
গ্রামের নাম অনন্তপুর। কবে কোন কালে এই গ্রাম প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তার কোনও হিসেবনিকেশ অতিসাধারণ চাষাভুষো গ্রামবাসীর কাছে নেই। কাটোয়া লাইনের এই গ্রামে কুড়ি-পঁচিশ ঘর মানুষের বাস। বেশিরভাগই ছোটো চাষি। দু-একজনের গ্রামেই মুদি দোকান আছে। আর একঘর ওস্তাগর। বাকি বাজার ও কেনাকাটার জন্য হয় মঙ্গলবারের হাট, না-হলে বড়ো রাস্তা থেকে বাস ধরে কাটোয়া বা নবদ্বীপ টাউনে যেতে হয়।
গ্রামের বেশিরভাগ অংশই চাষজমি বা পুকুর। আলপথ ধরে যাতায়াত। এছাড়া কিছু ইটপাতা রাস্তা। বিদ্যুৎ ব্যবস্থা থাকলেও দিনে বা রাতে একটা বড়ো সময় জুড়ে থাকে লোডশেডিং। গ্রামের এক প্রান্তে আছে ভাসান দিঘি। এত বড়ো দিঘি এ-অঞ্চলে বিশেষ দেখা যায় না। গ্রামের দুর্গাপুজো, কালীপুজো আর শেতলা পুজোর ভাসান এই পুকুরেই হয় বলে ভাসান দিঘি নাম হয়েছে এই জলাশয়ের।
ভাসান দিঘির পাশেই গ্রামের পুজোতলা। সেখানেই সময় ধরে দুর্গা, কালী আর শেতলা পুজো হয়। এমনকি মাঝে মাঝে গ্রামের লোক এখানেই সত্যনারায়ণ পুজোর আয়োজন করে। ছোটো গ্রাম। সবকিছু একসঙ্গে ভাগযোগ করে করাটাই অভ্যেস। আপনি হয়তো এই বাংলারই কোনও গ্রামে থাকেন, চাকরি করেন বা বেড়াতে গেছেন। কিন্তু অনন্তপুরের মতো এমন অনন্ত শান্তির গ্রাম ক’টা দেখেছেন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যেতেই পারে। গ্রামের নিস্তরঙ্গতা ভিড় করেছে গ্রামের প্রকৃতিতেও। এখানে তাই গাছের পাতাও আরামে নড়ে। আর ভাসান দিঘিও তরঙ্গ তুলতে ভুলে যায়। পাখিরা শান্তিতে গাছের বসে ঝিমোতে থাকে, গোরু-ছাগল নিঃশব্দে জাবড় কাটে কচি ঘাস। কারও কোনও তাড়া নেই।
ব্যতিক্রম কেবল গ্রামের একমাত্র ছোটোদের স্কুলটা। সেখানে রোজ সকালে কচিকাঁচাদের ঢল নামে, নতুন জীবনের আলোড়ন ওঠে। যদিও রাজ্যের বেশিরভাগ প্রাথমিক স্কুলের মতো এখানেও শিক্ষকের অভাব। তবুও আশিস খাস্তগীরের বাগানে ফুল-ফল আনন্দে খেলা করে রোজ। চাষিদের এই অতিসাধারণ গ্রামে তিনি যেন এক স্বর্গীয় বাগানের একমাত্র মালি।
আশিসের বাগানের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ফসল রঞ্জন। ক্লাস থ্রিতে পড়া রঞ্জন অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের তুলনায় অনেক বেশি সিরিয়াস। কিন্তু চিন্তা একটাই, কতদিন ছেলেটা পড়াশোনা করতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ আছে। ছেলেটার বাবা মারা গেছে গেল বছর। মা এর জমি ওর জমিতে কাজ করে। নিজেদের বলতে রঞ্জনের বাবার বিঘা দুই চাষের জমি ছিল, কিন্তু একার পক্ষে সে-জমি চাষ করা বা চাষ করানো তার দ্বারা সম্ভব নয়। তাই প্রায় জলের দরেই সে-জমি বেচতে বাধ্য হয় রঞ্জনের মা। কিন্তু সে-টাকায় কতদিন আর চলে? মালতী তাই ওই টাকাটুকু ব্যাংকে রেখে রোজকার দিন গুজরানের জন্য জমিতে কাজ করে। এছাড়া একশো দিনের কাজে কিছু টাকা আসে। লক্ষ্মীর ভান্ডার আছে। কিন্তু রঞ্জনের মতো মেধাবী ছাত্রকে উপযুক্ত জায়গা দিতে যে-খরচা লাগার কথা, তা জোগাড় করার ব্যবস্থা মালতীর পক্ষে করা সম্ভব না।
আশিস খাস্তগীর অবিবাহিত। অনন্তপুরেই তাঁর বাড়ি। ভাসান দিঘির পাশে। পশ্চিমপাড়ে। বাবা-মার খেয়াল রাখবেন বলে বিয়ে করলেন না। কিন্তু বাবা-মাও কি কারও চিরজীবন থাকে? বছর পঁয়তাল্লিশের, তামাটে বর্ণের, সাড়ে পাঁচ ফুট উচ্চতার সুগঠিত চেহারার মানুষটা তাই স্কুলের সময়টুকু বাদ দিয়ে বড়ো একা। আর কোনও পিছুটান নেই বলে এই সময়টাও তাঁর কেটে যায় ছাত্রছাত্রীদের কথা ভেবেই।
একা হাতে ঘর পরিষ্কার রাখা বা রান্নাবান্না করা আর তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। বুঝতে পারছেন, বয়স বাড়ছে। আগামীকাল থেকে পুজোর ছুটি পড়ছে। স্কুল সেরে তিনি যাবেন রঞ্জনদের বাড়িতে। মালতীর সঙ্গে কথা বলবেন। মালতী তাঁর বাড়িতে রোজকার কাজকর্ম করে দিতে রাজি হলে আর তাঁকে কোনও ঝঞ্ঝাট পোহাতে হবে না। আর তিনি যে-বেতন দেবেন তাতে ওদের সংসারটাও চলবে। হয়তো সমস্ত গরিব ছাত্রছাত্রীর উপকার করা তাঁর একার পক্ষে সম্ভব নয়, কিন্তু রঞ্জনের ব্যাপারটা আলাদা। তার প্রতি এক অদ্ভুত স্নেহ অনুভব করেন তিনি।
তাঁর যেটুকু যা থাকবে তা রঞ্জনকেই দিয়ে যাবেন তিনি। মালতীকে সময় করে জানালেই হবে যে রঞ্জনের পড়াশোনার দায়িত্ব তিনিই নেবেন। প্রতিদানে তাঁর সঙ্গে রঞ্জনের যোগাযোগটুকু যেন থাকে।
কিন্তু পরদিন স্কুলে তিনি রঞ্জনকে দেখতে পেলেন না। স্কুল সেরে ওদের বাড়িতে গিয়েও দেখলেন যে বাড়ি তালাবন্ধ। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়ে জানা গেল পুজোর ছুটির আগে প্রতিবছর রঞ্জনকে নিয়ে তার বাবা কলকাতা যেত ঢাক বাজানোর বায়না পেয়ে। এ-বছর মালতী গেছে তার ছেলেকে নিয়ে।
আশিসমাস্টার ফেরতা পথে ভাবতে লাগলেন, মানুষের জীবন বড়ো জটিল। ঈশ্বর মানুষকে কতরকমভাবে পাশে রাখেন। তুচ্ছাতিতুচ্ছ মানুষের সামান্য সামান্য যোগদানেই ধর্মচার আসলে জীবনধারণের মাধ্যম হয়ে যায়। আবার কত মানুষের হাজার ইচ্ছে না পাওয়া হয়েই থেকে যায়। যেমন তাঁর ইচ্ছেটা।
(২)
স্কুল বন্ধ। গ্রামে পুজো আসে, পুজো যায়। মনে একটা আনন্দের রেশ থাকলেও এ-বয়সে এসে আশিসের মনে পুজো নিয়ে আর আলাদা কোনও অনুভূতি বাসা বাঁধে না। বরং এবার তাঁর মনটা খারাপ। ছুটি পরার পর রঞ্জনের সঙ্গে দেখা হয়নি। ছেলেটাকে নতুন একটা জামা দেবেন ভেবেছিলেন তিনি। আর তাঁর সংগ্রহ থেকে ‘চাঁদের পাহাড়’-টা পড়তে দেবেন ভেবেছিলেন পুজোর ছুটিতে। সে-সব আর হল কই।
আজ অষ্টমী। সকালে স্নান সেরে দিঘির পাড় ধরে দক্ষিণ পাড়ে পুজোতলায় এসেছেন তিনি। অঞ্জলির প্রস্তুতি চলছে। বামুনঠাকুর আর তাঁর দুই শাগরেদ লাল ধুতি পরে তৈরি। ফুল গোছাচ্ছে গ্রামের মেয়ে-বউরা। এ-গ্রামে ছোটোবেলা কেটেছে তাঁর। কখনও জাতধর্মের বিচার দেখেননি। রহিম ওস্তাগরও পুজোর ডালা দিয়ে যায়। আবার ঈদের দিন তার বাড়িতে যে-ই যায় সিমুই, মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়ন হয়। গ্রামের নাপিতেরও পুজোয় সমান অধিকার। প্রসাদে সমান ভাগ। এটা পশ্চিমবাংলা। এখানে ধর্ম যার যার, উৎসব সবার।
পুজো-বেদির সিঁড়িতে বসে পুজোর কাজ দেখতে দেখতে এসবই ভাবছিলেন তিনি। হঠাৎ কী মনে হল পুকুরের পশ্চিমপাড়ে নিজের বাড়িটার দিকে তাকালেন তিনি। একটি ছেলে তাঁর বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। অবিকল রঞ্জনের মতন দেখতে। আরে, গায়ে তো তার স্কুলেরই জামা। রঞ্জন নাকি? পুকুরের ও-পাড় থেকে যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে।
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মনটা তাঁর আনন্দে ভরে উঠছে। হাত তুলে হাঁক পাড়লেন তিনি, “দাঁড়া রঞ্জন, আমি আসছি!”
বলেই হনহনিয়ে হাঁটা শুরু করলেন তিনি। কিন্তু এ কি! ছেলেটা পাড় ধরে দিঘিতে নামছে কেন? পাড় ঢালু। এক্ষুনি স্লিপ খেয়ে পড়বে ছেলেটা।
প্রাণপণে হাঁটার গতি বাড়িয়ে তিনি প্রায় চিৎকার করতে লাগলেন, “আর নামিস না রঞ্জন! পড়ে যাবি যে! আমি আসছি। নামিস না, নামিস না!”
তাঁর চোখের সামনে ছেলেটা জলে নেমে তলিয়ে গেল। গ্রামের তরঙ্গহীন জীবনের মতো ভাসান দিঘির জলে কোনও তরঙ্গ উঠল না। তাঁর পা কাঁপছে। ছেলেটা তাঁর সামনে স্বেচ্ছায় জলে ডুবে গেল! তিনি বসে পড়লেন।
আর তখনই তাঁকে ঘিরে ধরল গ্রামের লোকজন। হারান মন্ডল বয়স্ক চাষি। তিনি আশিসের চোখে-মুখে জলের ছিটে দিয়ে বললেন, “কী হয়েছে মাস্টারমশাই? এত হনহনিয়ে হাঁটা লাগালেন যে! বয়সটা বাড়ছে। শরীরে আর সয়?”
হতবিহ্বল আশিস একবার দিঘি পাড়ে নিজের বাড়ির দিকে তাকালেন, একবার হারানের দিকে। তারপর বললেন, “আপনারা দেখলেন না? ওই যে বাচ্চা ছেলেটা, রঞ্জন, জলে ডুবে গেল! ওই যে ঠিক আমার বাড়ির সামনেটায়! উফ্, কী ভয়ানক! কতবার ডাকলাম, শুনল না।”
পুজোর কাজ করছিল সুমি। রঞ্জনরা ওদের প্রতিবেশী। মাস্টারের অবস্থা দেখে ছুটে এসেছে সেও। আশিসের কথা শুনে চোখ বড়ো বড়ো করে সে বললে, “আ মোলো যা! রঞ্জন জলে ডুববে কেন গা? সে তো গেছে কোলকেতা মায়ের সাথে। ঢাকের বাইনা নিয়ে। সেদিন আপনি খোঁজ নিলেন। তখন বললুম যে! আজ এখানে আসার আগেও দেখলাম দোরে তালা ঝুলছে!”
