পুরাতনী-নুতন বৎসর-জয়ঢাক৪৮

puratani48

ভগবানের চরণে ভক্তিভরে প্রণাম করিয়া আমরা নুতন বৎসরের কাজ আরম্ভ করিতেছি। আমাদের প্রিয় পাঠকপাঠিকাগণের মঙ্গল হউক;  এবারে আমরা যেন আরো ভালো করিয়া তাঁহাদের সেবা করিতে পারি।

একটা বৎসর চলিয়া যাওয়া ত সহজ কথা নহে। পৃথিবীর পিঠে চড়িয়া আমরা এই সময়ের মধ্যে না জানি কোথা হইতে কোথায় চলিয়া আসিয়াছি। মোটামুটি হিসাবে বলা যায় যে, গত বৈশাখ মাসে আমরা আকাশের যে স্থানে ছিলাম, সূর্যের চারিদিক ঘুরিয়া আবার সেইখানে ফিরিয়া আসিয়াছি; এই ঘটনাটি ঘটিতে যে সময় লাগিয়াছে তাহাই এক বৎসর। সূর্য এখান হইতে প্রায় ৯২৭৯৬৯৫০ মাইল দূরে, তাহার চারিদিক ঘুরিয়া আসিতে গেলে প্রায় ৫৮৪০০০০০০ মাইল পথ চলিবার দরকার হয়। এই কাজটি আমরা ৩৬৫(১/৪) দিনে শেষ করিয়াছি; সুতরাং আমাদিগকে প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১৮(১/২)মাইল হিসাবে চলিতে হইয়াছে।

সেকেন্ডে ১৮(১/২) মাইল! কি ভয়ংকর কথা। রেলগাড়ি যদি এত তাড়াতাড়ি চলিতে পারিত, তাহা হইলে কলিকাতা হইতে দিল্লী যাইতে এক মিনিটও লাগিত না। ২২ মিনিটের মধ্যে সমস্তটা পৃথিবী ঘুরিয়া আসা যাইত (অবশ্য পৃথিবীর চারিদিক বেড়িয়া রেল থাকিলে)।

আসলে কিন্তু পৃথিবীকে ইহার চেয়েও তাড়াতাড়ি চলিতে হইতেছে। সূর্য যদি আকাশের এক জায়গায় স্থির থাকিত্‌ তবে তাহার চারিদিকে ঘুরিয়া আসিতে পৃথিবীর ওই পরিমাণ পথই চলিতে হইত, এ কথা ঠিক। কিন্তু পন্ডিতেরা অনেক পরীক্ষা তথা হিসাব করিয়া দেখিয়াছেন যে, সূর্য আকাশের একস্থানে বসিয়া নাই, সে বৎসরে চল্লিশ পঞ্চাশ কোটি মাইল হিসাবে একদিকপাণে ছুটিয়া চলিয়াছে। এই হিসাবে পৃথিবীকেও সূর্যের সঙ্গে সঙ্গে চলিতে হইতেছে। নচেৎ সূর্য তাহাকে পিছনে অন্ধকারের মধ্যে ফেলিয়া নিজের আলোক লইয়া কোথায় চলিয়া যাইবে।

ভাবিয়া দেখ, পৃথিবীর কাজ কত কঠিন! বেচারীকে চলিতে চলিতে ক্রমাগত পাক খাইতে হইতেছে, নহিলে আমাদের দিনরাত হয় না। পাক খাইতে খাইতে আবার তাহাকে সূর্যের চারিদিকে চক্কর দিয়া আসিতে হইতেছে, নহিলে আমাদের বৎসর হয় না। এইসব কাজ করিতে করিতে আবার শুধু সূর্যের সঙ্গে থাকিবার জন্য তাহাকে বৎসরে চল্লিশপঞ্চাশ কোটি মাইল করিয়া ছুটিতে হইতেছে, নহিলে আমরা অন্ধকারে পড়িয়া মারা যাই।

সুতরাং পৃথিবী যে বৎসরের শেষে আবার আকাশের একজায়গায় ফিরিয়া আসে এ কথা ঠিক নহে।  গত বৎসর ঠিক এই সময়ে আমরা যেখানে ছিলাম, এখন তাহা হইতে ঢের দূরে আছি। আশ্চর্যের কথা এই যে, এমনভাবে এতদিন ছুটিয়াও পৃথিবী আকাশটাকে পাড়ি দিতে পারে নাই। সে জিনিসটা না জানি তবে কত বড়!

যাহা হউক, এত কথায় আমাদের কাজ নাই;আমরা বৎসরের কথাই বলিতে যাইতেছি। আকাশের যেখানেই থাকি, বৎসরে সূর্যের চারিদিক একবার দেখিয়া আসিতেছি একথা ঠিক। আর, তাহার দরুণ যাহা ঘটিবার কথা, তাহা নিয়মিতরূপেই ঘটিতেছে, সুতরাং আমাদের সংসারযাত্রা নির্বিঘ্নেই চলিয়া যাইতেছে।

গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত, এসকল ঋতুর পরিবর্তন কেন হয়? না, পৃথিবী যে সূর্যের চারিদিকে ঘুরিতেছে, তাই। আরেকদিন তাহার কথা ভালো করিয়া বলিব। আজ শুধু এতটুকু মনে করিয়া দিতেছি যে, এইসকল ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বৎসরের হিসাবও আমরা পাইতেছি। শীতকালের দিন কেমন ছোট, আর রাত কত লম্বা; গ্রীষ্মকালের দিন কত লম্বা, আর রাত কত ছোট। এসকল কথা হয়ত তোমরা সকলেই লক্ষ করিয়াছ। মোটামুটি ২১শে ডিসেম্বর সকলের চেয়ে লম্বা রাত আর ছোট দিন হয়। তারপর ক্রমে রাত ছোট আর দিন বড় হইয়া ২০শে মারচ্‌ দিন আর রাত্রি সমান হয়। তারপর ক্রমে দিন বাড়িয়া, রাত ছোট হইয়া ২১শে জুন সকলের চেয়ে লম্বা দিন আসে। তারপর আবার দিন ছোট আর রাত বড় হইয়া ২২শে সেপ্টেম্বর দিন-রাত সমান হয়। তারপর ২১শে ডিসেম্বর পর্যন্ত ক্রমে রাত লম্বা আর দিন ছোট হইতে থাকে।

এইসকল ঘটনা হইতে বৎসরের হিসাব সহজেই পাওয়া যায়। চৈত্রমাসের শেষদিনকে বিষুবসংক্রান্তি বলে; সেইদিন দিবারাত্রি সমান হইবার কথা। ইহার পরের দিন (অর্থাৎ ১লা বৈশাখ) হইতে দিন রাত্রির চেয়ে বড় হইতে থাকে, সেইদিন হইতে গ্রীষ্মকাল এবং বৎসরের আরম্ভ ধরা হয়।

দুঃখের বিষয়, পূর্ব্বে ৩০ এ চৈত্র বিষুবসংক্রান্তি হইত বটে কিন্তু এখন আর তাহা হয় না। পৃথিবীর চালচলনের মধ্যে এমন একটু ঘোরপ্যাঁচ আছে যাহার দরুণ বিষুবসংক্রান্তি ক্রমেই ঠিক বৎসরের শেষ হইবার একটু আগে পড়িয়া যায়। আমাদের প্রাচীন জ্যোতিষীরা এই ঘটনার কথা জানিতেন। কিন্তু এখনকার পঞ্জিকাইয় তাহার আর কোন হিসাব রাখা হয় না। বিষুবসংক্রান্তি আসলে ২০এ মার্চ হইয়া গিয়াছে; সেইদিন দিনরাত  সমান ছিল। সেদিনকার বাংলা তারিখ ছিল ৬ই চৈত্র। তার পরের দিন হইতে পয়লা বৈশাখ ধরিতে পারিলে বৎসরের হিসাব ঠিক হইত।

যাহা হউক, সে হিসাব যখন হইবার নয়, তখন আর দুঃখ করিয়া লাভ কি? চলিত হিসাবেই তোমাদের শত বৎসর পরম সুখে কাটিয়া যাউক।

Leave a Reply