অনুবাদ গল্প-বোকা রাজা-সুকন্যা দত্ত-বসন্ত ২০২২

golpobokaraja

একদা এক দেশে এক রাজা বাস করতেন। তিনি ভীষণ বোকা ছিলেন। তবে তাঁর মন্ত্রী ছিলেন  ভীষণ চালাক। একবার গরমকালের এক রাতে রাজার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। বিছানায় শুয়ে শুধু এ-পাশ ও-পাশ করছেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, এখন তো গভীর রাত। নিশ্চয়ই ঘড়িতে  একটা বাজে। তখনই রাজপ্রসাদের গম্বুজের বড়ো ঘড়ি থেকে আওয়াজ এল, ঢং। তিনি মনে মনে বললেন, ‘ওই তো একটা ঘণ্টা বাজল। তার মানে আমি ঠিকই ভেবেছি।’

এক ঘণ্টা পর আবার ঘড়িতে বেজে উঠল, ঢং ঢং। তিনি বুঝতে পারলেন, এখন সময় রাত দুটো।

এইভাবে যখন শেষপর্যন্ত সকাল ছ’টার ঘণ্টা বেজে উঠল, তখন তিনি বিছানা থেকে উঠে পড়লেন। মনে মনে বললেন, ‘নাহ্‌, সকাল হল। এবার উঠে পড়ি। কিন্তু শরীরটা বিশেষ ভালো লাগছে না।’

বিছানা ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে পোশাক পরিবর্তন করে ভাবলেন, সারারাত জেগে শরীরটা ক্লান্ত লাগছে। যাই, আশেপাশে ঘুরে হাওয়া খেয়ে আসি। এরপর একজন প্রজাকে হাঁক দিয়ে বললেন, “যাও, মন্ত্রীকে প্রস্তুত হতে বলো। আমরা দুজন একসঙ্গে ঘোড়সওয়ারে যাব।”

প্রজা প্রণাম ঠুকে মন্ত্রীকে জানাতে চলে গেলেন।

এরপর রাজা আর মন্ত্রী ঘোড়ায় চড়ে রাজপ্রাসাদের বাইরে ঘুরতে বেরিয়ে গেলেন।

অনেকক্ষণ ঘোরাঘুরির পর মন্ত্রী রাজাকে জিজ্ঞেস করলেন, “রাজামশাই, এখন আপনার শরীর কেমন লাগছে?”

রাজা হাসিমুখে উত্তর দিলেন, “বেশ ভালো।”

সেই সময় রাজা তাকিয়ে দেখলেন, তাঁদের পথের পাশেই একটা বড়ো নদী। তিনি মন্ত্রীকে বললেন, “দাঁড়াও। আমার বড়ো তেষ্টা পেয়েছে মন্ত্রী। চলো ওই নদীর জল পান করে পিপাসা মেটাই।”

দুজনে নদীর কাছে আসতেই রাজার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তিনি অবাক হয়ে বললেন, “আরে, নদীটার জল কী স্বচ্ছ! এই নদী কোথা থেকে বয়ে এসেছে?”

মন্ত্রী জানালেন, “রাজামশাই, আমাদের পূর্বদিকের রাজ্য থেকে এই নদী বয়ে এসেছে।”

রাজা শুনেই চিৎকার করে বললেন, “কী! আমাদের রাজ্যের নদী ওদের কাছ থেকে এসেছে? সর্বনাশ! এক্ষুনি এর বিহিত হওয়া দরকার।”

মন্ত্রী বললেন, “কিন্তু রাজামশাই…”

কথা শেষ না হতেই রাজা বললেন, “কোনও কিন্তু নয়। আমি হুকুম দিলাম, এই নদীর ওপর একটা বাঁধ নির্মাণ করো। দেখবে কিছুতেই নদীর জল আমাদের রাজ্যের বাইরে যেন না যায়। তাহলে সকলের গর্দান যাবে।”

রাজার কথার অবাধ্য হওয়ার ক্ষমতা কারও নেই। অবশেষে নদীর ওপর এক বিরাট বাঁধ নির্মাণ করা হল। বাঁধ দেওয়ার কারণে নদীর সব জল আটকে গেল। দেখতে দেখতে নদীর জল ফুলে-ফেঁপে  রাস্তাঘাট ডোবাতে শুরু করল। রাজ্যে শুরু হল বন্যা।

মন্ত্রী রাজাকে বললেন, “রাজামশাই, এখনই এ অবস্থা। সামনে বর্ষাকাল আসছে। তখন তো রাজ্যের অবস্থা আরও শোচনীয় হবে।”

রাজা বললেন, “তুমি চিন্তা কোরো না মন্ত্রী। আমরা প্রতিবেশী রাজ্য থেকে নদীকে ছিনিয়ে নিতে পেরেছি। আনন্দ করো।”

মন্ত্রী মনে মনে রাজার মূর্খতার জন্য আফসোস করতে লাগলেন। তিনি জানতেন, রাজার এই ব্যবস্থার কারণে প্রতিবেশী রাজ্যে জলের আকাল শুরু হয়েছে। ওরা যে-কোনো সময় এই রাজ্য আক্রমণ করতে পারে। কিন্তু বোকা রাজাকে বোঝায় কে? এদিকে বাঁধটা না ভাঙলে সমস্ত রাজ্য জলে ভেসে যাবে। এখন উপায়?

হঠাৎ মন্ত্রীর মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে গেল।

সন্ধ্যায় তিনি রাজপ্রাসাদের ঘড়ি গম্বুজে গেলেন। ওখান থেকে সমস্ত রাজ্যে ঘড়ির ঘণ্টা শোনা যায়। সেখানে গিয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে ডেকে বললেন, “শোনো, রাত বারোটার পর প্রতি ঘণ্টার বদলে আধঘণ্টা পর পর সময়ের ঘণ্টা বাজাবে।”

কর্মচারী মন্ত্রীর আদেশ পালন করে সেইভাবেই ঘণ্টা বাজাতে লাগল। এর ফলে রাত তিনটের সময় ছ’টা ঘণ্টা বেজে উঠল, ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং ঢং।

এই ঘটনার কথা মন্ত্রী আর সেই কর্মচারী বাদে বাকি কেউ জানত না। রাজ্যের সকলে তখন গভীর ঘুমে ব্যস্ত ছিল। ঘণ্টা শুনেই প্রজারা সকলে ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়ল। একজন প্রজা অপরজনকে বলল, “শুনলে ভাই? ছ’টা ঘণ্টা বাজল। তার মানে এখন ছ’টা বাজে। কিন্তু চারপাশের অন্ধকার দেখে তো তা মনে হচ্ছে না।”

অপরজন বলল, “আমিও তো সেটাই ভাবছি। অন্যান্য দিন এই সময় আকাশে সূর্যের আলো ফুটে ওঠে। আজ সূর্যের কী হল বলো তো?”

এসব কাণ্ড দেখে ভয়ে প্রজারা এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল আর চিৎকার করে বলতে লাগল, “ওঠো, সকলে উঠে পড়ো। দেখো সূর্যের কী যেন হয়েছে!”

রাজপ্রাসাদের চারদিকে হইচই পড়ে গেল। সেনাপতি দৌড়ে এসে রাজাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে দিয়ে বললেন, “রাজামশাই, তাড়াতাড়ি উঠে পড়ুন। একটা আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেছে।”

“কী হয়েছে সেনাপতি?”

সেনাপতি বললেন, “এখন সকাল ছ’টা বাজে, কিন্তু দেখুন চারদিকটা কেমন অন্ধকার। সূর্য এখনও আকাশে ওঠেনি।”

রাজা বিস্মিত হয়ে বললেন, “কী বলছ? এখনও সূর্য ওঠেনি?”

“হ্যাঁ রাজামশাই, আপনি নিজের চোখেই দেখুন।”

রাজা জানালার কাছে এসে চারদিক তাকিয়ে দেখলেন। ঠিক তো, সেনাপতির কথায় এতটুকু মিথ্যে নেই। কিন্তু এও কি সম্ভব!

