
এক ছিল বিলাই আর এক ছিল উলাই। দুজনের বেজায় ঝগড়া। এতটুকুনিও ভাবসাব নেইকো, মিলমিশ নেইকো। বিলাই যখনই উলাইকে দেখতে পায় তখনই তেড়েমেড়ে কামড় দিতে, মারামারি করতে ছোটে। উলাইও কম যায় না। সেও বিলাইকে রাগিয়ে দিয়ে এদিক সেদিক গড়গড়িয়ে পালায়। কখনও গিয়ে ঢোকে খাটের তলায়, আবার কখনও লুকোয় বুনুনি বুড়ির বেতের ঝুড়ির ভেতর। মোট কথা, বিলাই কিছুতেই সহজে উলাইয়ের নাগাল পায় না। শুধুই রেগে দাঁত কিড়মিড় করে আর ঘুসি পাকায়। পিঠটা ধনুকের মতো বাঁকিয়ে বড়ো বড়ো নখ বার করে মিয়াঁও মিয়াঁও করে ডাক ছাড়ে। তাতে উলাইয়ের ভারি বয়েই গেছে। সে বহাল তবিয়তে বেতের ঝুড়িতে বসে বসে নিজের সব সাথীদের কাছে কেমন করে বিলাইকে বোকা বানিয়েছে সেই কাহিনি শোনায়। আর সেই শুনে বিলাই টেবিলের তলা থেকে গরগর করে আর থাবা চাটে। মনে মনে ভাবে, ‘খুব বাড় বেড়েছে বেতের ঝুড়ির উলের গোলাগুলোর। বিশেষ করে ওই মোটাসোটা গোলপানা ইয়া বড়ো লাল টুকটুকে উলের গোলাটার। খালি এ-পাশ ও-পাশ গড়াবে আর বিলাইকে একেবারে পরোয়াই করবে না। এত বড়ো সাহস! রোসো। একদিন বিলাইও যদি গোটা গোলাটা ঘরময় খুলে জড়িয়ে-মড়িয়ে ছিঁড়ে-খুঁড়ে একশা না করেছে তবে বিলাই নিজেকে আর বিড়াল বলে পরিচয়ই দেবে না। ওই যে ওই বুনুনি বুড়ির ভাঁড়ার ঘরে ইঁদুরটা থাকে, ওর মতোই গা-ঢাকা দেবে। অপমানে মুখ লুকোবে।’
বিলাইয়ের নাজেহাল দশা দেখে পাশের বাড়ির হুলোটাও পাঁচিলে বসে বসে কেমন খিকখিক করে হাসে। সামান্য একটা উলের গোলাকেও যে সামলাতে পারে না সে কেমন বিড়াল শুনি! বিড়াল সমাজে এসব কায়দা তো একেবারে গোড়ার দিকেই শেখানো হয়। উলের গোলা নিয়ে খেলা, সুতোয় জট পাকানো, আলোর ফুটকি নড়তে চড়তে দেখতে পেলেই তাড়া করা, নরম গদি আঁচড়ে-কামড়ে তুলো বার করে দেওয়া—এগুলো তো চোখ ফোটার পরেই শিখতে হয়। পরের ধাপে ইঁদুর কী করে ধরতে হয় সেই কেরামতি শেখার পালা। তারও পরের ধাপে শিখতে হয় মানুষদের নজর এড়িয়ে দুধটা মাছটা টুক করে তুলে নিয়ে ছুটে পালানোর কায়দাটি। এত কিছু শেখার পরেও যদি বিলাই এমনি করে লেজেগোবরে হয় তাহলে বিড়াল সমাজে মুখটা কেমন করে দেখায় বল দিকি!
এদিকে লাল টুকটুক উলাইয়ের মাথাতেও নানারকম বদমাইশি মতলব ঘোরে বিলাইয়ের সঙ্গে ঝামেলা করার। উলাই করবে কী, গোলার লাল ডগাটা তিড়িং-বিড়িং করে বিলাইয়ের নাকের ডগায় নাচাবে, ভেংচি কাটবে, আবার ছড়া বাঁধবে—
বিলাই বিলাই বিলুনি
দুধের কড়ায় নাচুনি
গাইছে দেখো কাঁদুনি
বিলাই বিলাই বিলুনি।
হয়েছে কী, একদিন বিলাই টেবিলে রাখা দুধের কড়াইতে মুখ ডুবিয়ে দুধ খেতে গিয়ে সেই কড়াইয়ের ভেতরেই উলটে পড়ে গিয়েছিল। তারপর দুধে ভিজে চুপচুপে হয়ে ভয়ের চোটে ডাক ছেড়ে কাঁদতে শুরু করেছিল। আর সেই না দেখে উলাই আর তার দলবলের বেতের ঝুড়ির ভেতর থেকে সে কি হাহা হিহি হাসি। শুধু কি হাসি? ওই দু-খানা উলের কাঁটা দিয়ে আবার বিলাইকে খোঁচাও দিয়েছিল ওরা। নেহাতই বুনুনি বুড়ি এসে কাঁটাগুলো কেড়ে নিয়েছিল তাই বাঁচোয়া। তারপর বুনুনি বুড়ি দুধের কড়া থেকে বিলাইকে তুলে জলে ধুয়ে মুছিয়ে রোদে শুকতে দিয়েছিল শেষমেশ। সে আর-এক বিপদ। তোমরা তো জানোই যে বেড়ালরা একদম জল ভালোবাসে না, চান করতে চায় না। আর দুধে ভেজার পর ফের সেই জল দিয়েই কিনা বিলাইকে আবার চান করতে হল! যাকে বলে ডবল বিপদ, ডবল সাজা। আর সেই থেকে উলাইরা ওই ছড়াটি আওড়ে রাগাবে শুধু বিলাইকে। এ কেমন কথা বলো দিকি তোমরা? অমন একটু আধটু বিপদ-আপদ ঘটন-অঘটন তো সবারই হয়! তাই বলে কি সবসময় এমন করে রাগাতে আছে কাউকে?
সেই থেকে বিলাইও নজর করে থাকে কেমন করে উলাইকে সাজা দেওয়া যায়। খানিকটা উল টেনে জড়িয়ে-মড়িয়ে দিলে উলাই যখন এই পুঁচকে একটা উলের গোলা হয়ে যাবে তখন বুঝবে মজা। বদমাইশি করা বেরিয়ে যাবে তখন। নানারকম মতলব ভাঁজে বিলাই।
একদিন হল কী, বুনুনি বুড়ি ঝোলায় ভরে উলের টুপি, উলের জামা, উলের পা-মোজা, উলের হাত-মোজা, উলের মাফলার, উলের চাদর, উলের সোয়েটার—আরও কত কত জিনিস নিয়ে হাটে গেল বেচতে। সেই সুযোগে বিলাই লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে টেবিলের ওপর কোনোমতে উঠে হামলা করল বেতের ঝুড়ির ভেতর। তারপর লাল-নীল-সাদা-কালো-হলুদ-সবুজ-খিচুড়ি নানা রঙের উলের গোলাগুলো টেনেটুনে খুলে একশা করতে শুরু করল। গোলাগুলো তো একবার গড়গড়িয়ে এদিকে যায়, আর-একবার ওদিকে যায় বিলাইয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য। টেবিল থেকে লাফ মেরে নীচে নেমে খাটের তলায় লুকোয়। চারদিকে ‘পালাও পালাও! বাঁচাও বাঁচাও!’ রব শুধু। এদিকে উলের গোলাদের হারিয়ে লড়াই জিতে বিলাই তো মহা খুশি। শুধু একটু আপশোশ, আসল বদমাশ লাল টুকটুক উলাইটা কোথায় গিয়ে যে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে পড়ল একটু পরেই কী জানি! তাকে আর দেখতে পেল না বিলাই—নইলে আজ বিলাই গোটা গোলাটাই খুলে ভোঁ ভাঁ করে দিত।
এদিকে বিকেল গড়িয়ে আঁধার নামতে হাটবাজার উঠে যেতে বুনুনি বুড়ি বাড়ি ফিরল। ঘরে ঢুকে তো বেচারার মাথায় হাত। সব উলের গোলা চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিঁড়েখুঁড়ে একাকার হয়ে পড়ে আছে। বিলাইটা তার মাঝখানে বসে বসে থাবা চাটছে। বুনুনি বুড়ির আর বুঝতে বাকি রইল না যে তার আদরের বিলাইবাবুই এই কাজটি করেছেন। তোমরা ভাবছ বুঝি বুনুনি বুড়ি বেজায় রেগে গিয়ে বিলাইকে বকবে মারবে কিংবা হয়তো ঘর থেকেই বার করে দেবে? উঁহু! আসলে বুনুনি বুড়ি সেরকম রাগী মানুষই নয়। উলের মতন নরম নরম জিনিস যে বোনে তার মনটা কি কখনও কঠিন হতে পারে? বুনুনি বুড়ি তাই বিলাইকে কিছু না বলে তাকে কোলে তুলে রেখে এল কাগজের বাসকো-বাসার ভেতর। তারপর হেথাহোথা থেকে খুঁজেপেতে উলের গোলাগুলো বার করল। তারপর সেগুলোর জট ছাড়িয়ে ফের নতুন করে দুই হাতের আঙুলের ফাঁকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গোল গোল গোলা পাকাল।
এদিকে বিলাইয়ের মনটা একটু একটু খারাপ হতে শুরু করল। উলাইদের ওপর বদলা নিতে গিয়ে বুনুনি বুড়িকেই সাজা দেওয়া হয়ে গেছে। বেচারা কত খাটুনি সয়ে একটা একটা উলের জিনিস বানায়, হাটে বেচে। এটা মোটেই উচিত হয়নি বিলাইয়ের। ছিঃ ছিঃ!
ওদিকে একদিন কাটে, দু-দিন কাটে, বিলাই দেখে বেতের ঝুড়িতে বাকিসব নানা রঙের উলের গোলা থাকলেও লাল টুকটুক উলাইটা নেই। বিলাইয়ের শুরুতে অতটা কিছু মনে না হলে যত দিন গড়ায় মনটা আরও খারাপ করে। গেল কোথায় উলাইটা? একবারে খুলে ফেলেনি তো বিলাই লাল টুকটুক গোলাটা? উলাই কি তবে মরেই গেল? বুনুনি বুড়ি কি পারল না ফের উলাইকে গুটিয়ে ফের গোলা বানাতে অন্য গোলাগুলোর মত? বিলাই তো উলাইয়ের ওই পচা ছড়াটাও শোনার জন্য মন কেমন করছে। আহা, সারাদিন বিলাইকে রাগালেও কেমন একটা যেন একসঙ্গে থাকা দুজনেরই অভ্যেস হয়ে গিয়েছিল। বিলাইয়ের আর লাফাতে মন লাগে না, আলোর ফুটকি তাড়া করতে ভালো লাগে না, এমনকি বুনুনি বুড়ি দুধটা মাছটা ওর নাগালের ভেতর ফেলে রেখে দিলেও ঘুরে তাকায় না বিলাই। এই তো সেদিন ভাঁড়ার ঘরের ইঁদুরটাও লেজ নেড়ে ওর নাকের ডগা দিয়ে চলে গেল, তবু বিলাইয়ের একবারও থাবা ছুড়তে মন চাইল না। এমনধারা মনখারাপ হবে জানলে কি আর বিলাই অমন খারাপ কাজটি করত গো?
দেখতে দেখতে দিন পনেরো কেটে গেলে। একদিন বিকেলে বিলাই দুঃখী দুঃখী মুখে বসে আছে, এমন সময় বুনুনি বুড়ি শিগগির হাট থেকে বাড়ি ফিরেই ডাকাডাকি শুরু করল—“ও বিলাই! কোথা গেলি বাছা! আয় তোর জন্য কী এনেছি দেখে যা বাবা। দোকানের কেনাবেচা সেরে কি আর বেশি সময় পাই রে? তাও এটা বানালুম তোর জন্য। দেখ দেখি বিলাইসোনা কেমন লাগে। মাপজোখ ঠিক হল নাকি? আমি বুঝতে পেরেছি সেদিন তুই কেন ওই উলের গোলাগুলো নিয়ে টানাটানি করেছিলি। ভাবছিলি বুঝি এই বুনুনি বুড়ি রাজ্যের সবার জন্য উলের জিনিস বানায় আর বিলাইসোনার জন্যই কিছু বানিয়ে দিল না আজ অবধি? আমারই ভুল বাছা। এবার দেখ তো এই লাল টুকটুক…”
বুনুনি বুড়ি বকবক করতে করতে ঝুলি থেকে একটা চার হাত-পাওয়ালা লাল সোয়েটার, দুটো হাত-মোজা, দুটো পা-মোজা একটা পুচকু লাল টুপি—কত কী জিনিস বার করে করে পরাতে শুরু করল বিলাইকে। বিলাই তো অবাক চোখে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে আর কান খাড়া করে শুনতে পায় কে যেন বলছে—‘কী ভেবেছিলে বিলাইবাবু? এত সহজে আমার হাত থেকে রেহাই পেয়ে যাবে? এবার থেকে কেমন সবসময় আমি তোমার গায়ে গায়েই থাকব। হি হি হি হি! কী মজা! চিনতে পারছ লাল টুকটুক উলাইকে?’
এই শুনে বিলাই রেগে যাওয়ার বদলে এত এত খুশি হল যে কী বলি তোমাদের। খামোখা এতদিন ধরে ভয় পেয়েছে, মনখারাপ করেছে। উলাই বুঝি হারিয়েই গেছে, মরেই গেছে এইসব আজেবাজে কথা ভেবেছে। আর দেখো কী হল! বুনুনি বুড়ি হাটে বসে বসে মাল কেনাবেচার ফাঁকে লাল টুকটুক উলাই দিয়ে বিলাইয়ের জন্য গরম পোশাক তোয়ের করছিল এতদিন। সেইজন্যই বিলাই উলাইয়ের দেখা পায়নি আর এখন দেখা পেল একেবার আলাদা রূপে। থাক এবার উলাই সবসময় ওর গায়ে। নাক দিয়ে একটু হাতের লাল টুকটুক হাত-মোজাটা ঘষে, জিভ দিয়ে চেটে নিল বিলাই। অমনি ফের কে যেন বলে উঠল—‘আহা করো কী, করো কী! কাতকুতু লাগে যে!’
সেই শুনে বিলাইয়ের গোঁফের ফাঁকে যে একটা মুচকি হাসি ঝিলিক মারল, সেটা কি তোমরা দেখতে পেলে?
ছবি – সুকান্ত মণ্ডল
খুদে স্রষ্টাদের সমস্ত কাজের লাইব্রেরি