শিশির বিশ্বাস-এর সমস্ত গল্প

গল্পটা শুনেছিলাম ধূর্জটিবাবুর কাছে। সে সময় নাথের বাগানে এক এঁদো গলির ভেতর সারদাময়ী মেসের দোতলার এক ঘরে আমাদের ‘শনিবারের সভা’ বসত। নির্ভেজাল আড্ডার আসর। প্রতি শনিবার সন্ধেয় খোলা হত মেসের এই ঘরটি। বেয়ারা ব্রজ ঝাড়পোঁছ করে মেঝেয় মস্ত ফরাশটা পেতে দিত। একে একে হাজির হত সবাই। এর মধ্যেই ব্রজ গোটা কয়েক রেকাবিতে গরম তেলেভাজার সঙ্গে মুড়ি এনে হাজির করত। মাঝেমধ্যে অন্য খাবারও আসত। জমে উঠত আসর। প্রসঙ্গত বলে রাখি, আমরা যারা শনিবারের সভার শরিক,তাদের প্রায় সবাই কোনোও না কোনোও সময় এই সারদাময়ী মেসের আবাসিক ছিলাম। তবে ব্যতিক্রমও ছিলেন কয়েকজন। ধূর্জটিবাবু তাদেরই একজন। মাঝবয়সি ভদ্রলোক সরকারি দপ্তরের এক পদস্থ ব্যক্তি ছিলেন। তাঁর আচার আচরণেও সেটা প্রকাশ পেত। সাধারণত কথা বলতেন কম। তবে যখন বলতেন,চমৎকার বাচনভঙ্গিতে জমিয়ে ফেলতেন। সারাটা সময় হাতে থাকত একটা হাভানা চুরুট।
সেদিন, অক্টোবরের এক সন্ধ্যায় আসর বসেছে। মহালয়ার ঠিক পরের দিন। উৎসবের আমেজ। তাছাড়া দিনকয়েক আবহাওয়া একটানা মেঘলা থাকার পর গত দুদিন হল বেশ পরিষ্কার। শনিবারের সভায় তাই সমাগম একটু বেশি। খাবারের আয়োজনও একটু স্পেশাল। মুড়ি তেলেভাজার সঙ্গে দেদার গরম জিলিপি। খুচখাচ রঙ্গরসিকতার ফাঁকে হাত চলছে সবার। এর মধ্যেই হঠাৎ ঝুপ করে লোডশেডিং। ব্রজ অবশ্য সঙ্গে সঙ্গেই গোটা কয়েক মোমবাতি জ্বেলে দিয়ে গেল। বলাবাহুল্য,অন্ধকার তাতে দূর হল সামান্যই। কলকাতায় লোডশেডিং তখন সবে শুরু হয়েছে। কে একজন বললেন,“এ তো দেখছি এক ভালো আপদ শুরু হল! যা শুনছি তাতে তো মনে হচ্ছে ব্যাপারটা সহজে মিটবে না।”
ওদিক থেকে আর একজন বললেন,“তা না মিটুক,কিন্তু আজকের এই অন্ধকারের সন্ধেটা আমরা অন্যভাবে উপভোগ করতে পারি। আজকের আসরের বিষয়বস্তু হোক অলৌকিক ঘটনা। এই অন্ধকারে সেটা জমবে বেশ।”
মুহূর্তে হইহই করে উঠল সবাই। ধ্বনিভোটে গৃহীত হয়ে গেল প্রস্তাব। ধূর্জটিবাবু নীরবে চুরুট টানছিলেন এতক্ষণ। প্রস্তাব শুনে একটু নড়ে উঠে স্বভাবসিদ্ধ ভরাট গলায় বললেন,“কারও আপত্তি না থাকলে এ ব্যাপারে আমি একটা ঘটনার কথা বলতে পারি। অদ্ভুত হলেও আমি এর প্রত্যক্ষদর্শী। ঘটেছিল আমার জীবনেই”।
লোডশেডিং –এর সন্ধ্যা। ঘরের ভিতর আলো –আঁধারির এক রোমাঞ্চকর পরিবেশ! বিষয়বস্তুর পক্ষে একেবারে জমজমাট। তার উপর বক্তা ধূর্জটিবাবু। তিনি শুরু করলেন তাঁর কাহিনি।
“সে প্রায় তিরিশ বছর আগের কথা। বয়স কম। কলেজ থেকে বের হয়ে সবে চাকরিতে ঢুকেছি। ছেলেবেলার সেই ডানপিটে স্বভাবটা তাই যায়নি। অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ পেলেই নেচে ওঠে মন। এই সময় একদিন অফিসে এসে হাজির বাল্যবন্ধু সোমনাথ। বলল, ‘ধূর্জটি, মাস দেড়েকের ছুটি ম্যানেজ করতে পারবি? চল কেদারনাথ ঘুরে আসি। অবনীকেও বলেছি,ও রাজি হয়েছে।’
“সোমনাথ,অবনী আর আমি শুধু বাল্যবন্ধুই নই,এক সাথে স্কুলেও পড়েছি। তারপর কলেজে। সবসময় একসাথে থাকতাম। সবাই বলত তিন মূর্তি। কলেজ থেকে বেরিয়ে আমি আর সোমনাথ চাকরিতে ঢুকলাম। অবনী পোস্ট গ্র্যাজুয়েট পড়তে গেল। যদিও চাকরির দরকারটা আমাদের থেকেও বেশি ছিল ওর। বিধবা মায়ের একমাত্র সন্তান। গ্রামে সামান্য জমিজমার উপর নির্ভর করে অবনীর মা খুব কষ্ট করেই ছেলের লেখাপড়া আর সংসার চালাতেন। লেখাপড়ার ওপর অবনীরও ঝোঁক ছিল। তাই চাকরির চেষ্টা না করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে ভর্তি হতে আমরা আবাক হইনি। আসলে প্রাণের বন্ধু হলেও তিনজনের স্বভাব ঠিক একরকম ছিল না। আমি যতটাই ডানপিটে অবনী ছিল ততটাই ধীরস্থির। বিধবা মা’কে খুব ভক্তি করত। আর ছোটোবেলা থেকেই সোমনাথ ধার্মিক মানুষ। ঠাকুরদেবতার উপর অচলা ভক্তি। হঠাৎ কেদারনাথ যাওয়ার পরিকল্পনা ওই কারণেই।
“সে যাই হোক,আমি কিন্তু এককথায় রাজি হয়ে গেলাম। স্রেফ অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধে। এ যে সময়ের কথা,কেদারনাথ ভ্রমণ তখন সহজ ব্যপার নয়। হৃষীকেশ থেকে পাহাড়ি গ্রাম আর বনজঙ্গলের ভিতর দিয়ে হাঁটাপথ। ক্রমাগত চড়াই আর উতরাই। সোমনাথকে শুধু বললাম,‘অবনী যাবে বলছিস,ওর মা রাজি হয়েছেন? সব বলেছিস তাঁকে?’
“বিধবা মা তাঁর একমাত্র সন্তানকে অত দূরে এমন অনিশ্চয়তার পথে পাঠাতে সহজে রাজি হবেন না বুঝেই বলেছিলাম কথাটা। কিন্তু আমাকে আবাক করে দিয়ে সোমনাথ বলল, ‘সেজন্য চিন্তা নেই,মাসিমার সম্মতি পাওয়া গেছে। ওঁকে কথা দিয়েছি অবনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেব ওঁর কাছে। অবনীরও খুব ইচ্ছে যাওয়ার তাই আর আপত্তি করেননি।’
“গোছগাছ করে তিন বন্ধু একদিন রওনা দিলাম। ট্রেনে হরিদ্বার। দিনদুই কাটালাম গঙ্গার ধারে এক ধর্মশালায়। তারপর একদিন হৃষীকেশ,লছমনঝোলা হয়ে এক তীর্থযাত্রী দলের সাথে ভিড়ে পড়লাম।
“উঁচুনিচু পাহাড়ি পথ চলেছে বনের ভিতর দিয়ে। মাঝেমধ্যে দু-একটা ছোট গ্রাম। তীর্থযাত্রীদের জন্য চটি। এক আধটা দোকানপাট। আমাদের খাওয়াদাওয়ার আর রাতের আশ্রয়। এছাড়া মাঝেমধ্যেই পার হতে হচ্ছে পাহাড়ি নদীর উপর দড়ির নড়বড়ে ঝুলন্ত সেতু। সে এক অভিজ্ঞতা! গোড়ায় দিনকয়েক একটু কষ্ট হচ্ছিল,কিন্তু পরে সহ্য হয়ে গেল ব্যাপারটা। এ এক অদ্ভুত জীবন। দিনভর পথ চলো। পথে কোনোও চটিতে দিনের খাওয়া আর বিশ্রাম সেরে নাও। সন্ধের পর পথচলা বারণ। তখন আশ্রয় নাও কোনও চটিতে।
“পথে প্রথমেই পড়ল দেবপ্রয়াগ। গঙ্গা এখানে অলকনন্দার সাথে মিলিত হয়ে বয়ে চলেছে দক্ষিণে সমতলভূমির দিকে। শাস্ত্র অনুসারে এই দেবপ্রয়াগই নাকি মর্তলোকের সীমানা। এর পরেই শুরু হল দেবলোক। দেবপ্রয়াগ তাই তীর্থযাত্রীদের কাছে পুণ্যস্থান। এখানে একদিন বিশ্রাম নিয়ে আমরা গারওয়ালের রাজধানী শ্রীনগর হয়ে পৌঁছলাম রুদ্রপ্রয়াগ। এখানে অলকনন্দার সাথে মিলিত হয়েছে মন্দাকিনী। রুদ্রপ্রয়াগ থেকে কেদারনাথের পথ গেছে এই মন্দাকিনীর পাশ দিয়ে। সেই পথ ধরে গুপ্তকাশী,শোনপ্রয়াগ হয়ে একদিন এসে পৌঁছলাম গৌরীকুন্ড। কেদারনাথ এখান থেকে মাত্র একদিনের পথ হলেও উচ্চতার পার্থক্য খুব বেশি। পার্থক্য তাপমাত্রারও। গৌরীকুন্ডে দিনের বেলা তেমন শীতবস্ত্রের দরকার হয় না। কিন্তু শোনা গেল,কেদারনাথে দিনেদুপুরেও নাকি মোটা কম্বল জড়িয়ে রাখতে হয়। এদিকে রাত্তিরের ঠান্ডা আর পথকষ্টে দলের অনেকেই তখন অল্পবিস্তর অসুস্থ। সবাই তাই ঠিক করল গৌরীকুন্ডে দিন দুই বিশ্রাম নেবে। আমরা তিন বন্ধু এ পর্যন্ত মোটামুটি সুস্থই রয়েছি। তাই ঠিক করলাম,অযথা দেরি করব না।
“অবনীর জ্বরটা এল সেই রাত্তিরেই। সাথে বুকে পিঠে ব্যথা। মাথায় সামান্য যন্ত্রণা। কিন্তু তেমন গ্রাহ্য করলাম না কেউ। অবনী নিজেও বলল, ‘এই সামান্য জ্বরে এমন কিছু অসুবিধা হবে না। অল্পই তো পথ!’
“সুতরাং পরদিন ভোরে যথাসময় বেরিয়ে পড়লাম। গৌরীকুন্ড থেকে কেদারনাথের পথ প্রকৃতই বন্ধুর। ঘন ঘন চড়াই আর পাকদন্ডী। কিন্তু চারপাশের দৃশ্য অসাধারণ। সেই নয়নাভিরাম প্রকৃতির দিকে চোখ ফেরালে সব তুচ্ছ হয়ে যায়। পাশ দিয়ে ভীমগর্জনে বয়ে চলেছে মন্দাকিনী। দুধারে পাহাড়ের উপর থেকে ছোটবড় কত যে ঝরনা এসে মিশেছে তার সংখ্যা গুণে শেষ করা যায় না। পথের বাঁকে মাঝেমধ্যেই দৃষ্টিপথে ধরা দিচ্ছে দূরে বরফেমোড়া সকালের রোদে কাঁচা সোনার বরণ কেদারনাথ শৃঙ্গ। সে দৃশ্য পথের সব কষ্ট ভুলিয়ে দেয়। যাই হোক,একনাগাড়ে চড়াই পার হয়ে আমরা যখন কেদারনাথে পৌঁছলাম বেলা তখন প্রায় দুটো। আকাশে রোদের ছিটেফোঁটাও তখন অবশিষ্ট নেই। জোরালো হাওয়া বইছে। ঠান্ডা বরফ-শীতল হিমেল বাতাস। এই দুপুরেও ভিতরের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দেয়।
“কেদারনাথের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সত্যিই কোনোও তুলনা নেই। মন্দাকিনীর দুধারের খাড়া পাহাড় এখানে সরে গেছে আনেকটাই দূরে। মাঝে বেশ খানিকটা প্রায় সমতল। এরই শেষ প্রান্তে পাথরের তৈরি চমৎকার কেদারনাথ মন্দির। পেছনে পর্বতের চুড়ো থেকে নেমে আসছে মন্দাকিনী। গমগম শব্দে বয়ে চলেছে মন্দিরের পাশ দিয়ে। মন্দিরের ডানদিকে বিজয় পাহাড়ের ঢাল বেয়ে ঝরনাধারার মতো নেমে আসছে দুধগঙ্গা। জল তার দুধসাদা। মিশেছে মন্দাকিনীর সঙ্গে। পাশেই খানিক দূরে ক্ষীরগঙ্গা। দূরে মন্দিরের পিছনে বরফে মোড়া বিশাল কেদারনাথ শৃঙ্গ। সব মিলিয়ে সে এক ছবির মত দৃশ্য। দু’চোখ ভরে দেখেও যেন আশ মেটে না।”
এই পর্যন্ত বলে ধূর্জটিবাবু থামলেন। মোমবাতির মৃদু আলোয় ঘরের ভিতর শ্রোতাদের মুখের উপর সামান্য দৃষ্টি বুলিয়ে নিয়ে বললেন,“অলৌকিক গল্প শুনতে বসে আপনারা নিশ্চয় ইতিমধ্যে অধৈর্য হয়ে উঠেছেন। তাই আর সময় নষ্ট করব না। মূল ঘটনায় আসি। কেদারনাথ মন্দিরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ সন্দেহ নেই,কিন্তু সেদিন সেসব দেখার মতো অবস্থা আমাদের সত্যিই ছিলো না। পথশ্রমের ক্লান্তি,তার উপর প্রচন্ড ঠান্ডায় অবনীর অবস্থা তখন ভালো নয়। জ্বরে পুড়ে যাচ্ছে শরীর। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। শেষদিকে তো আর চলতেই পারছিল না। আমাদের দুজনকে প্রায় বয়ে আনতে হয়েছে। কেদারনাথে পৌঁছে তাড়াতাড়ি এক চটিতে এসে উঠলাম।
“সে’সময় তীর্থযাত্রীরা কেদারনাথ দর্শন করে দিনেদিনেই নেমে যেত গৌরিকুন্ডে। ভালো চটি কেদারনাথে তখন ছিল না। ছিল মাথা গোঁজার মতো সামান্য ব্যবস্থা। অসুস্থ অবনীকে তারই একটায় বিছানা পেতে গোটা কয়েক কম্বল চাপিয়ে শুইয়ে দেওয়া হল। অসুস্থ মানুষটিকে নিয়ে এরপর যে কী ভীষণ বিপদে পড়লাম তা বলে বোঝানো যাবে না। জ্বরটা বেড়েই চলল। সেই সাথে শ্বাসকষ্ট। ব্যপারটা যে নিউমোনিয়ার দিকে যাচ্ছে,লক্ষণ ভালো নয় বুঝতে বাকি রইল না। এই দুর্গম পান্ডববর্জিত স্থানে কী করব কেউ যখন বুঝে উঠতে পারছি না এমন সময় আমাদের চটিওয়ালা সুরজদেও বললেন, ‘বাবুজি,একটা কথা বলব?’
“বৃদ্ধ সুরজদেও মন্দিরে পান্ডার কাজও করে। সামান্য আয়ের জন্য পড়ে আছে এই দুর্গম দেশে। চমৎকার মানুষ। এই বিপদে নিজেই এগিয়ে এসেছে অবনীর শুশ্রূষায়। যথাসাধ্য চেষ্ঠা করে চলেছে। আমরা সায় দিতে বললেন, ‘বাবুজি আজ শুক্লা চতুর্দশী। প্রতি মাসের এই রাতে একজন সাধুপুরুষ এখানে আসেন। সারা রাত মন্দিরের চাতালে শুয়ে কাটিয়ে দেন। ফিরে যান ভোর হবার আগেই। কারও সঙ্গে কথা বলেন না। সবাই বলেন উনি দিব্যপুরুষ। বয়সের গাছপাথর নেই। এদিন উনি এখানে আসেন উত্তরে কেদারনাথ পর্বত ডিঙিয়ে। কোথা থেকে কেউ জানে না। এই বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে আপনারা ওঁকে ধরুন। ওনার অসাধ্য কিছু নেই।’
“সাধুসন্ন্যাসীর ওপর সোমনাথের ভক্তি বরাবর। দিনকয়েক হিমালয়ের পথে ঘুরে এ ব্যাপারে আমার নিজেরও তখন কিছু দুর্বলতা এসে গেছে। তা ছাড়া প্রবল স্রোতের মুখে ভেসে যাওয়া মানুষ সামান্য খড়কুটোও আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। বিনা দ্বিধায় রাজি হয়ে গেলাম। বৃদ্ধের কাছ থেকে সব খবর নিয়ে দু’জন এক সময় হাজির হলাম মন্দিরের পেছনে খানিক দূরে আপ্রশস্ত সমতলভূমিতে। সন্ধের অন্ধকার নামতে তখনও খানিক বাকি। আশপাশে জনপ্রানী কেউ নেই। আদূরে মন্দাকিনীর তিনটি ধারা মিলিত হয়ে শুধু ভীমগর্জনে বয়ে চলেছে। দূরে কেদারনাথ পর্বতের শিখর শেষ বিকেলের ম্লান আলোয় ঝকমক করছে। কতক্ষন সেদিকে তাকিয়ে ছিলাম খেয়াল নেই। হঠাৎ দেখি, দূরে পাহাড়ের আড়াল থেকে এক জটাজূটধারী সাধু এদিকে আসছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই মানুষটি অদূরে মন্দাকিনীর ওপারে এসে হাজির হলেন। ভস্মমাখা বিশাল শরীর। এই ভয়ানক শীতেও সারা শরীর প্রায় নগ্ন। কোমরে এক টুকরো কৌপীন মাত্র। গলায় মস্ত এক রুদ্রাক্ষর মালা। মাথায় বিশাল জটাজূট। দীর্ঘ শ্মশ্রু। আজানুলম্বিত বাহু। সন্ধ্যার আবছা আলোয় আমার মনে হল মানুষটির ভস্ম আচ্ছাদিত শরীর দিয়ে যেন এক দিব্য জ্যোতি ফুটে বের হচ্ছে। ভেবেছিলাম,খানিক এগিয়ে মন্দিরের সামনে দড়ির সাঁকোটা দিয়ে নদী পার হবেন কিন্তু হঠাৎ আমাদের সামনেই তিনি স্রোতস্বিনী মন্দাকিনীর জলে পা রাখলেন। অক্লেশে হেঁটে পার হয়ে এলেন নদী। গোড়ালির বেশি ডুবল না। অদ্ভুত ব্যাপার দেখে দুজনেই হতবাক। এই ভয়ানক স্রোতস্বিনী নদী এভাবে পার হাওয়া সম্ভব, চোখের সামনে দেখেও বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। ইতিমধ্যে সাধুবাবা কাছে এসে পড়ছেন।

“মন্ত্রমুগ্ধের মতো দু’জন এগিয়ে গিয়ে প্রণাম করলাম। আশ্চর্য! সাধুবাবার পা দুটি খটখটে শুকনো। সামান্য জলের চিহ্নমাত্র নেই। শুধু তাই নয়,অপূর্ব এক মিষ্টি গন্ধ বের হচ্ছে তাঁর শরীর থেকে। বিস্ময়ে তখন দু’জনের বাকরোধ হয়ে গেছে। কথা বলার সামান্য শক্তিও শরীরে অবশিষ্ট নেই। প্রণাম করে শুধু তাকালাম তাঁর মুখের দিকে। কিন্তু তাও ঠিকমতো পারলাম না। জোড়া ঘন ভুরুর তলায় অমন দিঘল চোখ,দিব্য অন্তর্ভেদী দৃষ্টি এর আগে কখনও দেখিনি। সে চোখের দিকে তাকাবার জন্য যে মানসিক ক্ষমতার দরকার,তার কিছুমাত্র ছিল না আমাদের। মুহূর্তে চোখ ফিরিয়ে নিলাম। তিনি চলে গেলেন।
“প্রায় হতবুদ্ধির মতো দু’জন এরপর কতক্ষণ সেই নির্জন ভূমিতে দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না। চমক ভাঙল অদূরে মন্দিরের মৃদু ঘন্টাধ্বনির শব্দে। সন্ধ্যা উৎরে গেছে অনেকক্ষণ। আরতি শুরু হয়েছে। ফিরে এলাম ডেরায়। সব শুনে বৃদ্ধ সুরজদেও দু’হাত কপালে ঠেকালেন শুধু।
“রাতে অবনীর অবস্থা আরও খারাপ হল। যা আশঙ্কা করেছিলাম তাই। ডবল নিউমোনিয়া। সঙ্গে সামান্য ওষুধপত্র যা ছিল,তারপর টোটকা,ব্যর্থ হল সবই। শ্বাসপ্রশ্বাস ক্ষীণ হয়ে এল। চেতনাহীন শরীর নিঃসাড় হয়ে এল ক্রমশ। রাত্তিরটা যে আর কাটবে না, বুঝতে বাকি রইল না কারও।
“রাত তখন কত খেয়াল নেই। বাইরে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে জোরালো হিমেল হাওয়া। ঘরের ভিতরে বসেও দারুণ ঠান্ডায় জমে আসতে চাইছে শরীর। শিয়রে বসে উদ্বিগ্ন সোমনাথ নাড়ির গতি পরীক্ষার জন্য অবনীর হাতটা তুলে নিয়েছিল। খানিক দেখে সেটা নামিয়ে রেখে ছিলে-ছেঁড়া ধনুকের মতো লাফিয়ে উঠে বলল, ‘ধূর্জটি,তুই বোস। আমি আসছি।’ দরজা খুলে মুহূর্তে প্রায় পাগলের মতো বের হয়ে গেল ও।
“এই রাতে সোমনাথ কোথায় ছুটছে,বুঝতে তখন বাকি নেই আমার। কিন্তু এই অবস্থায় ওকে একা ছাড়তেও সাহস হল না। ছুটে সঙ্গ নিলাম। বাইরে ঝড়ের মতো বরফ- শীতল হাওয়া বইলেও আকাশ বেশ পরিষ্কার। কুয়াশা তেমন জমাট বাধেনি তখনও। প্রচন্ড ঠান্ডায় প্রায় জমে আসতে চাইছে শরীর। জ্যোৎস্নার আলোয় হোঁচট খেতে খেতে কোনও রকমে এক সময় এসে পৌঁছলাম মন্দিরের সামনে উঁচু সুপ্রশস্ত পাথরের চাতালের কাছে। এই প্রচন্ড ঠান্ডায় গোটাকয়েক রোমশ পাহাড়ি কুকুরের সঙ্গে সেখানে শুয়ে আছেন জটাজূটধারী প্রায় নগ্ন একটি মানুষ। সেই সাধুবাবা। নিদ্রিত মানুষটির দেহ-নিঃসৃত দিব্যজ্যোতি রাতের অন্ধকারে আরও স্পষ্ট।
“মানুষটি যে সামান্য নন সেটা আগেই বুঝেছিলাম। কিন্তু সেই মুহূর্তে মনে হল,যেমন ভেবেছিলাম মানুষটি তার চাইতেও অনেক বড়। সামান্য মানুষ আমরা,এমন দিব্য পুরুষের সাথে কথা বলার ক্ষমতা কোথায়? গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে এল। কোনওমতে বসে পড়লাম তাঁর পায়ের কাছে। কতক্ষণ যে দু’জন ওইভাবে পড়ে ছিলাম, জানি না । বোধ হয় চেতনা হারিয়ে ফেলেছিলাম। হঠাৎ দেখি সাধুবাবা উঠে বসেছেন। তাঁর দু’চোখের দৃষ্টি গতকালের মতো অমন তীব্র অন্তর্ভেদী নয়। বরং অনেক প্রশান্ত। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি। আমরা তাকাতে বললেন, ‘এভাবে এখানে কেন বাবারা? ঘরে যাও। ফেরার যে সময় হল আমার!’ দিব্য পুরুষটির ওই কথায় যেন বাক্স্ফূর্তি হল আমাদের। সোমনাথ মূহূর্তে তাঁর পায়ের উপর হুমড়ি খেয়ে পড়ল, ‘আমাদের সঙ্গী অবনীকে সুস্থ করে দিন বাবা। ঘরে ফিরে যাই। দয়া করুন।’
মৃদু হাসলেন উনি, ‘মৃত মানুষকে কী বাঁচানো যায় বাবা? সে পারেন ওই ওপরওয়ালা। আমি সামান্য মানুষ। সে সাধ্য কোথায়? তাছাড়া মৃত্যু সে তো জীবনেরই পরিণতি। ওই ওপরওয়ালাই আমাদের পৃথিবীতে পাঠান। কাজ ফুরিয়ে গেলে আবার নিজের কাছে ডেকে নেন। মৃত্যু তাই দুঃখের নয়। পরম আনন্দের।’
“একথা আগেও তো শুনেছি। কিন্তু সেই রাতে দিব্যপুরুষটির মুখের ওই কথাগুলি আমার ভিতরটা যেন জুড়িয়ে দিল। মনে হল,এরপর কিছু চাইবার নেই আর। সোমনাথ কিন্তু থামল না। একই ভাবে তার পায়ে মাথা কুটতে কুটতে বলল, ‘কিন্তু আমি ওর বিধবা মাকে যে কথা দিয়ে এসেছি বাবা যে তীর্থ শেষে অবনীকে নিরাপদে ফিরিয়ে দেব তাঁর কাছে! একমাত্র সন্তানের জন্য তিনি যে পথ চেয়ে রয়েছেন! ফিরে গিয়ে তাঁকে কী বলে বোঝাবো আমি? দয়া করুন বাবা। মায়ের কাছে ছেলেকে ফিরিয়ে নিয়ে যাই।’
“প্রায় পাগলের মতো সোমনাথ এরপর কতক্ষণ যে তাঁর পায়ের উপর মাথা কুটেছিল আজ তা আর মনে নেই। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সাড়া দিলেন উনি। ডান হাত তুলে বললেন, ‘তাই হোক বাবা। অবনীকে তার মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিও তুমি।’
“তখন ব্রাহ্মমুহূর্ত। পুব আকাশে পাহাড়ের পিছনে সামান্য ফিকে রং ধরেছে। চাঁদ পাহাড়ের আড়ালে অনেকক্ষণ আগেই বিদায় নিলেও চারপাশটা ফরসা হয়েছে সামান্য। দেরি না করে উঠে দাঁড়ালেন তিনি। বড়ো বড়ো পা ফেলে মন্দির পার হয়ে চলে গেলেন উত্তর দিকে। অন্ধকারে আর দেখা গেল না তাঁকে।
“নিঃশব্দে দু’জন একসময় ফিরে এলাম ডেরায়। ঘরে ঢুকে চমকে উঠলাম প্রায়। অবনীর মুখের ভাব আগের মতোই তেমন ফ্যাকাশে। চোখ দুটোও অসুস্থ মানুষের মতো স্থির। কিন্তু বিছানার উপর গায়ে কম্বল জড়িয়ে দিব্যি উঠে বসেছে। আমাদের দেখে সামান্য ভারি গলায় বলল, ‘আমাকে একা রেখে তোরা গিয়েছিলি কোথায়? জ্বরটা কিন্তু একদম সেরে গেছে রে। বেশ লাগছে এখন। মনে হচ্ছে হেঁটেই ফিরতে পারব।’”
ধূর্জটিবাবু থামলেন। আমরা একঘর মানুষ প্রায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলাম। কে যেন বলল,“আপনার বন্ধু ভালো হয়ে গেল তাহলে?এমনও হয়!”
উত্তরে মৃদু হাসলেন উনি। হাতের চুরুটে গোটা কয়েক টান মেরে বললেন,“আমার গল্প কিন্তু এখনও শেষ হয়নি। সামান্য আছে। আর এ কহিনীর সেটাই ক্লাইম্যাক্স।”
থামলেন ভদ্রলোক। নিঃশব্দে চুরুট টানতে টানতে অদূরে মোমবাতির শিখার দিকে আনমনে তাকিয়ে রইলেন খানিক। তারপর হঠাৎই মুখ খুললেন আবার।
“অবনীকে নিয়ে এরপর একদিন ফিরে এলাম কলকাতায়। পথে অবনীর আর কোনও সমস্যা হয়নি। তবু কেন জানি না ওকে কখনই তেমন স্বাভাবিক মনে হয়নি। সেই হাসিখুশি অবনী হঠাৎ কেমন পালটে গেছে। কথা বলে কম। গম্ভীর হয়ে থাকে। গলার স্বরটাও কেমন অন্য রকম। ঘড়ঘড়ে। মুখের সেই ফ্যাকাশে ভাবটাও রয়ে গেছে। পালটায়নি একটুও। চোখের মণি দুটোও কেমন স্থির। যাই হোক,ফিরে গেলাম যে যার বাড়িতে। কেটে গেল মাসকয়েক। অবনীর সাথে এরপর দেখা হয়েছে বার কয়েক। কিন্তু কখনই ওকে সেই আগের মতো মনে হয়নি। কেমন যেন পালটে গেছে মানুষটা।
“এর প্রায় মাসছয়েক পরের কথা। একদিন দুপুরে হঠাৎ অবনী অফিসে এসে হাজির। পরনে গুরুদশার কাপড়। চমকে উঠে বললাম, ‘এ কী রে অবনী! মাসিমা মারা গেছেন ! কী হয়েছিল?’
“অবনী ভারি গলায় বলল,‘গত পরশু হঠাৎ হার্ট অ্যাটাক। কাউকেই সেভাবে জানাবার সময় পাইনি। সবে সোমনাথের অফিস হয়ে তোর এখানে আসছি। সোমনাথ অফিসে নেই। বেরিয়েছে। খবরটা তাই এখনও দেওয়া হয়নি ওকে। তা শোন,মায়ের কাজটা একটু বড় করেই করব ঠিক করেছি। তোদের থাকাটা তাই খুব জরুরি।’
“অফিস থেকেই টেলিফোন করলাম সোমনাথকে। পেয়েও গেলাম। কাছেই অফিস। শুনে হন্তদন্ত হয়ে চলে এল আমার অফিসে। আরও প্রায় ঘন্টাদেড়েক কথা বলার পর চলে গেল ওরা।
“মায়ের শেষ কাজটা বেশ জাঁকজমক করেই করল অবনী। সেদিন সব মিটতে আমরা যখন বিদায় নিলাম,রাত তখন প্রায় দশটা। পরদিন সকালে যথাসময়ে অফিসে এসে বসেছি, তখন টেলিফোন এল। উঠে গিয়ে ধরতেই ওধার থেকে সোমনাথের উত্তেজিত গলা, ‘ধূর্জটি, এইমাত্র খবর পেলাম অবনী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। অবস্থা ভাল নয়। পারলে এক্ষুনি চলে আয়।’
“খবর পেয়ে সোমনাথ আগেই হসপিটালে পৌঁছে গেছে। সেখান থেকেই ফোন করেছিল ও। অফিস থেকে বের হয়ে একরাশ দুশ্চিন্তা নিয়ে ছুটলাম। এই সামান্য সময়ের মধ্যে অবনীর কী এমন হতে পারে ভেবে পেলাম না কিছুতেই। হাসপাতালের সামনে ট্যাক্সি থেকে নামতেই দেখা হয়ে গেল সোমনাথের সঙ্গে। থমথমে মুখে এগিয়ে এসে বলল, ‘অবনী সম্ভবত বাঁচবে না রে ধূর্জটি। স্যালাইন,অক্সিজেন কিছুই টানতে পারছে না। ডাক্তার জবাব দিয়ে দিয়েছেন। ওর বাড়ির আত্মীয়রা একবার দেখতে চেয়ে আবেদন করেছিল। অনুমতি মিলেছে। আমরা সবাই যাচ্ছি। তুইও চল।’
“ছুটলাম ওদের সাথে। লিফটে চারতলায় উঠে করিডোর ধরে খানিক হেঁটে অবনীর কেবিন। প্রায় উদ্ভ্রান্তের মতো পথটুকু পার হয়ে দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়েছি,কেবিনের পর্দা সরিয়ে নতমুখে বেরিয়ে এলেন ডাক্তার। পিছনে নার্সও রয়েছেন একজন। আমাদের দেখে বললেন, ‘সরি,পেশেন্ট মারা গেছেন। এইমাত্র। একবার দেখে আসতে পারেন।’
“ডাক্তার চলে গেলেন। প্রায় আচ্ছন্নের মতো নার্সের সঙ্গে ঢুকলাম কেবিনের ভিতর। ছোট্ট কেবিন। বিছানায় আপাদমস্তক সাদা চাদরে ঢাকা অবনীর দেহটা। ঘরে আমরা ক-টি প্রাণী তখন নির্বাক। কারও মুখেই কথা নেই। আমাদের অবস্থা দেখে নার্স ভদ্রমহিলা নিজেই এগিয়ে গিয়ে মৃত অবনীর মুখের উপর থেকে চাদরটা সামান্য সরিয়ে দিলেন। আর তারপরেই ভয়ার্ত আর্তনাদে পিছিয়ে এলেন কয়েক পা। বিছানায় শোয়ানো রয়েছে একটা পুরোনো শুকনো খটখটে নরকঙ্কাল। মেদ মাংসের সামান্য চিহ্নও নেই তার গায়ে।”
ঘরের ভিতর বাজ পড়লেও বোধ হয় এতখানি চমকাত না কেউ। মোমবাতির মৃদু আলোয় প্রায় হাঁ করে সবাই গল্প গিলছিলাম এতক্ষণ। ব্যাপারটা সামলাতেই লেগে গেল কয়েক সেকেন্ড। তারপরেই চারদিক থেকে প্রশ্নবাণ ছুটল,“নরকঙ্কাল! সেকী! কোত্থেকে এল?”
সামান্য হাসলেন ধূর্জটিবাবু। হাতের চুরুটে একটা টান দিয়ে গম্ভীর গলায় বললেন,“ব্যাপারটা নিয়ে সেই সময় শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। কাগজে লেখালেখিও কম হয়নি। তদন্তও হয়েছিল। কিন্তু রহস্যের মীমাংসা হয়নি । তবে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞরা নানা পরীক্ষার পর জানিয়েছিলেন,নরকঙ্কালটি অন্তত ছ-মাসের পুরোনো। আর সেটা অবনীরই।”
ছবি- শিবশংকর ভট্টাচার্য