গল্প-খাঁচা-কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-বসন্ত ২০২৪

golpokhacha

না, কেউ কিছু বুঝতে পারছে না। বাড়িসুদ্ধ এতগুলো লোক, কিন্তু কেউ বুঝতে পারছে না ঝিমলির কী হয়েছে।

সেই দুপুরবেলা ওর বাবার কারখানা থেকে ঘুরে এসে মায়ের কাছ ঘেঁষে শুয়েছিল ঝিমলি। তারপর বিকেল থেকে আর তার ওঠার নাম নেই। বিছানা ছেড়ে উঠছেও না, কারও সঙ্গে কথাও বলছে না। শুধু মুখ ভার করে পড়ে আছে। মা এসে তাড়া দিয়ে গেল বার কয়েক, দাদা দু-একবার ধাক্কা মেরে ওঠানোর চেষ্টা করে বিফল হয়ে খেলতে চলে গেল; শুধু ঠাম্মা বার বার সবাইকে ডেকে ডেকে বলছে, “ওরে, আমার দিদুমণির কী হল দ্যাখ না রে! শরীর খারাপ হল নাকি?”

মায়ের পাশেই তো শুয়ে ছিল ঝিমলি। কিন্তু মাও কিছু বুঝতে পারেনি, ভেবেছে ঝিমলি বোধ হয় ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু ঝিমলি তো মোটেই ঘুমোয়নি। মায়ের দিকে পিছন ফিরে শুয়ে সারাটা দুপুর চোখের জল ফেলেছে, কে জানে কীসের অভিমানে। এই বিকেলেও তার চোখে ছলছলানি, গোটা মুখটা থমথম করছে।

সকাল থেকে কিন্তু একদমই এরকম ছিল না ঝিমলি। দিব্যি ভোর ভোর উঠে পড়েছে, রোজকার সব কাজ নিয়ম করে সেরেছে, এমনকি মায়ের হাতে হাতে সাহায্যও করেছে টুকটাক। আজ তো ছুটি, তাই সকালে পড়তে বসার কোনও তাড়া ছিল না। বরং অন্য একটা আনন্দে বিভোর ছিল ঝিমলি। আজ বিশ্বকর্মা পুজো। প্রতিবারের মতোই এবারেও বাবার কারখানায় পুজো আর খাওয়াদাওয়া হবে। আর এই প্রথমবার বাবা বলেছে এ-বছর কারখানায় নিয়ে যাবে ঝিমলিকে। তাই দারুণ একটা খুশিতে ঝিমলি ঝলমল করছিল।

এর আগে আর কোনোদিন বাবার কারখানায় যাওয়া হয়নি ঝিমলির। দাদা গত কয়েক বছর ধরেই যাচ্ছে। কিন্তু ও ছোটো ছিল বলে ওকে কখনও নিয়ে যায়নি বাবা। এই বছর ঝিমলি ক্লাস ফাইভে উঠল, তাই বড়ো হয়ে যাবার উপহার হিসেবে ওকে এই বছর বাবার কারখানায় নিয়ে যাওয়া হবে।

একটু বেলা হতেই স্নান-টান সেরে ঝিমলি রেডি। দাদা সেই কোন সকালে বাবার সঙ্গেই চলে গেছে। ঝিমলি এখন যাবে কাকার সঙ্গে সাইকেলে চেপে। দুপুরের খাওয়াটাও কারখানাতেই হবে। কী মজা! এতদিন এই পুজোর দিনটায় মা আর ঠাম্মার সঙ্গে ঝিমলি বাড়িতেই খেত। কিন্তু এই বছর যেন সবকিছুই স্পেশাল!

পাড়ার মোড়ে আসতেই ঝিমলির চোখে পড়ল বাউলকাকা আসছে। তার সেই একতারাটা বাগিয়ে ধরে তেমনি খোলা গলায় গান ধরেছে—‘খাঁচার ভিতর অচিনপাখি কেমনে আসে যায় / ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়’।

ওরা কাছাকাছি আসতেই গান থামিয়ে বাউলকাকা হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল, “কী গো ঝিমলিরানি, কাকার সঙ্গে চললে কোথায়?”

ঝিমলিও হাসিমুখে উত্তর দিল, “বাবার কারখানায়।”

“পুজো আছে বুঝি?”

ঝিমলি হাসিমুখেই মাথা নাড়ে। ততক্ষণে ওদের সাইকেল বাউলকাকার পাশ দিয়ে এগিয়ে যায় বড়ো রাস্তার দিকে। একটু দূরেই বাজার। তার পরেই পড়ছে পিচ ঢালা চওড়া রাস্তাটা, যেখান দিয়ে বাসগুলো যায় আসে। ওই রাস্তাটাই এই মফস্‌সলের শিরদাঁড়া। শহরের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্র।

ওই বড়ো রাস্তায় পড়ার পর বাঁদিকে মাইল খানেক গেলেই ঝিমলির বাবার কারখানা। সেই রাস্তায় ওঠার সময় ঝিমলির চোখ গেল আকাশের দিকে। ও মা! আকাশটা আজ ফুলের বাগানে পরিণত হয়েছে! সেখানে ছোটো-বড়ো নানা রঙিন ফুলের মতো ঘুড়ির দল উড়ে বেড়াচ্ছে। ঝিমলি শুনেছে, বিশ্বকর্মা পুজোর দিন নাকি একবার না একবার বৃষ্টি হবেই। কিন্তু কই, আকাশে তো ঝলমলে রোদ্দুর। আর কী মিষ্টি গন্ধ বাতাসে! এই ঝলমলে আলোয় চারপাশের গাছে পাখিগুলোও কী মনের আনন্দে কিচিরমিচির করতে করতে এ-ডাল থেকে ও-ডালে লাফালাফি করছে। এরকমই সারাদিন থাকুক বাবা, বৃষ্টি হলেই তো সব মজা নষ্ট।

ঝিমলি কারখানায় পৌঁছতেই বেশ একটা হইহই পড়ে গেল। ফুটফুটে মেয়েটাকে সবাই একবার করে আদর করতে চায়। একজন আবার কোত্থেকে একটা থাম্বস-আপ ভরা গেলাস এনে ঝিমলির হাতে ধরিয়ে দিল। কী ভালো খেতে! বাবাও হাসিমুখে কারখানার সব স্টাফ আর লেবারদের ডেকে ডেকে মেয়েকে চিনিয়ে দিচ্ছিল। তারপর কাকাকে বলল, “যা তো রমেশ, ঝিমলিকে একবার কারখানাটা ঘুরিয়ে নিয়ে আয়।”

পুজো তখনও চলছিল। অফিস ঘরের সামনে একটা উঠোন। সেখানে বিশ্বকর্মা ঠাকুরের একটা মূর্তি বসানো। তার চারপাশে কাগজের ফুল আর শিকলি দিয়ে কী সুন্দর করে সাজানো। ঝিমলি একবার ঠাকুর নমস্কার করে নিয়ে কাকার সঙ্গে চলল কারখানা ঘুরে দেখতে।

অফিস ঘরের পাশ দিয়ে একটা প্যাসেজ। সেখান দিয়ে ঢুকলেই পেছনটায় বেশ বড়ো জায়গা নিয়ে কারখানাটা। লেবারদের বেশ কয়েকজন সেজেগুজে সেখানে বসে ছিল। কেউ কেউ তাস খেলছে, কেউ কেউ গল্প করছে। ওদের দেখে খেলা আর গল্প ফেলে সবাই তাকাল। দু-একজন চেয়ার ছেড়ে উঠেও এল। কাকা হাত নেড়ে ওদের সবাইকে বসতে বলল। তারপর ঝিমলিকে নিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সব দেখাতে আর বোঝাতে লাগল।—এই দ্যাখ ঝিমলি, আমাদের কারখানাটার দুটো ভাগ। এই দিকটায় আলমারি তৈরি হয়, আর ওদিকটায় লোহার খাঁচা। এই দ্যাখ, এই যে নীচু আর লম্বা মেশিনটা দেখছিস, এটা দিয়ে লম্বা লম্বা স্টিলের পাত কাটা হয়। তারপর এই দুটো মেশিনে পাতগুলো দরকারমতো নানাভাবে বাঁকানো হয়। এই দ্যাখ, এগুলোর নাম ওয়েল্ডিং মেশিন। একটা পাতের সঙ্গে আর একটা পাত জুড়তে এগুলো কাজে লাগে। আর এটা হচ্ছে রঙ করার স্প্রে-মেশিন। আলমারি পুরো তৈরি হয়ে গেলে মেশিনটা চালিয়ে এই বন্দুকের মতো জিনিসটা দিয়ে পিচকিরির মতো করে…

কাকা বলে যাচ্ছিল আর শুনতে শুনতে চারদিকে চোখ ঘোরাচ্ছিল ঝিমলি। একটু পরেই কাকার কথাগুলো আস্তে আস্তে ওর কানে অস্পষ্ট হয়ে গেল। কারণ ওর তখন চোখে পড়েছে, ঘরটার একধারে দাঁড় করানো রঙ-করা ঝকঝকে চার-পাঁচটা আলমারি, আর তার পাশেই রাখা বিভিন্ন ধরনের খাঁচা। ছোটো, বড়ো, গোল, চৌকো মিলিয়ে প্রায় বারো-চোদ্দটা খাঁচা সাজিয়ে রাখা আছে সেখানে। তাদের গায়ে রুপোর মতো রঙ। এমনকি সন্টুদের বাড়িতে যেমন একটা বিশাল খাঁচা আছে, জানালার সমান উঁচু, আর লম্বায় স্কুলের বেঞ্চিগুলোর মতো, যাতে অনেক অনেক বদরি পাখি থাকে, ঠিক তেমনি বিরাট একটা খাঁচাও একপাশে রয়েছে।

সেগুলো দেখতে দেখতে ঝিমলির মনটা হঠাৎ যেন কেমন করে ওঠে। কী একটা ভেবে ও হঠাৎ থম মেরে যায়। রমেশ আলমারি দেখানো শেষ করে তখন খাঁচা তৈরির পদ্ধতি দেখাতে শুরু করেছিল। ঝিমলি বলে উঠল, “কাকা, বাইরে চলো। এখানে আর থাকব না।”

রমেশ অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে বলল, “কেন রে? কী হল?”

ঝিমলি বলল, “ভাল্লাগছে না। চলো, বাইরে চলো।”

রমেশ কিছুক্ষণ অবাক হয়ে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে ঝিমলির হাতটা ধরে বাইরে পুজোর কাছে এল। তারপর ওকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিয়ে নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।

সেই থেকেই ঝিমলি এরকম হয়ে আছে। গলার কাছটা ব্যথা ব্যথা করছে। ঢোঁক গিলতে গেলে লাগছে। আর চোখ দুটো মাঝে মাঝে ঝাপসা হয়ে আসছে। সেই অবস্থাতেই পুজো শেষ হতে প্রসাদ খেয়েছে, বাবার অফিসে বসে কম্পিউটারে একটু গেম খেলেছে; তারপর দুপুরে মাংস-ভাত খেয়ে আবার কাকার সঙ্গেই বাড়ি ফিরেছে, কিন্তু ওর পরিবর্তনটা কেউ লক্ষ করেনি।

অবশ্য করার কথাও নয়। ও তো এসে সটান ঘরে ঢুকে মায়ের খাটে শুয়ে পড়েছে দেওয়ালের দিকে মুখ করে। আর মা হাতের কাজ-টাজ সেরে খেয়েদেয়ে এসে যখন শুয়েছে, ভেবেছে ঝিমলি ঘুমোচ্ছে।

সবার টনক নড়ল বিকেলে ও কিছুতেই উঠছে না দেখে। তারপর একে একে সবাই ডেকে যাওয়ার পরেও ঝিমলি যখন কিছুতেই উঠল না, তখন ঠাম্মার তাড়ায় মা এসে ঘরে ঢুকল। কপালে হাত দিয়ে একবার জ্বর আছে কি না দেখল, তারপর জোর করে ওর মুখটা ঘুরিয়ে ধরতেই অবাক। এ কী! ঝিমলির গালে জলের দাগ, চোখ দুটো ছলছল করছে আর মুখটা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে! সঙ্গে সঙ্গে উৎকণ্ঠিত গলায় মা বলে, “কী হয়েছে ঝিমলি? কী হয়েছে সোনা আমার?”

ঝিমলি মুখ ঘুরিয়ে নেয় আর জোরে জোরে মাথা নাড়ায়।

মা এবার জোর করে ঝিমলিকে নিজের কোলে টেনে নেয়। আর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের বুকে মুখ চেপে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে ঝিমলি। মা বলতে থাকে, “কী হয়েছে সোনা? আমায় বল। কাঁদছিস কেন? কী হয়েছে বল আমায়!” মুখে বলে আর ঝিমলির মাথায়-পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে থাকে মা।

সেই আদরে এবার আর নিজেকে ধরে রাখতে পারে না ঝিমলি। সকাল থেকে যে চাপা কষ্টটা ওর ছোট্ট বুকটাকে কুরে কুরে খেয়েছে, যে-কথা ভেবে ওর ছোট্ট দু-চোখ বেয়ে জলের ধারা নেমেছে সারা দুপুর ধরে, সেই তীব্র কষ্টটা এবার যেন বুক ভেঙে বেরিয়ে আসে। মাকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে-কাঁদতেই ঝিমলি বলতে থাকে, “কেন, কেন বাবা খাঁচা তৈরি করেছে? পাখিগুলোর কষ্ট হবে না বুঝি? ওরা কেমন ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ায়, গাছে গাছে বাসা বাঁধে, মনের সুখে গান গায়। সেই পাখিগুলোকে বন্দি করে রাখার জন্যে বাবা কেন খাঁচা বানিয়েছে? বলো, বলো!”

ঝিমলিকে বুকে চেপে ধরে ঝিমলির মা স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। আর ঝিমলির চোখের জল মায়ের কাপড় ভিজিয়ে দিতে থাকে।

অনেক, অনেকক্ষণ পর মা আস্তে আস্তে বলে ওঠে, “চুপ কর ঝিমলি। চুপ কর। উঠে বোস। তোর বাবা আর কোনোদিন খাঁচা বানাবে না ঝিমলি। কোনোদিন না। আজই আমি তোর বাবাকে বারণ করে দেব, সে যেন খাঁচার বদলে অন্য কিছু বানায়। কিন্তু খাঁচা আর নয়। পাখিগুলো আর কোনোদিন বন্দি হয়ে থাকবে না ঝিমলি।”

ধীরে ধীরে মায়ের বুক থেকে মুখ তোলে ঝিমলি। জলভরা চোখে হাসি ফুটিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকায়। মায়ের মুখটা কী মিষ্টি লাগছে দেখতে। ঠিক সপ্তমীর সকালের দুগ্গা ঠাকুরের মতো।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply