গল্প-লোমশ ম্যামথ-মৌসুমী রায়-বসন্ত ২০২৪

golpolomoshmaammoth

বর্ষা, ২০২৩।

গরমের ছুটির পরে ইস্কুলের দ্বিতীয় দিন। ক্লাসে ক্লাসে ছাত্রছাত্রীরা তাদের গরমের ছুটি কাটানোর গল্প বলে চলেছে। সবাই শুনছে, মতামত দিচ্ছে, হইচই করছে। এখন গল্প বলা আর গল্প শোনা একটা বিষয়।

বটেশ্বর তার বেড়ানোর কিছু ছবি এঁকে এনেছে। ছেলেটা ভালো বলে আর সুন্দর ছবি আঁকে। দিদিমণি তাই তাকে সবার শেষে বলতে বলেছিলেন।

বটেশ্বর।—

আমার বাবা সাইবেরিয়াতে একটা কাজ নিয়ে গেছেন বছর দু-এক হল। আমি এবারের গরমের ছুটিতে বাবার কাছে বেড়াতে গেছিলাম আর তিন সপ্তাহ ছিলাম। এর মধ্যে একদিন বাবা আমাকে ‘লোমশ ম্যামথ পার্ক’ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিল।

তোমরা জানো যে সাইবেরিয়া চির-শীতের দেশ। শীতকালে তার তাপমাত্রা মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রির তলায় চলে যায়। মাঝখানে প্রায় একশো বছর উষ্ণায়নের জন্য সাইবেরিয়ার পার্মাফ্রস্টের ক্ষতি হয়ে গেছিল। এই উষ্ণায়নকে আটকানোর জন্য অনেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে আর অনেক কিছু উলটেপালটে ভালো ভালো কাজ করতে হয়েছিল পৃথিবী জুড়ে। তাতে সাইবেরিয়ার বরফ আর তাপমাত্রার উপকার হয়েছিল। বাবা ওখানের একটা পরিবেশ রক্ষা প্রজেক্টে কাজ করে এখন।

বাবার কাজের এলাকা তুন্দ্রা আর তাইগার মাঝামাঝি। সাইবেরিয়ার দক্ষিণে যেখানে স্তেপি মানে ঘাসজমি শুরু হয়েছে সেখানে একটা বিশাল এলাকা নিয়ে এই লোমশ ম্যামথ পার্ক। পার্কটা এতটাই বড়ো আর ছড়ানো যে তাতে একটা ছোটো দেশ ধরে যায়। অনেকদিন আগে এসব জায়গায় শয়ে শয়ে তেলের কূপ ছিল। ফসিল ফুয়েল নিষিদ্ধ হবার পরে গত পঞ্চাশ বছর ধরে খুব যত্ন করে আস্তে আস্তে এই এলাকাতে লোমশ ম্যামথদের থাকার মতন সেই লক্ষ বছর আগেকার পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।

লক্ষ বছর আগে সাইবেরিয়া জুড়ে অনেক অনেক লোমশ ম্যামথ ঘুরে বেড়াত। তার সঙ্গে আরও অনেক প্রাণীরাও ছিল। কিন্তু জিন টেকনোলজি ব্যবহার করে শুধু লোমশ ম্যামথদেরই ফিরিয়ে আনা গেছে। এরা আসলে প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড হাতি; এদের বাঁকানো দাঁত আর শীতের জন্য গায়ে ঘন লোম।

আমি বাবার কাছে এই পার্কের কথা আগেও শুনেছিলাম। তাই ওই শীতের মধ্যেও সকাল সকাল উঠে তৈরি হয়ে বসেছিলাম। তারপর তো খানিকটা গেলাম সেমিকন বাসে চেপে, তারপরে যান্ত্রিক স্লেজে। ওখানে পৌঁছে আমার খুব উত্তেজনা হচ্ছিল। পার্কের কাছে গিয়ে তো হাঁ হয়ে গেলাম। কী বিশাল! কতরকমের গাছ, ঝোপঝাড় আর অনেক ধরনের ঘাসে ছাওয়া পাহাড়ের পরে পাহাড়, প্রান্তর। কোনও পাঁচিল নেই, তার বদলে নার্ভ-ভাইব্রেটরের ব্যবস্থা। পার্কের বিভিন্ন সীমানায় আমাদের মতন ট্যুরিস্টদের জন্য দেখানোর মাচা আছে। এমন সব ব্যবস্থা, যাতে ওখানের পরিবেশ বা লোমশ ম্যামথদের স্বাভাবিক জীবনের কোনও অসুবিধে না হয়।

আমি সেরকম একটা মাচার ওপরে উঠেছিলাম। জায়গাটা খোলা হলেও তার বিশেষত্ব আছে। ওখানে বিশেষ শব্দতরঙ্গ কাজ করার ব্যবস্থা ছিল। ওঠার আগে তাই আমাকে কানে দেবার জন্য একটা প্যাড দিয়েছিল। কিন্তু ওপরে উঠে আমার কান প্রায় ঝালাপালা হয়ে যাচ্ছিল। কতশত যে আওয়াজ কানে আসছিল—বাতাসের শোঁ শোঁ, জলপ্রপাতের গরগরানি, পোকামাকড়-পাখপাখালির চিৎকার; এমনকি গাছেদের জল টানার হালকা আওয়াজও! উফ্‌, তার মধ্যে পাখিদের কয়েকটা ডাক এত জোরালো ছিল যে আমাকে মাঝে মাঝে কানে প্যাড দিতে হচ্ছিল।

একঘণ্টা থাকার অনুমতি ছিল। চুপচাপ বসে থেকে খানিক পরে তিনটে লোমশ ম্যামথকে ঘাস খেতে খেতে আসতে দেখলাম। এতদিন ছবিতে দেখেছি, এখন সামনাসামনি দেখতে পেয়ে কী রোমাঞ্চ হচ্ছিল যে কী বলব! কী প্রকাণ্ড প্রাণী, কিন্তু কী শান্ত।

সবচাইতে চমক অপেক্ষা করছিল যখন ওদের একটি কাছে এল। তার চোখে চোখ পড়াতে মনে হল সে যেন মুচকি হাসল আর আমার কানের কাছে তার মোটা শান্ত গলায় কথা ভেসে এল—“আজ বাতাস বেশ হালকা, না?”

আমার মুখ থেকে কথা বেরিয়ে গেল—“তুমি কী খাচ্ছ?”

“এখন আমার খিদে নেই।” বলে হেলতে দুলতে শুঁড় দুলিয়ে লোমশ ম্যামথ চলে গেল।

আমি তো তখন উত্তেজনায় ফেটে পড়ছি। বাবা নামতে নামতে ফিসফিস করে বলল, “এখানে টেকনোলজি ব্যবহার করে ওদের বিশেষ শব্দতরঙ্গে রেখে ওদের ভাষা বোঝার আর মানুষের ভাষা ওদের বোঝানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই ওদের সঙ্গে কোনও রেষারেষি নেই। ওরা এলাকার বাইরে যায় না, নার্ভ-ভাইব্রেটরের জন্য বাইরে থেকে কেউ এখানে আসতে পারে না। তাছাড়া এরা খুব বুঝদার প্রাণী। এখানে খাবার আর জায়গা প্রচুর। ওরা শান্তিতে আছে।”

মাচা থেকে নামার সময়ে একটা প্রদর্শনী কক্ষ আছে। সেখানে চোখে পড়ল ২০২৩ সালের দুটো খবর, তোমাদের বলছি। এক, লোমশ ম্যামথ একটি বিলুপ্ত প্রাণী। সুদূর অতীতে প্লিসটসিন যুগে এদের বাস ছিল, হলোসিন যুগে এরা শেষ হয়ে যায়। প্রাচীন গুহাচিত্রে ও বরফে জমা এদের হাড়গোড় দেখে মানুষের সঙ্গে এদের সংঘাতের পরিচয় পাওয়া যায়। অর্থাৎ, মানুষ এদের মেরে খেত।

দুই, ম্যামথদের বংশধর হাতির অস্তিত্ব সংকটে। হাতির দাঁতের লোভে অবৈধ শিকার আর মানুষের দ্বারা হাতির বিচরণ ক্ষেত্র দখল হওয়াতে এদের সংখ্যা কমতে কমতে এখন মাত্র সাড়ে চার লাখ হাতি বেঁচে আছে পৃথিবীতে।

বটেশ্বর বলার সঙ্গে সঙ্গে তার আঁকা ছবিগুলোও দেখাচ্ছিল।

বটেশ্বরের কাহিনি শেষ হল।

দিদিমণি দেখলেন অনেকগুলো ছোটো ছোটো হাত উঠেছে। ছাত্রছাত্রীরা সবাই বলতে চাইছে। কৃষক আর পরিবেশ সংরক্ষক পরিবারের ছেলেমেয়ে বেশিরভাগই। সবাই তাদের চেনা আর পোষা পাখি আর প্রাণীদের গল্প বলতে চাইছে। এখন পশুপাখিদের ভাষা মানুষ বোঝে। যন্ত্র ছাড়াই।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply