
বন্ধু টিয়া ডাকছে তাকে—”সুমি, ও সুমি।”
ও সৌমি বলতে পারে না। ছোটো তো! অবশ্য সৌমিও ছোটো, ক্লাস ফোরে পড়ে। ভৈরব নদীর ধারে এই নন্দনপুর গ্রামে দিদিমার বাড়ি বেড়াতে এসেছে। এখানে এসে পাশের বাড়ির টিয়া ওর বন্ধু হয়েছে। ওদের দমদমের পূর্ব সিঁথির বাড়ির কাছে তো তেমন কোনও বন্ধু নেই। ওই স্কুলে শ্রীয়া, সুজনা এমন কয়েকজন মাত্র বন্ধু। তো এই দিদিমার বাড়ি এলে তার মন আনন্দে ভরে থাকে। এখানে সবকিছু তার ভালো লাগে। যদিও এই বাংলাদেশে আসতে গেলে পাসপোর্ট ভিসা লাগে; সে মায়ের পাসপোর্টে চাইল্ড হিসেবে আসে, তবু তাদের দমদমের বাড়ি থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যায়। মা গল্প করে, আগে নাকি একই দেশ ছিল। খুলনা থেকে এক স্টিমারে কলকাতা যাওয়া যেত। তার দাদু সুরেন বোস, যাকে সৌমি দেখেনি, তিনি আগেই মারা গেছেন। তাঁর কলকাতায় ডাক্তারখানা ছিল। মাও কলকাতার স্কুল-কলেজে পড়েছে।
“কী রে, চল!” টিয়া হাত ধরে টান মারে।
মাটির উঁচু দাওয়া থেকে নেমে নিকোনো উঠোন পেরিয়ে তারা দুজন চলে যায় একধারে পুরোনো শিউলি গাছতলায়। কত্ত কমলা ডাঁটিয়ালা সাদা শিউলি ফুল খটখটে শুকনো উঠোনে ছড়িয়ে আছে। কতকগুলো কুড়িয়ে জড়ো করে নাকের কাছে আনে। কেমন মিষ্টি সুগন্ধ! সৌমি তার ঘেরওয়ালা লাল ফ্রকের কোঁচরে কতগুলো শিউলি নিয়েছে; টিয়াও নিয়েছে তার সাদা টেপ-জামায়।
এবার তারা এগোল সামনে জঙ্গুলে বেড় বাগানের দিকে। একটু এগিয়েই বনের মধ্যে থির জলের পুকুরটা দেখতে পেল। দুটো বড়ো পদ্মফুল ফুটে আছে। দি’মা বলেছে—খবরদার, ওই পদ্ম তুলতে যাবে না। গভীর জল, ডুবে যাবে। দি’মা সেদিন ওই পুকুরে নাইতে নেমে তাকে একটা পদ্ম তুলে এনে দিল। তার দি’মার গায়ে কেমন সুন্দর পদ্মগন্ধ লেগে থাকে। আসলে সৌমির তো আর কোনও দাদু-ঠাম্মা নেই। তবে এই দি’মাই সেরা। ফর্সা ধবধবে রঙ, মাথার চুল সব সাদা, পরনে সাদা শাড়ি। দি’মাকে সরস্বতীর মতো দেখায়। দিদা বলেন, আগে সবই ভারত ছিল। এক স্টিমারে খুলনা থেকে কলকাতা আসা যেত। দি’মা যখন তিন মাসের ভিসা নিয়ে তাদের দমদমের বাড়িতে আসেন, কত গল্প শোনে দিমার কাছে রাত্তিরে শুয়ে শুয়ে। লালকমল নীলকমল, অনেক অ্যাডভেঞ্চার, স্বাধীনতা সংগ্রামের কাহিনি। দি’মা খুলনার করোনেশন গার্লস হাইস্কুল থেকে সে-কালে এন্ট্রান্স পাশ করেছিলেন। দাদুর বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল।—‘জানো সোনা, আমাদের বাড়িতে উল্লাসকর দত্ত, বারীন ঘোষের পায়ের ধুলো পড়েছিল।’—দি’মা এমনভাবে গল্প বলেন, সৌমির গায়ে কাঁটা দেয়।
“সোনা, ও সোনা, কোথায় গেলি, খাবি আয়!”
সৌমি শুনতে পায় দি’মা তাকে ডাকছে। টিয়ার হাত ধরে টান মারে।—”আয় খাবি আমার সঙ্গে।”
“না রে, মা খুঁজবে, বাড়ি যাই।”
সৌমি কোঁচরের ফুলগুলো দাওয়ায় ছড়িয়ে রেখে, কলতলায় হাত-পা ধুয়ে বাড়ির লাগোয়া ঢেঁকিঘরে এল। এই ঢেঁকি বলে কাঠের অদ্ভুত জিনিসটা সৌমি শুধু দি’মার বাড়িতেই দেখেছে। এ দিয়ে ধান ভানা যায়, চিঁড়ে কোটা যায়। তবে দি’মার তো অনেক ধানজমি, অনেক পুকুর, ফলবাগান, শষ্যক্ষেত—এইসব বেশিরভাগ চালই খুলনার কলে কোটা হয়। কিছু ভালো ধান বাড়িতে সেদ্ধ করে শুকিয়ে এই ঢেঁকিতে কোটা হয়। এই সমস্ত কাজ করে দেয় দি’মার লোকেরা—সুলেমান, বাদল, গফুর, টুসির মা, ফুলু। দি’মা বলে, ‘ওরা আমার হাত, ওদের জন্যেই টিকে আছি।’
নিকোনো মাটির ঢেঁকিঘরের একপাশে কাঠের জ্বালের উনুনে ভাত রান্না হচ্ছে। টুসির মা লাল চালের ভুরভুরে গন্ধের ফ্যানাভাত পদ্মপাতায় বেড়ে দিল। দি’মা বাড়ির ক্ষেতের আলুসেদ্ধ অনেকটা ঘি কাঁচা লংকা দিয়ে মেখে একদলা সৌমির পাতে দিলেন। উহ্, কী দারুণ স্বাদ! তবে দুপুরে দি’মার উঁচু আটচালা বাড়ির রান্নাঘরের কাছে খাওয়ার ঘরে কাঁসার থালায় ঝরঝরে ভাত, দি’মার নিজের পুকুরের কাতলা মাছ ভাজা, মাছের ঝোল এইসব খাওয়া হয়।
“সোনা, চল ঘুরে আসি।” দি’মার কথায় সৌমির মন নেচে ওঠে। ওরা কিছুটা হেঁটে দি’মার বড়ো পুকুরটার কাছে এল। টানা জাল দিয়ে বাদল-গফুর ওরা মাছ ধরছে। বেশ কয়েকটা চকচকে কাতলা, ফলুই, বাটা মাছ একটা অ্যালুমিনিয়ামের বড়ো হাঁড়ির মধ্যে রয়েছে।
“আমি যখন থাকব না, সোনাকে এমন করে মাছ ধরে খাওয়াবি।”
“ও দি’মা, তুমি কোথাও যাবে না।”
তিনি হাসেন।—”চল এগোই।”
ওদিকে স্থলপদ্ম, কাঞ্চন, জবা, কামিনী এইসব ফুলের বাগান পেরিয়ে তারা ভৈরব নদীর পাড়ের পথ ধরে। একদিকে বিশাল নদী, অন্যদিকে দি’মারই নানা সবজির ক্ষেত। মাচায় কুমড়ো, শসা ফলে রয়েছে। নদীর ঠান্ডা হাওয়ায় সৌমির শীত শীত করে। দিদিমা কিছুটা এগিয়ে গেছেন। এমনটা তো দি’মা কখনও করেন না! তার হাত ধরে সঙ্গে সঙ্গে চলেন।
আচ্ছা, এবার মা কি তার সঙ্গে আসেনি? তাহলে সৌমি একা কী করে বর্ডার পেরিয়ে, নদী পেরিয়ে দিমার কাছে এল!
সৌমি জোরে পা চালাল দি’মার কাছে যাব বলে। দি’মা বহুদূরে চলে গেছেন। সাদা কুয়াশার মধ্যে তাঁর সাদা শাড়ি ভাসছে। সাদা ফিনফিনে পাখাওয়ালা পরিরা দিদার হাত ধরে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে।
“দি’মা! দি’মা!” সৌমি ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে ছুটতে থাকে। দি’মা, দি’মা—সৌমির বুকফাটা কান্না ছড়িয়ে পড়ে ভৈরব নদীর পাড়ে কুয়াশামাখা শস্যক্ষেতে।
“সোনা, ও সোনা! কী হল, ঘুমের মধ্যে কাঁদছ কেন?” মা তাকে ঠেলেঠুলে জাগান।
“দি’মা কোথায় চলে গেল!” জেগে উঠেও সৌমির কান্না থামে না।
“তুমি স্বপ্ন দেখছিলে সোনা, সত্যি নয়।” মা হাসেন।
“দেরি হয়ে যাচ্ছে, তুমি সোনাকে রেডি করে দাও।” বাবা পাশের ঘর থেকে হাঁক পাড়েন। তাঁকে অফিস যেতে হবে। সৌমিও মায়ের সঙ্গে স্কুলে যাবে, তার মা তাদের স্কুলেরই টিচার।
ও-ঘরে মার ফোনটা বেজে যাচ্ছে। কথাবার্তায় মা শুনতে পায়নি। মা ও-ঘরে গিয়ে ফোনটা ধরে।
“ওই দেখ, তোর দিদার ফোন। শুধু শুধু কাঁদিস!” মা চেঁচিয়ে বলে।
দিমা একা থাকেন বলে মা গিয়ে আই.এস.ডি কার্ড ভরে দিয়ে আসে যাতে দি’মা সবসময় ফোন করতে পারেন। কথা শোনা যাচ্ছে না। চুপ করে মা কী কথা শুনছে? থমথমে মুখে এ-ঘরে এসে মা বাবাকে ডাকল।—”বাদল মার ফোনে বলছে, মা নাকি সকালে চা-বিস্কুট খেয়ে দাওয়ার মাদুর পাতা খাটে টানটান হয়ে শুয়ে পড়েছেন। এখন টুসির মা দেখে কোনও সাড় নেই। ডাক্তার এসে আমাকে খবর দিতে বলেছেন। চার ঘণ্টা পরে তিনি এসে যা লেখার লিখে দিয়ে যাবেন।” বলতে বলতে মা হাউ হাউ করে কাঁদতে লাগল।—”আমি এখনই যাব, মাকে শেষ দেখা দেখে আসি।”
“কিন্তু ভিসা নেই যে।” বাবাকে অসহায় দেখায়।
“বর্ডারে গিয়ে তো বলি। এতবার যাই, ওঁরা আমাকে চেনেন।”
“তুমি একা যাবে না। আমিও সোনাকে নিয়ে তোমার সঙ্গে যাচ্ছি।”
সৌমি হতভম্ব হয়ে মা-বাবার কথা শুনছিল। মা কেমন হয়ে গেছে। চোখ দিয়ে অবিরল জলের ধারা বইছে। পাসপোর্ট, টাকা এইসব নিয়ে বাড়িতে তালা দিল। বাবা সৌমির হাত ধরে মাকে নিয়ে অটোতে দমদম স্টেশন এসে বনগাঁর ট্রেনে উঠলেন। এই সকালবেলায় ভিড়টা একটু কম। তাও কত লোক উঠছে-নামছে, কত স্টেশন চলে যাচ্ছে, হকার হাঁকছে—মা যেন নিথর, এমনি তাকিয়ে আছে। সৌমিও ভাবছে, তাহলে সত্যিই কি দি’মা পরিদের দেশে চলে গেল?
বনগাঁ স্টেশনে নেমে অটোতে তারা পেট্রাপোল বর্ডারে এল। সৌমি জানে, এটা ভারতের দিক। আগেও মার সঙ্গে এসেছে। বাবা অফিসারদের কাছে গিয়ে মাকে দেখিয়ে অনেক কথা বলে কিছু একটা লিখিয়ে নিলেন। তাঁরা মাকে চেনেন। মা দি’মার বাড়িতে যাবার জন্য এই বর্ডার দিয়েই যাতায়াত করেন। কথাবার্তায় সৌমি যা বুঝল, ওতে লেখা আছে বাংলাদেশ বর্ডার একদিনের টেম্পোরারি পারমিট দিলে তারা যেতে পারে।
বাংলাদেশের বেনাপোল বর্ডারের লোকেরা মাকে এই অবস্থায় দেখে খুবই দুঃখিত হলেন। তাঁরা একদিনের জন্য একটা পারমিট করে দিলেন ও-দেশে যাবার জন্য। তবে সূর্যাস্তের আগে ফিরে আসতে হবে। শুধুমাত্র বিশেষ ক্ষেত্রেই এমন পারমিশন দেওয়া হয়, নইলে ভিসা ছাড়া যাওয়া যায় না।
তারা একটা ভলভো বাসে ঘণ্টা দুইয়ের মধ্যে খুলনা পৌঁছল। খুলনা ঘাট থেকে টাবুরে নৌকোয় নন্দনপুর ঘাটে উঠল। মাকে বাবা জড়িয়ে ধরে নিয়ে আসছে।
এই তো দি’মার বাড়ির উঠোনে এসেছে। এবার দি’মা হাসিমুখে বেরিয়ে এসে তাকে আদর করবেন—সৌমির মনে আশা। কিন্তু এ কী! উঠোনে, বারান্দায় এত লোক কেন? দাওয়ার মাদুরপাতা খাটে যেখানে সবাই মিলে বসে গল্প হত, সেখানে দি’মা ঘুমিয়ে আছে। মা গিয়ে দি’মাকে জড়িয়ে ধরে আছাড়ি-পিছাড়ি কাঁদছে। সৌমি খাটে উঠে দি’মার মুখখানা তার দুটো ছোটো হাত দিয়ে ধরে বলে চলেছে, “ও দি’মা, তুমি ওঠো, চলো নদীর ধারে বেড়াতে যাব।”
কিন্তু দি’মা উঠছে না, জাগছেও না। ডাক্তারবাবু পাশে চেয়ারে বসে ছিলেন। তিনি ডেথ সার্টিফিকেট লিখে মার হাতে দিলেন। গ্রামের লোক মিছিলের মতো তাদের সঙ্গে শ্মশানঘাটে চলল। নদীর ধারে দি’মাকে শুয়ে তার উপর কাঠ সাজিয়ে মা পাটকাঠির আগুন দিদার মুখে ছোঁয়াল। বাবা মাকে ধরে আছে, নইলে পড়ে যাবে। দাউ দাউ করে চিতার আগুন জ্বলছে। সৌমি ডুকরে কেঁদে উঠল।
অনেকক্ষণ জ্বলার পরে, পড়ে রইল আগুনপোড়া ছাই। ঠাকুরমশায়ের কথায় নদী থেকে ঘটে করে জল এনে মা চিতায় ঢেলে দিল। তাহলে সব শেষ! দি’মা আর কোথাও রইল না। গ্রামবাসীরা তাদের সঙ্গে ফিরে এল। আচার-নিয়ম পালন করে প্রতিবেশীদের আনা খাবার মা খেতে পারল না। শুধু বাবা চা-বিস্কুট খেল। আর সৌমিরও খেতে ইচ্ছে করছিল না। ও অল্প দুধ-বিস্কুট খেল।
টুসির মা, ফুলু, গফুর, বাদল, সুলেমান—ওরা সবাই ঘিরে বসেছিল। মা ওদের বলল, “এই জমিজমার ফসল সব তোমরাই ভাগ করে নেবে। শুধু ঘরদুয়ার পরিষ্কার করে রেখো, ভিসা নিয়ে কখনও মায়ের ভিটেতে আসব।”
টুসির মা কেঁদে কঁকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, বড়মা বলে গেছে সোনাদিদি এলে যত্ন করতে।”
এবার তাদের ফিরতে হবে। আসার সময় যেমন হুতোশ ছিল, ফেরার সময় গভীর দুঃখে সবাই চুপচাপ। দমদমের বাড়িতে ফিরতে ফিরতে সন্ধে পেরিয়ে গেল। মা সারাদিন উপোস রয়েছে, বাবা জোর করে একটু শরবত খাইয়ে দিল।
“কাল থেকে তিনদিন হবিষ্যি খাব।” মা বলল।
বাবা সেদ্ধভাত ফুটিয়ে নিল, তাই দুজনে খেল। সারাদিন অনেক ধকল গেছে। আলো নিভিয়ে তারা ঘুমিয়ে পড়ল।
অনেক রাতে সৌমির ঘুম ভেঙে গেল। অন্ধকারের মধ্যেও ঘরটা পদ্মফুলের মিষ্টি গন্ধে ভরে আছে। হঠাৎ দেখল শঙ্খের মতো ফর্সা দি’মা। সাদা চুল, সাদা শাড়িতে সরস্বতীর মতো দেখাচ্ছে। শূন্যের মধ্যে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে। বলছেন, “সোনা, আমি তোমার কাছেই থাকব।”
সৌমি মাকে ঠেলা দেয়।—”ও মা, ওই যে দি’মা।”
মা ঘুমজড়ানো স্বরে পাশ ফিরে শুয়ে বলল, “হ্যাঁ সোনা, তোমাকে নন্দনপুরে দি’মার কাছে নিয়ে যাব।”
ছবি-রাহুল মজুমদার