দেশ ও মানুষ-তাঁতীয়া মামার কাহিনি-উমা ভট্টাচার্য-জয়ঢাক ৪৮

desh4802

দেশপ্রেমিক হিসাবে ঝাঁসীর রানি লক্ষ্মীবাঈ,নানাসাহেব আর তাঁতীয়া টোপীর কথা দেশের প্রায় সব মানুষই জানে। কিন্তু তাঁতীয়া মামা,ওরফে তাঁতীয়া ভীলের কথা প্রায় কেউই জানেনা, যেমন জানেনা ঝলকারী কোরিনের কথা। এঁদের মতই তাঁতীয়াও বুন্দেলখন্ডের মানুষ। শুধুমাত্র জনশ্রুতি আর লোকের মুখে মুখে বলা গল্পের মধ্যে বেঁচে আছে তাঁর নাম।

ঝাঁসির মতই মহারাষ্ট্রের একটি বিস্তৃত রুক্ষ অঞ্চল,খান্ডোয়া। সেখানেই বাড়ি ঠাকুর বিশ্বেশ্বর সিং-এর। বিশ্বেশ্বর সিং ছিলেন একজন সেনাকর্মী,অবসর নেবার পরে এখন পালা করে থাকেন দুই ছেলের কাছে। বড় ছেলে হোসিয়ার সিং খান্ডোয়া জেলায় পুলিশের একজন নামকরা সার্কেল ইন্সপেক্টর,আর ছোট ছেলে গাবরু সিং খাণ্ডোয়া জেলারই অন্য এক পুলিশ স্টেশনের একজন সার্জেন্ট। দুজনেই সেদিন বাড়ি এসেছেন, ছুটিতে নয়,এলাকার ধনী আর প্রতাপশালী লোকদের ত্রাস এক দুর্ধর্ষ ডাকাতকে ধরার কাজে।পুলিশের খাতায় ডাকাত বলেই চিহ্নিত তাঁতীয়া।  সেদিন রাতে দুইভাই খাওয়া দাওয়ার পরে শুয়েছেন একই ঘরে। দুজনেই জানে্ন যে তাঁরা যাকে ধরতে এসেছেন তার কাছে কোনও খবরই গোপন থাকেনা, তাদের গ্রামে আসার খবরও গোপন নেই। ভীষণ চতুর আর কৌশলী ডাকাত সে।

তাই মনে একটা ভয় নিয়েই শুয়েছেন দুই ভাই। অনেক রাত পর্যন্ত দুজনে আলোচনা করেছেন নিজেদের কাজের কৌশল নিয়ে।

গভীর রাতে হঠাৎ ঘরের মধ্যে শুরু হয়ে গেল ঘুষোঘুষি, মারামারি। ধ্বস্তাধ্বস্তির শব্দ আর ‘তন্দ্রা’, ‘তন্দ্রা’ বলে চিৎকার শোনা গেল বাইরে থেকে। ছুটে এলেন বাবা বিশ্বেশ্বর সিং।দরজা খুলে টর্চের আলোয় দেখেন দুই ছেলেই একে অন্যকে ঘুষি,চড়,মারছে। বিশ্বেশ্বর চিৎকার করে থামালেন দুজনকে। বাবার প্রশ্নের উত্তরে দু ভাই জানালেন রাতে ঘুমের মধ্যে কোন শব্দ শুনে দুই ভাইই উঠে পড়েন। তারপর একে অন্যের সঙ্গে ধাক্কা লেগে পরস্পরকে তাঁতিয়া ভেবে জাপটে ধরে মারতে শুরু করেছিলেন তাঁরা। তন্দ্রা ওরফে তাঁতীয়া ভীলকে নিয়ে এমনই আতঙ্ক ছিল পুলিশের মনেও। 

ডাকাত হতো কারা? চিরকালই গ্রামের নিপীড়িত, অত্যাচারিত, না খেতে পাওয়া সাধারণ কিছু মানুষ অবস্থা বিপাকে বাঁচার জন্য কোনও জীবিকা না পেয়ে ছিনিয়ে নেওয়ার  জীবিকা অবলম্বন করতো। আমাদের বাংলায় যেমন ছিল বিশে ডাকাত, রঘু ডাকাত, গৌর বেদে ডাকাত তেমনই মধ্যভারতে খান্ডোয়া অঞ্চলে বিখ্যাত ছিল তন্দ্রা বা তাঁতীয়া ডাকাত। গরীব মানুষের কাছে সে ছিল তাঁতীয়া মামা, ঠিক রবিনসন ক্রুশোর মত দয়ালু।     খান্ডোয়া তখন ইংরেজের অধীন। গ্রামে সাধারণ মানুষের চরম দুর্দশা। একদিকে কোম্পানির সাহেব আর টমিদের অত্যাচার,অন্যদিকে গ্রামের মুখিয়া আর খাজনা আদায়কারী জমিদারদের অত্যাচার। সেই সময়ই তৈরি হয়েছিল এমন কিছু ‘ডাকাতদল’। তবে তাঁতীয়া মামার দল ছিল গরিবের সহায়। তারা সেসময় পুলিশ, জমিদার, আর বড়লোকদের মনে খুবই আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিল।বুদ্ধি আর কৌশলে সে ও তাঁর সঙ্গীরা ছিল পুলিশের থেকেও দক্ষ। এদের জন্য ঘুমিয়েও শান্তি ছিলোনা অত্যাচারীর আর তাদের রক্ষাকারী পুলিশের। এইভাবেই খান্ডোয়া অঞ্চলের এক সাধারণ ভীল যুবক তাঁতীয়া ক্রমশ সেখানকার গরিব মানুষদের নির্ভর হয়ে ওঠে। ‘তাঁতীয়া মামা’ নামে তাঁকে ডাকতে শুরু করে সবাই। পাড়ার লোকে তাকে ডাকত ‘তন্দ্রা’বলে।    

নিমারের ‘ভিদ্রা’ গ্রামে ১৮৪২ সালে জন্মের কিছুদিন পরই তাঁতীয়া মাকে হারায়। মা-হারা শিশুর ঘরে আদর-যত্ন নেই। গরীব চাষী বাবা ভান সিং ভীল  কাছেই ‘পোখার’ গ্রামে নিজের কিছু জমিজমাতে আবাদ করে কষ্টেসৃষ্টে দিন গুজরান করতেন। ছেলের দিকে সেভাবে নজর দেবার সময় কোথায় তাঁর? দুঃখকষ্ট, অভাব অনটন ছিল এই গরীব মানুষদের বংশপরম্পরায় একমাত্র নিত্যসঙ্গী।

বাড়িতে ভালো লাগেনা ছোট্ট তাঁতীয়ার। সারাদিন মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়ায়,খেলে, পাখি শিকার করে। তাঁতীয়ার সঙ্গে ছিল তাঁর আরও দুই সাকরেদ, ডোপিয়া আর বিশালদেহী বিজনিয়া। এছাড়া সঙ্গে ছিল আরও কিছু সাহসী আর গরিবদরদি ভীল যুবক। ক্রমে তাদের সর্দার হয়ে ওঠে তাঁতীয়া।

আমাদের বাংলার নিমাইয়ের (শ্রী চৈতন্যদেবের) মত দুর্দান্ত ছিল বালক তাঁতীয়া। ভয়ডর বলে কিছু ছিলনা তার, মজার খেলা ছিল লুকিয়ে গ্রামের কাছকাছি মানুষদের বাড়ির গাছের ফলমূল পেড়ে মজা করে খাওয়া।  কখনও কখনও খিদের জ্বালায় অন্যের খেতের ছোলামটরের মত ফসল লুট করে দল বেধে খেত গাছের ছায়ায় বসে।  বড়লোকেদের ক্ষতি হলে তারা মাঝে মাঝে ধরে তাকে মারধরও করত। ফলে ছোট ছেলেটি আরও দুর্ধর্ষ হয়ে উঠতে লাগল। সে ক্রমে লক্ষ্য করলো বড়লোকরা তাঁর বাবার মত অনেক গরিব মানুষদের উপর অত্যাচার করে, ফসল উঠলে মিথ্যা ঋণের দায়ে চাষীদের ফসল কেড়ে নেয়, না দিলে মারধর করে, ঘরবাড়ি লুট করে সব কেড়ে নিয়ে যায়। কেউ এদের বিচার করেনা। পুলিশও এদেরই রক্ষা করে। তাই এবার সে দলবল নিয়ে শুরু করলো অত্যাচারী বড়লোকদের জমির ফসল কেটে নেওয়া, ফসলের গোলা লুট করা, আর সেই শস্য গরিব মানুষদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার কাজ ।ফলে শুরু হল তার আর তার দলবলের উপর আক্রমণ, মারধর।

এইভাবে চলতে চলতে তাঁতীয়া যত বড় হতে লাগলো তত কঠোর হতে  লাগলো। একবার তাকে ধরতে না পেয়ে গ্রামের মোড়ল তার বাবাকে ধরে নিয়ে গেলে কিশোর তাঁতীয়া ক্ষমা চেয়ে বাবাকে ছাড়িয়ে নিয়ে এল,আর তারপর থেকে কিছুদিন শান্ত হয়ে বাবার সঙ্গে ক্ষেতের কাজ করতে যেতে লাগলো। সেইসঙ্গে সাধ্যমত গরিবদের সাহায্য করা চালাতে থাকলো সে।

তার যখন ত্রিশ বছর বয়স, তখন বাবা মারা গেলেন। জমির সব দায়িত্ব পড়লো তার উপর।এইবার বাধল গোল। একেই শুখার দেশ খান্ডোয়া, চাষের ভরসা একমাত্র আকাশের জল। সে বছর খরা হল, একফোঁটা বৃষ্টি নেই,ফসল শুকিয়ে গেল মাঠেই। কিন্তু জমিদারের আর মহাজনের তাতে কী? তারা জোর করে খাজনা আদায় শুরু করলো। না দিতে পারলে শুরু হল লুটপাট। কিন্তু যেসব লোক খাজনা আদায়কারী অফিসারকে লুকিয়ে কিছু কিছু ঘুষ দিতে পারলো তাদের খাজনা মকুব করে দিতে লাগলো। তাঁতীয়া সব দেখেশুনে প্রতিবাদ করলো,আর তার সঙ্গে অনেক গরিব মানুষ সামিল হল। সে নিজের জমির খাজনা তো দিলই না, অন্যদেরও দিতে বারণ করলো। পেয়াদা এসে তার জমির দখল নিল। কিন্তু তাঁতীয়া তার সাতপুরুষের জমি ছাড়বেনা, জোর করে জমিতে চাষ করতে শুরু করলো। তার নামে নালিশ গেল আদালতে, পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে গেল, একবছরের সশ্রম কারাদণ্ড হল তার। 

জেলের অত্যাচারে আরও কঠিন, আরও প্রতিশোধপরায়ণ মানুষ হয়ে উঠলেন তিনি। জেল থেকে বেরিয়ে প্রথমে  রুজির জন্য অন্যের জমিতে দিনমজুর খাটতে শুরু করলেন। এদিকে মজবুত চেহারার, সাহসী, দুর্দম তাঁতীয়ার উপরে নজর পড়লো গ্রামপ্রধান প্যাটেলের। প্যাটেল চাইল তাঁতীয়া তাঁর বাড়িতে চাকর হিসেবে থাকুক, আর তাঁর হয়ে কাজ করুক। কিন্তু স্বাধীনচেতা তাঁতীয়া কারও চাকর হতে রাজী হলেন না।ফলে প্যাটেল রেগে গিয়ে  তাঁতীয়াকে যে কোনও উপায়ে ফাঁদে ফেলার জন্য ফন্দি আঁটতে লাগলো, তাঁর বিরুদ্ধে গ্রামের মাতব্বরদের নিয়ে দল ভারী করলো।

কদিন বাদে একটা সুযোগও হাতে এসে গেল প্যাটেলের। গ্রামের এক বাড়িতে চুরি হল।সেই চুরির মাল পাওয়া গেল চোরের বাড়িতে। কিন্তু প্যাটেল চোরকে দিয়ে স্বীকার করালো যে তাঁতীয়াই তাকে চুরি করতে পাঠিয়েছিল। পুলিশ এল তাঁতীয়ার বাড়িতে তাঁকে ধরে নিয়ে যেতে। তাঁতীয়া পুলিশের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। পুলিশের সঙ্গে মারপিট বেধে গেল তাঁর। তাঁর বাড়িতে চুরির জিনিস পাওয়া যায়নি, তাই চুরির জন্য তাঁকে ধরা গেলনা, কিন্তু পুলিশের গায়ে হাত তোলার অপরাধে তাঁর আবার একবছরের কঠিন হাজতবাস হল।প্যাটেলের মিত্র পুলিশ জেলে তাঁর উপর এত অত্যাচার করলো যে জেল থেকে বের হয়ে এল অন্য এক তাঁতীয়া, আরো কঠোর, কৌশলী,আর প্রতিহিংসাপ্রবণ। গরীবের বন্ধু আর দুষ্টের শত্রু। পুলিশও হয়ে গেল তাঁর আক্রমণের লক্ষ।

সমাজের মাথা জমিদার আর মাতব্বরদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর জন্য তাঁতিয়া এবার দল তৈরি শুরু করলেন। একাজ তো একা করা সম্ভব না! জুটে গেল খাজুরি গ্রামের আর এক দামাল ভীল যুবক, বিশালদেহী ‘বিজানিয়া’। আর জুটে গেল ‘ডোপিয়া’নামে আর এক সঙ্গী,যে ছিল ভীষণ নিষ্ঠুর আর চতুর। এরকম আরও দশজন ভীল যুবক যোগ দিল তাঁর দলে। এরা সকলেই গরিব আর অত্যাচারিত ভীল পরিবারের সন্তান, তাই কষ্টে থাকতে থাকতে হয়ে উঠেছিল কঠোর আর তাঁতীয়ার প্রতি ছিল তাদের অটুট আস্থা, আর গরিবদের প্রতি দয়ালু মনোভাব।এই দল নিয়ে তাঁতীয়া হয়ে উঠেছিলেন পুলিশেরও ত্রাস।

শুরু হল ইংরেজ পুলিশের ভাষায় ডাকাত তাঁতীয়ার অভিযান। বড়লোক,মোড়ল,আর তাদের সাহায্যকারী পুলিশ হল তাঁর মূল শত্রু। জঙ্গলে ডেরা বেঁধে সেখান থেকে তাঁরা বের হতেন শুধু ডাকাতি করার জন্য, আর প্যাটেল গ্রামের কারও উপর অত্যাচার করেছে শুনলে তার প্রতিশোধ নিতে। তাঁর ছিল বিশ্বস্ত খবর সংগ্রহকারী দল।পথেঘাটে প্যাটেলের বিশ্বস্ত লোকজন পেলেই তাকে অপহরণ করতো, আর একমাত্র মোটা মুক্তিপনের বিনিময়েই ছাড়তো। আর সেই টাকা দিয়েই হত গরিব মানুষদের সাহায্যদান, কারও মেয়ের বিয়ের টাকা দেওয়া, অন্নহীন মানুষদের মুখে খাবার তুলে দেওয়া, রোগীর জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।

প্যাটেল আর ধনী মানুষেরাও চুপ করে বসে থাকতোনা। তারাও সবসময় ব্যস্ত থাকতো তাঁতীয়াকে কীভাবে জেলে পাঠানো যায় সেই সুযোগের খোঁজে। প্যাটেল একবার লোক মারফৎ তাঁতীয়ার সঙ্গে সমঝোতা করার জন্য বলে পাঠালো। অনেক দিন ধরে খোশামোদ করার পর সরল বিশ্বাসী ভীল তাঁতীয়া ভাবলেন যে, বয়স তো হয়েছে প্যাটেলের, তাই হয়ত কৃতকর্মের জন্য পরিতাপ হয়েছে। এই সুযোগে যদি গ্রামের গরিবদের জন্য কিছু সাহায্যের ব্যবস্থা করানো যায় তবে ভালোই হয়। তাই তিনি প্যাটেলের আমন্ত্রণ রক্ষা করতে গেলেন তার বাড়িতে। প্রতারক প্যাটেল তখন তাঁকে পুলিশের হাতে সদলে ধরিয়ে দিল। তাঁদের রাখা হল কড়া প্রহরায় খান্ডোয়া জেলে।

তাঁতীয়ার স্বভাবের বিশেষত্বই ছিল যদে সে শত্রুকে প্রকাশ্যে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে পালাতো।এবারও তার ব্যত্যয় হলনা।  ভাগ্যক্রমে সেবার জেলে তিনজনই ছিল এক কুঠুরিতে।জেলে তাদের কুঠুরির সামনে একদিন  একটা লোহার  রড পরে থাকতে দেখতে পেয়েই ডোপিয়া সবার অলক্ষে সেটা তুলে নিল, আর লুকিয়ে রাখল নিজেদের কুঠুরিতে। তারপর প্রতি রাতে একটু একটু করে  দেয়ালে একটা গর্ত করলো তারা, আর এক অন্ধকার রাতে একজন একজন করে  সেখান দিয়ে বেরিয়ে গেল কুঠুরি থেকে, সঙ্গে নিল পাতলা কালো কম্বলগুলো। বেরিয়ে দেখে সামনে উঁচু পাঁচিল। তাতে কী? ইচ্ছা থাকলেই উপায় হতে  বাধ্য। ভীমাকার বিজানিয়া ডোপিয়াকে কাঁধে তুলে নিয়ে দাঁড়ালো পাঁচিল ঘেঁষে।তাঁতীয়া কম্বলগুলোকে জোড়া দিয়ে তার মাথায় একটা ভারী পাথরের চাঁই বেঁধে ডোপিয়ার হাতে দিয়ে পাঁচিলের বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিলেন আর সেটা বেয়ে দুজন পাঁচিল পার হয়ে গেল। শেষে তাঁতীয়া পাঁচিলের মাথায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে চ্যালেঞ্জ জানালেন প্রহরীদের, “আমি তাঁতীয়া। জেল থেকে পালাচ্ছি,ক্ষমতা থাকে তো ধরো আমাকে।” নিশুতি রাতের নীরবতা খানখান হয়ে ভেঙে শোনা গেল তাঁর কথা। যতক্ষণে সবাই তাদের ধরবার চেষ্টা শুরু করলো, ততক্ষণে তাঁতীয়ার দল বহুদূরে। রাতের অন্ধকারে ৬০ মাইল রাস্তা পেরিয়ে তারা পালিয়ে গেল।

এবার তাঁতীয়া শুরু করলেন বাংলার স্বদেশী ডাকাতদের মত কাজকর্ম। ততদিনে তাঁরা তাঁদের রাজ্যের ঝাঁসীর রানির বীরত্বের কথা শুনেছেন ,শুনেছেন দেশজুড়ে সিপাহী বিদ্রোহের কথা, ইংরেজ যে দেশের প্রধান শত্রু সে সত্যটা বুঝতে শিখেছেন। শুরু হল তাঁতীয়ার হাতে ইংরেজের হয়রানি। তিনি ভেবেই নিয়েছিলেন  সরকারী খাজনা লুট করা অন্যায় নয়,কারণ সেই খাজনা সংগ্রহ করা হয় দেশের মানুষের কষ্টের উপার্জন কেড়ে নিয়ে।

জেল থেকে বেড়িয়ে প্রথমেই পোখার গ্রামের প্যাটেলকে তিনি শাস্তি দিলেন বিশ্বাসঘাতকতার জন্য। তার বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তাকে বাড়ির বাইরে বার করে শেষ করে দেয়া হল। কিন্তু বাড়ির মেয়েদের, শিশুদের আর বৃদ্ধদের কোনো ক্ষতি করা হল না, বাড়ি লুটপাটও হল না। নির্দোষ মানুষদের কোন ক্ষতি করা ছিল তাঁর নীতিবিরুদ্ধ।

১৮৭৮ সাল থেকে ১৮৮৬ সাল  পর্যন্ত তাঁতীয়া ৪০০টিরও বেশি গভর্নমেণ্টের খাজনা লুট করে, সেগুলি  গরিবদের মধ্যে বিতরন করে তাদের দুঃখ লাঘব করে গিয়েছেন। বারবার নানা বেশে- কখনও নাপিত সেজে ইংরেজ সাহেদের দাড়ি কামিয়ে দিয়ে গেছে্ন , কখনও কুলি সেজে পুলিশের মোট বয়ে নিয়ে গেছেন। কখনও ধরা  পড়ে্ননি। ব্রিটিশের শাসন এলাকার মধ্যেই এই দল ইংরেজ সেনা আর পুলিশ অফিসারদের এত নাকাল করেছিল যে, ব্রিটিশ সরকার তাঁতীয়ার ডাকনামে ‘তন্দ্রা পুলিশ’ নামে একটি স্পেশাল পুলিশ বাহিনি তৈরি করেছিল।

 শেষমেষ ডোপিয়া আর বিজানীয়া পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও তাঁতীয়াকে পুলিশ ধরতে পারেনি। বিজানীয়াকে  ফাঁসি দিল ইংরেজ সরকার আর প্রতিবাদের কন্ঠ রোধ করতে দুদিন বিজানীয়ার মৃতদেহটি রাস্তার পাশে গাছে ঝুলিয়ে রাখল প্রকাশ্যে। ডোপিয়া ধরা পড়ে জেলে গেল, কিন্তু আবার জেল ভেঙে পালিয়ে গিয়েছিল সে।

বিজানীয়ার মত  শক্তিশালী সঙ্গীর পরিণতিতে সাময়িক ভেঙে পড়েছিলেন তাঁতীয়া, কিছুদিন চুপচাপ বসে থাকার পর আবার ভয়ঙ্কর হয়ে উঠলেন তিনি।বারবার এনকাউন্টারেও পুলিশ তাঁকে ধরতে পারেনি। এভাবে ১১ বছর কেটে গেল। ক্ষুধার্ত,হীনবল,হয়ে স্থান থেকে স্থানান্তরে পালিয়ে বেড়াতে বেড়াতে ক্লান্ত, অবসন্ন,হৃতমনোবল হয়ে, প্রায় ৪৫ বছরের  তাঁতীয়া পুলিশের সঙ্গে সমঝোতার চিন্তা করলেন।

বিজানীয়ার পরিণতি দেখে কেউ আর তাদের আদরের তাঁতীয়া মামাকে আশ্রয় দিতে সাহস করতোনা। কিন্তু আত্মসম্মান জ্ঞান তাঁকে নিজে থেকে পুলিশের হাতে ধরা দিতে দিলনা। পুলিশের কাছে আত্মসমর্পনের জন্য একজন মধ্যস্ততাকারীর খোঁজ করতে লাগলেন বীর তাঁতীয়া। গণপৎ নামে এক লোভি মোড়ল তাঁকে পুলিশের সঙ্গে সম্মানজনক সমঝোতা করিয়ে দেবে বলে আশ্বাস দিয়ে নিজের বাড়িতে নিমন্ত্রণ করলো। ১৮৮৬ সালে রাখীবন্ধন উৎসবের দিন  গ্রামের মোড়লের বাড়িতে  খেতে বসা অবস্থায় অভুক্ত, নিরস্ত্র তাঁতীয়াকে ধরে নিয়ে গেল  পুলিশ। ১৮৮৬ র  ২৬শে সেপ্টেম্বর জব্বলপুরে ডেপুটি কমিশনারের এজলাসে বিচার হল তাঁর, আর নভেম্বরে এই  মানবদরদী, গরিবের বন্ধু ‘তাঁতীয়া মামার’ ফাঁসি হয়ে গেল।

আজ এসো সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করি বিস্মৃত দেশপ্রেমী, জনদরদি মানুষটিকে, মাথা নত করি তাঁর উদ্দেশ্যে।  দেশকে ভালবেসেছিলেন, তাই দেশের মানুষের ভালো করার জন্য নিজের জীবনকে বিপন্ন করেছিলেন তিনি  নির্দ্ধিধায়। এখনও হয়ত এমন মানুষটির অনেক কথাই অজানা থেকে গেল।       

দেশ ও মানুষ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply