গল্প-খালপাড় অভিযান-তাপস মৌলিক-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

তাপস মৌলিকের সমস্ত লেখা

galpokhalpaar4902

ব্রেকফাস্টের সময় বাবিদা আর তম্বু নেই। খোঁজ, খোঁজ। সবাই আমার দিকেই তাকাচ্ছে। ওদের সব দায়িত্ব যেন আমার। যদিও আমাকে না নিয়ে ওদের কোথাও যাওয়াটা খুব অস্বাভাবিক। বাড়ির কোথাও নেই। বাইরে রাস্তায় বেরিয়ে চারদিক দেখতে লাগলাম। রাস্তার ওপারে ধানক্ষেত। মোটামুটি একশো মিটার দূরে এক সারি নারকেল গাছ, এ মাঠের সীমানা। তার ওপারে আবার ধানক্ষেত, বহুদূর অবধি, যদ্দূর দেখা যায়। ডানদিকে একটা বিশাল বাঁশবন।

ফোরের পরীক্ষার পর আমরা বেড়াতে এসেছি বড়পিসির কাছে, সোনারপুরের শীতলা গ্রামে। এখানে বড়পিসি, পিসো ছাড়াও আছে বড়দা, বড়দি, ছোড়দা, ছোড়দি – আমার পিসতুতো দাদা-দিদিরা। তাদের একমাত্র কাজ আমাদের ওপর খবরদারি করা। বাবিদা আমার জেঠতুতো দাদা, সেলিমপুরে থাকে, এবারে সিক্সে উঠবে। আমি আর আমার ভাই তম্বু এসেছি মায়ের সঙ্গে, কালনা থেকে। তম্বু এখনও দুধেভাতে, স্কুলে ঢুকতে আরও একবছর। ওর পড়ার বই বলতে অরণ্যদেব, ম্যানড্রেক এসব। আমার আর বাবিদার মাথায় গিজগিজ করছে টিনটিন, ফেলুদা, শঙ্কু, শার্লক হোমস, ঋজুদা। সবকিছুর মধ্যেই আমরা রহস্যের গন্ধ পাচ্ছি।

মাঠের দিকে তাকাতেই দূরে ওদের দেখতে পেলাম। বাঁশবনের দিক থেকে ছুটতে ছুটতে আসছে। আমাকে দেখেই বাবিদা ঠোঁটে আঙুল দিয়ে ইশারা করল। কাছে এসে বলল, “চল, আগে খেয়ে নি, তারপর বলছি।” বাড়ি ঢুকতেই তারস্বরে সবাই চিৎকার আরম্ভ করল – কোথায় গেছিলি, বলে যাস না কেন, পাখা গজিয়েছে, সারাদিন টইটই, বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাড়ি পাঠিয়ে দেব – এইসব। বড়দি সবচেয়ে বেশি চেঁচায়। যাক গে। চুপচাপ ভালমানুষের মত ব্রেকফাস্ট করেই ছাতে উঠে গেলাম।

বাবিদা বলল, “কালকের কাগজ পড়েছিলি?” বলে পকেট থেকে একটা ভাঁজ করা খবরের কাগজের টুকরো বার করল। এই খবরটা চোখে পড়েনি। ‘সোনারপুরে যুবক খুন’। ছোট্ট চারলাইনের নিউজ। গতকাল সোনারপুরে একটি চাষের খালের জলে এক যুবকের মৃতদেহ পাওয়া গেছে। পুলিশের ধারণা তার মাথায় কোনও ভারি জিনিস দিয়ে আঘাত করে খুন করে তারপর খালের জলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। যুবকের নামপরিচয় জানা যায় নি। পুলিশ তদন্ত করছে, কিন্তু এ ব্যাপারে কাউকে এখনও গ্রেফতার করতে পারে নি।

বাবিদা বলল, “খালটা ওদিকেই। বাঁশবন ছাড়িয়ে গেলে খালের উঁচু পাড়টা দেখা যায়।”

চাষের মাঠ যখন আছে, খাল তখন থাকতেই পারে। কিন্তু সেই খালেই যে মৃতদেহটা পাওয়া গেছে তার কী মানে আছে?

বাবিদা বলল, “ওই খালই সেই খাল। পাড়ার লোকেরা বলাবলি করছিল। প্রশ্ন হচ্ছে এই পাড়াগাঁয়ে ধানক্ষেতের মধ্যে বাইরের একটা লোক এসে কী করছিল যে তাকে খুন হতে হল?”

“বাইরের লোক কী করে জানলে?”

“গাধা! এখানকার লোক হলে কি আর নামপরিচয় জানা যেত না?”

সত্যিই তো! রহস্য! কিন্তু কত কিছুই তো হতে পারে। লোকটা হয়তো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে ওখানে পিকনিক করতে গেছিল যাদের কারো কোনও মোটিভ ছিল। হয়তো অন্য কোথাও ওকে খুন করে শেষে এখানে ফেলে দিয়ে গেছে।

বাবিদা বলল, “স্পটটা দেখতে পারলে হয়তো কোনও ক্লু পাওয়া যাবে।”

“কিন্তু স্পটটা কতদূর?”

“প্রথমে তো খালের ধারে পৌঁছতে হবে। খাল ধরে হাঁটলেই নিশ্চয় বুঝতে পারব জায়গাটা।”

সুতরাং উত্তেজনা। এই রহস্যের সমাধান আমাদের করে ফেলতেই হবে। করতে পারলে বাড়ি ফিরে স্কুলের বন্ধুবান্ধবের কাছে একটা বলার মতো ব্যাপার পাওয়া যাবে। আর অত ছোট ছোট পাণ্ডব গোয়েন্দারা, এনিড ব্লাইটনের ফেমাস ফাইভ যদি এত কিছু পারে, আমরাই বা পারব না কেন? শুধু একটু আটঘাট বেঁধে এগোতে হবে। খালি হাতে দুম করে বেরিয়ে পড়লে তো হবে না! প্ল্যান করতে হবে।

ঠিক হল দুপুরবেলা খাওয়াদাওয়ার পর আমরা বেরিয়ে পড়ব। বাবিদা বলল বাঁশবন থেকে খালপারটা বেশ দূর। তারপর খালপারে পৌঁছে সঙ্গেসঙ্গেই যে আমরা স্পটটা পেয়ে যাব তা তো নয়। হয়তো একদিকে হাঁটতে হাঁটতে পেলাম না, তখন আবার ফিরে গিয়ে উল্টোদিকে হাঁটতে হবে। অতএব, সময় লাগবে। আজ যদি জায়গাটা খুঁজে না পাই, ফিরে এসে কাল আবার সেখানে যাওয়াটা মুশকিল হয়ে যাবে। বাড়ি থেকে বেরোতে দেবে না। তাই ঠিক হল দরকার পড়লে রাতে আমরা খালপারেই থেকে যাব, কাল সকাল থেকে যাতে ফের খোঁজাখুঁজি শুরু করা যায়। সুতরাং সঙ্গে অনেককিছু নিতে হবে। লিস্ট তৈরি হল, তারপর লিস্ট মিলিয়ে সংগ্রহ।

আমি আর বাবিদা দুটো পিঠে ঝোলানো স্কুলব্যাগ নিচ্ছি, হাঁটতে সুবিধে হবে। তম্বু ছোট, ওয়াটার বটলটা ও নেবে। ব্যাগে প্রথমেই ঢুকল তিনটে চাদর, শীত আছে যথেষ্ট। একটা টর্চ ঢোকালাম, রাত্রে লাগবে। দেশলাই, ব্লেড, ছোট কাঁচি, একটা ছুরি। সবই বাড়ির এখান সেখান থেকে চুপচাপ ঢোকানো হল। কেউ টের পেলেই ঝামেলা। নানা প্রশ্নের জবাবদিহি করতে হবে। কতগুলো পুরনো খবরের কাগজ নিলাম, রাত্রে বিছিয়ে শোয়ার জন্য। কিছু ওষুধপত্তর নিতে হবে। তুলো, ব্যান্ডেজ, ডেটল, ফুরাসিন ইত্যাদি যা পাওয়া গেল একটা প্লাস্টিকে পুরে ফার্স্ট এইড কিট বানিয়ে ফেললাম। এরপর খাবারদাবার জোগাড় করার পালা। এটাই সবচেয়ে ঝামেলা। ছোড়দি, বড়দি, বড়পিসিকে ফাঁকি দিয়ে কিছু সরানোই মুশকিল। প্রথমেই দু’তিনটে প্লাস্টিক রেডি করলাম। পিসোর এখন অফিস যাওয়ার সময়। সবাই মোটামুটি তটস্থ। হলঘরে পিসো খেতে বসেছে। খেতে দিচ্ছে বড়পিসি। তার মধ্যেই ছোড়দি পিসোকে জুতোমোজা পরিয়ে দিচ্ছে, আর বড়দি ইংরিজি খবরের কাগজ পড়ে শোনাচ্ছে। এরকম সুযোগের অপেক্ষাতেই আমরা ছিলাম। রান্নাঘরের মুড়ির টিন খুলে এক প্লাস্টিক ভরতি মুড়ি নিয়ে নিলাম। আরেকটাতে চানাচুর, বেশ খানিকটা। প্রতিদিন সন্ধেবেলা এখানে একটা বড় গামলায় মুড়ি-চানাচুর-পেঁয়াজ মাখা হয়, সবাই একসঙ্গে খাই। একটু পরেই শুরু হয় মুড়ি ছোঁড়াছুঁড়ি। একজন হাঁ করে, আরেকজন দূর থেকে মুখ টিপ করে মুড়ি ছোঁড়ে। শেষে সারা মেঝেতে মুড়ি ছড়াছড়ি। তাই মুড়ি-চানাচুরের পরিমাণ একটু কমলে কেউ অতোটা খেয়াল করবে না। আর নিলাম বিস্কুট। পিসো বেরিয়ে যাওয়ার পরও ছোড়দির কাছে চেয়ে দু’বার বিস্কুট নিলাম, আর ব্যাগে পুরলাম। ছোড়দি একটু অবাক হল। সাধারণত এই সময়ে বিস্কুট চেয়ে খাওয়ার সময় আমাদের থাকে না। পিসো বেরিয়ে গেলেই আমরাও সোজা মাঠে, ক্রিকেট। আজ তিনজন ছাদে গুজগুজ ফুসফুস করছি দেখলে একটু অন্যরকম লাগতেই পারে। কিন্তু কেউ কিছু বলল না দেখলাম। হয়তো ভাবছে সকালের বকাঝকায় বেশ কাজ হয়েছে।

অন্যদিন মাঠ থেকে মোটামুটি কান ধরে তিনজনকে টেনে আনতে হয়। আজ চুপচাপ তিনজনের স্নানটান সারা। তক্কে তক্কে আছি কখন বেরোনো যায়। জুতোমোজা পরে সবার সামনে দিয়ে তো বেরোনো যাবে না, জিগ্যেস করবে কোথায় চললি! আমাদের খাওয়াদাওয়ার পর বড়রা সবাই একসঙ্গে খেতে বসল। এটাই মোক্ষম সময়। ওদের খাওয়া এখন ঘন্টাখানেক চলবে। খাওয়া তো শুধু নয়, আড্ডা-গল্প-হাহা-হিহি’র ম্যারাথন।

বেরিয়ে পড়লাম। সামনের মাঠটা দৌড়ে পেরিয়ে গেলাম, তারপর ডানদিকে ঘুরে বাঁশবনে ঢুকে গেলাম। ব্যাস, নিশ্চিন্ত। বাড়ি থেকে আর কেউ দেখতে পাবে না। জিনিসপত্র আরও কিছু যোগ হয়েছে। টুকিটাকি, সাবান, ব্রাশ, ডায়রি, পেন্সিল ইত্যাদি। পিসোর একটা মর্নিং ওয়াকের লাঠি আছে, মাথাটা গোলমতো, রুপো দিয়ে বাঁধানো। পিসোর খুব ফেভারিট জিনিস, কেউ ধরতে সাহস পায় না। বেরোনোর সময় বাবিদা সটান সেটাকে নিয়ে নিল। কে আর দেখছে এখন! তম্বুর পক্ষে ওয়াটার বটলের স্ট্র্যাপটা বেশি লম্বা হয়ে গেছে, হাঁটলে পরে হাঁটুতে ঢকর ঢকর করে লাগছে। গিঁট মেরে সেটাকে খাটো করে দিলাম।

galpokhalpaar4901

বাঁশবন পেরিয়ে আবার মাঠ, ধূ ধূ করছে। কোনও গাছপালা নেই। ধান কাটার পর ধানগাছের গোড়াগুলো শুকিয়ে খোঁচা খোঁচা হয়ে আছে। শীতকাল, তাই সাপের ভয় নেই। বহুদূরে উঁচুমত একটা বাঁধ টাইপের দেখা যাচ্ছে। ওটাই মনে হচ্ছে খালপার। খালের দু’পাশে উঁচু বাঁধ দেওয়া থাকে জানি। বাঁধ ধরে গাছের সারি চলে গেছে। তার আগে আর কোনও আড়াল নেই।

বাঁশবন ছেড়ে বেরোনোর পরে আবার বাড়িটাকে দেখা যাচ্ছে। যদিও অত দূর থেকে আমাদের বুঝতে পারবে না, তবু কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। যত তাড়াতাড়ি খালের ধারে পৌঁছনো যায় ততই ভাল। কিন্তু তম্বু নেহাতই ছোট। এই ঘন্টাদেড়েক হেঁটেই একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। দু’তিনবার জল খাওয়া হয়ে গেছে। এরপর মাঠের মধ্যে উবু হয়ে বসেই পড়ল। রেস্ট। বাবিদা অধৈর্য হয়ে পড়ছে। বলল, “হাঁটতে না পারলে বাড়ি চলে যা।” তম্বু বলল, “বাড়ি? বাড়ি তো অনেক দূর!”

“কোথায় দূর? ওই তো দেখা যাচ্ছে। ভয় নেই, আমরা তাকিয়ে আছি। খবরদার কিন্তু বলবি না।”

“দেখা গেলেই কি কাছে হল? সূর্যও তো দেখা যাচ্ছে!”

বুঝলাম বাড়ি ফেরার পাত্র তম্বু নয়। তখন বাবিদা আরেকটা প্রস্তাব দিল, “তুই তাহলে এখানেই বোস। জলের বোতল আর একটু মুড়ি চানাচুর রেখে দে। ফেরার সময় আমরা তোকে নিয়ে ফিরব।”

“কখন ফিরবে তোমরা?”

“খালের ধারেই এখনও পৌঁছলাম না! স্পটটা খুঁজে বার করতে হবে। কোনও ক্লু যদি পাওয়া যায়।”

তম্বুর নির্ঘাত আমাদের প্ল্যান মনে পড়ে গেল, দরকার হলে রাতটা খালের ধারেই কাটাব আমরা। আর বিকেল তো প্রায় হয়েই এসেছে। দেখি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে সে হাঁটতে আরম্ভ করল। খুব সম্ভব ব্যাপারটা কল্পনা করল যে – রাত হয়েছে, চাঁদ উঠেছে, ধূ ধূ খোলা মাঠের মধ্যে একা উবু হয়ে বসে আছে তম্বু, সামনে একটা প্লাস্টিকের ঠোঙায় একটু মুড়ি-চানাচুর।

আরও ঘন্টাখানেক হাঁটার পর খালধারে পৌঁছলাম। খালের দু’ধারেই উঁচু পার। জল খুব কম। বড়জোর হাঁটু অবধি হবে। পরিষ্কার টলটলে জল, তিরতির করে বইছে। আমরা যেরকম আশা করছিলাম – রক্তের স্রোত-টোত, ধস্তাধস্তির চিহ্ন – সেসব কিছু নেই। স্বচ্ছ জলের নিচে কাদামাটি এত পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে যে কেউ খালে নামলে তার পায়ের ছাপও ওপর থেকেই দেখা যাবে। তাই স্পটটা খুঁজে পেতে কোনও অসুবিধে হবার কথা নয়।

পাড় ধরে হাঁটতে আরম্ভ করলাম। সারি দিয়ে গাছ লাগানো পারে। শীতকাল বলে গাছে পাতা কম। মাটিতে প্রচুর শুকনো পাতা পড়ে আছে। রাত্রে আগুন জ্বালাতে কোন অসুবিধে হবে না। আধঘণ্টা হেঁটেও কোথাও অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ল না। ধারেকাছে কোনও গ্রামটাম নেই। চাষিদেরও মাঠে এখন কাজ নেই। তাই চারদিক শুনশান। খালের ওপারের উঁচু বাঁধটার ঠিক পেছনের অংশটা এদিক থেকে দেখা যায় না। ওপারে গেলে যদি কোনও ক্লু পাওয়া যায়! তাই বাবিদা বলল, “চল, খালটা পেরিয়ে ওপারে যাই।”

আমরা কেউই সাঁতার জানিনা। তবে জানার কোনও দরকার নেই। জল খুবই কম। জুতোমোজা খুলে জলে নেমে পড়লাম। প্রথমে বাবিদা, তারপর আমি। তম্বু দেখছে আমরা কী করি, ওকে তো শুধু জুতোমোজা খুললে হবে না! জলে নামতেই বিপত্তি। নরম কাদায় পা ঢুকে যাচ্ছে। একটু এগোতেই প্রায় হাঁটু অবধি কাদায় ডুবে গেল। আর এগোতেও পারি না, পেছোতেও পারি না। ওপারে যাওয়ার প্ল্যান ত্যাগ করতে হল। পিসোর লাঠিতে ভর দিয়ে, হাঁচড়পাঁচড় করতে করতে কোনও রকমে ফের পারে উঠে এলাম। হাত-পা কাদায় মাখামাখি। খবরের কাগজগুলো এখন কাজে লাগল। কাদা-টাদা মোটামুটি পরিষ্কার করে ফের হাঁটা লাগালাম।

একটু হাঁটার পর দেখি উল্টোদিক থেকে চার-পাঁচটা ছাগল নিয়ে এক বুড়োদাদু মাঠ ভেঙে আসছে। খাটো করে লুঙ্গি পরা, গায়ে একটা নস্যি রঙের চাদর। আমাদের দেখতে পেয়েছে। কাছে আসার পর জিগ্যেস করল, “কই চললেন বাবুরা?”

আমি বললাম, “দাদু, এই খালের ধারে কোথায় নাকি একটা খু… –আঃ!”

বাবিদার এক রামচিমটি খেয়ে আমার কথা থেমে গেল। তাড়াতাড়ি আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে সে বলল, “দাদু, বলছিলাম কী, এই খালের ধারে কোথায় নাকি একটা খুব সুন্দর বাগান আছে? সেটা কতদূর জানো?”

বুড়োদাদু অবাক হয়ে বলল, “এইখানে আবার বাগান কই? সবই তো মাঠ।”

“ও, বাগান নেই? আর জঙ্গল?”

“জঙ্গল আবার কই? ওই সামনে একটা খেজুর বাগান আছে। আপনেগো বাড়ি কই? শীতলা?”

“না না, আমরা কলকাতায় থাকি। ওই খেজুর বাগানের কথাই তো বলছিলাম। চল চল, তাড়াতাড়ি চল,” বলে বাবিদা আমাদের তাড়া লাগালো। আমরাও প্রায় দৌড়লাম সামনের দিকে। আরেকটু হলেই ধরা পড়ে গেছিলাম আর কি!

বুড়োদাদু পেছন থেকে বলল, “ওই বাগানে যাইয়েন না, সন্ধ্যা হইয়া আসছে।”

আমরা আর দাঁড়াই! বাবিদা আমার দিকে তাকিয়ে রেগেমেগে বলল, “বোকারাম, আর একটু হলেই সব গুবলেট করে দিচ্ছিলি। তুই ওকেই জিগ্যেস করতে গেছিলি কোথায় খুন হয়েছে?”

“কেন, কী হয়েছে তাতে? ও তো এখানকারই লোক, জানতেও পারে।”

“দাদুর গায়ের চাদরটার মধ্যে কালচে লাল ছোপগুলো লক্ষ্ করেছিলি?”

“ছোপ? ও, পানের পিকের ছোপগুলো?”

“বুদ্ধু! ওগুলো শুকনো রক্তের দাগ। আমার ধারণা ওই খেজুর বাগানে গেলেই স্পটটা পেয়ে যাব।”

“কী করে বুঝলে?”

“আমরা যাতে না যাই ওই জন্যই দাদু আমাদের বারণ করছিল। পড়িসনি, অপরাধী মাঝে মাঝেই তার অপরাধের জায়গায় ফিরে আসে? নাহলে, চারদিকে কেউ কোত্থাও নেই, একা একা এই ধূ ধূ মাঠে ও এখন কী করছিল?”

যখন দাদুর সেই খেজুর বাগানটায় পৌঁছলাম, বিকেল প্রায় শেষের দিকে। এই জায়গাটা চাষের মাঠ নয়। খালের ধারে উঁচুনিচু অনেকটা ঘাসজমি। সেখানে অনেক খেজুর, নিম, বাবলা আর শিমুল গাছ। জঙ্গল ঠিক বলা যায় না, তবে অনেক গাছপালা। শীতকাল, পাতা ঝরে গিয়ে গাছগুলো কেমন ন্যাড়া ন্যাড়া। নিচের মাটিতে ঘাসের ওপর শুকনো পাতার পুরু স্তর। দাদুর ছাগলগুলো মনে হয় এখানেই ঘাস-পাতা খেতে এসেছিল।

পৌঁছেই একটা শিমুল গাছের গুঁড়ির ওপর গ্যাঁট হয়ে বসে পড়ে তম্বু ঘোষণা করল, “আমি মুড়ি খাব।”

তম্বু বলতেই খেয়াল হল, আমাদেরও পেট খিদেয় চোঁ চোঁ করছে। সন্ধ্যে হয়ে গেছে। চারপাশের মাঠের ওপর ধীরে ধীরে পাতলা সাদা কুয়াশার চাদর নেমে আসছে। ঠাণ্ডা লাগছে একটু একটু। এতটা হেঁটে বেশ পা ব্যথাও করছে। আমরাও দুটো গাছের তলায় ব্যাগ-ট্যাগ নামিয়ে বসে পড়লাম।

মিনিট দশেক বসার পরই বেশ শীত করতে লাগল। চারদিক কেমন নিঝুম নিস্তব্ধ হয়ে গেছে। বাবিদা বলল, “শুকনো পাতা জড়ো করি চল। আগুন জ্বালবো। তারপর মুড়ি মাখা যাবে।”

তম্বুকে ওঠানো গেল না, হাঁটুর ওপর কনুই রেখে চুপ করে বসেই রইল। বেচারা বাচ্চা মানুষ, হাঁপিয়ে গেছে। আমি আর বাবিদা কিছুক্ষণের মধ্যেই শুকনো পাতা জড়ো করে একটা বিশাল স্তূপ বানিয়ে ফেললাম। তারপর সেটায় দেশলাই দিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া গেল।

প্রথমে একটু সময় লাগলেও একটু পরই পাতার স্তূপটা দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। বেশ উঁচু একটা আগুন হল। বাবিদা আমাকে বলল, “তুই আগুনের মধ্যে পাতা দিয়ে যা, আমি মুড়ি মাখছি।” আমি চারপাশ থেকে পাতা ছাড়াও শুকনো ডালপালা, কাঠিকুঠি জোগাড় করতে লেগে গেলাম। আগুনের আঁচে তখন শীতটা ভ্যানিশ হয়ে গেছে।

অনেকটা মুড়ি-চানাচুর মেখে, তিনটে প্লাস্টিকের প্যাকেটে ভাগ করে আমরা আগুনটা ঘিরে বসলাম। আমাদের লম্বা লম্বা ছায়াগুলো চারপাশের গাছের গায়ে পড়ে আগুনের তালে তালে দুলতে লাগল। রাত হয়ে গেছে। আকাশে হাল্কা জ্যোৎস্না উঠেছে। সেই আলোয় আর কুয়াশায় তিনপাশের ধূ ধূ মাঠ কেমন ‘হাইলি সাশপিশাস’ লাগছে।

মুড়ি খেতে খেতে বাবিদা বলল, “বুঝলি, খেয়ে নিয়ে আরও ডালপালা যোগাড় করতে হবে। আগুনটা সারারাত জ্বালিয়ে রাখতে হবে। তাহলে আর শীত করবে না।”

বললাম, “স্পটটা খুঁজে দেখবে না?”

“এই অন্ধকারে টর্চের আলোয় কি আর কিছু বোঝা যাবে? কাল সকাল থেকে ফের তদন্ত শুরু করতে হবে।”

তম্বু বলল, “আমরা কোথায় ঘুমবো?”

বাবিদা বলল, “ঘুমবো কেন? এখানেই সারারাত আগুন পোয়াব।”

তম্বুর মনে হয় বাবিদার প্ল্যানটা খুব একটা পছন্দ হল না। চারদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে অন্ধকারে ঝুপসি হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোকে দেখতে লাগল। এখন যদি বলে বসে বাড়ি যাব, তবেই হয়েছে। সেটা অবশ্য বলল না। বলল, “এখানেই বসে থাকব? ঘাসগুলো তো শিশিরে ভেজা। প্যান্ট ভিজে যাচ্ছে।”

বাবিদা পিসোর ওয়াকিং স্টিক দিয়ে আগুনটা খোঁচাতে খোঁচাতে বলল, “খবরের কাগজ নিয়ে এসেছি তো, পেতে দেব।”

“যদি কেউ আসে?”

“কে আসবে? ভূত?” বলে বাবিদা হেসে উঠল।

আমাকেও বাধ্য হয়ে হাসতে হল, নাহলে ওরা কী ভাববে! কিন্তু কিছুক্ষণ ধরেই একটা কথা আমার মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করছিল। বললাম, “ভূত নয়, কিন্তু ওই বুড়োদাদুটা যদি আবার আসে?”

বাবিদা বলল, “সে আবার এখানে আসতে যাবে কেন?”

“বা রে, তুমিই তো বলছিলে, অপরাধী বার বার তার অপরাধের জায়গায় ফিরে আসে। ও তো আমাদের এদিকে আসতে দেখেছে। আমরা কী করছি দেখার জন্য যদি আবার ফিরে আসে? দাদুর হাতে কিন্তু একটা কাস্তে ছিল।”

“আসুক না। এলেই হল? আমরা তো তিনজন আছি। কী করবে?”

“যদি লোকজন জুটিয়ে নিয়ে আসে? আমার মনে হয় ও শীতলাতেই থাকে।”

তম্বু হঠাৎ বলল, “ওই যে, আসছে তো!”

তম্বুর দৃষ্টি অনুসরণ করে আমরা দু’জনেই মাঠের দিকে তাকালাম। দেখি সত্যিই কুয়াশার আবছা অন্ধকারের মধ্যে দূরে তিনটে ছায়ামূর্তি এদিকেই এগিয়ে আসছে। সেই বুড়োদাদু আছে কি না আরও কাছে না এলে বোঝা যাবে না। তবে একটা ছায়ামূর্তি খুব ঢ্যাঙা, একটা মাঝারি লম্বা আর একটা ছোটখাটো। বাবিদা বলল, “আগুনটা জ্বালানো একটু গোলমাল হয়ে গেছে। চল তাড়াতাড়ি নিভিয়ে ফেলি, তারপর গা ঢাকা দিতে হবে।”

মুড়ি-টুড়ি ফেলে আমি আর বাবিদা তাড়াতাড়ি যে যার ব্যাগ উঠিয়ে পিঠে নিয়ে নিলাম। তারপর দু’জনে দুটো লম্বা গাছের ডাল দিয়ে পিটিয়ে পিটিয়ে আগুনটা নেভানোর চেষ্টা করতে লাগলাম। কিন্তু যেরকম দাউ দাউ করে জ্বলছিল আগুনটা, অত সহজে নেভে না কি? এদিকে ছায়ামূর্তি তিনটে ততক্ষণে আমাদের বেশ কাছাকাছি চলে এসেছে।

তম্বুটাকে নিয়ে আসা সত্যিই আমাদের ঠিক হয় নি। ও বেচারা এখনও খুবই ছোট। এতক্ষণ ধরে ক্যাবলার মত তম্বু ছায়ামূর্তিগুলোর দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল। আর তারপর যা করল, বললে বিশ্বাস করা যায় না। হঠাৎ সোজা পড়ি কি মরি করে ছুট লাগাল ওদেরই দিকে। আর আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, ওদের কাছে গিয়ে তম্বু সোজা ছোটখাটো ছায়ামূর্তিটার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

ওরা আগুনের আরও কাছে আসতেই ব্যাপারটা বোঝা গেল। ধরা পড়ে গেছি। ছায়ামূর্তি তিনজন আসলে ছোড়দা, ছোড়দার এক বন্ধু, আর মা। আমাদের খুঁজে বার করে ফেলেছে। তম্বু এখন মায়ের কোলে। তিনজনই আমাদের দিকে এমন কটমট করে তাকাচ্ছিল যে আমরাও আর কথা না বাড়িয়ে সুড়সুড় করে ওদের পেছন পেছন বাড়ির দিকে রওনা হলাম। আশ্চর্য, বাড়ি ফেরা অবধি সারা রাস্তা কেউ আমাদের সাথে একটাও কথা বলল না।

*

সোনারপুরের বাড়ির গ্রিল দেওয়া বাইরের বারান্দা। পাশেই রাস্তা। বারান্দায় তিনটে ছোট ছোট মোড়ায় আমাদের তিনজনকে বসিয়ে রাখা হয়েছে। বারান্দার বাইরে, বাগানে আর রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে অজস্র লোক। প্রথমে বারান্দার গ্রিল আর কোলাপসিবল গেট ধরে দাঁড়িয়ে আছে পাড়ার যত ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা। এরা সকাল বিকেল আমাদের সঙ্গেই খেলে, অথচ এখন কেউ আমাদের সাথে একটাও কথা বলছে না। কী বিশ্বাসঘাতক! ছোটদের পেছনের সারিটা পাড়ার যত মেয়ে আর বৌদের। তারও পেছনে আর রাস্তায় পুরুষমানুষদের জটলা। আমাদের সবাই অবাক হয়ে একমনে দেখে যাচ্ছে, যেন আমরা চিড়িয়াখানার কোন জন্তু। ভিড়ের থেকে টুকরো টুকরো নানারকম কথা ভেসে আসছে। ‘এই ছোঁড়াগুলোই বাড়ি থেকে পালিয়েছিল, না?’ ‘ধরা পড়ল কী ভাবে? পুলিশের হাতে?’ ‘এই বয়েসেই কী সাঙ্ঘাতিক বদমাইশ হয়েছে দেখেছিস? বড় হলে তো ডাকাত হবে!’ ‘এইটুকু ছেলে সব, পালাল কী করে? মা-বাবার জন্য একটু দরদ নেই গো!’

চারদিকের নানারকম কথাবার্তা থেকে যা বোঝা গেল, আমাদের খুঁজে না পেয়ে বাড়িতে বেশ হুলস্থূল পড়ে গেছিল। প্রথমে বাড়ির চারপাশেই খোঁজাখুঁজি করা হয়। না পেয়ে একেকজন একেকদিকে খোঁজ করতে বেরিয়ে পড়ে। বড়দা সেসময় বাড়ি ছিল না, বিকেলে বাড়ি ফিরে সব শুনেই স্কুটার নিয়ে সোজা চলে যায় চম্পাহাটির দিকে। বড়পিসি ছোড়দিকে নিয়ে গেছিল রেল লাইনের ধার অবধি। বড়দি গেছিল বলাকার মাঠের দিকে। ছোড়দারা খোঁজাখুঁজি করছিল পাড়ার স্কুলের আশেপাশে আর বাঁশঝাড়ের দিকে। বড়দা চম্পাহাটি অবধি গিয়েও কোনও হদিশ না পেয়ে চলে যায় থানায় খবর দিতে। বড়পিসি জেলেদের বাড়ি গিয়ে তাদের ধরে আনে পুকুরে জাল ফেলে খুঁজবে বলে। এমনসময় সেই বুড়োদাদু, সেই আমাদের ডুবিয়ে দিয়েছে, ছোড়দাদের খোঁজাখুঁজি করতে দেখে বলে তিনজনকে সে খালের ধার ধরে খেজুরবাগানের দিকে এগিয়ে যেতে দেখেছে। তখন মা আর ছোড়দারা রওনা হয় খালের দিকে আর অনেক দূর থেকেই আগুনটা দেখতে পায়। এই হল গিয়ে এদিককার ঘটনা।

এরপরে বড়দা, বড়দি, ছোড়দা আর ছোড়দির যা কথাবার্তা শুনতে পেলাম, তাতে বুঝতে পারলাম এখন আলোচনার বিষয় হল আমাদের নিয়ে কী করা যায়। ঠিক কেমন শাস্তি দিলে আমাদের এই ভয়ানক বেয়াদবির উপযুক্ত হবে। এই নিয়ে ওদের চারজনের নিজেদের মধ্যেই ঝগড়া লেগে গেল। কেউ বলছে, ‘ওই বারান্দাতেই বসে থাকুক ওরা, তিনদিন খাওয়া বন্ধ।’ কেউ বলছে, ‘কাল সকালেই তিনজনকে যার যার বাড়ি পাঠিয়ে দেওয়া হোক। অনেক হয়েছে।’ কেউ আমাদের জলতেষ্টা পেয়েছে কিনা সেটা পর্যন্ত জিগ্যেস করল না।

শেষমেশ কোনও কিছুই ওরা ফাইনাল করতে পারল না। আর তার ফলে যা ঠিক করল সেটা ভয়ংকর। ঠিক হল আমাদের শাস্তি দেবার ভারটা পিসোর ওপরে ছেড়ে দেওয়া হবে। পিসো কিছুক্ষণের মধ্যেই অফিস থেকে ফিরবে। আদ্যোপান্ত সমস্ত ঘটনা পিসোকে বলা হবে। তারপর পিসো যা শাস্তি দেয় তাই ফাইনাল। পিসোকে সবাই আমরা ভয়ানক ভয় করি। খুব মেজাজি মানুষ। বিশেষ করে ঠিক অফিসে যাওয়ার সময় আর অফিস থেকে ফেরার পরপরই পিসোর মেজাজ একদম উঁচু তারে বাঁধা থাকে। আমাদের তখন আর করার কিছুই নেই, শুধু নিজেদের বুকের ঢিবঢিব আওয়াজ শোনা ছাড়া।

বাইরের ভিড় পাতলা হয়ে এল। আমাদেরও বারান্দা থেকে উঠিয়ে একটা ঘরে বন্ধ করে রাখা হল। খানিক বাদেই কলিং বেলের আওয়াজ, পিসো চলে এসেছে। আমরা কান পেতে বাইরের ঘরের কথাবার্তা শোনার চেষ্টা করছি। পিসো জুতো খোলার সময়ই বড়দি ‘জানো, বাবা..’ বলে তড়বড় করে আরম্ভ করতে গেছিল, বড়পিসি থামিয়ে দিল, “দাঁড়া দাঁড়া, বাবা আগে হাত-মুখ ধুয়ে নিক, একটু খাওয়াদাওয়া করুক, তারপর যা বলার বলিস।” এই ঘরে আমাদের ঢোকানোর সময় দেখে এসেছি, পিসোর সেই ওয়াকিং স্টিকটা বসার ঘরের একপাশের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে সাজিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে ঘরে ঢুকেই নজরে পড়ে। রুপো বাঁধানো লাঠিটা কাদায় একদম মাখামাখি, নিচের দিকটা আগুনের আঁচে পুড়ে কালো হয়ে গেছে। ওটা দেখেই তো পিসোর মেজাজ সপ্তমে চড়ে যাবার কথা।

যাই হোক, বন্ধ ঘরের ভেতর থেকে বুঝতে পারলাম, পিসোর জলখাবার খাওয়া হল। তারপর চায়ের কাপ হাতে বসার ঘরের সোফায় থিতু হবার পর বড়দা, বড়দি এতক্ষণ ধরে মনে মনে রিহার্সাল দেওয়া পার্ট গড় গড় করে মুখস্থ বলে গেল। পিসোর কথা কিছু শোনা গেল না। আধঘণ্টা বাদে আমাদের ডাক পড়ল। তখন প্রায় সাড়ে ন’টা বাজে। আমাদের নিয়ে গিয়ে বসার ঘরের মধ্যে সেই তিনটে মোড়া রেখে তার ওপর বসানো হল। চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে বড়দা, বড়দি, ছোড়দা, ছোড়দি, বড়পিসি, মা, এমনকি রান্না করে যে সেই যশোদামাসি অবধি। সবাই মজা দেখতে উদগ্রীব।

পিসো গম্ভীরভাবে জিগ্যেস করল, “তোরা ওই খালের ধারে গেছিলি?”

বাবিদা বলল, “হ্যাঁ।”

“কেন?”

বাবিদা পকেট থেকে সেই ভাঁজ করা খবরের কাগজের কাটিংটা বার করে পিসোর হাতে দিয়ে বলল, “খুনের তদন্ত করতে।” তারপর আমাদের যাবার কারণ, সন্দেহ, ঘটনাবলী এবং প্রায় যে আমরা স্পটে পৌঁছে গেছিলাম সে বৃত্তান্ত কম কথায় নিচু গলায় ব্যাখ্যা করল। আমরা তো অপরাধী ধরতেই গেছিলাম, অথচ এখন কিনা আমাদেরই বিচার হচ্ছে।

পিসো গম্ভীরভাবে সমস্ত শোনার পর বলল, “আমার সামনে লাইন দিয়ে তিনজনে দাঁড়াও।”

আমরা উঠে দাঁড়ালাম। আমি আর বাবিদা দু’পাশে, মাঝখানে তম্বু।

পিসো প্রায় হুঙ্কার দিয়ে উঠল, “ওই ভাবে নয়, লম্বা থেকে বেঁটে, সিরিয়ালি।”

আমরা তাড়াতাড়ি স্থান পরিবর্তন করলাম। এবারে প্রথমে বাবিদা, তার পাশে আমি, সব শেষে তম্বু।

পিসো খানিকক্ষণ আমাদের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে বাবিদার দিকে তাকিয়ে বলল, “এইটা পালের গোদা, সবচাইতে লম্বা। এইটা একটু খাটো। আর এইটা তো একদম বাঁটকুল।”

তারপর আবার হুঙ্কার দিয়ে আমাদের পিলে চমকে দিয়ে বলল, “বেশ করেছিস গেছিস। একশবার যাবি। এই তো চাই।” তারপর বড়দা, বড়দি, ছোড়দা, ছোড়দিদের দিকে তাকিয়ে আরেকটা হুঙ্কার, “তোরা এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাঁ করে কী দেখছিস? পড়াশোনা নেই? যাও, নিজের কাজে যাও। লজ্জা করে না এইটুকু-টুকু ভাইদের নামে নালিশ করতে?”

ওদের উৎসাহে টগবগ করে ফুটতে থাকা মুখগুলো হঠাৎ চুপসানো বেলুনের মত হয়ে গেল। বড়রাও সবাই এদিকওদিক সরে পড়ল। আর আমরা কেমন যেন হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। ব্যাপারস্যাপার কী ঘটল তখনও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না।

পিসো গম্ভীরভাবে বলল, “তোরা কনটিকি অভিযানের গল্প শুনেছিস?”

আমরা বললাম, “না।” পিসো বাবিদাকে বইয়ের র‍্যাকের মাঝের তাকটার দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “ওখান থেকে কমলা রঙের স্পাইনের বইটা বার কর।” বাবিদা বইটা নামাল। দেখলাম থর হেয়ারডালের লেখা একটা বই, ‘দ্য কনটিকি এক্সপিডিশন’।

পিসো বলল, “তোদের আজকে কনটিকির গল্পটা বলব। ছোট করে বলব। তারপর বইটা পড়ে নিস। তার আগে চল খেয়ে নি। কই, খেতে দিয়ে দাও আমাদের, খিদে পেয়েছে।”

শেষের কথাটা অবশ্য বড়পিসিকে উদ্দেশ্য করে বলা। আমাদের ভ্যাবাচ্যাকা ভাবটা তখনও ঠিক কাটে নি। পিসো আমাদের গল্প বলবে? বড়পিসির কাছে ছোটবেলায় অনেক গল্প শুনেছি – ঠাকুরমার ঝুলির গল্প, টুনটুনির বইয়ের গল্প, হ য ব র ল – আরও কত কী। কিন্তু পিসোর কাছে আমরা বড় একটা ঘেঁষতাম না। যা রাশভারী মানুষ! চুপচাপ মুখ গুঁজে রাতের খাওয়া খেতে খেতে ভাবছিলাম, এ তো শাস্তির বদলে পুরস্কার জুটে গেল! কথাবার্তা অবশ্য তখনও কেউই বলছি না, কেননা পিসোর মুডের ওপর আমাদের ভরসা নেই মোটেই, কখন আবার বিগড়ে যাবে। তাছাড়া খিদেও এমন পেয়েছিল যে কথা বলা মানে সময় নষ্ট।

খাওয়াদাওয়া শেষ হল। বসার ঘরে ফিরে এসে আমরা সেই মোড়া তিনটেতে বসলাম। পিসো সোফায় আধশোওয়া। কনটিকির গল্প আরম্ভ হল। ছ’জন দুঃসাহসী অভিযাত্রী ঠিক করল ভেলায় চড়ে প্রশান্ত মহাসাগর পেরোবে। পেরুর কালাও বন্দর থেকে সাড়ে চারহাজার মাইল সমুদ্র পেরিয়ে যাবে পলিনেশিয়ান দ্বীপপুঞ্জে। বড়দা, ছোড়দা, বড়দি, ছোড়দিরা তখন খেতে বসেছে। বালসা গাছের লম্বা লম্বা গুঁড়ি লতার দড়ি দিয়ে বেঁধে তৈরি হল ভেলা। নাম দেওয়া হল কনটিকি। ছ’জন বন্ধু, আর সঙ্গে তাদের পোষা টিয়াপাখি লোরিটা, ভেসে পড়ল সমুদ্রে। বড়দাদের খাওয়া হয়ে গিয়ে তখন মা, বড়পিসিদের খাওয়া চলছে। ভেলায় খবর আদানপ্রদানের জন্য একটা রেডিও সেট ছাড়া আর কোনও আধুনিক যন্ত্রপাতি নেই। কেননা, অভিযানের নেতা নরওয়ের থর হেয়ারডালকে প্রমাণ করতে হবে বহুকাল আগে এভাবেই দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইনকারা ভেলায় করে সমুদ্র পেরিয়ে পলিনেশিয়ায় সভ্যতা বিস্তার করেছিল। হেয়ারডালের তত্ত্ব শুনে বিজ্ঞানী আর ঐতিহাসিকরা হেসেছিল, “যত সব পাগলের প্রলাপ। ইনকারা সমুদ্র পেরোবে কী করে? তারা তো জাহাজ বা নৌকো বানাতেই জানত না!” হেয়ারডাল বলল, “কেন? বালসা কাঠের ভেলায়?” বললেই তো হল না, প্রমাণ কোথায়? হেয়ারডালের রোখ চেপে গেল। তিনি আর তাঁর বন্ধুরা ঠিক করলেন নিজেরাই ভেলায় চড়ে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে প্রমাণ করে দেবেন যে ব্যাপারটা সম্ভব। খাওয়াদাওয়া সেরে সবাই তখন শুয়ে পড়েছে। বসার ঘর ছাড়া অন্য সব ঘরের আলো নিভে গেছে। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চলেছে – সাড়ে এগারোটা, বারোটা …। আর উত্তাল সমুদ্রের ঢেউয়ে ঢেউয়ে মোচার খোলার মত ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলেছে কনটিকি।

                                                 ছবি- শিবশংকর ভট্টাচার্য

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply