এই লেখকের আগের গল্প- একটা অদ্ভুৎ বিকেল, ভুলের ভবিষ্যৎ

“নাহ্, আমি আর পারছি না। সুইগি আর জোমাটোয় দুনিয়ার আমিষ খাবার অর্ডার করতে করতে আমার পকেটের অবস্থা সরকারি দপ্তরের ফাইলের মতো হয়েছে—ছেঁড়াফাটা, দেখেই বিবমিষা হয়।”
আমি চশমা ঠিক করতে করতে আড়চোখে মালপোয়ার দিকে দেখে নিলাম। নাহ্, তিনি চটির অর্ডার করা ফিস কবিরাজি সাঁটিয়ে এখন নাক ডেকে ঘুমোচ্ছেন। তার শ্বাসপ্রশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে তাল মিলিয়ে নাকের পাশের সাদা গোঁফগুলো ওঠানামা করছে। তারপর চটির দিকে তাকিয়ে গলার স্বর যথাসম্ভব কমিয়ে বললাম, “আস্তে কথা বল। মালপোয়া ভাগ্যিস ঘুমোচ্ছে, শুনতে পেলে ঠিক পিসিকে লাগাবে।”
চটি তড়বড় করে বলে উঠল, “ইল্লি রে! ওই ভয়ে পাক্কা দশদিন তেত্রিশ ঘণ্টা আমি ওর তোয়াজ করেছি, কিন্তু আর নয়। আমি কাউকে ভয় পাই না।”
ঠিক তখনই মালপোয়া ঘুমের মধ্যে ঘ্যাঁও (ম্যাও আর রাগ মিশিয়ে শব্দ) করে উঠল।
আমি চটির দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে দেখলাম, ওই একটা শব্দ শুনেই ও ভয় পেয়ে সুইগিতে মাছের কাটলেট অর্ডার করতে শুরু করে দিয়েছে। তারপর ভীষণ আস্তে প্রায় ফিসফিস করে বলল, “না মানে, এমনিই বলছিলাম আর কি। দীপুপিসির পেয়ারের বেড়াল তো আমাদেরও প্রিয়। ওকে আমরা খাওয়াব না তো কে খাওয়াবে?”
আমি চটির এহেন পরিবর্তনের দিকে চোখ ছানাবড়া করে তাকিয়ে বললাম, “একটু আগেই তো কীসব বলছিলি, ওর জন্য তোর সব টাকা শেষ…”
আমার কথা শেষ হবার আগেই চটি মালপোয়ার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে উত্তর দিল, “কখন বললাম বল তো? পিসি জার্মানি থেকে ফিরলে বলব। তুই কানে বেশি শুনছিস।”
আমি ওর দৃষ্টি অনুসরণ করে মালপোয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলাম। সে ঘুম থেকে উঠে কড়া চোখে চটির দিকে তাকিয়ে বসে বসে লেজ নাড়ছে। বুঝলাম, পিসির ভয়ে চটি তটস্থ। পাছে ওঁর প্রিয় বেড়ালিনী মালপোয়া ওর সব কথা পিসিকে লাগিয়ে দেয়, তাই ভয়ে এখন উলটো-পুরাণ গাইছে।
এই নিয়ে আর বেশি কথা এগোল না। দরজা খোলার শব্দে তাকিয়ে দেখি পেরেক ওর ল্যাপটপটিকে বগলদবা করে বিদ্যুৎগতিতে ঘরে এসে ঢুকল। তারপর ভীষণ উত্তেজিত গলায় বলে উঠল, “পিসি জার্মানি থেকে ভিডিও কল করেছে!”
এ-কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে আমরা তিনজনে মালপোয়ার দিকে তাকালাম। দেখি, সে টুকটুক করে উঠে এসে ল্যাপটপের সামনে এসে বসল। ততক্ষণে স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে পিসির ছবি। পিসির পেছনের দৃশ্য দেখে মনে হচ্ছে কোনও ট্রেনের কামরায় বসে। পিসি পান চিবাতে চিবাতে মালপোয়াকে বলল, “ওরা তোর ঠিকমতো খেয়াল রাখছে তো?”
