
সৌরনীলের অফিস একটা প্রাচীন বিশাল সরকারি বাড়িতে। সবাই বলে ‘লালবাড়ি’। বাড়িটার এখন সম্পূর্ণ রিনোভেশন চলছে। সবকিছু কালের যাত্রায় আজ জীর্ণ, ভঙ্গুর। তাই ভেঙেচুরে সারানোর সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বাড়িটাকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোরও একটা চেষ্টা চলছে। এ এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। বেশিরভাগ অফিসই অন্য বাড়িতে চলে গেছে; মাত্র কয়েকটা অফিস এখনও কোনোরকমে টিমটিম করে চলছে। তার মধ্যে সৌরনীলদের ডিপার্টমেন্টও আছে। চারদিকে ঠকঠকাঠক ভয়ানক শব্দের মধ্যেই কাজ করে চলেছে গুটিকয়েক মানুষ। অবশ্য সকলেই নতুন ঝাঁ-চকচকে অফিসে শিফট হবার দিন গুনছে। ক্যান্টিন, টি-স্টল সবই প্রায় বন্ধ। বিশাল বাড়িটাকে এখন আর চেনাই দায়—চারদিকে ভাঙা রাবিশ, কড়ি-বরগা-দরজা-জানালা, লোহার গ্রিল, পুরোনো ফার্নিচার, নানারকম জিনিসপত্র, হাবিজাবি সব ভরতি।
সেদিন একটু তাড়াতাড়িই বাড়ির পথে পা বাড়িয়েছিল সৌরনীল। কাল শনিবার, পরশু রবি—পরপর দু-দিন ছুটি। ভেবেছিল সুচেতাকে নিয়ে ঘুরে আসবে বর্ধমানে নিজেদের দেশের বাড়ি থেকে দু-দিনের জন্য। সবে বাড়ি ফিরে জুতোটা খুলে ঘরে ঢুকেছে, অমনি ফোন। ওরই কলিগ তনু।
“কী রে, কী হল আবার?” সৌরনীলের মনে শঙ্কা। আগে বেরিয়ে পড়েছে বলে বস আবার গাল পাড়ছে না তো!
তনুর গলায় তখন উৎকণ্ঠা।—“শোন, একটা ব্যাপার হয়ে গেছে। সকাল থেকে সরখেলবাবুকে দেখেছিলি তুই?”
“না, মানে একবার মনে হচ্ছে দেখেছিলাম। কেন, কী হয়েছে?”
“আরে সেটাই তো! আমিও তো দেখেছি সকালে, টয়লেটে যাবার সময়।”
“হ্যাঁ, তো কী হয়েছেটা কী বলবি তো!” সৌরনীলের গলায় উদ্বেগ।
“আর বলিস না। সরখেলবাবুকে পাওয়া যাচ্ছে না।”
“পাওয়া যাচ্ছে না! মানে?”
“মানে বলছি। তুই একবার এখনই অফিসে ফিরে আয়।”
“কী? আবার একঘণ্টা বাস জার্নি করে অফিস যাব? ইয়ার্কি পেয়েছিস?”
“না রে, কেসটা সিরিয়াস। সবাই খুঁজছে, চলে আয় তাড়াতাড়ি।” বলে ফোনটা কেটে দেয় তনু।
সৌরনীলের মেজাজটা খিঁচড়ে যায়। কাল সকালে বর্ধমান যাবার বাস ধরার আছে। গোছাগুছি সব বাকি। এর মধ্যে আবার কী এক উটকো ঝামেলা হল! কিন্তু তনুর গলায় কিছু একটা ছিল, একটা অশুভ ইঙ্গিত। মনটা কু-ডাক দিল সৌরনীলেরও। কী হল অফিসে, অদ্ভুত কাণ্ড! সরখেলবাবুকে পাওয়া যাচ্ছে না কেন? কোথায় গেলেন অফিস থেকে? এই তো সামনের মাসেই ওঁর রিটায়ারমেন্ট। নিপাট, অমায়িক ভদ্রলোক—সাতে-পাঁচে থাকেন না, পার্টি-পলিটিক্সের ধার ধারেন না, চাঁদাতে না বলেন না, চায়ের পয়সা বাকি রাখেন না, অযথা অফিস কামাই করেন না এমনকি চেয়ারে বসে ঢোলেনও না। শুধু একটাই শখ ভদ্রলোকের, খুব গ্যাজেট ভালোবাসেন। প্রায়ই নতুন কিছু না কিছু জিনিস এনে সবাইকে দেখান। তা সে স্মার্ট ওয়াচই হোক, নতুন ক্রেডিট কার্ড সাইজ মোবাইল বা ম্যাগনেটিক পাজল। সেই সরখেলবাবু বেপাত্তা!
আধঘণ্টাতেই উলটোদিকের বাসে চেপে অফিসে পৌঁছে যায় সৌরনীল। গিয়ে দেখে এলাহি কাণ্ড। অফিসে ভেঙে পড়েছে সমস্ত ডিপার্টমেন্টের লোকজন। বস উৎকণ্ঠিত হয়ে এদিক ওদিকে ছুটে বেড়াচ্ছেন আর ফোন করছেন। সেকশনাল হেড তো থানায় ফোন করেছেন; সবাইকে বলছেন, ‘একটু খুঁজে দেখুন না, ভদ্রলোক কোথায় গেলেন!’ খোঁজা তো যথেষ্ট হয়েছে গত এক-দেড় ঘণ্টায়।
সৌরনীল চলে গেল ওঁর চেয়ারের কাছে। চেয়ার থেকে ঝুলছে ওঁর ব্যাগ, যেমন রোজ ঝোলে। টেবিলের ওপর ওঁর চেনা টিফিন ক্যারিয়ারটাও দিব্যি সাজানো রয়েছে। তার পাশে খোলা রয়েছে ওঁর ফাইলপত্র, এমনকি ফাইলের উপর ওঁর পেনটাও খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, হঠাৎ কোনও কারণে উঠে গিয়েছিলেন। সব যেমনকার তেমন আছে, শুধু মানুষটাই নেই। অবাক কাণ্ড।
সবাই বলাবলি করছিল, সকালে যেমন আসেন তেমনটিই এসেছিলেন—ঠিক দশটায়, ইন-সাইনও করেছেন। গেটে দুজন দারোয়ান সবসময় থাকে। তারাও ওঁকে নেমে যেতে দেখেনি। ওরা তো প্রত্যেককে চেনে, নাম জানে। এখন লোকজন কমে যাওয়ায় ওদের পক্ষে হিসেব রাখা আরও সহজ হয়েছে। তাহলে সরখেলবাবু গেলেনটা কোথায়? অফিসের প্রতিটা ঘর খোঁজা হয়েছে, প্রতিটা বাথরুমও, এমনকি স্টোর-রুম, রেকর্ড-রুম পর্যন্ত বাদ যায়নি। কোথাও নেই সরখেলবাবু। সবাই সবদিক খুঁজেছে, ওঁর মোবাইলে ফোন করলে খালি বেজে যাচ্ছে—সবার মনে উৎকণ্ঠা। এদিকে পুলিশ এসে গেছে, জয়েন্ট সেক্রেটারিও হাজির, মিসিং ডায়েরিও করা হয়েছে।
হঠাৎ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে ছুটে আসে পিওন তপা। চিৎকার করে বলে, “পাওয়া গেছে! সবাই এদিকে এসো।”
ওর দেখানো আঙুলের দিকে লক্ষ করে সবাই হুড়মুড় করে ছুটে চলে। সিঁড়ি দিয়ে নামার বদলে উপরে উঠতে থাকে তপা। আরে, উপরে কেন! ওখানে তো কাজ চলছে রিনোভেশনের। লাল রিবন দিয়ে ঘেরা, ডেঞ্জার ট্যাগও লাগানো রয়েছে। ওখানে কী করতে গেছলেন উনি! সিঁড়িটা ঘোরার মুখেই পাওয়া যায় সরখেলবাবুকে। মাটিতে বসে আছেন কিছু পুরোনো ফার্নিচার, হাবিজাবির মধ্যে—বিস্ফোরিত চোখ। বোঝাই যাচ্ছে দেহে প্রাণ নেই। উলটোদিকের দেওয়ালে টাঙানো একটা বহু পুরোনো বন্ধ গ্র্যান্ড ফাদার ক্লকের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন তিনি। যেন খুব ভয় পেয়েছেন বা শক পেয়েছেন কিছু দেখে। ডাক্তার এসে দেখে গেলেন। বললেন, হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু। সৌরনীল অবাক হয়। সব ঠিক যেন স্বাভাবিক নয়; ও কিছু একটা রহস্যের আঁচ পায়। এদিকে সবার মধ্যে ফিসফাস চলতে থাকে—এত জায়গা থাকতে নিজের চেয়ার ছেড়ে এখানে কী করছিলেন সরখেলবাবু—কারও কাছেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হয় না।
নানারকম ফরমালিটি, পুলিশি জেরা, পোস্টমর্টেম, বাড়ির লোককে খবর দেওয়া, শ্মশানে যাওয়া—এসব করতে-করতেই রাতটা পার হয়ে যায় সৌরনীলের। মাত্র একমাস চাকরি বাকি ছিল ওঁর—কী যে হয়ে গেল! ওঁর একটিমাত্র ছেলে, সে অবশ্য ক’দিন আগেই একটা ছোটোখাটো সেলসের চাকরিতে জয়েন করেছে।
যাই হোক, এরপর ঘটনাটা সকলের মন থেকে আস্তে আস্তে হালকা হয়ে গেল, একটু যেন চাপাও পড়ে গেল। ওদিকে রিনোভেশনের কাজ তো সহজে শেষ হবার নয়, চলছে তো চলছেই। অফিসের কাজকর্মও যথারীতি চলছে, রোজকার রুটিন বদলায়নি।
তিন মাস পরের কথা। ডিসেম্বর মাস। সেদিনটাও শুক্রবার। আবার সামনে পরপর দু-দিন ছুটির হাতছানি। মনটা উড়ু উড়ু সৌরনীলেরও। অবশ্য সেদিন কাজের চাপটা একটু বেশিই ছিল। নানা ডিভিশনের একগাদা বাজেটের কাগজপত্র এসেছে, সেদিনই ছেড়ে দিতে বলেছেন বস। ক্যালকুলেটর নিয়ে হিসেব করে করে ওর মাথা-চোখ সব টনটন করছে। তার মধ্যে পিওন তপাকে দুপুরের পর থেকে বার বার চা-সিগারেটের জন্য খুঁজেও একবারও পাওয়া যায়নি, চাও খাওয়া হয়নি। ফাইলপত্র পাঠানো তো দূরের কথা, মাথাটা গরম হয়ে আছে। বাধ্য হয়ে বাথরুমে গিয়ে চোখে-মুখে একটু জল দিয়ে ও-পাশে সিঁড়ির কোণটায় গিয়ে সৌরনীল একটা সিগারেট ধরাল। সবে মৌজ করে দুটো টান দিয়েছে, হঠাৎ সিঁড়ির ওপর থেকে একটা গোঙানির মতো শব্দ শুনতে পাওয়া গেল। সেই সিঁড়ি! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল সৌরনীলের। তখনই দেখে ওরই সহকর্মী সুবীর হেলতে-দুলতে বাথরুম থেকে বেরোচ্ছে। ওর সন্ত্রস্ত ডাকে সুবীর এসে হাজির হয়। ওরা দুজনেই শুনতে পায় গোঙানি শব্দটা। তাড়াতাড়ি সিঁড়ি দিয়ে দুজনে উঠেই ওদের বুকটা ধক করে ওঠে, গায়ে কাঁটা দেয়। আবার সেই একইভাবে বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে সিঁড়ির উপরে হেলে পড়ে রয়েছে তপা। ওরও চোখটা বিস্ফোরিত, ভয় পেয়েছে যেন ভীষণ। তপাকে বাঁচানোর যথাসাধ্য চেষ্টা হয়। কিন্তু না, হাসপাতালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ও। এবারেও হার্ট অ্যাটাক।
মনটা খারাপ হয়ে যায় সবার। তপা খুবই প্রিয় ছিল সকলের, ওকে ছাড়া কারও চলত না। দরকার-অদরকারে ‘তপা’ হাঁক না পাড়লে সৌরনীলেরও যেন পেটের ভাত হজম হত না। শুধু চা-সিগারেট, ফাইল আদানপ্রদান বা টুকটাক ফাইফরমাশ খাটা নয়, ও যেন ছিল ওদের সবার নিকটাত্মীয়। কত সুখ-দুঃখের গল্প, গসিপ, উড়ো খবর, গোপন খবর—সব থাকত তপার কাছে। শুধু সঠিক মূল্য দেবার অপেক্ষা। এই তো সেদিন একটা পার্ট টাইম মোবাইল রিপেয়ার গুমটি দিল তপা। মোবাইলের যে-কোনো সমস্যা, যে-কোনো অ্যাকসেসরিজের দরকারে মুশকিল আসান ছিল ও।
হঠাৎ সৌরনীলের একটা চমক লাগল। তপাও গ্যাজেট ভালোবাসত। সরখেলবাবুর সঙ্গে ওকে কত গল্প করতে দেখেছে। আর দুটো ঘটনার মধ্যেই অনেক মিল।
পরপর তিন মাসের মধ্যে দু-দুটো অঘটন—দুটোই হার্ট অ্যাটাকে। কিন্তু দুটো ঘটনাই একই ধরনের এবং রহস্যজনক। পুলিশ এনকোয়ারি যা করার করছে, কিন্তু ছোটবেলা থেকে ফেলুদা-ব্যোমকেশের ভক্ত সৌরনীল ব্যাপারটা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে লাগল। ওর মনে পড়ে যাচ্ছিল তিন মাস আগে সরখেলবাবুর মৃত্যুর ঘটনাটা। সেদিনও ছিল শুক্রবার—কত তারিখ যেন ছিল? নিজের ঘরের ক্যালেন্ডারটার দিকে চোখ যায় সৌরনীলের। তখনই একটা বিস্ময় ওর চোখে মুখে ফুটে ওঠে—দুটো দিনই যে শুধু শুক্রবার ছিল তা নয়, ছিল মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার এবং তেরো তারিখ। আর সময়টাও ছিল দুপুরবেলা। অন্তত তপার ঘটনাটা তো ও নিজেই আবিষ্কার করেছিল। মোটামুটি সময়টা একটার পরেই। আচ্ছা, তেরো তারিখ সময়টা একটা তেরো, মানে তেরোটা তেরো নয় তো! অশুভ সংখ্যাটার সঙ্গে এ তো পুরো মিলে যাচ্ছে! এও কি সম্ভব! ইউরোপিয়ান দেশগুলোয় ‘ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথ’ অশুভ দিন বলে ধরা হয় সৌরনীল জানে। যিশুখ্রিস্টের লাস্ট সাপার ও শিষ্য জুডাস যেদিন ওঁকে ধরিয়ে দেয়, তার সঙ্গেও ব্যাপারটার যোগ আছে। নেট ঘেঁটে ও এসবই খুঁজে বার করছিল। তাছাড়া ডাকিনীবিদ্যার সঙ্গে নানা অশুভ ঘটনার গল্প-কাহিনি—সব এই তেরো তারিখ শুক্রবারকে নিয়েই। হঠাৎ মনে পড়ল যে গ্র্যান্ডফাদার ক্লকটার দিকে তাকিয়ে ওরা দুজনেই মরেছিল, সেই ঘড়িটাতেও লেখা ছিল মেড ইন ইংল্যান্ড, আর হরফগুলোও ছিল রোমান। ঘড়িটা কোথায় ছিল এতদিন কে জানে। কোনোদিন তো ওদের ঘরগুলোয় দেখেনি। অনেকদিন ধরেই বন্ধ হয়ে পড়েছিল হয়তো অন্য কোথাও। সেখান থেকে এনে সারাইয়ের লোকজন ওখানে রেখে দিয়েছিল নিশ্চয়ই—গোটা বাড়িটার যা অগোছালো অবস্থা। গোয়েন্দা কাহিনির ভক্ত সৌরনীল ক’দিন ধরে ইন্টারনেট ঘেঁটে বেশ কিছু তথ্য আবিষ্কার করে ফেলল। তেরো তারিখ শুক্রবার আর গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ি—এই দুটো নিয়ে অনেক কাহিনি, অনেক ঘটনার যোগসূত্র ধীরে ধীরে ওর কাছে পরিষ্কার হয়ে এল। একটা অজানা আশঙ্কাও ওকে গ্রাস করল। এ বছরে তো দুটো মাসে তেরো তারিখ শুক্রবার পড়েছিল—সেপ্টেম্বরে আর ডিসেম্বরে। আর ঠিক বেছে বেছে সেই দুটো দিনেই দুটো দুর্ঘটনা ঘটে গেল। আরও একটা জিনিস দেখে নিল সৌরনীল—সামনের বছরে মার্চেও তেরো তারিখ শুক্রবার পড়েছে।
ও নিজের আবিষ্কৃত তথ্যগুলো প্রিয় বন্ধু ও সহকর্মী তনুকে বলল।—“দ্যাখ তনু, আমার মনে হয় তেরো তারিখ শুক্রবারের সঙ্গে দুটো ঘটনারই একটা মিল আছে। আপাতত কাকতালীয় মনে হলেও, আমার কিন্তু মনে হচ্ছে, এর মধ্যে একটা গভীর রহস্য আছে।”
“কীরকম রহস্য শুনি?” তনু জিজ্ঞেস করল।
“রহস্য ওই ঘড়িটার মধ্যে। কেন ওরা দুজনেই ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে ওইভাবে ভয় পেয়েছিল! আর সময়টাও তো মনে হচ্ছে দুপুর একটা তেরো মানে তেরোটা তেরো। এই এতগুলো তেরোর সমারোহ—এটা অশুভ কিছুর ইঙ্গিত নয় কি?”
“কী করেছিস গুরু, তুই তো একেবারে গোয়েন্দা হয়ে গেছিস দেখছি!” তনু অবাক।
“হুঁ।” সৌরনীল বিজ্ঞের মতো বলল, “আর আসছে মার্চের তেরো তারিখও শুক্রবার, বুঝলি? মনে হচ্ছে ওইদিনও কিছু একটা ঘটতে চলেছে।”
“কী বলছিস সৌরনীল, এ তো ভয়ংকর ব্যাপার রে! আমাদের অফিসেই এইসব অলক্ষুণে কাণ্ড!”
“তুই থাকবি সেদিন আমার সঙ্গে? ব্যাপারটা খতিয়ে দেখতে হবে।”
“না বাবা, আমাকে এসবে ডাকিস না।”
“ধুর, ভয় পাচ্ছিস কেন? আমরা দুজনে আড়াল থেকে ব্যাপারটা দেখব শুধু। রহস্যভেদ করতেই হবে।”
“না রে সৌরনীল, এসব ছেলেমানুষী করিস না। কী হতে কী একটা হয়ে যাবে—তার চেয়ে পুলিশে বলে দেখ না। ওরাই যা করবার করুক।”
“তুই খেপেছিস? পুলিশ এসব তথ্য বুঝবেই না। আমাদের যুক্তি ওরা শুনবে? সব ফালতু বলে উড়িয়ে দেবে। তুই দেখিসনি ওসি সুব্রতবাবুকে, কীরকম রাগী? আমাদের কীরকম ইন্টারোগেশন করেছিল সন্ধে সাতটা অবধি? ভুলে গেলি?”
“তা অবশ্য।”
“তাহলে আবার কী? চল আমরাই দুজনে মিলে ব্যাপারটার শেষ দেখব। আমার মন বলছে, আমি ঠিকই সন্দেহ করেছি। মার্চের তেরো তারিখে আবার কিছু একটা ঘটতে চলেছে। আর সেটা আমরাই বের করব।”
“কিন্তু আমাদের কিছু হবে না তো রে!”
“ধুর ভিতু কোথাকার! আমরা অত কাছে যাব না, তাহলেই তো হল। সিঁড়ির নীচ থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখব। আর কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, বুঝলি?”
“ঠিক আছে।” অগত্যা রাজি হয় তনু।
সত্যিই তাই। আরও দুটো মাস কেটে যায়। তেরো তারিখে শুক্রবার না পড়ায়, আর কোনও দুর্ঘটনা ঘটেনি। যদিও প্রতি তেরো তারিখে দুপুর একটা থেকে দুজনে ছোঁকছোঁক করেছে সিঁড়ির কোণটাতে, ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখেছে কিছু ঘটছে কি না। কিন্তু না, ঘটেনি। কাঠের ওপর কারুকার্য করা ঘড়িটাও নেড়েঘেঁটে দেখার চেষ্টা করেছিল সৌরনীল, কিন্তু ওর চাবি কবেই হারিয়ে গেছে, তাই আর খোলা যায়নি। শুধু দেখেছিল ‘টিনস্ট্যান্ড সিগান’ আর ‘মেড ইন ইংল্যান্ড’ কথা কটা। আরও ভালোভাবে ঘড়িটা দেখবে ভেবেছিল, রোজ তো আর সেসব সম্ভব হয় না। একবার তো ওদেরই কলিগ সুমন্তদার চোখে পড়ে গেছিল।—“কী রে, কী করছিস এখানে তুই?” সুমন্তদা কিছু আঁচ করে জিজ্ঞেসও করেছিল।
“কিছু না, এমনি। সিগারেট খাচ্ছি।” বলে কাটিয়ে দিয়েছিল সেবার।
সিঁড়ির সেই জায়গাটা একইরকম আছে, কেউ পারতপক্ষে মাড়ায় না। গেলেই গা-টা ছমছম করে ওঠে; দু-দুটো অপঘাতে মৃত্যুর ঘটনা এখানেই ঘটে গেছে। কিন্তু কেউ জানে না কী হয়েছিল ওদের। সবাই বলে হার্ট অ্যাটাক। অন্ধকারে শুধু সৌরনীল একটা যোগসূত্র হাতড়ে চলে। ডাকাবুকো, সাহসী বলে ওর একটু সুনাম আছে। অফিসের স্পোর্টসে বেশিরভাগ প্রাইজই ওর বাঁধা। তাছাড়া প্রায়ই বেরিয়ে পড়ে দুঃসাহসী সব রুটে ট্রেকিংয়ে। সুচেতার কোনও কথা, কোনও বাধা মানে না। যে-কোনো ঝামেলায় অফিসে ও-ই আগ বাড়িয়ে এগিয়ে যায়, কিন্তু এবার যেন রহস্য উদ্ঘাটন আর গোয়েন্দাগিরির একটা অদ্ভুত নেশা ওকে পেয়ে বসেছে। ওর স্থির বিশ্বাস, ও রহস্যের সমাধান করতে পারবেই।
অবশেষে সেই দিনটি এসে উপস্থিত হয়। মার্চের তেরো তারিখ, শুক্রবার। সেদিন সকাল থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে—নিম্নচাপ। তনু অফিস কামাই করার তাল করেছিল, সৌরনীলের ধমকে বাধ্য হয়ে অফিস আসতে হয় ওকে। ভয়ে যেন তনু সেদিন জড়সড়।—“কী দরকার রে, ছেড়ে দে না! তিন নম্বর বলিটা কি নিজেরা হব নাকি?”
“ধুর বোকা, তুই একটা ভিতুর ডিম। বলছি না দূর থেকে দেখব, কাছে যাব না? জিনিসটা কী ঘটছে, দেখতে হবে না?”
তনু চুপ মেরে যায়।
বারোটার পর থেকে ঘনঘন ঘড়িটা মেলাতে থাকে সৌরনীল। লাঞ্চটা সেদিন তাড়াতাড়িই সেরে ফেলে, তনুকেও খেয়ে নিতে বলে। তনু একটু টালবাহানা করছিল বটে, কিন্তু ওর জোরাজুরিতে বাধ্য হয়। তারপর শুধু প্রতীক্ষা। নেট ঘেঁটে সৌরনীল আরও কিছু তথ্য পেয়ে গেছে—ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথে বেশ কিছু অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে, যার আজও কোন ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এটাকে নাকি বলে ট্রিস্কাডেকাফোবিয়া, আবার অনেকে বলে প্যারাস্কেভিডেকাট্রিয়াফোবিয়া। এই নিয়ে হলিউডে গোটা দশেক হিট ছবিও হয়ে গেছে—সবই হরর মুভি। সেগুলো একদিনে নেট থেকে ডাউনলোড করে দেখেও ফেলেছে সৌরনীল। তনুকেও দেখতে দিয়েছিল, ও অবশ্য একটু দেখেই ভয়ে বন্ধ করে দিয়েছে। তাছাড়াও অবশ্য সৌরনীল পড়ে ফেলেছে এর ওপরেই লেখা ড্যান ব্রাউনের ‘দ্য ভিঞ্চি কোড’, এমনকি টমাস লসনের বইও। গুগলে সার্চ করে দেখে নিয়েছে টিনস্ট্যান্ড সিগান গ্র্যান্ডফাদার ক্লকের নাড়িনক্ষত্রও—ঘড়িটা ইয়র্কশায়ারের, যেখানে উইচক্রাফট, ব্ল্যাক ম্যাজিক বা ডাকিনীবিদ্যার রমরমার কথা সবাই জানে। একটু আগে ও আর-একটা অদ্ভুত তথ্য পেয়েছে একটা ওয়েবসাইটে, যেখানে বলা আছে যিশুখ্রিস্টের বিশ্বাসঘাতক শিষ্য জুডাস ইস্কারিয়াট—যার থেকে ফ্রাইডে দ্য থার্টিনথ কুসংস্কার আর পরে ইয়র্কশায়ারে ডাকিনীবিদ্যা আর নিউমেরোলজির শুরু—সেই জুডাসেরই বংশধর টিনস্ট্যান্ড সিগান, যিনি ১৮২০ সালে প্যালেস্টাইনের জুডিয়া থেকে ইয়র্কশায়ারে পালিয়ে এসে ঘড়ির ব্যাবসা শুরু করেন।
সব জিনিসগুলো সৌরনীলের আস্তে আস্তে পরিষ্কার হয়ে আসছে, শুধু একটা কী যেন জিনিস ওর পেটে আসছে, মাথায় আসছে না। আর একটা কিছু যেন ও ছেড়ে যাচ্ছে।
যাই হোক, একটা বাজতেই প্রায় জোর করে তনুকে ধরে নিয়ে যায় ও সিঁড়ির কোণে; সিগারেট খাবার অছিলায় সব দেখতে হবে। তখনই সৌরনীলের মোবাইলটা হঠাৎ করে পিং পিং করে ওঠে। এই সময় আবার কে মেসেজ পাঠাল, বলতে-বলতেই দেখে একটা ব্ল্যাঙ্ক মেসেজ, অজানা নাম্বার থেকে এসেছে। যতসব ফালতু ভেবে মেসেজটা ডিলিট করতে যাবে, হঠাৎ করে চোখ পড়ে, শেষ চারটে সংখ্যার দিকে। ওয়ান থ্রি ওয়ান থ্রি। তেরোশো তেরো। তার মানে? এই সময়েই কে পাঠাল মেসেজটা? কিন্তু তখন আর এতসব ভাবার সময় নেই। ঘড়িতে একটা তেরো প্রায় বাজতে চলল। হঠাৎ একটা অদ্ভুত যান্ত্রিক আওয়াজ ভেসে আসে—আওয়াজ ঠিক নয়, একটা সুর। অবাক হয়ে ওরা দেখে, ঘড়িটার ভেতর থেকেই ওই অদ্ভুত সুরেলা শব্দটা আসছে, আর সুরটা ক্রমশ দ্রুতলয় হচ্ছে। হঠাৎ তনুর চোখ পড়ে ঘড়িটার দিকে, ওর কথা সরে না মুখে, ইশারায় দেখায় সৌরনীলকে। এ কি! কেমন যেন তিরতির করে কাঁপছে ঘড়ির কাঁটা দুটো। কত যুগ ধরে বারোটা কুড়ি বেজে খারাপ হয়ে পড়ে আছে ঘড়িটা সবাই জানে। কী করে এটা সম্ভব! কিন্তু হঠাৎই ঘড়ির কাঁটা দুটো উলটোদিকে ঘুরতে শুরু করে দিল। আরও দ্রুত হচ্ছে ওদের চলন, এবারে বাঁই বাঁই করে ঘুরতে শুরু করে দিল উলটোদিকে। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দুজনে—কী ঘটতে চলেছে এবার?
গায়ে কাঁটা দেয় সৌরনীলের। তনু পালাতে চায়, সৌরনীল ওকে ধরে ফেলে। শেষ দেখতেই হবে। অবাক বিস্ময়ে ওরা দেখে, ঘড়ির ডায়ালের ভেতর থেকে একটা অদ্ভুত আলোর সৃষ্টি হয়েছে আর যে শব্দটা তার সঙ্গে সঙ্গে বেরোচ্ছে, সেটা অসাধারণ মায়াবী আর সুরেলা, যেন ওদের ডাকছে। ওদেরও একটা আচ্ছন্ন ভাব যেন ধীরে ধীরে গ্রাস করে; ওরা আর পালাতে পারে না, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। ঠিক তখনই ঘড়ির কাঁটা দুটো একটা তেরো বেজে স্থির হয়ে যায় আর একটা তীব্র আলো ছড়িয়ে পড়ে ঘড়ির ডায়াল থেকে চারদিকে। ভয়ে চোখ বুজে ফেলে সৌরনীল। আস্তে আস্তে সেই আলোর ঝলক কমে এলে সৌরনীলের সাড় ফেরে। দেখে তনু চোখ বন্ধ করতে পারেনি, ওর চোখ স্থির হয়ে গেছে। সেই সঙ্গে মুখে একটা গোঙানির শব্দ, আস্তে আস্তে বসে পড়ে। ওকে ঝাঁকায় সৌরনীল; পাগলের মতো ডাকে—“তনু! তনু!”
কিন্তু তখন দেরি হয়ে গেছে। ততক্ষণে সিঁড়ির মুখে ছুটে হাজির হয়েছে ওদের আর সব সহকর্মীরা, ধরে তুলেছে তনুকে, কিন্তু তনু নেতিয়ে পড়েছে।
হসপিটালের ওয়েটিং রুমে বসে পুলিশ অফিসার যখন খবরটা দিল, নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না সৌরনীল। তনু আর নেই। সুব্রতবাবুর ধমকে চমকে ওঠে ও।—“খুব গোয়েন্দাগিরির শখ হয়েছিল, না? কী হল দেখলেন তো! চলুন থানায়, আপনাকে ইন্টারোগেশন করতে হচ্ছে।”
ততক্ষণে হিসাব করা হয়ে গেছে সৌরনীলের। পুরো অঙ্কটা এখন জলের মতো পরিষ্কার। সরখেলবাবুর পুরো নাম ছিল তন্ময় সরখেল। তপার ভালো নামটা আগে জানত না, আজই জেনেছে—তপন সমাদ্দার। তনুর নামটা তো জানেই, তনুময় সরকার। সব মিলে যাচ্ছে। ইস্, এটা যে আগে কেন মাথায় আসেনি! টিনস্ট্যান্ড সিগান আর ওদের সবার ইংরেজি নামের আদ্যক্ষর টি.এস আর অক্ষর সংখ্যাও ঠিক তেরোটা।