
রাত তখন কত জানা নেই সুপ্রতীকের। হঠাৎ কীসের একটা শব্দে তার ঘুমটা গেল ভেঙে। চোর ঢুকেছে ভেবে সে অমনি গর্জে উঠল—“কে ওখানে? এখুনি পুলিশ ডাকব নাকি?”
অন্ধকারে একটা ফিকফিক হাসি শোনা গেল। তারপর সুপ্রতীককে একেবারে হতভম্ব করে দিয়ে একটা খোনা স্বরে কে যেন বলে উঠল, “পুলিশ ডাকবেন’খন। এখন বলুন দিকি, আপনিই শ্রীযুক্ত সুপ্রতীক হালদার?”
সুপ্রতীক মনে মনে লোকটার সাহসের তারিফ করল। চুরি করতে এসে আবার মালিকের নামও জানতে চাইছে! ব্যাটা ঘুঘু দেখেছে, ফাঁদ দেখেনি। সুপ্রতীকও তার সঙ্গে তালে তাল মেলাবে ঠিক করল। শান্ত, নরম কণ্ঠে উত্তর দিল, “আজ্ঞে হ্যাঁ। আপনার পরিচয়?”
“আমি নিধি। অবশ্য ওটা পোশাকি নাম। আসল নামটা আপনার দ্বারা উচ্চারণ হবে না। আমি অন্য একটা গ্রহ থেকে এসেছি কিনা। অনেক দূরের গ্রহ, বুঝলেন? খুব উন্নত গ্রহ। হ্যাঁ, আপনাদের চেয়ে খুব, খুব উন্নত।”
“তা, বেশ তো। আমার সঙ্গে কী প্রয়োজন?”
“আমরা আপনাকে আমাদের নিজের গ্রহে নিয়ে যেতে এসেছি। আমরা চাই একজন পৃথিবীবাসী আমাদের এই সুন্দর গ্রহটি সরেজমিনে দেখুক। সেখানে ছয় মাস থাকার বন্দোবস্ত করব আমরা। আমাদের ইচ্ছা, পৃথিবীবাসী অনুভব করুক উন্নয়নের মাপকাঠি কেমন হওয়া উচিত। সে যাক গে, এই মুহূর্তে আমি আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে, সারা পৃথিবী তন্নতন্ন করে খুঁজে অবশেষে আমরা আপনাকেই এই বিশেষ সম্মানের যোগ্য বলে মনে করেছি। এখন শুধু আপনার সম্মতির প্রয়োজন। বলুন, আপনি কি আসতে চান আমার সঙ্গে? আমাদের গ্রহ ঘুরে দেখতে চান?”
বিস্ময়ের ঘোর কাটাতে কয়েক মিনিট সময় নিল সুপ্রতীক। তারপর বিগলিত ভঙ্গিতে বলল, “আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ জানাই এই অধমকে এমন অভাবনীয় সম্মান প্রদানের জন্য।” তারপর কী ভেবে বলল, “তা, আপনাদের এই গ্রহটি সম্পর্কে আগে কিছু বিষয় জেনে নিতে পারি কি?”
“স্বচ্ছন্দে। বলুন, কী জানতে চান।” অন্ধকারের মধ্য থেকে জবাব এল।
“আপনাদের গ্রহে কি ইঁচড় পাওয়া যায়? ইয়ে, মানে…” খানিক আমতা আমতা করে সুপ্রতীক।—“আসলে আমি ইঁচড় বড়ো ভালোবাসি। তাই জানতে চাইছিলাম।”
অন্যদিক থেকে ঝটপট উত্তর এল, “এ আর এমন কী! আমাদের গ্রহে সমস্ত শাক-সবজি-ফল পাওয়া যায়। আপনার কোনও অসুবিধা হবে না। অবশ্য সবই কারখানায় তৈরি। আপনি অর্ডার দিলে নিশ্চয়ই আনিয়ে দেব।”
“অ্যাঁ! কারাখানায় শাক-সবজি?”
“হ্যাঁ, খুব সহজ ব্যাপার।” লোকটা বোঝায়—“আমাদের সবই কারখানা-কেন্দ্রিক। সমস্ত কাজ রোবটরা করে আর আমরা বড়ো বড়ো বহুতলে বসে নিজের ইচ্ছামতো অর্ডার দিই। তখন আকাশপথে ওই রোবটরাই বাড়ি বাড়ি জিনিস পাঠিয়ে দেয়।”
“ভারি আশ্চর্য তো। আপনারা নিজেরা তাহলে কোনও কাজ করেন না?”
“কে বলল এ-কথা?” লোকটার গলায় স্পষ্টতই আঘাতের ছাপ ফুটে উঠেছে।—“রোবটগুলোকে একের পর এক কাজের অর্ডার দেওয়া, এও তো একটা কাজ নাকি? তা না-হলে ব্যাটাদের যান্ত্রিক কলকব্জাগুলো বিগড়ে যাবে না? একটা রোবটকে আপনি কতদিন বসিয়ে রাখবেন, বলুন?”
“তা বটে, তা বটে।” বলে সুপ্রতীক।—“তবে আমি ভাবছিলাম, ধরুন কখনও রোবটের অভাব দেখা দিল। তখন? কে অত কাজ করবে?”
“আরে মশাই, আমাদের রোবটরাই যে অন্যান্য রোবট তৈরি করে! ফলে এই সমস্যা কখনোই দেখা দেবে না, আপনাকে নিশ্চিত বলতে পারি।” তারপর একটু থেমে বলল, “অনেক প্রশ্ন তো করলেন, এবার বলুন দিকি আপনি কি আসছেন আমার সঙ্গে?” লোকটার গলায় অসন্তোষের চিহ্ন স্পষ্ট।
সেটা আঁচ করতে পেরেই সুপ্রতীক বলল, “আর একটামাত্র প্রশ্ন করব। কথা দিচ্ছি তারপর আর আপনাকে বিরক্ত করব না।”
“কী শেষ প্রশ্ন?”
সুপ্রতীকের গলাটা হঠাৎ একটু বেশি স্তিমিত হয়ে গেল। সে বলল, “আপনাদের গ্রহ অনেক উন্নত তা তো বুঝলাম। আমাদের যা নেই, আপনাদের সেসব আছে। কিন্তু আপনাদের কি ভূত আছে?”
এরপর চারদিক নিশ্চুপ। অনেকক্ষণ। লোকটার কোনও প্রতিক্রিয়া নেই। বাধ্য হয়ে সুপ্রতীক বলল, “কী হল? কোথায় গেলেন?”
অপর প্রান্ত থেকে অবশেষে ভেসে এল—“না তো। ভূত কী জিনিস আমাদের জানা নেই।”
লোকটার গলা শুনে মনে হল সে খানিক দমে গেছে।
এরপর আরও কয়েক মিনিট কেটে গেল। তারপর লোকটা করুণ সুরে প্রশ্ন করল, “ভূত না থাকলে কি আপনি আসবেন না? এ কী ঝামেলা!”
ঠিক এমন একটা প্রশ্নেরই অপেক্ষায় ছিল সুপ্রতীক। সঙ্গে সঙ্গে সে বলে বসল, “না, তা নয়। একটা ভূত আপনাদের গ্রহে নিশ্চয়ই জুটবে। আমি যাচ্ছি আপনার সঙ্গে।”
লোকটা আবার ফিক করে হেসে বলল, “তাহলে আমি ঠিকই ধরেছি, আপনিই সেই ভূত। তাই না? যাক, হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম মশাই। আচ্ছা, ভূত কারখানায় তৈরি করা যায় তো? তাহলে আমাদের রোবটগুলোকে ভূত তৈরি করা…”
তাকে আর শেষ করতে হল না। সুপ্রতীক বলে উঠল, “হ্যাঁ, হ্যাঁ। সে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।”
তারপর অন্ধকারে দুজন একসঙ্গে হেসে উঠল।