সেই মেয়েরা- সন্তোষকুমারীগুপ্তা-উমা ভট্টাচার্য-জয়ঢাক৪৮

সেই মেয়েরা সব পর্ব একত্রে

seimeyera4801

সন্তোষকুমারী গুপ্তার নাম শুনেছ কী কেউ? এই বাংলার কলকাতার কাছেই উনিশ শতকের অখ্যাত এক আধাশহর গরিফার এক স্বাধীনতাকামী বিদ্রোহী কন্যা।  ভারতবর্ষ তখন পরাধীন।প্রতিবেশী ব্রহ্মদেশেও  ইংরেজ শাসন চলছে। ১৯২৪ সালের ভারতে  স্বদেশী আন্দোলন চলছে পূর্ণোদ্যমে। এই অবস্থায়  মধ্যেই মাত্র একটাকা দামের  ‘শ্রমিক’  নামে একটি সাপ্তাহিক  পত্রিকা  প্রকাশিত হল কলকাতায়। সম্পাদিকা সন্তোষকুমারী গুপ্তা।  অভিনব এই পত্রিকা ছিল সমাজ়ের অবহেলিত খেটে খাওয়া শ্রমিকদের বিনোদনের জন্য  এক সাহিত্য পত্রিকা, যাতে সারা দেশের শ্রমিকদের খবরের সঙ্গে থাকত তাদের নিয়ে লেখা,আর তাদের লেখা গল্প, কবিতা। থাকতো তাদের আশা-আকাংক্ষার কথা, বঞ্চনার কথা, তাদের নিজেদের দাবিদাওয়ার কথা।

এই পত্রিকার  ২৮ শে নভেম্বরের পূজা সংখ্যাতে  ‘শ্রমিক’  শব্দটির মানে  খুব সুন্দর ভাবে লিখলেন তিনি  একটি কবিতায়—           

“বাহুর শকতি, চরণের বল,বুকের শোণিত, মাথার ঘর্মে,

ভূমি লক্ষ্মীরে উর্বর করি পল্লী-নগর সাজায় হর্ম্যে ।

অশনে বসনে ভূষিয়া সমাজে  পর্ণকুটিরে পাতে যে শয্যা,

বাসুকির সম মানবজগৎ  মস্তকে ধরি মুছায় লজ্জা।

ধনীর  ভ্রুকুটি  অঙ্গভূষণ, লাঞ্ছনা  যার  পারিশ্রমিক ;

ভোগ-সমুদ্র মন্থর বিষ যাহার ভাগ্যে- সেই না শ্রমিক”।

পত্রিকার সম্পাদিকা আর কবিতাটির রচয়িত্রীকে নিয়েই এবারের স্মৃতিচারণ। শ্রমিক পত্রিকার  পরবর্তী প্রতিটি  সংখ্যার  প্রথম পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত থাকত এই  অপূর্ব কবিতাটি।

তখন ১৯০৯ সাল। দক্ষিণ ব্রহ্মের মৌলমিন শহরের একটি আমেরিকান  মিশনারি  স্কুল। স্কুল বসবে, তার আগে সমবেত প্রার্থনা সঙ্গীত গাইতে হবে পড়ুয়াদের। ক্লাসে ঢুকলেন শিক্ষিকা । সবাই উঠে দাঁড়ালো । প্রতিদিন স্কুলে পিয়ানোর সঙ্গে ছাত্রীদের  গাইতে হত একটি গান, ‘রুল  ব্রিটানিয়া রুলস দ্য ওয়েভস’ –ব্রিটেনের রানির প্রশস্তি বন্দনাগীত।  একদিন সেই ক্লাসের  বারো  বছরের কিশোরী মেয়েটি ক্লাসের শিক্ষিকাকে জানালো সে এই গান গাইবেনা। মেধাবী ছাত্রীটি প্রিন্সিপালের খুবই প্রিয়। তাঁর কাছেও নালিশ গেল। তিনি  প্রিয় ছাত্রীটিকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন তুমি এ গান গাইবেনা?’’ মেয়েটি বিনা দ্বিধায় উত্তর দিল, “আমি একজন ভারতীয়, আমি দাস হতে চাইনা, তবে কেন আমি এ গান গাইবো? আমাদের দেশ ইংরেজের অধীন বলে বিদেশীরা সবাই আমাদের নেটিভ বলে, হেয় করে। আমি কেন সেই দেশের রানির বন্দনাগীত গাইব স্কুলে?” এই স্বাধীন মনোভাব আর সত্য বলার সাহস দেখে প্রিন্সিপাল তাকেই  সমর্থন করলেন।   

ছোট্ট মেয়েটির চেহারা খুব সুন্দর ছিল না ঠিকই, কিন্তু তার বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখ, আত্মপ্রত্যয়ী চেহারা সকলকেই আকৃষ্ট করত। বাবা প্রসন্নকুমার রায় ছিলেন  মৌলমিনে একজন  নামকরা ব্যারিস্টার। তাঁর চাকরির কারণে  ইংরেজের প্রতি তাঁর আস্থা আর ভক্তি দুইই ছিল। তাঁর মা ছিলেন কলকাতার নামকরা বিচারক ও স্বদেশপ্রেমী ব্যক্তিত্ব অক্ষয় সেনের মেয়ে- নগেন্দ্রবালা দেবী। তিনিও পিতার মতই ছিলেন স্বদেশপ্রেমী আর জনদরদি মহিলা। স্বাধীন মতপ্রকাশে তাঁর কোনও দ্বিধা ছিলনা। আর এইরকম দাদামশাই আর মায়ের কাছেই হয়েছিল মেয়েটির স্বদেশপ্রেমের দীক্ষা। সুদূর রেঙ্গুনে বাস করলেও বাংলাদেশের প্রতি  ভালবাসায়  ছেলেবেলা থেকেই তাঁর মন ভরে উঠেছিল।

তাঁর  স্কুলের অনেক শিক্ষিকাও ভারতীয়দের নিয়ে নীচু ধারণা  পোষণ করতেন আর সুযোগ পেলেই অন্য ছাত্রীদের সঙ্গে  সে কথা গল্প করতেন। শিক্ষিকাদের এই ভারতবিরোধী মনোভাব ছোট্ট মেয়েটিকে ক্ষুব্ধ আর বিদ্রোহী করে তোলে। আর তাই একদিন সে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়।

স্কুলের এই খবর বাড়িতে খবর পৌঁছুলে বাবার কাছে যথারীতি ধমক খেলো মেয়েটি , কিন্তু তাঁকে সমর্থন করলেন তাঁর তেজস্বিনী মা।  যে সময়ের কথা সে সময়ের চার বছর আগেই ইংরেজ ‘বঙ্গভঙ্গ’ ঘোষণা করেছে ।(১৯০৫ খৃস্টাব্দে )। সারা ভারত তথা বাংলাদেশে চলছে বঙ্গভঙ্গবিরোধী প্রবল আন্দোলন। বিদেশে থাকলেও নিয়মিত মায়ের কাছে দেশের খবর শোনে মেয়েটি, আর মনে মনে হয়ে ওঠে প্রবল ইংরেজ বিদ্বেষী। স্কুলে ভারতবিরোধী কথা শুনলেই  প্রকাশ হয়ে যেত তার রাগ। এই কারণেই ইংলণ্ডে গিয়ে পড়াশোনার জন্য মেয়েটি যে বৃত্তি পেয়েছিল, স্কুল কর্তৃপক্ষের আপত্তিতে সে সুযোগ তাকে দেওয়া হলনা। তাতে কোনও ক্ষোভ নেই তার। বরঞ্চ একটু একটু করে রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়লো মেয়েটি।

রেঙ্গুনে থাকতেই একটি স্কুলে শিক্ষিকার চাকরি পেয়ে গেল মেয়েটি, আর সেখানেই ‘সর্ব-ভারতীয় কংগ্রেস কমিটি’র ব্রহ্মদেশ শাখার  সদস্য হল মেয়েটি। পুলিশের নজর পড়লো তাঁর ওপর। বাবার  কাছে নালিশ  আর নির্দেশ এল মেয়েকে গৃহবন্দি করে রাখার। তখন তাঁর বয়স ২১ বছর। সময়টা ১৯১৮ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সবে শেষ হয়েছে।  ইংরেজবিরোধী রাজনৈতিক কাজকর্ম করার কারণে ব্রহ্মদেশ থেকে পুলিশ প্রহরায় তাঁকে পাঠানো হল কলকাতায় । তাঁকে  অন্তরীণ রাখা হল তাঁদের নৈহাটি- গরিফার বাড়িতে, স্বাধীনতার যুদ্ধের সময় যে বাড়ির পরিচিতি  ছিল “চরকা-বাড়ি” বলে।  ‘দেশবন্ধুর’ মন্ত্রশিষ্যা হলেন তিনি। সরাসরি ভারতীয় রাজনীতির মঞ্চে এলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের ডাকে।।  এই মেয়েটিই হলেন মফঃস্বল শহর নৈহাটির স্বল্পখ্যাত গ্রাম গরিফার মেয়ে, দেশের প্রথম মহিলা শ্রমিক নেত্রী  সন্তোষকুমারী গুপ্তা। স্বাধীনতার আন্দোলনের চারের দশক পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিতে যিনি ছিলেন অত্যন্ত সক্রিয় ,আজ তাঁর কথা অনেকেই জানেনা। প্রায় সবাই তাঁকে ভুলে গেছে। 

স্বদেশে এসেই বিদ্রোহিনী গান্ধিজির ডাকে সারা দিলেন ,কাজ করে চললেন দেশবন্ধুর নেতৃত্বে। সারা দেশে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন নানা মিটিং আর কংগ্রেসের নানা বাৎসরিক অধিবেশনে অংশ নিতে। ভালো বক্তা হয়ে উঠলেন। কাজ করতে শুরু করলেন লালা লাজপত রায়,মতিলাল নেহেরু,  সুভাষচন্দ্র বসু, সরলা দেবী চৌধুরানী, সরোজিনী নাইডু অ্যানি বেশান্ত  প্রমুখের সঙ্গে। কিন্তু তিনি যে বিশেষ কাজটির জন্য  সকল শ্রমিকের ‘মাইজি’ বা ‘মাইরাম’ হয়ে উঠলেন সেটি হল বাংলার  মিল শ্রমিকদের জন্য কাজ। তখনও সারা দেশে চটকল মজদুরদের নিয়ে কোনও মহিলা নেত্রী কাজ শুরু করেন নি। দেশে তখন  সাধারণ মানুষের মধ্যে , বাংলার  অত্যাচারিত তাঁতীদের মধ্যে, নীলচাষে বাধ্য হওয়া খাদ্যফসল উৎপাদনকারী কৃষকদের মধ্যে, ইংরেজবিরোধী মনোভাব যেমনভাবে বাড়ছিল তার সঙ্গে যুক্ত হল চটকল শ্রমিকদের ইংরেজ বিরোধী আন্দোলন। বাংলার মিল শ্রমিকদের দুর্দশার দিকে নজর  দেবার মত সংগঠন তখনও গড়ে  ওঠেনি মফঃস্বলে। এ কাজে এগিয়ে এলেন সন্তোষকুমারী দেবী। ১৯২৩ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘গৌরীপুর ওয়ার্কার্স এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশন’’। পরে ১৯২৪ সালে আরও অনেকের সঙ্গে মিলে গড়ে তোলেন “বেঙ্গল জুট ওয়ার্কার্স অ্যাসোসিয়েশন’’।  

শ্রমিক পত্রিকা প্রকাশের ব্যাপারে তাঁর প্রধান পৃষ্ঠপোষক ছিলেন দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস। শ্রমিকদের  উন্নয়নের জন্য কাজ করবার সঙ্গে সঙ্গে সন্তোষকুমারী শ্রমজীবী মহিলাদেরও শিক্ষার ব্যবস্থা করলেন।

দেশবন্ধু লিখলেন, “শ্রমিক স্বরাজকামী—তাই ‘শ্রমিক’(পত্রিকা) এই দরিদ্র উৎপীড়িত ও বহুভারাক্রান্ত নারায়ণের সেবার ভার গ্রহণ করিয়াছে।  —– ‘শ্রমিক’ এর এই নারায়ণ (দরিদ্র শ্রমজীবী) সেবা সফল হউক।” 

seimeyera4802

গরীব শ্রমিকদের  জন্য এক পয়সা মূল্যের এই রকম একটি অভিনব কাগজ প্রকাশ  করার জন্য সুদূর জাপান থেকে তাঁকে অভিনন্দন জানালেন বিপ্লবী রাসবিহারী বসু।  

সন্তোষকুমারীর মনে মানুষের নিঃস্বার্থ সেবা করার প্রেরণা ছিলেন তাঁর মা। ছোটবেলায়  দেশের বাড়িতে এলে  দাদুর কাছে(মাতামহ অক্ষয় কুমার সেন),মায়ের কাছে শুনতেন দেশের গরীব মানুষদের দুঃখ দুর্দশার কথা, দেখতেন তাঁর মা সামান্য সামর্থ্যের মধ্যেই কিভাবে  নিজেদের গরিফা  গ্রামের গরিব মানুষদের সাহায্য করতেন, দুঃস্থ মহিলাদের সাহায্য করতেন। কালীঘাটে বেড়াতে গেলে দেখতেন জগজ্জননীর মন্দিরের কাছেই ভিক্ষা করছে কত দুঃখী মানুষ, রোগে বিকলাঙ্গ হয়ে যাওয়া অশক্ত  ভিখারীরা। কেউ তাদের সাহায্য করছে ,কেউ আবার মুখ ফিরিয়ে  চলে যাচ্ছে। মায়ের মত তাঁরও চোখে জল আসতো এদের জন্য। ছোট্ট থেকেই তাঁর  মনে সঙ্কল্প তৈরি হয়েছিল যে, বড় হয়ে  অসহায়দের জন্য কিছু করবেন।

 তাঁদের নৈহাটির বাড়ির কাছেই ছিল গৌরীপুর জুটমিল। সেখানে তখন মিলমালিক আর মালিকের বিশ্বাসভাজন কিছু সর্দারদের অত্যাচারে শ্রমিকরা ছিল অত্যন্ত বিক্ষুব্ধ। আট ঘন্টা কাজ আর আর্থিক সুবিধার দাবিতে  তারা কাজ বন্ধ করে দিয়েছে মিলে, কিন্তু তাদের নেতৃত্ব দেবার কেউ নেই। মালিকও অনড়। ধর্মঘট চলছে, আর সঙ্গে বাড়ছে শ্রমিকদের  পরিবারে অনটন, তাদের ছেলেমেয়েরা খিদের জ্বালায় কাঁদছে।

বাড়িতে থেকেই সন্তোষকুমারী শুনেছিলেন এসব কথা। ১৯২২ সালের কথা। একদিন সকালে  বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ঘুরতে ঘুরতে চলে এলেন বাড়ির কাছেই জুটমিলের কুলিলাইনে। সেখানে এসে কুলি লাইনের শ্রমিক পরিবারের মানুষদের দুরবস্থা। দেখলেন ছেঁড়া কাপড় পরা, অভুক্ত, রোগাভোগা কিছু  মানুষ জটলা করছে নিজেদের   অবস্থা নিয়ে। এগিয়ে এলেন তিনি এদের আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে। তাদের সমস্ত অভাব অভিযোগের কথা তিনি ধারালো  ইংরেজিতে লিখে পাঠাতে লাগলেন মালিকের কাছে, আর শ্রমিকদের উৎসাহ দিলেন দাবি পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত ধর্মঘট চালিয়ে যেতে। তাঁর অনমনীয় দৃঢ়তা আর জোরালো চিঠিতে কাজ হল। মিলমালিকরা শ্রমিকদের দাবিদাওয়া মেনে নিলেন, কেউই ছাঁটাই হলনা। শ্রমিকরা ফের কাজে যোগ দিল। এইভাবে শ্রমিক আন্দোলনের এক আদর্শ নেত্রী হয়ে উঠলেন তিনি।

এছাড়া গান্ধীজির অসহযোগ আন্দোলনে, খিলাফৎ আন্দোলনে, মেয়েদের শিক্ষা আর অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেত্রীর ভুমিকায় দেখা দিলেন। খিলাফৎ আন্দোলনকারী মুসলিম সম্প্রদায় তাঁকে ‘খিলাফৎ মেমসাব’ বলে সম্বোধন করত। অবাংলাভাষী  শ্রমিকরা তাঁকে ডাকত ‘মাইরাম’ বলে।

 দেশবন্ধুর নেতৃত্বে কলকাতা কর্পোরেশনের এডুকেশন কমিটি গড়ে ওঠে। দেশবন্ধুর আমন্ত্রণে এডুকেশন কমিটির সদস্যাও হয়েছিলেন তিনি। মেয়েদের লেখাপড়া শেখানোর সাথে সাথে তাদের হাতের কাজ ও সেলাই শেখানো, স্বাস্থ্যবিধি শেখানো, ঘরবাড়ি ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার শিক্ষাও দিতেন। নারী জাগরণ ও নারীর  অধিকারের  সপক্ষে কাজ করতে  করতে  জ্যোতির্ময়ী দেবীর সঙ্গে মিলে  ‘নারী’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হলেন। শ্রমিকদের জন্য নিজ গ্রামে নাইট স্কুল খুললেন, সেখানে তাদের খবরের কাগজ থেকে পড়ে শোনানো হত দেশের অন্যান্য অংশের নানা খবর আর শ্রমিকদের খবর। স্থানীয় চিকিৎসকদের সহায়তায় বিনা পয়সায় শ্রমিক পরিবারের অসুস্থদের চিকিৎসা ও ওষুধের ব্যবস্থা করতেন।

শ্রমিক পত্রিকা পড়েই শ্রমিকরা নিজেদের অধিকারের সঙ্গে সঙ্গে কর্তব্য সম্বন্ধেও সচেতন হতে থাকেন। এই পত্রিকার প্রতিবাদী লেখার কারণে  একবার তিনি  ও পত্রিকার সহ সম্পাদক  গ্রেপ্তার  হন ও সাতদিন গৃহবন্দি থাকতে হয় তাঁকে। সব ভাষাভাষী  শ্রমিকের পাঠের সুবিধার  জন্য এই পত্রিকা বাংলা ,হিন্দি আর  উর্দু এই তিন  ভাষাতেই প্রকাশিত হতে শুরু করে কিছুদিনের মধ্যে । ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে কানপুরে কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনে বাংলার অন্যতম প্রতিনিধি সন্তোষকুমারী দেবীর হাত এই তিন ভাষায় প্রকাশিত পত্রিকাটির তিন হাজার কপি বিক্রি হয়েছিল, যে অর্থের সবটাই তিনি খরচ করেছিলেন  তাঁর শ্রমিককল্যাণের কাজে। ১৯২৭ সাল পর্যন্ত এই পত্রিকা চলেছিল। ১৯২৮ সাল থেকে রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন তিনি। পত্রিকা প্রকাশও নানা কারণে আর  চালু রাখা যায়নি ।

সমাজকল্যানমূলক কাজ তিনি কোনোদিনই বন্ধ করেন নি। মায়াপুর, বজবজ অঞ্চলে তাঁর প্রতিষ্ঠিত নানা সমাজসেবামূলক সংস্থাগুলো অবিস্মরণীয় কাজ করেছে। ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ‘সন্তোষকুমারী শিক্ষা নিকেতন’ আছে  দুর্গাপুরে। মায়াপুরেও রয়েছ এই বিদ্যালয়।

ব্রহ্মদেশের পতনের পরই তাঁরা ফিরে এসেছিলেন গরিফা গ্রামে। গান্ধীজীর  ভাবশিষ্যা তাঁর মা ১৯২৪ সালের পর থেকেই গ্রামের বাড়িতে চরকা বসিয়ে পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গ্রামের দুঃস্থ মহিলাদের  দিয়ে  সুতো কাটাতেন। আর সেইসঙ্গে গ্রামের অভাবী মহিলারা আয় করার সঙ্গে সঙ্গে স্বনির্ভর হতেও শিখছিল। তাদের কাটা  সেই সুতো কলকাতায় আনিয়ে  সন্তোষকুমারী দেবী  তাঁতে কাপড় বোনাতেন। ‘কলকাতার ডক্টরস লেনে’  নিজের বাসগৃহে তিনি তাঁত  বসিয়েছিলেন। চরকায় কাটা দেশীয় সুতো দিয়ে দেশীয় তাঁতীদের দিয়ে তিনি বোনাতেন দেশীয় কাপড়। স্বদেশী জিনিসের ব্যবহার বাড়াতে আর বিলিতি দ্রব্য বর্জনের আন্দোলনের দিক থেকে তাঁর এই কাজ ছিল পূর্ণমাত্রায় স্বদেশী। এই সন্তোষকুমারীই ছিলেন মৌলমিন এর স্কুলের সেই ইংরেজ বিরোধী স্বাধীনচেতা ছোট্ট মেয়েটি। ১৯৮৯ সালের ১৯শে সেপ্টেম্বর এই মহিয়সী নেত্রীর মৃত্যু হয়। তাঁর নিজের জায়গা নৈহাটিরও অনেকেই হয়তো এখনো জানেনা তাঁর কথা। এই লেখার মাধ্যমে জয়ঢাকের তরফে সেই মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হল।              

Leave a Reply