দেশ ও মানুষ-শ্রীনিবাস রামানুজন আয়েঙ্গার- উমা ভট্টাচার্য- পুরোনো জয়ঢাক৫০-শরৎ২০১৫

desh5001

শ্রীনিবাস রামানুজন ছিলেন ভারতবর্ষের এক বিরল প্রতিভাসম্পন্ন  স্বল্পায়ু গণিতবিদ। গণিতের ছাত্ররা নিশ্চয়ই জানে এই অসামান্য মানুষটির কথা। বিশ্ববিখ্যাত অঙ্কবিদেরা তাঁকে বলেছেন  ম্যাথমেটিশিয়ান নয়, ম্যাথম্যাজিশিয়ান-‘অঙ্কের যাদুকর’।

যখন ভারতের মাটিতে তাঁর প্রতিভা প্রকাশের কোনও রাস্তা  পাচ্ছেনা, উৎসাহ পাচ্ছেনা, সুযোগ-সহযোগিতা পাচ্ছেনা, এমনকি মাদ্রাজের কোনও কলেজেও তাঁর ঠাঁই হচ্ছে না (গণিত ছাড়া আর সব বিষয়ে ফেল করার জন্য)। সেই সময়ে   তাঁকে যোগ্য মর্যাদা দিয়ে নিজের দেশে নিয়ে গেলেন, গবেষণা করার সুযোগ করে দিলেন আর বিশ্বের গণিতবিদদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মান দিয়ে পাদপ্রদীপের আলোয় আনলেন  ইংরেজ  গণিতবিদ জি এইচ হার্ডি।  

 ১৯১৪ সাল থেকে রামানুজনের গবেষণার মেন্টর হওয়ার সাথে সাথেই তিনি এই ক্ষণজন্মা প্রতিভাটিকে চিনে নিয়েছিলেন আর তাঁর প্রতিভা বিকশিত ও প্রকাশিত হবার সকল সুযোগ করে দিয়েছিলেন আর  সঠিকপথে এগিয়ে  নিয়ে গিয়েছিলেন। 

কেম্ব্রিজের এই গণিতজ্ঞ অধ্যাপককে একবার একটি সাক্ষাৎকারের সময় পল এরডোস নামে একজন প্রশ্ন করেছিলেন যে, “গণিতজ্ঞ হিসাবে  গণিতের জগতে আপনার শ্রেষ্ট অবদান কী?” তৎক্ষণাৎ বিনাদ্বিধায় অধ্যাপক হার্ডির উত্তর ছিল শ্রীনিবাস রামানুজন আয়েঙ্গারকে আবিষ্কার করাই গণিতের জগতে তাঁর শ্রেষ্ঠ অবদান।

desh5004

মাদ্রাজের  অখ্যাত এক গ্রামের ছেলে ছিলেন শ্রীনিবাস রামানুজন। তাঁর ছিল আলোকসামান্য গণিতপ্রতিভা। তিনি কোনও শিক্ষক বা উপদেষ্টা ছাড়াই গণিতের কঠিনতম বহু সূত্র আবিষ্কার ও সমাধান করেছিলেন, নিজের সহজাত প্রতিভায়।

তাঁকে প্রথমে চিনতেই পারেনি তাঁর  দেশমাতৃকার শিক্ষিত সন্তানেরা,করেনি কোনরকম সাহায্য। অভাবের সংসারে বইপত্রও পাননি কোনও উচ্চমানের, যে ছেলেটি কলেজে ঢুকে একমাত্র অংক ছাড়া আর সব বিষয়েই ফেল করেছে তিনবার , গ্রাজুয়েট হতে পারেনি, সে যে এত বড় প্রতিভাবান তা বোঝা সত্যিই  সম্ভব ছিলনা তাঁর পরিচিত মানুষজন আর শিক্ষকদের। পরীক্ষায় গণিতের এক একটি প্রশ্নের সমাধান করে আসতেন তিন চারটি পদ্ধতিতে। সে’সব বোঝার ক্ষমতা বা দায় ছিলেনা পরীক্ষকদের। নিজের রাজ্যের কলেজগুলিতে তাঁর আবিষ্কৃত গণিত সূত্রগুলি বোঝার মত মানুষ এদেশে খুবই কম ছিল, আর ছিল প্রাতিষ্ঠানিক কিছু নিয়মকানুনের বাধা।  

রামানুজনের পৈতৃক বাড়ি ছিল মাদ্রাজের কুম্ভকোনম শহরে। ১৮৮৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ শে ডিসেম্বর  জন্ম হয়েছিল মামার বাড়িতর, চেন্নাইএর ২৫০ মাইল দূরে  কাবেরী নদীর তীরে ইড়োর শহরে। রামানুজনের পিতা শ্রীনিবাস আয়েঙ্গার ছিলেন দক্ষিণ ভারতীয় বৈষ্ণব ব্রাহ্মণ । অভাবের সংসারে এল নতুন শিশু, দক্ষিণভারতীয় ধর্ম সংস্কারক রামানুজনের নামে ছেলের নাম রাখলেন,রামানুজন—শ্রীনিবাস রামানুজন আয়েঙ্গার।

তাঁর বাবা কাজ করতেন স্থানীয় এক কাপড়ের দোকানে। হিসাবরক্ষকের কাজ। আর মা ভজন গাইতেন স্থানীয় দেবালয়ে। দাপুটে মা চিরকালই ছিলেন রামানুজনের উপর খুবই কর্তৃত্বকামী, কাউকে এমনকি পুত্রবধু জানকিকেও ঘেঁষতে দিতেন না ছেলের কাছে। ছেলেকে নিয়ে গর্বিত ছিলেন মা।

সাত বছর বয়সে রামানুজনকে ভর্তি করা হয়েছিল কুম্ভকোনমের কাঙ্গিয়াম প্রাইমারি স্কুলে। নীচু ক্লাসে থাকতেই তাঁর গণিতের অসামান্য দক্ষতা সহপাঠী আর শিক্ষকদের কাছে ছিল বিস্ময়ের বস্তু। পাটিগণিত, বীজগণিত, ত্রিকোণমিতি প্রভৃতি সকল শাখাতেই ছিল বালক রামানুজনের স্বজ্ঞা,সহজাত জ্ঞান,ও আগ্রহ। নানা জটিল প্রশ্ন করতেন শিক্ষককে গণিতের ক্লাসে, যেগুলি ছিল একেবারে নতুন আর জটিল। একটু বড় হলে শিক্ষক মহাশয় গণিতের বিভিন্ন জটিল প্রশ্নের সমাধান করতে তাঁকেই বোর্ডে ডাকতেন,যা অনায়াসেই সমাধান করতেন তিনি। তাঁর সহপাঠীরাও তাঁর কাছে টিউশন নিতে আসতো। শৈশব থেকেই তাঁর স্বাস্থ্য ভালো ছিলনা,কিন্তু তাঁর গণিতের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষায় কোনও বাধা সৃষ্টি করেনি। গণিতে শূন্য সংখ্যাটি নিয়ে ছিল তাঁর নানা ভাবনা। যে বিষয়ে নানা সময়ে নানা প্রশ্ন করে সহপাঠী আর শিক্ষকদের বিব্রত করে তুলতেন নিজের অজান্তেই।

১৮৯৭ সালে দশ বছর বয়সে তিনি তাঞ্জোর জেলা প্রাইমারি পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে হাফ-ফ্রি কনসেশন পেলেন ,যার ফলে তাঁর কুম্ভকোনম টাউন হাই স্কুলে পড়ার সুযোগ পেলেন। ১৯০৪ সালে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া পর্যন্ত তিনি এই কনসেশন পেয়েছিলেন,যার ফলে স্কুলস্তর পর্যন্ত পড়াশুনা করতে তাঁর আর্থিক অসুবিধা হয়নি। স্কুলের সিনিয়র গণিত শিক্ষক তাঁকে একটি স্কুল রুটিন তৈরি করতে দেন।  স্কুলে ১৫০০ ছাত্র আর ৩০জনের মত শিক্ষক ছিলেন, রামানুজন তাঁদের জন্য একটি সরল রুটিন তৈরি করে দেন  অনায়াসে।

কাজটা সহজ নয়। বেশ কিছু শ্রেণী , বেশ কিছু শিক্ষক এবং বেশ কিছু বিষয়। এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে প্রত্যেক শিক্ষক সমান সংখ্যক ক্লাশ পান, প্রত্যেক বিষয়ে জন্য সমানসংখ্যক ক্লাশ হয় এবং প্রত্যেকটা শ্রেণী প্রত্যেকটা বিষয়ে সমান সংখ্যক ক্লাশ পায়। সেইসঙ্গে আবার একই শিক্ষক যাতে পরপর অনেকগুলো ক্লাশ না পান কিংবা অনেক পরে পরে ক্লাশ না পান সেটাও খেয়াল রাখা প্রয়োজন। সব মিলিয়ে সে এক জটিল অঙ্কের খেলা। অঙ্কের ভাষায় বললে বলা যাবে এটি অনেকগুলো চলরাশিকে একত্রে নিয়ে সুষম বন্টনের সমস্যা। আধুনিক গণিতের অপারেশনাল রিসার্চ নামের শাখার কিছু বিশেষ ধারাতে এই কাজগুলো করা হয়। সেসব কিচ্ছু শিক্ষা না পেয়েও সমস্যাটার সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছে গিয়েছিলেন এই ছাত্রটি।  এমনই ছিল তাঁর সংখ্যা নিয়ে কাজ করার দক্ষতা। এই কাজের পুরস্কার হিসাবে তিনি লোনির ট্রিগোনোমেট্রি বইটি পুরস্কার পেয়েছিলেন। স্কুলে অনেকবার তিনি গণিতে অসামান্য দক্ষতার জন্য পুরস্কৃত হয়েছিলেন।

অভাবের সংসারের আর্থিক সুসারের জন্য রামানুজনের মা তাঁর বাড়িতে কয়েকজন কলেজ ছাত্রকে রেখেছিলেন পেয়িং বোর্ডার রেখেছিলেন। এই ছাত্ররা গণিতের এই বিস্ময় বালকের প্রতিভার পরিচয় পেয়ে এই কলেজ ছাত্ররা তাঁকে গণিতের সব শাখার সঙ্গেই  প্রাথমিক পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর পরবর্তী জীবনে যা পথ দেখিয়েছিল তাঁকে। স্কুলের শেষ বছরে (১৯০৩) এই বন্ধুরাই তাঁকে দিয়েছিলেন পিওর ম্যাথমেটিকসের ওপর লেখা জি এস কার -এর লেখা প্রসিদ্ধ বইটি। এই বইটি তাঁর গাণিতিক প্রতিভার বিকাশকে শতগুণ বাড়িয়ে দিল। তাঁর কাছে আর কোনও সহায়ক বই না থাকায় এই বইয়ে প্রদত্ত সুত্রগুলির যে সমাধান তিনি করেছিলেন সেগুলির প্রত্যেকটিই ছিল এক একটি গবেষণাপত্র। এই নেশাই তাঁর প্রথাগত শিক্ষায় সাফল্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। স্নাতক ডিগ্রি তিনি অর্জন করতে পারেননি। সেকথা একটুখানি আগেই লিখেছি।           

