এই লেখকের আগের উপন্যাস- কুকুলকানের সন্ধানে

১
কুউউউউউ!
ট্রেনের ভোঁ শুনে ঘুম ভেঙে গেল টিলুর। এই রে, জানলার বাইরে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কখন সে ঘুমিয়ে পড়েছে। আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল টিলু, তারপর একটা হাই তুলল। কানের ভিতরটা কেমন সোঁ সোঁ করছে এখনও, মাথাটাও একটু ভোম্বল হয়ে আছে। কানে আঙুল দিয়ে ঝাঁকিয়ে দিতে গিয়ে সে দেখল, তাদের কামরাটা প্রায় খালি হয়ে এসেছে, অন্যান্য লোকজন সব আগেই নেমে গিয়েছে মনে হয়। ট্রেনের স্পিডও কমে এসেছে অনেক। কটাং কটাং করতে করতে ট্রেনটা এখনও চলছে বটে, কিন্তু সে প্রায় হামাগুড়ি দেওয়ার মতোই চলা।
টিলুর অবশ্য সে নিয়ে চিন্তা নেই, উল্টে এই শম্বুকগতি লোহার দৈত্যের পেটে ঢোকার পর থেকেই সে মনে মনে প্রার্থনা করেছে, যেন খুব তাড়াতাড়ি নামতে না হয়। ট্রেনটা যেন ভীষণ লেট করে, দারুণ জোরে বৃষ্টি হয়ে লাইনের ওপর জল জমে যায়, আর কিছু না হোক হাতির দল এসে দাঁড়িয়ে পড়ুক লাইনের ওপর… শেষমেশ ওসব কিছুই হয়নি বটে, কিন্তু সময় তাও খুব কম লাগেনি। পুরোনো আমলের রেলগাড়ি, কখনও ঝিকমিকিয়ে চলে, কখনও আবার নাদুস নুদুস চালে এগোয়, দাঁড়িয়েও পড়ে যখন তখন মর্জিমাফিক, সাহেবগাড়ি বলে কথা! সেই কোন যুগে কাঠবোঝাই করে লোকালয়ে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বানানো হয়েছিল, মাঝেমধ্যে চিড়িয়াখানায় বাঘ হাতি ভাল্লুক ধরে পাঠানো হত এই গাড়িতেই। মেজাজই আলাদা। সে মেজাজের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে গন্তব্যের কথা বেমালুম ভুলে যেতে হয়, আর চোখ কান মন সব ঢেলে দিতে হয় পথের ওপর। যে সে পথ তো নয়, রূপকথার রাজ্য যেন! সমস্ত রাস্তাটা হাঁ হয়ে বাইরের দিকে চেয়ে থেকেছে টিলু। ছোটো ছোটো গোলাপি রঙের ঝর্ণা, বাটারস্কচ নদী, সাদাকালো বা হলুদ লাল ডোরাকাটা গাছের সারি, আর রামধনু রঙের পাহাড়… এমন দৃশ্য সে আগে কখনও দেখেনি। গাছগুলোর শরীর থেকে বেরিয়ে আসা অরেঞ্জ স্কোয়াশ রঙের শিকড়গুলোরও বাহার কি! যেন গাছের রূপ ধরে মাসিপিসিরা রেনবো কালারের সোয়েটার বুনছে। ট্রেন চলে তাদের পাশ কাটিয়ে। এমন পথ পেলে কে আর গন্তব্যের পরোয়া করে?
তা সেই রূপকথার পথও শেষ হতে চলল অবশেষে। টিলুর চোখে এখনও ঘুমের রেশ। চোখ রগড়ে চিরকালের সঙ্গী চশমাটা বের করে পরে নিল সে। সবুজ রঙের গোল চশমাটা নাকের ওপর এঁটে বসতেই সে খেয়াল করল, বাবা ইতিমধ্যেই জুতো পরে নিয়ে ব্যাগ গোছগাছ করছে। টিলুর ঘুম ভেঙে গেছে দেখে বলে উঠল, “টিলুবাবু যে ঘুমিয়ে কাদা! ওঠ ওঠ, স্টেশন এল বলে।”
টিলু জুতোয় পা গলিয়ে বেগুনি ব্যাকপ্যাকটা পিঠে নিয়ে নিল, তারপর জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকাতেই বিস্ময়ে একেবারে হাঁ হয়ে গেল সে। সবুজ রঙের ঘন কুয়াশায় আবৃত হয়ে আছে চারিদিক। কালচে সবুজ রঙের মেঘগুলো একেবারে নাকের ডগায় ভাসছে, ওরাই যেন পাহারাদারের মতো ট্রেনটাকে আগলে নিয়ে চলেছে। কাঠের খোলা জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে নিশ্বাস নিল টিলু। অজানা ফুল আর ভিজে মাটির গন্ধ এসে নাকে লাগছে, নিশ্চয়ই কিছুক্ষণ আগে বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে এক দু পশলা। সে ডান হাত বাড়াতেই জানলার সামনে ভেসে থাকা মেঘের বালিশ উবে গিয়ে তুলোর মতো সোনালি পরাগ রেণু ভেসে বেড়াতে লাগল হাওয়ায়, জোনাকির মতো উড়ে এল কামরার ভিতরে। হ্যারি পটারের ম্যাজিক স্পেলের মতো সোনালি আলোর ঝিলিক খেলা করতে লাগল কামরাটা জুড়ে, কিন্তু টিলু জানে, সে ছাড়া সে দৃশ্য আর কেউই দেখতে পাবে না। এইজন্য মনে মনে সে নিজেকে হগওয়ার্টসের ছাত্র বলেই মনে করে। সে আর তার বাবা দুজনেই পাক্কা পটারহেড, কিন্তু বাবার কাছে টিলুর মতো ম্যাজিক পাওয়ার নেই। অবাক চোখে সেই সোনালি আলোর খেলা দেখতে দেখতে টিলু বুঝতে পারল, তার চোখের কোল আবার ভিজে উঠেছে, বাঁ চোখটা জ্বালা করছে একটু একটু। সে তাড়াতাড়ি চোখ বন্ধ করে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিল, বাবা দেখলেই ব্যস্ত হয়ে পড়বে। গালের ওপর গড়িয়ে পড়া চোখের জল মুছতে মুছে সে ভাবল, সে কি কোনোদিনই ভালো হবে না?
২

টিলুরা যে স্টেশনে নামবে, সেটার নাম মিকোজিমালি। কিন্তু গাড়ি থামার পর কাউকে নামতে দেখা গেল না। স্টেশনই বা কই? ঢালু হয়ে বয়ে চলা খরস্রোতা নদীর ওপর একটা নীল কাঠের ব্রিজ আর ধাপে ধাপে ওপরে উঠে যাওয়া পাহাড়, সেই ব্রিজের সামনে এসে আচমকা লাইনটা শেষ হয়ে গিয়েছে। এই লাইনের ট্রেনগুলো এখনও সেই স্বাধীনতার আগের ডিজাইন বজায় রেখেছে। লোহার জায়গায় শালকাঠ দিয়ে তৈরি রেলট্র্যাক, মাঝেমধ্যে কাঠের পাটাতন বদলাতে হয় বলে মজুরদের ডাক পড়ে। আলাদা আলাদা কোচ, কিন্তু সিট ফিটের বালাই নেই, লম্বা লম্বা কাঠের ডেস্কের মতো বসাশোয়ার জায়গা, বড়ো বড়ো কাঠের জানলা। ব্যবহারও অবশ্য সেই আদ্যিকালের মতোই। কয়লা টানা ইঞ্জিন দিয়ে চলা এই ট্রেন বন্ধ করে দেওয়ার কথা অনেকদিন আগে থেকেই চলছে, কিন্তু এই নিবিড় বনপাহাড়ের দেশে নতুন করে ট্রেন লাইন বসানোর ঝক্কি নিতে কেউই রাজি নয়, আর এমনিতেও খুব দরকার না পড়লে এদিকপানে কেউ আসেও না। কিন্তু স্থানীয় মানুষের দাবি, ট্রেন বন্ধ করা চলবে না। সপ্তাহে মাত্র একদিন এই ট্রেনটা চলে পুলিপোঁতা থেকে মিকোজিমালি পর্যন্ত, ঘটঘট করতে করতে পেরিয়ে যায় গভীর গিরিখাত বা পাহাড়ি নদীর ওপর বানানো ব্রিজ। যারা এই ট্রেনে ওঠে, তারা সবাই স্থানীয় লোক, আদিবাসীদের গ্রামে জিনিসপত্র নিয়ে যায়। দু একজন শহুরে মানুষও মাঝেমধ্যে যায় বটে, যেমন টিলুরা চলেছে। রক্ষণাবেক্ষণ তেমন হয় না, তবু কী করে যেন টিকে গিয়েছে এই লাইনটা।
কাঠের ব্রিজের ওপর একটা মাঝবয়সী লোক অপেক্ষা করেছিল। টিলুরা নামতেই সে হাঁ হাঁ করে ছুটে এসে টিলুর বাবাকে জড়িয়ে ধরল, তারপর হেসে কেঁদে উত্তেজিত হয়ে অনেক কথা বলতে লাগল। বাবাও হাসিমুখে তার সঙ্গে কথা চালিয়ে গেল, টিলু কিছুই বুঝল না। টিলু হওয়ার আগে বাবা এখানে বেশ কয়েকবার এসেছে, কয়েক মাস করে থেকেওছে, কিন্তু টিলু আগে মিকোজিমালিতে আসেনি। সে শুধু জানে, বছর পঁচিশ আগে তার দাদু একটা কাজের সূত্রে এই অঞ্চলে এসে আর শহরে ফিরে যাননি, এখানেই পাকাপাকিভাবে থেকে গিয়েছিলেন। বাবা টিলুর দিকে মুখ ফিরিয়ে বলল, “এই দেখ টিলু, আমার ছাত্র বয়সের বন্ধু। ওর নাম তোপা। তোপা এখানে বাবার সঙ্গেই থাকত। ওই আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।” টিলু এইবার মন দিয়ে লোকটাকে দেখল। প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট লম্বা, শ্যামলা রং, ছোটোখাটো মুখ, দাঁড়িগোঁফ বলতে থুতনির কাছে আয়রন ম্যান মার্কা ছুঁচলো ছাগলদাড়ি। বড়ো বড়ো চোখদুটো দেখলেই তাকে ভালো মানুষ বলে মনে হয়, আর তার লম্বা চুলগুলো খুলে রাখলে হয়তো কোমর ছাড়িয়ে যাবে। এখন অবশ্য সেগুলো ছোটো ছোটো বিনুনি করে খোঁপা বেঁধে রেখেছে তোপা, তাতে বেশ একটা স্মার্ট ভাব এসেছে তার চেহারায়। তার পরনে সবুজ শর্ট আর চাইনিজ চেকারের মতো দেখতে একটা সুতির শর্ট কুর্তা, কাঁধের ওপর একটা গিটারের উল্কি। তোপা একগাল হেসে টিলুর দিকে তাকিয়ে চোস্ত আমেরিকান ইংরেজিতে বলল, “হাউ ডু ইউ ডু মিস্টার টিলু?”
টিলু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাতেই বাবা হেসে বলল, “চমকে গেলেন মিস্টার পটার? তোপা শিলংয়ে লিঙ্গুইস্টিক্স নিয়ে পড়াশোনা করেছে, ইউএসএ গিয়েছে, বাবার রিসার্চের কাজে প্রধান সহকারীও ওইই। আমাদের চেয়ে বেশি ভালো ইংরেজি জানে, আর গিটারটাও দারুণ বাজায়। ওর একটা রক ব্যান্ডও আছে। এখনও আছে তো তোপা?”
উত্তরে তোপা এক গাল হেসে জানিয়ে দিল, আছে। ততক্ষণে আরো দু’একজন স্থানীয় লোক এসে হাজির হয়েছে। তোপার কথায় তারা চটপট জিনিসপত্র কাঁধে তুলে নিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে চলল। তোপা ইংরেজি বাংলা মিশিয়ে বলল, “ঘণ্টাচারেকের পথ, ধীরেসুস্থে গেলেই হবে। চড়াই খুব খাড়া নয়। প্যাকড লাঞ্চ এনেছি। কোনও অসুবিধা হবে না। লেটস গো।”
টিলুরা এইবার রুকস্যাক নিয়ে তোপার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল। মিকোজিমালির পরই লাইন শেষ হয়ে গিয়েছে, তারপর আর কিছুই নেই। পাকা রাস্তা তৈরিই হয়নি, বাস গাড়ি চলার প্রশ্নই নেই। বনদপ্তরের চেকপোস্ট আছে অনেক দূরে, পেট্রোলিং অফিসাররা বিশেষ দরকারে এখনও ঘোড়া ব্যবহার করে। যতদূর চোখ যায় সবুজ বন পাহাড়ের সারি, নালা বা ঝোরার কুলকুল শব্দ কানে আসে, ভিজে বাতাস বয় বনের ভিতর থেকে। এদিকে বৃষ্টি হয় খুব বেশি, দু একদিন তেড়ে রোদ হলেই জোর বৃষ্টি নাম, ধোয়াপাকলা করে দিয়ে যায় সবকিছু। টিলু দেখল, মাটির ওপর গজানো উদ্ভিদগুলোর বেশিরভাগই চ্যাপ্টা আর চওড়া, তাদের মাঝে লাল নীল চোখের মতো নিশান। বাতাসে নড়লে মনে হয় কুলোর মতো কান নাড়িয়ে তাদের ভয় দেখানোর চেষ্টা করছে। বড়ো বড়ো কাঠের লগ নরম মাটিতে ছড়ানো, সেখানে রাশি রাশি প্রজাপতি বাসা বেঁধেছে। আর আছে মাথার ওপর গাছের ক্যানোপি, জেব্রা শামিয়ানার শাখাপ্রশাখা জুড়ে বিশাল বিশাল মাকড়শার জাল, সেই রুপোলি জালের ভিতর থেকে ছিটকে আসা রোদ্দুর সাত রঙে ভেঙে ছড়িয়ে পড়ছে ফার্ন গাছের স্ট্রবেরি লাল পাতার ওপর। সোনালি কালো ডোরাকাটা বাঘরঙা টিয়াপাখির দল উড়ছে গাছেগাছে, সবুজ কাঠঠোকরা কোটরে বসে ঠকঠকিয়ে চলেছে। বুড়ির চুলের মতো সোনা রং ঘাসের আঁশ ভেসে বেড়াচ্ছে তাদের ঘিরে ধরে, আর বেগুনি অন্ধকার জমা হচ্ছে সূর্যমুখী ফুলের বুকে।
কিছুটা এগোতেই এক একটা বাঁশের সাঁকো, তার নীচ দিয়ে সজোরে বয়ে চলেছে কলকল ছলছল নদী। সেরকম একটা সাঁকোর ধারে বসে লাঞ্চ সেরে নিল সবাই। হাতে পাকানো রুটির ভিতর মাংস আর সবজি পোরা একটা জিনিস, স্থানীয় কুলের চাটনি। অন্যরকম স্বাদ, চেটেপুটে খেয়ে নদী থেকে ওয়াটার বটল ভরে নেওয়া হল। ক্রিম রঙের নদী, তার উত্থালপাথাল ঢেউয়ের ফেনার ওপর ওপর বিস্কুট রঙের বড়ো বড়ো গাছ ফড়িং এসে নাচ দেখাচ্ছে। হলুদ বাঁশের ব্রিজের ধারে চুপটি করে বসে থাকা দুধ সাদা কচ্ছপের দল, ইতিউতি জলে লাফিয়ে পড়া লিপস্টিক লাল কোলাব্যাঙ। এর মধ্যে আবার কিছুক্ষণ পরপর বৃষ্টি নামছে, যেন কেউ বরফঠান্ডা আইশিং সুগার ছড়িয়ে দিচ্ছে গায়ে, তাতে গা ভেজে না, সুড়সুড়ি লাগে। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে রং বদলের খেলা চোখে পড়ে তার। মার্মালেড রঙের আকাশটা ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে পান্না সবুজ রঙে, আর সেখান দিয়ে পাল তুলে ভেসে চলেছে নানান রঙের মেঘের ভেলা… টিলু এমন অবাক হয়ে গেছে যে বার চারেক ঠোক্কর খেয়েছে সে। কেন সে আগে এখানে আসেনি? এতদিন শুধুশুধু একটা রংচটা ঘরের ভিতর বন্দি হয়েছিল সে! দাদু যদি হুট করে হারিয়ে না যেত, তাহলে কি আদৌ সে এখানে আসতে পারত?
স্বপ্নে বিচরণ করতে করতে কখন সে পথটা শেষ হয়ে গেল, টিলু বুঝতেই পারল না। ইতিমধ্যে দলের বাকি দুজনের সঙ্গেও তার ভাব হয়ে গেছে। তাদের নাম রিও আর ইনাও। তারা ইংরেজি বলতে পারে না বটে, কিন্তু তাদের মুখে হাসি লেগেই আছে। ইশারায় কথা বলতে অসুবিধা হয় না, যদিও তারা কিছু কিছু হিন্দিও জানে। চড়াই উৎরাই পেরিয়ে যখন একসময় পথ শেষ হল, সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। দূরে একটা কাঠের বাংলোর আদল দেখা যাচ্ছে। তোপা সেদিকে দেখিয়ে বলল, “আমরা এসে গেছি। ওই হল আমাদের গ্রাম। মামিলাপিনাতাপাই।
৩
“কতদিন পর এলি, সপ্তর্ষি?”
তোপার প্রশ্ন শুনে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল সপ্তর্ষি। কত বছর হল? সাত? না আট? শেষবার যখন এসেছিল, টিলু আর ওর মা অ্যাডেলিন আসতে পারেনি। টিলু তখন এইটুকুন! বাবা অবশ্য শহরে গিয়ে দেখা করে এসেছিলেন। সপ্তর্ষি ভেবে রেখেছিল, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ শেষ করেই দেশে ফিরে আসবে, বাবার সঙ্গেই গবেষণা করবে। কিন্তু কোথা থেকে কী হয়ে গেল! হুট্ করে একটা গবেষণার কাজ পেয়ে সপ্তর্ষিকে চলে যেতে হল তুরস্কে, তিন বছর কেটে গেল সেখানেই। সপ্তর্ষি ভেবেছিল এইবার বুঝি তল্পিতল্পা গুছিয়ে দেশে ফিরে যাবে, অ্যাডেলিনেরও আপত্তি ছিল না। কিন্তু একটা কার অ্যাক্সিডেন্টে যে সব তছনছ করে দেবে, সেটা কেউই বুঝতে পারেনি। দু’দিন হাসপাতালে থেকেই অ্যাডেলিন চলে গেল, রয়ে গেল টিলু। কত বয়স তখন তার? তিন? না সাড়ে তিন? প্রথম কয়েক মাস কিছুই বুঝতে পারেনি সপ্তর্ষি, কোনও সিদ্ধান্তই নিতে পারেনি। যখন সব আবার ক্রমে স্বাভাবিক হতে শুরু করল, তখনই টিলুর রোগটা ধরা পড়ল। তারপর কয়েকটা বছর যে কোথা দিয়ে কেটে গেল! এই ডাক্তার, সেই ডাক্তার! বাবা চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন দেশে ফিরে আসতে, কিন্তু ভারতে এলে টিলুর চিকিৎসা হবে কী করে? বিদেশের ডাক্তাররাও অবশ্য খুব একটা ভরসা দিতে পারেননি। শেষমেশ বাবা আর ছেলে দুজনেই মেনে নিয়েছে সত্যিটা। কিন্তু এর পরেও এমন একটা আঘাত যে আসতে চলেছে, সপ্তর্ষি সেটা কল্পনাও করতে পারেনি।
“ঠিক মনে নেই রে!” সপ্তর্ষি বলল।
তোপা বুকশেলফের বইগুলো ঝেড়ে ঝেড়ে রাখছিল। সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কয়েকদিন আগে অবধি এই স্টাডি রুমেই দিন কাটত স্যারের। যাকগে, শেষমেশ যে এলি এই যথেষ্ট। কিছু ভেবেছিস এরপর কী করবি?”
সপ্তর্ষি মেহগনি কাঠের টেবিলের ওপর হাত বুলিয়ে বলল,”জানি না রে। আপাতত এক বছরের স্যাবাটিকাল নিয়েছি। টিলু কেমন থাকে দেখি! আর ফিরলেই কার কাছে ফিরব বল? মা নেই, অ্যাডেলিন নেই, আর এখন বাবাও…”
“আগেই অত হতাশ হচ্ছিল কেন?” তোপা সপ্তর্ষির কাঁধে হাত রেখে তাকে চাঙ্গা করতে বলল, “নিখোঁজ মানুষরা বেশিরভাগ সময়েই ফিরে আসে! এ তো আর কিডন্যাপিং কেস নয়। আর স্যার দিব্যি সুস্থসবল ছিলেন,তাঁর গবেষণা নিয়ে যথেষ্ট উৎসাহ ছিল। উনি শুধু শুধু নিরুদ্দেশ হতে যাবেন কেন? ওই ছবিটা দেখ! ওটা আগের শীতে তুলেছিলাম। কোনোরকম ডিপ্রেশনের চিহ্ন দেখতে পাচ্ছিস?”
সপ্তর্ষি টেবিলের ওপর থেকে ছবিটা তুলে নিল। একটা গাছের তলায় তোলা হয়েছে ছবিটা। তোপাও সঙ্গে আছে, আর আছে কিছু স্থানীয় ছেলেমেয়ে। বাবার গায়ে উইন্ডজ্যাকেট, মাথায় হান্টিং ক্যাপ, দাঁড়িগোঁফের ফাঁকে উজ্জ্বল হাসিটা দেখেই সপ্তর্ষির মনে পড়ে গেল সেই দিনটার কথা, যেদিন যে প্রথম মামিলাপিনাতাপাইয়ে এসেছিল মায়ের সঙ্গে। কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে এরকম করেই হাসছিলেন বাবা। সপ্তর্ষি তখন কৈশোরের দোরগোড়ায়, বাবা এখানে চলে আসার পর সে মায়ের কাছে থেকেই পড়াশোনা করেছে, আর কলেজে পড়ার সময় তো হস্টেলেই থাকতে হত। বাবা এই দুর্গম অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়েছিলেন বটে, কিন্তু বাস্তববুদ্ধির অভাব তার কোনোকালেই ছিল না। ফলে স্ত্রী ছেলেকে নিয়ে আসার জন্য জোর দেননি কোনোদিন। অন্য কোনও দম্পতির ক্ষেত্রে এরকম পরিস্থিতিতে সমস্যা হতে পারত হয়তো, কিন্তু বাবা আর মায়ের মানসিকতা ছিল অন্যরকম। বাবার সিদ্ধান্তকে মা শুধু মেনেই নেয়নি, তাঁকে উৎসাহও দিয়েছিল। ফলে অসুবিধা হয়নি। শিক্ষকতার পাশাপাশি মা যখন সপ্তর্ষির পড়াশোনার আর খেলাধুলো সামলেছে, বাবা সামলেছেন তার প্রফেশন। অবশ্য পেশা যতটা, নেশা তার চেয়ে কম নয়।
সপ্তর্ষির বাবা ইন্দ্রজিত খাসনবিশ এ সময়ের নামকরা ফিলোলজিস্ট। মাইকেল হ্যালিডে, ইউরি নোরোজোভ, স্টিফেন পিঙ্কার বা এডওয়ার্ড সাপিরের পাশাপাশি ইন্দ্রজিত খাসনবিশের নামটাও ভাষাবিজ্ঞানের জগতে একত্রে উচ্চারিত হয়। আই সি চাকো, পট্টভিরামা শাস্ত্রী, এ কে রামানুজমের পর ভারতবর্ষে লিঙ্গুইস্টিক্স নিয়ে বিশেষ গবেষণা হয়নি, আমাদের দেশের অসংখ্য উপজাতি আর তাদের সমৃদ্ধ ভাষাগুলো ক্রমে হারিয়ে যেতে বসেছে। ডাক্তার অদিতি লাহিড়ীর মতো ব্যতিক্রমী দু একজন এই ফিল্ডে উল্লেখযোগ্য কাজ করছেন সন্দেহ নেই, কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে ফিল্ডে না কাটালে অজানা ভাষার ক্যাটালগিং আর ডকুমেন্টেশন করা অসম্ভব, বিশেষ করে ভারতীয় উপমহাদেশের দুর্গম অঞ্চলে। সামাজিক-রাজনৈতিক চাপ তো আছেই, ফিল্ড ওয়ার্কের জন্য মাঠেঘাটে, বনে জঙ্গলে দিন কাটানোর জন্য কোনও সরকারি-বেসরকারি সহায়তারও ব্যবস্থা নেই। তাই ইন্দ্রজিৎ খাসনবিশ ঠিক করেছিলেন, নাম কে ওয়াস্তে বার বার দু চার সপ্তাহের জন্য ফিল্ড রিসার্চ না করে এই অঞ্চলেই ঘাঁটি গেড়ে কাজ করতে।
ভারতবর্ষের উত্তরপূর্ব অঞ্চলে কয়েক হাজার উপজাতি আছে, তাদের অনেকেরই পৃথক ভাষা ছিল একসময়। এই ভাষাগুলোর মধ্যে প্রায় সত্তর শতাংশ ভাষা সম্পর্কে আমাদের কোনও স্পষ্ট ধারণা নেই। অনেক ভাষাই হারিয়ে গেছে, বাকিগুলো দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। স্বাভাবিক নিয়মে একটা ভাষা হারিয়ে গিয়ে অন্য ভাষাকে জায়গা করে দেয়, দু তিনটে ভাষা নিয়ে একটা সম্পূর্ণ নবীন ভাষা গড়ে ওঠে, সেটা নতুন কিছু নয়। কিন্তু সাধারণত এই সমস্ত ভাষার সঙ্গে অন্যান্য ভাষার কিছু মেলবন্ধন থাকে, একটা গোষ্ঠীর কিছু মানুষ প্রয়োজনে দুটো বা তিনটে ভাষায় কথা বলতে পারে। সেক্ষেত্রে একটা ভাষা বলার লোক যদি কমেও আসে, সময় থাকতে সেই ভাষার আঙ্গিক আর সেই গোষ্ঠীর সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হয়ে থাকে। অনেক ক্ষেত্রেই সক্রিয়ভাবে এই ভাষা বলার লোক কয়েক বছর পর হারিয়ে যায়, কিন্তু সেই ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা গান, গল্প, লোককথা, ইতিহাস, রান্নাবান্না, আচার অনুষ্ঠান সম্পর্কে একটা স্পষ্ট ধারণা করে নেওয়া যায়।
এই আর্কাইভাল লেগেসি শুধু একটা হারিয়ে যাওয়া সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধরেই রাখে না, নৃতত্ব, ভাষাবিজ্ঞান, শিল্প ও ইতিহাসের গবেষণায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও পালন করে। এমনও হয়, ছোট্ট কোনও গোষ্ঠীর ভাষা সম্পর্কে গবেষণা করতে গিয়ে একটা অধুনালুপ্ত ভাষা সম্পর্কে জরুরি তথ্য জানা হয়ে যায়। মায়া সংস্কৃতির জটিল লিপিগুলোর অর্থোদ্ধার করতেও এই ধরনের আর্কাইভাল রিসার্চের যথেষ্ট ভূমিকা ছিল। ইন্দ্রজিৎবাবু এই অঞ্চলের আদিবাসী গোষ্ঠীদের নিয়ে এই কাজটাই করতে চাইছিলেন। কিন্তু, মাসখানেক আগে তিনি আচমকা নিখোঁজ হয়ে যান। তোপা ফিরে আসার পর ব্যাপারটা জানতে পেরেই সপ্তর্ষিকে খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করেছিল। এইবার আর দ্বিধা করেনি সপ্তর্ষি, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব টিলুকে নিয়ে এখানে চলে এসেছে।
সপ্তর্ষি তোপাকে বলল, “পুলিশ কী বলছে?”
তোপা চুলের বিনুনিতে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, “কী আর বলবে? আমরা বার কয়েক ধর্ণা দিয়েছি বটে, তাতে সাহেবদের বিশেষ হেলদোল হয়নি। সার্চ পার্টির নামে দু-তিনজন কনস্টেবলকে পাঠিয়েছিল, তারা নিজেরাই উল্টে হারিয়ে যাচ্ছিল আরেকটু হলে!”
সপ্তর্ষি একটু উত্তেজিত হয়ে বলল, “একটা লোক নিখোঁজ হয়ে যাবে, পুলিশ একটা ইনভেস্টিগেশন করবে না? সরকারের একটা দায়িত্ব নেই?”
তোপা একটু করুণ হেসে বলল, “সরকার আমাদের কথা কবেই বা ভেবেছে! দিল্লি বম্বে হলে না হয় হত! আমরা জংলি লোক, আমাদের ছোটোখাটো সমস্যা নিয়ে মাথা ঘামালে ওদের চলবে? এসব সীমান্ত অঞ্চলে কী চলছে তুই তো জানিস। রিফিউজি ক্রাইসিস, মাদক দ্রব্য আর অস্ত্র পাচার, উপজাতিদের নিজস্ব রেষারেষি, আর সন্ত্রাসবাদের সমস্যা তো আছেই। সেনাবাহিনীর সঙ্গে টেররিস্ট গ্রূপের এনকাউন্টার তো লেগেই আছে। আর পুলিশের ক্ষমতাই বা কোনটুকু? মিসিং পার্সন রিপোর্ট করতেই অবস্থা খারাপ হয়ে গেছে। নামকরা বিজ্ঞানী হলে তিনি সব ছেড়ে এই জঙ্গলে আস্তানা গেড়েছিলেন কেন, সেই নিয়েই ওদের বেশি চিন্তা। তাছাড়া সপু, এসব জঙ্গল পাহাড় কতদূর অবধি চলে গিয়েছে, এখানে একজন মানুষকে খুঁজে বার করা কি মুখের কথা!”
সপ্তর্ষি মুখ নীচু করে বসে রইল। বাবার জন্য চিন্তা যা আছে তা তো আছেই, কিন্তু পাশাপাশি একটা চাপা অপরাধবোধও যেন তাকে কুরে কুরে খেতে লাগল। দেশের নাগরিক হিসেবে ব্যাপারটা তার পক্ষেও কম লজ্জাজনক নয়। তোপার কথায় ঘর করে থাকা গোপন হতাশার সুর বুঝতে তার কষ্ট হয়নি। সরকার যে এই অঞ্চল নিয়ে মাথা ঘামায় না, সেটা তার অজানা নয়। বাবা নিজেও বহুবার আফসোস করেছেন এ নিয়ে। প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ অবশ্য পুরোমাত্রায় চলছে, একের পর এক বড়ো নদীতে বাঁধ তৈরি হচ্ছে, খননকার্যও চলছে একাধিক রাজ্যে, কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য নিঃস্বার্থভাবে কিছু করার ইচ্ছে কেন্দ্র বা রাজ্য সরকারের আগেও ছিল না, এখনও নেই। সেটা হলে একটা রাজ্যভিত্তিক কমিটি তৈরি করে বিভিন্ন উপজাতিদের সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করার কাজটা তেমন কঠিন হত না। কিন্তু বার বার বলা সত্ত্বেও ও নিয়ে কেউই মাথা ঘামায়নি। ভাগ্য ভালো, এখানকার সাধারণ মানুষ বরাবরই কর্মঠ, উদ্যোগী, বুদ্ধিমান। তারা এখনও পুরোপুরি হাল ছেড়ে দেয়নি। শত বাধাবিপত্তি সত্ত্বেও প্রকৃতি আর নিজেদের ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে।
তোপা বন্ধুর দিকে তাকিয়ে একটু লজ্জিত হয়ে পড়ল। সপ্তর্ষি নিজেই নানান ঝামেলায় আছে, তাকে আর শুধু শুধু এসব কথা বলে বিব্রত করার কোনও মানে হয় না। সে লণ্ঠনের আলোটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল, “চিন্তা করিস না। তুই এসে গেছিস যখন, ব্যবস্থা একটা হবেই। আজ আর দেরি করে লাভ নেই, খাওয়াদাওয়া করে শুয়ে পড়। এদিকে টিলুবাবুর তো দেখছি একটুও ভয়ডর নেই। দিব্যি রান্নাঘরে গিয়ে রিওদের সঙ্গে জমে গেছে।”
সপ্তর্ষি উঠে দাঁড়িয়ে চার ব্যাটারির টর্চটা পরীক্ষা করে দেখছিল। এইবার একটু হেসে বলল, “বেশিরভাগ সময়টা তো বেচারির হাসপাতালেই কেটেছে। এখন ছুটি পেয়ে বেশ মজায় আছে।”
“তোর ছেলেটা কিন্তু বুদ্ধিমান!” তোপা লণ্ঠন তুলে নিয়ে বলল, “ওর চোখ দেখলেই বোঝা যায়। আর বলতে নেই, ওর চোখদুটো খুব সুন্দরও। পটারের ভক্ত বলেই হয়ত হ্যারির মতো মায়ের চোখ পেয়েছে, তাই তো?”
“ঠিকই। তবে দেখলেই কি সব বোঝা যায় রে!” সপ্তর্ষির গলাটা একটু যেন করুণ শোনাল। সে একটু বিষন্ন ভাবে হাসল।
তোপা থমকে গিয়ে বলল, “আচ্ছা, টিলুর রোগটা কী? একটু খুলে বলবি ব্যাপারটা?”
“বলব।” সপ্তর্ষি উঠে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়েছিল। বলল, “বা হয়তো বলার দরকারই পড়বে না। তুই নিজেই বুঝতে পারবি। আপাতত চল বাইরে গিয়ে দেখি টিলুটা গেল কোথায়!”
দুই বন্ধু ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। এই অঞ্চলে বিদ্যুৎ আসেনি সঙ্গত কারণেই। দরকার পড়লে সোলার পাওয়ার দিয়ে দু একটা বাতি জ্বলার ব্যবস্থা অবশ্য আছে। ছোট্ট গ্রাম, পনেরো কুড়ি ঘর লোকের বাস। বাড়িগুলো অবশ্য পাকা, কাঠ আর পাথর দিয়ে তৈরি একতলা বাড়িই বেশি। সামনে উঠোনের মতো একটা ঘেরা জায়গা। সবজির বাগান আর শূকর-মুরগির খোঁয়াড়ও আছে বাড়িগুলোর পিছনের দিকে, গ্রামের পাশ দিয়েই একটা ছোট্ট জলের ধারা বয়ে গিয়েছে। তারপর একটা ছোট্ট বুগিয়ালের মতো ঘাসের ময়দান। ময়দানের পর আবার গভীর জঙ্গল শুরু হয়েছে। ঘন সবুজের মধ্যে এই জায়গাটাই একটু ফাঁকা, ফুলগাছ দিয়ে ঘেরা বাড়ি আর কেয়ারি করা সবজির গাছ দিয়ে সাজানো। ছিমছাম, আন্তরিক। ড্রোন ক্যামেরা দিয়ে দেখলে জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যে অবস্থিত এই ছোট্ট গ্রামটা মরুদ্যান বলেই মনে হবে।
রান্নাঘরের দিক থেকে হাসির শব্দ ভেসে আসছিল। এখানে সকলের বাড়িতে পৃথক ভাবে রাঁধাবাড়ার চল নেই, গ্রামের সমস্ত মানুষের জন্য একসঙ্গে রান্না করা হয়। সকলেই হাত লাগায় সেই কাজে। সঙ্গে আড্ডা আলোচনা হাসিঠাট্টাও চলে। রান্নাবান্নার অছিলায় সন্ধ্যায় কিছুটা সময় দিব্যি কেটে যায়। কমিউনিটি কিচেনের এই ব্যাপারটি নিয়ে ইন্দ্রজিৎবাবুর বেশ উৎসাহ ছিল। আজ নাকি টিলুদের অনারে রিও স্পেশাল ফাকপাই চিকেন রান্না করছে, সঙ্গে এরোম্বার চাটনি আর জংলি মাশরুম দিয়ে ‘উশোই’ অর্থাৎ বাম্বুশুট স্যুপ। গ্রামের সবাই সাহায্য করছে এই ভোজ রাঁধতে, কিন্তু রান্নার তদারকির ভার আজ রিওর।
রান্নাঘরটা মাটির তৈরি। ভিতরটা বেশ পরিচ্ছন্ন। মাঝখানে কয়েকটা বাঁশ বেঁধে বারবিকিউ করা হয়েছে, সেখানে মাংস সেঁকা চলছে। রান্না হচ্ছে পাশের বড়ো বড়ো উনুনে ইয়া বড়ো ডেকচি চাপিয়ে। ঝুড়ির মধ্যে ভিয়েতনামিজ ধনেপাতা থেকে শুরু করে কুমড়ো, বেগুন, মাশরুম, শাকপাতা…সব ডাঁই করে রাখা। রিও মহাব্যস্ত হয়ে ডেকচিতে খুন্তি চালাচ্ছে। এদিক সেদিক তাকাতেই সপ্তর্ষি দেখতে পেল, এককোণে বাচ্চাদের সঙ্গে বসে আছে টিলু। তার মুখে হাসি, কোলের ওপর পা রেখে দাঁড়িয়ে আছে দুটো কুকুর ছানা। ছানা হলেও তাদের বেশ বড়োসড়ই বলতে হয়, পাহাড়ি কুকুর বলে কথা। একটা সাদা, অন্যটার গায়ে সাদাকালো ছিট। পরম যত্নে সে কুকুরগুলোর গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। তার সবুজ চশমা নাকের ওপর নেমে এসেছে, জুতোর ফিতে খুলে গেছে, সেদিকে তার খেয়াল নেই। সপ্তর্ষিকে দেখেই সে কুকুরদুটোকে নিয়ে ছুটে এল তার দিকে। তোপা সপ্তর্ষির কানে কানে বলল, “স্যারের পুষ্যি। বেচারির মা কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। এরকম অনেক আছে, কাল দেখবি।”
টিলু দৌড়ে এসে বলল, “বাবা, এই দেখো আমার নতুন বন্ধু।”
একটা কুকুর টিলুর কোল থেকে নেমে পড়েছিল, সপ্তর্ষি সেটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল, “বাহ্। আসতে না আসতেই কেমন দুটো সঙ্গী পেয়ে গেলি দেখ! লাকি বয়। তা কুকুরগুলোর রং কী দেখলি বল তো?”
ওমনি টিলুর মুখ থেকে হাসি মুছে গেল। একটু বোকার মতো তাকিয়ে সে ভয়ে ভয়ে বলল, “মেরুন?”
তোপার ভুরু কুঁচকে গেছে। সপ্তর্ষি অবশ্য অবাক হল না, কুকুরটার সামনে উবু হয়ে বসে চোখ কুঁচকে বলল,”মেরুন? না সবুজ? অন্ধকারে বুঝতে পারছি না বুঝলি। কাল সকালে দেখে ঠিক করা যাবে। তা এগুলোর নাম কী দিবি?”
টিলুর মুখটা আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সে বলল, “ওদের নাম তো আছে, দাদু রেখেছে। আমি দেব কেন?”
“আছে, তা বেশ। কী নাম?” সপ্তর্ষি উঠে দাঁড়িয়ে বলল।
টিলু একগাল হাসল, তারপর চোখ বন্ধ করে বলল, “টং আর লিং।”
৪
দাদুর বাড়িতে যে একটা আস্ত চিড়িয়াখানা আছে সে সম্পর্কে টিলুর কোনও ধারণা ছিল না। অবশ্য চিড়িয়াখানা বললে ভুল হবে, সেখানে তো জন্তুজানোয়ারদের খাঁচায় ভরে রাখা হয়। এখানে খাঁচাফাঁচার বালাই নেই, সবাই মস্তিতে খোলা জায়গায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। দাদুর কটেজটার পিছনে একফালি খোলা জায়গা আছে, সেখানেই তারা থাকে। মাঝেমধ্যে এদিক সেদিক চলে যায়, কিন্তু রাত হলে নিজে থাকতেই সেখানে ফিরে আসে। চারটে খরগোশ, দুটো হরিণ, তিনটে বেজি, পাঁচটা কচ্ছপ তো আছেই, তিন চাররকমের বাঁদর আর অসংখ্য পাখিও আছে। তারা বাঁধা থাকে না কেউই, আর সবাই নাকি দাদুর খুব অনুগত। গোল্ডেন লাঙ্গুর বলে একটা ধেড়ে হনুমানকে কাঁধে বসিয়ে একটা ছবিও আছে দাদুর, সেটা ইনাও তাকে দেখিয়েছে। পাখিদের ছবিও দেখিয়েছে অনেক। ইনাও আর রিওর কাছ থেকে শুনে শুনে নামগুলো মুখস্থ করে ফেলেছে টিলু। রুফাস নেকড হর্নবিল, প্যারাকিট বলে এক ধরনের টিয়াপাখি, ইন্ডিয়ান ট্রগন, থ্রাস্ট বার্ড (বাবা বলেছে, বাংলায় এই পাখির নাম হল কমলা ফুলি), হোয়াইট বেলিড হেরন, নাচানি মোরগ, আরো কত কি! অত টিলুর মনেও নেই। তবে মনে না থাকলেও অসুবিধা নেই। সকাল বিকেল একটু খেয়াল করলেই গাছে গাছে অসংখ্য পাখি দেখা যায়, তাদের কারো লেজে আলতার ছিটে, কারো পেটে সূর্যমুখীর মতো লাল নীল ছোপ। জঙ্গলে খানিকটা এগোলেই একটা ছোট্ট জলাশয়ের মতো জায়গা আছে, সেখানে সারসের দল এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মাছরাঙাও আছে দু তিন রকমের। তারা টুঁই টুঁই শব্দ করে জলে প্রায় পালক ঠেকিয়ে উড়ে যায়, দেখে মনে হয় যেন জলের ওপর পিয়ানো বাজানো প্র্যাকটিস করছে। জঙ্গলের ভিতর থেকেও সর্বক্ষণ পাখির গান ভেসে আসছে, সে শব্দ কানে গেলে আর পা নড়ে না। এক একটা পাখির এক এক রকম গলা। কেউ অরিজিৎ সিংয়ের মতো একা গাইছে, কয়েকজন পাখি আবার বিটিএস ব্যান্ডের মতো দল বেঁধে চিল্লিয়ে গান করছে। পাখির দল গাছে বসে বিটিএস মেম্বারদের মতো রঙিন জামাপ্যান্ট পরে, মুখে ক্রিম আর পাউডার মেখে গান করছে, দৃশ্যটা কল্পনা করতেই জোর হাসি পেয়ে গেল টিলুর। মন দিয়ে শুনলে এক একটা পাখির ডাকের সঙ্গে তাল রেখে গান বানিয়ে নেওয়া যায়। সকালবেলা টিলু এরকম একটা গান বেঁধে তোপাকে শুনিয়েছিল (বদলে তোপাও তার গিটার বাজিয়ে একটা ফাটাফাটি গান শুনিয়েছে টিলুকে), এখন কথাগুলো বেমালুম ভুলে গেছে। বাধ্য হয়ে সে সুরটাই ভাঁজতে লাগল।
কুই কুই কুই টোয়া টুটু
কুই কুই কুই টোয়া টুটু
টুইয়া কুই কুইয়া টুই
বেশিক্ষণ অবশ্য সুর ভাঁজতে ইচ্ছে করল না, পাখির সুরেলা ডাকের সামনে নিজেকে বড়ো বেসুরো লাগছে। তারপর টং আর লিং তার গান শুনে এমন অদ্ভুত ভাবে তাকাচ্ছে যে বলার নয়! কুকুর দুটোর পিঠে হাত বুলিয়ে টিলু চিৎপাত হয়ে ঘাসের ওপর শুয়ে পড়ল। আজকে আকাশটা অনেক বেশি সুন্দর লাগছে। কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর তার মনে হল, আকাশটা যেন স্থির নয়। সব কিছুই ঘুরছে, ঘুরেই যাচ্ছে। মনে হচ্ছে, আকাশটা একটা বিশাল কড়াই, সেই কড়াইয়ে জিলিপি ভাজা হচ্ছে। সোনালি রঙের ব্যাটারের গুঁড়োগুলো কড়াইতে পড়েই ঘুরতে শুরু করছে, তারপর একটা চক্রের মতো আকার নিচ্ছে। বিদেশে থাকার সময় ভ্যান গঘের এরকম একটা ছবি দেখেছিল টিলু, কিন্তু সেটা ছিল রাতের ছবি। এখন তো দিন! আচ্ছা, আকাশটা কি সত্যি ঘুরছে? নাকি আসলে তারই মাথা ঘুরছে?
কথাটা মনে হতেই তড়াক করে লাফিয়ে উঠল টিলু। বাঁই বাঁই করে মাথাটা ডানদিকে বাঁদিকে ঘুরিয়ে দেখল। কই না তো! তাহলে সে ঠিকই দেখেছে। এইবার কী করা যায়? আজ সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে পড়েছে সে, তারপর হাত মুখ ধুয়ে সকলের সঙ্গে বসে ওমলেট আর শাকের তরকারি দিয়ে রুটি খেয়ে নিয়েছে। কিছুক্ষণ রিওদের সঙ্গে ঘুরঘুর করেছে, কিন্তু বেশিক্ষণ তাদের পাওয়া যায় না। বেলা বাড়তেই তারা জঙ্গলে গাছ কাটতে বা শুকনো ঘাসপাতা সংগ্রহ করতে ঢুকে যায়, অনেকে রান্নাঘরে দুপুরের খাবারের জোগাড়যন্ত্র করে। গ্রামের ছেলেমেয়েগুলোর সঙ্গে ইশারায় ইশারায় ভাব পাতিয়ে নিয়েছে টিলু, কিন্তু সকালবেলা তারাও বড়ো ব্যস্ত থাকে। এখান থেকে ঘণ্টা দেড়েক হাঁটলে নাকি একটা অন্য গ্রামে স্কুল বসে, তারা সবাই সেখানে পড়তে যায়। আসার সময় বন থেকে ফলপাকুড় কুড়িয়ে ফেরে। এদিকে বাবা আর তোপা গম্ভীর মুখ করে দাদুর স্টাডিতে ঢুকে কী সব পড়াশোনা করছে, তাদের কাছে বসে থাকার মানেই হয় না। রিও অবশ্য বলেছে এখানে কোনও ভয় নেই, একা একা সে যেখানে ইচ্ছে যেতে পারে। শুধু বনের গভীরে না ঢুকলেই হল! না হলে রাস্তা চিনে ফিরতে পারবে না। দাদুও নাকি ওই জঙ্গলে ঢুকেই হারিয়ে গিয়েছে! দাদুটা একদম বোকা। এতদিন ধরে এখানে আছে, কিছুই চিনে উঠতে পারেনি। টিলু একবার হাই তুলল, তারপর টংয়ের কান মুলে দিয়ে, লিংয়ের লেজে টান মেরে উঠে পড়ল। তাতে অবশ্য তারা মোটেও গা করল না, পাশ ফিরে শুয়ে আগের মতোই মহানন্দে রোদ্দুর খেতে লাগল।
ঘাস তুলে চিবোতে চিবোতে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল টিলু। হরিণগুলো বনের সামনে গিয়ে ঘাস চরছে, তাদের সবুজ গায়ের ওপর হলুদ ফুটকিগুলো বৃষ্টির ফোঁটার মতো জ্বলজ্বল করছে। খরগোশগুলোর অবশ্য দেখা নেই। ওরা মহা দুষ্টু। কোথায় লুকিয়ে পড়েছে কে জানে? হয়তো বেজির গর্তে ঢুকে বসে আছে, নয় রিও দাদার দেওয়া গাজরের স্যালাড খেয়ে আরামে ঘুম দিয়েছে।
হাঁটতে হাঁটতে সে দেখল বাঁধানো চৌব্বাচার জলের তলায় দুটো কচ্ছপ ঢুকে মুখ উঁচিয়ে বসে আছে, যেন ভেংচি কাটছে টিলুকে। তাদের পাত্তা না দিয়ে অন্য তিনটে কচ্ছপের সামনে উবু হয়ে বসে পড়ল টিলু। আররে! কচ্ছপের খোলসগুলোর ওপর কেমন রংবেরংয়ের ডিজাইন! একটা গোল্লার ভিতর আরেকটা গোল্লা, সেখানে আবার কীসব আঁকিবুকি কাটা! টিলু ঘাসের ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে খুব মন দিয়ে সেই আঁকিবুকি দেখতে লাগল। আঁকিবুকিগুলো সত্যিই অদ্ভুত, যেন কেউ রঙিন সুতো দিয়ে রুমালের ওপর ডিজাইন বুনে দিয়েছে। টিলুর কাছে একটা ল্যাভেন্ডার রঙের (বাবা বলেছে ওটা ল্যাভেন্ডার, তার অবশ্য দেখে হলুদ বা সবুজ বলেই মনে হয়েছিল) সোয়েটার আছে, তাতে এমন কতগুলো নকশা করে দিয়েছিল বিন্তি মাসি। এই নকশাগুলো অবশ্য আরো অনেক বেশি জটিল। একবার বাবা গল্প করেছিল কচ্ছপের খোলসের ওপর কেউ গুপ্তধনের ম্যাপ এঁকে রেখেছিল। এগুলোও কি তেমন কোনও গুপ্তধনের ম্যাপ?
কথাটা মনে হতেই টিলু এক লাফে উঠে দাদুর স্টাডির দিকে ছুটল। এমন আচমকা লাফে টং আর লিংও ভড়কে গিয়ে মহা উত্তেজিত হয়ে ডাকতে ডাকতে তার পিছনে দৌড়াতে লাগল। বাগান পেরিয়ে, ফুলের কেয়ারি এক লাফে ডিঙিয়ে, বাঁ হাতে নাকের ঢলঢল করে নাচতে থাকা সবুজ ফ্রেমের চশমা সামলে ছুটতে ছুটতে তিন মূর্তি যখন বাবার সামনে পৌঁছাল, তখন বাবা কানে ইয়ারফোন লাগিয়ে গান শুনছে। টিলুর সে দেখে এইসা রাগ হল! এই কাজের ছিরি! তাকে দেখে ইয়ারফোন নামিয়ে বাবা বলল, “কী রে! হাঁফাচ্ছিস কেন? বাঘে তাড়া করেছিল বুঝি?”
টং-লিং তখন তোপার সামনে গিয়ে লাফালাফি জুড়ে দিয়েছে। তোপা পকেট থেকে দুটো বিস্কুট বের করে তাদের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে শিষ দিতেই কুকুরদুটো ম্যাজিকের মতো চুপ করে গেল, তারপর বাধ্য ছেলের মতো লেজ গুটিয়ে মাটিতে বসে পড়ল। এদিকে বাবার কথা শুনে টিলু তখন কী বলতে এসেছিল ভুলেই গেছে। সে চোখ বড়ো বড়ো করে বলল, “এখানে বাঘ আছে?”
বাবা তোপার দিকে তাকিয়ে ভুরু নাচিয়ে বলল, “কিরে! আছে?”
তোপা একটু মাথা চুলকে বলল, “সে মাসখানেক ধরে খুঁজলে দু’একটা পাওয়া গেলেও যেতে পারে।”
টিলু রাগী রাগী চোখে বাবার দিকে চাইতেই তোপা বলল, “তবে টিলুবাবু, বাঘ না থাকলেও লেপার্ড আছে। মালয় সান বিয়ারও দেখা যায় মাঝেমধ্যে। এই তো আগের মাসে দুটো ছেলে ঙাগেলসানি গ্রামে যাওয়ার সময়ে ক্লাউডেড লেপার্ডের খপ্পরে পড়েছিল। জোর বেঁচে গেছে। তবে বাঘ ভাল্লুক ছাড়াও এইসব জঙ্গলে অন্যরকম ভয়ের জিনিস আছে কিন্তু।”
টিলুর বেশ রোমাঞ্চ হল। সে ফিসফিস করে বলল, “ভূত?”
“আবার কী!” তোপা টিলুর সামনে বাবু হয়ে বসে গম্ভীর স্বরে বলল, “ভূত পেত্নী গিজগিজ করছে এখানে। এখানকার লোকেদের বিশ্বাস, পাহাড় জঙ্গলে যারা মারা গেছে, তারা পাখি আর জন্তু জানোয়ারের রূপ ধরে থাকে। জঙ্গলে নাকি ড্রাগনও আছে, তবে ওরা গাছের ডালের সঙ্গে মিশে থাকে। লাইখুতসাংবি বলে একটা পেত্নী আছে, তার হাতগুলো ইয়া লম্বা, বড়ো বড়ো চুলে মাথা ঢাকা থাকে বলে মুখটা দেখা যায় না। তারপর আছে তুয়াল সুমসু। এরা গ্রামের লোকের ভিতর ঢুকে বসে থাকে। এমনিতে কেউ বুঝতেও পারে না, কিন্তু সেই লোকটা গভীর রাতে বেরিয়ে হাত ভর দিয়ে জঙ্গলে চলে যায়। এদের সামনে পড়লে কিন্তু মহা বিপদ!”
সপ্তর্ষি হেসে বলল, “এই, শুধু শুধু ওকে ভয় দেখাচ্ছিস কেন?”
টিলুর একটু গা শিরশির করছিল বটে, কিন্তু সে জোর গলায় বলল, “আমি মোটেও ভয় পাইনি।”
“ভয় পাওনি?” তোপা মুচকি হেসে বলল, “তাহলে অমন করে দৌড়ে এলে যে?”
“সে তো আমি গুপ্তধনের কথা বলতে এসেছিলাম।” এতক্ষণে কথাটা মনে পড়েছে টিলুর। সে মহা উত্তেজিত হয়ে বলল, “ওই যে কচ্ছপগুলো, ওগুলোর পিঠের খোলসের ওপর গুপ্তধনের ম্যাপ আঁকা আছে। আমার কী মনে হয় জানো, দাদু ওই গুপ্তধন খুঁজতে গিয়েই জঙ্গলে গিয়েছিল। তারপর পথ হারিয়ে ফেলেছে।”
টিলু তড়বড়িয়ে কথা বলে গেল। তোপা আর সপ্তর্ষি নিজেদের মধ্যে মুখ চাওয়াচাওয়ি করল একদম, তারপর দুজনেই হেসে ফেলল। সপ্তর্ষি এইবার ছেলেকে কাছে টেনে নিয়ে বলল, “দাদু কিন্তু সত্যি সত্যিই গুপ্তধনের সন্ধান করছিল বুঝলি! কিন্তু সেই গুপ্তধনের ম্যাপ ওই কচ্ছপের পিঠে নেই, আছে এই ক্যাসেটগুলোর মধ্যে।”
“ক্যাসেট কী?” টিলু অবাক হয়ে বলল।
সপ্তর্ষি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তোপার দিকে তাকাল। তোপাও থমকে গিয়েছিল, এইবার সে হতাশ ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে চেয়ারটা টেনে বসল। টিলু ক্যাসেট কী জানে না, টেপ রেকর্ডার বা গানের সিডি সম্পর্কেও তার কোনো ধারণা নেই। তার দোষ নেই, এ যুগের ছেলেমেয়েরা অনেকেই ক্যাসেট দেখেনি। বিদেশে তো বটেই, দেশেও এখন গান শুনতে হলে লোকে স্পটিফাই, অ্যাপল মিউজিক বা ইউটিউব খুলে বসে, নাহলে সরাসরি ইন্টারনেট থেকে গান ডাউনলোড করে নেয়। টেপ রেকর্ডার, অ্যানালগ রেডিও, মাইক্রোফোন রেকর্ডার, ওয়াকম্যান সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা কিচ্ছু জানে না, পিন লাগানো রেকর্ড প্লেয়ার বা গ্রামোফোন তো অনেক দূরের কথা। অথচ বছর পনেরো কুড়ি আগেও গানের ক্যাসেটের ভালো চাহিদা ছিল। সপ্তর্ষির সংগ্রহে বহু ক্যাসেট ছিল, তোপা তাকে খালি ক্যাসেটে খুঁজে খুঁজে এই অঞ্চলের স্থানীয় গান রেকর্ড করে দিয়েছে কতবার। কত বর্ষার সন্ধ্যা, কত মন খারাপের রাত কেটেছে সে সব গান শুনে, সে সব ক্যাসেট এখন কোনো কাজেই লাগে না। দিনকাল যেভাবে বদলাচ্ছে, দশ বছর আগের প্রযুক্তিও হুট করে অর্থহীন হয়ে উঠছে, মানুষ নতুন প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে। এই দ্রুতগতিতে বদলে যাওয়া জীবনের হুড়োহুড়ির মধ্যে এসব স্মৃতির কোনও জায়গা নেই, কোনও মূল্যও নেই। তবু কয়েকজন থাকে, যারা অত সহজে বদলাতে পারে না। বাবা চিরকাল অডিও ডকুমেন্টেশনের জন্য ক্যাসেট আর ম্যাগনেটিক টেপ ব্যবহার করতেন, সেই সব ক্যাসেটের বাক্সগুলো বের করে এনেছে তোপা। এই পাহাড়ি এলাকায় ইন্টারনেট আসেনি, ব্যাটেরিচালিত টেপ আর ক্যাসেট দিয়েই কাজ চলে যেত।
টিলুকে সংক্ষেপে ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিল সপ্তর্ষি। টিলু দেখল, মাটিতে একগাদা কাঠের বাক্স ছড়ানো, তার ভিতর কতগুলো কালচে সবুজ রঙের আয়তাকার জিনিস। তার দুদিকে দুটো গোল গর্ত, স্বচ্ছ ক্যাসেটের ভিতর হলুদ ম্যাগনেটিক টেপের রিল দেখা যাচ্ছে। সে বাবু হয়ে বসে ক্যাসেটগুলো পরীক্ষা করতে লাগল। কার্টন বোঝাই ক্যাসেট, প্রতিটা বাক্সের ওপর মার্কার দিয়ে কিছু শব্দ আর সংখ্যা লেখা আছে। একটা ক্যাসেট তুলে চোখের সামনে ধরল টিলু। পার্ট এ-এর রিলের ওপর তিনটে স্টিকি নোট সাঁটা, সেখানে খুদে খুদে অক্ষরে ছাপা আছে তিনটে অক্ষর: জি-পি-আর। বি সাইডের ওপর সাঁটা নোটে লেখা: ভি-আর-বি। স্টাডি টেবিলের ওপর একটা হুমদো রেডিও গোছের যন্ত্র, আর তোপা আর বাবার হাতে একটা করে মাইক্রো রেকর্ডারের মতো জিনিস, তাতে ইয়ারফোন লাগিয়ে ক্যাসেটের রেকর্ডিং শোনা যায়। টিলু নেড়েচেড়ে বলল, “এখানে গুপ্তধন কোথায়?”
সপ্তর্ষি মুচকি হাসল। তোপা বলল, “গুপ্তধন তো খুঁজে বার করতে হবে টিলুবাবু। এইগুলোর মধ্যে শুধু গুপ্তধনের সংকেত আছে। ওই যে তুমি বলছিলে ম্যাপ, সেই ম্যাপ বলা চলে! তবে এই গুপ্তধন কিন্তু সোনাদানা নয়, বরং বলা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি দামি জিনিস। এই ধর,এমন কয়েকজন জাদুগর যারা দুশ বছর ধরে জঙ্গলে লুকিয়ে আছে?”
“জাদুগর?” টিলুর চোখে ঝিলিক দিয়ে উঠল, “মানে উইজার্ড? হ্যারি পটারের মতো? দাদু উইজার্ডদের খোঁজে গেছে? এই ক্যাসেটগুলো শুনলে কি আমরা জানতে পারব দাদু কোথায় আছে?”
তোপা তার লম্বা লম্বা চুল পাকাতে পাকাতে বলল, “হয়তো পারব। কিন্তু খুব কঠিন কাজ টিলুবাবু। আমরা গ্রামের মানুষের সঙ্গে কথা বলে যা রেকর্ড করতাম, তার থেকে পাওয়া তথ্যগুলো তোমার দাদু আলাদা করে নোটবুকে লিখে রাখতে। সেই নোটবুকগুলো বেশিরভাগ তোমার দাদু সঙ্গে করে নিয়ে গেছে, শুধু কয়েকটা ফেলে রেখে গেছে। হয়তো আমাদের জন্য কোনও সংকেত আছে সেখানে। কিন্তু মুশকিল হল, তোমার দাদু সব কিছুই লিখেছেন কোডওয়ার্ডে।”
“কোডওয়ার্ড? মানে হেঁয়ালি?” টিলু বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করল। সে বাবার দিকে তাকাল, যেন তোপার কথার সত্যতা যাচাই করে নিতে চায়। সে বলল, “আমি হেঁয়ালি সল্ভ করতে পারি।”
সপ্তর্ষি ঘাড় নেড়ে বলল, “বলছিস?”
টিলু জোর দিয়ে বলল, “হ্যাঁ।”
“বেশ।” আড়চোখে তোপাকে দেখে নিয়ে সপ্তর্ষি বলল, “এই ক্যাসেটগুলো দেখছিস তো, ওপরে দ্যাখ তারিখ লেখা আছে। দাদু যেদিন যেখানে গিয়ে ক্যাসেট রেকর্ড করেছে, তারিখগুলো সেদিনের। এইবার তুই খুঁজে খুঁজে গত দু’মাসের ক্যাসেটগুলো শোন তো! দাদু উইজার্ডদের খোঁজে কোথায় গিয়েছে কিছু বোঝা যায় কিনা! বুঝেছিস তো?”
টিলু একদিকে ঘাড় হেলাতেই সপ্তর্ষি টেবিল থেকে একটা ক্যাসেট বের করে ক্যাসেট প্লেয়ারে ঢোকাল, তারপর কানের ইয়ারফোনটা টিলুর দিকে বাড়িয়ে দিয়ে ইশারা করল। টিলু সেটা কানে লাগাতেই সপ্তর্ষি ক্যাসেট প্লে করে দিল। ওমনি টিলুর কানে ভেসে এল দাদুর গলা।
“প্রজেক্ট ব্লু স্কাই
রেকর্ডিং সেশন ১১৩ জি
দুপুর একটা, সিনিমুরুগু গ্রাম….”
৫
“জুভেনাইল মাস্কুলার ডিস্ট্রফি।”
“সেটা কী? খুব সিরিয়াস গোছের কিছু?” তোপার গলায় থাকা উদ্বেগ বুঝতে কষ্ট হল না।
সপ্তর্ষি মাটির দিকে দেখছিল। অন্যমনস্ক ভাবে আঙুল মটকাতে মটকাতে সে বলল,”ঠিক করে কেউই কিছু বলতে পারেনি। আসলে মাস্কুলার ডিস্ট্রফি আর স্ট্রারগার্ডট ডিজিজে সাধারণত যে ধরনের কেস আসে,টিলুর কেসটা ঠিক সেরকম নয়। সাধারণত বংশগতির কারণেই এমনটা হয়। কিন্তু আমার বা অ্যাডেলিনের পরিবারে কারো এরকম ছিল বলে তো জানি না। থাকলেও অনেক সময় নিজেই সেরে যায়।
মাকুলা,মানে রেটিনার যে অংশটা রং চেনার জন্য দায়ী,টিলুর কেস-এ মাকুলার সেই ফোটো রিসেপশন সেলগুলো মিউটেট করে গেছে। এই অস্বাভাবিক মিউটেশনের ফলে টিলুর চোখে আমাদের গোটা দুনিয়াটাই সম্পূর্ণ অন্যভাবে ধরা দেয়। আমাদের কাছে যেটা নীল বা সবুজ,তার চোখে সেটা খয়েরি বা রামধনু রঙের মনে হতে পারে। আমি আকাশকে নীল ভাবছি,ও হয়তো ভাবছে লাল। ও কিন্তু আমাকে বলছে,ও নীলই দেখছে, কারণ আমি ওকে বলছি আকাশটা নীল। কিন্তু মনে মনে ওর রংগুলো আমাদের চেয়ে আলাদা। আমার কাছে টিয়াপাখির রং সবুজ,ওর চোখে টিয়াপাখি হয়তো আকাশি আর হলুদ হয়ে ধরা দিচ্ছে। সাদা কুকুরকে দেখছে মেরুন। কিন্তু ও ঠিক কী দেখছে,কোন রং দেখছে,সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই,কারণ আমাদের মতো করে ও রং চিনতেই পারবে না। এমনকি আমাকে আর তোকে ও কীভাবে দেখছে,সেটা বোঝারও কোনও উপায় নেই।”
তোপা হাঁ হয়ে গিয়েছে,তার মুখে কথা সরছে না। আমতা আমতা করে সে বলল, “কিন্তু মুখে না বলতে পারলেও ও ছবি দেখে বলতে পারে তো? মানে ধর টিলু একটা সাদা খরগোশ দেখল! খরগোশটার রং সে বলতে পারবে না ঠিকই,কিন্তু ওকে অনেকগুলো রং দেখালে হয়তো সে বলতে পারবে সে খরগোশের গায়ে কোন রংটা দেখেছে?”
সপ্তর্ষি ফ্যাকাশে ভাবে হেসে বলল,”না রে! তুই যখন ওকে এক গুচ্ছ রং দেখবি,সেগুলো তো ও চিনতেই পারবে না। ধর ও লাল রঙের ওপর আঙুল রাখল। তুই ভাববি ও খরগোশটাকে লাল দেখছে। কিন্তু আসলে তো ও লাল রংটা দেখতেই পাচ্ছে না,সেটা ওর মাকুলা সম্পূর্ণ অন্য রং ভেবে রিসিভ করছে। তার চেয়েও বড়ো কথা,এই ফটো রিসেপশন ফ্লাকচুয়েট করে। নতুন কোনো জিনিস দেখলে সম্ভবত প্রথমেই সেটার একটা রং রেজিস্টার করে না ওর ব্রেনে,সেটা বদলে বদলে যায়। টিলুর কথা মতো গাছের রং জেব্রার মতো সাদা কালো,সেটা সে সব জায়গায় একই ভাবে দেখে। এই গোটা জঙ্গলের ও নাম দিয়েছে জেব্রা জঙ্গল। পাহাড়ি নদীর জল দেখে ওর ক্রিম কালার বা বাটার স্কচ আইসক্রিমের মতো মনে হয়। আসলে অবশ্য ও সাদা কালোও দেখছে না,ক্রিম কালারও দেখছে না, ক্রিম কালার বা জেব্রার রং বলে আমরা ওকে যা দেখিয়েছি,তার মাকুলা সে রং দেখে মস্তিষ্কে যে সিগন্যাল পাঠিয়েছে,টিলু দেখছে সেই রংটাকে। কিন্তু নতুন কোনও প্রাণী,নতুন কোনও জায়গা,নতুন কোনও পাখি দেখলে তার কাছে একটা নির্দিষ্ট রং হয়ে ধরা দিতে সময় নেয়। ঠিক কী করে ব্যাপারটা হয় আমি জানি না,কিন্তু অপথ্যালোমলোজিস্টদের মতে এই মাকুলা সেলের মিউটেশনের ফলে টিলু আসলে যে সমস্ত রং দেখছে,যেভাবে আমাদের চেনা দুনিয়াটাকে দেখছে, সেটা সাধারণ মানুষের দেখা বা কল্পনার বাইরের জগৎ। অনেক প্রাণী দুনিয়াকে শুধু সাদা বা কালো হিসেবেই দেখে,আবার মানুষের চেতনার পরিধির বাইরেও মহাবিশ্বে অনেক রং আছে,সেগুলো আমরা দেখতে পাই না। আমি রং রং বলছি বটে, কিন্তু ব্যাপারটা শুধু রং এর নয়। আলো, অন্ধকার, অণু-পরমাণু সব কিছুই তার কাছে অন্যভাবে ধরা দিচ্ছে। এই রোগের ফলে টিলুর সামনে সেই অজানা দুনিয়ার পথ খুলে গেছে।”
তোপা কী বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। সে আস্তে আস্তে বলল, “এর কোনো চিকিৎসা নেই?”
“না।” উত্তর দিল সপ্তর্ষি,”আপাতত নেই। দু একটা ঘটনা আগে শোনা গিয়েছে ঠিকই,কিন্তু সেগুলোর রেজাল্ট খুব একটা আশাপ্রদ নয়। সূর্যের আলো এড়ানোর কথা বলেছিল অনেকে,ফলে টিলু বহুদিন বাইরে আসেনি। মোনোক্রোমেটিক ওয়ার্ডে ভর্তি ছিল ছয় মাস ছয় মাস করে গোটা তিন বছর। মাঝে দু’এক সপ্তাহের জন্য বাড়ি নিয়ে আসতাম,কিন্তু বেশিদিন রাখা যেত না। সূর্যের আলোয় থাকলে,বাইরের জিনিস বেশি দেখলেই ওর চোখের ওপর অসম্ভব চাপ পড়ে,ক্রমাগত জল পড়তে থাকে চোখ দিয়ে,জ্বালা করে,মাথায় ব্যথা হয়। ওষুধ দিলে কিছুদিন ঠিকঠাক চলে, কিন্তু ওরকম করে কি একটা বাচ্চা ছেলে বাঁচতে পারে?”
সপ্তর্ষির চোখ দুটো ভিজে এল। সে আস্তে আস্তে বলল, “বিদেশের বাচ্চারা ছোটো থেকেই অসম্ভব স্মার্ট। টিলু ঠিক সেরকম নয়। ও প্রচন্ড সাহসী, কিন্তু ওর মনটা নরম,দুনিয়ার অনেক কিছুই সে জানে না। নিজের মনের ভিতর সে এমন একটা পেরিস্তান বানিয়ে বসে আছে,যা সত্যি হয়েও সত্যি নয়। তার এই দুনিয়াটার কথা আমরা কোনোদিনই বুঝতে পারব না। টিলুর বন্ধুবান্ধব নেই,স্কুলেও বেশিদিন রাখা যায়নি। প্রথাগত পড়াশোনা করাও ওর পক্ষে সম্ভব নয়। আমরা যা পড়ি,যা বুঝি,তার সঙ্গে আমাদের দেখার একটা স্বাভাবিক যোগ আছে। যদি কেউ রং চিনতে না পারে,তাহলে রঙের বর্ণনা পড়ে বুঝবে কী করে? ও হয়তো একটা জিনিস একভাবে দেখছে,গোটা ক্লাস আর শিক্ষক দেখছে অন্যভাবে। ওরকম করে কি পড়াশোনা হয়? অন্যান্য ছেলেমেয়েদের সঙ্গে ও খাপ খাওয়াতেই পারে না। সবাই ওকে ক্ষেপাত,বুলি করত। তাই বাড়িতেই ওকে পড়িয়েছি যতটা সম্ভব। বিদেশে হোম স্কুলিং ব্যাপারটা ব্রাত্য নয়,আর টিলু আর চারটে ছেলের চেয়ে অনেক বেশি ইন্টেলিজেন্ট। ও মাঝেমধ্যে এমন সব জিনিস খেয়াল করে যা আমরা লক্ষই করি না। সময় পেলে হয়তো ও ওই টেপগুলো থেকে সত্যিই কোনও সূত্র পেতে পারত। কিন্তু…”
“কিন্তু কী?”
“সময়ই তো নেই রে। দাদু আর নাতি…সময় নেই দুজনের কাছেই। একজন নিরুদ্দেশ,অন্যজনের চোখ দুটো ক্রমে খারাপের দিকে যাচ্ছে। ডাক্তারদের মতে,মস্তিষ্কের অন্যান্য কোষগুলো মাকুলার এই মিউটেশন মেনে নিতে পারছে না। ব্যাপারটা একটা অ্যানোমলি হয়ে দাঁড়িয়েছে। মাকুলার ফটো রিসেপটিভ সেল মস্তিষ্কে যে ধরনের সিগন্যাল পাঠাচ্ছে,মানুষের মস্তিষ্ক সে ধরনের সিগন্যাল ইন্টারসেপ্ট করার জন্য সক্ষম নয়। ফলে তারা মাঝেমধ্যে প্রতিরোধ করছে। এই টানাপোড়নের ফলে টিলুর দৃষ্টিশক্তি অ্যাফেক্টেড হচ্ছে,মস্তিকের স্নায়ুগুলোতে চাপ পড়ছে। ডাক্তারদের ধারণা, টিলুর রেটিনা খুব বেশিদিন এই চাপ সহ্য করতে পারবে না। এসব লক্ষণ তার আগাম সঙ্কেত। এত নতুন জিনিস দেখছে কয়েকদিন ধরে,রোদ্দুরে ঘুরছে,সে চাপ তো পড়বেই। কিন্তু ঘরে আটকে রেখেই বা কী হবে বল? তার চেয়ে বরং চোখ থাকতে নিজের মতো করে দুনিয়াটাকে দেখে নিক। তারপর তো…”
তোপা চুপ করে রইল। তারা দুজন বাইরে এসে কথা বলছিল। টিলুকে ভিতরের ঘরে শুইয়ে রাখা হয়েছে। সকালে ক্যাসেট শুনতে শুনতে টিলু জানলার ধারে চেয়ারের ওপর বসেছিল, সেখানে সরাসরি রোদ্দুর এসে পড়ছিল। আচমকা তার চোখ থেকে জল বেরোতে শুরু করে। টিলু বলেছিল,তার চোখের সামনে সব ঝাপসা হয়ে আসছে,চোখ জ্বালা করছে ভীষণ। যন্ত্রণার চোটে দু হাতে মাথা চেপে ধরেছিল,কিন্তু একটা শব্দ বের করেনি মুখ থেকে। দাঁতে দাঁত চিপে ছিল। সপ্তর্ষি দেরি করেনি,তোপাকে বলেছিল টিলুকে ধরে রাখতে। তারপর হাতের কাছে রাখা ব্যাগ বের করে টিলুর চোখে ওষুধ দিয়ে দিয়েছিল। প্রায় দু’তিন রকমের আই ড্রপ পরপর দেওয়ার পর টিলুর একটু আরাম হয়েছিল,সে নেতিয়ে পড়েছিল দাদুর সোফায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে।
সপ্তর্ষি নিজেকে সামলে নিয়েছে ইতিমধ্যে। সে তোপার পিঠে হাত রেখে বলল,”বেশি ভাবিস না। ভেবে লাভও নেই। আমি ব্যাপারটা মেনে নিয়েছি। টিলু যদি পুরোপুরি অন্ধ হয়ে যায়,সেক্ষেত্রে সার্জারি করে কিছু করা যেতে পারে। অবশ্য ডোনার তো লাগবেই। সে কথা থাক, তুই বরং একটু চায়ের ব্যবস্থা কর দেখি। মাথা ধরে গেছে। টেপগুলো থেকে তো কিছুই বোঝা গেল না। আরো সময় দিতে হবে।”
তোপা বুঝে গেল,টিলুর ব্যাপারটা নিয়ে সপ্তর্ষি আর কথা বলতে চাইছে না। সমাধান যখন কিছুই নেই,তখন এই নিরর্থক আলোচনা করে লাভ কিছুই নেই,এতে শুধু যন্ত্রণাই বাড়ে। এমনিতেও সে চাপা স্বভাবের ছেলে, নিজের সমস্যার কথা বারবার বলার স্বভাব তার নেই। দাদু, ছেলে আর নাতির মধ্যে যে যে এই একটা গুণ কমন পড়েছে, সেটা বোঝাই যায়। ইন্দ্রজিৎবাবুর স্বভাবও ছিল এরকম, ব্যক্তিগত দুঃখকষ্টকে বিশেষ পাত্তা দিতেন না। আর টিলু, ওইটুকুন ছেলে, তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই কতটা মানসিক চাপ আর যন্ত্রণার মধ্যে সে দিন কাটাচ্ছে। তোপা কিছু বলল না, মাথা নেড়ে রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।
৬
কিছুক্ষণ পর চা নিয়ে দুই বন্ধু বারান্দায় বসেছিল। সপ্তর্ষি চায়ে চুমুক দিয়ে দেওয়ালের দিকে তাকাল। কিছু কিছু ছবি ফ্রেম করে ঝোলানো আছে। বেশিরভাগই অবশ্য অজানা অচেনা ভাষায় লেখা উক্তি আর শিলালেখ, স্থানীয় মানুষজনের ফোটোগ্রাফ। বাঁশ আর হাড়ের তৈরি কিছু কিছু জিনিসও আছে, সেগুলো রাখা হয়েছে ভিতরে। এই বাড়িটা নিয়ে খুব একটা মাথাব্যথা ছিল না বাবার, কিন্তু সপ্তর্ষির কৈশোর ও যৌবনের অনেক স্মৃতিই এই বাড়ির সঙ্গে জড়িয়ে। লোকে ছুটি পড়লে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে যেত, সে আসত বাবার সঙ্গে দেখা করতে। কাঠের তৈরি বাড়ি, হাঁটতে গেলে ক্যাঁচকোচ শব্দ হয়, দরজা খুললে কাঠের গন্ধ নাকে লাগে, এমন একটা অদ্ভুত জায়গায় দিন কাটানোর উত্তেজনার সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। তখন সদ্য কৈশোরে পা দিয়েছে সপ্তর্ষি, ভাষাতত্ত্ব নিয়ে আগ্রহ জেগে উঠেছিল বাবার সঙ্গে কথা বলে বলেই। বাবা নিজে থেকে কিছুই বলেননি, কিন্তু সপ্তর্ষি মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল তার কর্মক্ষেত্র। সে সময় বাবার পিছন পিছন ঘুরে বেড়াত দিনরাত। এই গ্রামে তখন আরো কম লোক থাকত। বাঘ বেরোনোর ভয়ে আগুন জ্বালানো হত বিকেলের পর থেকেই, দুজন পাহারাদার দোনলা বন্দুক নিয়ে পাহারা দিত। তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল বনবিভাগের তরফ থেকেই, কিন্তু খরচাপাতি বাবাই দিতেন। মশার উৎপাত ছিল ভয়ানক, কিন্তু সাপখোপ বিশেষ দেখা যেত না। বাঁশের ছাল ছাড়িয়ে জ্বালাত লোকে, একটা ঘরে তৈরি তেল ফেলে দিত সেই আগুনের মধ্যে, তাতে বিচ্ছিরি ধোঁয়া হয়ে মশা একটু কমত।
এইটুকু জায়গার মধ্যেই তখন একাধিক ভাষা শোনা যেত। মিজো পাহাড় থেকে একজন শিকারী আসত মাঝেমধ্যে, সে এগারোটা ভাষা বলতে পারত। বুনো মোরগ বা মাছ ধরে নিয়ে আসত জঙ্গল থেকে, তারপর রান্না করতে করতে বিজাতীয় ভাষায় গান গাইত।
মজার কথা হল, এতগুলো ভাষা জানলেও লোকটা কিছুই লিখতে পারত না। সে দেখে খুব মজা পেয়েছিল সপ্তর্ষি। বাবা বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। এই অঞ্চলের অনেক ভাষারই নিজস্ব লিপি নেই, থাকলেও সে সব ব্যবহার করা হত না। মুখের কথাতেই কাজ চলে যেত দিব্যি, আইন কানুনের বাড়াবাড়ি ছিল না। ব্রিটিশরা আসার পর থেকে মানুষ ঠেকায় পরে লেখার কথা চিন্তাভাবনা করতে শুরু করে, তখন একটা বর্ণমালা চালু করা হয়। কিন্তু যে সমস্ত কথ্য ভাষা ডায়ালেক্ট আলাদা হলেও কমবেশি একই নিয়মে বলা হত, তাদের প্রত্যেকের জন্য ভিন্ন ভিন্ন লিখন শৈলী চালু করা সম্ভব ছিল না। ফলে ভিন্ন ভিন্ন ভাষার উপজাতিরাও সেই একই বর্ণমালা ব্যবহার করতে শুরু করে ধীরে ধীরে। সময়ের সঙ্গে দেখা যায়, তাদের নিজস্ব ভাষার শব্দ, লোকোক্তি, প্রবাদ, লোকগান, অপভাষা পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছে। পরবর্তী প্রজন্ম সে সব কিছুই জানে না। বাবা আপ্রাণ চেষ্টা করে তার কিছু কিছু পুনরুদ্ধার করতে পেরেছিলেন। তার অনুরোধে একটা রঙিন ছবির ওপর উল দিয়ে মিজোদের হারিয়ে যাওয়া জো লাই স্ক্রিপ্টের নকশা বুনে তুলেছিল মা, সেই ছবিটা এখনও টাঙানো আছে এই বাড়িতে।
পরবর্তী সময়ে সপ্তর্ষি যখন কম্পেরাটিভ লিংগুইস্টিক্স নিয়ে পড়াশোনা করছে, তখন ব্যাপারটা তার কাছে আরো গভীর ভাবে ধরা দিয়েছে। একটা জাতি বা গোষ্ঠীর ভাষা বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য শুধু তাদের নিজেদের ওপরেই নির্ভর করে না, সামাজিক রাজনৈতিক পরিবর্তনও অনেক সময় একটা ভাষার বিনাশের কারণ হয়ে উঠতে পারে। আধুনিক জাপানে যেমন হয়েছে। এত সমৃদ্ধ ভাষা হওয়া সত্ত্বেও জাপানিজ ভাষার আগে নিজস্ব কোনও লিপি ছিল না। চীনের কাঞ্জি ক্যারেক্টারের লগোগ্রাফিক নীতি ধার করে জাপানিজ ভাষায় লেখালিখি শুরু হয়, কিন্তু হোক্কাইডো, সাখালিন আর কুরিল দ্বীপের শাসকরা সেই লিপির ওপর পুরোপুরি নির্ভর না হয়ে নিজেদের আইনু ভাষাকে সযত্নে টিকিয়ে রেখেছিলেন। বিংশ শতাব্দীতে যখন সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা শেষ হয়ে পুঁজিবাদ ও জাপানিজ ভাষা রাজত্ববিস্তার করতে লাগল, আইনু, হাচিও, আমানি, কুনিগামী সহ ডজনখানেকের বেশি ভাষা লুপ্তপ্রায় হয়ে পড়ল কয়েক দশকের মধ্যেই। এখন আবার ভাষাবিজ্ঞানীরা মাঙ্গা কমিক্স আর অ্যানিমে ব্যবহার করে আইনু ভাষাকে জনপ্রিয় করে তুলতে চাইছেন। একটা ভাষার ইতিহাস শুধু ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস নয়, সেই বিবর্তনের পারিপার্শ্বিকের ইতিহাসও বটে। ভালো ফিলোলজিস্ট না হলে এই ইতিহাসের গুরুত্ব আর ভাষা বিবর্তনের বাঁকবদল বোঝা অসম্ভব। আর সেটা বুঝতে না পারলে লুপ্তপ্রায় ভাষাকে রক্ষা করা দূরস্থান, তার যথাযথ আর্কাইভিং করাও সম্ভব নয়। কম্পিউটেশন লিঙ্গুইস্টিক্স এর যুগে শব্দার্থবিদ্যা এবং ধ্বনিতত্ত্ব নিয়ে প্রচুর গবেষণা হচ্ছে, কিন্তু ফিল্ডে ঘুরে ঘুরে লোকের সঙ্গে কথা না বললে, তাদের সময় না দিলে, সংগ্রহীত তথ্যগুলো বিভিন্ন সোর্স এর জবানবন্দির সঙ্গে বাজিয়ে না দেখলে সার্থক ফল পাওয়া যায় না, তখন প্ৰযুক্তি কোনও কাজেই লাগে না। এই সত্যিটা বুঝেছিলেন বলেই ইন্দ্রজিত খাসনবিশ তার জীবনে একের পর এক মূল্যবান কাজ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
চা খাওয়া হয়ে গিয়েছিল। আকাশে মেঘ করেছে, কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি নামবে মনে হচ্ছে। সবুজ পাহাড়ের ওপর কালো মেঘের দল এমনভাবে ঘন হয়ে এসেছে, মনে হচ্ছে একদল দাঁতাল হাতি এসে দাঁড়িয়েছে। ঠান্ডা হাওয়া চলতে শুরু করেছে, টিপটিপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে, টং আর লিং লাফিয়ে লাফিয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে সামনে। সেদিকে তাকিয়ে তোপা ভুরু কুঁচকে বলল, “সপু, আমার মনে হয় স্যারের ব্যাপারটা আমাদের একটা চান্স নিয়ে দেখা উচিত। আর দেরি করলে বৃষ্টির সিজন চলে আসবে, তখন আর কিছুই করা যাবে না। যা করার এখনই করতে হবে। হয়তো লাভ কিছুই হবে না, কিন্তু চেক করে দেখতে ক্ষতি কি!”
ব্যাপারটা সপ্তর্ষিও যে ভাবেনি তা নয়। তোপার কাছে সে যা জেনেছে, তাতে বোঝা যায় বাবা কয়েকদিন ধরেই তাই আহোম ভাষার বিভিন্ন শাখা প্রশাখা নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাই আহোম এককালে বহু মানুষের মাতৃভাষা ছিল, কিন্তু গত দুশ বছরে কেউই এই ভাষায় কথা বলেনি। এককালে এই ভাষা যে উচ্চতা লাভ করেছিল, তা এখন কল্পনা করা মুশকিল। বিভিন্ন জায়গায় পূরাতাত্ত্বিক অভিযানের ফলে এই ভাষায় লেখা বেশ কিছু পাণ্ডুলিপি পাওয়া গেছে যা থেকে বোঝা যায় আহোম রাজ্যের এই ভাষা অসম, বর্মা হয়ে আজকের ভিয়েতনাম, এমনকি চীনের কিছু অংশেও ছড়িয়ে পড়েছিল।
উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে যখন আহোম রাজ্য জৌলুস হারাতে শুরু করে, তখন তাদের অনেকে পাহাড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়ে নিজেদের গোষ্ঠী বানিয়ে নেয়। আইতন, খামতি, খাময়াং, ফাকে, তুরুং…প্রায় পঞ্চাশটারও বেশি গোষ্ঠী ছিল একসময়। ফলে তাই আহোম ভাষা বিভিন্ন শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে যায়, তারপর একসময় কালের নিয়মে সেই গোষ্ঠীগুলো মূলধারায় মিশে গিয়েছে, ভাষাগুলো হারিয়ে গিয়েছে ধীরে ধীরে। এই সাব-ট্রাইব বা উপজাতিরাও হয় নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে, অথবা থাকলেও সেই ভাষার চর্চা আর কেউই করে না। ভাষাবিজ্ঞানীরা এতদিন তাই জানত। কিন্তু সম্প্রতি নতুন কিছু ম্যানুস্ক্রিপ্ট আবিষ্কার হয়েছে যাতে নতুন কিছু উপজাতির উল্লেখ পাওয়া গিয়েছে। এরা নাকি খাময়াংদের উপগোষ্ঠী। দলপতির সঙ্গে বিবাদ ঘটার ফলে কিছু শমন অর্থাৎ জাদুগর, পুরোহিত ইত্যাদিরা নিজেদের ছোটো ছোটো দল তৈরি করে জঙ্গলের আরো গভীরে চলে গিয়েছিল। এরা প্রকৃতির উপাসনা করত। গাছপালা, নদী, পাহাড়, ঝর্ণাকে আরাধ্য বলে মানত, অলৌকিকে বিশ্বাস করত। এই শমনদের ব্যবহৃত কিছু শব্দের উল্লেখও পাওয়া গিয়েছে। ভাষাবিজ্ঞানীদের ধারণা, এই শমন বা জাদুগররা নিজেরাও বিশেষ শক্তির অধিকারী ছিল, তাদের ভাষার মধ্যেও সেই বিশেষত্ব থাকার কথা। তাই আহাম ভাষার মূল আত্মাটা অপরিবর্তিত থাকলেও শমনদের হাতে সেই ভাষায় বেশ কিছু বদল ঘটেছিল, তার প্রধান হল টেক্সটের সঙ্গে লগোগ্রাফিক ছবির ব্যবহার। এমনটা আগে বিশেষ দেখা যায়নি।
এই ম্যানুস্ক্রিপ্টের সঙ্গে অন্যান্য নথিপত্র মিলিয়ে দেখে ইন্দ্রজিৎবাবুর বিশ্বাস হয়েছিল যে এরকম কিছু উপগোষ্ঠীর অস্তিত্ব এখনও সত্যিই আছে। কয়েক মাস ধরে তিনি তোপার সঙ্গে দিনরাত কাজ করেছেন, চেনা অচেনা উপজাতিদের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাদের ভাষার শব্দবিন্যাস আর মর্ফোলজির বিশেষণ করে বুঝতে চেয়েছেন ‘তাই আহোম’ ভাষার সঙ্গে তাদের শাখায় প্রশাখায় কোনো যোগাযোগ থাকতে পারে কিনা! বনেজঙ্গলে কয়েক প্রজন্ম ধরে বসবাস করলে একটা গোষ্ঠীর সঙ্গে অন্য গোষ্ঠীর যোগাযোগ ঘটেই, আর সেই যোগাযোগের তথ্য ধরে ‘ব্যাকট্র্যাক’ করে একটা অচেনা গোষ্ঠীর বর্তমান অবস্থান জানার চেষ্টা করা হয়। ব্যাপারটা সময়সাপেক্ষ ঠিকই, কিন্তু অসম্ভব নয়।
অনেক হিসেব করে শেষমেশ তারা সিদ্ধান্তে এসেছিল যে মামিলাপিনাতাপাই গ্রামের পঞ্চাশ মাইল রেডিয়াসের মধ্যেই এই খাময়াং শমন গোষ্ঠীর চারটে গ্রাম থাকার সম্ভাবনা আছে। এই মিসিং লিংক খুঁজে বার করার রিসার্চ চলাকালীন মাসদেড়েক আগে তোপাকে জরুরি দরকারে শহরে যেতে হয়, তখন ইন্দ্রজিৎবাবু পুরোদমে এই কাজে মেতে আছেন। এর কয়েকদিনের মধ্যেই জানা যায়, তিনি নিঁখোঁজ হয়েছেন। তোপার ধারণা, ইন্দ্রজিৎবাবু নিজেই সেই গ্রামের সন্ধানে বেরিয়েছিলেন। তারপর হয়তো তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন, গন্তব্যে পৌঁছতে না পেরে অন্য কোনো আদিবাসীদের গ্রামে আশ্রয় নেন তিনি। এই বিশাল অরণ্যের ভিতর খুব কম হলে তিনশোটা এরকম গ্রাম আছে, যেখানে যেতে হলে কয়েক সপ্তাহ ধরে ট্রেক করা ছাড়া কোনও উপায় নেই। বাইরের মানুষজন এই সব গ্রামের খোঁজ জানে না, কিন্তু ইন্দ্রজিৎবাবু আনাড়ি নন, আগেও তিনি ফিল্ড রিসার্চের জন্য বেশ কিছু গ্রামে গিয়েছেন।
সপ্তর্ষি একটু ভেবে বলল, “তোর কথায় যুক্তি আছে। বাবা যদি সত্যিই সেই শমন গ্রামের খোঁজে বেরিযে থাকেন, তাহলে সেটা খুব দূরে হওয়ার কথা নয়। সেটা হলে তিনি একা কোনোমতেই এগোতেন না। আমার মনে হয়, পাঁচ দিনের হাঁটা পথের হিসেবে রেডিয়াস ঠিক করে আমাদের এগোনো দরকার। এই রেডিয়াসের মধ্যে যতগুলো চেনা অচেনা গ্রাম আছে, সেখানে অনুসন্ধান করতে হবে। ভাগ্যে থাকলে এর মধ্যেই কোনও সূত্র পাওয়া যাবে।”
তোপা হাততালি দিয়ে বলল, “দূরত্বের ব্যাপারটা একদম ঠিক বলেছিস। তাহলে কাল পরশুর মধ্যেই বেরিয়ে পড়া যাক! আমি সব ব্যবস্থা করে ফেলছি।” তারপরেই সে একটু চুপসে পড়ার ভঙ্গিতে বলল, “কিন্তু টিলুর কী হবে? ওকে এই অবস্থায় একা ছেড়ে তুই যাবি কী করে?”
“আমিও যাব।”
তোপা মুখ ফিরিয়ে দেখল, টিলু কখন যেন এসে তাদের পিছনে দাঁড়িয়েছে। এতক্ষণ সে সব কথা শুনছিল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হয়েছে বাইরে, মাঝেমধ্যে মেঘ ডাকছে, এর মধ্যে টিলুর পায়ের শব্দ শুনতে পায়নি দুজনেই। সপ্তর্ষি একবার তোপার দিকে তাকাল, তারপর টিলুর দিকে তাকিয়ে হালকা গলায় বলল, “বেশ তো, যাবি। কিন্তু আগে বল, চোখে এখনও জল পড়ছে? মাথায় ব্যথা আছে?”
টিলু দু’দিকে মাথা নাড়ল। তোপা পায়ের ওপর পা তুলে বলল, “টিলুবাবু, অনেক হাঁটতে হবে কিন্তু! তোমার দাদু কোথায় গিয়েছে, সেটা তো আমাদের জানা নেই। সবটাই আমাদের অনুমান। পারবে তো? না পারলে অবশ্য…”
“দাদু কোথায় গেছে আমি জানি।” টিলু তোপাকে থামিয়ে দিয়ে বলল।
তোপা বিস্মিত হয়ে বলল, “তুমি জানো?”
সপ্তর্ষিও ভারী অবাক হয়েছে। সে ভুঁরু উঁচিয়ে বলল, “তুই জানবি কী করে?”
“বা রে!” টিলু হাসিমুখে বলল, “দাদুই তো বলে গেছে। তোমরা দেখতে পাওনি বুঝি?”
তোপা আর সপ্তর্ষি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল, তারপর দুজনে একসঙ্গে টিলুর দিকে তাকাল। তাদের চোখ বড়ো বড়ো হয়ে গেছে। তারা একসঙ্গে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গেছে দাদু?”
টিলু এইবার জোরে হেসে উঠল। নদীর মতো অবাধ হাসি। বৃষ্টির শব্দ ছাপিয়ে তার হাসির শব্দ শোনা যেতে লাগল।
৭
“মামিলাপিনাতাপাই মানে কী?”
তোপা আগুনের সামনে বসে তার ইয়া লম্বা চুলে খোঁপা বাঁধছিল। রিও আর ইনাও পাশে বসে শাক ছাড়াচ্ছে, তারা দুজনেই ভারী ব্যস্ত। আগুনের ওপর হাঁড়ি বসিয়ে স্টু রান্না হচ্ছে, তার মধ্যে জঙ্গল থেকে তুলে নানা কন্দমূল, শাকসবজি ফেলে দেওয়া হয়েছে, সঙ্গে দেওয়া হয়েছে লুকিটা নদী থেকে ধরা তাজা মাছ। এর পর নুন, গোলমরিচ আর রিওর নিয়ে আসা ঝাল ঝাল আখুনি চাটনি আর কটেজ চিজ দিয়ে দিলেই ডিনার তৈরি। তখন ভাত দিয়ে এই মিজোপাই স্যুপ আর সোয়াবিনের আচার খেতে অমৃতের মতো লাগবে।
তোপা মুচকি হেসে টিলুর দিকে তাকাল। সে যেন তার নামের সঙ্গে খাপ খাওয়াতেই একটা টিলার ওপর উঠে গিয়ে বসে আছে, তার মাথায় একটা দু কান তোলা খরগোশ টুপি। তার কোলের ওপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে আছে টং-লিং। মাঝেমধ্যে তারা জিভ বের করে হাই তুলছে। টিলু আবার জিজ্ঞেস করল, “বল না তোপা ভাই, মামিলাপিনাতাপাই মানে কী?”
“গুড কোয়েশচন!” তোপা হাঁটুর ওপর থেকে একটা পিঁপড়েকে টোকা মেরে উড়িয়ে দিয়ে বলল, “চলো দেখি তোমার বাবাকে জিজ্ঞেস করে সে জানে কি না?”
জঙ্গলের মধ্যে দুটো তাঁবু খাটানো হয়েছে। এই তাঁবুগুলো পিঠে বইতে কষ্ট হয় না, কিন্তু ওজন না থাকলেও সেগুলো আসলে খুবই মজবুত। একটা তাঁবুতে তিনজন বা চারজন থাকতে পারে, ইচ্ছে হলে ফোল্ডিং চেয়ারের ব্যবস্থা করা যায়। স্পিরিটল্যাম্প, টর্চ, কার্বলিক অ্যাসিড, মশা তাড়ানোর ক্রিম, রেশন, ওষুধপত্র, একটা বিশ্বাসযোগ্য রেমিংটন নায়লন-৬৬ বন্দুকও আছে…পাহাড়ে জঙ্গলে এক্সকার্সনে যাওয়া তোপাদের কাছে নতুন কিছু নয়, ক্যাম্পিং লাইফের জন্য প্রয়োজনীয় সব কিছু তাদের তৈরিই থাকে। প্রয়োজনে চটপট সব গুছিয়ে বেরিয়ে পড়া যায়।
সপ্তর্ষি একটা তাঁবুর ভিতর ব্যাটারির আলো জ্বালিয়ে ম্যাপ দেখছিল। তার সামনে ইন্দ্রজিৎবাবুর নোটবুকটা খোলা। একমনে সেটার দিকে তাকিয়ে কিছু চিন্তা করছে সে, তার মুখ ভর্তি ফোঁটা ফোঁটা ঘাম। তোপা তাকে দেখে বলল, “এইবার একটু নিশ্বাস নে দিকিনি। একসঙ্গে কাজ করলে মাথা ভোম্বল হয়ে যায়।”
সপ্তর্ষি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নোটবুকটা বন্ধ করে দিল, তারপর সটান শুয়ে পড়ে পায়ের ওপর পা তুলে দিয়ে বলল, “ধুর ধুর! আমি বোকাসোকা রিসার্চার, এসব শার্লকগিরি আমার পোষাবে না। তুই আর টিলু মিলেই চেষ্টা কর, বুঝলি! যদি কিছু মাথায় খেলে! আফটার অল, টিলুর দেওয়া ক্লু না পেলে তো এতদূর এগোনোই হত না।”
টিলু একটু লজ্জা পেয়ে গেছে। সে এক লাফে সপ্তর্ষির খাটে উঠে বলল, “ও বাবা, তুমি মামিলাপিনাতাপাই মানে জানো? তোপা ভাই বলেছে ও জানে না, তুমি জানো।”
“ও বাবা!” সপ্তর্ষি ছদ্মরাগের দৃষ্টিতে তোপাকে দেখে নিয়ে বলল, “আসলে তোপা ভাই আমাকে টেস্ট করে দেখতে চাইছে আমার মনে আছে কিনা!”
“আরে বাবা” তোপা ক্যাম্পচেয়ারে বসে হাতের টর্চটা নিভিয়ে দিয়ে বলল, “তখন তো আমি এখানে ছিলামই না। তোর মনে না থাকলে কার মনে থাকবে?”
“তা বটে!” সপ্তর্ষি টিলুর মাথায় তবলা বাজিয়ে বলল, “তখন বুঝলি, দাদু জাস্ট এখানে এসে উঠেছে। গ্রাম ফ্রাম কিচ্ছু নেই, শুধু কয়েক ঘর লোকের বাস। বাঘ বেরোত রোজই, আদিবাসী ছেলেমেয়েদের প্রায়ই কেউ না কেউ জন্তুজানোয়ারের পেটে যেত। মাঝে রেললাইনও খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সেই সিতাংফজুকিতে নেমে ঘোড়ার পিঠে মালপত্র চাপিয়ে আসতে হত। ওদিকে বাবা হাত পা ধরে সরকারের কাছ থেকে একটা চিঠি নিয়ে এসেছে, যে এখানকার মানুষের ভাষা নিয়ে গবেষণা করবে, সে জন্য জঙ্গল সাফ করে একটা বসবাসযোগ্য জায়গা করা দরকার। গ্রামে বাড়ি বানানোর জন্য মালপত্র আনতে হবে, তাই রেললাইনটাও সরানো দরকার। বাবা তো গর্মেন্ট এর কাছে আর্জি দিয়ে বসে আছে, কিন্তু কাজ আর হয় না। হবে কী করে? যে গ্রামে কাজের জন্য অনুমতি চাওয়া হচ্ছে, খাতায় তো সেই গ্রামের কোনও নামই নেই। গ্রামই ছিল না যখন, গ্রামের নাম আর থাকবে কী করে? রেগেমেগে বাবা ঠিক করল, নিজেই গ্রামের নাম দেবে। সরকারি খাতায় গ্রামের নাম রেজিস্টার করা কি চাট্টিখানি কথা? কিন্তু বাবাও ছাড়ার পাত্র নয়। এক বছর দৌড়াদৌড়ি করে শেষে আর্জি মঞ্জুর হয়ে গেল, গ্রামের নতুন নাম হল মামিলাপিনাতাপাই।”
টিলু চোখ বড়ো বড়ো করে শুনছিল। এইবার সে বলল, “কিন্তু মামিলাপিনাতাপাই কেন? ওটার মানে কী?”
সপ্তর্ষি একটু হেসে বলল, “সরকারের লোক ভেবেছিল ওটা বুঝি এখানকার মানুষের ভাষা। আসলে ওটা এখানকার শব্দই নয়। বাবা শব্দটা নিয়েছিল ইয়াগান ভাষা থেকে, চিলির ফকল্যান্ড আইল্যান্ডের লোকজন এই ভাষায় কথা বলত। ও জিনিস এক কথায় অনুবাদ করা যায় না। কিন্তু, পৃথিবীতে এত সুন্দর শব্দ খুব কমই আছে।”
টিলু অপেক্ষা করে আছে। সপ্তর্ষি ভুরু নাচিয়ে তোপাকে বলল, “তুই ট্রাই করবি নাকি?”
তোপা মাথা চুলকে বলল, “ইয়ে…ধরো টিলুবাবু! জঙ্গলে তোমার সঙ্গে একটা মেয়ের দেখা হয়ে গেল। তোমার খুব ইচ্ছে হল ও তোমার বন্ধু হোক। মেয়েটারও মনে মনে তাই ইচ্ছে। কিন্তু তোমরা কেউই কোনও কথা বলছ না। ও তোমার দিকে তাকিয়ে আছে, তুমি ওর দিকে। দুজনেই ভাবছে, আগে অন্যজন কথা বলবে! ওই মুহূর্তটা, তোমাদের ওই চাহনিটা… ওটাই হল মামিলাপিনাতাপাই।”
সপ্তর্ষি সটান বসে পড়েছে। সে মুগ্ধ গলায় বলল, “শাবাশ। আমি টুপি পরে থাকলে তোর অনারে টুপি খুলতাম। দারুণ বলেছিস। বুঝলি টিলু, ওই কথা না বলা চাহনিটাই হল মামিলাপিনাতাপাই। কিছু না বলে মনের কথা বোঝানোটা যে কত কঠিন, সেটা বোঝানোর জন্যই হয়তো বাবা নামটা রেখেছিল। অনেকে বলে, ওই শব্দটা মিথ্যে। ওরকম কোনও ভাব আসলে হয়ই না। আমি কিন্তু নিজেও নামটার মানে জানতাম না। বড়ো হয়ে যখন একদিন মানেটা জানা হয়ে গেল, বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাবা কিছু বলেনি, হেসেছিল শুধু। এরকম কত গোপন সংকেত যে তোর দাদু রেখে গিয়েছে, তা কে জানে?”
টিলু হাঁ করে শুনছিল। দাদুর জন্য এই প্রথম তার একটু মন খারাপ করল। এতদিন ধরে তাকে এখানে আসার জন্য বারবার করে চিঠি লিখত দাদু, তখন তো সে কত দূরে? আর এখন যখন সে সত্যিই এখানে এসেছে, দাদু কিনা জাদুগরের গ্রামে চলে গেল? তার গলার কাছটা ভারী হয়ে এসেছে। সে অন্ধকারে বাবার আস্তিনে মুখ লুকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল, “জাদুগরদের গ্রামটা আর কতদূর?”
“আড়াই তিন দিন লাগবে মনে হয়!” সপ্তর্ষি ছেলের মনের ভাব বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল, “ওখানে গেলে আমরা আবার একটা ক্লু পেয়ে যাব।”
“আমি টংলিংয়ের কাছে যাচ্ছি।” কথাটা বলেই টিলু খাট থেকে নেমে এক ছুটে বাইরে চলে গেল।
তোপা হাসল। সপ্তর্ষির দিকে ফিরে বলল, “তোর ছেলেটা তো তোর মতোই হয়েছে রে। আমাদের সামনে কাঁদবে না বলে বাইরে চলে গেল। মনে আছে, তুইও এরকম করতি?”
সপ্তর্ষি কিছু বলল না, ফ্যাকাশে ভাবে হাসল। তোপা নিঃশব্দে তার কাছে এসে নোটবুকগুলোয় চোখ বুলোতে শুরু করল। কাল টিলু অপ্রত্যাশিত ভাবে যে সংকেতটা খুঁজে বের করেছিল, সেটা তারা দুজনে শত ভেবেও বার করতে পারেনি। বলা উচিত, ব্যাপারটা তাদের মাথাতেই আসেনি। অথচ, এটাই সবচেয়ে আগে মনে পড়া উচিত ছিল।
তোপা নিজে শব্দতত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করছে, ইন্দ্রজিৎ খাসনবিশের সহকারী বাদেও তাংসা আর টিবেটো-বার্মান ঘরানার ভাষার বিবর্তন নিয়ে তার কিছু মূল্যবান লেখা প্রকাশিত হয়েছে। আদতে সেগুলো পড়েই ইন্দ্রজিৎবাবু দশ বছর আগে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তারপর দুজনে মিলে অনেকটা সময় একসঙ্গে কাটিয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সঙ্গে কাজ করার ফলে তোপা একটা কথা বুঝেছে, একটা অচেনা ভাষা নিয়ে গবেষণা করতে হলে শুধু মেধা, শিক্ষা আর অভিজ্ঞতা থাকলেই হয় না, আরো অনেক কিছু মাথায় রাখতে হয়। তার মধ্যে সবচেয়ে জরুরি হল, ফিল্ড নোটস তৈরি করা। নোটস তৈরি করা আসলে খুব প্রাথমিক একটা কাজ, তাই সে নিয়ে কেউ বিশেষ মাথাও ঘামায় না, কিন্তু ঠিক কীভাবে সেই নোট তৈরি করা উচিত, সেটা হাতেকলমে অনেক ভাষাবিজ্ঞানীই জানেন না।
মূল কথা হল, কোন গোষ্ঠী বা কোন ভাষা নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড মাথায় রেখে দরকারি ফিল্ড নোটস নেওয়ার একটা ব্লু প্রিন্ট তৈরি করা আগে জরুরি। কীভাবে, কখন, কোথায়, কোন যন্ত্র ব্যবহার করে সাক্ষাৎকার নেওয়া হচ্ছে, এবং এই সেশনের ‘ডেটা কর্পাস’ অর্থাৎ তথ্যসংকলনের সঙ্গে আগের কোনও সেশনের ডেটা পয়েন্টের মিল আছে কিনা সেটাও লিখে রাখা দরকার। এই মিলগুলো কিছু কিছু ক্ষেত্রে যুগান্তকারী আবিষ্কারের কারণ হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু মানুষের স্মৃতিশক্তি সীমিত। এমনটা হতেই পারে যে দুটো রেকর্ডিং সেশনের মধ্যে পঁচিশ থেকে তিরিশ বছরের তফাৎ, সেক্ষেত্রে আগের রেকর্ডিং এর খুঁটিনাটি কথা পুরাপুরি মন থেকে লোপাট হয়ে যায়, অথবা মনে থাকলেও সেই নোটস চট করে খুঁজে পাওয়া যায় না। সেক্ষেত্রে দুটো গবেষণার পরিশ্রমই মাঠে মারা যায়। তাই এই রেকর্ড সেশন, তুলনামূলক স্টাডি আর নোটস নেওয়ার নিয়মাবলী, ব্যাকগ্রাউন্ড বেস স্কেচ সহ সমস্ত ডেটা ট্যাগ এমনভাবে ডকুমেন্ট করতে হয় যাতে পঞ্চাশ বা একশো বছর পরেও চট করে হাতের কাছে পাওয়া যায়। আজকাল এই কাজটার জন্য সব কিছু কোড করে কম্পিউটার প্রোগ্রামে ফিড করে দেওয়া হয়ে থাকে, যাতে ডেটা ট্যাগ ব্যবহার করে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজতে অসুবিধা না হয়। কিন্তু কুড়ি বছর আগেও সেই ব্যবস্থা ছিল না। তাই ভাষাবিজ্ঞানীরা নিজের মতো করে এই কাজটা করে থাকতেন। ইন্দ্রজিৎবাবু কাজটা করতেন কালার ট্যাগের মাধ্যমে। তার প্রতিটা ক্যাসেটে তিনটে রঙের কম্বিনেশন ব্যবহার করে একটা কোড লেখা থাকত, যা থেকে সেই ক্যাসেটের যাবতীয় বিষয়বস্তুর একটা সামগ্ৰিক ধারণা পাওয়া যেত। লাল-নীল-হলুদ হলে স্টিকি নোটে আর-বি-ওয়াই মানে রঙের ইংরেজি নামের প্রথম অক্ষর লিখে রাখতেন তিনি। ব্ল্যাক, ব্লু বা ব্রাউন লিখতে হলে বিকে, বিএল বা বিআর লিখতেন। এইভাবে লেখার ফলে তাঁর সংগ্রহ করা প্রতিটা রেকর্ডিং-এর ক্যাটালগিং সহজ হয়ে যেত, তিন অক্ষরের প্রতিটা কম্বিনেশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত বিষয়ের সূচিটিও তার কাছে একটা ডেটাবেসে সযত্নে রক্ষিত ছিল।
তোপা কপালে আঙুল চালিয়ে বলল, “টিলু যে সত্যিই কিছু পেয়েছে, সত্যি বলতে প্রথমে সেটা আমার বিশ্বাস হয়নি। কালার কোডের ব্যাপারটা খতিয়ে দেখার কথা আমাদের মনেই আসেনি। “
সপ্তর্ষি মুচকি হেসে বলল, “টিলুবাবু অবশ্য খাঁটি ডিটেকটিভের মতো কাজই করেছে, কেসের ওপর থেকে ফোকাস লুজ করেনি। আমরা বোকার মতো পুরো ক্যাসেটগুলো শুনে সূত্র খুঁজতে চাইছিলাম, কিন্তু রেকর্ডিং শুনে তো আর বাবার মনোভাব বোঝার উপায় ছিল না। বেশিরভাগটাই তো উপজাতির মানুষের গলার স্বর, গান, বাজনা ইত্যাদি। প্রথমদিকে বাবা যে ভার্বাল ইন্ট্রোডাকশন দিয়েছে, সেটা শোনাই আসলে যথেষ্ট ছিল। টিলু সেটাই করেছে, কিন্তু শোনার পাশাপাশি ও ক্যাসেটগুলোও পরখ করেছে। গত দু মাসে যে ক’টা টেপ আমরা শুনেছি, তার মধ্যে তিনটে-চারটে কালার ট্যাগ আছে। এর মধ্যে যে সমস্ত গ্রামের রেকর্ডিংয়ে বাবা বিশেষ করে শমনদের কথা বলেছেন, সেই টেপগুলোর কালার কোড হল ব্লু-গ্রিন-ম্যাজেন্টা। বি-জি-এম। টিলু এইবার খুঁজে খুঁজে বি-জি-এম লেখা ক্যাসেটগুলো বার করেছে, উইজার্ডদের গ্রামের কথা জানতে হলে এটাই তো সহজ উপায়। প্রথমে দু মাসের ক্যাসেট, তারপর অন্যগুলো। ম্যাগনেটিক টেপে লেখা স্টিকি নোটগুলো একটু ফ্যাকাশে হয়ে গিয়েছিল, আর বি-জি-এম লেখা ক্যাসেটও বিশেষ ছিল না। কিন্তু টিলু হাল ছাড়েনি।”
তোপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “কম করে পাঁচ ছশো ক্যাসেট। সেগুলোর কালার কোড খুঁজে দেখা…বেচারির চোখের ওপর অসম্ভব চাপ পড়েছে সন্দেহ নেই। সেইজন্যই আসলে ব্যথাটা ট্রিগার করেছিল।”
“হুঁ।” সপ্তর্ষি বলল, “বাবার মতো কালার কোড ব্যবহার করার অভ্যেস আমারও আছে, কিন্তু আমি রেকর্ডিংগুলো এমপিথ্রি ফাইলে সেভ করে রাখি। এই ধর, পন্টিক গ্রিক কার্পেন্থিয়ান-ওয়ান ফাইভ আন্ডারস্কোর আরপিএল ডট এমপিথ্রি। টিলু সেটা জানে। বাবার ম্যাগনেটিক টেপের লেখাগুলো আবছা হয়ে গিয়েছে স্বাভাবিক কারণেই, কিন্তু টিলু যে বিজিএম লেবেল দেওয়া যে দুটো ক্যাসেট পেয়েছে, সেটা বাবা আগের কোডের সঙ্গে নতুন করে যোগ করেছিলেন। তুই যখন ব্যাপারটা জানিস না, বোঝাই যাচ্ছে সেটা তিনি খুব রিসেন্টলিই করেছিলেন। আর টিলুর অনুমানও হাফ মিলেছিল, কারণ যে গ্রামগুলোতে এই রেকর্ডিংগুলো হয়েছে, সেগুলোও কিন্তু উইজার্ড অর্থাৎ শমনদের গ্রামেই করা। মোট তিনটে গ্রাম আছে এই ক্যাসেটগুলোতে। সিনিমুরুগু, কানিসিনুসিপা আর মংদলকুকো। কিন্তু বেচারি টিলু জানত না, তার দাদু অন্য একদল উইজার্ডের সন্ধান করছিলেন। হগওয়ার্টস আর ড্রামস্ট্রাংয়ের মতো এখানেও উইজার্ডদের বৈচিত্র্য কম নেই।”
“কিন্তু এইটুকু তো সত্যিই যে তোর বাবাও একই লাইনে ভাবছিলেন।” তোপা হাল ছাড়তে রাজি নয়, “নাহলে আর তিনি পুরোনো ক্যাসেটগুলোয় নতুন কালার ট্যাগ লাগাতেন কেন?”
সপ্তর্ষি আড়মোড়া ভেঙে বলল, “তোর কী মনে হয়? বাবা ভাবছিলেন বিভিন্ন গোষ্ঠীর শমনদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল? তেমন কোনও প্রমাণ কি তোরা আগে পেয়েছিলিস?”
“যোগাযোগ বলাটা বাড়াবাড়ি! তবে…” তোপা থুতনির ওপর আঙুল ঘষতে ঘষতে বলল, “লোকালয় থেকে দূরে থাকতে হলে খানিকটা খবর রাখতে হয় বইকি। সত্যি মিথ্যা পরের কথা। ব্যাপারটা সার্ভাইভালের অংশ! শিকারীরা শিকারীদের খবর রাখে, শমনরা শমনদের খবর রাখে, এমনকি একটা টেররিস্ট গ্রূপের নেতাদের কাছেও দেখবে অন্য টেররিস্ট গ্রূপের হাঁড়ির খবর পাওয়া যায়। এলইডি বেসিক্স। এই তিনটে গ্রামে স্যার তেমন কোনও সূত্র পেয়ে থাকলে আমি অবাক হব না।”
সপ্তর্ষি সম্মতি দিয়ে বলল, “মংদলকুকো গ্রামের টেপটা বহুবছর আগে রেকর্ড করা। সেটা নতুন করে সামনে এনেছেন যখন, বাবা হয়তো সেখানে গিয়ে থাকতেও পারেন। দেখা যাক, সত্যিই সেখানে গিয়ে কিছু জানা যায় কিনা! চল, আজ আর জেগে কাজ নেই। খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়া যাক।”
মিজোপাই স্যুপের গন্ধে বাতাস ম ম করছে। খিদেও পেয়েছে জোর। দুই বন্ধু আর দেরি করল না, উঠে পড়ে তাঁবুর বাইরে এগিয়ে গেল।
৮
পাথর যে এত সুন্দর হতে পারে, সে কথা টিলুর জানা ছিল না। কিন্তু আজ সকালের অভিজ্ঞতা তাকে পুরোপুরি বোকা বানিয়ে দিয়েছে। নানান আকৃতির পাথর,কোনোটা ছোটো, কোনোটা বড়ো, কোনোটা আবার দেখতে জন্তুজানোয়ার বা ফুলের মতো। যেন কেউ ছেনি হাতুড়ি দিয়ে সেগুলো কুঁদে কুঁদে মূর্তি তৈরি করতে চেয়েছে। এক একটা পাথর প্রায় কয়েক হাজার বা কয়েক লক্ষ বছর পুরোনো, তার গায়ে সেই লক্ষ লক্ষ বছরের ইতিহাসের চিহ্ন রয়ে গিয়েছে। টিলু অবাক হয়ে দেখেছে, প্রকৃতির নিয়মে একটা পাথরে বিভিন্ন সময়ে যখন ফাটল ধরেছে, সেখান থেকে এক একটা রং ছিটকে এসেছে। কখনও ঘন নীল, কখনও হালকা হলুদ,কখনও আবার বিভিন্ন রঙের আঁকিবুকি। প্রতিটা ক্র্যাক বা ফাটলের নিজস্ব একটা রূপ আছে, একটা নকশা আছে, যা ছড়িয়ে আছে গোটা পাথর জুড়ে। যেগুলো বড়ো পাথর বা মনোলিথ, সেখানে এই রংবেরংয়ের নকশাগুলো এতটাই সুন্দর যে চোখ ফেরানো যায় না। একশো বছর আগে পাথরে ফাটল ধরলে যে রঙের নকশা হয়েছে, হাজার বছর আগের ফাটলের সঙ্গে তার আকাশ পাতাল তফাৎ। পাথরের ফাটল বেয়ে বৃষ্টির জল গড়িয়ে পড়ার ফলে পাথরের রং বদলে বদলে গিয়েছে,কিন্তু ফ্যাকাশে রঙের জৌলুস তীব্র রঙের চেয়ে কোনও অংশে কম নয়।
বাদবাকি যা ছিল, তা পুরো করে দিয়েছে পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা শ্যাওলা আর ছোটোছোটো বনফুলগুলো। তার ওপর বসে থাকে বিস্কুট রঙের পোকা, হলদে বেগুনি শুঁয়োপোকা আর গোলগাল ছাপ দেওয়া ফড়িং এসে ওড়াউড়ি করে। কত কত বছর ধরে বনের ভিতর ছড়িয়ে থাকা এই বিশাল পাথরের গায়ে এই গুঁড়ি গুঁড়ি ফুলের আলপনা আঁকা হচ্ছে, সে নিয়ে ফড়িং প্রজাপতি বোলতার দল কত কত গল্প আর গান করছে, সে খবর কেউই রাখে না। টিলুরই শুধু বারেবারে মনে হয়, পাথরগুলো তাকে দেখে হাসছে। সে টং-লিং-এর সঙ্গে আগে আগে ছুটে গিয়ে বড়ো বড়ো পাথরগুলো জড়িয়ে ধরে থাকে, মনে মনে তাদের সঙ্গে কথা বলে, তাদের গায়ে হাত বুলিয়ে দেয়। পাথরের শরীরগুলো ভিজে মাটির কুঁজোর মতোই ঠান্ডা। আরামে চোখ বন্ধ হয়ে আসে টিলুর। কিন্তু সে জানে, সে ছাড়া অন্য কেউ এই রঙের বাহার দেখতে পাচ্ছে না, বাবা আর তোপাও না। তাদের কাছে নাকি সব পাথরের রংই এক।
আজ বা কালকের মধ্যেই তাদের মংদলকুকো গ্রামে পৌঁছানোর কথা। ভোরবেলা তাঁবু গুটিয়ে, ব্রেকফাস্ট করে তারা পথ চলতে শুরু করেছে। আজকে তাদের এই জঙ্গলে চতুর্থ দিন। শঙ্কুযুক্ত সরলবর্গীয় বন পেরিয়ে তারা এখন যে জায়গাটায় এসে পৌঁছেছে, সেটা নাকি স্থানীয় উপজাতিদের প্রাচীন গোরস্থান। মাঝে মাঝে ঢেউখেলানো ছোটোছোটো ঘাসের ময়দান, তারপর আবার ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের মধ্যে একবার পা বাড়ালেই হল, সেখানে যত না মাটি, তার চেয়ে বেশি জল। সরু সরু তেজি নদীর জল কখনও শান্ত দীঘির চেহারা নিয়েছে, কখনও ঝোরা বা নালার রূপ নিয়ে ছুটে চলে। দুপুরের পর এখানে প্রায়ই রিমঝিম বৃষ্টি নামে, গাছপালা পাতা ফুলের ওপর একটা ভিজে ভাব থাকে। টুপটুপ করে এখান সেখান থেকে জল পড়ার শব্দ শোনা যায়, মনে হয় কেউ জলতরঙ্গ বাজাচ্ছে। ছোটোবেলায় শোনা কবিতা মনে পড়ে যায়। জল পড়ে, পাতা নড়ে। আবার পাতা নড়লেও পাতার কোলে জমা জল ঝরে পড়ে। গুলুব গুলুব শব্দ হয়। সবজেটে নালার নিচে জমাট বাঁধা অন্ধকার, সেখানে রূপোলি ব্যাঙেদের বৈঠক বসে। বৃষ্টি হোক না হোক, এখানে তাদের গানের আসর চলতেই থাকে সারেগামার মতো। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। ঘ্যাঙর ঘ্যাঙ। আর দু এক পশলা বৃষ্টি হলে তো কথাই নেই। রংধনু জলের স্রোত জেব্রা গাছের শিকড়ের ওপর দিয়ে বইতে শুরু করে, গাছের ডালে বাসা বেঁধে থাকা কীটপতঙ্গ আর কমলালেবু রঙের বড়ো বড়ো মাছি এসে ফার্নের পাতার ওপর বসে থাকে। মেঘ গর্জায়, ব্যাঙের মজলিশ বসে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গান গিয়ে চলে গাছের ওপর পাখির দল। লেজঝোলা, মুকুট তোলা, ছাতা তোলা… কত রকমের যে পাখি! অবাক কাণ্ড হল, তাদের প্রত্যেকের ডাক আলাদা। টিলু কানখাড়া করে সে ডাকগুলো লক্ষ করে, কিন্তু সবগুলো চিনতে পারে না। রিও আর ইনাও অবশ্য বেশিরভাগ পাখির ডাক চেনে। কোনটা সানবার্ড, কোনটা হানিডিউক, কোনটা রেন-ব্যাবলার, তারা চট করে বলে দিতে পারে। তাদের এই অসামান্য ক্ষমতা দেখে বেজায় হিংসে হয় টিলুর। বাবা, দাদু, তোপা সবাই মানুষের ভাষা নিয়েই পড়ে আছে, পশুপাখিদের ভাষা নিয়ে যেন কারো মাথাব্যথাই নেই।
এই চারদিনে যে টিলু কত কিছু দেখেছে, তার কোনও হিসেবে নেই। কোথাও সেগুন, পাইন, ওকে, কোথাও আকর্ণবিস্তৃত বনজ লতাপাতা উদ্ভিদ দিয়ে ঢাকা বনভূমি। বোনসুম, গোগরা, আলডার, ইনজুম, তেলিম, হেকুইচি চিং, হেনাপ চিং ইত্যাদি অনেক ভেষজ আছে, ওষুধ তৈরি করতে কাজে লাগে। ড্রাগনের মতো মুখওয়ালা ফুল, পাতা খাওয়া দূরবিন বাঁদর, জলের ওপর ডিগবাজি খাওয়া মাছ,বামন শূকর, ঝিকিমিকি রং ছড়ানো পেঁচা… আর এমনি পাখি যে কত তার ঠিক ঠিকানা নেই। ইনাও আর রিও তাকে শিখিয়েছে, কী করে ভিজে পাতা শুকিয়ে আগুন জ্বালতে হয়, কী করে বাঁশের মধ্যে ভাত পুরে কম আঁচে রান্না করতে হয়,জঙ্গলের মধ্যে ফুটে থাকা উজ্জ্বল রঙের ফুলের বোঁটা ছিঁড়ে ঝোলে দিলে যে খেতে দারুণ লাগে, সে কথাও শিখে নিয়েছে টিলু। সমস্যার মধ্যে একটাই,চোখটা মাঝেমধ্যে বড়ো ঝামেলা করে। জল পড়ে ক্রমাগত, জ্বালা জ্বালা করতে থাকে। বাবা তাকে আগেভাগে প্রমিস করিয়ে এনেছে, রোজ চারবেলা করে চোখে ওষুধ দিতে হয়, একদিন ব্যথা বেড়ে গিয়েছিল বলে ট্যাবলেটও খেতে হয়েছিল, কিন্তু ওসব নিয়ে বিশেষ পরোয়া করে না টিলু। এত ভালো ভালো জিনিস দেখতে পাচ্ছে, তার মধ্যে ওসব ছোটোখাটো জিনিস নিয়ে কেই বা মাথা ঘামায়?
টিলু অবশ্য ইতিমধ্যে দাদুর গবেষণা সম্পর্কে অনেক কিছুই জেনে ফেলেছে। সে এখন জানে, মংদলকুকো গ্রামে যে জাদুগররা থাকে, দাদু তাঁদের খোঁজ করছে না। কিন্তু দাদু আসলে কার খোঁজ করছে, তারা সেটা জানতে পারে হয়তো! দাদু নিজেও হয়তো সেখানে থাকতে পারে! অন্য দুটো গ্রাম খুব একটা দূরে ছিল না, দাদু সেখানে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা লোক পাঠিয়ে তোপা ভাইকে খবর দিত নিশ্চয়ই। সেটা যখন হয়নি, তার মানে দাদু সেখানে যায়নি। বাবা খুব চিন্তা করছে যে মংদলকুকো গ্রামে গিয়ে দাদুকে বা তাঁকে খুঁজে পাওয়ার কোনও রাস্তা না পেলে কী হবে? টিলুর অবশ্য মনে হচ্ছে, তারা ঠিক দাদুকে খুঁজে বার করবে।
কিছুক্ষণের জন্য একটা রেস্ট পয়েন্টে থামা হয়েছে বিশ্রাম নেওয়ার জন্য। ছোট্ট একফালি মাঠ, ল্যাভেন্ডার রঙের ঘাস মখমলের মতো ঢেকে দিয়েছে মাঠটাকে। মাঝে মাঝে বুনোফুলের ঝোপ, সেখানে গোলাপি ছিট ছিট রঙের দুটো খরগোশ লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াচ্ছে। টং আর লিং প্রাণপণ চেষ্টায় ওদের ধরার চেষ্টা করছে, কিন্তু খরগোশও দুষ্টু কম নয়। তারা টুক করে পাথর আর ঝোপের ফাঁক দিয়ে গলে যাচ্ছে। একসময় টংলিং হাল ছেড়ে দিল, তাদের কান ঝুলে গিয়েছে। টিলুর মনে হল অঙ্কের মাস্টারমশাই তাদের কানের লতি ধরে আচ্ছাসে মুলে দিয়েছে। খরগোশগুলো মহা পাজি। তারা এখনও পালাচ্ছে না, বরং দু পায়ে উঁচু হয়ে দাঁড়িয়ে ঝাবরা ঝুবরো গোঁফে (দেখে মনে হচ্ছে সাজঘর থেকে কেউ নকল গোঁফ লাগিয়ে দিয়ে গেছে) তা দিয়ে কুকুরছানা দুটোকে ক্ষেপাচ্ছে।
রিওরা বিস্কুটের টিন খুলে ফেলেছে ইতিমধ্যে। আনারস, বাদাম আর কফি খাওয়া হবে, টিলুর চোখে ওষুধও দিতে হবে। আপাতত মাঠের ওপর চিৎপাত হয়ে শুয়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে আছে সে, মুঠো থেকে বাদাম নিয়ে মুখে ফেলছে এক এক করে। আকাশের রং এখন কাজু আর পেস্তা দেওয়া গুড ডে বিস্কুটের মতো, তার ওপর দিয়ে হ্যাজেলনাট আইসক্রিমের স্কুপের মতো থোকা থোকা মেঘ ভেসে যাচ্ছে। খুব কাছ দিয়ে একটা বড়ো ময়ূর উড়ে গেল, তার লেজ থেকে আতশবাজির মতো রং ঝলসে উঠল।
খাওয়াদাওয়া আর ওষুধ দেওয়া হয়ে গেলে বেশ কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ঘাসের ওপর শুয়ে রইল টিলু। নরম গালচের মতো ঘাস, মিষ্টি ফুলের গন্ধ আসছে, ফিনফিনে হাওয়া বইছে, আরামে চোখ নিজেই বন্ধ হয়ে আসে। ওষুধের প্রভাব কেটে যাওয়ার পর চোখ খুলে সে দেখল, বাবা আর তোপা একটা ড্রয়িং খাতার মতো গাব্দা খাতা খুলে বসে আছে, রিও আর ইনাওও ঝুঁকে সেটা দেখছে। টিলু হামাগুড়ি দিয়ে সেখানে গিয়ে দেখল, খাতার ওপর দুটো পেন্সিলে আঁকা ছবি, তার নিচে ইংরেজিতে কীসব লেখা আছে।
টিলু একটা হাই তুলে বলল, “এগুলো কী?”
সপ্তর্ষি ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল, “এগুলোকে বলে লগোগ্রাফিক ক্যারেক্টার। শব্দও বলতে পারিস, আবার অক্ষরও বলতে পারিস। লগোগ্রাফিক সিস্টেমে ছবি দিয়ে দিয়েই লেখা হয়। দাদু যে উইজার্ডদের খুঁজতে গেছে, তারা এই অক্ষরগুলোও ব্যবহার করত।”
টিলু চশমাটা নাকের ওপর চেপে ধরে বলল, “এগুলো দাদু এঁকেছে?”
“না রে বোকা!” সপ্তর্ষি ছেলের কপালে টোকা দিয়ে বলল, “এগুলো তোপা ভাই আর আমি এঁকেছি। কয়েকদিন আগে বিজ্ঞানীরা যে পাণ্ডুলিপি খুঁজে পেয়েছিল, তাতে এই ছবিগুলো ছিল। কিন্তু তোর দাদুর ধারণা, এর কাছাকাছি কিছু ছবি তিনি আগেও দেখেছেন, নোটবুকে সে কথা লিখেছিলেন তিনি। তার কিছু ট্রেস পেপারে তোলা ছিল। সেখান থেকেই আমরা দুজনে মিলে এইগুলো এঁকেছি। প্রচুর সময় লেগেছে বুঝলি, পিঠ ভেঙে যাওয়ার জোগাড়!
টিলু অবাক হয়ে তাকাতেই সপ্তর্ষি হেসে ফেলে বলল, “ওরকম করে হাঁ হয়ে দেখছিস কি! তুই বুঝি ভাবছিস ওইটুকু আঁকতে সময় লাগবে কেন? ধর তোকে যদি আমি বলি দাদুর একটা ছবি আঁকতে, তুই পারবি?”
“ধ্যাত! আমি তো দাদুকে সামনে থেকে দেখিইনি।” টিলু বলে উঠল।
সপ্তর্ষি টিলুকে ক্ষেপানোর জন্য বলল, “তাতে কী? আমি তোকে সব বলে দেব। দাদুর নাক কেমন, কান কেমন, চোখ কেমন? এইবার তুই ছবি আঁকলে দাদুর মতো হবে তো?”
টিলু রেগে গিয়ে বলল, “ধুস। তুমি তো দাদুকে দেখছ বলে বলছ। আমি তো দেখিনি। আর এটা তো শুধুই একটা আঁকিবুকি ছবি, মানুষের ছবি তো নয়।”
সপ্তর্ষি চোখ নাচিয়ে বলল, “ওরে ক্যাবলা, তুই যেমন দাদুকে দেখিসনি, আমরা তেমন ওই অক্ষরগুলোকে দেখিনি। আমরা কেন, কোনও মানুষই আসলে জানে না ওই জাদুগরগুলো কীভাবে লিখত, কী করে ছবি আঁকত? ধর তুই অন্য গ্রহের প্রাণী, এইবার তুই হুট করে পৃথিবীর একটা বইয়ের পাতা পেলি। তাতে একটা আপেলের ছবি, নীচে লেখা আছে এ পি পি এল ই। এইবার যদি তোকে বলি এবিসিডি থেকে শুরু করে এক্স ওয়াই জেড অবধি লিখে ফেল, তুই লিখতে পারবি? পারবি না তো? এও প্রায় তেমনই ব্যাপার।”
“এগুলো নিয়ে আমরা কী করব?” টিলু জিজ্ঞেস করল।
তোপা বলল, “আমরা যে গ্রামে যাচ্ছি, সেখানে কাজে আসবে। সেখানকার লোককে এই ছবিগুলো দেখিয়ে আমরা জিজ্ঞেস করব এই ধরনের ছবি তারা আশেপাশে কোথাও দেখেছে কিনা? তাতে হয়তো আসল গ্রামটা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে।”
টিলু বাবার হাত থেকে খাতাটা নিয়ে মন দিয়ে দেখল। মাত্র দুটো ছবি। দেখে মনে হয় কেউ যত্ন করে একটা আল্পনা বানিয়েছে, এগুলোকে অক্ষর বা শব্দ বলে কল্পনা করা কঠিন। দেখতে দেখতে হঠাৎ টিলুর মনে হল, এর একটা ছবি সে আগেও দেখেছে। সে আঙুল দিয়ে দ্বিতীয় ছবিটা দেখিয়ে বলল, “এই ছবিটার মানে কী?

সপ্তর্ষি না কামানো দাড়িতে আঙুল চালিয়ে বলল, “ঠিক করে বলা যায় না। এই ছবিগুলোর একাধিক মানে থাকে। আমাদের ধারণা, এটা কোনও বিগ্রহ বা ম্যাজিক বোর্ডের ছবি হতে পারে।”
টিলু একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “আমি এই ছবিটা দেখেছি।”
এইবার সপ্তর্ষি আর তোপা দুজনেই চমকে উঠল। সপ্তর্ষি অবাক হয়ে বলল, “তুই দেখেছিস? কোথায় দেখেছিস?”
“ওই আগের মাঠটায়!” টিলু আঙুল দিয়ে দেখাল, “যেখানে অনেকগুলো বড়ো বড়ো পাথর ছড়ানো ছিল। একটা পাথরের ওপর এই ছবিটা আঁকা ছিল।”
সপ্তর্ষি সন্দেহের চোখে তোপার দিকে তাকাল। টিলু কতটা সত্যি দেখে, কতটা মনশ্চক্ষুতে দেখে বলা মুশকিল! অনেক কিছু সে সত্যিই দেখে, কিন্তু অন্য লোক সেটা দেখতে পায় না। কিন্তু টিলু মিথ্যা বলে না, বানিয়ে বানিয়ে কথা বলার অভ্যেসও তার নেই। যদি গিয়ে দেখা যায় কিছুই নেই, তাহলে সময়টা নষ্ট হবে। সপ্তর্ষি ধাঁধায় পড়ে গেল। তোপা তার মনের ভাব আন্দাজ করে বলল, “অত ভাবছিস কেন? টিলু বলছে যখন দেখেছে, দেখেই আসা যাক! জায়গাটা বড়োজোর মিনিট কুড়ির পথ। বেশিক্ষণ লাগবে না।”
আবার উল্টো পথে রওনা দিল সবাই। টিলু সামনে সামনে চলেছে, তার নিজের মনেও উত্তেজনা কম নেই। যদি সত্যিই ছবিটা ভ্যানিশ হয়ে গিয়ে থাকে, তাহলে? টং-লিং ও এই উত্তেজনায় শরিক হয়েছে, তারা হাঁকডাক করতে করতে অনেক দূরে চলে যাচ্ছে, আবার দৌড়ে ফিরে আসছে দলটার কাছে। মিনিট পনেরো হাঁটতেই দূর থেকে উঁচু নিচু ঘাসে ভরা ময়দানটা নজরে পড়ল, পাথরগুলো ধ্যানস্থ সন্ন্যাসীর মতো মিঠে রোদ গায়ে মেখে দাঁড়িয়ে আছে একইভাবে। এক ছুটে দূরের একটা পাথরের দিকে ছুটে গেল টিলু। এদিক ওদিক তাকাতেই সে আশ্বস্ত হল। এই তো ছবিটা! পুরোপুরি না হলেও প্রায় একই। কিন্তু… কিন্তু বাবারা এটা দেখতে পাবে তো?
টিলুর আশঙ্কা অমূলক ছিল। পাথরটার সামনে আসতেই তোপার মুখ দিয়ে একটা বিস্ময়ের শব্দ ছিটকে বেরোল। সপ্তর্ষি ছেলের মুখের দিকে তাকাল একবার, তারপর ব্যাগ রেখে ক্যামেরা বের করল সে। একটা ছবি তুলেই সে ক্যামেরাটা তোপার হাতে তুলে দিল, তারপর টিলুর চুল এলোমেলো করে আদর করে দিয়ে বলল, “ওয়েল ডান, পটার। হান্ড্রেড পয়েন্টস টু গ্রিফিনডোর। এইবার তোকে আরেকটা কাজ করতে হবে। ঘুরে ঘুরে সব পাথরগুলো দেখ তো এরকম আর ছবি খুঁজে পাস কিনা!”
টিলু মহানন্দে কাজে লেগে পড়ল। মিনিট কুড়ি পর দেখা গেল, পাথরগুলোর গায়ে এরকম বেশ কিছু ছবি খোদাই করা আছে। সেগুলো পর পর ছবি তুলে সাজিয়ে দিলে এরকম দেখায়।

তোপা আর সপ্তর্ষি মুখে কিছু না বললেও তাদের মুখচোখের ভাব দেখে তাদের মনের অবস্থাটা আন্দাজ করা যাচ্ছে। এই ছবিগুলো নিঃসন্দেহে সেই শমন গোষ্ঠীর হাতে খোদাই করা। তাই কাদাই বা টিবেটো-বার্মান থেকে যে সমস্ত ভাষা এসেছে, সেখানে লগোগ্রাফিক লিপির চল নেই, এই টেক্সট অর্থাৎ লিপিও তাদের অচেনা। তাই আহোম ভাষার গতানুগতিক লিপি সম্পর্কে যতটুকু ধারণা তাদের আছে, তাতে মোটামুটি আন্দাজ করা যায় যে মূল গোষ্ঠী থেকে নিষ্কাষিত শমনরা ভাষার মূল ‘সেমান্টিক্স’-এ বিশেষ অদলবদল না ঘটালেও কিছু কিছু নতুন শব্দাক্ষরের প্রবর্তন করেছিলেন। খুব সম্ভবত এই ছবিগুলো জাদুঘটিত মন্ত্র বা পুজোপাঠ সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের সময় ব্যবহার করা হত। দুইয়ে দুইয়ে চার করলে অনুমান করা যায় যে এই পাথরগুলো আহোম শমনগোষ্ঠীর সমাধিস্থল হিসেবে ব্যবহৃত হত, সেইজন্যই সমাধিস্থলের ওপর এই ছবিগুলো খোদাই করে রেখেছে তারা। যতদূর মনে হয় এইগুলো মৃতদের আত্মার শান্তির উদ্দেশে লেখা প্রার্থনামন্ত্র।
এই সমাধিগুলো অবশ্য কম করে হলেও পঞ্চাশ বছর আগের, তার পর হয়তো স্থানপরিবর্তন করা হয়েছিল। মজার কথা হল এখানে অন্য উপজাতির সমাধিফলকও আছে, যারা এখনও এই অরণ্যে বসবাস করে। তার মানে, এই উপজাতিদের নিজেদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। যদি নাও থেকে থেকে, অন্তত বৈরিতার কোনও চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না। সেটা হলে একই জায়গায় একাধিক গোষ্ঠীর সমাধিফলক পাওয়া অসম্ভব। আর কিছু হোক না হোক, আজকের এই আবিষ্কারেরর পর এই শমনগোষ্ঠী আর তাদের ভাষার অস্তিত্ব সম্পর্কে কোনও সন্দেহ থাকার অবকাশ নেই।
৯
মংদলকুকো গ্রামটা আসলে বেশ বড়ো। টিলু ভেবেছিল ঘন জঙ্গল দিয়ে ঘেরা ছোট্ট কোনও গ্রাম হবে, কাঁচামাটির বাড়ি বা খড়ের চাল দিয়ে তৈরি ঘরবাড়িতে হয়তো আলখাল্লা পরা কয়েকজন বুড়ো বুড়ো লোক থাকবে, তাদের লাল লাল চোখে আর বড়ো বড়ো দাড়িগোঁফের জঙ্গলের ভিতর থেকে টুপটাপ পোকা ঝরে পড়বে। সন্দেহজনক দৃষ্টিতে টিলুদের দিকে তাকিয়ে থাকবে তারা, অচেনা ভাষায় সম্ভাষণ করবে, রেগেও যেতে পারে! কিন্তু সচক্ষে গ্রামটা দেখার পর তার সমস্ত ধারণা ভুল বলে প্রমাণিত হল।
মংদলকুকো গ্রামটা একসময় শমনদের হাতে তৈরি হয়েছিল সন্দেহ নেই, কিন্তু এখন আর তারা কেউই তান্ত্রিক বা মারণ-উচাটন করা সাধুসন্ন্যাসীদের মতো চোগা চাপকান চাপিয়ে ঘোরে না। শমন বলতে দু একজন এখনও বেঁচে আছে ঠিকই, কিন্তু আর সব কিছুই বদলে গিয়েছে। ঘন অরণ্যের মধ্যে অবস্থিত এই গ্রামটাকে আধুনিক গ্রাম বলার চেয়ে একটা মফস্বলি টাউন বলাই হয়তো ঠিক। লোকালয় থেকে এত দূরে থাকা সত্ত্বেও মংদলকুকো গ্রামে প্রায় সব ব্যবস্থাই আছে, যা একটা মফস্বলে থাকতে পারে। বিদ্যুৎ না থাকলেও ঘরে ঘরে গ্যাসলাইট আছে, সোলার আছে, হাতে ঘোরানো পাম্প দিয়ে ঝর্ণার জল টানার ব্যবস্থা আছে, এমনকি কয়েকজনের কাছে স্মার্টফোনও আছে। মোবাইল কভারেজ না থাকলেও গান শুনতে, সিনেমা দেখতে সেগুলো কাজে দেয়। গ্রামের ছেলেছোকরারা মাসে দু-তিনবার শহরে যায়,দরকারি জিনিসপত্র সঙ্গে করে নিয়ে আসে সে সময়। চাল, ডাল,শাকসবজির অবশ্য অভাব নেই, সেসব গ্রাম সংলগ্ন এলাকাতে ফসল করা হয়। শুধু ব্যাটারি,মশলাপাতি, আচার, জামাকাপড় বা অন্যান্য উপাদান আনতে হলে শহরে যেতে হয়।
মংদলকুকো গ্রামের সব বাড়িই পাকা ইটের তৈরি, আধুনিক কায়দায় পেইন্ট করা হয়েছে বাড়ির দেওয়ালগুলো। ফুলের টব দিয়ে সাজানো চাতালের ওপর মুরগিরা দানা খাচ্ছে, জিনসের প্যান্ট আর ক্যাপ্রি পরা ছেলেমেয়েরা গিটার আর জিম্বে বাজিয়ে ইংরেজি গান করছে। অনেকের টি শার্টে আয়রন ম্যান, লৌ মাজাও বা টেলর সুইফটের ছবি, হাতের উল্কিতে আঁকা ড্রাগন। গ্রামের আশেপাশে বেশ কিছুটা অংশ জুড়ে গাছপালা বিশেষ নেই, ন্যাড়া মাটি ঢালু হয়ে নিচের দিকে চলে গেছে। ঘন অরণ্যের মধ্যে এই জায়গাটা যেন মন্ত্রবলে বদলে গিয়েছে, সেটা কতটা ভালো বা কতটা মন্দ, প্রথম ঝলকে দেখে সেটা বোঝার উপায় নেই। কিন্তু সতেজ, সবুজ অরণ্যপ্রান্তের মধ্যে অবস্থিত এই গোটা জায়গাটা যে একটা নিষ্প্রভ অর্থনৈতিক বদলের ইঙ্গিত বহন করছে, সে নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই।
দেখেশুনে টিলু আর সপ্তর্ষি তো দূর, তোপারাও বোকা বনে গেছে। গ্রামের একটা ছেলে এতক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলছিল, তার কাছেই সব খবর পাওয়া গেল। এইবার ছেলেটা গ্রামের দিকে এগিয়ে গেল। তোপা নিচু স্বরে রিও আর ইনাওয়ের সঙ্গে কথা বলতে লাগল। তারা দুজনও খানিকটা বিভ্রান্ত। তোপার কথা শুনে রিওরা ব্যাগ মাটিতে রেখে ছেলেটার পিছু পিছু চলে গেল।
সপ্তর্ষি আর টিলু যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে মূল গ্রামটা আরো কিছুটা দূরে। কাঁচা রাস্তাটা ঢালু হয়ে নিচের দিকে নেমে গিয়েছে, সেখান দিয়ে রিওরা নেমে যাচ্ছে। সেদিকে তাকিয়ে তোপা বলল, “জায়গাটা তো চিনতেই পারছি না। এত কম সময়ে এতটা বদল হয় কী করে?”
সপ্তর্ষি বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে গ্রামটা দেখছিল। এইবার সেটা টিলুর হাতে তুলে দিয়ে সে বলল, “লাস্ট কবে এসেছিলি?”
“বছর আটেক হবে।” তোপা বিমর্ষ গলায় বলল।
“তখন কীরকম ছিল জায়গাটা?” সপ্তর্ষি প্রশ্ন করল।
“কীরকম বলতে…!” তোপা একটু ইতস্তত করে বলল, “জংলি একটা গ্রাম যেরকম হয় আর কি! ছোট্ট, সুন্দর, সবুজে ঘেরা। লোকও কম ছিল, কিন্তু আন্তরিকতার অভাব ছিল না। গ্রামের কিছু লোক ঘুরে ঘুরে এইদিকের পাহাড়ে ঝুম চাষ করত, ফসলের মরসুম শেষ হলে গ্রামে ফিরে আসত। কয়েকজন ছেলেমেয়ে শহরে গিয়ে পড়াশোনা করছিল জানি, কিন্তু তাদের কথাবার্তায় এরকম জোর করে চাপানো স্মার্টনেস দেখিনি। এই ছেলেটা তো পূর্বপুরুষের ভাষা জানেই না বলল, স্টেট ল্যাংগুয়েজ জেনেই কাজ চলে যাচ্ছে। ইংরেজিও অল্পস্বল্প জানে দেখলাম।”
“উন্নয়ন হয়েছে বলছিস?” সপ্তর্ষি করব না করব না করেও কথাটা উচ্চারণ করে ফেলল।
তোপা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “এদিক নাকি সরকার জাথরোপা প্ল্যান্টেশন করবে বলে কয়েকশো একর জমি নিয়েছিল আদিবাসীদের কাছ থেকে। জাথরোপা জানিস তো, মিরাকল বায়োফিউল। বেশ একটা হিড়িক উঠেছিল একসময়। পেট্রল ডিজেল সব নাকি হার মেনে যাবে। কিন্তু আসলে কিছুই হয়নি। পুরোটাই ছিল গুজব। মাঝখান থেকে প্রচুর জঙ্গল কাটা পড়েছে, জমির উর্বরতাও কমে এসেছে। সরকার একসময় গাদা গাদা প্রমিস করেছিল, সে সব কিছুই হয়নি। মাইনিং প্রজেক্ট, পাম অয়েল প্ল্যান্টেশন, জাথরোপা ফিউল… একটা যায়, একটা আসে! কাজের কাজ কিছুই হয় না। মাঝখান থেকে জমিজমা হারিয়ে আদিবাসীরা টেম্পোরারি সেটলমেন্টে যেতে বাধ্য হয়েছে। সেখানে কোনও সুবিধাই নেই। মাঝে শুনলাম, একটা বাঁধ তৈরি হবে বলে সবাইকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেখানে নাকি কর্মসংস্থান হবে সকলের। তা সেই প্রজেক্টে অনেক ফাঁকফোকর ছিল, বাঁধ তৈরি হলে অর্ধেক জঙ্গল আর কয়েক হাজার গ্রাম ভেসে যেত। বিরোধ হওয়ার পর কোর্ট থেকে স্টে লাগিয়ে দিয়েছে, কিন্তু ইতিমধ্যে কাজ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কয়েক হাজার একর প্রিস্টিন ফরেস্ট একদম সাফ করে দিয়েছে, সেখানে এখন মাফিয়ারা পোস্তর চাষ করাচ্ছে জোর করে। উন্নয়নই বটে! বনজঙ্গল দুরমুশ করে উন্নয়ন চলছে। ইতিমধ্যে বাইরের লোকজন পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে এসে এসে জঙ্গলের মধ্যে ঘরবাড়ি তুলে ফেলছে, তারা নাকি হোমস্টে চালাবে। আসলে মুনাফার তাল। সরকারি বেসকারি কোম্পানি অফার দিলেই জমিজমা বেচে পিটটান দেবে। স্থানীয় মানুষের ভাষা বা সংস্কৃতি নিয়ে এদের কোনও আগ্রহ নেই। এসব কি আর আটকানো যাবে? লোকজন আজকাল বড্ড স্মার্ট হয়ে গেছে বুঝলি সপু, আমরাই বোকা থেকে গেছি। কালচারাল কনজার্ভেশন নিয়ে কে আর মাথা ঘামাবে?”
টিলু কিছুই বুঝছিল না। সে একবার তোপার দিকে, একবার বাবার দিকে তাকাল। সপ্তর্ষি চুপ করে গেছে। কোনও কারণে তোপা ভাইয়ের মন ভালো নেই, সেটা অবশ্য টিলু বুঝতে পেরেছে। সে নীচু স্বরে ফিসফিসিয়ে বলল, “দাদু এখানে নেই?”
তোপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, “রিও আর ইনাও খবর নিয়ে আসছে টিলুবাবু। দেখা যাক, এখনকার শমন রাজার সঙ্গে দেখা করা যায় কিনা! তিনি যদি রাজি হন, তাহলে হয়তো তোমার দাদুর কিছু খবর পাওয়া যেতে পারে! তুমি বরং একটা কাজ করো, তোমার দাদুর একটা ছবি পকেটে রেখে দাও, কখন দরকার পড়ে বলা যায় না।”
দাদুর পাসপোর্ট ছবির কয়েক কপি তারা সঙ্গে করেই এনেছে, টিলু ব্যাগ খুলে তার একটা কপি বের করল, তারপর স্কার্ফে মুড়ে সেটা তার প্যান্টের পকেটে রেখে দিল। এই হাইকিং ট্রাউজারগুলোতে গাদা গাদা পকেট থাকে, অনেক কিছু রেখে দেওয়া যায়।
রিওরা ফিরে এল মিনিট কুড়ি পর। তাদের সঙ্গে আরো দুজন ছেলে এসেছে, তারা না বলতেই তাদের ব্যাগগুলো কাঁধে তুলে নিল, তারপর ইংরেজিতে বলল, “কাম! কাম!” তোপা ততক্ষণে ইনাওর সঙ্গে কথা বলে নিয়েছে। সে সপ্তর্ষির দিকে ঘুরে উত্তেজিত গলায় বলল, “টিলুর অনুমানই ঠিক। স্যার সত্যিই এখানে এসেছিলেন।”
“ঠিক বলছিস?” সপ্তর্ষি উদগ্র স্বরে বলল, “কবে?”
“সম্ভবত আড়াই তিন সপ্তাহ আগে!” তোপা উত্তর দিল, “শমন রাজা আমাদের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হয়েছেন। তার কাছে আরো কিছু খবর পাওয়া যাবে নিশ্চয়ই। টিলুবাবু, রেডি তো?”
টিলু প্রচন্ড উত্তেজিত। সে জোরে জোরে ঘাড় নেড়ে জানিয়ে দিল, সে রেডি। টং- ইতিমধ্যে গা ঝাড়া দিয়ে উঠে রিওদের পিছনে পিছনে চলতে শুরু করেছে, বাকিরাও তাদের অনুসরণ করল। ঢালু পথ ধরে নেমে তারা যেদিকে এগিয়ে চলল, সেটা আসলে গ্রামের পিছন দিক। সেখানে এখনও কয়েকটা কাঁচা বাড়ি রয়ে গিয়েছে। কয়েকটা বাড়ি নির্মাণাধীন অবস্থায় পড়ে আছে, সেখানে কয়লা আর সুরকির স্তূপ। রোয়াকে বসে থাকা বাচ্চাদের দল প্রথমে অবাক হয়েছিল, এখন তারা গুটি গুটি পায়ে তাদের পিছু পিছু চলেছে। এরা কেউ আগে শহরে যায়নি,টিলুর মতো চশমা পরা ছেলেকেও আগে দেখেনি। এই গ্রামে আরো কয়েকটা কুকুর আছে, টংলিং আর অপরিচিত লোকজন দেখে তারা ডাকাডাকি করে ছুটে এসেছিল, বাচ্চারা তাদের ধমকে ভাগিয়ে দিয়েছে। টিলু মাঝে দু একবার তাদের দিকে চেয়ে হেসেছ, বিনিময়ে তারাও খিলখিল হাসির বন্যা বইয়ে উত্তর দিয়ে দিয়েছে।
শমন রাজার বাড়ির সামনে এসে ছেলেগুলো তাদের ব্যাগ নামিয়ে রাখল, তারপর ভিতরের দিকে ইশারা করে বলল, “গো, গো! নো শু!” বোঝাই যাচ্ছে, তাদের ইংরেজির দৌড় বেশিদূর নয়। মজার কথা হল, তোপা আর রিওদের সঙ্গে তারা দিব্যি স্থানীয় ভাষায় কথাবার্তা বলছে, কিন্তু টিলু আর সপ্তর্ষির সামনে ইংরেজি বলতেই হবে। সপ্তর্ষি মনে মনে একচোট হেসে নিল।
তোপা রোয়াকে বসে জুতো খুলতে খুলতে বলল, “যা বুঝছি, শমন রাজা আর তার ছেলে ছাড়া এদের নিজস্ব ভাষা বলার মানুষ আর বেঁচে নেই। থাকলেও, তারা আর নিজেদের ভাষা নিয়ে চর্চা করে না।”
সপ্তর্ষি জুতো মোজা খুলে ফেলেছে। সে বলল, “এদের চেহারা তো ঠিক স্থানীয় মানুষের মতো নয়। এরা কি অরুণাচলের বাসিন্দা?”
“ঠিক ধরেছিস!” তোপা বলল, “বুগুন সাব ট্রাইব! বুগুন ভাষাটাই তো হারিয়ে যেতে বসেছে, সে ভাষার শাখাপ্রশাখাকে আর কী করে টিকিয়ে রাখা যাবে? কী আর করা?”
শমন রাজার ঘরটা ছোটো। দেওয়ালে একটা বাইসনের মাথা, তার চারিদিকে বিভিন্ন রকম ডিজাইন করা। একপাশে একটা মাটির বেদী, সেখানে কতগুলো কাপড়ের পুতুল। তাদের সামনে হরেক রকম জিনিস সাজানো। ময়ূরের পালক, মানুষের হাড়, মদের পাত্র, শুকনো ফুল, কাঠের চিহ্ন, সেগুলো আসলে টোটেম হিসেবে ব্যবহার করা হয়। একটা ধুনোর মতো জিনিস জ্বালানো হয়েছে ঘরের ভিতর, তার মিষ্টি গন্ধ এসে নাকে লাগছে। গোটা ঘরে কুয়াশার মতো মিঠে ধোঁয়া।
ঘরের একপাশে কয়েকটা মোটা মোটা তক্তপোশ, তার একটায় শমন রাজা বসে আছেন। তাঁর বয়স নব্বই পেরিয়ে গিয়েছে, মুখের চামড়া ঝুলে গিয়েছে, কিন্তু মাথার কোঁকড়ানো সাদা চুল এখনও অটুট। তাঁর কানে আর নাকে মাকড়ি, কপালের ওপর একটা কীসের যেন তিলক কাটা। একটা চকরা-বকরা টি শার্ট এর ওপর ধানি রঙের আলোয়ান গায়ে দিয়ে বসে ছিলেন তিনি, তোপারা ঘরে ঢুকতে ইশারায় তাদের সামনের তক্তপোষে এসে বসতে ইশারা করলেন। তোপারা বসল। এইবার শমন রাজার নজর পড়ল টিলুর দিকে। তাঁর ঠোঁটের কোণে একটা ক্ষীণ হাসির রেখা খেলে গেল। তিনি তর্জনী তুলে টিলুকে এগিয়ে আসতে ইশারা করলেন।
টিলু একটু ভয় পাচ্ছিল, কিন্তু সে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল। শমন রাজা তাঁর দু হাত টিলুর দু গালে দেখে খুব মন দিয়ে তার চোখের ওপর ঝুঁকে রইলেন কিছুক্ষণ, তারপর অদ্ভুত গলায় বিড়বিড় করে একটা মন্ত্র পড়তে লাগলেন। মন্ত্র পড়া শেষ হলে তিনি টিলুর গালে টোকা দিয়ে হাসলেন, তাঁর চোখের দৃষ্টি নরম হয়ে এল। শমন রাজার ফোকলা মুখে একটাও দাঁত নেই, সেইদিকে তাকিয়েই টিলুর ভয় কেটে গেল। রাজা এইবার তার কোঁচড় থেকে একটা কলা বের করে তার দিকে এগিয়ে ধরলেন। টিলু সেটা নিয়ে নিল কিছু না ভেবেই। এইবার অন্যদের দিকে ফিরলেন শমন রাজা। তোপা তাঁকে অভিবাদন জানিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞেস করল, তিনি বিড়বিড় করে কিছু বলতে লাগলেন। তোপা আবার কিছু বলল, রাজা আবার মাথা নেড়ে নেড়ে কথা বলে চললেন। মাঝেমধ্যে তিনি দু হাত মাথার ওপর তুলে নানারকম অঙ্গভঙ্গি করছেন, তাঁর লোলচর্ম মুখে ফুটে উঠেছে নানারকম অভিব্যক্তি। তোপা এইবার পাথরের ওপর খোদাই করা ছবিগুলোর ফটোগুলো ওর সামনে মেলে ধরল। প্রথম তিনটে ছবি দেখে শমন রাজার মুখে বিশেষ কোনও প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না, কিন্তু চার আর পাঁচ নম্বর ছবিটা তার চোখের সামনে ধরতেই তিনি শিউরে উঠে বললেন, “মাসা! মাসা! নি মাসা! নি…”
টিলু অবশ্য কিছুই বুঝল না, শুধু হাঁ করে তাকিয়ে থাকল। বাবা মন দিয়ে তোপা আর শমন রাজার কথোপকথন শুনছে, তার ভুরু কুঁচকানো দেখে মনে হচ্ছে কিছু কিছু বুঝতেও পারছে। টিলু আর কী করে, সে কিছুক্ষণ ভ্যাবলার মতো বসে রইল, তারপর অন্যদিকে চোখ ফেরাল। শমন রাজার পিছনের দেয়ালে একটা হরিণের চামড়া শুকিয়ে রাখা আছে, বর্শা বল্লম জাতীয় কিছু অস্ত্রও দাঁড় করানো আছে একপাশে। ঘরের চার কোণে চারটে কাঠের বাক্স, তাতে হলুদ আর লাল রং দিয়ে নকশা করা। মনে হচ্ছে আউজা বোর্ড জাতীয় জিনিস, এইগুলো প্ল্যানচেটের সময় ব্যবহার করে আত্মাদের ডাকা হয়। এই ঘরটা যে একজন জাদুগরের সেটা একবার দেখলেই বোঝা যায়। আলো আঁধারি ঘরের মধ্যে এমন একটা অদ্ভুত পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে, বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় নেই।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর যখন তারা ঘর থেকে বেরোচ্ছে, শমন রাজা আবারও টিলুর গাল টিপে আদর করে দিলেন। তোপা শুদ্ধ সবাই মাটিতে মাথা ঠেকিয়ে তাঁকে প্রণাম করে ধন্যবাদ দিল, তারপর বেরিয়ে পড়ল। টিলু যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে দেখল, শমন রাজার ফোকলা মুখে শিশুদের মতো হাসি, তাঁর ডান হাতটা আশীর্বাদের ভঙ্গিতে ওপরে তোলা। টিলুর কেন জানি না একটু মন খারাপ হয়ে গেল।
ঘর থেকে বেরিয়ে তোপা বলল, “অনেক খবর আছে। কিন্তু সেসব বলার আগে রাতে থাকার বন্দোবস্ত করতে হয়। সন্ধে হয় হয়, ক্যাম্প করতে হলে আমাদের একটা ঠিকঠাক জায়গা খুঁজে নিতে হবে। কিন্তু শমন রাজা অনুরোধ করেছেন আজ এই গ্রামেই থেকে যেতে। কী করবি?”
সপ্তর্ষি উত্তর দেওয়ার আগেই একজন মাঝবয়সী লোক এসে তাদের সামনে দাঁড়াল। হাত জোড় করে কিছু কথা বলল সে, তার মুখে বিনয়ী হাসি। তোপা সকলের দিকে ফিরে বলল, “ইনি শমন রাজার ছেলে। আমাদেরকে ওর বাড়িতে রাতটা কাটিয়ে যেতে বলছেন। আমরা তাঁর অতিথি, আমাদের না খাইয়ে যেতে দিলে এদের অকল্যাণ হবে।”
অবশেষে তাই ঠিক হল। শমন রাজার ছেলের নাম শুকা, তিনি তাঁর বউ বাচ্চা নিয়ে গ্রামের শেষপ্রান্তে থাকেন। সেখানে যেতে বেশিক্ষণ সময় লাগল না। টিলু দেখল, তাঁর বাড়ির পিছনে একটা ছোট্ট পুকুর, সেখানে কতগুলো সবুজ রঙের পাতিহাঁস সাঁতার কাটছে। টং আর লিং সেখানে গিয়ে গা ভিজিয়ে মাটিতে লুটোপুটি করতে লাগল। ততক্ষণে শুকা তাদের জিনিসপত্র একটা বড়ো ঘরে রেখে দিয়ে এসেছে, সেখানে তক্তপোশ আর চাদর পেতে সকলের শোয়ার বন্দোবস্ত করে দেওয়া হয়েছে আগেই। সকলে জুতো খুলে, মুখে হাতে জল দিয়ে রোয়াকে এসে বসল, শুকার স্ত্রী ইতিমধ্যে সকলের জন্য চা আর ডিমভাজা নিয়ে এসেছেন। শুকার দুটো যমজ ছেলেমেয়ে, বছর দুই বয়স হবে, তারা গুটগুট করে হামাগুড়ি দিচ্ছে, মাঝেমধ্যে টলমলে পায়ে দাঁড়িয়ে পড়ে অবাক হয়ে টিলুদের দিকে তাকিয়ে আছে। টিলু ডিমভাজা মুখে পুরে আকাশের দিকে তাকাল। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে, একটা নীলাভ সবুজ আভা ছড়িয়ে পড়েছে আকাশ জুড়ে। বনের পাখিরা বনে ফিরে যাচ্ছে, তাদের কলকাকলিতে চরাচর মুখর। এইসময় ইচ্ছে করে চুপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকতে, মনটা কেমন উদাস হয়ে যায়।
সপ্তর্ষি চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “কিছু জানতে পারলি?”
তোপা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “আমাদের আন্দাজই ঠিক ছিল বুঝলি। স্যার এখানে এসেছিলেন, শমন রাজার সঙ্গে দেখাও করেছিলেন তিনি। আহোম শমনগোষ্ঠী সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন কিনা সে বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তিনি বুগুন ভাষা সম্পর্কেও নোটস নিয়েছিলেন। সম্ভবত আগেকার নোটস এর সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য বা তুলনামূলক স্টাডির জন্যও হতে পারে। ভদ্রলোক বললেন, মংদলকুকোর পরিবর্তন দেখে তাঁর পছন্দ হয়নি। একসময় স্যার বুগুন ভাষার রিভাইভালের জন্য যথেষ্ট চেষ্টা করেছিলেন, অরুণাচল সরকারের সঙ্গে কথা বলে প্রাথমিক স্তরে ভাষাশিক্ষার ব্যবস্থাও করেছিলেন, লোকগান বেঁধেছিলেন, সে সব কিছু কাজেই আসেনি। নতুন প্রজন্মের কাছে ওই ভাষার কোনও মূল্যই নেই। সচেতনতা না থাকলে কি আর লিঙ্গুইস্টিক্স হেরিটেজকে বাঁচানো সম্ভব?”
“সে তো বুঝলাম! আহোম শমনগোষ্ঠী সম্পর্কে উনি কিছু জানেন কি?” সপ্তর্ষি অধৈর্য হয়ে জিজ্ঞেস করল, “শমনরাজা বাবাকে কিছু বলেছিলেন নাকি?”
“হুঁ।” তোপা আস্তে আস্তে বলল, “সেই কথাতেই তো আসছি। হুড়বুড় করছিস কেন? বুগুনভাষী শমনদের মতো আরো কিছু শমন এসে এই অরণ্যে গ্রাম পত্তন করেছিল, কালের নিয়মে তারা সবাই ভেসে গিয়েছে। ভাষাগুলোও হারিয়ে গিয়েছে যথারীতি। তাই আহোম ভাষার চারটে শমন গ্রাম ছিল এই এলাকায়, তাদের সঙ্গে কালেক্রমে এদের যোগাযোগও ছিল। তার তিনটে পুরোপুরি নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু একটা গ্রাম, যেখানে আহোম গোষ্ঠীর সবচেয়ে সম্মানীয় শমনদের বাস ছিল, সেই মাসা উপগোষ্ঠীর কিছু মানুষ হয়তো এই অরণ্যে এখনও আছে। শমন রাজা নিজের চোখে তাদের কাউকে দেখেননি, কিন্তু এই সাব ট্রাইবটা নাকি আর পাঁচটা উপগোষ্ঠীর চেয়ে আলাদা, তারা প্রথম থেকেই রহস্যের আড়ালে নিজেদের মুড়ে রেখেছিল, বাইরের লোকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগও ছিল না বললেই চলে। অনেকের মতে, মাসা ট্রাইবের শমনরা সাধারণ মানুষের ক্ষমতাকে অতিক্রম করে গিয়েছিল। সে সব অন্য কথা। ঘটনা হল, নিজেদের অস্তিত্ব বাঁচানোর জন্য এরা আগের গ্রাম ছেড়ে জঙ্গলের সবচেয়ে গভীর অঞ্চলে চলে গিয়েছে। কিন্তু, বনের সেই প্রান্তে মানুষজনের পা পড়েনি বললেই চলে। বর্ণনা শুনে মনে হল ওংপুনিধুপিয়া অঞ্চলের কথা হচ্ছে। জায়গাটা এখান থেকে দু আড়াই দিনের পথ।”
“দাদু সেখানেই গিয়েছে?” টিলু বলে উঠল। সে এতক্ষণ বসে বসে সব কথা গিলছিল। সপ্তর্ষির চোখেও একই প্রশ্ন।
“তাই তো মনে হয়।” তোপা মাথা চুলকে বলল, “শমন রাজা তাঁকে বারণ করেছিলেন, কিন্তু স্যার সে সব পাত্তা দেননি। তোরা সকলেই যা জেদি! একবার জেদ চাপলে হল! রওনা দেওয়ার আগে তিনি অবশ্য শুকার কাছেই ছিলেন, তখন শমন রাজার সঙ্গে তার বেশ কথাবার্তাও হত। তিনি কিন্তু আমাদের সকলেকেই চেনেন। কিন্তু টিলুকে যে তিনি সবচেয়ে বেশি পছন্দ করেছেন, সেটা তো আমরা দেখলামই।”
টং এসে টিলুর হাত চাটছে। তাকে একটু ডিমভাজা দিতে সে কপাত করে মুখে পুরে দিল। লিং-এর দিকে একটা বিস্কুট ছুঁড়ে দিয়ে টিলু বলল, “আমরা চংকুনিরুপিয়া যাব তো?”
“চংকুনিরুপিয়া না টিলুবাবু, ওংপুনিধুপিয়া!” তোপা হেসে ফেলল। ডিমে কামড় বসিয়ে সে অন্যমনস্ক ভাবে বলল, “যাবে তো, কিন্তু একটা মুশকিল আছে যে!”
“কী মুশকিল!” সপ্তর্ষি জিজ্ঞেস করল।
তোপা একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “জায়গাটা নাকি খুব একটা নিরাপদ নয়। নানারকম ভয়ের জিনিস আছে। এদিকের আদিবাসীরা ও অঞ্চলটা এড়িয়ে চলে।”
“জন্তু জানোয়ারের কথা নিশ্চয়ই বলছিস না!” সপ্তর্ষি চোখ ছোটো করল। তার কপালে ভাঁজ পড়েছে।
“না।” তোপা বলল, “শমনরাজার কথা অনুযায়ী মাসা ট্রাইবের শমনদের কাছে অতিপ্রাকৃত কিছু শক্তি আছে। তা ব্যবহার করে এরা এই অরণ্যের গাছপালা, জন্তুজানোয়ারের সঙ্গে কথা বলে, তাদের আগলে রাখে। বিনিময় অরণ্যও তাদের রক্ষা করে। ওংপুনিধুপিয়ার জঙ্গল এমনিতেই নিবিড়, এত ছাড়াছাড়া নয়, কোনও পায়ে হাঁটা ট্রেল নেই। তারপর শোনা যায়, মাসা ট্রাইবের একজন… কী বলব,‘স্পিরিট ওয়ারিয়র’ আছেন, তিনি বনদেবীর রূপ ধরে তাদের শত্রুদের হাত থেকে রক্ষা করেন। সত্যি না গুজব, সে সব পরের কথা! কিন্তু টিলুবাবুকে নিয়ে এমন বিপজ্জনক জায়গায় যাওয়া কি ঠিক হবে? ও বরং এখানেই থাকুক রিওর সঙ্গে, আমরা ইনাওকে নিয়ে ঘুরে আসি। কী বলিস?”
সপ্তর্ষি চুপ করে গেল। টিলু অবশ্য চুপ করল না। সে হাতের মুঠো পাকিয়ে চোখ গোল্লাগোল্লা করে তোপার দিকে তাকাল, তারপর ফুঁসে উঠে বলল, “আমি যাবই। আমি যাবই যাবই যাবই যাব।”
সপ্তর্ষি একবার অসহায় ভঙ্গিতে টিলুর দিকে, তারপর তোপার দিকে তাকাল। তারপর হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, “বেশ, টিলু বলছে যখন, ও চলুক আমাদের সঙ্গে। বিপদ যদি হয়, সকলে একসঙ্গে মিলে মোকাবিলা করা যাবে।”
তোপা একগাল হেসে টিলুর দিকে চাইল। সে জানত, সপ্তর্ষি ছেলের কথা ফেলতে পারবে না। তাছাড়া, সপ্তর্ষির পরিবারের সকলেই অন্য ধাতুতে গড়া, তারা অত তাড়াতাড়ি মনের জোর হারিয়ে ফেলে না। বিপদের সামান্য আশংকা দেখলেই পিছিয়ে আসা বা অল্পবয়সীদের প্রতি পদে নিষেধ করার স্বভাবও তাদের নেই।বিদেশে তো বটেই, এইসব পাহাড়ি অঞ্চলেও বাচ্চাদের অত পুতুপুতু করে রাখা হয় না। তোপাও ছোটোবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে বনেবাদাড়ে ঘুরে গাছপালা চিনেছে, নদীতে সাঁতার কেটেছে, তাঁবুতে থেকেছে, তার বন্ধুরাও একইভাবে বড়ো হয়েছে, আত্মনির্ভর হয়ে উঠেছে এভাবেই। সপ্তর্ষি নিজেও বেশ ডেয়ারডেভিল গোছের ছেলে, ভয়ডর কম। রিও গ্রান্দে নদীতে কায়াকিং করতে যখন সে নিউ মেক্সিকো গিয়েছিল, তখন তার সঙ্গে অ্যাডেলিনের দেখা। অ্যাডেলিন তখন প্রায় সাড়ে সাতশো মাইল হেঁটে আরিজোনা থেকে নিউ মেক্সিকো পৌঁছেছে, যা আমেরিকায় গ্রেট এনচ্যান্টমেন্ট ট্রেল বলে জনপ্রিয়। এরকম বাবা মা-র ছেলে যে সাহসী হবে, তাতে আর অবাক হওয়ার কি আছে?
১০
আধশোয়া হয়ে পাথরের ওপর শুয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল টিলু। বাদলা দিন, গুড়গুড় করে বিদ্যুত ডাকছে, হালকা লালের ওপর বেগুনি ছোপছোপ মেঘগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে বিশাল বিশাল খোক্ষসের মতো। একঝাঁক টিটি পাখি উড়ে গেল খুব নীচ দিয়ে। সেদিকে তাকিয়ে আচমকা টিলুর মনে হল, আচ্ছা, খোক্ষস কথাটাই মনে পড়ল কেন? মেঘগুলো খোক্ষসের মতো! রাক্ষসও তো হতে পারত! কিন্তু টিলুর আবার ছোটোবেলা থেকেই রাক্ষসের চেয়ে খোক্ষসের প্রতি বেশি টান! টিলু চোখ বন্ধ করে ভাবল, তাই তো! রাক্ষস খোক্ষস তো একসঙ্গেই বলা হয়, তাহলে তার খোক্ষসকে বেশি পছন্দ কেন? খোক্ষস একা নয়, বাঘ-ভাল্লুকের মধ্যে তার ভাল্লুক বেশি প্রিয়, আম-জামের মধ্যে জাম বেশি পছন্দের, রামের চেয়ে লক্ষণ আর ডোরেমনের চেয়ে নোবিতা তার চিরকালের ফেভারিট। কেন? টিলু ভেবে ভেবে হাল ছেড়ে দিল। ধুত, মাথাটাই গরম হয়ে গেল! সে ভুস করে পাথর থেকে নেমে জলের মধ্যে ঢুকে পড়ল, তারপর নদীর জলে বুক ডুবিয়ে তোপার শিখিয়ে দেওয়া গানের সুর গুনগুন করতে লাগল।
এখন দুপুরবেলা। হাঁড়িতে খিচুড়ি চাপানো হয়েছে, তার আগে সবাই বেশটি করে নদীতে স্নান করে নিচ্ছে। জঙ্গলের নদীতে স্নান করায় এমন মজা, আগে কি সে জানত? ছায়াচ্ছন্ন বনের ভিতর দিয়ে ভেসে চলা এমন সব মন ভালো করা নদী, দেখেই ইচ্ছে করে জলে নেমে পড়ি। সুযোগ পেলেই তারা নদীতে স্নান করে নেয়, আজও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকাল সকাল মংদলকুকো থেকে বেরিয়ে প্রায় ঘণ্টা পাঁচ হাঁটতে হয়েছে, রোদের তাপে ঘেমেনেয়ে গিয়েছিল সবাই। জঙ্গলে ঢুকে পড়ার পর অবশ্য রোদ কমেছে, কিন্তু হাঁটার ক্লান্তি তো আর উধাও হবে না। এমন সময় হঠাৎ চোখের সামনে চলে এল এই নদী। নদী তো নয়, দুরন্ত একটা ছাগলছানা যেন! লাফিয়ে লাফিয়ে পাথরের ওপর দিয়ে চলেছে। নদীর দেখা পেয়েই সবাই চাঙ্গা হয়ে উঠল, ঝটপট বোঁচকাবুঁচকি ফেলে কাঠকুঠ জমিয়ে আগুন জ্বালিয়ে খিচুড়ি চাপিয়ে দেওয়া হল, তারপর ঘেমো জামা ছুঁড়ে ফেলে নদীর ঠান্ডা জলে নেমে পড়ল সবাই। যা হুজ্জুতি গেছে, মিনিট কুড়ি স্নান না করলে চলে?
টিলু এখন দিব্যি পাহাড়ি নদীতে স্নান করতে শিখে গেছে, প্রথমে সে একটু ভয় ভয় পেত। ডুবুক ডুবুক করে হাঁস বা বকের মতো ডুব দিয়ে কিছুক্ষণ সোনালি পাথরের ওপর শুয়ে থাকো, গায়ে নরম রোদ্দুর মেখে মৌজ করে কমলালেবু আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকো। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, আকাশের গা থেকে পাকানো সুতোর মতো স্বর্ণলতার ঝুরি নেমে এসেছে, হাতের নাগালে পেলে তাতে দোল দেওয়া যায়। কিন্তু আসল মজাটা হয় জলের নীচে তাকালে। ঝাঁকে ঝাঁকে রঙিন মাছ সাঁতরে যায়, এইটুকু-টুকু কাঁকড়া বা ব্যাঙ-এর ছানারা লুকিয়ে থাকে রং ঝিলমিল শ্যাওলা বা রেশমি বুটি কাটা গুল্মলতার আড়ালে,মাঝেমাঝে মুখ বের করে ‘টুকি’ করেই পালিয়ে যায়। পাহাড়ি নদীর বাঁকে বাঁকে আবার মাছরাঙার মতো শিকারী পাখি ওত পেতে থাকে, স্রোতের ধাক্কায় মাছ লাফিয়ে উঠলেই ক্যাঁক করে কামড়ে সোজা পেটে, সে এক দেখার জিনিস বটে।
কিন্তু টিলুর সবচেয়ে ভালো লাগে ছোটো ছোটো মিষ্টি জলের হ্রদ বা লেগুনগুলো। কাকচক্ষু জল টলমল করে সেখানে। শান্ত, কোমল, নিঃঝুম। সে জলে স্রোত নেই, কিন্তু জলের রং কি সুন্দর! নীলচে গোলাপি জলের ওপর পাতার জাফরি চুঁইয়ে রোদ আসে, মাথার ওপর থেকে ঝরে পড়ে ছোটো ছোটো ফুল। অগভীর গোলাপি জলের ওপর জলপাই রঙের পদ্মফুল ফুটে থাকে, পদ্মপাতার ওপর গা এলিয়ে বসে থাকে বাদামি কচ্ছপরা, স্থলপদ্ম আর আগরগাছের পাতায় শুয়ে থাকে শামুক-ঝিনুক বাহিনী,ছায়াঘন জলের গা ছুঁয়ে ওড়াউড়ি করে জলপতঙ্গের দল। হ্রদের ঠিক পাশে অজস্র বুনোফুলের ঝোপ, ফুলে বোঝাই হয়ে থাকে সেগুলো। আর আছে ব্যাঙের ছাতা। কত রকমের ব্যাঙের ছাতা যে এতদিনে টিলু দেখল। একতলা, দোতলা, চারতলা মহলের মতো এক একটা ছাতা, কী তাদের বাহার! ব্যাঙের ছাতা নয়,আসলে বলতে হয় ব্যাঙের প্রাসাদ। কত কত ঘর সেখানে, মাথার ওপর খিলান লাগানো ছাদ, সেখানে হলুদ কালো নকশা আঁকা। মনে হয়, ভেজা মাটির ওপর একটা ছোট্ট ডিজনিল্যান্ড। ফুলগাছের আলটুসি আদর খাওয়া ব্যাঙের ছাতার রূপ দেখে মোহিত হয়ে জলের দিকে চেয়ে থাকে টিলু। মিষ্টিগুড়ের মতো ফুলের গন্ধ জঙ্গলের বুনো গন্ধের সঙ্গে মিশে গিয়ে নেশা ধরায়, পিঁপড়ে কামড়ালেও বোঝা যায় না তখন। টিলু তো দূর, টং আর লিংও এখানে এলে ভৌ ভৌ করা ছেড়ে চোখ বন্ধ করে ফেলে। টিলু মাঝে মাঝে ভাবে, এরকম করেই যদি কাটত! দাদুর কি মজা! শহরে থাকলে কি এসব দেখা যায়?
আজ রান্নার ভার সপ্তর্ষির। রিও আর ইনাওকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারা কিছু না কিছু রান্না করবেই। কোত্থেকে যেন বাদামি রঙের মাশরুম নিয়ে এসেছে,সেগুলো ভেজে লঙ্কার আচার দিয়ে মেখে নিয়েছে তারা। এদিকে সপ্তর্ষি আজ খাঁটি বাঙালি খিচুড়ি করবে বলে বাতেলা দিয়েছিল, কিন্তু রান্না করতে গিয়ে দেখা গেল,পাঁচফোড়ন, তেজপাতা, গোটা এলাচ, কিছুই নেই। ফলে বাঙালি ভুনি খিচুড়ি শেষমেশ জংলি ভূতি খিচুড়ি হয়ে গেল, কিন্তু খাওয়ার সময় টিলু বুঝল, সেটার টেস্ট কিছু কম হয়নি। টক ঝাল মাশরুম দিয়ে ভরপেট খিচুড়ি খেয়ে আর কারোরই নড়াচড়ার ক্ষমতা রইল না, ঠিক হল কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার পথ চলা শুরু হবে।
তোপা টিলু আর ইনাওকে মাসা উপজাতির ছবিগুলো আঁকার কাজ দিয়েছে। অন্তত কয়েক কপি ছবি সঙ্গে থাকা দরকার। হাতে আঁকতে গেলে অনেক সময় সূক্ষ্ম কিছু জিনিস ধরা পড়ে, যা এমনিতে চোখ এড়িয়ে যায়। সুযোগ পেয়ে টিলু ছবিগুলো আঁকতে শুরু করল। আঁকতে আঁকতে সে বলল, “বাবা!”
“হুঁ!” সপ্তর্ষি চোখ না খুলেই বলল।
“দাদু মাসা উইজার্ডদের খুঁজতে চাইছিল তো!”
“হুঁ!”
“কিন্তু তাহলে দাদু বেগুন রাজার কাছে গেছিল কেন? বেগুন রাজা তো কোনোদিন মাসাদের দেখেইনি।”
টিলুর কথা শুনে সপ্তর্ষির বিষম লাগে আর কি! হাসতে হাসতে সে বলল, “ওরে বেগুন নয় রে বোকা, বুগুন! বুগুন একটা ভাষা। আর বেগুন কী সেটা নিশ্চয়ই তোকে বলে দিতে হবে না!”
টিলু বেজায় রেগে বলল, “ওই হল! কিন্তু বুগুন রাজাও তো জাদুগর, আর মাসারাও জাদুগর! তাহলে দাদু মাসাদের খোঁজার জন্য এত উতলা হয়ে কাউকে না বলে চলে গেল কেন? ওরা কি সত্যি সত্যিই কোনও গুপ্তধনের খোঁজ জানে?”
সপ্তর্ষি হেসে টিলুর দিকে তাকাল। টিলু জানে তার বাবা আর দাদু অচেনা ভাষা নিয়ে কিছু কাজকর্ম করে, কিন্তু একটা হারিয়ে যাওয়া ভাষার মর্ম উদ্ধার করার জন্য এত ছুটোছুটি হচ্ছে কেন, আট দশ বছরের ছেলের মনে এরকম একটা প্রশ্ন আসা অস্বাভাবিক নয়! এগুলো নিয়ে বড়োরা মাথা ঘামায় না বটে, কিন্তু আসলে এই ছোটো ছোটো প্রশ্নগুলোর গুরুত্ব কম নয়। তার মনে পড়ল, ছোটোবেলায় এরকম নিরীহ প্রশ্ন করে করেই সে অনেক বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠেছিল।
সপ্তর্ষি উপুড় হয়ে শুয়ে সামনে দুই হাত ভাঁজ করে কনুইয়ের ওপর ভর রেখে বলল, “গুপ্তধন তো গল্পে হয় রে টিলু! দাদু মাসাদের খুঁজতে গেছে তাদের ভাষাটা বোঝার জন্য।”
“কেন?” টিলুর সহজ প্রশ্ন।
“কেন?” সপ্তর্ষি একটু চিন্তার ভঙ্গি করে বলল, “সেটা বোঝানো তো মুশকিল মিস্টার পটার। আসলে, মানুষের যত কারবার সব ভাষা নিয়ে কিনা। সত্যি বলতে, এর চেয়ে বড়ো গুপ্তধন আর হয় না। ভাষার মধ্যেই তো সব গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। হ্যারি পটারকেই ধর, ভাষা না হলে তো সে বইটা লেখাই যেত না। গান, গল্প, সিনেমা, রেডিও, ইতিহাস, বিজ্ঞান, ছড়া, কিছুই হত না, আমরা কথা বলতেও পারতাম না। এইবার ভাব, ইংরেজি ভাষাটা যদি কয়েক হাজার বছর পর লোপাট হয়ে যায়, ইংরেজি বই, সিনেমা, গান, কিছুই না থাকে, লোকে ইংরেজি বলা ভুলেই যায়, এবিসিডিও আর কারো মনে না থাকে, তাহলে হ্যারি পটারের কথা কেউ জানতে পারবে কি? তুই আর আমি যে ওই বই পড়ে এত লাফালাফি করলাম, সিনেমা দেখলাম, কুইজ খেললাম, সে সব কেউ মনে রাখবে না। লক্ষ লক্ষ মানুষ এই ভাষায় কথা বলেছে, গল্প বানিয়েছে, গান করেছে, সব বেমালুম লোপাট হয়ে যাবে। বাংলা ভাষাটা হারিয়ে গেলেও কী মুশকিল হবে বল তো? তোর প্রিয় হলদে পাখির পালক গল্পটার কথা কেউ জানতেও পারবে না, বাংলা ভাষায় লেখা বা বলা কোনও কিছুরই অর্থ উদ্ধার করার উপায় থাকবে না।”
“কিন্তু এই ভাষাগুলো হারিয়ে যাবে কেন?” টিলু বলে উঠল, “কত লোকে তো এই ভাষায় কথা বলছে!”
“সে তো এখন বলছে!” সপ্তর্ষি হাসল, “দাদু যে মাসাদের ভাষা নিয়ে এত পড়াশোনা করছিল, একসময় লক্ষ লক্ষ লোক সে ভাষায় কথা বলত। কিন্তু এখন আর কাউকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। হতে পারে তাদের ভাষায় হ্যারি পটার বা হলদে পাখির পালকের মতো গল্প ছিল, ব্রুনো মার্স বা অরিজিৎ সিংয়ের মতো গান ছিল, হয়তো তারা গিটারের জায়গায় অন্য কোনো ইনস্ট্রুমেন্ট বাজাত, মাশরুমের মোরব্বা বানাত, চুলকুনির মলম আবিষ্কার করেছিল কিংবা মন্ত্র পড়ে বৃষ্টি নামাত… আমরা তো কিছুই জানি না। হতে পারে একশো বছর আগে মাসাদের মধ্যে একজন টিলু ছিল, তার বাবা তাকে এরকম করে গল্প বলত, ভাষাটা হারিয়ে গেলে তাদের কথা কি আর জানা যাবে? এরকম কত কত ভাষা হারিয়ে গেছে জানিস!”
এইবার টিলুর চোখে আশঙ্কার মেঘ দেখা গেল। সে মুখ নিচু করে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “এখানে কতরকম ভাষা আছে?”
“এই প্রশ্নটা দারুণ করেছিস।” সপ্তর্ষি তারিফের ভঙ্গিতে বলল, “দাঁড়া, তোর তোপা ভাইকে জিজ্ঞেস করে দেখা যাক! ও একদম সঠিক বলতে পারবে।”
তোপা প্রায় ঘুমিয়েই পড়েছিল, টিলুর ঠেলা খেয়ে সে চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল। ঘুম ঘুম চোখে বলল, “কী হয়েছে টিলুবাবু? ছবি আঁকা হয়ে গেল?”
“রাখ তোর ছবি।” সপ্তর্ষি রাগ দেখিয়ে বলল, “টিলু একটা ভয়ানক জটিল কোয়েশচন করেছে। তোকে উত্তর দিতে হবে। না দিতে পারলে পয়েন্ট কেটে নেব।”
সপ্তর্ষির কাছে ব্যাপারটা শুনে তোপার মুখে হাসি খেলল। সে হাই তুলে লম্বা চুলে আঙুল চালিয়ে বলল, “ও অনেক জটিল হিসেব টিলুবাবু। কানে পোকা ঢুকে যাবে।”
টিলু ছাড়ার পাত্র নয়। সে রেগেমেগে বলল, “না বললে তোমার চুলের মধ্যেই পোকা ছেড়ে দেব কিন্তু। তখন বুঝবে!”
তোপা বিস্ফারিত চোখে সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর ছেলেকে তো শান্তশিষ্ট ভেবেছিলাম রে! এ তো মহা গুণ্ডা! ঠিক তোর মতোই মিটমিটে বদমাইশ হয়েছে। শান্ত সেজে থাকে, ভিতরে ভিতরে ফন্দি আঁটছে।”
“তাহলেই বোঝ!” সপ্তর্ষি কান চুলকাতে চুলকাতে বলল, “চুলের মায়া থাকলে দেরি না করে উত্তর দিয়ে দে!”
তোপা উঠে গিয়ে নদী থেকে মুখে জল দিয়ে এল, তারপর বাবু হয়ে বসে বলল, “শুধু একবার কিন্তু! টিলুবাবু, মনে না থাকলে লিখে ফেলো। এখানে বলতে এই বনপাহাড়ের দেশে ঠিক ক’টা ভাষা আছে বা ছিল, সে কথা কেউই ঠিকঠাক বলতে পারবে না। কিন্তু যে সমস্ত ভাষা এখানে আছে, তাদের উৎসকে চারটে ভাগে ভাগ করা হয়েছে। টিবেটো-বার্মান, অস্ট্রো-এশিয়াটিক, তাই কাদাই আর ইন্দো-ইউরোপিয়ান। মিশমি আর কিছু খিচুড়ি ভাষার ইতিহাসও আছে, সে সব বাদ দাও। এখানকার সব ভাষাই এসেছে এই চারটে ল্যাঙ্গুয়েজ ফ্যামিলি থেকে। এইবার বহুল প্রচলিত ভাষা ছাড়া যে সমস্ত ভাষা নিয়ে তোমার দাদু আর আমি মাথা ঘামাতাম, সেগুলোর নাম তানি, নাগা, বোদিশ, বোদো-গারো, কুকি চিন, কার্বি, লোলো বার্মিজ, মুন্ডা, তাই, ইদু, তাওরা, মেই, বুগুন, সিয়াঙ্গিক, পুরোইক, মিজি, রুসো, কোরো, কমান… এই প্রতিটা ভাষা আবার কম করে চল্লিশ থেকে পঞ্চাশটা উপভাষায় ভেঙে গিয়েছে, তার কয়েকটা এখনও বলা হয়, বেশিরভাগই হারিয়ে গিয়েছে, কিছু কিছু ভাষা কয়েকজন মানুষের মধ্যে টিকে আছে। মোটামুটি আন্দাজে বলতে পারি, ছোটোখাটো ডায়ালেক্ট বাদ দিলেও এখানে প্রায় পাঁচশোটা ভাষা তো আছেই, তার নব্বই শতাংশই অবশ্য অজানা রয়ে গেছে। সে অবশ্য নতুন কিছু নয়। প্রচলিত মতে দুনিয়াতে সাত হাজারটা ভাষা আছে, তার মধ্যে প্রায় ছশোটা ভাষা লুপ্ত হয়ে গিয়েছে, আসলে সেই সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। প্রতি মাসে দুটো থেকে তিনটে ভাষা চিরতরে হারিয়ে যায় পৃথিবী থেকে। ওই যে দেখলে বুগুন রাজা, ও আর ওর ছেলে মারা গেলে বুগুন শমনদের ভাষাটাও একেবারে হারিয়ে যাবে।”
টিলুর মুখ হাঁ হয়ে গেছে। পৃথিবীতে এত এত চিরতরে ভাষা হারিয়ে গিয়েছে, হারিয়ে যাচ্ছে, সেটা সে কল্পনা করতে পারেনি। বাবার কথাটা তার বুকের মধ্যে বাজছে। একটা ভাষা হারিয়ে গেলে তার সমস্ত গল্প হারিয়ে যায়। তার মানে, এতগুলো ভাষার সঙ্গে তাদের কত কত অজানা গল্প হারিয়ে গিয়েছে! সে সব তারা কোনোদিনই জানতে পারবে না। বুগুন রাজার কথাও হারিয়ে যাবে? এই কঠোর সত্যিটা মেনে নিতে তার কষ্ট হচ্ছে, বুকটা ফাঁকা ফাঁকা লাগছে। সে কোনও কথা বলতে পারল না।
সপ্তর্ষি উঠে গিয়ে তার পিঠে হাত দিয়ে বলল, “এইবার বুঝেছিস তো, দাদু কেন এত উতলা হয়ে মাসাদের খোঁজে গিয়েছে? বুগুন রাজার মতো হয়তো মাসাদের কাছেও বিশেষ সময় নেই। দু চারজন ছাড়া ওই ভাষা কেউ জানে বলে মনে হয় না। মাসা শমনদের ওই ভাষা বলার মানুষ যদি বেঁচেই না থাকে, তাহলে ভাষাটাকেও আর বাঁচানো যাবে না।”
টিলুর বুকটা মুচড়ে উঠল। চোখের জল চাপতে গিয়ে সে বুঝল, তার চোখ জ্বালা করছে না। আজ তার সত্যি সত্যিই কান্না পাচ্ছে।
১১
বৃষ্টিটা শুরু হল দুপুরে।
কাল বিকেল থাকতেই ওংপুনিধুপিয়ার জঙ্গলে ঢুকে পড়েছিল তারা। কিন্তু সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছিল বলে খুব একটা দূরত্ব অতিক্রম করা যায়নি, তাড়াতাড়ি টেন্ট লাগিয়ে রাত্রিবাসের বন্দোবস্ত করা হয়েছিল। আজ সকালবেলা ফের হাঁটা শুরু হয়েছে। ক্রমে তারা বনের আরো গভীরে ঢুকে পড়েছে। যত হাঁটে, টিলু ততো অবাক হয়। মনে হয়, একটা জ্যামিতিক গোলকধাঁধার মধ্যে ঢুকে পড়েছে সে। একটু মন দিয়ে দেখলেই গাদা গাদা গোল্লা, ত্রিভুজ, চতুষ্কোণ, চোঙা বেলন, শঙ্কু, পিরামিডের মতো আকৃতি দেখা যায়, সে সবই আসলে প্রকৃতির তৈরি। ডোরাকাটা সাদাকালো শেডের গাছ আর পপিন্স কালারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ ছাড়া আর যে জিনিসটা প্রথমেই নজরে আসে, সেটা হল মাটির বড়ো বড়ো ঢিবি, বাবা বলছে পিট অ্যান্ড মাউন্ড, আর সেখানে গজিয়ে ওঠা উজ্জ্বল লাল নীল বেগুনি রঙের ছত্রাকের জাল। এই ছত্রাকের জাল বা ফাংগাল নেট এই জঙ্গলের অনেক জীবজন্তুকে খাবার সরবরাহ করে, এদের সূর্যের আলোর প্রয়োজনও বিশেষ হয় না। কিন্তু লতাপাতা গুল্ম গজানোর জন্য কিছুটা হলেও রোদ্দুর চাই, সেইজন্যই হয়তো বুড়ো গাছদাদুরা তাদের ঝাঁকড়া চুল সরিয়ে মাঝে মাঝে ‘ওপেন ক্যানোপি’ বানিয়ে ফেলেছে, সেখান থেকে রসনার মতো খানিকটা রোদ্দুর ছলকে ছলকে আসে। বাইনোকুলারের সাহায্যে দূরে একটা উঁচু জায়গাও দেখা গিয়েছে, সেখানে মনে হয় কয়েকটা গুহা ফুহা আছে। মোদ্দা কথা, এরকম জায়গা তারা কেউই আগে দেখেনি। দেখেশুনে টিলুর মতো তার বাবাও হাঁ হয়ে গিয়েছে, মাঝেমধ্যেই ক্যামেরা বের করে টপাটপ ছবি তুলছে।
এ জঙ্গলটা হল যাকে বলে ওল্ড গ্রোথ ফরেস্ট, লক্ষ লক্ষ বছর ধরে জায়গাটা একইরকম থেকে গিয়েছে। মানুষের অনুপ্রবেশ তো দূরস্থান, কয়েক হাজার বছরে এ অঞ্চলে দাবানল বা ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ও ঘটেনি বলে মনে হয়। ফলে এখানকার গাছপালা, লতাপাতা, ঝোপঝাড় আর মাটির মধ্যে একটা আদিম ভাব আছে, যার সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের টপোগ্রাফির কোনও মিল নেই। এরকম নিবিড় নিসর্গের অনুভূতি নিতে নিতে অরণ্যের ভিতর পথ চলার কথা ভাবলে মনে রোমাঞ্চ হয় সন্দেহ নেই, কিন্তু বাস্তবে এই কাজটা অসম্ভব কঠিন। এই জঙ্গলে কোনও রাস্তা বা শুঁড়িপথ নেই, মৃত গাছের ইয়া বড়ো বড়ো গুঁড়ি যেখানে সেখানে উল্টে পড়ে আছে। পথ রোধ করে দাঁড়ায় উল্টানো আইসক্রিম কোণের মতো উইপোকার ঢিবি বা পাহাড়প্রমাণ পিঁপড়ের বাসা, সেগুলোর সাইজ দেখলে গায়ের রোম দাঁড়িয়ে যায়। মিনি এভারেস্ট এক একটা। পায়ের তলার মাটি সর্বদাই নরম,পচা ফল আর পাতা পড়ে পড়ে চোরাবালির মতো হয়ে গিয়েছে, মাঝে মাঝে হুসহাস করে পা ভিতরে ঢুকে যায়। এক একটা গাছের কাণ্ড প্রায় কুড়ি হাত চওড়া, তাদের ওপর পুরু শ্যাওলার পরত, সেখানে বাসা বেঁধে আছে নানারকম পোকামাকড়, মাকড়শা। এসব খুব একটা বিষাক্ত নয় বটে, কিন্তু চোখের আড়ালে যে রাক্ষুসে মশারি খাটিয়ে রেখেছে স্পাইডিরা, সেখান থেকে মাথার ওপর টুপটাপ মাকড়শা ঝরে পড়লে যে পথভ্রমণ খুব একটা সুখকর হবে না, সে বলাই বাহুল্য! টং আর লিং বাঘ সিংহ দেখে ডরায় না হয়তো, কিন্তু মাকড়শা দেখলে এই মানিকজোড় ভয়ে কাঠ হয়ে যায়, লেজ দাঁড়িয়ে যায় দুজনেরই। দু একবার মাকড়সার মুখোমুখি হয়ে তাদের ভয় আরো বেড়ে গেছে, এখন বেচারিদের হাল টিনটিনের উল্কা রহস্যের কুট্টুসের চেয়েও শোচনীয়। অন্যদের অবস্থাও তথৈবচ। দু পা গিয়েই হা হা করে নিশ্বাস নিচ্ছে সবাই। কাটারি হাতে ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে হাঁটতে গিয়েই জিভ বেরিয়ে যাচ্ছিল, এর পর বিকেলের দিকে শুরু হল বৃষ্টি।
বৃষ্টি বলে বৃষ্টি, যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে। মুহূর্তের মধ্যে পায়ের তলাটা নদী হয়ে গেল, ভয়ঙ্কর সব শব্দ শোনা যেতে লাগল। ধুপধাপ, দড়াম দুড়ুম। এমন মুষলধার বৃষ্টির মধ্যে এগোনো যায় না, হড়কা বান আসার বিপদ আছে, কিন্তু যেখানে সেখানে ক্যাম্প লাগানোর মতো জায়গাও এ নয়। অনেক খুঁজে খুঁজে একটা একটা পাথরের চাতাল পাওয়া গেল, চড়াই ভেঙে খানিকটা উঠে গেলে খানিকটা শুকনো জায়গা, বড়ো বড়ো পাথরের বোল্ডার সেটাকে ঘিরে রেখেছে বলে মাথা গোঁজা যায়। জঙ্গলের মধ্যে এরকম কিছু কিছু পাথুরে জায়গা থাকে, বড়ো বড়ো পাথরের চাঁই আর মাটির শক্ত হয়ে টিলার মতো এক একটা আকৃতি তৈরি হয়ে যায়, মাঝেমধ্যে ছোটোখাটো গুহাও থাকে। প্রকৃতির খেয়াল! এটাও সেরকম একটা জায়গা। কিন্তু ওইটুকু জায়গায় দুটো তাঁবু খাটানো অসম্ভব, বড়ো তাঁবুটা খাটিয়ে গুজুমুজু হয়ে সেটার ভিতর ঢুকে পড়ল সবাই। ততক্ষণে সবাই ভিজে কাদা, ল্যাজে গোবরে অবস্থা বোধহয় একেই বলে। টংলিংকেও আর বাইরে থাকতে দেওয়া হয়নি। ফোর ম্যান টেন্ট, শোয়ার মতো না হলেও সকলের বসার মতো জায়গা আছে অন্তত, এরই মধ্যে অদ্ভুত দক্ষতায় স্পিরিট ল্যাম্প জ্বেলে কফি বানিয়ে ফেলল রিও, ব্যাগ থেকে শুকনো নিমকির টিন আর শুকার উপহার দেওয়া ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুটও বের করা হল। ভিজে জামা ছেড়ে সবাই খালি গায়ে বসে সেই কফি আর বিস্কুট খেতে লাগল।
সপ্তর্ষি কফিতে চুমুক দিয়ে ন্যাতানো গলায় বলল, “বোকামি হয়ে গেছে বুঝলি! এখানে এসে কিচ্ছু লাভ হল না।”
তোপারও তাই মনে হচ্ছে এখন। এইরকম জায়গায় মানুষ থাকতে পারে না, সে যত বড়ো শমন গোষ্ঠীই হোক না কেন! তারা আসলে অন্য কোথাও ঘাঁটি গেড়েছে, স্যারও হয়তো সেখানেই গিয়েছেন। কিন্তু শমন রাজার কথা এতটা ভুল হবে? মাসা ট্রাইবের লোকজন কি ইতিমধ্যেই হারিয়ে গিয়েছে? তবে এখন এসব ভেবে লাভ নেই। যা হওয়ার সে তো হবেই।
ইনাও টিলুর মাথা মুছিয়ে দিচ্ছিল। খাবলাখোবলা ভেজা চুল, নাকের ওপর সবুজ ফ্রেমের মোটকা চশমা, খালি গা, পরনে একটা মিকি মাউস আঁকা প্যান্টুলুন, টিলুর অবস্থা দেখে সপ্তর্ষি আর তোপা না হেসে পারল না। রিও হাসতে হাসতে তার শেখা বেস্ট হিন্দিতে বলল, “টিলুবাবু বরসাত কে বাড বাবুরাও আপ্টে বান গিয়া!” সে শুনে সকলের সে কি হাসি! টিলুর অবশ্য আয়নায় নিজেকে দেখে মন্দ লাগল না, সে টংলিং এর পাশে পাশে বসে চুক চুক করে গরম কফি খেতে লাগল। কুকুরছানা দুটোকেও বাটিতে করে কফি দেওয়া হয়েছে, আর সেটা যে তারা বেশ মৌজ করে খাচ্ছে সেটা তাদের মুখ দেখলেই বোঝা যায়।
হাসিঠাট্টা অবশ্য বেশিক্ষণ চলল না। সবাই গোল হয়ে বসে আলোচনা শুরু করল একসময়। এরপর কী করা হবে? শমনদের গ্রাম তো আকাশের চাঁদ, এখানে তো লোকবসতির কোনও চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি বাইরের কোনও লোক যে এই জঙ্গলে, তেমনটাও মনে হচ্ছে না। না হলে কাটারি দিয়ে পথ তৈরি করার সামান্য ইঙ্গিত অন্তত পাওয়া যেত। সীমিত রেশন নিয়ে, অনির্দিষ্ট ভাবে বেশিদিন এভাবে পথ চলা যায় না। ভেবেচিন্তে ঠিক করা হল, তিনদিনের মধ্যে কিছু না পেলে তারা ফিরে যাবে।
বাইরে বৃষ্টি একটু ধরেছে দেখে রিওরা ঠিক করল, আগুন জ্বালিয়ে তাড়াতাড়ি রান্না সেরে নেওয়া যাক। কখন আবার বৃষ্টি শুরু হবে, তার ঠিক নেই। অন্ধকার নামতে দেরি নেই, চটপট খেয়ে তাঁবুতে ঢুকে পড়তে হবে। তারা বাইরে চলে যেতে সপ্তর্ষি তোপাকে বলল, “ব্যাপার কী বল তো? আমাদের সত্যিই ভুল হল?”
“হুম!” তোপা ভুরু কুঁচকে বলল, “শমন রাজা একদম আউট অফ দ্য ব্লু আমাদের ওংপুনিধুপিয়ার কথা বলবেন বলে আমার বিশ্বাস হচ্ছে না। পুরোটাই উড়ো খবর হলে তিনি কিছুই জানাতেন না। এলইডির প্রধান ফান্ডাই হল, সিমিলার অকুপেশনে যে গোষ্ঠী সবচেয়ে কাছে বসবাস করে, তাদের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর স্যার তো এই কাজটা নতুন কাজ করছেন না, ওর মতো যুক্তিবাদী মানুষ আর ক’টা হয়? সাপোর্টিং এভিডেন্স না থাকলে উনি ঘর থেকে বেরোতেনও না, বুগুনদের গ্রামেও যেতেন না।”
“তাহলে?” সপ্তর্ষি গাল চুলকে বলল, “আমরা কিছু মিস করছি না তো?”
তোপা একটা শুকনো টিশার্ট গায়ে চাপিয়ে নিয়ে বলল, “শমন রাজা যে ওংপুনিধুপিয়া অঞ্চলের কথাই বলেছেন, সেটা নিয়ে আমার সন্দেহ নেই। কিন্তু মাসা ট্রাইব যদি ইতিমধ্যে এ অঞ্চলটা ছেড়ে চলে গিয়ে থাকে…”
তোপা কথাটা শেষ করল না। টিলু আজকাল খুব গম্ভীর হয়ে এই সমস্ত আলোচনা শোনে, সেদিন পাথরের ওপর ছবি আবিষ্কার করার পর ভাষাতত্ত্ব নিয়ে তার আগ্রহও বেড়েছে। বিস্কুট খেতে খেতে সে বলল, “এলইডি কী? এলইডি মানে তো লাইটের বাল্ব!”
তোপা প্রথমে চমকে উঠল, তারপর চোখ নাচিয়ে বলল, “সপু স্যার, ছেলেকে এলইডি কী বুঝিয়ে দিন দেখি!”
সপ্তর্ষি আড়মোড়া ভেঙে শিরদাঁড়াটা সোজা করে নিল, তারপর ছেলেকে যতটা সম্ভব সহজ ভাষায় ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করল। সে একসময় কিছুটা শিক্ষকতা করেছে, জটিল জিনিসকে সহজ করে বোঝানোর গুণটা তার সহজাত।
প্রাচীন ভাষার বিচ্ছিন্ন টেক্সট বা ছেঁড়া পুথির ওপর নির্ভর করে সে ভাষার উৎস সন্ধান করা এমনিতেই মুশকিল। বিশেষ করে লুপ্তপ্রায় অথবা পুরোপুরি হারিয়ে যাওয়া ভাষার রহস্য উদ্ঘাটন আর পুনরুদ্ধারের প্রজেক্টগুলো ঠিকঠাক ভাবে বাস্তবায়িত করা তো প্রায় গুপ্তধনের সন্ধান পাওয়ার মতোই কঠিন। সেক্ষেত্রে দেখা যায়, শুধু উপজাতির মানুষের সঙ্গে সাক্ষাৎকারের রেকর্ডিং আর সেই রেকর্ডিং শুনে তাদের ভাষা সম্পর্কিত নতুন তথ্য নোট করে রাখা, ওইটুকু করে আসলে কাজের কাজ কিছুই হয় না। ভাষাবিজ্ঞান আর গোষ্ঠীর ইতিহাস এখানে একে অপরের সঙ্গে এমন ভাবে জড়িয়ে থাকে, যে একটার রহস্য উদ্ধার না হলে অন্যটার কিনারা হয় না। ফলে ফিল্ড নোটসে কথ্য ভাষার বৈশিষ্ট লিখে রাখার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার যাবতীয় তথ্য লিপিবদ্ধ করে রাখা দরকার হয়ে পড়ে। এই তথ্যগুলো আসলে ভাষাবিজ্ঞানের অংশ নয়, বরং ব্যাপারটা জাতিতত্ত্ববিদ্যা অর্থাৎ এথনোগ্রাফির আওতায় পড়ে। কিন্তু মজার ব্যাপার হল, এথনোগ্রাফির এই তথ্যগুলো অধিকাংশই পাওয়া যায় সেকেন্ডারি সোর্স থেকে। ময়না তদন্তে যেমন একজন মানুষের সম্পর্কে জানতে গেলে পুলিশ তার পাড়াপড়শি, বন্ধুবান্ধবের কাছে খোঁজ করে, প্রায় সেরকম ব্যাপার। একটা শিকারী গোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও ভাষা সম্পর্কে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য তথ্য দিতে পারে তাদের কাছাকাছি বসবাস করা অন্য একটি শিকারী গোষ্ঠী, যে কিনা এই তদন্তে সেকেন্ডারি সোর্স। সার্বিক ভাবে এই ব্যাপারটাকে বলা হয় লিঙ্গুইস্টিক্স এথনোগ্রাফি। এই ফিল্ড সার্ভে চলাকালীন যে তথ্য রেকর্ড করা হয়, তাকে বলে লিঙ্গুইস্টিক্স এথনোগ্রাফিক ডকুমেন্টস বা এলইডি।
লিঙ্গুইস্টিক্স এথনোগ্রাফির উদ্ভবের পর অনেক চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গিয়েছে, ফলে গোটা দুনিয়া জুড়ে ভাষার ইতিহাস নিয়ে নতুন করে ভাবনাচিন্তা হচ্ছে। আগের সংস্কার আর প্রচলিত দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, তার জায়গা নিচ্ছে তাক লাগানো নতুন তথ্য। কিন্তু, এই বিপ্লবের ভিতটা আসলে লুকিয়ে আছে ইন্দ্রজিৎবাবুর মতো ভাষাবিজ্ঞানীদের নেওয়া ফিল্ড নোটস, তাঁদের সারাজীবনের পরিশ্রমের ওপর। সহজ কথায়, ফিল্ড নোটসে দূরদর্শিতা আর ডিটেইলিং-এর অভাব থাকলে পরবর্তীকালে সেগুলো কোনও কাজে আসবে না, আবার বর্তমান কালে নেওয়া ফিল্ড নোটসে গলদ থেকে গেলে আগের নোটসের সঙ্গে তুলনামূলক বিচার করে সত্যি মিথ্যা ঠিক করা মুশকিল হয়ে পড়বে।
টিলু মন দিয়ে সব কথা শুনল, মাঝেমধ্যে প্রশ্নও করল দু’একটা। কথা শেষ হলে সপ্তর্ষি আরেকবার তার চোখে ওষুধ দিয়ে দিল। টিলু চোখ বন্ধ করে তার কোলে মাথা রেখে শুয়ে রইল, সে তার কপালে হাত বুলোতে লাগল। ভাষাবিজ্ঞান নিয়ে ছেলের উৎসাহ দেখে সপ্তর্ষি খুশিই হয়েছে, কিন্তু তার মনে অন্য একটা চিন্তা ঘুরঘুর করছে। বেশিদিন এখানে থাকলে টিলুর চোখের ওষুধ শেষ হয়ে যাবে, ফলে তাড়াতাড়ি ফিরে যেতেই হবে। কিন্তু একবার এখান থেকে ফিরে গেলে বাবার সন্ধান পাওয়ার কোনও উপায় থাকবে না। মানুষটি নিঁখোজ হয়ে থাকলে তাদের করণীয় কিছু ছিল না, কিন্তু এখন তারা জানে যে বাবা একটা কাজ নিয়ে স্বেচ্ছায় এখানে এসেছিলেন, হয়তো এই জঙ্গল লাগোয়া কোনও গ্রামেই অপেক্ষা করে আছেন তিনি! তাঁকে এখানে ফেলে সে ফিরে যাবে কী করে? সপ্তর্ষি শত চিন্তা করেও এই দোটানা থেকে বেরোনোর কোনও পথ খুঁজে পেল না।
১২
টিলু ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাইরে অন্ধকার নেমে এল। একটানা ঝিঁঝিঁর ডাকের পাশে আরো হরেক রকম শব্দ কানে আসছে, তার উৎস বোঝে কার সাধ্য! এই বনে কতরকম পোকামাকড় আর স্তন্যপায়ী প্রাণী আছে, সে খবর আর কে রেখেছে? রিও আর ইনাও চৌকস ছেলে, এই ভেজা মরসুমেও আগুন জ্বালিয়ে ফেলে ভাত ডাল ফুটিয়ে ফেলেছে, ম্যাস্টিনে খাবার নিয়ে নিলেই হল। তোপা বাইরে গিয়ে রিওদের সাহায্য করছিল, তার গলা পেয়ে সপ্তর্ষি টিলুকে ডেকে তুলল। রাতের খাওয়া সেরে নেওয়াই ভালো। টিলু ঘুম থেকে একটু চোখ পিটপিট করল, তারপর জামাপ্যান্ট পরে নিল। বাতাসে একটা ঠাণ্ডা ভাব আছে, সপ্তর্ষি টি শার্টের ওপর একটা সোয়েটশার্ট চাপিয়ে নিল, টিলুকেও পরিয়ে দিল।
তাঁবু থেকে বাইরে আসতেই টিলু বিস্ময়ে বোবা হয়ে গেল। এই জায়গাটা খানিকটা উঁচু, অনেক দূর অবধি দেখা যাচ্ছে। মেঘ কেটে গেছে অনেকটা, তারা দেখা যাচ্ছে অনেক। কিন্তু টিলুর চমকানোর কারণ সেটা নয়। জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে টিলু দেখল, অন্ধকার জঙ্গলের মধ্যে থোকা থোকা ফলের মতো আলো, যেন দেওয়ালির দিন প্রদীপ জ্বালিয়েছে কেউ। কোথাও সেই আলো তীব্র, কোথাও একটু ঢিমে। টিলু বার কয়েক চোখ রগড়ে তাকাল, তার কি দেখতে ভুল হচ্ছে? কই না তো! ওই তো দেখা যায় গুচ্ছ গুচ্ছ আলোর বিন্দু! মাছের চিকচিকে আঁশের মতো, ঝালরবাতির মতো, উল্কাপাতের মতো উজ্জ্বল সেই আলোর রোশনাই। চাইনিজ লণ্ঠন কিংবা ফানুস যেভাবে আকাশে উঠে যায়, সেরকম লক্ষ লক্ষ আলোর শিখা গাছের ক্যানোপি ছাড়িয়ে ওপরে উঠে যাচ্ছে। নীল হলুদ সবুজ লাল সোনালি রুপোলি আলোর ছটায় আলোকিত হয়ে আছে সমস্ত অরণ্যপ্রান্তর। টিলুর নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এল। সে পা নাড়াতে পারছে না।
তাকে ওরকম স্থাণুবৎ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সপ্তর্ষি বলল, “কী হল রে? ওরকম ভোঁদাইয়ের মতো দাঁড়িয়ে রইলি যে! চোখে লাগছে?”
টিলু আঙুলটা সামনের দিকে তুলে বলল, “কত আলো!”
“আলো? কই?” সপ্তর্ষি অবাক।
“দেখতে পাচ্ছ না?” টিলু জোর দিয়ে বলল, “জঙ্গলের মাথার ওপর কত কত রঙিন আলো!”
সপ্তর্ষি জঙ্গলের দিকে তাকাল। নিশ্ছিদ্র অন্ধকার যাকে বলে, এ হচ্ছে তাই! জ্যোৎস্নার আলো বোঝা যাচ্ছে না। শুধু পাথরের ওপর জ্বালিয়ে রাখা আগুন ছাড়া কিছুই দেখার নেই। টিলুর চোখে অনেক কিছু অন্যভাবে ধরা দেয় ঠিকই, কিন্তু রাতের অন্ধকারে আলো দেখার কথা তো সে আগে কখনও জানায়নি। তাহলে কি তার চোখে নতুন কোনও উপসর্গ দেখা দিল?
সপ্তর্ষি টিলুর হাত ধরে বলল, “ঠিক আছে। আগে খেয়ে নিবি চল।”
খাওয়ার সময় টিলু মুগ্ধ চোখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল, সে কিছুতেই সামনে থেকে চোখ সরাতে পারছে না। সপ্তর্ষি নীচু গলায় ব্যাপারটা তোপাকে জানাতে সে ঘাড় নাড়ল। কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে সে বলল, “শমন রাজা টিলুর চোখে ফুঁ দিয়ে কীসব মন্ত্র পড়ছিল না?”
“তাতে কী?” সপ্তর্ষি হেসে ফেলল, “উনি কি টিলুর চোখে ম্যাজিক করেছেন?”
“তা তো জানি না।” তোপা শান্ত ভাবে বলল, “জঙ্গলের নাকি একটা নিজস্ব আলো থাকে, শমনরা সেই অদৃশ্য আলো দেখতে পান বলে মান্যতা আছে। রাতে বনবাদাড়ে চলতে গেলে ওদের লণ্ঠন ফন্ঠন কিছু লাগে না। কথাটা মনে পড়ল বলে বললাম।”
সপ্তর্ষি উত্তর দিল না। বাসনকোসন ধুয়ে গুছিয়ে নিচ্ছিল সবাই। আগুন নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে, এইবার শুয়ে পড়লেই হবে। এমন সময় একটা কাণ্ড ঘটল।
টিলু বাথরুম করতে পাথরের পিছনের দিকে গিয়েছিল, সেখান থেকে ফিরে আসার সময় তার চোখ পড়ল পাথরের ওপর। অমনি চমকে উঠল সে। পাথরের ওপর ও কীসের চোখ? দেখে মনে হচ্ছে, একটা তিনচোখা জন্তু তাকিয়ে আছে। ভালো করে দেখতে সে বুঝল, চোখ তো নয়! কয়েকটা জায়গা থেকে নীল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। যেন আলোর পেন্সিল দিয়ে পাথরের ওপর কেউ চোখের আকৃতি এঁকে দিয়েছে।
জায়গাটা একটু উঁচু। পাথরের ওপর পা রেখে রেখে টিলু ওপরে উঠে গেল,সেখানে গিয়ে দাঁড়াতেই পাথরের নীচের গর্তটা চোখে পড়ল তার। খুব বড়ো নয়, খুব ছোটোও নয়। সেখানে কতগুলো মূর্তির মতো জিনিস বসানো আছে। একটা হাতে তুলে নিয়ে দেখল সে, কাঠের তৈরি পুতুলের মতো লাগছে। মনে হচ্ছে গাছের পুতুল বানিয়ে তার মাথায় একটা মানুষের মুণ্ডু লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর কেউ হলে ভয় পেত, কিন্তু টিলু অত সহজে ভয় পাওয়ার ছেলে নয়। সে আবার পাথরের ওপর আঁকা আলোর চিহ্নটার ওপর চোখ রাখল। দুটো আয়তাকার আকৃতি আড়াআড়ি ভাবে আঁকা হয়েছে, তার মাঝে প্রদীপের মতো একটা চিহ্ন আঁকা,সেটা দেখে শিবঠাকুরের চোখের মতো মনে হচ্ছে। দূর থেকে দেখে ভুল হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এই পাথরের ওপর এরকম একটা চোখ মার্কা আলোকচিহ্ন কে আঁকবে? একঝলক দেখে মনে হয় চোখের ভিতর থেকে নীল আগুন বেরোচ্ছে,তাতে একটা সোনালি ভাবও আছে। বাবা বা তোপা হয়তো এই আলো দেখতেই পাবে না, তারা অনেক কিছুই দেখতে পায় না। নীল আলোর চোখটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে টিলুর মনে হল, এই চোখটা সে আগেও দেখেছে। কিন্তু কোথায়? কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতেই বিদ্যুৎচমকের মতো ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে গেল তার কাছে। টিলু আর দাঁড়াল না, এক লাফে পাথর থেকে নেমে তাঁবুর সামনে গিয়ে সপ্তর্ষির সোয়েট শার্ট টেনে ধরে বলল, “এক্ষুনি চল। তোপা ভাইকেও ডাকো। জলদি।”
সপ্তর্ষি একটু ভড়কে গেলেও টিলুর দিকে তাকিয়ে কিছু একটা আন্দাজ করে নিল,তারপর তোপাকে দু এক কথায় ব্যাপারটা জানিয়ে টিলুর হাত ধরে এগিয়ে গেল। টিলু উত্তেজনায় এমন ছটপট করছে যে টং আর লিং এর মধ্যেও সেই উত্তেজনা সংক্রমিত হয়েছে, তারা কান খাড়া করে উঠে এসেছে। রিও আর ইনাও তোপার পিছু পিছু এসে হাজির হয়েছে সেখানে। টিলু আবার পাথরের ওপর উঠে সেই আঁকা চোখটার ওপর আঙুল রেখে বলল, “এই দেখো!”
সপ্তর্ষিরা বোকার মতো তাকিয়ে রইল। তারা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। শুধুই অন্ধকার আর পাথর, আর কিছু নেই। টিলু বুঝে গেল, তার আশঙ্কাই ঠিক। বাবা কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। সে তড়বড়ো করে অনেক কথা বলে গেল, তারপর গর্তের ভিতর হাত ঢুকিয়ে সেই কাঠের পুতুলটা বের করে আনল। সেটা দেখিয়ে সে বলল, “এই দেখো। এইরকম পুতুল বুগুন রাজার ঘরেও ছিল। ওই গর্তটার ওপরেই একটা নীল চোখ আঁকা আছে।”
তোপার ভুরু কুঁচকে গেছে। সে টিলুর হাত থেকে পুতুলটা নিয়ে টর্চের আলোর নিচে ধরে বলল, “টোটেম হতে পারে! টিলু ঠিক বলেছে!”
“কিন্তু চোখটা তোমাদের দেখতেই হবে।” টিলুর উত্তেজনা কমছিল না, “আমি ঠিক দেখছি। মাসা জাদুগররা এখানে ওই চোখ এঁকে রেখে গেছে। তুমি দেখলেই বুঝতে পারবে।”
তোপা বিভ্রান্ত হয়ে প্রথমে সপ্তর্ষির দিকে, তারপর টিলুর দিকে চাইল। রিওরা টিলুর কাছে গিয়ে টর্চের আলো ফেলে জায়গাটা পরীক্ষা করছিল, কিন্তু কিছুই পাওয়া যাচ্ছে না। টং আর লিং ইতিমধ্যে পাথরের ওপর উঠে গর্তের ভিতর শোঁকাশুঁকি করতে শুরু করেছে, এইবার তারা চাপা ভুক-ভুক শব্দে ডেকে উঠল। রিও বলল, “কুকুরদুটো মনে হয় মানুষের গায়ের গন্ধ পেয়েছে। অপরিচিত মানুষ।”
ইনাও গর্তের ভিতর আলো ফেলে বলল, “এখানে আরো কয়েকটা কাঠের মূর্তি আছে।”
“এটা সম্ভবত মাসাদের উপাসনা স্থল!” তোপা ভেবেচিন্তে বলল, “হতে পারে ওরা মাঝেমধ্যেই এখানে আসে। মূর্তিটা দেখে তো কোনও দেবদেবীর মূর্তি বলে মনে হচ্ছে। মাসারা প্রকৃতির অনেক কিছুকেই দেবতুল্য মনে করে। কিন্তু টিলু যে চোখ দেখতে পেয়েছে, সেটার কী হবে? আমরা তো কিছুই দেখতে পাচ্ছি না।”
টিলুর মুখচোখ কুঁচকে গেছে। সে বুঝতে পারছে না কী করবে? বাবাদের জিনিসটা দেখাতে না পারলে ওরা কিছুতেই বুঝতে পারবে না। সে ব্যাকুল চোখে সপ্তর্ষির দিকে চাইল।
সপ্তর্ষির কপালে মস্ত ভাঁজ। সে কিছুক্ষণ টিলুর চোখের দিকে চেয়ে রইল। নিজের ছেলের স্বভাব তার জানা, খুব জরুরি কিছু না হলে টিলু এরকম হইচই করত না। কিন্তু, টিলুর চোখে যা ধরা দেয়, সপ্তর্ষিরা সেটা দেখবে কী করে? সপ্তর্ষি কিছু ভেবে তোপাকে বলল, “লেজার লাইট আছে?”
“উঁহু!” তোপা বলল, “তোর মনে হচ্ছে ওখানে সত্যিই কিছু আছে? টিলু ঠিক দেখেছে?”
“ঠিক ভুলের কথা নয়!” সপ্তর্ষি বলল, “ও যা দেখে, সেটা ওর কাছে মিথ্যা তো নয়। বানিয়ে বলা ওর স্বভাবে নেই। আর ও এটাও জানে যে আমরা ওর মতো করে অনেক কিছু দেখতে পাই না। তাহলে? তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু না হলে ও আমাদের দেখানোর জন্য জোরাজুরি করত না। “
“কিন্তু আমি বা তুই সে জিনিস দেখব কী করে?” তোপা বুঝতে পারছিল না।
সপ্তর্ষি একটু ভেবে বলল, “আমাদের কাছে এক্সট্রা কেরোসিনের টিন আছে না? নিয়ে আয় তো! পাথরে খোদাই করা টেক্সট পুরোনো হয়ে গিয়ে থাকলে কেরোসিন দিলে কাজ হয় দেখেছি। একটা এক্সপেরিমেন্ট করে দেখা যাক।”
তোপা বাক্যব্যয় না করে কেরোসিনের টিন নিয়ে এল। সপ্তর্ষি এইবার পাথরের ওপর উঠে টিলুর বলা জায়গায় খানিকটা কেরোসিন ছড়িয়ে দিল, তারপর তোপাকে বলল, “ক্যামেরাটা রেডি রাখ। আমি বললেই শাটার টিপবি।” তোপা ক্যামেরা ধরতেই সপ্তর্ষি লাইটার জ্বালিয়ে পাথরটার সামনে ধরল। কয়েক মুহূর্ত কিছুই হল না, তারপর দপ করে আগুন জ্বলে উঠল পাথরের ওপর।
“টেপ টেপ, চটপট শাটার টেপ!”
তোপা ততক্ষণে কয়েকটা ছবি তুলে নিয়েছে। কিন্তু সে ছবি দেখার দরকার পড়ল না। সবাই স্পষ্ট দেখল, আগুনের ভিতর থেকে একটা মুখের মতো আকৃতি উঁকি মারছে। মুখ নয়, আসলে দুটো…না, তিনটে চোখ। সেখানে আগুন ধরেনি। মনে হচ্ছে, আগুনের ভিতর থেকে কেউ তাদের লক্ষ করছে। রিওরা বিস্ময়ের শব্দ করে উঠল। তোপাও ভয়ানক চমকে গিয়েছে। কিন্তু তারা কেউ কোনও মন্তব্য করার আগেই টিলু তোপার কোমর টেনে ধরল। তার হাতে দুটো কাগজ। তোপা দেখল, সেটা টিলুর আঁকা লগোগ্রাফিক ক্যারেক্টারের ছবি। চতুর্থ ছবিটা আঁকতে শুরু করেছিল সে, কিন্তু শেষ করতে পারেনি। শুধু মাঝখানের আয়তাকার ক্ষেত্র দুটো আর একটা প্রদীপের ডিজাইনটুকু এঁকেছিল। এইবার টিলু আঙুল দিয়ে সামনের দিকে দেখাল।

তোপা এবার সামনের জ্বলন্ত আগুনের ভিতর থেকে উঁকি মারা চোখ তিনটের দিকে চাইল, তারপর মূল ছবি আর টিলুর আঁকাটা দেখল। এইবার ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছে সে। তার চোখ বিস্ফারিত হয়ে গিয়েছে, জোরে জোরে নিশ্বাস পড়ছে। দু হাতে মাথা ধরে সে বলে উঠল, “স্ট্রেঞ্জ! এ যে অভাবনীয় ব্যাপার।”
সপ্তর্ষি নেমে এসেছিল। ছবিটা চোখে পড়তেই সে যা বোঝার বুঝে গিয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে রিওদের আগুনটা নিভিয়ে দিতে বলল, তারপর টিলুর কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসে হাসল। টিলুর দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসল সে,তারপর তার মাথা ঝাঁকিয়ে চুল এলোমেলো করে দিয়ে বলল, “ব্রাভো মিস্টার পটার। মনে হচ্ছে ট্রাইউইজার্ড টুর্নামেন্টটা তুইই জিতবি।”
তাড়াতাড়ি শুতে যাওয়া আর হল না। আগুন নিভে যাওয়ার পর চিহ্নটা আরো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া পাথরের মাঝে সাদা হয়ে আছে তিনটে চোখ। টিলু বলল, সেগুলো থেকে এখনও নীল আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে। সপ্তর্ষি বলল, “জলের সঙ্গে গাছের নির্যাস বা রঙিন নুড়ির গুঁড়ো ব্যবহার করে তৈরি স্ট্রং কালি ব্যবহার করেছে, যা সময়ের সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। এই ধরনের স্থানীয় ওয়াটারবেসড ইংক অনেকসময় আগুনকে প্রতিরোধ করে। গুহাচিত্র আঁকার সময়েও এরকম কালি ব্যবহার করার নজির আছে।”
তোপা মাথা নেড়ে বলল, “থ্যাঙ্কস টু টিলু। আমরা জাদুগরদের গ্রাম খুঁজতে যাচ্ছি বটে, কিন্তু টিলু আমাদের রোজ যে ম্যাজিক দেখাচ্ছে, সেটাই বা কম কীসে!”
“সমাধিস্থলের পাথরের ওপর পাওয়া চিহ্নগুলো যে উপাসনা মন্ত্র, তার পক্ষে আরো একটা যুক্তি পাওয়া গেল।” সপ্তর্ষি চোখ বন্ধ করে বলল, “ওই ছবিগুলো শব্দসমষ্টি হিসেবে একটা মহাকাব্য বা মহামন্ত্রের অংশ হতে পারে, কিন্তু তার ভিতর থাকা স্ট্যান্ডঅ্যালোন লগোগ্রাফিক ক্যারেক্টারগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ এক একটা অর্থ বহন করছে, তাতে সন্দেহ নেই। যেভাবে এই শব্দাক্ষরগুলোকে এক একটা নকশায় ফেলা হয়েছে, তাতে আমার মায়ান স্ক্রিপ্টের কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। কম্বিনেশনাল ভ্যারিয়েশন! প্রতিটা অংশের ছবির অবস্থান ঠিকঠাক ভাবে বদল করলে সামগ্রিকভাবে একটা সম্পূর্ণ নতুন ছবির জন্ম হবে। সে ছবিটা একটা নতুন গল্প বলবে, যার সঙ্গে আগের ছবির গল্পের, বা গল্পের জায়গায় মন্ত্র, কাব্য, বিজ্ঞানের ফর্মূলা যা খুশি হতে পারে, তার কোনও মিল থাকবে না!”
তোপা উত্তেজিত গলায় বলল, “আমাদের আবিষ্কার করা পাঁচটা ছবির প্রতিটা অংশ যদি স্ট্যান্ডঅ্যালোন লগোগ্রাফিক ক্যারেক্টার হয়, তাহলে কতগুলো ভিন্ন ভিন্ন শব্দ আর অক্ষর হবে ভেবে দেখেছিস? এখন যদি অনুমান করা হয় যে প্রতিটা ক্যারেক্টারের নিজস্ব অর্থ আছে, সেক্ষেত্রে এই অল্টারনেটিভ ল্যাঙ্গুয়েজের স্কেল বুঝতে পারছিস?”
সপ্তর্ষি মাথায় হাত চালিয়ে বলল, “এখন প্রশ্ন হল, এই থ্রি আইড ক্যারেক্টারটা কী? এটা কি শুধুই ছবি? না ছবি আর টেক্সটের মেলবন্ধনে কিছু একটা লেখা হয়েছে?”
তোপা চুপ করে ভাবতে লাগল। টিলু আর রিও এই আলোচনায় যোগ দেয়নি, তারা গর্তের ভিতর থেকে উদ্ধার করা কাঠের মূর্তিগুলো ঘষে ঘষে পরিষ্কার করছে। মোট সাতটা মূর্তি পাওয়া গিয়েছে ওই গর্তে, তার সবগুলোই কমবেশি একরকম দেখতে। সেখানে অবশ্য বিশেষ কিছু নেই, পরিষ্কার হলে সেগুলো আগের জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ইনাও তাদের সঙ্গে যায়নি, সে অনেকক্ষণ ধরে গর্তের ভিতর টর্চের আলো ফেলে কী সব দেখছিল। এইবার সে তোপাকে বলল, “এখানে পাথরের ওপর অনেক কিছু লেখা আছে তোপা ভাই।”
তোপা আর সপ্তর্ষি চটপট উঠে এল। টিলুরাও ইনাওয়ের গলা পেয়ে ছুটে এসেছে। পাঁচ ব্যাটারির চার পাঁচটা টর্চ, তার তেজি আলোয় দেখা গেল, গর্তের দেওয়ালগুলো এবড়োখেবড়ো নয়, বরং মসৃণ। তার ওপর সত্যিই কীসব লেখা আছে। একটা দুটো অক্ষর নয়, সারা দেওয়াল জুড়ে গিজগিজ করছে হরফগুলো।
তোপা হতবাক হয়ে বলল, “আরে! এ তো ক্লে ট্যাবলেট, পাথর তো নয়। পাথরের গায়ের সঙ্গে একদম সেঁটে আছে। ফলকে অরিজিনাল তাই আহোম স্ক্রিপ্টে লেখা আছে দেখছি! এখানে দেখ কোনও লগোগ্রাফিক ক্যারেক্টার নেই।”“
“তুই পড়তে পারবি তো?” সপ্তর্ষি উল্লসিত স্বরে বলল।
“চেষ্টা করে দেখতে হবে।” তোপা বলল, “দাঁড়া, আগে ছবি তুলতে হবে ঠিক করে। এই ধরনের মৃত্তিকা ফলক খুঁজে পাওয়াই একটা ভাগ্যের ব্যাপার।”
ছবি তোলা হলে তোপা তাঁবুতে ফিরে এল। ক্যাম্পিং লাইট আছে বলে রক্ষে। কাগজ কলম নিয়ে কাজে লেগে পড়ল তোপা। আহোম তাই ভাষার মূল টেক্সট সম্পর্কে তার কিছুটা ধারণা আছে। অর্থাৎ আহোম লিপি নিয়ে যথেষ্ট গবেষণা হয়েছে, আধুনিক তাই কাদাই ভাষার সঙ্গে তার কিছুটা সাযুজ্য আছে। মুশকিল হল প্রাচীন তাই আহোম ভাষায় স্বরবর্ণের উচ্চারণ আর ‘টোন’ ব্যাপারটা কীভাবে চিহ্নিত করা হত ঠিক করে জানা যায়নি, তাই সঠিক উচ্চারণ জানার কোনও উপায় নেই। অর্থোদ্ধার বা কাজ চালানোর জন্য তাই কাদাই ভাষাটাই রেফারেন্স হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। ঘণ্টাখানেক ধরে মাথা ঘামানোর পর তোপা একটা কাজ চালানো গোছের অনুবাদ করে ফেলল।
সপ্তর্ষির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “খুব বেশি সময় দেওয়া গেল না। কিন্তু মনে হচ্ছে, এই লেখাগুলোর একটা অংশই আমরা ম্যানুস্ক্রিপ্টে পেয়েছিলাম। ফলে জোড়াতালি দিয়ে একটা গল্প দাঁড় করানো যাচ্ছে। মোটামুটি যা বুঝলাম, শোন। লেখাগুলো একটা দীর্ঘ আখ্যানের অংশ, সেখানে রাজকুমার সুখাপার বীরত্বের গুণগান করা গিয়েছে। সুখাপা ছিলেন মাউ লং রাজ্যের যোগ্য উত্তরাধিকারী, তাঁর নেতৃত্বে এই রাজ্য বর্মা থেকে চীনের ইউনান, মানে গোটা ব্রহ্মপুত্র ভ্যালি জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল। তুই নিশ্চয়ই জানিস, তাই আহোম ভাষাটা আসলে ‘তাই’ ল্যাঙ্গুয়েজ ফ্যামিলি থেকেই এসেছে, তাই আবার এভোলিউট হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার ক্রা-দাই ভাষা থেকে।”
“রাজকুমারের গল্পটা বলো না!” টিলু খাপ্পা হয়ে বলল। সে বেশ আগ্রহ নিয়ে তোপার কথা শুনছিল, গল্প ঘুরে যাচ্ছে দেখে সে মোটেই খুশি হল না।
তোপা জিভ কেটে বলল, “সরি সরি। তো যা বলছিলাম টিলুবাবু, রাজকুমার সুখাপা ত্রয়োদশ শতাব্দীতে ভারতে এসে আহোম রাজ্যের স্থাপনা করেন, কিন্তু ভারতে রাজত্ববিস্তার করা খুব সহজ ছিল না। ঘন অরণ্য, হিংস্র জানোয়ার, আর বৃষ্টি হলে তো বন্যা অবধারিত। সুখাপা তখন তাদের বেস্ট উইজার্ড মানে শমনদের কাছে গিয়ে সাহায্য চান। যতদূর মনে হয়, শমন বলতে এই লেখায় অন্তত মাসা ট্রাইবের পূর্বপুরুষদের কথাই বলা হয়েছে। শমনরা প্রকৃতিকে শান্ত করতে সাতজন দেবী দেবতার উপাসনা করে তাঁদের আহ্বান করে। আকাশ, বাতাস, জল, মাটি, বন, পাহাড় এবং পশুপাখি, এদের প্রত্যেকের এক একজন দেবতা ছিল। তাঁরা শমনদের উপাসনায় খুশি হয়ে তাদের আশীর্বাদ করেন। এই আশীর্বাদ কোন ভাষায় করা হল আন্দাজ করতে পারছিস?”
“তাই আহোম ভাষায়?” সপ্তর্ষি জিজ্ঞেস করল।
“ঠিক ধরেছিস।” তোপা উৎফুল হয়ে বলল, “ভাষার বিবর্তনের ইতিহাস কিভাবে মাইথলজির পার্ট হয়ে ওঠে দেখেছিস! দেবতারা তাই আহোম ভাষায় শমনদের বলেন, যতদিন আহোম রাজ্যের শাসকরা প্রকৃতিকে যোগ্য সম্মান দেবে, তাদের রাজত্ব বজায় থাকবে। কিন্তু যে দিন তারা প্রকৃতির কথা ভুলে যাবে, আহোম রাজ্যও ক্রমে ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে। তা শমনরাও সাত দেবতার সামনে প্রমিস করে, রাজা থাক না থাক, রাজত্ব থাক না থাক, তারা মনপ্রাণ দিয়ে দেবতার বাণী মেনে চলবে, এই প্রতিজ্ঞা আহোম রাজ্যের শমনরা কোনোদিন ভুলবে না। প্রকৃতির সাতটা এলিমেন্ট আর ঈশ্বরপ্রদত্ত এই ভাষাকে তারা উত্তরাধিকার সূত্রে রক্ষা করে চলবে। বুঝতেই পারছিস, আমরা যে সাতটা কাঠের মূর্তি পেয়েছি, তারা হলেন ওই সাতজন দেবতা। আমার ধারণা, আমাদের পাওয়া প্রথম ছবিটাতেও ওই সাতজন দেবতাকেই বোঝানো হয়েছে। ঘটনাটা এখানে শেষ হতেই পারত, কিন্তু হয়নি। আরেকটা ছোট্ট তথ্য আছে, আর সেটাই সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং! কী বল তো?”
“স্পিরিট ওয়ারিয়র?” সপ্তর্ষির চোখে ঝিলিক খেলে গেল।
“তুই বুঝলি কী করে?” এইবার অবাক হওয়ার পালা তোপার। সে অবাক হয়ে সপ্তর্ষির দিকে তাকাল। টিলুও জ্বলজ্বলে চোখে বাবার দিকে চেয়ে আছে।
সপ্তর্ষি মৃদুহেসে বলল, “এমন কিছু ব্যাপার নয়। বুগুন রাজা বলেছিলেন বলে আন্দাজে ঢিল ছুঁড়লাম। লেগে গেল। তুরস্কের জাগ্রোস পর্বতমালাতে আসুরিয়ান রাজ্যের হারিয়ে যাওয়া ভাষা নিয়ে কাজ করতে গিয়েও প্রায় একই অভিজ্ঞতা হয়েছিল। মিশর, মেক্সিকো, গ্রিস…স্পিরিট ওয়ারিয়র বা প্রোটেক্টরের ব্যাপারটা অনেক সভ্যতাতেই আছে। যাকগে, এখানে কী বলেছে শুনি!”
তোপা তার ছাগলদাড়িতে হাত বুলিয়ে বলল, “খুব ডিটেলে কিছু নেই। শমনরাও প্রকৃতি আর ভাষার রক্ষার জন্য একজন স্পিরিট ওয়ারিয়র বা রক্ষকের কথা বলেছেন। প্রতিটা প্রজন্মে একজন সাধারণ মানুষকে এই দায়িত্ব দেওয়া হবে, এই বাছাইয়ের কাজটা করা হয় একটা অনুষ্ঠানে। প্রকৃতির সাত দেবতা আর শমন গোষ্ঠী সম্মিলিত ভাবে তাঁকে এই মর্যাদা দেবে। ব্যস! এ সম্পর্কে আর কিছু লেখা নেই। শুধু সেই রক্ষকের নামটুকু ছাড়া।”
“কী নাম ওর?” টিলু জিজ্ঞেস করল।
“এই তো মুশকিল করলে!” তোপা এইবার হেসে ফেলল, “তাই আহোম স্ক্রিপ্ট পড়ে ঠিকঠাক উচ্চারণ জানার কোনও উপায় নেই। নি…মাওসা, মাওনিয়াসা, মাসআ…নি…এরকম কিছু হবে! ওই চোখ তিনটে সেই স্পিরিট ওয়ারিয়রের প্রতীক।”
এতক্ষণে শমন রাজার কথার মানে বোঝা গেল। চার নম্বর ছবি দেখে তিনি সম্ভবত ওই প্রতীকটা চিনতে পেরেছিলেন, সেইজন্য ‘নি মাসা মাসা…’ ইত্যাদি বলে উঠেছিলেন। সপ্তর্ষি আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। টিলুও চুপ।
ক্যাম্পিং লাইটের ব্যাটারি কমে এসেছে, আলোর তীব্রতাও কমে গেছে। বাইরে থেকে ঝিঁঝির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। একবার গুমগুম করে মেঘ ডেকে উঠল। মনে হচ্ছে আবার বৃষ্টি হবে। রিও আর ইনাও ইতিমধ্যেই ঘুমিয়ে কাদা। টংলিংও আপাতত গুটিসুটি মেরে ঘুমের দেশে। সপ্তর্ষি হাই তুলল। তারপর স্লিপিং ব্যাগ খুলে বলল, “আজকের জন্য যথেষ্ট হয়েছে তোপা। বাকিটা কাল দেখা যাবে। সারাদিন অনেক ধকল গিয়েছে, এইবার শুয়ে পড়। টিলু, লাইটটা নিভিয়ে দে তো।”
লাইট বন্ধ হতেই তাঁবুর ভেতরটা অন্ধকার হয়ে গেল। তোপা স্লিপিং ব্যাগের চেন খুলে ভিতরে ঢুকে পড়েছে। টিলুও লাইট নিভিয়ে বাবার কাছে শুয়ে পড়ল। এই একটা সময়, যখন তার চশমাটা নাকের ওপর থাকে না। সপ্তর্ষি ছেলের নাকটা নেড়ে দিয়ে, তার গালে আলতো আদর করে বলল, “কুইডিচ ম্যাচ না খেলেই তুই আজকে সোনালি বলটা ধরে ফেলেছিস রে পটরু। এইবার দাদুকে খুঁজে পেলেই আমরা সেরা টিমের কাপটা পেয়ে যাব।”
ঘুমে টিলুর চোখ জড়িয়ে আসছিল। সেই অবস্থাতেই তার ঠোঁটে একটা ছোট্ট হাসির রেখা খেলে গেল। বাবাকে জড়িয়ে ধরে টিলু ঘুমিয়ে পড়ল।
১৩
তখন অনেক রাত। সবাই গভীর ঘুমে ডুবে আছে, দু একজনের নাকও ডাকছে। এমন সময় টিলুর ঘুম ভেঙে গেল। বাঁ কানের কাছটা ভিজে ভিজে ঠেকছে। সে কাত হয়ে শুতে গিয়ে দেখল, টং তার কান চেটে দিচ্ছে। কানটা চেটে দিয়েই সে তাঁবুর দরকার কাছে ছুটে গেল, সেখানে দাঁড়িয়ে বাইরে দেখল, তারপর মুখ ফিরিয়ে টিলুর দিকে চাইল। আবার ফিরে এল টিলুর কাছে। আবার জিভ দিয়ে কান চেটে দিয়ে ছুটে গেল দরজার কাছে। টিলুর ঘুম কেটে গেছে ততক্ষণে। হাত বের করে আগে চশমাটা নিয়ে চোখে পরল সে, তারপর স্লিপিং ব্যাগের চেন খুলে উঠে বসল। তাঁবুর ভিতর কেমন একটা সবুজ আলো খেলা করছে বলে মনে হল তার। কিন্তু সেদিকে মন দিতে পারল না টিলু। টং বারবার তার কাছে আসছে আর দরজার দিকে ছুটে যাচ্ছে, কিন্তু মুখে কোনও শব্দ করছে না। ও কি টিলুকে ডাকছে? টিলু ধীরে ধীরে স্লিপিং ব্যাগ থেকে বাইরে এসে দাঁড়াল, তারপর এগিয়ে গেল তাঁবুর দরজার কাছে। তাঁবুর বাইরেও যেন একটা ফ্যাকাশে সবুজাভ দীপ্তি দেখা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে চেন টেনে তাঁবুর দরজাটা খুলতেই টং ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল, টিলুও বেরিয়ে এল তার পিছন পিছন।
নিস্তব্ধ রাত্রি। কোথাও কেউ নেই। ঝিঁঝিঁর একটানা বিরক্তিকর শব্দটাও আর সেভাবে কানে আসছে না। তার জায়গায় শোনা যাচ্ছে একটা মিহি বাঁশির মতো আওয়াজ। হাওয়ার শব্দ? তাই হবে। ওইটুকু তাঁবুর ভিতরে পাঁচজন থাকার ফলে একটা গুমোট ভাব তৈরি হয়েছিল, এখন খোলা আকাশের নীচে দাঁড়াতে পেরে বেশ ভালো লাগছে টিলুর। বাতাসে একটা ভিজে ভিজে ভাব, কিন্তু বৃষ্টি হচ্ছে না। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিল টিলু। আহ্! তাজা বাতাসের স্পর্শে প্রাণটা জুড়িয়ে যাচ্ছে। টিলু পাথরের ওপর বসে জঙ্গলের দিকে তাকাল। সন্ধ্যাবেলার সেই রঙিন আলোর ঝিলমিলানি এখন আর দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু তাই বলে নিকষ অন্ধকারও নেই। টিলু দেখল, চরাচর জুড়ে একটা নরম সবুজ আলো খেলা করছে। অরোরা বরিয়ালিসের সময় যেমন আলো দেখা যায়! চলমান ঢেউয়ের মতো! জীবন্ত। মনে হয়, একটা ধোঁয়ার ড্রাগন উড়ে বেড়াচ্ছে আকাশে। কুয়াশার চাদরের মতো সেই সবুজ আলোয় বনপ্রান্তর ঢেকে গিয়েছে।
টিলু আরামে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল, প্যান্টে টান পড়ায় চোখ খুলতেই হল। টং তার প্যান্ট ধরে টানছে। কুকুরটা তাকে কিছুতেই জিরোতে দেবে না মনে হচ্ছে। টিলু তার কান মুলে বকে দিল, কিন্তু টং একেবারে নাছোড়বান্দা। সে টিলুকে ছেড়ে পিছনের দিকে ছুটে গেল, তারপর আবার ফিরে এল। টং মনে হয় তাকে কিছু দেখাতে চাইছে। জন্তু জানোয়ার হলে কুকুরটা নিশ্চয়ই চেঁচাত! কিন্তু টং একটা শব্দও করেনি। তার মানে অন্য কিছু। বাবাকে ডাকবে? কিন্তু যদি কিছুই না থাকে? একটু ইতস্তত করে টিলু উঠে পড়ল। দেখাই যাক!
টং সেই পাথরের গর্তটার কাছে এসে দাঁড়িয়ে আছে। টিলু সাবধানে পাথরের ওপর পা রেখে সেখানে পৌঁছেই অবাক হয়ে গেল। তোপারা গর্তের ভিতর থেকে কিছুই সরায়নি, কাঠের মূর্তি আর মৃত্তিকা ফলক, সব আগের মতো যথাস্থানে রেখে দেওয়া হয়েছিল। এখন এখানে একটাও মূর্তি নেই। কিন্তু চন্দনধূপের মতো একটা গন্ধ এসে নাকে লাগছে। তাহলে কি তারা ঘুমিয়ে থাকা অবস্থায় কেউ এখানে এসেছিল? টিলুর রোমাঞ্চ হল। ব্যাপারটা বাবাদের জানাতে হবে। টংকে খুঁজতে গিয়ে টিলু দেখল, সে পিছনের ঢালু দিকটা দিয়ে জঙ্গলের মধ্যে নেমে গিয়েছে, অনেকটা নেমে সে তার দিকে ফিরে তাকাল। টিলু শিষ দিয়ে তাকে ডাকল। কিন্তু টং ফিরছে না। সে কয়েক কদম এগিয়ে এল, আবার নেমে গেল জঙ্গলের মধ্যে। টিলু ঠিক করল, অনেক খেলা হয়েছে। এইবার সে টংকে ধরে তাঁবুর ভিতর ঢুকে পড়বে। সে দ্রুত টংয়ের দিকে এগোল। কিন্তু টং আরো এগিয়ে যাচ্ছে। টিলু এইবার দৌড়তে লাগল। একদৌড়ে কুকুরটার কাছে পৌঁছে গেলেই হল! তারপর টংকে একটা চাঁটি লাগাবে সে! খুব পাজি হয়েছ তুমি!
কিন্তু টংকে চাঁটি লাগানো হল না। জঙ্গলের মাটিতে পা রাখতেই ম্যাজিকের মতো সব কিছু পাল্টে গেল। টিলু অবাক হয়ে দেখল, বৃষ্টির পর ভিজে মাটির ওপর অসংখ্য ছোটো ছোটো ফুল ফুটেছে। অবিকল বোতামের মতো দেখতে সেই ঘাসফুলের বৃন্ত আর পাপড়ি থেকে নরম বেগুনি আলো বেরোচ্ছে, অনেকটা জেলিফিশের সাঁতার কাটার মতো। সেই আলোয় একটা সম্মোহন আছে। এই রেশমি আলোর আচ্ছাদন ছড়িয়ে গিয়েছে যতদূর চোখ যায়। বুনো লতা আর উদ্ভিদ ঠেলে এগোতে এগোতে টিলু দেখল, টং একটা প্রকাণ্ড বৃক্ষের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছটার কাণ্ডের চাকলগুলো সাদা কালো নয়, বরং তার ওপর নানা ধরনের আলোর নকশা আঁকা। একটু এগোতেই টিলু বুঝতে পারল, নকশা নয়,এগুলো আসলে বয়সের চিহ্ন। গাছটা খুব বুড়ো হয়ে গেছে, বার্ধক্যের ফলে তাঁর গায়ের চামড়া কুঁচকে গিয়েছে। মানুষের যেমন নয়। সেই চামড়ার ভাঁজে ভাঁজে কত কত শুঁয়োপোকা, কত ফড়িং, কত পিঁপড়ে আশ্রয় নিয়েছে, গজিয়ে গিয়েছে কত ছোটো ছোটো ফুল, ব্যাঙের ছাতা। গাছটা তাদের সবাইকে আগলে রেখেছে। টিলু মায়াভরে গাছটার ওপর হাত রাখল। তোপা ভাই বলছিল, এই জঙ্গলে এরকম শত শত গাছ আছে। টিলুর দাদুর চেয়েও কত বছর আগে এরা এই পৃথিবীতে এসেছে, ছোটো থেকে বড়ো হয়েছে, তারপর একসময় বুড়োও হয়ে গেছে। এগুলোও তো তার দাদুর মতোই। গাছদাদু নামটা টিলুই দিয়েছিল। টিলু গাছদাদুর গায়ে হাত বুলোতে লাগল। একসময় তার মনে হল, সে তার নিজের দাদুর গায়েই হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা, গাছেদের কি বন্ধু, ছেলেমেয়ে, নাতিপুতি হয় না? তারা কি চিরকাল একাই থাকে?
টিলু দাঁড়িয়ে রইল। ফিরে যাওয়ার কথা আর তার মনে নেই। তার সামনে এই বনের রূপ পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, সে মুগ্ধ চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। আকাশ, মাটি, গাছ, বাতাস, বনের পশুপাখি… মাসা উইজার্ডরা যে সাতজন দেবতার পুজো করে বলে তোপা ভাই বলছিল, তারা সকলে যেন আজ জীবন্ত হয়ে এই অরণ্যে নেমে এসেছে। উলের বলের মতো রঙিন আলো জড়ামড়ি করে এগিয়ে চলেছে। আলো আর রং, রং আর আলো। এ এক বিচিত্র হোলিখেলা। মধ্যরাত পেরিয়ে এখন রাত্রির তৃতীয় প্রহর, কুঁড়িগুলো ম্যাজিকের মতো ফুলে বদলে যাচ্ছে টিলুর চোখের সামনে। ঘাসের পাতায় পাতায় মেথি, মেহেদি, কারিপাতা, জাফরান আর লেমন গ্রাসের গন্ধ, ফুলগুলোও গায়ে সুগন্ধি মেখেছে। ধানের তুষের মতো পরাগরেণু উড়ে যাচ্ছে এদিক সেদিক, যেন পাখির পালক। টিলু আচ্ছন্নের মতো পথ চলছে, তার সামনে সামনে চলেছে টং। কোথায় যাচ্ছে, কেন যাচ্ছে, তার সে হুঁশ নেই।
হুঁশ যখন হল, তখন টিলু দেখল সে এক ফালি ঘাসের ময়দানের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ঘাসের ওপর অসংখ্য জোনাকি, কয়েক লক্ষ তো হবেই, তারা টুনি বাল্বের মতো জ্বলছে আর নিভছে। সেই আলোয় দেখা গেল, ঘাসবনের ঠিক মাঝখানে শান্ত হয়ে বসে আছে একটা শিঙেল হরিণ। তার গায়ের রং নীলপদ্মের মতো উজ্জ্বল, তার ওপর লাল সোনাইল ফুলের মতো চিতি চিতি দাগ, চোখটা যেন তুলি দিয়ে আঁকা। তার বাহারি শিঙটা মনে হচ্ছে সোনা দিয়ে বাঁধানো, সেটা মাঝে মাঝে নাড়াচ্ছে সে, তখন সেখান থেকে ফুলঝুরি মতো আলোর ফুলকি ছিটকে পড়ছে। হরিণটার চোখ বন্ধ। তার সামনে বসে আছে একজন মানুষ। পরনের সাদা পোশাকটা দেখে তাকে একজন মেয়ে বলেই মনে হচ্ছে। তার মাথাটা হরিণের মাথার সঙ্গে ঠেকিয়ে রেখেছে সে। মেয়েটা হরিণটার গলায় আর মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে দিচ্ছে। টিলু নিশ্বাস বন্ধ করে সেদিকে তাকিয়ে ছিল, এইবার সে ঢোক গিলল। এটা কোন জায়গা? সে কোথায় এসে পড়েছে? এতক্ষণ সে তাঁবুর বাইরে কী করছিল? এই মেয়েটাই বা কে? এত রাত্রে গভীর জঙ্গলের মধ্যে এ কী করছে?

এমন সময় মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। হরিণটাও উঠে দাঁড়িয়েছে, সে শিং নেড়ে বিদায় জানিয়ে জঙ্গলে ঢুকে গেল। মেয়েটা হাঁটু মুড়ে ঘাসের ওপর বসে পড়ল, তারপর একটা বাঁশি বের করে বাজাতে লাগল। খুব মিহি, খুব মোলায়েম সেই বাঁশির সুর। টিলুর মনে হল, সে এই বাঁশি শোনার জন্যই এতদূর ছুটে এসেছে। সে নড়ল না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সেই বাঁশি শুনতে লাগল।
একসময় মেয়েটা বাঁশি বাজানো থামিয়ে সামনের দিকে চাইল, এইবার সে টিলুকে দেখতে পেয়েছে। তার বড়ো বড়ো চুল মাথার দু পাশ দিয়ে মুখের ওপর পড়ে মুখটাকে আড়াল করে রেখেছে, কিন্তু উচ্চতায় সে টিলুর সমানই হবে। টিলু নিশ্বাস বন্ধ করে দেখল, ঘাসের ওপর বসে থাকা জোনাকির দল একসঙ্গে উড়ে গিয়ে মেয়েটাকে ঘিরে ধরল। লক্ষ লক্ষ জোনাকি তাকে ঘিরে জ্বলছে আর নিভছে, রূপোলি আলোয় ঢেকে গিয়েছে মেয়েটার শরীর। টিলুর মনে হল, পেট্রোনাস চার্ম এর মন্ত্র পড়ে আহ্বান করা কোনো স্পিরিট গার্ডিয়ানকে চোখের সামনে দেখছে সে। সেই অবস্থায় মেয়েটা এক পা এক পা করে টিলুর দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। এই অভাবনীয় দৃশ্য দেখে এতক্ষণ টিলু সম্মোহিতের মতো দাঁড়িয়েছিল, এইবার তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। এই মেয়েটা কে? তোপা ভাই তাকে যে পেত্নীর কথা বলেছিল, তারও তো মুখ চুলে ঢেকে থাকে! এই কি তবে সেই পেত্নী? লাইখুতসাংবি? এই তাকে মন্তর দিয়ে ডেকে এনেছে? নিশির ডাক না কী বলে! টিলুর গা দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল, হাত পায়ের আঙুলগুলো কনকন করতে লাগল। সে প্রাণপনে পালাতে চাইছে এখান থেকে, কিন্তু তার পা দু খানা যেন আটকে গিয়েছে জমির সঙ্গে। টং এইবার মেয়েটার দিকে চেয়ে ভুক ভুক করে ডেকে উঠল। একেবারে সামনে এসে গেছে পেত্নীটা। আর রক্ষে নেই। এই বুঝি বড়ো বড়ো দাঁত বের করে সে টিলুর গলায় বসিয়ে দেবে! টংটা মার চেঁচাচ্ছে। সে ভয়ে চোখ বুজে ফেলল।
টিলুর গলায় অবশ্য কেউ দাঁত ফোটাল না। টং-এর ডাকা থেমে গিয়েছে। টিলু ভয়ে ভয়ে চোখ খুলে দেখল, মেয়েটা হাঁটু মুড়ে বসে টংয়ের মাথায় হাত বুলোচ্ছে। টং আরামে চোখ বন্ধ করে কান লটরপটর করছে। এইবার মেয়েটা মুখ তুলে টিলুর দিকে তাকাল। টিলু অবাক হয়ে দেখল, মেয়েটার বয়স তারই মতো হবে। কিংবা তার চেয়ে দু এক বছরের ছোটোও হতে পারে। পানের পাতার মতো মিষ্টি মুখ, বড়ো বড়ো চোখ, সেই চোখে দুষ্টুমির ঝিলিক। মেয়েটার মুখে একদম বাচ্চাদের মতো হাসি। সেই হাসি দেখেই টিলু বুঝে গেল, এ পেত্নী হতে পারে না। এইটুকু একটা পুঁচকে মেয়ে, ও পেত্নী হবে কী করে! এর মধ্যে মেয়েটা উঠে দাঁড়িয়ে টিলুর বুকে আঙুল রেখে আঙুল রেখে কী যেন জিজ্ঞেস করল। টিলু কিছুই বুঝতে পারল না, সে ফ্যাল ফ্যাল করে মেয়েটার মুখের দিকে চেয়ে রইল। মেয়েটার চোখ দুটো দুর্গা ঠাকুরের মতো, তার গা থেকে চন্দনের গন্ধ বেরোচ্ছে, কোমল দৃষ্টিতে টিলুর দিকে তাকিয়ে আছে সে।
টিলু এইবার ঠাহর করে দেখল, তার কপালের ওপর একটা হলুদ রঙের চোখ আঁকা, ঠিক যেরকম তারা আজ পাথরের ওপর দেখেছিল। টিলু কিছু না ভেবেই মেয়েটার কপালে আঙুল ছোঁয়াল। এই কি তাহলে মাসাদের সেই স্পিরিট ওয়ারিয়র? কিন্তু এ তো একটা বাচ্চা মেয়ে! মেয়েটাও ভারী অবাক হয়ে টিলুর দিকে তাকিয়ে আছে। এইবার সে নিজের কপালে আঙুল দিয়ে টিলুর দিকে তাকিয়ে হাত নাড়ল। সে জিজ্ঞেস করছে, তার কপালে আঁকা চোখটা টিলু দেখতে পাচ্ছে কিনা! টিলু ওপর নীচে মাথা নাড়ল। সে দিব্যি দেখতে পাচ্ছে। সেটা শুনে মেয়েটা ভারী অবাক হয়ে টিলুর দিকে চাইল, চেয়েই রইল। ইতিমধ্যে জোনাকির দল উড়ে এসে টিলুকে ঘিরে উড়তে শুরু করেছে, তাদের অদৃশ্য পাখার ঘসটানিতে ঝুমকোলতার ফুলের মতো ছোটো ছোটো নীল সাদা আলোর বুদ্বুদ জন্মাচ্ছে, মিলিয়েও যাচ্ছে। টিলু যে সেই আলোর বুদ্বুদগুলো দেখতে পাচ্ছে, সেটা বুঝতে পেরে মেয়েটা খুব খুশি হয়েছে মনে হল। এমন সময় টং তার সামনের দু পা মেয়েটার বুকের ওপর তুলে তার হাত চাটতে লাগল। মেয়েটা খিলখিল করে হেসে উঠল, তারপর টংয়ের কানদুটো ধরে খেলা করতে লাগল। ততক্ষণে টিলুর ভয় কেটে গেছে। সে বুকের ওপর আঙুল রেখে ইশারা করে মেয়েটাকে বলল, “আমি টিলু। আর ওর নাম টং। তোমার নাম কী?”
মেয়েটা কিছু বলল না, শুধু নিজের বুকের ওপর একটা আঙুল রাখল। টিলু আন্দাজে ঢিল ছুঁড়ে শমন রাজার মতো সুর করে বলল, “নি? নি? মাসা…নি?”
মেয়েটা সে কথা বুঝল কিনা কে জানে, কিন্তু এই প্রথম তার গালে টোল পড়তে দেখল টিলু। মেয়েটা টিলুর মতো গলা করে ভেংচি কেটে বলল, “নি নি নি!” তারপর সে টিলুর হাত ধরে টানতে লাগল। সে টিলুকে তার সঙ্গে যেতে বলছে। টিলু প্রথমে সিদ্ধান্ত নিতে পারল না। এই মেয়েটার সঙ্গে যাওয়া কি ঠিক হবে? বাবা আর তোপা ভাই যদি জেগে ওঠে, তাহলে টিলুকে না দেখতে পেয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে। কিন্তু টিলু প্রায় নিশ্চিত যে এই মেয়েটাই সেই ‘নিমাওসা’ না ‘মানিসা’ কী যেন, নাহলে তার মাথায় ওই চিহ্নটা আঁকা থাকত না। কিন্তু তোপা ভাই যে বলল, নিমাসা স্পিরিট ওয়ারিয়র! একটা বাচ্চা মেয়েকে কি দেবতারা ওই দায়িত্ব দিতে পারে? কিন্তু তা যদি না হয়, এই মেয়েটা নিশ্চয়ই ওই একই গ্রামে থাকে। তার সঙ্গে গেলে হয়তো দাদুর খোঁজ পাওয়া যাবে! কিন্তু তার অনুমান যদি ভুল হয়?
টিলু জায়গা থেকে নড়ছে না দেখে মেয়েটা তার ফ্রকের পকেটে হাত দিয়ে কিছু একটা বার করে আনল, তারপর আঙুল তুলে একদিকে দেখাল। টিলু দেখল, মেয়েটার হাতে একটা কাঠের মূর্তি! এইগুলোই তাদের তাঁবুর পিছনের গর্তে ছিল। বোঝাই যাচ্ছে যে মেয়েটা ওগুলো নিয়ে এসেছে, তার মানে সে টিলুদের তাঁবুটা চেনে। টিলুর মনে আর কোনও সন্দেহ রইল না। মেয়েটা তার কোনও ক্ষতি করবে বলে মনে হচ্ছে না। হয়তো সে বলতে চাইছে, ঘোরা হয়ে গেলে সে টিলুকে ফিরিয়ে দিয়ে আসবে। নাহলে টং তো সঙ্গে আছে, ও নিশ্চয়ই ফিরে যাওয়ার পথ বের করতে পারবে। টিলু আর দ্বিধা না করে টংকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েটার পিছন পিছন চলতে লাগল।
ঘন বনের ভিতর দিয়ে পথ। বলাবাহুল্য, সে পথ মানুষের জন্য নয়। গাছের ভাঙা ডাল সিড়ির মতো হয়ে আছে, পায়ের তলায় ভিজে পাতার কার্পেট। সেখানে সজাগ হয়ে বসে আছে হলুদ উইচ্চিঙড়ে, সারেঙ্গি বাজিয়ে গান করছে ঝিঁঝিপোকার দল। গাছের কোটরে বসে থাকা দুটো লক্ষীপ্যাঁচা দেখতে পেল টিলু, তারা কটমট করে টিলুদের দিকে তাকিয়ে আছে। উঁচুনীচু রাস্তা, মাঝেমধ্যে জল জমে আছে, সেই জলের ভিতর প্রতিফলিত হচ্ছে জোনাকিদের আলো। জোনাকির দল তাদের পিছু ছাড়েনি, যেন তাদের পাহারা দিয়ে নিয়ে চলেছে। হাজার হাজার টিমটিমে আলো চোখের সামনে ঘুরপাক খাচ্ছে, ছুটোছুটি করছে, এই উড়ানে আলোর বুকে মাঝেমধ্যে এক একটা আকৃতি ফুটে উঠছে, সে হাতির মুখও হতে পারে, আবার পাল তোলা নৌকাও হতে পারে। আলোর এই অসামান্য ম্যাজিক দেখতে দেখতে পথ চলতে গেলে অনেক কিছুই নজর এড়িয়ে যায়, কিন্তু মেয়েটি সেটা হতে দিচ্ছে না। টিলুর চোখ যাতে সব কিছুই দেখে, সে জন্য মাঝেমধ্যে সে টিলুর হাত ধরে থামিয়ে দিচ্ছে, তারপর আঙুল তুলে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে বিশেষ কোনও গাছ বা পাতার ওপর। ইতিমধ্যে টিলু মনে মনে তাকে নি বলেই ডাকতে শুরু করেছে, মেয়েটা অবশ্য সে কথা জানে না।
কোথায় কচুপাতার ওপর একটা সবুজ গিরগিটি বসে আছে, কোন ব্যাঙের ছাতার ওপর জাবপোকা বা ছাতরাপোকা ঘর বেঁধেছে, কোন গাছের ঝুরির মধ্যে লাক্ষাকীটের বাসা, নি-এর চোখে সব কিছু ধরা দেয়। মাটির ওপর গর্ত করে কত কত রাতচরা পাখি শিকারের আশায় বসে থাকে, মাজরাপোকা নীলমণি লতার ওপর বসে থাকতে ভালোবাসে, ডুমুর গাছের ফুলে নাশপাতির মতো গন্ধ, সে কথা টিলু আগে থোড়াই না জানত। জঙ্গল জুড়ে একটা সবজে আলোর আভা, সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। আর জোনাকিদের আলো তো আছেই।
হাঁটতে হাঁটতে একটা অগভীর ডোবা পড়ল, তার কাছে বড়ো বড়ো পাথর, সেখানে একটা কাঁচাগোল্লার মতো বড়ো লেডি বার্ড বিটল রাজার মতো বসে আছে। লুটকি ফুলের মতো চকচকে তার গা, সেখানে হলুদের ওপর লাল সাদার নকশা, একবার দেখলে আর চোখ সরানো যায় না। নি জামায় ময়লা লাগার পরোয়া না করে সটান সেখানে শুয়ে পড়ল, তারপর চোখ রাখল বিটলটার ওপর। টিলুও সাত পাঁচ না ভেবে শুয়ে পড়ল তার পাশে, তার দেখাদেখি টংও শুয়ে পড়ে ডোবার কাদামাখা জলে একটু গড়াগড়ি খেয়ে নিল। বিটলটার গা থেকে মিন্ট আইসক্রিমের মতো একটা গন্ধ বেরোচ্ছে, তার ইটুকু-টুকু চোখগুলো ঠিক কুঁচফুলের মতো দেখতে। টিলু মুগ্ধ হয়ে গেল। এত কাছ থেকে কোনোদিন সে এমন একটা সুন্দর পোকা দেখেনি। যার গায়ে এত রং, যাকে দেখতে এত সুন্দর, তাকে কি পোকা বলা উচিত?
রাতের জঙ্গল যে এত মনকাড়া, এত মায়াবী, টিলুর সেটা জানা ছিল না। সে কোনোদিন রাতের বেলা জঙ্গলে ঢোকেনি। নি-এর দৌলতে আজ সে এমন সব জিনিস দেখছে, যা তার কল্পনাতেও ছিল না। উইপোকার পরিত্যক্ত ঢিবির মাটি নিয়ে অবিকল ছাতার মতো জিনিস বানিয়েছে একটা খুটাপোতা পাখি, তার নিজের লেজটাও ইয়া বড়ো। রাখালভোলা পাখিগুলো আবার মহা বোকা, গুবরে পোকা খাবে বলে হাঁ করেই আছে। কিন্তু বুদ্ধিমান প্রাণীদেরও অভাব নেই। টিলু অবাক হয়ে দেখেছে, কী অসামান্য দক্ষতায় নীলবর্ণ আঁশপোকার দল বাদাম গাছের পাতায় ক্যাম্প বানিয়েছে, পাতার ডগায় ফ্ল্যাটবাড়ি তুলে ফেলেছে নার্গিস মথ, বনজাই ফুলের পাঁপড়িতে ডিম পেড়েছে প্রজাপতিরা। খরগোশদের সুড়ঙ্গরুপী বাড়িতে ঢোকার যে একাধিক পথ থাকে, জোড়া হরিণ যে পাতা চিবুতে চিবুতে গলা নেড়ে তাল দেয়, বেজি আর বুনো শুয়োর যে কাগজিলেবু গাছের ডগা খেতে ভালোবাসে, সেসব কি টিলু জানত? সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা, এই জঙ্গলের সবাই মনে হচ্ছে নি-কে চেনে। তাকে দেখে কেউই বিচলিত হচ্ছে না, দৌড়ে পালিয়েও যাচ্ছে না। দু একটা লাল সোনাইল কাঠবেড়ালি উল্টে নি-এর কাছে এসে তার হাতের পাতায় উঠে পড়ল, একটা কুনো ব্যাঙ তার কাঁধে বসে কিছুক্ষণ বনদর্শন করে নিল, একটা গিবন বাঁদর গাছ থেকে অর্ধেক নেমে এসে হুপ হুপ করে নি-এর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেষ্টা করল, যেন তাকে সেলাম জানাচ্ছে।
টিলুরা চলেছে তো চলেইছে। পথ এইবার ক্রমে একটু চড়াই হচ্ছে, মাঝেমধ্যে আকাশ দেখা যাচ্ছে। নি-এর তাতে কোনো হেলদোল নেই, টংও দিব্যি মেজাজে চলেছে, একবারের জন্যও সে ডাকাডাকি করেনি এতক্ষণে। টিলুর একটানা এতক্ষণ ধরে জঙ্গলের পথে চলার অভ্যেস নেই, সে একসময় হাঁফিয়ে পড়ল। হাঁটুর ওপর হাত রেখে সে ডাকল, “নি! দাঁড়া দাঁড়া! আমি আর চলতে পারছি না।”
নি থেমে গেল। সে এগিয়ে এসে টিলুর হাত ধরল, বাঁ হাতে পকেটে ঢুকিয়ে কিছু একটা বের করে তাকে দিল। টিলু সেটা হাতে নিয়ে দেখল, একটা কাগজে মোড়া পিপারমিন্ট। সে একটু অবাক হয়ে সেটা মুখে চালান করে দিয়ে হাতের ইশারায় কাগজটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, এটা সে কোথায় পেল? নি চুল ঝাঁকিয়ে একটু হাসল, তারপর আঙুল দিয়ে দূরের দিকে ইশারা করল।
“ওখানে তোদের গ্রাম আছে?” টিলু কথা বলার পাশাপাশি দু হাতে অঙ্গভঙ্গি করে বাড়ির আদল দেখানোর চেষ্টা করল।
নি ওপর নীচে মাথা হেলাচ্ছে। তার মানে, এটাই সেই মাসাদের গ্রাম। টিলু বুঝতে পারল না, এইবার সে কী করবে? নি তার কথা বুঝতে পারবে না, নাহলে সে তাকে দাদুর কথা জিগ্গেস করতে পারত! আচ্ছা, দাদুই কি নি কে এই পিপারমিন্টটা দিয়েছে?
কিন্তু টিলু আর কিছু জিজ্ঞেস করার সুযোগ পেল না। সহসা ভীষণ জোরে বৃষ্টি নামল, অনেক দূরে কড় কড় কড়াৎ করে একবার বাজে পড়ার শব্দ হল। টং ভয় পেয়ে আঁউ আঁউ করে ডেকে উঠল এইবার। নি চমকে উঠে একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর টিলুর হাত ধরে ছুটতে শুরু করল।
এবড়োখেবড়ো রাস্তা, মাটির পাশাপাশি পাথরও আছে, নাহলে দৌড়তে খুবই অসুবিধা হত। নি চটপট চড়াই ভেঙে উঠতে শুরু করল, তার পিছনে টিলু। টং আগে আগে চলেছে। ছুটতে ছুটতে টিলু দেখল, আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত অবধি একটা রক্তিম আলোর রেখা ফুটে উঠল, সেই আলোয় দেখা গেল তারা বেশ উঁচু একটা জায়গায় উঠে এসেছে। কিছুটা দূরেই একটা পাথরের চাতাল, সেখানে একটা গুহার মুখ দেখা যাচ্ছে। টিলু অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে ছিল। আকাশে একটা লাল রঙের আলো ছড়িয়ে পড়েছে, সেই রক্তবর্ণ আলোর বুকে কেউ রূপোর ধারালো ছুরি দিয়ে এফোঁড় ওফোঁড় করছে বলে মনে হল। এইবার তুমুল জোরে বাজ পড়বে। কিন্তু নি টিলুকে সেটা দেখতে দিল না। সে তার হাত ধরে টানছে।
দুজনে দৌড়ে গিয়ে গুহার ভিতরে ঢুকতে না ঢুকতেই ভয়ংকর জোরে একটা শব্দ হল, মাটি কেঁপে উঠল থরথর করে। টিলুর মুখ বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে, টং ডাকাডাকি করতে শুরু করেছে। শুধু নি-এর মুখে ভয়ের বিশেষ চিহ্ন দেখা গেল না। সে টিলুর কপালে হাত রেখে বিড়বিড় করে কিছু বলতে লাগল। হয়তো দু এক মুহূর্ত হবে, তারপরেই টিলুর মনে হল নি এর হাত থেকে একটা সোনালি আলো বেরিয়ে এসে তাকে জড়িয়ে ধরেছে, সেই আলোয় একটা উষ্ণতা আছে। ভয় কেটে যাচ্ছে, একটা নিরাপত্তার ভাব এসে স্বস্তি দিচ্ছে তাকে। টিলুকে ছেড়ে দিয়ে এইবার নি টংকে শান্ত করতে চলে গেল। টিলু অবাক হয়ে দেখল, গুহার ভিতরে যেন মোমবাতির শিখার মতো সোনালি আলো খেলা করে বেড়াচ্ছে। এইবার সেই সোনালি আলোর শিখাগুলো হাওয়ায় সাঁতার কেটে জঙ্গলের মধ্যে বেরিয়ে গেল, তারপর ম্যাজিকের মতো মিলিয়ে গেল বনের মধ্যে। এর কয়েক মুহূর্ত পরেই দেখা গেল, হাজারে হাজারে রঙিন আলোর শিখা আকাশের দিকে উঠে যাচ্ছে। এই আলোর মালার দিকে তাকিয়ে টিলু বুঝে গেল, কাল সন্ধ্যাবেলা সে এরকমই একটা দৃশ্য দেখেছিল।
গুহার ভিতর থেকে চিটপিট শব্দ শুনে টিলু চোখ ফিরে তাকাল। নি একপাশে আগুন জ্বালিয়ে ফেলেছে, সেখানে কিছু কাঠকুঠো, মাটির হাঁড়িকুড়ি, আরো কীসব ইত্যাদি রাখা আছে। টিলু এইবার ভালো করে গুহার ভিতরটা দেখল। বেশ বড়ো গুহা, শেড আছে বলে বাইরের বৃষ্টির জল এখানে পৌঁছায় না। গুহার দেওয়াল জোড়া মৃত্তিকা ফলক, সেখানে প্রচুর আঁকা আর লেখা খোদাই করা আছে। পুরো গুহাটা বোঝাই করা আছে এই ফলকগুলো দিয়ে। সেগুলো দেখেই টিলু বুঝে গেল, এই সেই তাই আহোম ভাষা। বাবা, তোপা, দাদু, সবাই এই ভাষার রহস্য জানার জন্যই মাথা ঘামাচ্ছে। টিলু দেওয়ালের কাছে গিয়ে যত্ন করে সেই লেখাগুলোর ওপর হাত বুলোতে লাগল। এই লেখার মধ্যে হয়তো নি এর গ্রাম, ওর মা বাবা, ওর পূর্বপুরুষদের কথা লেখা আছে! কিন্তু টিলু তো এই ভাষা পড়তে পারে না। আচ্ছা, নি কে তো ইংরেজি বা বাংলা শিখিয়ে দেওয়া যায়! তাহলে সে সবাইকে নিজের ভাষার কথা জানাতে পারবে, শেখাতেও পারবে।
নি ততক্ষণে একটা পাত্রে কিছু একটা ঢেলে নিয়ে এসেছে। সেটা টিলুর দিকে এগিয়ে দিয়ে সে হাসল। টিলুও হাসল। চামচ নেই। কিন্তু নি এর কাছে চামচ চাওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। সে হাত দিয়ে কিছুটা তুলে মুখে দিল! বেশ ভালো খেতে! বাবার করা পায়েসের মতোই অনেকটা, কিন্তু মিষ্টি একটু কম, চালটাও একটু অন্যরকম, একটা মাটি মাটি গন্ধ আছে, তাতে স্বাদ আরো বেড়েছে। টংকে দিয়ে নি তার পাশে এসে বসল, তার হাতেও সেই পায়েস। দুজনে আস্তে আস্তে সেই পায়েস খেতে লাগল। বাইরে জোরে বৃষ্টির হচ্ছে, মেঘ ডাকছে, তার সঙ্গে চলছে আলোর খেলা। এরকম সময়ে এমন পায়েস পেলে আর কী চাই?
খাওয়াদাওয়া হলে দুজনে মিলে বাসনকোসন মেজে ফেলল। টং ইতিমধ্যে আরাম পেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে, কিন্তু টিলুর ঘুম এল না। একপাশে পুরু পাতার গাদা, সেখানে আধশোয়া হয়ে বসে সে আর নি কথা বলতে লাগল। কেউ কারো ভাষা জানে না, কিন্তু কথা চালানোর চেষ্টা করতে গিয়ে দেখা গেল, খুব একটা অসুবিধা হচ্ছে না। টিলুর মনে পড়ে গেল, তাড়াতাড়িতে প্যান্টের পকেট থেকে কাগজগুলো বের করা হয়নি। অনেকগুলো খালি কাগজ রয়ে গিয়েছে, সেখানে ছবি এঁকে কথা চালানোর চেষ্টা করা যায়। সেগুলো বের করতে গিয়ে সে দেখল, ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুটের প্যাকেটটাও অর্ধেক রয়ে গিয়েছে। সেটা নি-কে ধরিয়ে সে ছবি আঁকতে লাগল। বাবার ছবি, তোপার ছবি, টং লিং, বুগুন রাজা, সমাধি স্থল…সেগুলো ঠিক আসল মানুষের মতো হল না বটে, কিন্তু ছবি আঁকা ছাড়া উপায়ই বা কি! নি বিস্কুট পেয়ে বেশ খুশি হয়েছে মনে হচ্ছে, সে হাসিমুখে সব ছবিগুলো দেখে অচেনা ভাষায় অনেক কিছু বলে যেতে লাগল। সেসব টিলু কিছুই বুঝতে পারল না। শেষমেশ নি একটা কাগজ টেনে পেন্সিল দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করল। আঁকছে তো আঁকছেই। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে টিলুর ঘুম এসে গেল।
টিলুর যখন ঘুম ভাঙল, বৃষ্টি থেমে গিয়েছে। মেঘ কেটে গিয়েছে অনেকটা,ভোরের আলো দেখা যাচ্ছে। নি তাকে উঠতে দেখে হাসল, তারপর তার হাতের কাছে পড়ে থাকা ছবিটা টিলুর দিকে এগিয়ে দিল। টিলু সেটা তুলে নিয়ে দেখল, নি একটা গ্রামের ছবি এঁকেছে। সেখানে একটা পুজো হচ্ছে। কয়েকটা কুঁড়েঘর,সাতটা প্রতিমা সাজানো, তার সামনে বসে কয়েকজন মানুষ, পিছন দিয়ে একটা ছোট্ট নদী বয়ে যাচ্ছে। ছবিটা দেখে টিলু তাজ্জব হয়ে গেল। এ তার মতো আনাড়ি হাতের কাজ নয়, নি যথেষ্ট ভালো এঁকেছে। একজন পরিণত শিল্পীর আঁকার সঙ্গে সঙ্গে তার আঁকায় কোনও তফাৎ নেই। নি এত ভালো আঁকতে শিখল কী করে?
সে বোকার মতো নি-এর দিকে তাকাতে সে তাকে বাইরের দিকে গিয়ে দাঁড়াতে ইশারা করল। টিলু টংকে তুলে গুহার মুখের কাছে গিয়ে দাঁড়াল। মিঠে হাওয়া বইছে, জেব্রা বনের ঝাপসা গাছপালা দেখা যাচ্ছে, পাখিদের কলকাকলি শুরু হয়ে গিয়েছে। পূর্ব দিকে অপরাজিতা ফুলের মতো গাঢ় নীল রং ছড়িয়ে গিয়েছে।এইবার সূর্য উঠবে, ধীরে ধীরে রোদ উঠলে এই নীল রং বদলে গিয়ে আকাশটা লালচে কমলা হয়ে যাবে। কি সুন্দর!
নি এর মধ্যে আবার চা করে এনেছে! টিলু মনে মনে বলল, ওইটুকু মেয়ের কি ক্যালি! সব পারে! এই অঞ্চলের ভেষজ চা এর স্বাদ এমনিতেও দারুণ, কিন্তু এখন যেন আরো ভালো লাগছে। ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুটগুলো তখনও দু চারটে ছিল,চায়ের সঙ্গে বিস্কুটে কামড় দিয়ে নি এর পাশে বসে পড়ল টিলু। দুজনেই চুপ করে সামনের আকাশের দিকে চেয়ে রইল। সেখানে একটু একটু করে সূর্য উঠছে।বাতাসে একটু শীত শীত ভাব! পকেটে হাত ঢোকাতে গিয়ে টিলু দেখল, বাঁ পকেটে এখনও কিছু একটা রয়ে গিয়েছে। সেটা বের করে আনতেই সে চমকে উঠল। আরে! এ যে দাদুর সেই ছবিটা! সেদিন স্কার্ফে জড়িয়ে রেখে দিয়েছিল।টিলু তাড়াতাড়ি সেটা নি-এর দিকে এগিয়ে দিল, তারপর ছবিটার ওপর আঙুল রেখে নিজেকে দেখিয়ে বলল, “আমার দাদু। মাই গ্র্যান্ডফাদার! তুমি কি ওকে দেখেছো?”
নি এর কোমল মুখে একটা অন্যরকম হাসি ফুটে উঠল। সে ঠোঁট টিপে হাসল,তারপর আঙুল দিয়ে দূরের দিকে দেখাল।
“দাদু তোমার গ্রামে আছে?” টিলু নি-এর আঁকা ছবিটা দেখিয়ে উত্তেজিত হয়ে বলল, “আমাকে সেখানে নিয়ে যাবে?”
নি ঘাড় নাড়ল। সে নিয়ে যাবে। টিলু নি-কে ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে বুঝল সে কিছুই বুঝবে না, একটু ভেবে সে একটা ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট বের করে নি এর মুখের কাছে ধরে হাসল। নি একটু অবাক হয়ে সেটায় কামড় দিতেই টিলুর চোখ জ্বালা করে উঠল। কিছু বোঝার আগেই চোখ থেকে হুড়মুড়িয়ে জল পড়তে শুরু করল। টিলুর মনে পড়ে গেল, তাড়াহুড়োতে কাল রাতে ওষুধ দেওয়া হয়নি চোখে!টিলু জোর করে মুখের হাসিটা বজায় রাখার চেষ্টা করল, কিন্তু পারল না। যন্ত্রণায় তার মুখটা বেঁকে যাচ্ছে। সে চোখ বন্ধ করে মাটিতে শুয়ে পড়ল। কয়েক মুহূর্ত ছটফট করতেই সে অনুভব করল, তার দু চোখের ওপর দুটো ছোটো ছোটো হাত। সেই হাত থেকে নির্গত উষ্ণতা যেন তার চোখের ভিতর ঢুকে যাচ্ছে, ঢুকে যাচ্ছে সমস্ত শরীরে। ক্রমে তার চোখের ব্যথা কমে আসছে, সে আবার চোখ খুলতে পারছে। চোখ খুলেই সে দেখল, নি তাকে জড়িয়ে ধরে আছে, তারও দু চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। দুজনে কিছুক্ষণ একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইল, কিন্তু কেউই কোনও কথা বলল না। দুজনে দুজনের হাত ধরে আছে, ধরেই আছে।
আচমকা টিলুর মনে হল, এই মেয়েটা তার খুব, খুব আপন। আচমকা টিলু বুঝতে পারল, মামিলাপিনাতাপাই কথাটা মোটেও মিথ্যে নয়।
১৪
প্রায় এক ঘণ্টা ধরে খোঁজাখুঁজি করেও টিলুর কোনও সন্ধান পাওয়া গেল না।
সপ্তর্ষির মুখটা কালো হয়ে গিয়েছে, তোপারও কপালে ভাঁজ। রিও আর ইনাও আশেপাশের জঙ্গল ঘুরে এসেছে ইতিমধ্যে, টিলু কোথাও নেই।
“ছেলেটা যাবে কোথায়?” তোপা ঝাঁকড়া চুল চেপে ধরে বলল।
রিও উবু হয়ে বসে বিড়ি খাচ্ছিল। সে মাথা চুলকে বলল, “টিলুবাবুকে কেউ ধরে নিয়ে যায়নি তো?”
“চুপ করো তো!” তোপা ঝামরে উঠল, “এই জঙ্গলের মধ্যে কোন ছেলেধরা তাকে ধরতে আসবে? আসবেই বা কেন?”
“না মানে!” রিও কিন্তু কিন্তু করে বলল, “আপনারা ওই শমনদের পোষা ভূতটার কথা বলছিলেন তো…!”
“ভূত!” তোপা রাগতে গিয়ে হেসে ফেলল, “ভূত নয় রে পাগলা, স্পিরিট…! আহ, তুই বুদ্ধি খরচ না করে চা বসা তো! মাথাটা একদম জ্যাম হয়ে আছে সকাল থেকে।”
রিও চা বসাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। তোপা পাথরে হেলান দিয়ে সপ্তর্ষিকে বলল, “তুই চিন্তা করিস না সপু। এখানে টিলুকে ধরে নিয়ে যাওয়ার কেউ নেই। আমার বিশ্বাস, ও নিজেই কোথাও গিয়েছে। সঙ্গে টং আছে, ও কিছুতেই ওকে বিপদে পড়তে দেবে না।”
“ঠিকই বলেছিস!” সপ্তর্ষি বলল, “টিলু যে নিজে নিজেই গিয়েছে তাতে আমারও কোনও সন্দেহ নেই। তাঁবুর জিপ খোলা ছিল, ওর জুতোটাও নেই। মুশকিল হল, ও যদি নিজে নিজেও গিয়ে থাকে, এতক্ষণে ওর ফিরে আসা উচিত ছিল। ওষুধ ছাড়া ও বেশিক্ষণ থাকতে পারে না। কাল উত্তেজনার মধ্যে রাতের ডোজটাও দেওয়া হয়নি। আমার চিন্তা হচ্ছে, ও পথ হারিয়ে ফেলল না তো?”
“চান্স কম!” তোপা চুলে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বলল, “টিলু হারিয়ে গেলেও টং ঠিক ওকে ফিরিয়ে আনত।”
সপ্তর্ষি কিছুক্ষণ গুম হয়ে বসে রইল। রিও ইতিমধ্যে চা দিয়ে গিয়েছে। চায়ে চুমুক দিয়ে সে বলল, “লিংকে নিয়ে আয় তো একবার! পিছনের পাথরগুলো একবার দেখে আসা যাক!”
সবাই মিলে সেখানে পৌঁছাতেই অবাক হয়ে গেল। কাঠের মূর্তিগুলোর কোনও চিহ্ন নেই। সপ্তর্ষি অবাক হয়ে বলল, “এ আবার কী! টিলু এগুলো নিয়ে যাবে কেন?”
তোপাও এইবার গম্ভীর হয়ে গিয়েছে। টিলু যথেষ্ট বুদ্ধিমান ছেলে, তার কাছে এরকম কিছু আশা করা যায় না। টোটেম বা মূর্তি যাই হোক, সেগুলো নেওয়ার তো প্রশ্নই নেই। ও এসব ব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন, কখনও অবাধ্যতা করে না। তাহলে কি অন্য কেউ এখানে এসেছিল? সে রিও আর ইনাওকে জায়গাটা খুঁজে দেখতে বলল। লিং যদি কোনও সূত্র বার করতে পারে!
বেশিক্ষণ সময় লাগল না। লিং একটা জায়গায় শুঁকে চাপা গলায় ডেকে উঠল। রিও লাফিয়ে উঠে বলল, “লিং গন্ধ পেয়েছে তোপা ভাই। কাল এখানে অন্য কেউ এসেছিল মনে হচ্ছে। এই দেখো, ধুপের গুঁড়ো।”
তোপা ব্যস্ত হয়ে বলল, “চল চল! ওকে নিয়ে এগোতে হবে। চটপট জিনিসপত্র গুছিয়ে নাও। টিলুর জন্য একটা নোট লিখে এখানে পাথরে চাপা দিয়ে দে সপু। ও ফিরে এলে যেন এখানেই অপেক্ষা করে। বিকেলের মধ্যে ওকে খুঁজে না পেলে আমরা এখানেই ফিরে আসব।”
মিনিট কুড়ির মধ্যেই বেরিয়ে পড়া হল। কাল রাতে জোর বৃষ্টি হয়েছে বলে মাটি একেবারে কাদা প্যাচপ্যাচে হয়ে আছে, যেখানে সেখানে জল জমে আছে। সকাল বেলাতেও মনে হচ্ছে সন্ধে নেমে গিয়েছে। কিছুটা এগিয়ে যেতেই লিং ভৌ ভৌ করে ডেকে উঠল। ইনাও তাকে ধরেছিল। সে মাটির ওপর চোখ রেখে বলল, “লিং মনে হয় টিলুবাবুর পায়ের ছাপ দেখতে পেয়েছে।”
ঠাহর করে দেখে বোঝা গেল, ইনাও ঠিকই বলেছে। একটা বাচ্চার জুতোর ছাপ এগিয়ে গিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। তার সঙ্গে একটা কুকুরের পায়ের ছাপও আছে। জলকাদা জমে যাওয়ার ফলে সেগুলো বুঝতে অসুবিধা হচ্ছে বটে, কিন্তু লক্ষ করলে দেখা যায় ঠিকই। সপ্তর্ষি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “অল রাইট। এই পায়ের ছাপ লক্ষ করেই এগোনো যাক। দেখা যাক কিছু মেলে কিনা!”
মিনিট কুড়ি হাঁটার পর এক ফালি মাঠের মতো জায়গা দেখতে পাওয়া গেল। সেখানে বড়ো বড়ো ঘাসের জঙ্গল, পায়ের ছাপ বোঝার কোনও উপায়ই নেই। মাঠের আগে একটা জায়গায় চোখ রেখে ইনাও বলল, “টিলুবাবু এখানে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়েছিলেন মনে হচ্ছে। মাটি বসে গেছে অনেকটা। হয়তো মাঠের মধ্যে কিছু দেখতে পেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে পড়েছিলেন।”
সপ্তর্ষি মাথা নাড়ল। এরকম করে গোয়েন্দাগিরি করার চেষ্টা করে বিশেষ লাভ হবে বলে মনে হয় না। মাঠ পেরিয়ে গভীর জঙ্গল, মাঝেমধ্যে গাছের ভাঙা ডাল আর গুঁড়ি পড়ে আছে, সেখানে পায়ের ছাপ দেখতে পাওয়ার প্রত্যাশা করাটা বাড়াবাড়ি। কিন্তু উপায় যখন নেই, তখন কি আর করা! যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখ তাই! রতন যদি সত্যিই মেলে! সবাই ঘাসের ময়দান পেরিয়ে সামনের দিকে এগোল। জলকাদার মধ্যে কিছুই ঠাহর করা যায় না। ইনাও টিলুর একটা মোজা লিং এর নাকের সামনে ধরেছে, সে এটা সেটা শুঁকতে শুঁকতে এগোচ্ছে।
প্রায় আধ ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর আরেকটা পায়ের ছাপ পাওয়া গেল। জায়গাটা ওই ঘাসের ময়দান থেকে কিছুটা দূরে, কাছেই একটা ডোবা মতন আছে। মেঘের ফাঁক দিয়ে রোদ্দুর পরে সেখানকার জল চিকমিক করছে। রিও প্রায় মাটির কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে বলল, “তোপা ভাই, এটা দেখো!
শুধু তোপা নয়, প্রায় সকলেই ঝুঁকে পড়ল জায়গাটার ওপর। কাদার ওপর টিলুর জুতোর ডিজাইন দেখে চিনতে কষ্ট হয় না, কিন্তু টিলুর পাশাপাশি আরেকটা ছাপ চোখে পড়ছে। সেটাও কোনও বাচ্চার, আকারে প্রায় একই। আশ্চর্যের কথা হল, সেটা খালি পায়ের ছাপ।
তোপা আর সপ্তর্ষি মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। তোপা বলল, “ব্যাপার কী বল তো?”
“হুম!” সপ্তর্ষি বাঁ দিক ডান দিক ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, “মনে হচ্ছে ওই ঘাসের ময়দানে অন্য কোনও বাচ্চার সঙ্গে দেখা হয়েছিল টিলুর। সেই ওকে নিয়ে গিয়েছে।”
“আমি বলেছিলাম না তোপা ভাই!” রিও মাথা নেড়ে বলল, “ওই শমনদের ভূতটা টিলুবাবুকে ভুলিয়েভালিয়ে নিয়ে গেছে।”
তোপা খাপ্পা হয়ে বলল, “ধুস তোর ভূতের নিকুচি! ভূত বলতে যার কথা তুই বলছিস, সে ওদের গ্রামের রক্ষক, টিলুকে ধরে ওর কী লাভ? আর সাতজন দেবতা আর এতজন শমন মিলে একজন বাচ্চাকে রক্ষক করবে বলছিস?”
“ওরা রূপ বদলাতে পারে!” ইনাও মুখ নীচু করে বলল, “শমনদের ভূত তো, ওদের বিশ্বাস নেই।”
তোপা হাল ছেড়ে দিয়ে সপ্তর্ষির দিকে চাইল। সপ্তর্ষি ব্যাগ নামিয়ে রেখে বলল, “ছদ্মবেশি ভূতই যদি হয়, তাহলে তো টংয়ের তাকে চিনে ফেলার কথা। তুমি যে সেদিন গ্রামে বলছিলে, টং আর লিং নাকি ভূত পিশাচ তুয়াল সুমসু কাউকেই ডরায় না।”
এই কথার উত্তর রিও আর ইনাও খুঁজে পেল না। সপ্তর্ষি আবারও ব্যাগ কাঁধে তুলে নিয়ে বলল, “এগিয়ে যাওয়া যাক।
ঘণ্টা দুয়েক ট্রেক করার পরেও তেমন কোনও সূত্র পাওয়া গেল না। টিলুদের পায়ের ছাপ উধাও হয়েছে, মাসাদের গ্রামেরও কোনও চিহ্ন নেই। সপ্তর্ষি মাটির দিকে চোখ রেখে চলেছে, তোপার গলায় বাইনোকুলার। হাঁটতে হাঁটতে সপ্তর্ষি বলল, “আচ্ছা, একটা কথা বল তো! কাল যে আমরা ওই পাথরের গর্তের মধ্যে ক্লে পটের লেখাগুলো খুঁজে পেলাম, সেগুলো ওখানে লাগিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যটা কী?”
“মানে?” তোপা ঠিক বুঝতে পারল না। সে একটা শোয়ানো গুঁড়ির ওপর বসে পড়ে সপ্তর্ষির দিকে তাকাল।
“মানে…” সপ্তর্ষি দাঁড়িয়ে পড়ে বলল, “শিলাফলক বা মৃত্তিকা ফলক ব্যাপারটা তো আসলে ডকুমেন্ট আর্কাইভিং টেকনিক। মেসোপটেমিয়ার সভ্যতা বল বা হরপ্পা, মৃত্তিকা ফলক বানিয়ে ইতিহাস লেখার অভ্যেস সেখানকার সাধারণ লোকের ছিল না। এসব কাজ সাধারণত সমাজের ইন্টেলেকচুয়াল বা শিল্পীদের জন্য বরাদ্দ থাকত। এখনও তো প্রায় তাই। ঠিক কি না?”
“তুই কিছু একটা বলতে চাইছিস মনে হচ্ছে?” তোপা ভুরু কুঁচকে তাকাল।
সপ্তর্ষি মাথায় আঙুল চালিয়ে জবাব দিল, “যদি ধরে নিই যে মাসাদের এই স্পিরিট ওয়ারিয়র বলে সত্যিই একজন আছে, আর সে কিনা এই গোষ্ঠীর ভাষা বাঁচানোর চেষ্টা করছে, সেক্ষেত্রে আমার ধারণা, এই মৃত্তিকা ফলকগুলো তারই তৈরি। ভেবে দেখ, যদি একটা উপজাতি শ্রিঙ্ক হতে থাকে, তাদের ভাষা বলার লোক কমে আসতে থাকে, তাহলে সেই ভাষাকে রক্ষা করার কোনও উপায় আছে কি? যত বড়ো শমন, যত বড়ো যোদ্ধা, যত বড়ো স্পিরিট ওয়ারিয়রই হোক না কেন, এই বিলুপ্তিকে ঠেকিয়ে থাকার ক্ষমতা কারোরই নেই। প্রকৃতির নিয়মে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, বিলুপ্ত হয়ে যায়। এটাই আবহমান সত্য। আর ভুলে যাস না, মাসা গোষ্ঠী প্রকৃতিকে সম্মান করার ব্রতও নিয়েছিল। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের বিরুদ্ধে তারা কিছুতেই যাবে না।”
“তাহলে?” তোপার ভুরু কুঁচকে গেছে।
“তাহলে এরকম কোনও ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার একমাত্র উপায়, সে ভাষাটাকে ডকুমেন্ট করে রাখা। সেই ভাষার ব্যাকরণ, সাহিত্য, সংস্কৃতি, ইতিহাসকে লিখে রাখা। এই লেখাগুলোকে যদি বাঁচিয়ে রাখা যায়, তাহলে হয়তো ভাষাটা বেঁচে গেলেও যেতে পারে। হ্যাঁ, সক্রিয় ভাবে সেই ভাষা জীবন্ত থাকবে না ঠিকই, কিন্তু তবু বেঁচে তো থাকবে। মায়ান, লিভোনিয়ান, ডালমেশন, আইনু, লিওনিজ, এমনকি সংস্কৃতকেই ধর না, কতজন আর এই সমস্ত ভাষায় কথা বলে বল? কিন্তু ভাষাগুলো এখনও বহাল তবিয়তে বেঁচে আছে, তাদের নিয়ে গবেষণাও চলছে। এদের মধ্যে যে সমস্ত ভাষা হারিয়ে গিয়েছিল, তাদেরও রিভাইভ করা হয়েছে। সেটা সম্ভব হয়েছে, কারণ সেই সমস্ত ভাষার ডকুমেন্টেশন আমরা পেয়েছিলাম।”
তোপার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উত্তেজিত হয়ে বলল, “তার মানে, এই স্পিরিট ওয়ারিয়র আসলে একজন শিল্পী ছাড়া কিছু নয়।”
“সম্ভবত!” সপ্তর্ষি বলল, “এখন তার মধ্যে অলৌকিক কিছু ক্ষমতা থাকলেও থাকতে পারে, সেসব নিয়ে আমি কিছু বলছি না। এথনোগ্রাফিক এভিডেন্সে এমন অনেক প্রমাণিত তথ্য আছে, যেখানে একজন মানুষ বা গোষ্ঠীর মধ্যে বিশেষ কিছু ক্ষমতার সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। তার কতটা গুজব, কতটা সত্যি, সে সব নিয়ে আলোচনা অবান্তর। সেদিক থেকে দেখতে গেল টিলুর চোখের সমস্যাটা একটা অসুখ, আবার সেটাকে একটা ক্ষমতাও বলা যায়। ওই ক্ষমতার কারণেই আমরা এতগুলো সূত্র খুঁজে পেয়েছি, সেটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।”
তোপা সপ্তর্ষির কাঁধে চাপড় মেরে বলল, “একশোবার। তা তোর কথাটা যদি সত্যি হয়, সেক্ষেত্রে সেই স্পিরিট ওয়ারিয়র বা শিল্পী যেই হোক না কেন, শুধু একটা দুটো মৃত্তিকা ফলক লিখে ক্ষান্ত হবে না। মাসা গোষ্ঠী ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে, তাতে কোনও সন্দেহ নেই। সেক্ষেত্রে সে এই আর্কাইভালের কাজটা আরো দ্রুত গতিতে করতে চাইবে, আরো অনেক শিলালেখ আর মৃত্তিকা ফলক তৈরি করতে চাইবে।”
“কিংবা!” সপ্তর্ষি চোখ বন্ধ করে বলল, “সেটা সে ইতিমধ্যেই করে ফেলেছে। সেসব কোনো জায়গায় স্টোর করে রাখা আছে, তার কাজ শুধু সেগুলো বিভিন্ন জায়গায় ইনস্টল করে আসা। আমার ধারণা, এই ইনস্টলেশনের সময় তাকে সেই সাতজন দেবতাদের আশীর্বাদ নিতে হয়, গোষ্ঠীর নিয়ম মেনে তাদের উপাসনা করতেই হয়। কিন্তু একবার এই মৃত্তিকা ফলক বাইরের মানুষের হাতে পড়লেই মিশন সাকসেসফুল। তখন এই দেবতাদের, মানে দেবতার মূর্তিদের আর কোনও কাজ থাকে না সেখানে!”
তোপা স্তম্ভিত হয়ে কয়েক মুহূর্ত বন্ধুর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আস্তে আস্তে বলল, “তুই বলছিস…”
“ঠিক ধরেছিস!” সপ্তর্ষি শান্ত গলায় বলল, “তাঁবুর সামনে জ্বালানো আগুন দেখে হয়তো সে আমাদের উপস্থিতি বুঝতে পেরেছিল। মোদ্দা কথা হল, আমাদের ধারণা যদি ঠিক হয়, এই ধরনের আরো বহু মৃত্তিকা ফলক ইতিমধ্যেই আঁকা হয়ে গিয়েছে এবং সেগুলো সযত্নে কোথাও রাখা আছে। এই বনের মধ্যে এই ধরনের জিনিস যত্ন করে রাখার জন্য ভালো জায়গা কী হতে পারে?”
তোপা উত্তর দেওয়ার চেষ্টা না করে রিওদের দিকে ফিরে চেঁচিয়ে বলল, “এখানে কোনও গুহা ফুহা আছে নাকি?”
রিও বলল, “আসার সময় ডানদিকে যে পাথুরে রাস্তাটা চড়াই উঠে গিয়েছিল, সেখানে কয়েকটা গুহা আছে মনে হয়। মনে নেই তোপা ভাই, জায়গাটা কাল দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল।”
তোপার মনে পড়ে গেল। তাই তো! সে এক লাফে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চল চল। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমাদের সেই গুহায় পৌঁছাতে হবে।”
চড়াই রাস্তাটা ধরে কিছুদূর এগোতেই গুহাগুলো দেখা গেল। তোপা বাইনোকুলার চোখে লাগিয়ে বলল, “ওটা কী দেখ তো!”
সপ্তর্ষি বাইনোকুলারটা তার কাছ থেকে নিয়ে চোখে লাগাল, তারপর উত্তেজিত হয়ে বলল, “ওটাই তো টিলুর স্কার্ফটা। টিলু নিশ্চয়ই ওখানেই আছে।”
দ্বিগুণ উৎসাহে পথ চলতে লাগল সবাই। লিং ছুটতে ছুটতে এগিয়ে গিয়েছে আগেই। গুহার সামনে পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না। পাথরের ওপর টিলুর স্কার্ফটা বাঁধা ছিল, সেটা খুলে নিয়ে তারা গুহার ভিতর পা রাখল। সেখানে ঢুকেই বিস্ময়ে তাদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠল। সারা গুহার দেওয়াল জুড়ে শত শত মৃত্তিকা ফলক সাজানো, সেগুলোর ওপর খোদাই করা হরফ গিজগিজ করছে। সপ্তর্ষিরা চোখ ছানাবড়া করে সেগুলো দেখতে লাগল, তাদের মুখে কথা সরছে না। তোপা আনন্দে অভিভূত হয়ে মাটিতে বসে পড়েছিল, সপ্তর্ষি তাকে তুলে ধরল। ছবিগুলো অসম্ভব পরিণত, কাঁচা হাতের কাজ মোটেও নয়। উত্তেজনা থিতিয়ে আসতে কিছুটা সময় লাগল। সপ্তর্ষি গুহাটা জরিপ করে দেখল। একপাশে রান্নার কিছু জিনিস, সঙ্গে কিছু ছেনি হাতুড়ি আর রং করার সরঞ্জাম পড়ে আছে। পাতার গাদার ওপর কিছু ছবি, সেগুলো সম্প্রতি আঁকা হয়েছে।
“টিলুর আঁকা!” সপ্তর্ষি দেখেই বলে উঠল, “কিন্তু ছেলেটা গেল কোথায়?”
তোপা ফটাফট ছবি তুলছিল। তার বিস্ময় যাচ্ছে না। সে অস্ফুট শব্দ করে বলল, “এ তো সত্যিই গুপ্তধন রে! এতটা আমি আশা করিনি। লগোগ্রাফিক ছবি আর তাই আহোম টেক্সট, দুই ভাষাতেই লেখা আছে। এত বড়ো আবিষ্কার এর আগে হয়নি। আমরা এখানে আসতে পারতাম কিনা সন্দেহ আছে। টিলু এখানকার খবর জানল কী করে? তোর ছেলেটা সত্যি ম্যাজিক ফ্যাজিক জানে না কি?”
“টিলু! টিলু!” সপ্তর্ষি চেঁচিয়ে ডাকল।
“টিলুবাবু! টিলু! মিস্টার পটার! কোথায় তুমি?”
সবাই যখন ডেকে ডেকে হয়রান, তখন জঙ্গলের ভিতর থেকে একটা বাঁশির শব্দ ভেসে এল। সবাই উদগ্র চোখে সেদিকে তাকাল। না, টিলু নয়! এক বৃদ্ধ এগিয়ে আসছেন তাদের দিকে। তাঁর বয়স সত্তর পেরিয়ে গিয়েছে, কিন্তু মুখে শিশুদের মতো একটা লালিত্য লেগে আছে। তাঁর হাতে একটা বাঁশের তৈরি বাঁশি। এতক্ষণ সেটাই বাজাচ্ছিলেন তিনি। তিনি সপ্তর্ষিদের সামনে এসে হাতজোড় করে দাঁড়ালেন,তারপর স্থানীয় ভাষায় বললেন, “নমস্কার। আমি আপনাদের টিলুর কাছে নিয়ে যেতে এসেছি।”
১৫
মাসাদের গ্রামটা দেখে দূর থেকে মনে হয়, জঙ্গলের ভিতর কেউ আরেকটা জঙ্গল বানিয়ে দিয়েছে। দুটো জঙ্গল একে অপরের মধ্যে মিশে গিয়েছে। কোনটা গ্রামের অংশ আর কোনটা জঙ্গল, সেটা বোঝার কোনও উপায় নেই। কথায় বলে, সুন্দরের বিকল্প সুন্দর। এই গ্রামটা দেখে সে কথা মনে পড়ে যায়। নোনা ইট, পাথর, কংক্রিট, ঝামা, সিমেন্ট কিছুই নেই, কিন্তু গেরস্তের ঘরদুয়োরের ভিতর বেশ একটা লক্ষীমন্ত ভাব আছে। মাত্র ছ’ সাতটা ঘর, সবুজ বাঁশের দেওয়াল, পাতা দিয়ে ছাওয়া ছাদ। বাসিন্দা বলতে বারো চোদ্দজন, তাদের মধ্যে অনেকেই বার্ধক্যের শেষ সীমানায় পৌঁছে গিয়েছে। এছাড়াও তিনটে দুধেলা গাই আছে, তাদের সিধেসাদা মুখ দেখেই মাসিমা মাসিমা বলে মনে হয়।
বাড়ির ভিতর রান্নার ব্যবস্থা নেই। অন্যান্য গ্রামের মতো এখানেও সকলের রান্নাই হয় একসঙ্গে। অলিভ মাটির ওপর বাঁশের তক্তা দিয়ে তৈরি খাটিয়া, নুড়িপাথরের চুল্লিতে রান্নাবান্নার ব্যবস্থা। একপাশে একটা ছোট্ট নদী, সেখান থেকে জল সংগ্রহের ব্যবস্থা। গ্রাম বলতে ওইটুকুই। এরই মধ্যে কতরকম ফুল, সবজি আর ভেষজের গাছ, তা গুনে শেষ করা যায় না। কাঠগোলাপ, সন্ধ্যামালতী, ঝুমকোলতা, নিশিন্দা, নীলাম্বরী, সূর্য্যমুখী, অনন্ত লতা, নয়নতারা, তেজপাতা, মরিচ, লেবু, টোম্যাটো ইত্যাদি তো আছেই, আর আছে অজস্র লুপিন গাছের ঝাড়। লাল, কমলা, বেগুনি, নীল বাঁশের ঘরগুলো বনের ছায়া দিয়ে ঘেরা, দূর থেকে দেখে বোঝার উপায় নেই। এখানে বৃষ্টি হয়, রোদ ওঠে, বাতাস বয়, ফুলপাতা ঝরে, নদী বয়ে যায়। দেখা যায় আকাশের তারা। অতিথিরাও মাঝেমধ্যে এসে হাজির হয় জঙ্গল থেকে। হরেক রকম পাখি, কাঠবেড়ালি, খরগোশ, বেজি। সাপও আসে। তাদের কেউ কিছু বলে না, তারাও কাউকে কামড়ায় না। বনের ভিতর মানুষ আর জন্তুদের মধ্যে বেশ একটা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বিরাজ করছে।
নি এর সঙ্গে টিলু আর টং যখন এই গ্রামে পা রাখল, গ্রামের প্রত্যেকে এগিয়ে এল তার দিকে। নি অল্প কথায় টিলুর পরিচয় দিয়ে দিল। টিলু যে আর চারজনের চেয়ে বেশি দেখতে পায়, সে কথা জেনে তাদের মুখের ভাব বদলে গেল। তারা প্রথমে অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর তাদের মুখে হাসি ফুটল। সবাই একসঙ্গে অনেক কথা বলতে শুরু করেছে তাকে, দু একজন বৃদ্ধ তার কপালে হাত রেখে মন্ত্র পড়ছে। একটা বৌ ঘটিতে করে জল আর গুড় নিয়ে এল। এতটা হেঁটে আসতে গলা শুকিয়ে গিয়েছিল, গুড়জল খেয়ে তার অর্ধেক ক্লান্তি উবে গেল। কী মিষ্টি জল! সে হাসি হাসি মুখ করে বলল, “থ্যাঙ্ক ইউ!” সবাই সে কথা শুনে হেসে উঠল, তারপর অনেক কথা বলে গেল।
টিলু একটু বিব্রত হয়ে পড়েছিল, কিন্তু তার ভালো লাগছিল। এখানে কেউ তার ভাষা বোঝে না, কিন্তু সে অভাব পুষিয়ে দিয়েছে তাদের চোখের ভাষা। টংয়ের জন্য দুধ আর ভাতের ব্যবস্থা হয়ে গেল, টিলুর সামনে রাখা হল আনারস। টিলু দু একটা কোয়া মুখে দিয়ে দেখল, অসম্ভব মিষ্টি। তিন চারজন স্ত্রী পুরুষ তাকে ঘিরে ধরে আছে, কেউ কেউ আদর করে তার গালে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে, টিলু কারোকেই বারণ করছে না। সে মুখখানা হাসি হাসি করে রেখেছে। কে বলবে এটা উইজার্ডদের গ্রাম! কিন্তু এরা জাদুগর তো ঠিকই! টিলুর মনে পড়ে গেল, মিস্টার আর মিসেস উইসলিকে দেখে এরকম মনে হত। হ্যারির বাবা মায়ের মতো রনের বাবা মাও অনেক বড়ো উইজার্ড ছিলেন, তারা ডেথইটার্সদের সঙ্গে যুদ্ধও করেছিলেন, কিন্তু তাদের দেখে কিচ্ছুটি বোঝা যেত না।
নি তাকে বসিয়ে একটা ঘরে গিয়েছিল, এইবার সে বেরিয়ে এসে তাকে সঙ্গে আসতে ইশারা করল। রাতভর জুতো পরে থাকার পর পা দুটো ঘেমে উঠেছিল, এখানে আসার পর সে জুতো খুলে ফেলেছে। শিশির ভেজা ঘাসের বিছানায় পা ভিজিয়ে রাখতে বেশ আরাম হচ্ছিল, সেই অবস্থাতেই সে নি-এর সঙ্গে এগিয়ে গেল, তার সঙ্গে চলল টং। একদম নদীর ধারের বাড়িটার কাছে গিয়ে নি তাকে চোখের ইশারায় ভিতরে যেতে বলল। নি পায়ে পায়ে ভিতরে ঢুকে দেখল, ঘরটা এইটুকুন, কিন্তু তার জানলাটা ইয়া বড়োকা। সেই জানলার বাইরে ভ্যানিলা রঙের নদী, নদীর ওপারে রামধনু রঙের পাহাড়, পাহাড়ের ওপর থেকে মেঘাচ্ছন্ন আকাশ উঁকি মারছে। সেই জানালার লাগোয়া একটা বাঁশের খাটিয়া, তার ওপর পাতার বিছানা, সেই বিছানায় বসে একটা বয়স্ক লোক বই পড়ছে। তার মুখভর্তি দাড়িগোঁফ, চোখে একটা চশমা, পায়ে একটা ব্যান্ডেজ। সেই ব্যান্ডেজের উপর একটা বাঁশের প্লাস্টার করা। টিলুকে দেখে তিনি চোখ ফিরিয়ে তাকালেন। তার সারামুখে হাসি ছড়িয়ে পড়ল।
“টিলুবাবু!”
“দাদু!”
দাদুকে দেখে টিলুর কথা বন্ধ হয়ে গেছে, সে কিছুই বলতে পারল না। এই প্রথম সে দাদুকে মুখোমুখি দেখছে। টং কিন্তু সময় নষ্ট করল না। সে অনেকদিন এই মানুষটিকে দেখেনি। আনন্দে সে হাঁকডাক করতে করতে দাদুর কাছে চলে গেল, তারপর তার হাত চেটে দিতে লাগল। দাদু তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললেন, “টিলু! তুই সত্যিই এসেছিস! আয়, আমার কাছে আয়।”
“দাদু!” টিলু আর নিজেকে আটকানোর চেষ্টা করল না, সে ছুটে গিয়ে দাদুর বুকে মুখ লুকোল।
এর পর কিছুক্ষণ ধরে দাদু আর নাতির মধ্যে মান অভিমানের পালা চলল। কত গল্প, কত হাসি! সে গল্প আর ফুরোয় না।
কাল রাতের অ্যাডভেঞ্চারের গল্প শুনে দাদু টিলুকে বললেন, “তুই সত্যিই ওই আলো দেখেছিস? তোকে আমার খুব হিংসে হচ্ছে রে! এই শমনরা ছাড়া জঙ্গলের ওই আলো বাইরের লোক দেখতে পায় না। তোকে প্রকৃতি আশীর্বাদ দিয়েছে বলে তুই এই রহস্যের সাক্ষী হতে পারলি! ভাগ্যিস, না হলে ও তোকে কিছুতেই এখানে নিয়ে আসত না। মাসারা বাইরের লোকের সামনে আসতে চায় না। তোকে দেখে ও বুঝেছিস নিশ্চয়ই, তুই অন্যদের মতো নয়।”
টিলু দাদুর দাড়িতে মুখ ঘষে বলল, “ও কিন্তু সত্যিই ম্যাজিক জানে দাদু! আমি দেখেছি! ও আমার চোখের ব্যথা সারিয়ে দিয়েছিল গুহায়।”
“সে তো জানবেই।” দাদু হেসে বললেন, “ওরা ডাক্তারি জানে, ইঞ্জিনিয়ারিং জানে, আরো অনেক কিছুই জানে। আমরা সে সব বুঝতে শিখিনি এখনও। কিন্তু কথাটা তুই বেশি কাউকে বলিস না। ওদের ক্ষমতার ব্যাপারটা নিয়ে জানাজানি হলে বেচারিরা আরো ঝামেলায় পড়ে যাবে। তবে টিলু, চোখের কথা ভাবিস না।তোর চোখ তো দিব্যি আছে, তুই অনেকের চেয়ে বেশি দেখতে পাস। একটু জল পড়ে আর ব্যথা হয় জানি, ও ঠিক সেরে যাবে। আর যদি না সারে, আমার চোখটা তোকে দিয়ে দেব।”
দাদুর কথা শুনে টিলু কিছু বলল না, শুধু ওর বুকে কিল মেরে ওর কোলে মুখ গুঁজল। সেই দেখে টং ও বিছানায় উঠে দাদুর কোলে মুখ ঢুকিয়ে দিল। দাদু ছটফট করে বললেন, “ওরে ছাড় ছাড়! আমার কাতুকুতু লাগছে যে!”
নি দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল, দাদু আর নাতির কাণ্ড দেখে সে হেসেই যাচ্ছে।তার হাসি আর থামে না। দাদু চোখ পাকিয়ে ছদ্মরাগে তার দিকে তাকালেন,তারপর তাকে কাছে আসতে ইশারা করলেন। নি কাছে আসতেই দাদু তার পকেট থেকে একটা পেপারমিন্ট বের করে তার হাতে দিলেন, তারপর তার কপালে একটা চুমো খেয়ে, তার উলোঝুলো চুলে হাত বুলিয়ে আদর করে তাকে অচেনা ভাষায় কিছু একটা বললেন। নি এর মুখে চাঁদের আলো ঝলসে উঠল। সে মিষ্টি হেসে বাইরে চলে গেল। দাদু বললেন, “আর চিন্তা নেই। ও তোর বাবা আর তোপাদের এখানে নিয়ে আসবে। বুদ্ধি করে ও তোর স্কার্ফটা রেখে এসেছে গুহায়। তোর বাবা আর তোপা ভাই ঠিক খুঁজে বার করবে গুহাটা। আমার পা-ও প্রায় সেরে গেছে,ফিরতে বিশেষ অসুবিধা হবে না।”
“ও কে দাদু?” টিলু জিজ্ঞেস করল।
“ওই তো এদের স্পিরিট ওয়ারিয়র রে!” দাদু হেসে বললেন, “মেয়েটা বর্ন আর্টিস্ট। গুহায় দেখিসনি, কত ছবি আর হরফ খোদাই করে রেখেছে। সব ও একা হাতে করেছে। ওই ছবিগুলোই এদের ভাষাটাকে বাঁচিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। ওর আগে এই কাজটা ওর দাদুকে দেওয়া হয়েছিল। ভদ্রলোক এককালে প্রচুর ক্লে পট ডিজাইন করেছিলেন, বাঁশিও বাজাতেন খুব ভালো। এখন বয়স হয়েছে, হাত কাঁপে বলে ছেনি হাতুড়ি ধরতে অসুবিধা হয়। তাই জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ান,মনের আনন্দে বাঁশি বাজান। সময় থাকতে নাতনিকে সব শিখিয়ে দিয়েছেন। ওর কাছেই খবর পাঠাচ্ছি। উনিই তোর বাবাকে এখানে নিয়ে আসবেন।”
দুপুরবেলাটা হাসি আর গল্পে কেটে গেল। নদীর জলে স্নান করে নিল টিলু আর নি। এই নদীতে প্রচুর রঙিন মাছ, কাঁকড়াও আছে। টং দৌড়াদৌড়ি করে তাদের ধরতে চেষ্টা করল, একটাও ধরতে পারল না। সে দেখে নি-এর সে কি হাসি!
দুপুরে মাছের স্যুপ আর ভাত খাওয়া হল, সঙ্গে বুনো ঝিঙের তরকারি আর ফল। দাদু খুব তৃপ্তি করে খেলেন। এরা সকলে বুঝে গিয়েছে দাদু এইবার এখান থেকে চলে যাবেন, সকলেরই মন খারাপ। একজন মেয়ে তো কেঁদেই ফেলল। দাদু হাসিমুখে তাকে সান্ত্বনা দিয়ে কী যেন বললেন, কিন্তু তাতে তার কান্না থামল না।দাদুর নিজের মুখটাও করুণ হয়ে গিয়েছে। তিনি চুপি চুপি টিলুকে বললেন,”এখানে যদি বরাবরের জন্য থাকতে পারতাম টিলু, তাহলে কী ভালোই না হত! আমি এদের খোঁজে এসেছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমাকে খুঁজে বের করেছে আসলে এরাই। পায়ে চোট লেগে জঙ্গলে পড়েছিলাম, হাড় না ভাঙলেও মচকে গিয়েছিল, ওই মেয়েটা আমাকে উদ্ধার না করলে মরেই যেতাম। এই কয়েকদিনে এরা আমাকে অনেক কিছুই শিখিয়ে দিয়েছে। এদের ভাষাটা যে কতটা সমৃদ্ধ, সেটা তোকে বোঝানো মুশকিল। ভেবে খারাপ লাগে, কয়েকদিন পর আর এদের ভাষাটা বলার কেউই থাকবে না।”
টিলুরও মন খারাপ হয়ে গিয়েছে। সে ঘাস ছিঁড়তে ছিঁড়তে বলল, “ওদের আমাদের সঙ্গে নিয়ে যাওয়া যায় না?”
“না রে!” দাদু ম্লান স্বরে বললেন, “সে ওরা যাবে না। আমি এদের বলেছিলাম মেয়েটাকে অন্তত নিয়ে যাই, স্কুলে ভর্তি করে দেব। মাঝেমধ্যে বেড়াতে আসবে। সে ওরা কিছুতেই রাজি হল না। ওইটুকুন মেয়েরও জেদ কম নয়। প্রকৃতির মাঝে না থাকলে ওরা বাঁচতে পারে না। বেঁচে থাকুক ভালো করে। যতদিন পারে!”
বিকেলের আগেই সপ্তর্ষিরা এসে গেল। এইটুকুন গ্রাম দেখে তোপারা তো অবাক।তারা স্থানীয় মানুষ, বনেজঙ্গলে ঘোরাঘুরি করে, কিন্তু এভাবে, প্রকৃতিকে এভাবে সঙ্গে নিয়ে যে কয়েকটা মানুষ আজীবন থাকতে পারে, সেটা চাক্ষুষ না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই কঠিন। টিলু আর দাদুর কাছে সব শুনে, নি-এর সঙ্গে পরিচয় করে তারা অভিভূত। রিও আর ইনাও, যারা কিনা এই শমনদের স্পিরিট ওয়ারিয়রকে ভূত বলে ভেবেছিল, তারা এখন টং আর লিংকে নিয়ে দিব্যি নি আর টিলুর সঙ্গে খেলা করছে, তাদের মুখে আর হাসি ধরে না। গ্রামের লোকও খুশি। মানুষ অতিথি এই গ্রামে বিশেষ আসে না, আপ্যায়ন করার সুযোগও পাওয়া যায় না, আজকে হঠাৎ করে এতগুলো লোক এসে উপস্থিত হওয়ায় তাদের চোখে মুখে আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বিকেলে ঘরে তৈরি পায়েস, ফলের সন্দেশ, সবজি ভাজা ইত্যাদি দিয়ে আরেক প্রস্থ খাওয়াদাওয়া হল, টংলিংও বাদ পড়ল না সেই ভোজ থেকে। অনেক রাত অবধি গল্পগুজব চলল, গ্রামের সবাই এই আড্ডায় যোগ দিল। টিলুর দাদু খুশিমনে দোভাষী হওয়ার ভার নিয়েছেন, যদিও তা না হলেও চলে যেত। কয়েকজন মানুষ যারা পরস্পরের ভাষা অবধি জানে না, তারা একে অপরের কথা শুনে হেসেই যাচ্ছে, এমন দৃশ্য দেখার সৌভাগ্য কতজনের হয়?
রাত কাটল, সকাল হল। টিলুরা এইবার ফিরবে। সকলের মুখ ম্লান, চোখে জল। গাঁয়ের সবাই সার দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে, দাদু তাদের প্রত্যেকের হাত ধরে বিদায় জানালেন। সপ্তর্ষি আর তোপা গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে অনেক আদর করে দিল নি কে। নি জোর করে মুখটা হাসি হাসি করে রেখেছে, কিন্তু টিলু জানে, ও আসলে কান্না চাপছে। শেষ মুহূর্তে নি এর সামনে দাঁড়াতেই নি তাকে জড়িয়ে ধরল, টিলু বোকার মতো তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল অনেকক্ষণ। কী বলবে বুঝতে না পেরে সে চুপি চুপি দাদুকে জিজ্ঞেস করল, “নি এর আসল নাম কী দাদু?”
“নি কে?” দাদু তো অবাক।
“কেন? ওই মেয়েটা?” টিলু নিকে দেখিয়ে বলে উঠল।
দাদু হো হো করে হেসে উঠলেন। টিলুর মাথায় একটা চাপড় মেরে বললেন, “ভালো নাম দিয়েছিস তো। নি মানে আসলে বনদেবী। যদিও তোর নি বনদেবী নয়, আবার বলতেও পারিস। বনদেবী হিসেবে ওকে ভাবতে ভালোই লাগছে। আহোম রাজ্যের মানুষ এই দেশের মানুষকে, তাদের সংস্কৃতিকে নিজেদের সংস্কৃতির সঙ্গে মিশিয়ে দিতে চেয়েছিল। মাওসা গোষ্ঠীর শমনদের কথ্য ভাষা ও তাদের নামের সঙ্গে এই মাটির অভিন্ন সম্পর্ক। সেই মাটির রক্ষাকর্তার নাম নি। আজকের অসম রাজ্য যেখানে, সেখানেই মাওসা গোষ্ঠীর সূত্রপাত। অসম বা আসাম থেকেই মাসা নামটা এসেছে। মেয়েটাকে আমি দু একটা কথা ইংরেজিতে শিখিয়ে দিয়েছি। এইবার তুই ওকে ইংরেজিতে ওর নামটা জিজ্ঞেস কর দেখি!”
টিলু ভয়ে ভয়ে নি এর চোখের দিকে তাকাল, তারপর তার হাত ধরে ইংরেজিতে বলল, “তোর নাম কী?
নি হেসে উঠল। সেই হাসিতে আকাশের সোনালি রং আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠল, বাসন্তী বাতাসে ময়ূরপঙ্খী রঙের ঝিলিক ধরল, মিষ্টি এলাচের সুবাস বয়ে গেল। টিলুর চোখে চোখ রেখে নি তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল, তারপর ফিসফিস করে বলল।
“আসমানি।”
অলঙ্করণ- শিমূল সরকার
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প উপন্যাসের লাইব্রেরি