
এক দারুণ শীতের রাতে, এক ঘন পাইন বনের মধ্যে দিয়ে দুই গরিব কাঠুরে হেঁটে চলেছিল। চারদিকে শুধু বরফ আর বরফ, মাটির ওপর সাদা পুরু বরফের চাদর, পাইন গাছের ডালপালা থেকে বরফ ঝুলছে। পাহাড়ি ঝরনাটাও জমে বরফ হয়ে গেছে। চারপাশ এত ঠান্ডা যে পশুপাখিরাও বুঝে উঠতে পারছে না কী করবে।
“উফ্ফ্,” দুই পায়ের মাঝখানে ঝোপের মধ্যে দিয়ে লেজ গুটিয়ে যেতে যেতে গরগর করে উঠল নেকড়েটা, “কি বিষাক্ত ঠান্ডা রে বাবা! সরকার এ ব্যাপারে কোন ব্যবস্থা নেয় না কেন?”
“টীঁ ! টীঁ! টীঁ!,” ডেকে উঠল সবুজ বদরি পাখিটা, “বুড়ি পৃথিবীর মৃত্যু হয়েছে, তাই তাকে সাদা চাদরে মুড়ে দেওয়া হয়েছে।”
“আসলে পৃথিবীর বিয়ে হবে, তাই তাকে সাদা বিয়ের পোশাক পরিয়ে কনের সাজে সাজানো হয়েছে,” ঘুঘুপাখি দুটো পরস্পরকে বলল। যদিও ঠান্ডায় তাদের গোলাপি পা-গুলো জমে গেছে, তবু পরিস্থিতিটাকে একটু আবেগমথিত করে দেখাটা যেন তাদের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে বলে তাদের মনে হচ্ছে।
“যত্ত সব বাজে কথা!” রেগে বলল নেকড়েটা, “আমি বলছি এটা পুরোটাই সরকারের দোষ, আর তোমরা যদি আমার কথা না মানো, তাহলে আমি তোমাদের খেয়ে ফেলব।” নেকড়েটার বড়ো বাস্তববাদী মন, তর্ক করার সামান্য সুযোগও সে কখনও ছাড়ে না।
“আমার কথা যদি শোন,” বলে উঠল কাঠঠোকরাটা, যে আবার জন্ম দার্শনিক, “কী হচ্ছে কেন হচ্ছে তার ব্যাখ্যায় আমার বিন্দুমাত্র কিছু এসে যায় না। যেটা যেমন সেটা তেমন, ব্যস, আর এখন এখানে মারাত্মক ঠান্ডা পড়েছে।”
সত্যিই মারাত্মক ঠান্ডা। লম্বা ফার গাছের কোটরে যে কাঠবেড়ালিগুলো থাকে, তারাও এ ওর নাকে নাক ঘষে ঘষে নিজেদের গরম রাখার চেষ্টা করছে।
খরগোশগুলো গুটিসুটি মেরে সেই যে তাদের গর্তের মধ্যে সেঁধিয়েছে, আর বেরোবার নামগন্ধ করছে না।
এই ঠান্ডাকে উপভোগ করছে একমাত্র বড়ো হুতুম প্যাঁচাগুলো। তাদের ডানার ওপর শিশির জমে বরফ হয়ে ডানা ভারি করে দিচ্ছে, কিন্তু তাতে তাদের কিছু এসে যাচ্ছে না। তারা তাদের হলুদ হলুদ গোল গোল চোখ ঘুরিয়ে এদিক ওদিক দেখছে আর জঙ্গলের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে পরস্পরকে ডাক পাঠাচ্ছে, “টু-হুইট ! টু-হূ ! টু-হুইট! টু-হূ ! কি দারুণ আবহাওয়া আজকে!”
ওদিকে সেই দুই গরিব কাঠুরে হেঁটেই চলেছে, হেঁটেই চলেছে, হাতে ফুঁ দিয়ে কোনক্রমে হাত গরম করতে করতে, লোহা বাঁধানো বড়ো বড়ো বুটজুতো দিয়ে ঝুরো বরফ ভাঙতে ভাঙতে এগিয়ে চলেছে, পথ যেন আর শেষ হয় না। একবার তো তারা একটা গভীর বরফের ফাটলের মধ্যে পড়েও গেল, আর তার থেকে যখন বেরিয়ে এল, তখন সারা গায়ে বরফ লেগে ময়দাকলের শ্রমিকদের মতো তাদের গা একদম সাদা হয়ে গেছে। আর একবার যেখানে একটা জলা জমে বরফ হয়ে গেছে, সেই শক্ত পিছল বরফে পা পিছলে তারা পড়ে গেল, তাদের কাঁধের কাঠের বোঝা থেকে ছোটো ছোটো কাঠের টুকরো ছড়িয়ে পড়ল এদিকে ওদিকে, অনেক কষ্টে সেগুলোকে কুড়িয়ে তারা আবার গাঁঠরি বাঁধল শক্ত করে। আর তারপর একবার তাদের মনে হল তারা পথ হারিয়ে ফেলেছে – ভেবেই তাদের প্রাণ ঠান্ডা হয়ে গেল, কারণ তারা খুব ভালো করে জানে যে, বরফে যারা ঘুমোয়, বরফ তাদের প্রতি কোন মায়াদয়া দেখায় না। কিন্তু তবু সন্ত মার্টিনের ওপর তাদের ভরসা ছিল, তিনি সব পথচারীদের ওপর নজর রাখেন। এই বিশ্বাসে ভর করে আবার তারা চলতে শুরু করল, ক্লান্ত পদক্ষেপে। অবশেষে তারা এসে পৌঁছাল জঙ্গলের প্রান্তে, যেখান থেকে নীচের উপত্যকায় দূরে তাদের গ্রামের আলো দেখা যায়।
তখন তাদের এত আনন্দ হল যে তারা প্রাণ খুলে উচ্চস্বরে হেসে উঠল, আর তাদের মনে হতে লাগল পৃথিবীটা যেন রূপোর আর চাঁদটা যেন সোনার তৈরি ফুল।
কিন্তু তাদের এ আনন্দ বেশিক্ষণ রইল না, যেই মনে পড়ল তারা কত গরিব, আবার তাদের মন খারাপ হয়ে গেল। তাদের মধ্যে একজন বলল, “কেন যে আমরা আনন্দ করি? জীবনটা তো বড়োলোকদের, আমাদের মতো লোকেদের জন্য নয়। এর চেয়ে ভালো হত যদি আমরা জঙ্গলের মধ্যে ঠান্ডায় বা কোনও জন্তুর হাতে মারা পড়তাম।”
“সত্যিই,” বলল তার সঙ্গী, “সারা পৃথিবী জুড়েই এমন অবিচার, কেউ কেউ এত এত পায়, আর বাকিরা প্রায় কিছুই পায় না। একমাত্র দুঃখ ছাড়া আর কিছুই সমান ভাগে ভাগ হয় না।” এভাবে যখন তারা নিজেদের দুঃখের কথা আলোচনা করছে, তখন একটা অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল। আকাশ থেকে একটা দারুণ সুন্দর ঝকঝকে তারা খসল। সব তারাকে পেছনে ফেলে রেখে আকাশের এক প্রান্ত দিয়ে সেই তারাটা নেমে এসে যেন কাছেই একগোছা উইলো গাছের পেছনে গিয়ে পড়ল।
