
(১)
মেয়েটিকে গ্রহান্তরে নির্বাসন দেওয়া হবে। এই তার শাস্তি। পৃথিবীতে আর কোনোদিন ফিরতে পারবে না সে। আর কোনোদিন দেখা হবে না প্রিয় মানুষজনের সঙ্গে। যদিও এখানে দেখা হওয়া মানে ভার্চুয়ালি দেখা হওয়া। পৃথিবীতে মানুষেরা এখন একে অপরের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা করতে পারে না। এমনকি বাবা-মায়ের সঙ্গেও না। তাঁদের সঙ্গেও কথা বলতে হয় ডিজিটাল স্ক্রিনের মাধ্যমে। স্ক্রিনে বাবা-মায়ের মুখ ঝাপসা করে দেওয়া হয়, যাতে মুখের অভিব্যক্তিগুলো স্পষ্ট দেখা না যায়। তাদের গলার আওয়াজও করে দেওয়া হয় বিকৃত।
চারপাশে ঘুরে বেড়ায় শুধু যন্ত্রমানব-যন্ত্রমানবীরা। এদের একদম সত্যি মানুষের মতো দেখতে। এদের কথাবার্তা, হাঁটাচলা, আচার-আচরণ দেখে কোনোভাবেই রোবট বলে অনুমান করা সম্ভব নয়। এরা যখন মিষ্টি করে হাসে, স্নেহমাখা হাত বুলিয়ে দেয় মাথায়, আদুরে গলায় জিজ্ঞেস করে ‘আজ ব্রেকফাস্টে কী খাবে বলো’—অবিকল মানুষ বলেই মনে হয়। তবু… তবু… তবু কী যেন একটা নেই। হাতের আঙুলগুলো মানুষের আঙুলের মতোই নরম। তবু মেয়েটার মনে হয়, ওই হাতগুলো মাথা ছোঁয়ার সময় কোমলতা ছাড়া আরও একটা কিছু উপস্থিত থাকার কথা ছিল যেন। গলার স্বর যতই মধুমাখা হোক, তার মধ্যেও কীসের যেন একটা অভাব রয়েছে। রান্নায় নুন না থাকলে যে অভাবটা অনুভূত হয়, তেমনই একটা কিছু না থাকার অভাব বোধ করে ওই গলার স্বরগুলোয়, ওই আঙুলগুলোর ছোঁয়ায়।
কীসের অভাব? সেটাই খুঁজতে শুরু করে ও। আর এই খোঁজ থেকেই নাকি ওর অপরাধেরও শুরু। এরকম কোনও খোঁজ শুরু করা, এরকম কোনও প্রশ্ন মাথায় আনা নাকি পৃথিবীর আইন অনুযায়ী মারাত্মক অপরাধ। নিজের ভালো লাগা, মন্দ লাগা নিয়ে কোনও কথা বলা চলবে না এখানে। প্রশ্ন তো নয়ই। তোমাকে যা যা দেওয়া হয়েছে তাই নিয়েই খুশি থাকতে হবে। সবই তো দেওয়া হয়েছে তোমাকে। কিছুরই তো অভাব রাখা হয়নি। এমনটাই বলে ওর রোবট মা যার চেহারা, গলার স্বর হুবহু ওর মানুষ মায়ের মতো।
ও রোবট মাকে বলে, “তোমার আঙুলগুলোয় কী নেই বলো তো?”
রোবট মা নিজের হাত উলটেপালটে দেখে বলে, “কী নেই? সবই তো আছে।”
“তুমি যখন আমার মাথায় হাত বোলাও তখন আমার খালি মনে হয়, আঙুলগুলো থেকে কিছু একটা বেরোনোর কথা ছিল, কিন্তু বেরোচ্ছে না।”
“আঙুল থেকে বেরোনোর কথা ছিল! কী? আঙুল কি কল নাকি যে খুললে জল বেরোবে?”
