কল্যাণ সেনগুপ্তের আগের গল্প বংশীধরের বিপদ, শুধু কথা, পাসওয়ার্ড, ঠাকুমা, হনুমানের চিকিৎসা , নম্বর

অনেকদিন বাদে মালদায় মামার বাড়ি আমের টানে এসেছে সন্দেশ। এসে দেখে মিনি আর গাবলু একটু লম্বা হয়েছে। গাবলুই প্রথম গর্ব করে বললে, “জানিস, এখানে খুব চোরের উপদ্রব। কিন্তু আমাদের পাড়ায় নেই।”
সন্দেশের উৎসাহের শেষ নেই। বললে, “তোরা কি চোর ধরার যন্ত্র বসিয়েছিস?”
“ইয়েস।”
“কই, দেখা?”
মিমি বললে, “চল দেখাচ্ছি।”
দুপুরবেলা শোবার ঘরে টান টান হয়ে হারুমামা। বুকের ওপর দুটো হাত। প্রথম প্রথম শব্দ হচ্ছে, যেন জল গরম হচ্ছে ইলেকট্রিক কেটলে। আস্তে আস্তে বুরু, বুরু, তারপর থেমে শুরু হল নতুন তালে – ঘড়ৎ, ঘড়ৎ, ফো। ঘড়ৎ, ঘড়ৎ ফো। জোর বাড়ছে। বাড়ছে। ঘরময় ঘড়, ঘড়। আর তারপর হঠাৎ কে কে বলে চিৎকার, ধড়মড় করে হাত-পা নড়ে উঠল। প্রায় উঠে পড়ে আর কি। চোখ খুলে গেল। দু-হাতে মুখের লালা মুছে চারদিক একবার তাকিয়ে ফের পাশ ফিরে শুলেন মামা।
কিছুক্ষণ চুপচাপ। একটু পরেই দ্বিতীয় পর্ব শুরু – বুরুক, বুরুক।
মিনি পর্দা ধরে হাসতে হাসতে ঝুলে পড়ে মাটিতে। বলে, “রাত্রের আসল পারফরম্যান্সটা অবশ্য আমরা খুব বেশি দেখতে-শুনতে পাই না। সেটা নাকি হুলুস্থুল কামান দাগা ব্যাপার। তাই রাত্রে আমি, দাদা, মা সবাই কম জল খাই।”
সন্দেশ অবাক।—“কেন রে? এখানে কী রহস্য?”
“তাহলে রাত্রে ঘুম ভেঙে বাথরুমে যেতে হবে না। এক ঘুমেই সকাল। ওতে পিলে চমকানো নাক ডাকাটা ঘুমে চাপা পড়ে যায় আর কি।”
***
ছুটির শেষে হারুমামা চলল সন্দেশকে নিয়ে কলকাতায়। মালদা থেকে রাত্রের ট্রেন। উলটোদিকের বার্থের তিনজনই মিলিটারি হাবিলদার। একটু গম্ভীর প্রকৃতির। তবে হারুমামাকে রুখবে এমন সাধ্য কার! নিমেষে জমিয়ে ফেললে। প্রথমে ভাঙা হিন্দিতে শুরু করেছিল। তা খানিক বাদে হাবিলদাররা বললে, “বাংলায় বলুন। আমরা কুচবিহারের বাঙালি তিনজনই। আমি সুবল দাস, আর বাকিরা দীপক বেরা, জীবন দত্ত।”
মামা সঙ্গে সঙ্গে বাংলায় ফিরে এসে হাঁপ ছেড়ে বললে, “কী ভয়ই পেয়েছিলাম স্যার, কী বলব। হিন্দি বলা কি অতই সোজা?” তারপর সন্দেশের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে, “বুঝলি, কী কঠিন জীবন এঁদের! এই যুদ্ধ করছেন, ওই লোক সামলাচ্ছেন, পরমুহূর্তে বন্যায় ঝাঁপিয়ে পড়ছেন। ওফ্! আপনারা হচ্ছেন রিয়াল হিরো, দাদা।”
সুবল দাস গাম্ভীর্য সরিয়ে হালকা হেসে বলেন, “আপাতত কাশ্মীরে পোস্টিং। এখন অবশ্য যুদ্ধ হচ্ছে না, তবে যে-কোনোদিন যেতে হতে পারে।”
শুনে মামা বললে, “আপনাদের কথা ভেবেই শিহরন দিচ্ছে স্যার। দারুণ ব্যাপার। তা, ফ্রন্টে থাকাকালীন স্নান, খাওয়া, ঘুম কী করে হয়? সবসময় তো টেনশন।”
জীবন দত্ত এতক্ষণ জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন। এবার মুখ ঘোরালেন।—“সে একটা ব্যাপার মশাই। এমনও হয়েছে স্যান্ডউইচ খাচ্ছি তাবুর মধ্যে, হঠাৎ চিৎকার এল বাইরে থেকে ‘এনিমি, এনিমি’। ব্যস, বন্দুক হাতে বাইরে। মুখে স্যান্ডউইচ, হাতে বন্দুক। তারপর ঢ্যা, ঢ্যা, ঢ্যা।”
সন্দেশ আর হারুমামার চোখ গোল গোল, ভুরু কপালের ওপরে।—“সে আবার কী—ঢ্যা ঢ্যা ঢ্যা?”
“ওরা হচ্ছে ফায়ারিং।”
“বলেন কী! দারুণ উত্তেজনার তো! আগে জানতাম স্যান্ডউইচ অন ফায়ার, এখানে দেখছি স্যান্ডউইচ উইথ ফায়ার।”
জীবন দত্ত মাথা নেড়ে বললেন, “তবে কিনা বেশি উত্তেজনাও মুশকিল। দিনের পর দিন স্নান নেই, খাওয়াদাওয়া নামমাত্র।”
হারুমামার মুখ আমসি।—“কী খান?”
জীবন দত্ত সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন, “শুকনো স্যান্ডউইচ আর কফি।”
“ব্যস? আর কিছু না?” করুণ মুখে সন্দেশ তুমিতে নেমে আসে।—“তোমরা ভাত খাও না?”
“না ভাই, ভাত খাওয়া সেই বাড়ি এলে।”
“বরফ দেখতে পাও?” সন্দেশ জিজ্ঞাসা করে।
“আরে, বরফের ওপরই থাকি বেশিরভাগ সময়।”
এরপর মোক্ষম প্রশ্ন করল মামা, “আপনারা তাহলে ঘুমোন কেমন করে মশাই? এত উৎপাতে…”
কথাটা শেষ করার আগেই ধরে ফেলেন সুবল দাস।—“ঘুম এমন জিনিস যে শত গুলি-গোলার মধ্যেও ঠিক চলে আসে। না ঘুমালে তো শরীর চাঙ্গা থাকবে না। শেষে শত্রুর সামনে বন্দুক হাতে করেই ঘুমিয়ে পড়তে হবে। আর তাহলেই গেল সব, গুবলেট। সে একটা বিশ্রী ব্যাপার হবে। বলব কী, ফ্রন্টে দুরুম-দারাম শুনে এমনই অভ্যেস হয়েছে যে মাঝে মাঝে গুলি-গোলার আওয়াজ না পেলে ঘুম আসতেও দেরি হয়।”
“সে কি!” মামা উত্তেজিত।—“আমরা তো গুলি-গোলার শব্দে ঘুমোতেই পারব না। কেবল মনে হবে, এই বুঝি এনিমি চলে এসে বন্দুকের খোঁচা দিচ্ছে।”
“সেরকম ভাবলে চলবে কেন?” জীবন দত্ত দারুণ একগাল বিজ্ঞের হাসি হাসেন। তারপর বলেন, “যান, শুয়ে পড়ুন এবারে।”
আলো নিভিয়ে মামা আর সন্দেশ শুয়ে পড়ে।
ভোর ভোর ঘুমটা ভাঙ্গে সন্দেশের। নীচের বার্থে মামা যেন লোকাল ট্রেন। হালকা গুটুর গুটুর শব্দ করেই চলেছে। কিন্তু… সামনের বার্থে এ কী কাণ্ড হাবিলদার আংকলদের? চোখ ছানাবড়া করে লাফ দিয়ে নীচে নামে সে।—“মামা ওঠো, মামা ওঠো।”
ধাক্কাধাক্কিতে মামা ধড়মড় করে উঠে বলে, “এসে গেছে?” তারপর চোখ যায় সামনে।— “এ কী রে! ওঁদের এরকম করে কে বাঁধল? সর্বনাশ।”
নীচে তিন হাবিলদার সোজা হয়ে বসে। এর ওর কাঁধে মাথা। নাক, মুখ, কান রুমাল দিয়ে বাঁধা। হারুমামা কুঁই কুঁই করে বলতে থাকে, “নিশ্চয়ই ডাকাত পড়েছিল।” বলে নীচে তাকায় সুটকেসের দিকে। না, সব তো ঠিকই আছে। তাহলে?
“মামা, চেন টানব?” সন্দেশ বলে।
“বিপদে চেন তো টানতেই হবে। কিন্তু এইরকম অবস্থা যে করেছে সে কাছাকাছি আছে কি না কে জানে। সে চেন টানতে দেখলে যদি খুব রেগে যায়?” এই বলে মামা চুপিচুপি আঙুল দিয়ে ঠেলা দেয়।—“ও মশাই, ও স্যার, শুনতে পাচ্ছেন? স্যার, কলকাতা প্রায়…”
আর বলতে হয় না। একজনের মুখের রুমালটা টানতেই খুলে আসে। সঙ্গে সঙ্গে তাঁর ঘুম ভেঙে যায়। তাঁর ঠেলাঠেলিতে বাকি দুজনেরও ঘুম ভাঙে।
মামা জিজ্ঞাসা করে, “আপনাদের মতন জওয়ানদের কে কী করে কাবু করল বলুন তো? এ তো ভীষণ বড়ো ডাকাত হবে! কয়জন এসেছিল? কেমন দেখতে স্যার?”
হাবিলদাররা চেঁচিয়ে ওঠেন, “ডাকাত? কে ডাকাত? কোথায়?” বলে ধড়মড় করে উঠে দাঁড়ান, এদিক-ওদিক তাকান।
“ডাকাত নয়?” রহস্য ঘন হয়। “তাহলে কে আপনাদের রুমাল দিয়ে মুখ বাঁধল?” মামা ব্যস্ত হয়।—“দেখুন কিছু নেয়নি তো?”
সুবল দাস তখনও ঝিম ধরে বসে ছিলেন। হঠাৎ তিনি হাউমাউ করে ওঠেন, “দাদা, আপনি থাকতে ডাকাত? ওসব তো আপনার কাছে নস্যি। আপনি তো জিনিয়াস মশাই। কী লেভেল! কোথায় লুকিয়ে ছিলেন দাদা? আসুন, বুকে আসুন। আপনার সঙ্গে যখন দেখা হয়েই গিয়েছে আপনাকে আর ছাড়ছি না।”
“ডাকাত নয়? তাহলে কে আপনাদের মুখে রুমাল বাঁধল?”
“বোঝেননি?”
মামা কেমন ভড়কে যায়।—“স্যার আ-আমি, মানে…”
“সেনাবাহিনীতে আপনার মতো মানুষ খুব দরকার। যাবেন?” এবারে দীপক বলে ওঠেন।
সন্দেশ দেখে মামার মুখটা করুণ হয়ে যাচ্ছে। সে নিজেও খানিক ঘাবড়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে, “না, মামা যাবে না। মামা গেলে আমায় বাড়ি নিয়ে যাবে কে? পরশু থেকে আমার স্কুল আছে না?”
হারুমামা দেখা গেল বেজায় ঘাবড়ে গিয়েছে। তো তো করে বলে, “ঠিক বুঝলাম না। আমি কি কিছু অন্যায়…”
শুনে সুবল দাস হেসে বলেন, “আরে ছি ছি। বলেন কী দাদা। আমি খোলসা করে বলছি শোনেন। কাল রাত্তিরে তো আপনি আর ভাগ্নে ঘুমিয়ে পড়লেন।”
মামা আর সন্দেশ ঘাড় নাড়ে।
“তারপরই আসল ঘটনা শুরু। আমরাও আলো নিভিয়ে শুয়েছি আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হল গোলাগুলি নিক্ষেপ।”
“অ্যাঁ! ট্রেনে গোলাগুলি? বলেন কী স্যার?”
সন্দেশ ব্যাপারটা কিছুটা আন্দাজ করতে পারছিল। ঘুমের মধ্যে সে খানিক টের পেয়েছ। সে কান খাড়া করল। সুবল তখন বলে চলেছেন, “প্রথমে গুড়গুড়, তারপর গড়গড়, হঠাৎ সব চুপচাপ তারপর প্রবল বিক্রমে হুরুর, হুরুর। তারপর কয়লার ইঞ্জিনের আওয়াজ ফুরুর ফু, ফুড়ুৎ ফু… সেই শব্দ তারপর বাড়তে লাগল, বাড়তে লাগল… ওরে বাবা, হঠাৎ স্কেল চেঞ্জ করে নাকের বদলে মুখ দিয়েও সেই ভু ভু শব্দ। যেন একসঙ্গে একশো ড্রাম বাজছে, হাজার কালবৈশাখীর মেঘ ডাকছে কানের কাছে। হরিবল। হরিবল।”
মামা লজ্জা পেয়ে বললে, “এ হে, ছি ছি, লজ্জায় ফেলে দিলেন। এমন করেছি আমি? আসলে একটু নাক ডাকে আমার।”
“বলেন কী? একটু? এ তো কুম্ভকর্ণের থেকেও বেশি।” দীপক বেরা হাসতে থাকেন।
“ঘুমাব কী? বোমা-গুলির শব্দই শুনছি। তার মধ্যে হঠাৎ আপনি আবার চেঁচিয়ে উঠলেন—কে? কে? ব্যস, নীচের বার্থে দীপকবাবুর বোধ হয় একটু চোখ লেগে এসেছিল, এই কে কে চিৎকারে ঘাবড়ে ঘুরতে গিয়ে একদম মাটিতে।”
“অ্যাঁ, একদম মাটিতে? কী কাণ্ড, কী কাণ্ড। আমরা কিছুই জানি না।”
“জানবেন কী করে? তখন তো আপনি গুলি-গোলা ছুড়ছেন।” সুবল দাস একটু গলা খাঁকারি দিলেন এবারে।—“আসলে আমরাও প্রথমে অন্ধকারে ভেবেছিলাম চোর-ডাকাত কিছু পড়েছে।”
লজ্জায় মাথা নীচু মামার। সুবল দাস এবারে মুচকি হেসে বললেন, “এরপর আপনাকে আর ছাড়া যায় স্যার? যুদ্ধে আপনাকে সঙ্গে করে নিয়ে যাব। আপনি শুধু রণক্ষেত্রে একটা খাটিয়া পেতে কষ্ট করে একটু ঘুমোবেন। ব্যস, শত্রুপক্ষ ওই গোলাগুলির শব্দেই পিছু হটবে।”
“না না, স্যার। ছি ছি, সারারাত আপনাদের ঘুম হয়নি। লজ্জায় মাথা হেঁট আমার।”
জীবনবাবু হাসতে হাসতে বলেন, “কীসের লজ্জা? আমরা বীরের সম্মান করতে জানি মশাই। জোর আছে বটে আপনার নাকে। নাকের ওপর গোলা বসিয়ে রাখলে আপনার এক ফুতে একদম ও-পারে শত্রুপক্ষে গিয়ে পড়বে। বলব কী মশাই, সীমান্তে গুলি-গোলার মধ্যেও মহানন্দে ঘুমিয়েছি, কিন্তু গতকাল যা শুনলাম সে তো অভূতপূর্ব। যেন জাহাজের ইঞ্জিন ঘরের শব্দ। কখনও ফু, কখনও ভু, কখনও তারস্বরে কে কে—ওফ্! প্রতিমুহূর্তে মনে হচ্ছিল এই বুঝি শত্রুপক্ষ কামান-বন্দুক নিয়ে তেড়ে এল।”
মামা মাথা চুলকে বললে, “আসলে নিজের নাক ডাকার শব্দে নিজেরই ঘুম ভেঙে যায়। ভাবি এই বুঝি কেউ দরজায় ধাক্কা দিচ্ছে, ডাকাত পড়ল বা কেউ এল বাড়িতে। তবে এভাবে আপনাদের ঘুম ভাঙাবার জন্য আমার তো একটা শাস্তি হওয়া দরকার স্যার।”
সুবল দাস হাসতে হাসতে বলেন, “কী শাস্তি নেবেন বলুন?”
ট্রেন বর্ধমান ঢুকছে। মামা উঠে দাঁড়ায়। বলে, “স্যার, আজ আপনাদের ব্রেকফাস্টের ভার আমার। গরম গরম পুরি আর ধোঁয়াওঠা আলুর তরকারি। চলবে?”
“আলবাত চলবে।”
বর্ধমানে গাড়ি দাঁড়াতে নেমে গিয়ে পুরি-সবজি কিনে উঠে এল মামা। তারপর সবার সামনে খাবারদাবার সাজিয়ে দিয়ে বলে, “স্যার, একটা প্রশ্ন। কে আপনাদের মুখ বাঁধল?”
জীবন দত্ত হাসতে হাসতে বলেন, “কেউ বাঁধেনি। গোলাগুলির শব্দে যখন ঘুম আসছে না তখন নিজের রুমাল দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে রুমালের কোণ দুটো দুই কানে ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম যদি তাতে শব্দের গোলা কিছু কমে। কিন্তু বোমের শব্দ কি বন্ধ করা যায় এত কাছে বসে? কেঁপে কেঁপে যাচ্ছিলাম মশাই।”
কোনোদিকে আর তাকাচ্ছিল না মামা। মনে মনে একটু গর্বও হচ্ছিল বইকি। শুধুমাত্র নাক বাজিয়ে তিন জওয়ানের মুখ বেঁধে ফেলা—কম বীরত্বের কাজ?
