গল্প-‘ব্রাউনিফ্রিজিড’ বহির্গ্রহে অজানা প্রাণীদের কবলে-দীপঙ্কর বসু -বসন্ত ২০২৪

golpobrownfrijid

২০৪০ সালের অক্টোবর মাস। কয়েকদিন আগেই শেষ হয়েছে শারদীয়া উৎসব। উৎসবের রেশ কমেনি তখনও। বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ড. লীলাবতী ঘোষের গবেষণাগারে তখনও কাজকর্ম শুরু হয়নি পুরোপুরি। এই সময় তাই ড. ঘোষ তাঁর ঘরে নিশ্চিন্ত মনে তাঁদের গবেষণার একটি পেপার লেখায় ব্যস্ত। এমন সময় সামনের দেওয়ালে ফুটে উঠল জিনিয়া নামের এক রোবটের মুখ। ভেসে এল তার গলার আওয়াজ—“ম্যাডাম, প্যারিস থেকে প্রফেসর এমিলি দেকার্তে কথা বলতে চান।”

নামটা শুনেই ম্যাডামের মুখটা খুশিতে ভরে গেল। সম্মতি দিতেই দেওয়ালে ফুটে উঠল এমিলির মুখ। প্রাথমিক কিছু আলাপ-আলোচনার পরে প্রফেসর দেকার্তে জানালেন যে তিনি এবং জাপানের বিজ্ঞানী মাসুকা সুজুকি শনির সবচেয়ে বড়ো উপগ্রহ টাইটান অভিযানে যেতে চান কিছু গবেষণার কাজে। ওঁদের ইচ্ছে ড. ঘোষ এবং ড. হলধর মান্ডিও ওঁদের সঙ্গে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করুন। চাইলে ওঁরা ওঁদের সবসময়ের সঙ্গী রোবট রোবটানুকেও সঙ্গে নিতে পারেন। ম্যাডাম সম্মতি দিয়ে ডেকে পাঠালেন তাঁর সবচেয়ে প্রিয় পুত্রসম ছাত্র হলধরকে। হলধর এলে বললেন প্রফেসর দেকার্তের প্রস্তাবের কথা। বললেন ওঁর সম্মতির কথাও। জানালেন নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহেই যাওয়া হবে। সেইমতো সবকিছু প্রস্তুত করতে বললেন।

পৃথিবীর মতোই নাইট্রোজেনে ভরপুর এই উপগ্রহে এখনও পর্যন্ত পদচিহ্ন পড়েনি মানুষের। ৯৫-৯৮ শতাংশ নাইট্রোজেন ছাড়া আর এখানের বায়ুমণ্ডলে আছে মিথেন এবং হাইড্রোজেন। এখানেও বৃষ্টি পড়ে, তবে তা তরল মিথেনের বৃষ্টি। এই তরল মিথেন টাইটানের উপরিতলে তৈরি করেছে মিথেনের সমুদ্র, নদী আর লেক। ম্যাডামের কাছে জেনেছি যে অনেক বিজ্ঞানী মনে করেন এই উপগ্রহের মাটির তলায় আছে জল যা পাঁচটি স্তরে বিভক্ত। একদম নীচে আছে পাথুরে সিলিকেট। তাকে খোলের মতো ঘিরে আছে অতি উচ্চ চাপে তৈরি ‘আইস ৬’ নামের একধরনের বরফ। এর উপরে আছে লবণাক্ত জলের স্তর। তার উপরে বরফের আস্তরণ। এর উপরে আস্তরণ হয়ে আছে তরল হাইড্রো-কার্বন আর হাইড্রো-কার্বনের বালি। এই অনুমান সত্য কি না তা জানতেই এই অভিযানের পরিকল্পনা প্রফেসর এমিলি দেকার্তের। অভিযানের ফল যাই হোক, এই অভিযান যে রোমাঞ্চকর হবে এ বিষয়ে ড. ঘোষ নিশ্চিত।

এমিলির কথামতো নভেম্বরের এক তারিখ ড. মান্ডি ও রোবটানুকে নিয়ে ড. ঘোষ পৌঁছে গেলেন ভারত মহাসাগরের এক দ্বীপে যেখান থেকে তিন তারিখে মহাকাশযান ছাড়বে। এক সপ্তাহ আগেই চলে এসেছিলেন প্রফেসর দেকার্তে এবং ড. সুজুকি তদারকির জন্য।

ড. ঘোষের কলমে।—

৩রা নভেম্বর, ২০৪০।

ড. সুজুকির পরিকল্পনায় তৈরি অ্যান্টি-ম্যাটার জ্বালানির মহাকাশযান যখন সবাইকে নিয়ে টাইটান যাত্রা শুরু করল, তখন ঘড়িতে ঠিক সকাল ন’টা। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল পার করার পরে রোবটানু, হলধর আর এমিলির উপর দায়িত্ব দিয়ে আমি আর মাসুকা শীতঘুম অর্থাৎ হাইবারনেশনের চেম্বারে চলে গেলাম। এই চেম্বারে থেরাপিউটিক হাইপোথারমিয়া পদ্ধতি প্রয়োগ করে বিপাকীয় ক্রিয়া মন্থর করে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে এমনভাবে মহাকাশচারীদের অজ্ঞান করা হয় যাতে তাঁরা মৃত্যুর কবলে না পড়েন। অর্ধেক রাস্তা যাওয়ার পরে হলধর আর এমিলি শীতঘুমে যাবেন আর আমি আর মাসুকা শীতঘুম ভেঙে মহাকাশযানের দায়িত্ব নেব—এমনটাই ঠিক হয়েছে। এসব করা হয় খাবার আর অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসের পরিমাণ কমানোর তাগিদে।

অর্ধেক রাস্তা পেরোবার পরে জাগিয়ে তোলা হল আমাদের শীতঘুম থেকে। হলধর আর এমিলি চলে গেলেন শীত ঘুমের প্রকোষ্ঠে। কন্ট্রোল রুমে থাকা যন্ত্রের পর্দায় দেখলাম বাইরেটা। নিঃসীম কালো শব্দহীন এক জগৎ। দূরে সূর্যকে মনে হচ্ছে অনেক ম্লান। মাঝে মাঝে কাছে ধূমকেতু চলে যাওয়ার সময়ে আলোর ঝলকানি ছাড়া ভারি একঘেয়ে এই যাত্রা। নিয়মমাফিক কিছু কাজ ছাড়া সবই চলেছে বিস্তর গবেষণা করে বানানো যন্ত্রের নির্দেশে।

সবকিছুর যেমন শেষ হয়, তেমনই আমরাও একদিন পৌঁছে গেলাম টাইটানের অক্ষের কাছে। আগেই শীতঘুম শেষ করে আমাদের কাজের সঙ্গী হয়েছেন হলধর আর এমিলি। মহাকাশযানকে নিয়ন্ত্রণ করে আমরা ঢুকে পড়লাম টাইটানের অক্ষে। আগেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অ্যান্টি-ম্যাটার জ্বালানি তৈরির উৎসকে। এবার আস্তে আস্তে অক্ষে ঘুরতে ঘুরতে যানের গতি কমাতে কমাতে অত্যন্ত সাবধানে নেমে পড়তে হবে টাইটানের মেরু অঞ্চলে। টাইটানের তাপমাত্রা মাইনাস ১৭৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস হওয়ায় আমরা এই ঠান্ডার উপযোগী স্পেস স্যুট নিয়ে এসেছি। সঙ্গে নিয়ে এসেছি অক্সিজেনের ছোটো ছোটো সিলিন্ডার। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি কফি রঙের বালির ভূপৃষ্ঠ। আসলে অবতরণের জন্য আমরা মেরু অঞ্চল নির্বাচিত করেছিলাম দুটি কারণে। এক, কঠিন হাইড্রো-কার্বনের বালি পাওয়া যাবে, আর যদি এই উপগ্রহে কোনও শত্রুতাপরায়ণ প্রাণী থাকে তবে মেরু অঞ্চলে তাদের থাকার সম্ভাবনা কম।

কিন্তু ভাবনা আর অনুমান সবসময় যে সত্যি হয় না তা বুঝতে পারলাম কিছুক্ষণের মধ্যেই। মাসুকা চেঁচিয়ে বললেন, “মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কাজ করছে না।”

এমিলি চিন্তিত মুখে বললেন, “তাহলে তো মহাকাশযান টাইটানের ভূপৃষ্ঠে আছাড় খেয়ে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।”

মনে হল সবার মুখের রক্ত কেউ শুষে নিয়েছে। ভয়ে এমিলি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো দাঁত চেপে হাত-পা ছুড়তে লাগলেন। হলধরও দেখলাম যথেষ্ট ভয় পেয়েছে। ড. মাসুকা কাঁপতে কাঁপতে আপ্রাণ চেষ্টা করছিলেন যানকে নিয়ন্ত্রণে আনার। আমারও হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছিল বিশ্রীভাবে। মনে হচ্ছিল তা ফেটে গিয়ে মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসবে। তবু নিজেকে যথাসম্ভব শান্ত আর সংযত করে সাহস জোগাতে দাঁড়ালাম গিয়ে ড. মাসুকার পাশে। সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছিলাম মৃত্যুকে। যখন যান ভেঙে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে মৃত্যুর প্রহর গুনছি, তখন আমাদের সকলকে অবাক করে যান আমাদের নির্দিষ্ট জায়গার থেকে অনেক দূরে হেলতে দুলতে অবতরণ করল টাইটানের মেরু অঞ্চলের কফি রঙের মাটিতে।

বুঝলাম, মৃত্যুর হাত থেকে এখনকার মতো বাঁচলেও বিপদ আমাদের দূর হয়নি। এই নিরাপদ অবতরণ যে এমনি এমনি হয়নি সেটুকু বোঝার মতো বুদ্ধি আমাদের সকলেরই আছে। তাই চিন্তিত মুখে সকলে অপেক্ষা করতে থাকলাম পরবর্তী ঘটনার জন্য। এটা সকলেই বুঝতে পারছিলাম যে আমাদের নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রকে নিষ্ক্রিয় করে এমন অবতরণের পিছে নিশ্চয়ই কোনও বুদ্ধিমান প্রাণী আছে। প্রযুক্তিতেও যে তারা যথেষ্ট উন্নত, সে-বিষয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই কারও।

বেশ কিছু সময় কাটার পর মাসুকা বললেন, “চলুন নামা যাক। দেখা যাক কী ব্যাপার।”

এমিলি জানালেন এই প্রস্তাবে তাঁর সম্মতি নেই।

হলধর বলল, “এখানে আমরা কতদিন অপেক্ষা করব? নামতে আমাদের হবেই। ওরা যদি এই যানের চাপ ও তাপমাত্রা পরিবর্তন করে দেয়, তাহলেই তো আমাদের দফারফা। কাজেই আমার মনে হয় আমাদের নেমে ওদের কাছে আত্মসমর্পণ করাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। তারপর দেখতে হবে ওরা আমাদের নিয়ে কী করতে চায়। হতেও তো পারে ওরা তেমন শত্রুভাবাপন্ন নয়। আমাদের যানকে আচমকা দেখে ভয় পেয়ে আমাদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। আপনারা আপত্তি না করলে আমি আর ড. মাসুকা নেমে দেখতে পারি অবস্থাটা কী।”

ওদের দুজনকে আলাদা করে ছেড়ে দিতে মন চাইল না আমার। আমি বললাম যে আমিও ওদের সঙ্গে যাব। রোবটানুকে বললাম এমিলির সঙ্গে থাকতে। ভয় পেলেও এই ব্যবস্থা এমিলির মনঃপুত হল না। তখন আমরা সকলে রোবটানুকে নিয়ে নেমে পড়লাম মহাকাশযান থেকে।

অচিরেই আমাদের ঘিরে ধরল একদল এলিয়েন। বিভিন্ন বই-পত্রিকায় যেসব এলিয়েনদের ছবি দেখতে পাওয়া যায়, এদের দেখতে অনেকটা তেমন। কিছুক্ষণ পরে অবশ্য বুঝতে পারলাম এরা এলিয়েন নয়। এলিয়েনদের পাঠানো সব যন্ত্রদানব। আমরা কিংকর্তব্যবিমূঢ হয়ে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে রইলাম। মনে হল আমাদের প্রাণের নির্যাসটা কেউ শুষে নিয়েছে। হঠাৎ এমিলি কাঁদতে লাগল। তা দেখে রোবটানু কিছু করবার জন্য ছটফট করছে দেখে আমি ইশারায় ওকে নিরস্ত করলাম। এসব দেখে কি না জানি না, একজন যন্ত্রদানব এগিয়ে এসে বোতামের থেকে অনেক অনেক ছোটো একটা জিনিস আমাদের সকলের কপালের মাঝখানে চেপে বসিয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখলাম ওরা অদৃশ্য হয়ে গিয়েছে। কিন্তু আমাদের মাথাও আর আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। পরে জেনেছিলাম, ওরা মোটেই অদৃশ্য হয়ে যায়নি। ওরা আমাদের সঙ্গেই ছিল। কপালে বসানো যন্ত্রের সাহায্যে দুটি প্রতিবিম্বকে একত্রিত করে অদৃশ্য করা হয়েছে। একে নাকি উদ্দীপিত বাস্তবতা বা অগমেন্টেড রিয়েলিটি বলা হয়।

