গল্প-গোরোংগোরোর জাগরণ-অমর্ত্য বন্দ্যোপাধ্যায় -শীত ২০২২

এই লেখকের আগের গল্প – জগৎশেঠের হিরে, ৭২ ঘণ্টা, সময় সরণীতে নবকুমার

golpogorasngoro

সেদিন সকালে ঠাকুরদার আমলের হাতঘড়িটা দিব্যি চলতে চলতে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে যেতেই নবকুমার বুঝতে পেরেছিল অস্বাভাবিক একটা কিছু ঘটতে চলেছে। অনেক নেড়েচেড়েও সে আর ঘড়িটাকে চালু করতে পারল না।

সময়-সফরের অভিজ্ঞতা নবকুমারের কাছে নতুন নয়। গ্রহান্তরের কোনও এক অজানা বন্ধু যে মাঝেমধ্যেই এভাবে নবকুমারের সান্নিধ্যে আসে, তাকে দিয়ে অদ্ভুত সমস্ত কাজ করিয়ে নেয়—এই বিষয়টা এখন নবকুমারের কাছে পরিষ্কার। তবুও, হঠাৎ কোনও ইঙ্গিত ছাড়াই এমনভাবে একেকদিন নিজের সমস্ত পরিকল্পনাগুলোকে বানচাল হয়ে যেতে দেখলে কারই-বা ভালো লাগে।

সেদিনটা ছিল শনিবার। মে মাসের সকাল। আগেরদিন রাত্তিরে তুমুল বৃষ্টি আর তার সঙ্গে তেড়ে কালবৈশাখী হয়ে গিয়েছিল। ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়াতে নবকুমার ভেবেছিল দুপুরের খাওয়া সেরে নতুন কেনা গাড়িটাকে বের করবে একবার। চলে যাবে ময়দান বা আউটরাম ঘাটের কাছাকাছি কোথাও। ফেরবার পথে অ্যাকাডেমি চত্বরে ভালো নাটক থাকলে সেখানেও ঢুকে পড়া যেতে পারে। কিন্তু ঘড়িটা বন্ধ হয়ে গেছে এটা টের পেতেই নবকুমার বুঝল কিছু একটা ঘটতে চলেছে। সেইমতো মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই দুপুরের খাওয়া সেরে গাড়িটাকে বের করল নবকুমার। দু-মাসও হয়নি গাড়িটা কিনেছে। এখনও ঝকঝকে রুপোলি রঙ, চকচকে চেহারা—নতুনের মতোই। মেয়ো রোডের মোড়টা পেরোতে গিয়েই মাথাটা এক ঝলক ঘুরে গেল হঠাৎ। রেড রোডে সাধারণত গাড়ি দাঁড় করাতে দেয় না। তবুও গাড়িটাকে কি একবার কোনোভাবে দাঁড় করাবে সে? তার শরীরটা যে মোটেও ভালো ঠেকছে না।

নবকুমারের মাথা ঝিমঝিম করছিল। একবার চোখ বুঝে চোখ খুলতেই সে দেখল চারপাশের সমস্ত দৃশ্যটাই যেন কোন ভোজবাজিতে পালটে গেছে হঠাৎ। দূরে যেদিকে তাকালে আকাশবাণী অথবা ইডেন গার্ডেনস দেখা যেত, এখন সেদিকটায় আরও দূরে তাকালে বিশাল উঁচু একটা পাহাড় যেন আকাশ ছুঁতে চাইছে। তার মাথার উপরে সাদা বরফ—উঁহু, বরফ তো নয়, ঝকঝকে ইস্পাতের তৈরি বিশাল বিশাল কয়েকটা চিমনি যেন মাথা উঁচিয়ে রয়েছে মনে হচ্ছে। তার উপরে সাদা ধোঁয়ার আস্তরণ। যে ধোঁয়াটাকে প্রথম দৃষ্টিতে বরফ বলে ভুল করেছিল নবকুমার। কিন্তু এখন আর সে গাড়ি চালাচ্ছে না। বরং জানালার পাশে আরামে ঠেস দিয়ে বসে আছে। তার পরনে একটা দামি বাদামি স্যুট। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও সেই স্যুটের কাপড়টাকে সে সঠিক করে চিনে উঠতে পারল না। এমন কাপড় সে কখনও পরেনি, কখনও দেখেওনি কোথাও। সুতির কাপড় নয়, আবার ঠিক যেন সিন্থেটিকও নয়। পকেট থেকে মোবাইলটাকে বের করে সময় দেখতে যেতেই নবকুমার দেখল এই যন্ত্রটাকেও আর সেই আগেকার মতো মোবাইল বলা চলে না। অনেকরকম ছবি আর প্রতীক তো পর্দা জুড়ে রয়েইছে, তার উপরে আবার সেগুলির কোনোটার উপরে আঙুল ছোঁয়ালে পর্দায় ফুটে ওঠার বদলে ত্রিমাত্রিক একেকটা ছবি যেন ওর সামনে একেকবারে হাওয়ায় ভেসে উঠছে। বিদেশি স্কাই-ফাই সিনেমাগুলোতে যেমনটা দেখায়, অনেকটা সেইরকম। নবকুমারের ভারি আশ্চর্য বোধ হচ্ছিল। তারিখ আর সময়টাকে দেখতে যেতেই সে দেখল যন্ত্র বলছে ৩১শে আগস্ট, ২১০১। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল নবকুমারের। নিজের সময় থেকে প্রায় আট দশক সে এগিয়ে এসেছে! কিন্তু এই শহরটাই-বা কোন শহর? দেশটাই-বা কোন দেশ? নবকুমারের মাথায় আর কোনও কিছুই কাজ করছিল না।