“আমি কোনও জিনিসের কথা বলছি না, তরঙ্গের কথা বলছি। অনুভূতির তরঙ্গ।”
“কেউ মাথায় হাত ছোঁয়ানোর পর এমন অনুভূতি হয়েছে তোমার?”
“না, তা হয়নি।”
“তাহলে কী করে জানলে? ওটা তোমার মনের ভুল।”
“হতে পারে। কিন্তু বার বার মনে হবে কেন? তোমার গলা শুনেও আমার একই কথা মনে হয় জানো? যখন তুমি আমাকে খুব আদর করে কিছু বলো—আচ্ছা, মায়ের সঙ্গে এখন একবার কথা বলাবে?”
“এই তো আমি কথা বলছি তোমার সঙ্গে। আর কী চাই তোমার? আমার গলা তো হুবহু তোমার মানুষ মায়ের মতোই।”
“তবুও, তবুও—প্লিজ শোনাও না একবার।”
“নিয়ম নেই।”
“বাবার গলা?”
“তোমার বাবার কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ হয়েছে। মেরামত হয়ে ফিরে এলে যত খুশি কথা বোলো।”
“আমি রোবট বাবার কথা বলছি না। মানুষ বাবার কথা বলছি।”
“নিয়ম নেই। খুব ভালো করেই জানো তুমি সেটা। বার বার কেন একই কথা বলো?”
“কারণ, আমার বার বার একই কথা মনে হয় যে। আমার মনে হওয়াটা বন্ধ করিয়ে দাও, তাহলে আর জিজ্ঞেস করব না।”
“বয়সের তুলনায় তোমার ম্যাচিউরিটি ভীষণ কম। তোমার বয়সি অন্য কোনও ছেলেমেয়ে এমন ছেলেমানুষী আবদার করে না। তুমি এরকম করতে থাকলে কিন্তু আমরা সবাই খুব বিপদে পড়ে যাব। আমাদের চাকরি চলে যাবে আর তোমার যে কী মারাত্মক শাস্তি হবে, তুমি কল্পনাও করতে পারছ না।”
“আমার বয়সি ছেলেমেয়ে! তাদের সঙ্গেই তাহলে কথা বলতে দাও।”
“সময় হলেই বলবে। তুমি তো জানো যে এটা একটা ডিসিপ্লিনড পৃথিবী। এখানে ওরকম হুটহাট কোনও কিছু করা যায় না।”
“আচ্ছা, জন্মের পর ছ’মাস আমি আমার মানুষ মায়ের কাছে ছিলাম। তাই না?”
“হ্যাঁ। কারণ, মায়ের দুধের সাবস্টিটিউট বিজ্ঞান এখনও আবিষ্কার করতে পারেনি। এক কথা কতবার জিজ্ঞেস করবে?”
“আমার ভালো লাগে। মায়ের কথা জিজ্ঞেস করতে আমার ভালো লাগে। বাবার কথা জিজ্ঞেস করতে আমার ভালো লাগে। আচ্ছা, এরকম কি হতে পারে—ওই যে ছ’মাস মা আমাকে কোলে করল, আদর করল, চুমু খেল, মাথায় হাত বোলাল, অসুখ করলে বুকে আগলে বসে রইল, সেগুলো আমি এখনও ভুলতে পারিনি।”
“বোকার মতো কথা কেন বলছ? অত ছোটো বয়সের স্মৃতি কারও মনে থাকে না।”
“আচ্ছা, আমাকে ছেড়ে যাওয়ার সময় মা কি খুব কেঁদেছিল?”
“কে বলেছে তোমাকে? কতবার তো বলেছি, মানুষের জীবনে কান্না একেবারেই গুরুত্বপূর্ণ নয়।”
“কেন?”
“কেন মানে? কোনও আবেগই গুরুত্বপূর্ণ নয়। কারণ, মানুষের উন্নতিতে আবেগ কোনও সাহায্য করতে পারে না। একমাত্র সাহায্য করে তথ্য। আর আমি হলাম তথ্যের সমুদ্র। আমার কাছে তুমি যা জানতে চাইবে তাই জানতে পারবে। আমার থেকে যোগ্য মা তুমি পৃথিবীতে দুটো পাবে না। তাই তোমার মায়ের আদলে আমাকে তৈরি করা হয়েছে। তোমার মায়ের মধ্যে যা যা দুর্বলতা ছিল সেগুলো আমার মধ্যে নেই আর আমার মধ্যে যা যা ভালো গুণ আছে সেগুলো তোমার মায়ের মধ্যে কিছুই ছিল না। সেই কারণেই আমাকে দিয়ে তোমার মাকে রিপ্লেস করা হয়েছে।”
“রিপ্লেস করা হয়েছে কেন? মা হওয়াটা কি কোনও চাকরি যে একজনকে তার থেকে যোগ্য কেউ এসে রিপ্লেস করবে?”
“বড্ড পাকা পাকা কথা বলো তুমি। তোমাকে আমরা এত সুন্দর পরিবেশ দিয়েছি, এত ইনফরমেশন-ফ্রেন্ডলি এনভায়রনমেন্ট দিয়েছি, তা সত্ত্বেও এইসব আজেবাজে প্রশ্ন তোমার মাথায় আসছে কোত্থেকে? আমরা তো তোমাকে এসব শেখাইনি। তুমি কি জানো, তোমার এইসব আচরণের জন্য আমাদের এফিসিয়েন্সি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে? বলা হচ্ছে, আমরা নাকি তোমাকে সঠিক শিক্ষা দিচ্ছি না, সঠিক পরিবেশ দিচ্ছি না।”
“এতে কি তোমার ডিমোশন হবে?”
“কী!”
“হা হা হা। বলছি যে, আমাকে যদি তুমি সঠিকভাবে মানুষ করতে না পার, তাহলে কি চাকরিতে তোমার ডিমোশন হবে? আমার ইমোশন কি তোমার ডিমোশনের কারণ?”
“এটা তুমি কোত্থেকে শিখলে?”
“কোনটা?”
“এই যে ইমোশনের সঙ্গে মিলিয়ে ডিমোশন বললে, এটা কে শিখিয়েছে তোমাকে?”
“কেউ শেখায়নি তো। আমি নিজে-নিজেই শিখেছি। আজকাল আমার এরকম মিলিয়ে মিলিয়ে কথা বলতে ভালো লাগে। আবার এগুলোতে সুর লাগাতে আরও ভালো লাগে। শুনবে একটা?”
“ছি ছি! ছন্দ মিলিয়ে কথা বলে তাতে সুর লাগিয়ে আবার আমাকে জিজ্ঞেস করছ শুনব কি না! তুমি কি জানো না যে, এটা সম্পূর্ণ নিয়মবিরুদ্ধ ব্যাপার? কেন বার বার এখানকার নিয়ম ভেঙে নিজেকে আর আমাদের বিপদের মধ্যে ফেলছ তুমি?”
“আমি তো ইচ্ছে করে করছি না।”
“মানে!”
“আমার ভেতর অন্য কেউ একটা আছে যে এগুলো করাচ্ছে। তার ওপর আমার কোনও কন্ট্রোল নেই। আর সে রোজ একটু একটু করে বড়ো হচ্ছে।”
“বড়ো হচ্ছে মানে! কে?”
“মানে তোমরা আমার ওপর যত ইনফরমেশনের বোঝা চাপানোর চেষ্টা করছ, ইনফরমেশনের পাহাড়টা যত বড়ো হচ্ছে, সেও তত বড়ো হচ্ছে। জানো, যখন আমি একা থাকি তখন ও আমার সঙ্গে কথা বলে।”
“কথা বলে! কী কথা বলে?”
“বলে যে, তুমি হলে আমার তথ্য মা আর যে আমাকে জন্ম দিয়েছিল সে হল আমার প্রেম মা।”
“প্রেম মা!”
“প্রেম মা। জন্মের পরের ওই ছ’মাসে সে নাকি আমার ভেতর একটা প্রেমের চারা বসিয়ে দিয়েছিল। সেই চারাটা বড়ো হতে হতে নাকি এখন বিশাল বড়ো হয়ে গেছে। তার ডালে ফুল ফুটেছে, ফল ধরেছে।”
(২)
সাতদিনের মধ্যে তদন্ত কমিটি বসে গেল। কারণ, মেয়েটা যা কাণ্ড করছে এই পৃথিবীর বিচারে তা গর্হিত অপরাধ। আর অপরাধ তো শুধু একটা নয়।
মেয়েটাকে তার রোবট মা কনফারেন্স রুমে নিয়ে এল। কমফারেন্স রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। মেয়েটা দেখল, দশজোড়া চোখ তার দিকে হিমশীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে। অবশ্য চোখের মালিকেরা কেউই ঘরের মধ্যে নেই। ডিজিটাল স্ক্রিনে তাদের বিশাল বিশাল মুখ ভেসে রয়েছে। এক-একটা মুখের আকার ওর গোটা শরীরের সমান। একসঙ্গে এই দশজনের সাক্ষাৎ পাওয়া মুখের কথা নয়। গুরুতর কিছু ঘটলে তবেই একসঙ্গে দশাবতারের দেখা পাওয়া যায় এবং সেটা অবশ্যই ডিজিটাল স্ক্রিনে।
ঘরে কোনও চেয়ার নেই। মেয়েটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুখগুলোকে দেখতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল প্রশ্নোত্তর পর্ব। এক-একটা প্রশ্ন ভেসে আসতে থাকল এক-একটা স্ক্রিন থেকে। প্রশ্নকর্তার গলার স্বরে গমগম করে উঠল গোটা ঘর।—“তোমার বয়স কত?”
“পনেরো বছর তিন মাস।”
“নেহাত কম তো নয়। অন্তত কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল সেটা বোঝার মতো বয়স তো হয়েছে।”
“কী জানি। যা বুঝছি তা ঠিক না ভুল, সেটা তো জানি না। বোঝার চেষ্টা করছি।”
“আবেগের বিষয়ে তোমার মা, মানে রোবট মা যা শিখিয়েছে মনে আছে তোমার?”
“হ্যাঁ, আছে।”
“শুনি।”
“আবেগ একটা অত্যন্ত অপ্রয়োজনীয় জিনিস। এটা মানুষের কোনও উপকারে লাগে না, শুধু পেছন দিকে টেনে নিয়ে যায়। তাই আবেগকে যত কম প্রশ্রয় দেওয়া যায় ততই ভালো।”
“এ-বিষয়ে তোমার কী মত?”
“ওই কথাটা ভীষণভাবে সত্যি।”
“কোনটা?”
“পেছন দিকে টেনে নিয়ে যায়।”
“তো সেটা ভালো, না মন্দ?”
“ভালো না মন্দ জানি না, তবে একটা অন্যরকম অনুভূতি হয়।”
“কীরকম? আবেগ কোথায় টেনে নিয়ে যায় তোমাকে?”
“পেছনে। অনেক পেছনে। সেই সময়ে, যখন হয়তো আমি জন্মাইনি। হয়তো আমার বাবা-মাও জন্মায়নি। তাদের বাবা-মায়েরা ছিলেন হয়তো। তখন হয়তো পৃথিবীটা অন্যরকম ছিল।”
“অন্যরকম বলতে?”
“হয়তো তখন মানুষে মানুষে সামনাসামনি দেখা করা যেত। হয়তো তখন মানুষের আবেগ প্রকাশ নিষিদ্ধ ছিল না।”
“একদম ঠিক বলেছ তুমি। পৃথিবী এরকমটাই ছিল আজ থেকে একশো বছর আগে। আর সেই কারণেই মানব সভ্যতা ধীরে ধীরে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। সেই ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েই আজকের মানব সম্প্রদায় তৈরি করা হয়েছে। মানব সভ্যতাকে অবলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আমরা কিছু সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছি। সেই সিদ্ধান্তগুলোর কারণেই আজকের মানব সমাজ একশো বছর আগের থেকে অনেক বেশি নিরাপদ। তোমার মতো ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা সুস্থভাবে সঠিক শিক্ষার মাধ্যমে এক-একজন সুন্দর মানুষে পরিণত হচ্ছে। তুমি নিশ্চয়ই চাও না যে, এই সুন্দর পৃথিবী থেকে আমরা আবার আগের ভুল পৃথিবীতে ফিরে যাই?”
“আমি কখনোই চাইব না। আমি চাইছিও না। আমি মনেপ্রাণে চাই আপনাদের শিক্ষায় মানুষের মতো মানুষ হয়ে উঠতে। কিন্তু ও চাইছে না।”
“সরি, কে চাইছে না?”
“আমার ভেতরে যে রয়েছে।”
“বুঝলাম না ঠিক। কে রয়েছে তোমার ভেতরে?”
“এই বাইরের আমিটা যদি হয় সিস্টেম ওয়ান, যে প্রতি মুহূর্তে অসংখ্য তথ্য জানার চেষ্টা করছে, তাহলে আমার ভেতরে একটা সিস্টেম টু ঠিক তার উলটো কাজ করে চলেছে।”
“কী করে চলেছে?”
“সে আমার কানে ক্রমাগত বলে চলেছে, শুধু তথ্য দিয়ে কিছু হয় না। তার সঙ্গে ভালোবাসা, দয়া, মায়া এসব নাকি মেশাতে হয়।”
“সর্বনাশ! এ তো মারাত্মক ব্যাপার। তার মানে আমাদের অজান্তে তোমার ভেতরে কেউ একটা অন্য প্রোগ্রাম ইনস্টল করে তোমাকে ভুল পথে চালনা করার চেষ্টা করছে।”
“কিন্তু আমি তো রোবট নই, মানুষ। আমার ভেতর কী করে প্রোগ্রাম ইনস্টল করা সম্ভব?”
“এসব হায়ার টেকনোলজির ব্যাপার তুমি বুঝবে না। আমরা মানুষকে আরও উন্নততর প্রাণীতে রূপান্তরিত করার জন্য তার ভেতরে কিছু কিছু রোবটিক কোয়ালিটি ইনস্টল করার চেষ্টা করছি। কিন্তু যতক্ষণ না দয়া, মায়া, ভালোবাসা এইসব অপ্রয়োজনীয় আবেগকে তার ভেতর থেকে ধুয়েমুছে সাফ করা যাচ্ছে, ওইসব রোবটিক গুণকে কিছুতেই ইনস্টল করা যাবে না। এখন দেখছি যে তোমার ভেতরে এর মধ্যেই কেউ ওইসব আবেগের বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছে। এটাকে প্রাথমিকভাবে একটা সাবোটাজ বলেই মনে হচ্ছে।”
“সাবোটাজ!”
“হুঁ। তোমাকে বাঁচাবার জন্য এখন আমাদের সামনে একটাই রাস্তা খোলা। আবেগগুলোকে মেরে ফেলার জন্য একটা স্পেশাল প্রোগ্রাম তোমার ভেতরে ইনস্টল করতে হবে। এছাড়া আর কোনও উপায় নেই।
(৩)
হাজার চেষ্টা করেও মেয়েটার ভেতরের মানবিক আবেগগুলোকে মেরে ফেলা গেল না। এদিকে তার মাথার তথ্যের পাহাড়ে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। সে অনেক তথ্য ভুলে যেতে শুরু করল। সেই জায়গায় তার স্বপ্নে আসতে লাগল অদ্ভুত সব ছবি। সেইসব ছবি এই পৃথিবীর নয়। আবার হয়তো এই পৃথিবীরই, কিন্তু বহু যুগ আগের।
একদিন দেখল, একটা বিশাল জঙ্গলের ভেতর অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। একদিন দেখল, তার বয়সি এক দঙ্গল ছেলেমেয়ে সবুজ মাঠে ছুটোছুটি করে খেলছে। একদিন দেখল, জনা দশেক মানুষ ঘাসের ওপর গোল হয়ে বসে কী এক অদ্ভুত সুরে কথা বলছে। এই পৃথিবীতে যেহেতু গান নিষিদ্ধ, তাই মেয়েটি বুঝতে পারল না যে ওরা গান গাইছে। কিন্তু ওই গানের কথা ও সুর তার মাথায় বসে গেল। গানের শুরুর কথাগুলো হল, ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে’।
গানটা শুনে কেমন যেন মোহমুগ্ধ হয়ে গেল ও। এমন অদ্ভুত জিনিস তো ও কোনোদিন শোনেনি। এইসব ছবি তার স্বপ্নের মধ্যে কোত্থেকে আসছে? বহুযুগের ও-পার হতে? এত অবাঞ্ছিত আবেগ, অনুভূতি তার মধ্যে কোত্থেকে আসছে? বহুযুগের ও-পার হতে? মেয়েটার মনে হল, হয়তো আজ থেকে একশো বছর আগে তার পূর্বপুরুষদের ভেতর ছিল এইসব অনুভূতি। তারা হয়তো একসঙ্গে বসে ওইরকম সুর করে কথা বলত। এক শতাব্দী সময়ের বেড়া অতিক্রম করে সেইসব আবেগ, অনুভূতি তার মনের মধ্যে হাজির হয়েছে ঠিক আষাঢ়ের মতোই।
সকালে ঘুম থেকে উঠে নিজের অজান্তেই ও গানটা গুনগুন করছিল। শুনতে পেয়ে ছুটে এল ওর রোবট মা।
“কী করছ এটা তুমি?”
“কাল স্বপ্নের মধ্যে শুনলাম। কী বলে গো এটাকে? আমারও মাঝেমধ্যে ইচ্ছে করে এরকম সুর করে কথা বলতে।”
“খবরদার। এই কথা তোমার মুখে যেন আর দ্বিতীয়বার না শুনি। আগেও বলেছি না?”
“কেন করব না গো? কী সুন্দর!”
“আমি বলছি তাই করবে না। এই পৃথিবীর সবথেকে নিষিদ্ধ জিনিস কী জানো?”
“আবেগ।”
“আর আবেগের মধ্যে সবথেকে নিষিদ্ধ হল, ওই যেটা তুমি এইমাত্র করলে। আমরা তোমাকে সঠিক পথে আনার জন্য…”
“আচ্ছা, আষাঢ় কী?”
“আমি জানি না। আর তোমারও জানার কোনও প্রয়োজন নেই। তোমাকে যা জানানো হবে তার বাইরে কোনও কিছু জানার তোমার প্রয়োজন নেই। মাথায় ঢুকেছে?”
“আমার মাথায় তো ঢুকেছে, কিন্তু আমার ভেতরে যে আছে তার মাথায় ঢুকছে না। ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে’—কী সুন্দর! আমি বলছি না, ও বলছে।”
(৪)
গ্রহান্তর। এই শাস্তিই স্থির হল মেয়েটার জন্য। কারণ, ওর মধ্যে যেসব প্রবণতা দেখা যাচ্ছে তা এই পৃথিবীর পক্ষে নাকি ভয়ানক ক্ষতিকর। পৃথিবীর মঙ্গলের কথা চিন্তা করেই ওকে জনমানবহীন অন্য এক গ্রহে নির্বাসন দেওয়া হচ্ছে।
পৃথিবীতেই হয়তো রাখা যেত সমস্ত জনসংযোগ ছিন্ন করে। ডিজিটাল স্ক্রিন এবং রোবটবিহীন একটা ঘরে রাখলে সেটাই গ্রহান্তরের সমান শাস্তি হত। কিন্তু পৃথিবীর যাঁরা নিয়ন্ত্রক, পৃথিবীর ভালোমন্দ যাঁরা নির্ধারণ করেন, তাঁরা মনে করলেন যে এমন একটা মারাত্মক অপরাধের জন্য একটা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া দরকার। তাই গ্রহান্তর। শুধু তাই নয়, গ্রহান্তরের লাইভ টেলিকাস্ট মানুষ ঘরে বসেই দেখতে পাবেন তাঁদের দেয়ালজোড়া ডিজিটাল স্ক্রিনে।
সকাল থেকে শুরু হল লাইভ টেলিকাস্ট। ঘর থেকে বের করে মেয়েটাকে মহাকাশযানের দিকে নিয়ে যাচ্ছে চারজন সশস্ত্র রোবট। আশ্চর্যজনকভাবে মেয়েটার মুখে ভয় বা দুঃখের কোনও ছাপ নেই। গোটা মুখ ভাস্বর হয়ে রয়েছে এক অদ্ভুত হাসিতে। পৃথিবীর মানুষ এমন বিচিত্র হাসি কখনও দেখেছে বলে মনে করতে পারল না। মেয়েটার ঠোঁট অল্প অল্প নড়ছে। ওর গলার আওয়াজ শোনা গেলে সবাই জানতে পারত যে ও গান গাইছে। গানটা আজ ভোরে ঘুম থেকে উঠে তৈরি করেছে ও।
রোবট চারজন মেয়েটাকে মহাকাশযানের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে বেরিয়ে এল। মহাকাশযানের দরজা বন্ধ হয়ে গেল। ঘড়ি উলটোদিকে ঘুরতে শুরু করল। দশ, নয়, আট, সাত… সময় শূন্য ছুঁলে মহাকাশযানও শূন্যে পাড়ি দেবে।
অবশেষে অন্য গ্রহের উদ্দেশে রওনা দিল মহাকাশযান। মেয়েটার সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ওর মাথার সিন্দুক বোঝাই হয়ে পৃথিবী ছেড়ে গেল স্বপ্ন, ভালোবাসা, দয়া, মায়া, কল্পনা, গানের শেষ টুকরোগুলোও।
পৃথিবীর বর্তমান ও ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রক দশ মাথা সন্তুষ্টির হাসি হাসল। রোবট প্রজন্ম তৈরি হওয়ার আর কোনও বাধাই রইল না। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাকাশযান মিলিয়ে যাচ্ছে দূর নক্ষত্রলোকে।
দশ মাথার মধ্যে যিনি সর্বশক্তিমান, তাঁর ডিজিটাল স্ক্রিনে এখন ফুটে উঠেছে মেয়েটার ঘর। তার ফেলে যাওয়া জিনিস গুছিয়ে রাখছে তার রোবট মা। গুছিয়ে রাখতে রাখতে সে যেন কিছু কথাও বলছে। কিন্তু কার সঙ্গে? ঘরে তো আর কেউ নেই। শোনার জন্য সর্বশক্তিমান অডিও লেভেল বাড়ালেন। হ্যাঁ, এবার পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছেন তিনি। শুনতে পেয়ে তাঁর শিরদাঁড়া বেয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত নেমে গেল।
ঘর গোছাতে গোছাতে রোবট মা গুনগুন করছে—‘বহু যুগের ও-পার হতে আষাঢ় এল আমার মনে’।
(গানের কথার ঋণস্বীকার: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)