গল্প-মিতুন-শিখা সেনগুপ্ত-বসন্ত ২০২৪

golpomitun88
মিতুন তুতুন দুই বোন। মিতুনের  এই নয় বছর বয়স হল, তুতুন  ঠিক পিঠোপিঠি না, একটু ছোট, তার বয়স পাঁচ বছর। তাদের খুব আনন্দ, বাবা মার সাথে আজ রাতের পুরী দুরন্ত ট্রেনে তারা ওড়িশার তিন জায়গায় বেড়াতে যাবে। তাদের বাবা হাইস্কুলের মাষ্টারমশাই,গরমের ছুটিতে বেড়াতে যাবেন বলে অনেক আগে থেকেই টিকিট কেটে,ঘর বুক করে রেখেছেন। ছোট্ট তুতুন অতসব বোঝে না। সে ফোলা ফোলা গালে, বড় বড় চোখে দিদির পিছু পিছু ঘুরে বেড়ায়। মিতুন ক্লাস থ্রিতে পড়ে আর নানা রকম ছবিওয়ালা গল্পের বই পড়তে খুব ভালবাসে।  প্রতিবেশীরাও কোঁকড়া চুল,ফর্সা টুকটুকে মিতুনকে দেখে ওর মাকে বলে,’ আপনার বড় মেয়ে যেমন সুন্দর তেমনি ওর মনটা ভাল’।
  সেদিন রাতে শিয়ালদা থেকে কু ঝিক ঝিক করে যখন ট্রেন ছাড়ল, তুতুন আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল। পরদিন ভোরে পুরী নেমে ওরা স্বর্গদ্বারে সমুদ্রের কাছেই একটা সুন্দর হোটেলে এল। দোতলায় ওদের ঘরের জানলা থেকে,বারান্দা থেকে বিশাল সমুদ্র দেখা যায়।  ব্রেকফাষ্ট খেয়ে সবাই সমুদ্রের কাছে এল। মিতুন সুন্দর দেখে ঝিনুক কুড়াচ্ছে আর তুতুনের বালির উপর কি ছুটোছুটি! বাবা মা মিতুন সবাই মিলে ওকে সামলাচ্ছে, সাগরে না ডুবে যায়। পরের দিন তারা গাড়ি করে অনেক দুরে, অনেক সময় নিয়ে পৌছল রম্ভা পান্থনিবাসে। এখানে সমুদ্র নেই  তবে নদীর মত একটা লেক বয়ে গেছে, নাম চিল্কা হৃদ।  সেদিন তারা খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিয়ে বিকেলে ঐ চিল্কার পাশে বসল।  সকালে তৈরি হয়ে তারা চিল্কার ধারে এল। সবার সাথে না গিয়ে বাবা বেশি টাকা দিয়ে শুধু তাদের জন্যই একটা বোট রিজার্ভ করলেন। নৌকোয় উঠে ছোট দু’টোর কি আনন্দ! প্রথমে একটু ভয় ভয় করছিলো,নৌকো টলমল, কিন্তু পরে ঠিক হয়ে গেল। মা মাঝিকে বললেন, ‘তুমি সোজা ‘ডলফিন নোজ’  -এ নিয়ে চল, বাচ্চারা ডলফিন দেখে আনন্দ পাবে”। তারপর অনেকক্ষণ চলে তারা একটা ধারে এল যেখানে ঢেউ কম। মাঝি নৌকোর মেশিন বন্ধ করে শুধু দাঁড় ধরে নৌকোকে এক জায়গায় স্থির রাখল। ওমা!,একটু পরে ডলফিনরা জলের উপর দিয়ে লাফাতে লাগল। একটা তো প্রায় নৌকোর উপর পড়ে আর কি। মিতুন ছবির বইতে এদের দেখেছে। সে আনন্দে চীৎকার করে বলতে লাগল, “ডলফিন, ডলফিন “!ছোট্ট তুতুন অবাক হয়ে বলল,’ছিপ নিয়ে গেল কোলা ব্যাঙে, মাছ নিয়ে গেল চিলে’। সে এই ছড়াটা মুখে মুখে নতুন শিখেছে। মিতুন বলে,’ কোলা ব্যাঙ না রে বোকা,  এর নাম ডলফিন’। কিছুক্ষণ থাকার পরে তারা ফিরে এল। এবার দুই বোনে সারা দুপুর বিকেল ধরে চলল সেই ডলফিনের গল্প। পরদিন সকালে তারা দরিংবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিল।  গাড়ি   অরন্যঘেরা পাহাড়ী পথে উঁচুতে উঠতে লাগল।  গাড়ি একেবারে পাহাড়ের মাথায় উঠে এসে একটু নেমে ঘন বনের মধ্যে তাদের জন্য নির্দ্দিষ্ট কটেজের সামনে এসে থামল। আশেপাশে একটু দুরে দুরে এমন কয়েকটি কটেজ আছে । বাবা বললেন, ‘এগুলোকে ‘ জঙ্গল রিসর্ট’ বলে, জঙ্গলের মধ্যে আছেতো, তাই’। কটেজ হলেও ভেতরের ব্যবস্থা বেশ ভাল। বড় বড় ঘর, ওয়াশরুম, আয়না সবই আছে। পাশেই ক্যান্টিন হল। চা, জলখাবার,  দুপুরের খাবার সবই ওখানে পাওয়া যায়।  তারা ফ্রেশ হয়ে, স্নান করে, রেডি হয়ে বনের পথ ধরে চলল ক্যান্টিন হলের দিকে একেবারে দুপুরের খাবার খেতে। মিতুন গাছের দিকে আঙুল দিয়ে দেখায়,’বাবা দেখ, কত্ত বড় কাঠবিড়ালী!’ বাবা বলেন,’ হ্যা, এটা এই জঙ্গলেই পাওয়া যায়,’জায়েন্ট স্কুইরেল’ বলে’। কোথায় একটা মোরগ ডেকে ওঠে, ‘কোকোর কো’।  বাবা বললেন, ‘ ওগুলো বনমোরগ, অনেক দেখতে পাবে’। সেদিন বিকেলে সামনে পার্ক মত জায়গায় সব কটেজের ট্যুরিস্টরা একসাথে মিলেমিশে গল্প গুজব করে ঠিক করলেন যে কাল  দুপুরে খেয়েদেয়ে তারা একসাথে বেড়াতে যাবেন।পরদিন বেড়াতে গিয়ে তারা হাঁটতে হাঁটতে একটা পাহাড়ী নদীর পাশে গিয়ে বসলেন। বিকেলে পাইন বনের মধ্যে দিয়ে তারা গোলমরিচ আর কফি বাগান দেখতে গেলেন। একটা ফাঁকা মতন জায়গায় চা কফির দোকান দেখে বড়রা বেঞ্চে বসে চা, কফি খাচ্ছে, বাচ্চারা নিজেদের মত খেলছে। মিতুন দেখে গাছে একটা লেজঝোলা পাখি, ট্টিটিইই করে ডেকে ডেকে দুরে দুরে উড়ে যাচ্ছে। মিতুনও ছুটে ছুটে তার পিছু ধাওয়া করেছে। অনেকটা ছুটে আর পাখিটাকে দেখতে পেল না। হুশ ফিরতে দেখে সে জঙ্গলের ভিতরে চলে এসেছে, মা বাবা কাউকে দেখতে পাচ্ছে না। তাড়াতাড়ি ফিরতে গিয়ে পথ ভুলে উল্টো দিকে বনের আরও  গভীরে চলে গেল।  চা টা খাওয়া হয়ে গেলে মা খেয়াল করলেন যে মিতুনকে তো দেখা যাচ্ছে না। তুতুনকে জিজ্ঞেস করলেন,  ‘দিদিকে দেখেছিস?’ তুতুন হাত দিয়ে বনের দিকে দেখায়—‘ওই দিকে পাখি দেখছিল’।  মা বাবাকে ডেকে বলেন, ‘ মিতুনকে দেখতে পাচ্ছি না’। সবাই  মিলে খোঁজাখুঁজি চলে। না মিতুন কোথাও নেই। মা কেঁদে দিয়েছেন। বাবা আর কয়েকজন ট্যুরিস্ট লোকদের নিয়ে বনের মধ্যে ঢোকেন। “‘মিতুন, মিতুন “– বাবা জোরে ডাকেন। কোন সাড়া নেই। এদিকে বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে। অন্যরা বলেন,’ চলুন থানায় খবর দিই,ওদের কাছে জোরালো টর্চ থাকে, পুলিশকে সাথে নিয়ে আবার খুঁজতে আসি, এ অঞ্চলে বুনো কুকুর এমনকি কখনও নেকড়েও আসে বলে শুনেছি’।  মিতুনের মা কেঁদেই চলেছেন, বললেন, ‘কী হবে!’ বাবাকেও উদভ্রান্ত দেখায়। এদিকে মিতুন বুঝেছে যে এই ঘন বনে সে পথ হারিয়েছে, অন্ধকার নেমে আসছে। সে মা, বাবা বলে চীৎকার করে কাঁদতে লাগল। দুরে কোন হিংস্র জন্তুর ডাক শোনা গেল। তাকে আত্মরক্ষা করতে হবে। কিন্তু সে গাছে উঠতে পারে না। কিছুটা এগিয়ে আবছা আলোয় দেখল একটা বড় গাছ অন্য একটা বড় গাছের উপর এমনভাবে হেলে আছে যে গোড়ার দিকে ছোটমত একটা ঘরের মত হয়ে আছে। সে পাশ থেকে একটা বড় কাঠি নিয়ে তার ভিতরে কয়েকবার খোঁচাখুঁচি করল, না সাপ টাপ নেই তাহলে ফোঁস ফোঁস করত বা বেরিয়ে আসত। মিতুন গুটিসুটি মেরে, হামাগুড়ি দিয়ে তার মধ্যে ঢুকে বসে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্তিতে একসময় ঘুমিয়েও পড়ল। বাবা পাঁচ ব্যাটারি টর্চসহ থানার পুলিশ, আরো কিছু লোক জোগাড় করে সারারাত বন তোলপাড় করে ফেললেন। জোরালো টর্চের আলো ফেলে, “মিতুন  মিতুন ” বলে চীৎকার করে ডেকেও তাকে পাওয়া গেল না। মিতুনের আশ্রয় নেওয়া গাছদুটোর পাশ দিয়েও গেছেন ডাকতে ডাকতে, কিন্তু মিতুন ঘুমিয়ে ছিল বলে শুনতে পায় নি। এদিকে ভোর হয়ে এসেছে।—‘ ওর মাকে আমি কি বলব’– মিতুনের বাবা একেবারে মাটিতে বসে পড়লেন। দুরে গাছের মধ্যে মিতুনের ঘুম ভাঙল, দেখে আলো ফুটেছে। খুব জলতেষ্টা পেয়েছে। গাছের কোটর থেকে বেরিয়ে সে হাঁটতে লাগল। একটা যেন জলের কলকল মত শব্দ শোনা যাচ্ছে! মিতুন শব্দের দিকটায় হাঁটতে হাঁটতে দেখে এক ছোট পাহাড়ী নদী বয়ে যাচ্ছে। সে দু’হাত জড়ো করে জল খেতে লাগল। থানার অফিসার মিতুনের বাবাকে বলেন,’ মিষ্টার বোস, উঠুন, ওদিকে নদীর দিকটায় খোঁজা হয় নি। সঙ্গের লোকেরা বলল, ‘ওখানে তো রাতে জীবজন্তুরা জল খেতে আসে’। মিতুনের বাবা আঁতকে ওঠেন, পা আর সরে না। অফিসার বলেন, ‘ চলুন, আমাদের শেষ চেষ্টা করতে হবে’। হাঁটতে হাঁটতে তারা নদীর ধারে যান। একটা লাল জামা গায়ে ছোট মেয়ে যেন জল খাচ্ছে! মিতুনের বাবা ছুটে গিয়ে মেয়েকে কোলে তুলে নেন। এবার তিনি কেঁদে ফেলেন ‘ কোথায় গিয়েছিলি মা, সারারাত তোকে খুঁজেছি’। সবাই মিলে হৈ হৈ করে মিতুনকে কটেজে নিয়ে এলেন। ওর মা একেবারে মেঝেতে উপুড় হয়ে ডুকরে ডুকরে কাঁদছিলেন।– ‘দেখো,কাকে নিয়ে এসেছি’। ওর বাবার কোলে মিতুনকে দেখে মা উঠে মিতুনকে কোলে নিয়ে জড়িয়ে ধরে চুমো দিতে লাগলেন। তুতুন কাঁদতে কাঁদতে বলছে,”দি,ও দি”। মিতুন বোনকে আদর করে,–‘কাঁদছিস কেন বোকা, এই তো আমি এসে গেছি’।
ছবি- মৌসুমী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply