সন্ধ্যা ভট্টাচার্য স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৩ – ৬ষ্ঠ স্থান

কাল শেষ বিকেলে কলকাতার বিখ্যাত সেই জিন-ম্যানিপুলেশন ক্লিনিক থেকে ছাড়া পেয়েছেন স্রোতস্বিনী। ক্লিনিকের তরফ থেকেই ওঁকে ফ্লাইটে পৌঁছে দিয়েছে ভুবনেশ্বরে। সেখান থেকে এয়ার-কন্ডিশনড গাড়িতে পুরীর সি-বিচের এই বিখ্যাত স্যানাটোরিয়ামে। থেরাপি প্যাকেজে তাই ছিল। স্যানাটোরিয়ামটা বেশি দিন হয়নি। বাইশ শতকের গোড়াতেই। একুশ শতকের পুরোনো পুরী শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছু দূরে এই আলট্রা-মডার্ন মডেল সি-বিচের ধারে বেশ ঝকঝকে, আলো হাওয়ার মাঝখানে চিকন সবুজ রঙের বাড়ি। বাড়ির বেশিরভাগ অংশই স্বচ্ছ কাচের। দেখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রথম দেখাতেই অনেক ছোটবেলায় গ্রামের মামার বাড়ির পাশের ধানক্ষেতের কথা মনে পড়ে গেল স্রোতস্বিনীর। থেরাপি প্যাকেজে এই স্যানাটোরিয়াম-বাসও কম্পালসরি করা আছে। তাছাড়া আর উপায় কী ছিল? কলকাতার ফ্ল্যাটের ঘরে আলো-হাওয়া তেমন খেলে না। ছেলেমেয়ে সবাই যে-যার সংসার নিয়ে দূর বিদেশে থাকে। তারা কি আর নিজেদের কাজকর্ম ফেলে মায়ের সেবার জন্য ছুটি নিয়ে আসবে? স্রোতস্বিনীও সেসব চান না। চিরকাল তিনি স্বাবলম্বনের কথা ভেবেছেন। আজকাল ওদের সঙ্গে যোগাযোগ বলতে ইন্টারনেট ভরসা। সেখানেই দরকারি, অদরকারি গল্পকথা। আর কাজের লোক, ভালো বাংলায় বলতে হলে কর্ম-সহায়িকা নামক সম্প্রদায়টিও দিন দিন শুধু মহার্ঘ নয়, বিরল প্রজাতি হয়ে পড়ছে। তাছাড়া এ-কালের দস্তুরই হল সহায়-সহকারী বর্জিত জীবন-যাপন।
খুব ছোটবেলার কথা মনে পড়লে এখন ভয় করে। স্রোতস্বিনীর ছোটবেলা? সেও তো প্রায় পঁয়ষট্টি-সত্তর বছর আগেকার কথা। সে-সব দিনে বা তার আগে যেভাবে মেয়েদের ওপর টর্চার করা হত! স্রোতস্বিনী অবশ্য চিরকালই স্বাধীনচেতা। বিয়েও করেছিলেন কেরিয়ারের দ্রুত ধাবমান গ্রাফটি দেখতে পাওয়ার পর। অর্থাৎ, পড়াশুনো শেষ করে চাকরি পেয়ে এবং এক্কেবারে নিজের মতে। আর্ট কলেজের মাস্টারমশাই বিপুল মিত্রকে। সে-বিয়ে টেকেনি। তাই আর অকারণে ‘নো কম্প্রোমাইস’। বিপুল খুব ভালো ছবি আঁকতেন, কিন্তু একেবারে খামখেয়ালি মানুষ। আগে বোঝেননি। যখন বুঝলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। তবুও মানুষটার সঙ্গে পনেরো বছরের যৌথ জীবন কাটিয়ে আচমকা ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর কয়েকবার জীবনসঙ্গী খোঁজার কথা যে মনে হয়নি তা নয়, তবে শেষ পর্যন্ত পিছিয়ে এসেছেন। ঠিক পিছিয়ে আসা হয়তো নয়, আর কোনও নতুন সম্পর্কে জড়ানোর জন্য সময় বা শ্রম খরচ করতে ইচ্ছে করেনি। একা, স্বাধীনভাবে থাকার কিছু শর্ত অবশ্যই আছে। বাজার-রান্নার মতো বিরক্তিকর কাজ তার মধ্যে দু-একটা। চিরকাল স্রোতস্বিনীর রান্না করাতে আলার্জি। মা-কাকিমারা যে এই কাজটাতে কী এত আনন্দ পেতেন! স্রোতস্বিনীর বরং গাছপালার কিছুটা শখ আছে। ফ্ল্যাটবাড়ির মাপা চৌকো বারান্দায় কত রকমারি পাতাবাহার গাছ লালনপালন করে আসছেন। ওদের জন্য কতটুকু আর যত্ন লাগে; সময়মতো জল দেওয়া আর মাসে একবার সার দেওয়া।
গাছের শখ বজায় রাখার পাশাপাশি বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাইরের জগতে কাজের পরিধি ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা, গবেষণা ছাড়াও স্রোতস্বিনী অনেক এন.জি.ও-র সঙ্গে যুক্ত। দুঃস্থ শিশুদের সাহায্য করাতে কেমন একটা নির্মল আনন্দ পেয়ে থাকেন।
ওদের জন্য কাজ করতে-করতেই হঠাৎ একদিন ব্যাপারটা মগজে হানা দিয়েছিল। আগেও যে ভাবেননি তা নয়। তবে বনগাঁর এন.জি.ও-তে নিয়মিত আসা সেই অনাথ বাচ্চা ছেলেটি—কী যেন নাম, কিশলয়—কী যেন বলেছিল? আর সুন্দরবনের বাঘ বিধবাদের গ্রামের ক্লাশ ফোরের ছোট্ট সুফিউদ্দিন? এন.জি.ও-দের বার্ষিক অনুষ্ঠানে ওরা কী সুন্দর করে গাছের সালোকসংশ্লেষের মডেল করে স্রোতস্বিনীকে বুঝিয়েছিল—‘দেখুন ম্যাডাম, গাছের কোনও বায়না নেই। ওরা ক্যাডবেরি, পট্যাটো চিপস কিচ্ছু খেতে চায় না। আর ওসব পাবে কী করে? ওদের কি বাবা-মা আছে? তাই ওরা সারাদিন পেট ভরে রোদ্দুর খায়। রোদ্দুর আর জল পেলেই ওদের আর খাওয়ার দুঃখ থাকে না। মানুষেরাও যদি এমনটা পারত—কত কাজ কমে যেত!’
ভাবনাটা অনেকদিন স্রোতস্বিনীর মাথায় ঘুরঘুর করেও ছিল। শেষমেশ স্থির করেই ফেললেন ড. বক্সীর ক্লিনিকে একবার যোগাযোগ করলে কেমন হয়? ড. বক্সী একই সঙ্গে নামি জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ার এবং প্যাথোলজিস্ট। ভালো গবেষক বলে অনেক দিন ধরে সুনাম বজায় রেখেছেন। নিয়মিত পৃথিবীর প্রথম শ্রেণির রিসার্চ জার্নালে তাঁর গবেষণাপত্র প্রকাশ পায়। আর বেশ কয়েক বছর ধরে খুব সাকসেসফুলি জিন নিয়ে হিউম্যান এক্সপেরিমেন্ট করে যাচ্ছেন। সারা পৃথিবীর হিউম্যান এথিক্যাল কমিটি ওঁর কাছে সাজেশন নিতে আসেন। মানুষের শরীরের বা মনের কিছু যুক্তিসম্মত চাহিদা অনুযায়ী তিনি কিছু জেনেটিক ম্যানিপুলেশন করে থাকেন। বেশ কিছু লোক এর ফলে উপকারও পেয়েছে। ওঁর কাছে যাওয়া যেতেই পারে। শুধু অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়াটাই আসল সমস্যা।
না, স্রোতস্বিনীর শরীরে এখনও অবধি তেমন রোগবালাই নেই। হবেই-বা কেন? ছোটবেলা থেকেই শরীরটা বিচ্ছিরি রকমের মজবুত। স্কুলে পড়ার সময় বছরে একবারও অসুখ না করার জন্য কম দুঃখ ছিল? বন্ধুরা জ্বরজারির অজুহাতে বাবা-মা-টিচার-বন্ধুদের কত আদর-মনোযোগ পেত। তাঁর এসব কিছুই পাওয়া হয়নি। গত সপ্তাহে সবে পঁচাত্তরের জন্মদিন পেরোল। এই ২১২৩ সালের নিরিখে তাঁর তো এখন প্রখর যুবতী-বেলা। স্রোতস্বিনীর মা-ঠাকুমা ছিলেন গত শতকের মানুষী। তাঁরা প্রায় শতায়ু হয়ে ধরাধামে টিকে ছিলেন। এই শতকে পৃথিবী জুড়ে মানুষের গড় আয়ু ১৩০ থেকে ১৪০ বছর চলছে। তাই অল্প বয়স থেকেই ক্লোরো-জিন থেরাপিটা নাকি করে নেওয়া দরকার। এতে রান্না-খাওয়ার অনেক ঝামেলা বাঁচবে। শরীরে এনার্জি লেভেল বাড়বে। আজকাল বেশিরভাগ প্রাকৃতিক খাবার-দাবার জেনেটিক্যালি মডিফায়েড হয়ে গেছে। আগেকার মতো স্বাদ আর পান না তেমন। জিভের স্বাদ-কোরকদেরও নাকি আজকাল বদলে নেওয়া যাচ্ছে। তবে এসবে খরচ বিস্তর। ছেলেমেয়েরাও চাইছে তিনি শুধু ক্লোরো-জিন থেরাপিটাই করুন। বছর দশেক আগে থেকে দেশে এই থেরাপির চল হয়েছে। গাছের ক্লোরোফিলের জিন নাকি দিব্যি মানুষের শরীরে ঢোকানো যাচ্ছে। শরীরের অজস্র কোশের মধ্যে রয়েছে একধরনের পাওয়ার হাউস, যাদের পোশাকি নাম মাইটোকন্ড্রিয়া। তারাই শরীরে শক্তির জোগান দেয়। তাদের মধ্যে এই ক্লোরোফিলের জিন নাকি দিব্যি মিলেমিশে থেকে যেতে পারে। চামড়ার রঙ সবুজ হয়ে যাওয়ার ভয়ে প্রথম প্রথম লোকে এ ব্যবস্থায় সাড়া দেয়নি। স্রোতস্বিনীর মর্জিমতো এখন তাঁর শুধু হাতে আর পায়ের চামড়ার কোশে ক্লোরোফিলের জিন ঢোকানো হয়েছে। কয়েকদিন পর থেকেই চামড়ায় সেইসব কোশেরা সংখ্যায় বাড়বে।
ক্লিনিক থেকে ছাড়া পাওয়ার পর কলকাতার দু-কামরার ফ্ল্যাটে থেকে থেরাপির বাকি অংশটা মেনে চলা সম্ভব ছিল না। স্রোতস্বিনীর এখন সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত—সারাদিনে অনেক রোদ্দুর চাই। অনেকটা আলো-বাতাস। কাল গোটা দিনটা স্যানাটোরিয়ামের ঘরে কেটেছে। ডাক্তার এসে একবার শুধু পরীক্ষা করে গেছেন। প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী হালকা, অথচ প্রোটিন ভরা ডায়েট। আজ সকাল থেকে শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগছে।
এখন বেলা ন’টা। গত ঘণ্টা তিনেক ধরে স্রোতস্বিনী পুরীর আলট্রা-মডার্ন মডেল সি-বিচে বালির ওপর নরম ম্যাট্রেস পেতে শুয়ে আছেন। এদিকটা এখনও বেশ নির্জন। এখানে বালির ফিকে সোনালি রঙে, সমদ্রের নীলে, উপুড় হওয়া আকাশের আনাচে-কানাচে বড়ো বেশি শুদ্ধতা, নিরিবিলি ভাব। এ জায়গাটায় হোটেলের দাম আকাশছোঁয়া। মধ্যবিত্তদের নাগালের বাইরে। সমুদ্রের সফেন জল ওঁর মাখনরঙা শরীর মাঝে মাঝে ছুঁয়ে যাচ্ছে। আর ওঁর পঁচাত্তর ছোঁয়া প্রায় যুবতী শরীরের ভেতরে বুঝি রান্না চলেছে। আপন মনে হ্যা হ্যা করে হাসেন স্রোতস্বিনীর। গাছেরা যেমন মাটি থেকে জল শুষে, বাতাসের কার্বন-ডাই-অক্সাইড গিলে ফেলে, ভরা রোদ্দুরে তাদের শরীরের ছোটো ছোটো পাতার রান্নাঘরে রান্না করে—তাঁরও কি ভেতরে ভেতরে তেমন রান্না চলেছে? তীক্ষ্ম চোখে স্রোতস্বিনী নিজের হাত-পায়ের চেটো পরখ করেন, একটু যেন ফিকে সবুজ সবুজ লাগছে! তাহলে কি অপারেশনটা সত্যি সাকসেসফুল হল? মুখে মাস্ক চাপা দিয়ে তিনি এখন শরীর ভরে রোদ্দুর শুষে নিচ্ছেন। বুক ভরে নিচ্ছেন সমুদ্র পাড়ের খ্যাপা বাতাস। মাঝে মাঝে পাশে রাখা বোতল থেকে গলায় ঢেলে নিচ্ছেন স্পেশাল মিনারেল ওয়াটার। আহ্! কী শান্তি। খরচ একটু বেশিই হল। তা হোক। রোজকার বাজার- রান্নার মতো তুচ্ছ ব্যাপার থেকে তো মুক্তি পাওয়া গেল। এখন ক’দিন এমনি চলবে। রোদ্দুর খেতে হবে প্রাণ ভরে—আজ, কাল, পরশু—তারপর আরও কিছুদিন ধরে, এইখানে এই নিঃসঙ্গ সমুদ্র পাড়ে। স্রোতস্বিনী এখন সিন্থেটিক গাছ মানুষী।
আজ স্যানাটরিয়ামে পঞ্চম দিন। সন্ধে থেকে বড়ো এলোমেলো বাতাস বইছিল। ঠান্ডা অথচ বেশ ফুরফুরে। এখন বাংলার কোন মাস? ফাল্গুন, নাকি চৈত্র? ছোটবেলায় মা বলতেন, ‘বসন্তকালের বাতাস বেশি গায়ে লাগাতে নেই। কখন রোগবালাই এসে হাজির হবে! মাথা-কান ভালো করে ঢেকে নে।’
ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অন্যমনস্কভাবে গলার স্কার্ফটা পেঁচিয়ে নিলেন স্রোতস্বিনী। আজ বোধ হয় পূর্ণিমা। বেশ বড়ো মাখন রঙের চাঁদটা আকাশে ঝুলতে ঝুলতে সমুদ্রের গাঢ নীলচে জলে মুখ দেখছে। স্রোতস্বিনীর ঠান্ডা লাগানো বারণ। একটু বাদে স্যানাটোরিয়ামের ডাক্তার ওঁর মেডিক্যাল চেক-আপে আসবেন। ড. বক্সীর কাছে প্রতিদিন মেডিক্যাল ফিডব্যাক রিপোর্ট পাঠাতে হয়। এদিকে হেড-কোয়ার্টাসে এন.জি.ওর রিপোর্ট পাঠানোর সময় হয়ে গেল। অনেক দায়িত্ব নিয়ে স্রোতস্বিনীর জীবন। ক’দিনে কাজ প্রচুর জমে গেছে। রিসার্চের কাজ, এন.জি.ও-র কাজ। ভাগ্যিস! নিয়মিত অধ্যাপনার চাকরি থেকে অবসর নেওয়া হয়ে গেছে। তবু তো এখানে ওখানে পড়ানো সেমিনার দেওয়া থাকেই। অথচ এখন কিছুদিন কিছুই করা যাবে না। আজকাল সন্ধে হলেই কেমন থেকে থেকে ঘুম পায়, অবসন্ন লাগে। আগে তো এমন হত না। প্রায় রাত একটা দেড়টা অবধি স্রোতস্বিনী নিয়মিত পড়াশুনোর কাজ করতে পারতেন। এখন দিনের বেলাটা বেশ লাগে, সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায়, সারাদিনে আর ঘুম-টুম পায় না। অথচ চিরকাল তিনি লেট-রাইসার। বেলা আটটার আগে বিছানা ছাড়ার কথা সচরাচর ভাবতেই পারতেন না। সারা সন্ধে ঠান্ডা ঘরের সোফায় বসে ঢুলতে থাকেন স্রোতস্বিনী।
অনেক রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। মনে পড়ল, সন্ধে থেকে স্যানাটোরিয়ামের তরফ থেকে কোনও অ্যাসিস্ট্যান্স পাওয়া হয়নি আজ। কেন? এমন হবার কথা ছিল নাকি? ওরা কি স্রোতস্বিনীর দরজায় নক করেছিল? ডোর বেল বেজেছিল? ইন্টারকমে ফোন এসেছিল? সেল ফোনে ভিডিও কলে? গত কয়েকদিন এমন ঘটনা ঘটেনি। তাহলে আজই-বা হবে কেন? শুধু একটা ঘরে চব্বিশ ঘণ্টা ফেলে রাখবে বলে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা নিয়েছে নাকি? গায়ে-মাথায় এত চাপ, ভার, ব্যথাই-বা লাগছে কেন? হঠাৎই অনেক দিনের অনেক পুরোনো রাগ, অভিমান, না পাওয়ার যন্ত্রণা স্রোতস্বিনীকে আকুল করে তোলে। কেমন যেন একটা অস্বস্তি শরীরের গণ্ডি পেরিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। কলিং বেল, ইন্টারকম বাজিয়ে লাভ হল না। সেল ফোনের ব্যাটারি ডাউন হয়ে আছে, চার্জ দেওয়া হয়নি। এদিকে জেদ, রাগ, অভিমান ক্রমশ বেড়েই চলেছে, মাথার ভেতরে দপদপ করছে। আগেকার মতো যখন তখন ওষুধ খাওয়া এখন চলবে না। ড. বক্সী স্ট্রিক্টলি বলে দিয়েছেন, এখন থেকে আপনার লাইফ হবে খুব ন্যাচারাল। ওষুধের সাপোর্ট নিলে হয়তো হিতে বিপরীত হবে। তাহলে? এক্ষুনি তাঁর মাথায় ম্যাসাজ করা দরকার।
অস্থির হয়ে দরজা খুলে বাইরে আসেন স্রোতস্বিনী। শুনশান করিডোর। রিসেপশনে বসে আছে একটি রোবট মহিলা। গাঢ় মেক-আপ আর স্বল্প বাসে। স্রোতস্বিনীকে দেখে মিষ্টি হেসে বলল, “রুম নাম্বার ৭২৭, আই গেস। হোয়াটস রং? ঘুম আসছে না?”
স্রোতস্বিনী রাগত গলায় মুখ ভেংচে বললেন, “ঘুম আসবে কী করে? আমায় সন্ধে থেকে কিছু খেতে দিয়েছেন? নট ইভন অ্যা গ্লাস অফ মিল্ক! এনি স্যুপ? নাথিং। খালি পেটে ঘুম হয়?”
রোবট রিসেপশনিস্ট তার রঙ করা ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল, “পুওর লেডি! কিন্তু ডক্টরের নির্দেশ, এখন থেকে আপনার খাবার দেওয়া হবে শুধুমাত্র একবেলা। সন্ধের পর নো মিল। আপনার সিস্টেম এসব আর নেবে না। আপনি নিজেই এখন দিনের বেলা বেশ কিছুটা ফুড তৈরি করতে পারছেন। এরপর ক্যালোরি ইনটেক বেশি হলে আপনি ক্রমশ ফ্যাটি হয়ে যাবেন, আর নড়াচড়া করতে পারবেন না। আপনার ঘরে সাফিশিয়েন্ট মিনারেল ওয়াটার আছে নিশ্চয়? আপনি বরং এক্সট্রা একটা বোতল নিয়ে যান। মিড নাইট কমপ্লিমেন্টারি সার্ভিস। আমি নোট করে রাখছি।”
ভীষণ ক্ষোভে স্রোতস্বিনীর চিৎকার করতে ইচ্ছে করে। ঠিক ছোটবেলার মতো। দুর্গাপুজোয় মনের মতো জামা না পেয়ে যেমন রাগে চিৎকার করে উঠতেন। মায়ের ওপর, বাবার ওপর। এখন কাকে রাগ দেখাবেন তিনি? কে আছে কাছের মানুষ, যার ওপর কারণে অকারণে রাগ দেখানো যায়। বাবা, মা, কাকিমা, ঠাকুমা, ছোটকা—কেউ আর নেই। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে? তাদের সঙ্গে আজকাল মনের সুর মেলে না। স্বামী হিসেবে বিপুল মন্দ ছিলেন না। শান্ত, চাহিদাহীন মানুষ। ওঁর সমস্ত মন জুড়ে ছিল শুধু ছবি আঁকার কথা। আদ্যোপান্ত অসংসারী এক আর্টিস্ট। ওঁর ওপর রাগ দেখালে বোকার মতো হাসতেন। আর ছেলেমেয়েরা? এখনকার এই প্রজন্ম! তারা এক আশ্চর্য জীব। ওরা সবেতেই বড়ো হিসেবি, ডিসিপ্লিনড। মায়ের জন্য ভাবনা-চিন্তার সময় সপ্তাহে একদিনের জন্যই একটি ঘণ্টায় নির্দিষ্ট করা আছে। আর ছাত্রছাত্রী, এন.জি.ও-র বাচ্চাদের কাছে স্রোতস্বিনী কোনোদিন কিছু প্রত্যাশা করেননি। তবু এত বছরে কয়েকটি প্রিয় ছাত্রছাত্রী কাছের হয়ে গেছে। তারা অবশ্য নিয়মিত খোঁজখবর নেয়। তাদের কি আর মাঝরাতে উপদ্রব করা চলে?
কোনোরকমে নিজের রাগত, অভিমানাহত শরীরটাকে টেনে টেনে ধীরে ধীরে নিজের ঘরে ফিরে যান স্রোতস্বিনী। খাটের ওপর বসে জানালার বাইরের আলো-আঁধারি পৃথিবীর দিকে চোখ রাখেন। পূর্ণিমার আলোয় চরাচর ভেসে যাচ্ছে। সমুদ্রের ওপরে আকাশ জুড়ে ফুটি ফুটি হলদেটে তারা। কতকাল আগে ছোটবেলায় কলকাতার পুরোনো বাড়ির ছাদ থেকে দেখা আকাশের মতো। বাবা কত যত্ন করে ছাদে উঠে আকাশের তারা চেনাতেন। সেসব মনে করে রাগটা আস্তে আস্তে স্তিমিত হয়ে আসে। আশেপাশে একটাও প্রিয় মানুষ নেই। ষাট-পঁয়ষট্টি বছর আগেকার সেই পুরোনো মলিন কলকাতার একান্নবর্তী বাড়িটার কথা মনে পড়ে। ঘরে ঘরে ঠেসাঠেসি কত লোক; সারাদিন কত তুচ্ছ কারণে কত ভয়ংকর ঝগড়াঝাঁটি, মান-অভিমান। আবার তুতো ভাইবোনেদের সামান্য জ্বরজারি, হাত-পা ভাঙার মতো বিপদ হাজির হলেই সবাই ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তখন আবার তাদের মা-বাবা নন, বাড়িসুদ্ধ লোক সেবা-যত্নের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এক মুহূর্ত সেখানে একা থাকা যেত না। কোথায় হারিয়ে গেল সেইসব সেকালের ঝগড়ুটে অথচ মায়া-মমতা ভরা মানুষগুলো!
অন্ধকারে সমুদ্রের পাড় ছুঁয়ে সারি সারি অজস্র ঝাঁকড়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে। জ্যোৎস্না-মাখা আকাশ জানিয়ে দিচ্ছে রাতের হাওয়ায় পাতা নড়ছে, পাতা খসছে। ওরা কেমন পাশাপাশি, গা লাগালাগি করে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা কি ঝগড়া করে? নিজেদের মধ্যে ভাব-ভালোবাসা বজায় রাখে? কে জানে! এখন অবশ্য সমুদ্রের ধারে বাধ্য সৈনিকের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। শান্ত, অবিচলিত। হাওয়ায় পাতা দোলানো ছাড়া আর যেন কোনও কাজ নেই ওদের, নেই কোনও বিদ্রোহের অভিব্যক্তি। একদৃষ্টিতে ওদের দেখতে দেখতে নিজের ভেতরে হঠাৎই অদ্ভুত একটা ঝাঁকুনি টের পান সহজে অসহিষ্ণু স্রোতস্বিনী। তারপরেই শরীর জুড়ে ভিজে ভিজে কেমন যেন একটা স্নিগ্ধ অনুভূতি। রাগ, জেদ, অভিমান, অবসাদগুলো যেন ক্রমশ শান্ত গ্রাম্য জনপদের মতো কোমল হয়ে আসছে। এয়ার কন্ডিশনড ঘরের জানালা খুলে দিলেন স্রোতস্বিনী। বাইরের পৃথিবীর কোমল ঠান্ডা হাওয়ার ঝাপটা তাঁর গাল-কপাল ধুয়ে দিল। শরীরে-মনে ভয় ছমছম করে। এই গাঢ় মধ্যরাতে বুকের ভেতর হঠাৎ কেন এত আকাশছোঁয়া নম্রতা! তাঁর ভেতরে অনেক দিনের চেনা সেই ছটফটে অভিমানী, রাগী মহিলাটি কোথায় চলে গেল? স্যানাটরিয়ামের এই ঘরে আজ রাতে শান্ত প্রতিবাদহীন মানুষের ঘেরাটোপে তাহলে কে জেগে রয়েছে? তিনি কি মানসিকভাবেও বদলে যাচ্ছেন? জানালার বাইরে রাতের অন্ধকারে নিসর্গ প্রকৃতি অদৃশ্য হাতছানি দিয়ে ডাক দেয়—এসো এসো, আরও কাছে এসো।
পায়ে পায়ে ঘর-লাগোয়া ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ান স্রোতস্বিনী। কে যেন ডাকছে না? রি-নি, সি–নি, স্রোতস্বিনী। বাবা, ছোটকা এভাবেই ডাকতেন তাঁকে। ভুল শুনলেন? সমুদ্রের চাপা গর্জন ভেসে আসে। শেষ রাতের উপোসি সমুদ্র বুঝি ডাক পাঠাচ্ছে—এসো, আরও কাছে এসো। জ্যোৎস্নার আলোয় অনেক দূরে সমুদ্রের মাঝখানে একটা জেলে ডিঙি দেখা যাচ্ছে। মাছ ধরে ওরা নিশ্চয়ই খুব সকালে ফিরে আসবে। সুষুপ্ত পৃথিবীতে প্রাণের স্পন্দন তাহলে তো আছেই। ওদেরও সমুদ্র নিশ্চয় ডাক পাঠিয়েছিল।
এন.জি.ও-র চেনা বাচ্চাগুলোর সারি সারি কচি মুখ ভেসে ওঠে। বনগাঁর কিশলয়, সুন্দরবনের বাঘ বিধবাদের গ্রামের সুফিউদ্দিন, আমতলার নয়ন, পুরুলিয়ার দিদিমণি টুডু—‘আবার কবে আসবে দিদি? এবারে কিন্তু মনে করে রঙ-তুলি এনো। আমরা আর কম্পিউটারে আঁকতে চাই না।’
কচি মুখগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে কখন যেন স্যানাটরিয়ামের গেটের কাছে পৌঁছে গেছেন স্রোতস্বিনী। চেয়ারে বসে রাত-পাহারাদার ঢুলছে। তার কোমর থেকে চাবির গোছা নিয়ে নিজেই গেট খুলে সমুদ্রের পাড়ে, জলের খুব কাছে এসে দাঁড়ান স্রোতস্বিনী। দূরের পুব আকাশে লালচে আলোর রেখা; একটি একটি করে হলুদ তারারা অদৃশ্য হয়ে চলেছে। জলের ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে কত অচেনা পাখি। কতদিন পরে তাঁর মনটা কী আশ্চর্যরকম শান্ত হয়ে গেছে। বহুদিন পরে বাবার গলা যেন শুনতে পেলেন স্রোতস্বিনী । বাবা খুব ভালো গান করতেন। কোন ছোটবেলায় পুরী বেড়াতে এসে সমুদ্রের পাড়ে বসে বাবা গান করেছিলেন—‘যখন এসেছিলে, অন্ধকারে চাঁদ ওঠেনি, সিন্ধুপারে চাঁদ ওঠেনি—তুমি গেলে যখন, অন্ধকারে চাঁদ উঠেছে, রাতের কোলে চাঁদ উঠেছে’। রাতের কোলের চাঁদ এখন কিছুটা ম্লান, ঢেউ ভেঙে ভেঙে শেষ রাতের সমুদ্র পায়ের কাছে জলের ঝাপটা মারছে। স্রোতস্বিনীর ভ্রূক্ষেপ নেই। তাঁর এখন একবিন্দু নড়ার ক্ষমতা নেই। তিনি কি ক্রমশ স্থবির হয়ে যাচ্ছেন? ছোটবেলায় দেখা তাঁদের পুরোনো বাড়ির সামনে প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা, অনেক বসন্ত পার করা ডালপালা ছড়ানো প্রাচীন সেই অমলতাস গাছের মতো?
স্রোতস্বিনী ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন সূর্য ওঠার। পঁচাত্তর বছরের মানুষী জীবনের পরে তাঁর এবার নতুন জীবন শুরু হয়েছে। সহিষ্ণু এক বৃক্ষ-জীবন। আবহমান কাল ধরে এ-পৃথিবীতে বেঁচে থাকতে হলে যা করতে হয়, তাই তিনি এবার শিখে ফেলেছেন। অকারণ উপেক্ষা, অপমান—আর কোনও দুঃখ নেই। আর কারও অপেক্ষায়, সমবেদনায় নয়, এবার থেকে বাকি জীবন তিনি নিজের মতো করেই বাঁচতে পারবেন। তাঁর চোখে এখন অদেখা এক আলো এসে পড়েছে। আ-আ-আ-আহ্, কী আনন্দ! তিনি কি এখন শুধুই স্রোতস্বিনী? নাকি স্বাধীনজীবী, স্বভোজী, আদিম ব্যাক্টেরিয়া অথবা প্রাচীন কোনও বৃক্ষের মতো বিচিত্র এক জীব!
অন্ধকারের পর্দা সরিয়ে আলো ফুটছে ধীরে ধীরে। বাইশ শতকের বালার্ক, বহু দূরের আকাশ আর সমুদ্রের জলের সীমানা থেকে মুচকি হাসে এই নবীন অথচ আবহমান এক বৃক্ষ-মানবীর দিকে।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস