শিবশংকর ভট্টাচার্যর সমস্ত গল্প

সকালবেলা হামু এসে বলল, “মুড়িতো খাচ্ছিস গরুর মত চপর্ চপর্ করে সকাল সন্ধে, যেতিস যদি কাজল দিঘিতে এই বড়ো বড়ো পানিফল। আর দিঘির পাড়ে আনারসি আম। ভূতুড়ে আম, জামরুল, লিচু – কত্ত গাছ। ফলের ভারে ডালগুলো মাটি ছুঁই ছুঁই, তোলো আর খাও। যাস যদি চল, নয়তো খেয়ে দেয়ে কাজ কিছু কম নেই আমার। ব্যাঙাকে ডেকে এসেছি, ল্যাংড়া গোঁসাই-এর দোকানে ঢাউস ঘুড়ি কিনতে যেতে হবে। নাঃ – যাই। কই গো দিম্মা মোয়া-টোয়া কি দেবে দাও”।
আমি আস্তে আস্তে ঢোঁক গিলে বললাম, “কিন্তু কাজল দিঘিতে নাকি কী কারা সব থাকে। সবাই যেতে বারণ করেছে! হ্যাঁরে লিচুও হয়েছে দেখেছিস?”
“দুর্ যত ভীতু নিয়ে পড়েছি। যেতে ইচ্ছে না করে তো যাস না। হ্যাঁ ওখানে ভূত থাকে, রাক্ষস থাকে, ডাইনোসর থাকে – কই গো দিম্মা মোয়া দিলে না? নাঃ, ব্যাঙার সাথেই যাই।”
আমার রাগ হয়ে গেল। আমি ভীতু! আর ও যে রাত্তিরে বাইরে যেতে ভয় পায়! ও যে বন বেড়ালে ডাকলে ফিট হয়ে যায়! হাতের আধখাওয়া মোয়াটা দিদিমার পেয়ারের কুকুর লালীর দিকে গড়িয়ে দিয়ে মুখটুক মুছে উঠে দাঁড়ালাম।
কাজল দিঘির পথে শেষ বাড়ি মিস্তিরিদাদুর, তারপরেই বেঘো জঙ্গল। পাথর বিছোনো পথ শেষ হয়ে সেখানে কেবল রাঙামাটির পথ। বর্ষার কাদা গরুর গাড়ির চাকার দাগ বুকে নিয়ে শুকিয়ে পাথরের মত শক্ত। সেই রাস্তা বন জঙ্গলের মধ্যে খানিকটা খানিকটা দেখা যাচ্ছে বাকি ঢাকা পড়ে গেছে। কী সব অদ্ভুত ব্যাপার সেই জঙ্গলে! পথের মাঝেই দোতলাবাড়ি সমান মস্ত উইঢিপি। উইমাটির মাঝে মাঝে পোড়ামাটির লাল খুদে খুদে মূর্তি বসানো পুরনো মন্দিরের গা দেখা যাচ্ছে। মাথার উপরে কোথায় কাঠঠোকরা ঠক্ ঠক্ ঠকাস্ ঠক্ করে কামারের দোকানের হাতুড়ি পেটার শব্দ তুলছে। হামু মাথার উপর আঙুল তুলে দেখাল লাল পিঁপড়ের পাতা সেলাই করা বাসা। বাবা রে! কানের পর্দা ফেটে যাবার মত নিঃঝুম চারধার। কেমন খিদে পেয়ে গেল হাঁটতে হাঁটতে। কতকগুলো লিচু পেড়ে নিয়ে বসে গেলাম একটু ফাঁকা মত দেখে ঘাসের ওপর। আর ঠিক তক্ষুনি সেই লোকটা মাথার ওপরকার তেঁতুলের ডালপালা থেকে ধুপ্ করে লাফিয়ে নাবল আমাদের পাশে। আমি অত মিথ্যুক নই যে বলব ভয় পাইনি, তবে কিনা লোকটাই একগাল হেসে বলল, “ভয় কী গো খোকারা? এখানেই থাকা হয় আমার। জেতে ঠ্যাঙাড়ে কিনা তাই বনে বাদাড়ে বাস। তা মুড়ি কি নিদেন মোয়া কিছু আনো নি কোঁচড়ে করে? অ, এমনি শুকনো বেড়াতে এয়েছ, তা বেশ। নামটি কী গা তোমাদের?”
হামু বললে, “নামে কী কাজ? যাকে তাকে নাম বলি আরকি, তায় ঠ্যাঙাড়ে!” আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম, “ছিঃ হামু, বড়োদের এভাবে বলতে নেই।”
লোকটা চোখ বড়ো বড়ো করে হামুর দিকে চেয়েছিল, আমার কথায় ঠান্ডা হয়ে পাশেই মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে থাকা তেঁতুল গাছের মস্ত শেকড়ের ওপর ঠেস দিয়ে বসে মাথার শক্ত করে বাঁধা গামছাটা খুলে নেড়ে নেড়ে বাতাস খেতে লাগল।
কয়লাকালো তেঢ্যাঙা লম্বা লোকটার শরীরে কেবল শক্ত হাড়ের ওপর খড়ি ওঠা কোঁচকানো চামড়া। চুলদাড়ি কতকাল না কামানো কে জানে? চোখদুটো বড়ো বড়ো ছাড়ানো লিচুর মত টস্টসে। খানিক দেখলে কষ্ট হয়, হঠাৎ দেখলে ভয়! কপাল থেকে গালের একপাশ বেয়ে পেঁচিয়ে গলা অবধি নেবে আসা একটা কতকালের পুরনো কাটা দাগ।
আমাদের বয়ে গেছে ওরকম বসে থাকতে, হামুকে কনুই ধরে টান মেরে উঠে দাঁড়াতেই লোকটা আবার ব্যস্ত হয়ে বলল, “কী যে তোমাদের শখ না! এই কড়া রোদ্দুর মাথায় নিয়ে এখন জঙ্গলটি টহল না দিলেই নয়? তার চেয়ে বোস তোদের সাথে কটা কথা বলে বাঁচি। তা-বাবারা নাম বলবিনে?”
আমি বললাম, “এর নাম হামু, আমার নাম শিবু। তোমায় দাদু বলে ডাকলে রাগ করবে?”
লোকটা কী যে খুশি! প্রায় নাচতে লেগে গেল, “ওরে, আমার নাতিরে, ষেটের পো জোড়া নাতি কোথায় তোদের রাখিরে।”
তারপর বলল, “দাঁড়া তোরা এট্টু, ভেতরের বনের দিকে মেলাই নারকেল গাছ, ডাব লিয়ে আসি তোদের লেগে।” বলে একছুটে বনের আঁধারে ভোঁ।
হামু চুপচাপ ছিল। এবার তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়িয়ে বললে, “বাড়ি চল শিবু, দিম্মা চিন্তা করবে, মা খুঁজবে।”
আমার রাগ হল। এ পেয়েছে আসলে ভয় আর শোনানো হচ্ছে মা খুঁজবে হ্যান ত্যান। বললাম, “আমি ডাব খেয়ে আম খেয়ে গল্প শুনে তবে যাব, বোস চুপ করে।”
একরত্তি শব্দ নেই। ক’টা ছাতারে পাখি খানিক দূরে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে, মাঝে মাঝে তাদেরই কিচ্ কিচ্। শুকনো পাতার ওপর তাদের পা ফেলার খচ্ মচ্। শাল বাবলার গা বেয়ে গিরগিটি বহুরূপী দুলছে, ছুঁচোর ডগা চোখ ঠায় চেয়ে আছে কোন দিকে। বুনো পানের লতা যেন অজগর বেড় দিয়ে আছে বিশাল ভূতুড়ে আমগাছের গায়ে। তাতে হাতির কানের মত বড়ো বড়ো পানপাতা। ওরই আড়ালে কে জানে কোথায় বসে কাঠঠোকরা ঠোঁটের ধার পরখ করছে ঠক্ ঠক্ ঠকা ঠক্! একা এখান থেকে বাড়ি ফিরতে ভয় করবে বলেই বোধহয় হামু চুপটি করে তেঁতুল গাছের গায়ে ছুরি দিয়ে নাম খোদাই করতে লেগে গেল। আর শেকড়ে মাথা রেখে শুয়ে বনের মাথায় নীল আকাশে চিলের চক্কর দেখতে কী যে ভালো লাগছিল আমার।
এমন সময় ঝোপ ঝাড় ঠেলে খচ্ খচ্ করে লোকটা আবার এসে গেল। কাঁধে এই বড়ো বড়ো সাত আটটা ডাব। তেঁতুল গাছটারই কোথায় কোন ফোকরে হাঁসুয়া লুকোনো ছিল তাই দিয়ে সব কটা ডাবের মুখ কাটা হয়ে গেলে বললে, “খা বাছারা। ভারী মিঠে জলটা। শরীর ঠান্ডা হবে।” বলে আবার তেঁতুল গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে গামছার বাতাস খেতে লাগল।
খেতেখেতেই শুনলাম লোকটার নাম বুধু পাড়ুই। নিবাস ছিল গুপ্তিপাড়ার দিকে। দুষ্টু লোকদের অত্যাচারে গাঁ ছেড়ে এসে চাষের কাজ ভুলে ঠ্যাঙা দিয়ে মানুষ মেরে তাদের টাকা কেড়ে নিয়ে পেট চালাত। এখন এখানেই থাকে, ফল পাকুড় খেয়ে পেট ভরায়।
আমি বললাম, “কিন্তু বুধুদাদু, মানুষ মারা, ডাকাতি করা এসব তো অন্যায় কাজ। তুমি ওসব করতে যে, খারাপ লাগত না?”
কেমন ঝিম মেরে আমার কথা শুনল বুধুদাদু। তারপর ফিস্ ফিস্ করে যেন নিজেকেই বলল, “খারাপ কাজ মানলাম। তার ফল ভোগও করছি। এই জঙ্গলে কত বচ্ছর গেল গাছে গাছে, কোটরে কোটরে। হুঁ বলতে চিতার তাড়া, সাপের ছোবল। বর্ষার জলে মাথায় ছাত নেই, শীতে গায় ঢাকা নেই – ফল ভোগ হয়নি? আর ওদের কথা কে বলবে নাতি? যারা আমার ঘরে আগুন দিল ওদের গোলামি করতে চাইনি বলে। আমার লাঙল হাল গরু কেড়ে নিলে মিথ্যে দাদনের টাকা শুধবার কথা বলে। আমার ছেলেকে ধরে ফাঁসিতে লটকাল মিথ্যে খুনের দায়ে – ওরা কী ফল ভুগল নাতি? ওদের তো এখন বাড়বাড়ন্ত! ওরাই কি ভগবানের নিজের লোক, আমরা কেবল ভেসে এসেছি? তা থাকগে নাতিরা, চল তোদের দিঘি দেখিয়ে আনি।”
খানিক হাঁটবার পর হাত ধরতে হল বুধুদাদুর। যত এগোই বন আরও ঘন আরও আঁধার হয়ে আসে। হামু মাঝে মাঝে রাগ রাগ চোখে আমার দিকে দেখছে। দিঘির পশ্চিমের উঁচু পাড়ে বড়োসড়ো একটা কালো পাথর, মাটিতে আধডোবা, মাথায় ছাতিমের ছাতা, সেখানে জুত করে বসে বুধুদাদু বললে, “দেখ নাতিরা, এ তল্লাটে এতবড়ো দিঘি আর নেই। দিল্লির বাদশা বর্ধমানের জায়গিরদার শের আফগানকে হুকুম দিয়ে এই দিঘি এক রাত্তিরের মধ্যে কাটান। কত জমজমা তখন এখানে। আশপাশের দুশোজন জমিদার তাঁদের লোক লশ্কর পাঠিয়েছিলেন দিঘি কাটার কাজে। এছাড়া দু”হাজার বাদশাহি সৈন্যও এসেছিল কাজে। সে এক এলাহি ব্যাপার। সন্ধে থেকে রাতভর নাগাড়ে মাটি কাটবার পর চল্লিশহাত গভীরে কোদালের মুখে ঠেকল এক পাথরে বাঁধানো কুয়োর মুখ। সেই কুয়োর দশ হাত গভীরে এক কালো পাথরের শিবলিঙ্গ। স্থানীয় মজুরের দল বললে দেবতার থান, মাটি কাটা চলবে না। বাদশার ফরমান হাতে শের আফগান নিজে দাঁড়িয়েছিলেন। হুকুম দিলেন, কাজ বন্ধ হবে না, হাত থামলে পিঠে পড়বে কোড়া। মজুররা বললে – রইল কোদাল। চন্ডির দেউলের পুজারি ছুটে এল বাধা দিতে, তার পিঠেও পড়ল কোড়া। তারপর দিল্লির বাদশার দর্প চূর্ণ করে শিবলিঙ্গ থেকে বাণ ডাকল। প্রলয়ের মত হাজার বছরের জমে থাকা কালো বাসুকির মত জল ভাসিয়ে দিল বাদশার দু’হাজার সেনাকে। শের আফগান মাথা নুইয়ে ভোর রাত্তিরের আঁধারে বর্ধমানে পালালেন। তারপর থেকে ফি বছর শিবচতুর্দশীতে দিঘির ধারে হিঁদুর ঠাকুরের কাছে পুজো পাঠিয়ে দিতেন তিনি।
“যে পাথরে বসে আছি তার নিচেই পাথরে বাঁধানো ঘাট। ঘাটের পাথর ফাটিয়ে এক মহাবট অনেক উঁচুতে ডালপালা ঠেলে চারদিকে ঝুরি নামিয়ে যেন ধ্যান করছে। বটের ডালপালার নিচে জমে থাকা আঁধার চেয়ে থাকলে মন ঠান্ডা হয়ে আসে।”
অবাক হয়ে ভাবছিলাম কী সুন্দর করে বলে লোকটা, যেন চোখের সামনেই দেখছি সব। একটা খটকা লাগল, বললাম, “তুমি কী করে জানলে এত সব গল্প?”
একটু বেজার হল লোকটা, “ওই তো তোদের দোষ নাতি। চোখে দেখা ব্যাপারটা গল্প হল? মাটি খোঁড়াদের সর্দার ছিলুম আমি, জানিস! আমিই তো বলেছিলুম দিঘি খোঁড়া বন্ধ কত্তে শিবলিঙ্গ পাবার পর। এই তো পিঠে চাবুকের দাগ দেখেছিস?”
“সে তো অনেক বছর আগেকার কথা। তুমি কি এত বুড়ো নাকি!”
“বেশ তো গুপ্তিপাড়ার কাওকে জিজ্ঞেস করিস, শুনতে পাবি।”
আমি কড় গুনে হিসেব করছি দিল্লির বাদশার আমল কত দিন আগের। বুধুদাদু হঠাৎ তিড়বিড়িয়ে উঠে বললে, “তুই কোথায় থাকিস বললি?”
আমি হিসেব গুলিয়ে বললুম, “কলকাতার কালীঘাটে।”
“কল-কা-তা, সে আবার কোথারে!”
“কলকাতা, কালীঘাট শোননি! তুমি কী গো? এখান থেকে গঙ্গায় সোজা ত্রিবেণী বাঁশবেড়ে হয়ে চুঁচড়ো চন্দননগর হয়ে আর একটু গেলেই তো কলকাতা, কালীঘাট – জাননা? কী আশ্চর্য। মা কালীর মন্দির যে।”
বুধুদাদু এবার লাফিয়ে উঠল – “ও হো। কালীক্ষেত। তুই বললি কালীঘাট, কী করে বুঝব। তা কলকাতার কই, সুতোনুটির দিকে?”
ইতিহাস বইতে সুতোনুটি গোবিন্দপুর পেয়েছি, বললুম, “হ্যাঁ সুতোনুটি, তুমি কী করে জানলে দাদু?”
“হ্যাঁ, ওখানে বলে আমার বন্ধু বাড়ি করেছে। মস্ত বড় জাহাজ তার। কী তার লোক-লস্কর-কামান-বন্দুক; পাক্কা সাহেব। সোঁদরবনে ডাকাতি করত এককালে।”
হামুর গা টিপুনিতে পারা গেল না। এমনিতে ঘুড়ি ওড়াতে বেরুলে বাড়ি ফেরার নাম করে না এখন একেবারে সুপুত্তুর। কোথায় একটু গল্প টল্প শুনব বুধুদাদুর কাছে, যদিও মনে হচ্ছে বেশির ভাগটাই ভুল। তবু ভালো লাগে তো। অবশ্য বেলাও গড়িয়েছে বেশ। উঠে পড়লাম। পেটে কল্ কল্ করছে ডাবের জল। রোদটা বেশ গা সওয়া লাগছে।
বুধুদাদুও উঠে পড়ল, “হ্যাঁ চ বাবা চ তোদের এগিয়ে দি, বেলা গেল। আসিস আবার। কেউ তো আসে না। ভয় পায় আমাকে। আসিস নাতিরা। আরও কত দেখবার আছে এই বনে, দেখাব।”
তেঁতুল গাছটার গোড়ায় দাঁড়িয়ে যতক্ষণ দেখা যায় আমাদের দিকে চেয়ে রইল বুড়ো। বেলা কত কোনো খেয়াল ছিল না। মসজিদের কাছে আসতেই ঝপ্ করে সাঁঝের আঁধার নামতে লাগলেন। আমরা অবাক। পুরো দিন কেটে গেল টের পেলাম না। ঝোপঝাড়ের গায়ে গায়ে রাতের আঁধার জমে গেল বাড়ি ফিরতে ফিরতেই। বাড়িতে হই হই কান্ড! সারাদিন সবাই মিলে খুঁজেছে আমাদের, এখন মামারা লাঠি লন্ঠন নিয়ে আবার খুঁজতে বার হচ্ছে এমন সময় বাড়ি পৌঁছুলাম।
তারপরের কথা শুনলে চোখে জল আসবে তোমাদের! আমাদের কাছে সব শুনে গুপ্তিপাড়ার ডাক্তারদাদু শুধু চোখ কপালে তুলে বললেন, “বুধু পাড়ুই! এ তল্লাটের সব চাইতে নামকরা ঠ্যাঙাড়ে ছিল তো, ওকে নিয়ে কত গপ্প আছে। আমাদের ছোটকালে শুনেছি। নবাবের ফৌজের হাতে মরেছিল বুধু এই কালনাতেই। কিন্তু সে তো সাড়ে তিনশো বচ্ছর আগেকার কথা!”
ছবিঃ শিবশংকর ভট্টাচার্য