মালপোয়া তার নাকের পাশের দুধসাদা গোঁফ নাড়িয়ে কড়া চোখে একবার আমাদের দেখে নিল। আমরা তখন শ্বাস আটকে বসে। মালপোয়ার রিপোর্টের ওপর নির্ভর করছে দীপুপিসি আমাদের কী শাস্তি দেবেন। তবে আমাদের সমস্ত আশঙ্কাকে ভুল প্রমাণ করে মালপোয়া হ্যাঁ-সূচক ‘ম্যা’ ডাক দেওয়ার পর আমরা তিনজনেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।
পাক্কা চার মিনিট মালপোয়ার সঙ্গে কথা বলার পর পিসি আমার দিকে তাকিয়ে ডান ভ্রূ ওপরের দিকে তুলে অল্প হেসে বলল, “বুইলি ঠোঙা, এবার কলকাতায় ফিরে আগে ভীমনাগের রসগোল্লা খেতে হবে। এখানকার লোকজন কেমনতরো, মানে সবই ঠিক আছে, তবে মিষ্টি খেয়ে একদম সুখ নেই।”
ততক্ষণে আমাদের পেটের মধ্যে কোল্ডড্রিংক ঝাঁকানোর মতো অনেক প্রশ্ন ভুসভুসিয়ে উঠছে। চটি পেছন থেকে বলে উঠল, “দীপুপিসি, তোমার সিক্রেট এজেন্টের কাজ কেমন চলছে বলো আগে। কিছু সন্ধান পেলে?”
দীপুপিসি মুহূর্তের মধ্যে রাগে লাল হয়ে গেল। রেগে গিয়ে পানের পিক ফেলার বদলে ঢক করে গিলে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ঠোঙা, কলকাতা ফিরে এই অলপ্পেয়ে চটিকে আমার বাড়িতে আর ঢুকতে দেব না। শুধু তুই, আমি, পেরেক আর মালপোয়া। গোপনীয়তা কবে শিখবে ও?” তারপর নিজের বুরুশের মতো কদমছাঁট চুলে হাত বুলিয়ে আবারও বলল, “পেরেক, আমার ফেরার দিন এখনও জানি না, তবে ফিরেই তোদের নিয়ে বসব।”
তারপর আমাদের আর কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়ে ধাঁ করে ভিডিও কল অফ করে দিল।
চটি স্বগতোক্তি করল—”বেড়ালের সঙ্গে চার মিনিট কথা বলল আর আমরা মাত্র দেড় মিনিট!”
আমি কনুইয়ের ইশারায় ওকে চুপ করতে বললাম। এই কথা মালপোয়া শুনতে পেলে আর রক্ষে নেই। পিসি সত্যি-সত্যিই ‘চটি বিদায়’ করবে।
আমরা আগেই জানতাম, পিসি কোনও একটি সিক্রেট মিশনে জার্মানিতে গেছে। সেখান থেকে ভীষণ সিকিউর লাইনে সামান্য সময়ের জন্য কল করেছে। আমাদের জন্য নয়, তার প্রিয় পোষ্য মালপোয়া কেমন আছে, দীপুপিসির অবর্তমানে আমরা ওঁর বেড়ালীনির ঠিকঠাক খেয়াল রাখছি কি না—নিজের চোখে সেটা দেখাই ওর উদ্দেশ্য।
হাজার হাজার মাইল দূরে পিসি এখন কী করছে, কবে ফিরবে আর কবে আমরা পিসির এই নতুন অভিযানের গল্প শুনব—সেই আলোচনায় আমরা মশগুল হয়ে উঠলাম।
।।১।।
“পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য! সেটা আবার কী?” আমি চশমা ঠিক করতে করতে বিস্ময়ে বলে উঠলাম।
“হু হু বাওয়া, তবে আর বলছি কী!”
কথা হচ্ছিল দীপুপিসির বাড়ির বৈঠকখানায় বসে। ওই ভিডিও কলের পনেরো দিন পর গতকাল রাতে পিসি কলকাতায় ফিরেছে। আজ সকাল থেকেই আমরা তিনজন মধুতে পিঁপড়ে লাগার মতো পিসির পেছনে ঘুরছি—কতক্ষণে লোমহর্ষক অভিজ্ঞতা শুনব! শেষমেশ দুপুরে চাট্টি ভাত উদরস্থ করে, শেষ পাতে পিসি দশটা ভীমনাগের রসগোল্লা খেয়ে পাত্রে পড়ে থাকা মিষ্টির রসের পুরোটা চুমুক দিয়ে খেতে খেতে কথাগুলো বলল। আমরাও ততক্ষণে গুছিয়ে বসেছি পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্যের কাহিনি শোনার জন্য।
দীপুপিসির এই বৈঠকখানাটির প্রতিটি কোনায় সাজানো রয়েছে দেশি-বিদেশি বহু জিনিস। এগুলোর বেশিরভাগই পিসি অভিযান করতে গিয়ে পেয়েছে। আবার কিছু কিছু সেইসব দেশের সরকার প্রদত্ত পুরস্কারও রয়েছে। গতবার মিশর অভিযানে অলৌকিকভাবে পিসি মালপোয়াকে পেয়েছিল, সেই ইস্তক ও আমাদের হাড় মাস জ্বালিয়ে খাচ্ছে। সেইসব দেখতে দেখতে ভাবছিলাম, এইবারের অভিযানে পিসি কী সঙ্গে করে এনেছে।
“রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ শহরের বাইরে সারস্কোয়ে সেলো স্টেট মিউজিয়ামে একটি অ্যাম্বার রুম আছে। পঁচিশ বছর ধরে প্রায় বারো মিলিয়ন ডলার খরচ করে রাশিয়ায় এটি নতুন করে তৈরি করা হয়।” এতটুকু বলে পিসি একটু চুপ করে থাকল। তারপর আবার বলল, “এখন তোদের মনে প্রশ্ন জাগছে, অ্যাম্বার রুম কী? নতুন করে তৈরি করার মানে কী?”
তারপরই ক্রুদ্ধ চোখে পেরেকের দিকে তাকাল। আমরা দুজন পিসির দৃষ্টি অনুসরণ করে ওর দিকে তাকিয়ে দেখি ও মোবাইল ঘাঁটছে। আমি পেরেককে থামানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু তার আগেই পিসি হুংকার দিলে বলে উঠল, “আমার গল্প শুনতে এসে তোরা যদি গুগল করে সব জেনে যাবি তবে এখনই দূর হ!”
পেরেকের ইহজীবনে আর কিছুই হবে না, ওকে আমরা আজকের পরই ত্যাগ করব—আমি আর চটি এই সমস্ত বিভিন্ন শাপশাপান্ত করার পর পিসিকে শান্ত করলাম। তারপরও পিসিকে তিন খিলি মিঠাপাতার পান খাইয়ে তবে আবার গল্প শোনাতে রাজি করানো গেল।
পিসি মালপোয়াকে কোলে নিয়ে গুছিয়ে বসে আবার গল্প শুরু করল।
“এই অ্যাম্বার চেম্বারের ইতিহাস বলার আগে কী এই অ্যাম্বার সেটা আগে বলে নিই। বড়ো গাছের গায়ে আঘাত লাগলে বাকল কেটে সাদা, বাদামি বা লাল রঙের একরকম রস নিঃসৃত হয়। সূর্যতাপে এর উদ্বায়ী অংশটুকু বাষ্পীভূত হয়ে গেলে যা পড়ে থাকে তা বহুবছর ধরে আস্তে আস্তে জমাট বেঁধে ফসিলের রূপ নেয়। এই প্রাকৃতিক অ্যাম্বর একটি দুষ্প্রাপ্য জিনিস। আর এই অ্যাম্বারের সঙ্গে বিভিন্ন দুর্মূল্য হিরেমানিক দিয়ে প্যানেল তৈরি করে সাজানো হয়েছিল সেই সময়কার অ্যাম্বার রুম। এই অ্যাম্বার চেম্বারের একটা সুদীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেটা তোদের অন্যদিন শোনাব। আজ বলব সেই অভিযানের কথা।”
