রাজীবকুমার সাহার অন্যান্য গল্প, উপন্যাস ও প্রবন্ধ

কামানি ত্রিপুরিদের চিরাচরিত বিবাহ প্রথা। বিয়ের আগে পাত্রকে দুই থেকে চার বছর পর্যন্ত হবু শ্বশুরবাড়িতে রীতিমতো বেগার খাটতে হয়। তিন মাইল দূর থেকে টিলাটঙ্কর ডিঙিয়ে জল আনো রে, শুয়োর চরাও রে, জুমে আগুন দাও রে, ফসল ফলাও রে—মেলা কাজ। যে যত তাড়াতাড়ি কাজেকর্মে হবু শ্বশুরবাড়ির লোকজনকে সন্তুষ্ট করতে পারে, সে-বাড়ির মেয়ের সঙ্গে বিয়েতে তত আগে অনুমতি মেলে। তারপর সিঁদল-শুঁটকির গোদক আর সাদা ভাতে মহা ভোজের আয়োজনে ধুমধাম করে বিয়ে হয় দুজনার।
ধনঞ্জয়ও একদিন তেমনি চামরি কামানি খেটে বিয়ে করা বউ নিয়ে ফিরছিল নিজের গাঁয়ে। মদ্দ জোয়ান—এই ভরা চৈতেও জোর হাঁটা লাগিয়েছে গাঁয়ে ফিরে গড়িয়া পুজোয় আনন্দ করবে বলে। বন্ধুবান্ধব, আত্মীয়স্বজন আর সঙ্গে নতুন বউ—জব্বর উল্লাস হবে এ-বছর।
শ্বশুরবাড়ি থেকে ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছিল ধনঞ্জয়। সূর্য ডোবার আগেই বাড়ি ফিরতে হবে। পথ বড়ো জঙ্গুলে। কেউ কোত্থাও নেই, চারদিকে শুধু ঝিঁঝিঁর একটানা ডাক আর পাখপাখালির কিচিরমিচির। দুজনেই জোর পা চালিয়েছে, পাছে পথেই না আঁধার নেমে আসে।
গাঁ আর বেশি দূরে নয়। আর দুটো টিলা বেয়ে উঠে নেমে গেলেই বাড়ি। কীসের একটা মিষ্টি গন্ধে মোহিত হয়ে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়ল নতুন বউ। জিজ্ঞেস করে, “এ কীসের গন্ধ গো? এত মিষ্টি!”
ধনঞ্জয় পথে দেরি করতে রাজি নয়। তাড়াতাড়ি উত্তর দেয়, “ও কিছু নয়, খেরেংবার বুবার। চলো চলো, পা চালাও।”
বউ তো নড়ে না। সে দ্বিগুণ কৌতূহলে জানতে চায়, “সেটা কী?”
“আহা, সে আছে এক ফুল। এখন চলো তো।”
“খেরেংবার ফুল? কই, অ্যাদ্দিন তো কোথাও নাম শুনিনি এর! দেখতে কেমন গো? কোথায় ফুটে আছে বলো না!”
ধনঞ্জয় অধৈর্য হয়ে উঠে। বলে, “সে-ফুল দেখতে নেই। মহা বিপদ ঘটে যাবে। স্বর্গের ফুল যে!”
চোখ দুটো চকচক করে উঠে নতুন বউয়ের।—”স্বর্গের ফুল! সত্যি বলছ? একবারটি দেখাও না লক্ষ্মীটি!”
ধনঞ্জয় যত বারণ করে, বউয়ের মুখ তত ভার হয়—চোখ ছলছল, গলায় অভিমান। হতাশ ধনঞ্জয় শেষে ঝুপসি এক গা-ফাটা দৈত্যের মতো গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলে, “ওই দেখো, ওই গাছটার গায়ে ফুটে আছে। সাবধান, কাছে যেও না কিন্তু!”
নতুন বউয়ের চোখে নেশা লাগে। গাছটার গায়ে লেগে থাকা থোকা থোকা ফুলগুলো থেকে চোখ ফেরাতে পারে না সে। ঘোরের মধ্যেই বায়না ধরে—”একটা, মাত্র একটা এনে দাও না গো, খোঁপায় গুঁজি!”
ধনঞ্জয় আঁতকে ওঠে—”ও কী বলছ তুমি! সে ফুল পাড়তে আছে? খোঁপায় গোঁজা তো বহুদূর। একমাত্র দেবতাদেরই অধিকার তাতে। মানুষে নিলে ঘোর অমঙ্গল হয়।”
নতুন বউয়ের কৌতূহল গাঢ় হয়। জিজ্ঞেস করে, “দেবতাদের ফুল মানে? এখানে এল কী করে?”
ধনঞ্জয়ের চোখে আশা জাগে। ভাবে, গল্পের অছিলায় এই জঙ্গল থেকে বার করে নিয়ে যাবে বউকে। বলে, “চলো, যেতে যেতে বলছি। বড়ো আশ্চর্য ঘটনা।”
“মোটেও না। এখানেই বলো।”
নিরুপায় ধনঞ্জয় বলতে শুরু করে, “এক ছিল অপ্সরা। কীসের অপরাধে স্বর্গ থেকে মর্ত্যে নির্বাসন হয় তার। নিজের যে-কোনো একটিমাত্র প্রিয় বস্তু ছাড়া আর কুটোটিও মর্ত্যে নিয়ে আসবার অনুমতি নেই। অপ্সরা নিয়ে আসে এই খেরেংবারের ক’টি বীজ। এনে মর্ত্যের মাটিতে ছড়িয়ে দেয় সে। কিন্তু স্বর্গের আর মর্ত্যের জল-মাটি এক হবে কেন? ফলে একটি ফুলের চারাও গজাল না; কতক বীজ নষ্ট হল। হতাশ অপ্সরা তখন ঘন জঙ্গলে প্রাচীন এক গাছের কোটরে বাকি বীজগুলো রেখে এল। তারপর দিন যায়, মাস যায়, খরা আসে, বর্ষা নামে—অপ্সরা মনমরা হয়ে অভিশপ্ত জীবন কাটায়। হঠাৎ একদিন সেই বীজগুলোর কথা মনে পড়ল তার। দৌড়ে গিয়ে মাঝপথেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে সে। চারদিক ম ম করছে তার প্রিয় ফুলের সুগন্ধে। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই গাছটির কাছে দৌড়ে আসতেই দেখে, সে-গাছের সারা শরীর বেয়ে গোছায় গোছায় ফুটে আছে খেরেংবার। হঠাৎ কী একটা মনে পড়তেই শঙ্কিত হয়ে ওঠে সে। তাই তো! এই স্বর্গীয় ফুলে একবার মানুষের হাত লাগলে তো অপবিত্র হয়ে যাবে। তাই মনে মনে অভিশাপ দিয়ে রাখল অপ্সরা—যে এই ফুলে হাত লাগাবে, উল্লুক হয়ে যাবে মুহূর্তে। আর মনুষ্য জীবনে ফিরে আসতে পারবে না সে।”
গল্প শেষ করে ধনঞ্জয় বলে, “এইবার তুমিই বলো, এ-ফুলে হাত দিই কেমন করে? বাড়ি চলো, সন্ধে নেমে আসছে।”
বউয়ের চোখে অবিশ্বাস।—”যাহ্, জল নেই, মাটি নেই, ফুল এমনি-এমনিই ফুটে, না? ওসব বুজরুকি আমি বিন্দুমাত্র বিশ্বাস করি না। একটা ফুল আমার চাই।”
আকুল হয়ে ওঠে ধনঞ্জয়। তাড়াতাড়ি বলে, “যে-সে নয় গো, আমাদের গাঁয়ের দিয়ারির (গণক) কাছে নিজের কানে শুনেছি আমি, বিশ্বাস করো!”
কিন্তু নতুন বউ অনড়। নিয়তি তাকে বশ করেছে। শত চেষ্টাতেও ধনঞ্জয় তাকে এক পাও নড়াতে পারেনি সেখান থেকে। একটা ফুল সে নেবেই। নইলে এখান থেকেই ফিরে যাবে সোজা বাপের বাড়ি। ধনঞ্জয়ের ঘর করবে না সে।
ধনঞ্জয় বোঝাবার চেষ্টা করে—”বেশ তো, খেরেংবার খোঁপায় পরবে সে তো ভালো কথা। তবে তার আগে গাঁয়ে চলো, দিয়ারির সঙ্গে পরামর্শ করি, তারপর নয় এনে দেব ফুল।”
কিন্তু নতুন বউয়ের সেই এক কথা—হয় ফুল, নয় বাপের বাড়ি।
ধনঞ্জয়ের চোখ ফেটে জল আসে। করুণ চোখে বারে বারে বউয়ের মুখে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে যায় সেই গাছের দিকে। তারপর গাছে উঠতে উঠতে চিৎকার করে বলে, “ফুল নিও, তবে সাবধান, গাঁয়ের ফিরে দিয়ারিকে না জানিয়ে খোঁপায় পোরো না কিন্তু। কেমন?”
