অরূপ দাসের আগের গল্প- পথের পথিক, নিয়তি, মিন্টু যখন গোয়েন্দা, প্রফেসর মানবেশের ফর্মুলা, লোকটা

আজ রবিবারের আড্ডায় ভৈরবের গেঞ্জিতে আঁকা টাইম মেশিন ছবিটা ঘিরে হুল্লোড় চলছে। ছবিটা নাকি ভৈরব এক প্রতিবেশী ছবিওয়ালাকে দিয়ে আঁকিয়েছে। তাঁর আঁকা ছবি লাখ লাখ টাকায় বিক্রি হয় বলে খবর। কিন্তু গেঞ্জিতে টাইম মেশিনটা তিনি বিনিপয়সায় ভৈরবকে এঁকে দিয়েছেন।
ভৈরব সেইসব কথাই বলছিল, তখন তাকে থামিয়ে পিন্টু ঠাট্টার স্বরে বলে উঠল, “এবার এ থামুক দেখি। গেঞ্জিতে আঁকা ছবি! তাই নিয়ে একি আদিখ্যেতা শুরু করেছে! সত্যিকারের টাইম মেশিন যদি থাকত, তাহলে কী যে করত ভৈরব কে জানে!”
শুনেই ভৈরবের মেজাজ তিরিক্ষি। ভুরু কুঁচকে বলে, “আমার কাছে যদি সত্যিকারের টাইম মেশিন থাকত, তাহলে ওই দিয়ে তোকে প্রথমেই ডাইনোসরের যুগে পাঠিয়ে দিতাম।”
শুনে সবার সে কী হাসি!
বিলু হাসতে হাসতে বলে, “ডাইনোসরের মুখোমুখি হলে পিন্টুর কী অবস্থা হত, সেটা ভাবলেই ভীষণ হাসি পাচ্ছে!”
পিন্টু জবাব দিল, “বেশি হাসিস না, সব দাঁত পড়ে যাবে।”
হাসি বজায় রেখেই বিলু বলে উঠল, “পড়ে তো পড়ুক, তবুও আমি হাসব।”
নিপুদা পান চিবাতে চিবাতে সবার কথাগুলো শুনছিল। খানিক বাদে পিক ফেলে নিয়ে বলে, “টাইম মেশিন নিয়ে আমার জীবনে একটা ঘটনা ঘটে গিয়েছিল, জানিস!”
শুনেই তো সবার মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। বিলু গলা লম্বা করে বলে, “কী বলছ নিপুদা! কী ঘটেছিল?”
নিপুদা নড়েচড়ে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, “সেটাই আজ তোদের বলা যাক তবে…”
***
মেসোমশাই উদয়পুর পঞ্চায়েত দপ্তরে বদলি হয়ে যাওয়ার পর থেকে মাসি আমাকে অনেকবার উদয়পুরে যাওয়ার কথা বলেছিলেন। বারবার অনুযোগ শুনতে শুনতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে শেষমেশ অফিস থেকে দু’দিন ছুটি নিয়ে উদয়পুর রওনা হলাম।
বালিগঞ্জ থেকে উদয়পুর বাসে ধর এই ঘণ্টাদুয়েক। ঘনবসতি এলাকা। স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল সবকিছুই ভালো ব্যবস্থা। সকাল সকাল মাসির বাড়ি পৌঁছে জলখাবার খেয়ে মাসতুতো ভাই বিল্টুর সঙ্গে বেরিয়ে পড়লাম ঘুরতে। আদ্যানাথ উদ্যান নামে একটা বড়ো বাগান আছে এই এলাকায়। চিরঞ্জিত নামে বিল্টুর এক বন্ধুর আসার কথা আছে সেখানে। তাই আমরাও সেদিকেই যাব বলে ঠিক হয়েছে।
বিল্টু আমার থেকে তিন বছরের ছোটো হলেও আমরা দাদা-ভাইয়ের চাইতে বন্ধুই বেশি। গল্পগুজব করতে করতে দুজনে হাঁটছিলাম, তখন বিল্টু হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে বলে, “ওই দেখো নিপুদা, জমিদারবাড়ি। ২৫০ বছরের পুরোনো, জানো!”
অযত্নে, অবহেলায় জীর্ণ বাড়িটা মাঠের শেষপ্রান্তে পড়ে রয়েছে। দেখে আমার আগ্রহ বেড়ে গেল। বললাম, “তাই নাকি? এত পুরোনো?”
বিল্টু বলল, “ওই বাড়ির একমাত্র বংশধর দিগম্বর রায়চৌধুরী আজকাল শিলিগুড়িতে থাকেন। ওখানে তাঁর সোনার দোকান রয়েছে। এবাড়ির পূর্বপুরুষদের মধ্যে অনেকেই কিন্তু কৃতি মানুষ ছিলেন। যে বাগানে যাচ্ছি, তার নাম হয়েছে দিগম্বরবাবুর ঠাকুর্দা আদ্যানাথের নামে।”
দিগম্বরকে নিয়ে মোটেও আমি আগ্রহী নই। তবে জমিদার বাড়িটা আমায় টানছিল। বললাম, “বাড়িটা কাছ থেকে একবার দেখে আসলে হয়! এসব পুরোনো বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়ালে অতীতের স্মৃতিগুলোকে ছুঁয়ে দেখতেইচ্ছে হয় খুব।”
“বেশ তো,” ঘাড় নাড়ল বিল্টু, “তুই ঘুরে আয়। আমি বরং আদ্যানাথ উদ্যানে গিয়ে বসছি। চিরঞ্জিত সেই কবে আমার থেকে একটা গল্পের বই নিয়েছে। বইটা আজকে দেওয়ার কথা। আমায় না দেখতে পেলে নির্ঘাত পালাবে! তুই বাড়িটা দেখে নিয়ে এই রাস্তাটা ধরেই সোজা হাঁটা দিস। উদ্যান অবধি যেতে মিনিটপাঁচেকের বেশি লাগবে না।”
এই বলে, আমায় রেখে বিল্টু হাঁটা দিল। আমি জমিদারবাড়িটার দিকে এগিয়ে গেলাম।
সামনে এসে বুঝতে পারলাম, বাড়িটার প্রতি দিগম্বরবাবু একদম উদাসীন। ভাঙাচোরা বাড়ি। পেছনে ঝোপঝাড় ভর্তি। হঠাৎ সেই জংলা থেকে একটা গম্ভীর গলা ভেসে এলো, “কে দাঁড়িয়ে?”
এদিক-ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলাম না। জবাব দিলাম, “আমার নাম নিপু।”
এবারে মানুষটা ঝোপঝাড়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। দেখে মনে হচ্ছে লোকটার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। স্বাস্থ্যবান। মাথায় ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া চুল। গোঁফদাড়িতে মুখ ঢাকা। পরনে আলখাল্লা। ডান হাতে একটা চারাগাছ। আমায় দেখে দেঁতো হেসে বলে, “নিপু! এ আবার কেমন নাম বাপু?”
নিপু নামটা আমার ঠাকুরমার দেওয়া নাম। নামটা নিয়ে কেউ মশকরা করলে আমার গা-পিত্তি জ্বলে ওঠে। মনে হয় ঠাকুরমাকে অপমান করা হচ্ছে। তাই তাই খানিক রেগেমেগে বললাম, “তাতে আপনার কোথায় সমস্যা শুনি?”
লোকটা খিঁক করে একটু হেসেই হাসিটাকে কোনোমতে চেপে বলে, “তেমন কোনও সমস্যা নেই। শুধু ঐ… শুনতে যেন কেমন কেমন!।” এই বলে আবার হো হো করে হাসতে শুরু করল।
নিশ্চয়ই এ পাগল! এখানে দাঁড়ানো মানে সময় নষ্ট করা। আমি তাই মুখ ঘুরিয়ে হাঁটা ধরলাম। লোকটা তখন পেছন থেকে ডেকে বলে, “ওহে, একটু দাঁড়াও দেখি!তোমাকে কিছু দিতে চাই।”
“আমাকে!” অবাক হয়ে বললাম, “কী?”
সে এগিয়ে এসে নরম গলায় বলে, “যাওয়ার আগে এই চারাটা নিয়ে যাও।” বলে চাত্রাটা সে আমার দিকেবাড়িয়ে ধরল। সেটা তার হাত থেকে নেবাএর সময় চোখে পড়ল, লোকটার গলায় একটা গোলমত কী ঝুলছে। জিনিসটা রঙ কালো। দেখলে পিচ্ছিল বলে মনে হয়।
সেটার দিকে আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা বলে, “এইটে কী জানো? এ হল গিয়ে আমার আবিষ্কৃত টাইম মেশিন। এর থেকে একটা বিশেষ আলো বেরোয়। সেই আলোয় চেপে আমি নানান টাইমে পৌঁছে যাই।”
আমি বললাম, “অ্যাঁ?”
সে জবাব দিল, “হ্যাঁ। আমি ঠিকই বলছি। আসলে আমি একজন বৈজ্ঞানিক। এইমাত্র এতে চেপে ভবিষ্যৎ থেকে ঘুরে এলাম। ভবিষ্যতে পৃথিবীটা যে কী ভয়ানক হয়ে উঠবে, স্বচক্ষে সেটা দেখে এলাম। কিছুক্ষণ পরে আমায় আবার অতীতে, মানে আমার নিজের সময়ে ফিরে যেতে হবে। ভেবেছিলাম, চারাটা আমার বংশধরকে উপহার দিয়ে যাব। কিন্তু তার সঙ্গে দেখা হল না। হাতে সময়ও নেই বেশি। এক্ষুনি অতীতে ফিরে যেতে হবে কিনা!”
এই চারাগাছটা তোমায় দিতে পেরে শান্তি পেলাম।
ভাবলাম, মিছে কথা বলবার আর জায়গা পেল না বুঝি এ। মজা করে বললাম, “ভবিষ্যতে গিয়ে কী দেখলেন শুনি?”
শুনে লোকটা উদাস হয়ে পড়ল। বলে, “গিয়ে দেখি, সেখানে গাছ নেই কোনো। গাছের অভাবে মানুষ আর যত জীবজন্তু আছে সব লোপ পেতে শুরু করে দিয়েছে। পাবেই তো! গাছ না থাকায় বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইড ভীষণ বেড়ে গেছে। সবসময় তাই বেজায় গরম। সেই গরমে পৃথিবী জুড়ে বেশিরভাগ জায়গা শুকিয়ে মরুভূমি। কখনও কোথাও বৃষ্টি হলে জমিতে ধ্বস নামছে। নদী আর সমুদ্রের ধারের জমি জলের তলায় চলে যাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছিল, অসহায় মানুষগুলোকে টাইম মেশিন করে আমার যুগে নিয়ে যাই! কিন্তু তা তো হবার নয়। তখন ভাবলাম, রাস্তা তো একটা আছে! যেন ভবিষ্যতে সেই কার্বন দানবের সৃষ্টি না হয়, সেই সংকল্প আমাদের নিতে হবে অতীতে ফিরে। আর তা হচ্ছে, লাগামহীন গাছ কাটা বন্ধ করা। পাশাপাশি নতুন গাছও অনেক লাগানো শুরু করা দরকার। ‘গাছ লাগাও, পরিবেশ বাঁচাও’-এই স্লোগানটাকে যদি বিশ্বজোড়া মানুষ এখনই কাজে লাগায়, তাহলে পৃথিবীতে গাছ বেড়ে উঠে ভবিষ্যতটা ভালো হয়ে যেতেও পারে।”
লোকটার প্রতি আমার কেমন একটা মায়া জন্মে গেল। টাইম মেশিন ব্যাপারটা তেমন বিশ্বাস করার মত না হলেও, বাকি কথাগুলো এ মিথ্যে বলেনি। লোকটা নিশ্চয় শিক্ষিত। মনে হচ্ছে কোনো দুর্ঘটনায় মাথায় চোট-টোট পেয়েছে! আর তাইতেই বোধ হয় মাথাটায় খানিক গন্ডগোল দেখা দিয়েছে!
এদিকে লোকটা তখন আপন মনে কীসব বিড়বিড় করছে। তার চোখ জলে চিক চিক করছে। আমি আর দাঁড়ালাম না। দেরি হয়ে যাচ্ছিল। ওদিকে বিল্টু আমার জন্য অপেক্ষা করছে।
হাঁটতে হাঁটতে লোকটার সম্পর্কেই ভাবছিলাম। লোকটাকে চিকিৎসা করালে হয়তো মাথার ব্যামো দূর হতে পারে! বালিগঞ্জের নাটোর পার্কের মানসিক হসপিটালে ধরে নিয়ে যেতে পারলে ভালো হত! এসব ভাবতে ভাবতে আদ্যানাথ উদ্যানের দিকে হেঁটে চললাম।
আদ্যানাথ উদ্যানে এসে দেখি বিল্টু একটা চেয়ারে বসে রয়েছে। আমাকে দেখে বলে, “চিরঞ্জিত এখনও আসেনি জানিস!”
বিল্টুর কথার কোনও উত্তর দিলাম না। আমি মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছিলাম। যেখানেই তাকাই সারি সারি গাছ। পুরনো গাছের সঙ্গে আরও কত নতুন গাছ হাতছানি দিয়েছে আকাশের দিকে। রাজ্য সরকার এই উদ্যানটাকে হাতে নেওয়ার পর, উদ্যানটা ঢেলে সাজানো হয়েছে। বাঁধানো ঝিলও আছে একটা। তার জলে মাছ খেলে বেড়াচ্ছে। চারপাশে ফুলের বাগান। সেখানে প্রজাপতি আর ফড়িং উড়ে বেড়াচ্ছে। গাছের ডালে পাখিদের কিচির মিচির।
বিল্টু বলছিল, “শয়ে শয়ে গাছ লাগিয়ে এই বাগান গড়ে তুলেছিলেন আদ্যানাথ। তিনি একজন বৈজ্ঞানিক ছিলেন। কিন্তু একটা সময় তিনি সবকিছু ছেড়েছুড়ে বৃক্ষরোপনে মন দিয়েছিলেন। দেশ-বিদেশে ঘুরে ঘুরে বৃক্ষমেলা করতেন। সেই সময় বৃক্ষরোপণ এবং অরণ্য সংরক্ষণ অভিযানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন আদ্যানাথ। ওই দেখ আদ্যানাথের মুর্তি।”
বিল্টুর হাত অনুসরণ করে মূর্তিটার দিকে তাকাতেই আমার বুক ধড়াস করে উঠল। কী সাংঘাতিক! একটু আগে যে লোকটার সঙ্গে কথা বললাম, এ যে তাঁরই মূর্তি!
তবে, আদ্যানাথের মূর্তির গলায় সেই গোলাকার বস্তুটা ছিল না। বোধ হয় এখান থেকে নিজের যুগে ফিরে গিয়ে তিনি তাঁর টাইম মেশিনটা নষ্ট করে দিয়েছিলেন! ভালোই করেছিলেন। নইলে মান আর হুঁশ হারিয়ে যাওয়া মানুষ সেইটেকে কোন অপকর্মে লাগাত কে জানে!
“মূর্তিটার দিকে তাকিয়ে কি এত ভাবছিস?” বিল্টুর কথায় হুঁশ ফিরল আমার।
জমিদার বাড়ির সামনে ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা বিল্টুকে আর কিছু বললাম না। বললে ও বিশ্বাস করবে না তা আমি জানি। বরং আদ্যানাথের থেকে পাওয়া উপহার চারাগাছটা তুলে ধরে, আদ্যানাথের মূর্তির নীচে খোদাই করা লাইনটা বিল্টুকে পড়ে শোনালাম… ‘গাছ লাগাও, পরিবেশ বাঁচাও।’