
পলাশবাবুর জীবনে সমস্যার অন্ত নেই। এই যেমন সকালবেলা দুটো মুখে দিয়ে যখনই দরজা খুলবেন, অধিকাংশ দিন দেখতে পাবেন হরেনকাকার লাল সুইফট ডিজায়ার গাড়িখানা একেবারে ওঁর দরজার সামনে রাখা। বার বার বলেও কোনও সুরাহা হয়নি। তারপর তিনি ভিড় মেট্রো ঠেলে যখন অফিস ঢুকবেন, দেখবেন নানান কারণে খাস্তগীরবাবুর মুখ ভার। খাস্তগীরবাবু ওঁর অফিসের বস। পলাশবাবুর ধারণা, ভদ্রলোক হাসতে জানেন না। দু-বছর হল ভদ্রলোক এসেছেন পার্ক স্ট্রিটের এই অফিসে। এই দু-বছরে তিনি একবারও খাস্তগীরবাবুকে হাসতে দেখেননি। তিনি শুধু যে হাসেন না, সেটা নয়। অন্য কাউকে হাসতে দেখলেও বোধহয় ওঁর শরীরে একরকম কষ্ট হয়। তাই বিভিন্ন ছুতোয় তিনি পলাশবাবুকে উত্যক্ত করতে থাকেন। যদিও এই স্বভাব অফিসের প্রায় সবার সঙ্গেই বজায় থাকে, তবু পলাশবাবুর ধারণা, ওঁর সঙ্গে যেন বেশি করে অসহযোগ করেন খাস্তগীরবাবু। এছাড়া বাজারে পাঁচটা পেয়ারা নিলে নিয়ম করে একটা পচা বেরোয়। কোনোদিন বলতে গেলে এক চোখ কানা দিলীপ বলবে, ‘আরে বাবু, ওরকম একটা দুটো বেরিয়ে যায়—কী করব বলুন তো?’ তারপর অবলীলায় অন্য খরিদ্দারদের ফল দিতে ব্যস্ত হয়ে যাবে। যেন মনেই নেই পলাশবাবু ওখানে আছেন, কিছু বলছিলেন। মজার কথা, পলাশবাবুও ‘আর কোনোদিন যাব না ওর দোকানে’ এরকম বিড়বিড় করতে করতে চলে আসেন এবং দু-দিন পর আবার সেই দোকানের সামনে গিয়েই বলতে থাকেন, ‘আজ কিন্তু সব ঠিক করে দেখে দেবে।’
বছর পঁয়ত্রিশের পলাশ সামন্তর জীবন এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। তিনি একা মানুষ, বিয়ে-থা করেননি। সিংহী পার্কের দোতলা বাড়িতে একাই থাকেন। অনন্তদা বলে একজন বুড়ো মতন চাকর আছে বটে, সে সকালে এসে দিনের রান্না করে চলে যায়। ওই খেয়েই পলাশবাবু বাকিটুকু ফ্রিজে ঢুকিয়ে অফিস বেরোন এবং ওঁর সমস্যাসংকুল জীবন শুরু হয়।
এভাবেই কেটে যাচ্ছিল। পলাশবাবুর ধারণা ছিল, ওঁর বাকি জীবনও এভাবেই কেটে যাবে। কিন্তু এই সমস্যাবহুল জীবনের মাঝে আবার এক নতুন সমস্যা এসে পলাশবাবুর জীবনটা কেমন এলোমেলো করে দিল যেন।
সেদিনও রাতে ফ্রিজের খাবার গরম করে খেয়ে চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়েছেন তিনি। সারাবছর গায়ে চাদর জড়িয়ে শোয়া ওঁর অভ্যেস। নইলে ঘুম আসতে চায় না। আর একবার ঘুমিয়ে পড়লে কিছু মনে থাকে না ওঁর। ভীষণ গভীর ঘুম হয় পলাশবাবুর, স্বপ্ন-টপ্নও দেখেন না একেবারেই। অথচ সে-রাতে তিনি খুব স্পষ্ট স্বপ্ন দেখলেন যে খাস্তগীরবাবু অফিসে একটা নীল শার্ট পরে এসেছেন আর পারচেজ সেকশনের প্রবীরকে ভীষণ বকাবকি করছেন। এটাও মনে আছে, খাস্তগীরবাবুর বুকপকেটে সুতোর কাজ করা একটা পাখি ছিল।
সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানার ওপর বেশ খানিকক্ষণ অবাক হয়ে বসে ছিলেন পলাশবাবু। জানালার ঘষা কাচ দিয়ে রোদ্দুর আসছে। আর তখনও তিনি শুনতে পাচ্ছেন, খাস্তগীরবাবু বলছেন, “প্রবীর, চাকরি করার ইচ্ছে না থাকলে বলো, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি!”
হরেনবাবুর গাড়ির পাশ কাটিয়ে বেরিয়ে, মেট্রোর ভিড় ঠেলে যখন তিনি অফিসে পৌঁছলেন, হাঁ হয়ে দেখলেন খাস্তগীরবাবু একটা নীল শার্ট পরে এসেছেন, বুকপকেটের ওপর সুতোর কাজ করা একটা পাখি বসে। খানিকক্ষণের জন্য নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল যেন ওঁর। তাও চুপ করে রইলেন। মনে মনে বললেন, এসব কাকতালীয় ব্যাপার।
তারপর টিফিনের পরেই দেখলেন প্রবীর গম্ভীর মুখে খাস্তগীরবাবুর চেম্বারে ঢুকছে। অমায়িক বলে খাস্তগীরবাবুর সুনাম আছে। অমায়িক অর্থে মাইক লাগে না ওঁর এমনই গলার জোর। চেম্বারের বাইরে থেকেও ঢোঁক গিলতে গিলতে পলাশবাবু শুনতে পেলেন—“প্রবীর, চাকরি করার ইচ্ছে না থাকলে বলো, আমি ব্যবস্থা নিচ্ছি!”
আকাশপাতাল ভাবতে ভাবতে তিনি বাড়ি ফিরলেন। এমনকি বুঝতে পারলেন, রাতের চাদর গায়ে দেওয়ার সময় বেশ চিন্তা হচ্ছে ওঁর। পাগল-টাগল হয়ে যাচ্ছেন নাকি তিনি! কিন্তু পাগলরা কি স্বপ্ন দেখে? তিনি সঠিক জানেন না। এসব ভাবতে-ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়লেন।
সেই রাতে পলাশবাবু আবার আর একটা অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, একজন প্রবীণ ভদ্রলোক—মুখটা একটু চেনা চেনা লাগল ওঁর, কিন্তু কোথায় দেখেছেন কিছুতে মনে করতে পারলেন না। দেখলেন, সেই প্রবীণ ভদ্রলোকের পরনে সাদা আদ্দির পাঞ্জাবি, সঙ্গে চুনোট করা ধুতি। ভদ্রলোক ওঁদের বাড়ির গুদোমঘরে কী যেন খুঁজছেন।
এই গুদোমঘর পলাশবাবু ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছেন। পুরোনো বাড়ির যাবতীয় বাতিল জিনিস এখানে স্থান পায় শেষে। ফুটো হয়ে যাওয়া লোহার বিশাল কড়া, আদ্যিকালের ভাঙা কাঠের আসবাব, বেতের ঝুড়ি, ছেঁড়া-ফাটা পুরোনো তবলা—কী নেই সেখানে!
পলাশবাবু দেখলেন একটা কাঠের ভাঙা আলনা। এটা উনি দেখেছেন ছোটোবেলায়। ভদ্রলোক ওই আলনার তলায় একটা তাক মতন আছে, সেখানে কী যেন খুঁজছেন।
ঠিক এই পর্যন্ত স্বপ্নটা দেখেই ওঁর ঘুম ভেঙে গেল। ভয়ের কোনো স্বপ্ন নয়, তবু ঘুম থেকে উঠে ওঁর মনে হল কেমন একটা কাঁপুনি দিচ্ছে শরীরে। দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িতে দেখলেন সকাল সাড়ে ছ’টা বাজে।
গুদোমঘরে শেষ কবে ঢুকেছেন পলাশবাবু মনে করতে পারলেন না। কিন্তু বুঝতে পারছিলেন আজ একবার ঢুকতেই হবে ওঁকে। অনন্তদা চলে যাওয়ার পর একটু কিন্তু কিন্তু করে তিনি অফিস ডুব মারার সিদ্ধান্ত নিলেন। যতক্ষণ না গুদোমঘরের রহস্য পরিষ্কার হচ্ছে, শান্তি পাবেন না।
গুদোমঘরটা একতলা আর দোতলার মাঝখানে। সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় বাঁদিকে। প্রমাণ আকারের ঘর নয়—নীচু ছাদ, মাথা ঝুঁকিয়ে ঢুকতে হয়। ওভাবে ঢুকতে প্রথমেই একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে ঝাপটা মারল ওঁর। তারপর গন্ধটা সয়ে যাওয়ার পর চারদিকে ভালো করে তাকালেন। শেষ বোধহয় এসেছিলেন যখন পুরোনো লোহার বালতিটা দিয়ে জল বেরিয়ে যাচ্ছিল সেটা রাখতে। অনেকদিনের জিনিস, ফেলে দিতে মায়া হয়েছিল।
ভাঙা আলনাটা দেখতে পেলেন তিনি। মাথা নীচু করেই গুঁড়ি মেরে এগিয়ে গেলেন ওটার দিকে। তারপর তলার ভাঙা তাকটায় দেখতে পেলেন কিছু ছেঁড়া কাগজ, কয়েকটা বাতিল হওয়া পেন, কবেকার পুরোনো কয়েকটা খবরের কাগজ। কয়েকটা টিকটিকির ডিমও নজরে এল ওঁর।
এসবের মধ্যেই পলাশবাবু দেখতে পেলেন একটা আদ্যিকালের ছোট্ট একটা পকেট ডায়েরি। নীল রঙের তুলোট মলাট। কেন জানি পলাশবাবুর মনে হল, এটা খুঁজতেই তিনি এসেছিলেন। ডায়েরিটা সাবধানে হাতে তুলে নিলেন তিনি।
চলেই আসছিলেন, নজরে এল, আলনার পাশেই বেশ কয়েকটা ছবির ফ্রেম ওপর ওপর রাখা আছে। এগুলো ওঁদের সব পূর্বপুরুষদের ছবি। অনেকদিনের পুরোনো সব ছবি। সবার ছবি দেওয়ালে রাখা সম্ভব নয় বলে তাঁদের জায়গা হয়েছে এখানে, এই গুদোমঘরে।
কী মনে হতে পলাশবাবু ছবিগুলো একটা একটা করে নামিয়ে দেখতে লাগলেন। ওঁর বাবার ছবি এখনও বাড়ির দেওয়ালে শোভা পাচ্ছে। ঠাকুরদার ছবি চিনতে পারলেন, ঠাকুমার ছবিও। বাকি কাউকেই চেনেন না তিনি। আর কয়েকটা ছবি দেখার পরই একটা ছবি দেখে আঁতকে উঠলেন তিনি।
কালকের স্বপ্নে দেখা সেই মূর্তি! সেই সাদা পাঞ্জাবি আর চুনোট করা ধুতি। মাথার চুল ধপধপে সাদা, মুখ দেখে মনে হচ্ছে কী যেন একটা ভাবছেন প্রবীণ মানুষটি। ছবিটার তলায় ক্যালিগ্রাফিক পেনে লেখা আছে চারুচন্দ্র সামন্ত।
তাড়াতাড়ি করে পলাশবাবু ছবিটা আবার আগের জায়গায় রেখে বেরিয়ে এলেন গুদোমঘর থেকে। হাতে সেই ডায়েরিটা। গুদোমঘর থেকে বেরিয়ে এসে পলাশবাবু বুঝতে পারলেন, রীতিমতো ঘেমে গেছেন তিনি।
ডায়েরিটা খুলে প্রথমেই তিনি দেখলেন মলাটের এ-পাশে নামের জায়গায় লেখা আছে চারুচন্দ্র সামন্ত। খুব একটা অবাক হলেন না তিনি এটায়। যেন এটা তো হওয়ারই ছিল। কিন্তু তিনি চমকে উঠলেন সালটা দেখে। ডায়েরিটা উনিশশো তেইশ সালের। এটা দু-হাজার তেইশ চলছে। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে ওঁর কোনও এক পূর্বপুরুষ এই শব্দগুলো লিখে গেছেন। ভাবতেই গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল পলাশবাবুর।
ছোটো ছোটো পাতায় মুক্তোর মতন হাতের লেখা। পলাশবাবু হিসেব করে দেখলেন চারুচন্দ্র সামন্ত ওঁর ঠাকুরদার ঠাকুরদা। মানে বৃদ্ধ প্রপিতামহ।
ডায়েরির শুরুর কয়েকটা পাতায় সংসারের হিসেবনিকেশ। লেখা কিছু নেই। কিন্তু কয়েক পাতা পর তিনি অদ্ভুত জিনিসটা লক্ষ করলেন। চারুচন্দ্র একটা জায়গায় লিখেছেন—‘আজ আমার এক পূর্বপুরুষ আমার সহিত সাক্ষাৎ করিলেন। করালিপ্রসাদ সামন্ত নাম। জীবনের প্রতি অগাধ জ্ঞান তাঁর।’ পলাশবাবুর মনে হল দম বন্ধ হয়ে আসছে ওঁর। চারুচন্দ্র লিখেছেন—‘উনি মারা গিয়াছিলেন, কিন্তু উত্তরপুরুষকে পথ দেখাইবার নিমিত্ত পুনর্বার প্রকট হইলেন।’
তারিখ দেখলেন বারো আগস্ট, উনিশশো তেইশ; আজ বারো আগস্ট দু-হাজার তেইশ। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগের লেখা। ডায়েরিটা গোগ্রাসে পুরোটা পড়ে ফেললেন তিনি। ওইদিনের পর থেকে ডায়েরি অনিয়মিত। কোনোদিন কিছু লেখা থাকলেও সে-সব ছোটো ছোটো কথা। ‘স্বাধীনতা গ্রহণ নয়, অর্জন করিবার বিষয়।’ ‘যে মানুষ স্বাধীনতার অর্থ বোঝে না সেই আসল পরাধীন।’ এইসব ছোটো ছোটো বাণী ধরনের কথা। কিন্তু তন্নতন্ন করে খুঁজেও পলাশবাবু করালিপ্রসাদ সামন্তর বয়স অথবা কবে মারা যান, কীভাবে দেখা দিয়েছেন—এসব কিছু খুঁজে পেলেন না।
পলাশবাবু ডায়েরিটা পুরোটা পড়ে শেষ করার পর খানিকক্ষণ চুপটি করে বসে রইলেন। চারুচন্দ্র সামন্তর জীবনে কীসের সমস্যা ছিল তিনি জানেন না। কিন্তু এটুকু জানেন, আজ যেমন তিনি তার পূর্বপুরুষের সাক্ষাৎ পাচ্ছেন—যেভাবেই হোক না কেন, ঠিক সেরকম ধরনের ঘটনা আগেও ঘটেছে। আজ থেকে ঠিক একশো বছর আগে।
সেই রাতে তিনি আর একটা স্বপ্ন দেখলেন। দেখলেন, হরেনবাবু ওঁর বাড়ি এসেছেন ছেলের বিয়ের কার্ড দিয়ে নেমন্তন্ন করতে। বর্ষীয়ান হরেনবাবু চিবিয়ে চিবিয়ে বলছেন, “আগামী রবিবার তোমার কোনও কাজ নেই তো? তা তুমি তো একা মানুষ, তোমার আবার কী কাজ! দেরি করবে না। কাজ-টাজও থাকতে পারে।” উকিল বলে এবং ভালো পসার আছে বলে তিনি প্রায় সবকথাই একরকম করে বলেন। যেন আদালতে জেরা করছেন অপরাধীকে।
স্বপ্নের মধ্যেই পলাশবাবু দেখতে পেলেন, হরেনবাবুর কথা শুনে তিনি জোরে হেসে উঠেছেন। এত জোরে তিনি হাসেন না সাধারণত। ওঁর হাসি দেখে হরেনবাবুও অবাক হয়েছেন। একটু যেন বিরক্ত হয়ে বলছেন, “হাসির কথা কী বললাম?”
হাসি থামিয়ে পলাশবাবু বলছেন, “আরে একটা গাড়ি কিনলাম নতুন। লাল সুইফট ডিজায়ার। এই দেখুন না, জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে। রবিবার তো গাড়িটা সার্ভিসিংয়ে নিয়ে যাব। কী করে আসব বলুন দেখি!”
হরেনবাবু কিছুটা চটে গিয়ে বলছেন, “তোমার মাথার ঠিক আছে? ওটা আবার তোমার গাড়ি কবে থেকে হল হে? ওটা তো আমার!”
“এ আপনার কেমন কথা হরেনকাকা? চব্বিশ ঘণ্টা আমার বাড়ির দরজা আটকে যে-গাড়ি দাঁড়িয়ে থাকে, সেটা আপনার কী করে হয় বলুন তো?” তারপর হঠাৎ কী যেন মনে পড়ে গেছে এমন মুখ করে তিনি বললেন, “একটা কাজ করি বরং, আপনার ছেলে পটা তো আমার ভাইয়ের মতো, ওর বিয়েতে বরং এই গাড়িটা গিফট করছি আমি।”
স্বপ্নটা ভেঙে গেল পলাশবাবুর। শোওয়ার আগে ভেবেছিলেন চারুচন্দ্র সামন্ত স্বপ্নে আসবেন। কিন্তু এরকম স্বপ্নটা এসে আবার সবকিছু কেমন তালগোল পাকিয়ে গেল ওঁর।
সন্ধেবেলায় যখন হরেনকাকা দরজার বেল বাজালেন, পলাশবাবু একটুও অবাক হলেন না। সবকিছু পুরোটা সিনেমার মতন দেখে যেতে লাগলেন তিনি। যেন যা হওয়ার হয়েই গেছে, তিনি শুধু ওঁর অংশটুকু অভিনয় করে যাচ্ছেন।
হরেনকাকা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার খানিকক্ষণের মধ্যে পলাশবাবু শুনতে পেলেন একটা গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট হওয়ার আওয়াজ। তারপর শুনতে পেলেন একটা গাড়ি হুশ করে বেরিয়ে গেল। পলাশবাবুর মনে হল ওঁর বুক থেকে ভারী কিছু একটা নেমে গেল যেন। যেন ওটা যে ওখানে ছিল, সেটাই তিনি এতদিন জানতেন না।
পরের রাতে তিনি স্বপ্ন দেখলেন, এক চোখ কানা দিলীপের দোকানে গেছেন। দোকানে বেশ ভিড় আছে। তিনি সকলের সামনেই একটা মাঝারি মাপের কুঁকড়ে-মুকড়ে যাওয়া প্লাস্টিকের প্যাকেট থেকে কয়েকটা পচা পেয়ারা বের করে সামনে রেখে দিলেন। এক চোখ কানা দিলীপ কেমন অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ওঁর দিকে। দোকানের বাকি খরিদ্দাররাও অবাক হয়েছে।
পলাশবাবু বেশ মজার সুরে বলছেন, “এই পেয়ারাগুলো রাখো দিলীপ, তুমি বেছে দিয়েছিলে এগুলো। এত ভালো স্বাদ, একা খেয়ে শান্তি পেলাম না। ভাবলাম তোমার কাছ থেকে সারাবছর ফল নিই, তোমাকেও ভাগ দিয়ে আসি। ভালো করে খেও।”
তারপর আর কাউকে কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তিনি উলটোদিকের নারানের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বলছেন, “ভালো দেখে বেছে দিও, খারাপ হলে কাল এসে ফেরত দিয়ে যাব।”
নারান খানিক বিগলিত হেসে বলছে, “একটাও পচা বেরোলে আমার নারান নাম বদলে দিলীপ রাখবেন বাবু!” ওঁরা দুজনেই তারপর হো হো করে হেসে উঠলেন।
ঘুম থেকে উঠে ওঁর মনে পড়ল পচা পেয়ারাগুলো কোথায় তিনি তো জানেনই না। চারুচন্দ্র কি ভুল করলেন তাহলে? ঘড়ির দিকে তাকিয়েই তিনি চমকে উঠলেন। সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। সাধারণত সাড়ে ছ’টার সময় তিনি উঠে পড়েন। বিছানা ছাড়তে-ছাড়তেই অনন্তদার বেলের আওয়াজ শুনতে পেলেন তিনি।
একটু পরেই ওঁকে অবাক করে দিয়ে রান্নাঘর থেকে অনন্তদার স্বগতোক্তি ভেসে এল—“এই পচা পেয়ারাগুলো আবার এখানে কে রাখল! যাই গিয়ে জমাদারের জায়গায় ফেলে দিয়ে আসি।”
পলাশবাবু তাড়াতাড়ি করে গিয়ে অনন্তদার হাত থেকে প্লাস্টিকটা নিয়ে নিলেন। গতকাল রাতের স্বপ্নে দেখা প্লাস্টিকটাও এরকম কুঁকড়ে যাওয়া ছিল। অনন্তদা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল পলাশবাবুর মুখের দিকে।
দেরি হয়ে গিয়েছিল বলে পচা ফলের প্লাষ্টিকটা নিয়েই অফিস গেছিলেন তিনি আজ। অফিসের বাকিরা কেউ কিছু না বললেও খাস্তগীর কথা শোনাতে ছাড়লেন না।
“এটা অফিস, না বাজার, অ্যাঁ?” চেম্বারে ডেকেই বললেন তিনি। পলাশবাবু তখন আতিপাতি করে নিজের ভেতরে একটা না দেখা স্বপ্ন খুঁজছিলেন। যেন স্বপ্নটা দেখে ফেলতে পারলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। চোখা চোখা উত্তরগুলো ছুড়ে দেবেন খাস্তগীরের মুখের দিকে। কিন্তু সে-সব কিছুই হল না। তিনি মিউমিউ করে বললেন, “আসলে আজ ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে গেছিল বলে…”
“থাক আর সাফাই গাইতে হবে না আপনাকে। যান গিয়ে সাপুই বিল্ডার্সের ফাইলটা নিয়ে আসুন।” ধমকে উঠলেন খাস্তগীর।
যদিও এই ঘটনার জন্য ওঁর বাজারের ঘটনা একটুও প্রভাবিত হল না। একেবারে স্বপ্নে যেমন দেখেছিলেন অবিকল সেইরকম হল। এমনকি স্বপ্নে দেখা হতভম্বের মতন এক চোখ কানা দিলীপের মুখটা পর্যন্ত হুবহু মিলিয়ে দেখে নিলেন তিনি মনে মনে।
সেদিনের পর থেকে হরেনবাবু আর গাড়ি রাখেন না। সোজা বাড়ির তালা খুলে ঢুকতে ঢুকতে তিনি মনে মনে ভাবছিলেন আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তে হবে। খাস্তগীরকে নিয়ে স্বপ্ন না দেখলেই নয়। বড্ড বাড় বেড়েছে লোকটা।
তাড়াতাড়ি করে খেয়েও নিলেন তিনি। তারপর আবার চারুচন্দ্র সামন্তর একশো বছরের পুরোনো ডায়েরিটা খুলে বসলেন। যদি কিছু বাদ পড়ে গিয়ে থাকে। কীভাবে সবকিছু ঘটেছিল যদি কোনও ক্লু পাওয়া যায়।
কিছুই পাওয়া গেল না। দশটা বাজতে না বাজতে পলাশবাবু চাদর মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লেন, স্বপ্ন দেখার আশায়।
অথচ সেই রাতে কোনও স্বপ্ন দেখলেন না তিনি। সকালে ঠিক সাড়ে ছ’টার সময় ঘুম ভেঙেও গেল। ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারলেন মনটা ভারী হয়ে আছে। তিনি ভেবেছিলেন আজ আবার কোনও স্বপ্ন দেখবেন আর অফিসে গিয়ে খাস্তগীরকে শায়েস্তা করবেন।
চারুচন্দ্র সামন্ত কি ছেড়ে গেলেন তাকে! এমন ভাবলেন পলাশবাবু মনে মনে। মনটা ভারি বিমর্ষ হয়ে গেল ওঁর।
সেদিন অফিসে গিয়ে ডাক পড়ল ওঁর। খাস্তগীরবাবুর প্রবল বকা খেলেন তিনি। অথচ পলাশবাবুর খুব কিছু দোষ ছিল না। অফিসের সবাই আহা উহু করল আর সারাদিন তিনি গুম মেরে বসে রইলেন। তিনি খাস্তগীরবাবু নয়, ভাবছিলেন ওঁর পূর্বপুরুষের কথা। হঠাৎ করেই নিজেকে বড়ো অসহায় মনে হল ওঁর।
সেই রাতেও তিনি খাস্তগীরবাবুকে নিয়ে কোনও স্বপ্ন দেখলেন না। বরং এক অদ্ভুত স্বপ্ন এল। দেখলেন, তিনি একটা বিশাল মাঠের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন। রাতের সময়, আকাশে চাঁদ আছে। কয়েকটা তারা ইতিউতি ছড়িয়ে আছে। পলাশবাবু মাঠটার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন। ওঁর সামনের দিকে বেশ খানিকটা দূরে একটা গোল-পোস্ট। পিছন ফিরে দেখলেন সেখানেও অমনি একটা গোল-পোস্ট। মাঠটায় আলো আছে, কিন্তু মাঠের ধারে ধারে অন্ধকার। ওঁর পায়ের সামনে একটা ফুলবল রাখা।
জীবনে কোনোদিন খেলাধুলা করেননি পলাশবাবু। বই পড়ার শখ ছিল, ভেবেছিলেন লেখক হবেন। হয়েছেন সদাগরি অফিসের কেরানি। ওঁর ফুটবল খেলা মানে স্কুলে টিফিনের সময়ে প্লাস্টিকের বল নিয়ে দৌড়োদৌড়ি। তাও বেশিরভাগ সময়ে ওঁকে গোল-কিপার করে রাখা হত। ভয়ে ভয়ে তিনি বলটার দিকে তাকালেন।
এমন সময় একটা মৃদু গুঞ্জন কানে এল। মনে হল মাঠের চারপাশের অন্ধকার থেকে কেউ বা কারা ধীর স্বরে ডাকছে, ‘পলাশ, পলাশ, পলাশ!’ কেউ হালকা ঠেলে দিল ওঁকে এবং ঠিক সেই মুহূর্তেই বল নিয়ে দৌড়তে থাকলেন তিনি। দৌড়নো শুরু করতেই দেখলেন কোথা থেকে ছায়া ছায়া খেলোয়াড়রা যেন মাটি ফুঁড়ে উদয় হচ্ছে। ভয় লাগছিল ওঁর। যেন এক্ষুনি সেইসব অশরীরী শরীর তাঁকে ঠেলে ফেলে দিয়ে বলটা কেড়ে নেবে। শিউরে উঠলেন তিনি।
ঠিক তখনই ওঁর মনে হল, ছুটতে-ছুটতেই, সামনের গোল-পোস্টের পাশে একজন বয়স্ক লোক দাঁড়িয়ে আছেন। ওঁর পরনে সাদা পাঞ্জাবি আর চুনোট করা ধুতি।
ওঁকে দেখেই কেমন যেন বুকে বল এল পলাশবাবুর। বুঝতে পারলেন তিনি ছুটছেন। ওঁর পায়ে বল। পাখির মতো উড়ে উড়ে যেন তিনি পা ফেলছেন। কেমন জানি পলাশবাবুর মনে হল ওঁর একটা একটা পায়ের তলা দিয়ে একটা একটা শতক পেরিয়ে যাচ্ছে। তখনও গোল-পোস্ট দূরে। পাশ থেকে একটি ছায়া বড়ো কাছাকাছি চলে এসেছিল। তখনও তিনি গোল-পোস্ট থেকে অনেকটা দূরে। ওখান থেকেই তিনি শট নিলেন।
আর ঠিক তক্ষুনি ওঁর ঘুমটা ভেঙে গেল। জানা হল না গোল হল কি হল না।
মনটা খারাপ হয়ে গেল ওঁর। দ্বিতীয়বার মনটা খারাপ হল, কারণ আজও তিনি খাস্তগীরের স্বপ্ন দেখেননি। তবু মনে হল গোলটা করতে পারলে আনন্দ লাগত। বিছানায় উঠে বসে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন নীল ডায়েরিটা মাথার পাশের টেবিলের ওপর রাখা।
অফিস শেষ হওয়ার মুখে খাস্তগীরবাবুর ডাক পড়ল। পলাশবাবু ভেবেছিলেন বেঁচে গেলেন। শেষ বেলায় প্যাঁচার মতন মুখ করে তিনি খাস্তগীরবাবুর চেম্বারে ঢুকলেন।
“যাক আজ তবু বাজারের ব্যাগ নিয়ে অফিসে আসেননি।”
“ইয়ে ওটা তো মানে একদিনই খালি…”
“আজ থেকে একশো বছর আগে কী হয়েছিল জানেন?”
পলাশবাবু চমকে উঠলেন। একবার মুখে এসে গিয়েছিল, ‘আজ থেকে একশো বছর আগে চারুচন্দ্র সামন্ত ডায়েরি লিখেছিলেন।’ সামলে নিলেন নিজেকে। আমতা আমতা করে বললেন, “মানে আমি তো ঠিক…”
“রাবিশ!” অনেকটা হুংকারের মতোই শুনতে লাগল ওঁর গলাটা। “আজ থেকে একশো বছর আগে এই কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এই দিনে। আর আপনাদের কোনও ভ্রূক্ষেপই নেই! সারাদিন কেটে গেল!”
এবার ব্যাপারটা পরিষ্কার হয়েছে পলাশবাবুর কাছে। এসব কাজ নিয়মমতে ব্রাঞ্চের হেডেরই করার কথা। খাস্তগীরবাবু ভুলে গেছেন। এখন খুব সম্ভবত ওপরমহল থেকে বকুনি খেয়েছেন, সেটাকেই অধস্তনদের মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তিনি।
বলেই যাচ্ছেন বলেই যাচ্ছেন খাস্তগীরবাবু এবং মাথা নীচু করে পলাশবাবু শুনে যাচ্ছেন। ওঁর মনে হচ্ছিল কানের পাশ দিয়ে ছায়া ছায়া শব্দগুলো হুশ হুশ করে বেরিয়ে যাচ্ছে যেন। শেষ কথা তিনি শুনতে পেলেন, “আপনারা এরকম করলে আজ থেকে একশো বছর পর কোম্পানির কী হবে জানেন?”
পলাশবাবু এবার চোখ তুলে তাকিয়েছেন। খুব শান্ত ভঙ্গিতে কাটা কাটা স্বরে বললেন, “আর যাই হোক, আপনার মতন ম্যানেজার থাকবে না, এটুকু নিশ্চিত।”
উনি দেখলেন খাস্তগীরবাবু কেমন হাঁ করে ওঁর মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। এক্ষুনি একটা বড়ো মশা ঢুকে গেলেও ওঁর হাঁ বন্ধ হবে বলে মনে হয় না। চেম্বারের দরজাটা বন্ধ করতে করতে পলাশবাবুর মনে হল ওঁর কানের পাশে অনেকজন মিলে চেঁচিয়ে উঠছেন, ‘গো-ও-ও-ও-ল!’
রাস্তায় এসে পলাশবাবুর মনটা হালকা হয়ে গেল। সন্ধের শহর—বড়ো বড়ো আলো, পথঘাট ল্যাম্প পোস্টের মায়াবী আলোয় ভাসছে। ধীরে ধীরে তিনি মেট্রোর রাস্তা ধরলেন। ওঁর বুকপকেটে উঁকি মারছে নীল ছোট্ট ডায়েরিটা।
সেই রাতে তিনি আর কোনও স্বপ্ন দেখলেন না। সেই আগের মতো ঘুম হল ওঁর। গভীর নিদ্রা বলতে যা বোঝায়।
সকালে ঘুম-চোখ খুলে লম্বা একটা হাই তুলে তিনি দেখলেন ঘড়ির কাঁটায় পাক্কা সাড়ে ছ’টা বাজে। দেরি না করে উঠে পড়লেন তিনি। কাজটা সকাল সকাল সেরে ফেলতে হবে।
পলাশবাবু সোজা চলে গেলেন গুদোমঘরে। মাথা নীচু করে ভাঙা আনলার পাশ থেকে ছবিগুলো একটার পর একটা নামিয়ে রাখতে থাকলেন। তারপর সেখান থেকে চারুচন্দ্র সামন্তর ছবিটা বের করে আনলেন। ধুলো-টুলো ঝেড়ে দেওয়ালে টাঙিয়ে দিলেন ছবিটা। ভেবে রাখলেন বাজার থেকে একটা মালা আনতে হবে।
অনন্তদা যখন রান্নাবান্না করতে এল, দেখল পলাশবাবু টেবিলের ওপর ঝুঁকে পড়ে কীসব যেন লিখছেন। এর আগে কোনোদিন এরকম কিছু সে দেখেনি। একটু কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করল, “কী লিখছ গো দাদাবাবু?”
পলাশবাবু একটা নতুন ডায়েরি কিনে এনেছেন গতকাল অফিস থেকে ফেরার সময়। ডায়েরির পাতা থেকে মুখ তুলে একগাল হেসে তিনি বললেন, “একটা গল্প লিখছি অনন্তদা। গল্পের নাম একশো বছর পর।”
অনন্তদা অনেকদিনের পুরোনো লোক। হেসে বললে, “একশো বছর পর কী হবে তার জন্য এখন থেকে গল্প লিখছ? তখন তো তুমি আমি কেউ থাকব না দাদাবাবু!”
পলাশবাবু হেসে বললেন, “কেউ না কেউ তো থাকবে অনন্তদা। এই পৃথিবী থাকবে, তার আলো থাকবে, তার কালো থাকবে। মানুষ সেদিনও স্বপ্ন দেখবে, আনন্দ পাবে, দুঃখ পাবে, আবার উঠেও দাঁড়াবে। পৃথিবী যতদিন থাকবে, ততদিন এই গল্প চলতেই থাকবে অনন্তদা।”
অনন্তদা কী বুঝল কে জানে, একগাল হেসে রান্নাঘরে ঢুকে গেল। সকালের মিঠে রোদ্দুরে তার দাদাবাবুকে আজ বড়ো উজ্জ্বল লাগছিল।
পলাশবাবু ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন। এবার উঠতে হবে, নইলে অফিসের দেরি হয়ে যাবে। পেনটা সদ্য কেনা ডায়েরিটার মধ্যে ঢুকিয়ে তিনি ডায়েরিটা বন্ধ করে দিলেন। আবার অফিস থেকে ফিরে এসে লিখবেন।
পলাশবাবু শুরু করেছেন অনেকটা এভাবে—
‘দিন কয়েক আগে আমার পূর্বপুরুষ শ্রী চারুচন্দ্র সামন্ত দেখা দিয়েছিলেন আমায়। খুব সম্ভবত নিজের পরিচয় দেওয়ার জন্যই তিনি আমায় একটি নীল ডায়েরির সন্ধান দিয়েছিলেন এবং তারপর থেকেই আমার জীবনে অনেকগুলো ঘটনা ঘটে যায়। আজ তাদের গল্প শোনা যাক।’
অনন্তদা চা দিতে এসে দেখে তার দাদাবাবু চা না খেয়েই বাথরুমে ঢুকে গেছে। মৃদু হেসে চায়ের কাপটা নিয়ে রান্নাঘরে চলে যাওয়ার সময় অনন্তদা দেখতে পায় পলাশবাবুর নতুন ডায়েরি। যার মলাটটা উদার আকাশের মতো ঝকঝকে নীল।
ছবি- মৌসুমী রায়