মহাশ্বেতার আগের গল্প- শুকতারার গল্প, খুলির আর্তনাদ(১ম) , খুলির আর্তনাদ(২য়), খুলির আর্তনাদ(৩য়) খুলির আর্তনাদ(৪র্থ) শলকেনের ছবি (১ম পর্ব) শলকেনের ছবি (২য় পর্ব), তুফান ১ম পর্ব, তুফান ২য় পর্ব, কালো বিড়াল (অ্যালেন পো), গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্ট, অতিথি, জলসাঘরের ভূত, সুইমিং পুল, কুকুর ও ক্যাঙারুর গল্প,

গাঁয়ের থেকে অনেক দূরে জঙ্গলের মধ্যে থাকত এক দাদা আর তার বোন। বাপ মা তাদের অনেক আগেই মারা গিয়েছিল। তারপর থেকে একটা ছোট্ট ঘাস-পাতার বাড়িতে তারা নিজেদের মত করে আনন্দে থাকত।
এক পুর্ণিমার রাতে তারা ঠিক করল জঙ্গলের মধ্যে ক্যাঙারু শিকারে বেরোবে। দাদা তার তীর ধনুক নিল আর বোন রাস্তায় খাওয়ার জন্য গুছিয়ে নিল অনেকগুলো মিষ্টি আলু। ক্ষিদে পেলে সেগুলোকে সেদ্ধ করে খেয়ে নেবে। তারপর
বেরিয়ে পড়ল তারা আলোআঁধারি অন্ধকারের জঙ্গলে। বেশ অনেকক্ষণ হাঁটবার পর তারা একটা গুহার কাছে পৌঁছল। সেখানে আবার ক্যাঙারুদের বিশাল আড্ডা। চাঁদের আলোতে তারা বড় মজা পেয়েছে। সব হুটোপাটি করে বেরোচ্ছে গুহার সামনের খালি জায়গাটায়। তাই দেখে বোনের একটু দুঃখই হল। সারা জীবন ওই একমাত্র দাদাকে ছাড়া কারুর মুখ দেখেনি সে। দাদা যখন শিকার করে খাবার আনতে বেরোয় তখন একা একা ঘরে বসে থেকে তার বড় ভয় লাগে, আর একাও লাগে। মনে হয় কিছু খেলার সাথী থাকত যদি! এই চাঁদের আলোয় খেলতে থাকা ক্যাঙারুদের হিংসা হয় তার। ইস! কি আনন্দেই না আছে!
কিছু দূরে দাদা আর বোন বসে পড়ল। দাদা বোনকে আগুন জ্বালিয়ে নিতে সাহায্য করল, তারপর বোন মিষ্টি আলুগুলোকে তাতে রান্না করতে লেগে গেল। ভালভাবে রান্না হওয়ার পর দাদা বোনকে আলুগুলোকে ভালো করে টুকরো করে কেটে রাখতে বলে ক্যাঙারু মারতে বেরিয়ে পড়ল। বোন তার থলে থেকে একটা পাথরের হাতে তৈরি ছুরি বের করে আলু কাটতে লাগল। কিন্তু অন্ধকারে একা বসে তার গা ছম ছম করতে লাগল। একবার ভাবল দাদাকে ডাকে। দাদা, দাদা করে দু-একবার চিৎকার করা সত্ত্বেও কেউ এল না। এদিকে জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরসর করে হাওয়া বইতে লাগল, আলো আঁধারিতে চারিদিকে ছায়ামূর্তি দেখতে লাগল বোন। আর অন্যমনস্কভাবে আলু কাটতে গিয়ে হঠাৎ করেই তার আঙুল খুব জোরে কেটে গেল। সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত পড়তে লাগল, আর সেই রক্ত জঙ্গলের মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। তাই দেখে বোন তো ভয়ে চিৎকার করে কাঁদতে লাগল। দূর থেকে তার দাদা সেই আওয়াজ শুনে ছুটে এল তার কাছে।
এসে চারিদিকে এত রক্ত দেখে সে তো হতভম্ব! কোনরকমে বোনের হাত ধরে টেনে নিল নিজের কাছে। তারপর হাঁটা লাগাল বাড়ির দিকে। বোনের তো হাত থেকে ঝরঝর করে রক্ত পড়েই যাচ্ছে। দাদার মনে দুশ্চিন্তা, এই রাত্রিবেলা এই জঙ্গলের মধ্যে বোনকে কীভাবে ভাল করব? এখানে ডাক্তারও কোথায়, বদ্যিও বা কোথায়? এদিকে বোন আস্তে আস্তে আস্তে নেতিয়ে পড়তে লাগল। দাদা বুঝতে পারল এই বোধহয় শেষ। বোন বোধহয় আর বাঁচবে না। এমন সময় পাশে তার চোখে পড়ল একটা বিশাল গাছ। তার গুঁড়ির ঠিক মধ্যিখানে একটা বিশাল কোটর। এমন সময় বোনের কী যেন একটা হয়ে গেল। সে যন্ত্রচালিতের মত গাছটার দিকে চলে গিয়ে সিধে কোটরের ভেতরে ঢুকে গেল।
দাদা তো “বোন, বোন” বলে হাজার ডেকেও সাড়া পেল না। কোটরে উঁকি মেরে দেখল কেউ কোত্থাও নেই। তাই দেখে তো তার মাথায় হাত। এমন সময় কোটর থেকে বেরিয়ে এল একটা ক্যাঙারু। দাদা তো অবাক! এই কিছুক্ষণ আগেই বোন গটমট করে ঢুকে গিয়েছিল সেখানে, আর সে উঁকি মেরেও তো আর কিছু দেখতে পায়নি ভেতরে, তাহলে ক্যাঙারুটা এল কোত্থেকে? এরকম সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতেই ক্যাঙারুটা বলে উঠল, “দাদা, তোমারই দোষ! আমাকে একলা রেখে কেন গেছিলে শিকার করতে? আমার কত ভয় লাগছিল জানো? তাইতেই তো হাত কেটে গেল। যাই হোক। আমি অনেক দিন ধরে খেলার সাথী চেয়েছিলাম, আমার মনের ইচ্ছা পূর্ণ হল। আমি চললাম। তুমি আমার জন্য চিন্তা কোরো না।”
দাদা বুঝতে পারল তার মৃতপ্রায় বোনকে জঙ্গলের দেবতা ওই গাছের মধ্যে দিয়ে রক্ষা করেছে, আর তার মনের ইচ্ছাও পুর্ণ করেছে। সে তবুও বোনকে অনেক কাকুতি মিনতি করল তার সাথে বাড়ি ফিরে যেতে। কিন্তু বোন আর তার কোন কথা শুনল না। পেছন ফিরে লাফাতে লাফাতে ক্যাঙারুদের আড্ডার দিকে চলে গেল। দাদা চোখ মুছতে মুছতে বাড়ি ফিরে এল।
আর কখনও সে তার বোনকে দেখতে পায়নি।
পাপুয়া নিউগিনির লোককথা
ছবিঃ মৌসুমী