গল্প-সময় সরণীতে নবকুমার-অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় -শরৎ ২০২২

এই লেখকের আগের গল্প – জগৎশেঠের হিরে, ৭২ ঘণ্টা

golposomoysaranita

পাথরটা হাতে নিতেই নবকুমারের গায়ে কেমন যেন একটা শিহরন খেলে গেল। ঠান্ডা লাগল নাকি হঠাৎ? নাকি জ্বর এল? নবকুমার হাতটাকে টেনে সরিয়ে নিল আবার। পাথর যে এরকম একটা অনুভূতি জাগাতে পারে, তার জানা ছিল না। সকালবেলা ছাদের টবগুলোয় জল দিতে গিয়ে পাথরটা তার চোখে পড়েছিল। চিনা জবাগাছের যে টবটা, তার ঠিক পাশেই শানের উপরে পাথরটা পড়ে ছিল। এমন পাথর আগে কখনও দেখেনি নবকুমার। শুধু যে চকচকে তাই নয়, কেমন যেন মসৃণ, বেশ নিটোল একটা জ্যামিতিক আকৃতি রয়েছে। অনেকটা ছোট্ট পায়রার ডিমের মতো আদলের। কিন্তু তার চেয়েও মসৃণ আর জায়গায় জায়গায় রঙবেরঙের খুপরি খুপরি ছোপ। নবকুমার আবারও হাত বাড়াল। ঠান্ডাটা বোধহয় সয়ে গেছে এবার। কেন জানি না, পাথরটা হাতে নিতে এবারে আর নবকুমারের কোনও অসুবিধে হল না। বরং সে যেন একটা আরামের অনুভূতি পেল। পাথরটাকে পকেটস্থ করে সে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে এল। তার অফিসের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

এই নামটার জন্যই নবকুমারের যত ঝামেলা হয়। কেউ কেউ প্রথম আলাপেই নাম শুনে ভেবে বসতে পারে যে, সে বোধহয় বেজায় ব্যাকডেটেড। আসলে যে তার বয়স বত্রিশ, আর সে যে সেক্টর ফাইভের নামজাদা একটি বহুজাতিক সফটওয়্যার কোম্পানিতে সিস্টেম ডিজাইনার, নাম দেখে অন্তত তা বোঝবার উপায় নেই। পাথরটা হাতে চেপে সিঁড়ি দিয়ে নামতে-নামতেই হঠাৎ নবকুমারের মাথাটা একচোট ঘুরে গেল। এক মুহূর্তের জন্য তার চারপাশটা কেমন পালটে যেতে লাগল। সম্বিৎ ফিরতে সে দেখল সে তার ফ্ল্যাটের দরজাটার কাছ অবধি নেমে এসেছে। হাতের ভেতরে পাথরটা যেন কেমন গরম গরম বলে মনে হচ্ছে এবার। নবকুমার পাথরটাকে যত্ন করে তার কাজের টেবলটার উপরে রেখে দিল। কাল শনিবার। অফিস থেকে ফিরে আজ রাত্তিরে না-হয় পাথরটাকে নিয়ে বসা যাবে। স্নান করে নবকুমার অফিসে চলে গেল।

***

রাত বারোটা পাঁচ। সোদপুরের এই ফ্ল্যাটটাতে একাই থাকে নবকুমার। বিয়ে-থা করেনি। মা, বাবা আরও আত্মীয়স্বজনেরা সবাই দিনাজপুরে থাকেন। গত কয়েক বছরে একা নবকুমারই, প্রথমে কলেজের কারণে এবং পরবর্তীতে চাকরির সুবাদে কলকাতার উপকণ্ঠে এসে সোদপুরের এই নিজস্ব ফ্ল্যাটটিতে ঘাঁটি গাড়তে পেরেছে। ফ্ল্যাটে আসবার আগে অবধি অবিশ্যি মেসবাড়িতে কলেজ জীবন কাটিয়েছে নবকুমার। পাথরটাকে সে হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখছিল। হঠাৎ করে হাতে একটা হালকা শক লাগার মতো অনুভূতি হল নবকুমারের। তারপর তার আর কিছু মনে নেই।

ধু-ধু বালুরাশির মধ্যে নবকুমারের জ্ঞান ফিরল। চারপাশে তাকিয়ে সে দেখল, কেবল বালিয়াড়ির পরে বালিয়াড়ি দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। কনকনে ঠান্ডা হাওয়াতে তার গা কাঁপতে শুরু করেছিল। ঠান্ডাটা একটু সইতে সে দেখল, দূরে একটা বালিয়াড়ির ও-পাশ থেকে যেন একটুখানি আলোর আভাস দেখা যাচ্ছে। নিজেকে ধাতস্থ করে কোনোরকমে বালির উপরটায় উঠে বসল নবকুমার। তাকে হাঁটতে হবে। ওই বালিয়াড়িটার দিকেই।

“নবকুমারবাবু, শুনতে পাচ্ছেন?” কে যেন অনেক দূর থেকে তার নাম ধরে ডাকছে।

নবকুমার চকিতে চারপাশে ঘুরে তাকাল, কেউ তো নেই। আবার খানিক দূর হাঁটতে না হাঁটতেই সেই ডাক, “নবকুমারবাবু, শুনছেন?”

এবারে দাঁড়িয়ে পড়ল নবকুমার।—“কে! কে ডাকছেন আমায়?”

“আজ্ঞে আমার নাম শুনলে তো আপনি চিনবেন না, পরিচয় দিতে হলে বলতে পারি আমার নাম এক্স এক্স সেভেন টু ওয়ান। আমাদের গ্রহে আমরা সবাই এরকম একেকটা সংখ্যার মাধ্যমেই নিজেদেরকে চিহ্নিত করি।”

“গ্রহ! তার মানে? দাঁড়ান দাঁড়ান,” বালিতে প্রায় একটা হোঁচট খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে নবকুমার।—“গ্রহ মানে? এটা তো পৃথিবী।”

“আজ্ঞে পৃথিবীই, কেবল প্রায় সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার সময়ের পৃথিবী। আপনি যেখানটায় এসে পড়েছেন, এই দেশটার নাম ইজিপ্ট। এখানে এখন ফারাও তুতেনখামেনের রাজত্ব চলছে।”

টাল খেয়ে পড়ে যেতে-যেতেও নবকুমার নিজেকে সামলে নেয়।—“কী আবোলতাবোল বকছেন মশাই! কে আপনি? দয়া করে সামনে এসে কথা বলুন। আর আমিই-বা এই মরুভূমির মাঝখানে এলাম কী করে?” নবকুমার প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

“শান্ত হোন, নবকুমারবাবু। আমি যে মাধ্যম দিয়ে আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করেছি, তার নাম টেলিপ্যাথি অথবা আপনাদের কাছে যা চিন্তাশক্তির মাধ্যম। আমার কথা আপনি আপনার মস্তিষ্কের ভিতর দিয়ে শুনছেন। আমার নাম এক্স এক্স সেভেন টু ওয়ান, দুশো মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরের অডিয়ন সেরাবেলাম গ্রহের বাসিন্দা আমরা। আপনি আমাকে মিস্টার এক্স বলে ডাকতে পারেন। অথবা আপনার সুবিধামতো আর অন্য যে-কোনো নামেও ডাকতে পারেন, যেমনটা আপনার অভিরুচি।”

নবকুমারের মাথার ভিতরকার আওয়াজটা স্তব্ধ হয়ে গেল। সে মাথা চেপে বালির উপরে বসে পড়ল।

“হঠাৎ আমার উপর এভাবে চড়াও হওয়ার কারণ?” হতভম্ব নবকুমার প্রশ্ন করল। এই কণ্ঠস্বরকে বিশ্বাস করা ছাড়া সে আর কোনও উপায় দেখছে না।

“সেরকম কোনও কারণ নেই নবকুমারবাবু। আমাদের আকাশযান যে ঠিক কোথায় ল্যান্ড করবে তা অনেক আগে থেকেই অঙ্ক কষে বের করে নেওয়া হয়ে থাকে। আমরা কেবল একটা জনবহুল এলাকা বেছে নিতে চাইছিলাম, যেখানে প্রচুর মানুষ থাকে। তারপর প্রতিটি মানুষের মধ্যে থেকে র‍্যান্ডম স্যাম্পল সিলেকশনের মাধ্যমে বাছতে বাছতে আমরা আপনার কাছে পৌঁছেছি। প্রক্রিয়াটি জটিল, কিন্তু ব্যক্তি-নিরপেক্ষ, আর সেই কারণেই এই ধরনের প্রজেক্টের পক্ষে খুবই উপযোগী।”

নবকুমারের মাথার ভেতরটা আবার কেমন যেন গুলিয়ে যায়।

“তার মানে আপনি কি বলতে চাইছেন যে ওই ছোট্ট পাথরটা আপনাদের মহাকাশযান? আপনারা…”

“না না নবকুমারবাবু, ওই ছোট্ট পাথরটা কেবল একটা যন্ত্র। যা এই পৃথিবীর, বা বলা ভালো সমস্ত সৌরজগতের যে-কোনো সজীব বা জড় বস্তুকে একই সঙ্গে বিভিন্ন সময়কাল এবং বিভিন্ন স্থানবিন্দুতে নিয়ে যেতে সক্ষম।”

“টাইম মেশিন!”

“ঠিক তাই। আর ওই পাথরটাই এই মুহূর্তে আপনাকে উড়িয়ে নিয়ে এসেছে ২০২১ সালের সোদপুর থেকে ১৩২৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দের ইজিপ্টে। ফারাও তুতেনখামেনের রাজত্বে আপনাকে স্বাগত জানাই।”

“তুতেনখামেন!” নবকুমারের গলা দিয়ে আর আওয়াজ বেরোয় না।

“যদিও সেই রাজত্ব এখন শেষ হতে চলেছে, আপনি সেই মুহূর্তের সাক্ষী থাকবেন নবকুমারবাবু। আপনি এক মহান ইতিহাসের সাক্ষী হতে চলেছেন। বালিয়াড়িটার দিকে এগোতে থাকুন। আমি আপনার সঙ্গে সঙ্গে রয়েছি।”

মাথার ভিতরকার আওয়াজটা ক্রমশ ফিকে হয়ে মিলিয়ে যায়। নবকুমার কোনোমতে আবার উঠে দাঁড়ায়। এখন এই কণ্ঠস্বরের নির্দেশ মেনেই তাকে যা করার করতে হবে। আর অন্য কোনও উপায় নেই।

এদিকে নবকুমার যখন সোদপুর ছেড়ে এসেছিল, তখন সেখানে রাত। মরুভূমিতে এখন বিকেল। এ-কথা যে সে ভাবছে এটা টের পেতেই বোধহয় মাথার ভিতরকার কণ্ঠস্বরটা বলে উঠল, “যে যন্ত্র আপনাকে এক নিমেষের মধ্যে সাড়ে তিন হাজার বছর পিছিয়ে আনতে পারে, সে কি আর দিনের সময়টাকে সামান্য একটু আগুপিছু করে নিতে পারে না? এসব নিয়ে আপনি সময় নষ্ট করবেন না নবকুমারবাবু। সামনের দিকে এগিয়ে চলুন। ইতিহাস ঘনিয়ে উঠতে আর বেশি দেরি নেই।”

নবকুমার যন্ত্রচালিতের মতো বালিয়াড়িটার দিকে এগিয়ে গেল। মরুভূমিতে গোধূলি নেমেছে।

***

সে দৃশ্য যে না দেখেছে তার কাছে সেটাকে ব্যাখ্যা করা অসম্ভব। দিগন্ত থেকে দিগন্তে চলে গিয়েছে একের পর এক বালিয়াড়ির ঢেউ খেলানো দৃশ্যপট। হলুদ বালির উপরে সোনালি সূর্যের শেষ আভাটুকু এসে পড়েছে। কেবল একদিকে যেন কয়েকটা বালিয়াড়ি বিস্তীর্ণ হয়ে আকাশে গিয়ে মিশতে চাইলেও তার ঠিক পরেই যেন কেমন একটা শূন্যতা ঘনিয়ে উঠেছে।

“নীলনদ!” মাথার ভিতরকার কণ্ঠস্বরটা আবার ফিসফিসিয়ে উঠল।

নবকুমারের গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। সে সেই নির্দিষ্ট বালিয়াড়িটার উপরে এসে দাঁড়াল। এ এক আশ্চর্য দৃশ্য তার সামনে। বিশাল একটি রাস্তা, তার দু-পাশে অসংখ্য স্ফিংক্সের মূর্তি সার বেঁধে চলে গিয়েছে। সামনের দিকের স্ফিংক্সগুলির মাথার দিকটাতে কাজ চলছে। মানুষের মাথা সরিয়ে যেন আরও কোনও একটি পশুর মাথা সেগুলির উপরে বসানো হচ্ছে। অজস্র শ্রমিক একতালে কাজ করে চলেছে। দেখলেই বোঝা যায় তাদের মধ্যে অধিকাংশই এখানে ক্রীতদাস হিসেবে কাজ করছে। কালো কাফ্রিদের চাবুক মেরে কাজ করাচ্ছে প্রাচীন মিশরীয় ধনী পোশাক পরা মানুষেরা। সেই স্ফিংক্স সরণির শেষ প্রান্তে আকাশ ছুঁতে চেয়েছে এক দেবালয়। সূর্যের সোনার রশ্মিতে তার গা বেয়ে যেন আলো ঠিকরে পড়ছে।

“আমুন-রা। সূর্য দেবতার মন্দির, যে মন্দিরের সংস্কারসাধন করেছেন তুতেনখামেন।” গ্রহান্তরের বন্ধু আবার নবকুমারের মাথার ভিতরটায় কথা বলে ওঠে।—“আমুন-রা—সৃষ্টি ও সূর্যের দেবতা। আমুন হল সৃষ্টির দেবতা, আর রা হল সূর্যের প্রতীক। দুইয়ে মিলে আমুন-রা। সূর্য আর আলো—উজ্জ্বলতার উপাসক তুতেনখামেন।” কণ্ঠস্বর বলে চলে, “কেবল এই উজ্জ্বলতার উপাসনাই তার পতনের কারণ।”

এমন সময় নবকুমার দেখল, অনেক দূরে মরুভূমির দিক থেকে ধুলো উড়িয়ে ঘোড়ায় টানা একটা রথের মতো দেখতে জিনিস যেন উল্কার গতিতে ক্রমশ ছুটে আসছে। তার উপরে দাঁড়িয়ে যে লোকটা গাড়ি চালাচ্ছে, তার পাশে একটা লোক যেন চিৎকার করে কিছু একটা বলতে বলতে আসছে। সমস্ত লোকজন সবাই হাতের সমস্ত কাজ ফেলে রেখে এক এক করে সেই গাড়িটার দিকে ছুটে যাচ্ছে। ক্রীতদাসেরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে। কাজ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফিসফিস করে তার মাথার ভিতরকার সেই কণ্ঠস্বর, গাড়ির উপরের লোকটার মুখের কথাগুলোকেই যেন নবকুমারের জন্য তৎক্ষণাৎ অনুবাদ করে দিল, “ফারাওয়ের মৃত্যু হয়েছে, মহামান্য ফারাও তুতেনখামেন আর আমাদের মধ্যে নেই, ফারাওয়ের মৃত্যু হয়েছে। যথাযোগ্য মর্যাদায় সকলে মহান ফারাওয়ের স্মৃতির উদ্দেশে শোকজ্ঞাপন করুন!”

গাড়িটা নবকুমারের খুব কাছে এসে পড়েছে। অথচ ওকে যেন কেউ দেখতেই পাচ্ছে না। গাড়িটা নবকুমারের গজ ত্রিশেক দূরে এসে থেমে গেল। সমস্ত লোক তার দিকে ছুটে যাচ্ছে তখন। এমন সময় দুটি বিশেষ মানুষকে আলাদা করে চোখে পড়ল নবকুমারের (নাকি সেই গ্রহান্তরের বন্ধুই তার মাথার ভিতর থেকে তার চোখের দৃষ্টিকে বিশেষ করে ওই দুজন মানুষের দিকে চালিত করেছিল? নবকুমারের এর উত্তর জানা নেই)।

দুজন মানুষ। দুজনেই অবস্থাপন্ন। এক নারী ও এক পুরুষ। মেয়েটির বয়স গাড়ির উপরকার লোকটির মতোই। দুজনেই কম বয়স্ক, তরুণ। অন্য লোকটি তুলনায় প্রবীণ। চোখেমুখে কেমন যেন একটা ধূর্ততার ছাপ। বারে বারে চারপাশটায় তাকাচ্ছে, আর গাড়ির উপরকার লোকটার দিকে তাকিয়ে কিছু যেন একটা বলবার চেষ্টা করছে। মেয়েটি ভিড় ঠেলে গাড়িটার কাছ অবধি পৌঁছবার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছে না। বার বার লোকের ধাক্কা খেয়ে পিছিয়ে আসছে।

“গাড়ির উপরকার লোকটির নাম আকিকি, মিশরীয় ভাষাতে যার অর্থ বন্ধুত্বপূর্ণ। যে মেয়েটি আকিকির কাছে পৌঁছতে চেষ্টা করছে, তার নাম আকিলা—মিশরীয় ভাষাতে যার অর্থ বুদ্ধিমতী। আর ওই যে লোকটিকে দেখছেন আকিকিকে চোখের ইশারায় কিছু বলতে চেষ্টা করছে, ওর নাম আমেনোফিস, এক ফারাওয়ের নামে ওর নাম। কিন্তু এখানে আমেনোফিস আইয়ের অনুচর।” নবকুমার কেবল শুনে চলেছে, “এই আই হল আসলে তুতেনখামেনের অন্যতম পরামর্শদাতা। কিন্তু নিন্দুকেরা বলে তুতেনখামেন নাকি আসলে আইয়ের হাতের পুতুল। নিশ্চয়ই জানেন যে এই আই কিন্তু আসলে তুতেনখামেনেরই সৎ-ঠাকুরদা। তুতেনখামেন সহ আরও অন্তত তিনজন ভূতপূর্ব ফারাওয়ের অন্যতম পরামর্শদাতা হিসেবে সে কাজ করেছে। তুতেনখামেনের মৃত্যুর পর এই আই-ই নতুন ফারাও হয়ে দেশের সিংহাসনে বসবে। বিয়ে করতে চাইবে তুতেনখামেনের বিধবা পত্নী আঁখেসোনামুনকে। আশ্চর্য কুশলী চরিত্র এই আই, আর সেই আইয়েরই অনুচর আমেনোফিস।”

মাথার ভেতরকার কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আকিকির পিছন থেকে কার যেন একটা হাত ঝলসে উঠল। পড়ন্ত সূর্যের আলোয় দেখা গেল মণিমাণিক্যখচিত একটি ছোরার হাতল যেন ঝিলমিলিয়ে উঠল একটিবার। মুহূর্তের অপেক্ষা, ছোরাটা আমূল গেঁথে বসল আকিকির পিঠের উপর। লোকজন ছত্রভঙ্গ হয়ে চারপাশে ছুটতে শুরু করল। আর ঠিক সেই সময়েই আকিকির কাছ অবধি পৌঁছে গেল আমেনোফিস। স্পষ্ট বোঝা গেল সে বিরক্তিমিশ্রিত উৎকণ্ঠার সঙ্গে একটা কিছু জানবার চেষ্টা করছে আকিকির কাছ থেকে। কিন্তু আকিকির তখন আর কোনও কথা বলবার মতোই অবস্থা নেই। আকিকির শেষ নিঃশ্বাস পড়ল। নবকুমারের মাথার ভিতরে সেই আশ্চর্য কণ্ঠস্বরও তখন ফিসফিসিয়ে বলে উঠল, “শত্রুর শেষ রাখতে নেই। অন্তত তেমনটাই নির্দেশ দিয়ে রেখেছিল আই। কেবল এটা বলতে ভুলে গিয়েছিল যে ছোরাটা মারবার আগে যেন অন্তত আকিকির সঙ্গে আমেনোফিসের একটিবার কথা হয়ে যায়। তাহলেই আমেনোফিসের হাতে আকিকির যা তুলে দেবার কথা ছিল সেটা যথাস্থানে পৌঁছে যেতে পারত। কিন্তু সময়ের সামান্য এদিক ওদিক। আইয়ের মতলব কার্যকরী হল না। যদিও সবকিছু সময় মতো হলেও আকিকির হাত থেকে সেই জিনিসটা শেষ অবধি আমেনোফিসের হাতে পৌঁছত না হয়তো, কারণ ইতিহাস তার আগেই অন্যপথে চলে গিয়েছে।”

“তা-তার মানে?” একটু যেন তুতলে গিয়ে মনে-মনেই প্রশ্ন করে নবকুমার।

“তার কারণ জানতে হলে এবার আমাদের আকিলার পিছন পিছন যেতে হবে, জলদি!” হিসহিসে গলাতে একটা নির্দেশ পায় নবকুমার। আকিলাকে সে হারিয়ে ফেলেনি তো? দৃষ্টি দিয়ে চারপাশ তোলপাড় করে সে খুঁজতে শুরু করে। খানিক দূরে দেখতে পায় হনহনিয়ে হাঁটতে হাঁটতে আরও দূরে চলে যাচ্ছে আকিলা। চকিতে নবকুমার তার পিছু নেয়। সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার ইতিহাস দ্রুত গড়িয়ে চলেছে।

স্ফিংক্স সরণি থেকে অনেকটা দূরে সরে এসেছে আকিলা। ছোট্ট একটা শঙ্কু আকৃতির তাঁবুর সামনে সে এসে দাঁড়ায়। এদিকে তার পিছনে পিছনে নবকুমার ছাড়াও আরও একটি লোক এসে দাঁড়িয়েছে। সেই ঘোড়ায় টানা অভিশপ্ত রথটির চালক। ইতিউতি সে তাকিয়ে দেখছে চারপাশ। তারপর চকিতে সে যেন একটা কিছু আকিলার হাতে গুঁজে দিল। তড়বড় করে মিশরীয় ভাষাতে কী যেন বলে গেল। নবকুমারের মাথার ভিতরকার কণ্ঠস্বর কোনও নির্দেশ পাঠাল না। লোকটা তার কথাগুলো কোনোমতে শেষ করেই কেমন যেন ছুটতে ছুটতে চারপাশটা দেখতে দেখতে চলে গেল। আকিলাও ঢুকে পড়ল সেই তাঁবুটার ভেতর।

“ভালোবাসার মানুষকে ভালোবাসার মানুষের শেষ উপহার। কেউ কি আর সে নিয়েও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে?” নবকুমারের মাথার ভিতরকার কণ্ঠস্বরটা কেমন যেন স্বগতোক্তি করল মনে হল, “ভাগ্যিস এই উপহারের গভীর অর্থটা জানে না এরা কেউ। একমাত্র যে জানত, সে এখন পরপারের যাত্রী।”

“কোন জিনিসের কথা বলছেন আপনি?” নবকুমার প্রশ্ন করে।

“আর একটু ধৈর্য ধরতে হবে যে নবকুমারবাবু। ওই যে আপনারাই বলেন, সবুরে মেওয়া ফলে। তাহলে? সবুর করলে তবে না মেওয়া ফলবে।”

নবকুমার রাগ করে আর কোনও উত্তর দেয় না এ-কথার।

সূর্য ডুবে যাচ্ছে। দ্রুত মরুভূমিতে রাত নেমে আসছে।

“আজ পূর্ণিমা, কিন্তু চাঁদের আনন্দ বেশিক্ষণ উপভোগ করতে পারবেন না।” নবকুমারকে যেন তার গ্রহান্তরের কণ্ঠস্বরটি হঠাৎই এ-কথা মনে করিয়ে দেয়। এখান থেকে বেশ খানিকটা দূরে আমুন-রার মন্দিরগাত্রটি জ্যোৎস্নায় ধুয়ে যাচ্ছে। রাত বাড়ছে।

***

এভাবে বালির উপরে বসে থাকতে থাকতে কতক্ষণ কেটে গিয়েছিল নবকুমারের মনে নেই। হঠাৎ যেন সেই গ্রহান্তরের কণ্ঠস্বরটি তাকে জাগিয়ে দিয়ে বলল, “নবকুমারবাবু তৈরি হোন, ঝড় আসছে—প্রবল বালির ঝড়। এই ঝড়ের মধ্যেই আমাদের যা করার করতে হবে।”

কথা শেষ হতে না হতেই শোঁ শোঁ করে ঝড় এসে পড়ল। সে কী হাওয়ার দাপট! আর সেই সঙ্গে ছুরির চেয়েও ধারালো ভয়ানক বালুকণার দাপাদাপি। সারা গায়ে বৃষ্টির মতো বালি এসে বিঁধছে, দু-হাত দূরের জিনিসও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। আকিলা যেন সেই ঝড়ের দাপটেই তাঁবু থেকে হঠাৎ ছিটকে বেরিয়ে এল। তাঁবুটা ঝড়ের দাপটে কোথায় যেন উড়ে যাচ্ছে। হাওয়ার ধাক্কাতে আকিলা নবকুমারের গায়ের উপরে এসে পড়ল একেবারে। অথচ সে যেন কিছু টেরই পেল না। কেবল সাড়ে তিন হাজার বছর আগেকার একজন মানুষের জলজ্যান্ত স্পর্শ অনুভব করল নবকুমার। এমনি সময় আকিলার হাত থেকে একটা ছোট্ট রুমালে মোড়া জিনিস দূরে ছিটকে গিয়ে পড়ল বালির উপরে। প্রবল একটা হাওয়ার দাপটে আকিলাও তখন যেন অন্যদিকে আরও একটু দূরে সরে গিয়ে নুয়ে পড়ল। এই সুযোগ! নবকুমার সবে হাত বাড়িয়ে তুলে নিচ্ছে জিনিসটাকে, আর ঠিক তখনই চারপাশের অন্ধকারটা কেমন জানি হঠাৎ করে আরও গাঢ় হয়ে আসতে শুরু করল।

“আমরা সময় সরণিতে ফিরে এলাম নবকুমারবাবু, আমাদের অভিযান সফল!”

কণ্ঠস্বরের উত্তেজনাটুকু ওই প্রবল অস্বস্তির মধ্যেও নবকুমার অনুভব করতে পারল। এক অন্ধকার থেকে সে যেন তখন নেমে চলেছে আরও গভীর, গভীর থেকে গভীরতর অন্ধকারের দিকেই।

***

“নবকুমারবাবু, নমস্কার। আকিলার হাত থেকে আপনি যা নিয়ে এলেন তা আসলে আপনার প্যান্টের বাঁ পকেটে থাকা অন্য পাথরটির একই রকমের একটি হুবহু জুড়ি পাথর।”

“অর্থাৎ আরও একটি টাইম মেশিন?”

“ঠিক তাই।”

“আপনাদের পূর্বপুরুষেরা সেই প্রাচীন মিশরেও ঘুরতে এসেছিলেন?”

“একদমই তাই। কেবল যাবার সময় অসাবধানতাবশত একজন অভিযাত্রী তাঁর সময়-যন্ত্রটিকে এভাবে অলক্ষ্যে ফেলে যান, আর সেই পাথরই নানা জায়গায় হাত ঘুরতে ঘুরে স্বয়ং ফারাওয়ের হাতে গিয়ে পৌঁছয়।”

“এতদিনের মধ্যে আপনারা আর কখনও এই পৃথিবীতে আসেননি?”

“আসবার প্রয়োজন পড়েনি নবকুমারবাবু। মিশরীয় সভ্যতাকে আমরা যা দিয়ে গিয়েছিলাম, তারপর থেকে এতদিন অবধি মানুষের আর কোনও কিছুর প্রয়োজন পড়েনি। মানুষ নিজের যোগ্যতাতেই ক্রমশ নিজের উন্নতিসাধন করেছে।”

“শুনে খুশি হলাম। কিন্তু এতদিন পরে আবার এই পাথরটার জন্য এভাবে ফিরে এলেন কেন?”

“পৃথিবীর গভীরতম সংকট আসন্ন। মানবসভ্যতাকে টিকিয়ে রাখতে গেলে আবার আমাদের ফিরে আসাটা জরুরি। তাই আমাদের আনাগোনা শুরু হয়েছে। মানুষকে আবার সঠিক সভ্যতার পথে ফিরিয়ে আনতে পারি কেবল আমরাই। তাই আমাদের এই প্রত্যাবর্তন।”

“কিন্তু তুতেনখামেন কি এই পাথরের ব্যবহার কিছু বুঝতে পেরেছিলেন? আইয়েরই-বা এই পাথরটার উপরে নজর পড়েছিল কেন?”

“এই পাথরের যে আরও একটি ব্যবহার রয়েছে নবকুমারবাবু।”

“কী সেই ব্যবহার?”

“তুতেনখামেনের সমাধিতে স্বর্ণখচিত জিনিসপত্রের একেবারে ছড়াছড়ি ছিল সে-কথা জানেন?”

“হ্যাঁ, জানি বৈকি!”

“এমনকি তুতেনখামেনকে অনেকে গোল্ডেন ফারাও বলে চিহ্নিত করে থাকেন। তাঁর সমাধিকক্ষে সোনায় মোড়া যত সংখ্যক ব্যক্তিগত জিনিসের সন্ধান পাওয়া গেছে, তেমনটা আর কোনও ফারাওয়ের ক্ষেত্রে ঘটেনি। মোট ৫০০০-এরও বেশি পুরাবস্তুর সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল তুতেনখামেনের সমাধিতে। সেগুলির সম্পূর্ণ তালিকা প্রস্তুত করতেই পাঁচ বছরের ওপর সময় লেগে গিয়েছিল। এই সমস্ত জিনিসের মধ্যে একেবারে নিজস্ব ব্যক্তিগত ব্যবহারেরও অজস্র জিনিস ছিল, আর সেগুলির প্রতিটিই ছিল খাঁটি সোনার তৈরি। কিছু বলবেন না নবকুমারবাবু? মাথায় কিছু খেলছে না?”

নবকুমার অস্ফুটে বলে ওঠে, “পরশপাথর!”

অন্ধকার ক্রমশই আরও গাঢ় হয়ে তার উপরে চেপে বসতে শুরু করেছে।

***

চকিতে যেন ঘুমটা ভাঙল নবকুমারের। নিজের কাজের টেবলটার উপরেই মাথা রেখে সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। প্রথমে চারপাশটা তাকিয়ে দেখতে দেখতেও যেন কোনও কিছুই তার বিশ্বাস হচ্ছিল না। টেবলটার উপরে তাকিয়ে সে আশ্চর্য হয়ে দেখল যে সেই পাথরটার ঠিক পাশেই অবিকল একই রকম দেখতে আরও একটি পাথর পড়ে রয়েছে। খালি চোখে দেখলে অন্তত কিচ্ছুটি তফাত করা যাবে না। হাত বাড়িয়ে নবকুমার পাশের পাথরটাকে তুলতে যাবে, এমনি সময় হঠাৎ ডোর বেল বেজে উঠল। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে দরজাটা খুলতেই সে দেখল বেশ লম্বা, ফরসা, ধোপদুরস্ত একজন ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে আছেন। দাড়িগোঁফ পরিষ্কার করে কামানো। পরনে একটি ছাই রঙের সুন্দর সাফারি স্যুট।

“নমস্কার, আমার নাম সাংখ্য মিত্র। সরকারি পরিসংখ্যান দপ্তরের একজন সামান্য কর্মী। আমি থাকি এই কাছেই, খড়দহের অডিয়ন অ্যাপার্টমেন্টে। আসলে আমাদের দপ্তরের তরফ থেকে, আপনাদের মতো যারা টেকনোলজি সেক্টরের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদেরকে নিয়ে একটা র‍্যান্ডম স্যাম্পল সার্ভে করা হচ্ছে। সেই সূত্রেই স্রেফ সাধারণ কয়েকটা প্রশ্ন করব। আপনি কি অনুমতি দেবেন?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, এতে তো আর আপত্তির কিছু নেই।” ঘুম ঘুম ভাবটা এখনও নবকুমারের চোখে লেগে রয়েছে।

ভদ্রলোক বললেন, “ইয়ে, তার আগে যদি আপনি কিছু মনে না করেন, আসলে স্টেশন থেকে এতদূর হেঁটে আসতে আসতে খুব তেষ্টা পেয়ে গিয়েছে, এক গেলাস জল যদি…”

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। দাঁড়ান না, এক্ষুনি এনে দিচ্ছি।” নবকুমার জল আনতে ভিতরে যায়।

***

সাংখ্য মিত্রকে আর কোনোদিনই সোদপুরে দেখা যায়নি। কেবল নবকুমার ফিরে এসে দেখেছিল টেবলের উপরে তার সেই পাথর দুটো আর নেই। ল্যাপটপ ছাড়াও সেখানে তার কাজের জিনিস বলতে ছিল খান দুই মেটালিক পেন-ড্রাইভ আর একটা পুরোনো দিনের টাইটান রিস্ট-ওয়াচ। এখনও সেই তিনটে জিনিসই রয়েছে টেবলের উপর। কেবল জানালা দিয়ে নতুন সূর্যের আলো এসে যখন একেকবারে তাদের উপরে পড়ছে, তখন হঠাৎ হঠাৎ যেন একেকটা সময়ে নবকুমারের চোখ ঝলসে যাচ্ছে। অস্ফুটে নবকুমার আরেকবার উচ্চারণ করল, “অডিয়ন সেরাবেলাম!”

পরশপাথর!

অলঙ্করণ- সায়ন মজুমদার

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s