গল্প-ঝিমলি নামে মেয়েটা-শর্মিষ্ঠা সেন-শীত ২০২৩

এই লেখকের আগের গল্প- স্বর্ণময়, গল্প বোনা, নিঝুম দুপুর

golpojhimli

মাসখানেক ধরে বাড়িতে আবার লোকজনের আনাগোনা। ফিতে দিয়ে মাপজোক হয়েছিল প্রথমে, তারপর গাড়ি বোঝাই করে জিনিসপত্র—লোকজন আসছে তো আসছেই। ভাঙাচোরা বাড়িটা অবশেষে সারাই হচ্ছে। ঝিমলি খুব খুশি।

সত্যিই যা অবস্থা হয়েছিল! ছাদ থেকে যখন-তখন প্লাস্টার খুলে খুলে পড়ত। রঙ চটে গিয়েছিল কবেই। অত বড়ো বাড়িটা সন্ধ্যাবেলায় দেখলে ভূতের বাড়িই মনে হত। রাতে টিমটিমে হলুদ একটা আলো জ্বলত বাইরে—নারকেল, সুপুরি আর সেগুনগাছের ছায়ায় এক বিচিত্র আলোছায়ার জীবন্ত নকশা পড়ে থাকত গোটা উঠোন জুড়ে। ইদানীং তাই বোধ হয় বাড়ির চারপাশ কেউ মাড়ায় না। ঝিমলির রাগ হয়, কষ্ট হয়। না-হয় একটু ভাঙাচোরা আর জঙ্গল-টঙ্গল হয়ে আছে, তা বলে বন্ধুরাও কেউ আসতে চায় না—এটা ঝিমলির কষ্টের একটা কারণ।

অবশ্য সে যদি বলো, ঝিমলির মা বলে, ঝিমলি ছিঁচকাঁদুনেদের মতো দুঃখ পেয়ে ‘নাকি-কান্না’ কাঁদতে ভালোবাসে। সারাক্ষণ রিমলির সঙ্গে ঝগড়া আর ঠাকুমার কাছে গিয়ে নালিশ। মা তাহলে আসলে ঝিমলিকে চেনেই না। ওটা তো রিমলিকে বকা খাওয়ানোর একটা কায়দা। ঝিমলি আসলে খুব দস্যি মেয়ে।

মা রিমলি-ঝিমলির ঝগড়ার মধ্যে কখনোই থাকে না। দু-বোন চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ঘুমোনোর সাত-আট ঘণ্টা ছাড়া বাকি সময় খুনসুটি করে কাটায়। রিমলি দু-মিনিট সাতচল্লিশ সেকেন্ডের বড়ো, তাই মাঝে মাঝে একটু শাসন করতে চায় ঝিমলিকে। তা ঝিমলি সে-সব মানবে কেন! ওদের দু-বোনের সারাদিন ধরে হুটোপুটি, কান্নাকাটি, গলাগলি ভাব—সব পরপর চলতে থাকে। এদিকে এক মুহূর্তও ওরা একে অন্যকে ছেড়ে থাকতে পারে না।

এমন গমগমে বাড়ি হঠাৎ চুপচাপ হয়ে গেলে ভালো লাগে? ঝিমলিরও লাগে না। ঠাকুমা নেই, রিমলি নেই। ও তাই একা-একাই সারাদিন বাড়ির মধ্যে ঘুরে বেড়ায়। কুন্দের ঝোপ থেকে সাজি ভরে ফুল তোলে, প্রজাপতির পেছন পেছন দৌড়য়, কাকের সঙ্গে ‘কা কা-খা খা’ করে কথা বলে, কখনও ছাদের আলসেতে পা টিপে টিপে হাঁটে। যদিও ছাদের আলসেতে ওঠা বারণ, তবুও ঝিমলি এটাই করবে। ওর কারও বারণ শুনতে বয়েই গেছে! যা দস্যি! ও ঠিক করেছে, বড়ো হয়ে বাবার মতো ফৌজি হবে, দারুণ যুদ্ধ করে শত্রুকে হারিয়ে দেবে।

ঠাকুমা বলতেন, ‘এই মেয়ে বড়ো হলে এমন কুঁদুলে হবে যে বাড়িতে কাক-চিল বসতে দেবে না।’

রিমলি ছড়া কাটত—‘কুঁদুলে বুড়ি ঝিমলি/ ভালোবাসে ইমলি/ ইমলিভরা পোকা/ ঝিমলি মস্ত বোকা!’

আর যাবে কোথায়, রিমলি-ঝিমলির দুপদাপ দৌড় শুরু। আর ঠাকুমা পেছন থেকে সাবধান করতেন—‘ওরে আস্তে আস্তে দৌড়ো, হাত-পা ভাঙলে বিছানায় থাকতে হবে ছ’মাস!’

কে কার কথা শোনে। অথচ দ্যাখো, সাবধানী ঠাকুমাই কেমন ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে মাথা ফেটে একদলা হয়ে গিয়েছিল!

ঝিমলি সেদিনটার কথা মনে করতে চায় না। খুব কষ্ট হয় বুকের মধ্যে। মা, রিমলি, বাবা কেমন পাগলের মতো করছিল। রিমলি চিৎকার করতে করতে শান্ত হয়ে গিয়েছিল একসময়। তারপর অনেকদিন কথা বলেনি কারও সঙ্গে, একদম বোবা হয়ে গিয়েছিল যেন। ঝিমলিরও তো বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। রিমলিকে জড়িয়ে ও কতকিছু বলেছিল, চোখের জল মুছিয়ে দিয়েছিল—রিমলি তবুও অবুঝের মতো ছটফট করছিল।

আর মা? মায়ের কথা মনে পড়তেই ঝিমলি শান্ত হয়ে বসে। আঁজলাভরে জল নিয়ে কুঞ্জলতায় দেয়। মায়ের প্রিয় ফুল। কেমন ঢেকে ফেলেছে শোবার ঘরের বাইরের জানালাটা। গাঢ় লাল ফুলে ফুলে ভরতি হয়ে আছে। কী সুন্দর! ঝিমলি খুশি হয়ে হাততালি দেয়।

দূরে কাজ করছে নীলুকাকুর ছেলে। ঝোপঝাড় পরিষ্কার করার কাজে ওকে লাগিয়েছে বাবা। সে কাজ করতে করতে এদিকে মুখ তুলে তাকায় বার বার। তবে ঝিমলি কথা বলে না। ও একটু নাকউঁচু। সবার সঙ্গে কথা বলে না‌। রিমলি আবার দুনিয়াসুদ্ধ লোকের সঙ্গে কথা বলবে, ভাব করবে—একদম অন্যরকম।

***

ঝিমলির সবচেয়ে ভালো লাগে কুয়োতলায় গিয়ে কুয়োয় মুখ ঢুকিয়ে ‘কু’ দিতে। কেমন গমগম করে ওঠে, তাই না? যেন কুয়োর ভেতর থেকে আরও একজন কথা বলে ওঠে। বাবা বোধ হয় কুয়োটা ঢেকে দিতে বলেছে। ঝোপ-জঙ্গল, ইট, সুরকি সব কুয়োতে ফেলা হচ্ছে তাই। ঝিমলিও দু-একটা পাথর উঠিয়ে টুপটাপ করে কুয়োতে ফেলছে। এমনিতেই কুয়োটা বেশি ব্যবহার হত না, শুধু ঠাকুমা পুজোর বাসন মাজতে আসতেন। বাগানের মাটি আর তেঁতুল দিয়ে বাসন মাজা হত। এত ঝকঝক করত যে ঝিমলি পরিষ্কার নিজের মুখ দেখতে পেত। এখন সেই জল থেকে পচা গন্ধ বেরোয়—কতদিন পরিষ্কার করা হয়নি যে! ঝিমলির তাতে কোনও অসুবিধে নেই অবশ্য। ও বলে, নিজের বাড়ির সবই ভালো। ঠিক ঠাকুমা যেমন বলতেন।

মা গজগজ করত। বলত, ‘দস্যি মেয়েদের নিয়ে সংসার, এই ভাঙা বাড়িতে হয়? কোনদিন মাথার ওপর সব ভেঙেচুরে পড়বে দেখো!’ বাবা মাসের পর মাস বাইরে। মা চিন্তা করত খুব।

আসলে বাড়িটা তৈরি করেছিলেন রিমলি-ঝিমলির বড়ো বাবা, মানে বাবার ঠাকুরদা। বাড়িটার বয়স হয়েছিল বটে, তবে কাঠামোটা পোক্ত ছিল, তাই একটু টাকাপয়সা খরচ করলেই আবার বাড়িটা নতুন করা যেত। বাবা আসলে সময় পাচ্ছিল না। করছি, করব‌ করে করে এতগুলো বছর কেটে গেছে। তাই ঠাকুমা বাবার হয়ে একটু বলতেন, ‘যতদিন সংস্কার না হয়, এই ভাঙা বাড়িটাকেই ভালোবেসে থাকো না বাপু! আপন ঘরের কাঁচা ছাউনিও ভালো।’

ঝিমলির ঠাকুমার কথা মনে পড়ে। রোজ। ঠাকুমাকে জ্বালাতন কম করেনি সে। রাগ হলেই ‘বিটকেল বুড়ি’ বলে ভেঙচি কেটে, জন্মের আড়ি দিয়ে পালিয়ে যেত। ঠাকুমা ভয় দেখাতেন মাকে বলে দেবেন বলে, কিন্তু বলতেন না মোটেও। ঝিমলি ভাবে, একবার যদি ঠাকুমাকে দেখতে পেত, ছুট্টে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলত, ‘সরি গো ঠাম্মাবুড়ি, একশোবার সরি। আর কক্ষনো জ্বালাব না গো। এসো, ভাব ভাব ভাব!’

ঠাকুমাকে আর দেখতে পাবে না বলে খুঁ খুঁ করে কেঁদে ফেলে ঝিমলি। ওদিকে নীলুকাকুর ছেলে খুরপি ফেলে বাড়ির ভেতরে দৌড়ে যায়। ঝিমলিও কুয়োতলা থেকে উঠে ঘরে ঢোকে।

সারা ঘরে ধুলোময়লা। বৈঠকখানা ঘরটায় কাজ হচ্ছে আজ। দেওয়াল ঘষামাজা চলছে। কাল থেকে চুনকাম শুরু হবে বোধ হয়। ঝিমলি ছোটো ছোটো পায়ের ছাপ ফেলে সারা ঘরে ঘুরে বেড়ায়। ধুলোময়লা গায়ে এসে পড়ছে, সে ভ্রূক্ষেপ নেই ওর। হঠাৎ পায়ে লেগে এটা-ওটা পড়ে যায়, শব্দ হয় খুটখাট। নীলুকাকু হাতজোড় করে বলে, “মা জননী, তুমি বাইরে যাও, তোমার বাড়িই তো সারাই করছি গো!”

ঝিমলি খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে। এটুকু মেয়েকে কে হাতজোড় করে কথা বলে?

অবশ্য নীলুকাকুর ধরনই এমন। ঠাকুমাকেও মা জননী বলত। মাকে বলে বৌদিদি। নীলুকাকুরা এ-বাড়ির পেছন দিকেই থাকে। ঝিমলিদের বাড়ির অংশ ছিল একসময়। ঝিমলির বাবা ওদের লেখাপড়া করে জমি আর বাড়িটুকু দিয়ে দিয়েছে। বাবা যখন অফিসের কাজে চার-পাঁচ মাস টানা বাইরে থাকে, তখন এ-বাড়ির আগড়ুম বাগড়ুম কাজ নীলুকাকুই করে। বাড়ি সারাইয়ের ঠিকেদারও নীলুকাকু জোগাড় করে এনেছে।

***

দেখতে দেখতে ঝিমলির চোখের সামনে একটু একটু করে ওদের বাড়িটা সুন্দর হয়ে উঠতে থাকে। ছাদটা আবার খুঁড়ে ভেঙে নতুন করে জলছাত করা হয়েছে। চারদিকে রেলিং দিয়ে ঘেরা। কার্নিশগুলো সারাই হয়েছে। ঘরের ভেতরগুলোও সারিয়ে-সুরিয়ে রঙ করে একদম রাজার বাড়ির মতো হয়েছে। নতুন আলো দেওয়া হয়েছে বাইরে। ঝিমলি যদিও কখনও রাজবাড়ি দেখেনি, তবুও ওর মনে হচ্ছে রাজবাড়ি আসলে এমনই হয়।

জানালার বাইরের কুঞ্জলতাটা অবশ্য বাঁচাতে পারেনি। জঙ্গল সাফ করার সময় ওটাও ঘ্যাচাং ফুঁ হয়ে গেছে। তবে ঝিমলি প্রচুর বীজ ছড়িয়ে দিয়েছে এর মধ্যেই, বর্ষার জল পেলেই আবার মাটি ফুঁড়ে গাছ বেরোবে। ঠাম্মাটা কেন যে এমন করে আসে না! ঠাম্মা কি আর গাছ! মানুষ একবার মরে গেলে আর ফেরে না। দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বারান্দার রেলিংয়ের ওপর বসে ঝিমলি।

বাগানটাও খুব সুন্দর হয়েছে। কুয়োতলা বুজিয়ে ওখানে ছোটো ছোটো কীসব ফুলগাছ লাগানো হয়েছে। মা চিনবে ওসব। ঝিমলি ভাবছিল, ওখানে বাবা যদি একটা দোলনা টাঙাতে বলত—রিমলি দুলত বেশ। ঝিমলি হুই জোর একটা ঠেলা দিত, আর রিমলি পা উঁচু করে পৌঁছে যেত ওই ওপরে—কী মজাটাই না হত!

ঘুরে ঘুরে সব দেখে ঝিমলি। সবার মনের মতো হয়েছে এবার বাড়িটা। মা আর বাবার ওপর চেঁচামেচি করতে পারবে না।

ভাবতে ভাবতে কখন যেন আনমনা হয়ে পড়েছিল ঝিমলি। দূর থেকে কানে আসে কার ডাক—“ওরে আমার ঝিমলি বুড়ি, পাকুনি বুড়ি, নাটুকে রানি…”

আরে, এসব তো ঠাম্মা ডাকত ওকে! তবে কি ঠাম্মা সত্যিই গাছেদের মতো আবার ফিরে এসেছে? তাকিয়ে থাকতে কষ্ট হয়—অসম্ভব যন্ত্রণা কোথায় যেন। ঝিমলি দেখতে পায়, ঠাকুমার হাসি হাসি মুখটা। ধীর পায়ে হেঁটে ঠাকুমার হাতটা ধরে ও।

***

তারপর এক রোদ ঝলমলে সকালে বাড়িটার সামনে একটা গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নামে মা, বাবা আর রিমলি।

কলকাতায় বড়ো ডাক্তার দেখিয়ে রিমলি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। চোখের সামনে বোনকে আর ঠাকুমাকে খোলা ছাদ থেকে পড়ে যেতে দেখেছিল ও।‌ দৌড়ে এসে ঠাকুমাকে জড়িয়ে ধরতে গিয়েছিল ঝিমলি। সামলাতে পারেনি ঠাকুমা। শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল রিমলি। বাবা-মা চেয়েছিল বাড়ি বিক্রি করে অন্য শহরে নতুনভাবে শুরু করবে। রিমলি বাধা দিয়েছিল। বোনের সঙ্গে বারোটা বছর একসঙ্গে এ-বাড়িতে কাটিয়েছে, এই বাঁধন ছেড়ে অন্য কোথাও রিমলি থাকতে পারে?

গেট ঠেলে বাড়িতে ঢুকতেই কোথায় যেন কিচিরমিচির করে অনেক পাখি ডেকে ওঠে; সড়সড় করে দুটো কাঠবেড়ালি দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায় পেয়ারাগাছটার মাথায়। ফুলে ফুলে ভরা ছোটো ছোটো গাছ হালকা হাওয়ায় মাথা দোলায়, ঠিক যেন ঝিমলি দৌড়ে বেড়াচ্ছে গোটা বাড়ি জুড়ে। সেগুনগাছের শুকনো পাতা মাড়িয়ে রিমলি ঘরে ঢোকে।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply