গল্প-আজি হতে শতবর্ষ পরে-বাসুদেব গুপ্ত-বর্ষা ২০২৪

golposhatabarsha

“আকাশে ট্রাফিক জ্যাম। কার নয় ফিউ। তবে কেন হল কারফিউ? দেখি একবার তবে ঠিক করে ভিউ।”

“আকাশে দাঁড়িয়ে থেকে ব্যাটারি ফুরোলে কী হবে? ফিউসসস?”

“হবেই না। ফুরোবেই না। ন্যানোনিউক ব্যাটারি লাগানো প্রায় সব Saxi-তে। একবছর পরে চার্জ দিলেই হবে।”

বলেই তুড়ুক দু-হাত দু-পা তুলে ব্যাঙের মতো এক লাফ দিয়েই নীচে দুম করে পড়ে গেল। পড়ে গম্ভীর গম্ভীর মুখ করে জিজ্ঞেস করল,  “নিউক জানো? নাকি তোমাদের সিলেবাস এখন শুধু তরোয়াল দিয়ে ঘাস কাটা শিখাচ্ছে?”

২১২৩ সাল থেকে আসা রোবট, যেমন পারে বোঝায় সুমনকে। সুমন ভাবার চেষ্টা করে আজি হতে শতবর্ষ পরে পৃথিবীটা কেমন হবে? ওর কিছুই মাথায় আসে না।

তুড়ুক ফার্স্ট জেন রোবট। নামটা দেওয়া সুমনের। আসল নাম বলে কিছু হয় নাকি রোবটের?

তুড়ুকের হাবভাব একটা ফাজিল ছেলের মতো। সে চোখ ঘোরাতে থাকল আর পিঁক পিঁক শব্দ করতে থাকল। রোবটদেরও বিবর্তন হয়। তুড়ুক সর্ববিদ্যাবিশারদ হলেও বাঁদরামিটা যায়নি।

এমিশ ভূতত্ত্ববিদ। তার কাজ হল এদিক সেদিক পাহাড়ে-কন্দরে মাটি-পাথর খুঁড়ে ইতিহাস বার করা। বার করে আনা তাদের সৃষ্টি, ধ্বংস ও বিবর্তনের ইতিহাস। এমিশের বৌ ইসাবেলা কাজ করে স্পেস-স্টেশন নিউ বস্টনে। যখন জল বাড়া শুরু হল, আগের বস্টন শহর মিশে গেল অতলান্তিকে। তারই নামে নাম এই নিউ বস্টন। নিউ বস্টন হল স্পেস ফ্যাক্টরি। এক কিমি ব্যাসের একটা চাকা। ফ্লাইং সসার বা ফ্লাইং সংসার দু-ই বলা যায়। সেখানে দিনরাত চলছে বড়ো বড়ো কারখানা, তৈরি হচ্ছে নানারকম ওষুধ, জিন কন্ককশান, ভ্যাকসিন থেকে শুরু করে অদ্ভুত সব কম্পাউন্ড আর এলয় যা কাজে লাগবে ভবিষ্যতের ইন্টার গ্যালাক্টিক অভিসন্ধানের জন্য। এছাড়া সোলার শক্তিকে ফোকাস করে পাঠানো হচ্ছে পৃথিবীর বড়ো বড়ো সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্রে। এক-একটি কেন্দ্রে এক দানবীয় ক্ষমতার ১০ গিগাওয়াট করে তৈরি হয় যাতে দিল্লি-মস্কোর মতো শতকের সবচেয়ে বড়ো মেট্রোপলিসের দিব্যি চলে যায়।

কিন্তু আসল কাহিনি কখনও প্রকাশ পায় না। যদিও কানাঘুষো হয়। সেগুলো শহরের বড়ো বড়ো বিলবোর্ড হ্যাক করে অনেকে দেখিয়েও দেয়। সে মাত্র ক’দিন। তারপরেই সেই হ্যাকারের বাড়ি ড্রোন গিয়ে চড়াও হয়ে ব্যস ফিনিশ।

নিউ বস্টন যেন এক বিশ্বব্যাপী সিসিটিভি। একদিন চিন যে পথ দেখিয়েছে, যে স্পাইং টেকনোলজি গড়ে তুলেছে দুই দশক ধরে, তারই চূড়ান্ত প্রডাক্ট এই স্পেস-আই। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ কী করছে, কী বলছে, কী ভাবছে সব এখানে ধরা পড়ছে, রেকর্ড হচ্ছে, এ.আই ধরে ফেলছে কার কখন রাগ হচ্ছে, পেট ব্যথা করছে, মাথায় দুষ্টু বুদ্ধি চাপছে সব। আর সেই তথ্য চলে যাচ্ছে ঠিক জায়গায়। এ.আই বিচার করছে ও বিপজ্জনক কেউ হলে তাকে এলিমিনেট করে দিচ্ছে। ইসাবেলা নিজের যোগ্যতাবলে এই স্পেস-আইর মেনটেনেন্স অফিসার। বছরে তার শুধু একমাস ছুটি। বাকিটা কাটে স্পেসে। পর্দায় চোখ রেখে। 

এদের একটি ছেলে। তার নাম আমারুক। রেড ইন্ডিয়ান জিন আছে বলে জন্মের সময়ে হসপিটালে এ.আই ওকে এই নাম দেয়। পালটানো যেত। কিন্তু নামটা ওর ছোট্টবেলা থেকে খুব পছন্দ। তাই রয়েই গেছে। আমারুক রোবট ইঞ্জিনিয়ার। রোবট ডিজাইন, উৎপাদন, সাপোর্ট আপগ্রেড নানা জিনিস ওর নিজের কোম্পানিতে হয়। ওর স্পেশালিটি হচ্ছে জোবট। জোকার রোবট—নানারকম স্ট্যান্ড-আপ কমেডি, জোকস থেকে ডিগবাজি, জিভ ভ্যাংচানো সবেতেই এরা খুব পটু। আমারুকের আর একটা দায়িত্ব হল রোবট দিয়ে গবেষণায় সাহায্য করা। যেমন আজ। জিপ্পি আর হিপ্পি দুটো জোবট নিয়ে বেরিয়েছে বাবার সঙ্গে। জোবটরা ফাজিল হলেও কিন্তু খুব বুদ্ধিমান। হাবভাব যেমন সার্কাসের জোকার যারা এ-ওর পিছনে ফাটাস ফটাস করে স্ল্যাপ-স্টিক দিয়ে পেটাত। ট্রাপিজ দেখাতে গিয়ে প্যান্ট খুলে আকাশ থেকে নেটের ওপর ধপাস করে পড়ত। সেইরকম।

এখন তো এ.আই সুপারভার্সে সার্কাস হয়। সেখানে শুধু হাতি-ঘোড়া নয়, ডাইনোসর নাচে, টি-রেক্স ভয় দেখায়। জোবটরা টেকনোলজি শেখে রোবটদের স্কুলে। তার সঙ্গে শেখে হিউম্যান সাইকোলজি। কীসে মানুষ মজা পায়, বুড়ো খড়ুসও শিশুর মতো হাততালি দিয়ে ওঠে—সব তাদের শিখতে হয়। কিন্তু যতই হোক রোবট তো। এ.আই-কে বলা হয় ৯৮% বিজ্ঞান। মাঝে মাঝে গোলমাল করেই ফেলে। 

ভারতের নাম এখন জম্বুদ্বীপ। পুরোনো নাম আবার ফিরে এসেছে। রাজার নাম কিন্তু রোমানদের মতো। গ্রুটিন প্রোটিনেক্স। তিনপুরুষের রাজত্ব। প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীর ঝুটঝামেলা তুলে আবার রাজা চালু হয়েছে। রাজা নিজের নাম রীতিমতো ঘোষণা করে পালটেছেন আলফালফা গ্রুটিন প্রোটিনেক্স। নাম থেকেই স্বাস্থ্য যেন ফেটে বেরোচ্ছে। সবসময় একটা লাঠির মতো, রাজদণ্ড নিয়ে ঘোরেন। আসলে সেটা একটা ভি.পি.এন। রাজা যা বলেন সব ফিল্টার হয়ে যায় যাতে কেউ সেটা আবার নেটে পোস্ট করে দিয়ে রাজাকে না বিভ্রাটে ফেলে।

রাজার আদেশ সবাই জাপানি খাবার খাবে, রোজ ব্যায়াম করবে বা দু-ঘণ্টা খেলবে। কাজ করা বা পড়াশোনার দরকার নেই। রোবটরা আছে কী জন্য? সবাই কি এত নিয়ম মেনে আর জাপানি খেয়ে থাকতে পারে? পুরোনো বই সব লাইব্রেরি, নেট থেকে বাদ। তবু মুখে মুখে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চিকেন বিরিয়ানি, ভাপা ইলিশ এসব অস্বাস্থ্যকর খাবারের গল্প চলতে থাকে। কেউ কেউ চেষ্টা করে লুকিয়ে বানাতে। কিন্তু তাদের অবলীলায় পাকড়ে ফেলে স্পেস-আই। তাদের পাঠিয়ে দেওয়া হয় মাঠে।

রোবট চাষিরাই চাষ করে, কারখানায় রোবট মজুররা জিনিস বানায়, স্টেজে রোবট গায়ক নেচে নেচে হিপহপ গায়। আর তাদের দেখাশোনার কাজে লাগে এসব অপরাধীরা। খুব ঝামেলার কাজ। রোবটদের বেশি বকাবকি করা যায় না। একটা ঘুরে ঘা দিলেই, ব্যস। বিচার চেয়ে লাভ নেই। মানুষ বিচারক প্রায় শেষ। রোবট আছে তো। ওরাই উকিল, ওরাই পুলিশ, ওরাই জাজ। 

দিকদিগন্তব্যাপী টম্যাটো কেচ-আপ প্লানটেশন। সাধারণ মানুষ গোটা টম্যাটো খায় না। ক্ষেত থেকে তুলেই স্কোয়াশারে ফেলে দেয় রোবটরা। টম্যাটোর সাইজও প্রকাণ্ড। এক-একটা প্রায় তরমুজের সাইজের। ২০৩৩ সালে ইনডিয়া আর মণিপুরের দশ বছরের যুদ্ধে প্রায় পাড়ার পেটোর মতো ন্যানো নিউক ব্যবহার হয়। আর সেই তেজস্ক্রিয়তায় শাপে বর। টম্যাটোগুলো তৃষ্ণার্তের মতো সেই রেডিয়েশন খায় আর বড়ো হতে থাকে। প্রফেসর যোশী নামকরা স্কুলে স্পিরিচুয়াল ব্রেন ম্যানেজমেন্ট পড়ান। তিনি বলে দিয়েছেন, এই রেডিয়েশন পবিত্র। ক্যানসার সারে। কিন্তু এমিশের কাজ বিপদসীমার ওপরে যদি কোনও টম্যাটোর খোঁজ পাওয়া যায় তো সঙ্গে সঙ্গে সাঁজ অ্যান্ড রিপোর্ট।

জিপ্পি আর হিপ্পি টগবগ টগবগ করতে করতে চলেছে আর জোক করে যাচ্ছে।

“ডিমরা কেন জোক করে না?”

“পারলি না তো? তাহলে নিজেকেই ক্র্যাক করতে হবে যে।”

জোকটা টোকা। তা এ.আই তো নিজে কিছু বানাতে পারে না। মানুষ যা করেছে সেগুলোই টুকলি করে চালায়।

হিপ্পি জোক করে নিজেই খুব হাসল। জিপ্পি হাসি পেলেই তিড়িংবিড়িং করে গঙ্গা ফড়িংয়ের মতো লাফায়। ওদের হাসি হা-হা হি-হি হে-হে ইচ্ছেমতো প্রোগ্রাম করা যায়। দুটো লাফ দিয়ে ওরা হঠাৎ কী একটা দেখে টম্যাটো ক্ষেতে উবু হয়ে বসে পড়ে। খবর খরচ আওয়াজ হয়। তারপর দুজনে ধরাধরি করে তুলে আনে একটা আমাজনের পার্সেলের মতো বাক্স। সেটা খুললে আর একটা বেরোয়। তার ভিতর থেকে আর একটা। শেষে বেরোয় বাবল পেপারে মোড়া চতুর্দিক স্টেপল করা একটা ডায়েরি। রোবটরা জন্মে ডায়েরি দেখেনি। কাচিং ফ্লিং ফিচিং ক্লিং অরিজিনাল রোবট মেশিন ভাষায় কথা বলে সেটা তুলে দেয় আমারুকের হাতে। এমিশ দৌড়ে এসে কেড়ে নেয় নিজের অ্যান্টি তেজস্ক্রিয় গ্লাভস পরা হাতে।—“আমায় দাও। কেউ ধরবে না। আগে আমি স্যানিটাইজ করব, তারপর।”

পরীক্ষা করে দেখা গেল পার্সেলটা নিরীহ। ডায়েরিটি কোন অজানা ভাষায় লেখা।

আমারুক বুকপকেট থেকে একটা স্ক্যানার বার করে। রোবটদের শেখাবার জন্য ওকে অনেক ভাষা নিয়ে কাজ করতে হয়। নিজে না জানলেও। স্ক্যানারটা বিপ বিপ করে উঠে ডিসপ্লেতে দেখায় ভাষার নাম

ভাষা বেঙ্গলি। অধুনা লুপ্ত।

সুমন পাল। ক্লাস ৮। নবীনপুর। সরলাবালা বিদ্যালয় ২০২৩।

“বাবা, আমি এটা নিয়ে একটু দেখতে চাই। ইন্টারেস্টিং লাগছে। আমায় দেবে?”

“নে, কিন্তু জিম করার কথা ভুলে যাস না। যা। নিয়ে যা।”

বড়ো হয়ে গেলেও আমারুক বাবার কথা খুব মেনে চলে। চটপট জিমে গিয়ে ৫০০ ক্যালরি ঝরিয়ে ফেলল। এই জিমটা রিয়েল, ভার্চুয়াল নয়। ডাম্বেল, কেটলবেল, ট্রেডমিল সব একশো বছর আগের মতো এখনও। জিম করে অটো শাওয়ারে একটা কুল শাওয়ার ঠিক পাঁচ মিনিট সেট করে দিয়ে গুনগুন করে গানও এসে গেল—‘যদি না করো জিম, পাবে ঘোড়ার ডিম।’

এরপর সেই স্বাস্থ্যকর অখাদ্য। সি উইড দিয়ে রান্না মিসো স্যুপ। খাবার কিনতে হয় না। ফোনে একবার বললেই কিছু পরে ড্রোন এসে খাবারটা ডেলিভারি করে যাবে চিমনি দিয়ে ঢুকে। শোনা যায় একশো বছর আগে, ওই চিমনি দিয়ে নাকি সান্টা নামে এক উইআর্ড চরিত্র এসে মোজার মধ্যে খেলনা দিয়ে যেত। এখন সে আসে না আর। চিমনি দিয়ে খাবার আসে চটজলদি। খাওয়া শেষ করে আমারুক পড়ল ডায়েরিটা নিয়ে।

১৩ বছরের এক বালকের ডায়েরি। তার নাম সুমন পাল।

প্রথম দুটো পাতা খাঁ খাঁ করছে সাদা। তারপরের পাতায় একটা রকেট ও আর একটা ফ্লাইং সসার। এর পর থেকে পাতায় পাতায় রোজনামচা। ডায়েরি। ১০০ পাতায় শেষ। সেখানে তারিখ ৮ জুলাই ২০২৩। ইংলিশে লেখা, মাই লেটার টু দি ফিউচার।

এমিশ আজকের মতো রেডিও-অ্যাক্টিভ টম্যাটো খোঁজা শেষ করে ঘরে একটা লেমন জুস নিয়ে বসল। আমারুক গভীরভাবে ডায়েরিটা পড়ছে দেখে বিরক্ত করল না। ওর ঘরে শুধু গ্যাজেট আর গ্যাজেট। থ্রি-ডি প্রিন্টার থেকে বুড়ো রুগ্ন সব রোবট ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কিন্তু এমিশের যেন ওকে এখনই দরকার। ও খুব উত্তেজিত। মাটি খুঁড়তে গিয়ে একটা জিনিস পাওয়া গেছে যেটা স্ক্যান করে দেখতে হবে। যেটা পাওয়া গেছে যেটা পুরোনো স্মার্ট ফোনের মতো দেখতে।

আমারুক চোখ তুলে দেখে বাবা দাঁড়িয়ে আছে ওই একশো বছরের পুরোনো একটা কমিউনিকেটর  নিয়ে।

“এটা ডায়েরিটার কাছাকাছিই পাওয়া গেল। দেখ কিছু ইন্টারেস্টিং পাস কি না।” এমিশ এমনভাব করল যে ওর খুব একটা কৌতূহল নেই।

আমারুক মনে মনে হাসল। বাবা এরকমই। অবশ্য সবাই আজকাল দোলাচলে ভুগছে। বেশিরভাগ লোক নিউক ওয়ার ও এপোফিসের ধাক্কায় ধ্বংস হয়ে উড়ে গেছে। যারা আছে তারা বুঝতে পারে না কী করা যায়। সবাই আমারুক নয়। একসঙ্গে শিল্পবোধ ও ইঞ্জিনিয়ারিং না জানলে ওই বসে খাওয়ার দলে চলে যাবে। ১০০ বছর আগে জাপানে ব্যাপারটা শুরু হয়। হিকিকোমরি। সবাই ঘরেই বসে থাকত। বেরোত না, খেলত না, কাউকে ফোন করত না, কোনও কাজ করত না, শুধু খাও আর চুপচাপ বসে থাকো। গ্রুটিন জোর করে জিম না করালে সবাই হিকিকোমরি হয়ে যেত এতদিনে।

“অনেকদিন মাটির নীচে ছিল। এর আর কি কিছু অবশিষ্ট আছে?” এমিশ উদ্বিগ্ন। আবিষ্কারটা কাজে দেবে তো?

“দেখছি ন্যানো ওয়াশার চালিয়ে।”

এই গ্যাজেটটাও আমারুকের বানানো।

২৪ ঘণ্টা ঘেঁটে ব্যাপারটা একটু পদে এল। ফোনের মধ্যে প্রায় গুপ্তধন। ১৩ বছরের একটা চনমনে কিশোরের ঝকঝকে সেলফি সব। একটা দাঁত একটু ভাঙা। আর চোখের কোলে খানিকটা ফোলা কালো দাগ নজরে পড়ল। কোথাও জোর ধাক্কা লেগেছিল। কিন্তু হাসিটা অমলিন উজ্জ্বল।

এর পরে চোখ টানল একটা বড়ো পুরোনো ইটের বাড়ি আর তার গেটে একটা সাইনবোর্ড। মনে হয় স্কুল। এক বৃদ্ধা। লোল মুখের ও গলার চামড়া মনে হয় ফ্ল্যাট ব্রেড বেলছে একটা কাঠের রোলিং পিন দিয়ে। একটা অযত্নের বাগান। ঝোপ। একদল ১৩-১৪ বছরের ছেলে আকাশে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে উল্লাস করছে। একটা ছবিতে একটা ঝোপের আড়ালে আলো-আঁধারি, সেখানে কিছু লোক জটলা করছে। মনে হয় লুকিয়ে তোলা ছবি। ওরা কি ডাকাত?

সুমনের জন্য চিন্তায় পড়ে যাচ্ছিল আমারুক। তারপর ওর হাসি পেল। ১০০ বছর আগের কথা। তারপর দুনিয়াটার চেহারাটাই বদলে গেছে। আর আমি ভাবছি ডাকাতগুলো যদি দেখে ফেলে কী হবে।

পরের ছবিটা দেখে কিন্তু আমারুকের চক্ষু স্থির নিঃস্পন্দ হয়ে গেল।

একটা রোবট। টেবিলের ওপর বসে হাত-পা দোলাচ্ছে। এক সেকেন্ড লাগল তাকে চিনতে। তিন মাস আগে আমারুকের একটা রোবট তলিয়ে যায় একটা গহ্বরে। অ্যাস্টরয়েড শাওয়ার হয়েছিল ২০৫০ সালে। তখন সারা গ্রহেই চাঁদের মতো অনেক ক্রেটার তৈরি হয়। কোনো-কোনোটা এত গভীর যে কেউ সাহস করে এক্সপ্লোর করেও দেখে না। সেই ক্রেটারটা আবার বেশিরকম তেজস্ক্রিয়। এমিশ আর আমারুক রেকি করতে গিয়েছিল চার রোবট নিয়ে। গায়ে মার্ক করে লেখা এ এ। এমিশ আর আমারুক জয়েন্ট কোম্পানির লোগো।

১০০ বছর আগে এক কিশোরের স্মার্ট ফোনে তার তিন মাস আগে হারিয়ে যাওয়া রোবটের ছবি। এটা কী করে হয়? তাড়াতাড়ি ডায়েরিটা ও ইউনিভার্সাল রিডারে ফিড করে পড়তে শুরু করে। উত্তেজনায় হাত-পা কাঁপছে। কিছু ক্লু পাওয়া যাবে ওই ডায়েরিতে?

ডায়েরি, ৮ই জুন।

আজ আমার অঙ্ক টিচার খুব বকল। বাবাকেও ডেকে বলেছে। বাবা বলল, এই সামান্য অঙ্ক না করতে পারলে কি তুই বড়ো হয়ে রাজনৈতিক গুণ্ডা হবি? আমার দুঃখ হয়েছে। আড়বাঁশীটা নিয়ে সিতারাতে চলে গেলাম। সিতারা আমাদের নদী। তার ওপর একটা ভাঙা নৌকো, সেখানে বসে খানিকটা বাজালাম। ভালো লাগছে না। সুরও লাগছে না যেন। ব্যাজার মুখে হাঁটছি নদীর ধার দিয়ে। আবছা অন্ধকার। হঠাৎ কী যে হল, চারপাশটা বোঁ করে ঘুরে গেল। আমি গিয়ে পড়লাম একটা বদখত গর্তে। সাধের বাঁশি গেঁথে গেল কাদায়। গড়িয়ে গড়িয়ে অনেকদূর গেলাম, তারপর বোধহয় অজ্ঞান।

হঠাৎ চোখ খুলে দেখি নদীর ধারে একটা ঢিবির পাশে আমি আর মাথার উপর চাঁদ। কোনোমতে উঠে বসলাম। কে যেন কী বলল। কই, কেউ কোত্থাও নেই। ভালো করে চোখটা জামার কোণ দিয়ে মুছেই চমকে গেছি একেবারে। একটা তিন ফুট লম্বা পুতুল আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা ১৮০ ডিগ্রি ঘুরিয়ে চোখ নাচিয়ে বলল, “২ আর ২ কত?”

আমি খেপে গিয়ে বললাম, “এ তো সবাই জানে, চার। আমি অত কাঁচা নই।”

“ধুর তুমি কিছু জানো না। ফেল কি এমনি এমনি করো! ২ আর ২ হবে বাইশ। বা হবে জিরো। তুমি ২-গুলো মাথায় মাখবে না রান্না করবে—সব তোমার হাতে।” বলেই সে খিক খিক করে হেসেই বাঁচে না। সবচেয়ে বিরক্ত লাগল ওই মাথা ঘোরানো আর বিপ বিপ করা এক মিনিট ধরে।

আমারুকের মাথায় কিচ্ছু ঢুকছে না। আরও পড়তে থাকে। বাবাকে ডাকবে? না থাক, ঘাবড়ে যাবে।

১৫ই জুন।

সাতদিন হল আমি তুড়ুককে পেয়েছি। তুড়ুক যে রোবট এটা বুঝতে প্রবলেম নেই। আমরা অনেক রোবট খেলনা দেখেছি। ইউটিউবে রোবট কুকুর তাড়া করতে দেখেছি, এমনকি নাচতেও দেখেছি। আমার দাদা চ্যাটজিপিটিকে জিজ্ঞেস করে করে ইংলিশ রচনা লিখে ক্লাসে খুব নাম করেছে। কিন্তু ওগুলো যাই হোক না কেন, প্রোগ্রাম ছাড়া আর কী? তুড়ুক কিন্তু একেবারে মানুষের মতো জীবন্ত। তবে মানুষের থেকে অনেক ভালো। তুড়ুক সারাক্ষণ জোকস করছে আমার গোমড়া মুখে হাসি আনার জন্য। কিন্তু সারাক্ষণ ও আমাকে ম্যাথস শিখিয়ে যাচ্ছে আড়ালে। যখন সবাই ঘুমোতে চায় ও নিঃশব্দে বেরিয়ে আসে আমার আলমারি থেকে। সাতদিনে আমাকে ও ক্লাসের অ্যালজেব্রা শেষ করে দিল। আমি জানতে চাইলাম, “এত কোচ করছ, বেতন নেবে না?”

ও খুব বড়োর মতো মুখ করে বলল, “তুমিই আমার পরীক্ষা। তোমার ফল ভালো হলেই আমিও পাস।”

ও, বলা হয়নি, তুড়ুক সাতটা ভাষায় কথা বলতে পারে। কিন্তু বাংলা বলে কিছু ওর জানা নেই। আশ্চর্য লাগল শুনে। ও হিন্দি বলে তাই আমারও হিন্দিটা বেশ সড়গড় হয়ে যাচ্ছে। ওর কথা শুনে আমারও মনে হয়েছে আমাকে ভালো করতেই হবে। আমি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করলাম আজ।

২২ জুন।

একটা গোলমাল বেধেছে। মা ওকে দেখে ফেলেছে। মা ভেবেছে ও একটা খেলনা। আমার নানারকম ভাঙাচোরা ফোন, কম্পিউটারের পার্ট, হার্ড ডিস্ক এসব জমানোর অভ্যেস আছে। মার এটাকে দেখে মনে হয়েছে ধুলো ঝেড়ে বসার ঘরে রাখলে মানাবে। তুড়ুকও হঠাৎ উৎসাহ পেয়ে ‘নমস্তে মৌসি’ বলাতে মা তো খুব খুশি। এখন তুড়ুক দুটো সোফার মাঝে বসে আছে গুরুর মতো। যত রাজ্যের লোক আসছে আর প্রশ্ন করছে। এরা বুড়ো মানুষজন, চ্যাটজিপিটি জানে না। তাই অবাক হয়ে যাচ্ছে খুব। কিন্তু আমার পড়াশোনা লাটে। আমি চুপিচুপি জিজ্ঞেস করাতে ও গম্ভীর গুরুদেবের মতো আমাকেও জ্ঞান দিয়ে দিল—“সব কি আমি শেখাব বেটা? অভি প্রাকটিস করো দিনরাত। ফল জরুর মিলেগা।”

দূর ছাই।

২৫ জুন।

আজকে বাড়িতে পুলিশ এল তুড়ুককে নিয়ে যেতে। কালো পোশাক পরা কমান্ডো, হাতে ইনসাস। মুখ ভাবলেশহীন। বাবার সঙ্গে কীসব কথা হল। বাবা পরে বলল, ওরা নাকি সন্দেহ করছে তুড়ুক প্রতিবেশী দেশের স্পাই। নাশকতা করার জন্য রাতের অন্ধকারে ওকে ড্রোন এসে রেখে গেছে।

তারপর আমার ডাক পড়ল। আমাকে দেখে ওদের নেহাত পুঁচকে মনে হল বলে সামান্য পুছতাছ করল।—“ইয়ে মিলা কহাঁ? কুছ দেশদ্রোহী বাত বোলা তুমকো?”

আমি সত্যি কথাই বললাম। আমাকে অঙ্ক শেখাত আর জোক শোনাত। জোক শুনে অফিসারের ভুরু কুঁচকে গেল। তুড়ুক এতক্ষণ চুপ করে ছিল। ভাবগতিক দেখে সে দুমদাম তিনটে জোক বলল। কেউ হাসল না। তখন তুড়ুক বলল, “আমি কিন্তু দেশপ্রেমিক রোবট।” বলে গান গেয়ে উঠল—সারে জহাঁসে অচ্ছা।

তাতে অফিসার আরও গম্ভীর হয়ে বলল, “ইয়ে গানা অউর গীতিকার তো ব্যান হো চুকে হ্যায়। আমরা একে সিজ করলাম। হাবিলদার, সিজার লিস্ট বানাও।”

তুড়ুক পিঁপিঁ আওয়াজ করে হাত-পা ছুড়ে যাব না যাব না বলে একটু ঘ্যানঘ্যান করতে দুজন সিপাই ওকে ধরতে যেতেই এক ভয়ংকর আশ্চর্য ব্যাপার হল। যারা ট্রানসফর্মার দেখেছ, তারা আন্দাজ করতে পারবে। হঠাৎ চ্যাঁ চোঁ ঘটাং ছটাং আওয়াজ করে তুড়ুকর শরীরটা হয়ে গেল একটা সত্যি ড্রোন। আর তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল চারটে ব্যারেল। সেখান থেকে একটা করে ফায়ার হল এক এক পুলিশের দিকে। আর বিশাল চেহারার লোকগুলো তালপাতার সেপাইর মতো গড়িয়ে পড়ে গেল মাটিতে। তারপর আবার সেইসব গিয়ার-মোটর এসবের আওয়াজ হল পর যে-কে-সেই তুড়ুক।

আতঙ্কে চোখ বড়ো করে দেখছিল আমার দিদি। কিন্তু ও খুব সাহসী। ও বলে ওর আইডল মাতঙ্গিনী হাজরা। ভয় ঝেড়ে ফেলে দৌড়ে গেল পুলিশগুলোর দিকে। নাকের নীচে হাত রেখে পরীক্ষা করল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“কী! সব শেষ?” বাবার গলা দিয়ে একটা আর্ত স্বর বেরিয়ে এল।

“নাহ্‌, ওরা দিব্যি বেঁচে আছে। একটু স্টানগান দিয়ে স্টান করে দিয়েছি।” বলে হি হি করে তুড়ুক হেসে উঠে বলল, “কেমন পান দিলাম বলো তো।”

আমাদের কারও ভয়ে গলা দিয়ে কোনও আওয়াজ বেরোচ্ছ না। তখন তুড়ুক ফেলুদার মতো বা বলা যায় মিতিনমাসির মতো দু-বার পায়চারি করে আমাদের রহস্যভেদ করে শোনাল। মাথামুণ্ডু বুঝলাম না। তবু লিখে রাখছি এই ডায়েরিতে।

“আমি একশো বছর ভবিষ্যৎ থেকে নেহাত স্পেস টাইমের ওয়ার্ম হোলে পড়ে গিয়ে এখানে এসে পড়েছি। আমি দেশদ্রোহী স্পাই এসব কিছু নই। নেহাত একটা রোবট। আমার টাইমে প্রায় সব কাজই আমরা করি। কারখানা চালাই, চাষ করি, গান লিখি, ছবি আঁকি, রান্না করি। সব। মানুষেরা বিশ্রাম নেয়। গান শোনে। ভিডিও খেলে। সিরিয়াল দেখে। ফোনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে। হবি নিয়ে ব্যস্ত থাকে।”

“বাহ্‌, দারুণ তো! এটাই তো আমরা চাই। এত কষ্ট খাটুনি আর পোষায় না।” আমাদের কাজের মাসি খুব উৎসাহ পেয়ে গেল।

“হ্যাঁ, তবে সবাইকে ব্যায়াম করতে হয়। রাজার আদেশ। আমার মালিকের নাম আমারুক। সে যখন এই টুবলু মানে শ্রী সুমন পালের বয়সি, তখনই সে আমাকে বানায়। রোবট বানানো ওর হবি ও পেশা। টুবলুকে দেখে আমার ওর কথা মনে হত। মনখারাপ হত।”

“রোবটের আবার মনখারাপ হয় নাকি?”

“আগে হত না। আমারুক ফিলিং মডিউলটা লাগাবার ক’দিন পরেই আমার এই অ্যাকসিডেন্ট। কিন্তু এই পুলিশবাবুরা জ্ঞান ফিরলে তো আমাকে ছাড়বে না। আমি তো আর ফিরে যেতে পারব না। এখানেই আমার শেষ। টুবলু, তোমাকে ডায়েরি লিখতে শিখিয়েছি। তুমি আমার সব কথা লিখে রেখেছ। আজকের কথাও লিখো। আর ডায়েরিটা কোথাও যত্ন করে রেখে দিও। যদি ভবিষ্যতের মানুষ জানতে পারে এক হতভাগা রোবটের গল্প। আমি এখন সেলফ ডেসট্রাক্ট করব। বাই। তোমাদের জীবন সুখের হোক।” বলে তুড়ুক মাথার পেছনে হাত দিয়ে কী একটা টিপল।

আমি ‘না তুড়ুক তুমি,’ বলে চিৎকার করেই দেখলাম তিন ফুটের রোবট এক বস্তা লোহালক্কড়ের মতো মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। সব শেষ।

৬ জুলাই।

তুড়ুক নেই। কিন্তু দুই দেশে যুদ্ধ বেধে গেছে তুড়ুককে নিয়ে। ঠিক ভোট আসার আগে এমন যুদ্ধ হয়, বাবা বলল। তুড়ুকর মতো নাকি স্পাই চারদিকে অনুপ্রবেশ করেছে, এই খবর টিভিতে রোজ দেখাচ্ছ। সন্ধেবেলা খুব চেঁচামেচি হচ্ছে। এর মধ্যেই দুই দেশ বেশ কিছু বম্বিং করেছে। কী হবে জানি না। ভয় করছে।

৮ জুলাই।

আমরা এবার শেষ হয়ে যাব। কাল রাতে অ্যাটম বোমা ফেলেছে দুই দেশই। আমার ডায়েরি এই শেষ। আমি এটাকে ভালো করে মুড়ে যেখানে তুড়ুক এসেছিল সেখানে পুঁতে রাখব। পৃথিবী, বিদায়। অনেক কিছু করব ভেবেছিলাম। কিছু হল না। যারা বেঁচে থাকবে তাদের জন্য শুভেচ্ছা। তারা যেন সত্যিকার মানুষ হয়। আমাকে তুড়ুক শিখিয়েছিল। রোবটের কাছে মানুষ হবার শিক্ষা। তোমরা যারা পড়ছ হেসে ফেলছ না তো?

ডায়েরি এখানেই শেষ। মনে হয় ডায়েরিটা রাখার সঙ্গে ওর ফোনটিও পুঁতে রেখেছিল।

আমারুক আর এমিশের দীর্ঘশ্বাস পড়ল।

“আচ্ছা, আবার আমরা ওই ওয়ার্ম-হোলটা খুঁজে যদি চলে যাই, যুদ্ধটা থামাতে পারব। আর আমাদের অর্ধেক ধ্বংস হওয়া আধখাওয়া আপেলের মতো পৃথিবীতে বাস করতে হবে না।”

ওরা দুজনেই জানে অতীতকে পালটানো যায় না। সময় থাকলে শুভবুদ্ধি না হলে আমাদের সর্বনাশ কে আটকাবে?

বিপ বিপ আওয়াজ হয়। জিম করতে হবে। ওদের রাজাও যে একটা রোবট। ফাঁকি চলবে না।

ছবি- মৌসুমী রায়

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply