ঋকবাবুর রান্নাখেলা- রাশিয়ান বরশ স্যুপ-তনুশ্রী মুস্তাফি-জয়ঢাক৪৯-বর্ষা২০১৫

rikbabu49

আচ্ছা ছোট ছোট ছেলেগুলি কী দিয়ে তৈরি হয় বলো তো? মেয়েদের মত খালি ভালো ভালো জিনিস দিয়ে নিশ্চয় নয়।  সে তো আমার ঘরের নমুনাটিকে দেখলেই বুঝতে পারি।কী পাজি আর কী দুষ্টুই না রে বাবা! সর্বক্ষণই পায়ের তলায় চাকা(তিনি হাঁটতে খুব একটা পছন্দ করেন না অগত্যা হামেশাই স্কুটারবাহন) আর মুখে ফুটছে খই। কোনো কথা মাটিতে পড়ার অপেক্ষা নেই, সঙ্গে সঙ্গে তিনি হাজির তাঁর  অমূল্য মতামত নিয়ে।  দেখতে দেখতে ঋকবাবু ছয় বছরে পড়লেন। গোটা চারেক দুধে দাঁত খুইয়ে আর গোটা দুই দাঁত অর্জন করে তিনি এখন নিজেকে বড়ই বীর মনে করেন। মানে কাউকে পাত্তা দেওয়ার ব্যাপার আর খুব একটা নেই। থাকবেই বা কেন? নিজে নিজে খেতে পারেন, চান করতে পারেন, মায় খানিক খানিক পড়াশুনাও নিজে করে নেন। গল্পের বই পড়েন, রাস্তা চিনে যেতে পারেন। বেশ তালেবর ব্যক্তি।

এ হেন ব্যক্তিকে কিনা গরম পড়তেই মা দিলেন মাথা ন্যাড়া করে। স্কুলে তো মানে প্রেস্টিজ একেবারে ফুটো। কোথায় ছিলেন ক্লাসের উঠতি গুন্ডা না এখন সবাই একবার করে মাথায় হাত বুলিয়ে চলে যায়। রাগে হাঁড়িচাচা পাখি হয়ে একদিন ফিরলেন স্কুল থেকে। মাঝরাস্তায় এসে ছেলে আর বাড়ি ফিরবে না। মায়ের উপর কী রাগ! অনেক সাধ্যি সাধনা করে তাকে বাড়ি তো আনা হলো। বিকেলবেলা বাবা বাড়ি ফিরে ওয়ারজোন খেলতে বসে দেখালেন ডেমোলিশন ম্যানেরও তো মাথা ন্যাড়া। কি রকম হাতে গ্রেনেড  নিয়ে জাগলিং করে। ব্যাস ছেলে একেবারে ফিদা। তা তিনি আপাতত ডেমোলিশন ম্যান। শতকরা একানব্বই শতাংশ বিস্ফোরক। বাকিটা মা মাঝে মাঝে জল ঢেলে দেয় কিনা।

আপাতত ঋকের স্কুলে গরমের ছুটি। টানা দু মাস। মা বেচারির ত্রাস। দুষ্টুমি তবু সহ্য হয়, কিন্তু বকবক? সেটা কে থামাবে? সকালে ঘুম ভাঙা থেকে শুরু করে রাতে ঘুমোতে যাওয়া অবধি মুখ চলছে তো চলছেই। গল্পের বই পড়ে শোনাও, প্রশ্নের চোটে হয় বই বন্ধ নাহলে ধমকে চমকে চুপ করাতে হয়।  পৃথিবীতে বোধহয় একমাত্র ছেলে যে গল্প শুনতে গিয়ে, কম্পুটারে গেম খেলতে গিয়ে বকুনি খায়, কেন? না বকবকানির চোটে কানে ব্যথা হয়ে যায় বলে। সেদিন দুপুরে সিনেমা দেখছিল, যেমন দেখে থাকে সোফায় মাথা আর আকাশে পা করে( উনি সাধারণ মানুষের মত বসতে পারেন না তো, আর মাথায় অক্সিজেনটাও বেশি পৌঁছোয় কিনা উল্টে বসলে!), তা মায়ের সাধ হলো একটু দার্শনিক আলোচনা করবার  ( মায়ের যে কেন এরকম বিপজ্জনক সাধ হয় মাঝে মাঝে! )।

এতোলবেতোল নানা কথার মাঝে জিগ্গেস করলেন  “ঋক সোনা তোমার সব চাইতে খারাপ লাগে কী?” শূন্যে পা ছুঁড়তে ছুঁড়তে সপাট উত্তর, “কিচ্ছু না।”

“কিছুই না? একেবারে কিছুই না?”

“নাহ কিচ্ছু না। আবার কী?”

“না ধর মা যখন বকে তোমায়?”

“সে তো তুমি পাগল হয়ে যাও তখন। হি হি হি।”

এক গাল মাছি। কেন যে এর সাথে কথা বলতে যাই!।

সে যাই হোক। আপাতত কিছুদিন ধরে ঋক সবজি খেতে খুবই আগ্রহী। মাঝে বাড়িতে সবারই একবার করে বসন্ত রোগ হয়ে গেছে। তা তখন ঋক নিমপাতা, উচ্ছে সবই খেয়েছে আর সোনামুখ করেই খেয়েছে। মাও এই ফাঁকে সবজি খাওয়ার উপকারিতা একেবারে ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছেন। ঋক এখন জানে রং মিলিয়ে মিলিয়ে এক এক সবজির এক এক রকম উপকারিতা। লাল বা কমলা রঙের সবজি আর ফলে থাকে সব চাইতে বেশি ভিটামিন সি যা আমাদের চামড়ার খেয়াল রাখে। সবুজ রঙের ফল আর সবজিতে আছে আয়রন যা দরকার শরীরে রক্ত তৈরির জন্য। নীল আর বেগুনি ফল বা সবজিতে আছে ক্যান্সার আটকানোর ক্ষমতা। সাদা ফল আর সবজি বাড়ায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। প্রতিদিন খেতে বসে এখন ঋক মিলিয়ে নেয় আজ  কী কী রঙের খাবার খেল।

এই ছুটিতে ঋক মায়ের সাথে তৈরি করেছে মাটির তলার নানা সবজির সুপ। মা বলেন অনেকদিন আগে রাশিয়া বলে এক বিশাল কনকনে ঠান্ডা আর বরফে ঢাকা দেশে থাকত জার নামের শক্তিশালী রাজা, তার রানি জারিনা, বড়লোক মন্ত্রীরা আর দেশ ভর্তি গরিব সৈন্য আর চাষী, জেলে, তাঁতি প্রজারা। একদিকে বড়লোকদের অনেক পয়সা। তারা পিপে পিপে মিষ্টি মদ, সাদা ধবধবে রুটি, বড় বড় হাঁসের রোস্ট এই নিয়ে রোজ খেত মহাভোজ। এদিকে দেশ ভর্তি প্রজারা বেশিরভাগই থাকত না খেয়ে। নুন আর ক্ষুদের জাউ ঘরের বাচ্চাবুড়োগুলোকে খাওয়াতে পারলে তারা মনে করত অনেক হয়েছে। এরই মাঝে ঠাকুমা-দিদিমা-মায়েরা বরফের সাথে লড়াই করে অল্প চাষ করে আর বন জঙ্গল ঢুঁড়ে নিয়ে আসতো সস্তার যত সবজি- বাঁধাকপি, বিট, গাজর, আলু, শালগম এই সব।  ভিনিগারে ভিজিয়ে অল্প জারিয়ে নেওয়া হত সেই সব সবজি যাতে অনেকদিন পর্যন্ত সেগুলো ভালো থাকে। তারপর গরু বা শুয়োরের হাড়, সস্তা মাংসের ছাঁটের সাথে সেই সবজি সেদ্ধ করে তৈরি হত বরশ সুপ। গরিব দুঃখী মানুষের খাবার। কিন্তু খাদ্যগুণে সব চাইতে সেরা। ভিটামিন আর খনিজ খাদ্যগুনে সমৃদ্ধ। সেই খেয়ে রুশি চাষীর ছেলে আকাশপাতাল এক করে ডাকত ‘সিবকা বুরকা, জাদুকা লাড়কা, চেকনাই ঘোড়া, সামনে এসে দাঁড়া।’ এক লাফে ঘোড়ার পিঠে চেপে ইলিয়া মুরমিত্স, চাষীর ছেলে যেত তাতার দস্যুদের থেকে বন্দি রাশিয়াকে উদ্ধার করতে আর জিতেই ফেরত আসত।

 

বরশ সুপ বানানোর উপকরণ

rikbabu4902

(এই প্রণালীতে নিজের পছন্দমত অদলবদল করে নিতে পারো তবে বিট চাইই চাই ):

বিট – মাঝারি মাপের চারখানা, কুঁচিয়ে

গাজর –  সেও গোটা চারেক, কুঁচিয়ে

বাঁধাকপি – মাঝারি মাপের হলে তার আধখানা (আমরা দিইনি), কুঁচিয়ে

আলু – মাঝারি মাপের একখানা (আমরা দিইনি), কুঁচিয়ে

আপেল – এক খানা (আমরা দিইনি), কুঁচিয়ে

আদা – আধ ইঞ্চি মাপের একখানা,কুঁচিয়ে 

রসুন –  পাঁচ-ছটা কোয়া, কুঁচিয়ে

পেঁয়াজ – এক খানা, কুঁচিয়ে (আমরা আগে থেকে ভেজে নিয়েছি, তবে না করলেও চলে)

ভিনিগার – দু চামচ

চিকেন স্টক – ৪০০ মিলি (সোজা ভাষায় ৫০০ গ্রাম চিকেন আর এক লিটার জল একটা পাত্রে নিয়ে উনুনে বসিয়ে দাও। ওতে দাও কয়েকটা তেজপাতা, এক মুঠো রসুনের কোয়া আর গোটা গোলমরিচ, চারটুকরো করে কাটা দুটো পেঁয়াজ, আধ ইঞ্চি মাপের একটা আদার টুকরো, একটা গাজর, পারলে লিক আর সেলেরি। টগবগ করে ফুটে উঠলে নামিয়ে নাও। চিকেনের টুকরোগুলো তুলে রাখো। পরে স্যান্ডউইচ বানাতে বা স্যালাড বানাতে কাজে লাগবে। জলটা ছেঁকে নাও। ওটাই চিকেন স্টক। প্রায় দশ দিনের বেশি ফ্রিজে ভালো রাখা যায়। আর নানা রান্নায় কাজে লাগে।) চাইলে কিন্তু নিরামিষাশীরা চিকেন ছাড়াও বানাতে পারো। চিকেন বাদে শুধু সবজিগুলো দিয়ে স্টক বানিয়ে সেটা ব্যবহার কর।

চিকেন ডাম্পলিং বানানোর উপকরণ:

বোনলেস চিকেন – ২৫০ গ্রাম

মাশরুম – ছ’খানা

পালংশাক, ভাপানো – এক মুঠো বা এক থাবা, যে মাপে খুশি

ডিম – দুটো

দুধে ভেজানো পাউরুটি- চারখানা

প্রণালী

 ১। প্রথমে একটা প্যানে একচামচ সাদা তেল আর এক চামচ মাখন দাও।  গরম হলে ওতে সব সবজি ঢেলে দাও। ভালো করে নেড়েচেড়ে মেশাও। তারপর একটা গল্পের বই খুলে নিয়ে পড়তে বস। ঋক অবিশ্যি  এই পর্যায়ে বারবার কার্টুন দেখতে পালাচ্ছিল। তবে দশ মিনিট বাদে বাদে ডাকলেই এসে চেয়ারের উপর দাঁড়িয়ে খানিক হাতা এবং হাতের কসরত দেখিয়ে যাচ্ছিল।  মোটামুটি মিনিট কুড়ি বাদে যখন একটু রংটা পাল্টে পোড়া পোড়া হবে আর বেশ মিষ্টি একটা গন্ধ ভাসবে বাতাসে ওতে অর্ধেক চিকেন স্টক ঢেলে দাও। এক চা চামচ নুন আর অল্প গোলমরিচ গুঁড়ো দিও। এবারে ঢাকা দিয়ে ফুটতে দাও। মিনিট দশেক বাদে ওতে ৬০০ মিলি জল ঢেলে দিয়ে ঢাকা দিয়ে আবার ফুটতে বসিয়ে দিও।  পনের মিনিট বাদে নামিয়ে নাও।  ঠান্ডা হলে হ্যান্ড ব্লেন্ডার বা মিক্সিতে পিষে নাও। এবারে ওতে দু চামচ ভিনিগার মিশিয়ে ফ্রিজে তুলে রেখে দাও। এক রাত বিশ্রাম পেলে ওর স্বাদ আরো বাড়বে। সেই কথাটা জান তো? স্টক আর স্টু যত পুরনো হয় তত স্বাদে বাড়ে। আগেকার দিনে ঠান্ডার দেশে কী করত জানো? ঘরে যে আগুনকুন্ড থাকত তাতে একটা একটা বড় হাঁড়ি চাপিয়েই রাখত। শুরুতে একবার হয়ত ঠিকঠাকভাবে সুপ বা স্টু বানানো হতো, তারপর থেকে যে যখন ইচ্ছে খানিক করে সবজি, বা মাংস বা মশলা বা জল ঢেলে দিত।  দিনের পর দিন সেটা ফুটতেই থাকত আর বেড়েই যেত। শেষ আর হত না।

২। পর দিন সকালে একটা বড় ডেকচিতে বাকি চিকেন স্টক আর এক গ্লাস জল মিশিয়ে ফুটতে বসাও। উনুন অল্প আঁচে রাখবে। এবারে মিক্সিতে চিকেন ডাম্পলিং বানানোর সব উপকরণ নিয়ে পিষে নাও। একটা বাটিতে এই মিশ্রণটা ঢেলে নিয়ে হাতে করে মেখে নাও যেমন আটা মাখে। যদি দেখো জল  বেরোচ্ছে তাহলে জলটা চেপে ফেলে দিয়ে আর একটা পাউরুটি হাতে ডলে মেখে নিও ভালো করে। এবারে হাতে করে ছোট ছোট গোল্লা পাকাও। এই পর্যায়ে ঋককে একটু সাহায্য করার চেষ্টা করার জন্য গম্ভীর গলায় মাকে বকে দিয়েছে ঋক “এটা কের (কার বলতে পারে না ঋক)  কাজ মা?  হ্যা? কের কাজ? আমার না তোমার? দেখছ না আমি রান্না করছি?’

৩। ওদিকে দেখো চিকেন স্টকটা এখন টগবগ করে ফুটছে।  ওতে পাঁচ ছটা করে গোল্লা এক একবারে ছাড় আস্তে করে। হাতে করে না দিয়ে একটা হাতায় গোল্লাগুলো নিয়ে আস্তে করে ডুবিয়ে দাও। দেখবে ওগুলো ডুবে গেছে। যেই ওগুলো সেদ্ধ হয়ে যাবে টুপ টুপ করে একটা একটা করে ভেসে উঠবে। এটা দেখতে ভারী মজা লাগে। যেই ওগুলো ভেসে উঠবে সাবধানে ছেঁকে তুলে একটা প্লেটে রাখো।

৪। এবারে ওই স্টকে আগে থেকে তৈরি বিটের সুপটা ঢেলে দাও। ভালো করে মিশিয়ে নিয়ে এক চামচ তুলে নিয়ে চেখে দেখো তো নুন ঠিক আছে কিনা। যদি লাগে আরো খানিক নুন আর গোলমরিচ গুঁড়ো মিশিয়ে নাও। এবারে পরিবেশনের পালা।

৫। শীতের দিনে এই সুপ গরম গরম খেও প্রচুর গোলমরিচ গুঁড়ো দিয়ে।  বাটিতে প্রথমে কয়েকটা চিকেন ডাম্পলিং দেবে। তারপরে উপর থেকে কয়েক হাতা সুপ। সাথে দুটো কড়কড়ে টোস্ট। শীত পালাবে বাপ বাপ বলতে বলতে।

৬। গরমের দিনে এই সুপ খেও ঠান্ডা ঠান্ডা। সাথে নিও এক চামচ টক দই। প্রাণটা একেবারে ঠান্ডা হয়ে যায়। 

ঋকের বড় প্রিয় এই সুপ।  বেশি চিবোতে হয় না, খেতে গিয়ে সময় নষ্ট হয় না, সাথে মুরগিও খাওয়া যায় আবার সবজি খাওয়া হয় বলে মাও খুশি থাকে। শুধু দৌড়ঝাঁপ একটু বেড়ে যায় এই যা। আর বকরবকরও।

রাঁধুনীঃ ঋকবাবু

রান্নাগুরুঃ তনুশ্রী মুস্তাফি

ছবিঃ তনুশ্রী মুস্তাফি

Leave a Reply