ততক্ষণে আমরা দীপুপিসির কাছে আরও ঘন হয়ে বসেছি। নিজেদের বুকের লাবডুব শব্দ নিজেরাই শুনতে পাচ্ছি।
“গভীর রাতে ফ্রাঙ্কফুর্ট এয়ারপোর্টে যখন নামলাম তখন ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। আমার হোটেলের ঘরে সকালে যখন মুখের ওপর রোদ এসে পড়ল তখন ঘুম ভাঙল। তখনই ইন্টরকমে জানাল আধঘণ্টার মধ্যে তৈরি হতে হবে। গাড়ি এসে আমায় এই অভিযানের অন্য সদস্যদের কাছে নিয়ে যাবে। আমিও তৈরি হয়ে নিলুম। এক খিলি পান চিবুতে চিবুতে গাড়ি চাপলুম।”
“পিসি, তুমি ওখানে পান নিয়ে গিয়েছিলে বুঝি?” পেরেকের চোখে বিস্ময়।
দীপুপিসি ওঁর চোখ দুটো বড়ো বড়ো করে উত্তর দিল, “আমি মহাকাশে পর্যন্ত পান ছাড়া চলি না, আর এ তো নস্যি!” তারপর আবার বলতে শুরু করল, “জার্মানির বার্লিনে হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়ামের মধ্যে আমাদের এই মিটিং ডাকা হয়েছিল। রাস্তায় যেতে যেতে অ্যাম্বার চেম্বারের হারিয়ে যাওয়ার ইতিহাস নিয়ে ভাবছিলাম।”
আমি থাকতে না পেরে বললাম, “বলো কী! গোটা চেম্বারটা হারিয়ে গিয়েছিল—এ কি ভোজবাজি?”
পিসি তাঁর কদমছাঁট চুলে হাত বুলিয়ে বলল, “চব্বিশ বছর ধরে এক কোটি কুড়ি লাখ ডলার খরচ করে এই চেম্বার বানানো হয়েছিল। যাকে বলে কুবেরের ধন। এর সৌন্দর্য, আভিজাত্য ছিল আলাদা। সেইজন্যই তো একে পৃথিবীর অষ্টম আশ্চর্য বলা হত।
“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে জার্মানির নাৎসি বাহিনী একের পর এক দেশ লুঠ করছিল। তাদের উদ্দেশ্য ছিল জাদুঘর ও দুষ্প্রাপ্য জিনিস নিজেদের এক্তিয়ারে নেওয়া। ক্রমে জার্মান বাহিনী সোভিয়েত ইউনিয়নের সেন্ট পিটার্সবার্গে পৌঁছল। ওদের টার্গেট ছিল অ্যাম্বার রুম। অ্যাম্বার রুমের কিউরেটর সেই সময় একটা ভুল করেছিল। সেই ভুলটা না করলে হয়তো আজ অ্যাম্বার রুম এভাবে হারিয়ে যেত না।”
আমরা প্রায় সমস্বরে বললাম, “কী ভুল, পিসি?”
পিসি একটু চুপ করে থাকার পর উত্তর দিল, “উনি অ্যাম্বার চেম্বারের প্যানেলগুলো খুলতে পারলেন না, পরিবর্তে ওটাকে সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন এভাবে জার্মানদের চোখকে ধুলো দিতে পারবেন। কিন্তু ওরা তো জার্মান। এক নিমেষে এই কায়দা ওরা ধরে ফেলল। তারপর যে প্যানেল তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন খুলতে অপারগ ছিল সেটি তারা অবলীলায় মাত্র ছত্রিশ ঘণ্টায় খুলে বাইশটি সিন্দুকে ভরে ফেলেছিল। সেখান থেকে সিন্দুকগুলি কিং ক্যাসেলে আনা হয়েছিল। তারপর কিন্তু সেই সিন্দুকের আর কোনও হদিস পাওয়া যায়নি।”
“বলো কী! এত ধনসম্পত্তি রাতারাতি উবে গেল?”
পেরেকের প্রশ্নে পিসি উত্তর দিল, “সেই হারিয়ে যাওয়া অ্যাম্বার চেম্বারের হদিস পেলাম পঁচাত্তরের বছর পর। হেলমেট গানজেল হলেন পূর্বতন জার্মান গুপ্তচর। উনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ের একজন জার্মান সেনার লেখা গুপ্ত চিঠি থেকে জেনেছিলেন, জার্মানির ডরসনডফ শহরে তিন কিলোমিটার লম্বা খনির মধ্যে চারটি সিন্দুক ভরতি অ্যাম্বার চেম্বার লুকানো রয়েছে। হেলমেট গানজেল, আমি, একজন আর্কিওলজিস্ট—তাঁর নাম পিটার আর দুজন খোঁড়াখুঁড়ি করার লোক নিয়ে রওনা দিলাম ডরসনডফের উদ্দেশে। মনে রাখতে হবে, এটা জার্মানির একটি টপ সিক্রেট মিশন। এর ওপর অনেকগুলো দেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ভর করছে।”
আমি রুদ্ধশ্বাসে দীপুপিসিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর? তোমরা সেই কুবেরের সম্পত্তি খুঁজে পেলে?”
পিসি আর এক খিলি পান মুখে দিয়ে আয়েশ করে চিবাতে চিবাতে বলল, “সেটাই এবার বলব তোদের।”
।।২।।
“আমরা যে এটা নিয়ে কতটা উত্তেজিত ছিলাম তা তোদের বলে বোঝাতে পারব না। তখন শীতের শুরু। জার্মানির ডরসনডফ শহরটির পাহাড়ের গায়ে গায়ে বাতাসের মতো সবুজ ঘাস লেগে রয়েছে। ছবির মতো সুন্দর শহরটার পশ্চিমপ্রান্তে সেই খনিটার সামনে গিয়ে যখন দাঁড়ালাম, তখন দুপুরের সফর শেষ করে সূর্য তার ব্যস্ততার ঝুলি মিশিয়ে দিচ্ছে বিকেলের আকাশে। চুনাপাথরের তৈরি খনিটির ভেতরের অসীম অন্ধকার—দেখে মনে হচ্ছিল, বুঝি এখনই অ্যাম্বার চেম্বারের ধনরত্ন আলো হয়ে জ্বলে উঠবে। আমরা চারজন খনির মধ্যে প্রবেশ করলাম। আমাদের সঙ্গে রইল বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ করার একমাত্র উপায় ওয়াকিটকি। এটার সিগনাল খনির অনেক ভেতরে প্রায় নেই বললেই চলে। ক্রমে চলতে চলতে একসময় বাইরের আলো শেষ হয়ে গেল। আমাদের মাথায় হেলমেটের সঙ্গে জ্বলতে থাকা আলোর হলুদ রঙ অনুসরণ করে আমরা এগিয়ে চললাম। এইভাবে দীর্ঘ এক কিলোমিটার পথ চলার পর আমরা যখন ক্লান্ত, ভাবছি ফিরে যাব বা অন্য পথে যাব কি না, ঠিক তখনই…”
গল্পের এই জায়গায় এসে পেরেক বলে উঠল, “আরে পিসি, তুমি তো রোজ পাঁচ কিলোমিটার হাঁটো। ওখানে এক কিলোমিটার হেঁটে ক্লান্ত হয়ে পড়লে?”
পিসি পেরেকের দিকে ভ্রূতে গিঁট ফেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর খিঁচিয়ে বলে উঠল, “ওরে ছোঁড়া, তোর বুদ্ধি আর কবে হবে র্যা? সোজা রাস্তায় পাঁচ কিলোমিটার হাঁটা আর অমন অন্ধকারের ভেতর ওইভাবে কুঁজো হয়ে হাঁটা এক হল? ইডিয়েট একটা!”
তারপর পেরেকে হাতুড়ি ঠোকার মতো ওর মাথায় একটা রামগাঁট্টা বসিয়ে দিল। তারপরই যেন কিছুই হয়নি এমন মুখ করে পিসি আবার বলতে শুরু করল, “খনির বিভিন্ন শাখাপ্রশাখা আর তাদের ততোধিক সরু আর নীচু রাস্তা দেখে আমরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছিলাম। এভাবে দিকভ্রান্তের মতো বেশ কিছুক্ষণ চলার পর আমরা এমন একটা জায়গায় গিয়ে পৌঁছলাম যেখানে প্রচুর ঝুরো পাথর পড়ে রয়েছে। জায়গাটার আশপাশ দিয়ে প্রচুর শাখা এঁকে-বেঁকে ছড়িয়ে রয়েছে। আমাদের আর্কিওলজিস্ট বন্ধু পিটার জানালেন, এই জায়গার পাথর বেশ অন্যরকম। আমার একটু আগে থেকেই সন্দেহ হচ্ছিল। কারণটা অবশ্য অন্য। আমি হাঁটতে হাঁটতে একজায়গায় ব্রোঞ্জ কানেকটারের অংশ পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। এটি অ্যাম্বার রুমের প্যানেলগুলো জুড়বার জন্য ব্যবহার করা হত।
“আমি হেলমেটকে বললাম এখান থেকে খনির ওপরে সিগন্যাল পাঠাতে। এই অংশটিকে প্রথমে খনির বাইরে থেকে চিহ্নিত করতে হবে, না-হলে পরবর্তী সময়ে জায়গাটিকে সনাক্ত করা মুশকিল হবে। আমাদের দুজন সহযোগী প্রচুর চেষ্টা করেও বাইরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারল না। কারণটা আগেই বলেছি। আমরা কিছুক্ষণ সিগন্যাল পাঠানোর চেষ্টা করলাম, তারপর সেই চেষ্টা বন্ধ করতে হল। ততক্ষণে স্মার্ট ঘড়ির কাঁটা জানান দিচ্ছে, বিকেল পাঁচটা বেজে গেছে। আমাদের ছয়টার মধ্যে খনির বাইরে বেরোতে হবে। ওখানে এটাই নিয়ম। পরের দিন আবার যাওয়া যাবে, কিন্তু আমরা যদি এখন জায়গাটা ছেড়ে দিই তবে কাল হয়তো চিনতে পারব না। আর তাছাড়া, গুপ্তধনের এত কাছে এসে এখন এভাবে ফিরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না।
“আমরা সকলে নিজেদের মতো করে খোঁজা শুরু করলাম। আমি খনির দেওয়াল ধরে বাঁদিকে একটু এগোতেই ডানদিকের মেঝেটা কেমন যেন একটু অদ্ভুত লাগল। পেট্রোম্যাক্সের আলোয় দেখলাম, মনে হল, জায়গাটা যেন পরে বানানো হয়েছে। মেঝের ওপর উবু হয়ে বসে পড়লাম। তখন উত্তেজনায় আমি আমার বাকি মেম্বারদের ডাকতেও ভুলে গেছি। ধুলো আর নোংরার মোটা আস্তরণ ঘাঁটতে ঘাঁটতে হঠাৎ একটা আংটার মতো জিনিস আমার হাতে ঠেকল। আমি ওটা ধরে দিলাম এক টান।”
এবার মালপোয়া পিসির কোলে বসে উৎসুক গলায় বলে উঠল, “ম্যাও।”
পিসি ওকে আদর করতে করতে বলল, “সেটাই তো বলছি সোনা।”
আমি কনুইয়ের খোঁচা খেয়ে তাকিয়ে দেখি পেরেক দুঃখী মুখে আমাকে ফিসফিস করে বলছে, “কিছু জিজ্ঞেস করলে পিসি আমাদের দাঁত খিঁচায়। আর মালপোয়াকে…”
আমি ওকে চোখের ইশারায় চুপ করতে বললাম। এখন যদি পিসি দেখে পেরেক মালপোয়ার নামে আমার কাছে অভিযোগ করছে, এক্ষুনি কেলেংকারি বাধবে।
পিসি আবার গল্পে ফিরে গেল।—”টান তো দিলাম। তারপরই ঘটল আশ্চর্য কাণ্ড! মাটি ফুঁড়ে চারটে ইয়া লম্বা আর তেমনই চওড়া সিন্দুক আমার সামনে বেরিয়ে এল। আমি কোনোমতে একটা সিন্দুকের ডালা খুললাম। তাতে আমার মাথার বাল্বের আলো পড়তেই আমার চোখ ধাঁধিয়ে গেল। এত অ্যাম্বার দেখে কয়েক সেকেন্ডের জন্য আমি তন্ময় হয়ে গিয়েছিলাম। বুঝতে পারিনি পুরো চত্বরটা জুড়ে মাটি কাঁপতে শুরু করেছে। আসলে আমরা চারজনই খনির এই জায়গায় এসে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছিলাম যে কারও কথা মনে ছিল না।
“আমি কয়েক সেকেন্ড ওইভাবেই দাঁড়িয়ে রইলাম। ততক্ষণে খনির মধ্যে সিন্দুকের ওপর পাথর পড়তে শুরু করে দিয়েছে। আমার সামনের সিন্দুকের খোলা ডালার মধ্যে ছোটোবড়ো পাথর পড়তে শুরু করে দিল। আমার চোখের সামনে মহামূল্যবান অ্যাম্বার টুকরো টুকরো হয়ে যেতে লাগল। খনির ভেতরে পেট্রোম্যাক্স আর আমার হেলমেটের অপ্রতুল আলোয় দেখলাম, অ্যাম্বারের মধ্যে আটকানো মণিমাণিক্য চারদিকে ছড়িয়ে যেতে শুরু করেছে। আমার অবস্থা তখন পাগলের মতো! হাতের মধ্যে এমন কুবেরের ধন পেয়েও এভাবে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে—এটা ভাবতে ভীষণ কষ্ট হচ্ছিল। প্রচণ্ড ধুলো আর অন্ধকারের মধ্যে ডুবে যেতে যেতে আমি আবিষ্কার করলাম, আমার পেছনে একটা বড়ো চাঁই ভেঙে পড়ছে।”
।।৩।।
“পিসি, তুমি তখন কী ভাবছিলে? মরে যাওয়ার ভয় করছিল?” আমি শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করলাম।
পিসি মুচকি হেসে উত্তর দিল, “আমি কখনও মরতে ভয় পাই না। তবে আমার স্বপ্নের অ্যাম্বারের এইরকম অবস্থা দেখে চোখে জল এসে গিয়েছিল। সেই ভয়ংকর সময়ে মাথা ঠান্ডা রেখে পাথরের বড়ো চাঁইটার ওপর দিয়ে একটা লাফ দিলাম। মনে মনে ভাবলাম, হয় এসপার, নয় ওসপার হবে। আমার মনে হয়, যাঁরা ওই সিন্দুক বোঝাই অ্যাম্বার ওখানে ওভাবে লুকিয়েছিলেন তাঁরা চাইতেন না এটা কখনও বাইরে যাক। তাই ওভাবেই মরণফাঁদ বানিয়ে রেখেছিলেন। যদি কেউ ওই সিন্দুকের সন্ধান পেয়েও যায়, তবুও সে সেটি উদ্ধার করতে সক্ষম হবে না। যাই হোক, ঠিক সময়ে লম্বা লাফটা দেওয়ার কারণে কোমরে চোট পেলেও এ-যাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেছি বলতে পারিস।”
এতদূর শুনে পেরেক উদাস গলায় বলে উঠল, “শেষ পর্যন্ত তাহলে সেই দুষ্প্রাপ্য জিনিস কালের অতলে চিরকালের জন্য তলিয়ে গেল? তোমাদের এত চেষ্টা সবই বিফলে গেল?”
পিসি এই কথার কোনও উত্তর না দিয়ে আমাদের দিকে তাকিয়ে জুলজুল চোখে মিটিমিটি হাসতে লাগল। পিসির এই হাসির মানে আমরা বিলক্ষণ জানি। গতবার মিশর অভিযানে অলৌকিকভাবে পিসি যখন একটি মমিকে মশারি সাপ্লাই দিয়ে রিটার্ন গিফট হিসাবে মালপোয়াকে বাড়িতে খুঁজে পেয়েছিল, তখন পিসি এমন করে হেসেছিল।
আমরা রুদ্ধশ্বাসে পিসির দিকে তাকিয়ে রইলাম। তারপর দীপুপিসি তাঁর জামার পকেটে হাত ঢুকিয়ে যেটা বার করে আনল তা দেখে আমাদের চোখ কপালে ওঠবার জোগাড়! পিসির হাতের পাতার ওপর একটা মুরগির ডিমের সাইজের রুবি! বিকেলের শেষ আলো রুবিটির মধ্যে পড়ে তৈরি করছে এক অপূর্ব রঙের ছটা।
আমরা তিনজন সমস্বরে বলে উঠলাম, “কেমন করে পেলে?”
এমনকি মালপোয়া পর্যন্ত দেখি উত্তেজিত হয়ে ম্যাও ম্যাও করে ডাকছে আর ঘন ঘন লেজ নাড়ছে!
পিসি তার শুঁয়োপোকার মতো মোটা কালো ভ্রূ নাচিয়ে উত্তর দিল, “হু হু বাওয়া, এটা সেই বিস্ফোরণের ফল। অ্যাম্বার আর সোনা, মাণিক্য-ভরতি বাক্সটা থেকে ছিটকে যখন সবকিছু বাইরে বেরিয়ে আসছিল, তখন জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে সিন্দুকের মধ্যে হাত ঢুকিয়ে মুঠো-ভরতি করে জিনিস তুলে নিয়েছিলাম। তারপর সেগুলো সন্তর্পণে আমার ঢাউস বুক পকেটে পুরে নিয়েছিলাম। তার মধ্যে এই অপূর্ব রুবিটি ছাড়াও বেশ কিছু দুর্মূল্য অ্যাম্বার, লাল হিরে, পদ্মনীলা, সোনার টুকরো ছিল। এর মধ্যে দুর্লভ লাল হিরের প্রতি ক্যারেটের দামই প্রায় ১০ লক্ষ মার্কিন ডলারেরও ওপরে। আর এটির অ্যান্টিক দামের কথা তো ছেড়েই দিলাম। এই রুবিটি বার্লিনের হিস্টোরিক্যাল মিউজিয়ামের তরফ থেকে আমার জন্য সৌজন্য পুরস্কার স্বরূপ পেয়েছি।”
আমরা তখন আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়েছি। রুবিটিকে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখার জন্য আমাদের মধ্যে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। এর মধ্যে পেরেক দীপুপিসিকে জিজ্ঞেস করল, “পিসি, এখন এই রুবিটা নিয়ে কী করবে? এটা নিশ্চয়ই তোমার বৈঠকখানার শোভাবর্ধন করবে?”
পিসি আনন্দে চোখ দুটো ভীমনাগের রসগোল্লার থেকেও সাইজে বড়ো করে উত্তর দিল, “ওটা আমি মালপোয়ার গলায় মালার লকেট করব। ও এটা মাঝে মাঝে পরবে।”
এই বলে পিসি মিষ্টি হেসে মালপোয়ার দিকে তাকাল, আর সঙ্গে সঙ্গে আমরা অবাক হয়ে দেখলাম, মালপোয়াও অম্লানবদনে আনন্দে ‘ম্যাও’ বলে ঘাড় নেড়ে দিল।
(রাশিয়ার বিখ্যাত ও ঐতিহাসিক অ্যাম্বার চেম্বারের ঘটনা অবলম্বনে গল্পটি লেখা।)
ছবি-জয়ন্ত বিশ্বাস