এই লেখকের আগের গল্প- আমরা হারব না কিছুতেই, ঘটেছিল যাহা

বঙ্কুবাবুর পুরো নাম বঙ্কিমবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়। ইসকুলে ছেলেপুলের দল আড়ালে বলে বি-কিউব। অথচ বঙ্কুবাবুর অঙ্ক বিষয়টির সঙ্গে সরাসরি কোনও সম্পর্ক নেই। তিনি সাকিনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের বাংলা শিক্ষক। বাংলা পড়ান ও পড়েন। অবসর সময়ে একটু-আধটু লিখবার চেষ্টা যে করেন না তা নয়। আজকাল তো সবাই অল্পবিস্তর লিখিয়ে। শেকবুক খুললেই লেখক-লেখিকাদের চালচিত্র হাজির হয়ে যায়, আর এই অজস্র লেখার ভিড়ে বড্ড অসহায় লাগে বঙ্কুবাবুর। তিনি কি তেমন কিছু উল্লেখযোগ্য লিখে উঠতে পারবেন ইহজীবনে? ভাবলেই ইয়াব্বড় একটা দীর্ঘনিশ্বাস বেরিয়ে আসে তার হৃদয় ফুঁড়ে।
সাকিনপুরকে মোটের ওপর গ্রামই বলা চলে। তবে আধুনিকতার প্রভাব বেশ ছড়িয়েছে এখানেও। বঙ্কুবাবু একলা মানুষ, বাপ-মা স্বর্গগামী হয়েছেন বছর পাঁচেক আগে, অতএব দায়দায়িত্ব নেই তেমন। এমনিতে খুব যে খারাপ আছেন তা বলা যায় না। ওই রাত হলেই খানিক নির্জন লাগে চারিধার এই আর কি। এত বড়ো বাড়ি তার! সেই বাপ-পিতেমোর আমলের দালান। পুরো দালানখানি বয়সের ভারে জর্জরিত, নীচের দিকের একাংশ ভালোভাবে মেরামত করে সেখানেই আস্তানা গেড়েছেন বঙ্কুবাবু। বাকি সব ঘরের দরজা তালাচাবি দিয়ে বন্ধ করা আছ। গ্রামের লোক বলে ভূতের বাড়ি। রাতবিরেতে নাকি নানারকম আওয়াজ শোনা যায় বাড়ির পাশ দিয়ে গেলে। এই গ্রামের জমিদার ছিলেন তাঁর পূর্বপুরুষরা। এখন সেই রামও নেই, নেই তাঁর রাজত্বও। তা বঙ্কুবাবু এই একলা নিতাই হয়ে থাকাটাকে ভালোই বাসে। পড়াশুনো করা মানুষদের নির্জনে থাকায় কোনও অসুবিধে নেই। আর তাছাড়া বঙ্কুবাবু বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, ভূত-প্রেতে বিশ্বাস করেন না। তবে সমস্যার উৎপত্তি হল এই পড়াশুনো করতে-করতেই।

বঙ্কুবাবু পৃথিবীর বায়োডাইভারসিটি নিয়ে পড়াশুনা করছিলেন বিস্তর। পড়তে পড়তে হঠাৎ কোথায় দেখতে পেয়েছেন আগামী একশো বছরের মধ্যে পৃথিবীর জীববৈচিত্র্যে নাকি অস্বাভাবিক পরিবর্তন আসবে। নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে অনেক জীব। তারপর থেকেই বঙ্কুবাবুর ভারি কষ্ট হচ্ছে এই পৃথিবীর জন্য। কীভাবে যে এই সহনশীলা গ্রহটির ওপর অত্যাচার হয়ে চলেছে তা নিয়েই ভাবছেন সর্বক্ষণ। পৃথিবী কি প্রতিশোধ নেবে না? এখনও মানুষ কিছু বুঝতে পারছে না? তবে কি মানুষেরও অন্তিমকাল আসন্ন?
এইসব আগডুম বাগডুম ভাবনারা তার মনোজগতকে এমন আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে আজকাল ক্লাসে পড়াতে গিয়েও মনোযোগ দিতে পারছেন না। এমনিতে ছেলেপুলেরা তাকে বিশেষ মান্যিগণ্যি যে করে তাও না। নিজের কানে শুনেছেন, ছাত্ররা বলছে, ‘ওই যে পাগলা বি-কিউব আসছে।’ অতএব ছেলেপুলের কথা আর কী বলবেন! সব তো এক-একটি কালিদাস তৈরি হচ্ছে। সেদিন ক্লাসে ‘এককথায় প্রকাশ করো’-তে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “যে ভবিষ্যৎ দেখতে পায় না তাকে কী বলে রে?”
ওমা! ডেঁপো পটলা—পটলকান্তি প্রামাণিক, যাকে সবাই পেছনে বলে ‘পটলকান্তি জ্ঞানের সমুদ্দুর হতে চেয়েছিল’, সে আগ বাড়িয়ে উত্তর দিলে, “ধৃতরাষ্ট্র।”
বঙ্কুবাবু না হয়ে অন্য কেউ হলে সে খেঁকিয়ে উঠতই। কিন্তু বঙ্কুবাবুর মনে হল যুক্তিটা শোনা দরকার। পটলা জানাল, “যে বর্তমানই দেখতে পায় না, সে ভবিষ্যৎ কী করে দেখবে! তাই ধৃতরাষ্ট্র।”
বঙ্কুবাবু তারপর থেকে ক্রমাগত ভেবেই চলেছেন। কথাটা মন্দ বলেনি পটলা। মানবজাতি এখন ধৃতরাষ্ট্রের মতোই চোখে ঠুলি পরে বসে আছে। বর্তমানই দেখতে পাচ্ছে না তায় ভবিষ্যৎ!
অতএব কাউকে জল নষ্ট করতে দেখলে কিংবা প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার করতে দেখলেই তিনি বিশেষ উদ্যোগী হয়ে তাকে জ্ঞান প্রদান করতে শুরু করেন। যেমন, ‘জল নষ্ট কোরো না বাবারা। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তোমাদের মাফ করবে না।’ বা ‘প্লাস্টিক দিয়ে পৃথিবী ঢেকে ফেলো না মায়েরা। বড়ো ভোগান্তি হবে মানুষের।’
কিন্তু দুঃখের বিষয়, তাঁর কথায় কেউই পাত্তা দেয় না। ফ্যাকফ্যাক করে হাসে। হালফিলে বঙ্কুবাবুর কী করে যেন ধারণা হয়েছে, সিম্পল লিভিংটাই আসলে সারভাইভালের মূলমন্ত্র। একসময় মানুষ সেই আদিম ব্যবস্থায় ফিরে যাবে, যেখানে যন্তর-মন্তর সব মিছে হয়ে গেছে। কিন্তু এইসব কাকে আর বলবেন।
এমনিতে এমন পাগলা জগাই মানুষ, তার উপরে আবার মানব সভ্যতা নিয়ে সবিশেষ চিন্তিত হয়ে পড়েছেন। অতএব যা-তা ঘটতে লাগল। এই যেমন শামুদের পানাপুকুরের পাশে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেলেন একদিন, আর একদিন মিত্তিরদের গোয়ালের পাশে গোবরে মাখামাখি হয়ে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল তাঁকে। সাকিনপুরের ফণীডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেন, ফণীডাক্তার একগাদা ভিটামিন, আয়রন আর মিনারেল ক্যাপসুল ধরিয়ে দিয়ে এন্তার বিশ্রাম আর চিন্তাহীনভাবে সময় কাটানোর পরামর্শ দিলেন। নিরুপায় বঙ্কুবাবু কয়েকদিনের জন্য ইশকুল থেকে ছুটি নিলেন। কিন্তু তা নিলে কী হবে, চিন্তার আর প্রকোপ কমল কই! বঙ্কুবাবু আরও দুর্বল হয়ে পড়তে লাগলেন দিন দিন। বঙ্কুবাবুর বাড়িতে রান্না আর ঘরের কাজকর্ম করেন খেন্তিপিসি। খেন্তিপিসির রান্না যেমন খারাপ, কাজও তেমন জঘন্য। তার ওপর দু-দিন অন্তর অন্তর কামাই। ভালো মানুষ বঙ্কুবাবু তখন নিজেই যতটা পারেন করে নেন। চালে-ডালে কোনও প্রকারে দুটি ফুটিয়ে দু-বেলা ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন। ইদানীং সাতসকালে কোনও প্রকারে কাজ সেরে পিসি এ-চত্বর থেকে পগারপার হন। বঙ্কুবাবুর ভূতুড়ে বাড়িতে নাকি তার গা-ছমছম করে। ইদানীং নাকি ছায়া ছায়া কিছু মূর্তিও দেখতে পেয়েছেন তিনি। বন্ধ ঘরগুলো থেকে অদ্ভুতুড়ে আওয়াজও নাকি শোনা যায়। তার ওপর বাজার- সদাই যা কেনা হচ্ছে দু-দিন অন্তর-অন্তরই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কী ভূতুড়ে! একলা মানুষের কতটুকু চাল-ডাল লাগে! বঙ্কুবাবুর ধারণা, ছিঁচকে চোরের উপদ্রব বেড়েছে বলেই এরূপ ঘটছে। ছুটি নিয়ে ভালোই হয়েছে; এখন ক’দিন বাড়িতে থেকে এইসব রহস্যের উদঘাটন করা যেতে পারে।
কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ঘটে আর এক। রহস্য আরও ঘনীভূত হল। তাঁর জীবনে অদ্ভুত কিছু ঘটনা ঘটল। বঙ্কুবাবু ভয়ানক দুর্বল বোধ করতে করতে একদিন অচৈতন্যের মতো ঘুমিয়ে পড়লেন। আধো ঘুমের মধ্যে মনে হল ঘামে জবজব করছে শরীর, এদিকে গলা শুকিয়ে কাঠ। এমন সময় একটি হাত এগিয়ে এসে তাঁর গলায় অল্প অল্প করে জল ঢেলে দিল, সযতনে মুছিয়ে দিল গায়ের ঘাম। বঙ্কুবাবু অর্ধচেতন অবস্থাতেও বুঝতে পারলেন এক দীর্ঘ ছায়া ঠায় বসে আছে তাঁর শিয়রে। এরকমভাবে দু-দিন বিছানাতে পড়ে থাকার পর তাঁর জ্ঞান এল খেন্তিপিসির ডাকে। এতদিন নাকি শরীর ভালো ছিল না, সেজন্য ছুটিতে ছিলেন খেন্তিপিসি। বঙ্কুবাবু এইবার নিশ্চিন্ত হলেন। হয়তো তাঁর নিজেরও জ্বর এসেছিল এবং জ্বরের ঘোরে অচেতন অবস্থায় তিনি ভুলভাল দৃশ্য দেখেছেন, ছায়া-টায়া কিছু নেই।
পরের ঘটনাটি ঘটল মঙ্গলবার পড়ন্ত বিকেলের দিকে। ইশকুলে জয়েন করে আবার ক্লাস নিতে শুরু করেছেন। তবে শরীর সেরে উঠলেও জুত পান না তেমন। ইশকুল সেরে টিউশন পড়িয়ে ভুবন কেশদের ধানের মড়াইর পাশ ঘেঁষে যে শর্টকাট রাস্তাটি আছে, ওইটি ধরে তড়িঘড়ি বাড়ি ফিরছিলেন। মাথাটা একটু টলটল করতেই বুঝতে পারলেন দিব্য কে যেন ধরে নিল তাঁকে। মনে হল যেন ঘন কালো রঙের একটি মেয়ে। মেয়েটির মুখটি বড়ো সুন্দর, সাকিনপুরের মন্দিরতলার যোগ মহাবিদ্যা কালিকাদেবীর মতো। কিছুক্ষণ পর চোখ খুলে দেখলেন, শুয়ে আছেন বাড়ির বিছানায় এবং ধবধবে পরিষ্কার চাদরে। ঘরে চোখ বুলিয়ে দেখলেন, তাঁর এলোঝেলো ঘর কোন মন্ত্রবলে যেন অতি পরিপাটি হয়ে গেছে।
কিন্তু এসব অদ্ভুত কথা কাকেই-বা বলবেন, কেই-বা তা বিশ্বাস করবে! এমনিতেই লোকে তাঁকে অর্ধ পাগল ভাবে। তবে আজকাল আর পাঠ্য বইয়ের ওই থোড় বড়ি খাড়া পড়াতে কোনও উৎসাহ পান না। ক্লাসে উষ্ণায়ন, গ্লেসিয়ারের গলন, ওজন স্তরে ছিদ্র, দূষণ, প্লাস্টিকের যথেচ্ছ ব্যবহার কিংবা ডিজিটাল টক্সিফিকেশন নিয়েই বক্তিমে করতে থাকেন অনবরত।
সেদিন হঠাৎ হেড-স্যার ডেকে পাঠালেন বঙ্কুবাবুকে আর বললেন, “মাস্টারমশাই, আপনি তো পদার্থবিদ্যা কিংবা জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক নন! আপনার কাজ হচ্ছে ছেলেপুলেদের বাংলা বানান এবং ব্যাকরণ শেখানো। বলি আপনার বাংলার বগি লাইনচ্যুত হচ্ছে কেন অহরহ?”
সংকুচিত ও ব্যথিত মন নিয়ে বঙ্কুবাবু সেদিন বাড়ি ফিরে দেখলেন খাওয়ার টেবিলে লোটে মাছের ঝুরি করে রাখা আছে। সঙ্গে জুঁই ফুলের মতো সাদা ভাত ও একবাটি মুসুরির ঘন ডাল। ভাতের পাশে আলুপোস্ত। দেখামাত্র চোখে জল চলে এল বঙ্কুবাবুর। ক’দিন ধরেই মায়ের হাতের লোটে ঝুরি খেতে ইচ্ছে করছিল তাঁর। সেই মা-টাই তো আর নেই! হাত ধুয়ে খেতে বসেই আবেশে চোখ বুজে গেল তাঁর, বেশ বুঝতে পারলেন এ-বস্তু খেন্তিপিসির প্রোডাকশন নয়।
খাওয়াদাওয়ার পরে শান্ত মনে এইসব ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করতে বসলেন। সত্যিই এই বাড়িতে অশরীরী নেই তো? তেঁনারা নাকি মনের কথা বুঝতে পারেন! পরক্ষণেই নিজের দুই গালে ঠাস ঠাস করে চড় কষাতে ইচ্ছে হল তাঁর। তিনিও অলৌকিক গালগপ্পে বিশ্বাস করতে শুরু করলেন! কিন্তু কে এমন অতি বান্ধব মানুষ তাঁর জীবনে এল যে প্রতি মুহূর্তে তাঁকে আগলে আগলে রাখছে! অত্যন্ত ভাবিত হয়ে পড়লেন তিনি।
সন্ধ্যার আবছা আলোয় বাইরে তাকাতেই দেখলেন বহুকালের অনাদৃত তুলসী মঞ্চটিতে প্রদীপ জ্বালাচ্ছে একটি দীর্ঘাঙ্গী মেয়ে। ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে উঠতে যাবেন, দেখতে পেলেন আরও ক’টি ছায়ামুর্তি এগিয়ে আসছে তাঁর ঘরের দিকে। ঘরের মধ্যে যারা এসে দাঁড়াল, তাদের দেখে বঙ্কুবাবু ভিরমি খেতে গিয়েও খেলেন না।
ইদানীং আর তাঁর মাথা টলটল করে না, যখন-তখন চেতনা বিলোপও হয় না। শরীরে ভালোই বল অনুভব করেন। ভালো করে ঠাহর করে দেখলেন, চার দীর্ঘ অবয়বের যুবক-যুবতী দাঁড়িয়ে আছে তাঁর সামনে। ওদের পরনে ঢিলেঢালা খাদির শার্ট ও প্যান্ট। একটি ছেলের মাথার চুল সোনালি, অথচ গাত্রবর্ণ বাদামি, চোখের রঙ নীলচে সবুজ। অন্য একজন সাদা চুলের তাম্রাভ বর্ণের মেয়ে। চোখ দুটি টানাটানা আর ভারি মায়াময়! মা কালিকার মতো অপূর্ব সুন্দরী আর একটি মেয়ের দিকে তাকালে আর চোখ ফেরাতে পারা যায় না। একেই বোধহয় দেখতে পেয়েছিলেন। কোঁকড়ানো চুলের মঙ্গোলয়েড চেহারার শ্যামবর্ণ আর একটি ছেলে যেমন দীর্ঘ, তেমনই বলশালী।
বঙ্কুবাবুর ভ্যাবাচ্যাকা খাওয়া করুণ মুখ দেখে বুঝি মায়া হল তাদের। মা ভবতারিণীর মতো সুন্দরী মেয়েটি তাঁর হাতে একটি বই ধরিয়ে দিয়ে মিটিমিটি হাসতে লাগল। বঙ্কুবাবু বইটি হাতে নিয়ে তাজ্জব হয়ে গেলেন। প্রথম পাতায় জ্বলজ্বল করছে লেখকের নাম, শ্রী বঙ্কুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়। বইটির নাম, ‘ভবিষ্যতের পৃথিবী’। অত্যন্ত ঘাবড়ে গিয়ে ছেলেমেয়েগুলির দিকে তাকাতেই সাদা চুলের মেয়েটি তাঁর দিকে মাথা ঝাঁকিয়ে মৃদু হাসল। কোনও কথা বলছে না সেই মেয়ে, অথচ বঙ্কুবাবু দিব্য মেয়েটির বক্তব্য বুঝতে পারছেন।
“অবাক হবেন না লেখকমশাই, আমরা হলাম ভবিষ্যতের মানুষ। আপনার এই বইটি এক আশ্চর্যজনক আখ্যান। আমাদের কাছে আপনি ভবিষ্যৎদ্রষ্টা এক ঈশ্বরপ্রতিম মানুষ। ভবিষ্যতের পৃথিবীতে যা ঘটবে এই শতাব্দীর প্রথমভাগে বসেই আপনি তা অক্ষরে অক্ষরে লিখে গেছেন। সেই জন্য আমরা আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছি সেই সুদূর ভবিষ্যৎ থেকে। আমাদের বিশ্বাস মানব সভ্যতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনি আরও অনেক কিছু জানেন এবং সেজন্য আমাদের সাহায্যও করতে পারেন। আমাদের পৃথিবীতে এখন ভয়ানক গোলযোগ চলছে। কৃত্রিম জন্মদান পদ্ধতিতে তৈরি প্রায় অমর মানব-মানবীর দল পৃথিবীর অবশিষ্ট সমস্ত রিসোর্স দখল করে নিয়েছে। এদিকে আপনি ভালোই জানেন যে ভবিষ্যতের পৃথিবীতে জল, বাতাস কিংবা প্রাকৃতিক খাদ্য সবই অপ্রতুল। আমাদের জন্মের বহুবছর আগেই প্রচুর মানুষ নানারকম মহামারীর প্রকোপে মারা গেছে, উষ্ণায়নের প্রভাবে জলের তলায় চলে গেছে বহু দেশ, ঘন বনাঞ্চল হয়ে গেছে মরুভূমি। পৃথিবীর আবহাওয়া অতি উষ্ণ। যার ফলে সবুজ লতাপাতা দিয়ে বানানো প্রাচীরঘেরা ঘরের মধ্যে থাকতে হয় দিনের বেলায়। খাদ্য তৈরি হয় গবেষণাগারে। প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরির জন্য কিছু গ্রিন হাউস আছে বটে তবে তা মহার্ঘ। পোকামাকড়ে ভরে গেছে পরিবেশ। সম্পূর্ণ অন্যরকমের এক ইকোসিস্টেম। এখনকার বেশিরভাগ জীব প্রজাতিই নেই ওই পৃথিবীর বুকে। যারা আছে ইভোলিউশনের ফলে ভিন্নরূপ গ্রহণ করেছে। যেসব মানুষেরা বেঁচে থাকতে পেরেছিল, তাদের হাত ধরেই বিজ্ঞানের আরও অগ্রগতি ঘটেছে। নতুন নতুন সারভাইভাল স্ট্রাটেজির আবিষ্কার করে দশকের পর দশক মানুষ পৃথিবীর বুকে টিকে থাকবার চেষ্টা করে গেছে। তার ফলেই কৃত্রিম উপায়ে জন্মদান করাতে হয়েছে শক্তিশালী প্রজাতির মানুষের যারা অমিত বলশালী। তারা আবহাওয়ার যে-কোনো বিরুদ্ধাচার সহ্য করতে পারে। আর বহু পুরুষ ধরে মানব প্রজাতি যে অমানবিক কর্মকাণ্ড করে পৃথিবীকে কলুষিত করেছে তার ফল ভোগ করছি আমরা, প্রকৃতিজাত সামান্য কিছু মানুষ, যারা আপনাদের প্রকৃত উত্তরসূরি। আমরা সামান্য কিছু প্রাকৃতিক মানুষই ওই পৃথিবীতে এখনও টিকে আছি। হ্যাঁ, বিজ্ঞানের তুমুল উন্নতি হয়েছে সেখানে, মানুষ সহজে মরে না, মরি না আমরাও। কারণ, উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞান। কিন্তু সব প্রাকৃতিক রিসোর্স এখন ওই কৃত্রিম মানুষদের হাতে। এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলিত প্রয়োগ বেশিরভাগটাই ওদের হাতে। আমরা অতিকষ্টে কিছুটা বজায় রাখতে পেরেছি। ওরা আমাদের কোণঠাসা করে ফেলেছে। ধীরে ধীরে মুছে ফেলতে চায় ওই পৃথিবী থেকে। বুঝতেই পারছেন, আমাদের পালিয়ে পালিয়ে বেড়াতে হচ্ছে ওই পৃথিবীর বুকে। এটাই হচ্ছে সমস্যা। তবে হ্যাঁ, বিজ্ঞানের প্রবল উন্নতির ফলে টাইম ট্রাভেল বিষয়টিকে কয়েক বছর আগেই বাস্তবায়িত করা সম্ভব হয়েছিল। আমাদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান শিকোবার পুর্বপুরুষের কাছে লুকিয়ে রাখা ছিল এই টেকনোলজি। কৃত্রিম মানুষের দল এখনও এর সন্ধান পায়নি। শিকোবাই বুদ্ধি দিল, এই টাইম মেশিনে চড়ে আপনার সঙ্গে দেখা করতে। আমাদের ধারণা ছিল আপনার কাছে অবশ্যই কিছু সমাধান সূত্র পাওয়া যাবে, যা দিয়ে আমরা ভবিষ্যৎ পৃথিবীর বুকে টিকে থাকতে পারব আরও কয়েক দশক।”
এতটা বলে চিন্তার তরঙ্গ থামাল যুবতীটি। বঙ্কুবাবু শিকোবাকে সনাক্ত করবার চেষ্টা করছিলেন। অমনি সেই মঙ্গোলয়েড চেহারার বলশালী যুবকটি হেসে বঙ্কুবাবুকে অভিবাদন জানাল। বঙ্কুবাবু আরও ভেবলে ভ হয়ে গেলেন। বাপ রে! এরা চিন্তা পড়তে পারে!
যুবকটি চিন্তসূত্র ছড়িয়ে জানাল, “বি-কিউব, আমাদের কাছে অতি উন্নত প্রযুক্তি আছে। আমাদের আর কষ্ট করে শব্দ বা বাক্যের প্রয়োগ করতে হয় না। শিখতেও হয় না। আমরা চিন্তার আদানপ্রদান করি অনায়াসে। আমাদের ধারণা ছিল আপনি সবই জানেন কারণ, আপনার বইতে এগুলো সব লেখা আছে।”
বঙ্কুবাবু অতি দ্বিধাজড়িত কণ্ঠে তৎক্ষণাৎ বলে ওঠেন, “না না, আমি তো এখনও কোনও বই লিখে উঠতে পারিনি।”
অমনি ছেলেটির চিন্তারেখা জানায়, “ওইটাই তো আমাদের সামান্য অঙ্কের ভুল হয়েছে বি-কিউব। আপনি বইটা লিখবেন দু-হাজার বত্রিশে আর আমরা এসে পড়েছি দু-হাজার তেইশের বি-কিউবের কাছে। সামান্য দুই সংখ্যার হেরফের। অবাক হচ্ছেন তো! যা আপনি এখনও লিখে উঠতে পারেননি এ-যাবৎ সেই বস্তু আপনার কাছে এল কী করে! এ হল গিয়ে কোয়ান্টাম ফিজিক্সের বুটস্ট্রাপ প্যারাডক্স যা কিনা এক আদি অনন্ত লুপকে নির্দেশ করে। স্রষ্টা তা সৃষ্টি করবার আগেই সৃষ্টি খুঁজে নিচ্ছে তার স্রষ্টাকে। বইটি লেখবার দশ বছর আগেই বইটি হাজির হয়েছে লেখকের কাছে। ভবিষ্যৎ থেকে কোনও তথ্য যখন অতীতে চলে আসে তাকে অন্টলজিক্যাল বা ইনফরমেশন প্যারাডক্সও বলা হয়। এটা একমাত্র টাইম ট্রাভেলের দ্বারাই সম্ভব।”
“কিন্তু আপনাদের তো আমি কোনও তথ্য দিয়েই সাহায্য করতে পারব না। ২০৩২-এর বঙ্কুবাবু তা করলেও করতে পারেন।” বঙ্কুবাবু অধোবদন হয়ে বললেন।
তা ঠিক। সোনালি চুল ছেলেটি তরঙ্গ ছড়ায়, “আমাদের এখানে থেকে যাওয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠছে তো আপনার মনে? তবে শুনুন। যেতে পারতাম আগেই, কিন্তু ঘটনাচক্রে আপনার শরীরের একটি তাৎক্ষণিক এক্স-রেতে আমাদের কাছে ধরা পড়েছিল, আপনার মাথায় বাসা বেঁধে আছে খুব বাজে ধরনের একটি ম্যালিগন্যান্ট টিউমার। যা থেকে আপনার মৃত্যু হবার সম্ভাবনা ৯৯%। আপনি যদি না-ই বাঁচেন, এই বইটাই-বা আপনি লিখবেন কী করে, আমাদের সমাধান সূত্র দেবেনই-বা কী করে! আপনাদের পৃথিবীতে এই অসুখের চিকিৎসা না থাকলেও, আমাদের পৃথিবীতে এর চিকিৎসা জলভাত। ন্যানোরোবটের সাহায্য নিয়ে আর উন্নতমানের সেল রি-জেনারেশন থেরাপি প্রয়োগ করে ওই টিউমারটা সবংশে বিনাশ করা হয়েছে এবং মস্তিষ্কের ওই অংশটি সম্পূর্ণ সুস্থ ও পূর্ণ করে দেওয়া হয়েছে। আপনি এখন বহু বহু বছর বাঁচবেন এবং প্রচুর বই লিখবেন। তার মধ্যে একটি বই আপনাকে দিয়ে গেলাম। আপনার চিকিৎসার জন্যই আমাদের এখানকার বসবাস একটু দীর্ঘায়িত হয়ে গেল। তবে আপনার বসতবাটি বড়ো নিরাপদ। কয়েকটা ঘর পরিচ্ছন্ন করে দিব্য থাকা গেছে। আপনাদের খাবারদাবারও অতি সুস্বাদু। আপনার প্রিয় সমস্ত খাবারের রেসিপি আমাদের কাছে আছে। আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা দু-হাজার বত্রিশের বি-কিউবের কাছে চললাম। বড়ো আশা করেই যাচ্ছি।” বলেই চার মূর্তি একে একে ঘরের বাইরে পা বাড়ায়।
“দাঁড়াও, দাঁড়াও! শুধু কি দিবে আর নিবে মিলাবে মিলিবে বলেই এতদিন থাকলে তোমরা? আমায় চিকিৎসা করে সুস্থ করলে?” বঙ্কুবাবু ক্ষীণ স্বরে বলে ওঠেন। তাঁর হুব্বাভাব এখনও কাটেনি।
অমনি হেসে উঠল ছেলেমেয়েগুলো। সোনলি-চুলো ছেলেটি চিন্তারেখায় বলে উঠল, “আপনার কী মনে হয়? একশো বছর পরের প্রাকৃতিক মানুষও কি আপনাদের বেশিরভাগের মতো স্বার্থপর? শুধু দেওয়া-নেওয়াটুকুই বোঝে? আপনার সুস্থ মস্তিষ্ককে এবার একটু ব্যায়াম করান, ভাবুন, ভাবুন, ভাবা প্র্যাকটিস করুন বি-কিউব।”
ছবি- মৌসুমী রায়