নিরুপায় রামানুজন নিজের কাজগুলি কতটা ঠিক, আর তিনি এভাবে গণিতের গবেষণা করার সুযোগ কোথায় পাবেন, ভাবতে ভাবতে ঠিক করলেন ,তিনি বিলেতের গণিতশাস্ত্রের পণ্ডিতদের কাছে তাঁর আবিষ্কৃত সূত্রগুলি পাঠাবেন। কিন্তু সব কাজের জন্যই টাকার দরকার। কলেজে ১৯০৪ সালে প্রথমবারের পরীক্ষায় ফেল করাতে সিনিয়ার এফ এ  ক্লাসে প্রমোশন পেলেন না। তাঁর বৃত্তিও  বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এক বছর পড়া হলনা খাদ্যাভাবে শারীরিক অসুস্থতার জন্য। পরের দুবছরেও একই রেজাল্ট। হতাশ হয়ে অর্থের জন্য তখন একটি কাজ খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কাজও মেলেনা।  খাদ্যের অভাবে শরীর  মন দুইই অচল, কিন্তু স্লেটে আর রাস্তা থেকে কুড়িয়ে আনা কাগজের টুকরোতে চলে গবেষণার কাজ । কিন্তু সেগুলির প্রকাশের ব্যবস্থা হচ্ছে না। মন অশান্তিতে ভরে আছে।  

কাজের খোঁজ করতে ডিসেম্বর মাসে দেখা করলেন বাল্যবন্ধু ,সি ভি রাজাগোপালাচারীর কাছে। রাজাগোপালাচারী সহপাঠীর গণিতের প্রতিভার কথা জানতেন, তাই একটা কেরাণির চাকরি করে দিতে মন চাইলনা। বন্ধুর মুখে শুনলেন যে তাঁর আবিষ্কৃত সূত্রগুলি কেউ বোঝেনা, তিনি বোম্বাই শহরের বিখ্যাত গণিতজ্ঞ শ্যালধানাকে চিঠি দিয়েছেন, ইন্ডিয়ান ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটিকেও চিঠি দিয়েছেন,কোনও উত্তর পাননি। রাজাগপালাচারী তাঁকে নিয়ে গেলেন এক উচ্চপদস্থ সরকারী কর্মচারী ও গণিতজ্ঞ আর দেওয়ান বাহাদুর রামচন্দ্র রাওয়ের কাছে,যিনি ছিলেন নেলোরের জেলা জজ। তিনি নিজের উপার্জন থেকে একটা মাসোহারার ব্যবস্থা করে দিলেন।  

এদিকে বিনা শ্রমে টাকা নিতে বাঁধল রামানুজনের। কাগজ কিনতে পারছেন না তাই স্লেটে লিখে আর মুছে কাজ চলছে। ১৯১১ সালের শেষ দিকে  প্রথমে  ২০ টাকা মাইনের একটা চাকরি  পেলেন মাদ্রাজেই । এরপর ১৯১২ সালের প্রথমে  মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্টের অফিসে মাসে  ৩০ টাকা মাইনের একটি চাকরি পেলেন। কাগজ কেনার টাকা হবে আর গবেষণাও চালাতে পারবেন বলে মনে বেশ আনন্দ। এই সময় অফিসে তাঁর ওপরওয়ালাদের একজন ছিলেন স্যার ফ্রান্সিস স্প্রিং, আর একজন ছিলেন নারায়ণ আইয়ার। তাঁরা রামানুজনের গণিত প্রতিভার কথা জানতেন আর তাই সর্বদা তাঁকে গবেষণার কাজে উৎসাহ দিতেন।  অফিসের কাজের সময়টুকু ছাড়া দিনের প্রায় বেশির ভাগ সময়ই কাটত তাঁর গবেষণার কাজে। ক্রমে স্যার ফ্রান্সিস আর নারায়ানা আইয়ারের সাহায্যে ঠিকঠাক একটি চিঠি লিখে পাঠালেন বিলেতের দুই পন্ডিত গণিতজ্ঞ এইচ এফ বেকার আর এ ডব্লিউ হবসনের কাছে। চিঠিতে নিজের কাজের কিছু নমুনাও পাঠালেন । কিন্তু এবারেও কোনও উত্তর এল না।    

 ১৯০৭ থেকে ১৯১২ সাল পর্যন্ত সময়ে তিনি একজন শুভান্যুধায়ীর খোঁজ করছিলেন যে তাঁর কাজের মূল্য দিতে পারবে। একজন গণিতজ্ঞের জীবনে ১৮ থেকে ২৫ বছর পর্যন্ত সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধ্যাপক হার্ডি পরে আক্ষেপ করে লিখে গেছেন, এই ৫টি বছর চরম দুঃখ আর দুর্ভাগ্যের মধ্যে দিয়ে মাস্তুলহীন জাহাজের মত চলেছিল রামানুজনের জীবন। এই প্রতিভার পরিচিতি মেলেনি, মূল্যায়ন হয়নি , দিশাহীনভাবে কেটে গেছে ,অজানা ভবিষ্যতের দিকে।  

এই সময় রামানুজমের কিছু আবিষ্কৃত ফর্মুলা অধ্যাপক শেশু আইয়ারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি ইংলণ্ডের রয়েল সোসাইটির ফেলো এবং কেম্ব্রিজের গণিতবিদ অধ্যাপক হার্ডির সঙ্গে তাঁকে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন। রামানুজন লিখলেন সেই ঐতিহাসিক চিঠি। এই চিঠিই তাঁর জীবনের   গবেষণার সুযোগ ,স্বার্থকতা আর স্বীকৃতির  পথ খুলে দিল। ব্রিটিশ উপনিবেশ ভারতের মাদ্রাজের এক সামান্য অফিসের করণিকের লেখা চিঠিটি ১৯১৩ সালের ১৬ই জানুয়ারি পৌঁছুল অধ্যাপক হার্ডির হাতে। ঐতিহাসিক সেই চিঠি  পড়ে হার্ডি পেলেন তাঁর অধ্যাপক জীবনের অমূল্য রত্নটির সন্ধান যা নাকি হার্ডির কাছ থেকে গণিত জগতের পাওয়া শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার শ্রীনিবাস রামানুজন-দি ইন্ডিয়ান  ম্যাথম্যাজিশিয়ান।

চিঠিতে রামানুজনের  ১২০টি উপপাদ্যের বর্ণনা ছিল। যেগুলি পড়ে হার্ডি বিস্মিত হলেন এই ভেবে এ কি সামান্য একজন কেরাণির কাজ। রামানুজন কী কী বই পাঠ করেছেন, কাদের কাছে পাঠ নিয়েছেন জানতে উৎসুক হলেন তিনি। এর কারণ রামানুজনের পাঠানো সেই উপপাদ্যের তালিকায় যেসব  গুরুত্বপূর্ণ আর কঠিন সমস্যা ছিল সেরকম কোনও সমস্যা তিনি আগে কারো কাজে পাননি এবং কয়েকটি তিনি নিজেও সমাধান করতে পারেননি, আর পরে তা স্বীকার করেন।

