গল্প-গাবলু ও ন’দাদু-অনির্বাণ চৌধুরী-শরৎ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- বন্ধু

golpogablu o nodadu

তখনও চৌকির জামানা দিব্যি রমরম করে চলছে। বড়োজোর কোনও বাড়িতে হয়তো চার পা-ওয়ালা ইংলিশ খাট। খাটের নীচে দমবন্ধ বাক্সখাট দেখেনি কেউ। ম্যাট্রেসরা সব অপেক্ষা করছে টাচ লাইনের ধারে। হঠাৎ কোনও ইংলিশ খাটের তোশক তুলে নারকেলের ছোবড়ার গদির সন্ধান পাওয়া যায়। লোকের মুখে জাজিম।

ন’ঠাকুমার বিছানার চাদর, বালিশ, তোশক সব গুটিয়ে ক্রিমরোলের মতো করে ন’ঠাকুমারই চৌকির নীচে চালান করে দিল বাপটু। ঠাকুমা তো রেগে কাঁই। এদিকে স্টেজ প্রায় তৈরি। সবার মেক-আপও শেষের পথে। শুধু ওই মুনিপ্রবরের মেক-আপটা নিয়েই যত গোলমাল। প্রতি পদে ঠোক্কর। এত কিছু যে লাগতে পারে ছাই ঘুণাক্ষরেও ভেবে ওঠা যায়নি। অ্যাক্টর-ডিরেক্টর গাবলু তখন দিশেহারা। দিশেহারা ওয়ার্ডটাও আবার নতুন শিখেছে। ইউজটা ঠিকমতো হল কি না কে জানে! ওসব এখন মাথায় রাখলে চলবে না। সামনে বড়ো চ্যালেঞ্জ।

“মুনির তো সাদা দাড়ি চাই রে।” মাথায় এল টুপাইয়ের।

হক কথা। এই গুরুতর কথাটাই তো মাথায় আসেনি কারও। ভুটাইদিদির ওয়াটার কালারের কালো টিউব থেকে রঙ নিয়ে তুলি দিয়ে গাবলুর গাল কালো করার প্ল্যান একেবারে মাঠে মারা গেল। সাদা রঙের টিউবটা নাকি হারিয়ে গেছে কবেই। আসলে সে ল্যান্ডস্কেপ, পোট্রেট যাই আঁকা হোক না কেন, সাদা তো প্রায় লাগেই না। তাই হারিয়ে যাবার পর আর গরজ করে খোঁজা হয়নি কখনও। তাছাড়া গালে সাদা ওয়াটার কালার লাগালেই যে ক্লাস ফাইভের গাবলু হঠাৎ করে ঋষিতুল্য হয়ে গিয়ে সকলকে পদধূলি বিলাতে লেগে যাবে এমন বিশ্বাস ছিল না কারোরই।

এবার মুশকিল আসান বাপ্টু।—”ন’দাদুর ডাক্তারখানায় নিশ্চয়ই তুলো পাওয়া যাবে।”

“আরে, ন’দাদুর তো হোমিওপ্যাথি। তুলো থাকবে কেন?” ভুটাইদিদির তখন ক্লাস এইট। আর একটু তলিয়ে ভাবতে পারে।

বাড়ির গেটের সামনে ন’দাদুর ছোট্ট টিনের ডিসপেন্সারি। কালেভদ্রে ক্যাঁচক্যাঁচ করে দরজা খোলা হয়। ন’দাদু সেখানে বসে কিছুক্ষণ। খবরের কাগজে শব্দসন্ধান করে। খুব মনযোগ দিয়ে। পাড়ার বাচ্চারা তক্কে তক্কে থাকে। মিষ্টি বড়ি খাবার লোভে ভিড় জমায় দাদুর কাছে। কাউকে নিরাশ করে না দাদু। ন’দাদুর রাগ নেই। ডিসপেন্সারিতে শেষ কবে রুগী আসতে দেখা গেছে মনে করতে পারে না প্রায় কেউই।

