বিশ্বের জানালা সব পর্ব একত্রে

ওপরের ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে কিছু মানুষ বিচিত্র পোশাক পরে মাথায় জয়ঢাকের মত একটা কিছু চাপিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁদের মুখ দেখা যাচ্ছেনা। তবে ঢাকগুলি নিশ্চয় খুব ভারী তাই দুপাশে ঝোলানো দুটি লটকন (সুন্দর করে বানানো দড়ির মত জিনিস) হাত দিয়ে ধরে রেখেছেন।
আসলে এগুলি হল মুখোশসুদ্ধ বিরাট বিরাট টুপি। এঁরা হলেন বামিলেকি উপজাতির মানুষ। এঁরা এখন এদের রাজবাড়ির উৎসব উপলক্ষে নাচের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছেন। পরেছেন তাঁদের জাতির ঐতিহ্যময় পোশাক, যা তাঁরা নিজেরাই বানান পুঁতি, নানারঙের পাথর, কড়ি, রঙিন কাপড় আর সুতো দিয়ে। অপূর্ব সুন্দর পোশাক। বেশির ভাগ পোশাকের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে মুখোশ। মুখোশগুলি হয় প্রধানত হাতী,কুমীর,চিতা,বাঘ, সিংহ প্রভৃতি বলশালী জন্তুর আদলে।

রাজা অর্থাৎ ওঁদের এক একটি গোষ্ঠীর আঞ্চলিক প্রধান, যাঁকে ওরা বলেন ‘ফন’,তাঁদের বাড়ির নানা অনুষ্ঠান, উৎসব উপলক্ষেই এঁরা আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন।
মনে হয় যখন এঁরা যখন মিশরের দিক থেকে ধর্মান্তরিত হবার ভয়ে ক্যামেরুনের পশ্চিম অঞ্চলের সাভানা নামের ঘাসজমিতে এসে বসতি গড়েন তখন যেসব জন্তু এঁরা দেখেছিলেন সেগুলির ভীতি থেকেই তাদের আদলে মুখোশ বানিয়ে তাই পরে উৎসবে নাচগান করেন। দেশান্তরী হওয়ার সময়কার বিপদের দিনে যে সর্দাররা তাঁদের রক্ষা করেছিলেন, তাঁদের বংশধর পরবর্তী সর্দার বা প্রধানকে তাঁরা রক্ষক, সুবিচারক, আধ্যাত্মিক গুরু, সেনাপ্রধান হিসাবে মানেন। আর অনুষ্ঠান পরবে নাচগানের মধ্যে দিয়ে তাঁকে সম্মান জানান।
এই মুখোশ আর পোশাকের বর্ণিল আর বিচিত্র রকম দেখলেই বোঝা যায় এ ব্যাপারে নানা পরিবারের মধ্যে আর নানা গোষ্ঠীর মধ্যে বেশ প্রতিযোগিতা আছে। কার পোশাক আর মুখোশ কতটা সুন্দর হতে পারে সেটার প্রতিযোগিতা। [ নীচে দেখ সেরকমই আরও দুটি পোশাকের ছবি, এবং তারপর ওঁদের একজন প্রধান (এনজি কামগা জোসেফ। বামিলেকিদের বানহুন গোষ্ঠীর ফন)-এর ছবি (তাঁর পোশাকটিও মজাদার)]।


এঁদের মধ্যে ‘কুশোই’ সমাজের মানুষরা প্রাচীন এক যোদ্ধা জাতির বংশধর, তাই এই মানুষদের তৈরি পোশাক আর মুখোশ আর নাচের মধ্যে থাকে বীরত্বের প্রকাশ। আর আছে ‘কুফোই’ সমাজ যাঁরা পুলিশের ভূমিকা পালন করেন। রাজ্যের মানুষদের নানা বিবাদের বিচার করে,মীমাংসা করে দেন। এঁদের ক্ষমতা এত যে এঁরা অপরাধের গুরুত্ব বুঝে শাস্তি বিধান করেন, এমনকি মৃত্যুদন্ডও দিতে পারেন। বিচারের সময় প্রধান বিচারক একটি বিশেষ মুখোশ ব্যবহার করে থাকেন।
এতক্ষণ যাঁদের পোশাক আর অনুষ্ঠানের কথা শোনালাম, তাঁদের আসল পরিচয়ই তো এখনও দেয়া হয়নি। আফ্রিকার একেবারে পশ্চিম দিকে অবস্থিত ক্যামেরুনের নাম সবাই জানি। এই ক্যামেরুনের পাহাড় ঘেরা পাথুরে অঞ্চলে আছে অনেক অরণ্য।
এখানকার পাঁচটি প্রধান অঞ্চলে বাস করে প্রায় ২৫০টি বিভিন্ন আদিম উপজাতির মানুষ। একসঙ্গে যাঁরা “বামিলেকি উপজাতি” নামে পরিচিত। পাঁচটি অঞ্চলের আলাদা সংস্কৃতি আর ভাষা। তবে সব ভাষারই উৎস এক – ‘নাইজার-কঙ্গো’ভাষা গোষ্ঠীর অন্তর্গত।
ক্যামেরুনের পশ্চিমের হাইল্যাণ্ডের ঘন সাভানা তৃণভূমি অঞ্চলে বাস করেন বামিলেকি উপজাতির মানুষেরা, যাঁরা আফ্রিকার ‘বান্টু’ গোষ্ঠীর অন্তর্গত। এঁদের মধ্যে আবার বিভিন্ন এলাকার নামে ৩০টি শ্রেণী আছে। এঁরা কথা বলেন বান্টু ভাষায়, যাকে আবার এঁরা নিজস্ব চলিত রূপ দিয়ে নিয়েছেন ।এখন অবশ্য ইংরেজিও একটা প্রধান কথ্য ও লেখ্য ভাষা।
বামিলেকিদের বাসভূমির উত্তর,পশ্চিম দিক সুরক্ষিত রেখেছে ‘ব্যাম্বুওটস’ পর্বতশ্রেণী আর দক্ষিণ, পূর্ব দিক ঘিরে রেখেছে ‘নাউন’ নদী। মাঝখানের নীচু প্রায় সমতল অঞ্চলে এঁরা বাস করেন, তাই এঁরা নিজেদের বলেন ‘পিপল ডাউন দেয়ার’- নিচু তলার মানুষ।
এখানে ১০০টি ছোট ছোট অঞ্চলে আলাদা ১০০টি ছোট ছোট রাজ্য আছে। এইসব অঞ্চলের ‘আঞ্চলিক প্রধান’ই হচ্ছেন সেই অঞ্চলের রাজা। দলগুলি ছোট-বড় নানা আকারের হলেও এদের রীতিনীতি, আদবকায়দা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, খাদ্য, পালাপার্বণ, রাজনৈতিক আর সামাজিক কাঠামো প্রায় এক। এঁদের প্রধান বা রাজার নির্বাচন হত বংশপরম্পরায়। প্রধানের জীবিত অবস্থাতেই পরের উত্তরাধিকারী নির্বাচন করা হত, কিন্তু প্রধানের মৃত্যু পর্যন্ত সেই ব্যক্তির নাম গোপন রাখা হত।
আদিম বামিলেকিদের এক একটি দল তাদের প্রধানের বাড়ির কাছাকাছি সারি সারি ঘর বানিয়ে বাস করে। মাঝখানে থাকে একটি প্রশস্ত প্রাঙ্গন, প্রাঙ্গনের দুইধারে সাধারণ মানুষদের কুটিরের মত ঘরগুলি তৈরি হয় বাঁশ আর কাঠের খুঁটির উপর। গোলাকার ছাউনি তৈরি হয় খড়জাতীয় জিনিস, পাতা এসব দিয়ে। দেওয়াল হয় মাটির তৈরি। দেখতে অনেকটা গ্রামের ধানের গোলাবাড়ির মত। তবে এদের ঘরের কাঠের খুঁটিগুলি সুন্দর খোদাই কাজের অলঙ্করণ থাকে।
সাধারণের বাড়িগুলির শেষ মাথায় অপেক্ষাকৃত উঁচু আর ঢালু একটা জায়গায় তৈরি হয় প্রধানের বাড়ি। তাঁর বাড়িটির দেওয়াল, খুঁটি সব কারুকার্য করা, খুব সুন্দরভাবে সাজানো, সাধারণ মানুষদের ঘরগুলি থেকে আলাদা।
তবে আজকাল সব বাড়িঘরই আধুনিক হয়ে গেছে। পুরনো ঘরবাড়িগুলি যেগুলি আছে সেগুলি গুদাম ঘর, শস্যাগার,আর কখনও কখনও প্রাচীন মানুষজনের সভাগৃহ হিসাবে ব্যবহার করা হয়।
প্রধান বা রাজার বাড়িতে আগে থাকত পূর্বপুরুষদের ব্যবহৃত সুন্দর পোশাক,শিরস্ত্রাণ, মুখোশ, ধাতুর ভারী ব্রেসলেট,নানা উজ্জ্বল রঙের রত্ন আর পুঁতিতে সাজানো সিংহাসন,তাঁদের শিকার করা পশুর শিং,চামড়া,হাতির দাঁত,সুন্দর টেরাকোটা সামগ্রী, কারুকার্য করা পাথর বা কাঠের তৈরি বসবার টুল ইত্যাদি। যাঁর বাড়িতে এতসব দামী আর ঐতিহ্যময় জিনিসের সংগ্রহ তাঁর আভিজাত্য তত বেশি, তিনি কত বড় বংশের বংশধর, সেটাই প্রমাণ করে এসব সংগ্রহ। এখনও পূর্বতন রাজপরিবারের বংশধররা সেগুলি যত্ন করে রাখেন।
এঁদের সমাজে মেয়েপুরুষ উভয়েই কাজ করেন। মেয়েরা প্রধাণত ঘরের কাজ আর ক্ষেতখামারের কাজ করেন, আর পুরুষেরা জমি পরিষ্কার করেন, চাষের জায়গাটি ঘেরা দিয়ে সুরক্ষিত করেন, উৎপন্ন জিনিস বাজারে বিক্রি করেন। এছাড়া অনেকেই পরিবহন ব্যবসায় যুক্ত। ট্যাক্সি, ট্রাক ইত্যাদি চালিয়ে ভালো উপার্জন করেন।
ঔপনিবেশিকদের সময়ে আর তার আগে এঁরা প্রধানত পশুপালন, গবাদি পশুর চাষ আর ভাড়াটে যোদ্ধার কাজ করতেন। এঁরা খুবই উদ্যমী, আর ব্যবসায়ের ঝুঁকি নিতে পিছপা হন না। এঁরা নিপুণ হস্তশিল্পী। এঁদের কুটিরশিল্পের মধ্যে দেখবার মত হাতির দাঁতের কাজ, পাথরের উপর খোদাই করে তৈরি গৃহসজ্জার নানা উপকরণ, মুখোশ, বসার টুল, মাথার টুপি। এছাড়া বিখাত এঁদের কাঠখোদাইর কাজ, যা এঁরা নিজেদের প্রাচীন দিনের কুটির তৈরির সময় দরজা, ঘরের খুঁটি, ফ্রেম ইত্যাদিতে ব্যবহার করতেন।
কথা হল এঁরা কোথা থেকে এসেছিলেন এই সাভানা গ্রাসল্যান্ডে, আর কেনই বা এসেছিলেন? বিভিন্ন মানুষের লেখা থেকে জানা যায় যে, এঁদের আদি বাসভুমি ছিল মিশর। কোনও সামাজিক বা প্রাকৃতিক কারণে এঁরা একাদশ শতাব্দি থেকে চতুর্দশ শতাব্দির মধ্যে মিশর ছেড়ে দেশান্তরী হন। দক্ষিণ-পশ্চিম মুখে চলতে চলতে এসে উত্তর ক্যামেরুণের নিরালা অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন।
এরপরে আবার এঁদের দেশান্তরী হতে হয় সপ্তদশ শতাব্দিতে। তখন বিদেশি বণিকেরা এসে গেছে আফ্রিকার সম্পদের সন্ধানে। ‘আটলান্টিক সমুদ্রের পথে দাস ব্যবসায়’ তখন শুরু হয়ে গেছে। সরল,সাদাসিধে,আদিম মানুষদের ধরে নিয়ে গিয়ে নিজেদের দেশে বিক্রি করার লাভজনক ব্যবসায়ের প্রতিযোগিতায় নেমেছে তখন ইউরোপ ও আমেরিকার বহু দেশ। ক্রীতদাস হওয়ার হাত থেকে বাঁচতে, আর ইসলামীকরণের হাত থেকে বাঁচার জন্য বামিলেকি মানুষরা উত্তর ক্যামেরুন ছেড়ে আরও দক্ষিণ দিকে আর পশ্চিম দিকে পালাতে লাগলো। শেষে থিতু হল তাদের বর্তমান বাসস্থানে ।
তবুও নিস্তার নেই। ১৮৮৪ সালে প্রথমে এল জার্মানরা, দখল নিল ক্যামেরুনের, অবশ্য এলাকা শাসনের ব্যাপারে প্রথমে বিজিত মানুষদের কিছু সুযোগ সুবিধা দিয়েছিল তারা। এরপরে আসে ফরাসিরা।
বেশ কিছুকাল এসব সহ্য করবার পর দুই বিদেশী শক্তির আধিপত্যের লড়াইয়ে ক্লান্ত মানুষজন তৈরি করল রাজনৈতিক দল। যারা ক্যামেরুনের স্বাধীনতার লড়াই শুরু করলো। ১৯৫৫ সালে ফরাসিরা এই রাজনৈতিক দলকে বেআইনি ঘোষণা করলে, শুরু হল জনযুদ্ধ। স্বাধীনতাকামী জনতার বিরুদ্ধে প্রবল আক্রমণ চলল। বিশেষত পশ্চিমাঞ্চলে, যেখানে বাস ছিল অধিকাংশ বর্ধিষ্ণু বামিলেকি ব্যবসায়ীদের, যারা তখন বিদেশের সঙ্গেও ব্যবসা করে প্রভূত অর্থ উপার্জন করছে। আর এরাই উৎসাহ আর অর্থ যোগাতো বিদ্রোহীদের, আশ্রয় দিতো তাদের।
এসময় প্রচুর বামিলেকি মানুষ এই নরমেধ যজ্ঞের আহুতি হন। কিন্তু ঝুঁকি নিতে ভয় নেই যাঁদের তারা আবার মাথা তুলে দাঁড়ালেন। পরবর্তীকালের ছেলেমেয়েরা শিক্ষার সন্ধানে বিদেশে পাড়ি দিতে লাগলো। আর ক্যামেরুনের বামিলেকি ব্যবসায়িরা আজও দেশের অর্থনৈতিক উন্নতিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করছেন। এঁদের মধ্যে আছেন শিল্পী, সুদক্ষ পেশাদার মানুষ, চাষী,মৃৎশিল্পী প্রমুখ উদ্যমী বামিলেকি জনগণ।
একনজরে কিছু তথ্য
- অবস্থান—আটলান্টিকের পুর্বতীর ঘেঁষে আফ্রিকার পশ্চিম উপকুলে ক্যামেরুনের ঘাসজমিতে।
- ভাষা—বামিলেকি নিজস্ব ভাষা, এছাড়া ঔপনিবেশিকদের আগমনের পর থেকে ইংরেজি একটি প্রধান ভাষা, আর ফ্রেঞ্চও ব্যবহৃত হয়।
- উৎপন্ন ফসল ও গাছপালা— বাদাম, ভুট্টা,মকাই,কোকোইয়াম ইত্যাদি। এসবই এদের প্রধান খাদ্য।সাভানা ঘাস ছাড়াও পশ্চিমের উচ্চভূমি ঘন জঙ্গলে ভরা।আর আছে প্রচুর ‘রাফিয়া’পাম গাছ, যার পাতা এদের কুটির ছাইতে ব্যবহৃত হত।
- জনসংখ্যা—বর্তমান জনসংখ্যা প্রায় তিনলক্ষ পঞ্চাশ হাজারের বেশি। পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭৫% মানুষ গ্রামীণ কৃষিজীবি। বাকি মানুষ শহরবাসী, এদের বাস প্রধানত চারটি শহরের মধ্যে প্রধান শহর ‘বাফুসসাম’এ।
- সংস্কৃতি—আনন্দ উৎসব এঁরা পছন্দ করেন। আমাদের দেশের মুখেভাত, পইতে ইত্যাদির মত, খৃস্টানদের ব্যাপটাইজেশনের মত অনুষ্ঠান হয় ওঁদেরও। ছোট ছোট ছেলেদের নিয়ে বিচিত্র উলকিতে দেহ সাজিয়ে নাচতে নাচতে তারা দল বেঁধে এঁদের দেবস্থানে যান। এক একটি উপজাতি দলের এই গণ অনুষ্ঠানে সকলেই একসঙ্গে আমোদ আহ্লাদ,খাওয়া দাওয়া করে। মেয়ে পুরুষ উভয়েই নাচগানে অংশ নেয়। এছাড়া এদের অন্যান্য সব অনুষ্ঠান হয় রাজপরিবারের যে কোনও অনুষ্ঠান উপলক্ষে।সেদিন এরা বিভিন্ন ধরনের মুখোশ ও টুপি, নানা পশুর আদলে তৈরি শিরস্ত্রাণ পড়ে।
- জলবায়ু—এই অঞ্চলে দুটি প্রধান ঋতুর প্রভাব। প্রায় নয়মাসব্যাপী দীর্ঘ বর্ষাকাল। এইসময় পশ্চিমী মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে এখানে বৃষ্টিপাত হয়। প্রতি বছরের গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ১০০০ মিলিমিটার থেকে ২০০০ মিলিমিটারের মধ্যে থাকে।
- ধর্ম- প্রধানত এদের নিজস্ব ধর্মের লোক ছাড়াও, এখন এখানে বেশীর ভাগ মানুষই খৃস্টান, আর কিছু ধর্মান্তরিত মুসলিমও আছে।