এই লেখকের আগের গল্প-বিপিনবাবু ও হারু নাপিতের ভূত

মানুষ অনেক কারণে বিখ্যাত হয়—কেউ গান গেয়ে, কেউ কবিতা লিখে, কেউ খেলে—কিন্তু ব্রজেনবাবুর খ্যাতি তাঁর কিপটেমির জন্য। দুষ্টু লোকে অবশ্য বলে যে ওটা খ্যাতি নয়, অখ্যাতি। সে যাই হোক, ব্রজেনবাবুর সে নিয়ে বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা ছিল না। তিনি শুধু নিজের মতো করে এক-একদিন এক-একটা নতুন নতুন ফন্দি বার করতেন আর খরচ কমিয়ে পয়সা বাঁচাতেন। তবে তিনি নিজে কখনও মানতেন না যে তিনি কিপটে। কেউ বললে তিনি যুক্তি দিয়ে বোঝাতেন যে কেন তাঁকে কিপটে বলা উচিত নয়।
ব্রজেনবাবু বিপত্নীক। খরচের ভয়েই তিনি বিয়ে করেননি। থাকার মধ্যে আছেন দূরসম্পর্কের এক পিসি। তিনকুলে তাঁর আর কেউ নেই ব্রজেনবাবু ছাড়া। সেই পিসির সঙ্গেও ব্রজেনবাবুর খিটিমিটি লেগেই থাকে তাঁর এই কিপটে স্বভাবের জন্য। বিধবা পিসি একটু পুজো-অর্চনা নিয়ে থাকতে ভালোবাসেন। বিনে পয়সায় যা ফুল পাওয়া যেত, তাতেই পুজো করতেন পিসি। একদিন তাঁর শখ হল ঠাকুরকে একটু ধূপ দেখানোর। তাই ব্রজেনবাবুকে বলেছিলেন ধূপ এনে দেবার কথা। বেশ কয়েকদিন ব্রজেনবাবু সেই কথা কানেই তুললেন না। শেষে পিসির চেঁচামেচির তিনি একদিন ধূপ নিয়ে এলেন বটে, সে মশা তাড়ানোর ধূপ। পিসি তো হতবাক!—“ও ব্রজ, এটা কী এনেছিস?”
ব্রজেনবাবু গম্ভীর মুখে বললেন, “ধূপ।”
পিসি এবার ধৈর্য হারালেন, “তুই আমাকে পাগল পেয়েছিস? এই ধূপ দিয়ে আমি পুজো করব?”
“দ্যাখো পিসি, বাড়িতে তো খুব মশা, আর এই ধূপেরও খুব সুন্দর গন্ধ। তুমি সকাল-সন্ধ্যা পুজোর সময় একটু ধূপ দেখিয়ে তারপর নিভিয়ে দেবে আর রাতে আবার এই ধূপটা মশা তাড়ানোর জন্য জ্বেলে নেব। এক কাজে দুই কাজ। তোমার ঠাকুর ওর গন্ধ শুঁকে বুঝতেই পারবে না যে ওটা মশা তাড়ানোর ধূপ।”
ব্যস, আলাদা করে ধূপ কিনতে আর খরচ হল না। তবে সেই একবারই মশা তাড়ানোর ধূপ কিনেছিলেন ব্রজেনবাবু। কারণ, তাঁর একটা শতচ্ছিন্ন মশারিতে তাপ্পি লাগিয়ে তিনি দিব্যি ঘুমাতেন। তবে পিসি সেই ধূপ ঠাকুরকে দেখিয়েছিলেন কি না সে-কথা অবশ্য জানা যায়নি।
তবে হ্যাঁ, কিপটে হলে কী হয়, ব্রজেনবাবু কিন্তু সপ্তাহে তিন-চারদিন বিকেলে দুটি করে চপ কিনে নিয়ে আসেন নিজের জন্য। পিসি সূর্য ডোবার পর আর কিছু খান না, তাই কোনও ঝামেলা নেই। ব্রজেনবাবু ওই দুটি চপ খেয়ে পেট ভরে জল খেয়ে নেন। ব্যস, একটু পরেই অ্যাসিড হয়ে পেট ভার, আর খিদে পায় না। রাতে খাওয়ার খরচ বেঁচে গেল। আর যেদিন তিনি চপ আনেন, সেদিন তিনি মাথায় তেল মাখেন। না না, আলাদা করে তেল কিনে এনে নয়। ওই চপের গায়ের যে তেল হাতে লেগে যায় আর চপের ঠোঙায় যে তেল লেগে থাকে, সেই তেল তিনি ঘষে ঘষে মাথায় মাখেন। ব্যস, মাথায় লাগানোর তেলের খরচ বেঁচে গেল। রোজ তেল লাগানোকে ব্রজেনবাবু বিলাসিতা মনে করেন। তাই রোজ তিনি চপ খান না।
আর সপ্তাহের বাকি দিনগুলো তিনি পিসির সঙ্গে অমাবস্যা, একাদশী, পূর্ণিমার উপোস করে কাটিয়ে দেন। পুরো খরচা বেঁচে যায় ওই দিনগুলোর।
ব্রজেনবাবু তেল কিনেন না বলে সাবানও কেনেন না, তা কিন্তু নয়। তিনি একটি ছোট্ট কাপড় কাচার সাবান কিনে প্রথমেই চলে যান মাছ বিক্রেতা ঘনার কাছে। ঘনার সুনাম আছে যে খুব ছোটো মাছও ঘনা যতগুলো পিস করতে বলা হবে ততগুলো করে দেবে। মাছ কাটা শেষ হলে ঘনা তার বঁটিতে সাবানটাকে বারো টুকরো করে দেয় যাতে এক-একটি টুকরো ব্রজেনবাবু এক-এক মাসে ব্যবহার করতে পারেন।
কিন্তু একবার এই সাবান নিয়ে একটা কাণ্ড হল। ব্রজেনবাবু যে থলিতে করে শেষ বাজারের ফেলে দেওয়া শাকসবজি ভরে নিয়ে আসছিলেন, তার মধ্যেই সাবানের টুকরোগুলো নিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন। বাড়ি ঢোকার মুখে রোয়াকের সামনে প্রতিবেশী মধু লোহারের সঙ্গে দেখা হয়ে যাওয়াতে থলেটা রোয়াকে রেখে মধুর সঙ্গে দুটো কথা বলছিলেন। মধুর সঙ্গে তার ছাগলটাও ছিল। সে সেই ফাঁকতালে থলের মধ্যে রাখা হাবিজাবি সবজির সঙ্গে সাবানও খেয়ে ফেলেছে। ব্রজেনবাবু যখন কথা শেষ করে থলিটা নিতে যাবেন, ততক্ষণে ছাগল সব সাবাড় করে দিয়েছে। ব্রজেনবাবু তো হায় হায় করে উঠলেন। তাঁর এক সপ্তাহের বাজার আর এক বছরের জন্য কেনা সাবান খেয়ে নিয়েছে, সে কি কম কথা! সামনেই ছিল মধু। মধুকে তিনি সঙ্গে সঙ্গে বলেন, “মধু, তোমার ছাগল আমার বাজারের সব শাকসবজি খেয়ে নিয়েছে। এর দাম আমি গুনে গুনে তোমার কাছ থেকে নেব—একশো দশ টাকা তিপ্পান্ন পয়সা। তোমার সুবিধার জন্য ওই তিন পয়সা ছেড়েই দিলাম। তুমি ওই একশো দশ টাকা পঞ্চাশ পয়সাই দিও। আর হ্যাঁ, তোমার ছাগল আমার সাবানও খেয়ে নিয়েছে; তাহলে হল গিয়ে সবসুদ্ধ একশো ষাট টাকা পঞ্চাশ পয়সা। কই দাও!” বলে হাত পাতেন ব্রজেনবাবু।
এতক্ষণ মধু একটাও কথা না বলে ব্রজেনবাবুর কথা শুনছিল। এবার সে বলল, “আমায় কি আপনি পাগল পেয়েছেন? আপনি বেলা শেষে বাজারে গিয়ে কানা বেগুন, পচা কুমড়ো আর পোকায় খাওয়া শাকপাতা নিয়ে আসেন আর তার দাম একশো দশ টাকা? ওর দাম দশ টাকাও হবে না। দোকানিরা তো এমনিতেই আপনাকে ওসব দিয়ে দেয়।”
মধু একটুও ভুল বলেনি। তাই ব্রজেনবাবু আমতা আমতা করে বলেন, “বেশ, ঠিক আছে। দিতে হবে না তোমায় সবজির টাকা। সে আমি তোমার ছাগলকে এমনিই খাওয়ালাম। কিন্তু তাই বলে ও সাবান খেয়ে নেবে?” অত্যন্ত রেগে গিয়ে বলেন ব্রজেনবাবু।
মধুও দমবার পাত্র নয়। সেও বলে, “কেন? আপনি শোনেননি? কথাতেই তো আছে—পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়!”
“তোমার ছাগল আমার সারাবছরের সাবান খেয়েছে, তাই তার দাম তোমাকেই দিতে হবে।”
“ফের বাজে কথা বলছেন? সারাবছরের সাবান? তার মানে আপনি বলতে চান যে আমার ছাগল বারো-চোদ্দটা সাবান খেয়ে নিয়েছে? আপনি নিজে কখনও একসঙ্গে এতগুলো সাবান দেখেছেন? কেনা তো দূরের কথা।” মধু ব্রজেনবাবুর দিকে কটমট করে তাকিয়ে থাকে।
ব্রজেনবাবুও ছেড়ে দেবার পাত্র নন। তিনিও বলেন, “হ্যাঁ, ছিল তো, ছিল। বারোটা পিস ছিল।” এটুকু বলেই তিনি চুপ করে যান।
এরই মধ্যে ব্রজেনবাবুর আর মধুর মধ্যে বচসা হচ্ছে দেখে ওখানে কিছু লোক জড়ো হয়ে যায়। তার মধ্যে মাছ বিক্রেতা ঘনাও ছিল। ঘনা হঠাৎ বলে ওঠে, “হ্যাঁ, ছিল তো, বারো পিস। ব্রজেনবাবু তো একটু আগেই আমাকে দিয়ে একটা সাবানের বারোটা পিস করিয়ে নিলেন।”
ব্রজেনবাবুর বারো পিসের রহস্য সবার কাছে ফাঁস হয়ে গেল। মধু হাসতে হাসতে ব্রজেনবাবুকে বলল, “দেখুন ব্রজেনবাবু, সাবান আমার ছাগল খেয়েছে, আমি তো খাইনি। আপনি যদি পারেন আমার ছাগলের কাছ থেকে সাবান আদায় করে নিন।”
এর পর থেকে ব্রজেনবাবু টানা এক মাস মধু ছাগল যখন পটি করত তখন গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তাঁর আশা ছিল যে যদি পটির সঙ্গে সাবানের টুকরোগুলো বেরিয়ে আসে! কিন্তু এক মাসেও যখন কিছু হল না, তখন তাঁর বিশ্বাস হল যে মধুর ছাগল তাঁর সাবান হজম করে ফেলেছে। তাঁর লোকসানের খাতায় তিনি সাবানের দশ টাকা লিখে রাখলেন আর মধুকে কীভাবে জব্দ করা যায় তার ফন্দি খুঁজতে লাগলেন।
এরপর একদিন সকালে রোজকারমতো বাজার বসেছে। যে-যার মতো বাজার করছে। ব্রজেনবাবু বাজারের যেদিকটায় রিকশা, টোটো স্ট্যান্ড সেখানে একটা মুদির দোকানের সামনে চাতালে দাঁড়িয়ে আছেন। মধু লোহার ওই মুদির দোকানেই মাসের বাজার করে। দোকানে ঢোকার মুখেই মধু ব্রজেনবাবুর মুখোমুখি। ব্রজেনবাবুকে দেখেই মধু ঠাট্টা করে বলে ওঠে, “কী ব্রজেনবাবু, বাজার হয়ে গেল? আপনার বাজারের থলি দেখছি না তো! এবারও কি…” বলতে না বলতেই ব্রজেনবাবু হঠাৎ মধুর ঘাড়ের ওপর অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। মধু ধরে না ফেললে ব্রজেনবাবু তো মাটিতেই পড়ে যেতেন। হতবাক মধু কী করবে ভেবে পায় না। চারদিক থেকে লোকজন ছুটে আসে। মুদির দোকানের দোকানি বলে, “চোখে-মুখে জল দাও, দেখো জ্ঞান আসে কি না।”
জল দিলেও কিছু লাভ হয় না, ব্রজেনবাবু যেমনকার তেমন পড়ে থাকেন। লোকজন পরামর্শ দেয় ব্রজেনবাবুকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে। মধু মনে মনে ভেবে দেখে যে বাজারে যে প্রাইভেট ডাক্তার বসেন, তাঁর কাছে নিয়ে গেলে ফি ব্রজেনবাবু কখনোই মধুকে ফেরত দেবেন না। ওইটুকু সময়ের মধ্যে মধু ভেবে নেয় যে একটু দূরে সদর হাসপাতাল, গাড়িতে করে গেলে দশ-পনেরো মিনিট লাগবে। ব্রজেনবাবুকে হাসপাতালে দিয়ে মধু চলে আসবে। এই ভেবে তাড়াতাড়ি মধু একটা টোটো ডেকে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে ব্রজেনবাবুকে টোটোতে ওঠায়। টোটোওয়ালা কুড়ি টাকা ভাড়া চায়। মধু মনে মনে ভাবে, যাক বাবা, কুড়ি টাকার ওপর দিয়ে গেল। এবার ব্রজেনবাবুকে হাসপাতালে ভরতি করে দিতে পারলেই তার দায়িত্ব শেষ।
হাসপাতালে পৌঁছে মধু টোটোওয়ালাকে বলে, “ব্রজেনবাবুকে ধরাধরি করে হাসপাতালের ভেতর নিয়ে যেতে হবে।”
বলতে না বলতেই মধু শোনে—“না হে মধু, তোমাদের আর ধরতে হবে না। এখন বেশ সুস্থ লাগছে। হাসপাতালে আর যেতে হবে না। পাশের গলিতেই আমার বন্ধুর বাড়ি। ওর বাড়িতেই দুপুরটা কাটিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর হেঁটেই বাড়ি চলে যাব।”
মধুর মুখে আর কথা সরে না। শুধু দেখে যে ব্রজেনবাবু পাশের গলির ভেতর দিব্যি কারও সাহায্য ছাড়াই নিজের পায়ে হেঁটে চলে গেলেন। কে বলবে যে একটু আগে তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন!
তবে আসল ঘটনা হল, ব্রজেনবাবুর সেদিন বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন ছিল। কিন্তু এত দূর গাড়িভাড়া দিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ব্রজেনবাবুর মোটেও ছিল না। ওদিকে এক বেলা বিনা পয়সায় একটু ভালোমন্দ খাওয়ার লোভ। শেষে ভেবে ভেবে এই ফন্দিটাই আঁটলেন ব্রজেনবাবু। মধু কখন দোকানে ঢুকবে, তা ব্রজেনবাবু আগে থেকেই লক্ষ রাখছিলেন। মধুর কাছ থেকে সাবানের টাকাও উদ্ধার হল, আর বন্ধুর বাড়ি নেমন্তন্ন খেয়ে এক বেলার খরচও বাঁচল।
এই ঘটনার পর থেকে মধু ব্রজেনবাবুকে দেখলেই আর সেদিকে যেত না।
জয়ঢাকের সমস্ত গল্প ও উপন্যাস