
এমন তো কোনোদিনও হয় না! মায়ের ডাকাডাকি, বকাবকি ছাড়াই নিজে থেকে ঘুম ভেঙে গেল আজ! বড়োদের ঘুম থেকে ডাকতে হয় না, আমাকেও ডাকতে হচ্ছে না! তাহলে কি বড়ো হয়ে যাচ্ছি?—মনে মনে এসব ভেবে খুব মজা পেল তোজো। কেমন যেন অন্যরকম লাগল। কিন্তু অন্যরকমটা যে ঠিক কী, সেটাই বুঝতে পারছে না সে। সবকিছু তো নিজের জায়গামতোই আছে। তবে কিছু একটা পরিবর্তন যে হয়েছে সেটা বেশ বুঝতে পারা যাচ্ছে।
অল্প কিছুক্ষণ বাদেই তোজো খেয়াল করল—এ বাবা! তাই তো! কোন কিছুতেই রঙ নেই কেন? চারদিক কেমন সাদাকালো হয়ে গেছে। তোজোর গায়ের নীল জামাটা কালো, মায়ের আকাশি রঙের শাড়িটা ঘোলাটে সাদা, চেরি রঙের ফ্রিজটা কালো, এমনকি ফ্রিজের মাথায় রাখা লাল-হলুদ টেডিটাও সাদাকালো! ব্যাপার কী? তোজো ছুটে গিয়ে জানালা দিয়ে বাগানে তাকিয়ে দেখল গাছগুলোতে সবুজ নেই, ফুলগুলোতে রঙ নেই, কয়েকটা প্রজাপতি উড়ছে—তারাও সাদাকালো। আকাশটাও নীল নয়, কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া। এমনটাও হয়! কালকেই তো সব ঠিকঠাক ছিল। সত্যি সত্যি ম্যাজিক নাকি?
তোজোর খুব মনখারাপ। দুধ, বিস্কুট কিছুই খেতে ইচ্ছে করছে না আজ। এই যে চারদিকের সব রঙ হঠাৎ করে হারিয়ে গেল, সবকিছু সাদা কালো হয়ে গেল—এসব নিয়ে বাড়ির বড়োদের কোনও মাথাব্যথা নেই, মনখারাপও নেই—তারা নিজেদের কাজ নিয়েই ব্যস্ত। বড়োদের কি রঙ ভালো লাগে না? মনে মনে ভাবল তোজো।
তোজো ক্লাস টুতে পড়ে। ওদের স্কুলে এখন গরমের ছুটি চলছে। সন্ধেবেলা মা অফিস থেকে ফিরলে তোজো মায়ের কাছে পড়ে, বাকি সারাদিন খেলা আর খেলা। পাড়ার বন্ধুরা আসে—ওরা সবাই মিলে তোজোদের বাগানে খেলা করে—লুকোচুরি, স্টোন পেপার সিজার, ক্রিকেট, কাদামাটি নিয়ে খেলা আরও কত কী! আজ খেলতেও মন করছে না তোজোর। যে বাগানে ঘাসপাতা সবুজ নয়, রঙবেরঙের ফুল নেই, মাথায় নীল আকাশ নেই—সবকিছুই সাদাকালো, সেখানে কি আর খেলতে ভালো লাগে!
না, এসব ভেবে আর মনখারাপ করে বসে থাকলে চলবে না, তোজোকেই কিছু একটা করতে হবে। বইয়ের টেবিল থেকে ক্রেয়ন, মোম রঙ, জল রঙ, তেল রঙ, চার-পাঁচটা তুলি যা যা ছিল সব নিয়ে এক দৌড়ে বাগান। বাগানে গিয়ে এদিক ওদিক তাকাল তোজো। কোন গাছটা থেকে শুরু করা যায়! ছোট্ট একটা নয়নতারা গাছের কাছে গিয়ে হাত দিয়ে একটা ছোট্ট পাতা আলতো করে ধরে সবুজ মোম রঙ ঘষতেই পাতাটা সবুজ হয়ে গেল! সঙ্গে সঙ্গে তোজোর মুখে গান—‘সা বলে শোনো শোনো, রে বলে কে রে, গা বলে গান শোনাতে এসেছে রে!’ খুব আনন্দ হলে তোজো এই গানটা গায়। এই তো হচ্ছে। একাই সব রঙ করে দেবে তোজো। আবার সব রঙিন হয়ে যাবে। নয়নতারা ফুলটায় বেগুনি রঙ ঘষতেই ফুলের রঙ বেগুনি, সাদা জল রঙে তুলি ডুবিয়ে একটা ছোট্ট ফোঁটা বেগুনি নয়নতারার ঠিক মধ্যিখানে। এই তো! এই তো সত্যিকারের নয়নতারা! জবা ফুলে লাল রঙের তুলি বোলাতেই জবাটাও টুকটুকে লাল।
জানালা দিয়ে উঁকিঝুঁকি দিয়ে এসব দেখে তোজোর বন্ধু পিহু, জুবিন, গোগোল, ঋষিও হাজির। ওরাও ওদের রঙ -তুলি নিয়ে লেগে পড়ল কাজে। আর অমনি পিহুর রঙের ছোঁয়ায় কলকে হল হলুদ, গোগোল অপরাজিতাকে ফিরিয়ে দিল তার হারানো নীল রঙ। জুবিন হরিমন্দিরের তুলসীগাছের পাতায় দিল হালকা সবুজ রঙ, ঋষির হাতে লাল-গোলাপি রঙ পেল মাধবীলতার দল। তোজো এক ছুটে বাড়ির ভেতর থেকে টেডিটা এনে লাল-হলুদ রঙ করে দিল, ঠিক যেমনটা আগে ছিল।
কিন্তু এভাবে আর কতক্ষণ! হাত ব্যথা করছে, রঙও ফুরিয়ে আসছে; সারা সকাল রঙ করে একটা ছোটো গাছও পুরো রঙ করতে পারেনি ওরা। উঁচু গাছগুলোতে তো হাতই পৌঁছয় না। আকাশ তো কত্ত উঁচুতে, নীল রঙ করবে কী করে! সবার খুব মনখারাপ।
গোগোল হঠাৎ বলে উঠল, “মোড়ের মাথায় উঁচু ফ্ল্যাট বাড়িটা রঙ করছে মিস্ত্রিকাকুরা, আজ বোধহয় কাজ বন্ধ। আচ্ছা, মিস্ত্রিকাকুদের কাছে তো অনেক রঙ! বড়ো বড়ো রঙের বালতি, মই! ওদের গিয়ে বললে হয় না? ওরা তো উঁচু গাছগুলোতে চড়তেও পারবে।”
যেমন ভাবা তেমন কাজ। দল বেঁধে ফ্ল্যাট বাড়ির সামনে।
“মিস্ত্রিকাকু, ও মিস্ত্রিকাকু!”
“কী, হয়েছে কী?”
“দেখছো তো সব কেমন সাদাকালো হয়ে গেছে, কোনও কিছুতেই রঙ নেই। আমাদের খুব মনখারাপ। তোমাদের কাছে তো কত্ত রঙ আছে, বড়ো বড়ো রঙের বালতি আছে, উঁচু মই আছে। তোমরা সবকিছু রঙ করে দাও না মিস্ত্রিকাকু।”
“কী যে সব বলো তোমরা! এত এত গাছপালা, ফুল, ফল, পাখি, প্রজাপতি, আকাশ রঙ করার মতো রঙ কি আমাদের কাছে আছে গো?”
“তোমাদের কাছেও অত রঙ নেই? তাহলে কাদের কাছে আছে?”
“না গো না, আমাদের কাছেও নেই আর অন্য কারও কাছেই অত রঙ নেই।”
“আচ্ছা বেশ!”
তোজো আর ওর বন্ধুরা বাগানে ফিরে এল।
বুড়ো আমগাছটার নীচে মাথা নীচু করে চুপ করে বসে আছে ওরা। কারও মুখে কোনও কথা নেই। হঠাৎ খুব মিষ্টি করে কেউ যেন বলল, “তোমাদের খুব মনখারাপ বুঝি?”
পিছন ফিরতেই দেখতে পেল ওদেরই বয়সি একটি মেয়ে। মাথায় কোঁকড়ানো চুল। গায়ে বেগুনি, নীল, আকাশি, সবুজ, হলুদ, কমলা আর লাল রঙ মেশানো ফ্রক। মুখটা ঠিক পিহুর পুতুলের মতো।
“তুমি কে গো? কী নাম তোমার?” পিহু জিজ্ঞেস করল।
“আমি বর্ণা। রামধনুদাদা আমায় তোমাদের কাছে পাঠিয়েছে। চারদিকের সব রঙ কেন হারিয়ে গেছে তোমরা কি কেউ জানো?”
“জানি না তো! তুমি জানো?” তোজো বলল।
“হ্যাঁ, জানি। প্রতিদিন রাত্রিবেলা সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়ে, তখন রামধনুদাদা এসে সবকিছু রঙ করে দিয়ে যায়। দাদার কাছে অনেক অনেক রঙ আছে কিনা! জানো, রামধনুদাদার খুব অসুখ। কাল রাতে আসতে পারেনি, তাই তো সব রঙ হারিয়ে গেছে।”
“রামধনুদাদা! সে কোথায় থাকে? আমাদের নিয়ে যাবে তার কাছে?” জুবিন আবদার করে বসল।
“হ্যাঁ, নিয়ে যাব তো। সেই জন্যই তো এলাম। তোমরা সবাই এসো আমার সঙ্গে।”
সবাই বর্ণার পিছু পিছু গিয়ে দেখল, বাগানের পিছন দিকটায় খুব সুন্দর করে সাজানো একটা মস্ত বড়ো রথ দাঁড়িয়ে। এত সুন্দর রথ তোজোরা কোনোদিনও দেখেনি। ওরা সবাই রথে চড়ে বসল। অমনি ধবধবে সাদা একটা ঘোড়া নিমেষের মধ্যে ওদের উড়িয়ে নিয়ে গাছপালা, আকাশ, নদী সব পেরিয়ে হুস করে রামধনুদাদার বাড়ি!
সেই বাড়ির লাল দরজা, হলুদ জানালা, দেওয়ালের রঙ হালকা বাদামি। বাগান-ভরতি সবুজ গাছ, কত রঙের ফুল, কত রঙের ফল! ফুলের উপর বাহারি রঙের প্রজাপতি। গাঢ় নীল আকাশে রঙবেরঙের পাখি, ঘুড়ি, বেলুন। বাড়ির দেওয়ালে দেওয়ালে ঝলমলে সব ছবি আঁকা।
বর্ণার পিছনে হাঁটতে হাঁটতে ওরা পৌঁছল রামধনুদাদার ঘরে। সেই ঘরের সবকিছুই সাদা। বিছানায় পাতা ধবধবে সাদা চাদরের উপর রামধনুদাদা শুয়ে, গায়ে উজ্জ্বল সাদা পোশাক। রামধনুদাদার সারা শরীর থেকে জ্যোতি বেরোচ্ছে।
পাশ ফিরে শান্ত হাসি মুখে রামধনুদাদা বলল, “রঙ নেই বলে তোমাদের ভারি কষ্ট হচ্ছে বুঝি!”
“হ্যাঁ, খুব কষ্ট হচ্ছে। আমাদের রঙ ফিরিয়ে দাও রামধনুদাদা।” তোজোরা সবাই একসঙ্গে বলল।
“রঙ না থাকলে আমারও ভারি কষ্ট হয়। কিন্তু আমার যে ভারি অসুখ, কী করে রঙ করতে যাব বলো তো?”
“কী হয়েছে তোমার?” ঋষি জিজ্ঞেস করল।
“তোমাদের ওখানে এখন এত কলকারখানা, এত গাড়ি, ধুলো, ধোঁয়া—গাছপালা, আকাশ কালো হয়ে থাকছে সবসময়। রোজ রোজ সেসব পরিষ্কার করে রঙ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠেছি আমি, খুব ক্লান্ত।”
“তাহলে কী হবে! তুমি কি আর কোনোদিনও রঙ করতে যাবে না রামধনুদাদা?” বলতে বলতে জুবিন কেঁদে ফেলল।
“গাছ লাগাও, অনেক অনেক গাছ লাগাও। তাহলে এত ধুলো হবে না, এত ধোঁয়াও হবে না। আমার পরিশ্রমও কম হবে, শরীর খারাপও করবে না।”
“আচ্ছা ঠিক আছে, আমরা কাল থেকেই সবাই গাছ লাগানো শুরু করব—অনেক অনেক গাছ লাগাব। তুমি আজ রাতে সবকিছু আগের মতো রঙ করে দেবে তো রামধনুদাদা?” সবাই একসঙ্গে বলল।
“দেব, দেব। তোমাদের জন্যই আবার রঙ করে দেব সব।”
এরপর বর্ণা সেই সুন্দর রথে করে সবাইকে বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিয়ে গেল।
পরদিনও নিজে থেকেই ঘুম ভাঙল তোজোর। উঠেই চারদিকটা দেখে নিল একবার। ছুটে গিয়ে জানালা দিয়ে নীচে দেখল। ঠিক আগের মতো সবকিছু—নীল আকাশ, সবুজ গাছ, রঙিন ফুল-ফল, রঙিন প্রজাপতি, সবুজ রঙের টিয়া! ঘরের ভিতরেও তাই—চেরি রঙের ফ্রিজের মাথায় লাল-হলুদ টেডি, মায়ের আকাশি শাড়ি, তোজোর নীল জামা।
মাকে জড়িয়ে ধরে তোজো বলল, “রামধনুদাদা কি ভালো, তাই না মা?”
“রামধনুদাদা! সে আবার কে?”
“আরে রামধনুদাদার শরীর খারাপ ছিল, সেই জন্যই তো সবকিছুর রঙ হারিয়ে সাদাকালো হয়ে গেছিল। বর্ণার সঙ্গে গিয়ে আমরা বলে এলাম, তাই তো রামধনুদাদা কাল রাত্রিবেলা এসে আবার সব রঙ করে দিয়ে গেছে!”
“কী যে সব আবোল-তাবোল বলিস আজকাল! সকালে উঠেই রামধনুদাদার গল্প শুরু করেছিস। শোন, আমায় আজ একটু তাড়াতাড়ি অফিসে যেতে হবে। ফেরার সময় কিছু আনব তোর জন্য? রূপকথার গল্পের বই আনব?”
“আজ একটা ফুলগাছের চারা এনো তো মা।”
“ফুলগাছের চারা কি করবি!”
“বাগানে লাগাব।”
“বেশ, তাই এনে দেব।”
“তোজো দেখে যা! আকাশে কি সুন্দর রামধনু উঠেছে।” ছাদ থেকে ঠাম্মা ডাকল।
এক ছুটে ছাদে গিয়ে আকাশের দিকে মুখ করে তোজো চিৎকার করে বলল, “থ্যাংক ইউ রামধনুদাদা!”
ভীষণ মিষ্টি গল্প, আবার শিক্ষাও সুন্দর। খুব ভালো লাগলো।
খুব সুন্দর গল্প