হার্ডি মনস্থির করে ফেললেন যে এই সম্পদকে অবশ্যই নিয়ে আসতে হবে কেম্ব্রিজে,এবং প্রয়োজনীয় প্রথানুগ শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, আর পাশ্চাত্যের উচ্চস্তরের গণিতজ্ঞদের সঙ্গে তাঁর পরিচয় করিয়ে দিতে হবে, আর গণিত জগৎ পাবে এক অসামান্য গণিতজ্ঞকে। “লন্ডনের ট্রিনিটি কলেজের শিক্ষকেরা ভারতীয় গণিতবিদ রামানুজনকে কেম্ব্রিজে আনতে চান” এই মর্মে লেখা হার্ডির চিঠি পৌঁছুল লন্ডনের ইন্ডিয়া অফিসের  সেক্রেটারির হাতে, সেখান থেকে মাদ্রাজের ইন্ডিয়ান স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি মিঃ আর্থার ডেভিসের কাছে । তিনি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়কে জানালেন, শুরু হল রামানুজনকে লন্ডনে পাঠানোর প্রক্রিয়া। ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ও বাধ্য হল  হার্ডির সঙ্গে যোগাযোগ করতে। অবশেষে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় সর্বোচ্চ ডিগ্রি না থাকলেও রামানুজনের বিলেতে গবেষণার জন্য মাসে ৭৫ টাকা করে দু’বছরের জন্য একটি স্পেশাল  স্কলারশিপ দেবার ব্যবস্থা করল। আর মাদ্রাজ পোর্ট ট্রাস্ট তাঁকে দু’বছরের বেতনহীন ছুটি অনুমোদন করল। মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় ‘সর্বপ্রথম রিসার্চ স্কলার’ হিসাবে বৃত্তি দিল রামানুজনকে, যাঁকে তারা গ্রাজুয়েট ডিগ্রি তো দূরের কথা, তাঁর গণিত প্রতিভার কোন মুল্যই দেয়নি এতদিন। প্রতিভার স্বীকৃতি আর কাজ করার সুযোগ লাভের অধিকার থেকে  বঞ্চিত হয়ে সমাজের এককোনে প্রান্তিক আর ব্রাত্য হয়ে, সামান্য কেরাণি হয়ে বেঁচে ছিলেন  যে রামানুজন, তিনি পেশাদার গণিতজ্ঞ হিসাবে জীবনের এক  নতুন অধ্যায় শুরু করতে চললেন কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে, অধ্যাপক হার্ডির ছত্রছায়ায়।

কিন্তু বাদ সাধল সনাতন হিন্দুদের জাতিগত কুসংস্কার। মা কোমলাতাম্মা কিছুতেই বিলেত যেতে দেবেন না। সে’সব মেটাবার পর এক সপ্তাহের মধ্যেই মাদ্রাজ বিশ্ব বিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট ১০,০০০ টাকা মঞ্জুর করল, রামানুজনের মাসিক স্কলারশিপ বেড়ে হল বছরে ২৫০ পাউন্ড, পাথেয় আর পোশাক  বাবদ দেওয়া হল ১০০ পাউন্ড।

১৯১৪ সালের ১৭ই মার্চ রামানুজন জাহাজ থেকে নামলেন লন্ডনের মাটিতে। হার্ডি ২০ পাউন্ড খরচ করে তাঁকে ভর্তি করে দিলেন  কলেজে আর বছরে ৪০ পাউন্ড করে আর একটি স্কলারশিপের ব্যবস্থা করলেন। হার্ডি তাঁকে আধুনিক প্রথাসিদ্ধ গণিতবিদে পরিবর্তিত করতে চেষ্টা করেননি। রামানুজনের পূর্ণ  স্বাধীনতা ছিল তাঁর জানা প্রাচীন পদ্ধতিতে কাজ করার, আর যেসব উপপাদ্য আবিষ্কার করেছিলেন সেগুলি সমাধান করে প্রমান করার  দায়িত্বও ছিল তাঁর। সেকাজে তিনি সফলও হলেন।

 ১৯১৪ সালের জুন মাসের মধ্যেই তিনি কিছু নিবন্ধ লিখে ফেলেছিলেন। লন্ডন ম্যাথমেটিক্যাল সোসাইটির এক সভায় স্যার হার্ডি রামানুজনের নোটবুকে লেখা ও সমাধান করা গণিতের কিছু সমস্যার ফলাফল  উপস্থিত করলেন। সকল সদস্যই বিস্মিত হয়েছিলেন এই ভারতীয় ছাত্রের কাজ দেখে। দেড় বছর বাদে হার্ডি মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রেজিষ্ট্রারকে  এক পত্রে জানালেন যে , রামানুজন আধুনিক যুগের সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ, তাঁর নিজের জীবনে এইরকম একজন প্রতিভাধর দেখেননি।

ট্রিনিটি কলেজ়ে একদিন অঙ্কের ক্লাসে অধ্যাপক বেরি কিছু গাণিতিক সমস্যা লিখছিলেন বোর্ডে। হঠাৎ রামানুজনকে  খুব উত্তেজিত দেখে অধ্যাপক বেরি তাঁকে জিজ্ঞেস করলেন, তিনি কিছু বলবেন কি! সঙ্গে সঙ্গে রামানুজন আসন ছেড়ে উঠে গেলেন,  আর সবাইকে অবাক করে দিয়ে  সমস্যাগুলোর উত্তর লিখে দিলেন বোর্ডে, যদিও তখনও সেগুলি তখনও ক্লাসে সমাধান করানো হয়নি। গবেষণা আর প্রথাগত শিক্ষা ভালোভাবেই চলেছিল কেম্ব্রিজে তাঁর পাঁচ বছরের অবস্থানকালে।

desh5002

১৯১৪ থেকে ১৯১৯ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে গণিতের বিভিন্ন নুতন বিষয়ের উপর ২১ টি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছিলেন। এর মধ্যে মাত্র পাঁচটি ছিল হার্ডির সঙ্গে ,বাকিগুলি তাঁর একার। দুবছর পর হার্ডির অনুরোধে ও ভারতে মিঃ ফ্রান্সিস স্প্রিং-এর চেষ্টায় মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয় ১৯১৫ সালের ডিসেম্বরে স্কলারশিপের মেয়াদ বাড়িয়ে দেয় ১৯১৯ সাল পর্যন্ত।

‘হাইলি কম্পোজিট নাম্বার’ নিয়ে তাঁর সুদীর্ঘ গবেষণাপত্রটি প্রকাশের পরে  ১৯১৬ সালে রামানুজনকে বি এ ডিগ্রি দেয় কেম্ব্রিজ  থেকে। তাঁর লন্ডন বাসের মেয়াদও বাড়িয়ে দেওয়া হল। হার্ডির উদ্যোগেই তাঁর গবেষণার সুযোগ হয়। ১৯১৮ সালে্র ফেব্রুয়ারি ‘রয়েল সোসাইটির ফেলো’ নির্বাচিত হলেন রামানুজন । সে সময় রামানুজন অসুস্থ ছিলেন, তখন প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলছিল।

desh5003

এরপর অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে পড়ায় রামানুজনকে দেশে ফিরে আসতে হয়। আসলে বৈষ্ণব পরিবারের সন্তান রামানুজন নিজে রান্না করে খেতেন, তাঁর খাদ্যদ্রব্য চালের গুঁড়ো, ও অন্যান্য জিনিস আসত মাদ্রাজ থেকে জাহাজে করে। যুদ্ধের বাজারে সেই রসদ লন্ডনে পৌঁছুত না সময়মত। এছাড়া তিনি ছিলেন নিরামিষাশী, ফলে ঠান্ডার দেশে প্রোটিনের অভাব আর পরিমাণমত খাবারের অভাবে ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ছিলেন। রাতে রাতে তাঁর জ্বর হতে শুরু করল,ওজন কমে যেতে লাগল। জীবনে বীতশ্রদ্ধ হতে লাগলেন তিনি। বাধ্য হয়ে তাঁকে দেশে ফেরানোর ব্যবস্থা করতে হল। হার্ডি তাঁকে দেশে ফিরিয়ে দিলেন এই আশায় যে ভারতীয় আবহাওয়ায় আর বাড়ির খাওয়া দাওয়ায় তিনি ভালো হয়ে উঠবেন। তাঁকে মাদ্রাজে নিয়ে আসা হল ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসে। 

কিন্তু লাভ হলো না কোন। ডাক্তারদের সব  চেষ্টা, পরিবারের সেবা শুশ্রূষা সব ব্যর্থ করে ১৯২০ সালের ২৬শে এপ্রিল মাত্র ৩২ বছর বয়সে এই প্রতিভার জীবনদীপ নিভে গেল। পৃথিবী হারাল এক বিরাট মাপের  গণিতজ্ঞকে।

দেশ ও মানুষ সব লেখা একত্রে

Leave a Reply