বিশ্বের জানালা সব পর্ব একত্রে

নাম শুনে অবাক হবারই কথা। এরা আবার কোথায় আর এমন নামই বা কেন এদের? কিন্ত মজা করে এমন নামেই ডাকে দ্বীপের মূলনিবাসীরা অর্থাৎ আদি ইনুইট বাসিন্দারা। এরা আসলে এস্কিমো, আদি থেকেই ছিল মৃগয়াজীবি, শিকারনির্ভর যাযাবর মানুষ। প্রায় তিনহাজার বছরেরও আগে থেকে এরা এখানে বাস করত আর তুষারজমাট ‘বেরিঙ্গীয়া’ পেরিয়ে উত্তর আমেরিকা,বিশেষত আলাস্কা অঞ্চল থেকে এশিয়া ও পশ্চিম সাইবেরিয়া অঞ্চলে অনায়াসে যাতায়াত করত শিকারকে তাড়া করতে করতে। খানিকটা বোঝা যাচ্ছে দ্বীপ দুটি কোথায় হতে পারে! রাশিয়া আর আলাস্কার কাছাকাছিই হবে নিশ্চয়।
এই দ্বীপ দুটির অবস্থান বেরিং প্রণালীর ঠিক মাঝখানে, যাদের একদিকে আলাস্কা আর একদিকে সাইবেরিয়া । পোশাকী নাম ‘ডাইমোডে’ দ্বীপ। আসলে একটি ছোট আর একটি একটু বড়,দুটি দ্বীপ নিয়ে এই ডাইমোডে গঠিত। আর্কটিক মহাসাগর আর আটলান্টিক মহাসাগরকে যুক্ত করেছে বেরিং প্রণালী। আর্কটিক বৃত্তের ৫২ মাইল দক্ষিণে অবস্থিত দ্বীপ দুটির মধ্যে বড়টির নাম ‘বিগ ডাইমোডে’-আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার পশ্চিমে রাশিয়ার দিকে অবস্থিত। আর ছোট দ্বীপটি ‘লিটল ডাইমোডে’ উত্তর-পূর্ব আমেরিকার আলাস্কার পূর্ব দিকে অবস্থিত।বিগ ডাইমোডে আর লিটল ডাইমোডে দ্বীপদুটির মধ্যে তিন দশমিক আট কিলোমিটারের দূরত্ব।আর আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা থেকে বিগ ডাইমোডে দ্বীপটি দুই দশমিক চার মাইল দূরে, আর লিটল ডাইমোডে দ্বীপটি মাত্র দশমিক ছয় মাইল দূরে।
হিমযুগে এই পুরো অঞ্চলটি জমাট বরফে ঢাকা থাকতো। শীতের সময় এই বরফজমাট ব্রিজ ‘বেরিঙ্গীয়ার’ ওপর দিয়ে আদিম মানুষেরা অনাদিকাল থেকে সহজেই রাশিয়ার সাইবেরিয়া আর উত্তর-পূর্ব আমেরিকার মধ্যে চলাচল করত। তারা বিনা বাধায় ইউরোপ আর আমেরিকার মধ্যে শিকারে যেত। মেরু ভালুকের দল শিকারের খোঁজে ঘুরে বেড়াত, শিকারী আদিম জনজাতি ইনুইটরা কিং ক্র্যাব, মাছ ধরতো, পরিযায়ী শিকারের পিছু ধাওয়া করে চলে আসতো এক দ্বীপ থেকে অন্যটিতে। এছাড়া আত্মীয়দের সঙ্গে দেখাসাক্ষাত করতে যেত, বিভিন্ন ঋতুর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে সকলেই অংশ নিতে আসতো, বিভিন্ন জিনিসের চাহিদা মেটাতে কিছু ব্যবসাও হতো। তবে বসবাসের পক্ষে বিশেষ উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় বিগ ডাইমোডেতে বেশি মানুষজন থাকত না। মানুষের বসতি ছিল প্রধানত লিটল ডাইমোডে দ্বীপের পশ্চিম দিকের ঢালে। তাদের ঘরগুলি ছিল পাথরের দেওয়ালের মাথায় শিকার করা পশুর চামড়া দিয়ে করা ছাউনি। তিমির শক্ত দন্তহাড়কেও ব্যবহার করত ঘরের ছাউনিকে চাপা দেবার কাঠামোটি বানাতে। সাদা বরফের বুকে এলোমেলোভাবে স্তূপ করা পাথরের ডাঁই মনে হত ঘরগুলিকে দেখে। আর্কিওলজিস্টদের মতে ইগ্নালুক নামে যে এস্কিমো গ্রামটিতে প্রধানত জনবসতি গড়ে উঠেছে, প্রায় তিনহাজার বছর আগে সেই এলাকাটি ছিল এস্কিমোদের বসন্তকালীন মৃগয়াক্ষেত্র। পশ্চিমী নাবিকেরা দেখেছিলেন সেখানে এস্কিমোদের এক উন্নত সংস্কৃতি ছিল, আর ছিল তিমিশিকারের বিরাট উৎসব। মিলেমশে বেশ চলছিল প্রত্যন্ত বরফ রাজ্যের বাসিন্দাদের। বাদ সাধলো সাহেবদের ভৌগলিক আবিষ্কার।
১৬৬৮ সালে এই দ্বীপ প্রথমে নজরে আসে একজন রাশিয়ান সমুদ্র অভিযানকারীর । দ্বীপটি এর পরে নজরে আসে ১৭২৮ সালের আগস্ট মাসের ১৬ তারিখে, একজন ডেনিশ নাবিক ‘ভাইটাস বেরিং’এর । ঐ দিনটি ছিল রাশিয়ান চার্চের শহিদ সাধু ডাইমোডের মৃত্যুদিবস। বেরিং তাঁর নামেই দ্বীপটির নাম রাখেন – ডাইমোডে আইল্যান্ডস।
১৮৬৭ সালে আমেরিকা আলাস্কা অঞ্চলটি কিনে নেয় রাশিয়ার কাছ থেকে, আর লিটল ডাইমোডে চলে যায় আমেরিকার দখলে। অধিকারের এক নতুন সীমারেখা টানা হল দুই মহাদেশের মাঝে। বিগ ডাইমোডের জনতাকে রাশিয়া সরিয়ে নিয়ে গেল মূল ভূখন্ডে। আর আলাদা হয়ে গেল এতদিনের একাকার দ্বীপদুটির মানুষেরা, একদিক থেকে অন্যদিকে অনায়াস চলাফেরায় বাধানিষেধ আরোপিত হল।
রাজনীতি তাদের পৃথক করে দিলেও আত্মীয়ের বন্ধন শেষ করা যায়নি। মানুষ লুকিয়েচুরিয়ে, ঘন কুয়াশার আড়ালকে কাজে লাগিয়ে দুপাশেই যাতায়াত করতে থাকলো। কখনো ধরা পড়ে গেলে অনধিকার প্রবেশের জন্য দন্ড দিতে হয়। এরপর ১৮৮০ সালে টানা হল আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা। দ্বীপদুটিকে দুপাশে রেখে টানা এই রেখা দুটি দ্বীপকে নতুন নামে চিহ্নিত করলো। সারা পৃথিবিতে সময়ের হিসাবকে ঠিক রাখতে ‘টুডে’ থেকে ‘টুমরো’কে আলাদা করার সাথে সাথে দ্বীপদুটিও হয়ে গেল “টুমরো আইল্যান্ড”,(বিগ ডাইমোডে দ্বীপ) আর “ইয়েসটারডে আইল্যান্ড”,(লিটল ডাইমোডে দ্বীপ)। দুদিকের দুরত্ব সামান্য হলেও সময়ের পার্থক্য হয়ে গেল ২৩ ঘন্টার। তারিখ রেখার পশ্চিমদিকে থাকায় বিগ ডাইমোডে সময়ের দিক থেকে ২৩ ঘন্টা পিছিয়ে গেল লিটল ডাইমোডের থেকে।
যে এস্কিমোরা গাছপালাবিহীন তুষার মরুর শীতল ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঊষর প্রান্তরে এসে বসতি গড়েছিল হাজার বছর আগে, সেই লিটল ডাইমোডের বাসিন্দারা এই কৃত্রিম সীমারেখা মন থেকে মানেনি। তারা আজও তেমনিভাবেই যাতায়াত করে দুই দ্বীপের মধ্যে, শিকারের পিছু ধাওয়া করে ঢুকে পড়ে ‘টুমরো আইল্যান্ড’ বিগ ডাইমোডেতে, আবার শিকার করে ফিরে আসে নিজেদের দ্বীপে। আর মজা করে বলে, “উই গো হান্টিং টুডে”, “উই কিল ইট টুমরো”, “অ্যান্ড উই বুচার অ্যান্ড ইট ইট ইয়েসটারডে”।
কিছু তথ্য—

- ডাইমোডে আইল্যান্ডসে এখন আর আগের মত অবস্থা নেই।দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে রাশিয়ার বিগ ডাইমোডে দ্বীপটিতে মানুষের বসতি বিশেষ নেই, সেখানে একটি রাশিয়ান সেনাছাউনি আছে।
- লিটল ডাইমোডেতে ১৭০ জন ইনুপিয়াট ইনুইট এস্কিমোদের বাস।দ্বীপের পশ্চিমের ঢালে সুবিধাজনক জায়গায় ইগ্নালুক গ্রামে তাদের বাড়িঘর। এখন পাকাবাড়িও হয়েছে। এখন কিছু ইনুইট বাসিন্দারা চাষবাসও করে। তাছাড়া আইভরি কার্ভিং বা হাতির দাঁতের সুক্ষ কাজ করে। গ্রামে একটি স্কুল আছে।আর একটি মুদিখানা আছে।