উপন্যাস- নীলাচলের  নীল  আঁচলে –শিবশঙ্কর ভট্টচার্য-শরৎ ২০২৪

শিবশঙ্কর ভট্টাচার্যের সমস্ত লেখা 

uponyasnilachal

তখন আকাশটা আরও নীল ছিল। সেখানে ঘন সবুজ পাহাড়ের গা ছুঁয়ে নানান রঙের মেঘেরা খেলা করে বেড়াত। শরতের মেঘ ছিল শিমুল তুলোর মতো সাদা। বর্ষায় ঘন কাজলের মতো কালো। শীতের কুয়াশা আর মেঘ পাহাড়ের কোলে ঘুমোতে আসত। সকাল থেকে সন্ধে চারপাশটা অনবরত রঙ বদলাতো। গাছপালার রঙ বদলাত, গন্ধ বদলাতো বাতাসের। পাহাড়তলীর যে বাড়িতে আমরা থাকতাম তাকে দূর থেকে দেশলাই বাক্সের তৈরি বলে মনে হত। দেখাত যেন রঙচঙে পুতুলের বাড়ি। সাদা রঙের বাড়ি, তিন তলায় লাল টালির বাহারি মুকুট। একতলা দোতলা ইট সিমেন্টের, তিনতলার মাথায় লাল টালির ছাদ, দেয়াল ইকড়ার তৈরি কালো কাঠের ফ্রেমে ভাগ ভাগ করা। তাকে বলে আসাম টাইপ বাংলো। কালো ফ্রেমের মাঝের সাদা চৌখুপীগুলো দেখলেই মনে হত ছবি আঁকি ওখানে, আঁকতামও। তিন তলার ওপরে বলে বাবা মায়ের চোখে পড়ত না। মাঝখানটায় ছ-সাত ইঞ্চি বা দশ আঙুল ফাঁক রেখে পাশাপাশি দুসার বেতের বা পাহাড়ি শরগাছের দেয়াল, তার ওপর চুন সুরকির পলেস্তারা। একে বলে ইকড়ার দেয়াল। সে দেয়ালে কান পেতে চুপ করে থাকলে শুনতে পেতাম ঘুনপোকাদের একঘেয়ে কাঠ চিবানোর শব্দ, ঝিঁঝিঁপোকা আর গুবড়ে পোকাদের আওয়াজ। তিন তলার ওপরে বলে ইদুঁর ছুঁচোর আমদানি কম ছিল। তবে টিকটিকির এত রকম ফের আর কোথাও চোখে পড়েনি। আর রাত্তির হলেই কোথা থেকে উড়ে আসত অসংখ্য জোনাকি। পাহাড়ের গাছগুলো চুমকি বসানো মনে হত।

আমাদের থাকবার জায়গা দুভাগে ভাগ করা। দোতলায় বড়োদের এলাকা, শোয়া বসার ঘর, রান্নাঘর। তেতলায় ছোটোদের পড়াশুনোর আর খেলার জায়গা। ওপরে পাশাপাশি খানতিনেক ঘর, তার সামনে টালির ছাদের তলায় ঢাকা চওড়া বারান্দা আর বাকিটা খোলা ছাদ। ঠাকুমার পুজোর ঘরও ছিল তেতলায় খোলা ছাদের লাগোয়া। বাবা মায়ের নজরের আড়ালে ইচ্ছেমতো দুষ্টুমি করতাম আমরা চার ভাইবোন ওখানে, বাধা দিত না কেউ।

দাদা দিদিরা পড়তে বসলে আমিও মায়ের হেফাজত থেকে তাদের পিছু পিছু তিন তলায় পালাতাম। সেখানে আলো নিভিয়ে জোনাকিদের ওড়াউড়ি করতে দেখা যেত। অন্ধকার গাঢ় হলে আকাশময় মিটমিটে তারা ফুটে উঠত। তখন আকাশের তারার দল আর জোনাকিরা একাকার হয়ে যেত আমার চোখে। কেউ উড়ে বেড়াতো কেউ স্থির হয়ে মিটমিট করছে।

সেখানে আমাদের এই তেতলার ছাদের চেয়ে উচুঁ ছাদ আর ছিল না। বুক সমান পাঁচিলের ওপর দিয়ে ডিঙি মেরে দেখতে চেষ্টা করতাম নীচের দিকে। নজর চলে যেত অনেক দূর। বাড়ির সামনে ঘাসে ঢাকা মাঠ পার হলেই কালো পিচের রাস্তা। রাস্তার ওপাড়ে বাজার। এপাড়ে ডাইনে বাঁয়ে একতলা দোতলা বাড়ি গায়ে গায়ে দাঁড়িয়ে। একতলায় সারি সারি অনেকগুলো দোকান। আমাদের ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ঘুরপাক খেলে কাছে দূরে যে পাহাড়গুলো উলটোমুখি ঘুরতে থাকত তাদের মধ্যে নীলাচল পাহাড় ছিল সবচাইতে কাছে। যার চুড়োর কাছাকাছি কামাক্ষা দেবীর মন্দির। নীলাচল পাহাড়ের দিকে মুখ করে দাঁড়ালে বাঁয়ে লালপাহাড় আর ওঁবাবার আশ্রমের টিলার ওপাড়ে বিশাল চওড়া ব্রহ্মপুত্র। যার অন্যপাড়ে দেখা যায় ধোঁয়াটে আমিনগাঁও। ডাইনে কালাপাহাড়, গোশালা পাহাড়, আরও দূরে ধোঁয়াটে নীল শিলং পাহাড়ের সারি। আকাশের গায়ে স্বপ্নের মতো আঁকা মনে হত।

আমাদের বাড়ির সামনে বাজারের পর থেকে ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে পান্ডু স্টেশন অব্দি টানা সার বাঁধা অসংখ্য ছেঁচা বাশের বাংলো বাড়ি। একে বলে রেস্টক্যাম্প। বিশ্বযুদ্ধের সময় এখানে দেশী বিদেশী সৈনিকরা থাকত। পান্ডু থেকে গৌহাটি যাবার রেল লাইন পর্যন্ত যার সীমানা। দিনের মধ্যে অনেকবার রেলগাড়ির টানা হুইসেল শুনতে পেতাম। বড়ো বড়ো গাছপালা আর বাড়িঘড়ের ফাঁকে রেলগাড়ির গা দেখা যেত না। ফাঁকে ফাঁকে একটু একটু আভাস মিলতো। দূর থেকে হুইসালের টানা শব্দ দূর থেকে কাছে এসে আবার দূরে মিলিয়ে যেত। আকাশের গায়ে ছুঁড়ে দেয়া ধোঁয়ার চলন দেখে টের পেতাম রেলগাড়ি চলছে। আর মাঝে মাঝে ব্রহ্মপুত্র নদের দিক থেকে কানে আসত স্টিমারের ভোঁ। সে বড়ো গম্ভীর আওয়াজ। পাহাড়ের গায়ে গায়ে বেশ কিছুক্ষণ ছুঁয়ে ছুঁয়ে ফিরতো সেই শব্দ। আমাদের মনের ভেতর বাজতে থাকত আরও কিছুক্ষণ। দিনের মধ্যে ভোঁ শুনতাম অনেকবার। রাতে শুনলে ভয় করত।

রেস্টক্যাম্পের বাড়িঘর আর গাছপালার আড়ালে রেলগাড়িটার শরীর তো দেখতে পেতাম না, স্টিমারও দেখতে পাবার জো নেই পাহাড়ের বাধায়। কিন্তু দুটির দু রকম আওয়াজ শুনে মুগ্ধ হয়ে যেতাম। রেলের হুইশাল যেন রাখালের সুরেলা বাঁশি তারায় বাঁধা। স্টিমারের ভোঁ শঙ্খের মতো খাদে একটানা, গম্ভীর মন্দ্রসপ্তক। একটু যেন অভিমানী ভাটিয়ালী ছোঁয়া তাতে।

ব্রহ্মপুত্রকে প্রথম দেখি আরও ছোটো বয়সে। কলকাতা শহর থেকে বারকয়েক রেলগাড়ি পালটে আর দুবারে দুটো মস্ত চওড়া নদী স্টিমারে পেড়িয়ে তবে বাবা মা আমাদের চার ভাইবোনকে নিয়ে পান্ডুর এই বাড়িতে পৌঁছেছিলেন। সেবারেই আমি প্রথমবার ভালো করে রেলগাড়ি দেখতে পাই। এর আগে কাশী যাবার সময় রেলগাড়িতে যাওয়া হলেও বয়েস ছিল তিনের কাছাকছি, ফলে প্রায় কিছুই মনে ছিল না। শুধু মনে ছিল ভয় পাওয়াটুকু। শেয়ালদা স্টেশনে এসে রেলগাড়ি দেখে আমার মুখ হাঁ হয়ে গেল। পাঁচ কি ছয় বয়েস তখন আমার। তখনকার রেলগাড়ির চেহারাই ছিল আলাদা। সার বাঁধা অনেকগুলো লাল রঙের কামরা, তার সামনে কয়লার গাড়ি আর এক আশ্চর্য দুরন্ত চেহারার ইঞ্জিন। শেষ মাথায় ছোট্ট খাট্টো একখানি ডিব্বা, মেজমামা বললেন এটাতে গার্ডসাহেব বলে একজন থাকে! তাকেও দেখলাম। আহা আমায় যদি চিরকাল থাকবার জন্য দিত অমন একখানি ডিব্বা! ইঞ্জিনটাই অবশ্য নজর টানত বেশি। কপালের ওপর আলো জ্বলা বাক্সো, তলায় সামনের দিকে কাঠ বা লোহার ঢালু জালি লাগানো, দৈত্যের দাঁতের মত দেখতে। মেজোমামা ট্রেন ছাড়তে দেরী আছে বলে আমাদের রেলগাড়ি দেখিয়েছিলেন। দাদা বলল একে বলে কাউ ক্যাচার, মানে কি পরে জেনেছি। লোহার গোল গোল দুটো বাফার চোখের মত দেখতে। মনি নেই বলে ভয়ংকর দেখাত। সব মিলিয়ে ইঞ্জিনের চেহারাটা এক অন্ধ দৈত্যের মত। দিনের আলো ফুরিয়ে গেলে তার কপালের একটা মাত্র চোখ জ্বলে উঠে চরাচর শাষন করে। বাফারের গোল চাকতি দুটোর মাঝখানে কপালে মস্ত বড়ো তারা আঁকা।

ইঞ্জিনের চিমনি দিয়ে কালো ধোঁয়া গলগল করে বেরোচ্ছে দেখে মেজোমামা তাড়া দিলেন, গাড়ি ছাড়ার সময় হয়েছে। একবার ফুস্‌স করে যেন শ্বাস ফেললো ইঞ্জিন, আর যন্ত্রপাতির মধ্যে দিয়ে সাদা ধোঁয়া বেড়োচ্ছে। তারপর চলে যাবার আগে দেখলাম নীল টুপি নীল জামা প্যান্ট পরা সেই আশ্চর্য মানুষটি, ড্রাইভার। ইঞ্জিনের ভেতর যার ব্যস্ত চলাফেরা যাত্রার নায়কের মত। জলন্ত কয়লার লালচে আলো তার ঘামে ভেজা গায়ের ওপর চকচক করছে। এত বড়ো রেলগাড়িটা এর হাতের কলকাঠিতেই চলবে। এর হাতেই হুইসেল বাজানোর শেকল, টানলেই বাজবে কু-উ-উ-উ। মেজোমামার কিনে দেয়া ঝুম ঝুমি বাঁশি হাতে মার কাছে এসে বসলাম আমরা। জানলা দিয়ে আর একটা ইঞ্জিন ঢুকতে দেখলাম। কতরকম যন্ত্রপাতির নড়াচড়া, ছোটো চাকা বড়ো চাকা পিস্টন, ধোঁয়ায় ভরে গেল প্ল্যাটফরম। এবার লম্বা হুইস্যল দিয়ে গড়াতে শুরু করল আমাদের রেলগাড়ির চাকা। চলতে শুরু করতেই রেলের লাইনে, চাকায় আর যন্ত্রপাতিতে মিলে তালে তালে ঝুক ঝুক ঝুক ঝুক, মাঝে মাঝে ক্ষ্যাপা হাতির মতো ডাক ছাড়ছে কু-উ-উ-উ। সে এক স্বপ্নের রেলগাড়ি ছিল আমাদের ছোটোবেলায়। পুরনো দিনের সিনেমা ছাড়া তার আর কোন অস্তিত্ব নেই এখন। মনের মধ্যে বাসা বেঁধে আছে চিরকালের মতো।

কলকাতা থেকে প্রথমবার এই পাহাড় জঙ্গলের দেশে আসার সময় আমাদের সঙ্গে কত যে মালপত্তর লটবহর ছিল বলবার নয়। আমি তখন গুনতে টুনতে শিখিনি। দাদা আর দিদি রেলগাড়িতে ওঠার পর থেকে পান্ডুতে নামা অবদি দিনের মধ্যে কতবার যে মালপত্র গুনতি করত তার হিসেব নেই। আমি তখন খুব ছোটো, ছোটো বোন বাবলি তখন সবে একপা দুপা করে হাঁটতে শিখেছে। সেই দু তিনটে দিন আমি প্রায় দম বন্ধ করে জানলার ধারে বসে বাইরের উল্টো পথে ছুটতে থাকা দুনিয়াটাকে একটু একটু করে পাল্টে যেতে দেখছি। খোলা জানালার পাশে বসে কতবার চোখে ধোঁয়া লেগেছে, কয়লার গুঁড়ো পড়েছে, তবু চোখ ফেরাতে পারি নি। লাইনে চাকায় লোহা ঘসার গন্ধ পেয়ে নাকে হাত চাপা দিয়েছি তবু জায়গা ছাড়িনি। আমার মতো দিদিও জেদ করত জানালার ধারে বসা নিয়ে। উলটো দিকের জানালাটা ওর। তবে দাদা অনেক বুঝদার ছিল, আমাদের ব্যবহারে আপত্তি করত না। আমাদের ছোটো মাথার ওপর দিয়ে অবশ্য দেখতে পেত সবই। বাবলি ছোটো, ও থাকত মায়ের কোলের কাছে। তার কোন বায়না নেই, কান্নাকাটিও নেই। গোলাপি রঙের সাজগোজ করা হাসিমুখ পুতুলটি। আমার থেকে দুই আড়াই বছরের ছোটো সে। তাই ও সবার আদুরে। সে গাড়ির চলনের সঙ্গে বসে বসে দুলছে, পাশ দিয়ে অন্য গাড়ি গেলে চমকে মাকে জড়িয়ে ধরছে।

মায়ের বড়ো ভালো লাগত ট্রেনে চড়তে। বেশ বুঝতে পারতাম ছেলেমানুষি একটা ব্যাপার একটু একটু করে মায়ের চাল চলনের মধ্যে ঢুকে পড়ছে। বাইরে থেকে তেমন বোঝা না গেলেও গাড়ির দুলুনীর চেয়ে মা যেন ইচ্ছে করে একটু বেশি বেশি দুলছেন। মাঝে মাঝে গুনগুন করে গান গাইছেন। পুল পেরোবার গমগম শব্দ পেলেই জানালা দিয়ে ঝুঁকে নদীর জল দেখছেন। আর দিনের মধ্যে সতেরো বার খাবারের পোঁটলা খুলে বসছেন আমাদের খাওয়াতে। পাঁউরুটির ওপর জেলির পরিমাণ না চাইতেই বেড়ে যাচ্ছে। ক্রিম বিস্কুটের ক্রিমটুকু খেয়ে বাকিটা ফেলে রাখলেও বকাবকি নেই। যখন তখন ফিরিওলা ডেকে এটা ওটা খাওয়া তো আছেই। তার মধ্যে সব চাইতে প্রিয় কাঁচা শালপাতার দোনায় করে অংকুর বার হওয়া ভেজা ছোলা মটর। আদা নুন পেঁয়াজ কুচি আর ধনে পাতা কাঁচা লংকা কুচি লেবুর রস দিয়ে কৌটোয় ঝাঁকিয়ে ঝাঁকিয়ে হাতে হাতে শালপাতার ঠোঙায় খাওয়া। কি যত্ন করে যে দিত ফিরিওলা! দেখলে জিভে জল আসবেই। মুখে দিলেই ঝালে হুস্‌ হাস্‌ চোখে জল, তবু খাওয়া চাই। আর একজন মুগডাল ভেজা চিনি নারকোল কোড়া দিয়ে বেচত। সেটাও অপূর্ব! এসব দিশি চমৎকার খাবার কম দেখি আজকাল।

বাবার অবশ্য তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই কোনওদিকে। খাবার হাতে পেলে খেয়ে নিচ্ছেন। আনমনে ইংরিজি বইয়ের পাতা ওলটাচ্ছেন। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে। বেঞ্চের ওপর তোলা পায়ের পাতা নড়েই চলছে। মাঝে মাঝে বই পড়ে হোহো করে হাসছেন। অন্য যাত্রীরা অবাক হয়ে দেখলেও বাবার তাপ উত্তাপ নেই। চাওয়ালা উঠলেই চা খাচ্ছেন মাটির ভাঁড়ে। বেশ একটা খুশি খুশি ভাব। বই বন্ধ করে আমাদের দিকে ফিরে বসে গপ্‌পো করছেন। কখনও রেওলগাড়ির চাকা কি বলতে চাইছে ডেকে ডেকে শোনাচ্ছেন। আমরাও কচি গলায় কোরাস গাইছি বা আবৃত্তি করছি।

টক্‌কর টক্‌কর পয়সা দে

টক্‌কর টক্‌কর পয়সা দে

রেলগাড়ি জোরে চলার সময় বলতে শুনেছি –

হরিবাবুর কতো টাকা এতো টাকা ততো টাকা।

স্টেশন থামার আগে,

তুতেন খামেন আমেন আমেন।

খুব বেশি জোরে চললে বলছে

যত পাই ততো খাই আরো চাই আরো চাই

বুড়ো বুড়ি ছোঁড়া ছুঁড়ি হুড়ো হুড়ি হুড়ো হুড়ি।

আর ভারী চমৎকার একটা ছড়া তো সবার জানা, আমরাও বলতাম

আইকম বাইকম তাড়াতাড়ি

যদুমাস্টার শ্বশুরবাড়ি

রেলকম ঝমাঝম

পা পিছলে আলুর দম!

বেশ টের পেতাম আমাদের মতো বাবা মাও বেশ খুশি খুশি আছেন। শুধু গাড়ি পাল্টাবার সময়টা কেমন দিশেহারা হয়ে যাচ্ছেন। যে লোক তখনকার দিনে একবার এ পথে এসে মনিহারি ঘাট সকড়িকলি ঘাট ফরাক্কা খেজুরিয়া ঘাটের চেহারা দেখেছে সেই বুঝবে ওঁদের দিশেহারা হওয়ার কারনটা। ধোঁয়া ছাড়া দুরন্ত ইঞ্জিনের দস্যিপনা, বালির ঢালু চরার ওপর দিয়ে লটবহর মাথায় কুলিদের পিছু পিছু ছেলে পুলে নিয়ে দৌড়োদৌড়ি, নানা ভাষায় নানা মানুষের চেঁচামেচি, সব গোলমাল ছাপিয়ে স্টিমারের গম্ভীর ভোঁ। তারওপর গরমের দিনে ধুলোর ঝড়। ছলাৎ ছলাৎ শব্দে দিগন্ত মোছা উথাল পাথাল ঢেউ, সব মিলিয়ে সে এক ভয়ঙ্কর ব্যাপার! বাবা বলতেন জগঝম্প। প্রাণ যেন গলার কাছে এসে খাবি খেতে থাকে। তার মাঝেই কারো মালপত্রের হদিশ করতে না পারা, ছেলে মেয়ে হাত থেকে ছিটকে যাওয়া, বালিতে গড়াগড়ি। নদীর ওপাড়ে স্টিমার থেকে আর এক জগঝম্প বেধে যেত ওপাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা রেলগাড়িতে ঠিকঠাক জায়গা পাওয়া নিয়ে। অনেক টানা হ্যাঁচড়া হাঁকা হাঁকির পর বেঞ্চের ওপর বেডিং বিছিয়ে বসে পরার পর অশান্তি ধীরে ধীরে থিতিয়ে আসত। মোটামুটি শান্তি ফিরে আসত ঘণ্টাকয়েকের জন্য। তারপর আবার নদী আবার গাড়ি পালটে স্টিমার। আবার ধুন্ধুমার! কেউ কেউ আবার গাড়িতে উঠেই শুয়ে পড়ত সটান, কারো কথাতেই নড়ত না। রিসার্ভেসান থাকলেও তেমন মানতো না কেউ, জায়গা পেতে যুদ্ধ করতে হত।

ধানক্ষেত পাটক্ষেত আর বাড়িঘর দেখতে একঘেয়ে লাগবার পর আসত জঙ্গল আর ছোটো বড়ো পাহাড়ের দেশ। জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার সময় গাড়ি চলতো ঢিমে তালে। শন্‌ শন্‌ করে একটা আলাদা রকম শব্দে বুকের মধ্যেটা কেমন করত! রাজাভাতখাওয়া, নাগরাকাটা, আলিপুরদুয়ার কত অদ্ভূত নামের স্টেশন। সবচেয়ে পছন্দের ছিল ছোট্ট স্টেশন গুল্‌মা। জঙ্গলের মধ্যিখানে ছোট্ট গুমটিঘর। লাল সবুজ নিশান হাতে একজন মাত্র লোক দাঁড়িয়ে। শুনলাম মাঝে মাঝে হাতি চিতা হরিণরা দল বেঁধে আসে স্টেশনের কাছে। হাতির দল দাঁড়িয়ে থাকে লাইনের ওপর। রেলগাড়ি তখন দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ। রাতের অন্ধকারে জঙ্গলের শব্দ আরও গম্ভীর ভয় ধরানো। ট্রেনের টিম টিমে আলোয় মায়ের গা ঘেঁসে বসতাম।

এ রকম দিন তিনেক চলার পর আমিনগাঁও স্টেশন এল প্রায় মাঝরাতে। ততক্ষণে আমাদের দুচোখে ঘুমের ঢল নেমেছে। মনেই নেই কি করে রেলগাড়ি থেকে নেমে লঞ্চে উঠলাম, নদী পেরোলাম। একসময় ঝোড়ো ঠান্ডা হাওয়ায় আর কাঁপা কাঁপা শাঁখের মতো শব্দে ভোঁ বাজতে চোখ থেকে ঘুম গেল পালিয়ে। দেখতে পেলাম মস্ত কালো দানবের মতো পাহাড়ের তলায় মধ্যরাতের নিকষ কালো দামাল জলের ওপর লঞ্চের কড়া আলোর চমক, আর দূরে পান্ডু শহরের মিটমিটে আলোর মালা। ঘুমঘুম চোখে স্বপ্নের মতো লাগল।

বাবা বলে দিলেন নদীটাকে বলে ব্রহ্মপুত্র নদ, আর ঐ হল পান্ডু। এখন থেকে আমরা এইখানেই থাকব। অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম পাড়ের আলোর মালার দিকে।পাড়ের কাছে কালো জলে তার কাঁপা কাঁপা উলটো ছবি ফুটে উঠছে। কালো পাহাড়ের চূড়ার দিকে একটা লাল আলো জ্বলছে। লঞ্চ ভোঁ বাজিয়ে পাড়ের কাছাকাছি আসতে কুলিরা লম্বা লম্বা লাফ মেরে লঞ্চে উঠে আসতে লাগল। তখনও দশ পনেরো ফুট দূরে আছে জেটি। কে কোন মাল বইবে তার অধিকার নেবার জন্য প্রাণ হাতে করে লাফ দেয় ওরা। আমার অবাক চোখে রামের বানর সেনা বলে মনে হত কুলিদের দেখলে। বাবা বলেলন ওরা হল ল্যাজহীন রামভক্তের দল!

লঞ্চ পাড়ে ভিড়ল। আমাদের অনেক মালপত্র বলে বাকিদের নেমে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। বসে বসে বাবা পাহাড়টার চূড়ার দিকে আঙ্গুল দেখিয়ে বললেন, ওখানে আছে আমাদের দেশের এক শ্রেষ্ঠ তীর্থ, মা কামাখ্যার মন্দির, পরে নিয়ে যাব ওখানে।

কুলিদের সঙ্গে সঙ্গে কামাখ্যার পান্ডারাও উঠে এসেছিলেন লঞ্চে। বাবা তাদের নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। শেষটায় আমাদের পান্ডার নাম শুনে তাঁরা হাল ছেড়ে চলে গেলেন।

যারা পান্ডু স্টেশন থেকে গৌহাটি বা গৌহাটি পেড়িয়ে যেতে ট্রেন ধরবে তাদের দৌড়াদৌড়ি কমে এল। আমরাও কুলিদের পিছুপিছু নতুন জায়গায় নেমে এলাম।

বাবা মা দাদা আর দিদির কাছে পান্ডু নতুন কিছু নয়, বছর কয়েক আগে বাবা গৌহাটিতে চাকরি করতেন। আমি আর ছোটো বোন বাবলি এখানে নতুন। ঘুম চোখে অবাক হয়ে চেয়ে রইলাম। পান্ডু গৌহাটি শহরেরই একটা প্রান্ত। দাদা দিদি এখানে আগে থাকলেও দিদির প্রায় কিছুই মনে নেই। ওকে নাকি ঝুড়িতে বসিয়ে কামাখ্যায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল দুবছর বয়সে। দাদা অবশ্য আরও তিন বছরের বড়ো, ওর কিছু কিছু মনে আছে।

লঞ্চ থেকে নেমে আসার সময় মাঝ রাত। অতো রাতেও লোকজন কুলি রিকশা আর গাড়ির ভিড়ে সরগরম। ভিড়ের মধ্যে লোকেদের হাঁকাহাঁকি, রেলগাড়িতে জায়গা দখল নিয়ে গন্ডগোল। একটু দূরে অনেকগুলো লাইনের কাটাকুটি খেলার ওপর ধোঁয়া ছাড়া ইঞ্জিনের এগোন পিছোন, শান্টিং এর আওয়াজ। তার ওপর তিন চার বার গম্ভীর হর্নের ভোঁ বাজিয়ে লঞ্চটার ছেড়ে যাওয়া, তাক লেগে গেল আমার! মাঝরাতেও কত আলো আর লোকজন!

ওপাড়ে আমিনগাঁওয়ের দিকে চেয়ে দেখলাম। অনেক দূরে আবছা ছবির মতো অল্প কিছু আলো তারার মতো ঝিকমিক করছে জেটির কাছে। আমিনগাঁও মাঝ রাতে যেন ঘুমিয়ে আছে। ওপাড়ের ডাইনে বাঁয়ে পাহাড় দেখা যাচ্ছে। নীচে ব্রহ্মপুত্রের স্রোত কেটে এগিয়ে চলছে লঞ্চ। মাথার ওপর তারা ভরা আকাশে লঞ্চের হালকা ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বাতাসে। দেখতে দেখতে কতদুরে চলে গেল লঞ্চ।

কয়েকজন লাল কাপড় পরা লোক একধারে জটলা করে বসে আছেন। কাঠ জড়ো করে আগুন জ্বেলেছেন। হাতে হাতে রুটি তৈরি চলছে। মা বললেন সাধুরা মা কামাখ্যার পুজো দিতে এসেছেন। এখানেই রাত কাটাবেন ওঁরা। সকাল হলে পাহাড়ে উঠবেন মন্দির দেখতে। দাড়ি গোঁফ আর মাথা ভর্তি লম্বা জটা একজন সাধু আগুন ঘিরে নাচতে নাচতে বম্‌ বম্‌ করে চিৎকার করছে দেখে ভয় হল আমার। লাল বড়ো বড়ো চোখ, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা ঝুলছে। মাঝরাতে ঐ সাধুর চেহারা দেখে মোটেই ভালো লাগেনি আমার।

দশ বারোটা রিকশায় মাল তুলতে সময় লাগল। লম্বা হুইসেল বাজিয়ে গৌহাটি যাবার গাড়িটা চলতে শুরু করল। সাধুদের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে ঘুম চোখে রেললাইনের ওপর ইঞ্জিনের শান্টিং দেখে মনে হল স্বপ্ন।

মাঝরাতে দূরের যাত্রীরা এদিককার ট্রেনে উঠে যাবার পর নির্জন পান্ডু স্টেশন থমথম করতে লাগল। মালপত্র রিকশায় তোলা হতে হতে কালো আকাশ কালো জলের মাঝে কালো পাহাড়টা ভালো ঠাহর করতে পারলাম না। স্টেশনের অনেকগুলো লাইনের ওপর সার্চলাইটের আলো পড়ে চকচক করছে। সার্চলাইটের লোহার থাম্বাটা এক ঠ্যাঙে দৈত্যের মত দেখাচ্ছে, যার মাথার ওপর চারদিকে চারটে কড়া আলোর চোখ দেখলে ভয় লাগে। আমাদের চোখে ঘুম, শরীরে অদ্ভূত একটা দোল। মাথার মধ্যে ভিড় করে আছে তিন দিনের নতুন দেখা দুনিয়ার কত ছবি!

রেলগাড়ি থেকে নেমে আসবার তিনদিন পড়েও চলার দুলুনিটা থেকেই যেত আমাদের মধ্যে। মন্দ লাগত না। বরং থেমে থাকা ব্যাপারটাই দু’চক্ষের বিষ মনে হত।

বলতে ভুলেছি সেই পাগল মানুষটার কথা। ফেরিলঞ্চ থেকে নেমে পান্ডু স্টেশনের পাশে রিকশায় ওঠার সময় অন্ধকার থেকে সটান আলোয় এসে আমাকে প্রকান্ড এক ফৌজি স্যালুট! তারপর আবার অন্ধকারে কোথায় মিলিয়ে গেল কে জানে। আমি তো অবাক! বহুবছর পর আবার তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল আমার। তার চেহারা তখন আর আগের মত নেই, আমিও পালটে গেছি অনেকটাই। কলেজে পড়ি, দাড়ি গোঁফ গজিয়েছে। মাথা প্রায় ছফুটের কাছাকাছি। সেও বুড়ো হয়েছে। কুঁচকে যাওয়া চামড়া, মাথায় সাদা চুলের নুড়ি কাকের বাসা। তবু আমায় চিনে নিতে ভুল হয়নি তার! ছেলেবেলার মতই হঠাৎ দেখা দিয়ে স্যালুট করে নিমেষে উধাও হয়েছিল সে।

যাই হোক, অতো মালপত্তর বোঝাই দশ বারোটা রিকশা পান্ডু ঘাট ছাড়িয়ে খানিকটা এগোবার পড়েই চারদিক শুনশান। বাঁয়ে উঁচু পাহাড়, ডাইনে রেললাইন গুলো কাটাকাটি খেলতে খেলতে চলল কিছুক্ষণ। ঢেউ খেলানো পথে একটা অন্ধকার দোতলা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালাম।

বাড়িটায় কেউ জেগে নেই। অনেক ডাকাডাকির পর দোতলার জানলায় আলো জ্বেলে একজন উঁকি মেরে দেখে ছুটে নীচে নেমে এল। তারপর বাকি সারা রাত ধরে চলল মালপত্র টানাটানি আর সাজানো গোছানো। আমরা অবশ্য ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। তখন সবে আকাশে দিনের আলো ফুটেছে সূর্য ওঠেনি। পায়ে পায়ে সিঁড়ি বেয়ে তেতলার ছাদে উঠে এসে মাকে দেখতে পেলাম। মায়ের রাতজাগা ক্লান্ত মুখ, উড়ু উড়ু চুল, ডাগর চোখের ভাষাহীন দৃষ্টিতে তৃপ্তি। সূর্যের হালকা লাল রোদ্দুর তাতে প্রাণ পেয়েছে। এই পাহাড় জঙ্গলের দেশে নতুন করে ঘর সংসার পাতবার স্বপ্ন আঁকা রয়েছে মায়ের মুখে চোখে।

বাবা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার। পান্ডুর লোকেরা সবাই চিনত বাবাকে, ভালোও বাসত। বাবা গান আবৃত্তি করেন নাটক করেন। বছর কয়েক আগে গৌহাটিতে থাকার সময় থেকেই সারা গৌহাটির লোক তাঁকে চিনতেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস, ভূপেন হাজারিকা, অনিল দাশরা বন্ধু ছিলেন। বাড়িতে আসতেন। বড়দা বলে ডাকত সবাই। মাকে পান্ডুতে কেউ চেনে না। এ বাড়িতে মাছ খাওয়া চলবে না বলে দিয়েছিলেন বাড়িওয়ালা। তিনি আর আশপাশে সবাই মারোয়ারী, মাছ মাংস খান না। কিন্তু মা মাছ ছাড়া খেতে পারেন না। মা আলাপ করতে গেলেন বাড়িওয়ালির সঙ্গে। আমরা মাছ মাংস ডিম খাই বলে তিনি বললেন, “আপলোগ গাই ভি খাতে হো?” মা শুনে হেসে গড়াগড়ি। সেইসব শুনে তিনি নিশ্চিন্ত। আমি সঙ্গে ছিলাম, আলাপ হল উষা, আশা, রজনী আর শোভার সঙ্গে। আশা আর রজনী আমার বয়েসি। দিদির বন্ধু হল উষা আর আশা। শোভা ছোটো, বাবলির বন্ধু। আমরা ওখানে থাকতেই চলে এল প্রদীপ কুমার আর সুধীর কুমার।

সহজে মাছ, মাংস খাবার মত দেয়নি মারোয়ারি ভদ্রলোক। পরে বুঝে গেল বাঙালিকে মাছ খেতে না দিলে বাবা অন্য বাড়ি ভাড়া নেবেন। ততদিন মাকে মাছের নেমতন্ন খেয়ে বেড়াতে হয়েছে। অসিত রায়ের বাবা মায়ের খুবই প্রিয় মানুষ। তিনিই প্রথম মাকে নিয়ে গেলেন তাঁদের বাড়িতে। রেস্ট ক্যাম্পের রেল কোয়ার্টারে থাকেন তাঁরা। বিদ্যামন্দির স্কুলের পাশে। ওখানেই পড়েছি আমরা।

পাশের বাড়িতে থাকেন বাঙালি ডাক্তার, মুখার্জি। আমাদের শরীর খারাপ হলে তিনি আসতেন। ওঁদের বাড়িতে দোলনা ছিল। সেই টানেই চলে গেলাম একদিন। মনোজদা রঞ্জু আর বুলুর সঙ্গে বন্ধুত্ব হল। বুলু আর আমি সমান বয়সি, রঞ্জু একটু বড়ো আর মনোজদা দাদার মতো। খেলতাম আমরা একসঙ্গেই ওদের ছাদের ওপর।

আমি তখনও স্কুলে পড়ি না, বাবলি তো একেবারেই ছোটো। দাদা আর দিদি ভর্তি হল স্কুলে। ওদের অনেক বন্ধু জুটল। দিদির বন্ধু দীপুদিদের বাড়ি আমাদের বাড়ির কটা বাড়ি পরেই। দীপুদি নীচের রাস্তা থেকে নানা রকম মজার সুর করে দিদিকে ডাকত স্কুলে যাবার সময়। একদিন দিদি নিয়ে গেল ওদের বাড়িতে। দীপুদির বাবা ‘অরুনা’ সিনেমা হলের ম্যানেজার। রোজ বিকেলে বড়ো চমৎকার বাংলা সিনেমার গান বাজানো হত সিনেমা হলে। সেই গান শুরু হলে আমাদের খেলা শেষ করে বাড়ি ফিরতে হত। দীপুদির ভাই মানিক সিধু আমার বন্ধু। ওদের বাড়ির লম্বাটে উঠোনেই আমাদের খেলাধুলো। এ বাড়ি ছাড়িয়ে একটু গেলেই জঙ্গলে ঢাকা মাঠ পাহাড়ের ঢালে গিয়ে মিশে গেছে। মাঠের বাঁদিকে আছে চাঁদুদের বাড়ি। চাঁদু আমার বন্ধু, আদুদি একটু বড়ো, দিদির বন্ধু। চাঁদু মেয়ে হয়েও খেলাধুলোয় ওর সঙ্গে এঁটে ওঠা মুশকিল। দৌড়তে পারত আমার চেয়েও জোরে। ওদের একটা ভাই একটু ভোলাভালা, নামও ভুলুয়া। পাহাড়তলিতে একটা ছোটো খাটো ঝরনা পাথরের তলায় তলায় বয়ে এসে ঝরে পড়ত বড়োবড়ো পাথরের ওপর। সেখানে গর্তে জমে থাকা কাঁচের মত জলের তলায় খেলা করে বেড়াতো ছোটো ছোটো মাছ। দু একটা বোড়া সাপও থাকত পাথরের খাঁজে লুকিয়ে। হলদের ওপর কালোয় তাদের শরীরে চমৎকার ছবি আঁকা।

পাহাড়ের ওপর পাহাড়িদের কাঠের ঘর জঙ্গল দিয়ে ঘেরা। ঝোপের ফাঁকে ফাঁকে দেখা যায় টালির চাল, টিনের ছাউনি। ওখান থেকেই এল জুঠিদিদি। দিদির চেয়ে কয়েক বছরের বড়ো। জুঠিদিদি গল্পের ঝুড়ি।

ভূত প্রেত দত্যি দানবদের ওপর আমাদের অগাধ আস্থা ছিল সে বয়সে। তাদের চোখে দেখতে পাই না বলে একটু দুঃখ ছিল মনে, দিদি বলল দেখা হলে বোধহয় দুঃখ আরও বাড়তে পারে। তাছাড়া তারা তো থাকে সাত সমুদ্দুর তেরো নদীর ওপাড়ে। কাজেই দেখা হওয়ার সম্ভবনা কম। জুঠিদিদি বলল, তোরা ছেলেমানুষ বলে জানিস না কিছুই, সব আছে আমাদের আশপাশেই। হাওয়ায় ভর করে চলে ফেরে। চোদ্দ সমুদ্দুর উনচল্লিশ নদীও পার হয়ে যায় অনায়াসে। তাছাড়া তারা আসে চেনা মানুষের ছদ্মবেশ ধরে, কে কী বোঝা মুশকিল। মন্তর পড়ে দিলে তারা আর কিছু করতে পারে না। মন্তর কোথায় পাব জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকে। পরে অবশ্য ওই খোঁজ দিয়েছিল মন্ত্রপড়া কবচের। পরিয়েও দিয়েছিল।

বাড়িতে কেউ এলে আগে দেখি ছায়া পড়ে কিনা, পায়ের পাতা সামনের দিকে না পেছনে। সবাইকেই সন্দেহের চোখে দেখি। গল্প শোনার এমনি ঠেলা!

জুঠিদিদিকে নিয়ে এসেছিল ব্যাংকের পাহারাদার সাংবীরপুন্‌ দাদা। জুঠিদিদি ওর বন্ধুর মেয়ে, পাহাড়ের ওপরে ওদের পাশাপাশি ঘর। নেপালের লোকেরা সবাই খুব সুন্দর আর হাসিখুশি। ওরাও তাই। আমাদের ছাদ থেকে ও বাড়ি দেখাত আঙুল দিয়ে। জঙ্গলের মধ্যে পাথর সাজানো সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয়। কাঠ আর ইকড়ার তৈরি। ওদের ঘর নাকি ঝড় জল ভূমিকম্পেও ঠিক দাঁড়িয়ে থাকে, শুধু ধ্বস নামলে কিছু করার থাকে না। সে তো পাকা বাড়িও ভেঙে যায়। ধ্বস কাকে বলে জানা ছিল না আমাদের। ওর মুখেই শুনলাম পাহাড়ি এলাকায় বেশি বৃষ্টি বা ভূমিকম্প হলে মাটি পাথর আলগা হয়ে ঝুর ঝুর করে ভেঙে পড়ে। বড়ো বড়ো গাছপালা পাথর ঘরবাড়ি সবশুদ্ধ ধ্বংস হয়ে যায়। তার তলায় চাপা পড়ে জীবজন্তু মানুষ সব মারা পড়ে। একে বলে ধ্বস!

কম বয়স বলে মা বেশি কাজ করতে দেন না ওকে। সাংবীরপুন দাদাকে মা বলেছিলেন এইটুকু মেয়েকে কাজ করতে পাঠাল কেন? পড়াশুনা করাবে না? ও বলেছিল, বডডো গরীব ওরা, খেতেই পায় না পড়াবে কি! তাছাড়া নেপালীদের অল্প বয়সে বিয়ে হয়ে যায়। পড়বেটা কখন। শুনে মা মাইনে ছাড়াও কিছু কিছু করে টাকা জমিয়ে রাখতেন ওর বিয়ের জন্য। জুঠিদিদি মায়ের কাছে চুপচাপ, আমাদের কাছে কথার ফুলঝুড়ি। ওর বলা গল্পগুলোও অন্যদের থেকে আলাদা। বুনো গন্ধ লেগে থাকে তাতে। ছোট্ট বেলা থেকে কতজনের কাছ থেকে কত যে গল্প শুনেছি তার ঠিকঠিকানা নেই। মা দুপুরবেলা শুয়ে শুয়ে গল্প পড়ে শোনাতেন আর নিজের ছোটোবেলার গল্প বলতেন। বাবা অবনিন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাছা বাছা বই পড়ে শোনাতেন। ‘চাঁইবুড়োর পুঁথি’ বাবার মুখে শুনে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেত সকলে। বাবা শম্ভু মিত্রর প্রথম শিষ্য ছিলেন, পড়াটা ছিল অসাধারন! বড়ো পিসিমা আর দিদি, মানে ঠাকুমা বলতেন পুরানের গল্প, উপনিষদের গল্প, মেজ পিসেমশাই রবিঠাকুরের শান্তিনিকেতনে প্রথম দিকের ছাত্র। শমী ঠাকুরের বন্ধু। তিনি রবীন্দ্রনাথের পড়ানোর কথা বলতেন। পান্ডুর হিতেনকাকা বলতেন বাঘের গল্প, শিকারের গল্প। গল্প বলার রাজা ছিলেন আমার মেজপিসিমা। আজ অব্দি আর কাউকে ও রকম রসিয়ে গল্প বলতে শুনিনি। পুরুষের ছদ্মনামে তাঁর ছাপা লেখা পড়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁকে আলাপ করতে ডেকে পাঠান। তেরো চোদ্দ বছরের ছোটো মেয়ে সেই লেখক জেনে তিনি অবাক হয়ে অনেক আশীর্বাদ করেছিলেন। তখন অবশ্য এতসব কথা জানতে পারিনি, শুধু মুগ্ধ হয়ে গল্প শুনতাম। শুনতে শুনতে গল্পের বই পড়া শুরু হল। বাবা মাঝে মাঝেই বই কিনে আনতেন আমাদের জন্য। জন্মদিনে শুধু বই উপহার পেতাম। আমি নাকি অ আ ক খ শিখেছি গল্পের বই থেকে।  জুঠিদিদির গল্প অন্যরকম! বইতে পাইনি ওসব।

পাহাড়ের উপর যেখানে ওদের ঘর সেখানে মাঝে মাঝে চিতাবাঘ আসে। ওরা নাকি একবার দুটো চিতাবাঘের ছানা পুষেছিল। ওর বুড়াদাদা বনের মধ্যে খুঁজে পান। ওদের মা সাপের কামড়ে মরে পড়েছিল পাশেই। সেই ছানাদুটোকে তুলোর সলতেয় করে দুধ খাইয়ে খাইয়ে বড়ো করতে হয়েছিল। তাদেরই ছেলেপুলে নাতি নাতনিরা এ বাড়িটাকে নিজের বাড়ি মনে করে মাঝে মাঝেই আসে। তারা সবাই ওদের পোষা।

শুনে আমাদের হাত পা ঠান্ডা! ভয় করে না তোমাদের? জুঠিদিদি হেসেই অস্থির। তাহলে তো আমার ছোটো ভাইটাকেও ভয় পাওয়া উচিত! সেও তো বনে বনেই ঘোরে সারাক্ষণ! বুনোরা বরং লাজুক। ভয় পায় মানুষকেই। ওরা চায় মিলেমিশে থাকতে, মানুষরা তা চায় না। জানোয়ার দেখলেই তাকে মারতে চায়।

একটা মস্ত বড়ো ময়াল সাপ নাকি ওদের ঘরের আশেপাশেই থাকে। মাঝে মাঝে এসে দুধ খেয়ে যায়, কাউকে কিছু বলে না। ভারী সুন্দর ছবি আঁকা তার গায়ে। মাঝে মাঝে ইঁদুর খরগোশ বন মোরগ ধরে খায়। তারপর পেট ভরে গেলে কদিন চুপ করে শুয়ে থাকে, কিছু খেতে দিলেও খাবে না তখন। তবে শঙ্খচূড় সাপ বেশি কাছে আসে না। ভীষণ রাগ ওদের। অন্য সাপ ধরে খায়। বাসা বেঁধে ডিম পাড়ে ঘরের কাছেই।

দিদি বলে সাপটাকে খাঁচায় রাখলেই পারো! কামড় খাবার ভয় নেই তোমাদের? শুনেছি শঙ্কচুর সাপের ছোবল খেলে হাতিও মরে যায়!

জুঠিদিদি খাঁচার কথা শুনে রেগেই গেল। তোদের যত বাজে কথা! তোদের একদিন খাঁচায় বন্ধ করে রাখলে বুঝতে পারবি খাঁচায় থাকার দুঃখ। খোলামেলা থাকলে জানোয়ার একরকম, খাঁচায় ভরে দিলে যতই তাকে খাওয়াও আর যত্ন করো সে রেগে যায়। তার মাথায় খুন চড়ে যায়। ছাড়া পাবার পরেও সে রাগ ভুলে যায় না। তখনই সে মানুষ মারার কথা ভাবে। তাকে তার জায়গায় রেখেই ভালোবাসতে হয়, তবে সে ভালোবাসা ফেরত পাওয়া যায়।

জুঠি দিদি আরো কত যে গল্প বলত! ও নাকি উড়ন্ত সাপ, উড়ুক্কু কাঠবেড়ালি দেখেছে! আরো দূরের বনে গেলে দেখা যায় ওসব। এখানে এত মানুষের ভিড়ে আসতে চায় না ওরা। ওদের বাড়িতে যে পোষা উল্লুক ছিল, যার নাম বনমালী, সে প্রথম প্রথম নানারকম ডাক দিয়ে বনজঙ্গল মাতিয়ে রাখত। এত লোকজন বাড়িঘর দেখে সে ডাক ভুলে গিয়ে কাঁদতো মাঝে মাঝে। তাই তাকে বশিষ্ঠের জঙ্গলে ছেড়ে আসতে হয়।

আর বলত ওর বুড়াদাদার কথা। এখন তার বয়স একশর বেশি। বুড়ো হয়ে আর চলতেফিরতে তেমন পারে না, চোখে ভালো দেখতেও পায় না। জুঠি দিদি নিজের হাতে খাইয়ে না দিলে খায় না। সে নাকি কম বয়সে ভারি জোয়ান আর সাহসী ছিল। বুড়াদাদার বাবা ছিল জুঠি দিদির বাবার বাবারও বাবা। তারাও ছিল খুব জোয়ান। লড়াই করতে বিদেশে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। এখন এই বাড়িতে ঠাকুমা আর মাকে নিয়ে জুঠি দিদি আর তার ছোটো ভাইকে থাকতে হয়। বাবা না থাকলে ছেলেমেয়েদের খুব কষ্ট। বুড়া দাদা জঙ্গল দপ্তর থেকে পেনশন পায় বলে চলছে। বাবা আর দাদু বেঁচে আছে না যুদ্ধে মরে গেছে সে খবরও দেয়নি কেউ। তাই যুদ্ধের উপর খুব রাগ জুঠিদিদির। ওর বাবা অবশ্য ফিরে এসেছিল আমরা থাকতে থাকতেই।

একদিন আমি আর দিদি হাঁটতে হাঁটতে সেই পাহাড়ের গোড়ায় গিয়ে হাজির। অনেক খানি উঁচুতে ঘরগুলো দেখতে পাচ্ছি। ওর মধ্যে কোনটা জুঠিদিদিদের ঘর জানি না। কিন্তু এই বুনো রাস্তায় উঠব কি করে? বৃষ্টির জলের স্রোতে ঝোপ উঠে গিয়ে সিঁথির মত খাঁজ পড়েছে, তাতে মাঝে মাঝে ছোটো বড়ো পাথর বসিয়ে উপরে উঠে যাবার রাস্তা! কিন্তু যা খাড়াই উঠতে পারলেও নামতে পারব কিনা কে জানে! তবে এতদূর এসে ফিরে যাব? দুপাশের গাছের ডাল আর মোটা মোটা শিকড় ধরে অনেক কষ্টে উঠে গেলাম। একটা বিশাল চ্যাটালো পাথরের চারপাশে পাঁচ ছটা ঘর। মোটা মোটা বাঁশের তৈরি দেওয়ালের ওপর কাঠের আর টিনের ছাদ কোনরকমে খাড়া আছে। দূর থেকে যত সুন্দর পুতুলের ঘর মনে হয় ততটা সুন্দর মনে হল না। আরো কিছুটা ওপরে যেন দু তিনটে ঘর ওদের। বড়ো গাছের মোটা মোটা শেকড়ওলা গুড়ির মাঝে ঘর গুলো যেন গুহার মুখ। সত্যি সত্যি ঘরের পেছনে পাথরের বড়ো গুহার মধ্যেও থাকে ওরা। ঝড় বৃষ্টি হলে সবাই ওখানে গিয়ে ঢোকে। আমার যে কি ভালো লাগল জুঠিদিদিদের বাড়ি দেখে কি বলব। দিদির বোধহয় অতোটা পছন্দ হয়নি। বারবার বলতে লাগল, চল দেখা করেই ফিরে যাই। বিকেল হয়ে গেছে, আলো চলে গেলে নামতে পারব না।

জুঠিদিদি কি খুশি আমাদের দেখে! ওর ভাইটাকেও দেখলাম। আমার থেকেও ছোটো দেখতে। একটা ঢালু লম্বাটে পাথরের ওপরে উঠে স্লিপ খেয়ে নীচে নেমে আসছে বার বার। পাথরটা একেবারে সমান আর তেলতেলে। ও আমাদের দেখে আরো নানারকম কেরামতি দেখাতে লাগল, কিন্তু কাছে কিছুতেই এল না। জুঠিদিদির মা আর ঠাকুমা বেরিয়ে এল ঘর থেকে। আমাদের দেখে খুব খুশি। ওদেরও জুঠিদিদির মতই দেখতে। বাতাসা আর জল খেতে দিয়ে বারান্দার পাথরে বসাল।

জুঠিদিদি ঘরে গিয়ে ধরে ধরে নিয়ে এল ওর বুড়াদাদাকে। এত বুড়ো মানুষ আমি দেখিনি এর আগে। পাকা চুলগুলো চূড়ো করে বাঁধা। রোগা লম্বা শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সমস্ত গা যেন কাঠির মত সোনালি টুকরো জুড়ে তৈরি। জঙ্গলের চৌকিদারির চাকরি করত বুড়াদাদা। সারা জীবন ধরে জঙ্গলের অনেক কিছু দেখেছে জেনেছে। সাতটা গ্রামের লোক এই বুড়াদাদার কথা মেনে চলত। চোখে দেখতে না পেলেও বোধহয় কিছু বলতে চাইল আমাদের দিকে মুখ ফিরিয়ে। ফোঁকলা মুখে জিপটা নড়ে উঠল ঠোঁট কাঁপতে লাগল। কোন শব্দ বার হল না। একসময় ও বাতাসের গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারত বুনো হাতির দল কত দূরে আছে। মাটিতে কান পেতে জানতে পারত দলে কতজন আছে কোন দিকে তারা চলেছে। সে নাকি ক বছর আগেও তিরধনুক দিয়ে বনমুরগি মারতে পারত খাবার জন্য। জুঠিদিদির কাছে আর একটা কথা শুনে ভয় হল আমাদের মনে। এই পাহাড় জঙ্গলে অনেক ভূত পেত্নী আছে, তাদের বলে দেও। সেই কারণে এই নীলাচল পাহাড় আর মা কামাখ্যার মন্দিরের এত নাম ডাক। দেওদের অনেকেই নাকি এই বুড়াদাদার পোষ মানা। অনেক রোগের ওষুধ জানে তারা।

বাড়ি ফিরতে সেদিন বেশ দেরি হয়েছিল। আমাদের হাত ধরে পাহাড়ের গোড়া অব্দি পৌঁছে দিয়েছিল জুঠিদিদি আর ওর মা। বাড়ি ফেরার পথে দিদি আমাকে বারবার বলেছিল পাহাড়ে যাওয়ার কথা যেন কাউকে না বলি। কিন্তু পরে জুঠিদিদির বোকামিতে মার কাছে সব ফাঁস হয়ে যায়। মা কিন্তু বকেন নি। , শুধু বলেছিলেন, বলে গেলেই পারতি। সেই থেকে আমার বন পাহাড়ে ঘোরাঘুরিতে আর কোন বাধা রইল না।

মালিগাঁও থেকে প্রায় রোজই সন্ধ্যেবেলা আমরা অপেক্ষায় থাকতাম কখন হিতেন কাকা আসবে। হিতেন কাকা বাবার বন্ধু। মালিগাঁও রেলের কোয়ার্টারে থাকেন। আমাদের টানে সন্ধ্যে হলেই আসতেন। মাঝে মাঝে কাকিমাকেও নিয়ে আসতেন। হাতে থাকত চানাচুরের ঠোঙা। বাঘের গল্প, শিকারের গল্প আর আসামের বন জঙ্গলের যত গায়ের লোম খাড়া করা গল্প শুনতাম হিতেন কাকার কাছে। ওর বাবার একটা একনলা বন্দুক হাতে তখনকার আমলের জঙ্গলে মানুষ খেকো বাঘ আর বুনো শুয়োর শিকারের গল্প শুনলে হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসত। তিনি পাগলা হাতির তাড়া খেয়ে কিভাবে পালিয়ে বেঁচে ছিলেন সে সব শুনলে বোঝা যায় কি সাহস ছিল তখনকার বাঙালি শিকারীদের। তবে তিনি কখনো হরিণ বা ছোটোখাটো প্রাণী মারেন নি। সরকার তাঁকে ডেকে পাঠাতো যখন কোন শুয়োর, হাতি বা বাঘ মানুষ মারতো। একবার মনিপুরের পাহাড়ে বুনো হাতির তাড়ায় পাথরের ফাটলে ঢুকে প্রাণ বাঁচাতে হয়েছিল তাঁকে। খাড়াই সেই বাঁশের ঘন ঝাড়ের আড়ালে সেই ক্ষ্যাপা হাতির ডাক শুনলে হাত-পা অচল হয়ে যায়। ওই সাংঘাতিক ঢাল বেয়ে বাঁশের খোঁচা খেতে খেতে দু’ঘণ্টা তাঁকে ছুটতে হয়েছিল। হাতির শুঁড় মাঝে মাঝে ছুঁয়েও ফেলেছিল তাঁকে। ঘুরে দাঁড়িয়ে গুলি মারবারও সুযোগ দেয়নি হাতিটা। তিনি ফাটলে ঢুকে পড়ার পরে ওপর থেকে পেচ্ছাপ করে চান করিয়ে দিয়েছিল, এমন তার রাগ। সেই হাতি তার এক বছর পরে মারা পড়ে তাঁরই গুলি খেয়ে। তার দাঁতের মাপ ছিল পাঁচ ছ ফুট লম্বা। সরকার থেকে সে দুটো তাঁকে উপহার দেওয়া হয়।

হিতেন কাকা গল্পগুলো বলার সময় আমাদের মনে হত আমরাও বন্দুক কাঁধে বন জঙ্গলে বাঘের খোঁজে ঘুরে বেড়াচ্ছি। দু’তিনটে বাঘের গল্প আজও মনে আছে। একবার হিতেন কাকার বাবা সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়েছিলেন বাড়ির লোকেদের সঙ্গে। পূর্ব বাংলার খুলনার কাছে নৌকায় বেড়াতে বেড়াতে জঙ্গল ঘেঁষা খালে যাযাবর বেদেরা নৌকা লাগিয়েছে দেখতে পান। বেদেরা সাত আটটা নৌকা একসঙ্গে নোঙর করে কাঁকড়া ধরেছিল। সুন্দরবনের জঙ্গলে জোয়ার ভাঁটা খেলে। তখন ভাঁটা চলছে বলে জল নেমে গিয়ে ভেজা মাটি আর গাছের শিকড়ের জালে আটকে থাকা বড়ো মাছও পাওয়া যায়। কাঁকড়ার গর্তের ভেতর পাওয়া যায় বড়ো বড়ো কাঁকড়া। এ নৌকা থেকে হাঁক দিয়ে বেদেদের নৌকায় মাছ আছে কিনা জিজ্ঞেস করলেন হিতেন কাকার বাবা। উত্তরে ওদের নৌকা দাঁড় করাতে বলে বেদে মোড়ল ছিপ নৌকা নিয়ে কাছে এসে বড়ো একটা ভেটকি মাছ দিয়ে যাবার সময় বলে গেল বনে যাতে নামার চেষ্টা না করা হয়। এদিককার জঙ্গল গরম। বিপদ হতে পারে!

কিন্তু ওদের জন্য যে বিপদ অপেক্ষা করছিল তার কথা তারা জানতেও পারেনি। হিতেন কাকা নিজেও ছিলেন নৌকায়। তিনি বললেন, মিনিট দশপনের পরে আমরা শুধু একটা চিৎকার শুনতে পাই। কেউ যেন কারো গলা চেপে ধরেছে, সেই রকম চাপা ঘরঘর আওয়াজ। আমরা বেশি দূরে যাইনি তখনও। বাবা তাড়াতাড়ি নৌকা ঘোরাতে বললেন। বেদে নৌকাগুলোর কাছে গিয়ে দেখি ভয়ংকর কান্ড। মোড়লের বড়ো ছেলেকে বাঘে টেনে নিয়ে গেছে। দলবল নিয়ে তারা দা সড়কি হাতে বনে ঢুকেছে বাঘের মুখ থেকে ছেলেকে টেনে আনতে। বাবাকে আসতে দেখে ছেলেটার মা বলল, বাবু তোর বন্দুকটা দিয়ে বাঘটাকে মেরে আমার ছেলেটাকে নিয়ে আয়, পায়ে পড়ি তোর। সেই প্রথম সুন্দরবনের ডাঙায় নেমে বাঘ শিকার বাবার। তার চামড়াটা আছে দমদমের বাড়ির বৈঠকখানায়। তবে ছেলেটাকেও বাঁচানো যায়নি। সুন্দরবনের বাঘের মতো হিংস্র বাঘ আর কোথাও নেই।

ভাগ্যিস আমি তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি, তাই প্রায় প্রত্যেকদিন সন্ধ্যাবেলায় গল্প শুনতে পেতাম। দিদি মাঝে মাঝে তাড়াতাড়ি পড়াশোনা শেষ করে নিলেও দাদা বেচারার পড়া থাকত বলে বেশি শুনতে পায়নি হিতেন কাকার গল্প। একটা গোরুর দশ ফুট উঁচু বেড়া টপকে যাবার গল্পটা মনে থাকতে থাকতে বলে রাখি! বনের মধ্যে কোয়াটার ওদের। ওর বাবা বন দপ্তরেই চাকরি করতেন বলে সবাই মিলে ওখানেই থাকতে হত। তখন হিতেন কাকা খুব ছোটো। বিকেল হলেই দু মানুষ উঁচু লোহার গেট বন্ধ করে দিতে হত। অনেকটা জমি মোটা ঘন কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে ঘেরা, মাঝখানে বাংলো। আরো কিছু বনকর্মীর ঘর আছে একটু তফাতে। তারা গোরু ছাগল পোষে, কুকুরও আছে কয়েকটা। মাঝে মাঝে গোরুগুলো কাকাদের জমিতে ঢুকে গাছপালা খেয়ে যায়। সেদিন শীতের রাত বলে তাড়াতাড়ি খাওয়া সেরে কুয়োর কাছে মুখ ধুতে গিয়ে হিতেন কাকার মা দেখলেন অন্ধকারে হাত দশ পনেরো দূরে একটা গোরু দাঁড়িয়ে আছে তরকারি খেতের ওপর। হাততালি দিয়ে হ্যাট হ্যাট করে তাড়া দিতেই গোরু একলাফে দশ বারো ফুট উঁচু বেড়া ডিঙিয়ে জঙ্গলে পালিয়ে গেল। লাফ দেবার সময় গোরুর জাত চেনা গেল হালুম শব্দে আর হ্যারিকেনের আলোয় তার গায়ে কালো ডোরা দেখে। দরজা কোনমতে লাগিয়ে বাড়ির লোকেদের কাঁপুনি থামেনা। এ রকম গল্প কত যে শুনেছি হিতেন কাকার কাছে!

স্কুলে ভর্তি না হলেও বাড়িতে পড়া শুরু হয়েছিল আমার অনেকদিন আগেই। মা কাজের ফাঁকে ফাঁকে পড়িয়ে যেতেন। তখন সবে অ আ ক খ আর এ বি সি ডি শেখার পর বানান লেখা আর কথা বানিয়ে লেখা শিখছি। এক দুই তিন চার শিখে অঙ্কও করতে পারি। বই পড়তে কী করে তার আগেই শিখে ফেললাম আজ আর মনে নেই। ইংরেজি বই আর বুক অফ নলেজের পাতায় ছবি থাকত অনেক। পড়তে পড়তে দেখতাম। কিন্তু রবি ঠাকুরের সহজ পাঠ পড়ার পর খুব খুশি হয়েছিলাম সাদাকালো ছবি দেখে। লেখা আর ছবি যেন হাত ধরাধরি করে চলছে! বাবা বললেন ছবিগুলো নন্দলাল বসুর আঁকা। ঐ আমার আসল ছবি দেখার শুরু। ওর তুলনা নেই। পাঁচ ছ বছরের ছেলেকে যা খুশি করতে পেরেছিল! যে ছেলে ছিল ভীষণ চঞ্চল।

এইরকম একটা সময় বাবার বন্ধু সুভাষ মুখোপাধ্যায় আমাদের সন্দেশ পত্রিকার মেম্বার করেছিলেন। পত্রিকা যে এমন হতে পারে জানা ছিল না। ভাই বোনেদের সঙ্গে মা বাবাও কাড়াকাড়ি করে পড়তেন। হাত ফেরত হয়ে হয়ে এক-দু’দিনের মধ্যেই পড়া হয়ে যেত আমাদের। সত্যজিৎ রায় আর সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের সই করা মেম্বারশিপ কার্ড পেতেও দেরি হল না। খুব রাগ হত যখন ডাকপিওন মানুষটি পত্রিকা দিতে এসে নিজেই পড়তে বসে যেতেন। মনে পড়ছে ওইটুকু বয়সে প্রথম পড়েছিলাম সম্পাদকের লেখা ভূমিকা। উপেন্দ্রকিশোরের টুনটুনির বই, রামায়ণ মহাভারত পড়া ছিল আগেই। এবার ‘লাল সুতো আর নীল সুতো’, ‘গুপী গায়েন আর বাঘাবাইন’ পড়ে একেবারে নিজের লোক মনে হল। সুকুমার রায়ের কবিতা তো মুখস্তই ছিল সব, তাঁর লেখা গল্পগুলো পেয়ে হাতে চাঁদ পেলাম। বিশেষ করে পাগলা দাশুর তো জবাব নেই! আর হেঁশোরাম হুঁশিয়ারির গল্প। বাবলি হয়ে গেল বেচারাথেরিয়াম, আমি ল্যাগব্যাগোর্নেস আর দিদি সর্বানী হল চিল্লানোসরাস। দাদা নিজে হেঁশোরাম। এরপর যখন পেতে লাগলাম সত্যজিৎ রায়, লীলা মজুমদার, প্রিয়ম্বদা দেবী, গৌরী ধর্মপাল সহ এক ঝাঁক নতুনদের লেখা। আমাদের পড়ার নেশা এমন হল বই ছাড়া আর কেউ কিছু উপহার দিলে রাগ হত। টংলিং, ব্যোমযাত্রীর ডায়েরি, বঙ্কুবাবুর বন্ধু, পিকলুর সেই ছোটোকা, মালশ্রীর পঞ্চতন্ত্র মিলে ঘুম কেড়ে নিল। ছবিগুলো যে কেউ আঁকলে তবে ছাপা হয় জানতামই না। মনে হত লেখার সঙ্গে ছবিগুলো আপনি ঢুকে গেছে বইতে। তাদের যেন প্রাণ আছে!

আর পেলাম প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর। জীবন সর্দার শিখিয়ে দিলেন পশু পাখি গাছপালা মাটি জল কিভাবে দেখতে হয়, বাঁচিয়ে রাখতে হয়। কোনো ফল খেলে আটি পুঁতে দিতাম সরস মাটিতে। পাখি ধরে খাঁচায় আটকে রাখার কথা ভাবতেও পারতাম না। নালায় নেমে শামুক গুগলিও তুলে ভালো করে দেখতাম। দেখতাম সাপ, গিরগিটি, কেন্নো বা পিঁপড়ের চলন। নজরে থাকত শুঁয়োপোকা থেকে কী করে প্রজাপতি অথবা ব্যাঙাচি থেকে ব্যাঙ হয়ে ওঠে। শুরু হল রাস্তা থেকে কানা খোড়া কুকুর বিড়ালের ছানা পেয়ে তিনতলার ঘরে রেখে তাদের সুস্থ করে তোলার দিকে ঝোঁক। দেখলাম আদর-টাদর পেলে তারা ঠিক বেঁচে যায়। প্রথম প্রথম মাকে লুকিয়ে করলেও পরে দেখলাম মায়েরও অতকিছু আপত্তি নেই। বরং কদিন বাদে মা-ই তাদের দেখভাল করতেন।

বাড়িতে আমাকে পড়াতে আসতেন স্বপ্না দিদিমণি। পড়ানোর আগে একটা কঠিন কাজ করতে হত তাঁকে। পাহাড় জঙ্গলের থেকে আমাকে খুঁজে নিয়ে আসা। বড্ড জ্বালাতন করেছি তাঁকে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এখন। পড়তে ভালোই লাগত। মা সবই শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আমাকেও স্কুলে ভর্তি হতে হবে, তাই বাড়িতে দিদিমনির কাছে পড়তে বসা। তাঁর জোয়ান খাওয়া মুখের গন্ধ আজও মনে পড়ে। ফাঁক ফাঁক দাঁতের ফাঁকে সুপুরি আর জোয়ানের টুকরো লেগে থাকত। আমি একদিন আধ মুঠো জোয়ান ওঁর কৌটো থেকে নিয়ে মুখে দিয়ে চিবোতেই লাফাতে লাগলাম। কী ঝাল রে বাবা! স্বপ্না দিদিমনির বড়ো ছেলে একদিন আমাকে একটা লম্বাটে ছোটো খাতা আর একটা দু ইঞ্চি মাপের কলম উপহার দিয়েছিলেন। সেটাই আমার জীবনের প্রথম ফাউন্টেন পেন। লিখতে গিয়ে কালি ভরে বোঝা গেল ফাউন্টেন নাম তার সার্থক। একমুখী নয় সে, বহুমুখী। কালি ধরে রাখার ব্যাপারে সে উদাসীন। ফলে পড়াশোনার পর আমাকে প্রায় চান করানো হত! তবু সেই পেন দিয়েই আমার কলমে লেখা শুরু হল। খাতাটাও ভরে ফেললাম কদিনেই। বাবা একবার একটা দামি আর মোটা কাগজের ড্রইং খাতা কিনে দিলেন আমাদের চার ভাই বোনের জন্য। কারণ আমি বাড়ির খাতায় যত্রতত্র আঁকা শুরু করেছিলাম। কথা দিতে হল অঙ্ক খাতায় আর ছবি আঁকা চলবে না। বাবা খাতাটার নাম দিলেন হাত চুলবুল খাতা। মা অনেকদিন সে খাতা আগলে রেখেছিলেন। কারণ তাতে আমার জীবনের প্রথম আঁকিবুকিগুলোর মধ্যে মানে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল। রেখা ছাড়াও রংয়ের যথেচ্ছাচারে তার চেহারা হয়েছিল অবর্ণনীয়। বড়ো হয়ে ওঠার পরেও অনেকদিন খাতাটা খুলে সেই বয়সটাকে ছুঁতে পারতাম। বাবার বদলির চাকরিতে নানান জায়গায় ঘুরতে ঘুরতে সেই খাতাগুলো আর খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর মধ্যে এই ‘হাত চুলবুল খাতাও’ একটা।

পান্ডুতে আসার কিছুদিন পর এক ছুটির দিনে বাবার সঙ্গে কামাখ্যা মন্দিরে যাওয়া হল। সেই প্রথম আমার কামাখ্যার নীলাচল পাহাড়ের চূড়ায় ওঠা। পান্ডু বড়ো বাজারের উল্টোদিকে অরুণা সিনেমা হলের পাশ দিয়ে কাঁচা রাস্তাটা শেষ হয়েছে নীলাচল পাহাড়ের তলায়। সেখান থেকে পুরনো দিনের পাথরের সিঁড়ি বেয়ে উঠতে হয় চুড়োর কাছাকাছি কামাখ্যা মন্দিরের চত্বরে। সেখানেই কামাখ্যা মন্দির। আরও বেশ কিছুটা উঠলে চুড়োয় ভুবনেশ্বরী মন্দির। কী যে চমৎকার ছিল পথটা আগাগোড়া! দু’পাশের ঢালু জমিতে ঘন জঙ্গল। মস্ত মস্ত গাছের পাতায় ছাওয়া মোটা মোটা ডাল মাথার উপর জাল বুনেছে, হাজারো নাম না জানা পাখির ডাক। গাছের কোটরে কোটরে পাখিদের আর কাঠবেড়ালিদের বাসা। বুনো ঝোপঝাড়ে কত ফুল ফুটে আছে, বাতাসে তাদের বুনো বন্ধ। সিঁড়ি মাঝে মাঝে নেই, মস্ত মস্ত পাথরের গায়ে খাঁজ কাটা। পথের মাঝে জঙ্গল ঘেরা গণেশ মন্দির। কালো পাথরে তৈরি বিশাল গণেশের মূর্তিতে লাল সিদুঁর লেপা। অন্ধকার মন্দিরে নজর করে দেখতে হয়, ভয় লাগে। মন্দিরের আশেপাশে এলোমেলো পড়ে থাকা পাথরের টুকরোর গায়ে কত ছোটো ছোটো মূর্তি, ফুল, জীবজন্তু খোদাই করা। অনাদরে পড়ে থাকা গোল কালো পাথরে নরকাসুরের মূর্তি। মোটা বটগাছের শেকড় তাকে সাপের মতো ঢেকে ফেলতে চাইছে। তলায় পড়ে থাকা শুকনো পাতার স্তূপে পোকামাকড়। গণেশ মন্দিরের বাঁয়ে একটা লাল মাটির পথ সেটা দেখা যায়, আমাদের বাড়ির ছাদে উঠলে। এই পথ দিয়েও মন্দিরে যাওয়া যায়। ওখানে জঙ্গল আরও ঘন। সাপের উৎপাত আছে বলে আমরা সিঁড়ি দিয়েই উঠলাম। গণেশ মন্দির থেকে সিঁড়িটা অনেক বেশি খাড়াই। এখানে খানিকটা ওঠার পর প্রাচীন পাথরের সিংহ দরজা, যার দুপাশে সিংহের অদ্ভুত মূর্তি খোদাই করা। এই জায়গাটা আমার সবচেয়ে প্রিয়। কতবার যে এখানে এসে বসে থেকেছি ঘণ্টার পর ঘণ্টা!

এখানে কোন শব্দ নেই। সামনে বেশ বড়ো একটা পাথরে খোদাই করা গণেশ মূর্তি, বোধহয় হাজার বছর আগে কেউ খোদাই করেছিল। জল আর হাওয়ায় ক্ষয়ে ক্ষয়ে প্রায় চেনা যায় না তাকে। মাথার উপর কাঠগোলাপ ফুলে ছাওয়া বিশাল অষ্টাবক্র গোড়ার গাছের ছায়া। তার গন্ধে মাতাল হয়ে আছে বাতাস। বড়ো বড়ো পাথর ছড়ানো চারদিকে। বড়ো পাথরের ডান দিকে অতল খাদ অনেক নীচে নেমে গেছে আর একটু বাঁক নিয়ে সোজা সিঁড়ি উঠে গেছে আবার কামাখ্যা মন্দিরের দিকে। এই বনে শঙ্খচূড় সাপ আর চিতা বাঘের বাসা।

এখানে বাঘের ভয়ে খুব কম লোক যাতায়াত করে এখনও। বেল গাছ থেকে অজস্র পাকা বেল নীচে পড়ে শুকিয়ে থাকে। যাত্রীদের বিশ্রাম নেবার জায়গা ছিল এটা। যারা গৌহাটি শহরের দিক থেকে গাড়ি চলার রাস্তায় কামাখ্যায় আসে, তারা এই চমৎকার পথটার কথা জানতেই পারে না।

এখানেই বাবার অফিসের চাপরাসি রমেশ বর্মন এক দুর্যোগের রাতে চিতা বাঘের হাত থেকে নেহাত কপাল ভালো ছিল বলে বেঁচে যান। পরে বলব তার কথা। অত সুন্দর নির্জন বন আমার আর চোখে পড়েনি। কয়েকশো বছরের পুরনো গাছগুলোর খোঁদলে বাসা করে কত রকমের পাখি থাকত! তাদের রকমারি ডাক কানে মধু ঢালতো। অত ডাকাডাকিতেও নির্জন বনের ঘুম ভাঙতো না। গাছগুলোর ফাটা বাকল বেয়ে কত বিছে পিঁপড়ে আর পোকামাকড়ের দল ব্যস্ত পায়ে চলাফেরা করত। লাল রংয়ের কাঠবেড়ালিদেরও দেখতে পেতাম। মানুষ দেখলেই লালরঙা ঝাঁকালো লেজ তুলে ছুটে পালাত। ওরা নাকি খানিকটা উড়তেও পারত! চার হাত-পা পাতলা ভাঁজ করা চামড়া দিয়ে জোড়া থাকত। দূরের ডালে যাবার সময় চার হাত পা ছড়িয়ে দিলেই গ্লাইডারের মতো উড়ে যেত। ছোটো বড়ো সাপও ছিল কত রকম। ছোটো ছেলেপুলেদের তারা কিছু বলত না।

বড়ো হয়ে আমি আমার ছোটোবেলার বন্ধু হোদল একবার খাদের দিকের জঙ্গলে হরিণ দেখেছিলাম। বাঘ মামা কখনো দেখা দেননি। ছোটোবেলাতেও অনেকে দেখলেও আমার চোখে পড়েনি। বোধহয় দয়া করেই দেখা দিতে চাননি। তবে একজন দোকানদারকে দেখে চমকে গেছিলাম, তার ভাগ্য অতটা ভালো ছিল না। তার একদিকের কান ঘাড়ের অনেকটা মাংস সহ নেই! গলার কাছে একটা ফুটো দিয়ে খাবার খেলে বার হয়ে আসে। কথা বলতে গেলে ফ্যাঁস ফ্যাঁস শব্দ হয়। কি বলছে বোঝা যায় না। চিতা বাঘের হাত থেকে কোন মতে বেঁচে গেছিল সে। কামাখ্যা মন্দিরে যাওয়ার যে লাল মাটির রাস্তাটা আমাদের বাড়ির ছাদ থেকে দেখতে পেতাম তারই নীচে কটা চালা ঘর ছিল। সেখানে ছোট্ট একটা পান তাম্বুলের খোলা দোকানে বসে থাকত সে।  লোকজন সেভাবে নেই বললেই চলে। হঠাৎ একদিন পেছন থেকে কেউ তার দুকাঁধে আলতো করে হাত রাখে। বউ না কোন বন্ধু ভেবে সে দু একটা কথাও বলে। তারপর এই বন্ধুটি আচমকা তার ঘাড় কামড়ে ধরে। থাবার নখ ঢুকে যায় গলায়। কপালগুণে তিন চারজন তীর্থযাত্রী এসে পড়ায় চিতাবাঘটি জঙ্গলে পালিয়ে যায়। সাত মাস হাসপাতালে থাকার পর বেঁচে ফিরে আসে লোকটি। মা কামাখ্যার আশীর্বাদেই তার এই অলৌকিক লক্ষণ বলে মনে করে সে। বলা বাহুল্য চিতাটি সেই আশীর্বাদ পায়নি।

তবে এসব অনেক দিন পরে ঘটেছিল। বছর দুই আগে পড়া বাঘের কথা কাগজে ছাপা হয়েছিল, সেটাও এই এলাকাতেই। তারও ক’বছর আগে এই পাহাড় ঘেঁষা আমার দিদির বাড়ির পনেরো ফুটের মধ্যে দুই ছানা সহ চিতা মাকে দেখা গেছে। আজকাল গৌহাটি শহরের এই প্রান্তে বড়ো চিতাবাঘের উৎপাত। আমাদের ছোটোবেলায় প্রায় পঞ্চান্ন ষাট বছর আগে এতটা ছিল না। এখন ঐ নির্জন সিঁড়িপথে যেতে গা ছমছম করে। তবু আমার পছন্দের জায়গা ছিল ঐখানটাই।

কামাখ্যা মন্দিরের চূড়া দূর থেকে দেখতে পেলেই পায়ে তাড়া লাগত। বড়ো বড়ো পাথর সাজিয়ে বিশাল চত্বরের মাঝে মস্ত মন্দির। তার চূড়াগুলো রোদ পড়লে ঝকঝক করত। গায়ে পাথর খোদাই করা দেব-দেবীদের মূর্তি ছাড়াও অসংখ্য কারুকাজ। একদিকের বাংলার খোড়ো চালের ধাঁচে তৈরি ঢালু ছাদের মন্ডপ ঘিরেও নানারকম মূর্তি। তবে আমার মনে চিরকালের মতো জায়গা করে নিয়েছে পেছনের সিংহ দুয়ারের পাশে পাথর খোদাই মার কোলে শিশুর মূর্তি। কোলের শিশুকে আদর করছে মা, শিশুর বাড়ানো পা মায়ের থুতনি ছুঁয়ে আছে। আজও আমার শরীর অবশ হয়ে আসে ঐ মূর্তির কথা মনে হলে। হাজার বছর আগে কোনো মহান শিল্পী ঠিক বুঝেছিলেন মা কাকে বলে! তাঁকে আমার সেলাম।

পূজা বা পাঁঠাবলিতে আমার কোন টান নেই কোনকালেই। আমি দেখতাম হাজার হাজার পায়রার ওড়াউড়ি। মানুষের ভয় নেই তাদের। বড়ো বড়ো বাঁকানো শিংওয়ালা মালাখোর পাঁঠার দল। তীর্থযাত্রীদের গলায় গাঁদা ফুলের মালা দেখলেই কেড়ে নিয়ে খেয়ে নেয় ওরা। তাই বাবা বলতেন মালাখোর। দেখতে ভালোবাসতাম সিঁড়ি দিয়ে ঘেরা সৌভাগ্য কুন্ডের সবুজ শ্যাওলা ভাসা জল। নীচের সিঁড়িতে বড়ো বড়ো কচ্ছপের রোদ পোহানো। আর শেকলে ঝোলানো কত কালের ঘণ্টা বাজিয়ে তার শব্দ শোনা। বাতাসে ও একটা পুজো পুজো গন্ধ পেলে ভালো লাগত। আর খুব ভালোবাসতাম নকুলদানা, যার ভেতর ক্ষীর দেওয়া। পাঁঠাকে চান করিয়ে টেনে নিয়ে যেতে দেখলে পালিয়ে যেতাম। কানে হাত চাপা দিয়ে চোখ বুঁজিয়ে লুকিয়ে থাকতাম মার পেছনে। মারও দেখতাম ভুরু কুঁচকে রয়েছে।

আমার মা তাঁর ছোটোবেলায় বাপের বাড়ির কালীপুজোয় পাঁঠাবলি বন্ধ করিয়েছিলেন রীতিমতো বিদ্রোহ করে, সারা জীবন মাংসও খাননি। কিন্তু এখানে কে তাঁর কথা শুনবে? দেখতাম টিনের চালার তলায় মেঝে ভর্তি রক্ত, নালা দিয়ে বয়ে চলেছে রক্তের স্রোত। পুজো বলে মনে হত না। বরং উৎসর্গ করে ছেড়ে দেবার কাজটি ছিল ভালো।

মন্দিরে ঢুকে কয়েক ধাপ নীচে নেমে অন্ধকার গুহার এক জায়গায় কোন চোরা স্রোত বয়ে যেত। ঐখানে দেখতাম পাথরের গায়ে তেল সিঁদুর মাখিয়ে ফুল বেলপাতা দিয়ে পুজো হচ্ছে।। প্রদীপের আধো অন্ধকারে ধুপ ধুনোর গন্ধে আর ধোঁয়ায় দম আটকে আসত। গম্ভীর গলার মন্ত্র পাঠ পাথরের দেওয়ালে ঘা খেয়ে খেয়ে ফিরত। এটাই নাকি আসল জায়গা। এখানেই জাগ্রত দেবী কামাখ্যা আছেন। আমার মন বলত মা কামাখ্যা আছেন বাইরে। ছেলে কোলে নিয়ে বসে আছেন। সব বিপদ আপদ আটকে দেবেন তিনি।

মন্দির ছাড়িয়ে এবড়ো খেবড়ো পাথরের সিঁড়ি ভেঙে অনেক উপরে পাহাড়ের চূড়ায় ভুবনেশ্বরী মন্দির। কেউ কোথাও নেই। মন্দিরের পেছনে মস্ত বটগাছের মোটা শেকড় আর পাথরের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে শুয়ে বসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যেত। মুখের কথা আপনিই বন্ধ হয়ে আসে। শুধু ছোটো ছোটো পাখি আর কাঠবেড়ালির কিচিরমিচির ফুলের গন্ধে ভোর হয়ে থাকা বাতাস আর অনেক নীচে বিশাল ব্রহ্মপুত্রের পাশে রঙিন কাঁথার মতো শুয়ে থাকা গৌহাটি শহর! মা একটার পর একটা কমলালেবু ছাড়িয়ে হাতে দিতেন তাই মুখে দিয়ে চিবোতে চিবোতে চেয়ে চেয়ে দেখতাম। দেখে দেখে আশ মিটত না।

তখনো ভর্তি হইনি ইস্কুলে। বাড়ির কাছাকাছি বন্ধু হয়েছিল অনেক। সবাই বাঙালিও নয়। দীপুদিদের বাড়ির গায়েই একটা বাংলো মত বাড়ি ছিল। চারপাশে অনেকটা ঘাস ছাঁটা মাঠের মাঝে আসাম টাইপের বাড়ি, মাথায় লাল করোগেটেড টিনের চাল। সামনে কাঠের রেলিং ঘেরা বারান্দা। দেয়ালগুলো কালো কাঠের প্রেমে ঘেরা সাদা রং করা ইকড়ার। সেই চমৎকার বাড়িটাতে নতুন ভাড়াটে এল। তিনটি বন্ধু হল আমার বাবু, বাচ্চু আর পানু। বাবু আমার বয়সী, বাচ্চু দু বছরের ছোটো আরও এক বছরের ছোটো পানু। তিনজনেই সমান দুষ্টু। আমরা তখন বেশ দলে ভারী। পাঁচ ছ জন মিলে ঝরনার পাশের পথ দিয়ে পাহাড়ে উঠে যাই। একটু একটু করে সাহস বাড়তে থাকে। মেয়েদের মধ্যে শুধু চাঁদু আসে, দিদি আদুদি দীপুদিরা আটকাবার চেষ্টা করে আমাদের। নীচেই থাকে ওরা। তাই জানতেই পারে না অনেকটা উঠে গেলে ওপরে স্বর্গ আছে।

গল্পে স্বর্গ নরকের কথা শুনেছি। আমরা পাহাড়ের ওপর সেই স্বর্গ খুঁজে পেলাম। লাল মাটির খাড়া পথে অনেকটা উঠে যেতে পারলে কড়াই এর মত একটা বড়ো গোল জায়গা সমান ভাবে চারিদিক থেকে নেমে ফুটচারে গভীর একটা গর্ত তৈরি করেছে। চারিদিকে বড়ো বড়ো পাথর থাকলেও তিরিশ চল্লিশ ফুট ব্যাস গর্তটা ঘাস ছাঁটা মাঠের মতো। সেখানে ছোটো ছোটো গাছ ফুলে সাদা হয়ে আছে। তাদের অপূর্ব গন্ধে ঘুম আসে। এখানে ছোটো ছোটো ঝাঁকবাঁধা সবুজ রঙা পাখি উড়ে আসছে, বসছে আবার উড়ে যাচ্ছে অন্য জায়গায়। আমরা ঐখানে শুয়ে থাকতাম, গড়াগড়ি খেতাম। মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়তাম। এখান থেকে আমাদের বাড়িগুলো দেশলাই বাকসো দিয়ে তৈরি মনে হয়। দিদিরা তলা থেকে হাত নাড়ত, পুতুল পুতুল লাগত।

নেমে আসার কথা মনে পড়লে ভয় করে এখন। উপরে ওঠার চেয়ে নেমে আসা কঠিন এমনিতেই। এই পথটা ছিল বেজায় ঢালু! মাঝে মাঝে বড়ো বড়ো পাথর। আমরা একবারও না থেমে দৌড়ে নামতাম। দৌড়াতে দৌড়াতেই বুঝতে পারতাম থামা চলবে না একেবারেই, গড়াতে গড়াতে নীচে পড়ে মরে যাব! কয়েকটা পাথরের উপর দিয়ে লাফিয়ে পার হতে হত। একবার খুব বড়ো একটা শঙ্খচূড় সাপের উপর দিয়েই টপকে চলে যাই। সাপটা বিড়ে পাকিয়ে শুয়ে বোধহয় ঘুমোচ্ছিল। ও পাক খুলতে খুলতেই পার হয়ে চলে যাই আমরা। যে কোনদিন ওখানে মরে যেতে পারতাম, কিন্তু আশ্চর্য, আমাদের কিছুই হয়নি!

আমরা পান্ডু এসেছিলাম শীতের শেষে। এখন বসন্তকাল পার হয়ে গরম পড়ে গেল। ব্যাংকের কাজ বাড়লো বাবার। মার সঙ্গে রেস্ট ক্যাম্পের আরো অনেক বাড়ির লোকেদের আলাপ হল। মার সঙ্গে আমরাও যেতাম, তাঁরাও আসতেন। রেস্ট ক্যাম্পের ঐ ছেঁচা বাঁশের কোয়ার্টার গুলো আমার বড়ো ভালো লাগত। মাথাতেও ছেঁচা বাঁশের পুরুচালা, মেঝেগুলো শুধু সিমেন্ট করা। কোয়ার্টার গুলোর বাইরে চমৎকার ঘাসে ঢাকা মাঠের মাঝখান দিয়ে কালো পিচের রাস্তা। বাঁশের ঘেরা বেড়ার মধ্যে আমগাছ, পেয়ারা গাছ, জলপাই আর অনেক সুপুড়ি গাছ। ছোটো ছোটো তরি তরকারির বাগান। কি যে শান্তি ছিল বাড়িগুলোয় বলবার নয়! ইট সিমেন্টের বাড়ি থেকে অনেক ভালো লাগত আমার, দাদার সঙ্গে ওখানে খেলতে যেতাম মাঝেমাঝে। যে স্কুলে ভর্তি হব সেটা দেখলাম। ঠাকুমা আগেই এসেছিলেন। ঠাকুমাকে দিদি বলতাম আমরা। দিদির সঙ্গে রেস্ট ক্যাম্প কালীবাড়িতে যেতাম। বড়ো ভালো ছিল কালীবাড়ি। ছোট্ট মন্দিরে ছোটো মূর্তি, মাথার উপর টিনের চাল। বড়ো একটা চন্ডীমন্ডপ শালের খুঁটির ওপর টিনের চাল দিয়ে তৈরি। ওখানে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতাম।

মেজ পিসিমারা এলেন কলকাতা থেকে। নিয়ে এলেন আমার বড়ো পিসিমার মেজো ছেলে, মেজদা। আর এলেন মেজ বউদি, পকোদি। পকোদি খুব ভালো গান করেন, রেডিওতে মাঝে মাঝে শুনি তার গান। মূর্তি তৈরি আর ছবি আঁকাতেও দারুন হাত! পকোদির ভালো নাম তপতী পাকরাশী। বেতার জগতে ওর ছবি দেখতাম। ওকে দেখতেও সুন্দর। বউদিও খুব সুন্দরী। মেজদাকে তো সাহেবের মত দেখতে! মেজ পিসিমা ছোটোখাটো, হাসিমুখ, বড়ো ভালো মানুষ। গল্প বলার রাজা! ওর লেখা গল্প পড়ে রবীন্দ্রনাথ খুশি হয়ে আলাপ করতে চেয়েছিলেন। মেজ পিসিমা পুরুষের ছদ্ম নামে লিখতেন। রবীন্দ্রনাথ চোদ্দ বছর বয়সের ছোটো মেয়েটিকে দেখে বলেছিলেন “আমি তো ভেবেছিলাম লেখক বেশ গোঁফদাড়িওয়ালা বড়ো কেউ হবেন, তুমি ওরকম ভালো গল্প লিখলে কি করে!” মেজ পিসেমশাই ছিলেন রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মচর্যাশ্রমের প্রথম দিকের আশ্রমিক, শমী ঠাকুরের বন্ধু। তিনি লেখায় উৎসাহ দিলেও জমিদারবাড়ির বড়োবউ মেজপিসিমা খুব বেশি লেখার সময় পাননি। লিখলে আর একজন মস্ত বড়ো লেখক পেতাম আমরা।

আর একটা লুকানো পরিচয় ছিল আমার দুই পিসিমার। তাঁরা যে বিপ্লবী ছিলেন সে কথা কেউ জানতে পারেনি। বিপ্লবী ত্রৈলোক্য মহারাজ অনেকদিন পরে তা ফাঁস করে দেন। তখন বিপ্লবীদের অনেক সুবিধে দেওয়া হত, ইন্দিরা গান্ধী তাম্রপত্র বিলি করেছিলেন। অনেক চোর ডাকাত আর ব্রিটিশের চরও পেয়েছিলেন সেসব। ত্রৈলোক্য মহারাজ যখন জিজ্ঞেস করেছিলেন তাম্রপত্র নেননি কেন? তাঁরা উত্তর দেন যারা স্বাধীনতার আগে ইংরেজদের অনুগত ছিলেন তাঁদের হাত থেকে তাম্রপত্র নিলে দেশের অপমান হত, তাই ও পথে যাইনি।

রোজ ভোরবেলা পাহাড়ে নদীর ধারে বেড়াতে যাওয়া চালু হল সবাই মিলে। মেজোমার কাছে একটা ভালো দূরবীন ছিল আর পকোদির ছিল ক্যামেরা। আমরা পাহাড়ের ওপরে উঠে দূরবীনে চোখ লাগিয়ে অবাক হয়ে দেখতাম কত দূরের ঘরবাড়ি মানুষগুলো কেমন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে মনে হচ্ছে! পকোদির তোলা ছবিগুলোও হত চমৎকার। মেজ পিসিমারা শিলং চেরাপুঞ্জি ঘুরে আসার পর মেজদা, মেজ বউদি ফিরে গেল কলকাতায়। মেজ পিসিমা আর পকোদিকে মা আর বাবা আটকে দিলেন। আরও কিছুদিন না থাকলে ওদের যেতে দেওয়া হবে না। পকোদি নামকরা রেডিও আর্টিস্ট হওয়ায় অনেক অনুষ্ঠানেই তার ডাক পরে আর পকোদি পালিয়ে বেড়ায়। শেষটায় রিক্রিয়েশন ক্লাবের এক অনুষ্ঠানে গান গেয়ে আসার পর বিপদ আরও বাড়ল। ওকে দিয়ে গান গাওয়ানো খুব শক্ত ছিল! স্বয়ং উদয়শংকর তাঁকে অনুরোধ করেও বিদেশে গান গাইতে নিয়ে যেতে পারেননি। শেষে মাদ্রাজ আর পুনায় খুব নামি গাইয়ে হয়েছিল। বোম্বে ফিল্মের গান গাইবার প্রস্তাব আসতে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছিল। এই দিদি এক বেজায় আশ্চর্য লোক। ঐরকম আশ্চর্য গানের গলা চট করে শোনা যায় না। পান্ডুতে অবশ্য আমাদের কিছু গান শিখিয়েছিল ঐ কদিনে।

মাটি দিয়ে কি সুন্দর শিব দুর্গা বানিয়ে রং করে দিল! বসে বসে আগাগোড়া দেখে আমি অবাক। এরকম যে পারে কেউ জানা ছিল না। আমি লুকিয়ে লুকিয়ে চেষ্টা করলাম বানাতে, সে যা হল বলবার নয়। পকোদির সেই অপূর্ব মূর্তি শিবরাত্রিতে একজন পুরুত চেয়ে নিয়ে গেলেন। সারারাত তার মাথায় দুধ ঢেলে সর্বনাশ করে দিল। এ দুঃখ আমার আজও যায়নি।

আগেই বলেছি মেজ পিসিমা গল্প বলার রাজা। প্রত্যেকদিন সন্ধ্যেবেলা চলল গল্প শোনার পালা। আমরা তো শুনতামই, আরো কেউ কেউ চলে আসতেন সন্ধ্যে হলেই। সে গল্পের এমনই টান। মার রান্নার গোলমাল হয়ে যেত রোজ। যক্ষপুরী নামের একটা গল্প তো দুবার বলতে হল তাঁকে। এ গল্পটি মেজপিসিমা দাদুর বন্ধু শান্তিনিকেতনের ক্ষিতিমোহন সেনের কাছে শুনেছিলেন, তাঁর বলার গুণে সেটি পৃথিবীর একটি সেরা গল্প বলে মনে হয় আমার। ফরাসি বিপ্লব থেকে শুরু করে তলস্তয় , গোরকি , শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, জন রাস্কিন , গ্রীম ভাইদের গল্প, এন্ডারসনের গল্প , যখের ধন, সকলের গল্প নিজের ঢংএ বলতেন তিনি। শুধু অবনীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্রকিশোর, রবীন্দ্রনাথ আর দক্ষিনা রঞ্জনের গল্প পড়ে শোনাতেন। কলকাতা থেকে তার আত্মীয় জিতেশ দা এসে ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন মেজ পিসিমা আর পকোদিকে। বাড়ি যেন হঠাৎ খালি হয়ে গেল।

গরমের ছুটি পড়ে গেল। জুঠিদির সঙ্গে বসে ওর গল্প শোনা চালু হল আবার। পড়া শেষ করে দুপুরে মাঝে মাঝে দিদি জুঠিদিদিকে বলে আজ এবেলা এখানেই থেকে যাও। মাঝে মাঝে ওর সঙ্গে পাহাড়ে যাই। একটা বড়ো চ্যাটালো পাথরে বসি, মাথার ওপর থেকে গুলাঞ্চ ফুল ঝরে পড়ে। ব্রহ্মপুত্রের দিক থেকে হু হু শব্দ করে বাতাস বয়। তাতে থাকে ঝোপঝাড়ের বুনো গন্ধ। কার্পাস তুলোর বীজ উড়ে বেড়ায়। ঘূর্ণিপাতার দল পাক খেতে খেতে মাটি ছোয়। মৌমাছিরা গুনগুন শব্দে উড়ে বেড়ায়। আমরা গল্প শুনি। 

জুঠিদিদি জঙ্গলের কথা বলে। ওর চোখের নীলচে তারা বড়ো বড়ো করে বলত এই নীলাচল পাহাড়ে বাস করে আছে বটে, তবুও এটা মোটেই ওদের নিজের দেশ নয়। ওদের নিজের দেশ যাওয়া খুব কঠিন। ইচ্ছে করলেই সেখানে চলে যাওয়া যায় না, পশুপতিনাথের অনুমতি চাই। নইলে বিপদ হবেই। তিনটে মস্ত চওড়া নদী লঞ্চে করে পেরিয়ে , কয়েকবার রেলগাড়ি পাল্টে অনেক দূরের এক দেশে পৌঁছানো যায়। সেখান থেকে সবুজ রঙের বাসে সারাদিন চলার পর পৌঁছানো যায় এক আশ্চর্য জায়গায়। সেখানে শুধু বন আর বন! স্বর্গের কাছাকাছি সে জায়গা। অনেক দূরের পাহাড়ের মাথায় বরফ রোদের তেজে ঝলমল করে। দেবতারা থাকেন ওখানে। নীলরঙা অনেক পাহাড় ওখানে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ওদের গা বন জঙ্গলে ভরা থাকে বলে দূর থেকে অমন নীল দেখায়। সেই পাহাড়ের নীচে থেকে ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে একদিন একরাত পাকদন্ডী ধরে ধরে যাবার পর তবে পৌঁছানো যায় ওদের আপন দেশের ঘরে। ওখানে জঙ্গলের বড়ো বড়ো গাছ ছুঁয়ে থাকে আকাশের মেঘ! জানালা খোলা থাকলে ঘরের মধ্যেও ঢুকে যায়। খুব বৃষ্টি হয় ওখানে সারা বছর। পাহাড়ের ঢাল সে জল বয়ে নিয়ে যায় নীচে, তবে নদী আর ঝোড়াগুলো জল পেয়ে বাঁচে। কিছু জল সরোবরে জমা হয়, বাকিটা নদী বয়ে নিয়ে বড়ো গাঙ হয়ে সমুন্দরে মিলে যায়।। বুঝলাম সমুন্দর মানে সমুদ্র।

জুঠিদিদির আপন দেশে সবই ভালো, সব সুন্দর! ওখানকার বনে ধুনোর গন্ধ। ঝিঁঝিপোকারা সারাক্ষণ ডাকাডাকি করে, ঠিক যেন মন্দিরে ঘণ্টা বাজানো হচ্ছে। বেঁটে বেঁটে ঘোড়াগুলো মাপে ছোটো আর খুব লক্ষ্মী! টুকটুক করে জঙ্গলের পথে চলে কোন বেচাল না করে। খাদের ধার ঘেঁষে ক্ষুর টিপে টিপে খাড়াই পাহাড়ি পথ ঠিকঠাক পার হয়ে যায় একটুও ভয় না পেয়ে। সে ঘোড়াদের রাগও নেই ভয় নেই। ওরা শুধু জানে সামনের দিকে চলতে আর ওদের বাবা ঠাকুরদারা ছিল যুদ্ধ করতে ওস্তাদ। কিন্তু কেউ ওদের ডাকতে শুনেনি কোনদিন! যুদ্ধের ঘোড়ারা নাকি ডাকে না, শুধু খুশি হলে নাক দিয়ে ফরর্‌ ফরর্‌ শব্দ করে আর ঘাড়ের চামড়া কাঁপায়।

মেজদি, মানে আমার দিদি শুনেটুনে বলল আমাদের দেশের ঘোড়ারাও আগে ডাকত না। সব ঐ যুদ্ধের ঘোড়া কিনা! শেরশাহ বলে একজন মস্ত বড়ো রাজা প্রথম ঘোড়ার ডাকের ব্যবস্থা করেন। লোকজন রেখে তাদের ডাকতে শেখান। মেজদি স্কুলে যায়, আমাদের চেয়ে জানে-টানেও অনেক। একথা নাকি ওর পড়ার বইতে লেখা আছে। দেখিয়েও ছিল। জুঠিদিদের দেশে নিশ্চয়ই শেরশাহ ছিল না। জুঠিদিদি ব্যস্ত হয়ে মাথা নেড়ে বলেছিল শেরশাহ না থাকতে পারে তবে শেরপারা তো আছেই। আর বড়ো বড়ো শেরও আছে অনেক, তোমরা যাদের বাঘ বলো। শেরপারা দরকার বোঝেনি তাই ডাকতেও শেখায়নি। শেরপা হল বরফের ঐ উঁচা উঁচা পাহাড়ে যারা লোকেদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যায়, সেই ভীষণ সাহসী লোকেরা। বরফের দেশে থেকে তাদের হাত পায়ের আঙুল খসে খসে পড়ে যায় তবু পাহাড়ে যাওয়া চাই-ই চাই! বুড়ো হয়ে তারা যখন আর যেতে পারে না তখনও দুচোখ মেলে চেয়ে থাকে পাহাড়ের দিকে। তাদের চোখের মণিতে পাহাড় চূড়োর বরফের ছবি দেখা যায়, মরে যাওয়ার পরেও।

দিদি জিজ্ঞেস করল তুমি গেছ ওখানে? দেখেছ নিজের সেই দেশ?

জুঠিদিদি মাথা নাড়ল – না।

আমাদের জুঠিদিদি একবারও নিজের চোখে দেশ দেখেনি। বুড়াদাদার কাছ থেকে একশ বছর আগেকার কত কত গল্প শুনে দেশ জেনেছে! বাবা বলতেন একশ নয় রে, আরও কত বছরের পুরনো কথারা গড়িয়ে গড়িয়ে চলতে চলতে এসে পৌঁছেছে আজকের দিনে। জুঠির বুড়োদাদা হল ওর বাবার বাবার বাবা। শুনেছি তার বয়স এখন একশ পঁচিশ বছর হল। সে বলছে তার চেয়েও বুড়ো-বুড়িদের কাছ থেকে শুনে। তারা আবার শুনেছে তারও আগের মানুষদের মুখে! তাই এতে যতটা আছে সত্য প্রায় ততটাই আছে কল্পনা। ছেঁকে নিলেই পাবি সাধারণ মানুষের ইতিহাস। যে যা বলে শুনবি মন দিয়ে। বাবার কথাটা মাথায় রেখে শুনতাম ওর কথা মন দিয়ে। বিশ্বাস করতাম। আজও করি।

জুঠিদিদি আবার একশর বেশি ভাবতেই পারে না, শোনেওনি কোনদিন। ওর কাছে একশ হল অনেক, তাই বুড়াদাদার বয়স ও বলে একশ। আসলে ওর ঠাকুরদার বয়েসই একশ পার হয়ে গেছে কবে! বুড়াদাদা ঠাকুরদার ও বাবা। চোখে দেখা যেমন, কানে শোনাও একরকম দেখা। জুঠিদিদি ওর মত করে ওর দেশ দেখেছে বৈকি। সে দেশে দূরের নীল পাহাড় চুড়ায় বরফ আছে, আর তলায় ঘন বন। হাতির পেটের মতো মোটা আকাশ ছোঁয়া গাছ আছে। বনে আছে বাঘ ভালুক বুনো মহিস আর আছে বিশাল অজগর সাপ, যার মাথায় মনি! এ মনি যার কাছে থাকবে তাকে মেনে চলবে সবাই। জঙ্গলের মধ্যে আছে ঘোড় সওয়ার, তার পোশ্য চিতাবাঘ, ভূত-পেত্নী দেও। তাল গাছের মত মোটা সাপ আস্ত হরিণ গিলে শুয়ে থাকে। পেট ভরা আছে বলে তার গায়ে হাত দিলেও কিছু বলে না। আকাশে পূর্ণিমার চাঁদ থাকলে ঝরনার কাছে যেতে নেই কারো। পরীর দল সেখানে চান করতে নেমে আসে। দূর থেকে রাতের আকাশে সাদা ধোঁয়ার মতো তাদের নেমে আসার পথ দেখলেই জানা যায় সে কথা, কাছে গিয়ে দেখার সাহস নেই কারো। দেখতে নেই ও! দেখলে পশুপতিনাথ ঠাকুরের গোঁসা হয়। তখন আবার বড়ো করে পূজা দিলে মান ভাঙ্গে। সে পূজায় কবুতর বলি হয়, বকরি আর মেষ বলিও দিতে হয়। ঠিকঠাক বলি না দিলে ঠাকুর রাগ করেন। ক্ষেতে ফসল ফলে না। অজন্মা খরা অথবা বন্যায় দেশ উজাড় হয়ে যায়। মা দুর্গার পূজোতেও বলি দিতে হয় মোষ বকরি।

আমার মন খারাপ লাগে। যাই বলো জুঠিদিদি, তোমার পশুপতি ঠাকুর ভালো নয় মোটেই। দিদি দুখী গলায় বলত, মোষের উপর মা দুর্গার অত রাগ কেন? বলি দিলে ব্যাথা লাগে না? বড়ো বড়ো চোখে কটমটিয়ে যে জুঠিদিদি বলত, তোমরা তো মাছ খাও, মুরগি ছাগলও খাও, লাগে না ওদের? দিদি একটু কিন্তু কিন্তু হয়ে বলত, সে তো আমরা খাই। মা দুগ্গার নাম করতে যাব কেন? জুঠিদিদি রেগে গিয়ে বলত, হাতির মাংসও তো খায় আমাদের দেশে, হাতির পায়ের নীচের মাংস ভারি নরম। ওতেও তাহলে দোষ নেই বলো? বলে একটু চোখ মুছে নিতেই আমরা চুপ। জুঠিদিদি রাগ রাগ গলায় বলে, কোন ছাগল বা মুরগি বুড়ো হয়ে মরতে পায়? মাংসের লোভে হরিণও শিকার করে বাসি করে খায় ও দেশের মানুষ, হরিণ ছানা বা তিতির বন মুরগিও বাদ যায় না। ভগবানের নামে দোষ!

ছিঃ ওরা বুঝি রাক্ষস! রাগ হত আমার। সারাটা দিন ওর কথাগুলো মনের মধ্যে স্রোতের মতো বইতে থাকত। মাছ মাংস খেতে ভালোবাসি বলে নিজেদেরও খারাপ মনে হয়। রাত্তিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি মোষ বলি হচ্ছে। ছোট্ট একটা বাচ্চা মোষকে মেরে ফেলছে লোকেরা। অনেক দূরে বনের মধ্যে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ওর মা চোখের জল ফেলছে।

বাবার অফিসের দরজার কাছে টুলের ওপর বসে থাকে সাংবীরপুন দাদা। খাকি হাফপ্যান্ট, খাকি জামা, কোমড়ে চওড়া কালো চামড়ার বেল্টে খাপে ঢাকা কুকরি ঝুলছে, মাথায় কালো টুপিতে সোনালি গোল চাকতিতেও জোড়া কুকরি খোদাই করা। বুকের উপর আড়াআড়ি গুলি ভরা বেল্ট, দোনলা বন্দুক হাতে। সারা শরীরে অত কিছু লাগানোর পরেও কুঁচকানো চামড়া আর পাকা চুলে বুড়োটে ভাব। হাসলে অবশ্য ওকে ছেলে মানুষ বলেই মনে হয়। জুঠিদিদির বাবার বন্ধু ও। এ অবশ্য ওর নতুন বাবা! আসল বাবা যুদ্ধে মারা গেছে।

সেই সাংবিরপুন দাদার বউ এল একদিন। ছোট্টখাট্ট সুন্দর দেখতে, সারা গায়ে পেতলের গয়না সোনার মতো ঝকঝক করছে। সে মায়ের কাছে এসে কত কী বকবক করতে লাগল। একটুও না বুঝে মা তাকে আদর-টাদর করে পাশে বসতে দিলেন। জুঠিদি আমি আর বাবলি গুটি গুটি কাছে গিয়ে দাঁড়াতে জুঠিদিকেও আদর করে বললেন বোস এখানে। কী বলে বুঝিয়ে দে।

জুঠিদিদি বলল এ হল সাংবিরপুন কাকার নতুন বউ। দেশ থেকে এসেছে। দিদি ইশকুল থেকে ফিরে এসে ভারী অবাক। বুড়ো সাংবিরপুন দাদা এইটুকু নতুন বউ! রেগেও গেল একটু। ওর ধারণায় বর হতে হয় দেখতে সুন্দর আর অল্প বয়েসি, যদিও মুখে কিছু না বলে পাশে এসে বসল।   নতুন বউ আমাদের জন্য কত কি খাবার নিয়ে এসেছে পুঁটুলি ভর্তি করে। জুঠিদিদি বলল, এই দ্যাখ আমার দেশের লোক। বলেইছি খুব সুন্দর হয় দেখতে। অনেকক্ষণ হাসাহাসি আর গপপো টপপো করে আমাদেরি বাড়ির একটা ঘরে ওকে থাকতে দিলেন মা। পাহাড়ে জুঠিদিদিদের ঘরের পাশেই নতুন ঘর তৈরি হলে ওখানে সংসার পাততে যাবে বউ। বুড়ো সাংবিরপুন দাদা খুশি খুশি মুখে আমাদের মিস্টি খাইয়ে গেল।

আগে থেকে তো আমরা জানতাম না, কে কার বউ, তাই বড্ড চমকে গিয়েছিলাম সেদিন। বেশ মনে আছে ব্যাপারটা। সাত সকালে সুন্দর দেখতে নেপালি বউটি এসে উপস্থিত। তার অদ্ভুত সাজ পোশাক আর সারা গায়ে অজস্র গয়না দেখে মনে হয় কোথাকার রানি এলেন। একটা ঝোলা কাঁধ থেকে নামিয়ে কাছে বসে আমাদের গালটাল টিপে আদর করে ঝোলা খুলে কত রকম খাবার যে সে বার করতে লাগল! আমাদের বাড়ির দরজা সব সময় হাট করে খোলা থাকত, আর মার কাছে কোন অচেনা মানুষ এলেও মা তার সঙ্গে এমন আপনার লোকের মতো ব্যবহার করতেন যে আলাপ হতে একটুও অসুবিধে হত না কারো। তার গয়নাগাটি আর সাজপোশাক দেখে মার যে বেশ ভালো লেগে গেছে মুখের হাসি দেখেই বেশ বোঝা গেল। হাসিমুখে মা বসে আছেন, বেশ বোঝা যাচ্ছে তার অদ্ভুত অনর্গল কথার বিন্দু বিসর্গও বুঝেছেন না। অন্যমনস্কভাবে হাতে লেগে থাকা তেল হলুদ শাড়ির আঁচলে মুছে ফেলেছেন আর বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আছেন। তার কথার আশিভাগ হাসি আর বাকি কুড়ি ভাগ বিচিত্র ইরিং বিরিং। মাঝে মাঝে মায়ের অবাক মুখ দেখে বউটি হেসে গড়িয়ে পড়ছে। অবশেষে জুঠিদিদি এসে উদ্ধার করল আগেই বলেছি। এমন একজন দোভাষী পেলে আলাপ জমে উঠতে আর কতক্ষণ লাগে! মায়ের এবেলার কাজকর্ম মাথায় উঠল।

নতুন বউয়ের নাম পুষ্পমালা। বয়সে জুঠিদিদির চাইতে অল্পই বড়ো বলে মনে হয়। বিয়ের কথা কিছু মনেই নেই ওর, এতই ছোটোবেলায় বিয়ে হয়েছিল। বরের কাছে থাকতে এল এই প্রথম। সাংবিরপুন দাদার খত্‌ পেয়ে ওর বাবা আর দাদা পৌঁছতে এসেছিল, খতে অফিসের ঠিকানা দেওয়া ছিল। পুষ্প দিদি এতদিন পরে দেখে বরকে নাকি চিনতেও পারেনি, ভাগ্যিস ওর বাবা দাদা ছিল! জুঠিদিদি সব শুনে হেসে গড়াগড়ি। বলল ভালো করে ভেবে দেখো , ঠিক লোকের কাছে এসেছ তো? বলে আবার হাসি। সাপ ব্যাঙ কিছুই না বুঝে মা ও হাসতে লাগলেন। ঘণ্টাখানেকের মধ্যে ওর বাপের বাড়ির সব খবর নেয়া হয়ে গেল মায়ের। পুষ্পমালা দিদির বাপের বাড়ি জুঠিদিদির মত গাঁয়ে নয়। বড়ো একটা শহরের কাছাকাছি। শহরের নাম কাঠমান্ডু। সেখানে পশুপতিনাথ ঠাকুরের মন্দির আছে। দুর্গাপুজোর সময় মোষ বলি হয় ওখানে। পাহাড় জঙ্গল ঝেঁটিয়ে পুজো দেখতে আসে সবাই। মোষ বলি দেখতে পেলে আর কপালে সেই বলির রক্তের ফোঁটা লাগালে নাকি পূণ্যি হয়। পূণ্যি ব্যাপারটা কি না জানলেও খুব একটা ভালো যে নয়, তা বেশ বুঝতে পারলাম। পুষ্পদিদির দাদু ওই দেশের রাজার ফুল বাগানে মালির কাজ করে।

শহরের কাছেই ওর দাদুর বাড়ি। শহরের চওড়া পাথর বাঁধানো রাস্তা, তার পাশে বড়ো বড়ো ঘরবাড়ি, বাহারি দোকান। বড়ো বড়ো মন্দির গুলো সব কাঠ আর পাথরের তৈরি। কয়েকশ বছরের পুরনো নকশা করা কাঠ, তার মাঝে লাল নীল সোনালি রূপালি রঙে ছবি আঁকা। দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।! ঘন জঙ্গল কেটে জন্তু-জানোয়ার তাড়িয়ে কত হাজার বছর আগে বসত করা শহর। বাইরে থেকেও লোক আসে দেখতে!

আমাদের বাড়িতে তামার ওপর খোদাই করা চমৎকার একটি বুদ্ধমূর্তি ছিল। মার পুজোর আসনে সাজানো থাকত। সেটির দিকে নজর গেল তার। খবর পেলাম বুদ্ধদেব ওদেরই দেশের লোক। তাক লেগে গেল শুনে! ওর বলার ধরনে মনে হয়েছিল যেন ওদের পাশের বাড়িতেই সে থাকে। মূর্তিটা হাতে নিয়ে ভালো করে মুছেটুছেও দিল। তার দরকার ছিল অবশ্য। আমার ছোট্ট বোন বাবলি বুদ্ধকে একটু বেশিই ভালোবাসত। যত্ন করে খাইয়ে টাইয়েও দিতো নিজের খাবার থেকে। মুখ ধোয়া মোছা হত না প্রায়ই। মূর্তিটা যে তামার তৈরি তা প্রায় বোঝাই যেত না। পুষ্প দিদির হাতে পড়ে তার পুরনো জেল্লা ফিরে এল।

আমরা মার মুখে বুদ্ধদেবের তপবনের কথা শুনেছিলাম। সেই বনের খবর জানতে চাইলে বলল শুধু তপবন কেন, আরো অনেক বাগান আছে। সব তার দাদুর হাতে তৈরি। শহরের বাইরে অনেক বড়ো বড়ো জঙ্গলও আছে। জঙ্গলে হাতি, চিতাবাঘ আর হরিণরা থাকে। রাজার পাহারাদারেরা কড়া নজর দিয়ে রাখে যাতে বাইরের লোক তাদের শিকার করতে না পারে। শিকার করবার ক্ষমতা শুধু রাজা আর মন্ত্রীদের। শহরের মাঝখানে ও দেশের রাজার খুব সুন্দর বাগান ঘেরা বাড়ি। রাজা রানির কথা শুনে সোজা হয়ে বসলাম আমরা! তাদের নাকি দেবতাদের মতো দেখতে। পশুপতিনাথ আর মা দুর্গার পুজোর সময় তাঁরা সবার সামনে আসেন, গরিব মানুষদের দান ধ্যান করেন। মোষ বলির রক্ত দিয়ে কপালে তিলক পরে পূণ্য করেন। এই প্রথম কোন সত্যিকারের জ্যান্ত রাজার হদিস পাওয়া গেল।

পুষ্প দিদির মুখে রাজার বাড়ি কথাটা এত বারে বারে এল যে আমি যেন রাজা আর রানিকে নিজের চোখেই দেখতে পেলাম। রাজা রানি রাজপুত্র রাজকন্যা সবাইকে। বড়োদের কাছে কত যে রাজা রানির গল্প শুনেছি আর বইতে পড়েছি তার ইয়ত্তা নেই। এই প্রথম জানতে পারলাম শুধু গপপো নয়, রাজা তাহলে সত্যি সত্যিই আছে! সঙ্গে সঙ্গে একটু ভয়ও হল। রাজা যদি আছে তাহলে তো রাক্ষস খোক্কসও আছে। ভূত পেত্নীও আছে?

মোষ বলির কথা আর রক্তের তিলক পরার কথা শুনে দুঃখ হল আবার। কাউকে কিছু বললাম না। মনের মধ্যে অতল দুঃখ নিয়ে বেশ কিছুদিন একা একা ঘুরে বেড়ালাম।

গরমের ছুটিতে জুঠিদিদির কাছে গল্প শুনি। বন পাহাড়ের কথা তো কত শুনি। এবার শুনি ওখানকার মানুষদের কথাও। বনে জানোয়ার তো থাকবেই, তাই পাহাড়িরা দল বেঁধে পথ চলে। একসঙ্গে থাকলে ভয় থাকে না। ওদের কোমরে থাকে ধারালো কুকরি। সাহস খুব ওদের, মরে যেতেও ভয় নেই। বনের জানোয়াররাই উল্টে ভয় পায় মানুষদের। মুখোমুখি হয়ে গেলে ঝোপঝাড়ের আড়ালে পালিয়ে যেতে পথ পায় না!

ওদের দেশের মানুষরা জানে পাহাড়ের ঝোপঝাড়ে আগুন লাগিয়ে ছাইয়ের সারে জুম চাষ করতে আর জানে লড়াই করতে। অথচ আশ্চর্য সব সরল হাসিখুশি মানুষ, নিজেদের মধ্যে কোন ঝগড়া ঝাঁটি নেই। তবে রাজা বললেই ছুটে যাবে শত্রুর সঙ্গে লড়াই করতে। রক্তের মধ্যেই যুদ্ধ করবার বীজ থাকে ওদের। আর থাকে নিজের দেশ বাঁচিয়ে রাখার স্বভাব। দেশ মানে তার লোকজন, মাটি, জল, পাহাড়, জঙ্গল, জানোয়ার সবকিছু। সেরকমই মানুষ জুঠিদিদির অনেক অনেকদিনের ভুলে যাওয়া আপনজনেরা। ওর বুড়াদাদা, ঠাকুরদার বাবা। বাবা ঠাকুরদাও চলে গেল যুদ্ধ করে দেশ বাঁচাতে, আর ফিরে এল না। সবাইকে খাইয়ে পড়িয়ে রাখবে বলে বুড়াদাদা দেশ ছেড়ে এই আসামের জঙ্গলে চলে এল বনের চৌকিদারির কাজ পেয়ে। পাহাড়ের গায়ে ডেরা বাঁধল। দেশ ছেড়ে আসার কত কষ্ট জানো তো?

দিদি বলল, বুড়াদাদা চৌকিদারীর চাকরিটা না নিলেই তো নিজের দেশে থাকতে পারত। কি এমন চাকরি? জুঠিদিদি রেগে গিয়ে বলল, যারা কিছু জানে না তাদের কথায় রাগ করতে নেই। চৌকিদারের কাজ কি সবাই পায় নাকি! তার উপর বনের চৌকিদারী। সেই হল বনের আসল রাজা। সবাই এ কাজ পারেও না পায়ও না। ঐ তো অত বড়ো দোকান পাশের বাড়ির সুরজ মলের পারবে ও কাজ করতে? না কেউ করতে দেবার কথা ভাববে। বুড়াদাদা করল, তারপর তার চাকরিতে পেনসিল হয়ে যাবার পর ওর ছেলেও লেগেছিল এ কাজে। সব ঘরের লোক পায় নাকি! তারও চাকরির সময় শেষ হবার পর আমার বাবা, তার ছেলে লেগে যায় চাকরিতে। তারা দুজন যুদ্ধে নিখোঁজ হওয়ার পর আমার নতুন বাবা কিন্তু পায়নি ও কাজ সহজে। বুড়াদাদা নিজে সাহেবদের কাছে বলার পর তবে চৌকিদারের সোনালি পদক লাগানো টুপি পড়তে পেয়েছে। কোমরে কত সুন্দর চামড়ার বেল্ট। সেখানেও সোনালি পদক লাগানো আছে, কাঠের ছাই আর তেঁতুল জল দিয়ে রোজ ঘষামাজা করে তাকে চকচকে করে রাখতে হয়। ভারী জুতো পায়ে সাজগোজ করে নতুন বাবা যখন জঙ্গলের কাজে যায়, ওকে রাজার মতো দেখতে লাগে। সবার এরকম ভাগ্য হয় নাকি!

ছেলে হয়ে জন্মায়নি বলে জুঠিদিদির মন খারাপ। চৌকিদার হতে পারবে না কোনদিন। ওর ভাই বা দাদাও নেই যে তারা চাকরিতে ঢুকতে পাবে।

বুড়ো সাংবিরপুন দাদার নতুন বউকে দেখে দিদি আমাকে চুপি চুপি বলল, এবার দেখিস জুঠিদিদিরও বিয়ে হয়ে যাবে। দূর থেকেই শুনতে পেয়ে জুঠিদিদি হেসেই খুন। বলল, দূর আমি বিয়েই করব না। আমার বুড়াদাদাকে দেখবে কে? দিদি বলল, কেন তোমার নতুন বাবা দেখতে পারবে না? তোমার মা ঠাকুমা? মা ঠাকুমার সকাল থেকে কত কত কাজ! দিদি শুনে বলল, তোমার বাবা ঠিক পারবে। মাথা নাড়লো জুঠিদিদি। তারও তো বয়স হয়েছে। তাছাড়া বনের চৌকিদারী ছেড়ে সে সময় পাবে কি করে? দিদি ভুরু কোঁচকালো, তোমার বাবা তো আর বনের কাজ করে না এখন, পেনসিল পায় বলেছো তো তুমি। জুঠিদিদি বলল, কাজ চলে গেলেও বনের চৌকিদারি যায় না। মরে যাবার আগে বনপাহারা ছাড়ে না কেউ। আমরা অবাক- মাইনে না পেলেও! হাসলে জুঠিদিদি, আরে তোরা তো ছেলেমানুষ! কী-ই বা বুঝিস। মাইনে তো পেটে খেতে পাবার জন্য, বন পাহারা তো সম্মানের ব্যাপার। কোনটা কম শুনি? তাছাড়া মাইনে না পেলেও কাউকে না খেয়ে মরতে দেখিনি বাবু, তোরাও তো মাইনে পাস না। চৌকিদারী অনেক বড়ো জিনিস। সবার ভাগ্যে জোটে না। আমি তো মেয়ে বলে ঐ চাকরি পাইনি, তাই বলে বন পাহারা দেব না? আমাদের দেশে বনের চৌকিদারি পেলে সবাই কত মানে!

শুনে আমার বাবার জন্য মন খারাপ হতে লাগল ব্যাংকের ম্যানেজারের বদলে বনের চৌকিদারী পায়নি বলে। দিদি মাথা নাড়লো, ও কি কথা জুঠিদিদি! তুমি তো বলো দেশের রাজাকেই সবাই বেশি মানে! বন পাহারা কি তার চেয়েও বড়ো? পাশে এসে বসল জুঠিদিদি। ওরে রাজা হল দেশের মাথা। আর বনের রাজা হল চৌকিদার। শুধু চাকরি হলেই হয় না, কত কি জানতে হয় ওদের জানিস? গাছপালা, মাটি জল, গ্রীষ্ম বর্ষা শীত, জীবজন্তু পাখি এইসবের কাছের মানুষ হতে হয়। আমার বুড়াদাদার বড়ো ভাই ওদের ভাষা জানত, মানুষও ছিল বড়ো ভালো। তবুও তার বনের চৌকিদার হওয়া হল না।

কেন হল না জুঠিদিদি? আমরা ঘনিয়ে বসলাম। জুঠিদিদি রোদে শুকোতে দেয়া কাপড় তুলে গোছাতে গোছাতে দুখী গলায় বলল, ওর যে মাথার ঠিক ছিল না!

পুষ্পমালা দিদির পোঁটলা খোলা হল। সে যে কত রকম খাবার! কোন কোনটা চেনা ঠেকলেও বেশি টাই অচেনা! আমরা ঝুঁকে বসেছি ওকে ঘিরে। একটা পাট করা কাপড়ে থরে থরে সাজানো নানা রকম খাবার। মনে আছে মটর কড়াই ভাজার সঙ্গে চালভাজা, একরকম গাছের গোড়া বা মূলের টুকরো, শক্ত শক্ত তিলের নাড়ু, চিনি র সাদা লাল হলুদ মঠ আর কালো ছোটো ছোটো গুলির মতো কি যেন। আমরা তো বেছে খেতে শিখিনি, হাতে পেলেই মুখে দেবার অভ্যাস। মূল থেকে তৈরি খাবারটার স্বাদ নেই, শুকনো শোলার মত। খাবার কিনা কে জানে? দাঁত শির শির করছিল, জলে দিতেই নরম হয়ে গেল। শক্ত একরকম পিঠে আর সাদা কদমা খেতে ভালোই লাগল। কদমার গায়ে একটা শুকনো পিঁপড়ে দেখিয়ে দিদি বলল, ওদেশ থেকে এসেছে বেচারা! একটা বড়ো আতস কাচ ছিল মায়ের কালো বাক্সে। ওতে চোখ লাগিয়ে দেখলাম, আমাদের দেশি পিঁপড়ের মত লাগল। তাকে তুলোয় শুইয়ে আতস কাচের তলায় রোদ্দুর ঘন করে পবিত্র আগুনে পোড়ানো হল। আশা করি তার আত্মা দেশে ফিরতে পেরেছে।।

সাত আট রকম কলাইয়ের দানা একসঙ্গে ভেজে তৈরি করা যে পদার্থটা শেষমেষ একটা ছোটো পুঁটলি থেকে বার হল তার গন্ধটা ভারী চমৎকার। পাহাড়ি ঝোপঝাড়ে আগুন দিলে যে একটা বুনো ধূপ ধুনোর গন্ধ ছড়ায়, খানিকটা সেরকম। সোলার মতো খাবারটা জলে দিয়ে মুখে দেবার পর একটা ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ অতটা ভালো না লাগলেও মনে আছে। কলাইয়ের দানা ভাজা আমরা কচি দাঁতে ঠিক সুবিধা করতে পারলাম না। মা মুখে দিয়ে চিবোতেই সারেগামার মতো ওপরে নীচে নানা পর্দায় শব্দ হতে লাগল। অসাবধানে মায়ের একটা দাঁত একটু নড়েও গেল। মুখের হাসিটি কিন্তু ভদ্রতা বজায় রাখতে ধরেই রাখলেন মা। আমাদের খাইয়ে পুষ্প দিদি খুব খুশি। জুঠিদিদির মুখেও হাসি ধরে না। ওর নিজের দেশের সবকিছুই যে কত ভালো হতে পারে সেই গর্বে ওর হাঁটাচলাই বদলে গেল। পুষ্প দিদির মুখ থেকে ওর নজর দেখি সরছেই না।

জুঠিদিদির আর পুষ্পমালা দিদির দেশ একটাই। আমার কিন্তু মনে হল দুটো আলাদা দেশ। পছন্দ হল জুঠিদিদির দেশটাই। এখন বুঝি কেন। পুষ্প দিদির দেশে পাকা রাস্তা, শহরের ইঁটের বাড়ি, জঙ্গল কেটে সাজানো বাগান। এখনকার নেপাল যেমন। জুঠিদিদির দেশের চেহারা একশ বছর আগেকার গাছপালা বন পাহাড়ে ছাওয়া, বুড়াদাদার কাছে কানে শোনা। কল্পনা তার ওপর যাদুতুলি বুলিয়েছে। এখনকার মত গাছপালা কেটে পাথর ভেঙে পাহাড় চেঁছে নদী আটকে কংক্রিটের স্তম্ভ, পাকা সড়ক বানিয়ে ফেলেনি!

অত সুন্দর নতুন বউ চলে আসায় বেচারা বুড়ো সাংবিরপুন দাদার ওপর নজরটা বেশি করে পড়তে লাগল আমাদের। বুড়োর হাসি বেড়ে গেছে! হাসলেই ওর ফর্সা কুঁচকোন গালে হাজারটা ভাঁজ হয়ে যায়। চোখ বুজে যায় আর প্রায় ফোকলা মুখ হাঁ হয়ে যায়। ব্যাংকের কাজে ভুল হতে থাকে। লাল তুলো আনতে বললে প্রথমে লাল মুলো আনে, তারপর বাজারময় লালতুর খোঁজ করে বেড়ায়। কোথাও না পেয়ে মার কাছে এসে জিজ্ঞেস করে, মাজি লালতুকো কোই নেহি মিলা! কাঁহা মিলেগা বোল সাকতা?

ওর নতুন বউ নতুন কাপড় আর গয়না গায়ে ঝমর ঝমর করে সারা বাড়িতে ঘুরে বেড়ায়। মাকে কাজে সাহায্য করতে চেষ্টা করে। গুনে দেখি ওর দুটো কানে ছটা ছটা বারোটা ছ্যাঁদা করা হয়েছে। নাকি গয়না পড়বার জন্য। নাকেও তিনটি ফুটো, দুদিকে নাকছাবি আর মাঝে নোলক। পুরোন কালের বড়ো বড়ো রুপোর টাকা দিয়ে গাথা তিন নহরের মালা ঝুলছে গলায়, একটু নড়াচড়া করলে জল তরঙ্গের মতো টুংটাং শব্দ হয়। হাতে পায়ে যেখানে সেখানে রুপো, কাঁসা আর সোনার গয়না ঝমঝম করছে। আমার তো ওকেই রাজকন্যা বলে মনে হল, আসল রাজকন্যা তাহলে কি! মনটা বেশ একটু খারাপ হল সাংবিরপুন দাদার কথা ভেবে। আহা বেচারা আধবুড়ো মানুষ, ওর পাশে এই বউ এক্কেবারে বেমানান।

বাবার অফিসের সদর দরজা আমাদের বাড়ির ঠিক মুখোমুখি। দোতালায় দুই দরজার মাঝে চাতাল। দোতালা সিঁড়ির পাশে টুলে বসে থাকে সাংবিরপুন দাদা, সবাই ডাকে বাহাদুর। দুটো আলাদা বাড়ি চাতাল দিয়ে জোড়া। দুই দরজা একসঙ্গেই পাহারা দেয় বাহাদুর। অফিস চলার সময় একটু গম্ভীর থাকে, বোধ হয় দোনলা বন্দুকটা হাতে থাকে বলে। কোমরে মোটা বেল্টের সঙ্গে বাঁধা কুকরিটা ঝুলছে। বুকে গুলির বেল্ট মাথায় টুপি, পায়ে জুতো মোজা। বেশ একটু জংবাহাদুর চেহারা। ডাকাত এলে চট করে কিছু করে উঠতে পারবে বলে বিশ্বাস হতে চায় না আমার। মুখে আঙুল পুরে সামনে দাঁড়িয়ে দেখি ওকে। হাফপ্যান্টের তলায় সরু সরু পা দুটো দেখে দুঃখ হয়। তবে বাবাকে দেখে যখন মেঝেতে বুট ঠুকে স্যালুট করে দেখে অত বুড়ো লাগে না! মনে মনে মত পাল্টাই, না আমার সাংবিরপুন দাদা অত কিছু বুড়ো নয়। বীর যেমন হতে হয় তেমনিই বটে! সামনে দাঁড়িয়ে চেয়েই থাকি, ভয়ে শ্রদ্ধায়।

মস্ত বড়ো বীর হলেও বাহাদুর দাদার মুখে সবসময় হাসি। ফর্সা চামড়া কুঁচকে হাসির ভাঁজ গুলো চওড়া ঠোঁট আর চোখের দুপাশের দাগে দাগে পাকা হয়ে আছে। না হাসলেও হাসি হাসি দেখায় সর্বক্ষণ। হাসবার সময় ওর খুদে খুদে নীলচে চোখ দুটো বুঁজে যায় আর হলদে রঙা না মাজা দাঁতগুলো গোলাপি মাড়ি সহ বার হয়ে আসে। না হাসলে গাল দুটো যায় চুপসে। কত কি কথা বলি আমরা সারা দুপুর। ফিসফিস করে বলি, বাহাদুর দাদা তুমি বন্দুক দিয়ে বাঘ মেরেছ? বাহাদুর দাদা চাপা গলায় বলে – হঁ। ভালুক মেরেছ? ও বলে – জী। না বলাটা নেই ওর মুখে। হঁ আর জী, এই দুটোই বলে বেশি। কেবল বাবা কিছু বললে বলে, জৌ! এখন বুঝি সেটা ছিল হুজৌরের অপভ্রংশ। ও কখনও কোন বড়ো কথা একটানা বলেনি। দিদি বলত ওর বউ ওকে বলতে দিলে তো!

আমি একদিন বন্দুকে গুলি কি করে ভরে জানতে চাওয়ায় ও চট করে বন্দুক ভাঁজ করে বেল্ট থেকে খুলে গুলি বার করে ফেলল। ম্যাগাজিনে ভরে ফেলার আগেই বাবা হঠাৎ কোত্থেকে এসে দেখে ফেললেন। তারপর থেকে আমাকে বাহাদুরের কাছে যেতে বারণ করা হল। বাহাদুরকে কী বললেন দেখা হয়নি। পরে শুনেছি কম বয়সে ওর হাতে অনেকেই গুলি খেয়ে মারা গেছে। নেপালের রাজার ফৌজে চাকুরী করত বাহাদুর। আমার মনের মধ্যে থাকা সাংবিরপুন দাদার মুখের হাসি তাতে একটুও কমেনি।

পুষ্পমালা দিদিকে রাঁধতে হয় না। জুঠিদিদি তরকারি কাটে মশলা বাটে, মা নিজে হাতে রাঁধেন। অবসর সময়ে দুজনে মিলে মাকে সাজাতে বসে। কেউ আলতা পরায়, আর একজন চুলে তেল দিয়ে খোঁপা বেঁধে দেয়। মুচকি হেসে মা বলে বুড়ো বয়সে ছেলের বউদের কাছে এই আদরটা পেলে হয়। বাবা মাঝে মাঝে সাংবিরপুন দাদাকে ঘর বাঁধার কাজে পাঠিয়ে দেন দুপুর- দুপুর। জুঠিদিদি দের ঘরের কাছে বাঁধা হচ্ছে ঘর। আমাদের ছাদ থেকে দেখা যায় বেশ। অতদূর থেকে মানুষ চেনা না গেলেও দেখা যায় কাজ হচ্ছে। আমরা দেখি। পুষ্পমালা দিদিও চেয়ে থাকে সেদিকে। মাঝে মাঝে হাত নাড়লে ওরাও নাড়ে, বোঝা যায় ওরাও দেখছে আমাদের। পাথরের চওড়া চাতালটার ওপর কে একজন বসে আছে। তার নরন চরণ নেই, মনে হয় জুঠিদিদির সেই বুড়া দাদা। কেউ হয়ত ধরে এনে বসিয়ে দিয়েছে ঘর তৈরি দেখার জন্য। জুঠিদিদি শুনে হাসল, দেখতেই পায় না বুড়াদাদা!

চোখে দেখতে না পেলেও হাওয়ার গন্ধ শুঁকতে আর কানে শুনে বুঝতে নাকি এখনও পারে বুড়াদাদা! কম বয়সে হাওয়ার গন্ধ শুঁকে বলে দিতে পারত বুনো হাতির দল কতদূর। কানে শুনে বুঝত হরিণের দল কোন পথে চলছে। আর ওর পোষা ‘দেও’ এর দল এখনো ওর কথা শোনে! দেও মানে যে ভূত সে কথা জেনেছি পরে। জুঠিদিদির সব কথাই তো আমরা হাঁ করে শুনতাম আর বিশ্বাস করতাম। কোনওদিন চোখে না দেখা ‘দেও’ দের ভয়ে কাঁটা হয়ে থাকতাম।

সারা দুপুর দাদা আর দিদি স্কুলে চলে যাওয়ায় আমার সময় কাটে ছবি এঁকে আর ঘুরে ফিরে। হাতে গল্পের বই থাকলে অবশ্য অন্য কথা, বুঁদ হয়ে থাকতাম গল্পের দুনিয়ায়। একা একাই থাকি। মা ব্যস্ত রান্নাঘরে। বোন তার পুতুলদের নিয়ে মার কাছাকাছি। বাহাদুর দাদার সঙ্গে গল্প বেশি দূর গড়ায় না। সব কথায় হঁ আর জি শুনতে একঘেয়ে লাগে। মাঝে মাঝে খাওয়া-দাওয়ার পর দুপুরে মা ধরে বেঁধে পাশে শোয়ান। গল্পের বই থেকে নানারকম গল্প পড়ে শোনাতে শোনাতে মা ঘুমিয়ে পড়েন, বোন বাবলিও ঘুমিয়ে কাদা। আমার দুচোখে ঘুমের হরতাল। শুয়ে শুয়ে দেয়ালের গায়ের দাগ দেখি। খোলা জানালা দিয়ে আকাশে মেঘেদের খেলা দেখি। পাশের বাড়ির কার্নিশে বসে থাকা পায়রা চড়াইদের রকম সকম দেখি। চুপি চুপি মায়ের পাশ থেকে উঠে পা টিপে টিপে পেছন দিককার খোলা ছাদে গিয়ে পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকি। কামাখ্যা মন্দিরে যাবার লাল মাটির পথ ধরে পিঁপড়ের মতো পুজো দিতে যাওয়া মানুষ দেখি। ডানদিকে ধ্বস নামা সবুজ পাহাড়ের গায়ে লাল ঘায়ের মতো জায়গাটার পাশে জঙ্গলে জুঠিদিদিদের ঘরগুলো দেখতে পাই। পাহাড়ের তলায় একটা পাকা ঘর থেকে কাদের যেন জোর কান্নাকাটির শব্দ কানে আসে। অনেক পরে জানতে পারি ওটা চোর ডাকাতদের জেলখানা বা হাজত। পুলিশের মার খেয়ে কাঁদে তারা। পুলিশদের উপর রাগ হয় খুব। নিশ্চিন্ত নিষ্কর্মা দিন কেটে যায় আমার। একটুও ভালো লাগে না ঘরে আটকে থাকতে। স্কুল কিরকম ব্যাপার জানা নেই। তবু ইচ্ছে করে স্কুলে যেতে। দাদা দিদি র হাবভাবে মনে হয় স্কুল বেশ ভালো। মুখে তেমন কিছু বলে টলে না। শুধু মার কাছে যখন গল্প করে জানতে পারি ওখানে অনেক নতুন বন্ধু। অনেক দুষ্টুমি। সবাই মন দিয়ে পড়াশোনা করে। আমার পড়া বাড়িতে। দিদিমণি একাই পড়ান।  অনেক বন্ধু একসঙ্গে পড়ার মজা না জানি কত!

আমার ইচ্ছে ইস্কুলে যাবার। বাবলি কোন সঙ্গে পাঁচে নেই। মা ওকে পড়তে শেখান, ছড়া বলান, স্লেটে খড়ি দিয়ে লিখতে শেখান। স্কুলে যাবার মন নেই ওর। হতাশ ভাবে দেখি দাদা দিদি নিজে নিজে চান করে স্কুলের পোশাক পড়ে খাওয়ার পর ব্যাগ কাঁধে চলে যায়। ব্যাগে থাকে টিফিন কৌটো জলের বোতল। টিফিন কৌটোতে খাবার ভরে দেন মা। সেই খাবার খেতে মন কেমন আনচান করে। সেই একই খাবার বাড়িতে খেতে দিলে চেয়ে দেখতে ইচ্ছে করে না। ওদের মুখে বন্ধুদের গল্প শুনে আমিও বানিয়ে বানিয়ে বন্ধুদের গল্প বলি। তারা সবাই পাহাড়ের গুহায় বা জঙ্গলে থাকে। সকলেই মস্ত বড়ো বীর। কারো কারো ডানা আছে, উড়তে উড়তে চাঁদেও যেতে পারে। যারা গুহায় থাকে তাদের লুকানো সুড়ঙ্গ দিয়ে অন্য দেশে চলে যাওয়ার পথ জানা আছে। তারা তীর ধনুক দিয়ে লড়াই করে বড়ো বড়ো বাঘ মারতে পারে। দাদা দিদি বড়ো, আমার কথা একটুও বিশ্বাস করে না, কিন্তু মন দিয়ে শোনে। আসল কথা ওদের মতো আমারও অনেক বন্ধু চাই। স্কুলে যাওয়ার জন্য মন খারাপ হয় আমার। বাবলির ওসব মন খারাপ নেই। মায়ের কাছেই থাকে ওর পুতুলের সংসার নিয়ে। তখনও ওর মুখে সব কথা ফোটেনি ভালো করে, তবু পুতুল ছেলেমেয়েদের আদর বা শাসন করতে ব্যস্ত থাকে সর্বক্ষণ। ওর রান্না বাটির সাজ-সরঞ্জামও অনেক। কাশি থেকে ঠাকুমার পাঠানো ছোটো ছোটো কাঠের তৈরি থালা বাটি হাঁড়ি, চমৎকার রং দিয়ে ছবি আঁকা তার ওপর। আমি ও খেলতে ভালোবাসি ওগুলো নিয়ে। ওগুলো ছুঁলেই মনে পড়ে কাশির ঐ মস্ত বড়ো জমিদার বাড়ির কথা। যে বাড়ি কাশিতে বিখ্যাত হয়েছিল ভুতুড়ে বাড়ি হিসেবে। খেলনাগুলোতেও যেন ভূতের ছোঁয়া লেগে আছে! ওই বাড়িতে তখনও আমার ঠাকুমা জ্যাঠামশাই জেঠিমা দাদা দিদিদের নিয়ে থাকেন। বছরখানেক আগে আমি যখন আরও ছোটো ছিলাম তখন কলকাতা থেকে সবাই মিলে আমরা কাশিতে বেড়াতে গিয়েছিলাম। সিগড়ার এক বাঙালি জমিদারের মস্ত বাগান ঘেরা বাড়িতে জ্যাঠামশাই একতলার আধখানা ভাড়া নিয়ে থাকতেন। সেখানেই মাসখানেক কেটেছিল আমাদের জ্যাঠতুতো দাদা দিদিদের মাঝখানে। অত বড়ো বাগান ঘেরা বাড়িতে আর কখনও থাকিনি।। বাড়িটার যেন প্রাণ ছিল।

চোখ বুঁজলেই মনের চোখে আজও দেখতে পাই। কাশির সিগড়ার জনতা ঘাট বাজারের পাশ দিয়ে পাথর বাঁধানো চওড়া পথটার বাঁকে মোটা মোটা লোহার লতানো পাতানো আলপনা তৈরি করা জবরদস্ত দেউরি। দুপাশে দু মানুষ উঁচু টানা দেয়াল চলে গেছে বহুদূর পর্যন্ত। দেয়াল আর দেউরির ওপর সারি সারি ঘন ছুঁচোল লোহার বল্লম বসানো। স্বপ্নেও তা পেড়োন যায় না। আমার কল্পনার রাজবাড়ীর দেউরি বা সিংহ দরজা দেখতে ঠিক ওই রকম। ঘরঘর শব্দে সে দরজা যখন খোলে গা শিউরে ওঠে। ভেতরে পা ফেলে দেউরি বন্ধ করে একটু এগোলেই কোথায় বাজারের হললা কোথায় কাশির বিখ্যাত জমজমাট রাস্তার ভিড়! শুধু গাছের পাতায় শনশন ঝরঝর শব্দ, বাতাসে পাকা পেয়ারা লেবু আর নানা রকম ফুলের গন্ধ। দূরে দূরে কিছু পাখির ডাক।

দুপাশে দেয়াল বরাবর বড়ো বড়ো গাছ পেরিয়ে গোল পাথরের নুড়ি বিছানো রাস্তা সোজা গিয়ে মিশেছে নির্জন আলিশান এক প্রাসাদে। যার সদর দরজায় পৌঁছতে হলে মাঝে একটা সাদা পাথরের ফোয়ারা পার হয়ে আরো কিছুটা গিয়ে গোটা বিশেক নীচু সিঁড়ি ভাঙতে হয়। রাস্তার দুপাশে মৌসুমী ফুলের কেয়ারি করা ঝাড়, যার পর থেকে শুরু হল পেয়ারা আর লেবু বাগান। বাড়ির পাশে আম কাঁঠালের বাগান। প্রত্যেক বাগানের গন্ধ আলাদা, রঙ আলাদা, শব্দও আলাদা! নুড়ি বিছানো রাস্তায় হাঁটলে খচমচ শব্দে বাগানের ঘুম ভেঙে যাবার ভয় হয়, পা ডুবে যায় কিছুটা। ফোয়ারার চারপাশে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে থাকা পরির দল চেয়ে আছে জলের দিকে। পরে মালির মেয়ে ফুলমনিয়া বলেছিল পূর্ণিমা রাতে তারা নাকি প্রাণ পেয়ে বাগানময় উড়ে বেড়ায়।

মস্ত বড়ো বাড়ি। মাঝখানে ফুটবল খেলার মাঠের মতো বিশাল উঠোন ঘিরে তিন দিকে তিনখানি মহল, পেছনে সারি সারি একতলা বড়ো বড়ো ঘরের মাঝে পেছনের বাগানে যাওয়ার দরজা। পেছনের বাগানে মালিরা তরকারির চাষ করে মস্ত ইঁদারার চারপাশ ঘিরে। ডানদিকের মহলের একতলা আর সামনের মহলের আটখানা জুড়ে আমরা থাকি। অনেকগুলো ঘরের একটাতেই আমরা সাত ভাইবোন ‘সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি’ দিব্যি এঁটে যেতাম। চড়ার সা রঞ্জু তখনো জন্মায়নি। ছোটো বোন বাবলি প্রথম হাঁটতে শেখে এ বাড়ির উঠোনেই, কাশির বাজার থেকে কেনা কাঠের চাকা গাড়ি ঠেলে ঠেলে। ওকে দেখাত টুকটুকে ফর্সা জাপানি পুতুলের মত। পুরো বাড়িতে আমরা ছাড়া আর থাকত এক ডাক্তারের পরিবার, বাঁদিকের মহলে। পুরো দোতালায় আর কেউ থাকে না। বড়ো বড়ো তালা ঝোলে দোতলায় যাওয়ার দরজায়। বন্ধ দরজা জানালায় দোতলা থমথম করে। ওপর দিকে চোখ তুলে তাকানো যেত না। বন্ধ জানালাগুলো যেন হাতছানি দিয়ে ডাকত আমাদের। অন্ধ চোখে চেয়ে থাকত। কখনও সকালে, কখনও বিকেলের পড়ন্ত রোদে ময়ূরের ঝাঁক হেটে বেড়াতো ছাদের আলসের ওপর। কখনও পেখম মেলে ঝলমল রোদে নেচে নেচে পালক শুকোত। একসময় বড়ো ডানা ছড়িয়ে উঠোনেও নেমে আসত। কোথা থেকে তারা আসত কে জানে? তাদের টানা কর্কশ ডাকে কেঁপে উঠত শান্ত নির্জন বাড়ি উঠোন। সন্ধ্যার কমে আসা আলোয় সে ডাকে করুন সুর বাজতো। মন খারাপ লাগত আমার। কখন যে তারা উড়ে যেত অন্ধকার আকাশে জানতেও পারতাম না।

নানা জাতের অসংখ্য পায়রার সংসার ছিল বাড়িটার প্রাণ। আমাদের ঘুম ভাঙত পায়রার বকবকম শুনে। তাদের অষ্টপ্রহর বকবকম কুটকচালিতে বাড়িটা শান্তি নষ্ট হত না একটুও। তবে তাদের বিপদও ছিল। হঠাৎ উড়ে আসা চিল আর বাজ যখন এসে ছোঁ মেরে ধরে নিয়ে যেত কোন নিরীহ পায়রা ছানাকে সব কটা পায়রা ঝাঁক বেঁধে আকাশে ডানা মেলে চক্কর কাটতে থাকত মাথার উপর। হাজার হাজার বিপন্ন পায়রার ডানায় হাততালির মতো শব্দ বাজতে থাকত। ডানার শব্দ কখনও কাছে আসত কখনও দূরে মিলিয়ে যেত। সূর্যের কড়া আলোয় তাদের ডানার চমকে ওঠা সাদা কালো ছেয়ে রঙ আকাশের নীল গায়ে চলমান ছবি আঁকত। হাঁ করে চেয়ে দেখতে দেখতে আমি সব ভুলে যেতাম। ঘাড় ব্যথা হয়ে চোখে ধাঁধা লাগলেও চোখ বুজতে পারতাম না। তিন চার বছর বয়সে দেখা সেই ছবি আজও আমার মনে আঁকা আছে। তার উজ্জ্বলতা একটুও কমেনি।

দূর থেকে শুনতে পেতাম বাড়ির পেছনের ইঁদারায় মালিদের জল তোলার শব্দ। গাছের গুঁড়ি কেটে তৈরি লাটাখাম্বায় বাঁধা দুটি বলদ ক্রমাগত ঘুরছে, তাদের দুঃখে তেলহীন লাটাখাম্বা যন্ত্র কান্নার আওয়াজ তুলছে। সাত আট জন মালি ইঁদারার জল বালতি করে তুলছে তো তুলছেই। পুরনো লোহার চাকতির ঘরঘর আর লোহার বালটির টুংটাং শব্দ সেই কান্নার সুরে সুর মিলিয়েছে। মালিদের মুখে অনর্গল দেহাতি গান, উঁচু গলার বকাবকি সবমিলিয়ে আশ্চর্য এক জগত। আমরা দূর থেকে শুনতাম। কাছে যাওয়া বারণ ছিল ছোটোদের। ইঁদারার জল আসত চানের ঘরের মস্ত চৌবাচ্চায়, নালা দিয়ে সেই জল যেত বাগানে। দেউড়ির ধারে দুপাশে চওড়া দেয়ালের গায়ে গেঁথে তোলা ঢেউ ঢেউ খোলার চালের খোপ খোপ ঘরে মালিরা দল বেঁধে থাকত। সকাল বিকেল দল বেঁধে জল তোলা আর কোদাল দিয়ে মাটি কোপানোর কাজ সেরে দল বেঁধেই তারা বেলাবেলি ঘরে ফিরে যেত। আকাশ ছোঁয়া দুটো নিম আর তেঁতুল গাছের তলায় তাদের দড়ির খাটিয়া পাতা সারিসারি। দূর থেকে দেখতাম কাঠের আগুনে বিকেলের পড়ন্ত বেলায় তাদের রান্না বসেছে। পাকানো ধোঁয়া উঠে মিশে যাচ্ছে আকাশের গায়ে। শীতের দিনে জড়ো করা শুকনো পাতার স্তূপে আগুন দিয়ে তার পাশে গোল হয়ে বসে দল বেঁধে হাত-পা সেঁকে নিত তারা। অনেক উঁচু হয়ে আগুনের হালকা উঠত। মানুষগুলোর গায়ে সেই আগুনের লাল আভা লেগে থাকত। দূর থেকে দেখতাম আমরা। পাতা পোড়ার বুনো গন্ধ আর চরচর শব্দ ভেসে আসত। সন্ধে অবধি একটানা সুরে গাওয়া একঘেয়ে দেহাতি গান কানে আসত। দিনের আলো নিভে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ঘরে ঢুকে যেত।

আমরাও শীতের পোশাকে সারা গা মুড়ে বড়ো দালানে মা জেঠিমার পাশে রান্নার জায়গায় বসতাম। দাদা দিদিরা বই খাতা নিয়ে পড়ত। আমার আর বাবলির পড়া নেই। বাবলি মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে বেড়াতো। কাশির পশ্চিমা শীতে জানালার বাইরে কুয়াশা নেমে সবকিছু ঢেকে দিত। ঘরের অনেক উঁচু ছাদ থেকে ঝোলানো বাতি টিমটিম করে জ্বলতো। ঘরের সব কোণে সেই আলো পৌঁছতে পারত না। আলোর থেকে ছায়া ছিল বেশি। আমি ঠাকুমার কাছে গল্প শুনতে চাইতাম।

সন্ধ্যের পরই অত বড়ো বাড়ি থমথম করত। মা জেঠিমা আমাদের রাতের খাওয়া খাইয়ে বিছানায় পাঠিয়ে গল্প করতে বসতেন। বড়ো দিদি খুব মনোযোগী পড়ুয়া। বই হাতে বিছানায় বসেই দুলে দুলে পড়ত। দাদা, দাদাভাই দিদি ছোড়দা পড়ার শেষে ঘুমোতে আসত। আমাদের সারাদিন দুষ্টুমির অন্ত ছিল না। সারাদিন টোটো করে বেড়ানোর পর ঘুমিয়ে পড়ত সবাই, আমার কিছুতেই ঘুম আসতে চাইত না। ছাদের দিকে চেয়ে চুপ করে শুয়ে থাকতাম। বাইরে থেকে রাতের পাখিদের ডাক শুনতে পেতাম।

কাশি থেকে আমরা ফিরে যাওয়ার পর অনেক ঘটনা ঘটে গেছে ঐ জমিদার বাড়িতে। অনেক পুরনো ভয়ানক কথা পরে জানতে পেরেছি আমরা। ভূত প্রেতে কোনো বিশ্বাস এখন অন্তত নেই আমার। তবুও অনেক ভেবেও কিছু কূলকিনারা খুঁজে পাইনি ঘটনাগুলোর আজও। সিগড়ার বাড়িতে অনেকদিন ধরে চলা ভুতুড়ে উৎপাতের কয়েক হাজার লোক সাক্ষী ছিল। ভারতের প্রায় সমস্ত খবরের কাগজে এ বাড়ির কথা লেখা হয়েছে মাসের পর মাস। একদল পুলিশ রোজ পাহারায় থাকত। দেড়শো দুশো লোক প্রত্যেকদিন দেখতে আসত। তবু কেউ পারেনি ব্যাখ্যা করতে। রাতের একটা সময় দোতলার বন্ধ ঘর গুলোতে যেন তান্ডব চলত! হামান দিস্তায় মসলা পেশার শব্দ, কাঁচ বা বাসন আছড়ে ভাঙার শব্দ, ভারী পালঙ্ক টানাটানি করার আওয়াজ শুনতে পেত সবাই। অথচ দোতলায় কেউ নেই! দোতলার সিঁড়ির ভারী দরজায় তালা দেয়া। শব্দ চলার সময় সাহসী লোকেরা পুলিশ আর সাংবাদিকদের নিয়ে তালা খুলে আগাপাশতলা খুঁজেও পায়নি কিছু। ফাঁকা ঘরে পুরু ধুলোর আস্তরণ, ভাঙচুরের কোন চিহ্ন নেই। তালা খোলার পর শব্দ থেমে যেত, দরজা লাগিয়ে নেমে এলেই আবার শুরু হত উৎপাত। এর কোন কিনারা হয়নি আজও! ছেলেবেলার সেই বাড়িটার কথা মনে হলে এখনো রোমাঞ্চ হয় আমার। তাতে ভয় হয়তো আছে, ভালোলাগাও কম নেই!

একটা দুটো ঘটনার কথা এখানেই বলে ফেলি। সাড়ে তিন বছর বয়স মিথ্যে বলে না, হ্যালুসিনেশনও দেখেনা। আমি যেন দেখেছিলাম আর দাদা দিদিদের বলেও ছিলাম। একদিন বিকেলে দলছুট হয়ে একা একাই লেবু বাগানে চলে গিয়েছিলাম। পাকা লেবুর গন্ধে পাগল পাগল লাগছিল সে কথা বেশ মনে আছে। গাছের তলায় ফাঁকা জায়গায় অনেক পাকা লেবু পড়েছিল, তাদের হলুদ রঙ যেন টানছিল আমাকে। হঠাৎ টের পেলাম আমার পাশ থেকেই কেউ যেন লেবু পাড়ছে। বোঁটা ভাঙা লেবুগুলো গরিয়ে গরিয়ে আমার পাশেই জড়ো হচ্ছে। অথচ ধারে কাছে কাউকে দেখতে পাচ্ছি না! গায়ে কাঁটা দিল ব্যাপারটা দেখে, পালিয়ে এলাম। সন্ধ্যার আগে কাউকে বলতেও পারিনি সে কথা। তবে লেবু বা পেয়ারা বাগানে একা একা আর কখনো যাইনি। ভয় পাওয়া কাকে বলে জানা ছিল না, তবে অবাক হয়ে ছিলাম খুব। অত কম বয়সে মনের ভেতর ভয় ব্যাপারটা বোধহয় জন্মায় না সকলের।

পরের ব্যাপারটা অনেকটাই হয়তো আমার মনের কল্পনা। যদিও আমার কাছে তা পুরোপুরি সত্যিই ছিল। বাড়ির একটা জায়গায় আমি যেন অনেক লোকজন দেখতে পেতাম। চেহারাগুলো একটু ধোয়া ধোঁয়া মতন, ঠিক পরিষ্কার নয়। হঠাৎ হঠাৎ দেখা দিয়ে মিলিয়ে যেত তারা। বাড়ির একধারে একতলা থেকে দোতালায় যাবার সিঁড়ি। চওড়া সাদা মার্বেল পাথরের নীচু নীচু ধাপ বেয়ে উঠতে হয়। রঙিন কাঁচের বাহারি কাজ করা লম্বা জানালা দিয়ে সূর্যের আলোর টুকরো রঙিন আলপনা ছড়িয়ে রাখত সাদা মার্বেলের ওপর আর উল্টো দিকের দেয়ালে। দোতলা অনেক উঁচু। একতলা থেকে অনেকগুলো পাক উঠে যেতে হয়। বোধহয় এখনকার তিন তলা সমান এক একটা তলা! জানালার নীচে দু একটা কাঁচ ভাঙা ছিল। বাইরে পাশেই কুলগাছে টুসটুসে পাকা কুল ঝুলছে। হাত বাড়িয়ে কুল পেড়ে খেত সবাই। হাজার ইচ্ছে হলেও আমি সিঁড়ির একটা ধাপেও পা রাখিনি কোনদিন। নির্জন সিঁড়িঘরে গেলেই মনে হত চারপাশের দেয়াল আর দেয়াল নেই, অনেক লোকজন যেন ভারী ব্যস্ত পায়ে চলে ফিরে বেড়াচ্ছে। কারো বিয়ে হলে যেমন লোকের আনাগোনা হয় সেরকম। কোন শব্দ করছে না কেউ, মাঝে মাঝে বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। বুঝতে পারছি তারা আছে সবাই শুধু চোখে দেখতে পাচ্ছি না। আমি এমনিতেই মুখচোরা ছিলাম খুব, ভালো করে চোখ মেলে চাইতেই বাধোবাধো ঠেকতো। পা টিপে টিপে পালিয়ে আসতাম। যেন শব্দ হলেই ঐ ব্যস্ত মানুষদের নজর পড়বে আমার দিকে। কিন্তু আবার ফিরে যাবার লোভও সামলাতে পারতাম না। পরে জেনেছিলাম ঐ বাড়িতে দুটো খুন আর একটা আত্মহত্যা হয় একসঙ্গেই। ছোট্ট একটি বাচ্চাকে নিয়ে একজন মেয়ে শুধু পালিয়ে বাঁচতে পারে। জমিদারের দুই মেয়েকে মেরে নায়েবের ছেলে রাইফেলের গুলিতে আত্মহত্যা করে। তাই দোতলায় কেউ থাকতে পারে না, তালা বন্ধ থাকে। এদের জ্বালাতেই অত ভালো বাড়ি ছেড়ে জ্যাঠামশাই অন্য বাড়ি ভাড়া নিতে বাধ্য হন।

বাবলির ওই কাশীর থেকে নিয়ে আসা কাঠের খেলনাগুলোর গায়ে আঁকা ছবি দেখলেই আমার ঐ বাড়ির কথা মনে পড়ত। বাড়িটা যেন অদৃশ্য সুতোয় টানত আমাকে। সেই ভয় মেশানো ভালোলাগার টান আজ ষাট বছর বাদেও লেগে আছে আমার মনে। জানি না কাশীর বাড়ি আজও আছে না ভেঙে ফেলা হয়েছে।

ফিরে আসি নীলাচলের নীল আঁচলে ঘেরা ছেলেবেলায়। একা একা এটা সেটা নাড়াচাড়া করি। ছাদে উঠে দূরের পাহাড় গুলোর দিকে চেয়ে থাকি। সবুজের পেছনে নীল পাহাড় গুলো আবছা নীল হতে হতে বহু দূরে প্রায় আকাশের গায়ে মিলিয়ে যায়। মনটাও ছুটতে থাকে দূর থেকে আরো দূরে। পাখির মতো উড়ে যেতে মন চায়। গল্পের বই হাতের কাছে পেলেই পড়ে ফেলি। কি করে যে আপনা থেকেই পড়তে শিখেছিলাম! অক্ষর লিখতে শিখেছি বাংলা ইংরেজি, নাম সই করে ফেলতে পারি। বাবা মা শিখিয়ে দিলেন অক্ষর বসিয়ে কথা তৈরি করতে। সে এক নতুন খেলা, মজা পাই বেশ। দিদিমনির কাছে পড়ে দু’মাসেই দিগগজ হয়ে উঠেছি। লেখার আর অংকের খাতায় ছবির পর ছবি আঁকি ফাঁক পেলেই। বাড়ির এখানে ওখানে ঘুরে বেড়াই। রাঙ্গা মামার দেয়া নানা রঙের চক দিয়ে যেখানে সেখানে ছবি এঁকে বেড়াই। সাদা চুনকাম করা দেয়ালে কোনোটা খালি থাকে না। সিমেন্ট রঙা খর খড়ে মেঝে, আলমারি, দরজা সিঁড়ি সব জায়গায় আঁকতে থাকি। মেঝেতে আঁকা ছবির উপর খালি গায়ে গড়াগড়ি খেয়ে গায়েও আঁকা ছবির ছাপ তুলে আয়নায় দেখি নিজেকে। মাকে লুকিয়ে করতে হয়। ধরা পড়ে গেলে জল সাবান দিয়ে ধুয়ে মুছে অস্থির করে তোলে। মাঝে মাঝে রাজা সাজতে ইচ্ছে হয়। তীর ধনুক তলোয়ার মুকুট তৈরি করে ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করি। মোটকথা দুপুর বেলাটা না ঘুমিয়ে যা মনে আসে তাই করে কাটাই। একা একা নিজেকেই নিজে গল্প শোনাই বানিয়ে বানিয়ে। মার চোখে পড়লে হাসেন। ছবি আঁকায় কোন বাধা দেন না। বড়ো মাপের কাগজ রং কিনে দেন। ছবি আঁকলে তুলে রাখেন যত্ন করে। বাবা খুব ভালো ছবি আঁকতে পারেন, বাবাও খুব নজর রাখেন আমার আঁকা ছবির ওপর। প্রথম আঁকা ছবিটার নাম দিলাম ‘মায়াবন’। পরের ছবি পায়রার সংসার। নাম আমি নিজেই দিতাম। শুরু হয়ে গেল আমার আঁকা-আঁকি পুরোদস্তুর।

আমার ছবিতে গল্প থাকত। কাজ করা মানুষজন থাকত। প্রাণ বাদ দিয়ে নিশ্চল ছবি কোনও দিন আঁকিনি। হাতি ঘোড়া বাঘ ভালুক কুকুর বেড়াল তো আঁকতামই। কল্পনায় দেখা ডাইনোসর টেরোডাকটিল কিছুই বাদ যেত না। বুক অফ নলেজের ছবি দেখে যন্ত্রপাতি রেল ইঞ্জিন ও আঁকার চেষ্টা করতাম। তবে সে ইঞ্জিনে ওড়ার কল জুড়ে দিতাম। এভাবেই দিন কাটে আমার। বোনের পুতুলদের অসুখ হলে ডাক্তারিও করি, যদিও বোন মোটেই খুশি হয় না ওতে।

দিন কয়েকের মধ্যেই পাহাড়ের গায়ে নতুন ছেঁচা বাঁশ আর শাল কাঠের ঘর তৈরি হয়ে গেল সাংবিরপুন দাদার। ওর নতুন বউ বোঁচকা-বুঁচকি নিয়ে ওখানে চলেও গেল সংসার করতে। কষ্ট হল আমাদের ও চলে যাওয়ায়। এ কদিন জুঠিদিদি আর পুষ্পমালা দিদির কাছে তেতলার ঘরে বসে কত গল্প শুনেছি। যাবার আগে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো পুষ্পমালা দিদি। এইখানে কদিন থাকবার পর মাকে বড়ো ভালোবেসে ফেলেছিল ও। তাছাড়া স্বামীর ঘর করতে যাবার আগে কাঁদাটা নিয়মও বটে। রোজ সকাল বিকেল দূরের পাহাড়ের গায়ে সেই ঘর থেকে ধোঁয়া উঠতে দেখলে জানতে পারতাম পুষ্পমালা দিদি রান্না করছে। দিদির সঙ্গে মাঝে মাঝে চলেও যেতাম দেখা করতে।

জুঠিদিদির অনেক কাজ। কত কাজ করতে মা বারণ করলেও করতেই থাকে। বলে বিয়ের পর তো অনেক কাজ করতেই হবে, তাই মার কাছ থেকে শিখে নিচ্ছে। মা যদি বলে তোর খুব বিয়ের শখ, নারে? জুঠিদিদিটা বোকা। একগাল হেসে মাথা নাড়লে মা ওর গাল টিপে দেয়। ও এখন একা একাই মায়ের পায়ে আলতা পড়াতে বসে, চুলে তেল মেখে খোঁপা বেঁধে দেয়। মা ওর চুলের উকুন বেছে তেল মেখে বেড়া বিনুনি বেঁধে দেয়, ঠিকঠাক করে শাড়ি পড়তে শেখায়। শাড়ি গোড়ালি অব্দি পরে ও হেঁটে পাহাড়ে উঠতে পারে না বলে আবার হাঁটু অব্দি গাছ কোমর করে পরিয়ে খুশি হয়ে চেয়ে থাকে মা। যেন নিজেরই মেয়ে।

দুপুর বেলা দাদা আর দিদি স্কুলে যায়। আমি আর বোন জুঠিদিদির পিছু পিছু ঘুরে বেড়াই। ও বলে, কিরে কি চাই? আমি বলি গল্প বলো। ও বলে, তোর দিদি আসুক। এখন আমার অনেক কাজ। তবু পিছু ছাড়ি না।

শীত পুরোপুরি গিয়ে গরমকাল এসে গেল। পুষ্পমালা দিদি আর জুঠিদিদিদের বাড়ি পাশাপাশি। নতুন বাড়ি গিয়ে ও ভয় পেয়েছে। জুঠিদিদি এসে হাসতে হাসতে বলল মাকে। বউয়ের ঘরের পাশেই বাঁশ ঝাড়। পাকা বাঁশের গায়ে পোকারা ফুটো করেছে, কাঠঠোকরা পাখি সেই ফুটো পোকা খাবার জন্য ঠোঁট দিয়ে ঠুকে ঠুকে বড়ো ফুটো করে দিয়েছে। ঝড়ো বাতাসে সেখানে বাঁশির মতো শব্দ হয়। সাংবিরপুন দাদার বউ ভেবেছে অন্ধকার রাতে পাহাড়ে পেত্নী কাঁদছে। সেই শুনে জুঠিদিদি হেসে গড়াগড়ি।

মা বললেন, অত হাসির কি আছে জুঠি? রাত্তিরে ঘুম ভেঙে ওরকম শব্দ শুনলে আমিও পেত্নীর কান্না ভাবতাম। তুই ওকে বুঝিয়ে দিলেই পারিস। জুঠিদিদি হাসি থামিয়ে বলল পেত্নী মোটেও ওমনি ভাবে কাঁদে না, হাসে। তাছাড়া যে যেমন ভাবে শোনে। তারপর চুপ করে থেকে নীচু গলায় বলল, কেউ শোনে ভূত পেত্নীর আওয়াজ কেউ শুনে পাগলা দাজু বাঁশি বাজাচ্ছে।

দিদি আর দাদা ছুটির পর ফিরে এসেছে। বই টই রেখে দিদি এসে বসল, মা গেল খাবার আনতে। বোন ওর ছোটো ছোটো হাতে জুঠিদিদির জামার কোণ ধরে টানল, ও জুঠিদিদি ভূত কেন রাত্তির বেলা বনে থাকে? ওদের ভয় করেনা! দিদি হাসতে লাগল, কথা শোন পুঁচকেটার। আরে ওকেই তো ভয়, ওর আবার ভয় কাকে! জুঠিদিদি দাজু কে রে?

হাতের কাজ ফেলে আমাদের পাশে এসে বসল জুঠিদিদি। নজর ওর যেন অনেক দূরের সেই শিলং পাহাড়ের দিকে, আকাশের নীল যেখানে পাহাড়ের নীলের সঙ্গে মিশে গেছে। উদাস হাওয়ার মতো ওর গলার স্বর।

জুঠিদিদির বুড়াদাদার সেই যে বড়ো একটা ভাই ছিল। ছোটো থেকেই অন্যদের থেকে আলাদা ছিল সে। অন্যরা যেমন ঝরনার জলে মাছ ধরত, পাখির লুকানো বাসা থেকে ডিম চুরি করে নিয়ে আসত, সেরকম নয়। সে ঝরনার জলে বৃষ্টির ফোটায় কান পেতে কি শুনতো। শুকনো পাতা পড়ার শব্দ, পাইনের ছুঁচোলো পাতার ঝিরঝির শনশন শব্দ শুনে উদাস হয়ে যেত। দেখতেও সবার থেকে আলাদা। তাই সবাই ওকে পাগলা বলত। দাদাকে তো ওরা বলে দাজু, তাই পাগলা দাজু। কেউ ওর মনের থৈ পেত না বলে পেছনে লাগত। তাতে অবশ্য ও বলত না কিছু। রাগ হিংসা ছিলই না ওর শরীরে। ছিল অনেক গুণ! বনের জন্তু জানোয়ারদের সঙ্গে কথা বলতে পারত সে। তাদের কথা বুঝতেও পারত। কম বয়সে পাগল হয়ে দেশ ছাড়তে না হলে সেই হত বনের বড়ো চৌকিদার।

সে ছিল পাগলাটে দেখতে। লম্বা, রোগা, চোখ দুটো বড়ো বড়ো আর মাথায় কাকের বাসার মতো চুলের বোঝা। পাতলা সোনালি দাড়ি গোঁফও ছিল তার মুখে, যদিও সে দেশের পুরুষ মানুষদের দাড়ি-গোঁফ তেমন দেখাই যায় না। বয়স হলেও তার মুখটা থেকে গেছিল ছেলে মানুষদের মতো। সবচেয়ে আশ্চর্য ছিল তার চোখ দুটি। সে চোখের নজরে তল পাওয়া যায় না। এমনিতে ভারী শান্তশিষ্ট স্বভাব। নিজে কিছু না বললেও অন্যরা কিছু বললে মন দিয়ে শুনত, কিন্তু কোন জবাব দিত না। দিনরাত ঘর ছেড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরত। বনের মাঝখান থেকে খুঁজে খুঁজে রোদে সেঁকা পাকা মুলি বাঁশের বোঝা কেটে এনে বাঁশি তৈরি করে রাখত সে। সরু মোটা নানান মাপের বাঁশির পাঁজা যত্ন করে তোলা থাকত তার নিজ হাতে গড়ে তোলা কাঠের ঘরের স্লেট পাথরের টালিতে ছাওয়া চালার নীচের বাতায়। এক এক সময়ে হাতে থাকত এক একটা বাঁশি। নিরালায় একা একা বসে কি যে সুন্দর সুর বাজাত সে। যেন এ দুনিয়ার চেনা কোন সুর নয়। মাঝে মাঝে দিনের পর দিন কোন হদিস থাকত না পাগলা দাজুর। কাউকে কিছু না জানিয়ে কোথায় যে চলে যেত! চালের বাতায় গোঁজা বাঁশির পাঁজায় তখনও কেউ হাত দেবার সাহস পেত না। একা তো সেই নয় আরও কোন কোন ছেলে বা মেয়ে জানতো বাঁশি বাজাতে। তবে তার মতো কেউ নয়। শুধু সত্যিকারের পাগলেরাই জানে অমন সুর তৈরি করতে।

কাছে বসে কেউ তার বাঁশি বাজানো শুনতে পায়নি। গাঁ ঘরে কতক্ষণই বা দেখা যেত তাকে। না খেয়ে না দেয়ে সারাদিন বনে বনে ঘুরে বেড়ানোই তার কাজ ছিল। রাত গহন হলে কখনও কখনও কান পাতলে শোনা যেত বাঁশির আওয়াজ। জানোয়ারের ভয়ে গাছের উপর রাত কাটানো দু একজন কাঠুরে অবশ্য দেখতে পেয়েছে তাকে বনের পথ দিয়ে নির্ভয়ে হেঁটে যেতে, কোন পাথরের উপর বসে বাঁশি বাজাতে। আশ্চর্য সে সুর! বনের সমস্ত শব্দ মিশে আছে তাতে। থামলেও সে সুর বাজতেই থাকে মনের মধ্যে। এমনই ছিল বুড়াদাদার সেই পাগলা দাজুর ক্ষমতা।

দিদি বলল, আমাদের হেমাঙ্গ জেঠু ও তো কি ভালো গান গায় সুর দেয়, তাকে তো কেউ পাগলা বলে না! তোমাদের দেশের লোক বুঝি ভালো নয়? জুঠিদিদি ব্যস্ত হয়ে বলল, না না তা মোটেও নয়। তারা তোমাদের চেয়ে অনেক বেশি ভালো মানুষ। পাগলা ব’লে ভালোবেসে, আদর করে।

আমাদের চেয়ে ভালো শুনে মনে মনে দুঃখ পেলেও চুপ করে থাকি। গল্পের টানে দিদিও আর আগে বাড়ে না, জুঠিদিদি বলতে থাকে।

কেউ জানে না এ বিদ্যে সে পেল কোথা থেকে। কোনকালে কেউ তাকে বাঁশি বাজাতে শেখায়নি। গাঁ ঘর ছেড়ে যায়ওনি কোথাও যে শিখবার সুযোগ পাবে। , একমাত্র নিজের ভাইকে সে বলেছিল বনের কাছ থেকে নদী আর বাতাসের কাছ থেকে এ বিদ্যে তার আপনা থেকেই শেখা।

কেউ ওর কাছে শিখতে চাইলে মুচকি হেসে চুপ করে থাকত পাগলা দাজু। বেশি পীড়াপীড়ি করলে উঠে চলে যেত। রাগ ছিল না তার শরীরে। কিন্তু এমন কিছু ছিল কম কথা বলা মানুষটার মধ্যে, কেউ তাকে আর ঘাঁটাতে সাহস করত না। বনের চৌকিদাররাও না।

বিকেলের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে নীলাচল পাহাড় লাল পাহাড়ের গায়ে। দুই পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে সূর্যের শেষ আলো এসে পড়েছে কালো পাহাড়ের গায়ে।।জুঠিদিদি বাড়ি চলে গেল। আকাশে প্রথম তারাটা ফুটলো।

এ সময় ঠান্ডা বাতাস বয়ে যায় ব্রহ্মপুত্রের দিক থেকে। আমাদের খোলা ছাদে দাঁড়িয়ে নীলাচল পাহাড়ের খাঁজের লাল পথটার দিকে চেয়ে দেখতে পাই নীল একটা ফুটকির মতো জুঠিদিদির ঘরে যাওয়া। দূর থেকে এদিকে ফিরে ও হাত নাড়ে, তারপর বড়ো কালো পাথরটার আড়ালে চলে যায়।

উল্টোদিকে রেল গাড়ির ধোঁয়া উড়তে দেখি। ঝিকঝিক শব্দে আর ধোঁয়ার গতিতে টের পাই তার চলন। আরো দূরে ব্রহ্মপুত্রের বুক থেকে ভেসে আসা স্টিমারের ভোঁ সন্ধের আকাশে কাঁপুনি ধরায়। পড়তে বসার সময় হয়। সিনেমা হলের গান কখন থেমে গেছে। লাল বাতি জ্বলে উঠল অনেক উঁচু পাহাড়ের মাথায়। সারারাতের পাহারাদারি শুরু হল তার। পথের ধারে বড়োবাজারে সারি সারি দোকান গুলোয় কার্বাইডের বাতি জ্বলে ওঠে। কোন মন্দির থেকে সন্ধ্যা পুজোর ঘণ্টা শুনতে পাই। আমাদের ঠাকুরঘরেও সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলে ওঠে, শাঁখে ফুঁ দেন মা।

পুজো দেবে সাংবিরপুন দাদার বউ। ওর ঘর থেকে ভূত তাড়াবার জন্য পূজো। রাত নিঝুম হলে ঘরের পাশে ভুতের কান্নাকাটি শোনা যায়, কখনো কখনো ভরদুপুরেও। নতুন বাড়িতে সংসার করতে এসে একি বিপদ। মাটির মূর্তি তৈরি করে পুজো। নিজেই বানিয়েছে পুষ্পমালা দিদি, নিজেরাই পুজো দেবে। একজোড়া পায়রা বলি দেবে বলে গেল। মা বলে দিলেন বলি না দিয়ে উৎসর্গ করে উড়িয়ে দিলে ভূতেরা খুশি হবে। তাই নাকি করবে শুনে আমরাও খুশি। পুষ্পমালা দিদিকে মা ভালো করে বুঝিয়েছেন কামাখ্যা পাহাড়ে কোন কিছু বলি দিলে তো মা কামাখ্যাই খেয়ে নেন, ভূতেরা কিছু পায়না বলে ক্ষেপে যায় আরো। শুনে শুনে ও চলে যাবার পর দিদি বলল মায়ের বুদ্ধিতে বেঁচে গেল পায়রা দুটো। মা ছোটোবেলায় নিজের বাপের বাড়িতেও বলি বন্ধ করেছিলেন।

পুজো দেবে শুনে জুঠিদিদি রেগে গেছে। বারবার বলেছে ভূত নেই মোটেই, ফুটো বাঁশে বাতাস খেলে গেলে বাঁশির মতো বাজতে পারে। ভূত পেত্নী হতে যাবে কোন দুঃখে! ওর কথা শোনে কে? বউ আবার জেনে গেছে বুড়াদাদার পোষা দেও গুলোর কথা। জুঠিদিদি বলেছে ভূত আর দেও এক হল? দেও মানুষের কত ভালো করে! কেউ শোনেনি ওর কথা। শেষে পুজোয় খিচুড়ি পায়েস ভোগ হবে শুনে চুপ করে গেছে জুঠিদিদি। আমাদের সবার নেমন্তন্ন। সকাল থেকে পুজো। মা পাহাড়ে সিঁড়ি নেই বলে উঠতে পারবেন না, তাই বাবলি ও গেল না। আমি আর দিদি গেলাম প্রসাদ খেতে। সাংবিরপুন দাদা বাবা মা দাদা আর বাবলির জন্য প্রসাদ পৌঁছে দেবে।

ঘরের বাইরে উঠোনে পুজো হচ্ছে। কাঠের জ্বালে ভোগ রান্না হচ্ছে পাশেই। পায়রা দুটো বাঁধা আছে। পুজো হয়ে গেলে ওড়ানো হবে। জুঠিদিদি আমাদের পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে গেল ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করছে বলে। দুপুরবেলা এখানে কোন শব্দ নেই, বাতাসও বইছে না। বড়ো কালো একটা চ্যাটালো পাথরের উপরটা সমান, ওখানেই বসলাম আমরা তিনজনে। মাথার উপর ঝুঁকে থাকা বড়ো কাঠগোলাপ গাছটার ঠান্ডা ঘন ছায়ায় কি আরাম। সাদা ফুলে ফুলে ছেয়ে আছে। ভারী সুন্দর গন্ধ। এখান থেকে নীচের শহরটাকে রোদে মেলে দেয়া রঙিন শতরঞ্চির মতো মনে হয়। পুজোর জায়গাটাও দেখতে পাচ্ছি। হঠাৎ হঠাৎ গাছ কাঁপিয়ে বাতাসের ঝিরঝির শব্দ আর ঝোপে লুকিয়ে থাকা পাখির ডাক, আর কোনো শব্দ নেই কোথাও।

জুঠিদিদি বলল গাছেরাও কথা বলে জানিস তো! সবাই শুনতে পায় না, কেউ কেউ পায়। ওদের কথা বুঝতেও পায়। আমার বুড়াদাদার সেই পাগলা দাদা সে ভাষা জানতো। তাদের সঙ্গে কথা বলতেও পারত। বনের সমস্ত জন্তু জানোয়ারদের ভাষা বুঝে কথাবার্তা চালাতে পারত। এরকম ক্ষমতা আর কজনের হয়!

অনেক বছর আগে দেশ জুড়ে একবার ভয়ানক ভুঁইদোল হল। মাটির একেবারে তলায় যখন ভূত আর রাক্ষসদের মধ্যে লড়াই হয় তখনই ভুঁইদোল হয় এ কথা কে না জানে। অনেক বাড়িঘর ভেঙে পড়ল, পাকা বাড়িগুলোও বাদ গেল না। পাহাড়ে ধ্বস নামলো কত জায়গায়। বড়ো বড়ো নদী চলার পথ বদলে নতুন পথে বইতে লাগল। মাটি ফেটে আগুন বার হল পাতাল থেকে। নদ নদী পাহাড় পর্বত তোলপাড় হয়ে ভয়ংকর অবস্থা। কত মানুষ যে মরে গেল হিসেব নেই। বন জঙ্গল ঝেঁটিয়ে কত জন্তু-জানোয়ার ভয় পেয়ে দিক বিদিক জ্ঞান হারিয়ে পাগলের মতো বেরিয়ে এল মানুষজনের বসতির মধ্যে দিয়ে। দূরের দেশের কত হাতি গন্ডার ময়াল সাপ ব্রহ্মপুত্রের পাগলা স্রোতে ভেসে চলে গেল। বড়ো বড়ো জানোয়ারের পায়ের চাপে কত গাঁয়ের ঘরবাড়ি লোকজন গুঁড়িয়ে গেল। বুনো মহিষ বড়া আর হাতি থাকে গভীর জঙ্গলে, তারাও গাঁ শহরে ঢুকে পড়ল। বাঘের থাবা আর সাপের কামড়েও লোক মরল অনেক। ফাটা জমির তলা থেকে গরম জলের ফোয়ারা আকাশ ছুঁতে চাইল। দাবানলে সব বন জঙ্গল ছারখার! মহামারীতেও লোক মরেছে কত! সেই সময়ে বুড়াদাদার দাজু একা এসে দাঁড়ালো বনের ধারে। ঝড়ো বাতাসে তার উড়ু উড়ু চুল দাড়ি, হাতে বড়ো মুলিবাঁশের বাঁশি।

ভুঁইদোল থেমে গেলে পরিষ্কার নীল আকাশে গোল সোনার থালার মত চাঁদ উঠল। ঠান্ডা বাতাসে মাটি জুড়ালো, পাহাড় শান্ত হল। ব্রহ্মপুত্র আর যত ছোটো নদীর জল আগের মত বইতে লাগল। সবাই শ্বাস ফেলে বাঁচলো, শুধু যারা চলে গেছে তারা আর ফিরে এল না। চাঁদের আলোয় পাগলা দাজু তখন চলেছে বনের দিকে। সবাই অবাক হয়ে দেখল ওর বাঁশির আওয়াজ কানে যেতেই লোকালয় ছেড়ে সার সার ছোটো বড়ো জানোয়ারের দল আবার ফিরে চলেছে বনের দিকে তার পিছু পিছু। দাজুর বাঁশির সুর তাদের শান্তি ফিরিয়ে দিয়েছে , বনে ফেরার ডাক শুনিয়েছে। একটুও পাগলামোর লক্ষণ নেই তাদের কারও। সকলকে যার যার জায়গায় পৌঁছে দিয়ে দাজু এসে একাই হাত লাগালো গাঁ শহর পরিষ্কার করতে। ওর দেখাদেখি একে একে কত লোক কত মেয়ে দুঃখ ভুলে সে কাজে লেগে গেল। যারা বেঁচে থাকলো তাদের কি মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকলে চলে?

ওর এইরকম আশ্চর্য ক্ষমতার কথা জানতে পেরে দেশের রাজা খুশি হয়ে দাজুকে ডেকে পাঠালেন। খাতির করে ইনাম দিতে চাইলেন, মন্ত্রী হতে বললেন। জমি জায়গা দিয়ে পাকা ঘর বাড়ি তৈরি করে দিতে চাইলেন। নিলোই না সে! দরবারে রাজার সামনে সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে বললেন দাজু, রাজা যদি জঙ্গলে শিকার করা বন্ধ করবেন বলে কথা দেন তবেই সে খুশি। টাকা পয়সা জমি বাড়ি ইনাম কিচ্ছু চাইনা তার।

সকলের সামনে রাজার মুখের উপর ইনাম বা টাকাকড়ি চায় না বলায় খুব রেগে গেল রাজা। মানে লেগে গেছে তার। যতই ক্ষমতা থাক এরকম কথা কেউ বলতে পারে মুখের উপর! শিকার বন্ধ করার কথা তো দিলই না, উল্টে পাগল বলে বকাবকি করল। মাথা নীচু করে পাগলা দাজু ঘরে ফিরে এল। রাজার কথা শোনেনি বলে দেশ শুদ্ধ লোক এমনকি আপন গাঁয়ের লোকেরাও যখন তাকে দোষ দিতে লাগল, তখন সে সত্যিকারের পাগল হয়ে গেল। কারও সঙ্গে কথা বলত না, চান খাওয়া ছেড়েই দিল। তার চোখের চাউনি ও আর আগের মত রইল না। এমনকি চেনা লোকেরাও তাকে আর চিনতে পারল না। সে যেন সকলের মধ্যে দুনিয়া ছাড়া কোন মানুষ। চুপ করে দূরের দিকে চেয়ে কি যেন ভাবছে জুঠিদিদি। তারপর? ওকে আনমনা হতে দেখে আমরা ওর হাত ধরে নাড়া দিলাম। তারপর কি হল বলো না?

তারপর একদিন সে যে কোথায় চলে গেল কেউ জানে না। কেউ বলে আরও গভীর বনে গিয়ে জানোয়ারদের রাজা হয়েছে সে। কেউ বা বলে মরে গেছে। আর কখনও তাকে দেখতে পায়নি কেউ।

তবে কোন কোন গভীর রাতে, অঝোর বৃষ্টির দিনে অথবা গরম কালের নির্জন দুপুরে কারো কারো কানে আসত বাঁশির সুর। গাঁয়ের যারা তাকে চিনত তারা বলাবলি করত বনের মধ্যে লুকিয়ে থেকে বাঁশি বাজাচ্ছে পাগলা দাজু। যারা তাকে জানতো না, কখনও চোখে দেখেনি তারা বলত বাঁশির আওয়াজ না ছাই! বনের ভেতর হাওয়া বয়ে গেলে ঐরকম শব্দ শোনা যায়। কারো কারো মনে হত ভূতেদের মায়াবী কান্না!

আমি আর দিদি, মনের কষ্টে কোনো কথা বলতে পারছিলাম না অনেকক্ষণ। জুঠিদিদিও চুপ করে বসেই ছিল পাথরের গায়ে ঠেস দিয়ে। দিদি আবার বড্ড কাঁদুনে। চোখ টোখ মুছে বলল, রাজা ভালো লোক বলতে চাও জুঠিদিদি? জন্তু-জানোয়ারদের শিকার করে কি আনন্দ পায় কে জানে? পাগলা দাজু কত ভালো। রাজা ভালো মানুষ হলে জন্তুদের কষ্ট বুঝত। রাজি হয়ে কথাটা দিলেই পারত! কত ভালো মানুষটা হারিয়ে গেল। কেউ তাকে খুঁজে বার করতে পারল না? বনের ভেতর কত কষ্ট। মা বাবা ভাই বোন সবাইকে ছেড়ে একা একা থাকতে হয়। খাওয়া নেই চান নেই ঘুম নেই। গরমের সময় বন তেতে ওঠে, সাপেরা ছোবল মারতে পারে। আগুন লেগে যায় গাছে গাছে ঘষা খেয়ে। কালবৈশাখী ঝড়ে বড়ো বড়ো গাছ উপড়ে পড়ে যায়। বৃষ্টির দিনে পাহাড়ি নদীতে বান ডাকে, ধ্বস নেমে আসে গাছপালা তছনছ করে। জোঁকের দল কিলবিল করে ঝোপে ঝাড়ে, রক্ত চুষে খায়। বরফ পড়ে শরীর জমিয়ে দেয়, হাত পা ফেটে রক্ত পড়ে। ও জুঠিদিদি ওর কোন বন্ধুও ছিল না? রাজা না করুক, আর কেউ খোঁজও করল না ভালো করে? পাগল বলে ওকে ভুলেই গেল সবাই! দিদির আবার চোখ ছল ছল করতে লাগল।

জুঠিদিদি রেগেই গেল। খোঁজেনি মানে! ওকে খুঁজতে গিয়ে গাঁয়ের কত কম বয়সী ছেলে নিজেরাই নিখোঁজ হয়ে গেল বনের ভেতর তা জানিস? তার মধ্যে কজন অবশ্য মগের মুলুকে পৌঁছে ব্যবসা করে মস্ত বড়োলোক হয়ে ফিরে এসেছিল অনেকদিন বাদে। তারা সবাই বলেছে পাগলা দাজুর খোঁজ নাকি কোথাও পাওয়া যায়নি। তারপর তো কত বছর পার হল। পুরোন রাজা বুড়ো হয়ে মরে গিয়ে তার ছেলে রাজা হয়ে বুড়োও হয়ে গেল, এখন আবার তার ছেলের ছেলে রাজা। শিকার উঠে গেল দেশ থেকে, তবু দাজু আর ফিরে এল না। এখনও ওকে খোঁজে সবাই। ছোটোরা শুকনো পাতার গায়ে কাজল দিয়ে ‘দাজু ফিরে এসো’ লিখে বনে ছড়িয়ে দিত। সেই পাতার চিঠি শুখার সময় ঘূর্ণি বাতাসে চক্কর খেতে খেতে আকাশে উঠে বনের আনাচে কানাচে পৌঁছে যেত না? সে চিঠি, দাজু দেখতে পায়নি বলতে চাও?

আমার এই বুড়াদাদা কতবার বনের গভীরে গিয়ে বড়ো বড়ো গাছের গায়ে ছুরি দিয়ে খোদাই করে লিখে এসেছে, দাজু তুমি গাঁয়ে ফিরে এসো। তোমায় না দেখতে পেলে সবাই কত কষ্ট পায়। গাছের মন বোঝো তুমি আমাদের মন বোঝনা? চালের বাতায় তোমার হাতে তৈরি বাঁশিগুলো ঘুনপোকায় খেয়ে শেষ করে ফেলল, আবার নতুন করে বাঁশি বানাতে হবে না? তোমার পোষা হরিণের ছানা হয়েছে, দেখবার লোক নেই। গাছের খোঁড়লে ধনেশ পেঁচা আর বন কবুতরেরা কত ডিম পারছে, তাদেরও ছানা হচ্ছে। সেই মা হারা ছোট্ট চিতার ছানা ‘শম্ভু’ বড়ো হয়ে তোমার খোঁজে বনে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। তুমি যেখানেই থাকো ফিরে এসো।

আমাদের বাড়িতে কত নতুন লোক বেড়েছে। ছোটো ছোটো বাচ্চারা জন্মে বড়ো হয়ে গেছে, তারা তোমার কথা শুনেছে। তোমায় দেখতে চায়। বুড়িমা কত কাঁদে, ফিরে এসো। তবু আসেনি!

শুকনো পাতায় লেখা চিঠি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু গাছের গায়ে খোদাই করে লেখা চিঠি নষ্ট হবার নয়, সে লেখা রোদ বৃষ্টি ঝড়ে ও মুছে ফেলা যায় না। গাছ যত বড়ো হয় লেখা তত পাকা হয়ে ফুটে ওঠে। বেঁচে থাকলে সে লেখাও তার নজরে পড়েনি বলতে চাও? মরেই গেছে আমার বুড়াদাদার পাগল ভাই। সে আর ফিরবে না কোনদিনও।

চোখে বোধ হয় ওর কুটো পড়েছে, কাপড়ের আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে লাগল জুঠিদিদি।

বনের জানোয়ারেরা মারেনি তাকে। সবাই জানতো যে জানোয়ারদেরও বন্ধু ছিল। মানুষেরা না বুঝলেও ওরা ঠিক ওর ভালোবাসা বুঝত। বনের মধ্যে পাগলা দাজু বুড়ো হয়ে মরেই গেছে। চুপ করল জুঠিদিদি।

এমন সময় গাছপালা ঝোপঝাড় কাঁপিয়ে ঝড়ো বাতাস বয়ে গেল। কত রকম পাখির দল একসঙ্গে ডেকে উঠল। আমাদের মাথার উপর ঝড়ে পড়ল একরাশ কাঠগোলাপ ফুল। কান পেতে স্পষ্ট শুনতে পেলাম কে যেন বাঁশির সুর তুলেছে কোথায়।

ও কিছু নয় রে! পোকা ধরা বাঁশের ফুটোয় বাতাস বইছে। উঠে দাঁড়ালো জুঠিদিদি। ওর এক চোখে হাসি এক চোখে জল।

প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরতে দুপুর গড়িয়ে গেল। মনের মধ্যে কতদিন আগে বনের গহনে হারিয়ে যাওয়া অবাক মানুষ জুঠিদিদির পাগলা দাজু। মুখে কথা নেই আমাদের। সেদিন রাতে ঘুম এল দেরিতে। স্বপ্ন দেখলাম জঙ্গলের গাছেদের গায়ে লেখা চিঠি পড়ে ফিরে এসেছে দাজু, ওর মাথায় সান্তা ক্লজের মতো সাদা লোমের ঘের দেয়া লাল টুপি। বাঁশি বাজিয়ে বনের পথে ঘুরতে ঘুরতে এসে উপস্থিতি! পরদিন সকালেই ‘সন্দেশ’ পেলাম হাতে। তাতে শুরু হয়েছে প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তর। জীবন সর্দার কে মনে হল আর এক পাগলা দাজু। তাঁর দেখার আর দেখানোর ক্ষমতাই আমাকে জীবজন্তু গাছপালাকে নতুন করে ভালোবাসতে শেখালো।

একদিন জুঠিদিদির বিয়ে হয়ে গেল। একটা কাপড় দিয়ে ঘেরা রিকশায় বসে পাড়া মাথায় করে কাঁদতে কাঁদতে ও চলে গেল বরের ঘর করতে। বর চলল পিছু পিছু খোলা কুকরি হাতে পাগড়ি মাথায়। আর ওকে দেখিনি।

পান্ডুতে আসবার আগে থাকতাম কলকাতার যাদবপুরে। তখন আমি খুবই ছোটো। মাপে অথবা মাথায় ছোটোরা দেখতে পায় মাটির কাছে ছোটোখাটো জিনিস। আমি দেখতাম ঘাস ফুল, দেয়ালের গায়ের শ্যাওলা, পিঁপড়ে, ফড়িং, বর্ষার সময় জন্ম নেওয়া ব্যাঙ্গাচি, জলের মধ্যে খুদে খুদে মাছেদের চলন এসব। শুকনো দিনে ছোট্ট ছোট্ট ব্যাঙের বাচ্চাদের আলগোছে তুলে টিউবয়েলের মধ্যে ছেড়ে দিতাম। জানতাম ওখানে জল পেয়ে খুশি হবে তারা। ধরা পড়ে যাবার পর বহুক্ষণ ধরে পাম্প করে জ্যান্ত অবস্থাতেই বার করা হয় ওদের। যথেষ্ট বকুনিও খাই। কেউ বুঝল না আমি ওদের ভালো করতেই চেয়েছিলাম। দুআড়াই বছরের ছোটো ছেলের মনের কথা কেই বা বোঝে!

আমার জ্যাঠামশাই খানিকটা বুঝতেন। আমাদের সঙ্গে অনেক কথা হত যাদবপুরে এলে। আমাকে বলেছিলেন আমি যা যা দেখতে পাই তাঁকে চিঠি লিখে জানাতে। আমার অক্ষর পরিচয় নেই, তবু লিখলাম! যতদূর মনে পড়ে কাগজ পেন্সিল নিয়ে বসে মুখে কথাগুলো বলতে বলতে হিজিবিজি দাগ দিয়েছিলাম। সে চিঠি বোধ হয় খামে করে পাঠানোও হয়েছিল। আমার মুখে বলা কথাগুলো দাদা উল্টো পিঠে লিখে দিয়েছিল। জবাবও এসেছিল জ্যাঠামশাই এর কাছ থেকে।

চিঠিতে লেখা ছিল ফড়িং কিভাবে শুঁড় পরিষ্কার করে, ডানার কাঁপুনি চোখ ঘোরানো পাতা কামড়ানো। ব্যাঙের কনসার্ট এর খবর। গ্যাঁ গো করে ডাকবার সময় চোয়ালের দুপাশে নীল থলি কিভাবে ফুলে ফুলে ওঠে। নালার জলে ছোটো লাজুক মাছেদের কথা। চিনির খবর কি করে কানে কানে পৌঁছে যায় পিঁপড়েদের কাছে। কিভাবে বৃষ্টির আগে দেয়াল বেয়ে ডিম মুখে নিয়ে ছাদে পৌঁছে যায়। এসব জরুরি খবর। তখন আমি মোটে আড়াই। চিঠি আর ডাক বাকসো নিয়ে আমার নানারকম ভাবনা ছিল সেই সময়ে। বেশ নতুন ধরনের চিন্তা বলতে হবে! বড়ো একটা খামের মধ্যে যদি চিঠির বদলে আমিই ঢুকে পড়তে পারি তবে আমিও আমেরিকায় যেতে পারি। তবে রেলগাড়ির ডিব্বা থেকে কাপড়ের ব্যাগ কিভাবে ছুঁড়ে ছুঁড়ে প্ল্যাটফরমে ফেলা হয় দেখে সে চিন্তা ত্যাগ করি। বডডো লাগবে! ওরা যদি একটু যত্ন করে কাজটা করত তবে কি হত বলা যায় না।

যাদবপুরে বড়ো পিসিমার বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির কাছাকাছি। সেটা আমার সারাদিন কাটানোর জায়গা। পিসেমশাই একটা দরমা আর টিনের চালের ঘরে সারা দুপুর লেখাপড়া নিয়ে থাকতেন। সেটা ছিল আমার ভারী পছন্দের জায়গা। বড়ো পিসিমার কাছে গল্প শোনাটা ছিল রোজকার ব্যাপার। দাদা দিদিরাও ভালোবাসতেন খুব। বাড়ির পাশে বাগান, দরমার ঘরটার পেছনে মস্ত বড়ো পুকুর। সেখানে কোমর বাঁকা একটা তালগাছ পুকুরের উপর ঝুঁকে থাকত। পুকুরের জলে পাকা তাল পড়ার শব্দ পেলেই খবর দিতাম পিসেমশাই কে। তাল তুলে এনে বড়া হত। আর ছিল বেশ বড়ো একটা ফলসা গাছ। তার তলায় নর্দমা থাকলেও আমাকে জায়গাটা টানত খুব। আসামে চলে যাওয়ার পর বড়ো পিসিমার বাড়ির কথা সব সময় মনে পড়ত। আমরা যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম সে বাড়ির কথাও। তখনও ওখানে রাস্তা পাকা হয়নি। রাম ঠাকুরের আশ্রম তৈরি হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে।

ঠাকুমাকে দিদি ডাকি আমি। দুপুরে দিদির পিঠের ঘামাচি গেলে দিতে দিতে শুনতে পেতাম ফেরিওয়ালাদের ডাক। দূর থেকে কাছে এসে আবার দূরে মিলিয়ে যেত। কত রকম জিনিস ফেরি করত ওরা। এখনো মনে পড়ে তাদের দুপুর রোদের ক্লান্ত গলার উদাস ডাক, শান্তিপুরের তাঁতের শাড়ি এগারো হাত ছ টাকা, চাই আইসক্রিম, ইচামুড়া নারকেলের তক্তিই-ই। কখনো কেনা হত না সবুজ বাক্স থেকে লাল রঙের আইসক্রিম। ওগুলো ছোটোদের খাওয়া বারণ। কিন্তু লোভ হত খুব। বাঁদর নাচ বা ভালুক নাচওয়ালা গেলে ডাক পড়ত বড়ো পিসিমার বাড়িতে। দেখতাম সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে। মজা লাগলেও ওদের গলায় বাঁধা দড়ি বা শেকল দেখে মন খারাপ হয়ে যেত। বড়ো পিসিমা ওদের খেতেও দিতেন।

পান্ডুতে কখনও বাঁদর নাচওয়ালা চোখে পড়েনি। বিহার উত্তরপ্রদেশ থেকে বোধ হয় কত দূরে দেশে জীবজন্তু নিয়ে যাওয়া সহজ ছিল না। তবে একটা ব্যাপারে আসাম টেক্কা দিতে পারত কলকাতা শহরকে। সাপ খেলা! মাথায় লাল পাগড়ি, রংবেরঙের আলখাল্লা আর লুঙ্গি পরা একজন ঘুরে বেড়াত পুরো পান্ডু মালিগাঁও জুড়ে। তার নাম জানি না। মুখে কোন শব্দ ছিল না তার, বাঁশিও বাজাতে শুনিনি। শুধু দু একবার কেরামতি দেখেছি তার। আর দেখেছি যাযাবর বেদের দল তাকে কেমন খাতির করত! আমার বেশ ভয় করত তাকে দেখলে। নীলাচল পাহাড়ে কামাখ্যা মন্দিরের কাছাকাছি জঙ্গলে আর মন্দির চত্বরে অনেক এরকম অদ্ভুত চেহারার মানুষ থাকত। তারা নাকি তান্ত্রিক। মন্ত্র দিয়ে অনেক কিছু করে ফেলতে পারে। তাতে মানুষের ভালো হওয়ার চেয়ে খারাপই হয় বেশি। এখনও খবরের কাগজে দেখা যায় কামাখ্যার তান্ত্রিকদের নানা বিজ্ঞাপন। খরচা করলে নাকি তারা যজ্ঞ টজ্ঞ করে বা মাদুলি দিয়ে যেকোনো গ্রহে সামলাতে পারে, বশীকরণ করে যা ইচ্ছে তাই করিয়ে নিতে পারে মানুষকে দিয়ে। মন্ত্র দিয়ে নাকি মানুষকে মেরেও ফেলতে পারে বা মরা মানুষ বাঁচিয়েও দিতে পারে! মন দুর্বল হলে ওসব বিশ্বাস করে লোকে। বাবা মা বিশ্বাস করতেন না ওসব বুজরুকী। আমরাও মানতাম না ওসব। কাজেই এদের থেকে দূরেই থাকতাম আমরা। সেই লোকটাও নাকি তান্ত্রিক। তার চেহারা দূর থেকে নজরে পড়লেই পালাতাম আমরা। রোগা আর মস্ত লম্বা লোকটার মাথায় খোঁপা করে বাঁধা জটার খানিকটা পাগড়ীতে ঢাকা, বাকিটা পাগড়ীর তলা দিয়ে সাপের মত চলার তালে তালে দুলতো। গোঁফ দাড়ি আর টকটকে লাল চোখে চাউনি ঠান্ডা। সারা গায়ে কালোর ওপর সাপের গায়ের আঁশের মতন ফাটাফাটা দাগ। ভয় পেলেও তার যে কিছু ক্ষমতা ছিল তাতে আমার সন্দেহ রইল না একদিন একটা ঘটনা ঘটার পর। আমি তখন আর একটু বড়ো হয়েছি। আট থেকে পাঁচ বছর বয়সী বন্ধুদের একটা দল ছিল আমাদের আগেই বলেছি। জঙ্গলে পাহাড়ে যাওয়া আর নানারকম দুষ্টুমি বুদ্ধিতে বেশ পাকা হয়ে উঠেছি। মানিকদের বাড়ির গায়ে রান্নাঘর লাগোয়া কতগুলো পোড়ো ঘর ছিল দরমার দেয়াল আর মাটির মেঝের। তার পেছনেই ঘন জঙ্গল। এটা ছিল আমাদের লুকোচুরি খেলার প্রিয় জায়গা, কারণ এখানে খুব দরকার না হলে কাউকে আসতে দেখতাম না। দরমার দেয়ালে নানা জায়গায় বড়ো বড়ো ফাঁক গলে জঙ্গলে পালিয়ে যাওয়া যায়। দরজা জানালার কাঠ ঘূণ ধরে প্রায় ভেঙে পড়েছে। ঘরগুলো নাকি মানিকরা জমি কিনবার অনেক আগে থেকেই ছিল। মাটির মেঝেতেও বড়ো বড়ো ইঁদুরের গর্ত।

একদিন লুকোচুরি খেলতে খেলতে ওই ঘরে ঢুকে বসে আছি। হঠাৎ দরমার ওপার থেকে কানে এল হিস্‌ হিস্‌ শব্দ। নীচু হয়ে বেড়ার তলার ফাঁক দিয়ে যা দেখলাম তাতে গা-হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এল! যেখান দিয়ে উঁকি দিয়েছি তার হাত দুয়েক দুরে বিড়ে পাকিয়ে হাত তিনের উঁচু মাথা তুলে আছে কুচকুচে কালো প্রায় রোগা সুপুরি গাছের মতো মোটা একটা সাপ। বিড়ে থাকায় সে কতটা লম্বা তখন বুঝতে পারিনি। শঙ্খচুর সাপ এর আগে দেখেছি পাহাড়ে, এর পাশে তাকেও ছোটো লাগল। সাপটা বোধহয় কাছাকাছি মানুষ আছে টের পেয়েছিল, কিন্তু দরমার বেড়ার জন্য দেখতে পায়নি। দেখে পালাবো কি, নরবারই ক্ষমতা নেই আমাদের। বেড়ার তলা দিয়ে ঘরে ঢুকতে একটুও কষ্ট করতে হবে না ওকে, নাগালের মধ্যেই আমরা তিনটে প্রাণী। বড়ো হয়ে সাপের সম্মোহন করবার ক্ষমতার কথা জেনেছি, তা যে সত্যি হাড়ে হাড়ে বুঝেছি সেদিন। কতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলাম জানি না, হঠাৎ পাশ থেকে একটা লম্বা হাত সাপটার গলার কাজটা চেপে ধরেই ঝটকা মেরে তুলে নিল। একটু তফাতে গিয়ে দাঁড়াতে দেখি সেই সাপুড়ে বাবাজি। সাপটা এমন ভাবে সারা শরীর দিয়ে তাকে পেঁচিয়ে ধরেছিল যে বেশ কিছুক্ষণ লড়তে হল তাকে। শেষে তাকে ঝোলায় পুরে কোনো কথা না বলে চলে গেল সে। বেঁচে গেলাম আমরা। কিভাবে কোথা থেকে যে সে এল জানি না। না এলে শেষ পর্যন্ত কি হত বলা যায় না। এভাবে আমার একটা পতাকি ফাঁড়া কেটে গেল।

আর একবার তাকে যাযাবরদের আস্তানায় দেখেছিলাম অনেকদিন পরে। ফাঁকা মস্ত বড়ো মাঠ যেখানে খেলতাম আমরা, বছরে একবার দুবার সেখানে কয়েক দিনের জন্য যাযাবরেরা থাকতে আসত। দেখতাম পাহাড়ের গা ঘেঁষে মাঠটার উপর ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে তাঁবু ফেলেছে বেদে যাযাবরেরা। কোথা থেকে তারা এল বা কদিন থাকার পর কোথায় চলে যায় কিছুই জানা ছিল না। খেলা ছেড়ে ঐ অদ্ভুত চেহারার মানুষগুলোর আশেপাশে ঘুরঘুর করতাম। ভীষণ নোংরা থাকত বলে খুব কাছে যাওয়া যেত না, একটু দূর থেকে দেখতাম। বুড়োবুড়ি থেকে ছোটো নানান বয়সের পঞ্চাশ ষাট জন মানুষ। অদ্ভুত তাদের সাজ পোশাক আর চেহারা। তাঁবু গুলোর চেহারাও অন্যরকম। কালো কাপড়ের ওপর লাল সাদা রঙে কত কি ছবি আঁকা। আমাদের ওরা কাছে ডেকে অনেক রকম খেলা দেখাত। সাপের খেলাই বেশি। ম্যাজিকও দেখাত। আমরা দল বেঁধে দেখতাম। যাযাবরদের মধ্যে সবচেয়ে লম্বা চওড়া বুড়ো একজন মানুষ বোধহয় ওদের সর্দ্দার। বেশ ভয় পাবার মতন চেহারা তার। সে হঠাৎ মাঠের মধ্যেই একটা গর্ত থেকে মস্ত লম্বা একটা সাপ টেনে বের করে ফেলল। হলদে আর কালো রঙের এই সাপটাও প্রায় দশ ফুট লম্বা। এর নাম নাকি শাঁখামুটি। প্রথমে কিছুক্ষণ সাপটা যেন একটু ঝিমিয়ে রইল। তাকে কাছে এনে দেখালোও আমাদের। বলল এটার মতোই আর একটা সাপও নাকি এই মাঠেই কোথাও আছে। তখনও সাপটা শান্তই আছে। তার মুখ ফাঁক করে বিষ দাঁতও দেখালো আমাদের। তারপরেই কোনো কারণে সাপটা খেপে গিয়ে ফুলতে লাগল! হঠাৎ অসাবধানে সর্দ্দারের হাত ফসকে মারল এক ছোবল। তারপর সর্দ্দারের চিৎকার করে কান্না আর ভিড়ের গোলমালে সাপটা যে কোথায় পালালো কারো নজরেই পড়েনি। এমন সময় বোধহয় চেঁচামেচি শুনেই কোত্থেকে সেই সাপুড়ে লোকটা হাজির। ওকে আসতে দেখেই বেদের দল তার পায়ে পড়ে গেল। সর্দ্দারের মুখ দিয়ে তখন ফেনা উঠে গেছে।

কাঁধের ঝোলা থেকে কিছু ওষুধ পত্তর বার করে সর্দ্দারকে খাইয়ে সে চলল সেই সাপের খোঁজে। সন্ধে হয়ে যাওয়ায় আমাদের আর কি হল না হল দেখা হল না। পরদিন সকালে দেখি সর্দ্দার নিজের তাঁবুতে বসে গল্প করছে। তার যে কত বড়ো একটা বিপদ হয়েছিল কাল, কে বলবে!

শুনলাম তাকে চিকিৎসা করে বিষ নামিয়েছে সেই সাপুড়ে। তাকে নাকি ভগবানের মতো মানে বেদেরা। সাপটাকেও খুঁজে জুড়ি সমেত বার করা হয়েছে। সাপুড়ে তাকে বস্তায় পুড়ে নিয়ে গেছে। ও যে কোথায় থাকত বলতে পারেনি কেউ। খুব বেশিদিন তাকে দেখতেও পাওয়া যায়নি। সাপ খেলা দেখা তো না সে কখনোও, সে বোধহয় ছিল সাপেদের রাজা।

হিতেন কাকার কাছে সাপের গল্পও শুনেছি অনেক। একটা ছিল খুব ভয় পাওয়ানো! চানের ঘরে ঢুকলেই জলভরা বড়ো ড্রামটার দিকে নজর চলে যেত! ভালো করে কোনের দিকগুলো দেখে টেখে তবে দরজা বন্ধ করতাম।

ডুয়ার্সের কোন এক চা বাগানের কোয়ার্টারে থাকতেন হিতেন কাকারা। তাঁর বাবা ওখানে ম্যানেজার। টংঘরের মতো মোটা মোটা খুটির ওপর কাঠের বাংলো বাড়ি। বাঘ বা অন্য জন্তুর ভয়ে খাড়া কাঠের মইভে ওঠানামা করতে হত। আশেপাশে ঘন জঙ্গল। একদিন হিতেন কাকার বাবা বিকেল বেলা চান করতে ঢুকেছেন। চানের ঘরে বড়ো বাথটবে জল ভরে দিয়ে গেছে ভারি। গরমের দিন বলে জানালা খোলাই আছে। তাঁর অভ্যাস ছিল অনেকক্ষণ ধরে গা ডুবিয়ে বসে চান করা। বিকেলের আলো কমে সন্ধে হয়ে এসেছে। উনি বাথটব থেকে উঠে বসতেই জলের মধ্যে থেকে ডাবের মত বড়ো কি একটা ভেসে উঠল। তারপর আস্তে আস্তে বেশ মোটা একটা ময়াল সাপ ধীরে ধীরে পিছলে নামতে লাগল টব থেকে। চানঘরের দরজার দিকেই চলেছে সে। পরে মাপ নিয়ে দেখা গেছে আঠারো ফুটেরও বেশি লম্বা সে। কোনমতে জানালা দিয়ে ঝোলা কাঠের বারান্দায় নেমে প্রাণে বাঁচেন হিতেন কাকার বাবা। ভয়ে তাঁর নাকি মুখ দিয়ে কথা বার হচ্ছিল না। অনেক লোকের চেষ্টায় গুলি করে মারা হয় সাপটাকে! তারপর থেকে আর বাথটবে চান করেননি তিনি। অত বড়ো সাপের সঙ্গে মোটাসোটা মানুষটা বাথটবে আঁটলেন কি করে তা নিয়ে অনেক হাসাহাসি হয়েছিল। তাঁর মতে সাপটার ও গরম লেগে চান করার ইচ্ছে হয়েছিল, চানের আরামে অত কিছু বোঝা যায় না। সে বোধহয় সাবান মাখার ঠ্যালায় পালাবার পথ খুঁজছিল, তাকে মারা মোটেই উচিত হয়নি। সে তো কোন ক্ষতি করতে চায়নি! বরং দেখা দরকার তাকেও সাবান মাখিয়ে অজান্তে কোন ক্ষতি করে দেওয়া হল কিনা। তবে সে বিশেষ আপত্তিও করেনি। বিখ্যাত শিকারি জিম করবেটের লেখায় পড়েছি, তাঁর জীবনেও প্রায় একই রকম ঘটনা ঘটেছিল। সেখানে চানের জায়গাটি ছিল তুলনামূলক ভাবে আরও ছোটো একটা গামলা, সাপটি ছিল ভয়ানক বিষাক্ত এক বড়ো মাপের গোখরো। সাবানের ফেনায় বোধহয় বিব্রত হয়েই সাপটা ছোবল দিতে পারেনি। তার মানে সাবানের পরিষ্কার করা ছাড়া আরও নানা রকম উপকারিতা আছে।

পাণ্ডুতে অনেক অদ্ভুত কান্ড ঘটতে দেখতাম। একজন রোজ সকালে খবরের কাগজ দিতে আসতেন। তাঁর দুই ছেলে খেলত আমাদের সঙ্গে। খবর পেলাম ওদের বাবা নাকি মস্ত বড়ো একটা ঘুড়ি তৈরি করেছেন। কদিন পরে তাকে ওড়ানো হবে। ওদের বাড়িতে অনেক উঁকি ঝুঁকি দিয়েও কিছু দেখতে পাওয়া গেল না। পরে শুনলাম রেলের কোন গুদামে সেটা তৈরি করে রাখা হয়েছে। এখন চলছে তার সুতো তৈরি করা। কত দিন লাগবে ওড়াতে কে জানে? আমরা দল বেঁধে ভদ্রলোককে চেপে ধরলে উনি খালি মুচকি হেসে বলেন সবুর করো, দেখতে পাবে। এমন ঘুড়ি কেউ কখনোও দেখে নি। আমরা দম বন্ধ করে অপেক্ষায় রইলাম।

সে ঘুড়ি উড়ল শেষ পর্যন্ত! এমন ঘুড়ি দেখিনি তো বটেই, শুনিওনি! দশ বারো ফুট চওড়া আর পনেরো ষোল ফুট লম্বা বিশাল চেহারা তার। কাগজের বদলে মোটা ক্যানভাসের কাপড় টানটান করে মোটা বেত আর বাঁশের গায়ে বাঁধা হয়েছে লোহার মোটা তার দিয়ে। একটা চওড়া রবারের ফিতে একোন থেকে ওকোন টান করে কেন বাধা তখন বুঝতে পারিনি। লেজের বাহার দেখেও অবাক হলাম। পাটের তৈরি দুটো লেজে দশ বারোটা পুতুল ঝুলছে! মাঝে একটা ঝোলা পকেটে পাথর পোরা হয়েছে যাতে গোল চককর না মেরে ঘুড়ি সোজা থাকে। নারকোলের আর বেতের আঁশ পাকিয়ে তৈরি হয়েছে দড়ি। তাঁর দুই ছেলে পাহাড়ের উপর ঘুড়ি নিয়ে উঠে গেল ধরিয়ে দেওয়া ‘ধরাই’ দেওয়ার জন্য। ভদ্রলোক মাঠের মধ্যে বড়ো ইলেকট্রিক তার পেঁচানোর লাটাই নিয়ে তৈরি। আমরাও তৈরি দম বন্ধ করে।

বিকেলের দিকে ব্রহ্মপুত্র থেকে জোরালো বাতাস বয়। সেই বাতাসে ঘুড়ি ছাড়তেই হাফপ্যান্ট পরা লোকটি ছুটলেন মাঠ দিয়ে, পিছু পিছু একশ দেড়শো লোকও ছুটলো। ঘুড়ি আকাশে উঠে যাবার পর সুতোর টানে তাকে সামলানো মুশকিল হল। সুতো ধরে রাখতে না পেরে উনি ছেড়ে দেওয়ার পর অত ভারী লাটাইও গড়গড়িয়ে ছুটল উল্টোমুখি। তার তলায় চাপা পড়তে পড়তে কোনমতে পালিয়ে বাঁচলাম আমরা। কি তার গোঁ গোঁ আওয়াজ। এবার বুঝলাম রবারের ফিতে কেন বাঁধা হয়েছে। ছেলে দুটো এতক্ষণে ভয়ে ভয়ে নেমে এসেছে পাহাড় থেকে। ওদের নিয়েই নাকি উড়তে চাইছিল ঘুড়িটা! কোন রকমে পালিয়ে বেঁচেছে।

কয়েক হাজার লোক দেখতে পেয়েছিল ঘুড়িটা অনেক দূর থেকে। পুলিশ এসেছিল খবর নিতে। সেদিন রাত হয়ে যাওয়ার পরেও নামানো যায়নি সে ঘুড়ি। সারারাত ধরে শুনতে পেতাম তার গোঁ গোঁ আওয়াজ। বাবলি ভয় পেয়ে বলত রাক্ষস কাঁদছে! বাবলি ঘুড়িটাকে জ্যান্ত ভেবে রাক্ষস নাম দিয়েছিল ওর। অন্ধকার রাতে ওই আওয়াজ শুনে ভালো লাগত না আমারও। দাদা বড়ো হয়ে গিয়েছিল বলে ওর কিছু মনে হত না। আমাদের বিস্ময়ের অন্ত ছিল না, পড়াশুনা খেলাধুলা মাথায় উঠেছিল। দু’দিন টানা আকাশে আপনিই উড়বার পর বৃষ্টিতে ভিজে সে ঘুড়ি ভেঙে পড়ে। ভদ্রলোকের খুব নাম হয়ে গেল এই ঘটনার পর।

হাফ প্যান্ট পরা ছেঁড়া গেঞ্জি গায়ের মানুষটিকে আজও পরিষ্কার মনে আছে। তার সচরাচর কথা না বলা মুখটার মধ্যে চোখ দুটো ঝকঝক করত। সারাদিন আকাশমুখো হয়ে চোখ দুটো কি যে খুঁজতো আমরা হদিস করতে না পেরে অবাক হয়ে চেয়ে থাকতাম। তার ছেলে দুটো আমাদের বয়সী হলেও কথাবার্তা বলত না বিশেষ, পাত্তা দিত না। বাবার ওই অদ্ভুত কাজ কর্মের জন্য বোধহয় গর্ব ছিল ওদের মনে। আমিও তার পাশে আমার ব্যাংক ম্যানেজার বাবাকে কল্পনায় দেখে বড়ো হতাশ হতাম। যদিও আমার বাবা গান গাইতেন দারুণ, ছবি আঁকতেন, অভিনয় করতেন দুর্দান্ত! তবে অমন ঘুড়ি তো ওড়াতে পারত না! ফলে বেঁটে কালো উস্কো খুশখো চুলের লোকটার ওপর আমাদের একটা অন্যায় রকম পক্ষপাতিত্ব ছিল।

নিজ হাতে তৈরি তার থাকবার ঘরটি ছিল অদ্ভুত। পাথর, বাঁশ, দরমা, টিন আর ত্রিপল কি নেই তাতে! বেতের দড়ি দিয়ে খান ছয় শাল খুঁটির ওপর কষে বাঁধা সে ঘর ঝড়ের হাওয়ায় উড়ে যেতেও দেখেছি। তাতে অবশ্য তিনি দমে যাওয়ার পাত্র ছিলেন না। আবার নতুন করে বাঁধা হয়েছিল সেই আশ্চর্য ঘর। এখন আফশোশ হয় একজন সত্যিকারের দার্শনিক ছোটোবেলায় ঠিক চিনতে পারিনি।

এরপরেও একটা বাকসো ঘুড়ি তৈরি করেছিলেন উনি, সেটা তত বড়ো না হলেও ভালো লেগেছিল আমাদের। শেষে রিটায়ার করে একটা ঘুড়ির দোকান খুলেছিলেন তিনি, আমরা ঘুড়ি কিনতাম ওখান থেকে। ওগুলো তেমন বিশেষ ভালো দেখতে না হলেও উড়ত ভালোই, ছোটো মাপের বলে দামেও ছিল সস্তা।

বাবার ব্যাংকে চাপরাশির কাজ করা রমেশ কাকার কাছেও নানা রকম গল্প শুনতে পেতাম। কোনও কোনওটা বেশ গা ছমছম করা। তখন অত সত্যিমিথ্যের বিচার করতে শিখিনি, যা বলত সবটাই বিশ্বাস করতাম। ভূত পেত্নীর গল্প তো ছিলই, বুনো জন্তুদের কথাও ছিল অনেক। ওগুলো কিন্তু বানানো বলে মনে হয় না। কারণ এই দু হাজার উনিশ সালেও নীলাচল পাহাড়ে বাঘ বার হবার কথা শোনা যায়। খবরের কাগজে ছবিসহ খবর হতেও দেখেছি। কেউ কেউ তাদের হাতে মারাও পড়েছে। তবে বড়ো কুলিন বংশের রয়াল বেঙ্গল নয়, তারা ছিল চিতাবাঘ। অসমীয়া নাম নাহরফুটুকি! এরা মানুষখেকো না হলেও বেজায় হিংস্র। মানুষকে বিশ্বাস করে না একটুও। মুখোমুখি হলে আচমকা ঝাঁপিয়ে পড়ে আঁচড়ে কামড়ে ঘায়েল করে ফেলে নিমেষের মধ্যে।

রমেশ কাকা কামাখ্যা পাহাড়ের বাসিন্দা। অফিস থেকে ফেরার পথে রাত হলে ভয় পেয়ে যেত। অনেকবার বাঘের দেখা পেয়েছে ও। পান্ডাদের ঘরের লোক বলে মা কামাখ্যার উপর অগাধ আস্থা। হাতে তিন ব্যাটারির টর্চ আর কাঠকুঠোর মশাল জ্বালিয়ে পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে মা কামাখ্যার নাম জপ করতে করতে বাড়ি পৌঁছে যেত রোজ। ভয় করে কিনা জিজ্ঞেস করলে বলত, ভয় কী! মা কামাখ্যা আছেন, তাছাড়া তাঁর ডাকিনী যোগিনীর দল পাহারা দিয়ে নিয়ে যায়! বাঘ কী করতে পারে?

শুনে আমরা ভয়ে জড়োসড়ো। বুকের ধুকধুকনি চেপে জিজ্ঞেস করতাম ডাকিনী যোগিনীদের তুমি দেখতে পাও? রমেশ বর্মন কাকা ওদের কক্ষনো ভয় পেত না, গলার আওয়াজ কখনো চড়ত না, বেজায় শান্ত মেজাজের লোক। বলত, দেখতে পাই বই কি! আমাকে চারদিক থেকে ঘিরে নিয়ে তারা চলতে থাকে, দেখব না? লম্বা লম্বা ছায়ার মত তারা। ফিসফিস করে বাতাসের শব্দে তারা কথা কয়, স্পষ্ট শুনতে পাই। ঝোপের মধ্যে বাঘের সবজে চোখ জ্বলজ্বল করে, বাঘের গায়ের গন্ধ পাই। দূর থেকে কাঠ চেরা শব্দের মত ডাক শুনতে পাই। তবু ঐ ডাকিনী যোগিনীদের ভয়ে বাঘ কাছে আসে না। তার ওপর টর্চ আছে হাতে। মুখের ওপর আলো ফেললেই জব্দ! তবে একবার হয়েছিল বিপদ! সেটা ছিল বিষ্টির দিন।

রমেশ কাকা শান্ত মুখে অনেকটা সময় দূরের পাহাড়ে চূড়ার দিকে চেয়ে থেকে চুপ করে যেন মনে মনে সেই দিনটায় পৌঁছে গেছে। তারপর চাপা গলায় বলতে শুরু করল। কথা বলার সময় ওর চোখের পাতা পড়ে না।

শেষ বর্ষায় পুজোর আগের একদিন কাজ থেকে ছুটি পেতে সন্ধ্যে হয়ে গেল। দুপুরে শিলাবৃষ্টি হয়ে যাওয়ার পর বেশ ঠান্ডা পড়ে গেছে। বৃষ্টি তখনও হচ্ছে ঝিরঝির করে, মাঝে মাঝে দমকা বাতাস হাড় কাঁপিয়ে দিচ্ছে। ছাতা মাথায় দিয়ে চলেছি পা টিপে টিপে। পাথুরে সিঁড়ি পথের আগে কামাখ্যা কলোনির লাল মাটির পথটা পিছল হয়ে আছে, পড়ে গেলেই বিপদ। বোধহয় অমাবস্যা ছিল, ঘুটঘুটে অন্ধকার চারিদিকে। টর্চের ব্যাটারীর তেজ কমে এসেছে। সিঁড়ির কাছে থমকে দাঁড়িয়ে মা কামাখ্যার নাম নিয়ে চড়াইবে উঠতে শুরু করলাম। নরকাসুরের আমলের সিঁড়ি। কত হাজার বছরের পুরনো কে জানে! এবড়ো খেবড়ো পাথর টানা বৃষ্টিতে ভিজে পেছল হয়ে আছে। পা টিপে টিপে চলতে হচ্ছে। পিছলে পড়লে মরতে হবে। ভেজা ধারালো পাথরের কোনায় পা লাগলে কেটে যাবে। কমে যাওয়া টর্চের আলোয় নজর চলছে না ভালো, বৃষ্টি ভেজা কাঠে মশাল জ্বালতে পারিনি বলে খুবই অসুবিধে হচ্ছে। তবু মা কামাখ্যার নাম জপ করতে করতে পথ চলছি। মেটে পথ আর সিঁড়িপথের মোড়ে মস্ত বড়ো গাছটার কাছে পৌঁছতেই বৃষ্টির তোড় বেড়ে গেল। পাথুরে সিঁড়ি ঢাল বেয়ে ঝরণার মত জলের স্রোত নেমে আসছে, পা ফেলতে যাওয়া মানে মরণকে আদর করে ডেকে আনা। ওখানকার খাড়াই কেমন জানো তো! মেটে রাস্তায় যেতে পারতাম, কাদা হলেও বিপদ কম। গেলাম না। ওদিকে আবার শ্মশান! দিনের আলোতেই কত কি দেখা যায়, আজ তো অমাবস্যার রাত! পা যেতে চাইল না। চুপ করে রইল রমেশ কাকা। কি যে ভাবে নিজের মনে?

তোমার ডাকিনী যোগিনীরা ছিল না?

আমার কথা শুনে হাসল কাকা। মা কামাখ্যার নাম করে মশাল জ্বাললে তবে তো তারা আসবে। ওরা থাকলে আর চিন্তা ছিল কি! বর্ষার মধ্যে মশাল জ্বালব কী করে, তাই তারাও নেই! ঘুরঘুট্টি অন্ধকার বনে ওপর ঝামটা বৃষ্টির মাঝে আমি একা!

জলের স্রোতে দাঁড়িয়ে থাকাও মুশকিল! অন্ধকারে গাছের ডালগুলোয় হাওয়ার চাপে মড়মড় করে শব্দ হচ্ছে। গাছের মাথাগুলো তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে ঝড়ে। এখানে দাঁড়ানোটা উচিত হচ্ছে না। গাছের গোড়ায় নরকাসুরের মূর্তি খোদাই করা গোল পাথরটার ডান পাশে ক’ধাপ সিঁড়ি ভাঙলে পুরনো গণেশ মন্দির। ওর ভেতর ঢুকলে মাথাটা বাঁচে।

মন্দিরে ঢোকার মুখে বিপদের ওপর বিপদ টর্চের ব্যাটারি গেল ফুরিয়ে! আর কোথাও কোন আলো নেই। মন্দিরের দরজায় কোন কপাট নেই। ঢুকতে গিয়ে থমকে গেলাম! নাকে কিসের গন্ধ পাচ্ছি! মস্ত গণেশ মূর্তির পাশে কয়েক জোড়া সবুজ চোখ! সর্বনাশ, কদিন ধরেই দুটো ছানা নিয়ে একটা বাঘিনীকে ঘুরতে দেখেছে অনেকে। তারাই বৃষ্টি বাদলায় আশ্রয় নিয়েছে মন্দিরের মধ্যে। হঠাৎ পায়ের তলার মাটিটা কেঁপে উঠল, টলে পড়লাম পাশের ঝোলা বড়ো ঘণ্টাটার ওপর! ভূমিকম্প! তার সঙ্গে আচমকা ঘণ্টার শব্দ শুনে আমাকে ধাক্কা দিয়ে বাইরে পালালো তারা। এক ঝলক বিদ্যুতের আলোয় চিতা আর ওর ছানাদের দেখতেও পেলাম। ভূমিকম্প, গণেশ বাবা না ঘণ্টার শব্দ কে যে বাঁচালো আমাকে! সকালের আগে আর মন্দিরের বাইরে যাইনি!

শুধু ডাকিনী যোগিনী আর বাঘের গল্প নয়, আরও অবাক করা গল্প শুনতে পেতাম রমেশ কাকার কাছ থেকে। স্কুলে তখনও ভর্তি হইনি বলে দুপুরবেলা দরজা খুলে পৌঁছে যেতাম ওর কাছে। এমন কিছু দূরেও নয়, দোতলারই কয়েক হাত তফাতে বাবার ব্যাংকের সদর দরজা দিয়ে ঢুকেই টুলে বসে থাকত সাংবিরপুন দাদা আর রমেশ কাকা। মা অবশ্যই আমার ওপর কড়া পাহারাদারির কথা বলে রেখেছিলেন ওদের, আর আমি গল্প শুনতে পেলে আর দুষ্টুমি করতাম না। তাই গল্প না বলে ওরা করেই বা কি?

নামকরা জাদুকর পিসি সরকার এলেন ব্যাংকে বাবার সঙ্গে দেখা করতে। উনি এসেছিলেন গৌহাটিতে ম্যাজিক দেখাতে, বাবার নাম শুনে নিজেই চলে এলেন। বাবার সঙ্গে তাঁর নাকি বন্ধুত্ব ছিল কম বয়সে। বাবার অতো সুন্দর চেহারা আর অভিনয় ক্ষমতার জন্য তাঁর অ্যাসিস্ট্যান্ট হতেও অনুরোধ করেন। বাবা ব্যাংকের চাকরি ছাড়তে রাজি হননি। বাবার কাছে তাঁর অনেক গল্প শোনা ছিল। মা গেলেন দেখা করতে। আমরাও চুপি চুপি দরজার ফাঁক দিয়ে উঁকি মেরে দেখলাম। দিদি বলেছিল দেখতে পেলে যদি ভ্যানিশ করে দেয়! তাই সামনে যেতে সাহসে কুলোয়নি। বাবলি তো তখন জাপানি পুতুলের মতো দেখতে, শান্তশিষ্ট। ওকে কোলে নিয়ে আদর-টাদর করলেন, মা-বাবার সঙ্গে অনেক গল্প করে চলে গেলেন। সেদিন তাঁর গৌহাটির কোন হলে ম্যাজিক দেখানো ছিল বলে থাকতে পারেননি। আমার মনে আছে সোনালি ঘড়ি, হাত নেড়ে কথা বলা আর হা হা করে হাসি। পরে ম্যাজিক দেখতেও গিয়েছিলাম বাবা-মায়ের সঙ্গে। হল ভর্তি অত আলো জাদুকরের পোশাক মাথার পাগড়ী আর একটার পর একটা অবাক করা খেলা দেখার পর চোখে আর মাথায় যেন ধাঁধা লেগে গেছিল। বাড়িতে এসে আমিও ম্যাজিক দেখাবার চেষ্টা করেছিলাম কয়েকদিন। আমার ওয়াটার অফ ইন্ডিয়া দেখানোর ঠ্যালায় ঘর মুছে মুছে মা ক্লান্ত হয়ে বকুনী দিয়ে আমার ম্যাজিক ছাড়ালেন। ফলে ভারতবর্ষের আরো একটি যশোপ্রার্থী জাদুকরের অপমৃত্যু ঘটলো অংকুরেই।

পরদিন বাড়ির সামনের রাস্তায় চোখ বাঁধা অবস্থায় মোটরসাইকেল চালিয়ে যেতে দেখেছিলাম জাদুকর পিসি সরকারকে।

লিখতে গিয়ে মনে পড়ে গেল মাসি সরকারের কথা!

তখন এমন একটা ধারণা ছিল জাদুকর হলে তাকে সরকার হতেই হবে। অন্তত আমার মত ছোটোদের মাথায় ঐরকম সরকারি ব্যাপার ছিল তাতে আমার সন্দেহ নেই। কালনায় আমার মামা বাড়ি। ছোটোবেলায় ছুটিছাটায় বাবা আমাদের ওখানে নিয়ে যেতেন। পুজোর সময় ওখানে একজন জাদুকর এলেন ম্যাজিক দেখাতে। পুজোর প্যান্ডেলে খেলা দেখাবেন। গ্রামের ব্যাপার, ছোটোখাটো প্যান্ডেল। জাদুকরও ছোটোখাটো মানুষ। সরকারকে দেখার পর আমার তো চোখেই লাগছে না। স্টেজ নেই, আলো নেই, কড়া রোদ্দুরে মাঠের উপর খেলা। কালো রঙের পোশাক আর টুপি পড়ে কালো কুলো মানুষটাকে দেখে মন খারাপ হয়ে গেল আমার। ছোটোমামা ছিল পাশে। জাদুকরের নাম জিজ্ঞেস করতে জবাব পেলাম মাসি সরকার। খেলাগুলো অত মনে নেই, নামটা মনে থেকে গেল।

মা-বাবা আমাদের কাজকর্মে বাধা দিতেন না খুব একটা। আমি তখনও স্কুলে ভর্তি হইনি বলে বাড়িতে মায়ের কাছে সকাল সন্ধ্যায় পড়তে বসতাম। পড়া শেষ করে কি করি কি করি ভাব মনের মধ্যে। বাবা গল্পের বই কিনে দিতেন। নতুন কোন ছোটোদের বই বার হলেই আমরা পেয়ে যেতাম। কাড়াকাড়ি করে পড়া হয়ে যেত দু-তিন দিনের মধ্যেই। দুপুরে ঘুমানোর সময় মা গল্প বলতেন। গল্পের বই পড়ে শোনাতেন। আমি আর বাবলি মায়ের দু’পাশে শুয়ে শুয়ে শুনতাম। মা ঘুমিয়ে পড়লে আমার মাথায় নতুন নতুন পোকা নড়ে বেড়াতো। মাঝে মাঝে চলে যেতাম রমেশ কাকা আর সাংবিরপুন দাদার কাছে। মাঝেমাঝে তিন তলার ছাদে উঠে পাহাড় জঙ্গল আকাশ মেঘের আনাগোনা দেখতাম। ছাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে লাট্টুর মত ঘুরপাক খেলে চারপাশের সবকিছু আশ্চর্য লাগত, বেশ মাথাও ঘুড়তো। তো তখন চুপ করে দাঁড়ালেও ঘূর্ণিটা থেকে যেত চোখে আর মাথার মধ্যে! সে এক মজা! বোনটাকেও শিখিয়ে দিলাম। ও খুব খুশি। মাকে দেখাতে গিয়ে বকুনি খেলো খামোখা। ছাদের ওপর গড়াগড়ি খেতেও শিখিয়েছিলাম। ছাদের খড়খড়ে মেঝেতে চক দিয়ে ছবি আঁকতে শুরু করলাম। আরো ছোটোবেলায় ছবি আঁকা শুরু হয়েছিল কলকাতায় থাকার সময়। আমার তখন বছর দুই আড়াই বয়স। বোন সবে জন্মেছে বলে আমাকে সামলে রাখতে বাবার টোটকা। বেশ কাজে লেগে গেছিল বলতেই হবে। শুধু মেঝেতে আঁকা নয়, একে খালি গায়ে তার উপর গড়াগড়ি দিলে গায়ে সেই চকের দাগ উল্টো হয়ে ফুটে উঠত। তারপর সেই বডি পেইন্টিং আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দেখা। মজা কম নয়। এখন অবাক হয়ে ভাবি ছাপার নিয়মটাও তো তাই! সোজা, ক্যামেরা আর ব্লকে উল্টো, আবার কাগজে ছাপার সময় সোজা। অফসেটেও তাই! ক্যামেরা, প্লেট, ব্ল্যাঙ্কেট, কাগজ। সোজা – উল্টো – সোজা। তখন তো খেলাই ছিল মাথায়। দরজার ফুটো দিয়ে বাইরের আলো দেওয়ালে পড়ত উল্টো ছবি হয়ে। ঘর অন্ধকার করে এই উল্টো ছবি দেখতে শেখাও ওই সময়। ছোটোবেলার দেখার চোখটাই আলাদা। সবাই ছোটোবেলায় একই রকম কৌতুহল নিয়ে জন্মায়।

আমার ছবি আঁকার ধুম নজরে পড়ল বাবা আর মায়ের। ছবি আঁকলেই হবে না, খাতার কাগজে এঁকে রঙ দিতে হবে। যাতে সে ছবি থেকে যায়। ভালো কাগজে বাঁধানো খাতা এল রঙের বাক্স এল। বাবা সে খাতার নাম দিলেন হাত চুলবুল খাতা। বইগুলোর মত এই খাতাও আমার একার নয়, যখন যার ছবি আঁকতে ইচ্ছে করবে, এই খাতায় এঁকে রাখতে হবে। এক নম্বর খাতা ফুরিয়ে গেলে দু’নম্বর খাতা এল। তারপর তিন। ছবি আঁকার জোয়ার বয়ে গেল বাড়িতে। আমাদের সঙ্গে সঙ্গে বাবাও আঁকতেন সময় পেলেই। দাদা এঁকে ফেলল একটা শুয়োর। যার লেজটা স্রপ্রিংয়ের মতো পাকানো। ভালোই হয়েছিল মনে হয়, নইলে এতদিন বাদে মনে থাকে? তারপর উৎসাহ বেড়ে যাওয়ায় বাড়িতে কেউ এলেই তার সামনে খাতা খুলে ধরতাম, আঁকো ছবি। মনে আছে রেলের হাসপাতালের একজন ডাক্তার এসেছিলেন বাবার সঙ্গে দেখা করতে। তাঁকে দিয়েও আঁকিয়েছিলাম। পাস ফেরা একটা মেয়ের মুখ এঁকেছিলেন। ভালোই, তবে নাকটা বেজায় লম্বা! দিদি আর বাবলির ঝোঁক ছিল ফুল আর আলপনার দিকে। বাবার আঁকা ছবিগুলো বড়ো ভালো হয়েছিল। যেমন আঁকা তেমনি রং! নীলচে সবুজ জলে লাল নীল মাছ খেলা করছে। আর এঁকেছিলেন মায়ের ছবি। শুয়ে শুয়ে বই পড়ছেন। নাম দিয়েছিলেন বিদুষী ভার্যা। আর একটা কানকাটা হাতির ছবি বোধ হয় আমার জ্যাঠতুতো দাদা হাবলুর আঁকা। খাতাগুলো ছিল অনেক বছর আমার কাছে। অনেক পরে সোনারপুরে আমার দোতলার ঘরে আগুন লেগে পুড়ে যায় আরো অনেক কাগজপত্রের সঙ্গে।

ছোটো খাতার পর এল বড়ো কাগজ। ছোটো হাতে বড়ো মাপের ছবি আঁকা বেশ ঝামেলার। প্রথম বড়ো ছবির আমার নাম দিয়েছিলাম মায়াকানন। পরেরটা পায়রার সংসার।

বাবা আমাকে স্কুলে ভর্তি করার জন্য উঠে পড়ে লাগলেন। বাবার থেকে বোধ হয় মায়ের তাগিদ বেশি ছিল। বাড়ির লেখাপড়া তো চলছিলই, এবার দাদা দিদির সঙ্গে ইস্কুলে যেতে পারবো ভেবেই মনটা খুশি হয়ে গেল। গেলাম ক্লাস টু তে ভর্তি হতে, ভর্তি হলাম ফোর এ। ভর্তির বর্ণনাটা না দিলেই নয়।

মা একদিন খাতা পেন্সিল আর এক বোতল দুধ নিয়ে আমার হাত ধরে লম্বা স্কুলবাড়ির কোণার একটা ঘরে বসিয়ে দিলেন। আমি যেন অথৈ জলে পড়লাম। মাস্টারমশাই কাকে বলে জানি না, কি করতে হবে আমাকে তাও জানা নেই। একজন বুড়ো মানুষ আমায় বসিয়ে দিলেন একদম পিছনে জানলা ঘেঁষা একটা বেঞ্চে। তারপর তিনি কত কি কথা বললেন শুনতেই পেলাম না। তারপর দেয়ালে লাগানো কালো একটা কাঠের গায়ে কত কি লিখতে শুরু করলেন দেখতেই পেলাম না। আমার সামনে একজন প্রায় বাবার মত বড়ো চেহারার লোক বসেছিল। আমি দেখলাম তার পিঠটা। লিখবার কথা কেউ বলেনি, আমিও কিছুই লিখিনি। নিশ্চিন্তে জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে পেন্সিল চিবিয়েছি। ক্লাসঘরের গন্ধ যে কি বস্তু ওই দিন বসে বসে খুব বুঝেছিলাম। বেশিরভাগ ছেলে বোধ হয় পেট পরিষ্কার এর ব্যাপারে মন দেয় না। আর নানা রকম গন্ধের সঙ্গে ঘাম, সরষের তেল, ছোলা মটর চিবানোর গন্ধ আর দরজা জানালায় নতুন লাগানো রঙের গন্ধ। এইসব মিশে আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে এল। দরজার ওপাশে হঠাৎ মাকে দেখলাম, দূর থেকে আমার খাতায় উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করছেন। তারপর ওই বুড়ো মানুষটিকে ডেকে কিছু বলার পর তিনি এসে আমার খাতা দেখে অবাক। এ কি, তুমি কিছু লেখ নাই? আমিও অবাক। কি লিখবো? উনি কালো কাঠের গায়ের লেখা গুলোর দিকে দেখালেন। ওই তো কি লিখবে ওইখানে প্রশ্ন লেখা আছে দেখো নাই? আমি যে সামনের লোকের পিঠ ছাড়া কিছুই দেখতে পাইনি বলার পর আমার জায়গা হল একদম প্রথম বেঞ্চে। তখন বোধহয় সময় প্রায় ফুরিয়ে এসেছে। কোথায় যেন একটা ঘণ্টা বাজছে। তার মধ্যেই প্রায় শেষ করে ফেললাম লেখা। আটকালাম রচনা লেখায়, লিখতে বলা আছে গোরু রচনা। আমি লিখতে চাই বেড়াল। তারপর অবশ্য অনেক বুঝিয়ে বলার পর গোরুই লিখলাম। ঘণ্টা পড়ার আগেই আমার লেখা শেষ। তারপর হেডমাস্টার মশায়ের কাছে উনিশের নামতা মুখস্ত বলার পর ভর্তি হলাম টু এর বদলে ক্লাস ফোরে।

প্রথম যে দিন স্কুলে যাই সে কথাও ছবির মতো মনে আছে। আমি মোটেও খুব একটা ভালো মানুষটি ছিলাম না। অবশ্য মুখ দেখলে নাকি তা বোঝা যেত না। একটা ঘরে পঞ্চাশ ষাটটা ছেলে মাস্টারমশাই না থাকলে যে কী লংকা কান্ড করতে পারে তা আমার আগে জানা ছিল না। দেখে আমি বেচারার আনতারা ফুসকুলিয়ে উঠল।

একটা ছেলে আমার মাথা ডিঙিয়ে লাফ দিল ছড়া বলতে বলতে। সেই আমপাতা জোড়া জোড়া ছড়াটা। আর সে কি গন্ধ! আমি বোকার মতো বসে রইলাম। হঠাৎ যেন মন্ত্র বলে সবাই চুপ করে গিয়ে উঠে দাঁড়ালো! আমি তো জানি না বড়ো কেউ ক্লাসে ঢুকলে উঠে দাঁড়াতে হয়, ফলে বসেই আছি বোকার মতো।

লম্বা, রোগা, খুব রাগী দেখতে একজন লোক বেত হাতে আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই পাশের ছেলেটা আমায় টেনে তুলে দাঁড় করিয়ে বলল, “ও আজকেই ভর্তি হইলো স্যার, কিচ্ছু জানে না।” বেত নামিয়ে আমার দিকে কড়া চোখে চেয়ে গলায় গড় গড় শব্দ করতে করতে তিনি চেয়ারে বসে খাতা খুললেন। পাশের ছেলেটার নাম হোদল। ভালো নাম অচ্যুৎ চক্রবর্তী। হোদল কানে কানে বলল “নাম ডাকবে। তোর নাম বললে দাঁড়িয়ে বলবি উপস্থিত।”

শুরু হয়ে গেল আমার স্কুল জীবন। প্রথম দিনেই অনেকটা বড়ো হয়ে গেলাম। হোদলের সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়ে গেল। তারপর একে একে বিশ্বনাথ, সনৎ, বেনুলাল, সঞ্জীব, বিপ্লব, অমরেশ, ক্যাবলা আরও কত বন্ধু পেলাম। মাস্টারমশাইদের কথা যত কম বলা যায় তত ভালো। বেত হাতে ঐরকম রাগী মানুষেরা ছেলেদের পড়াশুনো করাবেন কী, গায়ের জোর আর অকারণ অহংকার ফলাতে ব্যস্ত থাকতেন। বই থেকে মন আপনিই উড়ে যেত। স্কুলের সময়টা খাঁচার পাখির মত ছটফট করে বেরানো সকলের সঙ্গে আমিও অকারণে মার খেয়েছি কত! ব্যতিক্রম ছিলেন একজন, লালমোহন স্যার। বাকিদের ফ্যাসিস্ট ছাড়া আর কিছু বলা যায় না। মন দিয়ে না পড়িয়ে বেতের পর বেত ভাঙাই কাজ ছিল ওদের। পড়া পারতাম বলে কম মার খেলেও পাইকারি মার থেকে বাঁচাবে কে? কিছু না করেও পুরো ক্লাস নীল ডাউন বা বেঞ্চের ওপর সবাইকে দাঁড় করিয়ে একধার থেকে বেত মারার কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যেত না। পরমেশ স্যার, সতু স্যার আর অশোক স্যার অবশ্য কখনও পড়াননি তাই মারও খাইনি কখনও। ঘোর কালো, লম্বা, গোল চশমার হেড স্যার সাতেও থাকতেন না পাঁচেও না। গলার আওয়াজ শুনেছিলাম শুনেছিলাম শুধু প্রথম দিন। উনিশের নামতা বলার সময়। অশোক স্যার উঁচু ক্লাসে ইতিহাস পড়াতেন। ছেলেরা বলত বিন্দুসারের পুত্র অশোকস্যার। ছেলেদের উদ্ভাবন শক্তির তুলনা নেই!

ভালো লাগত লালমোহন স্যারকে। নোয়াখালির লোক, মুখের ভাষা বুঝে ওঠা মুশকিল। নিজে আঁকতে পারতেন কিনা জানি না তবে আমাদের উনি ছবি আঁকার ক্লাস করাতেন। ইনিই প্রথম পরীক্ষায় আমায় জোর করে গোরুর রচনা লিখিয়ে ছিলেন। তাঁকে কখনও রাগ করতে দেখা যায়নি। বড়ো আপন মনে হত তাঁকে। আমি আঁকতে পারি বলে বোধহয় কিছুটা পক্ষপাতিত্বও ছিল আমার ওপর। আর শুনেছি পক্ষপাতিত্ব ছিল প্রোদ্যোৎদার ওপর। প্রোদ্যোৎদা হোদলের মেজদা। বড়ো ভালো ছবি আঁকতে পারত। ওদের বাড়ির দেওয়ালে প্রোদ্যোৎদার আঁকা ঘোড়ার ছবি টাঙানো ছিল। আজও মনে আছে। বড়ো হয়ে ও বিখ্যাত নাট্যকার হয়েছে। শিল্পী হিসাবে নাম তো ছিলই বরাবর। তখন উঁচু ক্লাশে পড়ত বলে তেমন পাত্তা না দিলেও বড়ো হওয়ার পর আমরা বন্ধু।

স্কুলের গায়েই হোদলদের বাড়ি। কাজেই মাঝে মাঝেই যেতাম ওদের বাড়ি। ওদের বাড়ির ঠিক পেছনে অবনীমোহন রায়ের বাড়ি। সেখানেও যেতাম মাঝে মাঝেই। অবনী রায়কে ভয় পেতনা এমন মানুষ পাণ্ডুতে কমই ছিল। কম বয়সীরা তো বটেই তাঁর সমবয়সী মানুষরাও সমঝে চলতো। আমি তাঁকে দাদু বলে ডাকতাম। উনি ভারী ভালো মানুষ। এত ভালোমানুষ আমি সারাজীবনে কমই দেখেছি। অসিতকাকা, জীবনকাকারা তাঁর ছেলে। কমলাপিসি, ছবিপিসি আর ভুতু মেয়ে। আমাদের চার ভাই বোনকে তাঁরা খুব ভালোওবাসতেন। কেন জানি না আমার সঙ্গে অবনীদাদু খুব ভালো ব্যবহার করতেন।

আমাদের সময় বড়োরা অনেকেই খুব মেজাজি ছিলেন। হাসি খুব কমই ছিল। এখন তার কারণটা বেশ বুঝতে পারি। কারণটা সামাজিক। অভাব আর অস্থিরতা তাঁদের সুখে থাকতে দিত না। তার বারো তেরো বছর আগে দেশ ইংরেজদের হাত থেকে স্বাধীনতা পেয়েছে। তার জন্য সাম্প্রদায়িক কারণে আর নেতাদের অপদার্থতায় ভাগ হয়ে গেছে দেশ। দাঙ্গা বাঁধিয়ে হিন্দু মুসলমান চিরকালের সহজ সম্পর্ক হারিয়েছে। লক্ষ লক্ষ লোক খুন হয়েছে, ভিটে থেকে উদ্বাস্তু হয়েছে। পূর্ব বাংলা থেকে সব হারিয়ে অন্ধকার ভবিষ্যৎ আর দু:স্বপ্ন মাথায় নিয়ে যারা কোনও মতে প্রাণ বাঁচিয়ে সীমানা পার করে এদেশে এসে পৌঁছেছিলেন তাঁদের মধ্যে রেলের চাকরি জুটিয়ে কোনরকমে কয়েকজন ভাগ্যবান ঠাঁই পেয়ে যান রেস্ট ক্যাম্পে। আসার পরেও অসমীয়াদের চক্ষুশূল তাঁরা। আরো দফায় দফায় মারধোর  খেয়ে কোনওমতে বেঁচে থাকা তাঁদের হাসতে ভুলিয়েছিল। সবসময় তাঁরা রেগে থাকতেন। হয়তো স্কুলের মাস্টারমশাইরা সে কারণেই অত রাগী ছিলেন। রাজনৈতিক নেতাদের আদর্শহীন চুরিচামারিতেও ভয়ংকর বিরক্ত থাকতেন তাঁরা। বিশেষ করে যে নেতারা ক্ষমতায় এল তারা বেশির ভাগই ছিল অত্যাচারী এবং অসৎ বৃটিশদের চামচা। সত্যিকারের স্বাধীনতা সংগ্রামীরা স্বাধীন ভারতে গুরুত্ব পাননি তেমন। আবার ফিরে আসি পাণ্ডুর কথায়।

বাবাকে আর মাকে ওখানকার সবাই বড়ো ভালোবাসতেন। গৌহাটি শহরে বাবা ছিলেন সকলের প্রিয় বড়দা। তাই সকলেই আমাদের কাকা আর এই রায়বাড়ির ছেলেমেয়েরা আমাদের কাকা আর পিসি। একেবারে ছোট্ট ভুতু আমার চেয়ে ছোটো বলে পিসি নয় বন্ধু। এই শান্ত মেয়েটা বড়ো ভালো ছিল লেখাপড়ায়। আমার প্রিয় বন্ধু।

বন্ধু হত আমার সকলেই। ছেলে বা মেয়েদের আলাদা ভাবতে শিখিনি যে। চাঁদু ছিল আরেকজন, আদুদির বোন। এত ভালো দৌড়তে দেখিনি আর কাউকে। দীপুদি আমার দিদির বন্ধু। তার ভাই বোনেরা সবাই আমার বন্ধু। মানিক, দেবু, মীরা সবাই। বাবু, বাচ্চু আর পানু, তিন ডানপিটে ভাই আমার দলে। পানুর তখন মাত্র তিন, সেও আমার বন্ধু। বন্ধুদের আমি বড়ো ভালোবাসতাম। ওরাও। বিকেলে বাড়ির পেছনের পাহাড়তলির মাঠে খেলতাম। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার সাহস বেড়ে গেল। রেস্টক্যাম্পে চলে যেতাম হোদলদের বাড়ির সামনে ঘাসে ছাওয়া মাঠে। দাদা ফুটবল খেলতো ওখানেই বড়োদের সঙ্গে। ওরা আমাদের খেলায় নিত না। তখনও বড্ড ছোটো ছিলাম বলে আমাদের ছেলেমানুষী খেলা। রেস্টক্যাম্পকে বড়ো ভালোবাসতাম।

বাড়িগুলো একরকম দেখতে, পর পর এক এক সারিতে বসানো। পাকা মেঝে, মোটা দরমার দেয়াল। জানলার পাল্লা আর ছাদও ছেঁচা বাঁশের। দরমা সাজিয়ে হেলানো দোচালা। এত সুন্দর আর আরামের বাড়ি কমই দেখেছি। এগুলো সাহেবদের আমলে তৈরি রেলের কোয়ার্টার। রেস্টক্যাম্প জুড়ে কয়েকশো কোয়ার্টারে রেলের লোকেরা থাকত। বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় কী যে সুন্দর লাগত বাংলো মতো দেখতে বাড়িগুলো! পরে সেগুলো ভেঙে পাকা বাড়ি বানিয়ে সুন্দর লাগাটা চলে গেছে। ভারতের লোকেরা সৌন্দর্য ধরে রাখতে পারে না।

হোদলের সবচেয়ে বড়ো দাদা বিদ্যুৎদা থাকত কাটোয়ায়। ওখানে মামাবাড়িতে থেকে পড়াশুনো করত। কোনো ছুটিতে বিদ্যুৎদা পাণ্ডুর বাড়িতে এসে ঠিক করল লালপাহাড়ে পিকনিক হবে। আমি আর দাদাও ওদের সঙ্গে ভিড়ে গেলাম।

লালপাহাড়ের ওপারে পাণ্ডু এলাকার জন্য জল বিশুদ্ধকরণ করবার ব্যবস্থা ছিল। টেম্পল ঘাটের তিনটে পাশাপাশি পুকুরের জল ওখানে তুলে শুদ্ধ করার পর নীচে পাঠানো হত। জলের প্ল্যান্টের পাশে ছোটো ছোটো বারান্দাওয়ালা ঘর আর প্রচুর গাছপালা ছিল। ওখানেই ডিমের ঝোল, টমেটোর চাটনি আর ভাত রান্না হল। হোদল, আমি, উৎপল আর  সবার চেয়ে ছোটো অনুপের কোন কাজ করতে হয়নি। বিদ্যুৎদার রান্নায় লঙ্কা বোধহয় বেশি দেওয়া হয়েছিল। হুস হাস করতে করতে খেয়ে আমরা বেজায় খুশি। আজও ঐ দিনটা মনে আছে। বোনেরা যায়নি বলে একটু মন খারাপও হয়েছিল, সেটাও মনে আছে।

স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর আমার জীবনটা অনেকটাই পালটে গেল। নির্জন দুপুর আর রইল না। গল্প শোনা বন্ধ হল। দিনের বেলা স্বপ্ন দেখা বা কল্পনার জগতে ঘোরাফেরা কমে গেল। স্কুলটা মনে হত দু:স্বপ্ন। মাস্টারমশাইদের যমের মত ভয় পেতে শুরু করলাম। পড়াশুনো আগে ছিল সহজ, স্কুলে গিয়ে হয়ে গেল কঠিন। বানিয়ে লিখতাম নিজের ভাষায়, জোর করে মুখস্ত করতে শেখানো হল। মনের দু:খ মনেই চেপে রাখতাম দিনের পর দিন।

মনের দু:খ হালকা হত শুধু লালমোহন স্যারকে দেখলে। উনি ছোটোদের সত্যিই ভালোবাসতেন। স্কুলে যেতে ভালো না লাগায় বাড়িতে থাকতে আগের চেয়ে বেশি ভালো লাগত। মজা হত বাবার বন্ধুরা বাড়িতে এলে। হিতেন কাকা, ভানু কাকা তো আসতই কাকিমাদের নিয়ে। আসত মিবোকাকা, ফাঁকিকাকারা। মাঝে মাঝে অনিল দাশ, অনিল চক্রবর্তীরা আসতেন। হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর ভূপেন হাজারিকা এলে গানের জোয়ার বয়ে যেত। এঁরা বাবার সঙ্গে দল বেঁধে আসাম আইপিটিএ তৈরি করেছিলেন বলে অনেক দিনের বন্ধু। একসঙ্গে কোরাস গান গাইলে বাড়ি কাঁপত। আমরা অবাক হয়ে শুনতাম। এঁদের আমাদের বাড়িতে নেমতন্ন খেতে আসা লেগেই থাকত। বাবা মা সবাইকে রেঁধে খাওয়াতে বড়ো ভালোবাসতেন।

বড়ো হবার পর বুঝেছি বাবা ছিলেন অবন ঠাকুরের মত একজন অসাধারণ মানুষ। মা যেন তাঁর ছায়া। মনের এমন মিল চট্‌ করে নজরে পড়ে না। আসলে ঢাকার ভট্টাচার্যিরা আর ব্রাহ্মণদির মৌলিকরা সকলেই খোলা মনের, ভালো মানুষ ছিলেন। তাই আমার বাবা আর মা নিজের নিজের পরিবারে বড়ো হবার সময় পেয়েছিলেন অসামান্য শিক্ষা, উঁচু নজর, সৎ সরল মন আর অসামান্য প্রতিভা। খারাপ কোন কিছু ঘেঁষতেই পারত না।

ভানুকাকা বাটা কোম্পানির ম্যানেজার। তাঁর বউ দীপা কাকিমা খুব ভালো গান গাইতে পারতেন। কি যে মিষ্টি লাগত শুনতে! মা দীপা কাকিমাকে নিজের বোনের মত ভালোবাসতেন। রোজ বিকেলে কাকিমা চলে আসতেন একটা কৌটো হাতে করে। তাতে থাকত রান্না করে আনা মাছ। আমাদের বাড়িতে মাছ মাংস রান্না করা বারণ ছিল। মারোয়াড়ি মালিকের বাড়ি। মালিকের বউ মাছ মাংসের গন্ধ সইতে পারত না। তাই মালিক ছগনলাল জৈন বাবাকে অনুরোধ করে মাছ রান্না বন্ধ করিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু খেতে তো বারণ নেই। তাই রেস্টক্যাম্পের রায় বাড়ি আর গুহ বাড়ি থেকে রান্না করা মাছ আসত। দীপা কাকিমা রেঁধে আনতেন। রায় বাড়ি থেকে অসিতকাকাও নিয়ে আসতেন মাছ, মাংস। শেষে থাকতে না পেরে বাবা যখন বাড়ি বদলাতে চাইলেন মালিক বাধ্য হয়ে আর আমিষ রান্নার ব্যাপারে আপত্তি করল না। আমরা নীচে গিয়ে শুঁকে মাকে বলতাম গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে কি না। মা কাউকে অসুবিধেয় ফেলতে চাইতেন না। একতলায় মাছ মাংস রান্নার গন্ধ পেয়ে চেঁচাতেই মা ছুটতেন তিন তলার ছাদে। হাওয়ায় সে গন্ধ ছড়িয়ে যেত, একতলায় মারোয়ারী গিন্নীর নাক অবধি আর পৌঁছতেই পারত না। জলন্ত উনোন হাতে ঝুলিয়ে সিঁড়ি বেয়ে ওপর নিচ করা সোজা কথা নয়। শুধু উনোন তো না, হাঁড়ি, কড়াই, বালতি, অর্দ্ধেক রান্না করা মাছ মাংস সব। আমার মা তখনও কমবয়সী ছিপছিপে মেয়ে। কষ্টকে কষ্ট বলে মানতেন না। কাউকে কোন রকম কষ্ট দেওয়া তাঁর ধাতে ছিল না। সবসময় মুখে থাকত হাসি। লেখা পড়াতেও খুব ভালো ছিলেন। অঙ্কে অসাধারণ মাথা ছিল। বাবার সঙ্গে বিয়ে দেবার আর একটা কারণ ছিল মায়ের লং জ্যাম্প! মেয়ে দেখে এসে জ্যাঠামশাই নাকি বাবাকে বলেছিলেন “তোর বউ কি ফিট রে! আট দশ ফুট লং জ্যাম্প দিতে পারে জলভর্তি গ্লাস হাতে।” আসলে জ্যাঠামশাই জল খেতে চাওয়ায় মা বোধহয় একটু তাড়াহুড়া করেছিলেন। জ্যাঠামশাইয়ের নজর এড়ায়নি সেটা। বছর তিনেক পরে বিশাখাপত্তনমে সমুদ্রের ঢেউ ডিঙিয়ে ফুট দুয়েক হাইজ্যাম্প দিতে দেখে আমিও খুব খুশি হয়েছিলাম। আমি বেশি দুষ্টুমি করলে মার কানমলা বা চাঁটি খেয়ে বেশ বুঝতে পারতাম গায়ের জোরও কিছু কম ছিল না। বড়ো বড়ো শান্ত চোখের মেয়ে আমার মাকে আমি আমার মেয়ে ভাবতাম চিরদিন। বুড়ো হবার পর বলেওছিলাম। চাঁটি খাবার ভয়ে তখন বলিনি। বেশি বয়সে সেরিব্রাল অ্যাটাকে মা অচল হয়ে পরার পর মায়ের চান, খাওয়া, বাথরুমের কাজ আমরা ভাইবোনরা করেছি যখন, ছোটো মেয়েই তো মনে হত তাঁকে। মা তখন চোখেও দেখতেন না, শুনতে তো কবে থেকেই পেতেন না, কথা বন্ধ হয়ে গেছিল। তবু মার কাছে বসলেই মুখে আনন্দ ফুটে উঠত। ঠোঁট নেড়ে অবোধ্য শব্দ করে কথা বলতেও চেষ্টা করতেন। বড়ো কষ্ট হত তখন।

বাবা ছিলেন আশ্চর্য মানুষ। কোনও দু:খ বাবাকে ছুঁতে পারত না। সব সময় যেন আনন্দে আছেন। অফিসের কাজে ভীষণ মনযোগী। বেশ কয়েকটা বড়ো ব্রাঞ্চ বাবা ওপেন করে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। দেশশুদ্ধু লোক যেমন ভালোবেসে বড়দা বলে ডাকত, ব্যাংকের কর্মচারীরাও নিজের দাদার মত মানত। অবশ্য পান থেকে চুন খসবার মত ব্যাপার সহ্য করতেন না বলে কেউ কাজে ঢিলে দেবার কথা ভাবতেও পারত না। আবার সারাদিন কাজ করে বাড়ি ফেরার সময় পকেটে করে দশ বারোটা দ্রুত হাতে আঁকা কার্টুন নিয়ে আসতেন। তাতে কখনও কোন সহকর্মীর মুখ, কখনো নেতা মন্ত্রীদের চেহারা চিনতে পারতাম। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যেত শম্ভু মিত্র অথবা তাঁর নিজের চেহারা। ব্যাংকে চাকরি না করলে বাবা অবশ্যই নাম করা আঁকিয়ে হতেন বা বড়ো গায়ক হতেন। দেবব্রত বিশ্বাস বা হেমাঙ্গ বিশ্বাস বাবার গানের গলার ভক্ত ছিলেন। বড়ো হয়ে আইপিটিএর অনেকের কাছেই শুনেছি বাবার গানের সুখ্যাতি। কিন্তু বন্ধু হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মত বাবাও কখনো কারো কাছে গান শেখেন নি। গান ছিল তাঁর সহজাত। অনায়াসে মজার মজার ছড়া লিখতে পারতেন। আর বড়ো মাপের অভিনেতা তো অবশ্যই ছিলেন। স্টেজে উঠলে বাবাকে কখনও বাবা বলে চিনতে পারতাম না। চরিত্রের সঙ্গে এতটাই মিশে যেতেন। শম্ভু মিত্রের প্রথম যোগ্য ছাত্র বাবা। নবান্ন, জবানবন্দি, মুক্তধারা সহ আরও অনেক নাটক করেছেন বিজন ভট্টাচার্য, শম্ভু মিত্রের সঙ্গে। বোম্বাই সিনেমাতে নায়কের অভিনয় করার সুযোগ পেয়েও করেননি মঞ্চ ভালোবাসতেন বলে। বহুরূপীর স্রষ্টাদের একজন হলেও ভুঁইফোঁর লেখকদের খাতায় বাবার নাম নেই। এ লজ্জা নাটকের ইতিহাস যারা লেখেন তাঁদের। অমর গাংগুলি, দেবতোষ ঘোষ, অরুন মুখোপাধ্যায়, কুমার রায়, গঙ্গাপদ বসু বা শোভেন মিত্র বাবাকে গুরুত্ব দিয়েছেন মাথা হিসেবে। জীবনের শেষদিকেও শম্ভু মিত্র বাবার মতামত নিতেন চরিত্র সৃষ্টি করতে। খালেদ চৌধুরী সেটের ব্যাপারে বাবার মতামত নিতেন। তৃপ্তি মিত্র ভাইয়ের মত ভালোবাসতেন। শোভেনদার কাছে শুনেছি  চাকরিতে বদলি না হলে রক্তকরবীর বিশু হতেন বাবা। দুর্দ্দান্ত আবৃত্তি করতেন বাবা। উদাত্ত গলায় ‘মধুবংশীর গলি’ পুরো শুনেছি একানব্বই বছর বয়স হবার পরেও। শম্ভু মিত্রের ছাত্র হয়েও তাঁর কোন প্রভাব বা মিল খুঁজে পাইনি কখনো। অবন ঠাকুরের লেখা ‘চাঁইবুড়োর পুঁথি’ পাঠ যে শুনেছে সে কোনদিন ভুলতে পারবেনা। সব মিলিয়ে মনে হত বাবাই যেন স্বয়ং অবন ঠাকুর। বাবার একটাই দোষ, প্রচারের আলো সইতে পারতেন না একদম। নিজেকে সাধারনের মাঝে রেখেই তাঁর আনন্দ। অথচ যুগটাই তো প্রচারের।

আমাকে নিয়ে বাবার নানারকম পরীক্ষানিরীক্ষা চলত। রোগা ছিলাম বলে দু তিনটে প্যান্ট আর জামা পরিয়ে ভদ্রস্থ চেহারা দেবার চেষ্টা হত। এমনকি মাঝে মাঝে চুল-টুল আঁচড়ে পাউডার লাগাবারও চেষ্টা করতেন। একবার চিরুনি, কাঁচি নিয়ে ছুটির দিনে বসলেন নিজে হাতে আমার চুল কাটতে। উদ্দেশ্য হয়তো ভালোই ছিল কিন্তু ঘণ্টাখানেক লেগে থাকবার পর আমার চেহারা যা দাঁড়াল বলার নয়। আয়নায় নিজেকে দেখে আমি তো বাক্যহারা। এ কি চেহারা! মা বকাবকি করতে লাগলেন। দিদি আর বোন আমাকে দেখে হেসে গড়াতে লাগল। আমি কান্না থামাতে পারছি না। শেষে দাদা আমায় নিয়ে চলল সেলুনে। নাপিত খানিক হাঁ করে চেয়ে থাকার পর আমায় খুব চিন্তিত মুখ করে চেয়ারে বসাল।

চেহারাটার একটু বর্ণনা দেওয়া অন্যায় হবে না। হাজার হোক একটি শিল্পকর্ম! এখনকার দিনে ঐ রকম সাহসী চুলের স্টাইলের পেছনে লোকে যথেষ্ট টাকাপয়সা খরচ করে। কাঠির ডগায় আলুর দমের কপালের দিকটা অনেকটা কামানো। অনেকটা বিদ্যাসাগরী ঢঙে। কানের দুপাশে ঝুঁটি, মাথার ওপরে ঝুঁটি। মাথার পেছনটাও কামানো। নাপিত আর কী করে? কাঁচি চালিয়ে একটু ভারসাম্য আনার চেষ্টা করতে করতে কানে কানে আমায় সান্ত্বনা দিতে লাগল। আমি ঠিক করলাম চুল না গজালে আমি স্কুলে যাচ্ছি না। ওখানেই দেখা হল জীবনকাকাদের দলটার সঙ্গে। 

এঁরা রেস্টক্যাম্পের কম বয়সীদের দল। জীবনকাকাকে চিনতাম রায় বাড়ির ছেলে হিসেবে। নতুনদের সঙ্গে আলাপ হল। বাবা ওদের বড়দা, তাই সবাই আমাদের কাকা। মৃদুলকাকার মাথায় বাঁধা রুমাল ফুঁড়ে শক্ত শক্ত চুল খাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছিল। শক্তিকাকা মজাদার মানুষ। পিন্টুকাকা শ্যামলা রঙের সুন্দর মানুষ, মাথায় বড়ো বড়ো চুল। নটোকাকা কার্তিক ঠাকুরের মত দেখতে। জীবনকাকা যেন মোগল সম্রাটদের মত সুন্দর। খুব ভালো লাগল ওদের দেখে। দেখলাম ওরা বাবাকে নিয়ে কথাবার্তা বলছে নিজেদের মধ্যে। সেদিন বিকেলেই ব্যাংক ছুটির পর পুরো দলটাই এল বাবার সঙ্গে দেখা করতে। জন্ম হল নতুন একটা নাটকের আর সাংস্কৃতিক দলের – যুবতীর্থ।

আমরা নেহাত কচিকাঁচার দল। তবু বাড়িতে নতুন কাকাদের আনাগোনা আর বাবার হালচালে বুঝতে পারি একটা কিছু হচ্ছে। বাবা বিকেলের পর চলে যান রিহার্সালে আর মার মুখ গম্ভীর হয়ে থাকে। আমাদের ওপর কারণে অকারণে রেগে যায়। হিতেন কাকা, মিবোকাকাদের সঙ্গে বেশি দেখা হয় না। গল্প শোনার পাট উঠে গেল। শুধু মার কাছে শুনতাম নরসিংদি আর ব্রাহ্মনদির গল্প। ওখানে মায়ের বাপের বাড়ি ছিল। দেশভাগ হয়ে যাবার পর ওটা পাকিস্তান। শুনতে পেতাম আমার দাদু সোনাভাইয়ের কথা। তিনি বড়ো ডাক্তার তো ছিলেনই, অত বড়ো দানবীরও পাওয়া যায় না। শুনতাম সাত বছর বয়সে দিদিমার বিয়ে হয়ে মৌলিকবাড়িতে আসার কথা। তাকে তখন চান করিয়ে খাইয়ে দিতে হত। ন্যাড়া মাথা ছোট্ট পুতুলটির মত আমার দিদিমা এ বাড়িতে এসেছিলেন শ্বশুরের কোলে চড়ে। শুনতাম মায়ের মামাবাড়ি খিল গাঁ, ঢাকাই বাখরখানির কথা। দিদিমা খিল গাঁয়ের ভট্টাচার্য পরিবারের মেয়ে। মায়ের মামাদের কথা শুনতাম। বড়োমামা আদিত্য ভট্টাচার্য সাতবার মস্ত ফাঁড়ার হাত থেকে বেঁচেছিলেন। সে সব শুনতে শুনতে গায়ে কাঁটা দিত আমাদের। জামশেদপুর শহর তাঁর হাতে তৈরি। টাটার খুব কাছের বন্ধু ছিলেন তিনি। গল্পগুলো আমরা ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি। আদিত্য ভট্টাচার্যকে আমার দাদু বলতেন জামশেদপুরের ‘ফ্যাটেস্ট ম্যান ইন দ্য স্মলেস্ট কার।’ মোটাসোটা মানুষের গাড়িটা ছিল ছোটো। মোটা শরীরে অসম্ভব শক্তি ছিল। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে বেশ নাম ছিল। টাটার ইস্পাত কারখানা আর শহর তৈরির কাজ আজও বিখ্যাত হয়ে আছে। আর ছিলেন সাহসী।

ছোটোবেলায় একবার ভূত দেখেছিলেন। একজন প্রজার সঙ্গে মাঝে মাঝে তিনি রাত্তিরে মাছ ধরতে যেতেন। তার ডাকনাম ক্যাতা, উনি ক্যাতাকাকা বলে ডাকতেন। মাঝরাতে তার ডাক শুনে ছিপ টিপ নিয়ে ক্যাতাকাকার পিছু পিছু শ্মশানের পাশের জলা জমিতে ছিপ ফেলে বেশ ওজনে ভারী মাছ গিঁথেছে। অনেক কসরৎ করে তুলে দেখেন চাদরে জড়ানো যে মানুষটার ডাকে তিনি এসেছিলেন, বঁড়শিতে গিঁথে আছে তারই মৃতদেহ। কিন্তু তিনি ক্যাতাকাকা নন, আর কেউ। খোলা বড়ো বড়ো চোখে চেয়ে আছে, মুখে হাসি। কোন রকমে পালিয়ে বাড়ি ফেরার পর ধুম জ্বর। খবর নিয়ে জানা গেল ক্যাতাকাকার শরীর খারাপ ছিল বলে সে নাকি আসেইনি ডাকতে। তবে কে এসেছিল?

ঘন জঙ্গলে তাঁবু খাটিয়ে কাজ করার সময় চোদ্দ ফুট লম্বা ময়াল সাপ জড়িয়ে ধরে তাঁকে। মরতে মরতেও গায়ের জোরে তার পাক খুলে আছড়ে মেরেছিলেন তাকে। ঘুমন্ত অবস্থায় ছিলেন বলে মরে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল। সাপের মাথাটা নাকি নারকেলের মত বড়ো ছিল, গিলে খেতেও পারত। তবে অসুবিধা হত তার, মায়ের বড়োমামা ছ ফুটের ওপর লম্বা ছিলেন।

একবার কোথাও যাওয়ার পথে একটা গ্রামে রাত কাটাতে থেকে যান, সেখানে ঘোর জঙ্গল। যে বাড়িতে ছিলেন তারা তাঁর ঘরের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল বাইরে থেকে। মাঝরাতে ব্যাপারটা বুঝে কান পেতে শুনলেন তাঁকে কি ভাবে মারা হবে সেই আলোচনা হচ্ছে ফিসফিস করে। রাম দাতে শান দেবার শব্দও কানে এল তাঁর। জানলার কাঠের ফ্রেম দেয়াল থেকে ধ্বসিয়ে পালাতে পেরে যান সেবার। পরে পুলিশ এনে সে ডাকাতগুলোকে ধরে নিয়ে যান তিনি। মেঝে খুঁড়ে অনেক মানুষের হাড়গোড় পাওয়া গিয়েছিল ওখানে। জঙ্গলটার নাম লোধাশুলী। আজও অনেকে বিপদে পড়ে ওখানে।

সবচেয়ে বড়ো বিপদটা হয়েছিল এক বর্ষাকালে। ঘোড়ার গাড়িতে বেশ কয়েকজন মহিলা আর ছোটো ছেলেমেয়েদের নিয়ে কোন তীর্থস্থান থেকে ফিরছিলেন মায়ের বড়োমামা। তিনি আর গাড়ির গাড়োয়ান ছাড়া আর কোন পুরুষ মানুষ ছিল না। গাড়ির মধ্যে যারা ছিল সবাই আদিত্য ভট্টাচার্যের আপন জন। আমার দিদিমার কোলে আমার মাও ছিলেন। তখন রাত হয়েছে, বৃষ্টি হচ্ছে ঝম ঝম করে, অন্ধকারে গাড়ি হুড়মুড় করে রাস্তার পাশের জলভর্তি পুকুরে উল্টে পড়ে ডুবে গেল। নিমেষে ঘোড়ার গাড়ির দরজা ভেঙে আট দশজন মানুষকে জলের তলা থেকে একে একে বাঁচিয়ে ঘোড়াটাকেও মরার হাত থেকে বাঁচান একা হাতে। গাড়োয়ানকে অসাবধানে গাড়ি চালানোর জন্য চড় মেরে ভাঙা দরজাটা স্মৃতি হিসেবে রেখে দ্যান তিনি। জলে এক দু মিনিট থাকলেই সবাই মারা যেতে পারত। কারো কিচ্ছু হয় নি ঐ একটি মানুষের জন্য। কত বড়ো বীর ছিলেন মায়ের সেই বড়োমামা! তিনি সেদিন না থাকলে আমার মামাবাড়িতে বাতি দেবার কেউ থাকত না।

মা অন্য মামাদের কথাও বলতেন খুব। দু’জনকে আমিও দেখেছি বড়ো হবার পর। মায়ের ধনমামা দীনেশ ভট্টাচার্য থাকতেন শান্তিনিকেতনে। বিশ্বভারতীর অনেক বাড়ি সুরেন কর আর তাঁর হাতে তৈরি। রবীন্দ্রনাথ খুব নির্ভর করতেন তাঁর ওপর, ভালোওবাসতেন। ভারী মজার মানুষ ছিলেন তিনি। বর্ধমানে একদিন আমাদের বাড়িতে এসে খুব মজা করেছিলেন আমাদের সঙ্গে। নিজের নামের সঙ্গে আমাদের নাম মিশিয়ে অদ্ভুত সব নাম দিয়েছিলেন। দাদার নাম দিলেন দীসোনেমষ। দিদিরটা ছিল দারুণ! দীসনের্বাষণী। কেমন নির্বাসনের মত শুনতে! আমি দীশিনেবুষ, আর বাবলি দীননেন্দিষনী। এতেও কেমন নাচের ভাব। একবার দেখলেও মানুষটা মনে থেকে গেলেন সারাজীবন। মার ছোটোমামাকে অবশ্য দেখেছি অনেকবার। সকলেই বড়ো চমৎকার মানুষ ছিলেন।

মায়ের বাপের বাড়ির গল্প শুনতে শুনতে আমরা যেন সব ছবির মত দেখতে পেতাম। তখন তো বুঝতাম না সে সব গল্প বলতে বলতে দেশ হারিয়ে যাবার দু:খ মার কতখানি হত। সব আছে, কিন্তু আছে অকারণে বিদেশীদের হাতে দখল হয়ে। যে মানুষদের জন্য দাদুর এত দান এত ত্যাগ তারাই বসে গেল সব বাড়ি ঘর জমিজমা দখল করে।

একাত্তর সালে আমার ছোটো মামা ভারতীয় সেনার মেজর হিসেবে সেখানে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। জিতে যাওয়ার পর দাদুর দান করা হাসপাতাল, কলেজ, স্কুল, দেখে এসেছিলেন। নিজেদের বাড়িতেও গিয়েছিলেন। পরিচয় দিতে ইচ্ছে হয় নি।

বাবা অফিস ছাড়া দিনরাতের বাকিটা যুবতীর্থতে কী করেন জানতে পারলাম পুজোর সময়। ভানুকাকা, কাকিমা, মা আর আমরা চারজন চললাম নাটক দেখতে। বাবার অভিনয় স্টেজে অনেক দেখেছি। পাণ্ডুতেও বড়োদের দলের সঙ্গে নানা নাটকে বাবাকে দেখতাম। এই নতুন দলটার ‘দুই মহল’ নাটকটা খুব ভালো লাগল। তারপর থেকে মা আর বাবার নাটক করায় তেমন আপত্তি করতেন না, বরং কাকার দল বাড়িতে এলে খুশিই হতেন। তবে ‘দুই মহল’ নাটকটা শেষ হওয়ার পরদিনই সবাই যখন দলবেঁধে হাজির হলেন মা কোমরে হাত দিয়ে এসে দাঁড়ালেন। তোমাদের পড়াশুনো নেই? কলেজে ভর্তি হওয়া হয়নি বেশিরভাগের তখনও। মার জেদে একদিনে সবাই পাণ্ডু কলেজে নাম লেখালেন।

স্কুল যাওয়ার কতটুকুই বা পথ, সেটুকুই বড়ো বড়ো চোখ করে দেখতে দেখতে যেতাম। আমাদের গাঁয়ে পাশাপাশি মারোয়ারি ব্যবসায়ীদের বাড়ির তলায় নানা রকম দোকান। সবাই আমার চেনা। রাস্তা পার হলে বাজার, তারপরে বটগাছের পাশে ছোট্ট একটা মন্দির। সেখানে খুব সুন্দর ঝুলন সাজানো হত। সেখানে বসে থাকা একজন সাধু রোজ আমায় দেখে হাত নাড়তো। আর কয়েক পা হাঁটলে বাঁদিকে একটা মাঠ একটু ঢালু হয়ে নেমে গেছে। ওখানে অসীমকাকার কোয়ার্টার আর আমার বন্ধু শিবনাথ বোসের বাড়ি। শিবনাথ অঙ্ক করতে বড়ো ভালোবাসত। ইংরেজি, বাংলা, ইতিহাস, ভূগোলে তেমন মন নেই, পাগলের মত অঙ্ক করত। আর বড্ড সত্যি কথা বলত। মা ওকে চিনতেন। মাঝে মাঝে ডেকে জিজ্ঞেস করতেন আমি অঙ্ক করি কিনা ক্লাসে। ও বলত শিবু পারে অঙ্ক, করতে চায় না। মা বকতেন আমায়। চুপ করে থাকতাম। মা নিজে আমাকে অঙ্ক করাতেন রোজ। বাড়িতে ভালোই লাগত অঙ্ক করতে, স্কুলে ঢুকলেই কোথায় যেত সেই ভালোলাগা! পরিমল স্যারের দাঁতখিঁচুনি আর বেত নাচানো দেখলে আর অঙ্ক করতে ইচ্ছেই করত না। ভাবতাম কখন ঘণ্টা পড়বে রে বাবা? শিবনাথ ছিল আমার চেয়েও মাথায় ছোটো আর রোগা। ওর ওপর রাগ করতে পারতাম না। ও তো মিথ্যে বলত না!

অসীমকাকার কোয়ার্টারে আমাদের যাওয়া আসা ছিল। কাকা, কাকিমা হাসিখুশি মানুষ। তাদের ছোট্ট মেয়ে দোলা বাবলির থেকেও ছোটো। ওবাড়ি গেলে আমি সামনের বাগানেই খেলতাম, বাবলি আর দোলা ভেতরে পুতুল খেলত। দোলা স্বাভাবিক ছিলনা। কথা বলত জড়িয়ে জড়িয়ে। হঠাৎ একদিন ওর মা আমাকে আড়ালে চাপা গলায় খুব বকলেন। আমি নাকি দোলাকে মেরেছি! দোলা ওর মা’র কাছে নালিশ করেছে। আমি অবাক! কাউকে মারা বা খারাপ কথা বলা তো ভাবতেই পারিনি কখনও। মিছিমিছি এই বকুনি খেয়ে ঠিক করলাম আর কখনও যাব না ওদের বাড়ি। মাকে অবশ্য কিছু বলিনি কখনও, তবে সেই আমার বড়ো দুঃখ পাওয়া।

ওই মাঠটুকুর পর শিখদের ছোটো মন্দিরের পরেই ভানুকাকার জুতোর দোকান। দোকানে ছোটোদের জন্য ‘বাটা’ লেখা কাগজের মুখোশ আর বড়ো বড়ো বেলুন রাখা থাকত। ফেরার পথে পেতাম মাঝে মাঝেই। চৌধুরী কাকার মনিহারী দোকান আর বাটার দোকানের মাঝের গলি দিয়ে ঢুকে পড়তাম, শর্টকাট। বাটার উলটো দিকেই ‘অরুণা’ সিনেমা হল, চায়ের দোকান, চুলকাটার সেলুন। পাকা রাস্তার ওপর ঘন ছায়া দেওয়া দুটো বড়ো বড়ো আমগাছ ছিল।

গলি দিয়ে যাবার পর চোখ বুঁজিয়ে ফেলতাম। মুরগির মাংস বিক্রি হত এখানে। বাঁশের খাঁচায় বন্দি সুন্দর মুরগিগুলোর জন্য কষ্ট হত। আরও ভয় পেতাম মুরগি কাটা দেখতে। মরবার আগে খুব করুণভাবে ডাকত ওরা। দাড়িওয়ালা, লুঙ্গিপরা লোকটা আমাকে চোখবুঁজে চলতে দেখে হাসতো, ছুরি হাতে নিয়ে ভয় দেখাত। একটুও পছন্দ করতাম না লোকটাকে।

দোকান পেরিয়ে মাঠের মাঝ দিয়ে একটু গেলেই বিদ্যামন্দির স্কুল। এটুকু পথ দৌড়ে যেতাম। স্কুলটাকে ভালোবাসতাম, মাস্টারমশাইদের না।

চারপাশে কত কী ঘটতে থাকত, ছোটো ছিলাম বলে জানতেও পারতাম না। বুঝতেও যে পারতাম এমন বলা যাবে না। চোখ-কান খোলা থাকত, বুঝতে চেষ্টা করতাম। নজরে পড়ত বড়োদের অদ্ভুত চালচলন, ছোটোদের মজার মজার কাজকর্ম। পাহাড়, নদী, গাছপালা খুব ভালোবাসতাম। বড়ো বড়ো গাছ থেকে দেওয়ালের শ্যাওলা, ভালোবাসায় কোন বাছবিচার ছিল না। বেড়াল, কুকুর, পাখি, ছোটো ছোটো পোকামাকড়, মাছ সবকিছুই দেখতে ভালোবাসতাম। সন্দেশ পত্রিকার গ্রাহক ছিলাম বলে প্রকৃতি পড়ুয়ার দপ্তরে জীবন সর্দার বলে একজন বন্ধু পেলাম। তাঁকে দেখিনি, কিন্তু লেখা পড়েই বন্ধু বলে ভাবতে অসুবিধা হয়নি। আমার মত তিনিও নদী, বন, পাহাড়ে ঘুরে বেরান। ছোটো, বড়ো সবকিছু ছোটোদের মত কৌতুহল নিয়ে দেখেন আর অত সুন্দর করে লেখেন আমাদের জন্য। বন্ধু ছাড়া আর কী বলব! আমি একলব্যের মত আড়ালে এতদূরে থেকে তাঁর ছাত্র হলাম।

এক রবিবার সকালে ঘুম ভাঙলো নীচের রাস্তায় কার কান্না শুনে। কাপড়ে ঘেরা একটা রিকশা করে কেউ মরাকান্না কাঁদতে কাঁদতে চলেছে। রিকশার পিছু পিছু খোলা ভোজালি হাতে সাজগোজ করা একজন নেপালি আধবুড়ো লোক। ছুটে গিয়ে পাশ থেকে এক ফাঁক দিয়ে দেখে কেমন চেনা মনে হল। কান্নার গলাটাও যেন চেনা। পেছনে যারা আসছিল তাদের মধ্যে সাংবীরপুনদাদাও ছিল। শুনলাম আমাদের জুঠিদিদি গেল বরের ঘর করতে। এভাবে পাড়া জাগিয়ে কাঁদতে কাঁদতে যাওয়াটাই নাকি নিয়ম। সেদিন আমি আর দিদি খুব কেঁদেছিলাম। জুঠিদিদির বরটা কেমন বুড়ো বুড়ো দেখতে। আর কখনও দেখা হয়নি জুঠিদিদির সঙ্গে। হয়তো এখন নেপালের কোন গ্রামের ঘরে বসে সত্তর বছরের বুড়ি জুঠিদিদি ওর নাতি-নাতনীদের কাছে আমাদের কথাই বলছে। ওখানে ও ওর পাগলা দাজুর খোঁজ পেল কিনা কে জানে?

রেস্টক্যাম্পের সব বাসিন্দাই রিফিউজি হয়ে পূর্বপাকিস্তান থেকে পালিয়ে এসে ঠাঁই পেয়েছিলেন রেল কলোনিতে। কোনরকমে রেলে চাকরি পাওয়ার সুবাদে রেল কোয়ার্টারে থাকা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিদেশী সৈনিকদের থাকার জন্য তৈরি অস্থায়ী কটেজগুলোই রেল নিয়ে নেয়। নিঃসম্বল মানুষগুলো কম মাইনের চাকরিতে কোন রকমে সংসার করত। বড়ো পরিবারগুলোর অসুবিধা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছেলেমেয়েদের মধ্যে সবাই লেখাপড়া শেখার সুযোগ পায়নি। আমরা পাণ্ডুতে যাওয়ার মোটে তেরো বছর আগে স্বাধীন হয়েছে দেশ। তাই তার দাঙ্গা আর সর্বস্ব খুইয়ে আসার ঘা তখনও শুকোয়নি। পরিবারের বড়ো ছেলেরা কোনরকমে চাকরি জুটিয়ে দাঁড়িয়ে যেতে পেরেছে। তারা একটু আনন্দের খোঁজে ক্লাব তৈরি করে নাটক, যাত্রা বা গানের দল করে। যাদের বয়স কম তাদের অবস্থা খুব খারাপ। তারা স্টেজ বাঁধে, ফাইফরমাশ খাটে কিন্তু স্টেজে উঠে নাটক করার সুযোগ পায় না। চাকরিবাকরি নেই বলে তাদের অফুরন্ত সময়। বেকার আর অশিক্ষিত বলে বাড়িতে বসে থাকলেও কথা শুনতে হয়। ওদের মনের হাহাকারটা বাবা বুঝতেন বলে গড়ে তুললেন ‘যুবতীর্থ’। এবার শুরু হল কলেজে পড়া। কয়েক বছর পরে তারাও চাকরি জোগাড় করে দাঁড়িয়ে গেল। নাটকই হল তাদের দাঁড়ানোর খুঁটি। বাবার সঙ্গে সঙ্গে মাও জড়িয়ে পড়লেন ওদের সঙ্গে। বাবা তো ছোটো বড়ো সকলের বড়দা। বড়ো, ছোটো সকলের সঙ্গেই আছেন। তাই বড়োদের সঙ্গে ছোটোদের যে রেষারেষি সম্পর্ক সেটাও কমতে লাগল। শেষে সবাই মিশে গেল। গান, নাটক আর আবৃত্তি নিয়ে রেস্টক্যাম্পে নতুন প্রাণের সাড়া জাগলো। আমরা ছোটোরাও তার আঁচ পেলাম। রেলের রিক্রিয়েশন সেন্টারে একটার পর একটা অনুষ্ঠান দেখতে পেলাম।

ছাদের ওপর উঠে ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকালে দেখতে পেতাম ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। এর নকশা তৈরির জন্য নর্থ-ইস্ট ফ্রন্টিয়ার রেলের জেনারেল ম্যানেজারের খুব নাম হয়ে গেল ভারতময়। জিএম ছিলেন বঙ্কিম গাঙ্গুলী, সকলের মুখে মুখে বি সি গাঙ্গুলী। তিনি সম্পর্কে আমাদের মেসোমশাই। আবু মাসির বর। ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে ভারতে তো বটেই ভারতের বাইরেও তার নামডাক যথেষ্ট। জিএম-এর কোয়ার্টার ছিল মালীগাঁও গোশালা পাহাড়ের গায়ে লাগা একটা মাঝারি টিলার মাথায়, সমান জমিতে, বাংলো ধাঁচের। চারপাশে চওড়া বাগানে কতরকম ফুল, ফলের গাছ। একতলা মস্ত কোয়ার্টারের সামনের লনে মা-মাসিরা সোফায় বসে উল বুনতে বুনতে গল্প করতেন। দিদিমাও এসে বসতেন। আমরা মেসোমশাইয়ের ভাইপো-ভাইঝিদের সঙ্গে খেলতাম। বুলবুলদি আমার দিদিরই বয়েসি, বুটান বাবলির মত আর টেঁপু আমার সমান। বড়ো দাদা দিদিরা অনেক বড়ো। অবশ্য মাঝে মাঝে ক্রিকেট বা ব্যাডমিন্টন খেলতে আসতেন না তা নয়। অত নামকরা মানুষ মেসোমশাইকে একটু ভয় ভয় পেতাম। বাবার সঙ্গে তার খুব ভাব। বসার ঘরে তাদের কথাবার্তা আর হাসির শব্দ বাইরে মাঠ থেকেও কানে আসত।

আমার মায়ের আর ঠাকুমার হাতের রান্না খুব পছন্দ ছিল তার। মাঝে মাঝে মা নেমতন্ন করে খাওয়াতেন বাড়িতে ডেকে। মাসিও ভালো কিছু রাঁধলে গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন আমাদের নিয়ে যেতে। জিএম-এর গাড়ি এসে দাঁড়ালে সবাই চেয়ে থাকত বলে আমার লজ্জা করত খুব। গাড়িতে মুখ লুকিয়ে বসতাম।

পাহাড়ের গোড়া থেকে পাকিয়ে পাকিয়ে ওপরে ওঠার পথটা যে কী সুন্দর ছিল! পাহাড়ের গায়ে গায়ে আবার ঘাসের ঢালু জমির ওপর কেয়ারি করা ফুলের বাগান করা। ওরকম সুন্দর জায়গা আর সুন্দর বাংলো আর কখনও চোখে পড়েনি। আমার বড়োমামা যখন ভারতীয় সেনাবাহিনীর জেনারেল হয়েছিলেন, মা-বাবা গিয়েছিলেন তাঁর রাজকীয় কোয়ার্টারে। সেখানে জাঁকজমক আরও অনেক বেশি হলেও পাণ্ডুর ওই কোয়ার্টারের মত অত সুন্দর নয়। পাণ্ডুতে জিএম যেন মুকুটহীন রাজার সম্মান পেতেন। ওই রকম ভালো আর কাজের মানুষ কম দেখা যায়। স্বাধীন ভারতের খবরদারি করা অর্ধশিক্ষিত স্বেচ্ছাচারী নেতা-মন্ত্রীদের মধ্যে একমাত্র লালবাহাদুর শাস্ত্রীকে উনি ভালোবাসতেন। শাস্ত্রীজিও তাকে। ইন্দিরা গান্ধী অত সৎ মানুষকে সইতে পারেননি।

এই সময় কানাঘুষোয় শোনা যাচ্ছিল ব্রহ্মপুত্রের ব্রিজের প্রত্যেকটা পিলারের গোড়ায় নাকি একটা করে বাচ্চা ছেলে বা মেয়েকে বলি দেওয়া হচ্ছে। একদল সাধু নাকি বাচ্চাদের চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে। ব্যস! সঙ্গে সঙ্গে শুরু হল সাধু দেখলেই দলবেঁধে মারধোর। কামাখ্যা পাহাড়ের গোড়ায় বলে অদ্ভুত সব সাজ করা সাধুর কমতি ছিল না। তারা পড়ল ঘোর বিপদে। সাধু দেখলেই খেপে গিয়ে তাড়া করত সবাই। ধরতে পারলে সাধুর জটা, দাড়ি-গোঁফ ছিড়ে পিটিয়ে আধমরা করতে দেখেছি আমিও। পুলিশও তখন সামলাতে পারত না। সত্যযুগে যেমন আকাশপথ ব্যবহার জানত সাধুরা কলিযুগে তো তা সম্ভব নয়, তাই বদমাশ সাধুদের সঙ্গে ভালোমানুষ সাধুরাও অকারণে পড়ত বিপদে। কামাখ্যায় সাধু আসা কমে গেল।

হঠাৎ আমাদের পাড়াতেই একটা ঘটনায় আগুনে যেন ঘি পড়ল। ভীষণ খেপে উঠল সবাই। চারজন ছোটো মেয়ে স্কুল ছুটি হওয়ার পরে বাড়িতে ফিরল না। এদের মধ্যে একজন আমাদের বন্ধু মীরা। সিনেমা হলের ম্যানেজারের সেজমেয়ে। কারও মনে সন্দেহ রইল না যে এটা ওই ছেলে-মেয়ে চুরি করা সাধুদেরই কাজ। শহরজুড়ে দাঙ্গার মত অবস্থা তৈরি হল। চারটে মেয়ের বাকি তিনজনও কাছেই থাকে। একজনের বাবা পুলিশে চাকরি করে। শুধু পুরো গৌহাটি শহর নয়, আরও বহুদূর অবধি তন্নতন্ন করে খোঁজ করতে লাগল সবাই। পাড়াটা রেলের লোকেদের। ট্রেনের ড্রাইভার, গার্ড, চেকার সবাই মেয়েদের চেনে। তারাও নজর রাখতে লাগল। আমরাও পাহাড়, জঙ্গল, এপাড়া ওপাড়া সব খুঁজে দেখলাম। পুলিশ তো কোথাও খুঁজতে বাকি রাখল না। মীরার বাবা, মা, জ্যাঠামশাই খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিলেন। তিনদিন পরে হঠাৎ মীরা বাড়ি ফিরে এল, বাকিরাও নাকি ফিরে এসেছে। এই তিনদিনের মধ্যে মীরাকে প্রায় চেনা যায়না। চেহারা তো অর্ধেক হয়ে গেছেই, মুখে একটা কালচে ছাপ, হাত-পায়ে কোন সাড় নেই প্রায়। কথাও বলতে পারছিল না। ডাক্তার দেখিয়ে অনেক চিকিৎসার পর একটু শরীর ঠিক হওয়ার পর মীরা বলল ঘটনাটা।

ওরা চারজন একসঙ্গেই বরাবর স্কুলে যায় আসে হাঁটাপথে। সেদিনও তাই ফিরছিল। একটা নির্জন জায়গায় হঠাৎ দু’জন সাধু ওদের ধরে ফুল শুঁকিয়ে দেয়। একটা মেয়ে পালাবার চেষ্টা করেছিল, তাকেও ধরে ফেলে সাধুরা। ফুল শোঁকানোর পর নাকি ওদের মাথা কাজ করছিল না। সাধুদের পেছন পেছন হাঁটতে হাঁটতে কতদূরে কোথায় যায় তা আর মনে নেই। পথে অনেক লোক দেখেও কিছু বলতে পারেনি ওরা। শেষে সন্ধেবেলায় বন জঙ্গলের মধ্যে একটা ঘরে এনে ওদের আটকে রাখে সাধুরা। দুবেলা একগ্লাস করে সরবত ছাড়া কিছু খেতেও পায়নি ওরা। তিনদিন পরে ওদের একটু সাড় ফিরে এলে দেখে পাশের ঘরে দু’তিনজন লোক ওদের বলি দেওয়ার কথা বলছে। বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখে এদের মধ্যে একজনকে চিনতেও পারে ওরা। লোকটা তান্ত্রিক, কামাখ্যা মন্দিরের আশেপাশে কোথাও থাকে। ভয়ঙ্কর চেহারা তার। লোকটা একটা রাম-দায়ে শান দিচ্ছিল কথা বলতে বলতে। এমন সময় লঞ্চের ভোঁ শুনে ওরা বুঝতে পারে জায়গাটা ব্রহ্মপুত্র নদের ধারেই কোথাও। তারপর মরিয়া হয়ে বেড়ার তলার মাটি সরবতের গ্লাস দিয়ে খুঁড়ে চারজনই কোনমতে পালিয়ে দুতিনঘণ্টা ধরে হেঁটে পাণ্ডু ঘাটের কাছে পৌঁছায়। তখন মাঝরাত হলেও প্যাসেঞ্জার যায় বলে দু’তিনটে রিকশা থাকে। মেয়ে চারটেকে সেই রিকশাওয়ালারাই বাড়িতে পৌঁছে দেয়। সিনেমা হলের ম্যানেজারকে চিনত সেই রিকশাওয়ালা। মেয়েরা ফিরে আসায় ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ল সকলের। পুলিশ ওদের কথামত অনেক হাঁটাহাঁটি করে জঙ্গলের মধ্যে লুকনো একটা ঘর খুঁজে পেলেও সাধুদের ধরতে পারেনি। কামাখ্যার সেই তান্ত্রিককেও আর কোনদিন দেখা যায়নি।

এরপর রেল কোম্পানি আর পুলিশের লোকেরা সবাইকে জায়গায় জায়গায় গিয়ে মাইকে ঘোষণা করে বোঝাল ব্রিজের পিলারে বাচ্চা বলি দেওয়ার ব্যাপারটা মোটেই ঠিক নয়, খারাপ লোকেদের রটনা। কেউ কেউ চায়না ব্রহ্মপুত্রের ওপরে ব্রিজ হোক। তারাই এইসব বাজে গুজব রটিয়েছে। সাধুদের সকলেই মোটেও খারাপ নয়, কিছু লোক চিরদিনই সাধু সেজে, তান্ত্রিক সেজে মানুষকে ধাপ্পা দেয়। পুলিশ কড়া নজর রাখবে, সাধুদের অকারণে যেন না পেটানো হয়। সন্দেহ হলে পুলিশের কাছে খবর দিতে হবে। আস্তে আস্তে থিতিয়ে গেল ব্যাপারটা। নিত্য পথগুলোয় পুলিশ চৌকি বসল। ছেলেমেয়েদের ওপর সকলের নজরও বাড়ল। আমার মন থেকে এইসব সাধু সন্ন্যাসীদের ওপর আর কোন বিশ্বাস রইল না।

বৃষ্টির দিনগুলো বড়ো ভালোবাসতাম। সবচেয়ে ভালো লাগত শিলাবৃষ্টি হলে। বেশ মনে পড়ে একদিন বিকেল থেকেই আকাশ ঘন কালো মেঘে ঢাকা পড়ে গেল। পাহাড়ের মাথা মেঘে ঝাপসা দেখাতে লাগল। ঝরনার তলাকার জমা জলে মাছেদের ছুটোছুটি দেখতে যেতাম রোজ। আজ বিকেলে মাছগুলো খেলছিল না, স্থির হয়ে ছিল। যেন কিসের অপেক্ষায় আছে। তাড়াতাড়ি অন্ধকার হয়ে যাওয়ায় বাড়ি ফিরে এলাম। ভানুকাকা এসেছিল কাকিমাকে নিয়ে। বাবাও অফিস ছুটির পর কোথাও যায়নি। আকাশ এত থমথমে ঘন কালো আমি আর একবার দেখেছিলাম মামাবাড়ি কালনায়। রাস্তায় লোকজন কম ছিল, একদৌড়ে খেলার মাঠ থেকে বাড়ি পৌঁছে মার কাছে গেলাম। মা রাত্রের জন্য খিচুড়ি রাঁধতে রাঁধতে গুনগুন করে কী গান যেন গাইছিলেন। কাকিমা মার কাছে বসে মাকে সাহায্য করছিলেন। বাবা আর ভানুকাকা পাশের বড়ো ঘরে জানালা খুলে আলো না জ্বেলে বসেছিলেন। মেঘগুলো এবার প্রায় পুরো পাহাড়টা ঢেকে দোতলার জানালা দিয়ে ঢুকে আসছিল। বাবা শুরু করলেন রবীন্দ্রনাথের বর্ষামঙ্গল আবৃত্তি! গমগমে গলায় সে আবৃত্তি চারদিকে ছড়িয়ে যেতে লাগল –

ওগো সন্ন্যাসী কি গান ঘনালো মনে

গুরু গুরু গুরু নাচের ডমরু বাজিল ক্ষণে ক্ষণে।

আমরা চার ভাই বোন চুপ করে বসে শুনছি। কারো মুখে কোন কথা নেই। নড়া চড়াও বন্ধ। শুনতে শুনতে মনটা যেন ছবি দেখতে আরম্ভ করল। আকাশের মেঘ, বিদ্যুৎ চমক আর আবছা গম্ভীর পাহাড় মিলে যেন রবীন্দ্রনাথকেই দেখতে পেলাম। বাবার ঐ রকম গলা, জর্জ বিশ্বাস যাকে ডবল জোয়ারী গলা বলতেন। সেই ভরাট গলার ঐ রকম আবৃত্তি আর কারো গলায় শুনিনি। আবৃত্তি শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও কারো মুখে কথা নেই। ভানুকাকার চোখে জল। মা আর দীপা কাকিমা কখন যেন রান্নাঘর থেকে এ ঘরের দরজায় এসে দাঁড়িয়েছেন। রবীন্দ্রনাথের একশ বছর বয়েস হওয়ার উৎসব শুরু হয়েছে। বাবা যেন সেরা শ্রদ্ধাঞ্জলি দিলেন তাঁকে। 

তারপর শুরু হল প্রলয়। একটানা ঝড় আর আকাশ ভাঙা বৃষ্টির শব্দে কানে তালা লেগে যায়। তার ওপর নীলচে আগুনে রেখায় আকাশ চিরে বাজপড়া। কড় কড়াৎ শব্দে ঘর বাড়ি কেঁপে উঠতে লাগল। মাকড়সার জালের মত বিদ্যুৎ ছুটে যাওয়া দেখলে বুক শুকিয়ে যায়। বৃষ্টির তোড়ে তেতলার সিঁড়ি বেয়ে ঝরনার মত স্রোত বইছে। তিনতলার টিনের ছাদে গম্‌ গম্‌ শব্দ হতে লাগল। ঝড়ের সঙ্গে ঐ তুমুল বৃষ্টি চলছে তো চলছেই। কমবার বা থামবার নাম নেই। দাদা হঠাৎ বলল বৃষ্টির সঙ্গে শিল পড়ছে রে। সিঁড়ির খোলা চাতালে এক বেঘত উঁচু হয়ে বরফ জমে গেল কিছুক্ষণের মধ্যেই। মার ভেতর থেকে ছোটোমেয়েটা হঠাৎ বেরিয়ে এল। বালতি নিয়ে মুঠো মুঠো বরফ জমা করে কি আনন্দ মায়ের। নিমেষের মধ্যে ভিজে চুপ চুপে হয়ে গেল মা। দেখাদেখি আমরাও ঐ শিলা বৃষ্টির মধ্যে মাথায় গামছা তোয়ালে বেঁধে বৃষ্টি ভেজায় মেতে গেলাম। বড়ো বড়ো শিলগুলো দেয়ালে মেঝেতে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে। বাজ পড়ছে, আমরা মনের আনন্দে বৃষ্টিতে ভিজেই চলেছি। বাবা খোলা গলায় গান গাইছেন ঘরের মধ্যে। আমরা মার সঙ্গে বাইরে। শেষে কাকিমাই কোনও মতে আমাদের টেনে ঘরে ঢোকায়, মাকেও। তারপর মাকে বকুনি দিতে গিয়ে হেসে গড়িয়ে পড়ে। ভানু কাকা বেচারার মাথায় টাক বলে ঘরেই রইল বাবার সঙ্গে। নাকি শিল পড়লে টাক ফুটো হয়ে যাবে। সেদিন কেউ আমাদের বকেনি। ঘরে ঢুকে গা মাথা তক্ষুনি মুছে জামা কাপড় পাল্টে গরম গরম খিচুরি খেয়ে আমরা কোরাস গান ধরলাম।

যে রাতে মোর দুয়ারগুলি ভাঙল ঝড়ে।

কেউ শিখিয়ে দেয়নি, আপনিই আমরা ধরে ফেললাম গানটা সবাই মিলে। ছোটোবেলা থেকে আমাদের সব কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

সেদিন ঝড় বৃষ্টি থেমেছিল রাত বারোটায়। ভানুকাকা কাকিমা বাড়ি চলে গেলেন। পর দিন দুপুরেও মাঠের ওপর জমা বরফ দেখেছিলাম। পাহাড়ের উপর অনেক বাড়ির টিনের চাল উড়ে গেছিল। পাহাড়ে অনেক বড়ো বড়ো গাছের ডাল মুচড়ে ভেঙে পড়েছিল। রেস্ট ক্যাম্পেও অনেক বাড়ির ক্ষতি হয়েছিল। বড়ো বড়ো পাথর ধ্বসে পড়েছিল নীলাচল পাহাড়ে। পরদিন স্কুল বসেনি। খেলার মাঠের পাশে ঝোপ ঝাড়ে অনেক পাখি মরে পড়েছিল, বোধহয় বড়ো বড়ো শিলের ঘায়ে। কত পাখির বাসায় ভাঙা ডিম, মরা ছানা ভাঙা ডালপালার মাঝে ছড়িয়ে ছিল। মনটা বড়ো খারাপ হয়েছিল ওসব দেখে। ঝরনার জলে ছোটো মাছগুলোর কিছুই হয়নি। পরিষ্কার জলে দিব্যি লেজ কাঁপিয়ে তারা খেলায় মত্ত। দু:খ আর আনন্দ তো পাশাপাশিই চলতে থাকে। কেউ কাউকে ছাপিয়ে যায় না।

স্কুলের বাড়িটাকে ভালো লাগত। ভেতরের মাঠটাতে টিফিনের সময় খেলতাম। দাদা দিদিও তো ঐ স্কুলেই পড়ত। আমার ওপরে ওদের নজর খুব কড়া। খুব খেয়াল রাখত। বাইরে কোথাও না যাই। আমাকে আটকানো খুব সোজা ছিল না। ঠিক বাইরে হাসপাতালের চত্বরের কৃষ্ণচূড়া গাছটার তলায় চলে যেতাম। ভুতুদের বাড়ি কাছেই। ও বাড়িতে আম, পেয়ারা কুলগাছ ছিল। গরমে আম খেতে যাওয়ার জন্য ডাকত, শীতকালে কুল। ওদের বাড়ির ভেতরের বাগানটা আমার ভালো লাগত। স্কুলের গেটের কাছে ফেরিওয়ালারা কত কি ভালো ভালো জিনিস নিয়ে বসত, আমার খাওয়ার উপায় নেই। বন্ধুরা চোখের সামনে আচার, চানা ছোলা মটর ভাজা, শোনপাপড়ি, বুড়ির চুল আর আইসক্রিম কিনে খেত। পয়সা কোথায় পেত কে জানে! আমাদের বাড়িতে মা বাবা ছোটোদের হাতে পয়সা দেওয়া পছন্দ করতেন না। আর ফেরিওয়ালাদের ঐসব জিনিস নাকি ভালো নয়।

ঠাকুমা দুই ছেলের কাছেই থাকতেন। কখনও কাশী দিল্লী বা কলকাতায় জ্যাঠামশাইয়ের বাড়িতে, কখনও আমরা যেখানে থাকতাম। পাণ্ডূতে আছেন তখন। দিদি বলে ডাকতাম ঠাকুমাকে। আমার কাজ ছিল দিদির পাকা চুল তোলা আর পিঠ চুলকে দেওয়া। দিদিও আমার পিঠ চুলকে দিতেন। একদিন খুশি হয়ে দিদি আমার হাতে একটা এক টাকা দিলেন। আমি তো বাক্যহারা, সেই প্রথম টাকা আমার হাতে। টাকাটা পকেটে রাখতে ভরসা হল না বলে মুঠোয় নিয়েই স্কুলে গেলাম। ঝামেলা কম নয়। পড়াশোনা, লেখালেখি মাথায় উঠল। অঙ্ক করার সময় বাঁ হাতের মুঠোয় ধরা টাকাটার কথা মাথায় ঘোরায় অঙ্ক ভুল হতে লাগল। দাঁড়িয়ে পড়া বলার সময় কি বলতে কি বললাম। মার খাইনি নেহাৎ তিনটে ক্লাসের পর টিফিনে ছুটি হয়ে গেল বলে। এবার কী করি? জীবনে কোন কিছু কিনিনি। বাইরে ফেরিওয়ালার কাছে গিয়ে গলা শুকিয়ে গেল। কোন রকমে একটা কাঠিতে লাল বরফ লাগানো আইসক্রিম কিনে লুকিয়ে লুকিয়ে খেয়ে ফেললাম। কি যে ভালো লাগল বলার নয়। জীবনে প্রথম নিষিদ্ধ খাবার। তারপর সাহস বেড়ে যাওয়ায় একে একে তেঁতুলের আচার, ছোটো ছোটো লাল কুলের আচার, মটর ভাজা, আমসত্ত্ব, শোনপাপড়ি খাওয়ার পরও অনেক পয়সা বেঁচে আছে। একটা আস্ত টাকা খরচ করা কি সোজা কথা! বেশ বড়োলোক মনে হতে লাগল নিজেকে। ভরা পেটে বাড়ি যেতে যেতে চৌধুরীকাকুর দোকানে একটা এরোপ্লেন খুব ভালো লাগায় কত দাম জিজ্ঞেসা করে মুখ হাঁ হল। দাম চার টাকা। আমার অত পয়সা নাগালের বাইরে। শেষে মায়ের জন্য দুটো তিনটে সুতোর গোলা কিনে বাড়ি এলাম। মার হাতে সুতো তুলে দিতে মা অবাক। হঠাৎ উপহার পেয়ে মুখের দিকে হাঁ করে তাকালেন। পেলি কোথায়? কিনেছি। কে জানত বাপু ঐ উকিলি জেরার সামনে পড়তে হবে? আমাদের কেউ কিছু দিলে আমরা জানতে চাই কোথায় পাওয়া গেল? দিদির কাছ থেকে টাকা পাওয়া, খাওয়া দাওয়া সব বলতে হল। শেষে মার জন্য সুতো কিনেছি শুনে মার কি হাসি টাকা পেয়ে আমার বিপদের কথা শুনে। খুব আদর করেও দিলেন তাঁর পেটপাতলা ছেলেকে। আমি মার কাছ থেকে কিছু লুকোতে পারতাম না। আমার কাছ থেকে সেই প্রথম উপহার পেয়ে মার চোখে জল এসেছিল।

এবার সবাইকে উপহার দেওয়ার একটা ইচ্ছে হল আমার। কে কী ভালোবাসে জানি। মা ভালোবাসেন কাজুবাদাম, বাবা সিগারেট। দুজনকে দুটো পাহাড় উপহার দিলে কেমন হয়? কাজুর আর সিগারেটের। জিনিসগুলো জমাতে হবে। শুরুতেই আমার সংকল্প বড়ো ধাক্কা খেয়ে উড়ে গেল মাথা থেকে। কাজুবাদাম কেউ উপহার দিলে জমানো যায়। সবচেয়ে সহজ হল সিগারেট জমানো। বাবার অফিসের দরজার সামনে বেশ ক’টা আধপোড়া সিগারেট পড়েছিল, ঢোকার সময় লোকেরা হয়ত ফেলে ঢুকেছে। আমার নজরে পড়ে গেল সেগুলো। রমেশকাকা এই সময় বাইরে এসে একটা সিগারেট ধরাতে না ধরাতেই ভেতর থেকে ডাক পড়ায় ওটা ফেলে ছুটল ভেতরে। আমিও দিনের সেরা সংগ্রহ পেয়ে সেটা হাতে তুলে নিলাম। ঝোঁকা অবস্থা থেকে সোজা হলাম কানে বেশ কড়া টান খেয়ে। বাবা ঠিক তক্ষুনি বাড়ি আসছিলেন। তাঁর পা থেমে যায় দরজাতেই। দেখেন তাঁর গুণধর ছোটো ছেলের হাতে ধোঁয়া ওঠা সিগারেট। কানমলার পর গোটা দুই থাপ্পড় খেয়ে আমার মাথা ঘুরে গেল। অনেক পরে মাকে আমার ঘটনাটা বলতে মা বুঝলেন, বাবাকেও বোঝালেন। তারপর আদরটাদর করে বললেন সংকল্পটা যেন বড়ো হয়ে মনে রাখি, এখনও সময় হয়নি। যার জন্য প্রথম উদ্যোগ তাঁর হাতেই চড় খেয়ে আমার মন পালটে গেল। কোন ভালো কাজে ফুল বেছানো পথ পাওয়া যায় না।

প্রথম বৃষ্টিটার পর গরম যেন আরও জমিয়ে পড়ল। আকাশে মেঘের কোন চিহ্ন নেই। কড়া রোদে মাটি ফাটতে লাগল। ঝরনার জল শুকিয়ে এল। নীলাচল পাহাড়ের গাছগুলোর পাতা শুকিয়ে লাল হয়ে ঝরে যেতে লাগল। কে বলবে, মাত্র দশ-বারোদিন আগে শিলাবৃষ্টিতে মাঠে বরফ জমে গেছিল? হঠাৎ বাবা আমাদের নিয়ে চললেন বশিষ্ঠাশ্রম। মেজপিসিমার সঙ্গে এর আগেও এসেছিলাম বশিষ্ঠাশ্রমে। রামায়ণের বশিষ্ঠ মুনি এখানে ঝরনার ধারে পাথরে বসে তপস্যা করেছিলেন বলে শোনা যায়। অত সুন্দর জায়গা আসামে খুব বেশি নেই। গৌহাটি শহরের গণেশগুড়ি থেকেই তখন ঘন বন শুরু হয়ে যেত। বনে বাঘ ছিল, হরিণ, বাঁদর, সাপ, শেয়াল আর নানা রকম পাখি তো অনেক ছিল। থমথমে বনের ছায়ায় লাল মাটির পথে আস্তে আস্তে চালাতে হত গাড়ি। হাতিও ছিল সেই বনের গভীরে। গাড়ির শব্দে হাতি তাড়া করে গাড়ি উলটে দিতে পারে। চলতে চলতে একটা মস্ত লম্বা সাপ আর শেয়াল ছাড়া চোখে পড়ল বাঁদরের দল আর উল্লুক। দাদা বলল ঝোপের মধ্যে বড়ো কোন জানোয়ার যেন দেখা গেল এক ঝলক। বনের ঘন অন্ধকারে আমরা কিছুই দেখতে পেলাম না। বেশ কিছুক্ষণ পরে সেই খাড়া পাহাড়টা দেখতে পেলাম, যার তলায় বড়ো ঝরনার তলায় পুরোনো দিনের দুটো মন্দির। ঘন বনের মাঝে এখানে গাছপালা একটু কম বলে ঝরনার জলে রোদ পড়ে চোখ ঝলসে দিচ্ছে। পেছনে খাড়া পাহাড়টাতেও ঘন জঙ্গল, যেখানে রোদ পৌঁছায় না। আমরা ক’জন ছাড়া আর কেউ ছিল না সেখানে। স্তব্ধ বনের মধ্যে শুধু ঝরনার কুলকুল শব্দ আর পাখির ডাক। বড়োরা ঝরনার জলে চান করতে নেমে গেলেন। আমরা পাথরে বসে ঝরনার ঠান্ডা জলে পা ডোবালাম। মা চান করে এসে আমাদের চান করিয়ে দিলেন। বড়ো বড়ো পাথরের মধ্যে দিয়ে গমগম আওয়াজ করে জলের স্রোত নেমে গেছে নীচের দিকে। অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম বশিষ্ঠাশ্রম। শ্যাওলাধরা পাথুরে মন্দিরটা নাকি হাজার হাজার বছরের পুরনো। কল্পনায় দেখতে পেলাম বশিষ্ঠ মুনি ঝরনার পাশে পাথরের চাতালে বসে ধ্যান করছেন। রাতে এখানে বাঘ, হাতি, হরিণরা জল খেতে আসে বলে খাওয়াদাওয়া করে বিকেলেই ফিরে এলাম বাড়ি। ফেরার পথে গাড়ির হেডলাইটের আলোয় বেশ বড়ো একটা জানোয়ারকে বিদ্যুতের মত রাস্তা পেরিয়ে যেতে দেখা গেল। দাদা ফিসফিস করে বলল চিতাবাঘ মনে হল। রাত্রে বিছানায় শুয়ে কল্পনা করলাম আমি যেখানে পা জলে ডুবিয়ে বসে ছিলাম সেখানে একটা চিতাবাঘ উবু হয়ে ঝরনার জল খাচ্ছে। ঘুমের মধ্যেও আমার মনে জেগে রইল বশিষ্ঠাশ্রমের ঝরনার ঝরঝর আর সেই শান্ত বনের তলায় জমে থাকা হাজার বছরের অন্ধকার। সেই চমৎকার জায়গাটা আর আগের মতো নেই। বনের সেই রহস্য উধাও।

বর্ষা এল। এখানে বর্ষার মেঘ বড়ো চঞ্চল। পাহাড়ি জায়গা বলে বাতাসের ঠেলায় এই খালি আকাশে এই মেঘের দলের দৌড় শুরু হল। নীলগাইয়ের মত আকাশজুড়ে তাদের ছোটাছুটি, মাতামাতি চলছে, সঙ্গে সমানে ঝিরঝির বৃষ্টিরও বিরাম নেই। পলিমাটিতে কাদা তেমন হয়না, জলও জমে থাকে না। বৃষ্টিভিজে গাছগুলো সবুজ পাতায় ঢেকে যায়। আর ঝোপঝাড় ঘন হয়ে বেড়ে ওঠে। বড়ো বড়ো গাছ বেয়ে ছড়িয়ে যাওয়া লতায় কতরকমের ফুল ফোটে। বাতাসে ঝাঁপিয়ে পড়া লতাগুলোর ডগা বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে দোল খায়। বড়ো বড়ো গাছের বিশাল গুঁড়ির ফাটা বাকল বেয়ে জলের ফোঁটা নামে। মুখে ডিম নিয়ে পিঁপড়ের দল ওপরে উঠে নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। গাছের তলায় পাথরের খাঁজে আঁধার বন আলো করে কুরুক মাথা তোলে। যাকে আমরা বলি ব্যাঙের ছাতা। কী যে সুন্দর কোনো কোনোটার রঙ! কাঠবেড়ালির দল কোটর থেকে মুখ বাড়িয়ে বৃষ্টি দেখে। কতরকম পোকামাকড় যে জন্মায়! নীলাচল পাহাড় ঝাপসা করে মেঘ জমে থাকে। পাথরের তলায় তলায় শরীর ঢেকে চলা ঝরনার জল বাড়ে। রোদ উঠলে বনের আড়ালে নির্জন বাসায় পাথরের ওপর বিড়ে পাকিয়ে, ফনা তুলে, স্থির হয়ে শরীর গরম করে শঙ্খচূড়, শাখামুটি। কামাখ্যা মন্দিরের যাত্রীরা এপথে বড়ো একটা চলে না বুনো জন্তু বা বৃষ্টিভেজা পাথরে পিছলে পড়ে মরার ভয়ে। যারা যায়, সাবধানে পা টিপে টিপে চলে তারা।

আমরা পাহাড়ে যাই রোজ। আমার সঙ্গে যায় বাবু, বাচ্চু আর পানু। পানুর বয়স তখন তিন। আমিই বোধহয় বড়ো, আট। পকেটে জমিয়ে রাখা ফুল, ফলের বীজ ভেজা মাটির ওপর ছড়াতে ছড়াতে অনেকদূর অবধি উঠে যাই। ভয় পাইনা, আমরা বন ভালোবাসি। বনের পথে পাশকাটিয়ে সাপ চলে যায়, তারা কিছু বলে না আমাদের। পাখিরাও বোধহয় চেনে আমাদের, উড়ে পালায় না। ব্যস্ত থাকে লালরঙা কাঠবেড়ালির দল। আমাদের দিকে ফিরেও চায়না। বড়োজোর ফোলা লেজ নাচিয়ে চিক চিক ডেকে আলাপটা ঝালিয়ে নেয়।

এবাড়ি ওবাড়ি বন্ধুদের কাছে যাওয়া আসা তো ছিলই। তারাও আসত-যেত আমাদের বাড়ি। আজ চাঁদুর এক দিদি হঠাৎ আমাকে ধরে ধমক দিয়ে বললেন তুই আমার পেনটা চুরি করেছিস, ফেরত দিয়ে যাবি। আমার কেমন গলা শুকিয়ে মাথা ভোঁ ভোঁ করতে লাগল। কোন উত্তর দিতে পারলাম না। আমি আজও যে কথা ভাবতেই পারিনা, আট বছর বয়সের সরল ছেলে আমি চুরি করব ওনার পেন? জিনিসপত্র দূরে থাক, আমাকে কোন বাড়ির বাগানের ফুলে হাত দিতেও কেউ দেখেনি। তাকে চোর বলা সরাসরি! সত্যি বলছি, এমনভাবে কেউ কোনদিন আমাকে আঘাত করেনি। ঘণ্টাখানেক ওদের বাড়ির রকে চুপ করে বসে থেকে দিদির সঙ্গে বাড়ি চলে আসি। দু’দিন বাদে ওই কলম মেয়েটির ভাইয়ের কাছেই পাওয়ার পর দিদির কাছে আদুদি খুব দুঃখ করেছিল আমাকে ওইভাবে বলার জন্য। আমি আর কোনদিন ওদের বাড়িতে যাইনি। জানি না এ লেখাটা ওই মহিলার চোখে পড়বে কিনা, পড়লে অন্তত মনে মনে ওই আট বছরের সরল ছেলেটার কাছে যেন মাপ চেয়ে নেন। তাহলে হয়ত তাঁর পাপ কিছুটা কমতে পারে।

হাসপাতালের ওপাশে রাস্তা পেরিয়ে ভাসান পালের দোকান। বর্ষার মধ্যেই বাঁশের কাঠামো বাঁধা হত রথের সময় থেকে। আমাদের মন পড়ে থাকত ঐখানে। রথের মেলায় মাটির পুতুল, কাঠের নানা বাসনপত্তর আর লটকন পাওয়া যেত। লটকন বড়ো ভালো খেতে। কলকাতায় একেই বোধহয় বলে আঁশফল। ছাড়ানো, ছোটোমাপের লিচুর মত। বাইরের খোলসটা বাদামি, খরখরে। লটকনে আঁশের চাইতে গোল কালো বিচিটাই যদিও বেশি জায়গা নিয়ে নিত, তবু ছাড়িয়ে খেতে ভালো লাগত। বিচি জমিয়ে রাখতাম পাহাড়ে ছড়াবার জন্য। রথের সময় বৃষ্টি হবেই, ভিজতে ভিজতে সেই মেলা দেখার মজাই আলাদা। আশেপাশের গরিব মানুষেরা ঘুঘনি বা আলুর দম নিয়ে বসতেন। বিক্রি হত ভালোই। তালপাতার টুকরো চামচের মত করে ধরে সেই ঝাল ঘুঘনিও খেতাম। মা কিনতেন নারকোলের সন্দেশ আর লটকন। রথের জগন্নাথ ঠাকুরের পুজো হয়ে গেলে হরির লুঠ হত। আমি কোনদিন একটা বাতাসাও কুড়োতে পারতাম না।

ভাসান পাল প্রতিমা তৈরিতে হাত দিতেন রথের দিন থেকেই। আমরা স্কুলের টিফিনের সময় মাঝে মাঝে ওখানে গিয়ে দাঁড়াতাম। হোদল আর প্রদ্যোৎদাও থাকত। প্রদ্যোৎদা হোদলের দাদা। ও খুব ভালো ছবি আঁকতে পারত। ওদের বাড়ির দেওয়ালে টাঙানো থাকত ওর আঁকা ছবিগুলো। একটা ঘোড়ার ছবির কথা মনে আছে। নিতাই চন্দ আর জয়নারায়ণ কাকা পাড়ার বিখ্যাত লোক। ভয় পেতাম আমরা। ওদের মাঝে মাঝে দেখতাম এসে দাঁড়াতে। ওদের বোধহয় ঠাকুর বানানোর অর্ডার দেওয়ার ব্যাপার ছিল বলে আসত। প্রথমে হাত পড়ত বিষ্বকর্মা ঠাকুর তৈরির কাজে। কাঠ আর বাঁশের শক্ত কাঠামোর উপরে দড়ি দিয়ে খড় বাঁধা শুরু হলেই মূর্তি কেমন হবে বোঝা যেত। অবাক হয়ে দেখতে দেখতে টিফিন শেষের ঘণ্টা পড়লেই দৌড়। আবার পরের দিন টিফিনের সময় যেতাম। একটু একটু করে মাটি দিয়ে ঠাকুর তৈরি হয়ে যাবার পর অপেক্ষায় থাকতাম রং পড়বে কখন।

রং তৈরি করাটা দেখতে ভালোলাগত। পাশাপাশি মাটির অনেকগুলো বাটিতে গুঁড়ো রং আর আঠা মিশিয়ে মূর্তিতে দেবার রং তৈরি হত। আমার খুব ইচ্ছে করত ঠাকুরের গায়ে রং দিতে। ভাসান পালকে বলার সাহস পেতাম না। ওঁকে দেখলে রাগী মনে হত। একদিন স্কুল ছুটির পর সোজা পথে বাড়ি না ফিরে হাসপাতালের পাশ দিয়ে গিয়ে দাঁড়িয়েছি ভাসান পালের দোকানের সামনে। সাদা রং শুকিয়ে যাবার পর রং গোলা হয়েছে হাতির গায়ে দেবার জন্য। ভাসান পাল আমাকে কদিন ধরেই দেখছেন। আমার মুখ দেখে যা বোঝার বুঝেও গেছেন বোধহয়। হঠাৎ রঙের বাটি আর তুলি হাতে আমায় কাছে ডাকলেন। মুখে মিটমিটে হাসি।

রং দিবি হাতির গায়ে?

কোনমতে মাথা নেড়ে বললাম, হ্যাঁ!

তুলিটা আমার হাতে ধরিয়ে সরে দাঁড়ালেন ভাসান পাল। আমি শুরু করলাম পায়ের দিক থেকে। নখের জায়গাগুলো সাদা বাঁচিয়ে পায়ে রং দেওয়া হয়ে যেতেই আবার পাশে এসে তুলি চেয়ে নিয়ে নিজে বসলেন রং করতে। হাসি হাসি মুখ।

– ছবি আঁকতে পারিস বুঝি ?

-হ্যাঁ , একটু একটু

-ভালোই তো পারিস। নখটা সাদা রাখতে তো বলে দিইনি। বাড়ি যা এবার। ভাববে সবাই কোথায় গেলি। পরশু চোখ আঁকার সময় আসিস।

আমি প্রায় নাচতে নাচতে ছুটলাম বাড়ির দিকে। সেদিন বাস চাপা পড়তে পড়তে কোনওমতে বেঁচে গেছিলাম। আমার মন রাস্তার দিকে ছিল না সেদিন। তারপর থেকে মাঝে মাঝেই গিয়ে দাঁড়াতাম ঐ দোকানের সামনে। দুর্গাঠাকুর, কালীঠাকুর তৈরির সময় মনে আলাদা একটা উত্তেজনা হত। মূর্তিগুলো হত অনেক বড়ো। ভাসান পাল থাকতেন খুব ব্যস্ত। আমার দিকে ফিরে তাকাবার সময় পেতেন না। মনে মনে ভাসান পালকেই গুরু মানলাম। মাটির মূর্তি তৈরি করতে ওখানেই প্রথম দেখি।

আমার বাবা বলতেন যার কাছ থেকে যা শিখবে তাকে মনে রাখবে। গুরু বলে মানবে। ফলে আমি জীবনে অনেক গুরু পেয়েছি। মনেও রেখেছি। ভাসান পালের নামটাও আমায় ভাবাত। ঠাকুর পুজোর পর ভাসান দেওয়ার ব্যাপারটা খারাপ লাগত আমার। যার মূর্তি বানিয়ে পুজো করা হল তাকে যত্ন করে না রেখে ঐ রকম ঢাক ঢোল বাজিয়ে নাচতে নাচতে জলে ফেলে দেওয়ার কারণটা বুঝতেই পারতাম না। এর পেছনে অনেক গভীর চিন্তা থাকতেও পারে, আমার খুবই খারাপ লাগত। তাই ভাবতাম, ভাসান নামটা কে রেখেছিল রে বাবা! বাবাকে বলায় খুব গম্ভীরভাবে বললেন মূর্তি ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যাপারটা আসলে কারোরই ভালো লাগে না। ফেলেই যদি দেবে তবে অত খাতির করে পুজো করার মানেটা কি? মূর্তি না বানালেই হয়। পুজোর জাঁকজমক আমাকে একটুও খুশি করতে পারে না। দেখানোপনা মনে হয় পুরোটাই। বেশ কম্পিটিশানও চলে পুজো নিয়ে। ওভাবে না করে মনে মনে পুজো করলেই হয়। মনটা অত ঘটা করে পুজো করতেই পারেনা। পুজো তো করে ভেতরে থাকা শান্ত মনটাই। কেউ কেউ পুজো করে অভ্যেসে, মনের যোগ নেই। আমার পুজো শুধু মনে নয়, ছুটির আনন্দে, ধুনোর গন্ধে, সকালের শিউলি ফুল কুড়োনোয়, রেডিওর মহালয়ায়, নতুন জামা কাপড়ে আর প্রসাদে। প্রতিমা দেখতে খুবই ভালো লাগত, জলে ভাসিয়ে দেবে বলে মন খারাপটাও লেগে থাকত। মস্ত বড়ো প্রতিমার তুলনায় ভালো লাগত ছোট্ট ঠাকুর।

আমার যা কিছু ছিল সব মনের ভেতরে ভেতরে। মুখে বেশি কিছু বলতে পারতাম না। ছোট্ট ছিলাম বলে আমাকে কেউ নজরও করত না। আমারই দিদি সর্বানীর মুখে সব সময় খৈ ফুটতো। দেখতেও ভালো। আমার ওপর ওর যত খবরদারি। তবে পিঠোপিঠি ছিলাম বলে ভাইবোনেরা কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারতাম না। মা বাবাকে ছাড়া কোন আনন্দ ভাবতেও পারতাম না। মনে আছে শিলং বেড়াতে যাবার কথা। হঠাৎ স্কুল থেকে ছুটি করিয়ে রমেশকাকা বাড়িতে নিয়ে গেল। দাদা মেজদিকেও ছুটি করিয়ে নিয়ে এসেছে। বাড়ির একতলায় একটা বড়ো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। শুনলাম আমরা শিলং শহরে যাব। বাবার বয়স্ক একজন সহকর্মীও যাবেন আমাদের সঙ্গে। তাঁর নাম ‘আকাইল্যা’। ঐ রকম অদ্ভুত নাম জীবনে শুনিনি। বাবার চেয়ে বয়সে বেশ বড়ো মোটাসোটা মানুষটা হাসিখুশি মনে হল। জিনিসপত্র গুছিয়ে রওনা হয়ে অনেকটা চলে যাবার পর মায়ের মনে পড়লো একগাদা চিতল মাছ বেছে ‘মুইঠ্যা’ বানানোর জন্য আলমারিতে রাখা ছিল, রওনা হবার তাড়ায় সেটা পড়ে আছে বাড়িতেই। তখন তো ঘরে ঘরে ফ্রিজ ছিল না। ফেরার পর পচা মাছের গন্ধে ঘরে ঢোকা যাচ্ছিল না।

শিলং যাওয়ার পাহাড়ি পথ এখনকার মত চওড়া ছিল না। পাহাড়ে গাছপালা অনেক বেশি ছিল। গাড়ি চলত কম। বশিষ্ঠ যাবার পথ আর উনত্রু জল বিদ্যুৎ প্রকল্প ছাড়িয়ে পাহাড়ে উঠতে উঠতে জঙ্গলের ফাঁকে ফাঁকে একটা ঝরনার চলা দেখতে পাচ্ছিলাম। পাহাড়ের গায়েও কোন কোন বড়ো পাথরের গা বেয়ে জলের ধারা দেখতে পাচ্ছিলাম। গাড়ির শব্দ ছাপিয়ে একটা অদ্ভুত শব্দে কানে তালা লেগে যাচ্ছিল। একবার গাড়ি থামানো হলে বুঝলাম শব্দটা মন্দিরের ঘণ্টার আওয়াজ। আকাইল্যা বললেন ওটা ঝিঁঝিঁ ডাক! ডাক ঠিক নয়, ডানার সঙ্গে পা ঘষে ওরা দল বেঁধে ঐ রকম শব্দ করে। নংপো বলে একটা জায়গায় গাড়ি দাঁড় করানো হল। বড়োরা একটা হোটেলে ঢুকলেন চা খেতে আমরা গাড়িতেই বসে রইলাম। গাছের তলায় বসে লাল রঙের একরকম মাংসের ওপর থেকে ঝাউপাতা নেড়ে মাছি তাড়াচ্ছিল একজন মহিলা। পাশেই রাখা আছে একটা হরিণের মাথা। আর একজন স্কোয়াশ, প্লাম আর বুনো কুল বিক্রি করতে বসেছিল। অদ্ভুত তাদের পোশাক। ফল বেচা লোকটা হাতে লম্বা বাঁশের পাইপে তামাক খাচ্ছে। নীলচে ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে বাতাসে। বাবাও পাইপে করে তামাক খান, গন্ধটা অন্যরকম লাগল। একটু বুনো বুনো গন্ধ মনে হল। পাহাড় জঙ্গলের গন্ধের সঙ্গে চমৎকার খাপ খেয়ে যাচ্ছে। যত ওপরে উঠতে লাগলাম ঠান্ডা বাড়তে লাগল। মা ব্যাগ থেকে সোয়েটার, মাফলার বের করে দিলেন। 

প্রায় ষাট বছর আগে শিলং ছিল অন্যরকম। এত লোকজন, এত গাড়ি, বাড়ি কিছুই ছিলনা। আমরা থাকতে এলাম পাথর ছড়ানো ঢালু পথে নির্জন একটা জায়গায়। একটা ছোট্ট নদীর পুল পেরিয়ে ঢালু জংলি জমির ওপর বাগান ঘেরা লজে লাইটুমুখরায়। বড়ো বড়ো সরল গাছের বন। তাদের ঝিরিঝিরি সূচের মত ঘন পাতায় বাতাস বয়ে গেলে শিরশির শব্দ হয়। বাতাসে ধুনোর গন্ধ ছড়িয়ে যায় রোদ উঠলে। সূর্যের আলো কিন্তু গাছগুলোর তলায় মাটি ছুঁতে পারেনা। সবুজ অন্ধকারে ছোটো ছোটো সিকি-আধুলির মত রোদের টুকরো জ্বলজ্বল করে। পাথুরে রাস্তার বাঁকে পাথরের সিঁড়ি ভেঙে ছোটো টিলার ওপর বাংলো বাড়ি। পাশে মস্ত বড়ো একটা ন্যাসপাতি গাছের ঘন ছায়ায় কাঠের বেঞ্চ পাতা। কাঠের তৈরি চমৎকার বাড়িটা ছ’সাত ফুট উঁচু খুঁটির ওপর বসানো। মাথার ওপর নীল ঢেউ-টিনের ছাদ। কাঠের সিঁড়ি দিয়ে উঠে তিনদিক ঘিরে কাঠের রেলিং দেওয়া ঘোরানো বারান্দা। ছাদ থেকে কাঠের টবে অর্কিড গাছে ফুল ফুটে আছে। আমরা যখন এলাম তখন বিকেল ফুরিয়ে আসছে। সরলগাছের তলাকার অন্ধকার ঘন হচ্ছে। নদীটা পুলের এদিকে দুপাশে খাড়াই পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে নীচের দিকে চলেছে। কান পাতলে মিঠে শব্দ শোনা যায়। অন্ধকারে অল্প সাদা ফেনা ছাড়া কিছুই দেখা যায়না।

আমাদের লাগোয়া বাড়িটার নাম ‘হাই উইণ্ডস’। বেঁটে লতানো গোলাপের বেড়ার ওপাশে বাড়িটা একটু পুরনো। ওবাড়ি থেকে দু’তিনজন খাসিয়া ছেলেমেয়ে সকালবেলায় খেলতে এল আমাদের সঙ্গে। ওরাই বলেছিল, নদীটার নাম লুমপারিং। কাউকে না বলে, ঢালু জমির ঝোপঝাড় ডিঙিয়ে পৌঁছে গেছিলাম নদীর কাছে। একা যেতে সাহস পাইনি, দাদা আর আমি। দাদা এমন কিছু বড়ো নয়, তবু আমার ভরসা ছিল দাদা, দিদির ওপর। সকালের খাওয়ার সময় কেউ আর আমাদের খুঁজে পায় না। নদীর হাঁটুজল পেরিয়ে বড়ো বড়ো পাথর ডিঙিয়ে আমরা চলে গেছি অনেকদূর। এখানে জঙ্গল অনেক ঘন। গায়ে গায়ে দাঁড়ানো বিশাল গাছগুলোর মাথা দেখা যায়না। ঘন ডালপালার ফাঁকে আকাশটাও আর নজরে পড়ছে না। এখানে নদীটা একটু চওড়া, বোধহয় কিছুটা দূরে কোন জলপ্রপাতে মিশে গেছে। নদীর স্রোতের মিষ্টি টুংটাং শব্দটা অনেক জোরালো। এখানে থেমে পাথরের ওপর বসলাম কিছুক্ষণ। ওপর থেকে পাতা ঝরে পড়ছে মাথার ওপর। জল বেশি গভীর নয় লুমপারিং নদীতে। কাচের মত পরিষ্কার জলের তলায় ছোটো ছোটো মাছগুলোকে দেখতে পাচ্ছি। পাথরের গায়ে জন্মানো শ্যাওলা ঠুকরে কী খাচ্ছে কে জানে! হঠাৎ বাড়ির জন্য মন কেমন করে উঠল। ওরা নিশ্চয়ই খুঁজছে আমাদের। বেশ খিদেও পেয়েছে। উঠে পড়লাম দু’জনেই। বনের মধ্যে পথ হারিয়ে বাড়ি ফিরতে দেরি হয়েছিল আমাদের। বকুনিও খেয়েছিলাম। কিন্তু লুমপারিং নদীকে ভুলতে পারিনি। মনের কোণে ঝিরঝির করে বয়ে চলেছে। 

প্রথম দিন ঘরে ঢুকতে গিয়ে ভীষণ চমকে প্রায় ভিরমি খাই আর কী! সে কথাটা বলা হয়নি। দরজা খুলতেই দেখি দুটো বড়ো বড়ো সবুজ চোখ জ্বলজ্বল করছে। প্রায় দম বন্ধ হয়ে এসেছে আমার, কোন রকমে খাড়া আছি। বিশাল একটা বাঘ আমার দিকেই চেয়ে আছে, তার হাঁ-মুখে সারি সারি দাঁত কম আলোতেও দেখতে পাচ্ছি। এই বুঝি লাফ দিল! আমার হুঁশ পুরোপুরি চলে যাবার ঠিক আগে বাংলোর পাহারাদার এঘরে আলো দিতে এসে আমায় দেখতে পায়। তখন জানতে পারি ওটা স্টাফ করা বাঘ। মরা বাঘের চামড়ার মধ্যে তুলো পুরে সেলাই করে রাখা। চোখ দুটোও কাচ বসানো। অন্ধকারে হঠাৎ মুখোমুখি হয়ে গেলে ভয় তো করবেই! বাঘটাকে নাকি লুমপারিং নদীর ধারের বনেই শিকার করা হয়েছিল অনেক বছর আগে। ও মানুষখেকো হয়ে গেছিল বলে কোন বাঙালি শিকারি গুলি করে মারেন। 

ছোটোবেলাটা হল দিনেরবেলায় স্বপ্ন দেখার। শিলং শহরের লেক, বিডন-বিশপ আর এলিফেণ্ট ফলস, শিলং পিকের সেই অসাধারন দৃশ্য আর তার পাশের ঘন পাইন বনের স্বপ্ন দেখতাম আমি। পাইন বনের ভিতরে অর্কিড ফুল ফুটে আলো করে রেখেছে। গাছের গোড়ায় ভেজা মাটি আর পচা পাতার স্তূপে কত যে ব্যাঙের ছাতা ফুটে থাকত! রং বদলানো বহুরূপী বা ক্যামেলিয়ন গাছের গা আঁকড়ে ধরে আমাদের দিকে গোল গোল চোখে চেয়ে দুলতো। ঐ বনেও নাকি চিতাবাঘ থাকত। গাছের কোটরে ছিল হর্নবিল বা ধনেশ পাখির বাসা। ওটাই ছিল আমাদের মায়াবন। এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো মাপের প্রজাপতিও ওখানেই পাওয়া যেত। শিলং থেকে ফেরার পথে ‘বরপানি লেক’ দেখে স্তব্ধ হয়ে যাওয়ার কথাও মনে আছে। পাহাড় ঘেরা এতবড়ো মাপের লেক আর নজরে পড়েনি কোথাও। এপার ওপার দেখা যায় না তার। নীল জলের ওপর আকাশের রোদ ছায়া সবসময় রূপ বদলানোর খেলা খেলতো। বাতাসে শিউরে ওঠা জলের ঢেউ লক্ষ হিরের মত ঝলসে উঠত রোদ পড়লে। তারদিকে চেয়ে থাকাই যেতনা। দূরের পাহাড়গুলো আকাশের নীলের সঙ্গে মিশে আবছা হয়ে ফুটে উঠত। মনে হত কত কত দূর। অনেক পরে লীলা মজুমদারের ‘আর কোনখানেতে’ পেলাম শিলঙের কথা। আমার শিলঙের সঙ্গে তাঁর খুব মিল। সেই শিলং পিক, লাইটুমুখরা, লুমপারিং নদী, বরপানি, সেই করোগেটেড টিনের চাল আর ইকরার দেওয়াল দেওয়া ‘হাই উইন্ডস’ বাড়ি। এখনকার কংক্রিটের হাত পড়ে যাওয়া পথঘাটে জ্যাম হওয়া শিলং শহরের সঙ্গে তার কোন মিল নেই। উন্নয়ন কখনও কখনও মানুষের বোকামি।

পঞ্চাশ বছর পরে আবার এবং শেষবার শিলং গিয়ে দেখি শিলং পিক গেছে বদলে। পাইনের বন কেটে কংক্রিটের সারি সারি আর্মি কোয়ার্টার। বরপানিকে রেলিং ঘিরে পাটাতন বসিয়ে নানারকম ফূর্তির ব্যবস্থা। দোকান টোকানে নির্জন জায়গা জমজমাট। এলিফ্যাণ্ট ফলসে নানারকম আলো, সিঁড়ি বসিয়ে আর জঙ্গল কেটে শেষ করে দিয়েছে তার বুনো সৌন্দর্য! জলের ধারাও যেন স্তিমিত। ভয়ে লাইটুমুখরার দিকে আর যাইনি। উন্নয়নের কারিগরদের কি সৌন্দর্যবোধ থাকতে নেই?

পাহাড়ের গোড়ায় বশিষ্ঠমুনির আশ্রমেও একই অবস্থা। বনটা প্রায় নেই। গাছপালা কেটে ঘরবাড়ি আর শপিং মল বসানো হয়েছে। বশিষ্ঠাশ্রমের গা ঘেঁষে সেনাবাহিনীর মস্ত ক্যান্টনমেণ্ট। শেষ করে দিয়েছে অত সুন্দর জায়গাটাকে।

ফিরে যাই ছোটোবেলায়।

শিলং থেকে ফেরার পর পান্ডুতে মন বসতে সময় লাগল আমাদের। লালপাহাড়ের গায়ে পান্ডু ঘাটের পথে যেতে টেম্পল ঘাট বলে একটা জায়গা আছে, ওখানেও রেল কোম্পানীর কটা পাকা কোয়ার্টার আছে। সেগুলো পার হয়ে বাঁদিকে একটা টিলার ওপর ওঁবাবার আশ্রম। মা ওখানে যেতে ভালোবাসতেন। আমরাও যেতাম সঙ্গে। গাছপালায় ঢাকা জায়গাটি বড়ো শান্ত। টিলার গা ঘেঁষে বয়ে যাওয়া ব্রহ্মপুত্র নদের ওপর ঝুলন্ত একটা বারান্দায় বসলে মন ভালো হয়ে যায়। একটি ছোট্ট মন্দির আর দু তিনটে ইকড়ার দেওয়াল ঘেরা ঘর। মাথার উপর টিনের চাল। আশ্রমে চার পাঁচ জন মহিলা থাকেন। পুজো হতে দেখিনি। আমরা গেলে বাতাসা, নকুলদানা আর ফল প্রসাদ দিতেন খেতে। এখানে পাখির ডাক ছাড়া কোন শব্দ নেই। একটা ঘরের মধ্যে অনেক বই দেখতে পেলাম। দরজা বন্ধ বলে দেখার উপায় নেই। ঐটি ওঁবাবার থাকার ঘর ছিল। নদীর ওপর ঝুলন্ত বারান্দায় বসে ধ্যান করতেন তিনি। ওঁবাবা আগেই মারা গিয়েছিলেন বলে আমরা তাঁকে দেখতে পাইনি। মা ওখানে গিয়ে গাছের ছায়ায় চুপ করে বসে থাকতেন অনেকক্ষণ। পাথুরে সিঁড়ি দিয়ে ওখানে উঠে যেতে যেতে কত রকম গাছ যে নজরে পড়ত! মা বলতেন এ গাছগুলো থেকে ওষুধ তৈরি হয়। ওঁবাবা নানা জায়গা থেকে খুঁজে এনে এখানে বসিয়ে ছিলেন। মারা যাবার পরেও নাকি অনেকে দেখেছে ওঁবাবা বসে আছেন তাঁর প্রিয় ধ্যানের জায়গায়। চাঁদের আলোয় কুয়াশার মত আবছা শরীর নিয়ে বাগানে গাছপালা দেখে বেড়াতেন। আমাদের কখনও দেখা হয় নি। আমরা দেখতাম কত পাখি যে বাসা বেঁধে আছে সেই বনে। কাঠবেড়ালি আর লালমুখো বাঁদরের দল নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। আর দেখতাম ব্রহ্মপুত্রের ওপর জল কেটে চলেছে লঞ্চ, ছোটো ছোটো নৌকো। অনেক উঁচু থেকে তাদের দেখাত ছোট্ট। ওপারে অনেকদূরে ধোঁয়া ধোঁয়া আমিলগাঁও, আগিয়াঠুরির পাহাড়ের সারি। আর দেখতাম ব্রহ্মপুত্রের ওপর ব্রিজের কাজ চলছে। একদিন লোকে গাড়ি বা ট্রেনে চড়ে পৌঁছে যাবে পান্ডু। দূর থেকে দেখাত ঝুলনে সাজানো ব্রিজের মত। 

রথের মেলায় কেনা পুতুলগুলো কাজে লাগত ঝুলন সাজানোর সময়। বর্ষাকালেই ঝুলন পূর্নিমা। রাজকাহিনীতে বাপ্পাদিত্যর গল্প পড়ার পর খুব ভালোভাবে ঝুলন সাজাতে ইচ্ছে হত আমাদের। বালি সুরকি মাটি পাথর বয়ে এনে কদিন মাকে খুব ব্যস্ত রাখতাম। ঘর বারান্দা দিনে কয়েকবার করে ঝাড় দিয়ে পরিষ্কার করতে হত। বিরক্ত হলেও বাধা দিতেন না মা বাবা। পিচের রাস্তা তৈরি করতে কয়লা আর কাঠকয়লাও গুঁড়ো করতাম। পাহাড় থেকে শ্যাওলা খুঁজে নিয়ে আসতাম। চৌকো চৌকো ধানক্ষেত তৈরি করতে। ছোট্ট দোলনায় রাধাকৃষ্ণের ছোট্ট মূর্তি বসিয়ে সূতোর টানে দোলাতাম। প্রদীপ জ্বেলে মা ছোট্ট থালায় নকুলদানা আর বাতাসা সাজিয়ে দিতেন। পিঁপড়েরাও আসত প্রসাদ খেতে।

বাড়ি তৈরি হত দেশলাই বাক্স আর বাবার সিগারেটের প্যাকেট দিয়ে। রাংতা দিয়ে টিনের ছাদ। দাদা এসব ছেলেমানুষীতে খুব একটা থাকত না। ব্যাপারটা ছিল আমাদের তিন ভাইবোনের। মাও সাহায্য করতেন। শিখিয়ে দিতেন আয়না দিয়ে কি করে পুকুর তৈরি করতে হয়, সবুজ কাপড় দিয়ে পাহাড়।

হোদলদের বাড়িতে প্রদ্যোৎদা ফোয়ারা তৈরি করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিল। সাইফন ব্যাপারটা ওঁর কাছেই শেখা। সব চেয়ে ভালো ঝুলন সাজাতো বাজারের পাশে ছোট্ট মন্দিরের সেই সাধু। বড়ো দোলনাটায় আলো জ্বেলে দুলিয়ে দিলে কি ভালো যে লাগত! তাঁর তলায় পাহাড়, গাছপালা, মন্দির সব নিখুঁত। মাকে বলতাম ঝুলন সারা বছর রেখে দিলে হয় না? ঝুলন সাজাতো বলেই ঐ সাধুকে ভালোবাসতাম।   

কখন যে দুর্গাপুজো এসে যেত কাছে! এখনকার মত মস্ত বড়ো ঠাকুর হত না ওখানে। ভাসান পালের দোকানেই কাঠামোতে খড় বাঁধা হত। দুর্গা, অসুর আর সিংহের বড়ো কাঠামো, বাকি চার ভাইবোন ছোটো ছোটো। মাথার ওপর ত্রিপল খাটিয়ে অনেক ছড়ানো জায়গায় কাজে ব্যস্ত থাকত ভাসান পাল। পুজোর পরেই অ্যানুয়েল পরীক্ষা বলে দেখতে যাওয়া কমে যেত। দুর্গার মূর্তির পেছনের চালিটা আলাদা তৈরি হত। ওটার দিকে আমার বিশেষ নজর। শিবের মূর্তি থাকত মাথার ওপর। দুপাশে নৌকো, ঘোড়া, পালকি, হাতি আর ছোটো ছোটো কুকুর, বেড়াল, পাখি, মানুষ, ষাঁড়, গাছপালা, নদী, পাহাড়, চাঁদ, সূর্য, রাত কত কী যে আঁকতো! দেখে অবাক লাগত।

শিউলি গাছগুলোর তলায় ফুল বিছিয়ে থাকত। ব্রহ্মপুত্রের পারে কাশ ফুল ফুটে হাওয়ায় দুলতো। বৃষ্টি ভিজে পরিষ্কার গাছপালা, মাটি, পাথর সবাই মিলে পুজোর অপেক্ষায় থাকত যেন। মহালয়ার দিন শেষ রাতে রেডিওতে কান থাকত সকলের। আধো ঘুমে মহালয়া শুনে গায়ে কাঁটা দিত আমাদের। সকালে রোদ ওঠার পরেও ঘোর কাটতো না। পূজো শেষ হয়ে যাবার পরেও থেকে যেত ঘোর।

ছোটো মন্দিরের পাশে ছোটো প্যাণ্ডেল। মাথার ওপর ত্রিপলের তলায় চাঁদোয়া। মন্দিরের সামনে শালবল্লির ওপর টিনের চাল তো ছিলই। ওটা সকলের বসবার চণ্ডিমণ্ডপ। মেঝেটা বোধহয় পরে সিমেন্ট বাঁধানো হয়। তখন গোবর লেপা মাটি। ওই ছোটো আয়োজনে যে কি আশ্চর্য প্রাণ ছিল বলে বোঝানো যাবে না।

এতগুলো বাড়ির লোক প্রায় সবসময়ে একসঙ্গে থেকে পূজো করত। আড়ম্বর নেই, কোন রকম আতিশয্য নেই। ঢাক ছাড়া কোন কান ফাটানো শব্দ শোনা যেত না। খালি গলায় চণ্ডীপাঠ হচ্ছে, পুজো চলছে। হাজার খানেক লোক নিজের মধ্যে গল্প করতে ব্যস্ত। সবাই যেন আনন্দে ডুবে আছে। পাশে একটা মঞ্চ বাঁধা হত। সন্ধ্যেবেলায় অনুষ্ঠান শুরু হত। গান, নাচ, আবৃত্তি, নাটকে গুলজার হয়ে উঠত সন্ধে থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। ঐ আনন্দ মনে থাকবে সারা জীবন। কালনার জাপাট পাড়ার পুজো ছাড়া এ রকম আনন্দ আর কোনও পুজোয় পাইনি।

দাদা আর প্রোদ্যোৎদার সঙ্গে পাশের পাড়ার ঠাকুর দেখতে গিয়ে একজায়গায় পুরুত মশাইকে দেখে চমকে গেলাম। পুজো করছেন লালমোহন স্যার। বেশ গর্ব হল দেখে। পুজোর আসল লোক তো পুরুত ঠাকুর।

বিসর্জনের পর খালি মন্ডপে একটা টিমটিমে প্রদীপ জ্বলতে দেখে চোখে জল আসত। আমি ভাবি ভাসান পালের কেমন লাগত?

বিজয়া দশমীর কোলাকুলি, মিষ্টি খাওয়া, লক্ষী পুজো পর পর আসত বলে অন্যদের মনে হয়ত দু:খ কমে যেত, আমার কিছুতেই কমতে চাইতো না। মন খারাপ করে এখানে ওখানে ঘুরে বেরাতাম। কাউকে কিছু বলতে পারতাম না। কালী পুজোতেও খুব আনন্দ হত ওখানে। ছাদের ওপর প্রদীপ জ্বালা, বাজি ফোটানোর নেশা কাটবার পর আবার মন খারাপ হয়ে যেত বিসর্জনের কথা ভাবলে। দু একটা ছাড়া কোন কালী ঠাকুরের মূর্তি ভালো লাগত না দেখতে। কেমন ভয় ভয় করত মনের মধ্যে। বাজি পোড়ানোর ঠ্যালায় সেই ভয় অবশ্য কেটে যেতেও সময় লাগত না। ভাই ফোঁটার সময় মনে হয় বোন ফোঁটা নেই কেন? যারা এসব নিয়ম করেছে রাগ হত তাদের ওপর। কাউকে কিছু বলবার সাহস পেতাম না। মা ভাইদের কাছে না পেয়ে উনোনের গায়ে সাতটা ফোঁটা দিতেন। তখন মার মুখটা দেখে মন খারাপ হত। ভাইদের বড়ো ভালোবাসতেন মা।

পূজোর পর শীত তখনও পড়েনি। খবর পেলাম আমাদের ছোট্ট ভাই সবুকে নিয়ে বড়ো মামা আর মামি আসবেন পাণ্ডুতে।

পাণ্ডুঘাটের কাছে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছি। ওপারে ট্রেন থামার পর স্টিমার ছাড়ার অনেকটা সময়। মার চোখ ওপারের লঞ্চ ঘাট থেকে সরছে না। আমরাও চেয়ে আছি। বাবা সিগারেট খাচ্ছেন একটার পর একটা। অনেক দূর থেকে ভোঁ বাজিয়ে স্টিমার এসে লাগল। বড়োমামা আর মামিকে দেখতে পাচ্ছিলাম দূর থেকেই। মামির কোলে জড়িয়ে ধরা একটা ছোট্ট পুটলি। লঞ্চ থেকে নেমে কাছে এলে দেখলাম ছোট্ট ভাইটাকে। কয়েকমাস মাত্র তার বয়স।

বড়ো মামা মামি সুন্দর মানুষ, ভাইটাও সুন্দর। কিন্তু বাড়িতে এসেই শুরু হল তার কান্না। বড়োমামা নিজে ডাক্তার হলেও নিজেদের কারও চিকিৎসা করতে চাইতেন না। মার অনেক টোটকাতেও কান্না থামে না দেখে পাশের বাড়ির বুলু রঞ্জুর বাবা ডাক্তার মুখার্জিকে ডাকা হল। তিনি এসে ওষুধ দিয়ে থামালেন কান্না।

মামা মামিরা এলে মা গল্প করতে করতে এমন বুঁদ হয়ে যেতেন যে কাজকর্ম মাথায় উঠত। রান্না বসিয়ে ভুলে যেতেন। চান খাওয়ার ঠিক থাকতনা কারোও। আমরা স্কুল থেকে ফিরে এসে ওদের গল্প শুনতে বসতাম। বড়োমামা আর্মিতে চাকরি করতেন বলে অনেক ঘটনা ছিল তাঁর জীবনে। সেসব শুনতে চাইতাম আমরা। নাগাল্যাণ্ডে যখন ছিলেন তখন কয়েকবার শত্রুর সামনা সামনি পড়ে বরাত জোরে প্রাণে বেঁচেছিলেন। সেই ঘটনা শুনলে গায়ে কাঁটা দিত। একবার তাঁর পাশের ঘর থেকে বৈরী নাগারা আর একজন ক্যাপ্টেনের মাথা কেটে নিয়ে গেছিল। বাহিনীর লোকেরা ওদের তাড়া করে সে গ্রামে পৌঁছে গুলি চালিয়ে সবাইকে মেরে দিয়েছিল। বড়োমামা ছুটে গিয়ে একটি ছোটো মেয়েকে ক্ষেপে যাওয়া আর্মির রাইফেলের মুখ থেকে বাঁচাতে পেরেছিলেন। তখনো বড়োমামার বিয়ে হয় নি। শেষে ওখানকার কোন চার্চের ফাদারের কাছে মেয়েটিকে রেখে সব দায়িত্ব দিয়ে মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। নাগা পাহাড়ে সেনা বাহিনীর লোকেদের সিগারেট খাওয়া বারণ ছিল। রাতের অন্ধকারে দূরের পাহাড় থেকে ঐ আগুনের ফুলকি তাগ করে রাইফেলের গুলিতে খুন করত বৈরী নাগারা।

বড়োমামারা চলে যাবার পর অ্যানুয়াল পরীক্ষা এসে গেল। আমার হালচাল দেখে মা বাবার বিশ্বাস হত না যে আমি পাশ করব। আমার পরীক্ষা দিতে ভয় ছিল না কোন। পরীক্ষার শেষে রেজাল্ট হাতে হেড মাস্টারমশাই চলে এলেন বাবাকে দেখাতে, কি খুব তো বলেছিলেন পাশ করবে না। রেজাল্ট দেখুন! অবশ্য ভালোভাবে পাশ করে আমার কোন হেলদোল ছিলনা। ফাইভে উঠে গেলাম।

যুবতীর্থ থেকে প্রত্যেক বছর পিকনিকে নিয়ে যাওয়া হত। এবার গেলাম উন্ত্রু। বনের মধ্যে জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র। শিলং পাহাড়ে কিছুটা ওঠার পর জঙ্গলের মধ্যে অনেকটা যাবার পর উন্ত্রুর ওই বিশাল চওড়া প্রপাতটা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। জঙ্গলের মধ্যে একটা খালি জায়গায় উনুন বানিয়ে রান্না বসানো হল। বনের শুকনো কাঠ কুড়িয়ে তার জ্বালে রান্না হচ্ছে। বড়োরা ব্যস্ত কাজে। অনেক উঁচু থেকে পাথরের উপর জল পড়ার জায়গাটার পাশে সাতরঙা রামধনু ফুটে উঠেছে। বড়ো বড়ো পাথরের মাঝখান দিয়ে পথ করে পাঁচ ছটা জলের আলাদা ধারা প্রচণ্ড স্রোতে বয়ে যাচ্ছে নীচে। দেখতে দেখতে মনে হল স্বর্গে আছি। আমি তো ছোটোই, দিদি আর কতটা বড়ো! বাবলি ভালো মেয়ে, মার কাছে কাছে থাকে। দাদাও বড়োদের সঙ্গে কাঠ কুড়োতে ব্যস্ত। আমার আর দিদির কাজ নেই। কেউ নজরও রাখেনি আমাদের ওপর। প্রায় ত্রিশ চল্লিশ গজ দূরে ঝরনার ওপারে খাড়া পাহাড় আর ঘন বন। মোটা মোটা মস্ত লম্বা গাছগুলোর গায়ে অনেক ঝুলন্ত অর্কিড গাছে নানা রঙের ফুল ফুটে আছে অন্ধকার বন আলো করে। এই বয়ে যাওয়া জলের স্রোত যে কত জোরালো সেটা আন্দাজ নেই আমাদের। ঠিক করলাম ওই ফুল পেড়ে নিয়ে আসব। ওই বনে কী আছে জানা ছিল না। বড়োরা পেছনে আছে বলে সাহস বেড়ে গেল। পাথর থেকে পাথরে লাফিয়ে চার-পাঁচ ফুট চওড়া দুটো ধারা ডিঙিয়ে গেলে দু’তিন ফুট তলা দিয়ে ভীষণ শব্দ করে জলের স্রোত চলেছে। এবার পাথরগুলো বড়ো বড়ো আর উঁচু। ধারাগুলোও আর একটু চওড়া। কোনমতে সেগুলোও লাফিয়ে পার হয়ে গেলাম। দিদি আর আমি লাফালাফিতে বেশ পাকা ছিলাম। শেষ ধারাটা আরও একটু চওড়া। পেছন ফিরে আরেকবার তাকিয়ে সেটাও পেরিয়ে গিয়ে বেশকিছু ফুল পাওয়া গেল। এবার ফিরতে হবে। কিন্তু উঁচু পাথর থেকে নীচে লাফানো যতটা সোজা, নীচের পাথর থেকে একটু উঁচু পাথরে তো পৌঁছানো মুশকিল। জলের স্রোতটা যেন একটু বেড়ে উঁচু হয়ে প্রায় পাথর ছুঁই ছুঁই! বেশ বুঝতে পারলাম কাজটা ভালো করিনি। এখান থেকে ফেরা যাবে না। দিদি প্রায় কাঁদতে বসল। আমারও বনটার দিকে চেয়ে ভয় করতে লাগল। পেছন দিক থেকে যদি হাতি বা বাঘ বেড়িয়ে আসে! বড়োদের ডাকাডাকি করলেও জলের গমগম শব্দে সেই ডাক কেউ শুনতে পাচ্ছিল না। শেষে পিন্টু কাকা আর শক্তি কাকা আমাদের দেখতে পেয়ে দু’তিনটে বাঁশ পাশাপাশি পেতে আমাদের ফেরার পথ করে দেয়। তবে ফেরার সময় আমার পা কাঁপছিল। সাহস-টাহস কোথায় চলে গেছিল! একবার পড়েও যাচ্ছিলাম বাঁশ থেকে। পিন্টু কাকা হাত বাড়িয়ে ধরে ফেলে।

ওই জলে পড়লে নাকি আমাদের আর বাঁচতে হত না। পেছনের বনটায় নাকি শঙ্খচূড় সাপ আর বাঘের বাসা। ঝরনার জলও বাড়ে-কমে বলে বড়োরা কখনও ওপারে যেতে সাহস করে না। অনেক জীবজন্তু আর মানুষ এখানে জলের তোড়ে ভেসে গিয়ে মারা গেছে। বেশ বুঝলাম আমার আর দিদির একটা বড়ো ফাঁড়া গেল! সবার কাছে বকুনি-টকুনি খেয়ে বসে রইলাম কড়া পাহারায়। ঘুম পেয়ে গেল মরে যাওয়ার হাত থেকে বেঁচে। কথা বলতেও ইচ্ছা করছিল না কারও সঙ্গে। বিপদ একা আসে না। সেদিন ফেরার পথে সন্ধেবেলা বনের অন্ধকারে যেতে যেতে বাসে আগুন ধরে গেল। অবশ্য পুরো বাস জ্বলে যাওয়ার আগেই আগুন নেভানো গেল সবাই মিলে হাত লাগিয়ে। সবাই বাস থেকে নেমে বনের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ও হাতি বের হওয়ার ভয় ছিল। আগুন নেভার পর বাস চলল খুব ধীরে ধীরে। দু’ঘণ্টার পথ যেতে সময় লাগল ছ’সাত ঘণ্টা। মাঝরাতে বাড়িতে পৌঁছালাম। পরের বছর ‘অশ্বক্লান্ত’ বেড়াতে যাওয়ার সময় আর ছোটোদের নিয়ে যাওয়া হয়নি। নামটা অদ্ভুত বলে এখনও মনে থেকে গেছে।

পুজোর আগে হঠাৎ চারদিকের সবকিছু পালটে গেল। এল অন্ধকারের দিন। চীনের সঙ্গে যুদ্ধ লাগবে এরকম একটা কথা শোনা যেতে লাগল। ব্রহ্মপুত্রের ওপর ব্রিজ তৈরি হয়ে গেছে। প্রথম যে মালগাড়িটা সেই ব্রিজ পেরিয়ে আমিনগাঁও থেকে এপারে এল, তাতে একশ চল্লিশটা কামরা ছিল। আমি আর দিদি ছাদ থেকে দেখে গুনেছিলাম। এখান থেকে মালিগাঁও ওভারব্রিজ নজরে পড়ত। বোরঝাড় এয়ারপোর্টে যারা এরোপ্লেন থেকে নামত তারা এই পথেই যেত গৌহাটি। একদিন শুনলাম দেশের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরু আসবেন। আমরা নাম শুনেছি, দেখা হয়নি। বড়োরা অনেকে গেছিল রাস্তার ধারে ভারতের পতাকা হাতে নিয়ে, ওরা দেখে এল। আমরা ছাদে দাঁড়িয়ে অনেকগুলো গাড়ি যেতে দেখলাম। তার মধ্যে কোনটায় নেহেরুজি ছিলেন, বুঝতেই পারলাম না।

রাতে ইলেকট্রিক আলো জ্বালানো বারণ হয়ে গেল। হ্যারিকেনেও কাগজের ঢাকনা পরিয়ে একটুখানি ফাঁক রাখা হত, যাতে বাইরে থেকে কিছু দেখা না যায়। ছাদে দাঁড়িয়ে রাত্রিবেলা পাণ্ডু শহরটাকে ভুতুড়ে মনে হত। আমরা ছোটোরা তেমন কিছু বুঝতাম না। শুধু কানপেতে শুনতাম বড়োরা কি বলে! বাড়িতে রঞ্জিত কাকা এসে মাকে নানা রকম দেশাত্মবোধক গান শিখিয়ে যেতে লাগলেন। শুনে শুনে আমাদেরও শেখা হয়ে গেল। তখন রেডিওতেও ওই গানগুলো শোনা যেত। পাড়ায় পাড়ায় দাঁড়িয়ে এই গানগুলো গাওয়া হতে লাগল, সঙ্গে আবৃত্তি। একদিন আমাদের স্কুলে কালো চশমা পরা একজন গাড়ি থেকে নেমে হেডমাস্টার মশাইয়ের ঘরে গিয়ে বসলেন। ক্লাসে ক্লাসে নোটিশ গেল কলকাতা থেকে অতুল্য ঘোষ এসেছেন। টিফিনের সময় তিনি আমাদের সামনে বক্তৃতা দেবেন, সবাইকে ওখানে থাকতে হবে। তারপর স্কুল ছুটি হয়ে যাবে।

শুনতে গেলাম। উনি আমাদের বললেন আজ থেকে তোমরা কেউ চিনি খাবে না, যে টাকা বাঁচবে সেটা যুদ্ধে খরচ করা হবে। তিনি বোধহয় বোকা মনে করেছিলেন। এই ক’টা সাদাসিধে কথা না বলে বুঝিয়ে বলতেই পারতেন চিনি না খেলে সেই টাকা যুদ্ধে যাবে কোন পথে। বাবা বরং বলেছিলেন পুজোয় আমরা জামাকাপড় কিনব না, কালীপুজোয় বাজি পোড়াব না। সেই টাকা সরকারের কাছে পাঠানো হবে যুদ্ধে খরচ করতে। সেটা বোঝাও গেল, করাও হল। আমরা একটুও মন খারাপ করলাম না। বাকিরা কিন্তু তা করেনি।

হঠাৎ সত্যিই একদিন যুদ্ধ বেঁধে গেল চীনের সঙ্গে ভারতের। চারদিকে হাহাকার শুরু হয়ে গেছিল। আমরাও তার আঁচ পেতে লাগলাম। মাসে মাসে সেনাবাহিনীতে টাকা পাঠানো হত বলে আমরা ডাল-ভাত খেয়ে থাকতাম। মাঝে মাঝে ডিমের ডালনায় সুতো দিয়ে কাটা আধখানা ডিম। আমার মা মাছ ছাড়া ভাত খেতে পারতেন না। সেই মা বাবা মাছ খাওয়া ছেড়ে দিলেন প্রায়। একটা খাবার খুব পছন্দ ছিল, বাবা মজা করে ছড়ার মত ছন্দে বলতেন ‘বাসমতি চাল দিয়ে পোস্ত বাটা’। তলার দাগে চাপ দিয়ে বলতে হত। দিনের বেলায় শয়ে শয়ে ভারী ভারী মিলিটারি সাঁজোয়া গাড়ি, ট্যাঙ্ক অথবা সেনাদের নিয়ে গাড়ি যেত তেজপুরের দিকে। সৈন্যরা কামাখ্যা মন্দিরে পুজো দিয়ে পাহাড় কাঁপিয়ে জয় মা কামাখ্যা ধ্বনি দিলে আমরা নীচে থেকে শুনতে পেতাম। রাতের অন্ধকারে সেই সৈন্যরা ফিরতেন সাদা কাপড়ে ঢাকা মৃতদেহ হয়ে। ছোটোরা অবাক হয়ে ভাবতাম, যুদ্ধ কেন হয়? যুদ্ধ করাটা বোকামি বলে মনে হত।

কালো পিচের রাস্তায় সৈন্যদের টাটকা রক্ত পড়ে থাকত কোথাও কোথাও। তার ওপর দিয়েই আবার সৈন্যদের গাড়ি চলে যেত। কম বয়সি সব মানুষ, দাদার চেয়ে হয়তো একটু বড়ো! তাদের নিয়ে যাচ্ছে যুদ্ধ করতে। তারা আর বেঁচে ফিরবে কিনা জানা নেই। বীর মনে হত তাদের।

রেস্টক্যাম্পের মাঠে একদিন ভারতের জেনারেল কারিয়াপ্পা এলেন। উঁচু পাটাতনের ওপর দাঁড়িয়ে উঁচু গলায় কী সব চিৎকার করলেন কিছুই বোঝা গেল না। লাখখানেক লোক চুপ করে দাঁড়িয়ে শুনলো। শেষে জয়হিন্দ বলার পর বললেন – আপনারাও বলুন! দেশের লোকের এই আত্মবলিদানকে শহীদের স্বীকৃতি দিন। বলুন জয় হিন্দ! এবার অত লোকের চিৎকারে রেস্টক্যাম্পের সঙ্গে পাহাড়ও কেঁপে উঠল। জেনারেল কারিয়াপ্পাকে কাছ থেকে দেখতে পেয়েছিলাম, গাড়িতে ওঠার সময় আমার গালও টিপে দিয়েছিলেন।

নেফা পার হয়ে চীনারা তেজপুর অব্দি চলে এসেছিল। ওখান থেকে বহু লোক প্রাণ বাঁচাতে কোনরকমে গৌহাটিতে এসে পৌঁছেছিল। পাণ্ডুতেও কয়েকশো মানুষকে রেস্টক্যাম্পে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। কারিয়াপ্পার সভায় একটা মেয়ের সঙ্গে ভাব হয়ে গেল। ওরাও এসেছে তেজপুর থেকে, সঙ্গে কিচ্ছু আনতে পারেনি। দিদি আর আমি ওর কাছে শুনলাম যুদ্ধের কথা। কিভাবে দশ বারো মেগাটন বোমার শব্দে পাকা বাড়ির দেওয়াল ফেটে যায়। শুধু শব্দ শুনে হার্টফেল করে মারা যায় মানুষ। ওর কানেও তালা লেগে গিয়েছিল। ও নিজের চোখে দেখেছে ভারতীয় সৈন্যের মৃতদেহ কি ভাবে পিরামিডের মত সাজিয়ে পেট্রল ঢেলে পোড়ানো হয়েছে। ওই মৃতদেহগুলো নাকি ফিরিয়ে আনার মত অবস্থায় ছিল না। গন্ধে ওরা খেতেই পারত না। যুদ্ধের ভয়ঙ্কর বর্ণনা শুনে আমদের মুখে কথা সরেনি। দিদি কেঁদে ফেলেছিল, আর আমার খুব রাগ হয়েছিল ঐ লোকগুলোর ওপর, যারা এই যুদ্ধ বাধায়।

ভারতের নাকি অস্ত্রশস্ত্র গোলা বারুদ কম ছিল বলে সবাইকে রাইফেল দেওয়া যায়নি। গুলি গোলাও কম পড়ে গেছিল। যুদ্ধের জন্য দায়ী নাকি কৃষ্ণমেনন বলে একটা লোক আর নেহেরু।

বাবা আত্মরক্ষার জন্য গৌহাটি থেকে কিনে আনলেন একটা নাগা দা। মোটেই তেমন বড়ো নয়। ওটা দিয়ে কি করে চীনা সৈন্য ঠেকানো যাবে অনেক অবাস্তব কল্পনাতেও এটা পাওয়া গেল না। বহুদিন ঐ যুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে ওটা ছিল আমাদের বাড়িতে। সোনারপুরে একটা সিনেমার শুটিং এ ওটা চুরি যায়।

আমাদের বাড়ির ছাদে উঠলে আকাশে বোমা ফাটার আলো দেখা যেত। মাঝে মাঝে শব্দও কানে আসত। সাঁজোয়া গাড়ি, ট্যাংক, মেশিনগান বওয়া গাড়ি, অ্যান্টি এয়ারক্রাফট গানের উঁচানো নল আর ওয়ান টনার, থ্রি টনার ট্রাক তো হরদম যেতে দেখতাম। মৃতদেহ নিয়ে শুধু রাতে নয় দিনের বেলাতেও যেতে দেখতাম। কামাখ্যা মন্দিরে সারারাত ধরে যজ্ঞ হতে লাগল। লোকেরা বলাবলি করত প্লেন থেকে ঐ যজ্ঞের আগুণ দেখেই গৌহাটি শহরে বোমা ফেলতে পারে চীনারা। ভগবান কখনো যুদ্ধ বন্ধ করতে পারে না। পাণ্ডারা তো নয়ই। কাজেই যজ্ঞ করে মোটেও কোন লাভ হচ্ছে না। তবু যজ্ঞ বন্ধ করা গেল না।

রামায়ন, মহাভারত পড়ে অনেক বীর আর তাদের অস্ত্রশস্ত্রের কথা আমাদের জানা ছিল। কিন্তু ব্রহ্মাস্ত্রের বা পাশুপতের সঙ্গে যে মন্ত্র পড়তে হয় সেটা পাবো কোথায়? দমে না গিয়ে বাবার দাড়ি কামানোর ব্লেড আর পেরেক কঞ্চির ডগায় লাগিয়ে তীর তৈরি হল। মোটা বাখাড়ি বাঁকিয়ে ধনুকও হল। পাহাড়ে গিয়ে প্র্যাকটিস করতেও কোন খামতি রইল না। কিন্তু চীনা সৈন্যদের সামনে না পেলে যুদ্ধটা হয় কী করে? মনটা খুঁত খুঁত করতে লাগল এত কিছু জোগাড় করার পরেও!

ভানুকাকা একদিন সন্ধেবেলা এসে মাকে বললেন – বউদি আরশোলার সুক্তো রান্নাটা শিখে নিলে হয়। ওরা একবার এলে কি ছাড়বে? আগে থেকে অভ্যেস করে রাখা ভালো। কাকিমা ধমক দিয়ে বললেন – প্রাণে বাঁচলে তবে তো আরশোলা। ভানুকাকার স্থির বিশ্বাস চীনারা ওকে মারবে না। কারণ ওকে তো চীনাদের মতোই দেখতে। অসুবিধা ঐ চুং চাং ফুং ফাং বুলি না জানায়। বোবা চীনা তো সাজাই যেতে পারে!

তলায় তলায় বাবা আর মা কিছু ভাবছিলেন। আমাকে ডেকে বাবা বললেন – তুই বাবলিকে নিয়ে কলকাতায় যেতে পারবি প্লেনে তুলে দিলে? আমি অবাক! আমি আর বাবলি কলকাতায় যাবো মানে? তোমরা যাবে না? বাবা খুব গম্ভীরভাবে বললেন – দুটো মাত্র টিকিট পাওয়া গেছে। মারোয়ারীরা বেশি দাম দিয়ে সব টিকিট কিনে নিয়েছে। ওদের অনেক টাকা, প্রাণের ভয়ও বেশি। আমি বললাম – যাবো না তোমাদের ছেড়ে। মা বললেন – চীনারা দু একদিনের মধ্যে গৌহাটি দখল করবে। তোদের যদি বাঁচাতে পারি! আমি আবার বললাম –  আমি মরতে ভয় পাই না। ওরা মারলে সবাইকে একসঙ্গেই মারুক। বাবা জড়িয়ে ধরলেন আমাকে। মার চোখে জল। আমার খুব অভিমান হল নিজেরা মরে শুধু আমাদের দুজনকে বাঁচানোর কথা ভেবেছিল বলে। আজও সেই অভিমান একটু বেঁচে আছে মনের মধ্যে। কাউকে জানতে দিইনি।

কিছুই অবশ্য হল না। একদিন পরেই যুদ্ধ বন্ধ করে চীনা সৈন্য ফিরে গেল দেশে। তারপরেও কিছুদিন আকাশে যুদ্ধের প্লেন উড়ে লক্ষ রেখেছিল কেউ কোথাও থেকে গেল কিনা। এই নিধিরাম সর্দারের লড়াই নিয়ে ইতিহাস ভাবুক। আমরা বেঁচে গেলাম। তেজপুরের লোকেরা ফিরে গেল বাড়িতে। বাষট্টির বিশে অক্টোবরে শুরু হয়ে যুদ্ধ শেষ হল একুশে নভেম্বর। লক্ষ লক্ষ জওয়ানের জীবন নিয়ে।

চীন যুদ্ধ আমদের দেশকে ভালোবাসতে শিখিয়ে দিল। সৈনিকদের শ্রদ্ধা করতে শেখালো। আর মনে মনে একটু বড়ো হয়ে গেলাম। তবে দু:স্বপ্নে অনেকদিন যুদ্ধ দেখে ঘুম ভেঙে উঠে বসতে হয়েছে।

চীন যুদ্ধের পর জ্যাঠামশায়ের চিঠিতে জানা গেল আমার বড়ো দুই জ্যেঠতুতো দাদার পৈতে হবে। তখন আমার ছোটো জ্যেঠতুতো ভাই খুব ছোটো। ওর হবে আরও দশ বছর পরে। ঠাকুমা খবর শুনে বাবাকে বললেন – সবচেয়ে বড়ো নাতি মানে আমার দাদা সোমকে বাদ দিয়ে হঠাৎ কোন খবর না দিয়ে পরের দুজনের পৈতে হবে? যে করেই হোক ঐ একই দিনে আমাদের দুভাইয়েরও পৈতে দিতে হবে। আর কোনও উপায় না পেয়ে ঠিক হল কামাখ্যাতেই আমাদের পারিবারিক পাণ্ডার বাড়িতেই হবে পৈতে।

আমার বয়েস তখন খুবই কম, দাদা আরও ছ-বছরের বড়ো। সুরেন পাণ্ডা কামাখ্যা মন্দিরের নামকরা মানুষ। পাহাড়ের ওপর তাঁর বিরাট বাড়ি। সেখানেই আমাদের পৈতে হয়ে গেল। আমাকে খুব যে নিয়ম মানতে হয়েছিল বলা যাবে না। আমার পৈতে গুরুর মুখে বিচ্ছিরি গন্ধ বলে মন্ত্রটন্ত্রে তখন কান দেওয়া হয়নি। তবে লোকটার একটা কথায় আমার খুব রাগ হল। আমি নাকি আজ থেকে বাকিদের থেকে আলাদা সম্মান পাবো। আর মন্ত্রগুলো যেন কাউকে না বলে ফেলি। মন্ত্র মুখস্ত হতেই মাঠে গিয়ে বন্ধুদের লাইন করে দাঁড় করিয়ে কোরাসে গায়ত্রী মন্ত্র মুখস্ত করিয়ে দিলাম। আমাকে বন্ধুদের থেকে আলাদা করতে পারবেনা কেউ। আমার বন্ধুদের দলটাতে ছেলে মেয়ে কম ছিল না। সাম্যবাদে তখন থেকেই আমার বিশ্বাস।

পাহাড় জঙ্গলকে আরো ভালোবেসে ফেলেছিলাম দিনে দিনে। একা একা পকেট ভর্তি গাছের বীজ নিয়ে ছড়াতে ছড়াতে যেতাম। লালপাহাড় বা টেম্পল ঘাটের ওঁবাবার আশ্রমে গেলে ব্রহ্মপুত্র নদকে বড়ো ভালোভাবে দেখা যেত। ডাইনে একটা ছোটো দ্বীপের ওপর উমানন্দ ভৈরবের মন্দির দেখতে পেতাম। ওপারে আমিনগাঁওয়ের ধোঁয়াটে ছোটো বড়ো পাহাড়ের সারি। বাঁয়ে নতুন ব্রীজের ওপর দিয়ে লম্বা শুঁয়োপোকার মত রেলগাড়ি চলে যেত। এক মাইল লম্বা ব্রীজ পেরোতে অনেক সময় লাগত তার। নির্জনে বসে দূর থেকে গম গম শব্দটা কাছে এসে ব্রিজ ছাড়ালেই ঝিক ঝিক শব্দে পালটে যেত। চিমনি দিয়ে ধোঁয়া ছড়িয়ে যেত বাতাসে। আমার মনে পড়ত লীলা মজুমদারের লেখা টংলিং এর কথা। নিজেকে মনে হত চাঁদ। মাঝে মাঝে মনে মনে শিলং এর পাইনবনে চলে যেতাম। চোখ বুঁজলেই হাওয়ায় দোল খাওয়া লাইকেন আর ফুল ফোটা অর্কিডের লতা দেখতে পেতাম। সেই ছোটো নদী লুমপারিং। স্বচ্ছ জলের স্রোতের তলায় পাথরের ওপর শ্যাওলা ঠোকরানো খুদে খুদে মাছেদের কথা মনে পড়ত। চুপ করে বসে থাকতাম। পাখি আর কাঠবেড়ালিরা আমার কাছে আসতে ভয় পেত না।

আজকাল ষ্টিমারে করে যাত্রীরা আসে না ওপার থেকে। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকা ষ্টিমারটাকে দেখলে মন খারাপ লাগত। দিনের মধ্যে কয়েকবার করে সেই গম্ভীর ভোঁ আর বাজায় না কেউ। ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকা ষ্টিমারের গায়ে ‘পদ্মা’ লেখাটা থেকে রং ঝড়ে পড়ে কেমন দেখায়। জেটির সঙ্গে বাঁধা মোটা লোহার শেকলে জং ধরে যায়। ষ্টিমারে উঠে ক্যাপস্ট্যানটাতে চুপ করে বসে থাকি। একটা বুড়োটে লোক, বোধহয় সারেঙ ছিল, সে আমাকে নিষ্প্রভ চোখে চেয়ে দেখে। বাসন মাজে, তোলা উনুনে রান্না বসিয়ে কাপড় কাচে। আমার ওখানে বসে থাকা নিয়ে আপত্তি করেনা। খুব যে ফিরে তাকায় আমার দিকে তাও না। ওর লম্বা রোগা কোল কুঁজো শরীর আর অজস্র ভাঁজ পড়া মুখটা দেখি, আলাপ করতে ইচ্ছে হয়। জলের ওপর রোদ ছায়ার রং বদলানো দেখি। জলের গা ঘেঁষে মাছরাঙা, চিল আর পানকৌড়িদের উড়ে যাওয়া দেখি। কখনও হঠাৎ জল ছিটিয়ে শুশুক ডিগবাজি খেলে চমকে উঠি। স্রোতের ঠ্যালায় ষ্টিমারটা একটু একটু দোল খায়।

পাণ্ডু জায়গাটাকে আরও ভালোবেসে ফেলি। লাইটুমুখরা অনেক বেশি সুন্দর। পাণ্ডু তার কাছে রূপে দাঁড়াতে পারবেনা। কামাখ্যা মন্দির ভুবনেশ্বরী ভারতের বিখ্যাত মন্দির গুলোর তুলনায় এমন আর কি সুন্দর! বলিদানের জায়গাটা রক্তে মাখামাখি। ভাঙা পুরনো পাথর আর পচা ফুলের আবর্জনা পাহাড়ের ঢালে জমতে থাকে বছরের পর বছর। তবু আমার মনে আজও কেন পাণ্ডু আপন হয়ে মিশে আছে, আমি বুঝি না। আমার পাণ্ডুই সবচেয়ে প্রিয়। এখানকার পোস্ট অফিসের পাশের নর্দমাটাও ভালো লাগে। কি মায়া কাজল পরিয়ে দিয়েছিল পাণ্ডু, নীলাচল পাহাড়, কামাখ্যা মন্দির, রেস্টক্যাম্প।

স্কুলে মন বসছিল আস্তে আস্তে। খেলাধূলোও চলছিল ঠিক ঠাক। পাশের বাড়ির বন্ধু বুলু আর রঞ্জুর সঙ্গেও যেতাম খেলতে। মনোজদা বড়ো, দাদার সঙ্গে খেলত। আমাদের থেকে বয়েসে বড়ো অজয়দাও আসত ব্যাডমিন্টন খেলতে। একটা দোলনা ছিল ওদের বাড়িতে। ওখানে দুলতে দুলতে গল্প করতাম অনেক রকম। স্পাইডার লিলির অপূর্ব গন্ধে মাতাল হয়ে থাকত বাতাস। বড়ো বড়ো পাতার অত সুন্দর ফুল ফোটানোর গাছ দেখেছি কলকাতার হর্টিকালচার গার্ডেনে। ওখানেও অনেক দূর থেকে মনমাতানো গন্ধ পেয়ে পাণ্ডুর কথা মনে পড়ত। বুলুটা ছিল শান্তশিষ্ট ভালো ছেলে। খেলাধুলোয় পাকা। ওর সঙ্গে খেলা জমত আমার। মনোজ দা একটু কম কথা বলত। রঞ্জুর খুব খারাপ কথা বলার অভ্যেস ছিল বলে খারাপ লাগত।

ভালো গল্প বলত অজয়দা। সব গোয়েন্দাদের গল্প। শুনতে ভালো লাগলেও পরে আর মনে থাকত না। তখন বোধহয় স্বপনকুমারের বই লুকিয়ে খুব পড়ত ছোটোরা। বাবার এনে দেওয়া বইগুলো অন্যরকম। সন্দেশ পত্রিকায় কত যে ভালো ভালো গল্প, কবিতা পড়তে পেতাম! বড়ো লেখাগুলোর জন্য অপেক্ষা করে থাকতাম। সত্যজিৎ রায়ের লিওরের ছড়া, পাপাঙ্গুলের পর জবরখাকি ডং। মুগ্ধ হয়ে যেতাম। প্রফেসর শঙ্কুকে পেলাম ব্যোমযাত্রীর ডায়েরিতে। যেমন লেখা তেমনি চমৎকার ছবি! অবনীন্দ্রনাথ, রবীন্দ্রনাথ, উপেন্দ্র কিশোর, সুকুমার রায়, পুণ্যলতা হয়ে লীলা মজুমদার, সত্যজিৎ রায় এঁরা আমার পড়বার পছন্দ বদলে দিলেন। আমি কখনও স্বপন কুমারের লেখা পড়তে পারিনি। হাসি পেত। পরে ‘আম আঁটির ভেঁপু’ আর ‘আরণ্যক’ পড়ে ওই বয়সে মনে একটা ঝাঁকি লাগল। ভালো গল্প খুঁজে খুঁজে পড়তে লাগলাম। গল্প বলবার লোক মেজপিসিমাকে পাই না। উনি থাকেন কলকাতায়। ফলে পড়ার বইয়ের পাশাপাশি গল্পের বই হয়ে উঠল আমার বন্ধু।

আমি আর দিদি বাবলিকে নিয়ে বিকেলে খেলতে যেতাম সেই পাহাড়তলির মাঠে আগের মতই। কিন্তু আমাকে অকারণে পেন চোর বলায় এত দুঃখ পেয়েছিলাম যে আর কখনও কারো বাড়িতে যেতে চাইতাম না। বরং একা একা খেলা ছেড়ে চলে যেতাম এখানে ওখানে। দিদি ঠিক বুঝত আমার মন খারাপ হলে। ও বাধা দিত না। আমার বন্ধু চাঁদুও বুঝত আমার কষ্ট, কিন্তু ওর সেই দিদি অনেক বড়ো বলে কিছু বলতে পারত না।

কখনও কখনও পাণ্ডু স্টেশনের পাশে ইয়ার্ডে বা ব্রহ্মপুত্রের পারে গিয়ে বসে থাকতাম। এখানে মাঝে মাঝে মরৈণ্যার সঙ্গে দেখা হত। স্কুলে আমার সঙ্গে পড়ত। ওর ভালো নাম সুজিত। ডাকনাম মরৈণ্যা কেন বলতে পারব না। তখন এরকম বিদঘুটে নাম রাখত লোকে। যেমন, ‘আকাইল্যা’, ‘মরৈণ্যা’। মরৈণ্যা কথা খুব কম বলত। হাসত না কখনও। মাঝে মাঝে রেলের ইয়ার্ডে পড়ে থাকা ভাঙা লোহার টুকরো, নাটবল্টু কুড়িয়ে বেড়াত। চাপা গলায় বলত লোহা বিক্রি করলে টাকা পাওয়া যায়। বস্তায় করে সান্টিঙের ইঞ্জিনের পেছনের কয়লার গাড়িতে উঠে কয়লা চুরি করত। আমি ব্যাপারটা পছন্দ করতাম না। অবশ্য মুখে কিছু বলতেও পারতাম না। তবু, আমার পাশে এসে বসলে খারাপ লাগত না ওকে। আমার চেয়ে বয়সে বোধহয় একটু বড়োই ছিল সুজিত।

বিদ্যামন্দির স্কুলে জীবনে প্রথম ক্লাসঘরে বসতে গিয়ে যার পাশে প্রথম জায়গা পাই ওই ছেলেটাই সুজিত। ওর মার ডাক থেকে পরে জানতে পারি ওর ডাকনাম মরৈণ্যা! চোখ দেখে নিরাপদ মনে হয়েছিল ওকে। ভয়ঙ্কর রাগী ক্লাসটিচার ঘরে ঢোকার পর হোদলের সঙ্গে ও আমাকে টেনে তুলে বলে মাস্টারমশাই ঢুকলে উঠে দাঁড়াতে হয়। আমি তো স্কুলের নিয়ম কানুন কিছুই জানতাম না। অবাক হয়েছিলাম খুব। বাড়িতে মা বাবাকে দেখলে তো উঠে দাঁড়াই না, স্কুলে না দাঁড়ালে মার খেতে হবে কেন? বয়সে একটু কম ছিলাম বলে সুজিত আমায় ছোটো ভাইয়ের মত ভালোবাসত।

ওর জন্ম হয়েছিল রেলগাড়ির কামরায়। যে গাড়ি চালু আছে তাতে নয়, বসে যাওয়া কামরায়। যার তলায় যন্ত্রপাতি আর চাকা অনেকটা মাটির তলায় ঢাকা পড়েছিল। কর্ণের রথের চাকা যেমন মাটিতে বসে গেছিল, সেইরকম। জন্ম ওখানে, যতটুকু বেঁচে থাকা তাও ওখানেই।

বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রহ্মপুত্রের ধারে পাণ্ডু স্টেশনের নিরালা সাইডিঙে কটা ভাঙাচোরা কামরা বোধহয় রেল কোম্পানির অজান্তে বা অবহেলায় পড়েছিল এক কোণে। ওগুলোর গায়ে লেখা ছিল ‘কনডেমড’। তারপর বাতিল হয়ে যাওয়া যত লোহালক্কর জমা করা হত কামরাগুলোর পাশেই। বড়ো বড়ো কতগুলো ঝুপসি গাছ ওগুলোকে আড়াল করে রেখেছিল। বোধহয় স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রি হওয়ার যোগ্যতাও ছিল না ওগুলোর। ব্রিজ তৈরি হওয়ার পর ব্রহ্মপুত্রের ধারে প্রান্তিক স্টেশন বলে খুব একটা নজরেও ছিল না পাণ্ডু। নতুন স্টেশন বেশ দূরে তৈরি হয়েছে, নাম কামাখ্যা। ব্রিজ পার হয়ে ট্রেন ওদিক দিয়েই যায়। স্টিমার বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর কটা শাট্‌ল ট্রেন চলা ছাড়া পাণ্ডু ফাঁকা পড়ে থাকত। তাই কামরাগুলোর কথা ভুলেই গেছিল সবাই। যুদ্ধ চলাকালীন এই চত্বরটা হঠাৎ বেশ জমজমাট হয়ে উঠেছিল। সে সব চুকেবুকে গেলে সব চুপচাপ, নির্জন হয়ে গেল। শান্ত বলেই আমাকে টানত জায়গাটা। যেন ঘরে গিয়েছিল পুরোনো সেই পান্ডু স্টেশনটা।

এই কনডেমড রেলের কামরাতেই জন্ম সুজিতের। স্বাধীনতার পর পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভিখারির মত কোনোমতে পালিয়ে এসে এখানে উঠেছিল ওর বাবা মা। তারপরে জঙ্গল, ঝোপ আর লতার বাঁধনে লাইনের সঙ্গে কামরা বাঁধা পড়ে গেছে, দরজা, জানালাগুলোও আর আস্ত নেই। ওদের বাড়ির কাছাকাছি গেলেই ওর মায়ের একা ঘরে বকবকানি শুনতে পেতাম। তাঁর বোধহয় একটু মাথার গোলমাল হয়ে গিয়েছিল সংসার টানতে না পেরে। সুজিতের বাবা ইঞ্জিনে কয়লা বয়ে দেওয়ার কাজ করতেন। মাসে চল্লিশ টাকা মজুরিতে। দিনের বেলায় মদ খেয়ে পড়ে থাকতেন। সুজিতের কটা ভাই বোন খিদেয় কাঁদত। একটা কথা মাসিমা বারবার বলতেন, মরৈণ্যারে তুই কবে বড়ো হবি?

সবে ফোর থেকে ফাইভে উঠেছি, কিন্তু তাঁর বড়ো ছেলের বন্ধু বলে আমাকেই সব সুখ-দুঃখের কথা বলতেন মাসিমা। আর মুদ্রাদোষের মত বিড়বিড় করে বলেই যেতেন কবে বড়ো হবি রে মরৈন্যা? কবে চাকরি কইর‍্যা খাওয়াইবি? মরলো তো সবগুলা!

সুজিত কোন জবাব দিত না কখনও। ওর খিদে পাওয়া ভাইবোনদের কান্নায় বাবার নেশা ছুটে গেলে উঠে মারতেন ওদের, ওর মা চেঁচাতেন মারো সবকয়টারে! আপদ দূর হউক। চোয়াল শক্ত করে আমার হাত ধরে সুজিত টেনে নিয়ে যেত ব্রহ্মপুত্রের ধারে। সেখানে পঞ্চপাণ্ডব মন্দিরের কাছে একটা নির্জন পাথরে বসে ঢেউ দেখত, ছোটো ছোটো নুড়ি কুড়িয়ে জলে ফেলত। যেন ছুটে চলা ঢেউগুলোর মত সময়টা কেটে গেলেই বড়ো হওয়া যাবে। বসে বসে ওর নজর ওপারের ধোঁয়া ধোঁয়া পাহাড় ছাড়িয়ে আরও অনেক দূরে ভেসে বেড়াত। বিকেল ফুরিয়ে এলে আমায় বাড়ি ফিরতে হত। সুজিত ওখানে বসেই থাকত।

রেলগাড়িতে জন্ম বলে ওর সবকিছুতেই যেন চাকা লাগান ছিল। চুপ করে থাকত বলে ওর মনের ভেতরকার ছটফটানিটা ধরা যেত না। আমি ওর চোখমুখ দেখে বুঝতে পারতাম মাঝে মাঝে। বাড়ির কথা ভাবত সবসময়। ঝোপঝাড় থেকে খুঁজেপেতে শাক তুলে আনত। লোকের বাড়ির গাছ থেকে আম-কাঁঠাল। মাটি খুঁড়ে কোথায় মানকচুর গোড়া, চুপড়ি আলু পাওয়া যায় খবর রাখত। পাহাড়ের বেল গাছের তলায় পড়ে থাকা বেল, আমলকি, জলপাই, যা পেত বাড়িতে নিয়ে যেত সুজিত।

আমায় খুব টানত ওদের বাড়িটা। মাঝে মাঝেই স্কুল ছুটির পর ছুটতে ছুটতে চলে যেতাম। আমার বাড়ি থেকে অনেকটা দূর বলে মাকে লুকিয়ে যেতে হত। ব্রহ্মপুত্রের ধারে একটা প্রিয় জায়গা ছিল আমাদের, ওখানে গিয়ে বসতাম। ব্রহ্মপুত্র যেখানে নীলাচল পাহাড়ের ঢালে মিশেছে, সেখানে বড়ো বড়ো কয়েকটা পাথর নদীর জলকে ঘিরে রেখেছিল। ঘেরা জায়গায় জলটা শান্ত। বাইরের স্রোতের সঙ্গে এর সম্পর্ক কম। সেই স্থির জলের তলায় বড়ো বড়ো চিংড়ি মাছের বাসা ছিল। অন্য কুচো মাছও খেলা করত ওখানে। সুজিত এখানে মাছ ধরতে নেমে পড়ত। মাছ পেলে ভাইবোনগুলো খেতে পেত। জলে ডুব দিয়ে ওর খালি হাতে মাছ ধরা দেখতাম অবাক হয়ে। ওপরে ছেড়ে রাখা জামাপ্যান্ট পাহারা দিতাম। ও আমাকে হাতছানি দিয়ে ডাকলেও কখনও জলে নেমে যেতে সাহস পাইনি। সাঁতার জানি না। তাছাড়া কালো জলের তলার অন্ধকারটাকে ভয় পেতাম আমি। ওখানে যেন অজানা অদৃশ্য কেউ আমার দিকে চেয়ে আছে, এমন মনে হত। সুজিতের কোন ভয় ছিলনা। ভাইবোনেদের খিদে ওকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াত সবসময়।

ছেঁচা বাঁশের ঢালু চাল আর ইকারার দেওয়াল দেওয়া রেস্টক্যাম্পের কোয়ার্টারগুলোয় আমার অন্য বন্ধুবান্ধবরা অন্যরকম ছিল। তারা খুব বড়োলোক না হলেও খেতে পেত। তাদের বাবা রেল কোম্পানিতে স্থায়ী সরকারি চাকুরে। লেখাপড়াও সেসব পরিবারে বেশি। ছবি আঁকা, নাচ-গান, নাটক নিয়ে ওখানে অন্যরকম জীবন। খেলার মাঠে খেলত সবাই। পুজোয় একসঙ্গে আনন্দ করত। সবাই সবার বাড়িতে যেত। সুজিত কারও বাড়িতে যেত না। যেতে বলতও না কেউ। খেলার মাঠেও দেখা যেত না ওকে। আসলে বড়ো কম কথা বলত বলে ক্লাসঘরে ওর দিকে কারও নজর পড়ত না। দেখতেও খারাপ বলে কেমন কোণঠাসা হয়ে থাকত সবসময়। কারও সঙ্গে তেমন বন্ধুত্বও হয়নি ওর। পড়াতেও মন ছিল না। মাস্টারমশাইরা পড়া ধরলে চুপ করে মার খেত অথবা চুপচাপ বেঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে থাকত নিজে থেকেই।

অঙ্কের ক্লাস করাতেন পরিমল স্যার। তখন বোধহয় নিয়ম ছিল স্যারেরা হবেন বদমেজাজি, মারকুটে আর অবুঝ! অবশ্য এখনও শহরের বাইরের স্কুলগুলোতে নৃশংস সব শাস্তি দিতে দেখা যায় মাঝে মাঝে। অনেক ভালো শিক্ষকও দেখা যায়। তখন মার খাওয়াটা পড়ার অঙ্গ ছিল, কেন জানি না। পরিমল স্যার খুব কড়া ছিলেন। আমরা বাঘের মত ভয় পেতাম তাকে। তেলচুপচুপে ওলটানো কালো চুল, চওড়া কপালের তলায় গোল গোল চোখদুটো বাঘের মতই জ্বলজ্বল করত। হাতে বেত নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেই সব চুপচাপ। পড়ানোর চেয়ে কারণে অকারণে ছেলে ঠ্যাঙাতেই ব্যস্ত থাকতেন বেশি। বাবাকে জানতেন বলে বোধহয় আমি কম মার খেতাম। বাকিরা সারা গায়ে লাল দাগ নিয়ে বাড়ি ফিরত। এই লোকই মাঝে মাঝে লুকিয়ে সুজিতের হাতে টিফিন খাওয়ার পয়সা দিতেন। আমটা, কলাটা কিনে ওর বাড়ির জন্য পাঠিয়ে দিতেন। আর কেউ না জানলেও সুজিত আমায় বলেছিল, পরিমল স্যার ওর মায়ের কি রকম আত্মীয় হন। এ খবর স্যার কেন সবার কাছে লুকোতেন জানি না।

সুজিতের সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব দেখে ভুরু কুঁচকে যেত অনেকেরই। আড়ালে বা সামনেই নানা কথা বলত। ড্রইং মাস্টার লালমোহন বাবু একদিন বললেন, অর লগে তোমার অত কি? তোমার বাবা ব্যাঙ্কের ম্যানেজার, সাতশত টাকা মায়না পায়! অর বাপে পায় বত্রিশ টাকা আট আনা। স্যায় হইল গিয়া কয়লা বওয়া কুলি। অর লগে মিশা তো শোভা পায় না তোমার! ভদ্রঘরের পোলাগো লগে মিশবা। আমার মাথায় ঢুকলো না কিছুই। বাড়ি ফিরে বাবাকে বলতে বাবা বললেন, অবশ্যই মিশবে। এসব শেখানো হচ্ছে ইস্কুলে! আজই ওদের বাড়ির সবাইকে নেমন্তন্ন করো। রাতে একসঙ্গে খাব। তোমাকে এই স্কুল ছাড়িয়ে অন্য স্কুলে পড়াব, ওকেও পড়াব। কী ভালো যে লাগল বাবার কথা শুনে! তক্ষুনি খবর দিলাম ওদের রাতে আসতে।

মা অনেক কিছু রাঁধলেন। সবাই এসে খাওয়া দাওয়া করল। খুব আনন্দ হল আমার। সুজিত কিন্তু সারাটা সন্ধে মুখ নীচু করে চুপ করে রইল। মা অনেক আদরের কথা বলেও ওকে দিয়ে কথা বলাতে পারলেন না।

পরদিন স্কুলে গিয়ে ওকে খুঁজে পাইনি। হোদল খবর দিল সুজিত পালিয়ে গেছে। ছমাস তার আর কোনও পাত্তা নেই। ওর বাড়িতে মাঝে মাঝে খবর নিতে যাই। ওর মা চুপ করে কাঁদেন। একসময় যাওয়া ছেড়ে দিলাম। খুব মন খারাপ হত। একা একাই ব্রহ্মপুত্রের ধারে গিয়ে বসে থাকতাম।

একদিন আবুমাসির বাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে দেখি সুজিত ওই বাড়িতে চাকরের কাজ করছে। কী খুশি হলাম বলবার নয়। কিন্তু আমাদের দেখেই ও লুকিয়ে পড়ল। খুঁজে পেলাম বাড়ির পেছন দিকে, বাগানে। বড়ো বড়ো গাছের আড়ালে একটা পাথরের ওপর চুপ করে বসে আছে। পাশে বসে বললাম, পালালি কেন? বাড়ির জন্য মন কেমন করে না? কিছুক্ষণ চুপচাপ থেকে হঠাৎ বলল এখান কাজ করে ত্রিশ টাকা মাইনে পাই, মার জন্য টাকা জমাচ্ছি। বললাম, স্কুলে যাবি না? বলল তোরা পড়, আমার আর হবে না। বাবুকে বলবি না তুই আমার বন্ধু। মাকেও এখন বলবি না আমার কথা। একদিন যাব টাকা দিতে। ভাই বোনগুলো কেমন আছে রে? দেখতে ইচ্ছে করে।

আমার অবাক মুখের দিকে চেয়ে হাসল একটু। কেমন একটা কালো ছায়া পড়েছে ওর মুখে, ওর হাসিতে। খুব কষ্ট হল আমার। আমি না বললেও দিদি বলে দিল ও আমার বন্ধু। এক ক্লাশে পড়ে। খুব অবাক হল সবাই।

ওর মাকে বলতে বারণ করেছিল। শুনিনি আমি। সুজিত বেঁচে আছে জানল সবাই। শিগগির আসবে বলে পালিয়ে এলাম। খুব ইচ্ছে করলেও বলতে পারলাম না কোথায় দেখা হল, কোথায় চাকরি করছে। টাকা জমানোর কথাও বলা হল না ও চমকে দেবে বলে। শুধু বললাম ও ভালো আছে।

ফাইভের অ্যানুয়াল পরীক্ষার আগে হঠাৎ একদিন টিফিনে দেখি ক্লাশের জানলায় উঁকি মারছে সুজিত। ফুলপ্যান্ট, জামা, রঙিন সোয়েটার, চোখে গ্‌গ্‌লস। চেনাই যাচ্ছে না। আমাকে আড়ালে ডেকে বলল, মাকে টাকা দিয়ে গেলাম আর ভাই বোনেদের জামা কাপড়। বললাম, জি. এম এর বাড়িতে কাজটা করছিস? মাথা নেড়ে চলে গেল। ছেড়ে দিয়েছে চাকরি। কেন যেন খুশিই হলাম আমি। সেই ওকে শেষ দেখা।

কিছুদিন পর হোদল বলল সুজিতের অনেক পয়সা হয়েছে। কোথায় যেন ভালো কাজ জুটিয়ে প্রচুর টাকা পাচ্ছে। বাবাকে রিকশা কিনে দিয়েছে, বাড়িতে টাকা পাঠায় প্রত্যেক মাসে। তবে কোথায় থাকে কেউ জানে না। সরিৎ বলল ও সব জানে। ওর মার কাছে গেলাম একদিন দেখা করতে। খুব খুশি। তিলের নাড়ু দিলেন খেতে। বললেন, বড়ো হইছে সরন্যা। আমার আর কষ্ট নাই। ওদের রেল কামরার বাড়ির ছাদে কুমড়ো গাছে ফুল ফুটেছে। উঠোনে তুলসি মঞ্চ। ভালো লাগল দেখে।

হঠাৎ একদিন শুনলাম মরে গেছে সুজিত। শুনে যেন দম আটকে এল। এই প্রথম আমার বয়েসি কোন বন্ধুকে মরতে দেখলাম। দেখলাম বলা ভুল, খবর পেলাম। চলন্ত কয়লার গাড়ি থেকে কয়লা চুরি করতে গিয়ে রেলে কাটা পড়ে মরে গেছে সুজিৎ।

ছোটো বলে আমরা খুব কষ্ট পেলাম। বাবা মাও খুব দু:খ পেলেন। অন্য বড়ো লোকেরা বলাবলি করল, বেশ হয়েছে। বড়ো হয়ে ডাকাত হত। লালমোহন স্যার বললেন, অসৎ কর্মের বিপরীত ফল।

আর যাইনি ওদের বাড়ি। তাড়াতাড়ি বড়ো হতে গিয়ে সুজিতের আর বেড়ে ওঠা হল না। পাণ্ডুঘাটে বাঁধা লঞ্চটাতে একা একা গিয়ে বসে থাকতাম। পঞ্চপাণ্ডব মন্দিরের লাগোয়া খাড়া পাহাড়ের গায়ে কতগুলো বড়ো বড়ো পাথর গড়িয়ে পড়তে পড়তে থেমে গেছে। সেগুলো দেখে আমার মনে হত ওগুলো যেন খোদাই করা দশ-বারো ফুটের মূর্তি। আমার তো একটা গণেশ মূর্তি বলেই মনে হত! যেন কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছে পাহাড়ের ওপর থেকে। কালাপাহাড়ের কথা মনে হত আমার। বোধহয় তারই কাজ! বাবার কাছে কালাপাহাড়ের গল্প শুনেছিলাম। একজন হিন্দু ব্রাহ্মণ, প্রায় অকারণে রাগের মাথায় মুসলমান হয়ে ভারতজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা অনেক মন্দির ধ্বংস করেছিল। নষ্ট করেছিল শিল্প, ঐতিহ্য, ধর্মের কিছু হয়নি। সেদিন থেকে আমার মনে সব ধর্ম এক হয়ে পাথর হয়ে গেল। ভারতের ঐতিহ্যই ধর্ম, সাম্প্রদায়িক অনুষ্ঠানের কোন মূল্য নেই। ঐতিহ্যটা ভালোবাসা আর সহ্য করবার ক্ষমতা। আমার ধর্ম হল শিল্প, সংস্কৃতি। মনের মধ্যে এটা থাকলে কালাপাহাড় জন্মাতো না। ঐখানে বসে বসে আমি আমার মনের মধ্যে ডুবে যেতে পারতাম।

সারেঙ লোকটি নিজের কাজ করতে করতে দেখত আমাকে। একদিন হাত নেড়ে কাছে ডাকল। তার নাম বাবুর আলি। এই লঞ্চের সঙ্গে আছে সারা জীবন। সেই কোন ছোটোবেলায় খালাসির চাকরিতে ঢোকার পর আর কোথাও যাওয়া হয়নি। ওর বাবা, মা, ভাই, বোন কিছুই ছিলনা, ছোটোবেলা থেকেই জানা নেই কিছু। বিয়েও করেনি। বন্ধুও কেউ নেই। বাবুর আলি নামটা দিয়েছিল লঞ্চের অনেক আগের এক বুড়ো সারেঙ, কিন্তু সে হিন্দু না মুসলমান তাও কারও জানা নেই। অবাক হয়ে চেয়ে থাকতাম মানুষটার দিকে। যেন জলের ওপর ডানা মেলা শঙ্খচিলের জীবন। লোকটার মুখের ভাঁজে ভাঁজে কতদিনের কত গল্প জমে আছে যেন! তারপর মাঝে মাঝেই যেতাম ওখানে। খুব কম কথায়, প্রায় ফিসফিস করে অনেক গল্প শুনিয়েছে আমায় বাবুর আলি। কত ঝড়, বন্যার কথা শুনেছি! লঞ্চ আগে পদ্মা, মেঘনা, যমুনায় যেত কাজে। মাছ, শুশুক, সাপ আর বাঘের গল্পও শুনেছি। একবার ভূমিকম্পের পর ব্রহ্মপুত্রে হাতি ভেসে যেতেও দেখেছে সারেঙ, তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেও পারেনি। একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল তার, শুনে ভীষণ অবাক হয়েছিলাম আমি। বাবাকে বলায় বাবা বললেন, হতেই পারে। লোকটা যদি আশি বছরের হয় তবে রবিঠাকুরের চেয়ে মাত্র কুড়ি বছরের ছোটো। হয়ত দেখে থাকবে!

বাবুর আলি তখন ছোটো ছেলে, একটা বজরায় দাঁড়িয়ে ছিলেন রবিঠাকুর। লম্বা, সুন্দর চেহারা। সাধুর মত চোখ। জিজ্ঞেস করে নামটা জানতে পেরেছিল বজরার মাঝির কাছ থেকে। তবে দূর থেকে একবারই দেখা, কথাটথা হয়নি।

একদিন লঞ্চে উঠে বসে আছি চুপচাপ, হঠাৎ হালকা মেঘ করে বৃষ্টি এল। ঝিরঝিরে বৃষ্টি। ব্রহ্মপুত্রের কালো জলে স্রোতের পাকে হঠাৎ কি একটা মাথা তুলেই ডুবে গেল, ভালো করে দেখার আগেই। ধোঁয়ার মত ঝিরঝিরে বৃষ্টি জলের ওপর পড়ে স্রোতের গায়ে ভারী সুন্দর দেখাচ্ছিল। কখন বাবুর আলি দাদু পাশে এসে দাঁড়িয়েছে বুঝতেই পারিনি। বৃষ্টি দেখতে দেখতে চাপা গলায় বলল, এরে কয় ইলশাগুঁড়ি বৃষ্টি। এ সময় ইলশা মাছের ঝাঁক ধরা পড়ে জাউল্যাগো জালে। জলের রঙ দেইখ্যা বুঝা যায় ইলশা মাছের চলন। আমি গুছিয়ে বসলাম ওর পাশে।

-তুমি বুঝতে পারো?

-কত ধরসি ইলশা মাছ, তবে এইখানে না। পদ্মা নদীর জলে মেলা ইলিশ! ঐখ্যানে ধরসি। তবে এক রাইতের এক ঘটনার পরে আর ধরতে যাই নাই। হালার প্রাণ আগে না ইলিশ আগে!

গল্পের গন্ধ পাওয়া গেল। দাদুর চোখ জলের স্রোতের দিকে, চুপ করে আছে।

-কি ঘটনা দাদু?

-থাউক, কইয়া কাম নাই। ভয় পাইবা তুমি। ভূত-প্রেতের কথা ছুটোদের কইতে নাই।

ভূতের কথা শুনে আমি লাফিয়ে উঠলাম।

-না দাদু, বলো, বলো! আমি ভূতের গল্প ভালোবাসি। দাদু শুরু করল ওর গল্প।

তখন আমার কুড়ি বছর বয়স। শ্রাবণ মাসের অমাবস্যা রাতে পদ্মা নদীর মাঝখানে লঞ্চ নোঙর করে রাখা আছে। মাঝরাতে গায়ে জলের ছিটে লেগে ঘুম ভেঙে গেল। হালকা ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। এ বৃষ্টি বড়ো আরামের, গা চট করে ভেজে না শুধু জলের কণা গায়ে মাথায় ছুঁয়ে যায়। লঞ্চের বাকিরা ঘুমিয়ে আছে। একা জেগে বসে আছি লঞ্চের আহ্নিকে, মানে একেবারে সামনের দিকে। হঠাৎ মনে হল, জাল ফেললে ইলিশ উঠতে পারে। বাকিদের কাউকে না ডেকে জাল ফেলে বসে আছি। সুতোটা কানের সঙ্গে ঠেকানো আছে, জালে মাছ পড়লে হালকা কাঁপন টের পাওয়া যায়। রাত কত, জানি না। হঠাৎ একটা লম্ফ জ্বলে উঠল, সেই আলোয় দেখলাম ছোটো একটা নৌকোয় বসে জাল ফেলছে কেউ। আর একটা আলো টিমটিম করে জ্বলে উঠল আর এক জায়গায়, আর একটা নৌকো। অবাক লাগল, মাঝ পদ্মায় নৌকো এল কোথা থেকে! জেলেরা জাল ফেলে ভোরের দিকে, এখন তো মাঝরাত! দেখতে দেখতে লঞ্চের চারপাশে অনেকগুলো নৌকোয় লম্ফ জ্বলে উঠল। ঠিক যেন পদ্মার কালো জলে জোনাকি ঝিকমিক করছে! এমন দৃশ্য কখনও দেখিনি এখানে। সারা পদ্মায় জলের ঢেউ দেখলে বুক কাঁপে, সেখানে দু’তিনশো লম্ফ জ্বেলে ছিপ নৌকোয় মাছ ধরে কারা? এত নৌকো এল কোথা থেকে? লঞ্চের বড়ো বাতিটা হঠাৎ জ্বেলে দিলাম। আশ্চর্য, কোথাও কোন নৌকো নেই! ঝিকিমিকি লম্ফের আলোগুলোও নেই। এক মুহূর্তে সব গেল কোথায়? হঠাৎ জালের সুতোয় কাঁপন টের পেলাম। একটু সবুর করে সুতো গোটাতে শুরু করলাম। এই জাল একা তোলা মুখের কথা না। তবে বয়স কম, গায়েও শক্তি অঢেল। জালের কাঁপনে বুঝলাম মাছ পড়েছে ম্যালা! মণখানেকের ওপর হবে! জাল প্রায় তুলে ফেলেছি, হঠাৎ নাকে খুব বদ গন্ধ পেলাম। জীবজন্তু বা মানুষ খুব পচে গেলে যে রকম দুর্গন্ধ হয়, সেই রকম। জাল তুলে দেখি মাছ কই? জালে উঠে এসেছে একটা মরা মানুষ। না, মরা তো না, জাল ছিঁড়ে উঠে দাঁড়িয়েছে মানুষটা। মাংস খসে খসে পড়া, পচা গলা একটা মানুষের মত চেহারা দাঁড়িয়ে আছে আমার দিকে চেয়ে। চোখদুটো জ্বলছে তার। এক মুহূর্ত দেখেই আমি চিৎকার করে পড়ে গেলাম, তারপর কিছু জানি না। সকালে জ্ঞান ফিরল সকলের ঠেলাঠেলিতে। তখন আর কোথাও কিচ্ছু নেই। তারপর থেকে আমি রাতে একা উঠি না, মাছ ধরার জালেও আর হাত দিই না। পদ্মা, ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা কত লোকের প্রাণ নিয়েছে, তার হিসেব আছে? তাদের আত্মারা শান্তি পায় না কখনও। তবে তারা বড়ো দুর্ভাগা, গতি না হওয়া শরীর তো! কারও কোনো ক্ষতি করার ক্ষমতা নেই।

আমি বললাম, একা থাকো, তোমার ভয় করে না? বাবুর দাদু একটু হেসে বলল, নাহ! ওসব সয়ে গেছে আমার, আর ভয় করে না। চলাচল শেষ হয়ে যাওয়া স্টিমারের অকেজো চিমনির ওপর বসে থাকা একটা বুড়ো শঙ্খচিল, যার পায়ে, ডানায় বয়েস এসে ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। ছানিপড়া, নিষ্প্রভ চোখে সে শুধু চেয়ে থাকে নদীর স্রোতের দিকে। অথবা চেয়ে থাকে আকাশ আর জল যেখানে অনেক দূরে আবছা রেখায় মিশে গেছে, সেখানে। কী আছে তার মনে? মেঘ করে এলে যে কালো স্রোত বয়ে যায় ব্রহ্মপুত্রে অথবা অনেক পেছনে ফেলে আসা সেই পদ্মা, মেধনা, গাঙুরে গঙ্গায়। অথবা দুপুরের রোদ যখন হিরের কুচি ছড়িয়ে দেয় স্রোতে, সে কি টের পায়? স্থির হয়ে থাকা বুড়ো শরীরের শুকনো পালক যখন ঝোড়ো, জোলো বাতাসে ফুরফুর করে ওড়ে তখন কি তার শরীরে সাড়া জাগে? বুড়ো সারেঙ বাবুর শেখকে দেখে আমার ঐ কথা মনে হয়।

পাণ্ডু স্টেশনের চৌহদ্দিতে পাগল মানুষের সংখ্যা বাড়ে। দেহাত থেকে এসে এখানে জায়গা করে নেওয়া কুলির দল কাজ ফুরিয়ে যাওয়ায় অনেকেই ফিরে গেছে গাঁয়ে। যারা যেতে পারেনি তারা বসে থাকে ঝুপসি বট গাছটার তলায়। ওখানে জমজমাট কুস্তির আখড়ার পাশে মহাবীর বজরংবলীর পাথুরে মূর্তিতে নিয়ম করে তেল-সিঁদুর পড়েনা। গলায় শুকিয়ে যাওয়া গাঁদার মালা কদাচিৎ পালটায় কেউ। লাল নিশান আর সার সার লাল ল্যাঙোটের লম্বা ফালিগুলো হাওয়ায় দোলে। বুড়ো,বেকার কুলি দামোদর বসে বসে ঢোলে। পাশের আর.পি.এফের ছোটো ব্যারাক থেকে এখানে ডাল-রুটি আসে। চেনা মানুষেরা ওর সামনে দু’চার পয়সা করে ফেলে যায়। বজরংবলীর মূর্তির সামনেও কিছু পয়সা জমা হয়। সিটি বাস যে গাছতলা থেকে ছাড়ে ওখানে ছোট্ট চায়ের দোকান। আগে দোকান খোলা থাকত দিন-রাত, এখন শাটল ফেরা অবধি খোলা থাকে। পাশে খালেক বসে কাটা তামাক আর তাম্বুল নিয়ে।

এরা চেনে আমাকে। দেখা হলে হাসে। আমি বাড়ি ফেরার তাড়ায় ছুট লাগাই। দূর থেকে অরুণা সিনেমা হলের গান শুনতে পাই। ছ’টায় গান শেষ হয়ে সিনেমা শুরু হবে। তার আগেই বাড়ি ফেরা নিয়ম। রাতের পড়া হয়ে যাবার পর আমি ছবি আঁকি। আমার রোজকার দেখা মানুষদের আঁকতে চেষ্টা করি। ভালো হয় না! পেনসিল কাটতে কাটতে ছোটো হয়ে যায়। খাতার কাগজ ফুরিয়ে গেলে দেওয়ালে আঁকি কাঠকয়লার টুকরো দিয়ে। চক দিয়ে মেঝেতে তো ছোটোবেলা থেকেই আঁকি। পাহাড়ে উঠে বড়ো বড়ো পাথরের গায়েও চক দিয়ে ছবি এঁকে আসি। কিছুতেই পছন্দ হয় না।

আমার সঙ্গে যে তিনজন পাহাড়ে, জঙ্গলে যেত তাদের কথা বলেছি। বাবু, বাচ্চু আর পানু। সবচেয়ে ছোটো হলেও তিন-চার বছরের পানুকে কিছুতেই ঠেকিয়ে রাখা যেত না। ও থাকত হাতে একটা নাগা দা নিয়ে। বলে বলেও কিছুতেই ওটা বাড়িতে রেখে আসতে চাইত না। আমরা নীলাচল পাহাড়ের মাঝামাঝি অবধি যেতাম। সেখানে জঙ্গল বেশ ঘন। পাথরের সিঁড়ি খুব খাড়া হলেও উঠে যেত তীর্থ করতে আসা লোকেরা। আমরা ওই পথে না গিয়ে পাহাড়ে উঠতাম বন জঙ্গলের ভিতর দিয়ে, যেখানে প্রতি পদে বিপদ লুকিয়ে আছে। আসলে আমরা বিপদের মুখোমুখি হতেই চাইতাম। নাগা দা হাতে থাকলেও কোন গাছপালা কাটা চলবে না, এরকম নিয়ম ছিল আমাদের। কোন পাখি বা কাঠবিড়ালিকে ঢিল ছোঁড়া বা তাড়া করার বারণ ছিল। বড়ো আনন্দ পেতাম এই রকম অভিযান করে। পাথরে ঢাকা একটা ঝরনার ওপর দিয়ে পাহাড় থেকে নেমে যাওয়ার পথটা ভয়ঙ্কর হলেও সুন্দর। ওখানে জঙ্গল এত ঘন যে আমাদের কেউ দেখতেই পেত না। মাথার ওপরটাই জঙ্গলে ঢাকা একটা গুহার মত পথ। ওখানে ঢুকে পাথরে শুয়ে থাকলে তলা দিয়ে বয়ে যাওয়া জলের শব্দ শোনা যেত। নাকে আসত খুব তেজি বুনো গন্ধ। ভেজা মাটির গন্ধও মিশে ছিল তার সঙ্গে। একদিন একটা আঁশটে গন্ধ পেয়ে উঁকিঝুঁকি মেরে দেখি তিনটে পাথরের খাঁজে শুকনো পাতার স্তূপের ওপর বিড়ে পাকিয়ে বসে আছে একটা মস্ত সাপ! আলো কম থাকায় কী সাপ বুঝতে না পারলেও তার ফনা ছিল দেখেছি, গায়ের রঙ কালচে। ছুটে পালাতে হয়েছিল তক্ষুনি! পানু আবার সাপটাকে ঝুঁকে দেখতে গেছিল। সাপটার চাউনি এখনও মনে আছে আমার। ভয় পেয়ে ওই পথে আর যাইনি কোনদিন। পরে শুনেছি ওই খানে গোরু ছাগলরাও চরতে যায় না। ওখানে শঙ্খচূড় সাপের বাসা। এখন মনে হয় সাপটা বোধহয় ডিম পাহারা দিচ্ছিল বলে আমাদের তাড়া করেনি।

এবার আমি একা একাই ছুটির দিনে কামাখ্যা মন্দিরে যেতে আরম্ভ করলাম। পুজো দিতে যেতাম না। আমার পুজো কোন মন্দিরে গিয়ে আজও হয় না। হয় মনে, মনে। বাবা মা আর বাকি গুরুজনদেরও মন্দিরে পুজো দেওয়া নিয়ে মাতামাতি দেখিনি। আমি এমনিই মন্দিরে যেতাম। ওখানে পাথরের দেওয়ালে গম্ভীর গলায় মন্ত্রপাঠ প্রতিধ্বনি, ধুপধুনো আর ফুলের গন্ধ আর অন্ধকারে মা কামাখ্যার রহস্যময় পীঠ, সব মিলিয়ে বড়ো ভালো লাগত। আমার পৈতাগুরু ভবেন পাণ্ডা একজন প্রধান পুরোহিত, তার সঙ্গে দেখা হত। অবাক হয়ে দেখতাম, ছোটো ছোটো মেয়েকে ফুলটুল দিয়ে সাজিয়ে কুমারী পুজো করছে। দেখতে ভালোই লাগত তাদের গম্ভীর মুখ করে বসে পুজো নেওয়া! সৌভাগ্যকুণ্ডের জলের তলায় কচ্ছপ দেখতাম, ওখানে সবুজ পানায় ঢাকা কালো জল মাথায় দিতে ভালো লাগত। আর ভালো লাগত ভুবনেশ্বরীর ওপরে বটগাছের তলায় কালো পাথরটাতে চুপ করে বসে থাকতে। সাহস করে তিন চারবারের বেশি যেতে পারিনি একা একা। দশ কুড়ি মিনিট বড়ো জোর। বাড়ি ফেরার তাড়া থাকত। কাউকে বলতেও পারতাম না ওখানে গেছি একা একা। তবু যেতেই হয়েছে। নীচে ব্রহ্মপুত্রের রূপালি ধারা, বটগাছের পাতা কাঁপিয়ে ঝির ঝিরে হাওয়া আর অনেক নীচে রঙিন শতরঞ্চির মত বিছিয়ে থাকা সুন্দর গৌহাটি শহর। কোথাও কোন শব্দ নেই। বটগাছের ঠান্ডা ছায়ায় পাথরের ওপর চুপ করে বসে থাকা। এত শান্তি বোধহয় পৃথিবীর কোথাও নেই।

কামাখ্যার পাণ্ডাদের কাছে আশ্চর্য একটা খবর পেয়েছিলাম মা বাবার সঙ্গে গিয়ে। বহু পুরনো একটা খেরোর খাতা বার করে ওরা দেখিয়ে দিয়েছিল আমাদের পূর্বপুরুষেরা কে কবে আর কতবার কামাখ্যা মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলেন।

আমাদের মায়ের বাবাকে আমরা সোনাভাই বলে ডাকতাম। তিনি শুধু যে বড়ো ডাক্তার ছিলেন তাই নয়, দানবীর হিসেবে বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর আরও অনেক রকম শখ ছিল। তাঁর নিজস্ব যাত্রার দলও ছিল। সেই যাত্রা দল নিয়ে বহু বছর আগে তিনি কামাখ্যার ঐ পাণ্ডার বাড়িতেই উঠেছিলেন পুজো দিতে। সে কথাও তাদের খেরোর খাতায় লেখা আছে। কয়েকশো বছরের খবর তো পাওয়া যাবেই আরও কত পুরনো দিনের হিসেব ওখানে লেখা আছে কে জানে?

গরমের ছুটিতে বাবা ঠিক করলেন একমাস ছুটি নিয়ে বেড়াতে নিয়ে যাবেন। ট্রেনে বোধহয় সেই প্রথম ব্রহ্মপুত্র ব্রিজের ওপর দিয়ে যাওয়া হল আমাদের। অদ্ভুত দেখাচ্ছিল আমাদের এত চেনা নীলাচল পাহাড় আর তার তলায় পাণ্ডু শহর। ট্রেনে উঠলাম নতুন তৈরি হওয়া কামাখ্যা স্টেশন থেকে। কলকাতা পৌঁছে আর একটা ট্রেন ধরে বিশাখাপত্তনম। কখনও সমুদ্র দেখিনি আমরা চার ভাইবোন। বড়োমামা তখন বদলি হয়ে এসেছেন বিশাখাপত্তনম বা ভাইজ্যাগ-এ। পৌঁছতে রাত হয়েছিল বলে তক্ষুনি সমুদ্র দেখতে যাওয়া হল না। বড়োমামার কোয়ার্টার একেবারে সমুদ্রের ধারে। সারা রাত ঢেউ ভাঙার গম গম শব্দ শুনে আন্দাজ করার চেষ্টা করছিলাম সমুদ্র ব্যাপারটা কী! সকালে সমুদ্রের ধারে গিয়ে অবাক হয়ে গেলাম। সমুদ্র এত সুন্দর!

সমুদ্রের জলের রঙ কী? আমার চোখে ধাঁধা লেগে গেল। সূর্য তখনও ওঠেনি, অন্ধকার সবে একটু ফ্যাকাসে হয়েছে। তাড়াতাড়ি ঘুম ভাঙ্গিয়ে আপালাসা দিদি আমাদের নিয়ে এসেছে এখানে। জায়গাটা খাঁড়ির কাছ ঘেঁষে। যে খাঁড়ি বা ব্যাকওয়াটার ক্যানালের ওপারে খাড়া পাহাড়ে কাছাকাছি রয়েছে মন্দির, মসজিদ আর গির্জা। পাহাড়ের তলায় সমুদ্রের গায়ে মস্ত উঁচু লাইটহাউসের মাথায় আলো সারারাত ঘুরে ঘুরে পাহারা দিয়েছে সমুদ্র, দূরের জাহাজকে পথ দেখিয়েছে। খাঁড়ি ধরে সোজা ডাইনে গেলে বিশাখাপত্তনমের বন্দর। বাঁয়ে তাকালে বড়ো বড়ো পাথরের স্তূপের ওপারে দূরে ওয়ালটেয়ার। আপালাসা দিদি সব আঙুল তুলে দেখাবার চেষ্টা করছে। আমার নজর ওসব ফিরেও দেখছে না। দেখছে সমুদ্রের জলের রঙ! দিনের আলো ফোটা আর সূর্য ওঠার পর থেকেই যা একটু একটু করে পালটে যাচ্ছে।

নীলের কত রকম ফের। তার সঙ্গে সবুজ, বাদামি, কালো, বেগুনি, আমার চোখ রঙগুলো আলাদা করে দেখছে আবার হারিয়ে ফেলছে। কতদূর থেকে জলের এক একটা প্রাচীর উঁচু হতে হতে কাছে এসে দুতিন মানুষ উঁচু ঢেউ হয়ে কামানের মত ভীষণ শব্দে ভেঙে পড়ছে পাড়ে। তার মাথার ওপরে হাজার পাগলা ঘোড়ার মত সাদা ফেনার মাতন! ভেঙে পড়ার পর ফেনা গড়িয়ে অনেকদূর এসে শান্ত হয়ে ফিরে যাচ্ছে সমুদ্রে। ফেরারও একটা নি:শ্বাস ফেলার মত শব্দ আছে। ফিরে যাওয়া ফেনার ওপর আবার আছড়ে পড়ছে নতুন ঢেউ। দূরে তৈরি হচ্ছে আরও নতুন নোনা জলের দেওয়াল। চেয়ে থাকতে থাকতে চোখে নেশা ধরে যায়। হাজার জয়ঢাক বা কামান ফাটার মত আওয়াজ শুনতে শুনতে কানে তালা লাগে। বুকের মধ্যে সেই লক্ষ তবলার বোল ঢেউ তোলে।

এ এলাকাটায় এত রকমের শঙ্খ আর ঝিনুক পাওয়া যায় যা আর কোথাও দেখিনি। কুড়িয়ে কুড়িয়ে আমাদের পকেট ভর্তি হয়ে যেত। কত রকমের রঙ আর আকার তাদের! আজও আমাদের সংগ্রহে রাখা আছে কিছু কিছু। প্রথম দেখা সমুদ্র আমার কাছে স্বপ্নের মতো।

একটু বাদে বড়োরা এসে পৌঁছলেন। মার সেই হাঁটু অব্দি ফেনায় ছোটো মেয়ের মত হাসিমুখে দাঁড়িয়ে থাকা চেহারাটা আজও মনে আছে। বাবার বালির ওপরে বসে ঢেউ দেখতে দেখতে সিগারেট খাওয়াও মনে আছে। বাবা জলে নামতে চাইতেন না। আমরা যে কখন কোমর জলে নেমে গেছি জানতেই পারিনি। বাবলিকে বেশি নামতে দেয়নি বড়োরা, ছোটো বলে। গোড়ালি ফেনায় ভিজে যেতেই হেসে কুটিপাটি ও। দাদা, দিদি আমি আর ওদের কাজের মেয়ে আপালাসা দিদি নোনা জলে বালিতে মাখামাখি হয়ে বাড়ি ফিরে আবার চান করলাম।

বিকেলে ছোট্টভাই সবুকে কোলে নিয়ে আমরা পাশের একটা বাগানে দোলনায় দোল খেতে যেতাম। সন্ধেবেলায় আবার সবাই মিলে সমুদ্রের ধারে বসে থাকা। রাতের সমুদ্র নীলচে রেডিয়ামের মত অন্ধকারে জ্বল জ্বল করত। ফুঁসে ওঠা ঢেউয়ের মাথায় ফেনা দেখে মনে হত বাসুকির দাঁত। লাইট হাউসের বড়ো আলোর বিম চক্কর কেটে যেত আমাদের মাথার ওপর দিয়ে। কালো পাহাড়ের গায়ে পুতুলের ঘরের মত সাজানো মন্দির, মসজিদ আর গির্জার জ্বালানো আলো মিট মিট করে জ্বলত।

বাঁয়ে তাকালে দূরের ওয়ালটেয়ারের আলোর মালা দেখতে পেতাম। সে আলোর আভায় বড়ো বড়ো পাথরের স্তূপে ধাক্কা খেয়ে ফেনাশুদ্ধু জল ছিটকে উঠতে দেখতাম। সন্ধেবেলা দিনের গাড়ি ঘোড়ার শব্দ কমে গেলে সমুদ্রে গুম গুম শব্দ বাড়ত। আমরা অনেক দূর থেকে আসা জাহাজের আলো দেখতে পেতাম। ঢেউয়ের অন্ধকার শরীর মাঝে মাঝে সে আলো ঢেকে দিত, আবার ফুটে উঠত। কোন কোন জাহাজ বন্দর থেকে এসে খাঁড়ি দিয়ে চলে যেত সমুদ্রের দিকে। কাছ থেকে দেখতে পেতাম কত লোক কত আলো! একটু একটু করে দূর থেকে আরও দূরে গেলে তার আলো আকাশের তারার মত মিট মিট করত। তারপর আর দেখা যেতনা। এত বড়ো আর পরিষ্কার আকাশ কোথাও দেখিনি। এত তারাও কোথাও দেখতে পাইনি।

এখন গরমকাল। বেশ কটা দিন মোটামুটি শান্তই ছিল সমুদ্র। মামী যেখানে রাঁধতেন তাঁর মাথার ওপর বিশাল ছাতা ধরে ছিল একটা মোটা তেঁতুল গাছ। শুধু খসে পড়া পাকা তেঁতুলেই আমাদের পকেট উপচে পড়ত। ভারী মিষ্টি তার স্বাদ। সারা দিন সমুদ্রের বাতাসে ঝির ঝির করে পাতা পড়ত তার। উঠোন ঢাকা পড়ে যেত ঝরে পড়া পাতায়। একদিন দুপুর থেকে আকাশে মেঘ জমতে জমতে কালো হয়ে গেল আকাশ। একটুও হাওয়া নেই। থম থম করতে লাগল চারদিক। মা আর মামী বলাবলি করছিলেন ঝড় আসবে আজ। বিকেলের দিকে ঝড় শুরু হল। ঝড়ের ভয়ঙ্কর শব্দে সমুদ্রের ঐ রকম গম গম আওয়াজ ঢাকা পড়ে গেল। বিকেল পাঁচটায় রাতের মত অন্ধকার! তেঁতুল গাছের একটা মোটা ডাল মুচড়ে ভেঙে পড়লো উঠোনে। একটুর জন্য রান্নাঘরের ছাদের ওপর পড়েনি। ভারী কাঠের তৈরি একটা মুরগির খাঁচা উলটে পালটে গড়াগড়ি খেতে খেতে ভেঙে গিয়ে মুরগিগুলো হাওয়ার ধাক্কায় কোথায় উড়ে গেল। কয়েকটা রান্নাঘরের ভেতর ঢুকতে পেরে বেঁচে গেল। কয়েকটাকে আর খুঁজেই পাওয়া গেল না। তার সঙ্গে আকাশ চিরে বাজ পড়তে লাগল সমুদ্রের ওপর। আমরা বারান্দার জালির ভেতর দিয়ে সমুদ্রের দিকে চেয়ে ভয় পেয়ে গেলাম। এক একটা ঢেউ কুড়ি তিরিশ ফুট উঁচু হয়ে ছুটে এসে ভেঙে পড়ছে অনেক উঁচু পাকা রাস্তার ওপর। আমাদের গায়েও নোনা জলের ছিটে লাগছে। তার মধ্যেই দু তিনটে জাহাজকে সমুদ্রে ভাসতে দেখেছিলাম। তারা ঢেউয়ের মাথায় একবার ওপরে উঠছে আবার ছিটকে পড়ছে নীচে। যারা ওতে ছিল তাদের কথা ভেবে মন খারাপ লাগছিল। কী হল তাদের কে জানে! অনেক রাতে ঝড় থেমে আবার শুরু হল বৃষ্টি। সকালবেলা ঘুম ভেঙে দেখি চারদিক শান্ত। যেন কিছুই হয়নি। 

বিশাখাপত্তনম থেকে ট্রেনে পুরী যাবার পথে রেলের চেকার খবর দিলেন প্রধানমন্ত্রী জহরলাল নেহেরু মারা গেছেন। পুরীর সমুদ্র দুদিন দেখে চলে এলাম কলকাতায়। পুরীর সমুদ্র আমাকে তেমন খুশি করতে পারলো না। কারণ, তখন বিশাখাপত্তনমের উত্তাল সমুদ্র সবে দেখে এসেছি আমরা। তবে তখনকার নির্জন সুন্দর পুরী শহরটা ভালো লেগেছিল। তখন মাত্র একটা দুটো হোটেল তৈরি হয়েছে ওখানে। এত লোকের ভিড়ও নেই, গাড়ি নেই, আর গাছপালা ছিল অনেক বেশি। পুরীর সেই নির্জন সৈকত সত্যিই সুন্দর ছিল। বালি চাপা পড়া গুটিকয়েক ভাঙা পুরনো বাড়ির ওপরটুকু জেগে আছে ফাঁকা স্বর্গদ্বারের পাড়ে। সেগুলোতে কেউ থাকে না, থাকা সম্ভবও নয়। শুনেছিলাম ওগুলো ভুতের বাড়ি। তারপর শুধু বালির ওপর ঢেউয়ের আছড়ে পড়া।

কলকাতায় দুটো বড়ো কাজ হল। বড়োপিসিমার বাড়িতে উঠেছিলাম। পিসতুতো বড়দাদা তখন ইঞ্জিনিয়ার পি.ডবলিউ.ডিতে। তিনি একদিন আমাদের সারকারামা দেখাতে নিয়ে গিয়ে বিপদে পড়েছিলেন। বাবলি ছোটো বলে বোধহয় যায়নি। দাদা নিজেই যেতে চেয়েছিলেন আমাদের নিয়ে, অফিসে জরুরি কাজ পড়ায় দুজন লোক দিয়ে পাঠালেন আমাদের। টিফিন কিনে খাওয়ানোর টাকাও দিয়েছিলেন ওদের হাতে মনে হয়। নইলে সারাদিন লাইনে দাঁড়িয়ে অত কিছু খেলাম কি করে ?

প্রায় বেলা দশটা থেকে ঘোর গরমে খোলা ময়দানে প্রায় মনুমেন্ট থেকে লাইন গিয়ে পৌঁছেছে সেন্ট পলস চার্চের পাশে। এখন যেখানে বিড়লারা প্ল্যানেটোরিয়াম বসিয়েছেন সেখানে। ওখানে ইগ্‌লুর মত গোল অত্যন্ত অস্বাস্থকর বিচ্ছিরি একটা বিশাল তাঁবুতে ঢুকিয়ে লুমিয়েরদের ক্যামেরায় তোলা আবোল তাবোল কিছু ছবি দেখানো হচ্ছিল। গরমে সেদ্ধ হয়ে যে তার ভেতর কেউ দম আটকে মরেনি ভাগ্য ভালো বলতে হবে। সেই সন আ লুমিয়ের দেখতে জ্যৈষ্ঠ মাসে অত বড়ো লাইন। আমার আট, দিদির এগারো, দাদার চোদ্দ।

দুই বিহারী পাহারাদার আমাদের নিয়ে দাঁড়াল লাইনের শেষ মাথায়। যেখান থেকে লাইনের শুরু দেখতে পাওয়ার কোন প্রশ্নই নেই। ছ ঘণ্টা বাদে ওই তাঁবুতে পৌঁছে দু মিনিট বাদেই চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে বাইরে এলাম। তখন ছটা সাড়ে ছটা বেজে গেছে। ফেরার পথে গোলপার্কে দাঁড় করিয়ে তারা কোন বিশেষ কাজ সারতে যায়। আরও ঘণ্টাখানেক পরে হঠাৎ সেজোমামার চোখে পড়ে যাওয়ায় আমরা ট্যাক্সি করে বাড়ি ফিরি। আমাদের ঐ রকম দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হয়ে যাওয়া সেজোমামার গোল চোখে চেয়ে থাকা বেশ মনে আছে। সেজোমামা তখন ইঞ্জিনিয়ারিং এর ছাত্র। 

আর একটা কাজ হল বাবার ব্যাগভর্তি অয়েল পেন্টিংএর সরঞ্জাম আর একগাদা কাঠ মিস্ত্রিদের যন্ত্রপাতি কেনা।

পাণ্ডু ফেরার সময় ট্রেনে এই দুটি নতুন ব্যাগ উঠল। এই দুটি ব্যাগের মধ্যেই রইল আমার ছোটোবেলার জীবনের মূল বাঁক। লিনসিড আর তার্পিনের গন্ধ পেলাম নাকে।

আবার শুরু হল স্কুল যাওয়া। বাবা নতুন নাটক ধরলেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা রক্তকরবী। বাড়িতে বাবা পড়তেন যখন পাশে বসে শুনতাম। শুনতে শুনতে আমাদের প্রায় মুখস্ত হয়ে গেল। গানগুলো তো ছোটোবেলা থেকেই শুনেছি। আরও ছোটোবেলায় শুনতাম আরো একটা খুব ভালোলাগা নাটক। যুবতীর্থর শক্তিকাকা, জীবনকাকারা তো মাঝে মাঝে সকাল হলেই চলে আসত। বেশ বুঝতে পারতাম খুব রিহার্সাল চলছে রোজ। বাবার নাটক পড়া এত জোর গলায় চলতো বোধহয় পাড়ার লোকেরাও শুনতো। পাশের বাড়ির এক মারোয়ারী আর একজনকে বলাবলি করেছিল ম্যানেজার সাবকো কেয়া হুয়া ইতনা চিল্লাতা কিঁউ? অন্যজন বলেছিল গানা ভি গাতা। আচ্ছা গানা। সব মিলকর বহুত জোরসে গাতা। এসব শোনার পর আমাদের কোরাস গানের তেজ আরও বেড়ে যেত।

বাবা আবার ছবি আঁকতে আরম্ভ করলেন। কি ভালো যে আঁকতেন অবাক হয়ে দেখতাম আমরা। কোন চেনা লোকের ছবি কয়েকটা লাইনে এঁকে ফেলতেন। এত জীবন্ত পোর্টেট খুব কম লোকেই আঁকতে পারে। একমাত্র অতুল বসুর ছবি অত প্রাণবন্ত হত। চরিত্রটা ঠিকঠাক ফুটে উঠত ছবিতে। আরো ছোটোবেলায় যাদবপুরে থাকতে বাবার আঁকা ছবিগুলো ছিল জলরঙে আঁকা ছোটোমাপের। কলমে কালিতে চট্‌পট আঁকতেন কার্টুন, মজার ক্যাপশানও থাকত তার তলায় লেখা। প্যাস্টেলেও এঁকেছেন ভালো ভালো ছবি। এবার আঁকতে শুরু করলেন ক্যানভাসের ওপর তেল রং দিয়ে। 

বাবাকে আঁকতে দেখে আমার মনের ভেতরকার টাট্টু ঘোড়াটাও তাল ঠুকতে লাগল। বাবা ক্যানভাসের সঙ্গে  তেলরঙে আঁকার মোটা কাগজও কিনেছিলেন। একটা কাগজ লুকিয়ে ফেললাম তিনতলার ঘরে। তেলরঙের ব্য্যাগে হাত দেওয়া সহজ কাজ ছিল না। বাবা খেপে যেতে পারেন। একদিন সুযোগ বুঝে রং বার করে সোজা ছাদের ঘরে। তেল মিশিয়ে সেই আমার প্রথম ছবি। একটা বাঘের মুখ এঁকেছিলাম মনে আছে। লোম আঁকতে প্যালেট নাইফ বা স্প্যাচুলা ব্যবহারের কথা কেউ শিখিয়ে না দিলেও নিজের থেকেই করলাম। এরপর আবার সব গুছিয়ে রাখলাম ঠিকঠাক জায়গায়। কেউ তখন টেরও পেলনা।

ধরা পড়লাম তিন চারদিন পরে। মা দেখি ছবিটা হাতে নিয়ে হাসি হাসি মুখে তেতলা থেকে নেমে আসছেন। বাবাকে দেখানোর পর দেখলাম বাবাও খুশি।

আমার মোটেও ছবি এঁকে ঠিক জায়গায় তুলে রাখার স্বভাব ছিল না। মা সব খুঁজেপেতে জমিয়ে রাখতেন। বাবা রং গুলো খুলেই রাখলেন যাতে আমার পেতে অসুবিধা না হয়। অফিস, রক্তকরবী নাটকের রিহার্সাল এসবের ফাঁকে বাবা মাঝে মাঝে তেলরং দিয়ে ছবি আঁকতে বসলে পাশে বসে মন দিয়ে দেখতাম। আরো ভালো করে শিখে নেবার চেষ্টা করতাম।

সাংবীরপুনদাদার বদলে ব্যাঙ্কে দুজন নতুন লোক এসেছে। বন্দুক হাতে পাহারা দেয় নরবাহাদুর ছেত্রী। অফিসের ভেতর কাজ করে ফমবাহাদুর গুরুং। দুজনেই নেপালী, দুজনেই হাসিখুশি আর খুব সরল ভালোমানুষ। ভাব হয়ে গেল খুব আমার সঙ্গে। কম কথা বলে দুজনেই। দুপুর আর আগের মত ফাঁকা নেই আমার। কামাখ্যা মন্দিরে উঠে যাবার পথে কিছুটা ওপরে ঘন জঙ্গলের মধ্যে দরমার দুটো ঘরে ওরা থাকে। ছোট্ট একটুখানি উঠোন, ঝাড়ু দেয় নরবাহাদুরদাদার বউ। আমি চলে যাই মাঝে মাঝে ওদের ঘর দেখতে। বউটি আমাকে বাতাসা নকুলদানা খেতে দেয়। কিন্তু সবসময় কাজে ব্যস্ত, কথা বলার সময় নেই। ফলে ওর সঙ্গে আলাপ জমলো না। আমার পাহাড়ি মানুষদের কেন জানি না খুব ভালো লাগত। বার বার মনে পড়ত জুঠিদিদির কথা। নানান গল্পের ঝুড়ি ছিল সে। মন খারাপ হত ওর কথা মনে হলে। সে নাকি নেপালে চলে গেছে বিয়ের পর। মাঝে মাঝে ওর বুড়াদাদাকেও দেখতে যেতাম। সাংবীরপুনদাদার বউ এখন বুড়াদাদার দেখাশুনো করে। বুড়াদাদা সারাদিন খুঁটিতে ঠেস দিয়ে বারান্দায় বসে থাকে চুপ করে। কানেও শুনতে পায় না, চোখেও দেখে না। আমি গেলে কিন্তু ঠিক বুঝতে পারত। পাশের মাটির মেঝে থাবড়ে বসতে বলত। বসতাম কিছুক্ষণ। একদিন শুনলাম দেশ থেকে খত এসেছে, জুঠিদিদির ছেলে হয়েছে। খবর পেয়ে মা খুব খুশি। যাক বনের নতুন পাহারাদার পাওয়া গেল একজন।

আমি একটা স্বপ্ন দেখতাম মাঝে মাঝে। কাউকে কখনও বলিনি। আমি যেন কোন পাহাড়ের দেশের রাজার ছেলে। সাজগোজ করে ছোট্ট ঘোড়ার পিঠে পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়াচ্ছি। কোমরে তলোয়ার, হাতে ধনুক, তুন ভর্তি তির, মাথায় সাদা পাগড়ি। যার মুখে সব সময় হাসি। রাগটাগ নেই তার। স্পষ্ট দেখতে পেতাম তার হাসিমুখ। ও কোন কিছুতে হেরে যায় না কখনও। রাতের স্বপ্ন নয় দিনের বেলাতেই দেখতাম। আমি জাতিস্মরবাদী নই। তবু কেন জানি না মনে হত ঘোড়ার পিঠে বসা ছেলেটা আমিই! আমার মনের ভেতর থেকে সে আমায় শক্তি যোগাত। আমিও হেরে যাবার কথা ভাবতে পারতাম না কখনও।

দাদা উঁচু ক্লাসে পড়ে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা শুরু হতে কয়েক মাস বাকি। পড়াশুনোয় খুব মন বসাল ও। দিনের বেলা খুব মন দিয়ে পড়ত। রাত হলেই পড়তে পড়তে ঢুলতে থাকত। ও নাকি চলতে চলতে পড়তে ভালোবাসত। দিনের বেলা বিরেনবাবু দাদাকে পড়াতে আসতেন। তিনি আমাদের স্কুলেই পড়াতেন বড়োদের ক্লাসে। আমরা পাইনি তাঁকে। ভালোমানুষ ছিলেন তিনি। পড়াতেনও খুব মন দিয়ে। শান্ত মানুষটি, কখনও তাঁকে রাগ করতে দেখিনি। আমার আর দিদির ইংরাজি মাস্টারমশাই এলেন একজন, খুব খারাপ লাগল তাঁর পড়ানো। আমরা বলললাম নিজেরাই পড়বো। তাই হল। অঙ্ক করতাম মায়ের কাছে। বাবলি পড়ে মার কাছেই। মুশকিল হত বাবাকে নিয়ে। বাবা ইংরিজির এম এ, বেজায় খটোমটো ইংরিজি। বানান ভুল হলে একশ বার করে টাস্ক লিখে লিখে হাত ব্যাথা। বাংলাতেও তাই। ট্রানস্লেশন করতে বললেন – ইরম্মদ রূপে অগ্নি ধাইলা ভূতলে! শুনে আমাদেরই ভূতলে যেতে ইচ্ছে হত।

বাবার বড়োমামা রামকৃষ্ণ রায়চৌধুরী রেডিওর নাম করা অভিনেতা। বেশ কিছু সিনেমা অভিনেতা অভিনেত্রীর গুরু। শম্ভু মিত্র বলতেন ‘গোল্ডেন ভয়েস’। আমাদের প্রিয় দাদাভাই তিনি। দাদাভাই এলেন আমাদের বাড়ি। সারা সন্ধে মামা ভাগ্নের আবৃত্তি আর নাটক পাঠ শুনে কান সার্থক হল আমাদের। আমার ঠাকুমার গানের গলা আর অভিনয় করবার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। যে কোন মানুষের কথা বলা হুবহু নকল করে অবাক করে দিতেন। যে কোন গান একবার শুনেই তুলে ফেলতেন গলায়! অনেক বড়ো বড়ো অনুষ্ঠানে গান গাইতে ডাকা হত তাঁকে। ভাই বোনের গুণ দেখে অবাক হয়ে যেত সবাই। আর মনে রাখার ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। ঠাকুমার বড়োদিদি লেখাপড়া জানতেন না। কিন্তু একবার মেঘনাদ বধ কানে শুনে মুখস্ত বলতে পারতেন। দাদাভাই খুব খুশি হলেন বাবা ওখানে রক্তকরবী করাচ্ছেন বলে। আরও অবাক হলেন যখন শুনলেন অভিনেতা অভিনেত্রীদের বয়সের গড় কুড়ি বাইশ। 

কয়েকমাস টানা রিহার্সাল চলার পর স্টেজ করার দিন ঘনিয়ে এল। বাবা তখন সেট তৈরির ব্যাপারে লেগে পড়েছেন। যুবতীর্থের কাকারাও দিন রাত খাটছেন। মাঝে মাঝে রাতও জাগছেন বাবা। খালেদ চৌধুরী বাবার বন্ধু। সেটটা অনেকটা সেইরকম হল। জালের দরজাটা বোধহয় শিশির কাকার আঁকা। বাজপাখি আঁকলেন বাবা নিজেই। বিশুর গানগুলো দিনরাত গেয়ে গেয়ে পচিয়ে ফেললেন। আমাদেরও মুখস্ত হয়ে গেল। এসে গেল নাটকের দিন।

এত ভালো হল অভিনয়, আজও সকলের মনে আছে। বহুরূপীর খুব সাহসী আর দূর্দান্ত নাটক হয়েছিল কলকাতায়। বাবা অবশ্য নিজেও ছিলেন সেই নাটকের রিহার্সালে বিশু পাগলের ভূমিকায়। চাকরিতে বদলি হয়ে যাওয়ায় করতে পারেননি। পরে শোভেন মজুমদারের কাছে শুনেছি, যিনি পরে ঐ ভূমিকায় অভিনয় করেন। যুবতীর্থ একদম আলাদা রকম প্রযোজনায় একই রকম নাম করে। শম্ভু মিত্র আর তৃপ্তি মিত্র গৌহাটিতে এসে সেই নাটক দেখে অবাক হয়ে যান। বাবার জায়গায় তখন অবশ্য রাজার ভূমিকা অন্য কেউ করেন। বাবা তখন বদলি হয়ে বর্দ্ধমানে।

অভিনেতাদের কেউ কেউ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ঠিকঠাক কথাই বলতে পারতেন না, তাঁরাও অসামান্য অভিনয় করেন। যাঁরা পাকা অভিনেতা তারা তো বটেই। রাজার ভূমিকায় বাবার অভিনয় অসাধারণ। বিশু পাগলের গানগুলো ভেতর থেকে বাবাই করেন। সবাই ভেবেছিল জীবনকাকা নিজেই গাইছে! সকলেই খুব উঁচুমানের অভিনয় করেছিল।

আমাদের ওখানে থাকার মেয়াদ ফুরিয়ে আসছিল। বাবা বদলি হয়ে গেলেন বর্দ্ধমানে। ওখানে নতুন ব্রাঞ্চে বাবাকে ম্যানেজার হিসেবে যেতে হবে। যেখানেই যেতেন, বাবার এত জনপ্রিয়তা হয়ে যেত যে তাঁকে একটার পর একটা নতুন ব্রাঞ্চ খুলতে যেতে হত। নাটক বাবার সবচেয়ে ভালোবাসার কাজ। বার বার তার বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যাঙ্কের চাকরি। মাকেও বার বার নতুন জায়গায় নতুন করে সংসার পাততে হয়েছে। ইচ্ছে থাকলেও ছাড়তে পারেননি চাকরি।

দাদার ম্যাট্রিক পরীক্ষা হয়ে গেছে। রেজাল্ট খুবই ভালো হয়েছে। এবার ভর্তি হতে হবে প্রিইউনিভার্সিটিতে। আমাদের নতুন ক্লাসে পড়া হয়েছে তিন মাস। বর্দ্ধমানে নতুন স্কুলে ভর্তি হতে হবে। শুরু হয়ে গেল মালপত্র বাঁধাবাঁধি। যুবতীর্থের কাকারা সাহায্য করতে এল। এবাড়ি ওবাড়ি নেমতন্ন খেয়ে বেড়াতে লাগলাম। আমি পাণ্ডুঘাটে দেখা করে এলাম বাবুর আলি দাদুর সঙ্গে। পাহাড়ে জুঠিদিদির বুড়াদাদা, ঘোড়ার আস্তাবলে, বন্ধুদের বাড়িতে দেখা করে এলাম। ওঁ বাবার আশ্রমে একা একা গিয়ে বসে রইলাম অনেকক্ষণ। আর কি আসতে পারব এখানে কোনদিন? থাকব কী করে বন্ধুদের ছেড়ে?

একটা ভালোবাসার জায়গা চিরকালের মত ছেড়ে চলে যাওয়ার কষ্ট ওই দশ বছর বয়সেই বুঝতে পারলাম। সবার মনের অবস্থাই এক। যুবতীর্থের কাকার দল রোজ আসে। ভীষণ মন খারাপ তাঁদের। ভানুকাকা কাকিমা আসে প্রত্যেকদিন। হিতেন কাকার মেয়ে হয়েছে। ভারী মিষ্টি দেখতে। নাম মিঠু। ওর ফোকলা মুখের হাসি মনে আছে এখনও। কাকিমা মন খারাপ করে বসে থাকেন। মা সবাইকে নেমতন্ন করে খাওয়ালেন। পিন্টু কাকা বোধহয় সাধু হয়ে যাচ্ছে। দাড়ি রেখেছে, ঘাড় ছাপিয়ে যাওয়া চুল মাথার ওপর চূড়ো করে বাঁধা। চোখের দৃষ্টি উদাস। রঞ্জিত কাকা, দুলাল কাকারা আসছে মাঝে মাঝে। বড়দা বউদি পাণ্ডু ছেড়ে চলে যাবে মেনে নিতে পারছে না কেউ। অসিত কাকা বাটি হাতে এলেন, মা রান্না কইরা পাঠাইয়া দিছে। জীবনকাকার বাবা ভীষণ রাগী অবনীদাদু আমাকে ধরলেন স্কুলের পথে। তোমরা নাকি চইল্যা যাইবা? আমি মাথা নেড়ে দেখি তাঁর চোখে জল। লঞ্চের পুরনো সারেং বাবুর আলির চোখেও জল দেখেছিলাম।

গণেশ মন্দিরের কাছে গিয়ে বসলাম একা। এখানেই আমি জীবনে প্রথম পাথর ছুঁয়ে দেখেছিলাম চার বছর আগে। ছোটো বড়ো ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথরগুলো আমার খুব চেনা। এক একটা পাথর খাড়া উঠে গেছে কত উঁচুতে! আট দশতলা বাড়ির সমান। কত হাজার বছর ধরে এরা দাঁড়িয়ে আছে! মোটা মোটা ছড়ানো শিকড় মাথার ওপর বিশাল সবুজ ছাতা ধরা কত কালের গাছগুলো দেখে আমাকে। আমি চিনি ওদের। কথা বলি। পাথর আর ক্ষয়ে যাওয়া লালমাটির গায়ে আঁকা কত ছবি! পাথরগুলোও কত জীবজন্তু আর মানুষের শরীরের ভঙ্গি লুকিয়ে রেখেছে। একটু নজর করলেই বোঝা যায়। ওরা কেউ পাথর নয়। একটু ছুঁয়ে দিলেই প্রাণ পাবে। ছোটোখাটো ঝোপ লতাগুল্ম মাথা দোলাচ্ছে আমাকে দেখে। পাখিরা আজও ডাকছে। সারাটা পাহাড় জঙ্গল জুড়ে ছড়িয়ে যাচ্ছে সে ডাক। আমি থাকব না যখন তখনও ডাকবে। খাড়া সিঁড়ি বেয়ে পাথুরে তোরণটা জড়িয়ে আকাশে অষ্টাবক্র ডালপালা মেলা গোলঞ্চ গাছটা কত ফুল ফুটিয়ে তলার পাথরগুলোয় ছায়া বিছিয়ে আছে। পাশে পাথরের গায়ে ক্ষয়ে অস্পষ্ট হয়ে যাওয়া কত ভুলে যাওয়া যুগ-যুগান্ত পুরনো গণেশ মূর্তি। এখানে বসতে ভালোবাসি আমি। বিকেলের আলো কমে আসছে। পাথরে ঢাকা ঝরনাটার ওপর কান পেতে ওর কুল কুল আওয়াজ শুনে গণেশ মন্দিরে এলাম। মন্দিরের ঘন অন্ধকারে কবেকার পাথুরে দশাসই গণেশ বসে আছেন শুঁড় তোলা, হাঁটুর ওপর কনুই রেখে। ক্ষয় হতে হতে চোখ মুখ বোঝা যায় না তবু আরামে বসার ভঙ্গি আমার কত চেনা। প্রণাম করে নেমে এলাম সিঁড়ি বেয়ে। অন্ধকার বন পড়ে রইল পিছনে।

পাণ্ডু ছেড়ে আসার আগেরদিন পিন্টু কাকা আমাদের আর মাকে নিয়ে কামাখ্যা মন্দিরে গেল পূজো দিতে। তখন অম্বুবাচী চলছে। হাজার হাজার সাধু সন্ন্যাসীর ভিড়ে গমগম করছে মন্দির। ভেতরে ঢোকা গেল না। বাইরে প্রদক্ষিণ করে বসলাম সৌভাগ্যকুণ্ডের ওপরের চাতালে। মার আজ বাড়ি ফেরার তাড়া নেই যেন। মন্দিরের গায়ের ওপর মশালের আগুনের আভা কাঁপছে। সন্ধে হয়ে গেছে অনেকক্ষণ। পাটকাঠির মশালে আগুন জ্বেলে মাটির রাস্তা ধরে নেমে এলাম নীচে।

কামাখ্যা স্টেশনে বসে আছি মালপত্র নিয়ে। কালাপাহাড়ের পাশ কাটিয়ে বাঁক নিয়ে — হুইসেল বাজিয়ে ট্রেন এল। ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার পর জানলায় থুতনি রেখে ফেলে আসা পাণ্ডুকে দেখছি। ব্রিজে উঠল ট্রেন। তলায় বয়ে যাচ্ছে ব্রহ্মপুত্র। দূরে পুরনো পাণ্ডু স্টেশন। লঞ্চটা ছোট্ট দেখাচ্ছে। সকালের আলোয় নীলাচল পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে স্থির। দূরে আমিনগাঁওয়ের আবছা পাহাড়, উমানন্দ। ট্রেন চলেছে ঝিক্‌ ঝিক্‌ করে।    

Leave a Reply