মল্লিকা ধরের আগের লেখা- তৃণার স্বপ্নপৃথিবী(উপন্যাস), আশ্চর্য নীল আয়না, শূন্যান্তর

একেবারে প্রথমে সৃষ্টিকর্তা ক্যাগেন সব পশুপাখি তৈরি করে পৃথিবীতে ছেড়ে দিলেন, কিন্তু না বানালেন কোনও পুকুর, না কোনও নদী, না কোনও ঝরনা বা প্রস্রবন। কোনও ঘাসজমি নেই, কোনও ফলের গাছ নেই, চারদিকে শুধু ধু ধু বালির মরু, তীব্র সূর্য আগুন ঢেলে তাতিয়ে তোলে তা সারাদিন। পশুপাখিরা সবাই পশুপাখি মেরেই মাংস ভক্ষণ করে আর তৃষ্ণা মেটায় রক্তে। কী ভয়ংকর রক্তলাল সেইসব দিন, কারও জীবনেরই কোনও নিরাপত্তা নেই।
এক ছিল বিরাট হাতি, সে এইসব দেখে ব্যথিত। সে বলে, “এইরকম চলতে পারে না, পারে না, পারে না।”
পশুপাখিরা কাছিয়ে আসে। কৌতূহলী হয়ে বলে, “তাহলে?”
মহান হৃদয় হাতি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, “আমি মরে গেলে আমার দেহের লোম থেকে গজাবে ঘাস। আমার নাড়িভুঁড়ি থেকে হবে তরমুজের লতা, তাতে রস টুসটুস তরমুজ ফলবে। আমার হাড় থেকে হবে ফলের গাছ, রসালো ফল হবে তাতে। আর কাউকে মাংস খেতে হবে না, রক্তপান করতে হবে না। প্রচুর খাবার আর পানীয় পাবে সব পশুপাখি।”
আগ্রহ-উদগ্রীব হয়ে সবাই হাতির দিকে তাকিয়ে থাকে। একজন বলে, “কবে, সে কবে? আহা, কবে?”
হাতি বলে, “কী জানি! আমরা, হাতিরা তো অনেকদিন বাঁচি। দেখা যাক কী হয়।”
সবাই আশায় আশায় চলে যায়। ভাবতে ভাবতে যায়, একদিন মরু সবুজ হবে, কত ঘাস, কত ফল, মাটিতে কত রসালো তরমুজ! এত তৃষ্ণা থাকবে না, ক্ষুধা থাকবে না, রক্তলোলুপ এইসব ভয়ানক দিনের অবসান হবে। কিন্তু সে কবে? ‘কবে তৃষিত এ মরু ছাড়িয়া যাইব তোমার রসাল নন্দনে?’
এক ছিল মস্ত সাপ। সে হাতিকে এসে বলল, “হাতি, সত্যিই তুমি তোমার নিজের জীবন দিয়ে আমাদের জীবন সুন্দর করতে চাও, আমাদের রক্ষা করতে চাও?”
হাতি বলে, “হ্যাঁ, সত্যি। এই বীভৎস যন্ত্রণা আর চোখে দেখতে পারি না। এর অবসান চাই।”
সাপ বলে, “আর একবার ভেবে দ্যাখো। সকলের জীবন সুন্দর হবে, কিন্তু তার জন্য চরম মূল্য যে তোমাকে দিতে হবে!”
হাতি বলে, “আমি ভেবে দেখেছি, অনেকবার। আমি তৈরি।”
সাপ বলে, “তবে তাই হোক।”
বিদ্যুতের মতন চমকে ওঠে সাপের ফণা। গভীর দংশন করে সে হাতিকে। সবটুকু বিষ ঢেলে দেয়। হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, যন্ত্রণায় নীল হয়ে যেতে থাকে তার বিরাট দেহ। কিছু পরেই মৃত্যু হয় হাতির।
হাতির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ে আগুনের মতন। দলে দলে পশুপাখিরা এসে হামলে পড়ে হাতির মৃতদেহের উপরে। পেটভরে মাংস খায়, তৃষ্ণা মিটিয়ে রক্তপান করে। তারা খায় আর পান করে। খেতে খেতে দিন ফুরায় প্রায়। আর কিছু পড়ে থাকে না চামড়া, হাড় আর নাড়িভুঁড়ি ছাড়া।
একসময় সূর্য নামে পাটে, পরিতৃপ্ত উদরে পশুপাখিরা ঘুমাতে যায়। বহুদিন পরে পেট ভরে খেতে পেয়েছে তারা, মিটাতে পেরেছে তৃষ্ণা।
পরদিন সকালে একে একে জেগে উঠতে থাকে পশুপাখিরা। আবার তপতপে গরম দিন, আবার ক্ষুধা, আবার তৃষ্ণা। আবার সেই যন্ত্রণা। সকলে উন্মত্তের মতন ‘হা খাদ্য, হা পানীয়’ শুরু করে।
সাপ বলে, “আরে তোমরা এত অধীর হয়ো না। মনে আছে হাতির প্রতিশ্রুতির কথা?”
পশুপাখিদের স্মৃতিশক্তি বেশি নয়। অনেকেরই কিছু মনে নেই। শুধু কয়েকজন তোতলাতে তোতলাতে বলে, “হ্যাঁ, কী যেন হাতি বলেছিল, সে মরে গেলে তার হাড় থেকে ফল গাছ হবে, তাই না? কিন্তু হাতি তো মরেনি। সাপ, তুমি তাকে মেরেছ।”
সাপ ভীষণ রেগে ফোঁস করে ওঠে, “এখন আমার নামে দোষ, না? সুবিধাটুকু পাওয়া হয়ে গেলে এরা সব ভুলে যায়! আয় কে খেতে চাস আমার রক্ত, এগিয়ে আয় সাহস থাকে তো।”
সাপের রোষদীপ্ত চেহারা দেখে সবাই পিছু হটে। সাপের বিষদাঁতের কথা কে না জানে! সাপকে কেউ ঘাঁটাতে চায় না।
অনাহারে আর বিনা পানীয়েই কেটে যায় একটি দিন। ক্রমে সূর্যাস্ত হয়। রাতের বেলা একে একে পরিচিত তারারা ফোটে আকাশে। তার সঙ্গে দেখা দেয় নতুন এক তারা, সেই তারা এগিয়ে আসতে থাকে। ভয়ে শিউরে ওঠে সব প্রাণী। বলে, “ওই যে হাতির আত্মা। আমাদের ধ্বংস করতে আসছে।”
চুপ করে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকে পশুপাখিরা। নতুন তারাটি এগিয়ে আসতে আসতে এসে স্থির হয় হাতির দেহাবশেষের উপরে। সহসা হাতির হাড়গুলো খাড়া হয়ে ওঠে। শিকড় গজিয়ে ছড়িয়ে যায় মাটির গভীরে, উপরে ডালাপালা গজায়, পাতাপত্তর হয়। ফলের গাছ হয়ে যায় ওরা। হাতির নাড়িভুঁড়ি থেকে তরমুজের লতা হয়, রসালো তরমুজ ধরে তাতে। আর হাতির গায়ের লোম থেকে হয় মস্ত মস্ত ঘাস, হাতিঘাসের জঙ্গল বলে যা এখন পরিচিত।
পরদিন সকালে পশুপাখিদের আনন্দ দেখে কে! দলে দলে হরিণ, খরগোশ, গোরু, ভেড়া, জেব্রা, ঘোড়া আর বাকি সবাই বেরিয়ে পড়ে খেতে। মাঠভরা সবুজ ঘাস, আহা! শুধু কিছু কিছু প্রাণী চিতা, হায়না, সিংহ, নেকড়ে, পেঁচা এইরকম কিছু প্রাণী বলল মাংস ছাড়া তারা বাঁচতে পারবে না। তারা চলে গেল রাত্রির অন্ধকারে, রাতে শিকার ধরে খাবে। শকুন বলল যে তারও মাংস লাগবে, কিন্তু সে নিজে মারবে না, এমনি এমনি কেউ মরে গেলে তবে খাবে।
খাবারদাবারের ব্যবস্থা তো হয়ে গেল। কিন্তু পানীয়? কী ভীষণ তৃষ্ণা!
আবার সাপকে তারা বলে, “পানীয় চাই, পানীয় চাই। তেষ্টায় মরে গেলাম।”
সাপ বলে, “ফলে রস আছে, তরমুজেও। ঘাসেও। সে-সবে তেষ্টা মেটে না তোমাদের?”
কিন্তু কেউ শোনে না। আহ্, তৃষ্ণা! আবার তারা তাকাতে থাকে এদিক-ওদিক। নধর কচি কোনও প্রাণীর মিঠে রক্তে তারা তৃষা মিটাবে।
সাপ বাধা দেয়। বলে, “না না না, আর নয়। মহান হাতি নিজের জীবন দিল তোমাদের জন্য, তবু তোমাদের সন্তুষ্টি নেই। দাঁড়াও, দেখি কী করা যায়।”
সাপ মাটিতে গর্ত করে নেমে গেল পাতালে। সেখান থেকে ফণা আর লেজের ঝাপটা দিয়ে ঠেলে ঠেলে পাতালের জল নিয়ে এল উপরে। দেখা দিল ঝরনা ও প্রস্রবণ। নীচু নীচু জায়গা জলে ভরে গিয়ে হল পুকুর-দিঘি-হ্রদ, নদী বয়ে গেল উপত্যকার মাঝ দিয়ে।
খাদ্য ও পানীয়ের সমস্যা মিটে গেল। এখন পৃথিবী ঘাসে পাতায় লতায় গাছে সবুজ, স্নিগ্ধ জলের এখন অভাব নেই। সকলে সুখী।
সাপ রইল না, আগুনে ঝাঁপ দিয়ে সে ফিরে গেল স্বর্গে। সে কাউকে বলেনি যে হাতিকে সে মর্মান্তিক ভালোবাসত, তাকে ছাড়া সে থাকবে কেমন করে?
রয়ে গিয়েছে হাতিঘাসের জঙ্গল, রয়ে গিয়েছে সেই জলকুণ্ড যেখানে প্রথম পাতালের জল নিয়ে এসেছিল সাপ। আর রয়ে গিয়েছে এই গল্প।
আফ্রিকার সান (San) জাতির উপকথা