ওদের নিয়ন্ত্রণে কিছুটা চলার পরে আমরা পৌঁছলাম পরপর থাকা অনেক মহাকাশ স্টেশনের মধ্যে একটিতে। সেখানে আমাদের রেখে দেওয়া হল নিয়ন্ত্রিত আবহাওয়ার একটি ঘরে। দুরু দুরু বক্ষে টানটান উত্তেজনায় ছাইপাঁশ খেয়ে আর নিদ্রাকে জলাঞ্জলি দিয়ে তিনদিন কাটল আমাদের।

চতুর্থ দিন এক অভিনব মহাকাশযানে নিয়ে যাওয়া হল আমাদের। ভয়ের সঙ্গে কৌতূহলও হচ্ছিল খুব। চিন্তাও হচ্ছিল দারুণ—কী হবে এর পরে, কী করতে চায় এরা আমাদের নিয়ে, কারা আছে এইসব যন্ত্রদানবদের আড়ালে, এরা কী আমাদের দাস বানাবে না মেরে ফেলবে! ভয়ে দেখলাম সকলের মুখ পাংশু, বাক্যহীন হয়ে গেছে। শুধু রোবটানুর কোনও তাপ উত্তাপ নেই। কিছুক্ষণ বাদে ছাড়ল অভিনব মহাকাশযানটি।

মহাকাশযানের একটি খালি দেওয়ালে ছোটো একটি জায়গায় দেখা যাচ্ছিল যানের বাইরের মহাকাশের ছবি। বাইরে চারদিক নিকষ কালো অন্ধকার। মহাজাগতিক ঝড়ের প্রভাবে যে চৌম্বকীয় তরঙ্গ এবং আয়নের তরঙ্গ তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে কসমিক ধূলিকণার সংঘর্ষে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে আলোর ঝলকানি। তীব্র বিকিরণের ঝড়, চৌম্বকীয় তরঙ্গ, কসমিক রশ্মি আর কসমিক ধূলিকণার আবহাওয়াকে কোনও আমল না দিয়ে এগিয়ে চলল এই মহাকাশযান। যানে আমাদের সঙ্গে ছিল দুজন যন্ত্রদানব। যানের প্রয়োজনীয় কাজকর্ম ওরাই করছিল।

বেশ খানিক সময় এইভাবে চলার পর মনে হল আমাদের যানটি এমন কিছুর মধ্যে প্রবেশ করল যেখানে গতিপথের ভিতরটা প্রসারিত আর সংকুচিত হচ্ছে। আর যত এগোচ্ছি ততই মনে হচ্ছিল সেটা আরও ছোটো হয়ে যাচ্ছে। সে এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। পরে জেনেছিলাম, এই পথটা ছিল একটি ওয়ার্ম হোল।

এইভাবে চলতে চলতে অনেকটা সময় পরে আমরা অবশেষে উপস্থিত হলাম বিচিত্র এক গ্রহের কাছে। কত সময় পরে তা অবশ্য বলতে পারব না। এত দ্রুত গতির যানে সময়ের পরিমাপ সম্বন্ধে কোনও ধারণাই নেই আমাদের মতো পৃথিবীর মানুষদের। ছবিতে দেখা গেল ঘন বাদামি রঙের একটি গ্রহটিকে। মহাকাশে ভাসমান সেই গ্রহ ক্রমশই বড়ো হতে থাকল। এর কালো কলঙ্কও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল। বুঝলাম আমরা অজানা এক গ্রহের খুব কাছাকাছি এসে গেছি। ন্যানো সেকেন্ডের ব্যবধানেই আমরা শুনতে পেলাম পৃথিবীর ভাষায় একটি ঘোষণা—আমাদের যান এখন লাল বামন তারা ‘এক্স ইনফিনিটি’র গ্রহ ‘ব্রাউনিফ্রিজিড’-এর কাছাকাছি এসে গেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা এই গ্রহে অবতরণ করব।

অবতরণের কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে এমিলি হিস্টিরিয়াগ্রস্ত রোগীর মতো গোঁ গোঁ আওয়াজ করতে শুরু করলেন। হলধরের চোখে মুখে ফুটে উঠল এক অসহায় আতঙ্কের ভাব। আমার পাশে বসা ড. মাসুকার হৃৎপিণ্ডের ধকধক আওয়াজ ওঁর ভিতরের চাপা উত্তেজনার প্রমাণ দিলেও ভাবলেশহীন মুখ দেখে তা বোঝার উপায় নেই। অজানা আতঙ্ক যে কী ভয়াবহ হতে পারে তা উপলব্ধি করে আমার শরীর হিম হয়ে গেল। ছবিতে ফুটে উঠল অজানা এই গ্রহের সমুদ্রের ছবি। ঘন বাদামি এই সমুদ্রের রঙ। এটা দেখে আমার মনে অন্য এক ভয়ের উদ্রেক হল। বুঝতে পারছিলাম, এই গ্রহের আবহাওয়া পৃথিবীর মতো হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম। এই গ্রহের প্রাণীরা এমনকি ভালো হলেও এই প্রতিকূল আবহাওয়ায় আমরা বেঁচে থাকব কীভাবে সেটাই ছিল আমার চিন্তার কারণ।

যা হোক, সাতপাঁচ ভাবনার মাঝেই আস্তে আস্তে নামতে থাকল মহাকাশযানটি অজানা গ্রহের মাটিতে। নীচের দিকের গাছপালার রঙ দেখলাম সব কালো। অবশেষে অবতরণ করল মহাকাশযান। নামার কিছুক্ষণ পরে আবার শুরু হল এক ঘোষণা।—আমাদের গ্যালাক্সিতে যে ৮২০ বিলিয়ন গ্রহ আছে তার মধ্যে যে ২৪ বিলিয়ন গ্রহে ভালো পরিমাণে অ্যামোনিয়া আছে আমাদের গ্রহ ‘ব্রাউনিফ্রিজিড’ তার মধ্যে একটি। আপনারা পৃথিবীবাসীরা এই গ্রহে স্বাগত। আমাদের এই গ্রহে আছে প্রচুর পরিমাণে নাইট্রোজেন, আছে ভালো মাত্রায় অক্সিজেনও। আর আছে অল্প পরিমাণ কার্বন-ডাই-অক্সাইড আর অন্যান্য গ্যাস। আছে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় অ্যামোনিয়াও। ছবিতে যে সমুদ্র আপনারা দেখেছেন তা অ্যামোনিয়ার সমুদ্র। এই গ্রহের আকৃতি পৃথিবীর তুলনায় তিন-চতুর্থাংশ। অভিকর্ষও প্রায় অর্ধেক। এই গ্রহের তাপমাত্রা অত্যন্ত শীতল। মাইনাস ১১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড থেকে মাইনাস ১২০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেডের মধ্যে ওঠানামা করে। আমরা পান করি তরল অ্যামোনিয়া। আমাদের খাবারও সবটাই অ্যামইনো-ভিত্তিক। এখানে আমাদের সূর্যের আলোর পরিমাণ কম হওয়ার কারণে এখানকার উদ্ভিদরা অক্সিজেন তৈরি করে দু-ভাবে। সালোকসংশ্লেষণ এবং রাসায়নিক সংশ্লেষণের মাধ্যমে। এই আবহাওয়া যেহেতু আপনাদের উপযোগী নয়, তাই এই গ্রহে এখনই আপনারা অবতরণ করতে পারবেন না। যতদিন না আমাদের বিজ্ঞানীরা আপনাদের বসবাসের উপযুক্ত কোনও উপায় বের করতে পারবেন ততদিন আপনাদের আস্তানা হবে এই যান। এখানকার সব ব্যবস্থা পৃথিবীর মতো রাখা হবে।

এখনই মৃত্যুর আশঙ্কা নেই এটা ভেবে একদিকে খানিকটা স্বস্তি মিললেও কতদিন এই মহাকাশযানে বন্দির মতো থাকতে হবে এটা ভেবে অস্বস্তি হচ্ছিল খুব। তবু নিজের মনকে ঠান্ডা করে সবচেয়ে বেশি ভেঙে পড়া এমিলিকে বোঝাবার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হল। বিকল্প কিছু নেই বুঝতে পেরে সকলেই আস্তে আস্তে পরিস্থিতিকে মানিয়ে নিতে বাধ্য হল। যানের মধ্যে আমাদের সময় কাটত নিজেদের মধ্যে অজানা ভবিষ্যতের অনুমান, আশঙ্কা আর হতাশার কথা বলে, ওদের দেওয়া অত্যন্ত বাজে স্বাদের অ্যামইনো-ভিত্তিক খাবার খেয়ে, ঘুমিয়ে আর যানের দেওয়ালে পাঠানো ওই গ্রহের রকমারি ছবি দেখে।

গ্রহটির সবকিছুই ভারি অভিনব। আকাশ লালচে কমলা রঙের। সেখানে ভেসে বেড়াচ্ছে সাদা অ্যামোনিয়ার মেঘ। সমুদ্রের রঙও বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন। বেশিরভাগ সমুদ্রের রঙ বাদামি থেকে ব্রোঞ্জ হলেও, অনেক জায়গায় তা গাঢ় নীল থেকে নীল। বুঝলাম সমুদ্রের অ্যামোনিয়ায় ভালো পরিমাণে ক্ষারীয়মৃত্তিকা ধাতু অর্থাৎ অ্যালকালাইন আর্থ মেটালের উপস্থিতিই এর কারণ। যেখানে তা নেই বা খুব কম পরিমাণে আছে। সেখানে সমুদ্রের রঙ নীল। ব্রাউনিফ্রিজিডের সূর্য একটি লাল বামন তারা হওয়ায় এই সূর্যের আলো এখানে অত্যন্ত স্তিমিত। আর তাই এই আলোর সবটুকু শোষণের জন্য এখানকার গাছপালা সব লম্বা আর কালো রঙের। ছবিগুলি খুবই আকর্ষণীয় হলেও কিন্তু তখন এসব দেখতেও ভালো লাগত না। একঘেয়েমি আর আতঙ্কের আবহাওয়ায় স্নায়ুর অবস্থা একেবারে শেষ পর্যায়ে। সকলেরই তখন মনে হচ্ছিল প্রতিদিন মৃত্যুর ভয়ংকর আতঙ্কের থেকে যা কিছু হওয়ার তা এখনই হয়ে যাক। অবসান হোক এই ভয়াল আতঙ্কের।

অবশেষে দেখা মিলল এই গ্রহের প্রাণীদের। দুজন রোবট এসে আমাদের মহাকাশযান থেকে অবতরণের ব্যবস্থা করল। তার আগে অবশ্য আমাদের একধরনের পোশাক পরানো হয়েছিল।

নেমে যা দেখলাম তা দেখে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে বয়ে গেল এক ঠান্ডা স্রোত। অন্যদের মুখ দেখে বুঝলাম তাঁদের অবস্থাও তথৈবচ। একটু দূরেই দাঁড়িয়ে আছে এক দঙ্গল অদ্ভুতদর্শন প্রাণী। এতদিন বিভিন্ন কল্পবিজ্ঞান গল্পে কিংবা সিনেমায় যে ধরনের প্রাণীর বর্ণনা পড়েছি বা দেখেছি তাদের সঙ্গে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাণীদের কোনও মিল নেই। ঢ্যাঙা চেহারার প্রাণীগুলোর সরু লম্বাটে গলার উপরে আছে থানকুনি পাতার মতো দেখতে একটা বড়োসড়ো মাথা। সেখানে আছে দুটি বিদঘুটে দেখতে চোখ আর মুখ। কোনও নাক নেই। ডানহাতের উপর থেকে উঠে গেছে মাঝারি আকৃতির আর একটি বস্তু, তাতে ছোটো ছোটো কয়েকটা ফুটো। মনে হল এটাই তাদের নিশ্বাস প্রশ্বাসের জায়গা। হাত দুটি অতীব সরু। হাতের আঙুলগুলো কালো। পায়ের হাঁটু থেকে আঙুল পর্যন্ত অংশ সরু এবং কালো। থাইটি কিন্তু বেশ মোটা। সারা গায়ের চামড়া অত্যন্ত রুক্ষ। ত্বক এমন যে মনে হয় ছোটো ছোটো বিভিন্ন রঙের কাপড়ের টুকরো দিয়ে তৈরি হয়েছে। যতটুকু অংশে পোশাক আছে তাও বেশ অভিনব। একইরকম চেহারার কয়েকটা বাচ্চাও এসেছে আমাদের মতো অদ্ভুত নতুন ধরনের জীবদের দেখতে।

ওদের মধ্যে দুজন এগিয়ে এসে বিশুদ্ধ পৃথিবীর ভাষায় আমাদের স্বাগত জানিয়ে জানাল যে আমাদের এখন পৃথিবীর আবহাওয়ার মতো করে বানানো একটি বাড়িতে থাকতে হবে। ওদের সাহায্য বা নির্দেশ ছাড়া বাইরে বেরোলে অ্যামোনিয়া-নাইট্রোজেনের এই আবহাওয়ায় আমাদের মৃত্যু হতে পারে। তাই এই ব্যবস্থা।

এরপর আমাদের ছোটো একটি উড়ন্ত অভিনব গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হল একটি ছোটো দোতলা বাড়িতে। আসতে আসতে অবশ্য অনেক আকাশচুম্বী বিচিত্র স্থাপত্যের বাড়ি চোখে পড়েছিল।

নতুন বাড়িতে আমাদের তুলনায় অনেক বেশি জায়গা থাকায় হাত-পা ছড়িয়ে থাকার জায়গা পেলেও অজানা ভয় আর দুশ্চিন্তা কিছুতেই আমাদের পিছন ছাড়ছিল না। সকলে আলোচনা করে বুঝতে পেরেছিলাম টাইটান হল এই গ্রহবাসীদের একটি উপনিবেশ। এটাও বুঝতে পেরেছিলাম টাইটান নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ হওয়ার কারণেই সেখানে ঘাঁটি গেড়েছে এই গ্রহবাসীরা। কিন্তু অত দূরের গ্রহ থেকে আমাদের এত দূরে নিয়ে আসার পিছনে কারণটা যে কী সেটাই আন্দাজ করতে পারছিলাম না। মেরে ফেলতে চাইলে তো টাইটানেই মেরে ফেলতে পারত! তবে কি যন্ত্রদানবগুলোর মতো দাস বানিয়ে রাখবে আমাদের, নাকি পৃথিবীর চিড়িয়াখানার মতো এই গ্রহের তেমনই কোনও জায়গায় দর্শনীয় প্রাণী হিসাবে রেখে দেওয়া হবে? মহাকাশযান থেকে নামার পরে যেমন জুলজুল চোখে আমাদের দেখছিল উপস্থিত গ্রহবাসীরা, তাতে এই সম্ভাবনাও একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

ড. মান্ডির কলমে।—

দু-দিন নতুন কিছুই হল না। তৃতীয় দিন প্রাতরাশের পর ওরা আমাদের নিয়ে গেল এক পরীক্ষাগারে। সেখানে বিভিন্ন ঘরে নানারকমের অভিনব সব যন্ত্রপাতি। সবগুলোই চালাচ্ছে যন্ত্রদানবরা। বিভিন্ন যন্ত্রের সামনে আমাদের সকলকে নিয়ে গিয়ে কখনও শুইয়ে, কখনও বসিয়ে কিংবা দাঁড় করিয়ে দিয়ে কীসব পরীক্ষা করল। এর আগে দু-দিন আমাদের সমস্ত বর্জ্য পদার্থ, থুতু, রক্ত আর চুল সংগ্রহ করে নিয়ে গেছে পরীক্ষার জন্য। আমাদের সকলের মধ্যে অবশ্য রোবটানু ছিল না। ও যে রোবট সম্ভবত অনেক আগেই ধরে ফেলেছিল ওরা। ওকে অবশ্য আজই নিয়ে গেল অন্য কোন জায়গায়। কেন তা অবশ্য জানি না। রোবটানু যেতে চাইছিল না দেখে ম্যাডাম ওকে বুঝিয়ে রাজি করিয়ে পাঠালেন ওদের সঙ্গে। এখানে কোনও কিছুতেই যে অবাধ্য হওয়া চলবে না তা ম্যাডাম সকলকে আগেই ভালো করে বুঝিয়েছিলেন।

এরপরের দু-দিন আমাদের দিনলিপির কোনও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হল না। অনেক আলোচনা করেও আমরা বুঝতে পারছিলাম না এরা কী করতে চাইছে আমাদের নিয়ে। এত পরীক্ষানিরীক্ষা কীসের জন্য! এরপরের দু-দিন যা ঘটল তার জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না আমরা। বেশ আশা জাগল সকলেরই মনে।

প্রথম দিন উচ্চ প্রযুক্তির অত্যাধুনিক কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন পদ্ধতির সাহায্যে আমাদের কথা বলার সুযোগ করে দেওয়া হল আমাদের একান্ত আপনজনদের সঙ্গে। আপনজনেরা একটু কান্নাকাটি করলেও আমরা বেঁচে আছি দেখে খানিকটা স্বস্তিও পেল। কেননা অনেকদিন যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় সকলে ধরেই নিয়েছিল যে আমরা অন্তরীক্ষে চিরকালের মতো হারিয়ে গেছি।

দ্বিতীয় দিন আমাদের আগেই দেখা উড়ন্ত গাড়িতে করে আমরা গেলাম এক জাদু দরজার সামনে। আমাদের সঙ্গী এবার দুজন। একজন আগে দেখা গ্রহবাসীদের মতোই দেখতে, আর একজন এক যন্ত্রদানব। গ্রহবাসীটি কী একটা আওয়াজ করতেই খুলে গেল দরজা। প্রায় ৬০-৭০ ফুট চওড়া এক পথ নেমে গেছে সুড়ঙ্গের মতো। দু-পাশ এমন পরিষ্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল না মাঝখানে কিছু আছে। এতটাই স্বচ্ছ। একটু যাওয়ার পর আমরা চারদিক স্বচ্ছ রোপওয়ের কুপের মতো একটি জিনিসে প্রবেশ করলাম। আটটি বসার জায়গা আছে এতে। বুঝলাম, এটি একটি যান। আমরা সাতজন ছাড়া আর একজন নতুন যে গ্রহবাসীকে এখানে দেখলাম, তার হাতে ছোটো একটি যন্ত্র। কুপটি দ্রুত গতিতে নেমে যেতে থাকল গভীর অ্যামোনিয়ার সমুদ্রে।

ড. মাসুকা ভয় ভয় মুখ করে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, “কী ব্যাপার বলো তো, এরা কি আমাদের সামুদ্রিক প্রাণীদের খাদ্য করার জন্য এখানে নিয়ে এল?”

পিঠ চাপড়ে ওঁকে সান্ত্বনা দিয়ে এখনই বেশি ভাবতে বারণ করলাম। সমুদ্রের নীচ দিয়ে চলা এমন যান সত্যিই আমাদের কাছে অভিনব। নানা বিচিত্র ধরনের সামুদ্রিক প্রাণী দেখলাম যা পৃথিবীর সামুদ্রিক প্রাণীদের থেকে একদম আলাদা। দেখে সকলেরই মন অল্প সময়ের জন্য হলেও ভালো হয়ে গিয়েছিল। আমাদের সামনে দেখি হঠাৎই অক্টোপাসের মতো এক সামুদ্রিক প্রাণী। কিন্তু অক্টোপাসের মতো এদের সামনে দুটো চোখ নেই। পুরোপুরি গোল মাথার একপাশে আছে অনেকগুলি খুব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চোখ। আমাদের সঙ্গের গ্রহবাসী না বললে আমরা বুঝতেই পারতাম না যে ওগুলো চোখ। গোল মুখের মাঝামঝি জায়গায় একটি সরু নলের মতো বস্তু। অক্টোপাসের মতো অনেকগুলি শুঁড় থাকলেও তার নীচের দিকটা একেবারেই আলাদা। সব শুঁড়ের নীচে আছে চওড়া সমতল পা। এটা যেমন সাঁতারের জন্য উপযোগী, তেমনই পছন্দের কোনও সামুদ্রিক প্রাণীকে কব্জায় আনার জন্য এটি হাতের কাজও করে। এই ব্যাপারটা চোখের সামনে প্রত্যক্ষও করলাম।

অবশেষে শেষ হল অ্যামোনিয়া সমুদ্রের এই যাত্রা। নামলাম গিয়ে এক সমুদ্রের তটে। আবার বসলাম গিয়ে এক উড়ন্ত গাড়িতে। সমুদ্রের তটটি ভারি অদ্ভুত। অ্যামোনিয়া তরল মাটির সঙ্গে মিশে টুকরো টুকরো কাদা হয়ে ছড়িয়ে আছে চারদিকে। এখানে মাটির রঙও এক এক জায়গায় এক-একরকম। ম্যাডামের কাছে শুনলাম, এর কারণ মাটিতে বিভিন্ন নাইট্রোজেন যৌগের উপস্থিতি।

হঠাৎই কোথা থেকে উদয় হল অ্যাপাটোসোরাসের মতো বড়োসড়ো চেহারার এক জন্তু। খানিকটা দূরে থাকলেও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল জন্তুটাকে। গলাটা অ্যাপাটোসোরাসের মতো অত লম্বা নয়। আমাদের উটের গলার মতো। মাথাটা শরীরের তুলনায় বেশ ছোটো। মাথায় সরু লম্বা অ্যান্টিনার মতো একটি অঙ্গ আছে। অ্যাপাটোসোরাসের মতো এটি চারপেয়ে নয়, দু-পেয়ে। হাঁটু থেকে ভাঁজ করা পায়ের পাতা দুটি পেপে গাছের পাতার মতো আকৃতির ছড়ানো। জন্তুটির শরীরের পিছনের অংশ মাছের ল্যাজার মতো, কিন্তু বেশ লম্বা। সামনে এমন কিম্ভূতকিমাকার জন্তু দেখে ভয়ে তো আমাদের আত্মারাম খাঁচা। গ্রহবাসী দেরি করল না। ওর প্লাজমা আগ্নেয়াস্ত্র থেকে জন্তুটার কিছু দূরে গোলা ফেলতেই জন্তুটা দ্রুত হাঁটতে হাঁটতে অ্যামোনিয়া সমুদ্রে অদৃশ্য হয়ে গেল। গ্রহবাসী জানাল যে জন্তুটি একটি উভচর প্রাণী। ভয় পেয়ে আক্রমণ করতে পারত। তাই ভয় দেখানোর জন্য গোলাটা তাক করেছিলাম। কেননা আমাদের এই গ্রহে অনন্যোপায় না হলে কোনও প্রাণ কিংবা পরিবেশের ক্ষতি করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

আবার বসলাম গিয়ে এক উড়ন্ত গাড়িতে। চারদিকে অ্যামোনিয়া নদী থেকে তৈরি অ্যামোনিয়ার হ্রদ, গিরিখাত আর উপত্যকা। এই ঘন বাদামি রঙের হ্রদের মধ্যে কোনোটা তরল অ্যামোনিয়ার আবার কোনোটাতে উপরিতল ভরে আছে অ্যামোনিয়ার বরফে। যাত্রাপথে একপশলা অ্যামোনিয়া বৃষ্টির অভিজ্ঞতাও হল।

আস্তে আস্তে অনেকটা যাওয়ার পরে ফিরে এল সমতল। দূরে দেখা যাচ্ছে ছোটো ছোটো ঢেউখেলানো পাহাড়।

সেদিন বাড়ি ফিরে খাবার টেবিলে অনেক আলোচনা করেও কিছুতেই আমরা বুঝতে পারলাম না কী উদ্দেশ্য এই গ্রহবাসীদের! শেষ পর্যন্ত আমাদের নিয়ে কী করবে এরা! পৃথিবী থেকে বহুদূরে অজানা অচেনা সম্পূর্ণ অন্য আবহাওয়ার এক গ্রহে আটকে থাকা যে কী বিষম অস্বস্তি আর আশঙ্কার, তা প্রতি পদে অসহায়ভাবে অনুভব করছিলাম আমরা।

পরের দিন আবার আমাদের নিয়ে যাওয়া হল আর এক প্রস্থ পরীক্ষানিরীক্ষার জন্য। এরপরের দু-দিন আমরা বাড়িতেই থাকলাম।

তৃতীয় দিন আমাদের যেখানে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তা আমাদের মনে এমন ভয়ের সৃষ্টি করেছিল যা ভাবলে পরেও আমার মস্তিষ্কের নিউরনের গতি আর সংযোগ ওলটপালট হয়ে মাথায় এমন অস্বস্তি হতে থাকল যা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব।

সকালবেলা সবে প্রাতরাশ শেষ করেছি, হাজির ওই গ্রহবাসীদের একজন। সঙ্গে দুই যন্ত্রদানব। গ্রহবাসী জানাল, সেদিন আমাদের যেতে হবে এখানকার এক মিউজিয়ামে। প্রতিবারের মতোই উড়ন্ত গাড়িতে চেপে পৌঁছে গেলাম বিশালাকার এক মিউজিয়ামে। সে এক অভিনব স্থাপত্য। দু-চোখ ভরে দেখলাম। ভিতরে একটি ফুটবল মাঠের সমান একটি হলে নানা গ্রহের বর্ণনা এবং সেখান থেকে তুলে আনা প্রস্তরখণ্ড। মন দিয়ে দেখলাম বটে, তবে অনেক জিনিসই মাথায় ঢুকল না। নানা জিনিস দেখে শেষে গেলাম অদ্ভুত এক কক্ষে। সঙ্গের গ্রহবাসী জানাল যে এখানেই আছে বিভিন্ন গ্রহের প্রাণীদের সম্বন্ধে নানা তথ্য। অভিনব সব প্রাণীদের ছবি ও নানা তথ্য। দেখতে দেখতে হঠাৎই একজায়গায় দেখলাম পৃথিবীর বর্ণনা আর আমাদের ছবি। আমাদের ছবিতে লেখা ‘পৃথিবীর প্রাণী’। রোবটানুর ছবির নীচে লেখা ‘পৃথিবীর যন্ত্রদানব’। লেখাগুলো অবশ্য আমরা পড়তে পারছিলাম না। গ্রহবাসীই সব বলে দিচ্ছিল। আমাদের সম্বন্ধে এমন অনেক বৈজ্ঞানিক তথ্য ছিল যা আমাদের সকলেরই জ্ঞান ও বুদ্ধির অগম্য। এসব দেখার পর আমাদের মুখের চেহারা এমন হল যা দেখে সকলেরই মনে হবে যে কোনও ভ্যাম্পায়ার আমাদের মুখের রক্ত চুষে নিয়েছে। গ্রহবাসী জানাল এর পরের কক্ষটিতে বর্ণনা ও ছবি আছে তিনটি এমন অ্যামোনিয়া গ্রহের যেখানে প্রাণের অস্তিত্ব আছে।

প্রথম বর্ণনা আছে ‘ব্রাউনিফ্রিজিড’-এর সবচেয়ে কাছের অ্যামোনিয়া গ্রহের। এখানকার বিস্তৃত বিবরণের সঙ্গে ছবি আছে এই গ্রহের সবচেয়ে বুদ্ধিমান প্রাণীর। ছোটোখাটো চেহারার এই প্রাণীর মাথা এবং পেটের কাছটা অসম্ভব বড়ো। ডিম্বাকৃতি চোখের মণি উপরের দিকে। মাথার পিছন দিকে আছে অ্যান্টিনার মতো একটা সরু শলাকা। ‘ব্রাউনিফ্রিজিড’ গ্রহবাসী বিজ্ঞানী জানাল যে এরা শান্তিপ্রিয় এবং বন্ধুত্বপূর্ণ মনোভাবের।

পরের ছবিটি এক ভয়াল-দর্শন প্রাণীর। পিছন দিকে শলাকার মতো ডোরাকাটা চুল। মুখ দিয়ে বেরিয়ে আছে ছ’টা সূচালো বড়ো বড়ো দাঁত। একটু নীচের দিকে দু-পাশে আরও দুটো সূচালো দাঁত। হাত-পাগুলো অতীব লম্বা এবং অদ্ভুত দেখতে। বিজ্ঞানী জানাল, ‘এদের বাস অনেক দূরের এক অ্যামোনিয়া গ্রহে। শান্তিদ্রোহী এই প্রাণীরা একবার এসেছিল আমাদের এক মহাকাশ স্টেশন দখল করতে। ওই সময় ওদের যুদ্ধে হারিয়ে দিয়ে বন্দি করেছিলাম আমরা এই প্রাণীদের কয়েকজনকে। এই ছবি ওই প্রাণীদের।’

এর পরের ছবিটি এক কিম্ভূতকিমাকার প্রাণীর। চারটি চোখ আছে এদের। সরু মাথায় দুটি চোখ তার নীচে নাক। নাকের দু-পাশে দুটি সরু বাঁকা শলাকা। তার নীচের মাথার অংশ খানিকটা বড়োসড়ো। সেখানে আছে গোল ক্ষুদে আরও দুটি চোখ। তার নীচে মাঝারি আকৃতির তীক্ষ্ণ দাঁতের মুখ। সারা গায়ে বাদামি আর সাদা চুল। বিজ্ঞানী জানাল, শত্রুমনোভাবাপন্ন এই প্রাণীরাও দখল নিতে এসেছিল ওদের উপনিবেশ। তখনই আটক করা হয় এদের। এই দুই প্রাণীদেরই বন্দি করে রাখা হয়েছে অ্যামোনিয়া সমুদ্রের এক দ্বীপে।

অস্থায়ী গৃহে ফেরার পরে আমাদের ফ্যাকাসে মুখাবয়ব জানিয়ে দিচ্ছিল আমাদের করুণ পরিস্থিতির কথা। মিউজিয়ামে সবকিছু দেখার পর আমরা নিশ্চিত হয়েছিলাম যে আমাদের শেষের সেদিন আর বেশি দূরে নেই। মিউজিয়ামে ঠাঁই হয়ে গেছে আমাদের ছবি এবং যাবতীয় সবকিছুর। খাওয়াদাওয়া সব মাথায় উঠল। তখন সকলেরই এক চিন্তা—কোন পথে শেষ হবে আমাদের জীবন এবং কখন হবে তা। প্লাসমা আগ্নেয়াস্ত্রে একবারেই মেরে ফেলা হবে, নাকি অন্তরীক্ষে ছেড়ে দেওয়া হবে আমাদের। নাকি তিলতিল করে মৃত্যুর দিন গুনতে হবে অ্যামোনিয়া সমুদ্রের কোনও দ্বীপে যেখানে মিউজিয়ামের ছবিতে দেখা হিংস্র প্রাণীরাও আছে। যা হয়, যে সিদ্ধান্তে আমাদের কোনও ভূমিকা নেই তা নিয়েও আমাদের মধ্যে মৃদু তর্ক হয়ে গেল। আত্মীয়-পরিজনদের কথাও হল অনেক। অবশেষে একসময় ক্লান্ত হয়ে চোখ বুঝে গেল সকলেরই।

পরের দিন প্রাতরাশের কিছু পরেই আমাদের দেখভাল করছে যে গ্রহবাসী সে জানাল যে কিছু পরেই এই গ্রহের সর্বোচ্চ পদাধিকারীরা আসবে আমাদের সঙ্গে কথা বলতে। অনুমান করলাম, ওরা আমাদের অন্তিম দিনের বিষয়ে রায়দান করতে আসছে।

সবসমেত সাতজন পদাধিকারী আমাদের সামনে উপস্থিত হল। একজন এই গ্রহের প্রাণীদের বিজ্ঞানী, একজন শিল্পকলার কাজ করে, একজন ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিশেষজ্ঞ, একজন মহাকাশ বিশেষজ্ঞ, দুজন পরিবেশ বিশেষজ্ঞ, একজন ন্যায়নীতি বিশেষজ্ঞ। অনেকটা আমাদের নবরত্নদের মতো। সকলেই নিজেদের পরিচয় দেবার পর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিশেষজ্ঞ কিছু বলতে শুরু করার আগেই এমিলি বললেন যে ওঁকে যেন প্লাসমা আগ্নেয়াস্ত্রে একবারেই মেরে ফেলা হয়। ড. মাসুকাও কাঁদতে কাঁদতে বললেন তাঁকে যেন একবার তাঁর ছেলে এবং স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। পরিষ্কার বোঝা না গেলেও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার বিশেষজ্ঞ মনে হল মিচকি হেসে উঠল। তারপর শুরু করল তার বক্তব্য।

“আমরা ব্রাউনিফ্রিজিড গ্রহের বাসিন্দারা সাধারণভাবে শান্তিপ্রিয় হলেও আমাদের শত্রুদের বিষয়ে আমরা অত্যন্ত কঠোর। আমরা যেসব গ্রহে প্রাণের অস্তিত্ব আছে, বাইরে থেকে গিয়ে সেখানকার কোনও ক্ষতি করতে চাই না। কেননা আমরা বিশ্বাস করি, মহাবিশ্ব এক অনন্য বৈচিত্র্যে ভরা। এখন পর্যন্ত যেসব প্রাণের সন্ধান আমরা পেয়েছি তাও ভারি বৈচিত্র্যপূর্ণ। মহাবিশ্ব তার নিজস্ব নিয়মে এর সৃষ্টি, ধ্বংস আর বিবর্তন ঘটিয়ে চলেছে। তাই কোনও প্রাণের বা অন্য কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ধ্বংস করা আমাদের কাছে এক গর্হিত কাজ। এটা যে বা যারা করে, আমরা তাদের শাস্তির ব্যবস্থা করি। তাই আমরা সেসব গ্রহেই বসতি স্থাপন করি যেখানে প্রাণের কোনও চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এমনই এক উপগ্রহ টাইটান। আপনারা যখন টাইটানের অক্ষে প্রবেশ করেন, তখনই আমরা আপনাদের মহাকাশযানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিই। ওখানে আপনাদের আটকানোর পরে সিদ্ধান্ত হয় যে আপনাদের এই গ্রহে নিয়ে আসার। আমরা আপনাদের মহাকাশযান এবং সঙ্গে থাকা রোবটের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দেখেছি যে পৃথিবীর প্রযুক্তি এখন লেভেল দুইয়ে আছে। আমাদের প্রযুক্তির লেভেল এখন আট। কাজেই আপনাদের তরফে আমাদের আশঙ্কার কোনও কারণ নেই। আপনাদের শরীরের যাবতীয় পরীক্ষা এবং মাইন্ড রিডিং করে দেখেছি আপনারা কোনও খারাপ উদ্দেশ্যে টাইটানে আসেননি। তাই সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আপনাদের আবার টাইটানে নিয়ে গিয়ে আপনাদের মহাকাশযানে পৃথিবীর পথে রওনা করিয়ে দেব। আমরা চাই আপনারা পৃথিবীর বুদ্ধিমান প্রাণীদের জানাবেন যে তারা যেন ভুল করেও টাইটান বা তার আশেপাশে কোনও অভিযান না করে। যেহেতু আপনাদের সব জানা হয়ে গেছে তাই ভবিষ্যতে আপনাদের কোনও অভিযানকে আমরা শত্রুতাপূর্ণ অভিযান হিসাবে দেখব এবং সেই যানকে মহাকাশেই ধ্বংস করে দেব। এর সঙ্গে সঙ্গে আপনাদের মাধ্যমে আমাদের পৃথিবীবাসীদের কাছে বার্তা—বিশেষ কোনও কারণ ছাড়া কোনও প্রাণের বা অন্য কোনও মহাজাগতিক বস্তুর ধ্বংস করা এক গর্হিত কাজ এবং তা এই অনুপম সৃষ্টির বিরোধী। তাই এই কাজ যেন তারা ভুলক্রমেও না করে। এ-কাজ করলে তা শুধুমাত্র তাদের ধ্বংসই ডেকে আনবে।”

ঘটনার আকস্মিকতায় আমরা একেবারে হাঁ হয়ে গেলাম। গা থেকে ঘাম ঝরে মনে হল জ্বর নামল। ফাঁসির জন্য অপেক্ষারত কোনও মানুষের মুক্তি যে কী আনন্দের তা বর্ণনা করা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম সাহিত্যিকের পক্ষেও অসম্ভব। সেই মুহূর্তে আমরা তা অনুভব করছিলাম।

ম্যাডাম আমাদের সকলের পক্ষ থেকে আতিথেয়তার জন্য ওদের ধন্যবাদ জানালেন।

আমরা সকলেই ওদের কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশনের মাধ্যমে আপনজনদের জানিয়ে দিলাম আমাদের মুক্তির কথা।

এর পরের ঘটনার মধ্যে বলার মতো বিশেষ কিছু ছিল না। অবশেষে ভায়া টাইটান আমরা একদিন আবার পা রাখলাম পৃথিবীর মাটিতে। পৃথিবীর বিখ্যাত এক গবেষণা পত্রিকায় ‘ব্রাউনিফ্রিজিড’-এর বার্তা-সহ এই অভিযানের কাহিনিও প্রকাশ করলাম আমরা এই আশা করে যে পৃথিবীর লোভী মানুষ ও যুদ্ধোন্মাদ শাসককুলের এটি পড়ে যদি চিন্তাভাবনার কোনও পরিবর্তন হয়।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply