স্বপ্না লাহিড়ীর বনের ডায়েরির আগের লেখা– কৌখাল, আমার গেছো ভূত, নাগজিরা, ভালু, আমি আর অজগর

জানুয়ারি মাস শেষ হতে চলেছে, কিন্তু এখনো কনকনে ঠান্ডা এখানে। সপ্তাহখানেকের জন্যে বাইরে যেতে হয়েছিলো একটা কাজে। সেদিন ফিরে এসে কলেজে কয়েকটা ক্লাস নিয়ে আর কিছু কাজ সেরে আমার স্কুলে পৌঁছতে পৌঁছতে শীতের বেলা প্রায় ঢলে পড়়েছিল। ছুটি হব হব করছে তখন। স্কুল অফিসের সামনে স্কুটারটা দাঁড় করাতেই ক্লাস ইলেভেন টুয়েলভের বাচ্চারা দৌড়ে এসে আমাকে ঘিরে ধরল | চাপা উত্তেজনায় মুখ চোখ লাল ওদের। অভিমান ঝরা কন্ঠে অনুযোগ, “এত দেরি করতে হয়? ল্যাবে তোমার জন্যে কী রেখেছি দেখবে চল।” আমি আমার স্কুলের ছেলেমেয়েদের খুব আপনজন, তাই দূরত্বের কোন বালাই নেই। এদের বেশির ভাগই আমাদের স্কুলে সেই কেজি ক্লাস থেকে পড়ছে। আর যারা পরে এসেছে, তারা এদের তালেই তাল দিয়েছে। এদের আমি হাড়ে হাড়ে চিনি।
এরা এমনিতে খুবই নিয়ম মানা ছেলেমেয়ের দল। কিন্তু হঠাৎ এত উত্তেজনা কীসের! মনে মনে ভাবলাম, গিয়েই দেখি কী কান্ডটি ঘটিয়েছে এরা! দূর থেকে দেখলাম আমাদের বায়োলজির টিচার মৌসুমী ও পদার্থবিদ্যার দেবাশীষ বারান্দায় দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে। ল্যাবে গিয়ে যা দেখলাম তাতে আমার তো চশমাশুদ্ধু চোখ কপালে। হাসবো কি কাঁদবো ভেবে পাচ্ছিলাম না। একটা তেলের টিনে ফরমালিনে চোবানো আস্ত একটা হনুমান !!
খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে গম্ভীরভাবে জিজ্ঞাসা করলাম, “এটা কার কীর্তি?”
দেবাশীষ মাথা চুলকিয়ে বলল, “স্কুলে আসার রাস্তায় এটাকে পড়ে থাকতে দেখলাম, তাই–”
আমি বললাম “তাই তুই তুলে নিয়ে এলি এটাকে?”
দেবাশীষ বলল, “ম্যাডাম এদেরকে সেই ক্লাস সিক্স সেভেন থেকে দেখেছি জ্যামের, হরলিকসের শিশিতে সাপ, ব্যাঙ, ইঁদুর, ফড়িং, আরশোলা, টিকটিকি যা পাচ্ছে সব ফরমালিন এ চুবিয়ে রেখে দিয়েছে, সেগুলো এখনো মিউজিয়ামে রাখাও আছে। তাই ভাবলাম এটাও থাকবে।”
আমি আর কী বলি? নেশাটা তো আমিই ধরিয়েছি! এখনকার ক্লাস টুয়েলভের ছাত্র ছাত্রীরা যখন ক্লাস সিক্স-এ ছিলো তখনো আমাদের স্কুলে ল্যাব তৈরি হয়ে ওঠে নি। বারান্দা কিম্বা মাঠেই আমরা গাছপালা , জন্তুজানোয়ার বা পাথর টাথর নিয়ে কাজ করতাম। সে এক মজার ল্যাবরেটরি ছিল আমাদের! ততক্ষণে ছুটির ঘন্টা বেজে গেছে। বললাম, “তোমরা যাও,যা করার কালই করা যাবে।”
পরের দিন সকালে,কলেজে একটা প্র্যাকটিকাল ক্লাস নেবার পর, দুটো পিরিয়ড খালি ছিল, ভাবলাম স্কুলে ঘুরে আসি একবার। দেখে আসি হনুমানটার কী অবস্থা। স্কুলে গিয়ে শুনলাম,বাচ্চারা আজ একটু বেশিই চঞ্চল, তাদের ঘন ঘন জল তেষ্টা পাচ্ছে। স্যার ম্যাডামরা পিছন ফিরলেই তাদের চাপা স্বরে কথাবার্তা চলছে। আমি আর দেরি না করে মৌসুমী আর কয়েকটি ছেলেমেয়েকে নিয়ে গেলাম ল্যাবে। হনুমানটার ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু তো একটা ভাবতে হবে! সবাইকার কপালে চিন্তার রেখা, সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে, যেন আমার ওপরেই হনুমানটার ইহকাল পরকাল নির্ভর করছে ! সবাইকার দিকে একবার তাকিয়ে বললাম, ”হনুমানটাকে প্রিজার্ভ করে রাখার মতন অত বড় জার আমাদের কাছে নেই আর ওটাকে তেলের টিনেও ফেলে রাখা যায় না।”
মৌসুমী বলল, ”ম্যাম ওটার ভেতরের যন্ত্রপাতিগুলো প্রিজার্ভ করলেই তো হয়!”
আমি বললাম, ”তা হয়, তবে আমাদের ছুরিকাঁচি দিয়ে ওটাকে কাটা যাবে না।” বীরেন্দ্র বলে একটি ছেলে (সে এখন নিজেই একজন ডাক্তার) লাফিয়ে উঠে বলল, ”ম্যাম, কোলিয়ারির লাশ কাটা ঘর থেকে ওদের যন্ত্রপাতি নিয়ে আসি?” আমি বললাম, “তার থেকে ওটার হাড়গোড় বের করলে কেমন হয়?”
সমস্বরে প্রশ্ন, “কী করে ম্যাম? কী করে?”
আমি বললাম, “সোজা। কিছু নুন সহযোগে ওটাকে মাটির নিচে কবর দিয়ে দিলেই হল। দিনদশেক পরে ওটার কংকাল পেয়ে যাব আমরা।”
এরপর হইহই করে কোদাল,শাবল,গাঁইতি নিয়ে কবর খোঁড়া হল। আমাদের স্কুলের চারপাশে বেশ ঘন জঙ্গল ছিল তখন। রাত্তিরবেলায় ভালুক, হায়না, শেয়াল কখনো কখনো লেপার্ডও হানা দিত, তাই গর্তটা গভীর করে মাটি চাপা দিয়ে তার ওপরে বেশ কিছু ভারি ভারি পাথর চাপানো হল। বলাই বাহুল্য, সেদিন আমার আর কলেজে যাওয়া হয়ে ওঠেনি।
দিন দশেক পরে কবর থেকে হনুমানের অবশেষটুকু তুলে তাকে স্নান করিয়ে একটা বড় কাচের ট্রাউ বা বাটিতে পটাশিয়াম হাইড্রক্সাইডের হালকা ঘোলে ডুবিয়ে রাখা হল ছোটখাট মাংসের টুকরো গলিয়ে ফেলার জন্য। এরপর হাড়গুলোকে হাইড্রোজেন পারক্সাইডে ব্লিচ করে সেগুলোকে একটা বড় কার্ডবোর্ডে সেঁটে লেবেল লাগিয়ে কাচের বাক্সে পুরে ফাইনাল টাচ দিতে প্রায় চারদিন লেগে গিয়েছিল।
সব কিছুই নির্বিঘ্নে হয়েছিল, শুধু হনুমানটাকে মাটি পাথর চাপা দেবার পর, আমাদের চৌকিদার রামাধীন আমার সামনে হাত জোড় করে বলল,“মা জি,হনুমানজি হিন্দু ব্রাহ্মণ দেবতা,তাঁকে আপনি কবর দিলেন,পাপ হবে যে!”
সেদিন তাকে বুঝিয়েছিলাম যে,হনুমানজি নিজে একজন বিদ্বান পুরুষ,তাঁর হাড় নিয়ে পড়াশোনা করলে তিনি পাপ দেবেন না। কিছুক্ষণ পরে সে আমাকে কিছু ফুল ভগবানের পায়ে দিয়ে দিতে বলল। আমি তার নিষ্ঠা আর বিশ্বাসকে অশ্রদ্ধ্বা করতে পারিনি,ফুলগুলো সযত্নে ছড়িয়ে দিয়ে দুটো ধূপকাঠি জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম ।
ছবি –অর্ণব