
সত্যসাধনবাবু একজন নিপাট ভদ্রলোক ও অত্যন্ত গোবেচারা মানুষ। তিনি নিজে কোন সাতে-পাঁচে থাকেন না। তবে ভালো মানুষ হওয়ার অনেক ফ্যাসাদ। ভালো লোকের ভালোমানুষীর সুযোগ নিতে চায় সকলেই। সত্যসাধনবাবু বেশ বুঝতে পারেন যে সকলেই তাঁকে ঠকাতে চায়। কিন্তু সব জেনেশুনেও তিনি ঠকে যান।
নিত্যসাধন ও সত্যসাধন যমজ ভাই। ছোটবেলা থেকেই দুজনের চেহারায় মিল থাকলেও দুজনের স্বভাবে বিস্তর ফারাক ছিল। নিত্য ছিল ভীষণ ডানপিটে আর লড়াকু। বন্ধুদের সঙ্গে ঝগড়া মারামারিতে সে ছিল এক নম্বরে। আর সত্য ছিল যেমন শান্ত তেমনি ঠান্ডা স্বভাবের। বড় হয়েও তার সেই মিনমিনে স্বভাবের কোন পরিবর্তন হয়নি।
সত্যসাধনবাবু সহকারী শিক্ষকের চাকরি পেয়ে শহরে এসে চোখে অন্ধকার দেখলেন। এখানে কোথায় থাকবেন,কোথায় খাবেন তার ব্যবস্থা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। একজন সহকর্মীর চেষ্টায় তিনি শহরের শেষপ্রান্তে একটা ঘর ভাড়ায় পেলেন। কাছেই খাঁদুদার হোটেল। সেখানেই সকাল-সন্ধ্যা দু-বেলা খাবার বন্দোবস্ত হয়ে গেল।
সত্যবাবু ভূগোলের শিক্ষক। ভূগোলের ক্লাসে ছেলেদের একেবারেই মন বসে না। সত্যবাবুকে ক্লাসে ছেলেরা ভয়ও পায়না একদম। পড়ানোর সময় সবাই এত গোলমাল করে যে কেউই পড়া শুনতে পায়না। সত্যবাবু বেশ চেঁচিয়েই পড়ানোর চেষ্টা করেন কিন্তু তাতেও কোন কাজ হয়না। ছেলেরা গোলমাল করতেই থাকে। সামনের গুটিকয় ছাত্র সত্যবাবুর পড়া শুনতে পায়। পেছনের ছাত্ররা তখন হয় কেউ কেউ ঘুমোয় নয়তো কাগজের বল তৈরি করে এর ওর গায়ে ছুঁড়ে মারে। হেডস্যার যতীনবাবু ক্লাস চলাকালীন মাঝেমধ্যেই ক্লাসের পিছন দিকে চুপিচুপি ঢুকে পড়েন। তাঁকে দেখে ছাত্ররা নিমেষেই তথাগত বুদ্ধের মত হয়ে যায়। এইমাত্র যে ছেলেটি খাতার পাতা ছিঁড়ে রকেট বানিয়ে ক্লাসে উড়িয়ে দিল সে হেডস্যারকে দেখে এমনভাবে সত্যস্যারের দিকে তাকিয়ে ধ্যানমগ্ন হয়ে গেল যেন মনে হবে সে একজন অত্যন্ত মনোযোগী ছাত্র। যে ছেলেরা তখনও ঘুম থেকে ওঠেনি যতীনবাবু তাদের এক একটি প্রমান সাইজের গাঁট্টা মেরে উঠিয়ে দেন। ছাত্ররা এই ধরনের গাঁট্টা খুব চেনে। যতীনবাবুর গাঁট্টা যে একবার খায় সে ভোলে না। সত্যবাবু হঠাৎ পিন ড্রপ সাইলেন্স হয়ে গেল কেন বুঝতে পারেন না। তিনি পিছনে তাকিয়ে যতীনবাবুকে দেখে লজ্জায় পড়ে যান। যতীনবাবু এর আগেও দুবার তাঁর ক্লাসে ঢুকে পড়েছিলেন। আসলে সত্যস্যারের ক্লাসে এত গোলমাল হয় যে সেটা অফিসঘর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। তখন যতীনবাবু সব কাজ ফেলে সত্যবাবুর ভূগোলের ক্লাসে চলে আসেন।

