বিদেশি গল্প-ঝিলের ধারে বাড়িতে সেই রাত -(রিচার্ড হিউএস-এর গল্প অবলম্বনে)অনুবাদ: সুবীর-শরৎ২০২৩

লেখক পরিচিতি: রিচার্ড হিউএস-এর জন্ম ১৯ এপ্রিল, ১৯০০ সালে। তিনি ইংল্যান্ডের ওয়েব্রিজে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। কর্মজীবনে তিনি বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়িয়েছেন। ভ্রমণকালে লিখেছেন অসংখ্য কবিতা। তাঁর লেখা কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ হল ‘হাই উইন্ড ইন জামাইকা’, ‘জিপসি নাইট অ্যান্ড আদার পোয়েমস’। নিজের শেষ কাজ অসমাপ্ত অবস্থাতেই ২৮ এপ্রিল, ১৯৭৬ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

golpojhilerdharebari

ঝমঝম করে একটানা বৃষ্টি হয়েছে। এখন বৃষ্টিটা একটু থামলেও বাতাসের বেগ একফোঁটা কমেনি। গাছপালার ভিতর দিয়ে বাতাসের তীব্র সাঁ সাঁ শব্দে কান পাতা দায়। প্রায় কুড়ি-বাইশটা আরামদায়ক খামারবাড়ি পেরিয়ে ওরচেস্টারশায়ারের কাদাময় আঁকাবাঁকা গলি দিয়ে হেঁটে চলেছি আমি। কোনোখানে থামার বা থাকার ইচ্ছা আমার মনে জাগেনি। বর্তমানে আমার যা অবস্থা তাতে ওখানে গেলে আমাকে থাকতে দেবে তারও কোনও সম্ভাবনা নেই।

প্রায় সন্ধের মুখে রাত কাটানোর মতো একটা আস্তানা চোখে পড়ল। লোকালয় থেকে দূরে ঝোপঝাড় আগাছায় ঢাকা বাগানটা পেরিয়ে মজা ঝিলের পাড়ে পরিত্যক্ত, নির্জন বাড়িটা। আসন্ন সন্ধ্যার ম্লান আলোয় বাড়িটা কেমন মায়াবী লাগছিল। ঠিক করলাম আজ রাতটা এখানেই কাটাব।

বাগানের বড়ো গাছগুলোর পাতায় জমে থাকা বৃষ্টির জল হাওয়ায় নাড়া খেয়ে ঝরে পড়ছে। মনে হচ্ছে বাইরে বৃষ্টি কমে গেলেও এই বাগানে যেন এখনও বৃষ্টি কমেনি। বাড়িটার ছাদটা এখনও মজবুত আছে। দেখে মনে হল ভিতরে তেমন জল ঢোকেনি। একটা আস্তানার আমার খুবই প্রয়োজন। এই ভেজা পোশাক পরে সারারাত ভবঘুরের মতো ঘুরলে নির্ঘাত মারা পড়ব।

চারপাশটা একবার ভালো করে দেখে নিলাম। নাহ্‌, কেউ কোথাও নেই। ওরচেস্টারশায়ারের এইদিকটা এমনিতেই নির্জন। তাছাড়া বর্ষণ-ক্লান্ত সন্ধ্যা। বাতাসের দাপট এখনও কমেনি। এমনি সন্ধ্যায় প্যাচপ্যাচে কাদা মাড়িয়ে কে আসবে এদিকে? অতএব একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত, এখানে রাত কাটালে অনধিকার প্রবেশের দায়ে কেউ অভিযোগ করবে না।

কোটের লাইনিংয়ের ভেতর থেকে লোহার একটা শিক বের করলাম। সেটার সাহায্যে নিজের দক্ষতার সামান্য ব্যবহারে তালাবন্ধ দরজা খুলে ফেললাম। ভিতরে মরচে পড়া ছিটকিনি খুলতেও তেমন বেগ পেতে হল না।