“আরে! যে পাবে সে তো সোনা পাবে,” বলেই তারা ছুট লাগাল, সোনা পাওয়ার জন্য এমন আকুল তারা।
একজন তো এত জোরে দৌড়ল যে তার সঙ্গীকে পেছনে ফেলে এগিয়েও গেল, উইলো গাছের ঝাড় ঠেলে উল্টোদিকে বেরিয়ে পড়ে দেখল, সাদা ধবধবে বরফের ওপর সত্যিই সোনার মতো কিছু একটা পড়ে আছে। সে তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে গেল, ঝুঁকে পড়ে হাত রাখল সেটার ওপর, সেটা অদ্ভুত সুন্দর তারার নক্সা আঁকা পাতলা সোনালি চাদরে মোড়া কিছু একটা, সেই সোনালি চাদরটা আবার অনেকগুলো পরতে পরতে জড়ানো। সে চীৎকার করে তার সঙ্গীকে ডেকে বলল সে সেই আকাশ থেকে নেমে আসা ধনসম্পদের সন্ধান পেয়েছে। তারপর তার সঙ্গী তার কাছে এসে পৌঁছলে তারা দুজন বরফের ওপর বসে আস্তে আস্তে চাদরের বাঁধন খুলতে লাগল, তার ভেতরে থাকা সোনা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নেওয়ার জন্য। কিন্তু হায়! তার মধ্যে না ছিল সোনা, না ছিল রূপো, না ছিল দামি অন্য কিছু, ছিল কেবল একটা ছোট্ট ঘুমন্ত শিশু।
একজন আরেকজনকে বলল, “আমাদের সব আশায় একেবারে জল পড়ে গেল গো! আমাদের কপালটাই খারাপ! একটা বাচ্চাকে নিয়ে গিয়ে কি লাভ আছে? আমরা এমনিতেই গরিব আর আমাদের ঘরে তো বাচ্চার অভাব নেই, শুধু শুধু তাদের ভাগের খাবার আর কাউকে দিয়ে লাভ কি? একে এখানেই রেখে চলে যাই চল।”
কিন্তু অন্যজন উত্তরে বলল, “কিন্তু সেটা তো খুব অধর্ম হবে! এই বরফের মধ্যে এই বাচ্চাকে ফেলে রেখে যাওয়ার অর্থ তাকে সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া! আমিও তোমার মতোই গরিব আর আমার ঘরেও অনেকগুলো ছানাপোনা আছে, তবু আমি এই বাচ্চাকে ঘরে নিয়ে যাব, আমার বউ ওর যত্ন নেবে।”
এই বলে সে সেই শিশুকে পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে, সোনালি চাদরটা তার গায়ে বেশ ভালো করে জড়িয়ে দিল যাতে তার ঠান্ডা না লাগে, আর তারপর গ্রামের দিকে চলতে শুরু করল। তার সঙ্গী একই সঙ্গে তার নরম মন আর বোকামির বহর দেখে অবাক হয়ে গেল।
গ্রামে এসে তার সঙ্গী তাকে বলল, “তুমি তো বাচ্চাটাকে নিলে, তাহলে ওর সোনালি চাদরটা আমাকে দাও, আমরা তো যা পাব ভাগ করে নেওয়ার কথা ছিল।”
কিন্তু সে রাজি হল না, বলল, “চাদরটা না তোমার না আমার, এটা কেবলমাত্র ঐ বাচ্চাটার,” বলেই তাকে বিদায় জানিয়ে নিজের বাড়ির দরজায় গিয়ে কড়া নাড়ল। তার বউ যখন দরজা খুলে দেখল যে বর নিরাপদে বাড়ি ফিরে এসেছে, তখন তাকে জড়িয়ে ধরে চুম্বন করে, তার পিঠ থেকে কাঠের বোঝাটা নামিয়ে নিল, তারপর তার জুতো থেকে বরফের কুচি ঝেড়ে দিয়ে তাকে সাদরে ঘরে নিয়ে যেতে চাইল।
কিন্তু সে চৌকাঠ থেকে নড়ল না, বউকে বলল, “তোমার জন্য জঙ্গলে আমি কিছু খুঁজে পেয়েছি, তাকে নিয়ে এসেছি তোমার আদরে রাখার জন্য।” তার বউ আনন্দে চীৎকার করে বলল,”কি এনেছ? আমাদের ঘরে তো এমন কিছুই নেই, কতকিছু আমাদের প্রয়োজন।” তখন সে আস্তে আস্তে সোনালি চাদরটা খুলে তার মধ্যে ঘুমন্ত শিশুটাকে দেখাল।
“এ কি সর্বনেশে কাণ্ড!” বিড়বিড় করে বলে উঠল তার বউ, “আমাদের ঘরে কি বাচ্চার অভাব আছে গো, যে বাইরে থেকে বাচ্চা নিয়ে আসতে হবে? আর এ বাচ্চা যে আমাদের দুর্ভাগ্য ডেকে আনবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কি?” তার বউ তার ওপর খুব রাগ করতে লাগল।
“না না শোন, এ তো নক্ষত্রের সন্তান,” বলে সে তার বউকে জানাল কিভাবে এই শিশুকে সে খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু তার কথায় তার বউ মোটেই গলল না, বরং তাকে নিয়ে হাসল, তার ওপর রেগে গেল আর তারপর কাঁদতে কাঁদতে বলল, “আমাদের নিজেদের বাচ্চাদেরই ঠিকমতো খাবার জোটে না, আর আমরা এখন অন্যের বাচ্চার খাবার যোগাড় করব? আমাদের কথা কে ভাবে? কে আমাদের খাবার যোগাবে শুনি?”
“কিন্তু ভেবে দেখ, ভগবান তো চড়ুই পাখিদেরও খাবার যোগান,” উত্তরে বলল সে।
“চড়ুই পাখিরা শীতকালে না খেয়ে মারা পড়ে না?,” বলল তার বউ, “আর এখন তো শীতকাল!” কিন্তু বউয়ের কথার সে আর কোন উত্তরও দিল না, আর চৌকাঠ থেকে নড়লও না।
খোলা দরজা দিয়ে প্রচণ্ড ঠান্ডা হাওয়া আসতে লাগল, তার বউ কাঁপতে কাঁপতে তাকে বলল, “তুমি কি দরজাটা বন্ধ করবে না? কি সাঙ্ঘাতিক ঠান্ডা হাওয়া ঢুকছে ঘরে, আমি তো ঠান্ডায় জমে যাচ্ছি।”
“যে বাড়িতে মানুষের হৃদয় জমে পাথর হয়ে যায়, সেখানে এরকম সাঙ্ঘাতিক ঠান্ডা হাওয়া ঢুকবে না তো কোথায় ঢুকবে?”