অফিস ঘরে বসে যতীনবাবু সত্যসাধনবাবুকে ডেকে পাঠান। তারপর বেশ মিষ্টি মিষ্টি করে বলেন,“কি সত্যবাবু আপনি ছেলেগুলোকে ধমক টমকও তো লাগাতে পারেন! কই আর কারো ক্লাসে তো এত চিৎকার শোনা যায়না। শুনুন, ক্লাস নেওয়া মানে কিন্তু চেয়ারে বসে থেকে ছাত্রদের দিকে তাকিয়ে গড় গড় করে পড়া বলে যাওয়া নয়। আপনি পুরো ক্লাস পায়চারি করবেন। দরকার হলে লাস্ট বেঞ্চে যে ছেলেটি বসে রয়েছে তার পাশে বসে পড়াবেন। বুঝলেন?” সত্যবাবু বুঝলেন ঠিকই, কিন্তু ছাত্ররা বুঝলে তবে তো। তিনি তাদের কিছুতেই বাগে আনতে পারেন না।
আজ সত্যবাবু বেশ দরদ দিয়েই ছাত্রদের পড়াচ্ছিলেন এমন সময় টিফিনের ঘন্টা বেজে উঠল। তাঁর পড়ানোটা শেষ হতে না হতেই ছেলেরা সব চোঁ-চাঁ করে বাইরে বেরিয়ে গেল। সত্যবাবু ধীরে ধীরে টিচার্সরুমে ফিরে এলেন। জহরবাবু ইতিহাসের শিক্ষক। নাকের ডগায় চশমা পরেন। নাদুস-নুদুস চেহারা। সবসময় মজা করতে ভালবাসেন। সত্যবাবু টিচার্সরুমে তাঁর পাশেই বসেন। জহরবাবু বললেন,“ভূগোল মানেই গোল আর এই গোল থেকেই যত গন্ডগোল। এই দেখুন না আমার ভুঁড়িটা দিন দিন কেমন গোল হয়ে উঠেছে! ভুঁড়ি বেড়ে যাওয়াটাও গোলমেলে ব্যাপার। কি বলেন সত্যবাবু?”
এ কথায় অন্যান্য শিক্ষকরাও হেসে উঠলেন। অবশ্য সত্যবাবু এ হাসিতে যোগ দিতে পারলেন না কারণ জহরবাবু ঠিক কী বলতে চাইলেন সেটাই তাঁর কাছে পরিষ্কার নয়।
সন্ধায় বাড়ি ফিরে একটু জিরিয়ে নিয়ে টিভি খুলে বসতে না বসতেই বাড়ির মালিক মন্ডলবাবু দোতলা থেকে নিচে নেমে এলেন। “কি সত্যবাবু ফ্রি আছেন নাকি? নবীনকে তাহলে পাঠিয়ে দিই।” সত্যবাবু অনিচ্ছাসত্ত্বেও বললেন,“হ্যাঁ পাঠান।”
এই হয়েছে আরেক জ্বালা। মন্ডলবাবুর ছেলেকে ভূগোলটা বিনিপয়সায় ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে দিতে হবে। সারাদিন স্কুল করে এসে এই সময়টা তিনি টিভি দেখে বা বই পড়ে কাটাতে চান। কিন্তু তা হবার নয়। বাড়ির মালিক এক কাপ চা পাঠিয়ে দিয়ে নবীনকে তাঁর কাছে রেখে যান। ভালোমানুষ সত্যবাবু খাঁদুর হোটেলে খেতে যাবার আগে পর্যন্ত নবীনের মগজে ভূগোলের পেরেক ঢোকাতে ব্যস্ত থাকেন।
প্রত্যেক পাড়ার মোড়েই কিছু বখাটে ছেলের আড্ডা থাকে। সত্যবাবু এই পাড়াতে এসেই ছেলেগুলোকে লক্ষ্ করেছেন। প্রথম প্রথম তারা সত্যবাবুকে কিছু বলত না। কিন্তু দু-একদিন পরেই তিনি শুনতে পেলেন পেছন থেকে কে যেন বলে উঠল,“ভূগোলবাবু,পৃথিবীর ওজন কত?” আশ্চর্য কান্ড ! তিনি যে ভূগোল শিক্ষক এটা এরা জানল কী করে? নবীনের কাছে জেনেছে কি? খাঁদুর হোটেল ভাড়াবাড়ি থেকে হেঁটে দশ মিনিট। পাড়ার মোড় দিয়েই যেতে হয়। পাঁচ-সাতজন ছেলে এই সময়টা রোজ বসে থাকে। মোড়ের মাথায় আগে একটা স্ট্রিটলাইট ছিল। এখন তা নষ্ট হয়ে গিয়ে জায়গাটা অন্ধকার হয়ে আছে। সেই অন্ধকার রাস্তায় সত্যবাবু হনহন করে হাঁটতে লাগলেন। কিন্তু অন্ধকারের মধ্যেও বখাটে ছেলেগুলো তাঁকে ঠিক চিনতে পারল। কীভাবে যেন এখন ছেলেগুলো তাঁর নামটাও জেনে গেছে। ছেলেগুলো সুর করে বলতে লাগল,“সত্যবাবু মিথ্যে বলেন,নিজেই নিজের কানটি মলেন।” সত্যবাবু কোন রকমে ছেলেগুলোর নাগালের বাইরে গিয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।
খাঁদুর হোটেলে এসে কাঠের বেঞ্চিতে বসতেই খাঁদুর অর্ডার হয়ে গেল,”বাবুকে জল দে।” কাজের ছেলে ফটিক খাবার টেবিলে ঠকাং করে এক গ্লাস জল রেখে গেল। সকাল-সন্ধে দু’বেলা এই খাঁদুর হোটেলের খাবার খেয়ে খেয়ে সত্যবাবুর জিভে চরা পড়ে গেছে। থোড়-বড়ি-খারা আর খারা-বড়ি-থোড় খেয়ে খেয়ে তিনি অস্থির হয়ে পড়েছেন। রুটি সহযোগে তরকারি খেতে গিয়েই তিনি বুঝলেন দিনের বাসি তরকারিটাই গরম করে খেতে দেওয়া হয়েছে। যতই গরম করুক সবজিটা থেকে হালকা টক টক গন্ধ ছাড়ছে এটা সত্যবাবু ঠিক ধরে ফেললেন। তবে তিনি মুখ ফুটে কিছু বলতে সাহস করলেন না। পাশে আরো দু-একজন ঐ সবজিটাই অম্লানবদনে খেয়ে নিল দেখে তিনি একটু খাবার খেয়েই উঠে পড়লেন।
খাঁদুর হোটেল থেকে বেরিয়ে সত্যবাবু একটু জোরেই পা চালাতে লাগলেন। বখাটে ছেলেগুলোকে দেখা যাচ্ছে না। তার বদলে মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন নিত্যবাবু। তিনি সত্যবাবুর অপেক্ষাতেই ছিলেন। এরপর দুজন মিলে গল্প করতে করতে ভাড়াবাড়িতে এসে ঢুকলেন। নিত্যবাবু বললেন,“বাড়িটা তো বাসস্ট্যান্ড থেকে একটু দূরে। কাছাকাছি ভাড়াবাড়ি পাওয়া গেলনা?” সত্যবাবু বললেন,“এ দিকটা বেশ নির্জন। গ্রাম্য ভাব আছে। তাই এদিকটাই পছন্দ হয়ে গেল,তাছাড়া ভাড়াবাড়ি খোঁজাও তো একটা ঝক্কি।” নিত্যবাবু বললেন,“শোন কাল ভোরবেলার বাস ধরে তুই গ্রামে চলে যা। জ্যাঠামশাই কি সব কাগজপত্র তোকে দিয়ে সই-সাবুদ করাবে। আমাকে কালকের দিনটা শহরেই কাটাতে হবে। ফিরব পরশু সকালে। অসুবিধা নেই তো?” সত্যবাবু বললেন,“একটা অসুবিধে অবশ্য আছে, হঠাৎ না জানিয়ে স্কুল কামাই করলে যতীনবাবু আবার রেগে যান।” নিত্যবাবু বললেন,“না জানিয়ে কেন? আমি নিজে গিয়ে তোর সিএল-এর দরখাস্ত জমা দিয়ে আসব। স্কুল এখান থেকে আর কত দূর! আমার কাজগুলো না হয় স্কুল থেকে ফিরে এসেই করে নেব।”
কথামত ভোরবেলাতেই সত্যবাবু বেরিয়ে পড়লেন। নিত্যবাবু উঠলেন আরো একটু পরে। দাড়ি কেটে স্নান সেরে একটু ফ্রেশ হয়ে নিলেন। সত্যবাবুর সিএল এর দরখাস্তটা পকেটে ঢুকিয়ে মোড়ের মাথায় এলেন। একটা রিকশায় চেপে বাসস্ট্যান্ডে এসে বাস ধরে সোজা স্কুলে পৌঁছে গেলেন। প্রেয়ার শেষ করে ছাত্ররা তখন ক্লাসে ঢুকে পড়েছে। শিক্ষকরাও রোল কলের খাতা ও চক-ডাস্টার হাতে নিয়ে যে যার ক্লাসে ঢুকে যাচ্ছে। নিত্যবাবু অফিস ঘরের দিকে যাবেন ঠিক তখনই হেডস্যার যতীনবাবু অফিস ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নিত্যবাবুর কাছে চলে এলেন। নিত্যবাবুর হাতে চক ডাস্টার আর রোল কলের খাতাটা ধরিয়ে বললেন,“সোজা ক্লাসে চলে যান। ফিরে এসে অ্যাটেনডেন্সে সই করবেন। না হলে ছেলেগুলো চেঁচিয়ে গন্ডগোল করবে। আপনার দেরি দেখে আমিই সেভেন বি-তে যাচ্ছিলাম। প্রথমের ক্লাসটা মিস যাওয়া কোনো কাজের কথা নয়। যান যান।”
নিত্যবাবু পকেট থেকে সত্যবাবুর দরখাস্তটা বের করতে যাচ্ছিলেন তার আগেই যতীনবাবু চক-ডষ্টার হাতে গুঁজে দিয়ে অফিস ঘরের দিকে চলে গেলেন। কী আর করা যায়! সেভেন বি-এর ছেলেরা মহা গোলমাল শুরু করেছে। ক্লাসের বাইরে তখনও দু-একজন ঘোরাফেরা করছিল। নিত্যবাবু দরজার সামনে এসে দেখলেন দরজার গায়ে লেখা রয়েছে সেভেন-বি। তিনি চুপচাপ ক্লাসে ঢুকে পড়লেন। ধীরে ধীরে খাতা খুলে রোল-কল করতে লাগলেন। সামনের ছাত্ররা ইয়েস স্যার বলে শান্ত হয়ে বসে পড়ল। কিন্তু পেছনদিকে গোলমাল চলতেই লাগল। নিত্যবাবু একটি ছাত্রর কাছে এসে ভূগোলের বইটি নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখতে লাগলেন। ভাবলেন সত্যটা কতদূর পড়িয়েছে কে জানে। আজ তিনি পুরনো পড়া থেকে দু-একটি করে প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে সময়টা কাটিয়ে দেবেন। সত্যর ছাত্ররা সত্যকে ভয় পায়না মনে হচ্ছে। তিনি প্রথম দিকের আহ্নিক গতি বার্ষিক গতির চ্যাপ্টারটা খুলে একবার চোখ চালিয়ে নিলেন। তারপর ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষণ করার জন্য একটু গলা-খাঁকারি দিলেন। তবে এতেও ছাত্রদের মনোযোগ আকর্ষিত হলনা। উপরন্তু পেছন দিকের হৈ- হট্টগোলটা বেড়েই চলল। নিত্যবাবু বই থেকে চোখ তুলে পিছন দিকে চাইলেন। সেখানে ছাত্ররা কেউ বই খাতা বের করেনি। তার বদলে গল্প-গুজবে মেতে রয়েছে । নিত্যবাবু ছাত্রদের এরকম আচরণে বেশ অবাক হলেন। তিনি ধীর পায়ে পিছনের দিকে চলে এলেন। দুটি ছাত্র মারামারি শুরু করে দিয়েছে। নিত্যবাবু যে ছাত্র দুটির সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন এটাও তারা বুঝতে পারল না। ছেলে দুটি এবার নিজেদের মধ্যেই কিল-চড়-ঘুষি চালাতে লাগল। একজনের ঠোঁট কেটে রক্তও বের হয়ে গেল। অপরজনের জামার তিনটি বোতাম পট পট করে ছিঁড়ে গেল। তবে হাতাহাতি বন্ধ হল না। নিত্যবাবুকে তোয়াক্কা না করেই পাশ থেকে দু-একটি ছেলে সাবাশ দিতে শুরু করল। নিত্যবাবু ভূগোলের ক্লাস মাথায় উঠল। তিনি তো আর সত্যবাবু নন যে বিশৃঙ্খলা সহ্য করবেন! রাগে তাঁর মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। তিনি রক্তচোখে কয়েক সেকেন্ড ছেলে দুটির দিকে তাকিয়ে থাকলেন তারপর হাতের দুটি থাবায় ছাত্র দুটির চুল শক্ত করে ধরে বিশাল এক হুঙ্কার ছাড়লেন। সেই হুঙ্কার শুনে পুরো ক্লাস একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সকলের চোখ চলে গেল স্যারের এই রুদ্রমূর্তির দিকে। আজ কি হল সত্যস্যারের? তিনি তো ছাত্রদের গায়ে হাত তোলেন না! এমনকি জোরে বকা- ঝকাও করেন না কোনদিন। শুধু বলেন,“মন দিয়ে লেখাপড়া না করলে কেউ বড় হতে পারবে না। পড়ায় মন দাও”। ব্যাস এই পর্যন্তই। তা স্যারেরা তো এরকম উপদেশ দিতেই পারে,তা বলে ছাত্ররা কি সেই উপদেশে কান দেবে?বয়েই গেছে। কিন্তু আজ তো শুকনো উপদেশ নয়! একেবারে রুদ্রমূর্তি। ছেলেদুটি তখনো স্যারের মুঠোয় বন্দি। তাদের মাথার চুল যেন উপড়ে পড়বে। যন্ত্রণায় নাক চোখ কুঁচকে আছে। আর সেই দৃশ্য দেখে অন্য ছাত্ররা বিলকূল বোবা হয়ে গেছে। নিত্যবাবু আরো একবার হুঙ্কার ছাড়লেন। তাঁর সেই সিংহগর্জন পৌঁছে গেল টিচার্সরুম পর্যন্ত। যতীনবাবু সেই চিৎকার শুনে তড়িঘড়ি সেভেন বি-এ পৌঁছে দেখলেন সত্যবাবু দুটি ছেলের কান ধরে হিড় হিড় করে বাইরে নিয়ে আসছেন। তারপর চিৎকার করে বললেন, “গেট আউট। আমার ক্লাশে এরকম বেয়াদপি যেন আর না হয়।” হেডস্যার দেখলেন ক্লাসের সব ছাত্র নিজের নিজের জায়গায় বসে বই খুলে রেখেছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। তিনি সত্যবাবুর পিঠে একটা চাপড় মেরে বললেন,“সাবাশ! এই তো চাই। স্পেয়ার দা রড অ্যান্ড স্পয়েল দি ষ্টুডেন্টস।” এই বলে তিনি চলে গেলেন। অবশ্য নিত্যবাবুও আর দাঁড়ালেন না। দু-এক মিনিট পরে তিনিও হন্ হন্ করে বেরিয়ে মেন গেটের দিকে চলে গেলেন। যে ছাত্র দুটি নিলডাউন দিয়েছিল তারা হাঁটু গেড়ে বসেই থাকল।
নিত্যবাবু বাসে উঠেই জানালার দিকে একটা সিট পেয়ে গেলেন। বাসের ঐ একটি সিটই খালি ছিল। তিনি একবার চোখ চালিয়ে দেখলেন বাসে কেউ দাঁড়িয়ে নেই। যতগুলি সিট ততগুলি লোক। কখনো কখনো এরকমটি হয়ে যায়। শহরে ফিরে তিনি অনেকগুলি কাজ সারলেন। তারপর সন্ধ্যে নাগাদ সত্যর ভাড়াবাড়িতে ফিরলেন। সারাদিন বেশ পরিশ্রম হয়েছে। এরপর শুয়েবসে একটু বিশ্রাম দরকার। পাঁচ মিনিট পরেই নবীন এসে হাজির। পেছনে মন্ডলবাবু। হাতে তাঁর চায়ের কাপ। নিত্যবাবু চা একদম পছন্দ করেন না। চা দেখলেই তাঁর রাগ বেড়ে যায়। তিনি লেবু মেশানো শরবত ভালবাসেন। মন্ডলবাবু বললেন,“আপনার চা এনেছি। ওরে নবীন, মাস্টারমশাইয়ের হাতে চায়ের কাপটা ধরিয়ে দে।” নিত্যবাবু বললেন,“আমি চা খাই না। ওটা নিয়ে যান।” মন্ডলবাবু বললেন, “সে কি মশাই? চা তো আপনি রোজই খান। আজ খেতে ইচ্ছে না করলে খাবেন না, জোর করব না।” ইতিমধ্যে নবীন বইপত্র নিয়ে নিত্যবাবুর খাটে উঠে পড়েছে দেখে নিত্যবাবু চেঁচিয়ে উঠলেন। “আজকে পড়ানো টড়ানো হবে না। আমি ভীষণ টায়ার্ড।”মন্ডলবাবু সে কথা শুনে বললেন,“ঠিক আছে আধঘন্টা বাদেই না হয় নবীনকে ছেড়ে দেবেন।”
তাঁর কথা শেষ না হতেই নিত্যবাবু গম্ভীর গলায় বললেন,“দেখুন আজ আমি এক মিনিটের জন্যও কাউকে পড়াবো না,বুঝেছেন? নাকি আরো সোজা করে বলতে হবে?” মনে মনে ভাবলেন, সত্যটা কি সব আপদ জুটিয়ে রাখে! কোন মানে হয়? এসব আপদ ঘাড় থেকে না ঝেড়ে ফেললে ঘাড়েই শক্ত করে চেপে বসে। সত্যবাবুর এই অচেনা ছবিটার সঙ্গে মোটেই পরিচিত নন মন্ডলবাবু। তিনি আর কোন কথা না বাড়িয়ে নবীনকে নিয়ে ছাদে উঠে গেলেন।
গলির মোড়ে যেখানে পাঁচ-সাত জন আড্ডা দিতে বসে আজকে তাদের দল ভারী। সবাই একসঙ্গে জুটেছে। অনেকক্ষন ধরেই হইহল্লা চলছে। পাশেই একটা পানের দোকান। সেখানে চানাচুর-কেক–চকোলেট সবই পাওয়া যায়। মাঝে মধ্যেই সেখান থেকে খাবার আসছে। পাঁচু বলে একটা ছেলে আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল,“ওরে ভূগোলবাবু আসছে রে”। আলো-আঁধারি রাস্তায় কে আসছে যাচ্ছে ছেলেগুলো ঠিক বুঝতে পারে। নিত্যবাবু অনেকটা কাছে এসে গেছেন। তিনি চুপচাপ হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ মাঝরাস্তায় পাঁচু নিত্যবাবুর সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর বলল, “স্যার পৃথিবীর ওজন কত সেটা এখনও জানালেন না কিন্তু। এ কী রে? ভূগোলবাবু খাঁদুর হোটেলে খেয়ে দিন দিন কেমন তাগড়া হয়ে যাচ্ছে রে! আগে তো ফড়িং এর মত ছিলেন।” এরপর পাঁচু হাততালি দিয়ে হেঁড়ে গলায় গান শুরু করল, “সত্যবাবু মিথ্যে বলেন…”
এই সত্যবাবু নামটা কানে যেতেই নিত্যবাবু এক নিমেষে কেসটা ধরে ফেললেন। এটা কি অপারেশন নাম্বার থ্রি? তিনি মুখে একটা কথাও বললেন না। কিন্তু বাচ্চা ছেলের মত ল্যাং মেরে পাঁচু নামের ছেলেটিকে মাটিতে ফেলে দিলেন। পাঁচু মাটিতে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেল। তাকে মাটিতে পড়ে যেতে দেখে দু-জন দৌড়ে কাছে চলে এল। নিত্যবাবু দু-জনকেই বিরাশি সিক্কার চড় কষালেন। সত্যবাবুর পেল্লাই চড়গুলো যে মোটেই মিথ্যে নয় এটা যখন তারা বুঝতে পারল তখন আর কেউ ট্যাঁ-ফোঁ করল না। এতবড় একটা অপারেশন এত তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে যাবে এটা নিত্যবাবু ভাবতেও পারেন নি। ছেলেগুলোকে তিনি একটা কথাও বলেননি। শুধু একটা হাত ও পায়ের খেল দেখিয়েছেন মাত্র। তিনি কয়েক পলক ছেলেগুলোর দিকে তাকিয়ে একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত বোধ করলেন যে এরা আর সত্যকে ঘাঁটাবে না। সত্যটাও হয়েছে তেমনি। কোন কিছুর প্রতিবাদ করা তার ধাতে নেই। আরে বাবা কামড়ানোর কি প্রয়োজন,ফোঁসটাতো করতে পারিস। ফোঁস করলেই তো কাজ হাসিল হয়ে যায়!
যাইহোক আর আশা করি কোন নতুন উপদ্রবের উদয় হবে না । ছেলেগুলোকে পিটিয়ে তিনি অনেকটা চাঙ্গা বোধ করলেন। ক্ষিদেটাও চনমনে হয়েছে। খাঁদুর হোটেলে গিয়ে বেঞ্চিতে বসতে না বসতেই ফটিক নামের ছেলেটি ঠকাং করে এক গ্লাস জল দিয়ে গেল। দোকানের মাঝখানে একটা বাল্ব ঝুলছে। তার আলোতে নিত্যবাবু দেখলেন গ্লাসের জলে কিছু একটা ভাসছে। তিনি ছেলেটিকে ডেকে জলটা পাল্টে দিতে বললেন। ছেলেটি আরো এক গ্লাস জল দিয়ে গেল। নিত্যবাবু গ্লাস থেকে এক চুমুক জল খেতে গিয়েই মাছের আঁশটে গন্ধ পেলেন। তিনি জলটা পাশে রেখে হাফপ্লেট তড়কা ও রুটির অর্ডার দিলেন। খাঁদুবাবু কাকে যেন ডাক পাড়লেন, “হাফ-তড়কা রুটি।” তারপর বললেন, “সত্যবাবু আজ অনেক তাড়াতাড়ি এলেন যে?” নিত্যবাবু সে কথার কোন জবাব দিলেন না। তিনি খাবার টেবিলের পাশে রাখা খবরের কাগজটা টেনে নিয়ে দেখতে লাগলেন। পনেরো কুড়ি মিনিট কেটে গেল তবু রুটি তড়কা পাতে পড়ল না। নিত্যবাবু গলা চড়ালেন,“বলি খাবার কি আসবে না উঠব?” খাঁদুবাবু বলল,”আরে মশাই ব্যাস্ত হচ্ছেন কেন? ভালো খাবার পেতে গেলে একটু ধৈর্য ধরে বসতেই হবে। এই তো সবে রুটি বেলা শেষ হয়েছে। এবার উনুনে সেঁকে পরিবেশন করতে যা বাকি। ফটিক,বাবুকে কাঁচা লঙ্কা কাঁচা পেঁয়াজ দে।” নিত্যবাবু খবরের কাগজ এক পাশে সরিয়ে বেসিন থেকে হাত ধুয়ে এলেন। আরো তিনজন খদ্দের খাবার টেবিলে এসে বসল। তাদের একজন নিত্যবাবুকে দেখে ঘাড় নাড়ল। নিত্যবাবুও ঘাড় নাড়লেন। ফটিক নিত্যবাবুর থালায় গরম রুটি আর বাটিতে করে তড়কা দিয়ে গেল। তা দেখে পাশের তিনজন খদ্দেরই রুটি তড়কার অর্ডার দিল।
নিত্যবাবু একটুকরো রুটি ছিঁড়ে তড়কা সহযোগে মুখে দিয়েই থেমে গেলেন। তড়কা একেবারে টকে গেছে। নির্ঘাৎ এটা সকালের খাবার। তিনি তড়কার বাটিটা একটু জোরেই ঠেলা মারলেন। বাটিটা ঠকাং করে মেঝেতে পড়ল তারপর তড়কাটা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ল নিচে। খাঁদুবাবু ক্যাশবাক্স থেকে খুচরো পয়সা বের করছিলেন। তিনি সত্যবাবুর এহেন আচরণ দেখে বিস্মিত হলেন। একটু চেঁচিয়েই বলে উঠলেন,“এটা একটা দোকান। আপনার ঘর পেয়েছেন কি, যে ইচ্ছে হল আর অমনি সবজির বাটি ছুঁড়ে দিলেন?” বাকি খদ্দেররাও নিজেদের মধ্যে কথা থামিয়ে নিত্যবাবুকে দেখতে লাগলেন। নিত্যবাবু বললেন,“সকালের খাবার রাতে খাওয়াচ্ছেন,এর মানেটা কি? আমরা কি গরু নাকি?” খাঁদুবাবু ক্যাশবাক্সের ঢাকা ঝপাং করে বন্ধ করে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন, “একদম বাজে কথা বলবেন না। কী মনে করেছেন কী? আমার খদ্দের ভাঙাবেন? খাঁদু দত্তকে ভড়কি দেওয়া অত সহজ নয়। আপনার মতন অনেক খরিদ্দার আমার দেখা আছে। ঠিক সেই সময় ফটিক থালায় রুটি আর তড়কা নিয়ে এসে বাকি খদ্দেরদের টেবিলে রাখল। নিত্যবাবু তাঁদের কাছে এসে বললেন,“নিন একটু মুখে দিয়ে দেখুন খাবার টকে গেছে কি না। লোকগুলো প্রায় একসঙ্গেই বলে উঠল, “হ্যাঁ একদম ঠিক কথা। এ খাবার মুখে দেয়া যায় না।” তারাও তড়কার প্লেট একদিকে সরিয়ে হাত গুটিয়ে নিল। খাঁদুবাবু এবার বেশ চুপসে গেলেন। এতক্ষন তিনি বেশ হম্বি-তম্বি করছিলেন। এবার নিচু স্বরে কথা বলতে শুরু করলেন। কাকে যেন উদ্দেশ্য করে বললেন, “বাবুদের কী খাবার দিয়েছিস? আমার বদনাম করে দিলি যে!” তারপর তিনি নিত্যবাবুর কাছে এসে নরম স্বরে বললেন, “কিছু মনে করবেন না স্যার। কাজের ছেলেগুলোকে নিয়ে আর পারা যায় না। আপনি বসুন।” কিন্তু নিত্যবাবু আর বসলেন না। এই তো সবে আটটা বাজে। আরেকটু হেঁটে গেলেই তো বাজার পৌঁছে যাবেন। তিনি উঠে বেসিনে হাত ধুয়ে বের হয়ে গেলেন। খাঁদুবাবু পেছন থেকে ডাকছেন, “বলি ও সত্যবাবু, রাগ করলেন নাকি?”
সত্যবাবু লোকটি যেমন তেমনি আছেন। কথায় বলে স্বভাব যায় না ধুলে। তিনি যেমন ভালোমানুষটি ছিলেন তেমনই রইলেন। তবে নিত্য তাঁকে বলে গেছেন এরপর থেকে তিনি যেন একটু আধটু ফোঁস –ফাঁস করেন। তা না হলে সকলেই ঘাড়ে চেপে বসবে।
ঠিক দশটার সময় টিচার্স রুমে পৌঁছতেই যতীনবাবু এক গাল হেসে বললেন,“ঠিক করেছেন। আপনি একদম ঠিক কাজ করেছেন। ছেলেগুলো দিনকে দিন বাঁদর হয়ে উঠছে। ওদের বাঁদরামো ওভাবেই ঠেকাতে হবে। এ ছাড়া আর কোন উপায় নেই। তা আপনি কাল ওভাবে চলে গেলেন কেন?” সত্যবাবু কোন জবাব দিলেন না। শুধু মুচকি মুচকি হেসে অ্যাটেনডেন্সের খাতায় দুটো সই করলেন। একটা গতকালের আর একটা আজকের। ক্লাসে ঢুকেই তিনি টের পেলেন ছেলেরা তাঁকে ভয় ও ভক্তির চোখে দেখেছে। তিনি গম্ভীরভাবে পড়ানো শুরু করে দিলেন। তাজ্জব ব্যাপার,পেছন দিকের বদমাশ গোছের ছেলেগুলোও ভালো ছেলেদের মত বই খুলে বসেছে। কোথাও গোলমাল নেই।
সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে সত্যবাবু টিভি খুলে বসলেন। আজ নবীন পড়তে আসেনি। মন্ডলবাবুও চা পাঠান নি। এতে সত্যবাবু খুশিই হলেন। সন্ধ্যেটা নিজের মতো করে কাটানো যাবে। তিনি সাড়ে আটটা পর্যন্ত টিভি দেখে ও গল্পের বই পড়ে কাটালেন। তারপর রাতের খাবার খেতে বেরিয়ে পড়লেন। মোড়ের মাথায় যে ছেলেরা বসে আড্ডা দিচ্ছিল তারা সত্যবাবুকে দেখে কথা থামিয়ে দিল। সত্যবাবু ধীরেসুস্থে হেঁটে মোড়ের রাস্তাটা পেরিয়ে গেলেন। ছেলেগুলোর কাছ থেকে কোন সাড়া পেলেন না। ওদের এরকম ভদ্র হয়ে যাবার পেছনে কি রহস্য আছে কে জানে।
খাঁদুবাবু আজ বেশ আদর যত্ন করে খাওয়ালেন। বার বার তিনি সত্যবাবুর খাবার টেবিলের কাছে এসে খাবার-পত্র ঠিক আছে কিনা জেনে নিলেন। সত্যবাবুকে একসময় ফাঁকা পেয়ে বললেন, “কাল সকালে আপনাকে নিজের হাতে সর্ষেবাটা ইলিশ রেঁধে খাওয়াবো। দেখবেন কেমন রান্না করি।” তিনি সত্যবাবুর হাতে মৌরি আর মিছরির দানা ঢেলে দিলেন।
সত্যবাবু মৌরি চিবোতে চিবোতে হাঁটতে লাগলেন আর ভাবতে লাগলেন, নিত্যটা সেরকমই থেকে গেল, ভালোমানুষ আর হতে পারল না!
ছবিঃ শিবশংকর ভট্টাচার্য