গল্প- কুকুর ও ক্যাঙারুর গল্প- মহাশ্বেতা -জয়ঢাক৪৯-বর্ষা ২০১৫

মহাশ্বেতার আগের গল্প- শুকতারার গল্প, খুলির আর্তনাদ(১ম) , খুলির আর্তনাদ(২য়), খুলির আর্তনাদ(৩য়) খুলির আর্তনাদ(৪র্থ) শলকেনের ছবি (১ম পর্ব) শলকেনের ছবি (২য় পর্ব)তুফান ১ম পর্ব, তুফান ২য় পর্ব, কালো বিড়াল (অ্যালেন পো), গ্যাব্রিয়েল আর্নেস্ট, অতিথি, জলসাঘরের ভূত, সুইমিং পুল

golpoaustralia49

অনেক, অনেক কাল আগে, কুকুর ও ক্যাঙারু ছিল ভারী ভাল বন্ধু। তারা একসাথে শিকার করত, খেলা করত, খেত আর একই জায়গায় ঘুমোতো। কুকুরের শরীর ভাল না থাকলে, ক্যাঙারু জঙ্গলে ঘুরে ঘুরে কুকুরের প্রিয় জন্তু শিকার করে আনত সে খাবে বলে। ক্যাঙারু অসুস্থ হয়ে পড়লে কুকুরও তার জন্য একই কাজ করত। আবার মাঝেমাঝে এমনিই তারা একে অপরের প্রিয় খাবার এনে উপহার দিত। তারা ছিল একেবারে হরিহর আত্মা।

একদিন খুব ভোরে ক্যাঙারু হঠাৎই ঘুম থেকে উঠে পড়ল। পাশে কুকুর শুয়ে ঘুমোচ্ছিল কিন্তু ক্যঙারু তাকে আর জাগালো না। সে একাই জঙ্গলে শিকার করতে চলে গেল। কুকুরকে আর জানালো না কিছুই।

ক্যাঙারু জঙ্গলের গভীরে ঢুকে গেছে, এমন সময় কুকুরের ঘুম ভাঙল। চোখ খুলে আশপাশে ক্যাঙারুকে কোথাও দেখতে না পেয়ে সে তাকে খুঁজতে বেরোল। তার নাম ধরে ডাকতে লাগল, “আ-উ-উ-উ-উ, ক্যাঙারু বন্ধু, কোথায় গেলে? আ-উ-উ-উ-উ–”

কিন্তু ক্যাঙারু তো তখন গভীর জঙ্গলে। সেখান থেকে সে না কুকুরের ডাক শুনতে পাচ্ছিল, না দিতে পারছিল তার উত্তর। আস্তে আস্তে দুপুর হয়ে এল। আশপাশে ক্যাঙারুকে খুঁজে না পেয়ে শেষে কুকুর মাটিতে বন্ধুর পায়ের ছাপ অনুসরণ করতে লাগল। এদিকে ক্যাঙারু সারা সকাল জঙ্গলে ঘুরেও কোন পছন্দসই  শিকার খুঁজে পায়নি। সূর্য তখন আকাশ বেয়ে অনেক উঁচুতে উঠে গেছে। ক্যাঙারু শেষমেষ ক্লান্ত হয়ে গাছের তলায় শুয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। সেটা ছিল একটা বিশাল কাঁঠাল গাছ। গাছটা ভর্তি ছিল থরে থরে পাকা কাঁঠাল আর সেগুলো গরমে সব গাছ থেকে খসে খসে পড়ছিল।

ঘুম থেকে উঠে ক্যাঙারুর পেট চোঁ চোঁ করতে লাগল। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে বেশ অনেকগুলো কাঁঠাল ছড়িয়েছিটিয়ে রয়েছে এদিক ওদিক। সে মাটিতে বসে সেগুলোকে খেতে লাগল পেট পুরে। সূর্যাস্তের সময় কুকুর তাকে খুঁজতে খুঁজতে এসে পৌঁছোল সেই কাঁঠাল গাছের নিচে। তখনো ক্যাঙারু খেয়ে চলেছিল। কুকুরকে দেখে সে একেবারে অবাক হয়ে গেল।

কুকুর বলল, “বন্ধু, সকাল থেকে আমি তোমায় খুঁজে চলেছি। এখন তো প্রায় রাতই হতে চলল।” ক্যাঙারুর মুখ ভর্তি তখন কাঁঠাল তাই সে কোন জবাব দিল না। কুকুর আবার জিজ্ঞেস করল, “খাচ্ছটা কী তুমি? আমিও খাব।”

ক্যাঙারু তখন মুখেরটুকু গিলে উত্তর দিল, “আরে বন্ধু, তুমি এ কী করে খাবে, আমি তো গোবর খাচ্ছি!” কুকুর বড়ই সরল ছিল। সে তার কথা মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে ফেলল। সন্ধের হালকা আলোয় সে গাছের কাঁঠাল ভাল করে দেখতেও পেল না। সে  সরল মনে জিজ্ঞেস করল ক্যাঙারুকে, “সে কি ভাই, গোবর কি আবার খাওয়া যায় নাকি?”

“কেন খাওয়া যাবে না? দিব্যি খাওয়া যাবে! এই দেখ না আমি খাচ্ছি?”

“খেতে কেমন গো? ভালো?”

“আরে দারুণ গো, দারুণ। খেলে মুখে স্বাদ লেগেই থাকবে।”

অন্ধকার হয়ে এসেছিল ততক্ষণে। দুই বন্ধু গাছতলা ছেড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। যেতে যেতে রাস্তার ধারে তারা দেখে এক ঢিপি সত্যিকারের গোবর পড়ে রয়েছে। ক্যাঙারু শয়তানী করে কুকুরকে বলল, “ওই যে কত গোবর। তুমি চাইলে চেখে দেখতে পারো, বুঝলে? আমার তো গলা অবধি ভর্তি।”

কুকুর তাই শুনে গিয়ে সেই গোবর মহানন্দে খেয়ে নিল। ক্যাঙারু ওদিকে হাসি চাপতে চাপতে কোনরকমে তাকে জিজ্ঞেস করল, “কি ভাই? ভালো লাগছে খেতে?” কুকুর তার উত্তরে বলল, “হ্যাঁ ভাই দারুণ! এরকম ভাল খাবার জীবনে খাইনি তো!”

কথাটা অবশ্য ক্যাঙারু বেশিক্ষণ গোপন রাখতে পারল না। বাড়ি ফিরেই সে কুকুরকে বলে দিল, “ভাই, আমায় মাফ করে দাও। আমি ওই গাছ তলায় বসে কাঁঠাল খাচ্ছিলাম, গোবর নয়। তোমাকে ঠাট্টা করে গোবর খাচ্ছি বললাম। কিন্তু ভাই তুমি তো তা সত্যি ভেবেই রাস্তার ধারে আসল গোবর খেয়ে নিলে। তুমি কিছু মনে করো না, হ্যাঁ ভাই?”

কুকুর তাতে মনে মনে ভীষণ বিরক্ত হল, কিন্তু ক্যাঙারুর সঙ্গে সে কোনরকমের দুর্ব্যবহার করল না। সে চুপচাপ থেকে চিন্তা করতে লাগল শুধু।

তারপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল। কুকুর আর ক্যাঙারু একদিন ঘুরতে বেরোল। এবার তারা গেল সমুদ্রের ধারে, ঝিনুক খুঁজতে আর তাজা মাছ ধরে খেতে। ক্যাঙারু অনেক খেটেখুটে ঝিনুক খুঁজতে লাগল, কিন্তু কুকুর একই জায়গায় বসে থেকে নখ দিয়ে বালি খুঁড়তে লাগল। কিছুক্ষণ বাদেই বালিতে তার লম্বা লম্বা সামনের পা-দুটোর অনেকটা ঢেকে গেল। দূর থেকে দেখে মনে হল যে তা যেন কে কেটে একেবারে ছোট করে দিয়েছে। ক্যাঙারুও দূর থেকে দেখে তাই মনে করল।

তা দেখে ক্যাঙারু সঙ্গে সঙ্গে ঝিনুক রেখে কুকুরের কী হয়েছে দেখতে চলে এল। এসে তার ছোট ছোট পা দেখে জিজ্ঞাসা করল, “ভাই তোমার পায়ের কী হয়েছে? দেখে ছোট মনে হচ্ছে যে?”

তার জবাবে কুকুর বলল, “আমি ঝিনুক দিয়ে কেটে ফেলেছি যে ভাই! এত লম্বা লম্বা হাত আমার আর ভাল লাগছিল না। বড় ঝামেলা! তাই ভাবলাম কেটে ফেলি।”

“ও, তাহলে আমিও তাই করি। তাহলে আমাদের দু’জনের হাতই একরকম হয়ে যাবে। ভালোই হবে। আমারও তো ছোট হাত হলে অনেক সুবিধা!”

“বেশ, তাই কর তাহলে, তোমার যদি ইচ্ছা হয়,” কুকুর মনে মনে হাসতে হাসতে জবাব দিল।

golpoaustralia4902

ক্যাঙারু সঙ্গে সঙ্গে তার সংগ্রহ করা সবচেয়ে বড় ঝিনুকটা তুলে নিয়ে এল। তার ধারালো দিকটা দিয়ে খচাত করে নিজের দুই হাত কেটে ফেলল যেমনটা সে কুকুরকে করতে দেখেছে। তার পা’গুলো ছোট ছোট হয়ে গেলে কুকুর মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বালির তলায় চাপা দেওয়া তার সামনের পা গুলো অনায়াসে বের কর আনল। ক্যাঙারু তা দেখে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠল। চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমায় বোকা বানালে কেন? আমার হাত দুটো কাটালে কেন আমায় দিয়ে? জবাব দাও!”

কুকুরও তার উত্তরে ক্যাঙারুকে জিজ্ঞেস করল, “আর তুমিও আমায় সেদিন বোকা বানিয়ে গোবর খাইয়েছিলে কেন?”

তারপর তো শুরু হল দুজনের মধ্যে চরম কথা কাটাকাটি আর ঝগড়া। কুকুর শেষে ক্যাঙারুকে তাড়া করে জঙ্গলের মধ্যে তাড়িয়ে দিল। তাদের বন্ধুত্বেরও সেইসঙ্গে অবসান ঘটল।

সেইদিন থেকে ক্যাঙারু ও কুকুরদের আর কোনরকম সদ্ভাব নেই। কুকুর যত রাজ্যের নোংরা খায় আর ক্যাঙারুর সামনের পাগুলো ছোট ছোট। যদি কেউ ক্যাঙারুদের এলাকায় কুকুর নিয়ে ঢোকে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে তারা সব পালিয়ে যায়। আগের বন্ধুত্বের ছিটেফোঁটাও তাদের মধ্যে আর নেই। এখন তারা পরম শত্রু।

পাপুয়া নিউগিনির লোককথা

ছবিঃ মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প-উপন্যাস