বরের কথার কোন উত্তর না দিয়ে সে আগুনের আরেকটু কাছে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর সে তার বরের দিকে ঘুরে তাকাল, তার দুই চোখে জল টলটল করছে। তাই দেখে তার বর তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে এসে শিশুটিকে তার কোলে দিল, সে শিশুটিকে পরম আদরে চুমু খেল, আর তারপর যে বিছানায় তাদের সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাটা ঘুমোচ্ছিল সেই বিছানায় সেই ছোটো বাচ্চাটার পাশে শিশুটিকে শুইয়ে দিল। পরের দিন সেই কাঠুরে সেই সোনালি চাদরটাকে সিন্দুকে তুলে রাখল, আর তার বউ ঐ শিশুর গলায় যে অ্যাম্বারের মালাটা ছিল সেটাকেও সিন্দুকে তুলে দিল।
এভাবে কাঠুরের বাচ্চাদের সঙ্গে নক্ষত্র শিশু বড়ো হতে লাগল, কাঠুরের বাচ্চারাই তার খেলার সঙ্গী, তারাই তার সর্বক্ষণের সহচর। দিনে দিনে নক্ষত্র শিশু আরও সুন্দর হয়ে উঠতে লাগল। গ্রামের সবাই তাকে মুগ্ধ হয়ে দেখত, কারণ আর সবার গায়ের রঙ চাপা, তাদের চুল কালো, আর নক্ষত্র শিশুর গায়ের রঙ ধবধবে, হাতির দাঁতের মতো, মেঘের মতো কোঁকড়ানো তার সোনালি চুল, তার ঠোঁটগুলো যেন টুকটুকে লাল গোলাপের পাপড়ি, তার চোখগুলো যেন নদীর স্বচ্ছ নীল জল, আর তার শরীর যেন সেই মাঠের নার্সিশাস ফুল, যেখানে কেউ ফুল তুলতে যায় না।
কিন্তু তার রূপই যেন তার কাল হল। সে ক্রমশ অহংকারী, নিষ্ঠুর আর স্বার্থপর হয়ে উঠতে লাগল। সে ঐ কাঠুরের বাচ্চাদের আর গ্রামের বাকি সব বাচ্চাদের রীতিমতো অবজ্ঞার চোখে দেখত – সে বলত, ওরা সব নীচু বংশ থেকে এসেছে, আর সে এসেছে এক অভিজাত বংশ থেকে, নক্ষত্রের সন্তান হয়ে – এই বলে সে বাকি বাচ্চাদের চাকর আর নিজেকে তাদের প্রভু বলে জাহির করা শুরু করল।
গরিবদের জন্য, অন্ধ বা আহতদের জন্য তার প্রাণে কোন মায়াদয়া ছিল না। তাদের দেখলে সে তাদের দিকে ঢিল ছুঁড়ত, তাদের তাড়া করে গ্রামের বাইরের বড়ো রাস্তায় ভাগিয়ে দিয়ে আসত, গ্রামে যাতে তারা আর ভিক্ষে করতে না আসে, তার সব ব্যবস্থা করত। আর তাই কিছু ভবঘুরে ছাড়া কেউই আর তাদের গ্রামে দ্বিতীয়বার ভিক্ষে চাইতে আসত না। নিজের সৌন্দর্য্যে সে নিজেই এত মুগ্ধ ছিল যে দুর্বল, হতভাগ্য লোকেদের দেখলেই সে শুধু তাদের নিয়ে ঠাট্টা মশকরা করত, পরিহাস করত। আর গ্রীষ্মে যখন চারদিক শান্ত থাকত, হাওয়া বইত না , তখন সে তাদের গ্রামের পুরোহিত মশায়ের বাড়ির ফলের বাগানে ছোট্ট পুকুরটার পাশে শুয়ে শুয়ে জলে নিজের ছায়া দেখত আর নিজের রূপে মোহিত হয়ে নিজের মনেই হেসে উঠত।
প্রায়ই সেই গরিব কাঠুরে আর তার বউ তাকে বকত, বলত, “আমরা কোনদিন তোমার সঙ্গে এমন খারাপ ব্যবহার করি নি যা তুমি বাকিদের সঙ্গে কর, বিশেষ করে তাদের সঙ্গে যাদের সাহায্য করার কেউ নেই। যাদের তোমার মমতা দরকার, তাদের প্রতি এত নিষ্ঠুর তুমি কি করে হতে পার?”
বৃদ্ধ পুরোহিত মশাইও তাকে মাঝে মাঝেই ডেকে পাঠিয়ে তাকে ভালোবাসার বাণী শোনাতেন, বলতেন, “এই মাছিগুলো তোমার ভাইয়ের মতো, এদের কোন ক্ষতি কর না। বনের যে পাখিগুলো মুক্ত আকাশে ডানা মেলে স্বাধীনভাবে উড়ে বেড়ায়, তাদের ফাঁদ পেতে ধরে, কেবলমাত্র নিজের খুশির জন্য খাঁচায় আটকে রেখনা। ঐ অন্ধ কেঁচোগুলো আর ছুঁচোগুলোও ভগবানের সৃষ্টি, ভগবানের জগতে কাউকে কষ্ট দেওয়ার তুমি কে? মাঠে চরে বেড়ানো গরু-ছাগলগুলোও ভগবানের প্রতি কৃতজ্ঞ।”
কিন্তু তাদের কারো কথাতেই নক্ষত্র শিশু পাত্তা দিত না, সে মাঝে মাঝে রেগে ভুরু কোঁচকাত, আর মাঝে মাঝে হেসে তাদের কথা উড়িয়ে দিত। তারপর সে তার সঙ্গিসাথীদের কাছে ফিরে গিয়ে আবার তাদের নানা অকর্মে নেতৃত্ব দিত। তার সঙ্গীসাথীরাও তার কথা মেনে চলত, কারণ তাকে দেখতে সুন্দর তো ছিলই, তার ওপর সে আবার ভালো নাচতে পারত, বাঁশিতে দারুণ সুরও তুলতে পারত। তাই বিনা বাক্য ব্যয়ে তারা নক্ষত্র শিশু তাদের যেখানে যেতে বলত, সেখানেই যেত, যা করতে বলত তাই করত। তাই নক্ষত্র শিশু যখন সরু কঞ্চি দিয়ে ছুঁচোর চোখে খোঁচাত, তারা কেবল হাসত। আর যখন কোন কুষ্ঠ রোগীর দিকে সে ঢিল ছুঁড়ত, তখনও তারা হাসত। সবেতেই সে তাদের ওপর দাদাগিরি ফলাত, আর এভাবে তারাও নক্ষত্র শিশুর মতো কঠিন হৃদয় হয়ে উঠতে লাগল।
তারপর একদিন সেই গ্রামে এল এক গরিব ভিখিরি মহিলা, তার পরনে শতছিন্ন পোশাক, পাথুরে রাস্তায় খালি পায়ে হাঁটতে হাঁটতে তার পা কেটে রক্ত বেরোচ্ছে, বড়োই দুর্ভাগা সে। প্রচণ্ড ক্লান্ত হয়ে সে একটা কাঠবাদাম গাছের নীচে বিশ্রাম নিতে বসল।
কিন্তু নক্ষত্র শিশু যেই না তাকে দেখেছে, অমনি সে তার সঙ্গীদের বল, “দেখ দেখ, একটা নোংরা ভিখিরি মহিলা কেমন ঐ অত সুন্দর সবুজ কাঠবাদাম গাছটার নীচে এসে বসেছে! চল ওকে এখুনি তাড়িয়ে দিই, কারণ ও কুৎসিত আর হতভাগ্য।”
তাই সে মহিলার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার দিকে পাথর ছুঁড়তে লাগল, তাকে নিয়ে মশকরা করতে লাগল, মহিলা ভয়ার্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু তার দিক থেকে নজর ফেরাল না। সেই কাঠুরে তখন কাছেই কাঠের ছোটো ছোটো গুঁড়ি কেটে দু-আধখানা করছিল, নক্ষত্র শিশুর কাণ্ড দেখে সে দৌড়ে গিয়ে তাকে ভীষণ বকল, বলল, “তোমার প্রাণ তো পাথরের তৈরি, কোন দয়ামায়া নেই তোমার, এই হতভাগ্য ভদ্রমহিলা তোমার কি ক্ষতি করেছেন যে তুমি ওঁর সঙ্গে এমন ব্যবহার করছ?”
নক্ষত্র শিশু তো রেগে লাল হয়ে গেল, মাটিতে পা দাপিয়ে দাপিয়ে সে বলতে লাগল, “তুমি আমাকে প্রশ্ন করার কে? আমি তো তোমার ছেলে নই যে তোমার কথা আমাকে মেনে চলতে হবে!”
“ঠিকই বলেছ তুমি ,” বলল সেই গরিব কাঠুরে, “কিন্তু তবু যখন তোমাকে জঙ্গলে কুড়িয়ে পেয়েছিলাম, তখন মায়ায় পড়ে তোমাকে নিয়ে এসেছিলাম।”
এই কথা শুনে সেই ভিখিরি মহিলা একটা ছোটো চীৎকার করে অজ্ঞান হয়ে গেল। কাঠুরে তাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে গেল, কাঠুরের বউ তার শুশ্রূষাও করল। তার জ্ঞান ফিরলে কাঠুরে আর তার বউ তাকে খাবার আর পানীয় দিল, আর তার আরামের পুরো ব্যবস্থা করল।
কিন্তু সে জল, খাবার কিচ্ছু ছুঁল না, কেবল কাঠুরেকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি এই বাচ্চাকে জঙ্গলে কুড়িয়ে পেয়েছিলে বলছ? সেটা কি আজ থেকে দশ বছর আগে?”
উত্তরে কাঠুরে বল, “হ্যাঁ ঠিকই, আজ থেকে দশ বছর আগেই আমি একে জঙ্গলে কুড়িয়ে পাই।”
“ওকে কুড়িয়ে পাবার সময় ওর সঙ্গে আর কি কি পেয়েছিলে বলতে পার?” চীৎকার করে জিজ্ঞেস করল ভিখিরি মহিলাটি, “ওর গলায় কি অ্যাম্বারের একটা মালা ছিল? আর ও কি একটা তারা নক্সা কাটা সোনালি চাদরে মোড়া ছিল? ”
“ঠিকই,” বলল কাঠুরে, “এগুলোই তো ছিল, ঠিক তুমি যেমন বলছ।” এই বলে সে সিন্দুক থেকে সেই সোনালি চাদর আর অ্যাম্বারের মালাটা বের করে এনে সেই মহিলাকে দেখাল।
সেগুলি দেখেই সেই মহিলা আনন্দে কাঁদতে লাগল, সে বলল, “ও আমার সেই ছোট্ট ছেলেটা, ওকে আমি জঙ্গলে হারিয়ে ফেলেছিলাম। ওকে শিগগিরই ডেকে আন, ওকে খুঁজতে আমি সারা দুনিয়া ঘুরে বেরিয়েছি।”
তখন সেই কাঠুরে আর তার বউ বাইরে গিয়ে নক্ষত্র শিশুকে ডেকে বলল, “ঘরে যাও, সেখানে তোমার মা তোমার জন্য অপেক্ষা করছেন।”
এই শুনে সে খুব আনন্দে দৌড়ে ঘরের মধ্যে গেল, কিন্তু যখন সে দেখল কে তার জন্য অপেক্ষা করছে, সে তাচ্ছিল্যভরে হেসে উঠে বলল, “কই? আমার মা কোথায়? এখানে তো সেই জঘন্য ভিখিরি মহিলা ছাড়া আর কাউকেই তো দেখছি না!”
সেই মহিলা তখন উত্তরে বল, “আমিই তোমার মা।”
“তুমি কি পাগল?” রেগে চীৎকার করে বল নক্ষত্র শিশু, “আমি কিছুতেই তোমার ছেলে হতে পারি না, কারণ তুমি একটা ভিখিরি, তুমি কুৎসিত আর ছেঁড়া নোংরা জামাকাপড় পরে থাক। বিদ্যায় হয়ও এখান থেকে, আর কখনও যেন তোমার মুখ না দেখি।”
“না, তুমি সত্যিই আমার ছেলে, তোমাকে আমি জঙ্গলের মধ্যে জন্ম দিয়েছিলাম” কেঁদে বলল সেই মহিলা, তারপর হাঁটু গেড়ে তার সামনে বসে দু’হাত বাড়িয়ে দিল তার দিকে। “আর তারপর ডাকাতরা তোমাকে আমার কাছ থেকে কেরে নিয়ে গিয়ে তোমাকে জঙ্গলে মরতে ফেলে রেখে দিয়েছিল।” বিড়বিড় কড়ে বয়লে চলল সে, “কিন্তু আমি তোমাকে দেখেই চিনেছিলাম, আর তারপর তোমার নিশানিগুলোকেও চিনতে পেরেছি – তোমার সেই সোনালি চাদর আর সেই অ্যাম্বারের মালাটা। তাই আমি বলছি তুমি আমার সঙ্গে চল, তোমাকে খুঁজতে আমি সারা দুনিয়া চষে ফেলেছি। আমার সঙ্গে চল, সোনা আমার, তোমার ভালবাসার আমার বড়ো প্রয়োজন।”
কিন্তু নক্ষত্র শিশু তার জায়গা থেকে একচুল নড়ল না, উপরন্তু সেই মহিলার ওপর থেকে তার মনকে সম্পূর্ণ সরিয়ে নিল, একদম চুপ হয়ে গেল সে, কেবল সেই মহিলার কান্নার আওয়াজ শোনা যেতে লাগল।
অবশেষে বলে উঠল নক্ষত্র শিশু, এক ভয়ানক তিক্ত কঠিন স্বরে, “যদি সত্যিই কোনভাবে তুমি আমার মা হও, তাহলে আমার থেকে দূরে সরে থাকলেই ভালো করতে, এভাবে আমাকে লজ্জা দেওয়ার জন্য এখানে না এলেই পারতে, আমি তো এতদিন ভাবতাম আমি নক্ষত্রের সন্তান, আর আজ তুমি আমাকে বলতে এসেছ যে আমি এক ভিখিরির সন্তান। তুমি চলে যাও এখান থেকে, আর যেন কখনও তোমার মুখ আমাকে দেখতে না হয়।”
“হায়! সোনা আমার,” কেঁদে বলল মহিলাটি, “যাবার আগে অন্তত একটা চুমু দেবে না আমাকে? কত কষ্টে তোমাকে খুঁজে পেয়েছি আমি!”
“না,” বলল নক্ষত্র শিশু, “তুমি এত কুৎসিত, যে তোমার দিকে তাকানো যায় না, তোমার চেয়ে তো একটা সাপ কিংবা ব্যাঙকে চুমু খাওয়াও ভালো।”
তখন সেই মহিলা মনের দুঃখে কাঁদতে কাঁদতে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। সে চলে গেছে দেখে খুশি হয়ে নক্ষত্র শিশু তার সঙ্গীসাথীদের সঙ্গে খেলতে দৌড়ল।
কিন্তু তাকে দেখেই তার সঙ্গীসাথীরা হাসাহাসি শুরু করল, তারা বলল, “কি রে, তুই তো একটা ব্যাঙের মতো খারাপ দেখতে আর সাপের মতো জঘন্য। দূর হ এখান থেকে, তোকে আমরা খেলতে নেব না।” এই বলে তাকে তারা তাড়িয়ে দিল।
নক্ষত্র শিশু ভুরু কুঁচকে ভাবতে লাগল, “এদের হলটা কি? কি সব বলছে এরা আমাকে? আমি এখুনি গিয়ে পুকুরের জলে নিজের ছায়া দেখলেই বুঝে যাব আমি কত সুন্দর।”
এই ভেবে সে পুকুরের ধারে গেল, কিন্তু জলে নিজের ছায়া দেখে আঁতকে উঠল! তার মুখটা ব্যাঙের মতো হয়ে গেছে আর তার সারা গায়ে সাপের মতো আঁশ গজিয়েছে। সে ছিটকে উঠে ঘাসের ওপর শুয়ে কাঁদতে কাঁদতে কাঁদতে নিজের মনেই বলতে লাগল, “এ আমারই পাপের ফল, আমি আমার মাকে অস্বীকার করেছি, তাকে তাড়িয়ে দিয়েছি, অহংকারীর মতো তার সঙ্গে নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছি। এখন এত বড়ো পৃথিবীতে কোথায়ই বা তাকে খুঁজে পাব? কিন্তু তবু তাকে যতক্ষণ খুঁজে না পাচ্ছি, ততক্ষণ আমি থামব না।”
তখন কাঠুরের ছোট্ট মেয়েটা এসে তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “তোমার রূপ চলে গেছে তো কি হয়েছে? তুমি আমাদের সঙ্গেই থাক, আমি তোমাকে নিয়ে ঠাট্টা করব না।”
নক্ষত্র শিশু তাকে বলল, “না, আমি আমার মায়ের সঙ্গে খুব নিষ্ঠুর ব্যবহার করেছি, আর তাই এমন শাস্তি পেয়েছি। এখন তাকে খুঁজে বের করতে দরকার হলে আমি সারা পৃথিবী ঘুরব, যতক্ষণ তাকে খুঁজে না পাচ্ছি আর তার কাছ থেকে ক্ষমা না পাচ্ছি।”
এই বলে সে জঙ্গলের দিকে দৌড়ল, চীৎকার করে তার মাকে ডাকতে লাগল, কিন্তু কোন উত্তর পেল না। সারাদিন ধরে সে তার মাকে ডেকে গেল, তারপর যখন সূর্য অস্ত যাচ্ছে, তখন সে ক্লান্ত হয়ে গাছের নীচে পাতার স্তূপের ওপর শুয়ে পড়ল। তাকে দেখে, তার নিষ্ঠুরতার কথা মনে পড়তেই তার আশেপাশের সমস্ত পশুপাখিগুলো পালিয়ে গেল, সে একা পড়ে রইল সেখানে, কেবল একটা ব্যাঙ তার ওপর নজর রাখছিল, আর তার পাশ দিয়ে একটা সাপ ধীরে ধীরে চলে গেল।
পরের দিন সকালে ঘুম থেকে উঠে সে সামনের গাছ থেকে কিছু তেতো বেরি ছিঁড়ে খেয়ে আবার কাঁদতে কাঁদতে আরও গভীর বনের ডিকে চলল তার মাকে খুঁজতে। রাস্তায় যাকেই দেখতে পেল তাকেই জিজ্ঞেস করল তার মায়ের সন্ধান জানে কি না।
সে ছুঁচোকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি তো মাটির নীচে যেতে পার, সেখানে আমার মা আছে কি না বলতে পারবে?”
উত্তরে ছুঁচো বলল, “তুমি তো আমার চোখ অন্ধ করে দিয়েছ, আমি কি করে বলব?”
বদরি পাখিকে সে জিজ্ঞেস করল, “তুমি তো অনেক উঁচু গাছগুলোর ওপর দিয়ে উড়তে পার, সারা পৃথিবী দেখতে পাও, তুমি বল, তুমি কি আমার মাকে দেখেছ?”
উত্তরে বদরি পাখিটা বলল, “তুমি তোমার আনন্দের জন্য আমার ডানা ছেঁটে দিয়েছিলে, আমি উড়ব কি করে?”
তখন সে গাছের কোটরে একা একা থাকা ছোট্ট কাঠবেড়ালিটাকে জিজ্ঞেস করল, “আমার মা কোথায়?”
তার উত্তরে কাঠবেড়ালিটা বল, “তুমি তো আমার মাকে মেরে ফেলেছ, এবার কি নিজের মাকেও মারতে চাও?”
নক্ষত্র শিশু কাঁদতে লাগল, মাথা নীচু করে বারবার ভগবানের জীবদের কাছে ক্ষমা চাইতে লাগল, আর তারপর জঙ্গলের মধ্যে মায়ের খোঁজে আবার চলতে লাগল। তৃতীয় দিনে সে জঙ্গলের অন্যদিকে এসে পৌঁছল, তারপর নীচের সমতলের দিকে রওনা দিল।
যে গ্রামের মধ্যে দিয়েই সে যায়, তাকে দেখে বাচ্চারা হাসাহাসি করে, তার দিকে পাথর ছোঁড়ে। এত খারাপ দেখতে তাকে, যে চাষীরা তাকে গোয়ালেও শুতে দিতে চায় না, পাছে তাকে দেখে চিতাবাঘ এসে তাদের জমানো ফসল নষ্ট করে। চাষীদের ভাড়া করা কর্মচারীরা তাকে দেখলেই তাড়িয়ে দেয়, তার ওপর দয়ামায়া দেখানোর কেউ নেই।
কিন্তু তার মা মানে সেই ভিখিরি মহিলার কোনও সন্ধানও সে পায় না। তিন বছর ধরে সে দেশে দেশে ঘুরতে থাকে, মাঝে মাঝে হঠাৎ মনে হয় সামনে যেন সে তার মাকে দেখতে পাচ্ছে, মাকে চীৎকার করে ডাকতে ডাকতে সে মায়ের পেছনে ছোটে, রাস্তার পাথরে তার পা কেটে রক্ত পড়ে। কিন্তু মাকে পেরিয়ে সে কখনই এগিয়ে যেতে পারে না। এদিকে রাস্তার ধারে যারা থাকে, তারা কখনই তার মাকে বা মায়ের মতো কাউকে দেখেছে বলে স্বীকার করে না, উল্টে তারা তার দুঃখ নিয়ে হাসাহাসি করে।
তিন বছর ধরে সে দেশে দেশে ঘুরল, কিন্তু কোথাও তার জন্য দয়ামায়া, ভালোবাসা কিচ্ছু নেই, এ এমনই এক জগত যা সে তার গর্বের দিনে গড়ে তুলেছিল।
এভাবে এক সন্ধ্যেয় সে এক নদীর ধারে শক্ত পাঁচিল ঘেরা একটা শহরের দরজায় এসে পৌঁছল। তখন সে বড়োই ক্লান্ত আর তার পা ক্ষতবিক্ষত, তবু সে শহরে ঢোকার চেষ্টা করল। কিন্তু দ্বাররক্ষীরা বল্লম হাতে তার পথ আটকে দাঁড়াল, তাকে রুক্ষভাবে জিজ্ঞেস করল, “তোমার এখানে কি দরকার?”
“আমি আমার মাকে খুঁজছি,” সে বলল, “আমাকে দয়া করে ভেতরে যেতে দাও, হয়তো আমার মা এই শহরের ভেতরে আছে।”
কিন্তু তারা তাকে নিয়ে হাসাহাসি করতে লাগল, একজন তার হাতের ঢালটাকে নামিয়ে রেখে, তার কালো দাড়ি চুমরে চেঁচিয়ে বলল, “সত্যি বলতে কি, তোর মা তোকে দেখে মোটেই খুশি হবে না রে, কারণ তুই ঐ জলার ব্যাঙ আর বিলের সাপের চেয়েও দুর্ভাগা। দূর হ এখান থেকে, দূর হ। তোর মা এই শহরে থাকে না।”
আরেকজন, যার হাতে একটা হলুদ পতাকা ছিল, সে বলল, “কে তোর মা? আর এখানেই বা তাকে খুঁজছিস কেন?”
উত্তরে সে বল, “আমার মা একজন ভিক্ষুক, আমার মতোই, আর আমি তার সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম। তোমাদের কাছে মিনতি করছি, আমাকে ঢুকতে দাও, যদি আমার এই শহরের মধ্যে থাকে, তাহলে তার কাছে আমি ক্ষমা চাইব।”
কিন্তু সে রক্ষীরা তাকে ঢুকতে তো দিলই না, উপরন্তু তাকে বল্লমের খোঁচা মারল।
সে যখন কাঁদতে কাঁদতে ফিরে যাবে ভাবছে, তখন একজন রক্ষী, যার হাতে একটা ফুলের নক্সাকাটা বল্লম আর মাথায় একটা ডানাওয়ালা সিংহের নক্সা করা শিরস্ত্রাণ ছিল, সে এগিয়ে এসে জানতে চাইল কে শহরে ঢুকতে চাইছিল। বাকি রক্ষীরা তাকে উত্তরে জানাল, “একটা ভিখিরি, সে আবার আরেকটা ভিখিরির ছেলেও বটে, তাকে আমরা তাড়িয়ে দিয়েছি।”
“আরে কেন?” জোরে হেসে উঠে বলল সে, “ঐ জঘন্য জিনিসটাকে তো আমরা দাস হিসেবে বিক্রি করতে পারি, এক বোতল মিষ্টি মদের বিনিময়ে।”
এই শুনে একটা বুড়ো, শয়তানের মতো দেখতে লোক যে সেখান দিয়ে যাচ্ছিল, সে বলল, “এই দামে আমি ওকে কিনতে চাই।” সেই দামে কিনে সে বুড়োটা নক্ষত্র শিশুর হাত ধরে তাকে শহরের মধ্যে নিয়ে গেল।
শহরের মধ্যে এ রাস্তা ও রাস্তা দিয়ে অনেক ঘুরে তারা একটা পাথরের দেওয়ালের গায়ে, ডালিম গাছে ঢাকা একটা ছোট্ট দরজার সামনে এসে পৌঁছল। তারপর সেই বুড়ো একটা পলকাটা মণির আংটি দিয়ে সেই দরজা ছুঁতেই সেটা খুলে গেল। সেই দরজার ভেতরে পাঁচটা পেতলের সিঁড়ি পেরিয়ে তারা একটা বাগানের মধ্যে এসে পৌঁছল, সেই বাগান জুড়ে প্রচুর কালো পপি ফুটে রয়েছে আর এদিক ওদিক অজস্র সবুজ পোড়া মাটির পাত্র ছড়ানো। এবার সেই বুড়ো তার পাগড়ির মধ্যে থেকে একটা রেশমের রুমাল বের করে নক্ষত্র শিশুর চোখ বেঁধে দিল আর তাকে পেছন থেকে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে নিয়ে চলল। তার চোখ থেকে রুমাল খোলার পর নক্ষত্র শিশু দেখল টাকে একটা অন্ধকূপে নিয়ে আসা হয়েছে, সেখানে শুধু একটা শিং-এর তৈরি লন্ঠন জ্বলছে।
তারপর সেই বুড়ো তার সামনে একটা থালায় খানিক বাসি রুটি আর একটা কাপে খানিক নোনা জল দিয়ে বলল, “খাও।” তার খাওয়া হয়ে গেলে সেই বুড়ো চলে গেল আর পেছনের দরজাটাকে লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে শক্ত করে আটকে দিয়ে গেল।
পরের দিন সেই বুড়ো, যে আসলে লিবিয়ার এক জাদুকর, আর নীলনদের ধারের সমাধিগুলোর পাশে থাকে এমন এক জাদুকরের কাছে জাদু শিখেছিল, এসে নক্ষত্র শিশুকে বলল, “এই জিয়াওরস শহরের দরজার কাছে একটা জঙ্গল আছে, আর সেখানে তিন টুকরো সোনা আছে। তাদের মধ্যে একটা সাদা, একটা হলুদ আর তৃতীয়টা লাল রঙের। আজ তুমি আমাকে সেই সাদা সোনার টুকরোটা এনে দেবে, আর যদি না আনতে পার, তাহলে তোমাকে একশো ঘা বেত মারব। তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়, আমি সূর্যাস্তের সময় তোমার জন্য বাগানের দরজায় অপেক্ষা করব। আজকে সাদা সোনা অবশ্যই খুঁজে আনবে, নাহলে কিন্তু তোমার কপালে দুঃখ আছে, মনে রেখ তুমি আমার ক্রীতদাস, এক বোতল মিষ্টি মদের দামে আমি তোমাকে কিনেছি।” এই বলে সে নক্ষত্র শিশুর চোখ বেঁধে সেই বাড়ির মধ্যে দিয়ে, বাগানের মধ্যে দিয়ে, পাঁচ ধাপ পেতলের সিঁড়ি ভেঙে উঠে মণির আংটি ছুঁইয়ে দরজা খুলে নক্ষত্র শিশুকে রাস্তায় বের করে দিল।
নক্ষত্র শিশু শহর পেরিয়ে সেই জঙ্গলে গিয়ে ঢুকল যেখানে জাদুকর তাকে যেতে বলেছিল। বাইরে থেকে জঙ্গলটা দেখতে ভারি সুন্দর, সেখানে সব সুন্দর সুগন্ধি ফুল ফুটে আছে, গাছে গাছে পাখিরা গান গাইছে, আর সেসব দেখে বেশ খুশিমনে নক্ষত্র শিশু জঙ্গলের ভেতরে গেল। কিন্তু সে সৌন্দর্য্য তাকে বেশিক্ষণ উপভোগ করতে হল না, যেদিকেই সে পা বাড়ায়, সেদিকেই মাটি ফুঁড়ে শক্ত কাঁটাঝোপ গজিয়ে ওঠে, বড়ো বড়ো কাঁটারা তাকে ঘিরে ফেলে, শয়তান বিছুটি তার গায়ে জ্বলুনি ধরিয়ে দেয়, আর এভাবে কিছুক্ষণের মধ্যেই সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় পড়ে। তার মধ্যে সকাল থকে খুঁজে খুঁজে দুপুর গড়িয়ে ফেলেও কোথাওই সে সেই জাদুকরের বাতলানো সোনার সন্ধান পায় না। সূর্যাস্তের সময় সে কপালে কি নাচছে তাই ভেবে বিষন্নভাবে কাঁদতে কাঁদতে ফেরার পথ ধরে।
কিন্তু জঙ্গল থেকে বেরোবার ঠিক মুখে এসে হঠাৎ কারো একটা যন্ত্রণায় গোঙানোর আওয়াজ তার কানে আসে। নিজের দুঃখের কথা ভুলে সে তখন সেই আওয়াজ যেদিক থেকে আসছে সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখে একটা খরগোশ কোন এক শিকারির পেতে রাখা ফাঁদে আটকা পড়েছে। তাকে দেখে নক্ষত্র শিশুর খুব মায়া হল, সে ফাঁদ খুলে খরগোশটাকে ছেড়ে দিয়ে বল, “আমি নিজে যদিও ক্রীতদাস, তবু তোমাকে মুক্তি দিলাম।”
উত্তরে সে খরগোশ বলল, “তুমি সত্যিই আমাকে মুক্তি দিয়েছ? এর প্রতিদানে আমি তোমাকে কি দিতে পারি বল তো?” তখন নক্ষত্র শিশু বলল, “আমি একটা সাদা সোনার টুকরো খুঁজছি, কিন্তু সেটা কিছুতেই খুঁজে পাচ্ছি না, আর যদি সেটা নিয়ে না ফিরতে পারি তাহলে আমার মনিব আমাকে খুব মারবে।”
“তুমি আমার সঙ্গে এস,” বলল খরগোশ, “আমি তোমাকে সেই সোনার কাছে নিয়ে যাব, আমি জানি সে সোনা কোথায় আর কি উদ্দেশ্যে লুকোনো আছে।”
তাই নক্ষত্র শিশু তার সঙ্গে চলল, আর একটা বিরাট ওকগাছের একটা ফাটলের মধ্যে থেকে সেই সোনার খণ্ডটা খুঁজে পেল। আনন্দে আত্মহারা হয়ে সে সোনার টুকরোটা তুলে নিয়ে খরগোশের দিকে তাকিয়ে বল, “আমি তোমার জন্য যা করেছি, তার বহুগুণ তুমি আমার জন্য করলে, তোমার প্রতি আমি যেটুকু দয়া দেখিয়েছি, তার একশো গুণ দয়া তুমি আমাকে ফিরিয়ে দিলে।”
“না না, তা একদম নয়,” বলে উঠল খরগোশ, “তুমি আমার সঙ্গে যা করেছ, আমিতোমার জন্য ঠিক তাইই করলাম।” বলেই সে দৌড়ে উধাও হয়ে গেল, আর নক্ষত্র শিশু শহরের দিকে রওনা দিল।
শহরের দরজার কাছে এক কুষ্ঠরোগী বসেছিল। তার মুখ এক ধূসর ন্যাকড়ায় ঢাকা, কেবল চোখের জায়গায় গর্ত করা আর তার মধ্যে দিয়ে তার চোখগুলো যেন জ্বলন্ত কয়লার মতো লাল দেখাচ্ছে। নক্ষত্র শিশুকে আসতে দেখে সে একটা কাঠের বাটি বের করে সামনে রাখল, আর একটা ঘণ্টা বাজিয়ে তাকে ডেকে বল, “আমাকে একটা টাকা দাও, নাহলে আমি খিদেয় মরে যাব। ওরা আমায় শহরের বাইরে ফেলে দিয়ে গেছে, আমার ওপর কারো কোন মায়াদয়া নেই।”
“ইস,” আর্তনাদ করে উঠল নক্ষত্র শিশু, “আমার কাছে তো কেবল একটাই টাকা আছে, আর আমি যদি সেটা আমার মনিবকে না দিই, তাহলে সে আমাকে ভয়ানক মারবে, কারণ আমি তো তার ক্রীতদাস।”
কিন্তু সেই কুষ্ঠরোগী ক্রমাগত অনুনয় বিনয় করতে লাগল, কাতর প্রার্থনা করে যেতে লাগল যতক্ষণ না দয়াপরবশ হয়ে নক্ষত্র শিশু তাকে ঐ সাদা সোনার টুকরোটা দিয়ে দিল।
তারপর যখন সে সেই জাদুকরের বাড়িতে ফিরল, জাদুকর তাকে জিজ্ঞেস করল, “সাদা সোনার টুকরোটা এনেছ?” উত্তরে নক্ষত্র শিশু বল, “না, আনতে পারি নি।” ব্যস, অমনি সেই জাদুকর তার ওপর চড়াও হল, বেদম মার মারল তাকে। তারপর তার সামনে একটা খালি থালা আর খালি কাপ রেখে বলল, “খাও।” আর তারপর আবার তাকে নিয়ে গিয়ে সেই অন্ধকূপে ফেলে দিল।
আবার পরের দিন সেই জাদুকর তার কাছে এল, আর বলল, “আজ যদি তুমি আমাকে সেই হলুদ সোনার টুকরোটা এনে দিতে না পার, তাহলে তোমাকে যেমন দাস বানিয়ে রেখেছি, তেমন তো রাখবই, তার ওপর তিনশো ঘা বেতও মারব।”
নক্ষত্র শিশু আবার সেই জঙ্গলে গেল, সারাদিন খুঁজেও সে সেই হলুদ সোনার টুকরোটার সন্ধান পেল না। সূর্যাস্তের সময় সে বসে পড়ে কাঁদতে লাগল। তখন তার কাছে সেই ছোট্ট খরগোশটা এল, যাকে সে আগের দিন ফাঁদ থেকে উদ্ধার করেছিল।
খরগোশ তাকে বলল, “কাঁদছ কেন? কি খুঁজছ তুমি জঙ্গলে?”
নক্ষত্র শিশু উত্তর দিল, “আমি একটা হলুদ সোনার টুকরো খুঁজছি, যেটা এখানে কোথাও লুকোনো আছে, যদি আমি খুঁজে না পাই, তাহলে আমার মনিব আমাকে মারবে, আর দাস বানিয়েই রেখে দেবে।”
“আমার পেছনে পেছনে এস,” চীৎকার করে বলল খরগোশটা, আর বলেই জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ছুট লাগাল, একটা দীঘির ধারে এসে তবে থামল। সেই দীঘির মধ্যে জলের তলায় ছিল সেই হলুদ সোনার টুকরোটা।
“কি বলে যে তোমাকে ধন্যবাদ দেব!” বলল নক্ষত্র শিশু, “এই নিয়ে দ্বিতীয়বার তুমি আমাকে বাঁচালে।”
“উঁহু, তুমিই প্রথম আমার ওপর দয়া দেখিয়েছিলে।” বলেই সাঁ করে দৌড়ে পালিয়ে গেল খরগোশটা।
নক্ষত্র শিশু সেই হলুদ সোনার টুকরোটাকে তার বটুয়ায় ভরে তাড়াতাড়ি পা চালাল শহরের দিকে। কিন্তু সেই কুষ্ঠরোগী তাকে দেখে তার দিকে দৌড়ে গিয়ে তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে আকুতি জানাতে লাগল, “আমাকে একটা টাকা দাও, নাহলে আমি না খেয়ে মরব।”
নক্ষত্র শিশু তাকে বল, “আমার বটুয়ায় মাত্র একটাই হলুদ সোনার টুকরো আছে, আর সেটা যদি আমি আমার মনিবকে না দিই, তাহলে সে সারা জীবন আমাকে দাস বানিয়ে রেখে দেবে।”
কিন্তু সেই কুষ্ঠরোগী ভীষণ রকম অনুনয় বিনয় করাতে নক্ষত্র শিশুর দয়া হল, সে ঐ কুষ্ঠরোগীকে সেই হলুদ সোনার টুকরোটা দিয়ে দিল।
সে যখন জাদুকরের বাড়িতে ফিরল, জাদুকর তাকে দরজা খুলে ভেতরে নিয়ে গিয়ে জানতে চাইল, “হলুদ সোনার টুকরোটা কি তোমার কাছে আছে?” উত্তরে নক্ষত্র শিশু বলল, “না, আমার কাছে নেই।” অমনি জাদুকর তার ওপর চড়াও হয়ে তাকে মেরেধরে, লোহার শিকল দিয়ে বেঁধে তাকে অন্ধকূপে ফেলে দিল।
আবার পরের দিন সেই জাদুকর এসে বলল, “আজকে যদি তুমি আমাকে লাল সোনার টুকরোটা এনে দিতে পার, তাহলে আমি তোমাকে মুক্তি দেব, আর যদি না পার, তাহলে তমাকে মেরেই ফেলব।”
নক্ষত্র শিশু আবার জঙ্গলে গিয়ে সারাদিন ধরে খুঁজল, কিন্তু কোথাও সেই লাল সোনার টুকরোটা খুঁজে পেল না। সন্ধ্যের দিকে সে বসে বসে কাঁদতে লাগল, আর তখনই আবার সেই খরগোশটা এসে হাজির হল।
সে বলল নক্ষত্র শিশুকে, “যে লাল সোনার টুকরোটা তুমি খুঁজছ, সেটা তোমার পেছনের ঐ গুহাটার মধ্যে আছে। সুতরাং আর না কেঁদে এবার একটু খুশি হও।”
“তোমাকে কি পুরস্কার দিই বল তো?” আনন্দে চেঁচিয়ে উঠল নক্ষত্র শিশু, “এই নিয়ে তৃতীয়বার তুমি আমাকে বাঁচালে।”
“মোটেই না, তুমিই প্রথম আমাকে দয়া দেখিয়েছিলে।” বলেই ছুট্টে উধাও হল খরগোশটা।
গুহার মধ্যে দূরে এক কোণায় লাল সোনার টুকরোটা খুঁজে পেল নক্ষত্র শিশু। তক্ষুনি সেটাকে বটুয়ায় ভরে সে দ্রুত পা চালাল শহরের দিকে। তাকে দেখামাত্রই সেই কুষ্ঠরোগী এসে রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে কেঁদে কেঁদে তাকে বলতে লাগল, “আমাকে ঐ লাল সোনার টাকাটা দাও, নাহলে মরে যাব আমি।”
আবারও দয়াপরবশ হয়ে নক্ষত্র শিশু তাকে সেই লাল সোনার টুকরোটা দিয়ে বল, “তোমার কাছে এর প্রয়োজন আমার থেকে বেশি।” কিন্তু তার মন ভারাক্রান্ত হয়ে রইল, কারণ সে জানত তার সঙ্গে কি খারাপ ঘটনা ঘটতে চলেছে।
কিন্তু তাজ্জব ব্যাপার হল, যখন সে শহরের দরজা দিয়ে ঢুকতে চলেছে, তাকে দেখে সব দ্বাররক্ষীরা মাথা নামিয়ে তাকে অভিবাদন জানিয়ে বল, “আমাদে প্রভু কি সুন্দর!” তদের দেখাদেখি আরও সব লোকজন জড়ো হয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, “সত্যিই, ওঁর মতো এত সুন্দর মানুষ আর জন্মায় নি সারা দুনিয়ায়!” নক্ষত্র শিশু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ভাবতে লাগল, “এয়ার আমাকে নিয়ে মশকরা করছে, আমার দুঃখকে হাল্কা করে দেখছে।”
সেখানে এত লোকের জমায়েত হল যে সে রাস্তা হারিয়ে ফেলল, অবশেষে সে আবিষ্কার করল সে একটা চৌমাথার মোড়ে এসে পৌঁছেছে আর তার সামনে একটা বিরাট রাজপ্রাসাদ রয়েছে।
সেই প্রাসাদের দরজা খুলে গেল, সেখান দিয়ে সব পুরোহিতরা আর বড়ো বড়ো রাজকর্মচারীরা বেরিয়ে এসে তার সঙ্গে দেখা করবে বলে তার দিকে ছুটে ছুটে আসতে লাগল।
তার সামনে এসে সবাই মাথা নত করে বলল, “আপনি আমাদের প্রভু যার জন্য এতদিন ধরে আমরা অপেক্ষায় ছিলাম, আপনি আমাদের রাজপুত্র।”
তার উত্তরে নক্ষত্র শিশু বলল, “মোটেই আমি কোন রাজপুত্র নই, আমি এক দরিদ্র ভিক্ষুক মায়ের সন্তান। আর আপনারা যে বলছেন আমি খুব সুন্দর, আমি জানি আমি কত কুৎসিত।”
তখন সেই দ্বাররক্ষী, যার ফুলের নক্সাকাটা বল্লম আর ডানাওয়ালা সিংহের নক্সাতোলা শিরস্ত্রাণ ছিল, সে এগিয়ে এসে তার ঢালটা নক্ষত্র শিশুর সামনে ধরে চীৎকার করে বলল, “কে বলল আপনি সুন্দর নন প্রভু?”
অবাক হয়ে নক্ষত্র শিশু দেখল, তার মুখটা আবার আগের মতোই সুন্দর হয়ে গেছে, তার হারিয়ে যাওয়া লাবণ্য ফিরে এসেছে, আর তার চোখে এমন এক দীপটি এসেছে যা সে আগে কখনও দেখে নি।
এদিকে সেই পুরোহিতরা আর উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারীরা তার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে বলতে লাগল, “এমনই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে আজকের দিনে আমাদের যিনি রাজা হবেন তাঁর আবির্ভাব ঘটবে। সুতরাং প্রভু, আপনি এই রাজমুকুট আর রাজদণ্ড গ্রহণ করে আমাদের রাজ্যে করুণা আর ন্যায়বিচারের শাসন প্রতিষ্ঠা করুন।”
কিন্তু সে বলল, “আমি এর যোগ্য নই, আমি আমার জন্মদাত্রী মাকে অস্বীকার করেছি। যতক্ষণ না তাকে খুঁজে পেয়ে তার মার্জনা পাচ্ছি, ততক্ষণ আমি শান্তি পাব না। সুতরাং আমাকে যেতে দিন, কারণ আমাকে আবার সারা দুনিয়া খুঁজতে হবে, আর তাই রাজদণ্ড আর মুকুট দিলেও আমার পক্ষে এখানে থাকা হয়তো সম্ভব হবে না।” এইসব বলতে বলতে সে যে রাস্তাটা শহরের প্রবেশদ্বারের দিকে গেছে সেই দিকে তাকাল, আর অবাক বিস্ময়ে দেখল সৈন্যদের আশেপাশের ভিড়ের মধ্যে তার মা, সেই ভিক্ষুক মহিলা, আর তার পাশে রাস্তার ধারের সেই কুষ্ঠরোগী দাঁড়িয়ে রয়েছে।
আনন্দে চীৎকার করে উঠল সে, তাদের কাছে দৌড়ে গিয়ে সে তার মায়ের ক্ষতবিক্ষত পায়ে চুমু খেতে লাগল, আর তার চোখের জলে তার মায়ের পা ধুয়ে গেল। সে ধুলোয় মাথা নুইয়ে একেবারে পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে তার মাকে বলল, “আমার ঔদ্ধত্যের দিনে আমি তোমাকে অস্বীকার করেছিলাম। আজ আমার বিনয়ের দিনে আমাকে তুমি গ্রহণ করও। মা, আমি তোমাকে ঘৃণা দিয়েছি, তুমি আমাকে ভালোবাসা দাও। মা, আমি তোমাকে ত্যাগ করেছিলাম, তুমি আমাকে গ্রহণ কর।” কিন্তু সেই ভিক্ষুক মহিলা কোন উত্তর দিল না।
তখন সে হাত বাড়িয়ে সেই কুষ্ঠরোগীর সাদা পা ছুঁয়ে বলল, “তিনবার আমি তোমার ওপর করুণা দেখিয়েছি। আমার মাকে আমার সঙ্গে কথা বলিয়ে দাও।” কিন্তু সে কুষ্ঠরোগীও কোন উত্তর দিল না।
তখন সে আবার কাঁদতে শুরু করল, সে বলল, “মা, এই কষ্ট আমার সহ্যশক্তির বাইরে, আমাকে ক্ষমা কর, আমি জঙ্গলে ফিরে যাই।” তখন সেই ভিক্ষুক মহিলা তার মাথায় হাত রেখে বল, “ওঠ,” আর সেই কুষ্ঠরোগীও তার মাথায় হাত রেখে বলল, “ওঠ” ।
তখন সে উঠে দাঁড়িয়ে তাদের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখল, তারা আসলে এক রাজা আর রানি।
সেই রানি তাকে বললেন,”ইনি তোমার বাবা, যাঁকে তুমি সাহায্য করেছিলে।”
আর সেই রাজা বললেন, “ইনি তোমার মা, তুমি যাঁর পা তোমার চোখের জলে ধুয়ে দিয়েছ।”
তারপর তাঁরা তার গোলা জড়িয়ে, তাকে চুম্বন করে, রাজপ্রাসাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন, আর তাকে সুন্দর রাজপোশাক পরিয়ে তার মাথায় রাজমুকুট, হাতে রাজদণ্ড আর নদীর ধারের সেই শহরের শাসনভার তার হাতে তুলে দিলেন।
রাজা হয়ে সে করুণা আর সুবিচারের শাসন চালাতে লাগল, সেই দুষ্টু জাদুকরকে সে নির্বাসন দিল, সেই গরিব কাঠুরে আর তার বউকে অনেক দামি দামি উপহার পাঠাল, আর তাদের বাচ্চাদের অনেক সম্মানীয় পদ দিল।
পশুপাখিদের ওপর কোন নিষ্ঠুরতা সে বরদাস্ত করত না, বরং সকলকে সে ভালোবাসা, করুণা আর দানের শিক্ষা দিত। খাদ্যহীনদের সে খাদ্য দিত, বস্ত্রহীনদের দিত বস্ত্র, তার রাজত্ব শান্তি আর প্রাচুর্যে ভরে উঠেছিল।
কিন্তু বেশিদিন সে রাজত্ব করতে পারে নি, এত দুঃখ কষ্ট যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে সে গিয়েছিল, যে মাত্র তিন বছর রাজত্ব করার পরেই সে মারা যায়। আর তার জায়গায় এক দুষ্টু শাসক রাজত্ব করতে আসে।