ধনঞ্জয় তারপর এক থোকা ফুল ছুড়ে দেয় বউয়ের দিকে। বউ তো মহা খুশি। ফুল হাতে পেয়ে বউয়ের আর স্মরণে রইল না ধনঞ্জয়ের সাবধান বাণী। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে-ফুল খোঁপায় পরে নিল সে। আর সঙ্গে-সঙ্গেই ধনঞ্জয়ের হাত-পা সেঁটে গেল গাছের গায়ে। আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল সে, “সে কি! তুমি ফুল পরে নিলে নাকি? আমার হাত! আমার পা! হা ঈশ্বর, আমি এমন পালটে যাচ্ছি কেন?”
বউয়ের ঘোর কাটল এইবারে। ভুল বুঝতে পেরে সঙ্গে সঙ্গে খোঁপা থেকে ছুড়ে ফেলে সে-ফুল। কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার হয়ে গেছে। এই ভুলের আর প্রায়শ্চিত্ত নেই। চোখের সামনে ধনঞ্জয় ধীরে ধীরে মানুষ থেকে জলজ্যান্ত এক উল্লুক বনে গেল।
কান্নায় ভেঙে পড়ে নতুন বউ চিৎকার করে ওঠে, “তুমি ফিরে এসো লক্ষ্মীটি। মহাপাপ করেছি আমি। আমায় বলো কী করলে আবার মানুষ হয়ে ফিরে আসবে তুমি।”
গাছ থেকে উত্তর আসে—”সে উপায় আর নেই। বাকি জীবনটা উল্লুক হয়ে গাছে-গাছেই কাটাতে হবে আমায়। এই জঙ্গলেই হবে আমার বাস। তুমি ফিরে যাও।”
“না! না! না! কোত্থাও যাব না আমি তোমাকে ছেড়ে।”
“তাতে লাভ কিচ্ছু হবে না। আমার কথা শোনো, সন্ধে নেমে আসছে, তুমি তাড়াতাড়ি গাঁয়ে ফিরে যাও। গিয়ে আমার মা-বাবাকে খুলে বলো সব। তাঁদের যত্নআত্তি কোরো। আর অপেক্ষা কোরো পরজন্মের। আমায় আবার ফিরে পাবে তখন।”
বউ তখনও দাঁড়িয়ে। বলে, “আমি তোমার সঙ্গে ছোট্ট একটা সুখের ঘর বাঁধতে চেয়েছিলাম। নিজের কপাল নিজেই পুড়িয়েছি আমি। কার জন্যে আর ফিরে যাব বলো? তার চেয়ে আমার মরণ ভালো।”
এই বলে গাছের গায়ে কপাল ঠুকতে লাগল বউ। মাথা ফেটে রক্তের ধারা বইতে লাগল। একসময় নেতিয়ে পড়ল শরীর। মরে গেল বউ।
উল্লুকটা গাছের মগডালে বসে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল শুধু। কিচ্ছু করতে পারল না। মুখ দিয়ে শুধু ‘হু-হু-হুলুক-হুতা’ ছাড়া আর কোনও শব্দ বেরোল না।
পরের জন্মে বনরুই হয়ে জন্ম নিল বউ। সারাদিন সে এসে বসে থাকে সেই গাছের নীচে।
ত্রিপুরদেশের লোককাহিনি। ছবি সুলতা মিস্ত্রী
লোককথা মানেই মনে এক চেনা চেনা অনুভূতি! সেই ছেলেবেলার ইউক্রেনের লোককথার দিন! ত্রিপুর দেশের লোককথা আর রাজীববাবুর গল্প বলার ধরনটিও এক্কেবারে ফুল আর মৌমাছির মতো! আমাদের জন্য বরাদ্দ মিষ্টি মধুর অনুভব! খুব ভালো লাগল!
অনেক ধন্যবাদ রইল।