ভেতরটা গাঢ় অন্ধকার। স্যাঁতস্যাঁতে একটা গন্ধ ভাসছে ঘরের বাতাসে। একটা দেশলাই জ্বাললাম। ওয়াটার প্রুফের মোড়কে থাকায় ওটা এখনও ভিজে নষ্ট হয়নি। দেশলাইয়ের মৃদু আলোয় দেখলাম, একটা অন্ধকার পথ। হাওয়ার ঝাপটায় কাঠিটা নিভে গেল। আমি দরজাটা বন্ধ করে দিলাম। অবশ্য এতটা সতর্কতার প্রয়োজন ছিল না। সন্ধ্যার অন্ধকারে গাছপালা দিয়ে ঘেরা বাগান পেরিয়ে বৃষ্টি-মুখর সন্ধ্যায় আমার দেশলাইয়ের আলো ক’জনেরই-বা চোখে পড়বে? তবুও সাবধানের মার নেই।

আরও একটা কাঠি জ্বালালাম। দেশলাইয়ের সামান্য আলোয় অন্ধকার পথ আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। পরপর বেশ কয়েকটি কাঠি জ্বালিয়ে পৌঁছে গেলাম পথের শেষে। সামনে একটা ঘর। এই ঘরের দরজায় কোনও তালা নেই। সামান্য ঠেলা দিতেই ভেজানো দরজা খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করলাম।

এখানকার হাওয়ায় সেই স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধটা নেই, বেশ স্বাভাবিক পরিবেশ। ঘরের একদিকে একটা ছোটো জানালা। বন্ধ। ঘরের এককোণে একটা মরচে ধরা পুরোনো চুল্লি। মনটা খুশি হয়ে গেল। অন্ধকার রাতে চুল্লি জ্বালালে ধোঁয়া কারও চোখে পড়ার সম্ভাবনা নেই। আর তাছাড়া এই সুযোগে ভেজা কাপড়গুলো আগুনের ওপর মেলে শুকিয়ে নেওয়া যাবে।

দেশলাইয়ের বাক্সে এখনও বেশ কিছু কাঠি আছে, আগুন জ্বালাতে সমস্যা হবে না। কিন্তু আগুন জ্বালিয়ে রাখার মতো কাঠকুটো কোথায়? অসহায়ের মতো চারপাশে তাকালাম—যদি পোড়াবার মতো কিছু পাওয়া যায়। মেঝেতেও কিছু নেই।

দেওয়ালের দিকে তাকাতেই সমস্যার সমাধান হয়ে গেল। হাজার হোক এই বাড়িটা তো আমার নয়। যদি কোনও ক্ষতি হয় সেটা তো আমার হবে না। ওকগাছের তক্তা দিয়ে দেওয়ালগুলো ঢাকা আছে। ছুরি বের করে বেশ খানিকটা কাঠ কেটে নিলাম।

ঘরের দেওয়ালে একটা বিশ্রী খুঁত হয়ে গেল। যাক গে, তাতে আমার কী? বাড়িটা তো আমার নয়। এক রাতের জন্য আশ্রয় নিয়েছি, ভোর হলে আবার নিজের পথে। কার কী ক্ষতি হল অত ভাবলে চলে না।

চুল্লিতে কাঠ দিয়ে আগুন জ্বালালাম। শুকনো ওক কাঠ চমৎকার পুড়তে শুরু করল। চায়ের জল চড়িয়ে আমি কাপড়চোপড় শুকাতে লাগলাম। বুটজোড়া চুল্লির পাশে খুলে রাখলাম। চা তৈরির প্রয়োজনীয় সবকিছু আমার কাছে আগে থেকেই ছিল।

আয়েশ করে চা শেষ করলাম। ততক্ষণে পোশাকও শুকিয়ে গিয়েছে। খিদে পেয়েছে। কিন্তু সঙ্গে থাকা খাবার অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছে। অগত্যা খালি পেটেই শক্ত মেঝেতে শুয়ে পড়লাম। খিদে সত্ত্বেও খুব তাড়াতাড়ি দু-চোখে ঘুম নেমে এল।

খুব বেশিক্ষণ ঘুমাতে পারলাম না। হঠাৎ করেই ঘুমটা ভেঙে গেল। চুল্লির আগুন এখনও বেশ জোরালো। শক্ত কাঠের মেঝেতে ঘুমানো অত সহজ নয়। একটু নড়াচড়া করলেই ঘুম ভেঙে যায়। শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অসাড় হয়ে আসে। পাশ ফিরে আবার ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু তখনই একটা শব্দ শুনে চমকে উঠলাম। অন্ধকার পথে একটা পায়ের শব্দ। এই ঘরের দিকেই এগিয়ে আসছে। স্পষ্ট বুঝতে পারলাম, বাড়ির মালিক আসছে। পালাতে হবে এখান থেকে।

ঘরে একটামাত্র ছোটো জানালা। সেটা খুললেও সেখান দিয়ে গলে পালাতে পারব না। একটামাত্র দরজা, যেটা দিয়ে ঢুকেছি। তেমন কোনও আলমারি বা কাবার্ডও নেই যে সেখানে লুকোব। নাহ্‌, লোকটার মুখোমুখি হয়ে ভদ্রভাবে এই সমস্যার সমাধান করতে হবে। তা না হলে অনধিকারে তার ঘরে প্রবেশ করার জন্য আমার নামে পুলিশের কাছে যদি অভিযোগ করে তাহলে আবার ওরচেস্টারশায়ারের জেলে ফিরে যেতে হবে আমাকে। মাত্র দু-দিন আগেই সেখান থেকে এসেছি আমি। আবার ওই নরকে ফিরে যেতে চাই না।

আগন্তুকের কোনও তাড়া নেই, ধীর নিশ্চিন্ত পায়ে এগিয়ে আসছে সে। দরজার ফাঁক দিয়ে সরু পথটাতে যে আলোটুকু পড়ছে সেটা দেখে বোধহয় ভাবছে, কে এল তার বাড়িতে?

দরজার ভেজানো পাল্লা দুটো খুলে গেল। ভিতরে প্রবেশ করল সেই আগন্তুক। ভাব দেখে মনে হল আমার উপস্থিতি যেন সে টেরই পায়নি। আমি অবশ্য ঘরের এককোণে গুটিসুটি মেরে বসে ছিলাম। চট করে দেখে ফেলাও সম্ভব নয়। সোজা চুল্লির কাছে চলে গেল সে। হাত দুটো আগুনের ওপর ধরে গরম করতে লাগল।

সন্ধ্যার পর আবার বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বোধহয় সেই বৃষ্টিতে ভিজতে হয়েছে লোকটাকে। অসম্ভব-রকম ভিজেছে সে। এমনকি অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টিতে ভিজেও আমি অমনভাবে ভিজিনি। তার পরনের জীর্ণ পোশাক একেবারে চুপসে গিয়েছে। টপটপ করে মেঝেতে জল ঝরছে সেগুলো দিয়ে। টুপি নেই লোকটার মাথায়। ভেজা চুল থেকে টুপটুপ করে জল পড়ছে জ্বলন্ত চুল্লিটার ওপর; আগুনের ওপর পড়ে হিস হিস শব্দ হচ্ছে। সেই অন্ধকার ঘরের মধ্যে তৈরি হয়েছে কেমন যেন একটা ভূতুড়ে পরিবেশ।

চেহারা দেখে লোকটাকে আইন মেনে চলা সুনাগরিক বলে মনে হল না। আমারই মতো ভবঘুরে। মনে হল একই পথের পথিক আমরা। এই একাকিত্ব ঘেরা অদ্ভুতুড়ে পরিবেশে আলাপ জমানোর সুতীব্র বাসনা এড়াতে পারলাম না। একটু হেসে জিজ্ঞেস করলাম, “কী মশাই, আপনিও কি আমারই মতো রাতের আস্তানার খোঁজে?”

“তাছাড়া আর কী? যা ঝড় শুরু হয়েছে! শুনতে পাচ্ছেন না বাইরে বাতাসের গর্জন?”

“তা পাচ্ছি। মনে হয় আজ সারারাত চলবে।”

“যা বলেছেন। খুবই খারাপ অবস্থা। তার ওপর যেরকম ভিজেছি! উফ্‌, কী ঠান্ডা! মনে হচ্ছে যেন বরফ হয়ে যাব।”

“হ্যাঁ, এইরকম আবহাওয়া রাস্তায় বেরোনোর পক্ষে খুবই খারাপ। তবে একটা ব্যাপারে ভেবে খুব অবাক হচ্ছি।”

“কী ব্যাপার?”

“ভাবছি এই বাড়িখানা পরিত্যক্ত কেন। পুরোনো হলেও বসবাসের পক্ষে অনুপযোগী নয়। অন্তত ভাড়া দিলে কিছু পয়সা তো আসত বাড়ির মালিকের কাছে।”

ঘরের মধ্যে কেমন একটা বদ্ধ পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল—জানালাটা খুলে দিলাম। বাইরে ঝড়ের বেগ বেড়েছে; বাতাসের হুংকার ভেসে আসছে। শব্দ করে দূরে কোথাও বাজ পড়ল। যেন একটা প্রকাণ্ড নীল-সাদা সাপ আকাশের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্তে এঁকে-বেঁকে চলে গেল। বাগানের গাছগুলো ঝড়ের দাপটে দুলছে। মনে হচ্ছে যে-কোনো সময় শিকড় উপড়ে আছড়ে পড়বে। কড়-কড়-কড়াত করে আবার একটা বাজ পড়ল। মনে হল সৃষ্টি যেন আজকেই রসাতলে মিশে যাবে।

খুকখুক করে একবার কেশে নিয়ে লোকটা বলতে শুরু করল।—”একটা সময় ছিল, এই বাড়িটার মতো সুন্দর বাগানঘেরা বাড়ি এই এলাকায় একটাও ছিল না। কিন্তু এখন? কোনও ভবঘুরে ভুলেও এখানে রাত কাটাতে চায় না। এমনকি ভিখারিরাও এই বাড়িতে থাকতে চায় না। ভালো করে দেখুন, কোনও ভিখারি থাকলে অন্তত কিছু ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো, খাবারের অবশেষ খুঁজে পেতেন।”

“কিন্তু কেন? বাড়িটার এই অবস্থা হল কী করে?”

“ভয়। বুঝলেন, ভয়।”

“ভয়? কীসের ভয়?”

“বুঝলেন না, ভূতুড়ে বলে এ-বাড়ির বদনাম আছে। প্রাণের ভয় কার নেই বলুন?”

“আপনি মনে হয় এ-বাড়ির ব্যাপারে অনেক কিছুই জানেন। একটু খুলে বলুন না।”

“সে বড়ো দুঃখের কথা। আপনার কি শুনতে ভালো লাগবে?”

“অন্ধকারে চুপচাপ বসে থাকার থেকে গল্প শোনা অনেক ভালো। আমি ভূত-টুতে অত বিশ্বাস করি না।”

“লোকে বলে, এ-বাড়ির মালিক পাশের ঝিলে আত্মহত্যা করেছিল। সাঁতার জানত না। তার মৃতদেহ যখন পাওয়া যায়, লাশ ভাসছে ঝিলের জলে। সারা শরীরে একটা পিচ্ছিল শ্যাওলা আর কাদামাটির আস্তরণ। আঠালো মাটিতে আটকে ছিল জলের পানা।

“মরবার পরেও নাকি গ্রামের অনেকে দেখেছে ওকে ঝিলের পাড়ে বিষণ্ণভাবে ঘুরে বেড়াতে। সবথেকে বেশি দেখা গিয়েছে স্কুলের কাছের রাস্তাটাতে। ছেলের ঘরে ফেরার অপেক্ষা করতে। ও বোধহয় ভুলেই গিয়েছে, ওর মৃত্যুর অনেক আগেই ওর স্ত্রী-ছেলে মারা গিয়েছে বসন্তরোগে। সবকিছু হারিয়েই দুঃখে-যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করেছিল লোকটি। স্ত্রী-পুত্রের মৃত্যুর পর লোকটা ঘরের বাইরে বেরোত না তেমন। বাড়িটার মধ্যে একা-একাই পায়চারি করত সারাদিন। মৃত্যুর পর এখনও মাঝে মাঝে পায়চারি করতে দেখা যায় লোকটিকে।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নড়েচড়ে বসল আগন্তুক। তার জুতোর মধ্যে জল থাকায় ভেতর থেকে ছপছপ আওয়াজ শোনা গেল।

কিছুক্ষণ নীরব কাটল। বাইরে অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। ঝোড়ো বাতাস যেন উড়িয়ে নিয়ে যেতে চায় বাড়িটিকে। কড়কড় করে চমকে উঠছে বিদ্যুৎ। বাজের আওয়াজে থরথর করে কেঁপে উঠছে চারপাশ।

এই অসহ্য নীরবতা কাটাতে আমি বললাম, “আমাদের কিন্তু ভয় পেলে চলবে না। ভূতের ভয়ে এই বাড়ির আশ্রয় ছেড়ে চলে গেলে এই দুর্যোগের মধ্যে রাস্তায় রাত কাটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়।”

“না না, এই বাড়ি ছেড়ে কেন যাব? ওসব ভূতুড়ে গালগল্পে আমি বিশ্বাস করি না।”

“সে আমিও করি না। শুনেছি খুব কম লোকই ভূত দেখে। আমি অবশ্য কোনোদিনই দেখিনি।”

আমার দিকে তাকাল আগন্তুক। বিষণ্ণ, করুণ সেই দৃষ্টি।—”কোনোদিন দেখেননি! ভাবছেন ভবিষ্যতেও দেখবেন না? ভালো। কোনো-কোনো মানুষ তো সারাজীবনেও ভূত দেখেনি। ভূতের উপদ্রব ছাড়াই দেশের মানুষ এমনিতেই কষ্টে আছে। তার ওপর ভূতের ভয় পেলে তারা কোথায় যাবে?”

“আমার কাছে অবশ্য ভূত নয়, পুলিশ হচ্ছে আসল ভয়ের কারণ। পুলিশ আর গায়ে পড়া কৌতূহলী লোকদের কারণেই আজকাল আমাদের মতো মানুষদের রাত্রে আশ্রয় পাওয়া কষ্টকর হয়ে উঠেছে।”

লোকটার জীর্ণ পোশাক থেকে তখনও জল ঝরছে। জলে ভেসে যাচ্ছে মেঝে। কেমন একটা আঁশটে গন্ধ আসছে তার গা থেকে। অবাক হয়ে বললাম, “এতক্ষণ আগুনের পাশে বসে আছেন, তার পরেও আপনার পোশাক শুকোল না? মাথা আর গা থেকে যে এখনও জল ঝরছে।”

“শুকোবে না।” খুকখুক করে কাশল লোকটা। তারপর হেসে বলল, “আমার শরীর শুকোনোর কথা বলছেন? শুকোবে না। কোনোদিন শুকোবে না। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা—সবসময় এইরকমই থাকবে। আমার মতো যাদের অবস্থা তাদের শরীর শুকোয় না। দেখবেন? এই দেখুন।” লোকটা তার ভেজা হাত দুটো ঢুকিয়ে দিল চুল্লির ভিতর। ভ্রূ কুঁচকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে ওই আগুনের দিকে। সে এক বদ্ধ উন্মাদের দৃষ্টি। না, এই ভয়ংকর অমানুষিক, অপার্থিব দৃষ্টি কোনও মানুষের হতে পারে না।

মুহূর্তের মধ্যেই পুরো ব্যাপারটা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে গেল। একটা শীতল শিহরন খেলে গেল আমার সারা শরীরে। এ-ই সেই জলে ডুবে মরে যাওয়া বাড়ির মালিকের লাশ। নিজের অজান্তেই একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল আমার মুখ দিয়ে। বুটজোড়া হাতে নিয়ে একছুটে বেরিয়ে এলাম সেই অভিশপ্ত বাড়িটা থেকে।

অন্ধকার বাগান পেরিয়ে ঝিলের পাশ দিয়ে কীভাবে যে বড়ো রাস্তায় পৌঁছলাম বলতে পারব না। বাইরের দুর্যোগ এখন আমার অন্যরকম লাগল। বৃষ্টিকে মনে হল ঈশ্বরের আশীর্বাদ। বজ্রের গর্জন হল আমার এগিয়ে চলার সংকেত। কাদামাখা পথ এখন আমার পরম আশ্রয়। বিদ্যুতের আলোয় পথ দেখে আমি অভিশপ্ত বাড়িটাকে পিছনে ফেলে এগিয়ে চললাম।

ছবি-সুলতা মিস্ত্রী

জয়ঢাকি গল্প-উপন্যাসের লাইব্রেরি এইখানে

Leave a Reply