উপন্যাস সোনালী ভেড়ার লোমের খোঁজে-দেবদুলাল কুণ্ডু শরৎ ২০২১

uponyasSonaliBhera1

এক

ছোট্ট রাজ্য আয়োলকাস। এখানকার বৃদ্ধ রাজা হলেন এইসান। একটু বেশি বয়সেই তিনি পুত্রসন্তান লাভ করেছিলেন, ছেলের নাম রেখেছিলেন জেসান। রাজকুমার জেসান এখন নাবালক। রাজা এইসান ভীষণ চিন্তিত, নিজের শরীরের যা অবস্থা তাতে আর কতদিন তিনি রাজ্যশাসন করতে পারবেন, সে ব্যাপারে সন্দেহ আছে। অন্যদিকে ভাই পেলিয়াসকেও সিংহাসনে বসাতে তাঁর মন সায় দিচ্ছে না। এর প্রধান কারণ পেলিয়াসের অত্যাচারী মনোভাব, প্রজারা তার উপর অসন্তুষ্ট। কিন্তু কী করা যায়? রাজা এইসান ক’দিন ধরে যখন এই চিন্তায় মশগুল, তখন একদিন ভাই পেলিয়াস তাঁকে যুক্তি দিল, “দাদা, আমি জানি রাজা হবার কোনও যোগ্যতাই আমার নেই, কিন্তু তোমার অসুস্থতার কথা ভেবেই আমি পরামর্শ দিচ্ছি কুমার জেসানকে সিংহাসনে বসিয়ে তুমি অবসর নাও।”

“কুমার এখন খুবই ছোটো, রাজ্যপরিচালনার কিছুই সে জানে না। কীভাবে ওর উপর শাসনভার চাপিয়ে দিই বলো!” রাজা মাথা নাড়লেন।

“কিছু যদি মনে না করো, একটা কথা বলি। তোমার রাজ্যের উপর আমার বিন্দুমাত্র লোভ নেই। জেসানকে তুমি যুবরাজের পদে বসাও আপত্তি নেই, শুধু আমাকে ওর অভিভাবক করে দাও। আর তুমি তো মাথার উপর রইলেই। আ-আমার দেহেও তো রাজরক্ত বইছে, নাকি? আমি তোমায় কথা দিচ্ছি, ও যেদিন সাবালক হয়ে উঠবে, সেদিন আমি ছুটি নেব।”

এইসান ভাবলেন যুক্তিটা মন্দ নয়। প্রকাশ্যে বললেন, “আমি কয়েকদিন ভাবি, তারপর সিদ্ধান্ত জানাচ্ছি।”

কয়েকদিন ভাবনাচিন্তা করে রাজা পেলিয়াসের পরামর্শকেই মেনে নিলেন। একটা ভালো দিন দেখে তিনি অবসর নিলেন, রাজপদে অভিষিক্ত করলেন রাজকুমার জেসানকে। যতদিন রাজকুমার নাবালক থাকবেন, জেসানের অভিভাবক হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার থাকবে পেলিয়াসের উপর। এককথায় জেসানের হয়ে পেলিয়াসই রাজ্যশাসন করবে। এইসানের এই সিদ্ধান্তে প্রজারা খুব একটা খুশি হল না, কিন্তু বাধ্য হয়ে মেনে নিতে হল তাদের।

তবে পেলিয়াস হাতে স্বর্গ পেল। কিন্তু তাড়াহুড়ো করল না সে। সে জানে সবুরে মেওয়া ফলে। এখন ধীরে ধীরে পাত্র-মিত্র-পারিষদদের দলে টানতে হবে। তারপর গোটা রাজ্যকে আনতে হবে হাতের মুঠোয়। সবার আগে করতে হবে জেসানের একটা ব্যবস্থা। পেলিয়াস একটা মতলব আঁটল। একদিন এইসানকে বলল, “দাদা, জেসানকে উপযুক্ত শিক্ষা দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। তবেই সে আগামী দিনে তোমার মতো দক্ষ শাসক হয়ে উঠবে।”

“তোমার পরামর্শ খারাপ নয়, তবে ও তো পুথিপত্র পড়ছে—সংগীত শিক্ষা, ধর্মশাস্ত্র…” এইসান বললেন।

“না, আমি আসলে তলোয়ার চালনা, অশ্বচালনা এবং রাজনীতি ও রণনীতি শিক্ষার কথা বলছি।”

“ভালো প্রস্তাব। ঠিক আছে, এগুলোর জন্য সেরা প্রশিক্ষকদের নিযুক্ত করো।”

পেলিয়াস আগে থেকেই সব ঠিক করে রেখেছিল। পরের দিন থেকে আরম্ভ হল জেসানের প্রশিক্ষণ। কয়েকদিন বেশ ভালোভাবেই চলল সব। কিন্তু পরপর দুটো দুর্ঘটনায় এইসান ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়লেন। একদিন প্রশিক্ষকের তরবারির খোঁচায় আহত হল সে, আরেকদিন ঘোড়ায় চাপতে গিয়ে ঘোড়াটা লাফিয়ে উঠে মাটিতে ফেলে দিল জেসানকে।

একদিন এক বিশ্বস্ত গুপ্তচর দেখা করল এইসানের সঙ্গে। “মহারাজের জয় হোক।”

“বলো কী সংবাদ এনেছ।”

“মহারাজ, আপনার পুত্র রাজা জেসানের সামনে ভীষণ বিপদ।”

“তার মানে? কী বলছ তুমি চর!”

“আপনার ভাই পেলিয়াস তাঁকে হত্যার জন্য গভীর ষড়যন্ত্র করছেন।”

এইসান আশঙ্কা করেছিলেন জেসানকে নিয়ে, কিন্তু এতটা ভাবতে পারেননি। জেসান তাঁর নয়নের মণি। তিনি বেশ বুঝতে পারলেন, পেলিয়াসের বিছানো ফাঁদে তিনি ধরা পড়ে গিয়েছেন। এখন কীভাবে জেসানকে বাঁচানো যায়, তাই নিয়ে চরের সঙ্গে গভীর আলোচনায় বসলেন।

পরের দিন তিনি ডেকে পাঠালেন পেলিয়াসকে।

“জেসানের প্রশিক্ষণ কেমন চলছে বলো।” এইসান বললেন।

“শুরুতে ভালোই চলছিল। কিন্তু আগের জনকে ছাড়িয়ে নতুন একজন তলোয়ার প্রশিক্ষক নিয়োগ করা হয়েছে, আর ওই ঘোড়াটা ছিল অসুস্থ।” নরম গলায় বলল পেলিয়াস।

“আমি দুর্ঘটনার কথা বলছি না, ও তো ঘটতেই পারে। এগুলো শিক্ষার অঙ্গ। আমার বক্তব্য হল, জেসানের প্রশিক্ষণ ঠিকঠাক চলছে না। আমি প্রাসাদের উপর থেকে সেদিন দেখছিলাম। তাই আমি ভেবেছি আমার পছন্দের শিক্ষক আমি নিয়োগ করতে চাই ওর জন্য। কিন্তু এই মুহূর্তে প্রশিক্ষকদের পরিচয় আমি গোপন রাখতে চাইছি।” দৃঢ়তার সঙ্গে বললেন এইসান। মুহূর্তে কালো হয়ে গেল পেলিয়াসের মুখ। বিরস বদনে সে বিদায় নিল।

দুই

আয়োলকাস শহর থেকে অনেক দূরে পাহাড়ি গুহায় বাস করে সেন্টুর প্রজাতির মানুষেরা। এদের মাথা থেকে কোমর পর্যন্ত মানুষের দেহ, আর কোমরের নীচে থেকে ঘোড়া। এরা একই সঙ্গে বলবান ও বুদ্ধিমান। এদের ভেতরে সবচেয়ে জ্ঞানী হলেন কিরো। একবার রাজা এইসান গুহাবাসী এই সেন্টুরদের উপকার করেছিলেন। সেই সময় কিরো তাঁকে বলেছিলেন, “মহারাজ, যদি কোনোদিন কোনোভাবে আপনার উপকারে আমরা লাগতে পারি, তবে কৃতার্থ হব।”

আজকে রাজার হঠাৎ মনে পড়ল কিরোর কথা। তাছাড়া ওরা শহর থেকে অনেক দূরে থাকে। তাই জেসানকে যদি ওদের কাছে রেখে আসা যায়, তবে পেলিয়াস ওর কোনও ক্ষতি করতে পারবে না।

কয়েকজন বিশ্বাসী অনুচর সঙ্গে করে ছেলেকে নিয়ে রাজা এইসান রওনা দিলেন সেন্টুরদের পাহাড়ি গুহার দিকে। তাঁদের পৌঁছতে বিকেল হয়ে এল। পাহাড়ের কাছাকাছি আসতেই রাজা দেখতে পেলেন হাতে বর্শা আর তলোয়ার উঁচিয়ে কয়েকজন সেন্টুর তাঁদের দিকে সন্দেহের চোখে চেয়ে আছে। রাজা ঘোড়া থেকে নেমে বললেন, “আমি আয়োলকাস রাজ্যের রাজা এইসান, আর আই আমার ছেলে জেসান। আমরা এসেছি মহামতি কিরোর সঙ্গে দেখা করতে।”

“আসুন আমার সঙ্গে।” একজন সেন্টুর তাঁদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গুহার দিকে।

রাজা চারপাশে চোখ বোলালেন। পাহাড়ি এলাকা হওয়া সত্ত্বেও চারপাশ সবুজে ঢাকা। পাহাড় থেকে নেমে এসেছে সরু নদী। এই সেন্টুর প্রজাতির প্রাণীরা বেশ পরিশ্রমী, কারও ক্ষতি করে না। এরা যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী। এরা বহুবছর ধরে বহিঃশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করে আসছে আয়োলকাসসহ থেসেলের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যকে।

কিরো উষ্ণ সম্বর্ধনা জানালেন রাজা এইসান আর তাঁর সঙ্গীদের। রাজা এইসান নিজেদের সমস্যার কথা বলতে আরম্ভ করতেই কিরো বললেন, “আমি জানি আপনারা সমস্যায় পড়ে এখানে এসেছেন। কিন্তু পথশ্রমে আপনারা ক্লান্ত। তাই আজকের রাতটুকু আপনারা বিশ্রাম করুন, কাল শুনব আপনাদের কথা।”

কুমার জেসান শুধু অবাক হয়ে দেখছে। কিরো তার দিকে তাকিয়ে হেসে থুতনি নেড়ে দিলেন। তারপর বললেন, “ভয় নেই, অনেক পথ তোমাকে যেতে হবে। ভয়কে জয় করো।”

ভেড়ার দুধ আর পাহাড়ি কিছু ফল দিয়ে রাতের আহার সারলেন তাঁরা। তারপর শুকনো ঘাসের বিছানায় শুলেন। কিন্তু রাতে কিছুতেই ঘুম আসছিল না তাঁদের। আসবে কী করে? নরম গদিতে ঘুমোনোর অভ্যাস যে তাঁদের!

“ভয় নেই বাবা, কয়েক বছর একটু কষ্ট করো, তারপর সিংহাসন বাহুবলে অধিকার করে নিও কাকার কাছ থেকে।” এইসান বললেন।

“কিন্তু তোমাকে ছেড়ে এতদূরে থাকতে পারব না বাবা। মা মারা যাবার পর তুমিই আমার জীবনের সর্বেসর্বা।” বালক জেসানের চোখে জল।

“তোমাকে ছেড়ে আমিও কি থাকতে পারব? তোমার মা স্বর্গে চলে গেছেন। তোমার দিকে তাকিয়ে আমি সেই কষ্ট ভুলে ছিলাম। আমার মন বলছে, আমিও হয়তো বেশিদিন বাঁচব না। আমার অবর্তমানে তোমার কাকা তোমার ক্ষতি করতে পারে। তাই তোমাকে এখানে রেখে যাচ্ছি। আর একজোড়া সোনার জুতো তোমাকে দিয়ে গেলাম, এটা আমাদের বংশের অভিজ্ঞান।”

তিন

সকালবেলা কিরো ডেকে পাঠালেন রাজা আর রাজকুমারকে। তখন সোনালি রোদ খেলা করছে পাহাড়ের চূড়ায়। দুজনে দেখলেন, পাহাড়ের পাদদেশে একদল ছেলে নিজেদের মধ্যে কুস্তি লড়ছে, আর পাশে দাঁড়িয়ে কিরো তাদের নির্দেশ দিচ্ছেন। রাজা আসতেই কিরো তাঁকে অভিবাদন করলেন। তারপর পাশে বসতে দিলেন। এইসান খুলে বললেন নিজের দুর্ভগ্যের ইতিহাস। এমনকি জেসানের প্রাণসংশয়ের কথাও বাদ গেল না। সবশেষে তিনি বললেন, “আপনি জেসানকে নিজের পিতৃরাজ্য পুনরুদ্ধারের উপযুক্ত করে তুলুন।”

“আপনি নিশ্চিন্তে থাকুন রাজা, ওর মধ্যে বিরাট সম্ভাবনা দেখতে পাচ্ছি।” কিরো বললেন।

রাজা এইসান বিদায় নেবার সময় জেসান বাবাকে জড়িয়ে ধরে ঝরঝর করে কেঁদে ফেলল।

“আর হয়তো তোমার দেখা পাব না বাবা!” জেসান বলল।

“নিশ্চয় দেখা হবে। মাঝখানে ক’টামাত্র বছর। এর ভেতরে তুমি নিজেকে তৈরি করে নাও বাবা। আমি যেখানেই থাকি না কেন, আমার আশীর্বাদ সবসময় তোমার সঙ্গে থাকবে।”

চোখের জল লুকিয়ে বিদায় নিলেন রাজা এইসান।

কিরো ভীষণ দয়ালু। মধুর স্বভাব আর মিষ্টি কথার জন্য তিনি ছাত্রদের কাছে প্রিয় ছিলেন। কিন্তু শিক্ষক হিসাবে ছিলেন বেশ কড়া। জেসানকে তিনি বললেন, “এখন কান্নার সময় নয়। তোমার মতো অনেক ছাত্রই বাপ-মায়ের আদর আর আরামের শয্যা ছেড়ে এখানে পড়ে আছে।”

কিরো অন্যদের সঙ্গে জেসানের পরিচয় করিয়ে দিলেন। অ্যাকিলেস, হারকিউলিস প্রভৃতি বীরদের সে সতীর্থ রূপে পেল। খুব তাড়াতাড়ি জেসানের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মাল যে পিতার সিংহাসন সে অনায়াসে পুনরুদ্ধার করতে পারবে।

কিরো প্রথম শেখালেন কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হয়। তারপর ছাত্রদের বুদ্ধিপ্রয়োগ, যুদ্ধবিদ্যা প্রভৃতি শেখাতে লাগলেন। পাশাপাশি দয়াধর্ম, ন্যায়, সত্যবাদিতা প্রভৃতি সৎ গুণ শেখাতে লাগলেন। ছাত্রদের তিনি আত্মবিশ্বাসী করে তুলতেন। “তোমরা নিজের উপর ভরসা রাখবে। কোনও পরিস্থিতিতেই নিজের উপর বিশ্বাস হারাবে না। তাহলেই তোমাদের জয় সুনিশ্চিত।”

সন্ধ্যায় শিষ্যদের নিয়ে বসতেন তিনি, গল্প-গান শোনাতেন। ছাত্রদেরও গল্প-গান করতে উৎসাহ দিতেন। প্রকৃতির কলে কিরোর শিক্ষা আর সাহচর্য কয়েক বছরেই জেসানকে ধারালো, বুদ্ধিমান, রূপবান ও শক্তিমান যুবকে পরিণত করল। এরই মধ্যে কিরোর অনুচর রাজধানী থেকে সংবাদ এনেছে, রাজা এইসান মারা গিয়েছেন, আর কাকা পেলিয়াস জাঁকিয়ে বসেছে আয়োলকাসের সিংহাসনে। এই সংবাদ পেয়ে মাটিতে আছড়ে পড়ে জেসান কাঁদতে লাগল। কিরো আর তার বন্ধুরা জেসানকে সান্ত্বনা দিলেন। জেসান শুরু করল আরও কঠিন অনুশীলন।

একরাতে কিরো যুবরাজ জেসানকে একাকী ডেকে বললেন, “তুমি এখন সাবালক। এখানকার সমস্ত শিক্ষা তোমার পূর্ণ কয়েছে। এবারে তোমার জীবনের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। পিতার ইচ্ছের কথা নিশ্চয় ভুলে যাওনি?”

“না, ভুলিনি প্রভু।” জেসানের দু-চোখে প্রতিশোধের আগুন।

“তাহলে সে সময় এসেছে আজ। যাও যুবক, রাজধানীতে গিয়ে তোমার অধিকার দাবি করো। তোমার কাকা যদি অনায়াসে সিংহাসন না ছাড়ে, তবে বীরের মতো ছিনিয়ে নাও। আমি আর তোমার বন্ধুরা সব সময় পাশে আছি।”

চার

রাজধানী আয়োলকাস এখন উৎসব নগরী। অত্যাচারী রাজা পেলিয়াস এককথায় কারও ধড় থেকে মুণ্ডু আলাদা করে দেয় তো, আবার যে তার প্রশংসা করে, সে পায় পুরস্কার। তাই শখ করে কেউ রাজদ্রোহী হতে চায় না। বরং রাজানুগ্রহ লাভের জন্য সকলেই ভিড়ে যায় স্তাবকের দলে। রাজার একান্ত অনুগত কিছু পারিষদ আছে। আর আছে পরামর্শদাতা জ্যোতিষী ক্রেনিয়াস। সময়ে দুঃসময়ে রাজাকে পরামর্শ দেয় সে, খড়ি পেতে বলে দেয় ভবিতব্য। একদিন ক্রেনিয়াস পেলিয়াসকে বলল, “আমি অমঙ্গলের আভাস পাচ্ছি রাজা।”

“অমঙ্গল? এই আনন্দোৎসবের মধ্যে অমঙ্গল? একটু ভেঙে বলো ক্রেনিয়াস।”

“আপনার দাদা তো মারা গেছেন। ভাবছেন, সিংহাসন লাভের কাঁটা দূর হয়েছে। কিন্তু ভুলে যাবেন না, আপনার ভাইপো জেসান এখনও বেঁচে আছে।”

“কী বলছ তুমি!” রাগে হাতের পানপাত্র ছুড়ে ফেলে দিল পেলিয়াস।

“আমি দেখতে পাচ্ছি আপনার মূর্তিমান বিপদ এগিয়ে আসছে একপায়ে সোনার জুতো পরে।”

“তার মানে?”

“তার মানে সে আপনার দাদার বংশধর, সিংহাসনের উত্তরাধিকারী।”

পেলিয়াস ঝপ করে সিংহাসনে বসে পড়ল। তারপর ভাঙা গলায় বলল, “ওকে আটকাবার কি কোনও চেষ্টা করা যায় না?”

“ভাইপো জেসান এখন যুবক, তার দেহে এখন ষাঁড়ের বল। তাকে শক্তিহীন করতে হলে ষণ্ডমেধ যজ্ঞ করতে হবে আপনাকে।” ক্রেনিয়াস বলল।

“তাহলে সেই আয়োজন করো। মহামন্ত্রীকে ডাকো, আমি নির্দেশ দিচ্ছি ষণ্ডমেধ যজ্ঞের আয়োজন করার।”

“যে আজ্ঞে মহারাজ।”

ক্রেনিয়াস বিদায় নিল। আর পেলিয়াস চিন্তিত মুখে পায়চারি করতে লাগল ঘরের মধ্যে।

পাঁচ

কিরোর কাছ থেকে বিদায় নেবার সময় জেসানের চোখে জল এল। তার মনে হল, সে দ্বিতীয়বার আশ্রয়হীন হল। কিরোর কাছে পিতৃস্নেহ আর সতীর্থদের ভালোবাসা পেয়ে সে নিজের কষ্ট ভুলে ছিল। বিদায় লগ্নে কিরো মনে করিয়ে দিল ওর দুর্ভাগ্যের কথা। মাথায় যেন আগুন ধরে গেল তার। সে চিতাবাঘের চামড়া দিয়ে তৈরি একটা আলখাল্লা চাপিয়ে নিল নিজের দেহে। এটা কিরো তাকে দিয়েছেন। আর পায়ে গলিয়ে নিল বাবার দেওয়া সোনার জুতোজোড়া। তারপর কিরো আর সতীর্থদের কাছে বিদায় নিল। অত বড়ো শক্তিশালী কিরোর দুই চোখের কোণ জলে চিকচিক করে উঠল। জেসানকে জড়িয়ে ধরে কিরো বললেন, “মনে রাখবে আগে কর্তব্য, তারপর হৃদয়ধর্ম। তুমি সামনের দিকে এগিয়ে যাও, আর জয়ী হও।”

গুহাময় পাহাড়ি উপত্যকা থেকে আয়োলকাস যাবার পথে একটা পাহাড়ি নদী পড়ে। বাবার সঙ্গে জেসান যখন এখানে এসেছিল, তখন নদীতে তেমন জল ছিল না। কিন্তু এই মুহূর্তে নদীতে বান এসেছে। প্রচণ্ড স্রোতে নদী হয়ে উঠেছে ভয়ংকর। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে সে ভাবতে লাগল কীভাবে অন্য পাড়ে যাবে। ঠিক সেই সময় ওর দৃষ্টি গেল কিছুটা দূরে। সেখানে একজন বৃদ্ধা লাঠিতে ভর করে দাঁড়িয়ে আছে। বৃদ্ধার দু-পাশে দুটো সুন্দর ময়ূর চোখে পড়ল তার। বৃদ্ধার বেশবাস বড়ো বিচিত্র, কিন্তু ভিখারিনী বলে মনে হল না।

“তুমি কি ওই পাড়ে যাবে বাছা?” বুড়ি জিজ্ঞেস করল তাকে।

“হ্যাঁ, কিন্তু তুমি?”

“আমিও ওই পাড়ে যাব। কিন্তু কীভাবে যে পার হব, বুঝতে পারছি না। তুমি তো দেখছি একজন বীর যুবক। আমাকে পার করে দেবে?”

“মা, আমি যদি পার হতে পারি, তবে তুমিও যেতে পারবে। তুমি আমার পিঠে ওঠো, তোমাকে অপর পাড়ে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি আমাকে বীর বলে ডেকেছ, বীরের আবার কষ্ট কীসের? তোমার জায়গায় যদি আমার মা হত, তাকেও তো এভাবে পিঠে করে পার করতে হত আমাকে।”

জেসানের ব্যবহারে বুড়ি মুগ্ধ। বুড়ি জেসানের পিঠে উঠল। ময়ূর দুটো এসে বসল জেসানের দুই কাঁধে। তারাও আরামে নদী পার হতে চাইল। সে বাধা দিল না। নদীতে কোমর সমান জল। বুড়িকে কাঁধে নিয়ে জেসান নদীর একেবারে মাঝখানে চলে এল। হঠাৎ ওর মনে হল বাবার দেওয়া জুতোজোড়ার কথা। কাদায় জুতোজোড়া আটকে যেতে পারে এটা তার মাথাতেই আসেনি। আবার এই মুহূর্তে জুতোজোড়া খুলে হাতে নেওয়াও সম্ভব নয়। হঠাৎ একটা জুতো কাদার ভেতরে আটকে গেল। এখন কীভাবে সে ওটাকে খুঁজবে? মনটা খারাপ হয়ে গেল জেসানের। সোনার তৈরি বলে নয়, আসলে এই জুতোজোড়া তার বংশের অভিজ্ঞান যেটা তার বাবা তাকে দিয়েছিল।

অপর পাড়ে পৌঁছানোর আগেই জেসানের মনে হল পিঠের বোঝা যেন হালকা হয়ে গেছে। অবাক হয়ে গেল সে। পাড়ে পৌঁছে বুড়িকে পিঠ থেকে নামাল। তারপর চোখের পলক ফেলতেই সে দখল এক অপরূপ সুন্দরী নারী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার দু-পাশে দুটো ময়ূর।

uponyasSonaliBhera2

“আ-আপনি?” জেসান জিজ্ঞেস করল।

“রাজকুমার জেসান, আমি অলিম্পাসের দেবী জুনো। ছদ্মবেশে তোমার পরীক্ষা নিচ্ছিলাম এতক্ষণ।”

“দেবী জুনো!”

জেসান কিরোর কাছে দেবদেবীদের সম্পর্কে শুনেছিল বটে। কিন্তু দেবী যে তার পরীক্ষা নিতে পারেন, তা বুঝে উঠতে পারেনি। সে ভয়ে-ভক্তিতে হাঁটু গেড়ে প্রণাম করল দেবীকে।

“দেখলাম তুমি সত্যিই সৎ, দায়ালু আর প্রকৃত বীর। আমি আশীর্বাদ করছি, তুমি সর্বদা জয়ী হবে, কোনও বিরুদ্ধ-শক্তি তোমাকে পরাভূত করতে পারবে না। নিজের উপর বিশ্বাস রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যাও।” এই বলে নিজের ময়ূরে টানা রথে করে জুনো আকাশপথে উড়ে গেলেন। আর মনে আনন্দ নিয়ে জেসান এগিয়ে চলল আয়োলকাসের দিকে।

আয়লোকাসে আরম্ভ হয়েছে ষণ্ডমেধ যজ্ঞ। রাজধানীর একেবারে মাঝখানে উঁচু বেদির উপর বেঁধে রাখা হয়েছে ভীষণাকৃতির একটি ষাঁড়, তার মাথাটা হাড়িকাঠে শক্ত করে বাঁধা। রাজা পেলিয়াস তরবারি হাতে ষাঁড়ের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে। জাদুকর ক্রেনিয়াস মন্ত্রপূত জল ছিটিয়ে দিল চারপাশে। তারপর পেলিয়াসের কপালে এঁকে দিল কালো টিকা। কিছুটা দূরে চারপাশে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে দর্শকেরা। চারপাশে দর্শকদের ভেতরে মৃদু গুঞ্জন উঠল, তারা চঞ্চল হয়ে উঠল।

পেলিয়াসের প্রথম চোখ পড়ল দূর থেকে এগিয়ে আসা আগন্তুকের পায়ের দিকে। চমকে উঠল সে। এক পায়ে সোনার জুতো! এই জুতো তো তার ভীষণ চেনা। এ যে তাদের বংশের অভিজ্ঞান। না না, এ হতে পারে না। পেলিয়াসের হাত থেকে মাটিতে খসে পড়ল তরবারি।

“জে-জেসান?” পেলিয়াস তোতলাতে লাগল।

“মহারাজ, বলেছিলাম না, এক পায়ে জুতো পরে আপনার মূর্তিমান বিপদের আগমন ঘটবে রাজধানীতে?” ক্রেনিয়াস বলল।

“এই দেখো সকলে, আমার আদরের ভাইপো জেসান ফিরে এসেছে। তোমার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। দাদাকে মৃত্যুকালে কথা দিয়েছিলাম। তোমাকে এতদিন ছেড়ে থাকতে আমার কষ্ট হয়েছে।” পেলিয়াস চোখের জল মোছার ভান করল।

“পিতার মৃত্যুসংবাদ আমাকে দেবার প্রয়োজন মনে করেননি?” জেসান বলল।

“তোমাকে খুঁজে পাইনি বাবা।”

“মিথ্যে কথা। আমাকে খোঁজার চেষ্টা করেননি আপনি। থাক সে কথা। এখন একটা ভালো দিন দেখে আমাকে সিংহাসনে অভিষিক্ত করুন।”

“হে-হে-হে, হবে হবে, সব হবে। এত ব্যস্ত কেন ভাইপো? কাকার বয়স হয়েছে, কিন্তু অক্ষম তো হয়ে পড়েনি। তবুও তোমাকে সিংহাসন ছেড়ে দেব আমি। তারপর বনবাসে চলে যাব। কিন্তু তার আগে একটা শর্ত আছে।”

পেলিয়াসের ধূর্ততায় চমকে উঠল জেসান। সে যে সহজে সিংহাসন পাবে না, এটা বুঝতে পারল। বিচলিত হবার ভাব গোপন রেখে সে জিজ্ঞেস করল, “কী শর্ত?”

ধূর্ত পেলিয়াস মাখনের মতো গলায় বলল, “তুমি তো বীর যুবরাজ। আর হবে নাই-বা কেন? তুমি আমাদের বংশধর। কিন্তু প্রজারা প্রমাণ চায় তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে তুমি কতটা যোগ্য।”

“কী করতে হবে আমাকে?”

“কিছুই নয়, কলচিস থেকে সোনালি ভেড়ার একগুচ্ছ লোম তোমাকে আনতে হবে। আমি জানি তুমি ‘না’ বলবে না।”

চমকে উঠল জেসান। সে বুঝতে পারল, তার কাকা একটা আস্ত শয়তান। কিরোর কাছে সে সোনালি ভেড়ার গল্প শুনেছে। সে জানে কলচিসের পথ কত দুর্গম। সোনালি ভেড়ার লোম আনা তো দূরের কথা, সেখানে পৌঁছানোও কল্পনার বাইরে।

পেলিয়াসের পারিষদবর্গ সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, “হ্যাঁ, আমরা জেসানের বীরত্বের পরিচয় পেতে চাই।”

“ঠিক আছে। আমি কলচিস যাব। সোনালি ভেড়ার লোম আনব আমি।”

ছয়

অনেকদিন আগে অরকোমাস নামে একটা ছোট্ট রাজ্য ছিল। এই রাজ্যের রাজার নাম এটামাস আর রানির নাম নেফেল। রাজা-রানির ছেলের নাম ফ্রিক্সাস, আর মেয়ের নাম হেলে। বেশ সুখেই রাজ্যশাসন করছিলেন রাজা এটামাস। কিন্তু থিবসের রাজকুমারী ইনোকে দেখার পর রাজা উন্মাদ হয়ে গেলেন। তিনি ভুলে গেলেন নিজের স্ত্রী-পুত্র-কন্যার কথা। কারও পরামর্শ ছাড়াই তিনি বিয়ে করলেন ইনোকে। বিয়ের অনতিকাল পরে ইনোর নির্দেশে তাড়িয়ে দিলেন প্রথমা স্ত্রী নেফেলকে। রাজকুমার ও রাজকুমারীকেও তাড়াতে চেয়েছিল ইনো, কিন্তু নিজের সন্তানদের রাজা প্রাণের অধিক ভালোবাসতেন। তাই ইনোকে অনুরোধ করলেন অন্তত ছেলেমেয়ে দুজনকে যেন ঠাঁই দেওয়া হয়।

ছোটো রানি ইনো সতীনের ছেলেমেয়ে দুটোকে জায়গা দিল বটে, কিন্তু ওদের উপর ভীষণ নির্যাতন আরম্ভ করল। শেষপর্যন্ত রাজকুমার আর রাজকুমারীকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দেবার জন্য সুযোগ খুঁজতে লাগল। খুব তাড়াতাড়ি সেই সুযোগ এসে গেল ইনোর সামনে। প্রতিবছর রাজ্যে জাতীয় উৎসব অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। রানি ইনো বলল যে, এবারের উৎসবে দেবতাদের সন্তুষ্ট করার জন্য নরবলি দিতে হবে। ইনো অনেক আগে থেকেই নরবলি মানত করে রেখেছিল। নরবলির কথা ওঠায় রাজা আপত্তি করলেন। রাজার আপত্তি উড়িয়ে ইনো বলল, শুধু নরবলি দিলেই হবে না, দেবতাদের কাছে উৎসর্গ করতে হবে রাজার নিজের সবচেয়ে প্রিয়জনদের, আর সেই প্রিয়জন হল ফ্রিক্সাস আর হেলে।

স্তব্ধ হয়ে গেলন রাজা। তাঁর চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এল। কী বলছে ইনো? নিজের সন্তানদের আহুতি দিতে হবে? তিনি বুঝতে পারলেন, রূপে মুগ্ধ হয়ে কী ভুলটাই না করে ফেলেছেন। কালসাপ ঘরে এনেছেন। দারুণ মানসিক আঘাতে ভেঙে পড়লেন তিনি। কিন্তু কিছুতেই ইনোর ইচ্ছার বিরুদ্ধে যেতে পারলেন না। আসলে তিনি তখন ইনোর হাতের পুতুল।

জাতীয় উৎসবের দিনে রাজকুমার আর রাজকুমারীকে বলি দেবার ব্যবস্থা হল। রাজপুরোহিত তাদের স্নান করিয়ে, নতুন পোশাক পরিয়ে, হাত বেঁধে গলা ঢুকিয়ে দিল হাড়িকাঠের ভেতরে। জল্লাদ যখন তাদের মাথা কাটার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে, ঠিক তখন একটা সোনালি লোমওয়ালা একটা ভেড়ার আগমন ঘটল। দেবরাজ জুপিটার পাঠিয়েছিলেন ওই ভেড়াটাকে। দৈব প্রভাবে ভেড়াটি রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে পিঠে চাপিয়ে উড়ে চলল আকাশপথে। সমুদ্র অতিক্রম করার সময় রাজকুমারী ভয়ে শিউরে উঠল। আর সঙ্গে সঙ্গে পড়ে গেল জলে। রাজকুমার কিছুতেই নিজের বোনকে উদ্ধার করতে পারল না।

সোনালি ভেড়া উড়তে উড়তে লক্ষ যোজন অতিক্রম করে চলে এল কলচিসদের দেশে। আর সেখানে পৌঁছেই ভেড়াটি মারা গেল। রাজকুমার ফ্রিক্সাস ভেড়ার সোনালি লোমগুলো কেটে রাখল। ওই লোমগুলো থেকে আলো ঠিকরে বেরোচ্ছিল। সে লোমগুলো উপহার দিল কলচিসদের রাজাকে।

একদিন দৈববাণী হল, ‘রাজা, এই স্বর্গীয় লোমগুলো রাজ-উদ্যানের ওকগাছে রেখে দাও। আমরা একটা ড্রাগন পাঠাচ্ছি, সে ওই লোমগুলো পাহারা দেবে। বহুকাল পরে এক বীর রাজকুমার এই লোম উদ্ধার করে নিজের দেশে নিয়ে যাবে।’

সোনালি ভেড়ার লোমের এই ইতিহাস জেসান শুনেছিল মহামতী কিরোর মুখ থেকে।

সাত

আবেগের বশে জেসান বলে তো দিল কলচিসদের দেশে যাবে, কিন্তু সে তো একা! কী করে সেখানে অভিযান করবে? মায়াবী কলচিসদের দেশ কী এখানে? মনে পড়ে গেল কিরো আর তাঁর শিষ্যদের কথা। কিরো বলেছিলেন, সমস্যা হলে তিনি সাহায্য করতে প্রস্তুত। সে কিরোর সঙ্গে পুনরায় দেখা করে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল।

সব শুনে কিরো জেসানকে বললেন, “জেসান, এই মুহূর্তে তোমার কাকাকে জোর করে সরিয়ে তোমাকে সিংহাসনে বসাতে পারি। কিন্তু প্রজারা তোমাকে কাপুরুষ বলবে। তাই এই লড়াইটা তোমাকে লড়তেই হবে। আমরা সবাই তোমার সঙ্গে আছি। হারকিউলিস, থেসেউস সমস্ত বন্ধুরা এই অভিযানে তোমার সঙ্গে যাবে। তবে একটাই উপদেশ, এই দুঃসাহসিক অভিযানে যাবার আগে একবার অন্তত পবিত্র দোদোনার জঙ্গলে যাও। কথিত আছে, সেখানে সারি সারি ওকগাছে দেবরাজ জুপিটার ঘুরে বেড়ান। সাহসী পুরুষেরা সেই ওকগাছের কাছে গিয়ে প্রার্থনা জানালে দৈববাণী হয়, দেবরাজ জুপিটার তাদের সাহায্যের জন্য সুপরামর্শ দেন।”

কিরোকে প্রণাম জানিয়ে, তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে জেসান দোদোনার জঙ্গলে এল। তারপর ওকগাছের নীচে বসে নিজের দুর্ভাগ্যের কাহিনি বলে সাহায্য চাইল। অমনি দৈববাণী হল, ‘জেসান, দুঃখ কোরো না। এই যুদ্ধে তুমিই জয়লাভ করবে। একটা বিরাট জাহাজ তৈরি করাও। তারপর পঞ্চাশজন শক্তিশালী যুবককে সঙ্গে নাও। তারা একদিকে যেমন দাঁড় বাইবে, অন্যদিকে বিপদে লড়াই করতে পারবে। আমি বলে দিচ্ছি, শ্রেষ্ট শিল্পী অরফিউস তোমার সঙ্গে যাবেন। তাঁর সংগীতের মূর্চ্ছনা একদিকে যেমন তোমাদের একঘেয়েমির ক্লান্তি দূর করবে, অন্যদিকে নানা বিপদ থেকে তোমাদের রক্ষা করবে।’

“হে দেবরাজ, আমি তো কলচিসে যাবার পথ চিনি না। এখন আপনার আশীর্বাদ আমার পাথেয়।”

দ্বিতীয়বার দৈববাণী হল, ‘রাজকুমার জেসান, ওকগাছের নুইয়ে পড়া ডালটা তুমি কেটে নাও। তারপর একজন শিল্পীকে দিয়ে ওই কাঠ দিয়ে একটা মূর্তি বানাও। ওই মূর্তিটা জাহাজের সামনে স্থাপন করবে, সে-ই তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে কলচিসদের দেশে।’

দেবরাজ জুপিটারের উদ্দেশে হাঁটু গেড়ে অভিবাদন জানিয়ে রাজকুমার জেসান ওকগাছের নুইয়ে পড়া ডালটা কেটে নিয়ে ফিরে এল আয়োলকাসে। তারপর একটা সুন্দর জাহাজ নির্মাণ করল। জাহাজের নাম রাখল ‘আর্গো’। জেসানকে ডাকতে হল না। ওর বন্ধুরা স্বেচ্ছায় ওর সঙ্গে যেতে রাজি হল। এদের ভেতরে ছিল হারকিউলিস, থেসেউস, অ্যাকিলেসের মতো মহাবীরেরা। জাদু-বীণা হাতে এলেন অরফিউস। ওকগাছের ডাল থেকে তৈরি মূর্তিটা জাহাজের সামনে বসানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটা যেন জীবন্ত হয়ে উঠল। মূর্তির হাতটা কম্পাসের মতো ঘুরে ঘুরে দিকনির্দেশ করতে লাগল।

আট

জেসানের জাহাজ আয়োলকাসের মাটি ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্ভাগ্য যেন ওর পিছু ছাড়ছে না। বিশালকৃতির ঢেউয়ের তোড়ে এই বুঝি জাহাজ ভেঙে পড়ে। তখনই অরফিউস বাঁশিতে সুর তুললেন, সেই সুরে আকাশ-বাতাস আকুল হয়ে উঠল। ধীরে ধীরে শান্ত হল সমুদ্র। পঞ্চাশ জন বীরযোদ্ধা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।

দিনের বেলা তারা নৌকা বায়, আর রাতে নোঙর করে মাঝসমুদ্রে। এভাবেই কেটে গেল কয়েকটা দিন। একরাতে জাহাজের দুলুনিতে তাদের ঘুম ভেঙে গেল। তারা লক্ষ করল, নোঙর ছিঁড়ে জাহাজ চলতে শুরু করেছে। হঠাৎ জেসানের দৃষ্টি গেল সামনের দিকে। ভোরের আধফোটা আলোয় সে দেখল জাহাজ তীব্রগতিতে ছুটে চলেছে একটা ডুবোপাহাড়ের দিকে। জেসানের চিৎকারে সকলের ঘুম ভেঙে গেল। সকলে দিশেহারা হয়ে একসঙ্গে চিৎকার আরম্ভ করল। জেসান জুপিটার ও দেবী জুনোর উদ্দেশে প্রার্থনা করতে লাগল।

হঠাৎ দেখা গেল পুবদিক আলকিত করে দেবী জুনো আবির্ভূত হলেন। মৃদু হেসে তিনি নিজের হাতের লাঠিটা দিয়ে জাহাজের দিকে ইঙ্গিত করলেন, সঙ্গে সঙ্গে লাঠি থেকে তীব্র রশ্মি বেরিয়ে এসে থামিয়ে দিল জাহাজের গতি। জেসান ও তার সঙ্গীরা দেবী জুনোর উদ্দেশে প্রণাম করল। এবারে দেবী নিজের হাতের লাঠিটা ছুড়ে দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেটা একটা সাদা বকে পরিণত হল। জুনো বললেন, “জেসান, এই বকটাকে অনুসরণ করো, তবেই পথ খুঁজে পাবে।”

জেসানদের নির্দেশ দিয়েই দেবী উধাও হয়ে গেলেন। তারা সাদা বককে অনুসরণ করে নিরাপদ ও শান্ত সমুদ্রপথে চলে এল। তারপরে আর বকটাকে দেখা গেল না।

দীর্ঘদিন জেসানরা ঘরছাড়া, ক্লান্তও বটে। অনবরত বৈঠা বেয়ে চলা যে কত কঠিন কাজ, তা এখন টের পাচ্ছে তারা। একদিন ওরা একটা সবুজ রেখা দেখতে পেল। কাছাকাছি যাবার পরে দেখল সেটা একটা দ্বীপ। অনেকদিন পরে মাটি দেখতে পেয়ে ওরা আনন্দে আলোকিত হয়ে উঠল। অনেকেই জেসানকে পরামর্শ দিল এই দ্বীপে একটু জিরিয়ে নেবার জন্য। জেসান ভাবল, যুক্তিটা মন্দ নয়। এক-দু’দিন বিশ্রাম নিলে আবার নতুন উদ্যমে ঢেউ ভেঙে যাত্রা করা সহজ হবে।

নয়

দ্বীপটা ছোটো, গাছাপালায় পূর্ণ। কিন্তু প্রচণ্ড শান্ত। কোথাও কোনও আওয়াজ নেই। কোনও পাখিও চোখে পড়ছে না। আশ্চর্য! এমন শান্ত দ্বীপ তো সাধারাণত দেখা যায় না। জেসান আর ওর বন্ধুরা অবাক হয়ে গেল। সকলে সমুদ্রতীর থেকে উঠে এসে ঝাউগাছের নীচে পা ছড়িয়ে বসল।

“কেউ সমুদ্রের ধার থেকে বেশি দূরে যাবে না। আর হাতের কাছে তির-ধনুক, বর্শা বা তরবারি রেখে দিও। নতুন জায়গা। আমরা জানি না এখানে কোনও বিপদ ওত পেতে আছে কি না!” হারকিউলিস বলল।

জেসান কয়েকজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে শুকনো খাবার নামাল জাহাজ থেকে। কয়েকজন আবার টাটকা মাছ ধরে নিয়ে এল সমুদ্র থেকে। আশেপাশে কিছু অজানা গাছে কিছু বিচিত্র ফল ধরেছে। কয়েকজন ফল পাড়তে উদ্যত হল। তাদের নিরস্ত করে জেসান বলল, “বন্ধুরা, এই ফল আমাদের খাওয়া উচিত হবে না। কারণ, কোনও প্রাণী আমাদের চোখে পড়ছে না যারা এই ফল ভক্ষণ করে বেঁচে থেকতে পারে। তাই আমাদের কাছে যা খাবার আছে, তাই দিয়ে আমাদের আহার সারতে হবে।”

“ঠিক আছে বন্ধু জেসান, তাই হোক।” বন্ধুরা বলল তাকে।

“তোমরা আমার জন্য কষ্ট স্বীকার করে এতদূর এসেছ, আমার ভীষণ খারাপ লাগছে। মাঝে মাঝে ভাবছি, এই অভিযানের ইতি টেনে চলো আমরা ফিরে যাই। দরকার নেই সিংহাসন পুনরুদ্ধারের।” জেসানের কণ্ঠে বিনয়।

সঙ্গে সঙ্গে হারকিউলিস জেসানের হাতে হাত রেখে বলল, “সম্পদে ও বিপদে আমরা তোমার পাশে আছি জেসান। কী বন্ধুরা, তোমরা আমার সঙ্গে সহমত?”

সকলেই হারকিউলিসের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বলল, “আমরা সহমত।”

খাবার খেয়ে সকলে একটু জিরিয়ে নিচ্ছে, এমন সময় জেসান পেছনে ঝাউবনে খসখস আওয়াজ শুনল। প্রথমবার ভাবল মনের ভুল। দ্বিতীয়বার আওয়াজ হতেই মুখ ফিরিয়ে দেখল সে। না, কোথাও কিছু নেই। এবারে ওর নাকে আঁশটে গন্ধ এসে লাগল। এ তো ঠিক মাছের গন্ধ নয়! জেসান কয়েক পা এগিয়েই যা দেখল, তাতে চক্ষু চড়কগাছ। বিরাট লম্বা, ভীমাকৃতি কালো রঙ বিশিষ্ট একটা কদর্য মানুষ ওর দিকে থপ থপ করে এগিয়ে আসছে। তার চোখদুটো ভাঁটার মতো লাল, হাতে বড়ো বড়ো নখ। শরীরে কোনও আবরণ নেই। শুধু কোমরের নীচে কলাপাতা জড়ানো। দাঁত কিড়মিড় করে ওটা এগিয়ে আসছে। জেসান বন্ধুদের উদ্দেশে হাঁক ছাড়ল। বন্ধুরা যে-যার অস্ত্র হাতে এসে দাঁড়াল জেসানের পাশে। ওরা দেখল ভয়ংকর রাক্ষসটাও একা নয়, ওর পেছনে পিল পিল করে আরও অনেকে এগিয়ে আসছে।

“বন্ধুরা, তির ছোড়ার আগে বুঝতে হবে ওরা বন্ধু, না শত্রু।” হারকিউলিস বলল।

কয়েক মুহূর্ত পরে একটা মস্ত পাথর এসে পড়ল তাদের দিকে। তারপর আরেকটা, আরও একটা।

“বন্ধুরা, নিরাপদ দূরত্ব রেখে লুকিয়ে পড়ো, এরা রাক্ষস! ধরতে পারলে জ্যান্ত গিলে খাবে।” জেসান বলল।

সকলে চটপট গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। এবারে জাহাজের দিকে ছুটতে হবে। কিন্তু জাহাজের দিকে যেতে হলে অনেকটা ফাঁকা জায়গা পেরোতে হবে। সেই সময় রাক্ষসদের ছোড়া পাথরের আঘাতে ঘায়েল হবার সম্ভাবনা রয়েছে।

জেসান একটা তির ছুড়ল একটা রাক্ষসকে লক্ষ্য করে। তিরটা রাক্ষসের গায়ে লাগল বটে, কিন্তু অনায়াসে সে তিরটা তুলে ফেলল নিজের শরীর থেকে। তখন হারকিউলিসের সঙ্গে পরামর্শ করে একটা কাজ করল জেসান। তারা যে আগুন জ্বেলেছিল, সেই আগুনটা তখনও নেভেনি। তারা তিরের ফলার মুখে আগুন জ্বেলে ছুড়ে দিল রাক্ষসদের দিকে। জ্বলন্ত তির তাদের গায়ে বেঁধামাত্র তারা মাটিতে গড়াগড়ি দিতে লাগল। তারপর কয়েক মুহূর্ত পরে শান্ত হয়ে গেল। পুরো দলটাকে মেরে থামল ওরা।

“সত্যি বন্ধু, তোমাদের ছাড়া এ কাজ সম্ভব ছিল না। কীভাবে যে তোমাদের ধন্যবাদ দেব!” জেসান বলল।

“বন্ধুদের ধন্যবাদ দিতে নেই। চলো, আমরা জাহাজে যাই। এই নির্জন দ্বীপে আর থাকার প্রয়োজন নেই।” হারকিউলিস বলল।

সকলে একে একে জাহাজে উঠল।

দশ

যুবরাজ জেসান যেমন এই সাফল্যে উজ্জীবিত, অন্যদিকে এই অফুরান সমুদ্রপথ নিয়েও চিন্তিত। বিশেষ করে খাদ্য আর পানীয় জলের ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কারণ, সমুদ্রের লবণাক্ত জল পান করা অসম্ভব। আবার শুকনো খাদ্যের ভাঁড়ারও প্রায় শেষের দিকে। সামুদ্রিক মাছ খেতে খেতে মুখে অরুচি ধরে গেছে। তাই সামনে কোনও দ্বীপ পেলে তাদের থামতে হবে।

“যুবরাজকে ভীষণ চিন্তিত মনে হচ্ছে!” হারকিউলিস বলল।

“হ্যাঁ বন্ধু, পানীয় জল আর খাদ্যের কথা ভাবছি।” জেসান বলল।

“দূরে একটা দ্বীপের রেখা দেখা যাচ্ছে। দেখি ওখানে পানীয় জল আর খাদ্যের কোনও ব্যবস্থা হয় কি না।”

“দ্বীপে নামতে তো বাধা নেই, কিন্তু অজানা জায়গায় একবার রাক্ষসের পাল্লায় পড়লাম। এবারে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে কে জানে!”

“বন্ধু, যখন আমরা সবাই আয়োলকাসের মাটি ত্যাগ করেছিলাম, তখন কী শপথ নিয়েছিলাম ভুলে গেলে?” হারকিউলিস বলল।

“ভুলিনি বন্ধু, কিন্তু তোমাদের কথা ভেবেই…”

“বার বার এক কথা বলবে না। ওই দেখো সবুজ দ্বীপটার কাছে চলে এসেছি আমরা। আর হ্যাঁ, এবারেও আমরা বিপদের জন্য তৈরি থাকতে হবে। সকলকে বলে দাও।”

জেসানদের জাহাজ থামল অজানা দ্বীপের পাশে। সকলে ঢাল-তলোয়ার, তির-ধনুক নিয়ে নেমে এল। এই দ্বীপ আগেরটার মতো নির্জন নয়। পাখির কলকাকলি শোনা যাচ্ছে, রঙবেরঙের পাখির দেখা মিলেছে। গাছে গাছে পেকে হলুদ হয়ে রয়েছে নানাধরনের ফল। পাখিরা ফল খাচ্ছে। জেসানদের মনে হল এবারে গাছের ফল খেতে কোনও বাধা নেই। তাদের কেউ কেউ গাছে উঠে ফল পেড়ে আনল। কয়েকজন কাছাকাছি মিষ্টি জলের ঝরনা খুঁজে পেল। তারা পাত্রগুলিতে জল ভরল। এইসব কাজ সারতে বেলা হয়ে গেল। সূর্য এখন মাথার উপর। সকলে দু-দণ্ড জিরিয়ে নেবার জন্য হাত-পা ছড়িয়ে বসল।

হঠাৎ চারপাশ অন্ধকার হয়ে এল। মনে হল একখণ্ড কালো মেঘ সূর্যকে ঢেকে ফেলেছে। কিন্তু একটু আগেও আকাশে কোনও মেঘ ছিল না। ওরা ভয়ে যার যার অস্ত্র হাতে জাহাজের দিকে এগোল। কিছুক্ষণ পরেই ব্যাপারটা পরিষ্কার হল। ওরা যাকে মেঘ ভাবছিল, সেটা মেঘ নয়, ঝাঁকে ঝাঁকে ঈগল পাখি একজোট হয়ে এগিয়ে আসছে ওদের দিকে। ওরাই ঢেকে ফেলেছে সূর্যটাকে। তাই অন্ধকার হয়ে পড়েছে দিগ্বিদিক। কিন্তু এত বড়ো ঈগল তো এর আগে চোখে পড়েনি। মানুষের চেয়েও বড়ো ওদের আকৃতি। চোখদুটো টকটকে লাল, ধারালো ঠোঁট আর নখ। তিরের বেগে ওরা ছুটে আসছে জেসানদের জাহাজ লক্ষ্য করে।

জেসান তির ছুড়ল ঈগলদের লক্ষ্য করে। ওরা অবাক হয়ে দেখল, তিরটা ঈগলের পায়ে লেগে ঠং করে শব্দ করে নীচে পড়ে গেল। হারকিউলিস সহ কয়েকজন তির ছুড়ল এবং আগের মতোই ঠং ঠং শব্দ করে উঠল। তখন ওরা ভালো করে লক্ষ করল, ঈগলগুলোর পাদুটো পেতলের বর্ম দিয়ে মোড়া।

“হে ঈশ্বর, শেষপর্যন্ত ঈগলের হাতে প্রাণ হারাতে হবে?” জেসান হাঁটু মুড়ে দেবতা জুপিটার আর দেবী জুনোর উদ্দেশে প্রার্থনা শুরু করল। ঠিক সেই সময় ওককাঠের তৈরি দিকনির্ণয়কারী মূর্তিটা সকলকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল, “জেসান, ভয় পেও না। তোমাদের ঢালের উপর তরবারি দিয়ে আঘাত করো, ঈগলেরা পালিয়ে যাবে।”

জেসান ওকগাছের মূর্তির উদ্দেশে অভিবাদন জানাল। তারপর সকলকে নির্দেশ দিল ঢালের উপর তরবারি দিয়ে আঘাত করার জন্য। সকলে সেইমতো ঢাল-তরবারির ঝনঝন আওয়াজ তুলল। সেই শব্দে ঈগলেরা আকাশপথে থমকে দাঁড়াল। তারপর যে পথে এসেছিল, সেই পথেই ঝাঁক বেঁধে ফিরে যেতে লাগল। এই দৃশ্য দেখে তারা দেবতা জুপিটারের জয়ধ্বনি দিতে লাগল। সেই সময় তারা দেখল জাহাজ একেবারে কূলে এসে পড়েছে। তবে এটা কোনও দ্বীপ নয়, একটা দেশের সমুদ্রতট ভূমি এবং অবশ্যই দেশটার নাম কলচিস। যুবরাজ জেসান বন্ধুদের দিকে সজল চোখে বলে উঠল, “অবশেষে।”

এগারো

মায়াবী দেশ কলচিস, জাদুর দেশ। রাজা এটস নিজে জাদুবিদ্যায় পারদর্শী। রাজার এক মেয়ে, নাম মিডি। রাজকুমারী মিডিও জাদু জানে। জেসান রাজার সঙ্গে দেখা করতে এল।

“প্রণাম মহারাজ। আমি আয়োলকাসের যুবরাজ জেসান, আর আমার সঙ্গে রয়েছে আমার বন্ধুরা।”

“আয়োলকাস! শুনেছি সে বহুদূরের পথ! তোমরা এলে কী করে?” রাজা বললেন।

“জাহাজে করে এসেছি মহারাজ।”

“তোমাদের সাহস তো মন্দ নয়! সাক্ষাৎ মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে এসেছ। তা তোমাদের আগমনের কারণ কী?”

জেসান একে একে বলে গেল নিজের দুর্ভাগ্যের ইতিহাস। রাজা সব শুনলেন। তারপর বেশ কিছুক্ষণ চিন্তা করে বললেন, “সোনালি ভেড়ার লোম আমাদের দেশের অলংকার। বড়ো পবিত্র জিনিস। আমরা পুরুষানুক্রমে এই পবিত্র ও মূল্যবান জিনিসটাকে রক্ষা করে আসছি। তাই কিছুতেই পারব না সেটা তোমাদের হাতে তুলে দিতে।”

“মহারাজ, আমার সব কথা তো আপনি শুনলেন।” জেসান বলল।

“আমি জানি তোমরা বীর, তোমরা সাহসী। তাই ঝড়-ঝঞ্ঝা সামলে এতদূর আসতে পেরেছ। তোমাদের বয়স অল্প। আবেগ আর সাহসে ভর করে এসেছ। তাই তোমাদের এই উদ্যমকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সোনালি ভেড়ার লোম যদি পেতে চাও, তবে একটা শর্ত আছে।” রাজা বললেন।

“কী শর্ত, বলুন!”

“সোনালি ভেড়ার লোম রাখা আছে রণদেবতার উদ্যানে। সেখানে প্রবেশের আগে একটা ফাঁকা মাঠ তোমাদের পেরোতে হবে। ওই মাঠে পেতলের তৈরি ভীষণাকৃতির দুটো ষাঁড় আছে। রাতে ষাঁড় দুটি সারা মাঠ ঘুরে বেড়ায়। ওদের শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে নাক দিয়ে আগুন বেরোয়। রাতে ওই পথে কেউ যেতে পারে না। তোমার কাজ হবে ষাঁড় দুটোকে লাঙলে জুতে মাঠ চাষ করা। তারপর সেই চষা মাঠে ড্রাগনের দাঁত রোপণ করতে হবে।”

“ড্রাগনের দাঁত?”

“হ্যাঁ, ড্রাগনের দাঁত। এই কাজটা শেষ হলেই প্রবেশ করতে পারবে রণদেবতার উদ্যানে। সেখানে ওকগাছ জড়িয়ে শুয়ে আছে একটা ড্রাগন, তারও নিঃশ্বাসে আগুন ছোটে। ওই ওকগাছের ডালে রাখা আছে সোনালি ভেড়ার লোম। তাই কাজটা একেবারে সোজা নয়।” বলে মৃদু হাসলেন রাজা।

জেসান আগাগোড়া শুনল। তারপর ভাবতে লাগল।

রাজা আবার শুরু করলেন, “তবে হ্যাঁ, কাজটা তোমাকে একা করতে হবে। এই কাজে তোমার বন্ধুদের বা সঙ্গীদের সাহায্য নেওয়া চলবে না।”

“আমি আপনার শর্তে রাজি।” জেসান বলল।

“আরেকটা কথা, এই কাজটা ভালোভাবে করতে পারলে আমি আমার একমাত্র কন্যার সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব।”

জেসান লজ্জায় মুখ নীচু করল। কী যেন ভেবে নিয়ে কিছুক্ষণ পরে বলল, “যদি সফল হই, তবে আপনার দান আমি মাথা পেতে নেব।”

বারো

জেসান বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনায় বসল।

“জাদুবিদ্যায় পারদর্শী রাজা এটস পেতলের ষাঁড় তৈরি করে উদ্যানের মুখে পাহারায় বসিয়েছেন।” হারকিউলিস বলল।

“আমরা সকলে মিলে রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামলে হয় না?” আরেকজন বন্ধু বলল।

“সেটা ঠিক হবে না। অন্যের দেশে এসে লড়াই করে আমরা জিততে পারব না। তাছাড়াও রাজা নিজে একজন জাদুকর।” জেসান বলল।

“তাহলে কী করবে বলে ঠিক করলে?” হারকিউলিস প্রশ্ন করল।

“আমি একাই লড়ব। তারপর তোমরা তো রইলে। বিপদ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়বে।”

“ঠিক আছে, তবে তাই হোক। তবে তোমার কিছু হলে রাজাকে কিন্তু ছেড়ে দেব না।” সকলে সমস্বরে বলল।

এমন সময় রাজার এক দূত দরজার বাইরে এসে ঘরে প্রবেশের অনুমতি চাইল। জেসান তাকে অনুমতি দিলে সে ঘরে ঢুকে কুর্নিশ করে বলল, “মহামান্য বীর যোদ্ধৃগণ, আপনাদের মধ্যে জেসান কে?”

“আমিই জেসান।” জেসান উঠে দাঁড়াল।

“আপনার সঙ্গে রাজকুমারী মিডি দেখা করতে চান।”

“রাজকুমারী মিডি!” জেসানের গলায় বিস্ময়। বন্ধুরাও অবাক।

“তিনি কোথায়?” জেসান জিজ্ঞেস করল।

“অতিথিশালার পেছনে উদ্যানে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন।” দূত বলল।

“এটা রাজার চাল নয় তো?” একজন স্বগতোক্তি করল।

“তোমরা এখানে থাকো, আমি জেসানের সঙ্গে যাচ্ছি।” হারকিউলিস বলল।

“না বন্ধু, আমি একাই যাব। কোনোরকম সমস্যা হলে আমি আওয়াজ দেব। চলো দূত।” জেসান বলল।

জেসান দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে উদ্যানে এল। সেখানে একটা গাছের নীচে পাথরের উপরে বসে আছে রাজকুমারী মিডি। জেসান রাজকুমারীকে অভিবাদন করে দূরত্ব রেখে দাঁড়াল।

“রাজকুমার জেসান, আমি অন্তরাল থেকে আপনাকে দেখেছি। আপনার বীরত্ব আর সৌন্দর্য মুগ্ধ করেছে আমাকে। বাবা আপনাকে যে শর্ত দিয়েছেন তা কোনও বীরের পক্ষেই পালন করা সম্ভব নয়। কারণ, রণদেবতার উদ্যানে প্রবেশপথে পেতলের তৈরি ষাঁড়ের যে স্তম্ভ দুটো আছে, সে দুটো আমার বাবারই তৈরি। আমার বাবা একজন জাদুকর। তাই একমাত্র জাদুবিদ্যার দ্বারাই ওই ষাঁড় দুটোকে বশীভূত করা সম্ভব।” মিডি বলল।

“কিন্তু আমি তো জাদুবিদ্যা জানি না।”

“আমি আপনাকে সাহায্য করব।”

“আপনি?”

“বাবার কাছেই আমার জাদুবিদ্যার হাতেখড়ি। তাই আপনাকে পথের দিশা দেখাতে পারি।”

“কিন্তু আমাকে সাহায্য করবেন কেন?”

“আমি, আমি চাই না আপনার মতো একজন বীর আমার বাবার কাছে হেরে যাক। তাছাড়া এতদূর থেকে এসেছেন শুধুমাত্র নিজের সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য…” রাজকুমারী মুখ নীচু করল।

“কিন্তু আপনার সঙ্গে আমার কী এমন সম্পর্ক, যে আপনার সাহায্য আমি নেব?”

“আমাকে আপনার একজন শুভাকাঙ্ক্ষী মনে করতে পারেন।”

“আপনার বাবা জানতে পারলে ভীষণ রেগে যাবেন।” জেসানের চোখে দ্বিধা।

“বাবা জানতে পারবেন না।” রাজকুমারী আশ্বাস দিল।

“ঠিক আছে, আপনার সাহায্য আমি নেব।” জেসান বলল।

রাজকুমারী জেসানকে সব বুঝিয়ে বলল।

তেরো

অন্ধকার রাত। চারপাশে ঝিঁঝিঁ পোকারা ডেকে চলেছে। কাছেই কোথাও শেয়াল জাতীয় প্রাণী ডেকে উঠল। জেসান অতিথিশালা থেকে বেরিয়ে এল। তার হাতে একটা মশাল, কোমরে গোঁজা তরবারি, পিঠে ঢাল। ধীর পায়ে সে রণদেবতার উদ্যানের দিকে এগোল। উদ্যানে প্রবেশের মুখে একটা মাঠ। মাঠটা প্রাচীরে ঘেরা। সকালে এসে সে এদিকটা একবার ঘুরে গেছে। মাঠের মাঝখানে স্তম্ভের উপর পেতলের ষাঁড় দুটো খুটিয়ে দেখেছে। এখন মশালের আলোয় ষাঁড় দুটোর পেতলের গা চকচক করছে। জেসান এখানে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গে তাদের নাসিকা গহ্বর থেকে বেরিয়ে আসছে আগুনের হলকা।

‘হে ঈশ্বর! কীভাবে আত্মরক্ষা করব বুঝতে পারছি না।’ মনে মনে বলল জেসান।

আজ সকালেই রাজকুমারী তাকে একটা প্রলেপন বা মলম দিয়েছিল। বলেছিল, মলমটা গায়ে মাখলে আগুনের হলকা গায়ে লাগবে না। জেসান মলমটা সারা গায়ে-মুখে মেখে নিল। তারপর ষাঁড়দ্বয়ের সামনাসামনি হল।

পাথুরে বন্ধ্যা জমি। এই জমি কর্ষণ করা অসম্ভব। তার থেকেও অসম্ভব ষাঁড় দুটোকে বশীভূত করা। জেসানের সাড়া পেয়ে ওরা যেন জীবন্ত হয়ে গেল। সামনের পা ঠুকতে লাগল মাটিতে, নাক থেকে বেরিয়ে আসছে আগুনের হলকা। জেসান ভাবল, বিপদের মুখে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে।

জেসান মাঝমাঠে দাঁড়াল। ষাঁড় দুটো হুংকার দিয়ে ছুটে এল ওর দিকে। জেসান প্রস্তুত ছিল। সঙ্গে সঙ্গে শূন্যে লাফিয়ে উঠে ডিগবাজি খেল সে। ষাঁড় দুটো নিজেদের গতি নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে ওকে অতিক্রম করে মাঠের দুই প্রান্তে ছুটে গেল। জেসান আবার মাঝমাঠে দাঁড়াল। ওরা আবার জেসানের দিকে ঘুরল। তারপর পায়ের খুর দিয়ে মাটি ওড়াল। নাক দিয়ে বেরোল আগুন। এবারেও তীব্র গতিতে ছুটে এল ওর দিকে। জেসান এই মুহূর্তের জন্যই অপেক্ষা করছিল। ষাঁড় দুটো যখন প্রায় তার কাছাকাছি এসে পড়েছে, তখন সে আবার শূন্যে লাফ দিল। সঙ্গে সঙ্গে এক অভাবনীয় ঘটনা ঘটল। ওরা একে অপরের সঙ্গে প্রচণ্ড জোরে ‘ক্র্যাং’ শব্দ করে ঠোক্কর খেল। জেসান মাটিতে নেমেই এগিয়ে এসে দু-হাতে ওদের শিং দুটি মাটির সঙ্গে ঠেসে ধরল। ষাঁড় দুটোর নাক থেকে বেরিয়ে আসা আগুনের উত্তাপ তার গায়ে লাগল না। সে মনে মনে ধন্যবাদ দিল রাজকুমারীকে।

শক্তি হারিয়ে ষাঁড় দুটো এলিয়ে পড়ল মাটিতে। সে অদূরে পড়ে থাকা লাঙলের জোয়াল তুলে দিল তাদের কাঁধে। তারপর লাঙলের ফলাটাকে মাটির সঙ্গে চেপে ধরে তার উপর উঠে দাঁড়াল। রাজকুমারীর দেওয়া লোহার চাবুকটা বের করল সে কোমরের কাছ থেকে। তারপর ঠকাং শব্দে ষাঁড় দুটোর পিঠে বসিয়ে দিল চাবুক। চাবুকের আঘাতে ওরা নিমেষের মধ্যে পুরো মাঠটাই চষে ফেলল। ততক্ষণে তদের জিভ বেরিয়ে গেছে। তাদেরকে নির্দিষ্ট জায়গায় ছেড়ে দিয়ে দম নেবার জন্য দাঁড়িয়ে রইল জেসান।

একটা কাজ শেষ হল। এবারে দ্বিতীয় কাজটি করতে হবে তাকে। এটাও কম শক্ত কাজ নয়। রাজা তাকে থলিতে করে ড্রাগনের দাঁত দিয়েছিলেন। জেসান সারা মাঠে দাঁতগুলো ছড়িয়ে দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে অসংখ্য সৈন্য মাটি ফুঁড়ে যেন উঠে দাঁড়াল মাঠে। কী সর্বনাশ! এখন এদের সঙ্গে আমাকে লড়াই করতে হবে? রাজা তাহলে তাকে মারবার ফন্দি এঁটেছিলেন! ইতিমধ্যে সৈন্যদল জেসানকে দেখে খাপখোলা তরবারি নিয়ে এগিয়ে আসতে লাগল। রাজকুমারী জেসানকে একটা ধাতব টুপি দিয়েছিল। বলেছিল, টুপিটার চৌম্বকীয় ধর্ম আছে, প্রয়োজনে কাজে লাগবে। টুপিটার কথা মনে পড়ল তার। বুদ্ধি করে টুপিটা নিজের মাথা থেকে খুলে ছুড়ে দিল সৈন্যদলের দিকে।

আশ্চর্য ঘটনা! টুপিটা ওদের দিকে ছুড়তেই ওরা মুহূর্তে লোহার কীলকাকৃতি লাভ করে ছিটকে এসে টুপিটার গায়ে সেঁটে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ধাতব বলের আকার নিল। জেসান আর সময় নষ্ট না করে একটা জাদু তির ছুড়ে দিল গোলক লক্ষ্য করে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ধাঁধানো আলো আর কান ফাটানো শব্দে বিস্ফোরণ ঘটল সেই গোলকের। সৈন্যদের ছিন্নভিন্ন টুকরোগুলো মিশে গেল মাটিতে। সঙ্গে সঙ্গে মাঠের বাইরে উল্লাসে ফেটে পড়ল জেসানের বন্ধুরা, যারা চুপি চুপি জেসানকে অনুসরণ করে এতক্ষণ লক্ষ করছিল জেসানের কার্যকলাপ। তারা প্রস্তুত হয়েই এসেছিল, জেসানের বিপদ দেখলে ঝাঁপিয়ে পড়বে।

বিস্ফোরণের শব্দ শুনে আরামের শয্যা থেকে উঠে এলেন রাজা এটস। রাজকুমারী প্রাসাদের উপর থেকে এতক্ষণ লক্ষ করছিল সমস্ত ঘটনা।

চৌদ্দ

জেসান সাহসে ভর করে প্রবেশ করল রণদেবতা উদ্যানে। উদ্যানটা বেশ সাজানো গোছানো। চারপাশে সুগন্ধি ফুলের গাছ, একপাশে ঝরনা। দূর থেকে সে দেখল হলুদ আলোয় ভরে আছে বাগানের মাঝখানটা। কাছাকাছি এসে ভালো করে চেয়ে দেখল একটা ওকগাছের ডাল থেকে এই হলুদ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। আর গাছটাকে বেড় দিয়ে শুয়ে আছে একটা ভয়ংকর ড্রাগন।

জেসানের পায়ের শব্দে ড্রাগনটা চমকে ঘাড় ঘোরাল। তারপর কয়েক মুহূর্ত যেন জরিপ করল জেসানকে। ক্রমে তার চোখদুটো হয়ে উঠল লাল। নিঃশ্বাসে বেরিয়ে এল আগুন। জেসান ড্রাগনের গল্প শুনেছে এর আগে। কিন্তু চোখে দেখল এই প্রথম। অজানা দ্বীপে প্রথমে রাক্ষস, তারপর রাক্ষুসে ঈগল, কলচিসে এসে পেতলের ষাঁড় এবং অবশেষে এই ড্রাগনের পাল্লায় পড়ল সে। এবার বোধ হয় আর শেষ রক্ষা হল না।

ড্রাগনটা উঠে দাঁড়াল। তারপর ওকগাছটাকে কেন্দ্র করে হুম হুম শব্দ করতে শুরু করল। জেসান আর একটু এগোল। ড্রাগন এখন ওর সামনে কয়েক হাত দূরে। নাক থেকে বেরিয়ে আসছে আগুন-নিঃশ্বাস। জেসান তো আগেই মেখে নিয়েছিল রাজকুমারীর দেওয়া জাদু-মলম। তাই আগুন-বাষ্প তাকে স্পর্শ করতে পারল না। সে আর একটু সাহসী হল। বিশালদেহী ড্রাগনটা এবারে ওর দিকে ধেয়ে এল। তার মুখের ভেতরে ধারালো দাঁতগুলো ঝিকিয়ে উঠল।

জেসান কোমরবন্ধ থেকে বের করল মরিচ চূর্ণ। এটা একটা অভিনব দাওয়াই। বুদ্ধি করে সে সঙ্গে নিয়ে এসেছিল। এই চূর্ণ সে ছিটিয়ে দিল ড্রাগনের চোখ লক্ষ্য করে। তারপর বলল, “আমায় ক্ষমা করো বন্ধু, এ ছাড়া আর আমার কোনও উপায় ছিল না।”

চোখে মরিচ চূর্ণ যাবার অনতিকাল পরে ড্রাগন পাগলের মতো হয়ে গেল, চোখে কিছুই দেখতে পাচ্ছিল না। জোরে জোরে হাঁচতে লাগল। তারপর সামনের পা দুটি দিয়ে চোখ ডলতে লাগল। তারপর অস্থির হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল।

এই অবসরে জেসান ফিরে তাকাল ওকগাছের দিকে। ঘন অন্ধকারের মধ্যেও আশ্চর্য হলুদ আভাতে ভরে রয়েছে চারপাশ। অবশেষে পরম প্রাপ্তি। এই জিনিসটার জন্য জীবন বাজি রেখে এতদূরে ছুটে আসা। সোনালি ভেড়ার লোম। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তের রাজাদের কাছে কাঙ্ক্ষিত ধন। তাড়াতাড়ি কাজটা সারতে হবে। না হলে মরিচের প্রভাব নষ্ট হয়ে যাবে। জেসান গাছে উঠে আলতো করে পেড়ে আনল সোনালি ভেড়ার লোম।

পনেরো

কলচিসে সূর্যের আলো ফুটতে না ফুটতেই পঞ্চাশ জন বীর যোদ্ধার কোলাহলে মুখরিত হল আকাশ-বাতাস। সপারিষদ রাজা বেরিয়ে এলেন রাজগৃহ ছেড়ে। বন্ধুরা তখন জেসানকে মাথায় করে নাচছে।

“এবারে আমাদের জাহাজ ছেড়ে দিলেই হয়।” এক বন্ধু মন্তব্য করল।

“না, সেটা ভালো দেখায় না। রাজা আমাকে পরীক্ষা করেছেন বটে, কিন্তু রাজকন্যার সঙ্গে একবার না দেখা করলে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে।” জেসান বলল।

রাজা ডেকে পাঠালেন জেসানকে। তারপর প্রদীপ জ্বালিয়ে পবিত্র ওকপাতা আর ফুলের ডালি দিয়ে বরণ করলেন ভাবী জামাতা জেসানকে।

“জেসান, তোমার সাহসিকতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। কিন্তু একটা সত্য কথা বলো তো, এই কঠিন কাজে তোমাকে কে সাহায্য করেছে?” রাজা বললেন।

“দেখুন, এই কাজটা খুব কঠিন ছিল। সত্যি কথা বলতে কী, আপনার মেয়ে আমাকে সাহায্য না করলে এই যুদ্ধটা জয় করা আমার দ্বারা সম্ভব ছিল না।”

“আমিও সেটা অনুভব করেছি। আসলে জাদুবিদ্যা না জেনে এই কাজ করা অসম্ভব। তবে কাজটা তুমি নিজের হাতে করেছ, এতেই আমি সন্তুষ্ট।”

“কিন্তু মহারাজ, ড্রাগনকে কিন্তু আমি একাই সামলেছি। সেখানে কারও সাহায্য নিইনি।”

“জানি। আমার কন্যা খাঁটি হিরেকেই চিনেছে। একটা কথা বলি, তোমার আর দেশে ফিরে কাজ নেই, তুমি বরং এদেশেই থেকে যাও। তোমার হাতে রাজ্য সঁপে দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি।”

“না না, মহারাজ, সেটা হয় না। পিতৃভূমিকে উদ্ধার করাটা আমার দায়িত্ব। আর এই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েই আমি এদেশে এসছি। অত্যাচারী রাজার হাত থেকে সিংহাসনকে মুক্ত করতে না পারলে আমার পিতার আত্মা শান্তি পাবে না। তবে কথা যখন দিয়েছি, আমি আপনার কন্যাকে বিবাহ করব।” জেসান মুখ নীচু করল।

রাজা এটস জেসানের কথায় সম্মত হলেন। ক্লান্ত বীরের দল এক সপ্তাহকাল বিশ্রাম নিল কলচিসে। তাদের আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি ঘটল না। তারপর নির্দিষ্ট লগ্নে রাজকুমারী মিডির সঙ্গে বিয়ে হল জেসানের। বিয়ের একদিন পরে রাজা চোখের জলে বিদায় দিলেন মেয়ে-জামাইকে। ফেরার পথে আরও একটি জাহাজ যুক্ত হল তাদের সঙ্গে। এই জাহাজটি রাজা এটস উপহার দিয়েছেন মেয়ে-জামাইকে। ফেরার সময় আর কোনও নতুন উপদ্রবে পড়তে হয়নি তাদের।

উপসংহার

জেসানের জাহাজ আয়োলকাসের সমুদ্রতীরে পৌঁছানো মাত্র বাতাসের বেগে সুসংবাদ ধেয়ে গেল রাজধানীতে। পেলিয়াস ধরে নিয়েছিল দুর্গম অভিযানে বেরিয়ে জেসান আর ফিরে আসবে না। কিন্তু জেসানের আগমনবার্তা তার কাছে দুঃসংবাদ হয়ে উঠল। দেশের সাধারণ মানুষ হয়ে উঠল পেলিয়াসের অবাধ্য। তারা হৈ হৈ রবে ছুটে এল রাজধানীতে। তারপর শুরু করল তাণ্ডব। রাজার কয়েকজন অনুচর বাদে বাকিরা উৎসবে মেতে উঠল। তারা আয়োলকাসে জেসানকে বরণ করার জন্য প্রস্তুত হতে লাগল। বন্দিশালা ভেঙে বেরিয়ে এল বন্দিরা। তারাও চায় জেসানকে রাজারূপে দেখতে। রাজ-তোরণে বেজে উঠল দুন্দুভিসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। তারপর দেশের প্রকৃত রাজাকে বরণের পালা আরম্ভ হল।

রাজপ্রাসাদে পা রেখেই জেসান জিজ্ঞেস করল, “কাকা কোথায়?”

“তিনি স্বেচ্ছায় নিজেকে গৃহবন্দি রেখেছেন। বাইরে বেরোননি।” মহামন্ত্রী বললেন।

“কেটে আনব নাকি তার মাথা?” সেনাপতি বললেন।

“খবরদার! এভাবে তাঁর সম্পর্কে কথা বলবেন না আপনারা। তিনি আমার কাকা। আমি তাঁর হাত থেকেই রাজমুকুট পরতে চাই।” জেসান বলল।

অনেক পীড়াপীড়িতে পেলিয়াস দরজা খুলল। একসঙ্গে ভয় ও লজ্জা ঘিরে ধরেছে তাকে। কাঁপতে কাঁপতে সে বাইরে এল। জেসান অভিবাদন করল কাকাকে।

“আপনি না পাঠালে সোনালি ভেড়ার লোম আনতে পারতাম না এদেশে। পাশাপাশি রাজকুমারী মিডির সঙ্গেও দেখা হত না।”

পেলিয়াস কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। তার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। জোর করে সে হাসার চেষ্টা করল। তারপর বলল, “আমাকে কি তুমি শূলে চড়াবে?”

“না না, আপনি আমাদের সঙ্গেই থাকবেন। আপনার সৎ পরামর্শ আমার কাজে লাগবে।” জেসানের কণ্ঠে বিনয়।

মুহূর্তে সমবেত জনতা হর্ষধ্বনিতে ফেটে পড়ল জেসানের মহানুভবতার পরিচয় পেয়ে। তারপর একটা ভালো দিন দেখে জেসানকে রাজসিংহাসনে অভিষিক্ত করা হল। এই অভিষেকের দিন কিরোসহ জেসানের বন্ধুরাও এসেছিল আমন্ত্রিত হয়ে।

জেসান রাজসভায় নিজের পাশের একটা সিংহাসনে বাবার দেওয়া জুতোজোড়ার একটি পরম যত্নে সাজিয়ে রাখল, বাকিটা তো হারিয়ে গেছে নদীবক্ষে।

একদিন একটা জেলে এল জেসানের সঙ্গে দেখা করতে। রাজা জেসানকে একপাটি সোনার জুতো দেখিয়ে জেলে জানাল, মাছ ধরতে গিয়ে এটা তার জালে ধরা পড়েছে।

“এই তো! এটাই তো বাবার দেওয়া জুতোজোড়ার হারিয়ে যাওয়া পাটি!” আনন্দোজ্জ্বল হয়ে উঠল জেসানের চোখমুখ। সে জেলে-মাঝিকে উপযুক্ত পুরস্কারে ভূষিত করল।

ছবি-শ্রীময়ী

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s