গল্প-মিশার ক্রিসমাস-তিথিপর্ণা সেনগুপ্ত-বর্ষা ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- মিশার ক্রিসমাস

golposcorpionkick

“তিতলিদিদি, কে প্রথম হ্যাট-ট্রিক করেছিল বলো তো?” খুব রহস্যময় গলায় জিজ্ঞেস করল দীপ্ত।

টিভিতে আই.পি.এল ফাইনাল চলছে—মুম্বই ইন্ডিয়ানস আর কে.কে.আর। আর দুই ওভার বাদেই ইনিংস ব্রেক, এমন সময় দীপ্তর এরকম উদ্ভট প্রশ্ন।

“কোন খেলায় হ্যাট-ট্রিক রে? ক্রিকেট, না ফুটবল? আর কোথায় প্রথম? ইন্ডিয়া, না পুরো ওয়ার্ল্ড?”

তিতলির ক্লাস সেভেন আর দীপ্তর সবে ক্লাস টু। কিন্তু ওর সঙ্গে গল্প করতে খুব ভালোবাসে তিতলি।

“আরে ক্রিকেট। আমাদের বড়ো মাঠে। ফার্স্ট হ্যাট-ট্রিক হল…” একটু থেমে দীপ্ত বলল, “আমার। আগের রবিবার করেছি। প্রথমটা বোল্ড, পরেরটা এল.বি.ডবলু, আর তার পরেরটা কট।” দীপ্তর চোখেমুখে গর্ব।

“আরেব্বাস, দারুণ ব্যাপার করেছিস তো দীপ্ত! তুই তো একেবারে স্টার প্লেয়ার!” বাবাও দীপ্তকে খুব বাহবা দিল।

একসঙ্গে খেলা দেখতে আজ দীপ্তদের বাড়িতে এসেছে তিতলিরা। তবে খেলা দেখছে মাত্র ওরা চারজন—দীপ্ত, দীপকাকু, তিতলি আর বাবা। মায়েদের, বিশেষ করে সুমিমাসির আই.পি.এল ভালো লাগে না, ওরা অন্য ঘরে গল্প করছে।

ইনিংস ব্রেক শুরু হতেই খাবারের জন্য অস্থির হয়ে পড়ল তিতলিরা। বেশ অনেকক্ষণ আগেই তৈরি হয়ে গেছে ওদের রাতের খাবার—মাটন বিরিয়ানি। বাবা আর দীপকাকু দুজনে মিলে রান্না করেছে, খেলা দেখতে দেখতে।

মাটন বিরিয়ানি খেতে খেতে গল্প জমে উঠল। মায়েরাও হাজির।

“শোন, তোদের একটা গল্প বলি। যদিও এটা ঠিক গল্প নয়, সত্যি ঘটনা।” দীপকাকু বলল।

দীপকাকু যেমন ভালো সেতার বাজায়, তেমন ভালো গল্প বলে। তিতলির তো দারুণ লাগে শুনতে।

“এই গল্পেও মাটন আছে; তবে মাটন বিরিয়ানি নয়, কচি পাঁঠার ঝোল।” বেশ নাটকীয়ভাবে গল্প শুরু করল দীপকাকু। “আর ফাইনাল খেলাও ছিল; তবে আই.পি.এল নয়, এক্কেবারে ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনাল—ইটালিয়া নাইনটি।”

“ও, সেই খেলাটা তো আমার এখনও মনে আছে। জার্মানি-আর্জেন্টিনা।” মা বলে উঠল। “খেলার শেষে মারাদোনার কান্না। খুব মনখারাপ হয়ে গেছিল।”

“রাইট। তবে জার্মানি-আর্জেন্টিনা নয়, খেলাটা হয়েছিল পশ্চিম জার্মানি আর আর্জেন্টিনার মধ্যে। বার্লিন ওয়াল তার আগের বছরই ভেঙে ফেলা হয়েছিল, কিন্তু দুই জার্মানি তখনও আলাদা। যাই হোক, আমরা ওই খেলাটা দেখেছিলাম প্রায় তিরিশ জন মিলে, আমাদের ক্লাব ঘরে। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি। আমাদের ক্লাবের নাম ছিল—বেহালা রাইসিং স্টারস।”

“রাইসিং স্টারস? বাবা, তোমরা স-বা-ই স্টার প্লেয়ার ছিলে?” দীপ্তর কাছে ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত লাগছে।

“স্টার নয়, রাইসিং স্টার। আমাদের ক্লাবের বয়েস তখন সাড়ে তিন। আর আমাদের ফোকাস ছিল শুধুমাত্র ফুটবল। সারাবছর ‘লা লিগা দি বেহালা’র জন্য আমরা প্র্যাকটিস করতাম। প্রথম বছর প্রত্যেকটা খেলায় অ্যাভারেজে ছ’টা করে গোল খেয়েছিলাম। দ্বিতীয় বছর অ্যাভারেজটা ইম্প্রুভ করে হল চার, আর তৃতীয় বছর তো ম্যান্টন স্পোর্টিং ক্লাবের সঙ্গে খেলায় ড্র করলাম। লিগ স্টেজ পার হতে না পারলেও ক্লাবের বড়োরা এককথায় স্বীকার করল যে আমরা ভালো খেলছি আর নিঃসন্দেহে রাইজিং।”

সবাই জোরে হেসে উঠল।

“দীপকাকু, তুমি কোনও পজিশনে খেলতে?” তিতলি জিজ্ঞেস করল।

“গোলকিপার। আর সেটা নিয়েই তো গল্প।” নিজের প্লেটে বেশ খানিকটা বিরিয়ানি তুলে নিতে নিতে বলল দীপকাকু।—“তা সে-বছর ওয়ার্ল্ড কাপে বেশ বিপাকে পড়েছিল আমাদের ক্লাব। আসলে সেই এইটি সিক্সের ওয়ার্ল্ড কাপ থেকে আমাদের কাছে মারাদোনা ছিল একমাত্র ঈশ্বর। দীপ্ত, তোর কাছে যেমন বিরাট কোহলি। তাই নাইনটির ওয়ার্ল্ড কাপের আগে থেকেই চাঁদা তুলে আমরা পুরো পাড়াটা আর্জেন্টিনার নীল-সাদা পতাকা আর মারাদোনার ছবি দিয়ে সাজিয়ে ফেলেছিলাম। কিন্তু টুর্নামেন্ট শুরু হতে দেখা গেল—হায়, কোথায় সেই এইটি সিক্সের আর্জেন্টিনা, কোথায় আমাদের ফুটবলের ঈশ্বর! সেই পুরোনো ম্যাজিক যে পুরো হাওয়া! আমাদে ভয় হল যে টুর্নামেন্টের মাঝপথেই না পতাকা-ছবি সব নামিয়ে ফেলতে হয়; চারদিকে যে সব নতুন তারকাদের নিয়ে হইচই শুরু হয়ে গেছে। অভি, তোর মনে আছে?” বাবাকে জিজ্ঞেস করল দীপকাকু।

“হ্যাঁ হ্যাঁ, খুব ভালোভাবেই মনে আছে।” বাবা জানাল।—“ইতালির স্কিলাচি, ক্যামেরুনের রজার মিল্লা—এরা সব।”

“ঠিক বলেছিস। আর আমি যেহেতু নিজে গোলকিপার ছিলাম, আমার মনে ধরেছিল কলম্বিয়ার রেনে হিগুয়িতার স্করপিয়ন কিক।”

“স্করপিয়ন কিক? সেটা কী জিনিস?” দীপ্ত তো বটেই, তিতলিও এই প্রথম শুনছে শব্দটা।

“দাঁড়া, তোদের চট করে দেখিয়ে দিই স্করপিয়ন কিক।” গল্প, খাওয়া সব থামিয়ে নিজের ফোনে ইউটিউব খুলে বসল বাবা।

স্ক্রিনে ওদের সামনে ভেসে উঠল কোনও এক ফুটবল ম্যাচের দৃশ্য। একজন লম্বা চুলের গোলকিপার কীরকম অদ্ভুত কায়দায় পায়ের গোড়ালি দিয়ে বলটাকে পেছন দিকে ঠেলে দিল, আর বলটাও ম্যাজিকের মতো লোকটার শরীরের উপর দিয়ে পাক খেয়ে সামনের দিকে চলে গেল!

তিতলি-দীপ্তরা তো একেবারে হাঁ! সোনার কেল্লার সেই ল্যাজ ঘোরানো কাঁকড়াবিছেটার কথা মনে পড়ে গেল তিতলির—হিগুয়িতার কিক তো কিক নয়, যেন একটা কাঁকড়াবিছের ছোবল!

“দেখার জিনিস! কী বলিস? চল, আবার আমাদের গল্পে ফেরা যাক।” দীপকাকু বলল।—“তা খারাপ গেলেও, পুরো কলকাতা শহরের প্রার্থনা আর ওদের গোলকিপার গাইকোচিয়ার জোরে আর্জেন্টিনা কোনোমতে ফাইনালে পৌঁছল। আবার সেই এইটি সিক্সের ওয়ার্ল্ড কাপ ফাইনালের রিপিট—পশ্চিম জার্মানি বনাম আর্জেন্টিনা। আমরাও স্বস্তির নিশ্বাস ফেললাম—পতাকা-ছবি আর নামাতে হবে না। ঠিক হল যে পুরো ক্লাব একসঙ্গে জার্মানি-আর্জেন্টিনা ফাইনাল দেখব। সঙ্গে মাংস-ভাত।

“ফাইনালের দিন সকালবেলা ক্লাবের সিনিয়রদের সঙ্গে বাজারে গেলাম মাংস-আলু-পেঁয়াজ এইসব কিনতে। বাজারেও সেদিন একদম আলাদা মেজাজ। সবাই আর্জেন্টিনার ফ্যান, সবাই চায় আর্জেন্টিনা জিতুক। মুদির দোকানের বাপিদা বলল, ‘মারাদোনার দিব্যি, আর্জেন্টিনা জিতলে তোদের সবাইকে কাল ফিস্ট খাওয়াব।’

“সন্ধে হতে না হতেই আমরা সবাই ক্লাবে হাজির। আমাদের ক্লাবে একটাই মাঝারি সাইজের ঘর ছিল; দেখলাম যে মাঝখানের ক্যারম বোর্ডের টেবিলটা সরিয়ে শতরঞ্জি পাতা হয়েছে। টিভিতে চলছে উইম্বলডন মেনস ফাইনাল—এডবার্গ আর বরিস বেকার। আর আমাদের ক্লাব ঘরের ঠিক পেছনে যে খোলা জায়গাটা, আমরা যেটাকে বলতাম ছোটো মাঠ, সেখানে এককোণে একটা বিশাল কড়াইতে চলছে মাংস রান্না। তার সুগন্ধে চারদিক ম ম করছে। রান্নার নেতৃত্বে বলাইদা।

“এই প্রসঙ্গে বলাইদার পরিচয়টা তোদের একটু দিয়ে রাখি। বলাইদা ছিল আমাদের ক্লাবের সবচাইতে সিনিয়র সদস্য আর আমাদের কোচ কাম ম্যানেজার। প্রায় নব্বই কিলো ওজন, কিন্তু ওই বিশাল শরীরে অফুরন্ত এনার্জি আর স্ট্যামিনা। অদম্য মনের জোর—টানা পাঁচটা ম্যাচ হারার পরও আমাদের প্র্যাকটিস করাতে প্রতিদিন ভোর পাঁচটায় মাঠে পৌঁছে যায়। আমরা পৌঁছার আগেই।

“রান্নার ওখানে গিয়ে দেখালাম যে ইয়া বড়ো বড়ো আলু লাল করে ভেজে কড়াই থেকে তুলছে বলাইদা। বলাইদার পরনে বারমুডা আর স্যান্ডো গেঞ্জি—ঘামে ভিজে সেই গেঞ্জি গায়ের সঙ্গে লেপটে গেছে। একটুক্ষণের মধ্যেই বুঝে গেলাম যে বলাইদার রান্না অনেকটা মারাদোনার ড্রিবলিংয়ের মতো—ওয়ার্ক অফ আর্ট। বর্ণে-গন্ধে-ছন্দে-গীতিতে হৃদয়ে দোলা দেওয়া আর্ট।

“মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম আমরা। আমরা মানে সপ্তর্ষি, অনির্বাণ, মিঠুন আর আমি। আমাদের মধ্যে সপ্তর্ষি একটু পেটুক প্রকৃতির। খানিক বাদে আর থাকতে না পেরে ও বলেই ফেলল, ‘বলাইদা, একটু টেস্ট করব না আমরা রান্না—নুন-মিষ্টি সব ঠিক আছে কি না?’

“ ‘আমার রান্না কখনও আগে থেকে টেস্ট করবার দরকার হয় না।’ গম্ভীরভাবে উত্তর দিল বলাইদা। অতএব ঘ্রাণেন অর্ধ ভোজনং সেরে উইম্বলডন দেখতে বসলাম আমরা। ফাইনাল যথাসময়ে শেষ হল—জার্মানির বরিস বেকারকে হারিয়ে স্টেফান এডবার্গ চ্যাম্পিয়ন। আমাদের ফুর্তি আর ধরে না। টেনিসে হেরেছে, ফুটবলেও নির্ঘাত হারবে জার্মানি।

“ ‘ভুলে যাস না, গতকাল মেয়েদের ফাইনালে কিন্তু জার্মানিই জিতেছে। স্টেফি গ্রাফ।’ বলাইদার সাবধান বাণী। ততক্ষণে রান্না শেষ বলাইদার।

“ ‘আরে দূর, সে তো গতকাল। আজ জার্মানি সবেতে হারবে। মিলিয়ে নিও।’ মিঠুনের কনফিডেন্স আমাদের ফুর্তি দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিল—হইহই করে ছোটো মাঠে নেমে পড়লাম বল নিয়ে। ফুটবল নয়, ক্যাম্বিসের একটা ছোটো বল।

“আমি প্রায় এক সপ্তাহ ধরে হিগুয়িতার স্করপিয়ন কিক প্র্যাকটিস করছিলাম বাড়িতে। মোটামুটি রপ্ত হয়ে গেছিল কিকটা। ভাবলাম সবাইকে চমকে দিই। সপ্তর্ষির এগিয়ে দেওয়া বলটাকে হিগুয়িতার কায়দায় ডান গোড়ালি দিয়ে কিক করলাম। আর—আর তাতেই বিপত্তিটা ঘটল।

“স্করপিয়ন কিকের জোরে পায়ের চটিটাই গেল খুলে। টের পেলাম যে এরোপ্লেনের মতো সাঁই সাঁই করে উড়ে যাচ্ছে আমার ডান পায়ের চটি। কিন্তু কোন পথে উড়ে যাচ্ছে সেটা বোঝার জন্য আমি ধাঁ করে পিছন ঘুরতেই চোখের সামনে হাওয়াই চটিটা হাওয়া হয়ে গেল। ঠিক যেন সুকুমার রায়ের ‘কোথায় বা কি, ভূতের ফাঁকি—মিলিয়ে গেল চট করে।’

“তন্নতন্ন করে আমার হারিয়ে যাওয়া চটি খুঁজতে লাগলাম আমরা চারজন। আলোতে, জমাট বাঁধা অন্ধকারে, বাইরে-ভেতরে—সব জায়গায়। আশ্চর্য ব্যাপার, কোথাও নেই আমার চটি!

“হঠাৎ সপ্তর্ষি হাঁপাতে হাঁপাতে এসে বলল, ‘শিগগির শোন, কেলেংকারি হয়েছে! তোর চটি মাংসের কড়াইতে পড়ে গেছে।’

“ ‘বলিস কী!’ আমার তো গলা শুকিয়ে কাঠ।

“ ‘হ্যাঁ রে, সত্যি বলছি। তোর চটি খুঁজতে ওই রান্নার দিকটায় গেছলাম। দেখলাম মাংসের কড়াইটা অর্ধেক ঢাকা দেওয়া। খুব লোভ হল, ভাবলাম একটা ছোট্ট মাংসের টুকরো তুলে খেয়েই নিই, কেউ বুঝবে না। আর কড়াইতে উঁকি মারা মাত্র তোর চটিটা দেখতে পেলাম—মাংসের ঝোলের মধ্যে প্রায় ডুবে গেছে, শুধু নীল স্ট্রিপ দুটো বেরিয়ে আছে। নিজের চোখে দেখবি, চল।’

“যাব কী, আমি তো ভয়ে কাঁপতে শুরু করে দিলাম। বড়োরা উইম্বলডনের প্রাইজ ডিস্ট্রিবিউশন দেখতে ব্যস্ত। যখন জানবে তখন যে কী হবে!

“ ‘ভয় পাস না, একটা কিছু ব্যবস্থা হয়ে যাবে। বি পজিটিভ।’ মিঠুন নিজে সবসময় পজিটিভ, সহজে ঘাবড়ায় না।

“মিঠুন আর সপ্তর্ষি, বলাইদা আর বাকি সিনিয়রদের জানাতে গেল ব্যাপারটা। অনির্বাণ রয়ে গেল আমাকে সাহস জোগাতে। দূর থেকে ভয়ে ভয়ে ওদের রি-অ্যাকশন বোঝার চেষ্টা করতে লাগলাম আমরা—তাড়িয়ে দেবে না তো ক্লাব থেকে?

“দেখলাম যে জোর মিটিং করছে ওরা। ওরা মানে সিনিয়ররা—বলাইদা, বিশুদা, মনাদা এরা। আমাকে কেউ ডাকল না। তারপরে দেখলাম বলাইদা গটগট করে কড়াইয়ের দিকে হাঁটা লাগিয়েছে। পিছন পিছন বাকিরা। কড়াইয়ের কাছে পৌঁছে খুব স্মার্টলি চটিটাকে বের করে, দূরে ছুড়ে ফেলে দিয়ে কড়াইটাকে আবার স্টোভে চাপিয়ে দিল বলাইদা। ততক্ষণে খানিকটা সাহস জোগাড় করে নিয়েছি আমি। ঠিক করলাম যে ক্লাব থেকে যা কঠোর শাস্তি আমায় দেবে তা মাথা পেতে গ্রহণ করব। কাঁদো কাঁদো মুখে সরি বলতে এগিয়ে গেলাম আমি। কিন্তু সরি বলতে গিয়ে দেখি যে কিছুই তো বলতে পারছি না, গলা যে বুজে এসেছে।

“আমাকে উদ্ধার করল বলাইদাই। বলল, ‘আরে ভালো করে ফুটিয়ে নিলেই তো হল মাংসটা। এই নিয়ে আবার এত ঘাবড়ে যাবার কী হল? তুই বরং স্করপিয়ন কিকটা আরও ভালো করে প্র্যাকটিস কর। ওটা তোকে একেবারে মাস্টার করে ফেলতে হবে। নেক্সট ম্যাচে ওটাই হবে আমাদের মোক্ষম অস্ত্র। ঠিক আছে?’

“আনন্দে, কৃতজ্ঞতায় আত্মহারা হয়ে আমি কোনোমতে মাথা নাড়লাম। টের পেলাম যে চশমার কাঁচটা ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। একটু বাদে হইহই করে খেতে বসা হল। হঠাৎ খেয়াল করলাম, সবাই আমাকে হিগুয়িতা বলে ডাকছে। যা লজ্জা করছিল কী বলব! যাই হোক, খেলা শুরু হয়ে যেতে সবাই খেলাতেই মন দিল, আমিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম।

“এই হল আমার গল্প—ফুটবল আর মাংস। এবার বল তোদের কেমন লাগল।” দীপকাকু জিজ্ঞেস করল সবাইকে।

“খুব ভালো।” দ্বিধাহীন কণ্ঠে জানাল দীপ্ত।

“আর বলাইদা আরও ভালো। কীরকম সুন্দর ক্ষমা করে দিয়েছিলেন!” তিতলি বলল।

“ঠিক বলেছিস তুই। বলাইদার মতো স্পোর্টিং লোক খুব কমই হয় পৃথিবীতে। আর এখন বুঝি যে আমাদের থেকে বয়সে অনেকটা বড়ো হলেও আমাদের কীরকম সম্মান দিত বলাইদা। বকত খুবই, কিন্তু আমাদের মতামতও যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে শুনত সবসময়।”

“কিন্তু সবাই যে ওই চটি পড়ে যাওয়া মাংসটা দিব্যি খেয়ে নিল, তা কারও পেটখারাপ হল না?” সুমিমাসি জিজ্ঞেস করল। তিতলির মাথায়ও অনেকক্ষণ ধরেই এই প্রশ্নটা ঘুরপাক খাচ্ছিল।

“আরে ধুর, পেটখারাপ-টারাপ কিছু হয়নি। বা হয়তো হয়েছিল, আর্জেন্টিনা হেরে যাবার দুঃখে আমরা কেউ আর ওসব খেয়াল করিনি।”

“বাবা, তুমি এখনও স্করপিয়ন কিকটা করতে পারো? আমাদের দেখাবে?”

“হ্যাঁ, অবশ্যই!” প্রবল উৎসাহ নিয়ে জানাল দীপকাকু।—“কিন্তু সেটা দেখানোর আগে যে পুরো ঘর খালি করতে হবে। বিশেষ করে এই বিরিয়ানির হাঁড়িটা।” বলেই ওদের সবার প্লেটে অনেকটা করে বিরিয়ানি দিয়ে দিল দীপকাকু।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply