
সব দেশেই কিছু মানুষ থাকেন যাঁরা নীরবে , লোকচক্ষুর আড়ালে থেকে বিনা প্রচারে সাধারণ ও দীনদরিদ্র মানুষদের উপকার করে যান। এঁরা নিজেদের জীবন বা অর্থের কথা চিন্তাও করেন না।এমনই একজন নিঃস্বার্থ মানুষ ছিলেন হালিশহরের ‘আত্মোন্নতি সমিতি’র সদস্য যতীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়।
শুরুতে হালিশহর বিষয়ে কিছু কথা বলে নেয়া যাক। বিপ্লবী বিপিনবিহারী গাঙ্গুলীর বাসস্থান হালিশহরের মানুষ সিপাহি বিদ্রোহের সময় থেকেই ইংরেজবিরোধী আন্দোলনে শরিক ছিলেন। হালিশহরের রায়চৌধুরী পরিবারের সন্তান রাজীবলোচন রায় ছিলেন বহরমপুরের সেনানিবাসে সেনা বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক, ও নেতা। ফাঁসি হয়েছিল তাঁর , সিপাহি বিদ্রোহের প্রশমনের পরেই। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তিনিই প্রথম বাঙালি শহীদ।
তাঁর আদর্শে ১৮৭০ সালে এই পরিবারের আর এক যুবক জীবনকৃষ্ণ চৌধুরী কিছু সাহসী আদর্শবাদী যুবকদের নিয়ে গড়ে তুলেছিলেন হালিশহরের সন্তানদল, যারা নিজেদের মধ্যে সংবাদ আদানপ্রদানের জন্য সংকেতশব্দ নির্ধারিত করেছিল “ স স ব ম” অর্থাৎ “সন্তান সম্প্রদায় বন্দেমাতরম।” সশস্ত্র বিপ্লবের জন্য তৈরি হচ্ছিল এই ‘সন্তানদল’। গোপনে চলত তাদের অস্ত্রশিক্ষা। তখনও সর্বভারতীয় বিপ্লবী সংগঠন ‘অনুশীলন সমিতির’, ‘আত্মোন্নতি সমিতি’বা যুগান্তর দলের মত বিপ্লবী সংগঠনের জন্মই হয়নি। তখন থেকেই হালিশহর ছিল বিপ্লবী চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষদের আবাস।
তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠেছে। চারিদিকে সাজো সাজো রব। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের সূত্র ধরে বাংলাদেশের সর্বত্র বিপ্লবী কার্যকলাপ বৃদ্ধি পেয়েছে। এমনই এক সময়ের মানুষ ছিলেন যতীন্দ্রনাথ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে সর্বভারতীয় বিপ্লবের প্রচেষ্টা বিঘ্নিত হতে শুরু হল। চারিদিকে পুলিশের নির্মম অত্যাচার শুরু হল বিপ্লবীদের খোঁজে। ভারতরক্ষা আইনে শুরু হল ধরপাকড়,ফাঁসি, কালাপানি, যাপজ্জীবন কারাবাস,দ্বীপান্তর। বাংলাদেশের প্রায় সকল নামকরা বিপ্লবীরা কারারুদ্ধ হতে শুরু হলেন । গ্রেপ্তারের ভয়ে সাধারণ বিপ্লবীরা কেউই বাড়িতে থাকতে পারে না, ফেরারি হয়ে ঘুরছিল এদিক ওদিক। খাওয়া নেই ,বিশ্রাম করার জায়গা নেই, নিরাপদ আশ্রয় নেই, হাতে টাকাপয়সাও নেই তাদের।
পুলিশের দৃষ্টি এড়িয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে,গভীর জঙ্গলে,কখনও খোলা আকাশের নীচে তাদের দিন কাটছিল। এই সব খবরই রাখতেন ‘কলিকাতা কেলনার কোম্পানির’ এক সামান্য খাজাঞ্চী যতীন্দ্রনাথ। নিজের সামান্য আয়কে ভরসা করে একদিন তিনি ঠিক করলেন এই আশ্রয়হীন, খাদ্যহীন বিপ্লবীদের সাহায্য করতে হবে।
পলাতক বিপ্লবীদের একটি সাময়িক আশ্রয়কেন্দ্র স্থাপন করার জন্য হালিশহর চৌধুরীপাড়ার বাসিন্দা যতীন্দ্রনাথ নিরাপদ আর নিরিবিলি একটা জায়গা খুঁজতে লাগলেন। এখন যেখানে কাঁচড়াপাড়া বাগের মোড় সেই অঞ্চলটির নাম ছিল মল্লিকের বাগ। এখানকার ‘বাগের খাল’-এর দিকটায় ম্যালেরিয়ার ভয়ে বিশেষ মানুষজনের বাস ছিলনা।
স্যাঁতসেতে, ঝোপঝাড় আর জঙ্গলময় নির্জন এই এলাকায়, বাগের খাল-এর জলধারার দক্ষিণ দিকে ১৪৪ টাকা বাৎসরিক খাজনার বিনিময়ে সাড়ে বাহাত্তর বিঘা পরিত্যক্ত জমি লিজ নিলেন যতীন্দ্রনাথ নিজের টাকায়, নিজের নামে। সেখানে কয়েকটি মুলিবাঁশের চালাঘর তুলে প্রতিষ্ঠা করলেন বিপ্লবীদের জন্য গোপন আশ্রয়। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘিরে ফেললেন সমস্ত জমিটা। চারজন মালী রাখলেন সমস্ত জমিটা পরিষ্কার করে তাতে নানা সবজির চাষ করতে।
পতিত জমি সামান্য যত্নের প্রতিদানে দিতে লাগল প্রচুর তরিতরকারি। শুধু চালটা কিনে নিলেই বাগানের সবজিতেই অনেক মানুষের খাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে যায়। এখানে দিবারাত্র সর্বক্ষণের জন্য খাদ্যসামগ্রী, বিছানাপত্র,আর ঔষধপত্রের ব্যবস্থা রাখা হল। কাছাকাছি গ্রামের কিছু দরদী মা বোনেদের ডেকে এনে এই মহৎ কাজের অংশীদার করা হল। তারা এইখানে এসে আশ্রয় নেয়া বিপ্লবীদের রান্নাবান্না, সেবাশুশ্রূষার ভার নিল খাওয়া থাকার বিনিময়ে।
তাঁর এই মহৎ কাজের সহযোগীও জুটে গিয়েছিলেন কিছু । এঁদের মধ্যে ছিলেন খড়দহের রহড়া গ্রামের কিরীটীভূষণ মুখোপাধ্যায়, বড় জাগুলির নিতাই চট্টোপাধ্যায় আর ভূপতি মুখোপাধ্যায়, কাঁচড়াপাড়া গ্রামের খগেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় প্রমুখ।
যতীন্দ্রনাথ যখন কাজে যেতেন কলকাতায় ,তখন এঁরা পালা করে এই আস্তানার দেখভাল করতেন। কাঁটাতার আর জঙ্গলঘেরা জায়গাটিতে গাছপালা দেখে দূর থেকে মনে হত কোনও চাষীর বাড়ি। লোকে বলত ‘তারবাগানের বাড়ি।’ বিপ্লবীরা সাধারণত রাতের অন্ধকারে এখানে আসতেন, খাবার পেতেন, বিশ্রাম নিতেন , দরকারমত চিকিৎসাও পেতেন। তারপর ভোরের আলো ফুটে লোকজনের যাতায়াত শুরু হবার আগেই সেখান থেকে চলে যেতেন।
যতীন্দ্রনাথ যা আয় করতেন তা থেকেই চলত এখানকার খরচ আর বিপ্লবীদের রাহাখরচ। এইখানে যতীন্দ্রনাথ একটা বন্দুক রেখে দিয়েছিলেন হঠাৎ আক্রান্ত হলে বিপ্লবীদের বাঁচানোর জন্য।
এইভাবে অনেকদিন চলার পর গোপন সূত্রে খবর পেয়ে পুলিশ নজর রাখতে লাগল বাগানওলা বাড়িটির ওপর। অনেকদিন ধরে তারবাগানের বাড়ির কর্মচারীদের ওপর নজর রাখার পর পুলিশ টের পেল যে এটি বিপ্লবীদের সাময়িক আশ্রয় আর রসদের জায়গা। বোমা আর গুপ্ত অস্ত্রের খোঁজে বারবার বাড়ির খানাতল্লাসি হওয়া শুরু হল।
এইরকম একবারের এক খানাতল্লাশির সময় পুলিশ যতীন্দ্রনাথের বন্দুকটা পেয়ে বাজেয়াপ্ত করল। জানা গেল বাড়ির মালিক আর বিপ্লবীদের আশ্রয়দাতা হলেন হালিশহরের যতীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। পুলিশের অভিযোগের ভিত্তিতে যতীন্দ্রনাথের চাকরিটি গেল। অর্থাগমের পথ বন্ধ হয়ে গেলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত তারবাগানের আশ্রয়টির খরচ চালিয়ে গেলেন তিনি। প্রচুর ঋণগ্রস্ত হয়ে সর্বস্বান্ত হলেও কর্তব্য থেকে সরে দাঁড়ালেন না।।
যুদ্ধ শেষ হবার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ডাকে সাড়া দিয়ে যতীন্দ্রনাথ চলে গেলেন বোলপুরে। সেখানে শ্রীনিকেতনের পল্লীসংঠন বিভাগটির গঠনমূলক পরিকল্পনায় যোগ দিলেন। এই সময় শান্তিনিকেতনের কাছে সুরুলের কৃষি ও শিল্পসংগঠনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অন্যতম সহকারী ছিলেন তিনি। ১৯২০ সালে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে বিলিতি জিনিস বর্জন আর স্বাধীনতার বাণী নতুনভাবে প্রচারের উদ্দেশ্যে যতীন্দ্রনাথের বাড়িতেই সর্বপ্রথম কংগ্রেসের কার্যালয় স্থাপিত হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর পরে শেষজীবনে তিনি রবীন্দ্রনাথের ডাকে বোলপুরে গিয়ে আমৃত্যু সেখানেই ছিলেন কবির সহকারী হয়ে।
এরকম স্বার্থশূন্য মানুষ আজকের দিনে একেবারেই দেখা যায়না। ভারতমায়ের অনামা সেবক যতীন্দ্রনাথকে জয়ঢাক সেলাম জানায়।