বিশ্বের জানালা-বিচিত্র জনজাতি -উমা ভট্টাচার্য-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা২০১৫

  বিশ্বের জানালা       সব পর্ব একত্রে

biswerjanala49

এবারের সংখ্যায় থাকছে ভারতবর্ষের বাংলাদেশের এক প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কথা, ‘যারা ঘরের নহে পারের নহে, আছে মোদের মাঝখানে’,  ছিন্নমূল এক্দল ভবঘুরে মানুষের কথা। নাম তাদের ‘কাকমারা’। বাস তাদের মেদিনীপুর,কাঁথি,খেজুরি,দাঁতন,তমলুক, মহিষাদল, সুতাহাটা, এগরা, এসব অঞ্চলে। এরা ঘুরে বেড়া্‌য়, ভিক্ষা করে গ্রামে গ্রামে,আর শিকার করে বিশেষত কাক যা অঢেল পাওয়া যায়। যেখানে যায় সেখানে মানুষের ফেলে দেওয়া বর্জ্য পদার্থ, কাঠকুটো, প্লাস্টিক, ছেঁড়া, ফেলে দেওয়া কাপড় ন্যাতা কুড়িয়ে নিয়ে অস্থায়ী আস্তানা তৈরি করে। কিছুদিন থাকে সেখানে তারপর সেখানের শিকার ফুরিয়ে গেলে আর ভিক্ষার অভাব হলে ,আস্তানা ভেঙে দিয়ে চলে যায় অন্য গ্রামে। তবে মেদিনীপুরের বাইরে এরা বিশেষ যায়না। নিজেদের নির্বাচিত অদ্ভুত বিচিত্র পোশাক পরে, নিজেদের শিকারের হাতিয়ার লাঠি,নারাজ নামে একধরনের ফাঁদ,ছেঁড়া বিচিত্র বর্ণের ঝোলা কাঁধে বেরিয়ে পরে শিকারের সন্ধানে। তবে শুধু মাংসে তো আর পেট ভরেনা, তাই চাল ডাল আনাজের জন্য ভিক্ষা করে গ্রামের বাড়ি বাড়ি।

একবার গিয়েছিলাম মেদিনীপুরের খেজুরির কাছে এক গ্রামে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিতে,সে প্রায় বিশবছর আগেকার কথা। বিয়েবাড়িতে ম্যারাপ বাঁধা,আগের দিন অনুষ্ঠান হয়ে গেছে, রাস্তার ধারে উচ্ছিষ্ট আবর্জনা ফেলা হয়েছে। সকালের টিফিন খাচ্ছে সবাই, হঠাৎ সামনের দরজায় শোনা টং টং ধাতব আওয়াজ। সঙ্গে একটি মনুষ্যকণ্ঠের ডাক।“লেড়িদি লেড়িদি। বুমি দেওয়া ওরা রাজা। বালু ওরা।”

চেয়ে দেখি বিচিত্র পোশাক পরিহিত এক বিচিত্রদর্শন মানুষ। সঙ্গে সঙ্গে সবাই তৎপর হয়ে উঠল। দেরি করা যাবেনা। বাড়ির গৃহিনী উঠে গেলেন  ভিক্ষা দিতে। টিফিন মাথায় উঠল। দেরি হলে রক্ষে নেই।

মানুষটির কর্কশ ভাষার অর্থ বুঝতে পারলাম না। পরে বাড়ির লোকেদের কাছে জানলাম ঐ বিচিত্র শব্দ বন্ধের মানে।‘লেড়িদি লেড়িদি—মানে সীয়ারাম, সীয়ারাম। ‘বুমি দেওয়া ওরা রাজা’-মানে ‘আমরা এসে গেছি’। ‘বালু ওরা’-মানে ‘তোমরা তাড়াতাড়ি ভিক্ষা দাও’। একটু বাদে বাড়ির গৃহিনী নিয়ে এলেন থালাভর্তি চাল, আলু, বেগুন,লঙ্কা, নুন আর কিছু খুচরো পয়সা দিয়ে ডালা সাজিয়ে। পছন্দসই ভিক্ষে হল বলে বাড়িয়ে ধরল ছেঁড়া ন্যাতা দিয়ে তৈরি মোটা আর বেঢপ একটা ঝোলা ‘জোলি’। অশ্রদ্ধায় সামান্য ভিক্ষা এরা নেয়না। ভিক্ষা আনতে দেরি হলে মুহূর্তে রেগে উঠতে পারে আপাতনিরীহ চেহারার দীনহীন মানুষটি। আগুনের গোলার মত লাল চোখদুটো যেন রাগে বেরিয়ে আসতে থাকবে চক্ষুকোটর থেকে। সেই চোখ পাকিয়ে অবোধ্য, অশ্রাব্য ভাষায় অভিসম্পাত করতে থাকবে, আর নিজের হাতের ধারালো কাটারি দিয়ে কোপ বসিয়ে দেবে নিজেরই শরীরের কোনখানে, আর ঝলসানো কাকের মাংস খাওয়া অপবিত্র শরীরের রক্ত ফিনকি দিয়ে এসে পড়বে গৃহস্থের উঠোনে। তাই মানুষ এদের ডাক শুনলে হাতের কাজ ফেলে ছুটে আসে ভিক্ষার ডালি সাজিয়ে। শুনলাম এদের নাম কাকমারা।  

এদের সাজপোশাক বিচিত্র, সেই পোশাকের নামও বিচিত্র। এদের ভাষা তেলেগু। এদের কপালে পরে লাল সিঁদুরের লম্বা টিকা। রংবেরঙের যে আলখাল্লা পরে তাকে এরা এখনও তেলেগু ভাষায় বলে, ‘এলিস অলখম’। মাথায় পরে লম্বা শুঁড়তোলা খানিকটা টোপরের মত দেখতে টুপি,এরা বলে ‘টোফি’। টোফির চারপাশে বাঁধে টকটকে লাল রঙের কাপড়ের ঝালর দেওয়া রংচঙের রুমাল। তবে পোশাকের রং প্রধানত খাকি রঙের, বনে শিকারের সময় শিকারের চোখে ধাঁধা লাগাবার জন্য পরে এই শার্ট জাতীয় পোশাক ‘সককা’। নারীপুরুষ নির্বিশেষে গলায় থাকে নানা রঙের ছোট বড় পুঁতির মালা- ‘পসল’ আর পরনে খাটো ধুতি ‘বাট্টা’। ভিক্ষায় বেরোয় ‘এসিম অলখম’ গায়ে‘জোলি’ কাঁধে, বাঁ হাতে বাঁশ বা ধাতুর তৈরি ‘লাঠ্‌টা’,ডান হাতের মণিবন্ধে থাকে ধাতুর তৈরি মোটা মোটা বলয় ‘কারিম’ আর একটা ধারালো কাটারি-‘কাত্তি’। ভিক্ষা করতে এলেও ভিখারিসুলভ কোনও কুণ্ঠা বা নরম ভাব থাকেনা এদের চাউনিতে।

অবহেলিত প্রান্তিক মানুষ হিসাবে বাচঁতে বাঁচতে, ভিন্ন সমাজের এককোণে অবাঞ্ছিতের মত পড়ে থাকতে থাকতে এরা এরকমই হয়ে গেছে বাঁচার তাগিদে। তবে কারো অনিষ্ট করেনা, ভিন্ন সংস্কৃতির মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করতে পারেনা, নিজেদের ভাষা আর সংস্কৃতিকে নিজেদের মত করে বাঁচিয়ে রেখেছে। এরা কাক বেজি ইত্যাদি পশুশিকার করে ঝলসিয়ে খেলেও গোমাংস খায়না। কাক এমনই অখাদ্য যে অন্য পশুও পারতপক্ষে সে মাংস খায় না। তবে কেন এরা খায়,এ প্রশ্ন মনে জাগা স্বাভাবিক। এরা নিজেদের পরিচয় দেয় তেলিঙ্গা বলে –ভাষা এদের তেলুগু। কারো কারো মতে এদের আদি বাস ছিল অন্ধ্রপ্রদেশের কাকিনাডায়।

তবে এরা আজকাল স্থানীয় ভাষার সঙ্গে খানিকটা পরিচিত হয়েছে প্রয়োজনে, তবু নিজেদের ভাষাতেই এরা স্বচ্ছন্দ। আচার আচরণ থেকেই সিদ্ধান্তে আসা যায় দক্ষিণ ভারতের তেলুগুভাষী সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে বাঙ্গলাদেশে চলে আশা একটি যাযাবর অংশ এরা, কারণ হিন্দু সংস্কৃতির অনেক নিয়মকানুন এরা পালন  করে। তবে  এখানকার পালাপার্বণে এরা আসেনা।এদের নিজস্ব পুরোহিত আছে। তাই মনে হয় এদের একটা সুসংহত সমাজ ছিল। শিকারজীবি আদিম তেলুগু জাতির কেন্দ্রচ্যুত একটা অংশ এই গোষ্ঠী  কোনদিনই কৃষিজীবি ছিলনা।  ভাগ্যের পরিহাসে হয়তো কোনও সামাজিক বিপর্যয়ে, বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার হয়ে এরা ভাসতে ভাসতে চলে এসেছে সুদূর অতীতে এদেশে। অর্থবিত্তহীন,আশ্রয়হীন উদ্বাস্তু হয়ে থাকার জায়গার অভাবে মাঠেঘাটে গাছতলায় আশ্রয় নিয়েছে।

এছাড়া দক্ষিণাপথ থেকে বাংলায় অনেক রাজারা সামরিক অভিযান করেছেন নানা সময়ে। দক্ষিণ ভারত,অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে বাংলার আসার সহজ পথ ছিল উড়িষ্যা হয়ে মেদিনীপুরের মধ্য দিয়ে।এইসব সামরিক অভিযানে পদাতিক বাহিনীতে যোগ দিতে বাধ্য হত সমাজের নীচুজাতির খাটিয়ে শক্তসমর্থ সাধারণ আদিবাসী মানুষ। পাইক  তীরন্দাজ হয়ে বা তাদের বিপুল অস্ত্রশস্ত্রের বাহক হয়ে এরা এসেছিল এদেশে। রাজকীয় অভিযান শেষে এদের উচ্ছিষ্ট আবর্জনার মত পিছনে ফেলে দেশের রাজা ফিরে গেছেন স্বদেশে। অচেনা রাস্তা,পথ প্রদর্শকের অভাব আর রসদের অভাবে বিপর্যস্ত এই ব্রাত্য মানুষেরা আর ফিরে যেতে পারেনি নিজেদের জন্মভূমিতে। মেদিনীপুরে এরকম আরও কিছু অন্য প্রদেশের ভিন্ন জনজাতির মানুষ আছে, যেমন শিয়ালগিরি, কলমাদার,-যারা নাকি মারাঠাদের রসদবাহী সৈন্য হিসাবে এসেছিল এখানে, আর, কোন না কোন কারণে বাধ্য হয়ে দেশে  ফিরতে পারেনি। এরা  অবশ্য তেলেঙ্গি কাকমারাদের মত স্বতন্ত্র না থেকে এখানকার জনজীবনে খানিকটা মিশে গেছে।  

কাকমারারা কিন্তু দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে এখানে থেকেও নিজেদের খাপ খাওয়াতে পারেনি এখানকার সমাজে। এরা বেঁচে রইল সেই ভিক্ষাজীবি আর শিকারনির্ভর জাত হয়ে। কাক শিকার  কেন? কারণ কাক সর্বত্রই সহজলভ্য,তাই প্রথমে  কাকশিকার করে তার মাংস দিয়ে উদরপূর্তি করত,পরে অন্যান্য খাদ্যের সন্ধানে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেছে।

এদের শিকারের সময় খুব ভোরবেলা। প্রায়ান্ধকারে এরা গাছপালা ঘেরা কোনও এলাকায় একটা জাল পাতে, তার দড়িটি থাকে প্রায় ৭০/৮০ হাত লম্বা। অল্প একটু মাটি খুঁড়ে চার-পাঁচ হাত লম্বা জালটা বিছিয়ে দেয় তার উপর। আর ছড়িয়ে দেয় ভাত। তার লোভে কাক এসে জালে ধরা দেয়।  কাক ছাড়াও বেজি,কাঠবেড়ালি এসবও পড়ে জালে। সঙ্গে সঙ্গে কলদড়িতে টান দিয়ে জাল গুটিয়ে নেয় আর ধরা পড়ে শিকার।

সব শিকারই এরা খায় তবু এদের নাম রয়ে গেছে কাকমারা বলে। আসলে এরা প্রথমে আর কিছু না পেয়ে কাকই ধরতো ।এদের মেয়েরা ছেঁড়াখোড়া শাড়ি কোনক্রমে গায়ে জড়িয়ে আস্তানাতেই থাকে আর পুরুষেরা ফিরে এলে ভিক্ষায় পাওয়া চাল, তরকারি ফুটিয়ে নেয় শ্মশান থেকে কুড়িয়ে আনা মালসা বা হাঁড়িতে, জল রাখে সেখান থেকেই কুড়িয়ে আনা কলসিতে। মাংস কাঠকুটোর আগুনে ঝলসে নেয়। রাঁধে শুধু বিকেলে। সারাদিন এটা ওটা, গাছের ফলপাকুড়টা খেয়ে।

আজ এই একবিংশ শতাব্দীতেও এরকম অবহেলিত প্রান্তিক মানুষের বাস আছে আমাদের সোনার বাংলায়, ভাবতেই কষ্ট হয় মনে। শুনেছি আজকাল কিছু স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন নাকি এদের সমাজের মূল ধারার সঙ্গে জুড়ে দেবার জন্য নানা প্রকল্প নিচ্ছে, এদের নিয়ে সিনেমাও হয়ে গেছে, তবুও এই সরল সাদাসিধে মানুষগুলি কি মানুষের পর্যায়ে এসেছে?  এখনও সে খবর জানি না। জানলে আবার লিখব এদের নিয়ে।

Leave a Reply