“এতটা ভুল দেখলাম!” স্বগতোক্তি করেন তিনি।
চাটুজ্জে বামুন বলে ওঠেন, “সারাটা জীবন তো একা কাটালে বাপু। একাকিত্ব এবার মাথায় ছাপ ফেলছে। আগেও বলেছি বিয়ে করো। বিয়ে-থা করার বয়সটাও তুমি হারিয়ে ফেললে। তখন মশকরা করতে, পুরুষ মাইনষের বয়স হয় না। এখন বোঝো ঠ্যালা।”
সেদিন আর অঞ্জলি দেওয়া হল না আশিসের। বাড়ি ফিরে এসে গুম হয়ে বসে রইলেন। দুপুরে সকলে মিলে অষ্টমীতে পুজোর দালানে লুচিভোগ খাওয়ার কথা। সেখানেও গেলেন না তিনি। এক গ্লাস ছাতুর শরবত খেয়ে শুয়ে রইলেন ঘরে।
দিঘির ও-পাড়ে ঢাক বাজছে। পুজো হচ্ছে। কেবল দেবী তাঁর অঞ্জলি নিলেন না। দেবীর প্রসাদ পাওয়াও তাঁর হল না। ঢাকের শব্দটা অসহ্য লাগছে। মনে হচ্ছে ঢাকের তালে ‘রঞ্জন’ নামটাই বার বার মগজে হাতুড়ি পিটছে। বাইরের ঘরের জানালাটা বন্ধ করলেন তিনি। দিঘির হাওয়া আসার দরকার নেই। শব্দটা তিনি আর নিতে পারছেন না।
একটু বাদেই হয়তো বিদ্যুৎ চলে যাবে। রোজ যেমন যায়। পুজোতলায় জেনারেটার আছে। গোটা গ্রাম যখন অন্ধকারে ডুবে থাকবে তখন কেবল পুজোতলায় আলো থাকবে। আর জেনারেটারের ফটফট আওয়াজ।
(৩)
কখন তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলেন খেয়াল নেই। জাগলেন যখন, চারদিক অন্ধকার। সন্ধ্যা গভীর। রাতের দিকে অগ্রসর সময়-কাঁটা। বিদ্যুৎ নেই। দিঘি পাড়ে বসানো জেনারেটারটা ফটফট করে যেন বিদ্রুপ করছে আধুনিকতাকে। একটা মোমবাতি খুঁজতে হবে। ঢাকের আওয়াজ নেই। তার মানে সন্ধিপুজোর তোড়জোড় চলছে।
খাট থেকে নামলেন তিনি। মোমবাতি বাইরের ঘরে থাকে। খাওয়ার টেবিলে। হয়তো লাগত না। সামনের জানালাটা খুললেই মন্দিরের আলো এসে ঢুকত ঘরে। তাতেই চলে যেত। কিন্তু ওদিকে তাকাতে তাঁর ইচ্ছা করছে না। তাকালেই সকালের ঘটনাটা মনে পড়ছে। কী ভয়ানক দৃশ্য! জানালা বন্ধ করে ঢাকের আওয়াজ আটকানো যায়নি। সম্ভব নয়। অন্তত নজরটা আটকানো যাক।
কোনোমতে মোবাইলের আলো জ্বালিয়ে খাওয়ার টেবিলের কাছে এলেন তিনি। কিন্তু মোমবাতি নেই। অথচ এখানেই তো রাখেন। কী যে হল তাঁর। বয়সটা এই মধ্য চল্লিশেই স্মৃতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছে?
মোবাইলের আলোটা হঠাৎ গেল কমে। চার্জ নেই। কুড়ি পার্সেন্ট। আর একটু পর এটুকুও থাকবে না। কোনোমতে রান্নাঘরের দিকে গেলেন তিনি।
যাক, ওভেনের পাশে রাখা আছে। কিন্তু দেশলাই বাক্সে হাত দিয়েই চমকে উঠলেন আশিস। এ তো চপচপে ভেজা। যেন সদ্য কেউ জলে চুবিয়ে রেখে গেছে। এটা কী করে সম্ভব? তিনি দেশলাই বাক্সটা ছুড়ে ফেলে জামায় হাত মুছতে গেলেন। ইস্! জামাটাও ভিজে চপচপে। এত ঘেমেছেন তিনি! না, এ তো ঘাম নয়। তাঁর সমস্ত গা জলে ভেজা। যেন স্নান সেরে গা মুছতে ভুলে গেছেন তিনি।
এবার সমস্ত মনঃসংযোগ কেন্দ্রীভূত করে তিনি অবস্থাটা বুঝতে চাইলেন। ঘরের মেঝে, দেওয়াল, সমস্ত আসবাবপত্র— সব ভিজে চুপচুপে হয়ে আছে। অথচ জল নেই কোথাও। তাঁর পায়ের তলায় জল নেই, অথচ ভিজে থাকার অনুভূতি। মেঝেতে জল নেই, অথচ তা কলতলার মেঝের মতন। আর্দ্র নয় বরং সিক্ত বলাই ভালো।
তিনি ওই অন্ধকারে হাতড়াতে হাতড়াতে বাড়ির দরজার কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করলেন। তাঁর পায়ে পায়ে তাঁর সঙ্গের ছায়ার মতন এগোচ্ছে ওই সিক্ততার শীতল অনুভূতিটা। এবার তিনি ভয় পেলেন। দরজাটার কাছে তাকে পৌঁছতেই হবে। তিনি দৌড়াচ্ছেন, একের পর এক আসবাবে ধাক্কা খাচ্ছেন। তাঁর লাগছে। কখনও ব্যথায় কঁকিয়ে উঠছেন, কখনও চিৎকার করছেন। অথচ দরজাটার কাছে তিনি কোনোভাবেই পৌঁছাচ্ছেন না। বাইরে থেকে পুজোর ঢাকের আওয়াজ আসছে।
বেশ বোঝা যাচ্ছে গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ এসে গেছে। তবু তাঁর ঘর অন্ধকার। দরজাটা কিছুতেই কাছে আসছে না তাঁর। তিনি হাঁপাচ্ছেন। বুক ধড়ফড় করছে তাঁর। উফ্! কী কষ্ট! ওই অস্বস্তিকর ভেজা ভাবটা যাচ্ছে তো না-ই, যেন বাড়ছে। তাঁর নাক-মুখ দিয়ে যেন শরীরের ভেতরে কেউ জল ঢুকিয়ে দিচ্ছে লিটার লিটার। অথচ তিনি বুঝতে পারছেন যে জল কোথাও নেই।
তাঁর বুকটা এবার ব্যথা করছে। পেটটা ফুলছে। এক অদ্ভুত অনুভূতি। তিনি বসে পড়লেন মেঝেতে। আর একটু জলের চাপ বাড়লেই এবার তাঁর নিশ্বাসটা বন্ধ হয়ে যাবে। তিনি নিজের গলাটা টিপে ধরলেন। আর জল তিনি গিলতে পারবেন না। তার চেয়ে, তার চেয়ে… কিন্তু মরতে তো তিনি চান না! বাঁচবেন বলেই তো তিনি কিনতে চেয়েছিলেন রঞ্জনকে। সেদিন গেছিলেন তো তিনি ওদের বাড়িতে। স্কুল ছুটি পড়ার একদিন আগেই। ভেবেছিলেন ওকে নিজের ছেলের মতন মানুষ করবেন, পড়াবেন। কিন্তু মালতীটা বাধা হয়ে দাঁড়াল। কিছুতেই ছেলেকে দেবে না। অথচ মালতীর ছা-পোষা জীবনের কোনও প্রভাবই তিনি দেখতে চান না রঞ্জনের মধ্যে। এদিকে ছেলেটাও মাকে ছাড়বে না। এবার যদি গ্রামে রটিয়ে দেয় সব কথা? মাস্টার ছেলে কিনতে এসেছিল! ইস! তার এতদিনের সম্মান! অতএব দুজনকেই… অথচ রঞ্জনকে তিনি ভালোবাসেন, প্রচণ্ড ভালোবাসেন। এখনও।
তাঁর চোখের দৃষ্টি আবছা হতে শুরু করেছে। যেন কেউ চোখের উপর কল চালিয়ে রেখেছে। তিনি ঘোলাটে দৃষ্টিতে অন্ধকারের মধ্যেও আবছা একটা অবয়ব দেখতে পেলেন।
“রঞ্জন! রঞ্জন! এসেছিস বাবা! আমায় বাঁচা!”
হঠাৎ একটা ভেজা হাত তাঁর মুখটা চেপে ধরল। এক মহিলার হাত। আর একটি ছোটো ছেলের হাতের আঙুল তাঁর নাকের ছিদ্রটাও বন্ধ করে দিল। তাঁর শরীরে জল কেন জল, হাওয়া কিছুই আর ঢুকতে পারছে না। তিনি কয়েক মুহূর্ত একটু আরাম পেলেও বুঝতে পারলেন যে তিনি শ্বাসটাও আর আদানপ্রদান করতে পারছেন না। ছটফট করতে লাগল তাঁর দেহটা। তাঁর দুই কানের ছিদ্রে তখন দুটি ফিসফিসানি অনবরত তাঁর কানের পর্দায় আঘাত করছে। একটি মহিলা কণ্ঠ ও একটি শিশু কণ্ঠ রিনরিনে গলায় বলে চলেছে—
“আমাদের মেরে ফেললে মাস্টার! রঞ্জন তার মায়ের সন্তান। রঞ্জন বিক্রির জিনিস নয়। রঞ্জন মাকে ছেড়ে থাকবে না। রঞ্জন মাকে ছেড়ে থাকবে না। রঞ্জন মাকে ছেড়ে থাকবে না। জলের নীচেও রঞ্জন মাকে জড়িয়েই আছে। মালতীর প্রাণ রঞ্জন।”
এতক্ষণ অতিরিক্ত জলের জন্য, আর এখন একটু বাতাসের জন্য আঁকুপাঁকু করছেন আশিস। বুকের কাছটা প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে, জিভটা শুকিয়ে যাচ্ছে। জল চাই, একটু বাতাস চাই। উফ্! সেদিন যখন মা-ছেলের অচেতন দেহ দুটো হাত-পা-মুখ বেঁধে পাটের বস্তায় ভরে ভাসান দিঘির জলে ফেলে দিয়েছিলেন রাতের অন্ধকারে, ওদেরও কি এরকমভাবেই প্রাণবায়ু বেরিয়েছিল? মৃত্যু কী কষ্টের!
সেদিন বাইরের দরজায় তালাটা তারই লাগানো, গভীর রাতে অচেতন দেহ দুটো বস্তায় ভরে নিয়ে যাওয়ার সময়। যাতে কেউ না সন্দেহ করে, পরদিন আবার তিনি গেছিলেন ওদের খোঁজ করতে। তখন ইচ্ছে করেই সুমিদের দরজার কড়া নেড়েছিলেন তিনি। একটা সাক্ষী রাখা ভালো।
কানের কাছে তখনও রিনরিনে কণ্ঠের আওয়াজেরা বলে চলেছে, “জল চাই? বাতাস চাই? রঞ্জন মরার আগে জল পায়নি, মালতীও মরার আগে জল পায়নি। দুজনেই একটু বাতাস পাওয়ার জন্য কত কষ্ট করেছে। তুমিও পাবে না। পাবে না। মালতীর চোখের সামনে তাঁর ছেলে খুন হল। তুমি কেন বাঁচবে? মরবে, মরবে।”
আশিস বেশ বুঝছেন তাঁর অন্তিম সময় আসন্ন। চোখ দুটো লাল হয়ে গেছে, গলার শিরা ফুলে গেছে। দু-হাতে সবটুকু শক্তি দিয়ে তিনি নিজেকে মুক্ত করার চেষ্টা করছেন। দূর থেকে ঢাকের আওয়াজ আসছে— রন্-জন্, রন্-জন্, রন্-জন্, রন্-জন্। মালতী ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে যখন ঢাকের কাঠি ধরত, ঠিক এই বোলটাই ফুটত তাতে। তার প্রাণের চেয়ে প্রিয় ছেলের নাম।
আস্তে আস্তে আশিসের ছটফটানিটা থেমে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে সন্ধিপুজোর বলিতেও ছটফট করতে করতে থেমে গেল শোল মাছটা। ছাগ, অর্থাৎ রিপু বলি হল মায়ের থানে। আর আশিস বলি হলেন চতুর্থ রিপুর— মোহের।
পরদিন সকালে পুজোর ভোগ দিতে এসে অনাদি সামন্ত আশিসের মৃতদেহটা খুঁজে পান। গ্রামের লোকেরাই তাঁর শেষকৃত্য করে। আপাতত স্কুলটা বন্ধ রয়েছে। ফলে গ্রামের প্রাণটুকু যেন দুর্গা ঠাকুরের সঙ্গেই ডুব দিয়েছে ভাসান দিঘির জলে। রঞ্জন আর তার মা অবশ্য কালীপুজো পার হয়ে গেলেও আর ফেরেনি। ঘরের দুয়ারে ময়লা জমেছে। প্রদীপ জ্বলে না আর তুলসির থানে। অবশ্য বাপ-মরা রঞ্জন আর তার মায়ের খোঁজ আর বেশি কেউ নেয়নি কয়েকদিন পর থেকে। সুমিও না।
কেবল আশিসমাস্টারের বাড়িটায় একদিন হঠাৎ বাজ পড়ে আগুন ধরে যায়। এখন সেখানে কেবল জমিটা পড়ে আছে একগাদা পোড়া ঘা বুকে নিয়ে। জমিটার মাঝখানে ছোট্ট একটা নীচু জায়গা তৈরি হয়েছে। সেখানে একদিন বৃষ্টিতে সেই যে জল জমল, সে-জল আর শুকাতে চায় না। প্রচণ্ড রোদেও সেই জলে ভেসে বেড়ায় দুটি শোল মাছ। একটি পরিণত, একটি শিশু। কেউ খেয়াল করেনি ঠিকই, কিন্তু তারপর থেকে গ্রামের যত পুজো হয়েছে ভাসান দিঘির পাড়ে, তাতে ঢাক-ঢোল বাজলেই বোল উঠেছে— রন্-জন্, রন্-জন্, রন্-জন্, রন্-জন্। আশিসমাস্টার বেঁচে থাকলে ঠিক ধরতে পারত।
বড় আটপৌরে লেখা। নরম, সহজ, হৃদয়স্পর্শী। অভিনন্দন।
দারুন!
পল্লব দাসের “মোহ” গল্পটি গ্রামীণ জীবনের সহজ সরলতা, মানবিকতা ও সম্পর্কের গভীরতা অসাধারণভাবে তুলে ধরেছে। রঞ্জনের প্রতি আশিস খাস্তগীরের স্নেহ, একাকিত্ব, আর গ্রামের প্রকৃতির শান্ত পরিবেশ পাঠকের হৃদয়ে গভীর ছাপ ফেলে। ভাষা সহজ হলেও আবেগ অত্যন্ত শক্তিশালী। গল্পের শেষ অংশ পাঠককে নাড়া দেয় এবং মানবতার গুরুত্ব বুঝতে সাহায্য করে। এটি এক হৃদয়স্পর্শী, বাস্তবধর্মী ও গভীর মানবিক গল্প—লেখককে অভিনন্দন জানাই।
সত্যি বলতে একটা দাগ কেটে গেল ভেতরে ভেতরে। স্যার আরও এরকম ছোটোগল্প লেখার অনুরোধ রইলো।