‘যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই, পাইলেও পাইতে পার অমূল্য রতন’। সাদা ধবধবে এক বাক্স তুলো পাওয়া গেল দাদুর ডিসপেন্সারিতে। বলা মাত্র গোটা বাক্সটাই গাবলুদের দিয়ে দিল ন’দাদু। দাদুর নাটকে খুব উৎসাহ। এবারের নাটকে অভিনয় করবে বলে একবার বলেওছিল ওদের। এই নিয়ে ছোটোদের দুটো মিটিংও হয়ে গেল। মিটিংয়ের সিদ্ধান্ত গাবলুরা খুব বুঝিয়ে বলেছিল দাদুকে। দাদু বলেছিল, ‘ঠিকই। যুক্তি আছে কথায়।’ রাগ করেনি। আসলে নাটকে চারজন বড়ো ছেলের রোল। যে-কোনো একটা রোল ন’দাদুকে দিয়ে দেওয়াই যেত। কিন্তু হাইটের তফাতটা যদি বেমানান লাগে? দাদু তো পাক্কা ছ’ফুট। তাছাড়া ন’ঠাকুমার চৌকির শরীর-স্বাস্থ্যের যা হাল তাতে গাবলু-বাপ্টু-টুন্টাই একসঙ্গে দাঁড়ালেই চৌকি বাবাজীবন বেতো ঘোড়ার মতো চিঁহিচিঁহি আওয়াজ তুলে, প্রাণভয়ে কেঁদে ককিয়ে একসা হয়। সেখানে ন’দাদু যদি উঠে দাঁড়ায় আর অভিনয়ের দাপটটা যদি বাইচান্স পা ফেলায় ট্রান্সফার করে ফেলে তবে চৌকি বেচারা যে চৌচির হবেই সে ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না। অগত্যা…

এদিকে তুলো তো না-হয় পাওয়া গেল, কিন্তু গালে লাগানো হবে কী দিয়ে? সমস্যা গুরুতর। রঙ-তুলিতে এসবের বালাই ছিল না। ভালোকাকু বলল অভিনেতারা নাকি গোঁফ-দাড়ি লাগাতে স্পিরিট গাম ব্যবহার করেন। চোখের দেখা তো দূরের কথা, এ নামটাও কোনোদিন শোনেনি গাবলুরা। আর শীতের সন্ধ্যায় জলপাইগুড়ি শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরের কোনও দোকানে এ-জিনিস পাওয়া আর পোষা উট নিয়ে মিনিবাসে ওঠা প্রায় একইরকম ব্যাপার।

আট কিলোমিটার দূরে হলেও তাদের সুন্দরনগর যে মোটেই গ্রাম নয় এই দাবি নিয়ে গর্জে উঠল ভালোকাকু। শিরিষতলার মণিদীপজ্যাঠা বলল শিরিষতলা অবধি নাকি মিউনিসিপ্যালিটির সীমানা। তারপর অবধারিত গ্রাম। এই নিয়ে শুরু হল সংগ্রাম।

গাবলুরা খুব বুঝতে পারছিল, এ-সংগ্রাম দীর্ঘজীবী হলে নাটকের ভূমিষ্ঠ থুরি মঞ্চস্থ হবার আশা কম। অত বড়ো বাড়ি। আট-আটটা ঘর। সব টেবিলের মাথা, খাটের তলা, জিওমেট্রি বক্সের ভেতর এমনকি কে যেন মুড়ির কৌটো খুলেও খুঁজে নিল একবার। কোনও আঠার টিউব পাওয়া গেল না।

নতুনকাকিমা আবার কাউকেই দুঃখ দিতে পারে না। ছোটোদের কারও চোখে জল দেখলেই কেঁদে ফেলে ভ্যাঁ করে। নাটকের দলবল গিয়ে ঢুকে পড়ল নতুনকাকিমার লেপের তলায়। একটা লেপের তলায় তখন নতুনকাকিমাকে নিয়ে সাতজন। লেপ গায়ে দিয়ে একটা মিনিয়েচার মিটিংও হয়ে গেল। নতুন কাকিমা মুহূর্তে বানিয়ে ফেলল আটা আর জল দিয়ে এক স্বর্গীয় আঠা। এখন শুধু গাবলুর গালে লাগানোর অপেক্ষা। যে গাবলু পায়ে কাদা লেগে যাবার ভয়ে বর্ষাকালে সাধের ফুটবল খেলাটাই বন্ধ রাখবে রাখবে করছে, সে অবলীলায় বাড়িয়ে দিল গাল। ভুটাইদিদি আর টুনাইদিদি মিলে পুরোদমে লেগে পড়ল গাবলুকে সন্ন্যাসী বানানোর পূণ্যব্রতে।

তারপর আবার নতুন ঝামেলা।

“এই ভুটাই, ঠোঁট আর নাকের মাঝের নীচু জায়গাটায় কি গোঁফ হয়?”

“এ বাবা, এইটা তো খেয়াল করিনি কখনও।”

বাড়িতে তখন বড়ো ছেলে বলতে মাত্র তিনজন। ন’দাদু, ভালোকাকু আর মণিদীপজ্যাঠা। কিন্তু তিনজনই ক্লিন শেভন। বোঝার উপায় নেই ওই নীচু জায়গাটায় গোঁফ হয় কি না।

এবার সলিউশন দিল দলের সবথেকে ছোট মেম্বার। সামনের ঝা-বাড়ির ক্লাস টু-এর ঘুটুল। ঘরের দেওয়াল জুড়ে তখন মুচকি হাসছেন স্বয়ং রবি ঠাকুর। তাঁর দিকে চোখ যায়নি কারও। কী আশ্চর্য! মিটে গেল গোঁফ নিয়ে সংশয়। এবার আবার নতুন গণ্ডগোল। একটা মিটলেই আবার সঙ্গে সঙ্গে নতুন একটার উদয় হয়। মুনিপ্রবরের দাড়ি না হয় সাদা করা গেল, কিন্তু চুল যে একেবারে কালো কুচকুচ করছে।

“আরে গাবলু হল গিয়ে একেবারে সিদ্ধপুরুষ মুনিপ্রবর। সাদা চুল মন্ত্রবলে কালো করে নিয়েছে।” বলল বাপ্টু।

সমাধানটা টুপাই, ঘুটুল, বিল্টুর মতো ছোটোরা খেয়েও গেল দিব্যি। কিন্তু ডিফার করল ভুটাইদিদি।—”এটা যদি আমরা মেনেও নিই, দর্শক মানবে কেন?

“সে না-হয় আমরা ইন্ট্রোডাকশনে এটা অ্যানাউন্স করে দেব।”

তবু মেজরিটি ওপিনিয়নে হেরে গেল সিদ্ধপুরুষ থিওরি। সবাই মিলে লেগে পড়ল কাঁচা চুল পাকা করবার বুদ্ধি বার করতে। মাথায় ময়দা ঢেলে চুল পাকাবার আইডিয়া দিল টুপাই। পছন্দ হল না কারও। আধঘণ্টার নাটক। ময়দা অতক্ষণ মাথায় আদৌ বসে থাকবে কি না সে ব্যাপারটা জানা ছিল না যে।

চুলের রঙ নিয়ে দুশ্চিন্তা যখন চরমে, ন’দাদু খুঁজে পেয়ে গেল তার একটা পুরোনো ক্যাপ। হঠাৎই। আর নতুনকাকিমা সেটা সেলাই করে ছোটো করে ফেলল। একদম গাবলুর মাথার মাপ। ব্যস, এবার শুধু টুপির ওপর আঠা লাগানো। আর আঠার ওপর তুলো। বাবা এসে ধুতিটা পরিয়ে দিলেই মুনিপ্রবর রেডি।

দুই

অ্যানুয়াল পরীক্ষার পর জলপাইগুড়ি যাবার নামে কিন্তু প্রথমে গাবলুর মনটাই খারাপ হয়ে গেছিল। পরীক্ষা শেষ হলেই না শীতের আসল মজাটা। সকালে ক্রিকেট, বিকেলে ক্রিকেট, সন্ধেয় ব্যাডমিন্টন। বইখাতা খোলার ঝামেলা নেই। রাত-দিন কানের কাছে পড় পড় পড় নেই। মজাই মজা। আর এসব ছেড়ে কেই-বা এক্কেবারে অচেনা অজানা নতুন জায়গায় যেতে চায়? তবে ট্রেনে উঠেই মনটা একদম ফুরফুরে হয়ে গেল। জনতা এক্সপ্রেস, কয়লার ইঞ্জিন। নন এসি থ্রি-টাইয়ার। এমন মজার জার্নি আর কোত্থাও নেই।

দাদু, ঠামা আর কাকুকে নিয়ে গাবলুরা মোট সাতজন। গোটা কিউবিকলের মালিকানা তাদের। সঙ্গে পাশের সাইড লোয়ার। মানে তিন-তিনটে জানালার ধার। গাবলুকে আর পায় কে। আর কতরকমের যে খাবার—চাআয়গ্রম, ডাআআল পুরিপ, মুড়ড়ি মশ্লা—আরও কত কী যে। নবদ্বীপ স্টেশনে বাবা, দাদু-ঠামার একটা ছবিও তুলে নিল। সে-সব একটা রোলে বারোটা ছবির দিন। গোকুলে বাড়িছে মোবাইল।

রাতের খাওয়ার পর গাবলুর আর ক্রিকেট মাঠ, ব্যাট, বল, র‍্যাকেট এসবের দুঃখ মনে রইল না। ভ্যানিশ করে গেল কোথায় যেন। মায়ের তৈরি মেটে চচ্চড়ি আর ঠামার ক্ষীরভরা পাটিসাপটা। টক্কর হল খুব।

জলপাইগুড়ি রোড স্টেশনে নামা নিয়ে বেশ টেনশন ছিল। একে তো সাত-সাতটা লোক। তার ওপর আবার ব্যাগ-সুটকেস-হোল্ডল—এরাও সংখ্যায় নেহাত কম নয়। কিন্তু নেমে পড়া গেল দিব্যি। রোড স্টেশন থেকে সুন্দরনগর রিকশা। জাস্ট আউট অফ দ্য ওয়ার্ল্ড। কী ফাঁকা ফাঁকা। কত গাছপালা। প্রায় সব বাড়ির হেলানো ছাদ। বাবা বলেছিল, খুব বৃষ্টির জন্য নাকি এমন ব্যবস্থা। ডিসেম্বরের জলপাইগুড়ি কনকন করে এসে আদর করে দিয়ে যাচ্ছিল নাকে, কানে, গালে।

কিছুক্ষণ পর ডানদিকের আকাশে ঝলমল করে উঠল আলো। রুপোলি আলো। এত সুন্দর আর কিছু দেখেছে বলে মনে করতে পারল না গাবলু। পাশে বসা কাকু বলল, “কাঞ্চনজঙ্ঘা। দেখে নে গাবলু। বেলা হলে কিন্তু আর দেখতে পাবি না।”

সেবার কাঞ্চনজঙ্ঘা ছাড়াও আরও অনেক কিছু দেখেছিল, জেনেছিল গাবলু। সে এক বিরাট লিস্ট। পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার মতো করে লিখে রেখেছিল নিজের ডায়েরিতে।

১) এক বাড়িতে পঁচিশ জন মিলে থাকাটা হল অসম্ভব মজাদার একটা ব্যাপার।

২) যতদূর পায়ে হাঁটা যায় ততদূর অবধি যে-কোনো বাড়িতে জিজ্ঞেস না করেই ঢুকে পড়া যায়। সাতসকাল, ভরদুপুর নাকি রাত গভীর ভাবতে হয় না।

৩) ঢুকেই অনায়াসে বলে ফেলা যায়—‘জ্যাঠাইমা, তোমাদের আজ বোরলি মাছ? বাটি করে দ্যাও তো একটু খ্যায়ে দেখি।’

৪) গানটা ‘ভালো করিয়া বাজাও রে দোতারা’ নয়—‘ভাল্ কৈরা বাজান গো দোতারা’। আর আসল গানটাতে শুধু একটা অন্তরা আর একটা সঞ্চারী নয়, অজস্র অন্তরা আছে।

৫) চটকা হল একধরনের গান, আর তা শুনতেও দারুণ।

৬) পৃ্থিবীর সবথেকে সুস্বাদু আলু পাওয়া যায় কত্তামার আগুন তাপানোর উনুনের মধ্যে, পরের দিন সকালে। সন্ধ্যাবেলা  কত্তামার কাছে গল্প শুনতে শুনতে গোল হয়ে বসে আগুনে আলুগুলো জাস্ট ফেলে দিলেই হল। পরের দিন শুধু একটু নুন চাই, ব্যস।

৭) কলকাতায় যেটা ল্যাটা মাছ, জলপাইগুড়িতে সেটাই টাকি আর রায়গঞ্জে সাটি। একসঙ্গে অনেকে মিলে খেতে বসলে আর মচমচে করে ভাজা হলে ওই মাছে আর কাঁটা থাকে না।

৮) কলকাতা থেকে কেউ বেড়াতে এসে যখন ফিরে যায় তখন অর্ধেক গ্রাম স্টেশনে পৌঁছে যায়। কীভাবে যেন! সকলের চোখ ভেজা থাকে। ট্রেনে বসা শহুরেদেরও রুমালের দরকার হয়।

এইভাবে কত অজানা জিনিস জেনে যেতে যেতে, নতুন নতুন দুর্দান্ত সব খাবার খেতে খেতে কতজনের সঙ্গে যে বন্ধুত্ব হয়ে গেল গাবলুর! বাড়ির ছোটোরা তো ছিলই, সুন্দরনগরের যত ছেলেমেয়ে প্রায় সবাই যেন তার নিজের লোক। দিন চলল সোনালি ডানায় ভেসে ভেসে। করলা নদীর জল তখন হাঁটু আর গোড়ালির মাঝামাঝি। পা দিলেই কনকনে ঠান্ডার কামড়। তবু ছোটোরা যে কতবার হেঁটে করলা পার হয়েছে তার আর গোনাগুনতি নেই। সাথে ছোটকাকু। বন্ধুর মতো। কত গল্প হয়েছে, নদীর ও-পাড়ে বসে। গান, অন্তাক্ষরী, কুইজ। ছোটকাকুই প্রথম দিয়েছিল আইডিয়াটা।—”তোরা এতজন বন্ধু, একটা নাটক করলে তো দারুণ হয় রে!”

হইহই করে উঠেছিল সকলে। গাবলুর ওপর ভার পড়ল ডিরেকশনের। তখনও তার ঝুলিতে মা-বাবার সঙ্গে দেখা দুটো বড়োদের নাটক। আন্তিগোনে আর জগন্নাথ। কিছুই বুঝতে পারেনি। দুটো নাটকেরই। ঢাকুরিয়া লেকে ওয়াটার ব্যালে। আর সিনেমা বলতে চারমূর্তি আর প্রতিশোধ।

ডাকঘর, ছোটোদের রামকৃষ্ণ, জাদুকর ম্যান্ড্রেক, আম আঁটির ভেঁপু আর হাঁদাভোঁদা মিশিয়ে একটা চিত্রনাট্য তৈরি করে ফেলা গেল। এর বাইরে আর কিছু পড়া ছিল না যে কারও। চারমূর্তি দেখার পর গাবলুর মাথায় ঘুটঘুটানন্দ ঘুরপাক খাচ্ছিল। তাই মুনিপ্রবরের দাঁড়িওয়ালা রোলটা সে চেয়ে নিল সবার কাছে। টুন্টাই বলল, “একটা গান থাকলে কিন্তু বেশ হয়। সিনেমার মতো। পর্দার পেছন থেকে। ভুটাইদিদির গানের গলাটাও তো খাসা।”

দুটো দেখা সিনেমার মধ্যে ‘ভারত আমার ভারতবর্ষ’ আর ‘হয়তো আমাকে কারও মনে নেই’—এই দুটো গান ভুটাইদিদির কমন পড়ে গেল। মেজরিটির ভোট পরেরটার দিকে। বাপ্টুর লিপে গান।

টুপাই বলল, “ছেলের গলায় মেয়ের গান কী করে মানাবে?”

“সিনেমায় ছোটো ছেলেদের গলায় তো মেয়েরাই গায় শুনেছি।”

“কিন্তু বাপ্টুর রোলটার তো গোঁফ আছে।”

এদিকে ভুটাইদিদিই একমাত্র গান জানা মেম্বার। তাকে গলাটা একটু ভারী করে গাইতে বলা হল।

তিন

ন’দাদুকে খুব মন দিয়ে দেখে গাবলু। কেমন যেন অন্যরকম। সবার থেকে আলাদা। আছে অথচ নেই। দেখছে কিন্তু দেখছে না। কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। ন’দাদুর ছেলে মেয়েরা মানে ভালোকাকু, ছোটকাকু আর কড়িপিসি—এরা ন’দাদুকে ন’কাকা বলত। বাবা বলত বড়ো দাদুকে। ন’দাদুর আর ‘বাবা’ শোনা হয়নি। কেউ কখনও এ নিয়ে আক্ষেপ শোনেনি ন’দাদুর। সাতসকালে উঠে একা একা বসে বেহালা বাজায়। একদিন খুব ভোরে জিরেন কাটের খেজুরের রস খাবার জন্য উঠে পড়েছিল সবাই। সেদিন দেখেছে গাবলু। ন’দাদু আবার স্বাধীনতা যুদ্ধেও নাকি লড়াই করেছে ইংরেজদের সঙ্গে। জেলে ছিল অনেক দিন। তখনই সময় নষ্ট না করে বেহালা বাজানো শিখে নিয়েছে। বাজানো হয়ে গেলে গাছ থেকে একমুঠো কালমেঘ পাতা তুলে নিয়ে চিবোতে চিবোতে মর্নিং ওয়াক করে। তেতো লাগে না। হাসি লেগে থাকে ঠোঁটে। দাঁড়ি কাটতে গিয়ে গাল কেটে গিয়ে গলগল করে রক্ত পড়ছিল একবার। কেউ চুন নিয়ে দৌড়ে এল, কেউ বা ডেটল। ন’দাদুর ব্যথা লেগেছে বোঝার উপায় নেই। মাঝে-মাঝে শুধু বলছে, ‘ও আস্তে আস্তে রক্ত ঠিক বন্ধ হয়ে যাবে।’ পয়সা দিয়ে হোমিওপ্যাথি গ্লবিউল কেনে আর ছোটোদের খাইয়ে দেয়।

একদিন সকালবেলা ন’দাদু গাবলুকে হাঁটতে নিয়ে গেল।—”তোরা নাকি নাটকের জন্য টিকিট করেছিস গাবলু?”

“হ্যাঁ, ন’দাদু।”

“কত দাম রে টিকিটের?”

“এক টাকা করে।”

“আমার বন্ধুদের তোরা নাটক দেখতে অ্যালাউ করবি তো? সব কিন্তু আমার মতো হদ্দ বুড়ো।”

“তোমার বন্ধুদের তো নিতেই হবে দাদু।”

“আচ্ছা বেশ। তবে আমি একশোটা টিকিট নেব। তোদের কোনও চিন্তা নেই রে। আমিও তোদের সঙ্গে টিকিট বানাতে লেগে পড়ব। কেমন?”

“এ তো দারুণ ব্যাপার দাদু! নাটক তো পুরো হাউজফুল হয়ে যাবে। তোমার ঘর উপচে পড়বে দর্শকে। আমাদের খুব মন দিয়ে রিহার্সাল দিতে হবে কিন্তু।”

“সে তো হবেই। নাটক দুর্দান্ত হবে দেখিস। কিন্তু তোরা টাকা দিয়ে কী করবি? ঠিক করেছিস কিছু?”

“হ্যাঁ দাদু। চমচম খাব। বেলাকোবার।”

“ওই চমচমের গল্প জানিস?”

“না তো দাদু।”

“তবে শোন। বাংলাদেশে টাঙ্গাইল বলে একটা জায়গা আছে। সেখানকার শাড়ি বিখ্যাত। টাঙ্গাইল থেকে ছয়-সাত কিলোমিটার দূরে পোড়াবাড়ি নামে এক গ্রাম ছিল। সেখানকার যশোরথ হালুই নামে এক মিষ্টির কারিগর দেড়শো বছরেরও বেশি আগে চমচম আবিষ্কার করেন। তিনি নাকি আবার আসাম থেকে গেছিলেন পোড়াবাড়িতে। দেশভাগের পরে পোড়াবাড়ির কারিগরদের একটা ভাগ বেলাকোবায় চলে আসে, আর একটা ভাগ যায় নদীয়ার মদনপুরে। এ-চমচম কিন্তু তোদের কলকাতার চমচমের মতো সাদা ধবধবে নরমসরম নয়। বরং একটু শক্ত আর লালচে রঙের। ওপরে গুঁড়ো ক্ষীর ছড়ানো। সাক্ষাৎ অমৃত। বুঝলি?”

“ওরে বাবা! চমচম নিয়ে তো পুরো ইতিহাস।”

“ঠিক তাই। তা তুই ক’টা চমচম খেতে পারবি বল। চমচম কিন্তু খুব কড়া মিষ্টি।”

“দশ-বারোটা তো পারবই দাদু। আমি তো আমার বন্ধুদের মধ্যে রসগোল্লা খাওয়ায় বরাবর ফার্স্ট। বিয়ে, অন্নপ্রাশনে তো কুড়িটা রসগোল্লার কম খাই না।”

“বাহ্‌, দারুণ! কিন্তু টিকিটের পয়সায় চমচম খেতে হবে কেন?”

“এটা তো ভাবিনি দাদু।”

“নাটকের পরের দিন দুপুরের খাওয়ার পর আমরা সবাই মিলে বেলাকোবা অভিযানে যাব। বাড়িসুদ্ধ সবাই। এখান থেকে বাসে দশদরগা। তারপর রিকশা। অমন রিকশা কখনও চড়িসনি। চারপাশে চাষের ক্ষেত। সবুজ, হলুদ, সোনালি। সে এক রঙয়ের মেলা। চুপিচুপি সব রঙেরা এসে বাসা বাঁধবে তোর মনে। একেবারে হোলির মতো রঙিন—সে এক আশ্চর্য ভ্রমণ। মাঝখানে সরু রাস্তা। আহা। বুঝলি?”

“কী মজা হবে দাদু! ভাবতেই তো পেটের মধ্যে খুশি গুড়গুড় করে উঠছে।”

“আমি খাওয়াব চমচম। সব্বাইকে। যে যতগুলো পারবে। আর আমার বন্ধু আছে বেলাকোবায়। দুর্গেশ। তাদেরও ডেকে নেব। দল বড়ো না হলে মিষ্টি খেয়ে মজা নেই। সে বলে দিলে আরও ভালো করে বানিয়ে রাখবে। বেশি করে গুঁড়ো ক্ষীর দিয়ে।”

“কিন্তু তাহলে টিকিট বিক্রির টাকায় কী হবে দাদু?”

“শোন গাবলু, সবসময় ভাববি, বড়ো হয়ে গেলেও তোর সবকিছু তোর নিজের জন্য নয় কিন্তু। দিয়ে দিবি লোককে। দেখবি তোর নিজেরটা ঠিক জোগাড় হয়ে যাচ্ছে। এতটুকু আটকাচ্ছে না কোথাও। কখনও আমার চাই, আমি কিচ্ছু পেলাম না—এসব বলবি না। ভাববিও না, বুঝলি? ওভাবে কিছু পাওয়া যায় না। শুধু শুধু মনে অন্ধকার জমে। কেমন?”

“আচ্ছা দাদু।”

“আমি একটা জিনিস ভেবেছি, দ্যাখ তোর পছন্দ হয় কি না। আমাদের বাড়িতে তো দুজন কাজের লোক। কত কাজ। কত সকালে ঠান্ডার মধ্যে আসে। ওদের দুজনেরই একটা করে শীতের চাদর আছে। একদিন বৃ্ষ্টিতে ভিজে গেলে পরদিন খুব বিপদে পড়ে। টিকিট বিক্রির টাকায় আমরা যদি ওদের দুটো গরম চাদর কিনে দিই?”

“এ তো দারুণ ব্যাপার দাদু!”

“আমরা বড়োরাই কিনে দিতাম। কিন্তু তোদেরও তো শিখতে হবে। বড়ো হতে হবে তো। তাই না?”

গাবলুর তখন খুব ইচ্ছে করছিল ঝাঁপিয়ে পড়ে ন’দাদুকে একটা প্রণাম করে। কিন্তু দাদু আবার ওইসব প্রণাম-ট্রনাম বিশেষ পছন্দ করত না। প্রস্তাবে রাজি হয়ে গেল দলের সকলেই।

***

নাটকটা কিন্তু দারুণ হয়েছিল। শুধু বাপ্টু মরে যাবার পরেও একবার শুয়ে-শুয়েই কান চুলকে ফেলেছিল। দোষটা কিন্তু ছিল কানের। তা সে বাছাধন যদি চুলকে ওঠে বাপ্টু বেচারা আর কীই-বা করবে? গাবলুর গালের বাঁদিকের দাড়ি একবার খুলে গেছিল আর ন’দাদুর প্রম্পটিংটা বড্ড বেশি জোরে হওয়াতে সবাই শুনতে পাচ্ছিল দিব্যি। ব্যস, ত্রুটি বলতে শুধু এইটুকুই। সবাই খুব হাততালি দিয়েছিল। কিপটে বলে যার প্রবল সুনাম, সেই পঞ্চাদাও চারটে টিকিট কেটেছিল। এসেওছিল বাড়ির সবাই মিলে। ঘর ভরে উঠেছিল দর্শকে। সে একেবারে লোকে লোকারণ্য। শুধু ন’দাদুর বন্ধুরা আসেনি। কী কাজে যেন আটকে গেছিল তারা। সবাই। ন’দাদুর বন্ধুদের টিকিট নিয়ে টোটাল কালেকশন হয়েছিল একশো একত্রিশ টাকা। সুন্দর চারটে চাদর দেওয়া হয়েছিল বুড়িমাসি আর আগমনীমাসিকে।

চার

আজকে গাবলু অনেক বড়ো হয়েছে। ওই বুড়ো হব হব আর কী। প্রৌঢ় বলা চলে। তবে ঠিক ঠিক বড়ো হতে পেরেছে কি না নিজেও বুঝতে পারে না। পুরোনো অ্যালবামের পাতা ওলটালে নবদ্বীপ, সুন্দরনগর, মুনিপ্রবর, বেলাকোবারা চোখ মেলে তাকায়। কত মজা। ভোরের কুয়াশার মতো কোথায় মিলিয়ে গেছে সে-সব। বড়োরা আর প্রায় কেউই নেই। শুধু ভালোকাকু একা থাকে সুন্দরনগরে। বাপ্টু সিয়াটলে। টুপাই কৃষ্ণনগরে হাইস্কুলে ইতিহাস পড়ায়। ভুটাইদিদির এখন খুব সুনাম। দেশ-বিদেশে ভারতীয় মার্গ সংগীতের অনুষ্ঠান করার ডাক পড়ে তার। সবাই ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেছে। এ-ধার ও-ধার। দেশ-বিদেশ। সোশ্যাল মিডিয়ায় ওদের গ্রুপে কালেভদ্রে ভার্চুয়াল গেট-টুগেদার হয়। সুন্দরনগরের সুন্দর দিনগুলো ফিরে আসে। রঙিন। ন’দাদুর গলাটা আজও কানে বাজে। মনখারাপ হয়। গাবলুর ডাকনামটা আজকাল আর মনেই পড়ে না। ওই নামে ডাকার লোকেরা হারিয়ে গেছে। গাবলু তার ছেলেমেয়েকে ন’দাদুর মতো করে বড়ো করতে চেয়েছে। সময় বলে দেবে ন’দাদুর ছায়া  হিয়া আর হৃদের হৃদয়ের কতটা গভীরে গিয়ে ছুঁয়েছে। গাবলু নিজেও ন’দাদু হয়ে ওঠার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। আজও। একটা কন্টিনিউয়াস প্রসেস। সবাই তো আর ন’দাদু হতে পারে না। যদি আর একটু কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।

ছবি-মৌসুমী

জয়ঢাকের গল্পঘর

3 thoughts on “গল্প-গাবলু ও ন’দাদু-অনির্বাণ চৌধুরী-শরৎ২০২৩

  1. আহা কি মায়াভরা লেখা। চোখের জল বাঁধ মানছে না।

Leave a Reply