
“ডুঙ্গেশ্বরী যাবেন নাকি?” বিকেল পাঁচটা নাগাদ মিস্টার সেনএর ফোনটা পেয়ে চমকে গেছিলাম। কিন্তু ডুঙ্গেশ্বরী সেটা আবার কোথায়?
“হ্যাঁ বা না কিছু বলুন, সন্ধে ৮টা নাগাদ রওনা দেব আজই।” না বলার কোন প্রশ্ন নেই, সবে পুজোসংখ্যার লেখাগুলো শেষ হয়েছে। মাথা একদম ফাঁকা হয়ে আছে, ওনার সঙ্গে গেলে কিছু না কিছু লেখার রসদ জুটবেই জুটবে।
“অবশ্যই যাব, ডুঙ্গেশ্বরী মানে সেই নর্থ বেঙ্গলের পাহাড় তো?”
“আজ্ঞে না। প্রাগবোধি পাহাড়ের নাম শুনেছেন?”
“চেনা চেনা ঠেকছে, সেই ‘কুকস ফুট মাউন্টেন’ তো, যেখানে বসে বুদ্ধদেব তপস্যায় সিদ্ধিলাভ করেছিলেন?”
“ঠিকই ধরেছেন, তবে ডুঙ্গেশ্বরী পাহাড় নর্থ বেঙ্গলে নয়। ‘কুকস ফুট মাউন্টেন’ আর প্রাগবোধি পাহাড়ও এক নয়। কুকস ফুট মাউন্টেন – রাজগীরে। কুকস ফুট মাউন্টেনের সঙ্গে মহাকাশ্যপ জড়িত, বুদ্ধদেব নন। ডুঙ্গেশ্বরী আর প্রাগবোধি একই পাহাড়, এখানেই পাহাড়ের এক গুহায় বসে বুদ্ধদেব দীর্ঘকাল ধ্যান করেছিলেন।”
আমি নিশ্চিত, লজ্জায় আমার জিভ কাটা মিস্টার সেন দেখতে পাননি। কিন্তু ডুঙ্গেশ্বরি পাহাড়টা আবার কোথায়! জানতে চাওয়ার আর সাহস হল না।
“ঠিক সাড়ে সাতটায় চলে আসবেন, আর হ্যাঁ, ছবি তোলার সব সরঞ্জাম নিয়ে আসবেন।” ফোনটা ছেড়ে, গুগ্ল খুলে বসেছিলাম। যাওয়ার আগে জায়গাটা সম্পর্কে জেনে যাওয়া ভালো।
আবার ফোন। “স্লিপিং ব্যাগ সঙ্গে নিয়ে নেবেন,” এক নিশ্বাসে কথাক’টা বলে ফোন ছেড়ে দিলেন মিস্টার সেন। খানিক অবাক হয়ে গিয়েছিলাম, যা বলার একবারেই বলেন উনি, দ্বিতীয়বার ফোন করলেন মানে ওঁর মাথায় কিছু ঘুরছে। কিন্তু আগস্ট মাসে স্লিপিং ব্যাগ! তাহলে ডুঙ্গেশ্বরী পাহাড় কি হিমালয়ের কাছাকাছি কোথাও? তাই বা কী করে হবে? সিদ্ধার্থ তো লম্বা ধ্যানে বসেছিলেন গয়ার কাছে! সেই ফল্গু নদীর ধারে। তবে কি আমরা গয়া যাচ্ছি? মিস্টার সেন আবার কবে থেকে ধর্মকর্ম নিয়ে মাতলেন!
স্লিপিং ব্যাগটা আছে কোথায়? এখনও গিন্নি স্কুল থেকে ফেরেনি, ও-ই এ’সব গুছিয়ে রাখে। খানিক পরেই বিনা নোটিসে বের হব শুনলে আবার না খ্যাঁচ খ্যাঁচ শুরু করে। কতদিনের জন্য যাচ্ছি তাও জানি না। যাকগে যা হবে দেখা যাবে।
লামাদের পোশাক পরা ন্যাড়া মাথা একজন লোক গাড়ি চালাচ্ছিল। স্টিয়ারিংএ বসার পর একটাও কথা বলেনি লোকটা। স্টিয়ারিংএ বসার পর কেন তার আগেও ওর মুখ থেকে একটাও কথা শুনিনি। লোকটাকে আগে কখনও দেখিনি। কোথা থেকে লোকটাকে জোটালেন জানতে চাইনি, কারন মিস্টার সেন এইসব উত্তর যথাসময়ে নিজে থেকেই দিয়ে দেন। লম্বা ড্রাইভে গেলে মিস্টার সেন নিজেই ড্রাইভ করেন, খানিক রাস্তা আমিও চালাই, সঙ্গে আর কেউ থাকে না আমাদের। তাই এইবার সঙ্গে অজানা একটা লোককে দেখে অবাক হয়েছিলাম।
গুগল বলে দিয়েছিল ডুঙ্গেশ্বরী বোধগয়ার উল্টোদিকে। তবে কি লোকটা ওইখান থেকে এসেছে? বুদ্ধগয়া তো লামাদের জায়গা!
আমরা চলেছি মাহিন্দ্রার ‘থর’এ চেপে। গাড়িটা সদ্য কিনেছেন মিস্টার সেন। ১৪০কিমি গতিতে গাড়িটা ছোটাচ্ছিল লামা ড্রাইভার। দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে দুর্গাপুর পার হয়ে এসেছিলাম আমরা। আমি চালালে ঘণ্টাতিনেক লাগাতাম পৌঁছতে।
“গতকাল সন্ধেবেলা বিহারের চিফ সেক্রেটারি ফোন করেছিলেন, মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে,” গাড়িতে ওঠার পর প্রথম কথা বললেন মিস্টার সেন, “ওদের পুলিশের পক্ষে হঠাৎ করে সারা পৃথিবী থেকে হামলে পড়া ভিড় সামলানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে।”
আমি চুপ করে শুনছিলাম। কীসের ভিড়, কেন ভিড় জানি না। এর আগে বোধগয়া কখনও যাইনি। শুনেছি সেটা একরকম আন্তর্জাতিক শহর। বছরভর বিদেশি লামাদের আনাগোনা লেগেই থাকে।
“কাগজে নিশ্চই দেখেছেন, বুদ্ধদেব ফিরে এসেছেন বলে রব উঠেছে, ক’দিন ধরে রাতে ডুঙ্গেশ্বরী পাহাড়ের পায়েসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।”
“পায়েস!”
“ঠিক, পায়েসের গন্ধ। ডুঙ্গেশ্বরী পাহাড়ের কাছেই সুজাতার গ্রাম। সুজাতার দেওয়া পায়েস খেয়েই উপবাস ভঙ্গ করেছিলেন গোতম।”
“গোতম!”
“হ্যাঁ আমরা গৌতম বলি, কিন্তু আসল উচ্চারণ হল গোতম।”
“ও!”
“যিনি গাড়ি চালাচ্ছেন, তিনি ডুঙ্গেশ্বরী পাহাড়ের মাথায় যে গুহায় গোতম বসে ধ্যান করেছিলেন এবং যাকে ঘিরে এখন এক মন্দির গড়ে উঠেছে তার প্রধান পূজারী। মহাবোধি সোসাইটি থেকে ওঁকে সরাসরি আমার কাছে পাঠানো হয়েছে, বুদ্ধদেব রহস্যের কিনারা করতে। ওখানকার পুলিশ বা সোসাইটি বুদ্ধদেব সত্যিই ফিরে এসেছেন কিনা জানতে চান।”
“এরকম একটা খবর পড়েছিলাম যেন কদিন আগে।”
“ঠিকই পড়েছেন। কথিত আছে মহাপুরষরা ফিরে আসেন। পায়েসের গন্ধর সঙ্গে মিথ মিশে সারা বিশ্বে গল্প ছড়িয়ে গেছে, বুদ্ধদেব পুনর্জন্ম নিয়েছেন।”
“যিনি গাড়ি চালাচ্ছেন তাঁর নাম শাসনপাল, পাল বলে আবার বাঙালি ভাববেন না, একবর্ণ বাংলা বোঝেন না। খানিক কাজ চালানোর মতো ইংরেজি আর হিন্দি জানেন। উনি শ্রীলঙ্কার লোক। পাহাড়ের মাথার মন্দিরটা শ্রীলঙ্কা সরকারের অর্থেই তৈরি।” আমি চুপ করে শুনে যাচ্ছিলাম, প্রশ্ন করা মানেই তাল কেটে যাওয়া।
“সারা পৃথিবী থেকে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা এসে জড়ো হচ্ছেন পাহাড়ের নীচে। সার সার তাঁবু গেঁড়ে উপাসনায় বসে আছে কয়েক হাজার মানুষ। এদের নিরাপত্তা দেওয়া সরকারের মাথাব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই বুদ্ধগুহায় যেতে চাইছে। নেহাত এরা শান্তিপ্রিয়, তাই পুরো জায়গাটা কর্ডন করে কোনোমতে ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে এদের। সামান্য কিছু করে লোককে প্রতিদিন গুহা দর্শনে যেতে দেওয়া হচ্ছে, পবিত্রতা বজায় রাখার নামে। ওই পাহাড়ের কোন নতুন মানুষের উপস্থিতি টের পাওয়া না গেলেও, পায়েসের গন্ধ যে পাওয়া যাচ্ছে, তা শাসনপাল থেকে ওখানে যেসব সন্ন্যাসী থাকেন সবাই কনফার্ম করেছেন। সরকার চাইছেন আমরা সত্যটা খুঁজে বের করি, সত্যিই বুদ্ধ ভগবান ফিরে এসেছেন না অন্য কোন রহস্য লুকিয়ে আছে পেছনে। একসময় এই জায়গাটা সন্ত্রাসবাদীদের ডেন ছিল। তবে এখন আর সে সব কিছু নেই। কিন্তু সরকার কোন ঝুঁকি নিতে চায় না। ওদের ইন্টেলিজেন্স বিভাগ এখনও রহস্যের কোনো কিনারা করতে পারেনি।
“খানিক ঘুমিয়ে নিন। ভোর চারটের মধ্যে আমরা পৌঁছে যাব। শাসনপাল খুব ভালো ড্রাইভার, একাই পুরো রাস্তা চালাবে।
“বাই দ্য ওয়ে, শাসনপাল ভিক্ষু হবার আগে ফর্মুলা কার ড্রাইভার ছিল, একজন ইঞ্জিনিয়ারও বটে।”
যতই ঘুমোবার চেষ্টা করি চোখের সামনে ভেসে ওঠে মুণ্ডিতমস্তক কাষায়পরিহিত সৌম্যদর্শন একটি মুখ। আমার সারা বাড়িতে ছড়ানো বুদ্ধের নানা ভঙ্গীর মূর্তি। কাজেই বারবার চোখের সামনে ভেসে ওঠা মুখটি যে গোতম বুদ্ধের তাতে কোন ভুল নেই। স্বপ্ন দেখছিলাম পাহাড়ের গুহায় স্বয়ং বুদ্ধদেব ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছেন, তবে শরীর কঙ্কালসার নয়। অনেকটা এই শাসনপালের মতো, মোটাসোটা গাবলুগুবলু চেহারা। আর সামনে বসে সুন্দর পোশাক পরিহিতা এক নারী। হাতে মোটা মোটা সোনার গয়না আর গলায় ইয়া চওড়া সোনার হার। দু’হাতে একটা পায়েস ভরা সোনার বাটি ধরে। আর আমি পটাপট ছবি তুলে যাচ্ছি।
ঘুমের চটকা ভেঙে গিয়েছিল গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দে। আবছা আলো রাতের নীরবতাকে কাটতে পারেনি। দেখি একটা ব্রিজের মুখে দাঁড়িয়ে আছি। সামনেটা বড়ো বড়ো গার্ড রেল দিয়ে আটকানো। তার সামনে একটা নো এন্ট্রি বোর্ড। কয়েকজন পুলিশ গার্ড রেলের থেকে খানিক দূরে চেয়ারে বসে ঢুলছে। শাসনপাল হর্ন দিয়ে পুলিশগুলোকে ডাকছিল। একজন পুলিশ চেয়ারে বসেই হাতের বড়ো টর্চটা জ্বালিয়ে ফিরে যেতে ইশারা করছিল। তাতে দমে না গিয়ে হর্ন বাজিয়েই চলছিল শাসনপাল। কয়েকবার হর্ন বাজাবার পর, চার পাঁচজন পুলিশ এগিয়ে এলো গাড়ির সামনে।
ভেজা রাস্তা আর ইতিউতি জমে থাকা জল বলে দিচ্ছিল খানিক বৃষ্টি হয়ে গেছে। কাচ নামাতে ঠান্ডা বাতাস শরীর কাঁপিয়ে দিল। এখন বুঝলাম কেন স্লিপিং ব্যাগ আনতে বলেছিলেন প্রফেসার তপনানন্দ সেন।
গাড়ি থেকে নেমে পুলিশগুলোর দিকে এগিয়ে গেছে শাসনপাল। কথা না শুনতে পারলেও বুঝতে পারছিলাম পুলিশরা আমাদের গাড়ি নো এন্ট্রি টপকে যেতে দিতে নারাজ। রাস্তার ধারের দোকানের বোর্ড দেখে বুঝতে পারছিলাম বোধগয়া এসে গেছি। এতো ভালো গাড়ি চালিয়েছে শাসনপাল যে কোনোকিছু টেরই পাইনি। মিস্টার সেন চুপ করে বসে আছেন।
শাসনপাল কারো সঙ্গে ফোনে কথা বলতে বলতে নাছোড় পুলিশ অফিসারকে তার ফোনটা ধরিয়ে দেওয়ার মিনিটখানেকের মধ্যে, ছুটে এসে গার্ড রেলগুলো সরিয়ে দিল পুলিশরা। শাসনপাল আবার স্টিয়ারিং-এ বসতে ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা একটা পুলিশের জিপ আমাদের গাড়ির সামনে হুটার বাজিয়ে এগোতে লাগল। জীবনে এই প্রথম পুলিশের জিপের পেছন ছুটছি।
“ওই যে নীচে শুকনো বালির চড়া দেখছেন, সেগুলোই কয়েকদিন টানা বৃষ্টি হলে ভয়ংকর হয়ে ওঠে। এটা ফল্গু নদী, খানিক উত্তরে মহোনা এসে মিশেছে এই নদীতে। এই নদীকে লিলাজান বা নিরঞ্জনাও বলে অনেকে।
“এক উন্মত্ত বর্ষায় শুধু শিক্ষা লাভের আশায় গুরু অলর কলন-এর কাছে পৌঁছতে উনি এইরকম এক ভয়াবহ নদী সাঁতরে পার হয়েছিলেন। অবশ্য ঘোর বর্ষায় ঝড়বাদলে সাঁতরে নদী পার হবার উদাহরণ আরও আছে। আমাদের বিদ্যাসাগর, সাধে কি এরা মহাপুরুষের সম্মান পেয়েছেন?”
মিস্টার সেন-এর কথার উত্তর দেব কী, ব্রিজের ওপর দিয়ে গাড়িটা যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। নীচের ওই হলদে দানার বিছানা দেখে আমার মাথা খারাপ হবার জোগাড়। শেষ আর হচ্ছে না। এই সেই ফল্গু নদী – অন্তঃসলিলা! বালি খুঁড়লেই নাকি জল পাওয়া যায়। হয়তো সোনাও!
ব্রিজ শেষ হতে না হতেই দেখি খানিক পরপর পুলিশের দল দাঁড়িয়ে। দুপাশে ভুট্টার ক্ষেত। তার মাঝ দিয়ে চলে গেছে পিচের রাস্তা। এখনও অন্ধকার পুরোপুরি কাটেনি। ভিড় না থাকলেও যে দু’একটা গ্রাম পড়ছিল, তার কোল ঘেঁষে একের পর এক তাঁবুর সার নজরে পড়ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল প্রায় সবগুলো তাঁবুই নতুন। রঙগুলো অধিকাংশেরই হয় গেরুয়া না হয় মেরুন। কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসীকে দেখলাম তাঁবুর সামনে ফোম ম্যাট বিছিয়ে চোখ বন্ধ করে ধ্যান করছে।
নদীর ধার ঘেঁষা কয়েকটা হোটেলও নজরে এলো। ‘বুদ্ধ ভগবান ফিরে এসেছেন’ বলে একটা ঘটনা ঘটে চলেছে পুলিশের জটলা না থাকলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। মিস্টার সেন আবার মুখে কুলুপ এঁটেছেন। পুলিশের জিপকে সেই গাড়ি ছাড়ার পর আর হুটার বাজাতে শুনিনি। যদিও মনে মনে ইচ্ছে হচ্ছিল জিপ গাড়িটা হুটার বাজিয়ে যাক, সবাই একটু ঘুরে ঘুরে আমাদের দেখুক।
একটা পথের বাঁকে সামনের এসকর্ট জিপটা আচমকা ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে হুটার বাজাতে শুরু করে দিল। আমার মনের ইচ্ছে পূরণ হলেও মিস্টার সেন বলে উঠলেন, হুটারের শব্দ শুনলেই নিজেকে কেমন যেন অসুস্থ বলে মনে হয়। ঠিক যেন অ্যাম্বুলেন্স যাচ্ছে। আমি মনে মনে লম্বা জিভ কাটলাম, দেখো দৃষ্টিভঙ্গীর কতো ফারাক। হুটারের শব্দ আমার কাছে ভি আই পি ট্রিটমেন্ট-এর, আর ওঁর কাছে অসুস্থ মানুষের সাহায্যের আবেদন।
গাড়িটা খুব আস্তে গড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল শাসনপাল। সামনে খানিক ঢাল। ঢালের পাশে একটা বিশাল বটগাছ। শয়ে শয়ে শেকড় নেমেছে বটগাছটা থেকে। কোনটা যে আসল কে জানে। বটগাছের নীচে একটা সোনালি রঙ-এর বুদ্ধের ছোটো মূর্তি। অগণিত রঙচঙে কাপড় বটগাছের গুঁড়িকে বেড় দিয়ে ঝুলছে। কয়েকটার মধ্যে আবার কীসব লেখা। কয়েক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষু না না আর একটা কী যেন বলে – শ্রমণ, বটগাছকে ঘিরে বসে। এটাই কি সেই বোধিবৃক্ষ, যার তলায় বসে ধ্যান করতেন গোতম! না, মিস্টার সেনকে জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না। আমি যে এতটাই অজ্ঞ সেটা প্রকাশ করার কোন দরকার নেই।
“নদীর চড়াটা অনেক এগিয়ে এসেছে, আগে বেশ খানিকটা ঝোপঝাড় দেখেছিলাম নদীর চড়া আর এই গাছটার মধ্যে। এখানে অনেক এরকম প্রাচীন বৃক্ষ দেখতে পাবেন। ভাগ্য ভালো বটগাছ বলে এখনও কুড়ুলের কোপ পড়েনি। বহু হোটেল আর লজ গড়ে উঠছে নদীর এপারেও। বুদ্ধদেব যে গাছের তলায় বসে ধ্যানরত ছিলেন সে গাছ নদীর ওপারে, বোধগয়ায় মহাবোধি টেম্পেল কমপ্লেক্সে।” মিস্টার কথা শুনে মনে হল উনি বোধহয় আমার মনের কথা টের পেয়ে গেছেন।
রাস্তাটা খালি ছিল, বৌদ্ধরা খুব ডিসিপ্লিন্ড, কয়েক হাজার লোক বসে আছে রাস্তাটা ব্লক না করেই। আমাদের গাড়ি এগিয়ে গেল নিঃসাড়ে। দুটো কুকুর রাস্তায় পায়ের মধ্যে মুখ গুঁজে শুয়ে ছিল। সামনের পুলিশের গাড়িটা গিয়ে সামনে দাঁড়াতেও ওঠার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছিল না ওদের মধ্যে। শ্রমণদের ঘিরে রাখা পুলিশ দলের একজন গিয়ে কুকুরদুটোর সামনে লাঠি ঠকঠক করতে উঠে দাঁড়িয়ে শরীরদুটো সামনের পায়ে ভর দিয়ে টানটান করে আড়মোড়া ভেঙে ভুট্টা ক্ষেতের পাশে গিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। একটা জিনিস ভালো লাগল, কোনো গাড়িই হর্ন বাজিয়ে উপস্থিত সন্ন্যাসীদের প্রার্থনায় ব্যাঘাত ঘটায়নি।
শাসনপাল ভাঙা ইংরেজিতে জানাল – এরপর থেকে আর কাউকে আর এগোতে দেওয়া হচ্ছে না। লোকটা সারা রাস্তা প্রায় কোন কথাই বলেনি। দূরের পাহাড় অনেকটাই কাছে এসে গেছিল। খুব একটা উঁচু না হলেও পাহাড়গুলো যে যথেষ্ট খাড়াই সেটা পাহাড়ের ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে জানি। পাহাড়ের পেছনদিকটা লাল হয়ে উঠেছে। তার মানে ওটাই পূর্বদিক। শাসনপাল পাহাড়ের গায়ে জ্বলতে থাকা কয়েকটা আলোর বিন্দুর দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল ওটাই ভগবান বুদ্ধের গুহা তথা ওদের মঠ।
দুপাশে কাঁটা আর ইউক্যালিপটাসের বন। কয়েকটা গোরুহীন গোরুর গাড়ি একদিকে হেলে দাঁড়িয়ে। বেশ কয়েকটা কাঁঠালের গাছ চোখে পড়ল। রাস্তার পাশ বরাবর সিমেন্টের পোস্টের মাথায় টান টান হয়ে থাকা ইলেকট্রিক তারের ওপর সার দিয়ে বসে টিয়া আর বাঁশপাতি পাখি। মাঝে মাঝেই বাঁশপাতিকে টিয়ার বাচ্চা বলে ভুল করে ফেলি। সূর্যের প্রথম আলোয় একটা সোনালি আভা জড়িয়ে পাখিগুলোর গায়ে। টিয়া আর বাঁশপাতিদের মাঝে কিছু শালিক আর পায়রাও জায়গা করে নিয়েছে। একটা উড়ন্ত ফরিংকে, তার থেকে খানিক লাফ মেড়ে উঠে ঠোঁটের ফাঁকে ধরে আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসেছে একটা ফিঙে। ব্রেক-ফাস্ট হয়ে গেল ওর। আমারও পেটটা খিদেয় চোঁ চোঁ করে উঠল। কাল বাড়ি থেকে বেরোনোর পর আর কিছু খাওয়া হয়নি। পাখিগুলো দেখে ক্যামেরা ব্যাগের চেনটা খোলার জন্য একবার হাত চলে গেছিল। কিন্তু এবার তো ছবি তুলতে আসিনি। যদিও মিস্টার সেন-এর নির্দেশে ছবি তোলার সব যন্ত্রপাতি নিয়েই এসেছি।
রাস্তাজুড়ে একের পর এক গার্ড রেল। পুলিশ অলস হয়ে বসে প্লাস্টিকের চেয়ারে। সাধারণ লোকজন একটাও চোখে পড়েনি। মানে পুলিশ খুব কড়া হাতে বজায় রেখেছে জায়গার পবিত্রতা। একটা ভুল মানেই আন্তর্জাতিক খবর হয়ে যাওয়া।
একটা মাঠের মধ্যে গিয়ে গাড়িটা দাঁড়াল। মাঠকে ঘিরে বেশ কিছু পরিপাটি করে বাঁশ দিয়ে তৈরি ছোটো ছোটো রিসর্ট। বড়ো বড়ো কংক্রিটের হোটেল এক কিলোমিটারের মধ্যে দেখতে পাইনি। সম্ভবত এখানে হোটেল তৈরির অনুমতি দেয়নি সরকার। জায়গাটাকে প্রায় ন্যাড়াই বলা যায়। ইউক্যালিপটাস, মহুয়া আর কয়েকটা শাল গাছ। বেশ কিছু ডুলি মাটিতে পড়ে যাত্রীর অপেক্ষায়। পাহাড়ের গায়ে সাদা রঙ করা বৌদ্ধ মঠটা দেখে মনে হল ওর উচ্চতা খুব বেশি হলে দেড়-দুশ ফুট হবে। এই সামান্য উচ্চতার জন্যও ডুলিতে উঠতে হয়!
গাড়ি থেকে নামতে দেখি কয়েকজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী দ্রুত এগিয়ে আসছে আমাদের দিকে। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে একটা সিমেন্ট বাঁধানো পথ ঘুরে ঘুরে উঠে গেছে মঠের দিকে। একদল হনুমান বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে বসে ছিল যেখান থেকে সিমেন্টের পথ শুরু হয়েছে সেখানে। শাসনপালের হাতে পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে আসা সন্ন্যাসীরা একটা ব্যাগ ধরিয়ে দিতেই হনুমানগুলো ঘিরে ধরল তাঁকে। ব্যাগের ভেতর থেকে একটা একটা ফল বের করে হনুমানগুলোর হাতে দিতেই সেগুলো নিয়ে গাছের ডালে চড়ে বসল হনুমানের দল।
“প্রতিদিন যারা এখানে আসেন তাঁরা অনেক ফল দিয়ে যান। সেই ফলগুলোই বিলিয়ে দেওয়া হয় হনুমানগুলোকে,” শাসনপাল নিজে থেকেই বলে উঠলেন।
আমাদের ব্যাগগুলো গাড়ি থেকে নামিয়ে কাঁধে তুলে নিয়েছিল মঠ থেকে আসা লোকজন।
চারপাশের পাহাড়গুলো মোটের ওপর ন্যাড়াই বলা যায়। দু’একটা গাছ, টাকের ওপর কয়েক গাছি চুলের মতো খাড়া হয়ে আছে এখানে সেখানে।
মিস্টার সেন গাড়ি থেকে নেমেই বাইনোকুলার চোখে লাগিয়েছিলেন। অনেকক্ষণ পর আবার কথা বললেন। শাসনপালের দিকে তাকিয়ে জানতে চাইলেন, “গতকালও কি পায়েসের গন্ধ পাওয়া গিয়েছিল?”
শাসনপাল, একজনকে কী যেন জিগ্যেস করলেন – ভাষাটা চেনা নয়, শুনতে অনেকটা দক্ষিণী ভাষার মতো। মনে হয় সিংহলি হবে, মঠটাতো শ্রীলঙ্কানদের অনুদানে তৈরি।
“হ্যাঁ, কাল দু’বার, একবার সন্ধের খানিক পর আর একবার ভোর রাতে।”
“অস্বাভাবিক কিছু কি দেখা গেছে?”
খানিক আগে যিনি শাসনপালের কথার উত্তর দিয়েছিলেন, তিনি সরাসরি বললেন, “না স্যার, তবে গন্ধটা যখন আসে তখন গাছ কেঁপে ওঠে, আর ছোটো ছোটো পাথর গড়িয়ে পড়ার আওয়াজ শোনা যায়, ঠিক যেন পাহাড়ের গা বেয়ে কেউ হাঁটছে। আমরা ঘরের বাইরে বেরোইনি বুদ্ধ ভগবান যদি আমাদের দেখে না ফিরে আসেন এই ভেবে।”
একটা জিনিস অবাক লাগল, পুরো মন্দির চত্বরে কোন পুলিশের উপস্থিতি নেই। সাধনার জায়গা ফিরে আসা বুদ্ধ ভগবানের দর্শনার্থীদের পুলিশ দক্ষতার সঙ্গে আটকে রেখেছে বহু দূরে।
বাঁধাই রাস্তাটার দু’পাশে শাল আর ইউক্যালিপটাস গাছের সারি। ছায়া দেবার জন্যই হবে। গাছগুলোর আকৃতি বলে দিচ্ছে যে তাদের বয়স বেশি নয়। কিছু খেজুর গাছ, আর ছোটো ছোটো বটগাছ পাহাড়ের নীচে। পাহাড়টা সটান উঠে গেছে – খাড়া ওপরে। ভালো পাহাড়ু না হলে এই পাহাড় বেয়ে চূড়ায় ওঠা অসম্ভব। অবশ্য মিস্টার সেনের অসামান্য আবিষ্কার উড়ুক্কু চাদর আছে। অবশ্য সে চাদর মিস্টার সেন একবারই প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছিলেন। মিস্টার সেন আর আগের মতো খ্যাপাটে আচরণ করেন না। বরং এখন অনেকটা দুঁদে গোয়েন্দার মতো চলনবলন ওনার। আমি অবশ্য ট্রেকিং-শু পরে এসেছি।
খানিক পরপর লম্বা বাতিস্তম্ভ রাস্তার পাশে। রাতেও কি লোকজন আসে এখানে?
হঠাৎ রাস্তার পাশের একটা গাছ নড়ে উঠতেই দেখি, একজন বৌদ্ধ সন্ন্যাসী পায়ে চপ্পল পরে গাছের মাথায়। বেল পাড়ছে। অনেক বেলগাছ জায়গাটা জুড়ে।
রাস্তার পাশে কয়েকটা ছোটো ছোটো চায়ের দোকান। দোকানের মাথায় লাগানো ব্যানার দেখে বুঝলাম এখানে মোমবাতি আর ধূপকাঠি পাওয়া যায়। পুজা দিতে এসে প্রায় সবাই মোমবাতি আর ধূপ জ্বালায়। খারাপ লাগল রাস্তার পাশে চিপস, বিস্কুট আর কোল্ড ড্রিঙ্কসের খালি বোতল পড়ে থাকতে দেখে, অথচ ময়লা ফেলার পাত্র রাখা আছে, আর সেগুলো প্রায় খালি।
মিনিট দশেকের মধ্যে পৌঁছে গেছিলাম মঠে। খাড়া পাহাড়ের গায়ে খানিক জায়গা সমতল করে কায়দা করে বানানো কয়েকটা ঘর। পুরো চত্বরটা সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। কোন শব্দ নেই, খালি ধূপের গন্ধ ছড়িয়ে জায়গাটা জুড়ে। এই ধূপের গন্ধ ছাপিয়ে পায়েসের গন্ধ পাওয়া কঠিন বিষয়। বাড়িতে রান্না করার সময় পায়েসের গন্ধ পেয়েছি। কিন্তু সেই পায়েস টেবিলে রাখলে গন্ধ পেয়েছি কিনা মনে করতে পারছি না। গন্ধটা ধূপের নয় তো! কেউ হয়তো পায়েসের গন্ধওয়ালা ধূপ জ্বালায় রাত্তিরে!
প্রশ্নটা করেই ফেলেছিলাম শাসনপালকে। তা উনি বললেন সন্ধের পর আশ্রমিকরা ছাড়া আর কেউ আসতে পারে না এখানে। তাছাড়া রাতে ধূপ জ্বালানো হয় না।
অনেকটা ‘এল’ শেপের মন্দির চত্বরটা। সাদা রঙ করা দোতলা কয়েকটা ঘর একটা ‘চোর্তেন’কে ঘিরে। একজন সাদা পোশাক পরা লোক পথ দেখিয়ে নিয়ে চলল সিঁড়ি বেয়ে দোতলার একটা ঘরে। আমাদের ব্যাগপত্র আগেই পৌঁছে গিয়েছিল সেখানে। দুটো খাটে সাদা চাদর বিছানো। সঙ্গে এট্যাচড বাথরুম। ঘরের মধ্যে একটা আলমারি আর বড়ো টেবিল। টেবিলকে ঘিরে কাঠের পালিশ করা চারটে চেয়ার। মেঝেয় কার্পেট, আর দেওয়াল জুড়ে হাড়সর্ব্বস্ব ধ্যানরত বুদ্ধের স্বর্ণাভ বুদ্ধ মূর্তির একটা বড়ো ছবি। মাথার ওপর সোনালি কাজ করা সাদা ফ্যান ঝুলছে। এটা এদের অতিথিশালা।
আমাদের যে পৌঁছে দিতে এসেছিল সে বলল – আমাদের জন্য চা আর খাবার রেডি হচ্ছে।
বাথরুম থেকে হাত-মুখ ধুয়ে বেরিয়ে এসে দেখি মিস্টার সেন উধাও! খিদে পেয়েছিল প্রচণ্ড, কিন্তু মিস্টার সেনকে দেখতে না পেয়ে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এলাম। গেলেন কোথায় ভদ্রলোক!
চত্বরের বাঁ দিকে একটা একতলা ঘরের বাইরে একজোড়া চটি দেখতে পেয়ে এগিয়ে গেলাম। দেখি একজন ঘরের ভেতর বসে প্রার্থনা করছেন। ঘরটার ডানদিকে কয়েকটা সিঁড়ির ধাপ উঠে গেছে এক পাথর বাঁধানো চাতালে। চাতালের পাশ থেকে একটা বিশাল রক ওয়াল সোজা উঠে গেছে। কম করেও ফুট তিরিশেক উঁচু পাথরের দেওয়ালটা। পাথরের দেওয়ালের গায়ে একটা সাদা রঙ করা ছোটো ইঁটের পাঁচিল। পাঁচিলের গায়ে একটা পাথরের ফলক। মিস্টার সেনের দেখা না পেয়ে জুতো খুলে রেখে সিঁড়ি বেয়ে উঠে এগিয়ে যাই ফলকটার দিকে। ফলকের গায়ে লেখা এক থাইল্যান্ডের লোকের নাম, যিনি ১৯৯৯ সালে ধ্যানরত বুদ্ধের মূর্তি দান করেছেন। পুরো চত্বরটায় অনেকগুলো সি সি ক্যামেরা লাগানো। এখানে সেই আসুক না কেন ক্যামেরায় ধরা পড়ে যাবে। কাজেই পায়েসের গন্ধ কেউ সবার অজান্তে এসে ছড়িয়ে দিয়ে যাবে সেটা অসম্ভব। তবে কি সত্যিই কিছু অতিলৌকিক ঘটনা ঘটে চলেছে! বুদ্ধ ভগবান কি সত্যিই ফিরে এসেছেন? শুনেছি অনেক মহাপুরুষের ছবি তুললেও তাঁর ছবি ক্যামেরায় ধরা পড়েনি।
সবই তো বুঝলাম, তা মিস্টার সেন কোথায়! শাসনপালকেও আসার পর থেকে দেখিনি।
পাথরের খাড়া দেওয়ালের গা ঘেঁসে লম্বা সিমেন্টের বেঞ্চ। পাথরের গা খুঁদে তৈরি ছোটো ছোটো খোঁদলের মধ্যে ধ্যানরত বুদ্ধের মূর্তি। কিন্তু মিস্টার সেন বলেছিলেন এখানে একটা গুহা আছে, যেখানে বসে গোতম ধ্যান করেছিলেন দীর্ঘকাল। সেটা কোথায়? বেশ কিছু বোল্ডার চত্বরটায়। যে কোন রক ক্লাইম্বার একবার উঠতে চাইবেন বোল্ডারগুলো দেখলে।
উঁচু পাথরের দেওয়ালটার গা ঘেঁষে তৈরি ইঁটের পাঁচিলের শেষে যেখানে ফলকটা লাগানো তার পাশে একটা লোহার বন্ধ দরজা। ভেতরে একটা টিমটিমে আলো জ্বলছে। দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকিয়ে দেখি, একটা পুর্ণাঙ্গ মানুষের আকারের ধ্যানরত বুদ্ধের কঙ্কালসার মূর্তি। সোনার মতো রঙ, সোনার কিনা কে জানে? শাসনপালকে জিজ্ঞেস করে দেখতে হবে। হতে পারে এই মূর্তিটা চুরি করার জন্য কেউ উঠে পড়ে লেগেছে!
এটাই সেই গুহা কিনা ভাবছি, কারন টিমটিমে আলোয় ভালো করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না, তখনই মিস্টার সেনের গলা পেলাম- “আপনার ডানদিকের ঘরের দরজাটা ঠেলে ঢুকে পড়ুন।”
খানিক চমকে উঠেছিলাম, কারণ সামনে একটা ঘর থাকলেও তার দরজাটা বন্ধ।
“আপনার পুরো মুভমেন্ট আমরা এখানে বসে লক্ষ করেছি, ক্যামেরার চোখকে ফাঁকি দিয়ে কেউ কিছু করতে পারবে না এখানে।”
মেঝেতে বেছানো কার্পেটের ওপর বসে শাসনপাল আর মিস্টার সেন। সামনে একটা বড়ো স্ক্রিনে গোটা আটেক টুকরো টুকরো ছবি। সি সি ক্যামেরার ফুটেজ।
“গতকাল সন্ধে আর আজ ভোরের ফুটেজ খানিক দেখেছি, কিছু অস্বাভাবিক দৃশ্য নজরে পড়েনি।” খানিক থেমে আবার বলেন মিস্টার সেন, “খুব ক্লান্ত না তো? চাইলে ব্রেকফাস্ট খেয়ে খানিক ঘুমিয়ে নিতে পারেন, না হলে আমার সঙ্গে পাহাড়ের চড়তে পারেন, আপনার যা খুশি।”
অনেকখানি মাখন দিয়ে মশলা মেশানো নুডুলস, চা আর মিষ্টি দিয়ে ব্রেকফাস্টটা জমেছিল দারুণ।
“ক্যামেরা সঙ্গে নিয়ে নিন, ভালো হয়েছে ট্রেকিং বুট পরে এসেছেন, জলের বোতল নিতে হবে না, শাসন আমাদের সঙ্গে পাহাড়ে যাবে ওর লোকজন নিয়ে। ওরাই শুকনো খাবার আর জল নিয়ে নেবে সঙ্গে। চিফ সেক্রেটারি ফোন করেছিলেন, পুলিশের কোন সহায়তা লাগলে সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যাবে, আকাশ পথে কিছু দেখতে চাইলে হেলিকপ্টারের ব্যবস্থাও করে দেবেন উনি। যেখানে গাড়ি থেকে নামলেন ওর কাছেই একটা হেলিপ্যাড আছে। প্রচুর অর্থবান লোক আসেন এখানে। এই অঞ্চলের সিকিউরিটি নিয়ে কোন আপোষ চাইছেন না সরকার। খবর আছে জাপান থেকে একটা বড়ো দল আসতে চলেছে গুহা দর্শনে। বেশিদিন লোকজনকে ঠেকিয়ে রাখা যাবে না।” একটানা বলে বাথরুমে ঢুকলেন মিস্টার সেন।
রুক্ষ পাহাড়ের গায়ে গাছ প্রায় নেই বললেই চলে, খানিক গুল্ম আর ছোটো ছোটো কাঁটা ঝোপ। এই মঠের লোকেরাই মাঝে মাঝে পাহাড়ের মাথায় ওঠেন প্রেয়ার ফ্ল্যাগ লাগাতে। সামান্য পায়ের চাপে আলগা পাথর গড়িয়ে পড়ছে পাহাড়ের গা বেয়ে। হাওয়া চলছে প্রচণ্ড জোরে। ব্যালেন্স একটু এদিক-ওদিক হলেই সোজা গড়িয়ে নীচে। পাহাড়ের ঢাল হবে ৭০০।
“আজ থেকে ষাট সত্তর বছর আগে এখানে নিশ্চিন্তে ঘুরে বেড়াতে পারতেন না।”
“সেই সন্ত্রাসবাদীদের জন্য?”
“না, এই জায়গায় বাঘ ঘুরে বেড়াত। এখনও প্রচুর ভালুক দেখা যায়। ভেবে দেখুন কী শ্বাপদসঙ্কুল জায়গায় বসে এক রাজার ছেলে জরা ব্যাধি মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচার কোন উপায় আছে কিনা তা খুঁজতে দিনের পর দিন এক জায়গায় বসে প্রাণের মায়া ত্যাগ করে চিন্তা করে গেছেন। আসলে কী জানেন, আমার মতে উনি একজন সমাজবিজ্ঞানী ছিলেন। খবরদার এসব আবার লিখতে যাবেন না, লোকে আপনাকে উন্মাদ ভাববে।”
আধঘণ্টা লাগল পাহাড়ের মাথায় উঠতে। ঢালের মধ্যে সামান্য সমতল জায়গা, অনেকটা টেবিলের মতো। সেখান থেকেই নানাদিকে দড়ির মাথায় বেঁধে চারদিকে ছড়িয়ে গেছে রঙচঙে পতাকা। বড়ো বড়ো বোল্ডারের গায়ে বাঁধা দড়িগুলো।
“এখানে কি আপনারা ছাড়াও অন্য লোক আসে?” শাসনপালের কাছে জানতে চান মিস্টার সেন।
“না খুব বেশি আসে না, তবে দু-একজন অতি উৎসাহে উঠে আসেন।”
“আইন করে বাইরের মানুষের অহেতুক এই পবিত্র পাহাড়ের মাথায় ওঠা বন্ধ করা উচিৎ,” ইতস্তত পড়ে থাকা কোল্ডড্রিঙ্কসের বোতল আর চিপসের প্যাকেটের দিকে আঙুল তুলে দেখান মিস্টার সেন, “অবশ্য পাহাড়ে ওঠা আপনারা বন্ধ করতে পারবেন না, আমাকে চিফ সেক্রেটারির সঙ্গে কথা বলতে হবে,” শাসনপালের দিকে ঘুরে বলেন উনি। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলেন “পুরো ডকুমেন্টেশানটা করবেন, থরোলি।”
ওখান থেকে ফল্গু নদীর দিকটা দেখা যাচ্ছিল। যতদুর নজর চলে তাতে গাছপালা খুব একটা দেখতে পেলাম না। ফাঁকা মাঠের ওপর আল দেখে মনে হচ্ছে এগুলো চাষের জমি। সম্ভবত এই অঞ্চলে ইরিগেশন সিস্টেম ভালো নয়, তাই সারা বছর চাষ হয় না। এখানে বালি তো ব্লটিং পেপার, নদীর জল শুষে পাঠিয়ে দেয় বালির তলায়। ধুস আমি চাষ নিয়ে ভাবছি কেন, আমি বুঝিটা কী!
পাহাড়ের পেছনের অংশটা দেখা যাচ্ছিল না, কেননা রিজের শীর্ষে ওঠা অসম্ভব। ওখানে উঠতে হলে মেসনার হতে হবে। মিস্টার সেন, হেলিকপ্টারের কথা বললেই তো পারেন। বেশ আকাশ থেকে চারপাশটা দেখা হয়ে যেত, আমারও জীবনের প্রথম হেলি-সফর হতো। তবে কি আজ রাতে উড়ুক্কু চাদরে চেপে অভিযানের মতলব করছেন মিস্টার সেন?
এখানে আসা অবধি মিস্টার সেন চোখে বাইনোকুলার লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কী দেখছেন উনিই জানেন। আমাদের সঙ্গে আসা শাসনপাল আর তার দলবল বসে আছে কতোগুলো বোল্ডারের ওপর।
“এই পাহাড়ে কি আরও অনেক গুহা আছে?” চোখে বাইনোকুলার লাগিয়েই প্রশ্ন করেন মিস্টার সেন। প্রশ্নটা যে আমাকে উদ্দেশ্য করে নয় সেটা বুঝে গেছিলাম।
“আছে,” শাসনপাল বলে। “আর অনেক গুহাই ভালুকের আস্তানা, তাই আমরা কেউ যাই না অন্য কোন গুহার দিকে। ঈশ্বরের সন্তানদের বাঁচার অধিকার আছে নিজের মতো।”
“পায়েসের গন্ধ ভেসে আসা শুরু হবার পর থেকে কি আপনারা কেউ অন্য গুহার ভেতর খুঁজে দেখার কথা ভাবেননি? হয়তো কোন গুহায় পুনর্জীবিত হয়ে ধ্যানমগ্ন আছেন বুদ্ধ ভগবান।”
কোন উত্তর দেন না শাসনপাল। আসলে এরা ভীষণ ধর্মভীরু। সাধনভজন আর ত্রিপিটক পাঠ ছাড়া অন্যকিছু নিয়ে ভাবে বলে আমার মনে হয় না।
খানিক দূরেই অন্য একটা পাহাড়ের গায়ে কতোগুলো খোলা গুহামুখ দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। আমি বেশ কিছু ছবি তুলে মনিটিরে এনলার্জ করে দেখে নিয়েছিলাম, ভিতরের কিছুই বোঝা যায়নি।
“ভন্তে শাসনপাল, আমি ওই পাহাড়ের দুএকটা গুহায় যেতে চাই,” খুব মোলায়েম গলায় বলেন মিস্টার সেন। ‘ভন্তে’ বলে শাসনপালকে এই প্রথম সম্বোধন করতে শুনলাম মিস্টার সেনকে। এতক্ষণ তো পুরো নাম ‘শাসনপাল’ বলেই ডাকছিলেন ওনাকে। বেশ বুঝতে পারছিলাম না জানিয়ে এই সব পাহাড়ের গুহায় ঢুকে সন্ন্যাসীদের ধর্মবিশ্বাসে আঘাত দিতে চাননি উনি। সম্ভবত এই কারণেই বুদ্ধের পুনর্জন্মের গল্প ফেঁদেছেন।
শাসনপাল কোন কথা না বলে পাহাড়ের গা বেয়ে নামতে শুরু করলেন। হাঁচোরপাচোর করে কোনরকমে ঘাস আর কাঁটাগাছের ডাল ধরে উঠেছিলাম। এবার নামতে গিয়ে কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। তিনবার হড়কেছি। পেছন থেকে শাসনপালের লোকেরা না ধরে ফেললে অবধারিত হাত পা ভাঙত। আমার ভারী ক্যামেরা ব্যাগটা নিয়ে নিয়েছে একজন। মিস্টার সেনের কোন বিকার নেই। খাড়া ঢাল বেয়ে নামার সময় একবারের জন্যও ব্যাড স্টেপ ফেলেননি উনি।
বেশ কিছু ছোটো ছোটো পাহাড়শ্রেণী ডুঙ্গেশ্বরীকে ঘিরে। এই অঞ্চলের প্রায় সব পাহাড়ই ন্যাড়া। খানিক কাঁটা ঝোপ আর গুল্ম পাহাড়ের ঢালে। ঝুরো পাথরের ওপর দিয়ে গিরগিটি অক্লেশে চলে যেতে পারলেও মানুষের এগোনোটা বেশ কঠিন। মিস্টার সেন সহ আমরা সবাই বেশ কয়েকবার করে হড়কেছি। হাতের তালু বেশ খানিকটা ছড়ে গেছে। কোন রকমে ঘাস আর কাঁটাগাছের ডাল ধরে পাহাড়ে ওঠা। বাঁচোয়া একটাই পাহাড়গুলোর, না পাহাড় বলাটা ঠিক হচ্ছে না টিলা বলাই ভালো, উচ্চতা খুব বেশি নয়। দিনের বেলা পাহাড়ের চড়তেই হাল খারাপ, রাতে সে ভগবান বুদ্ধ হোন বা যিনি পায়েসের বাটি হাতে ঘুরে বেড়ান তার যে হাল কী হয় সেটা বলার অপেক্ষা রাখে না। অবশ্য মহাপুরুষদের ক্ষমতা অসীম। আর যদি মিস্টার সেনের মতো উড়ুক্কু চাদর আবিস্কার করে তা নিয়ে ঘুরে বেড়ান তা হলে আলাদা কথা। নারদও তো ঢেঁকি চেপে ঘুরে বেড়াতেন।
মিস্টার সেন আগে থেকেই বলে দিয়েছিলেন আমরা সরাসরি কোনো গুহায় ঢুকব না। ভালুকের পছন্দের খাবার উই-এর ঢিবিতে পাহাড় ভর্তি। বলা যায় না হয়তো কোন ভালুক পরিবার বাস করে সেখানে। কিম্বা শেয়াল। শুনেছি এই অঞ্চলে নাকি হায়নাও আছে। ময়ালসাপও গোল্লা পাকিয়ে থাকতে পারে। খানিক আগেই ফুট সাতেক লম্বা সাপের কয়েকটা খোলস দেখেছি। কাঁকড়া বিছে থাকাও অসম্ভব নয়। রাস্তার ধারে যারা জড়িবুটি বিক্রি করে তারা এই রকম পাহাড় থেকেই বিছে সংগ্রহ করে শুনেছি।
প্রথম গুহার মুখের কাছে গিয়ে মিস্টার সেন পিঠের ব্যাগ থেকে একটা ছোট্ট যন্ত্র বার করেছিলেন। ক্যামেরা লাগানো একটা ড্রোন। সেই ড্রোনটাকে রিমোটে কন্ট্রোল করে উড়িয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন গুহার ভেতর। সাধারণ গুহা, কয়েকটা বাদুড় ঝুলছিল উল্টোমুখ হয়ে। ভালুক টালুক কিছু ছিল না। দুটো গুহা পাশাপাশি। মিনিট পাঁচেক পর ড্রোন ফিরিয়ে এনে উনি বলেছিলেন “ডুঙ্গেশ্বরীর পেছন দিকটা দেখা দরকার।”
ঘণ্টা তিনেক কেটে গেছে, খিদে পেয়ে গেছে খুব। দুই পাহাড়ের মাঝ দিয়ে খানিক সমতল জায়গা চলে গেছে। বড়ো পাহাড় হলে নির্ঘাত ভ্যালি বলতাম। রোদ চড়া থাকলেও হাওয়া চলছে বলে গরমটা গায়ে লাগছে না। ডুঙ্গেশ্বরীর পেছন দিকটায় অনেক গাছপালা। পাহাড়ের পায়ের কাছেই খানিক চাষের জমি। অনেক টমাটো পেকে রয়েছে। খানিক দূরে একটা ঝুপড়ির মতো বাড়ি। উঠোনটা গোবর দিয়ে পরিষ্কার করে লেপা। দুটো মোষ দূরে খুঁটিতে বাঁধা। তার পাশে ভুর করে রাখা সবুজ ঘাস। একটা সাইকেল খুঁটিতে হেলান দিয়ে রাখা। কয়েকটা মুরগি চড়ে বেড়াচ্ছে উঠোনে। দুটো ঘরের চালের ওপর বসে আমাদের দেখেই ডেকে উঠল।
মুরগির ডাক শুনে ঘরের ভেতর থেকে একটা আধবুড়ো লোক বেরিয়ে এলো। শাসনপাল সহ আমাদের দেখে তাড়াতাড়ি করে ঘরের ভেতর থেকে দুটো খাটিয়া এনে পেতে দিল উঠোনে।
“প্রভু কিছু করুন, রাক্ষস সব শেষ করে দিচ্ছে, কালও একটা মুরগি মেরেছে,” শাসনপালের পায়ের কাছে হাত জোড় করে বসে বলে লোকটা।
রাক্ষস শব্দটা শুনে চমকে উঠেছিলাম। পাহাড়ের ওদিকে বুদ্ধ ভগবান ফিরে এসেছেন বলে রব আর তার উল্টোদিকে রাক্ষস?
মিস্টার সেন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে। শাসনপাল আর তার দলবল রাক্ষস শুনে চোখ বন্ধ করে মালা জপতে লেগে গেছে।
“কি হয়েছে বলো তো?” লোকটার দিকে তাকিয়ে বলেন মিস্টার সেন।
“সাব, দিন দশেক আগে রাতে মুরগিগুলো চিৎকার করে উঠেছিল। সকালে উঠে দেখি একটা মুরগি নেই, খানিক রক্তমাখা পালক পড়েছিল দাওয়ার এক কোনায়। ভেবেছিলাম শেয়ালে মেড়েছে মুরগিটাকে। দু’দিন পর রাতে ঘরের চালে হঠাৎ হুটোপুটির আওয়াজ, চিৎকার করছিল চালের ওপর বসে থাকা মুরগিগুলো। সকালে উঠে দেখি দুটো মুরগি নেই।”
“খুব শেয়াল নাকি এখানে?” মিস্টার সেন বলেন।
“হুজুর এ শিয়ালের কাজ নয়, শিয়াল ঘরের চালে উঠে মুরগি মারবে না।”
“ওই দু’বারই হয়েছিল?”
“না হুজুর বেশ কয়েকবার। মোট ন’টা মুরগি গেছে আমার।”
“ঘরে আটকে রাখ না কেন?”
“ছোটো ঘরে কোথায় এতো মুরগি রাখব হুজুর।”
“যখন রাক্ষস আসে তখন কি কোন শব্দ শুনতে পাও?”
“না হুজুর,” তারপর খানিক চিন্তা করে ঘরের মালিক বলে “তবে রাক্ষস এলে পায়সের মতো গন্ধ পাওয়া যায়।”
মিস্টার সেন এবার শাসনপালের দিকে ঘুরে বলে “সি সি ক্যামেরার ফুটেজে বেলগাছের ওপর ছুঁচলো মুখের ওপর লাল দুটো চোখ দেখে আমার খানিক সন্দেহ হয়েছিল। কিন্তু নিশ্চিত হতে চাইছিলাম। কারণ ছবিগুলোতে পরিষ্কার কিছু বোঝা যাচ্ছিল না। জঙ্গলে খাবার কমে গেছে। তাই খাবারের খোঁজে ভামবেড়ালের দল এদিকে এসেছে। ওরা রাত্তিরেই বেরোয়, আর ওরা আসলেই পায়সের গন্ধ পাওয়া যায়। চলুন ভন্তে ফেরা যাক, ভগবান বুদ্ধ ফিরে আসেনি।”