রাজা বললেন, “কে আছ? মন্ত্রীকে ডেকে আনো।”

মন্ত্রী আসতেই রাজা চিৎকার করে বললেন, “এসব কী হচ্ছে? সকাল হয়ে গেছে অথচ সূর্যের কোনও দেখা নেই!”

মন্ত্রী একটু চুপ থেকে বললেন, “রাজামশাই, আমার মনে হয় এর পিছনে একটাই কারণ হতে পারে।”

“কী কারণ, মন্ত্রী?”

“রাজামশাই, কেউ নিশ্চয়ই সূর্যকে চুরি করে নিয়ে গেছে যাতে আমাদের রাজ্য একটুও সূর্যের আলো না পায়।”

রাজা বললেন, “সূর্য চুরি করেছে? হ্যাঁ, ঠিক বলেছ, হতে পারে। তোমার কী ধারণা? কারা এমন কাজ করতে পারে?”

মন্ত্রী বললেন, “রাজামশাই, আমার মনে হয় আমাদের পাশের রাজ্য শয়তানি করে এ-কাজ করেছে।”

রাজা আঁতকে উঠে বললেন, “পাশের রাজ্য! কিন্তু তারা এই কাজ কেন করবে?”

মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “রাজামশাই, আমি শুনেছি নদীর জল আটকে রাখায় আমাদের পূর্বদিকের রাজ্য ভীষণ রেগে আছে। আপনি তো জানেন, সূর্য প্রতিদিন পূর্বদিক থেকে উঠে, তারপর আমাদের রাজ্যে আসে। আমাদের দ্রুত একটা কিছু করতে হবে, নয়তো সারাজীবন আমাদের রাজ্য অন্ধকারে ডুবে থাকবে।”

কথাটা শুনে রাজা চিন্তায় পড়ে গেলেন। তারপর রাজা বললেন, “আমরা যদি আবার আগের মতো নদীর জল ছেড়ে দিই তাহলে কি পূর্বদিকের রাজ্য সূর্যকে আকাশে ছেড়ে দেবে?”

মন্ত্রী হেসে বললেন, “চমৎকার পরিকল্পনা রাজামশাই।”

রাজা গোঁফে হাত বোলাতে বোলাতে বললেন, “হাঃ হাঃ হাঃ। আমার মা সবসময় আমার বুদ্ধির প্রশংসা করতেন। যাও মন্ত্রী, নদীর বাঁধ ভেঙে দাও।”

মন্ত্রী করজোড়ে বললেন, “ধন্য রাজামশাই, আপনি সত্যিই মহান।” মন্ত্রী সেপাইদের ডেকে বললেন, “যাও, তোমরা এক্ষুনি নদীর বাঁধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দাও।”

সেপাইরা সকলে মিলে বাঁধটা ভেঙে ফেলল। নদীর জল বেগে প্রতিবেশী রাজ্যের দিকে ধেয়ে চলল।

রাজা আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন, এবার নিশ্চয়ই সূর্য উঠবে।

ধীরে ধীরে পূর্বের আকাশ রাঙা হয়ে সূর্য উঁকি দিল। রাজা আনন্দে আত্মহারা হয়ে বললেন, “ওই দেখো, সূর্য! আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য সূর্যকে মুক্তি দিয়েছে।”

মন্ত্রী কথাটা শুনে মুচকি হেসে বললেন, “হ্যাঁ রাজামশাই, আপনার পরিকল্পনার জবাব নেই। আপনি রাজ্যকে বিপদমুক্ত করেছেন। আপনি মহান।”

রাজা গর্বিত হয়ে উত্তর দিলেন, “ওহ্ মন্ত্রী, এটা তো আমার দায়িত্ব।”

এরপর থেকে সকলে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল। এসব যে মন্ত্রীর পরিকল্পনা, রাজা কখনও সে-কথা জানতে পারলেন না।

(তামিল লোকগল্প অবলম্বনে)

ছবি অংশুমান

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s