এই সময়ই সে পাশের লোকটাকে প্রথম লক্ষ করল। লক্ষ করতেই তার চমকানোর দ্বিতীয় পর্ব শুরু হল। হুবহু যেন তারই অবিকল এক প্রতিফলন তার পাশে বসে আছে। অথচ কেউ কারও উপস্থিতিকে টের পাচ্ছে না। এই নতুন নবকুমারকে দেখতে গিয়ে বারে-বারেই সে বিস্ময়াবিষ্ট হয়ে পড়ছিল। নতুন নবকুমারও একটিবার তার স্যুটের পকেট থেকে ছোট্ট একটা যন্ত্র বের করে দেখল। পুরোনো নবকুমার আশ্চর্য হয়ে দেখল হুবহু সেই একই যন্ত্র, সেও যেটা এই কিছুক্ষণ মাত্র আগেই তার পকেট থেকে বের করে দেখেছে। এটুকু সে বুঝল, এই নতুন নবকুমারকে অনুসরণ করাটাই এখন তার পক্ষে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।

গাড়িটা একটা বিশাল উঁচু হাইরাইজ বাড়ির নুড়ি বিছানো পোর্টিকোর সামনেটায় গিয়ে দাঁড়াতেই একজন ঝকঝকে উর্দিপরা লোক এসে নতুন নবকুমারের দিককার দরজাটা টেনে খুলে ধরল। পুরোনো নবকুমার এর মধ্যে বুঝে গেছে যে এখানে কেউই তাকে কোনোভাবে দেখতে পাচ্ছে না। কাজেই সেও তার দিককার দরজাটা খুলে নামতে নামতে দেখল এখানকার এই গাড়িগুলোর কোনও চাকা নেই। বরং কীসের জোরে যেন গাড়িটা আপনা-আপনিই মাটি থেকে ইঞ্চি দুয়েক উপরে ভেসে রয়েছে। এভাবেই চলে বোধহয়। এসব ভাবতে-ভাবতেই  পুরোনো নবকুমার শুনতে পেল তার নতুন সংস্করণকে উর্দিপরা লোকটা বলছে, “প্রফেসর, আপনার মোটোভিশনের ডানদিককার অ্যান্টি-গ্র্যাভিটি থ্রাস্টারগুলো মনে হচ্ছে একটু যেন গোলমাল করছে। ডিসব্যালান্সড লাগছে বাইরে থেকে।”

নতুন নবকুমার এর উত্তরে হেসে কী বলল সেটা আর পুরোনো নবকুমার এদিক থেকে ভালো করে শুনতে পেল না। তার আগেই বিশাল বাড়িটার ভিতর থেকে আরও একজন দশাসই চেহারার মানুষ নতুন নবকুমারকে আপ্যায়ন করতে এগিয়ে এসেছেন।

লম্বায় প্রায় সাড়ে ছ-ফুটের কাছাকাছি, মাথাজোড়া টাক, অথচ গালে যেন সেই পুরোনো দিনের জলদস্যুদের মতোই টকটকে আগুনরঙা ভরাট লাল দাড়ির বাহার। রোদ পড়লেই গালের সেই আগুন যেন একেকবারে চোখ ধাঁধিয়ে দিয়ে ঝলমল করে উঠছে। কুতকুতে দুটো চোখ—সে চোখ হাসছে না অন্য মানুষের একেবারে অন্তরাত্মার ভিতর অবধি মাইক্রোস্কোপিক দৃষ্টিতে যাচাই করে নিচ্ছে বোঝা কঠিন। গমগমে গলায় হাসতে হাসতে লোকটি নতুন নবকুমারকে উদ্দেশ করে বললেন, “আসুন আসুন, প্রফেসর নার্ভিক। আরুশা জিওট্রনিক্সে আপনাকে স্বাগত জানাই। আমিই এডওয়ার্ড হেস্টিংস। আরুশা জিওট্রনিক্সের হর্তা-কর্তা-বিধাতা…”

এডওয়ার্ডের মুখ থেকে কথাটা শেষ হবার আগেই স্মিত হেসে নার্ভিক বলে উঠল, “কিন্তু ওল্ডুভাই গর্জ অথবা ওলডোনিও লেঙ্গাই প্রজেক্টের ছাড়পত্র পাবার জন্য আপনারা এতখানি উঠে পড়ে লেগেছেন কেন বলুন তো? গোটা আরুশা অঞ্চলটাকেই কি আপনারা শ্মশান বানিয়ে ছাড়বেন?”

এডওয়ার্ডের মুখটা যেন একবারের জন্য ওঁর ওই আগুনবরন দাড়ির রঙের মতোই টকটকে রাঙা হয়ে উঠল। পরমুহূর্তেই অবশ্য তিনি নিজেকে সামলে নিয়ে বললেন, “এসব কথা ঘরের ভিতরে হওয়াই কি ভালো নয়? হাজার হোক আপনি সম্মাননীয় অতিথি আমাদের। বিশ্বাস করুন, পৃথিবীর শক্তি-সংকটের সমাধান ভিন্ন আর কোনও কিছুই আমাদের উদ্দেশ্য নয়।”

নার্ভিক একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল।—“মিডিয়াতে যদি আমি হইচই না বাধাতাম, আপনারা আমার সঙ্গে এই মিটিংয়ে বসতেও রাজি হতেন না বোধহয়। সে যা হোক, ডক্টর স্যাটলার এসেছেন? ইউ.এন এনার্জি কাউন্সিলের তরফে ওঁর থাকার কথা রয়েছে।”

এডওয়ার্ড হেস্টিংস মিষ্টি করে হেসে বললেন, “আজ্ঞে, ডক্টর স্যাটলার আছেন। এছাড়াও রাষ্ট্রপুঞ্জের তরফে নাওমি বলে একজন মিডিয়ার প্রতিনিধিকেও পাঠানো হয়েছে। আমি ফোর-সিটার হেলিক্যারিয়ারেরই ব্যবস্থা করেছি।”

“বেশ ভিতরে চলুন।”

নার্ভিক আর এডওয়ার্ড বাড়িটার দিকে এগোয়। পিছু পিছু এগোয় নবকুমার।

আরুশা, তানজানিয়া—সব মনে পড়ে যাচ্ছে নবকুমারের এখন। খুব ছোটবেলায় পড়ে আসা সেই চাঁদের পাহাড়ের দেশ, সেরেঙ্গেটির প্রান্তর, গোরোংগোরোর জ্বালামুখ—এই সেই আফ্রিকা! এসব ভাবতে-ভাবতেই সে দেখল তারা একটা কনফারেন্স হলের ভিতরে ঢুকে পড়েছে। এডওয়ার্ড ঘরে ঢুকেই সটান মঞ্চের উপরটায় উঠে গেলেন, সেখানে একটা পর্দা টাঙানো রয়েছে। ঘরে আরও দুজন লোক রয়েছেন। একজন শ্বেতাঙ্গ পুরুষ এবং একজন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা। আন্দাজে নবকুমার বুঝে নিল যে এঁরাই ডক্টর স্যাটলার এবং নাওমি, এডওয়ার্ড একটু আগেই যাঁদের কথা বলছিলেন। কিন্তু এডওয়ার্ড কিছু বলার আগেই নার্ভিক বলে উঠল, “সবার আগে আমিই আমার কেসটাকে তুলে ধরতে চাই। যদিও রাষ্ট্রপুঞ্জে আমি যে চিঠিগুলো বার বার পাঠিয়েছি তাতেই সবটা বলা হয়ে গেছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও, আজ ডক্টর স্যাটলার এবং নাওমিকে যদি একটু গোড়া থেকে বিষয়টা ছোটো করে আমি বলে না দিই, তাহলে তাঁদের আমার এই প্রজেক্টের বিরোধিতা সম্পর্কে বুঝতে অসুবিধা হবে।”

এডওয়ার্ড হালকা বিরক্তির সঙ্গে কাঁধ ঝাঁকিয়ে মঞ্চের উপরেই একটা চেয়ারকে টেনে নিয়ে বসে পড়লেন। নার্ভিক আস্তে আস্তে তার কথা বলতে শুরু করল।—

“আমরা এখন রয়েছি তানজানিয়ার আরুশাতে। এখানে আসতে আসতে আপনারা দেখেছেন আরুশা জিওট্রনিক্সের প্রথম কীর্তি, মাউন্ট মেরু জিওথার্মাল ইউনিট যা কিনা একার ভ্রান্তিতে এই সমস্ত অঞ্চলটাকে চিরতরে শেষ করে দেবার ক্ষমতা রাখে। গত ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ বছর ধরে আমরা এই বিপজ্জনক পদ্ধতিতে শক্তি উৎপাদনের চেষ্টা হতে দেখেছি। সারা পৃথিবী জুড়ে এমন অজস্র উদাহরণকে আমরা খুঁজে পেয়েছি। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই এই উৎপাদন পদ্ধতিকে হয় বন্ধ করে দিতে হয়েছে, অথবা ভয়ানক দুর্ঘটনার কবলে পড়তে হয়েছে। শক্তির জোগান দিতে গিয়ে আমরা কি নিজেদের বিনাশকেই ডেকে আনছি না?”

নাওমি ইতিমধ্যে একটা ল্যাপটপ খুলে নোট নিতে শুরু করেছে। ডক্টর স্যাটলার একমনে শুনছেন বলেই মনে হচ্ছে। নার্ভিক আবারও বলতে শুরু করে, “আজ থেকে প্রায় একশো বছর আগে ২০০০ সালের গোড়ার দিকে যখন ভূ-তাপশক্তি নিয়ে পৃথিবীতে মাতামাতি শুরু হয়েছিল তখন সেটাকে নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস বলে মনে করা হয়েছিল। খুব সহজ করে বলতে গেলে, এই ভূ-তাপশক্তির তত্ত্ব অনুযায়ী মাটির গভীর অবধি নল ঢুকিয়ে, সেই নলের মাধ্যমে জল প্রবেশ করিয়ে, ভূগর্ভের আভ্যন্তরীণ তাপের সাহায্যে সেই জলকে স্টিমে রূপান্তরিত করে, সেই স্টিমের মাধ্যমে টার্বাইন ঘুরিয়ে সেই শক্তির দ্বারা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। কিন্তু মানুষের শক্তির জন্য হাহাকার এতেও মিটল না। ২০৫০ সাল নাগাদ এক প্রায়োন্মাদ আমেরিকান বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দিলেন, বহুদিন ধরে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরির নিষ্ক্রিয় জ্বালামুখগুলির উপরে এই সমস্ত জিওথার্মাল প্লান্টগুলিকে বসানো গেলে জলের নলগুলিকে একেবারে আগ্নেয়গিরির পেটের মধ্যে পাঠিয়ে খুব সহজেই ভূগর্ভের ভিতরকার সঞ্চিত ম্যাগমা থেকে একসঙ্গে অনেকটা পরিমাণে ভূ-তাপশক্তিকে ব্যবহারের জন্য নিষ্কাশন করা সম্ভব হবে। প্রথম দিকে সেই তত্ত্বকে বিশেষ কেউ গুরুত্ব না দিলেও পরের দিকে প্রথমে ইতালিতে এবং পরে ভারতবর্ষে এই তত্ত্বের বাস্তবিক প্রয়োগ নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু হয়। ২০৭২-এ ইতালিতে প্রথম মাউন্ট ভিসুভিয়াসের জ্বালামুখের উপরে এমন একটি জিওথার্মাল প্লান্টকে বসানো হয়। ২০৮১ সাল নাগাদ ইতালির দেখাদেখি ভারতবর্ষেও ব্যারেন আগ্নেয়গিরির উপরে দ্বিতীয় এমন একটি ইউনিটকে স্থাপন করা হয়। এরপর উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা, এমনকি রাশিয়ার সাইবেরিয়াতেও একাধিক সুপ্ত আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখের উপরে এমন প্লান্ট বসানো হতে থাকে। এরই দেখাদেখি আফ্রিকার তানজানিয়াতে এডওয়ার্ড হেস্টিংস তৈরি করেন আরুশা জিওট্রনিক্স, যার আওতাতে প্রথম প্রকল্প হিসেবে গড়ে উঠেছে এই মাউন্ট মেরু জিওথার্মাল ইউনিট। এখন তারা তাদের পরবর্তী প্রকল্প হিসেবে নিকটবর্তী ওলডোনিও লেঙ্গাই আগ্নেয়গিরি এবং ওল্ডুভাই গর্জ গিরিখাতের ভিতরে দুটি নতুন ইউনিটকে চালু করতে চাইছে। যদিও দুটির কোনোটিই এখনও অবধি এ-দেশের বা আন্তর্জাতিক পরিবেশগত কোনও ছাড়পত্র পায়নি; আর যাতে তারা সেটা না পায় সেই চেষ্টাতেই আমার এখানে আসা।” নার্ভিক একটু দম নিতে থামে এবার।

এডওয়ার্ড হেস্টিংস একদৃষ্টিতে তার দিকে তাকান।

“গত বছর রাশিয়ার সাইবেরিয়াতে তারা তাদের তিনটি ভলক্যানিক জিওথার্মাল ইউনিটকে সম্পূর্ণভাবে শাটডাউন করেছে। কোনও যান্ত্রিক গোলযোগের জন্যই তারা এটা করতে বাধ্য হয়েছে বলে রুশ প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে। আমেরিকাতেও ভলক্যানিক জিওথার্মাল ইউনিটগুলিকে বন্ধের দাবিতে আন্দোলন শুরু হয়েছে। এসবের একমাত্র কারণ ২০৮৯ এবং ২০৯৫ সালের দুটি কুখ্যাত ভলক্যানিক এরাপশন বা আগ্নেয় উদ্‌গিরন যা কিনা সমস্ত পৃথিবীর ভলক্যানিক জিওথার্মাল ইউনিটগুলির সাধারণ নিরাপত্তা নিয়েই প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ২০৮৯ সালে ভারতবর্ষের ব্যারেন আগ্নেয়গিরিতে প্রবল অগ্ন্যুৎপাত শুরু হয়। সেই দাপটে জ্বালামুখের উপরে বসানো সমস্ত প্লান্টটি বিস্ফোরিত হয় এবং প্লান্টটিতে বাধা পাবার কারণে যে প্রবল শক্তিতে লাভার উদ্‌গিরন ঘটে তার কারণে প্রবল ভূমিকম্পে পোর্টব্লেয়ার-সহ আন্দামান দ্বীপপুঞ্জের প্রায় ৯০% স্থলভূমিই সমুদ্রগর্ভে হারিয়ে যায়। উত্তাল সমুদ্রের ঢেউ সুনামির আকারে ভারতবর্ষের অন্ধপ্রদেশ ও তামিলনাড়ু উপকূলে গিয়ে ধাক্কা মারে। এই ঘটনায় অন্ততপক্ষে তিন লক্ষ মানুষের মৃত্যু হয়। ২০৯৫-তে একই জিনিস ঘটে ইতালির ভিসুভিয়াসের ক্ষেত্রে। ইতালির বিস্তীর্ণ উপকূল অঞ্চল এর ফলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, সেখানেও প্রায় দেড় লক্ষ মানুষের মৃত্যু ঘটে। এই দুটি ঘটনার পর থেকেই আগ্নেয়গিরির উপরে জিওথার্মাল ইউনিট বসানোর বিষয়ে বিশ্বজুড়ে বিতর্ক শুরু হয়। অথচ তারপরেও আরুশা জিওট্রনিক্সের তরফে কোনোরকম পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই ২০৯৭-তে এখানে মাউন্ট মেরু জিওথার্মাল ইউনিটের কাজ শুরু করা হয়।” একটু থেমে নার্ভিক বলে চলে, “অথচ আমরা দেখেছি জুলাই, ২০৯৭ থেকে এই বছরের জুন মাস অবধি—এই চার বছরে ছোটোবড়ো মিলিয়ে অন্তত ৩৫১৫টি ভূকম্পন এই আরুশা অঞ্চলেই কেবল অনুভূত হয়েছে। ভুলে গেলে চলবে না, এই আরুশা অঞ্চল অথবা গোরোংগোরো জ্বালামুখ, এর গোটাটাই আসলে এক বিশাল আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখ মাত্র। ওল্ডুভাই গর্জ প্রজেক্টের বিবরণ অনুযায়ী আরুশা জিওট্রনিক্স চাইছে সেই ওল্ডুভাই গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে ড্রিলিং শুরু করে পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে অন্তত ১৫ কিলোমিটার গভীরে নল বসিয়ে গোটা গোরোংগোরোর জ্বালামুখ অঞ্চলটাকে বেড় দিয়ে ফিরে আসতে। এমনটা দুঃসাহস এর আগে অবধি কোনও ভলক্যানিক জিওথার্মাল ইউনিটেও কখনও দেখানো হয়েছে বলে শুনিনি। তাছাড়াও দ্বিতীয় প্রকল্পে ওলডোনিও লেঙ্গাই বলে যে আগ্নেয়গিরিটিকে সুপ্ত বলে দেখানোর চেষ্টা করা হচ্ছে, মনে রাখতে হবে গত ১৮৮৩ সাল থেকে ২০৭৮ সাল অবধি নিয়মিত ব্যবধানে সেই আগ্নেয়গিরিতে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা ঘটেছে। কাজেই কোনদিক থেকে আরুশা জিওট্রনিক্সের এঞ্জিনিয়ারদের কাছে এই ওলডোনিও লেঙ্গাই অথবা ওল্ডুভাই গিরিখাতকে এমন দুটি প্রকল্পের জন্য নিরাপদ বলে মনে হল, সে আমার বোধশক্তির বাইরে। আমি কেবল রাষ্ট্রপুঞ্জের কাছে অনুরোধ করছি, অবিলম্বে এই প্রকল্পদুটিকে যেন বাতিল করা হয়।” নার্ভিক তার বক্তব্যকে শেষ করে।

এডওয়ার্ড আবারও তাঁর তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আর সকলের দিকে তাকান। তিনি কিছুক্ষণ যেন ঘরের পরিবেশটাকে বুঝে নিতে চেষ্টা করেন। অন্তত নবকুমারের পিছন থেকে দেখতে দেখতে তাই মনে হচ্ছিল। তারপর ধীরে ধীরে চেয়ার ছেড়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।—“বেশ তো! আপনাদের যদি তাই মনে হয়, আমি আর এখানে আলাদা করে কোনও প্রেজেন্টেশন দেব না। আমাদের সঙ্গে হেলিক্যারিয়ার তৈরিই আছে। আমরা আকাশপথে একবার দুটো জায়গাকেই বরং সার্ভে করে দেখে আসি চলুন। প্রথমে ওলডোনিও ক্রেটারের উপরে একটা চক্কর মেরে ওল্ডুভাই গিরিখাতের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে একেবারে গোরোংগোরো ক্রেটার লজের হেলিপ্যাডে গিয়ে নামব। রাতটা ওখানে কাটিয়ে কাল আপনাদের না-হয় ওল্ডুভাই গর্জের সেকেন্ড লেয়ারে, মানে যেখানে ড্রিলিং চলছে এখন, সেখানে নিয়ে গিয়েও আপনাদের দেখিয়ে আনব আমাদের সেফটি মেজার্স এবং আদার সিকিওরিটি প্রোটোকলসও কতখানি জোরদার আছে। তাহলেই তো আর আপনাদের কোনও সংশয় থাকবে না। কী বলেন?” এডওয়ার্ড সকলের দিকে তাকান।

“ড্রিলিং কি এর মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে নাকি?” নার্ভিক অবাক বিস্ময়ে জিজ্ঞেস করে, “কী ব্যাপার, ডক্টর স্যাটলার! ইউ.এন তো এই ড্রিলিং স্থগিত রাখতে নির্দেশ দিয়েছিল!”

ডক্টর স্যাটলার মৃদু স্বরে বলেন, “আসলে পুরো ব্যাপারটাই তো ইকনমিক্স, বোঝেনই তো। ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসপেক্টসকে কি আর ওভাবে পুরোপুরি আটকে রাখা যায়? শ্রমিকরা কাজ করছে। আমরা তো আর তাদের রোজগারকে বন্ধ করে দিতে পারি না।”

নার্ভিক কিছু বলতে যাবার আগেই সেই উর্দি পরা লোকটা কনফারেন্স হলের দরজাটা একটু ঠেলে ভিতরে ঢুকে আসে।—“ক্যারিয়ার উড়বার জন্য তৈরি স্যার।”

এডওয়ার্ড সকলের দিকে তাকিয়ে ইঙ্গিত করেন। প্রথমে এডওয়ার্ড, পরে ডক্টর স্যাটলার এবং পিছন পিছন আর সকলে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। নবকুমারও অবাক বিস্ময়ে তাদের অনুসরণ করে। নাওমি যেন চোখের ইশারাতে নার্ভিককে কিছু একটা বলতে চাইছিল, নার্ভিক সেটাকে খেয়াল করেনি।

ওলডোনিও লেঙ্গাই। অগ্নিদেবের শয্যা…

হেলিক্যারিয়ারটাকে দেখার পর নবকুমার এতক্ষণে বুঝল যে নামে হেলিক্যারিয়ার হলেও আসলে এগুলোকে বর্তমান হেলিকপ্টারেরই আধুনিকতর সংস্করণ বলা যেতে পারে। এডওয়ার্ড প্রথমে চার আসনের হেলিক্যারিয়ারের কথা বললেও নবকুমার দেখল জিনিসটা আকারে-প্রকারে বেশ বড়োই। উর্দি পরা সেই প্রথম লোকটাও হেলিক্যারিয়ারে রয়েছে। নবকুমারও এক ফাঁকে ঠিক জায়গা করে উঠে পড়েছিল। আসন বলতে কিছুই নেই। বড়ো বড়ো গোল কাচের জানালা দু-পাশে, আর বেঞ্চির মতো টানা বসার জায়গা। সেই গোল জানালা দিয়েই নবকুমার নীচের দিকে তাকাল। অনেক নীচে সেই ওলডোনিও লেঙ্গাইয়ের জ্বালামুখ, তার উপর দিয়েই ক্যারিয়ার উড়ছে এখন। সেই চাঁদের পাহাড়ের ওলডোনিও লেঙ্গাই, যার নামের অর্থ ‘অগ্নিদেবের শয্যা’, মাসাইদের ভাষায়। স্কুলে থাকতে পড়েছিল নবকুমার। মাসাইরা কি এখনও আছে? নবকুমারের ভারি জানতে ইচ্ছে করছিল। এমন সময় নার্ভিকের চিৎকারে সচকিত হয়ে তার দিকে তাকাল নবকুমার।—“নামান, ক্যারিয়ারটাকে আরও নীচে নামান এখুনি!” চিৎকার করতে করতে নার্ভিক ওর হাতের ব্রিফকেস থেকে একতাড়া কাগজ বের করেছে।—“এই দেখুন,” কাগজগুলোকে নাড়তে নাড়তে সে ডক্টর স্যাটলারকে বোঝাতে চেষ্টা করে, “এটা ২০৯৭-এর ছবি, এগুলো ২০৯৯-এর। এবারে নীচে ক্রেটারটার দিকে ভালো করে লক্ষ করুন, দেখুন ভূমিকম্পে পাহাড়ের পূর্ব ঢালটা কতখানি ধ্বসে ঢালু হয়ে গেছে। এই ছবিগুলোর সঙ্গে মেলালেই আপনি বুঝতে পারবেন!”

ডক্টর স্যাটলার কেমন যেন অধৈর্যভাবে বলেন, “দাঁড়ান মশাই, অত তাড়াহুড়ো করছেন কেন? এতটাও আতঙ্কিত হবার মতো কিছু আছে বলে তো আমার মনে হচ্ছে না।”

নার্ভিক অবাক হয়ে কিছুক্ষণ স্যাটলারের দিকে তাকিয়ে থাকে।—“আপনি কী বলছেন বলুন তো? আপনার নিরপেক্ষতা নিয়ে তো আমার সন্দেহ বোধ হচ্ছে এখন!” নার্ভিক এবার নাওমির দিকে তাকায়।—“তুমি সবকিছু নোট করছ তো? আমাকে ফিরে গিয়ে ডক্টর স্যাটলারের এগেনস্টেও রিপোর্ট করতে হবে বলে মনে হচ্ছে।”

ডক্টর স্যাটলার এবার গলা তুললেন।—“রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রতিনিধিকে অপমান করবার কোনও অধিকার আপনার নেই প্রফেসর নার্ভিক!”

“একশোবার অধিকার আছে। আপনি বা আপনারা কেন এই আরুশা জিওট্রনিক্সের অনুকূলে কেসটাকে ঘুরিয়ে দিতে চাইছেন?” নার্ভিক আবারও প্রায় চিৎকার করে ওঠে।

ডক্টর স্যাটলারও বসবার জায়গাটা ছেড়ে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। হেলিক্যারিয়ারটা ভীষণ দুলছে। নবকুমার নীচের দিকে তাকিয়ে দেখল, সত্যিই জ্বালামুখটার পূর্বদিকের যে ঢাল, সেটা প্রায় ধ্বসে গিয়ে ঢালু হয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছে। যেটুকু খোঁড়াখুঁড়ির কাজকর্ম চলছে, সবটাই প্রায় পশ্চিমদিকের ঢাল বরাবর। তাছাড়াও পুরু সাদা একটা মেঘের আস্তরণ মাঝে-মাঝেই সমস্ত জ্বালামুখটাকে ঢেকে দিচ্ছে। এই মেঘ যেন সম্পূর্ণ সাধারণ মেঘ নয়। এর মধ্যে আগ্নেয়গিরির ছাই আর ধুলো মিশে আছে। নবকুমারেরও লক্ষণগুলো মোটেই ভালো ঠেকল না। কিন্তু ডক্টর স্যাটলার আর নার্ভিকের মধ্যে তর্কাতর্কি ক্রমেই যেন আরও বেড়ে চলেছে। এমন সময় নবকুমারই প্রথম দেখল উর্দি পরা লোকটাকে পিছন থেকে এগিয়ে আসতে। ওর হাতে একটা রিভলবারের মতো অস্ত্র উলটো করে ধরা, বাঁটের দিকটা সামনে। নার্ভিকের মাথার পিছনে জোরালো একটা আঘাত। নাওমি চিৎকার করে উঠেছে। তারপর নবকুমারের চোখের সামনেও অন্ধকার নেমে এল।

সময়-সফরের সময় নবকুমারের নিজের উপরে কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কখন সে কোথায় হারিয়ে যাবে, কোথায় জেগে উঠবে সেই রহস্য এখনও তার কাছে পরিষ্কার নয়। কাজেই নবকুমারের জ্ঞান ফিরতে সে যখন দেখল সে একটা চোরাকুঠুরির মেঝের উপরে পড়ে রয়েছে, সে এতটুকুও আশ্চর্য হল না। আবছা আলোয় সে দেখল তার থেকে একটু দূরেই দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে রয়েছে নার্ভিক আর নাওমি। দুজনেরই হাত খোলা, কিন্তু দেখেই বোঝা যাচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে না খাইয়ে এই ঘরে এদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। নার্ভিক মাঝে মাঝে মাথার পিছনে হাত দিয়ে যন্ত্রণার শব্দ করছে। নবকুমার ওদের কথা শুনতে পাচ্ছিল।

নার্ভিক বলছে, “তোমাকেও ওরা টাকার লোভ দেখিয়েছিল?”

নাওমি জবাব দেয়, “হ্যাঁ, তুমি আসার আগের দিন রাত্তিরেই। অনেক টাকা দেবে বলেছিল। আমি রাজি হইনি।”

“ওরা আমাদের এভাবে আটকে রাখল কেন? আমাদের আটকে রেখে ওদের কী লাভ? তোমার অফিস, আমার অর্গানাইজেশন থেকে তো দু-একদিনের মধ্যেই খোঁজ শুরু হয়ে যাবে।”

“ওদের কি অত বোকা ভেবেছ নাকি ? শুনলাম ওরা তোমার মোটোভিশনটাকে নিয়ে কথা বলছিল। সেটাতে নাকি সামান্য কিছু যান্ত্রিক গোলযোগ লক্ষ করা গেছে। কাল ওরা আমাদের ঘুমের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে আরুশাতে নিয়ে যাবে। তারপর মাউন্ট মেরুর কাছাকাছি কোথাও ওই গাড়ির ভিতর আমাদের ঢুকিয়ে গাড়িটাকে খাদে ফেলে দেবে যাতে অ্যাকসিডেন্ট বলে মনে হয়।”

নার্ভিক শব্দ করে একটা শ্বাস ফেলে।—“মাই গড, লোকটার পেটে পেটে এত!”

“কিন্তু আমি ওসবে ভয় পাচ্ছি না।” নাওমি হালকা সুরে জবাব দেয়।

“কেন?”

“আজকের রাতটা তো আগে কাটুক।”

“আজকে রাতে কী হবে, নাওমি?”

“আমার কাছে যতটুকু খবর, আজ রাতেই ওল্ডুভাই গিরিখাতের সেকেন্ড লেয়ারের ভিতর দিয়ে যে ড্রিলিং চলছে, তাতে মাটির নীচে ওরা ১১ থেকে ১২ কিলোমিটারেরও বেশি গভীরে গিয়ে পৌঁছবে।”

“তাতে কী হবে?”

“ওল্ডুভাই গিরিখাতের সেকেন্ড লেয়ারের নীচটাকে ভাবলে, মাটির গভীরে ১১ কিলোমিটারের কিছুটা পর থেকেই আর্থস ক্রাস্ট অর্থাৎ কিনা ভূত্বকের উপরের অংশটুকু সম্পূর্ণ ফুরিয়ে গিয়ে ম্যান্টল অংশ শুরু হচ্ছে। ভূগর্ভের বিভিন্ন স্তরের খবর জানো তো?”

“হ্যাঁ, জানি তো!”

“এখানকার ম্যান্টলের কম্পোজিশন মোটেই অন্যান্য জায়গার সাধারণ ম্যান্টলের মতো সুস্থিত নয়। আগ্নেয়গিরির নীচে তো কখনোই নয়। তাছাড়া গত কয়েক বছরের ভূকম্পনজনিত কারণে এবং অন্যান্য কারণে সে ভারি অস্থির হয়ে রয়েছে। কাজেই, সেখানে আঘাত করলে তার ফল যে কী হতে পারে কেবল ঈশ্বরই জানেন।”

“কী হতে পারে নাওমি?”

এবারে নাওমির গলাটা যেন অনেক অনেক দূর থেকে ভেসে এল।—“মাসাই প্রবাদ অনুসারে যেদিন পৃথিবী গর্ভে শেষ আঘাত পৌঁছবে, সেই আঘাতের মধ্যে দিয়েই সূর্যদেব আবার প্রকাশিত হবেন। মানবসভ্যতার শুরু যেখানে, শেষও সেখানে।”

“ওল্ডুভাই গর্জ, ওল্ডুভাই গর্জ!” অধৈর্য হয়ে প্রায় চিৎকার করে ওঠে নার্ভিক—“মানবসভ্যতার আদিমতম নিদর্শন পাওয়া গিয়েছিল সেইখানেই—১৯৩১, লুইস লিকির অভিযান!”

“ঠিক তাই।” নাওমি ফিসফিস করে বলে ওঠে, “সেখানেই সবকিছু শেষ হবে প্রফেসর। মানুষের লোভ, মানুষের ক্ষমতার মদমত্ততা—সবকিছুর।”

নবকুমারের চারপাশে কেমন যেন এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।

নবকুমার তার সেই মোবাইলের মতো যন্ত্রটায় দেখেছিল, সেদিন রাত ১২টা বাজার সামান্য কিছু পর থেকেই প্রবল ভূকম্পনে মাটি দুলে দুলে উঠতে শুরু করেছিল। চোরকুঠুরিটার একদিক থেকে অন্যদিক অবধি ওরা তিনজনে গড়িয়ে গিয়েছিল। নাওমি চিৎকার করে বলে উঠেছিল, “সব শেষের এই শুরু হল প্রফেসর!” ঘুপচি একটা জানালার ভিতর দিয়ে সেই রাত্তিরেও যেন দুপুরবেলার সূর্যের মতোই প্রচণ্ড উজ্জ্বল একটা আলোর বিচ্ছুরণ এসে চোরকুঠুরিটার মধ্যে পড়েছিল। প্রচণ্ড সেই শব্দ আর উত্তাপ, আর সেই সবকিছুর মধ্যেই যেন একবার হঠাৎ নার্ভিক চকিতে নবকুমারের দিকটাতে তাকিয়ে কথা বলে উঠেছিল। সে বলেছিল, “হে অতীতের নাগরিক, তোমাকে এই সবটুকুই দেখানোর প্রয়োজন ছিল। তাই তোমাকে এভাবে এই এত দূরের ভবিষ্যতে টেনে আনা। ফিরে যাও। পৃথিবীর মানুষকে বোঝাও! বোঝাও মিতব্যয়ী হতে, বোঝাও পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে, সম্পদের অপচয় না করতে…”

নাওমিও কি তখন তার দিকেই তাকিয়ে ছিল? নবকুমারের সে-সব কিছুই মনে নেই।

হঠাৎ প্রচণ্ড জোরে একটা আওয়াজের সঙ্গে সঙ্গে প্রকাণ্ড একটা আগুনের গোলা জানালা ভেঙে চোরকুঠুরিটার মধ্যে এসে পড়েছিল। সবকিছু অন্ধকার…

***

“আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে স্যার?”

সংবিৎ ফিরে পেয়েই প্রথম প্রশ্নটা শুনল নবকুমার। প্রশ্নটা যে করেছে তার দিকে তাকাতেই নবকুমার দেখল সে আবার সেই রেড রোডের রাস্তাতে ফিরে এসেছে। একটু দূরে তাকালেই ইডেনের বাতিস্তম্ভগুলোকেও দেখা যাচ্ছে। ঘোড়সওয়ার পুলিশদের একজন ওর গাড়ির পাশে এসে দাঁড়িয়ে ওকে প্রশ্নটা করেছে, “দূর থেকে দেখে মনে হল আপনি যেন কেমন একটা ভাবে গাড়িটাকে সাইড করছেন, তাই সঙ্গে সঙ্গে ছুটে এলাম।”

নবকুমার ক্লান্ত ভাবে মাথা নাড়ল।—“হ্যাঁ, মাথাটা একটু ঘুরে গিয়েছিল।”

“আপনি গাড়ি চালিয়ে এই অবস্থায় ফিরতে পারবেন তো স্যার?” পুলিশটা আবার জিজ্ঞেস করে।

নবকুমার মাথা হেলিয়ে সায় দিল, “পারব।”

ড্যাশবোর্ড থেকে জলের বোতলটা বের করে একটু জল খেল সে। শরীরটা ভালো লাগছে এবার। মোবাইলটা বের করে সে সময় দেখল। গাড়ি নিয়ে যখন সে রবীন্দ্রসদনের ক্রসিংটা পেরোচ্ছিল, তখন ঘড়িতে দেখিয়েছিল ৪টে ৫৯। এখন সে ঘড়িতে দেখল ৫টা ১১। মাঝের সময়টুকুর কথা ভাবতেই নবকুমারের গা দিয়ে যেন একটা শিরশিরে স্রোত বয়ে গেল। ৩১শে আগস্ট ২১০১ – তারিখটা সে বাড়িতে ফিরেই খাতায় লিখে রাখবে। নবকুমার মনে মনে ঘটনাগুলোকে সাজিয়ে নিচ্ছিল তখন।

জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s