সেই মেয়েরা- হটী বিদ্যালঙ্কার-উমা ভট্টাচার্য-জয়ঢাক৪৯- বসন্ত ২০১৫

সেই মেয়েরা সব পর্ব একত্রে

seimeyera49

অষ্টাদশ শতকের শেষভাগ। ভারতবর্ষে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসন চলছে। সে সময় ভারতে, বিশেষত বাংলাদেশের  গ্রামগুলিতে, প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থায় বিদ্যাশিক্ষা চলতো। সমাজে লেখাপড়ার চল বলতে ছিল টোল আর চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত  ভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা। ন্যায়শাস্ত্র, স্মৃতি, ব্যাকরণ,কাব্য,আর বৈদ্যকশাস্ত্র (আয়ুর্বেদ চিকিৎসা শাস্ত্র)ছিল শিক্ষার বিষয়। তবে সেই শিক্ষার অধিকার ছিল প্রধানত ব্রাহ্মণ আর বৈদ্য ছেলেদের।নীচু জাতির বা ভিন্ন ধর্মের মানুষের সে শিক্ষালাভের অধিকার ছিল না।আর মেয়েদের পড়াশোনার কথা তো মনেই আনা যেতনা। নারী শিক্ষা আন্দোলন তখনো শুরুই হয়নি পুরোদমে। সংস্কৃতসহ যে কোন শিক্ষার দুয়ার মেয়েদের কাছে বন্ধই ছিল। নানা কুসংস্কারের আর বিধিনিষেধের জালে আবদ্ধ রাখা হত মেয়েদের। বদ্ধমূল ধারনা ছিল যে, মেয়েরা পড়াশোনা শিখলে বিধবা হয়।

এইরকম সমাজের এক ব্যতিক্রমী নারী ছিলেন হটী বিদ্যালঙ্কার। জন্মস্থান বর্ধমানে। উদার চিন্তার মানুষ ছিলেন হটীর বাবা। পান্ডিত্যে এই মহিলা ছিলেন যেকোন পুরুষ পন্ডিতদের সমকক্ষ। সেই যুগে টোল, চতুষ্পাঠী স্থাপন করে ছাত্রদের পাঠদান করতেন প্রকাশ্যে।

বেদের যুগে মেয়েদের যে পৈতে হত,তাদের যজ্ঞ করার যে অধিকার ছিল, আর তাদের লেখাপড়ার যে অধিকার ছিল, যাজ্ঞবল্ক্য নামে এক মুনি ৩০০ খ্রিষ্টাব্দে তা নিষিদ্ধ করে দেন। আর তার পর থেকে সবাই সেটা মেনেই চলত। সেই সময়ে যে সব বিদূষীরা ছিলেন তারা মূলত লুকিয়ে বিদ্যাচর্চা করতেন। বাইরে প্রকাশ হতনা। আঠারো,উনিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত সামান্য কয়েকজন মহিলা বিদূষী টোল পড়ুয়ার বিরল দৃষ্টান্তের একজন হটী বিদ্যালঙ্কার।

রাঢ়দেশের বর্ধমানের সোঞাই গ্রামের এক কুলীন ব্রাহ্মনের একমাত্র মেয়ে ছিলেন হটী। ছেলেবেলায় মা মারা যাওয়ার পর ঘরের কাজকর্ম করার সাথে সাথে শুনতেন পিতা টোলের ছাত্রদের কী কী পড়াচ্ছেন। শুনেশুনেই ব্যাকরণ,ন্যায়,কাব্য-এইসবকিছুর অনেকগুলিই তিনি মুখস্থ করে ফেলেছিলেন। তখনকার দিনে একটি হাতেলেখা পুঁথি থেকে পন্ডিত মশায় পড়াতেন আর ছাত্রদের তা স্মৃতিতে ধারণ করতে হত। অসাধারণ স্মৃতির অধিকারিণী, অধ্যাবসায়ী হটী সেই সবই আত্মস্থ করেছিলেন নিজের চেষ্টায়।

এই সময় সামাজিক নিয়মে এক কুলীন পাত্রের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়ে যায়, তখন কুলীন ব্রাহ্মণরা বহুবিবাহ করতেন, তাই বিয়ের পরেও অনেক মেয়েকে বাপের বাড়িতেই থাকতে হত। হটীকেও তাই থাকতে হল। ফলে বাবার কাছে তাঁর পাঠও চলতে লাগলো গোপনে।

কিন্তু কিছুদিনের মধ্যেই বয়স্ক স্বামীর মৃত্যু হলে বিধবা হলেন হটী। বাবাকে বললেন, “বই, কলম হাতে নিয়ে পড়াশোনা করলে তো মেয়েরা বিধবা হয়, তবে আমি কেন বিধবা হলাম? আর বিধবা হলাম যখন,  তখন তো আমার পড়াশোনায় কোনও বাধা নেই। আমি পড়বো”। 

বাবা তাঁকে এইবার সযত্নে পড়াতে লাগলেন একান্তে। তিনি জানতেন শাস্ত্রে আছে  “কন্যাকেও পুত্রেরই মত সমানভাবে পালন করতে হবে,আর তাদের যত্ন করে বিদ্যাশিক্ষাও দিতে হবে।” ক্রমে হটী ‘নব্যন্যায়’ নামের সংস্কৃত বিষয়টিতেও অতিশয় পন্ডিত হয়ে উঠলেন।

কিছুকাল পরে বাবা মারা যেতে প্রকাশ্যে টোলের ছাত্রদের শিক্ষা দেবার ভারও হটীর ওপরে পড়ল। এইবারে ব্রাহ্মণ পন্ডিতেরা ক্ষেপে উঠলেন মেয়েটার স্পর্ধা দেখে। তাঁরা প্রতিরোধ শুরু করলেন।টোলের ছাত্ররা স্ত্রীলোকের কাছে আর বিদ্যাগ্রহণ করতে পারল না সমাজের চাপে। তারা একে একে টোল ছেড়ে চলে গেল। প্রচন্ড অর্থাভাবে পড়লেন হটী, সঙ্গে সামাজিক প্রতিকূলতা।

সমাজের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে অবশেষে তিনি কাশী চলে গেলেন। তখনকার দিনে অসহায়, সম্বলহীন বিধবাদের একমাত্র আশ্রয় ছিল কাশী। তবে হটী সেখানে গিয়েছিলেন নিজের জ্ঞানের সম্পদ সঙ্গে করে।

কাশীতে গিয়ে তিনি স্মৃতি, ব্যাকরণ ও নব্যন্যায়শাস্ত্রের জ্ঞানী পন্ডিতা হিসাবে ক্রমে পরিচিত হয়ে উঠলেন এবং একসময় নিজের টোল খুললেন কাশীতে। দলে দলে ছাত্র আসতে লাগল দেশবিদেশ থেকে। গৌড় দেশের ও কাশীর অনেক ছাত্রকে পড়িয়েছেন তিনি। নব্যন্যায়ের অধ্যাপিকা হিসাবে তাঁর প্রচুর নামডাক হল। এই সময় কাশীর পন্ডিতেরা তাঁকে ‘বিদ্যালঙ্কার’ উপাধি দিয়ে সম্মানিত করলেন। কাশীতে বিভিন্ন বিচারসভাতে পুরুষ পন্ডিতদের সঙ্গে তাঁরও ডাক পড়তো, এবং তিনি পুরুষ পন্ডিতদের মত বিদায় দক্ষিণাও নিতেন কারণ এই ছিল তাঁর জীবিকা। পন্ডিতদের মত নেড়া মাথায়  টিকিও রাখতেন তিনি।

      যে সময়ে শঙ্কর তর্কবাগীশ, জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের মত যশস্বী মহাপন্ডিতেরা শিক্ষার আকাশে বিখ্যাত হয়ে বিরাজ করছেন সেই সময় এক বিধবা মহিলা নিজের দক্ষতার আর সাহসের সঙ্গে একলা বারাণসীতে টোল প্রতিষ্ঠা করে এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত স্থাপন  করেছিলেন, পান্ডিত্যে তিনি বাংলার ও বাঙালির গৌরব যে কতখানি বৃদ্ধি করেছিলেন তা বোঝা যায় মনস্বী রাজনারায়ণ বসু তাঁর ‘সেকাল আর একাল’ বইটিতে তাঁর নাম উল্লেখ করা থেকে। এ ছাড়া শ্রীরামপুর মিশনের উইলিয়াম ওয়ার্ড তাঁর লেখা বই “হিন্দু”তে, জগন্নাথ তর্কপঞ্চাননের নামের সঙ্গে তাঁর নামটিও উল্লেখ করেছেন (১৮০৬-১৮০৭ খৃস্টাব্দে)তখনও তর্কপঞ্চানন মশাই বেঁচে  ছিলেন। তর্কপঞ্চানন মশায়ের মৃত্যুর তিন বছর পরে ১৮১০ খৃস্টাব্দে কাশীতেই হটী বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যু হয়।

১৮১৭ খৃস্টাব্দে স্থাপিত স্কুল বুক সোসাইটি প্রকাশিত “স্ত্রী শিক্ষা বিষয়ক” নামক পুস্তকে তাঁর সফলতা আর পাণ্ডিত্যের কথা সম্মানের সঙ্গে উল্লিখিত হয়েছে।

আজ এই সামান্য স্মৃতিচারণের মধ্যে দিয়ে এই মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাই ।

              

Leave a Reply